অনুবাদ কবিতা, গদ্য, প্রবন্ধ, বিশ্বসাহিত্য, ব্যক্তিত্ব

এডওয়ার্ড সাঈদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি: মাহমুদ দারবিশের ‘কবিতার তরবারি’

মাসুদুজ্জামান | 10 Oct , 2013  

সাংঘর্ষিক সংশ্লেষ

তিরিশ বছর আগে,
সময় তখন এতটা বন্য ছিল না …
আমরা দু’জনেই বলছিলাম :
অতীত শুধুই যদি হয় এক অভিজ্ঞতা,
ভবিষ্যতের নির্মাণ তাহলে অর্থপূর্ণ হবে, হবে বীক্ষণ।
সবাই চলো,
সবাই চলো ঘাসের অলৌকিকতা আর কল্পনার সারল্যকে
বিশ্বাস করে আগামীর দিকে এগিয়ে যাই/

মনে করতে পারছি না দু’জনে সিনেমা দেখতে গেছিলাম কিনা
সন্ধ্যায়। এখনও আমার কানে বাজে
বুড়ো প্রাচীন ইন্ডিয়ানরা হেঁকে চলেছেন : বিশ্বাস
করো না ঘোড়া অথবা আধুনিকতাকে

না। ফাঁসি হতে চলেছে যে মানুষটির
সে কখনো যে ফাঁসি দিচ্ছে, তাকে কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারে না:
আমিই কী তুমি? আমার তরবারি কী আমার নাকের চাইতে বড়ো ছিল,
তুমি কী জিজ্ঞেস করবে
আমি তোমার মতো আচরণ করেছিলাম কিনা?

এরকম একটা প্রশ্ন এক ঔপন্যাসিকের কৌতূহলকে
প্ররোচিত করেছিল,
কাচের অফিসে তিনি বসে আছেন, বাগানের লিলি তার
নজরেই আসছে না, যেখানে
কল্পনার বাহু বিবেকবোধের চাইতেও
স্পষ্ট
ঔপন্যাসিক এরকম একটা কিছু লিখতে চাইছিলেন
মানবিক প্রবৃত্তি নিয়ে … গতকালের মধ্যে
কোনো আগামী কাল নেই, তাহলে সবাই এসো
সামনের দিকে অগ্রসর হই/

সামনের দিকে এভাবে এগিয়ে চলা
বর্বরতার দিকে যাওয়ার
সেতু হয়ে উঠতে পারে …/

নিউ ইয়র্ক। অলস এক ভোরে এডওয়ার্ড
ঘুম থেকে আড়মোড়া ভেঙে উঠলেন। তিনি বাজালেন
মোৎসার্ট।
বিশ্ববিদ্যালয়ের টেনিস কোর্টে কিছুক্ষণ
দৌঁড়ালেন।
সীমানা ছাড়ানো

ভাব ও চিন্তার মধ্যে পরিভ্রমণ করতে করতে ছাড়িয়ে গেলেন
একের পর এক সীমান্ত,
অতিক্রম করে গেলেন সব বাধা। তিনি পড়তেন নিউ ইয়র্ক টাইমস।
লিখতেন মন্তব্যধর্মী জ্বালাময়ী নানান লেখা। প্রাচ্যবাদীদের কসে সমালোচনা করতেন
জেনারেলদের দুর্বলতা ধরিয়ে দিয়ে তাদের দিকনির্দেশনা দিতেন,
প্রাচ্যের নারীর হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হতে শিখিয়েছেন। তিনি গোসল সারলেন।

পছন্দমাফিক বেছে নিলেন অভিজাত স্যুট। চুমুক দিলেন
তার সফেদ কফিতে। ভোরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললেন :
ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়িও না।

বাতাসের মাঝে তিনি হেঁটে বেড়াচ্ছেন, আর বাতাসের
মধ্যেই নিজেকে চিনেছেন তিনি। বাতাসের কোনো ছাদ নেই,
কোনো ঘরবাড়ি নেই বাতাসের। বাতাস হচ্ছে কম্পাস
উত্তর দিক থেকে আসা অপরিচিত মানুষের।
তিনি বললেন : সেখানে থেকেই আমি এসেছি, এখান থেকেও,
কিন্তু আমি সেখানকার নই, নই এখানকারও ।
আমার আছে দুটি নাম যারা একবার মিলেমিশে যায় আরেকবার বিছিন্ন …
আমার আছে দুই ভাষা, কিন্তু সেই কবে ভুলে গেছি
আমার স্বপ্নের ভাষা সত্যি সত্যি কোনটি।
আমার আছে এক ইংরেজি ভাষা, লেখার জন্য,
তাই দিয়ে সৃষ্টি করে চলেছি কথামালা,
আর আছে সেই ভাষা যা দিয়ে স্বর্গ আর জেরুজালেমের মধ্যে
আলপন চলে, রুপোলি ছান্দোলয়ে,
কিন্তু সেই ভাষা আমার নিজের ভাবনাকে জাগিয়ে তোলে না।

আত্মপরিচয় সম্পর্কে কী বলবেন? আমি জিজ্ঞেস করি।
তিনি বলছিলেন : এ একধরনের আত্মরক্ষা …
আত্মপরিচয় হচ্ছে জন্মের শিশু, কিন্তু
পরিশেষে, এটা আত্ম-আবিষ্কার, তবে অতীতের
উত্তরাধিকার টেনে টেনে চলা নয়। আমি বহু, অসংখ্য …
আমার ভেতরে সব সময় তৈরি হয় নতুন আরেক বহির্দেশ। এবং
যারা দুর্ভোগের শিকার আমি তাদের সম্পর্কেই প্রশ্ন তুলি। আমিও কী
সেখান থেকেই আসিনি,
সেখানকার উপমার হরিণকে লালনপালন করবার জন্যে
আমার হৃদয়কে আমি প্রশিক্ষিত করে নিয়েছি …
উলে যেখানেই তুমি যাও, নিজের স্বদেশকে সঙ্গে নিয়ে যাও, আর যদি
প্রয়োজন পড়ে আত্মমুগ্ধ হতে পারো/

বাইরের বিশ্ব এক নির্বাসন,
নিজের ভেতরেও আছে নির্বাসিত বিশ্ব।
আর এই দুইয়ের কোনখানে তোমার অধিষ্ঠান?
আমার কথা যদি বলো, বলব– জানি না
ফলে একে হারাবার কোনো ভয় আমার নেই। আমি তা-ই যা আমি।
আমিই আমার অন্য, এক দ্বিত্ব
কথা আর অঙ্গভঙ্গির মধ্যে অনুরণন সৃষ্টি করে চলেছি।
যদি আমি কবিতা লিখতে পারতাম তাহলে বলতাম :
একের মধ্যে দুই আমি,
দুই পুচ্ছবিশিষ্ট পাখির ডানার মতো,
বসন্ত যখন বিলম্বে আসে
আমি তখন বয়ে আনি শুভসংকেত।

একটি দেশকে তিনি ভালোবাসতেন আর সেই দেশটিকে ছেড়েও এসেছিলেন।
[অসম্ভব কী সত্যিই সুদূর?]
অজানা সবকিছুকে ছেড়ে আসতেই ভালোবাসতেন তিনি।
সংস্কৃতি থেকে সংস্কৃতিতে স্বাধীনভাবে পরিভ্রমণের জন্যে
যারা মানবতার মর্মোদ্ধার করে চলেছেন
একটা জায়গাতেই যাতে সবাই বসতে পারেন সেরকম পরিসর খোঁজেন…
এখান থেকেই প্রান্ত এগিয়ে চলে। অথবা বলা যায় কেন্দ্র
যায় পিছিয়ে। পুব এখানে কেবল আঁটোসাটো গণ্ডীতে বাঁধা পুব নয়,
অথবা পশ্চিম নয় সুকঠিন আঁটোসাটো পশ্চিম,
এখানে আত্মপরিচয় বহুত্বের মধ্য দিয়ে মুক্ত, প্রসারিত,
এ নয় কোনো দুর্গ অথবা পরিখা/

উপমারূপক তখন নদীতীরে ঘুমাচ্ছিল;
পরি্েবশ দূষণের জন্যে নয়
এক তীর অন্য তীরকে আলিঙ্গনে বাঁধবার জন্য।

–আপনি কী কোনো উপন্যাস লিখেছেন?
চেষ্টা করেছি … চেষ্টা করেছি কীভাবে ফিরে পাওয়া যায়
দূররমণীকুলের আয়না থেকে নিজের প্রতিকৃতি।
কিন্তু তারা সুরক্ষিত রাত্রির মধ্যে ভোঁ-দৌড় দিয়ে ঢুকে পড়েছে।
যেতে যেতে বলে গেছে : যে-কোনো লেখাতেই হোক আমাদের পৃথিবী স্বাধীন।
এক পুরুষ আরেক নারীকে লিখতে পারে না যে-কিনা একই সঙ্গে প্রচ্ছন্ন আর স্বপ্ন।
এক নারী আরেক পুরুষকে লিখতে পারে না যে-কিনা একই সঙ্গে প্রতীক আর নক্ষত্র।
এমন দুটো ভালোবাসা পাওয়া যাবে না যা একরকম। একরকম নয়
কোন দুই রাত। তাহলে এসো মানুষের ভালো গুণাবলির একট তালিকা করি
আর হাসি।
–তাহলে আপনি আর কী করতেন ?

আমি আমার নির্বুদ্ধিতা নিয়ে হাসাহাসি করতাম
আর ময়লা ঝুড়ির মধ্যে উপন্যাসটিকে
ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম/

বৌদ্ধিক নিয়ন্ত্রণের কথা ঔপন্যাসিক বলতে পারতেন
আর দার্শনিক ব্যাখ্যা করে দেখাতে পারতেন চারণকবির গোলাপগুলোর/

একটি দেশকে তিনি ভালোবাসতেন আর সে দেশটিকে ছেড়েও এসেছিলেন তিনি :
আমি যা আমি তাই-ই আর এরকমি থাকব।
আমি কোথায় থাকব নিজেই তা ঠিক করব।
বেছে নেব নির্বাসনের স্থান। আমার নির্বাসন, মহাকাব্যিক
দৃশ্যের মতো। পক্ষ নিই
কবির প্রয়োজনে লাগা স্মৃতি আর আগামীকালের,
আমি বৃক্ষপ্রিয় পাখির জন্যে দেশ ও নির্বাসনকে
সমর্থন করি,
আর একটি চাঁদ, প্রেমের কবিতা লেখার রসদ জোগানোর জন্য
যথেষ্ট ঝলোমলো;
আমি সেই ধারণার পক্ষ অবলম্বন করি যা পার্টিবাজির কারণে
তছনছ হয়ে গেছে
পক্ষ অবলম্বন করি একটি দেশের যা পুরাণের দ্বারা ছিনতাই হয়ে গেছে।

— তুমি কী আসলে কিছু ফিরিয়ে দিতে পারবে?
পেছনে যা ফেলে এসেছি আমার আগামী তাই টেনে তুলছে আর বেশ দ্রুতই …
বালির উপর হিজিবিজি লেখার জন্য আমার ঘড়িতে
কেনো সময় অবশিষ্ট নেই। আগন্তুকের মতো যদিও আমি গতকাল
ঘুরে আসতে পারি যখন তারা
কোনো এক বিষাদিত সন্ধ্যায় গ্রাম্যগাথা শুনছে :
“মেঘের কান্না দিয়ে,
“বসন্তে বালিকা তার কলসি ভরে নিচ্ছে,
“কাঁদছে আর মৌমাছির মতো হাসছে
“হৃদয় তার ছিড়ে যাচ্ছে …
“এ কী প্রেম যার জন্যে পানিও ব্যাথাতুর
“অথবা অশ্রুবাষ্পে কিছুটা অসুখ …”
[গান শেষ না হওয়া পর্যন্ত]।

— তাহলে, নস্টালজিয়া আপনাকে স্পর্শ করতে পারে?
নস্টালজিয়া আরো উচু, আরো দুর আগামীকাল,
আরো অনেক দুরত্ব। আমার স্বপ্ন আমার পদক্ষেপকে নিয়ন্ত্রণ করে।
আর আমার দৃষ্টি আমার স্বপ্নকে স্থান করে দেয়
আমার হাঁটুর কাছে
পোষা বেড়ালের মতো। এটাই কল্পিত
বাস্তব,
ইচ্ছার শিশু : আমরা গোলকধাধাঁর সম্ভাব্যতাকে বদলে ফেলতে পারি।

— আর গতকালের জন্যে কোনো নস্টালজিয়া?
বুদ্ধিজীবীর কোনো জোলো আবেগ থাকা মানায় না, যদি কিনা
তা অচেনা মানুষকে বিমূঢ় করে দেয়ার জন্য ব্যবহৃত না হয়
আর তাকে অগ্রাহ্য করে।
আমার নস্টালজিয়া একধরনের সংগ্রাম
বর্তমানকে ছাড়িয়ে
ভবিষ্যপ্রসারী।

— তুমি কী নিঃশব্দে গতকালের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলে যখন
সেই বাড়িতে গিয়েছিলে, তোমার বাড়িতে
তালবিয়ায়, জেরুজালেমে?
বাবাকে ভয় পাওয়া একটি শিশুর মতো
আমি আমার মায়ের বিছানায় ঘুমোবার
আয়োজন করছিলাম। আমি
মনে করতে চেষ্টা করেছিলাম আমার জন্মের কথা, আর
আমাদের পুরনো বাড়ির ছাদের উপর থেকে দেখতে চেষ্টা করেছিলাম
সেই ছায়াপথ।
চাইছিলাম অনুপস্থিতির গায়ে চিমটি কেটে
গ্রীষ্মের বাগানের জেসমিন ফুলের
গন্ধ নিতে। কিন্তু হায়না, এটা সত্যি,
চোরের মতো আমাকে তাড়া করে নস্টালজিয়ার কাছ থেকে সরিয়ে দিল।
— তুমি কী ভয় পেয়েছিলে ? কিসে তুমি ভয় পেয়েছিলে?
হারিয়ে যাওয়া মুখগুলোর আমি মুখোমুখি হতে
পারছিলাম না। দরোজার কাছে একটা ভিক্ষুকের মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম।
আমার বিছানায় যেসব অচেনা মানুষ শুয়ে আছে কী করে তাদের কাছে আমি
ভেতরে ঢোকার অনুমতি চাই … কী করে বলি পাঁচ মিনিটের জন্যে
আমি কী ঢুকতে পারি? ছেলেবেলার স্বপ্নে দেখা প্রতিবেশীদের কাছে কী
আমার শ্রদ্ধায় আনত হওয়া উচিত? তারা কী আমাকে জিজ্ঞেস করে বসবে :
কে হে তুমি কৌতূহলী বিদেশী ভ্রমণকারী ? আর কী করেই বা আমি
যারা যুদ্ধে আক্রমণের শিকার হয়েছে, আক্রান্তদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে,
তাদের কাছে যুদ্ধ ও শান্তির কথা বলি,
কোনো কিছু যোগ করা ছাড়াই, মন্তব্য ছাড়াই?
তারা কী তাহলে আমাকে বলবে : এক শোবার ঘরে
দুই স্বপ্নের কোনো ঠাই নেই ?

এভাবেই আমি নই কিংবা তিনি
কে জিজ্ঞেস করেছিল; হয়ত পাঠক প্রশ্ন করেছিল :
চরম দুঃসময়ে কবিতা কী বলতে পারে ?

রক্ত
আর রক্ত,
রক্ত
তোমার দেশে,
আমার নামে এবং তোমার নামে,
কাঠবাদামের ফুলে, কলার গায়ে
শিশুর দুধে, আলো আর ছায়ায়,
গমের দানায়, নুনে/

দক্ষ খুনী, সর্বোচ্চ কুশলতার সঙ্গে
লক্ষ্যবস্তু ভেদ করে চলেছে।
রক্ত
এবং রক্ত
এবং রক্ত।
এই ভূমি এর শিশুদের রক্তের তুলনায় খুবই ছোটো
বলি হওয়ার জন্যে সর্বনাশের সীমায় দাঁড়িয়ে আছে। এই ভূমি
সত্যিকার অর্থেই সৌভাগ্যে পরিস্নাত,
অথবা বলা যায় দীক্ষিত
রক্তে,
এবং রক্তে
এবং রক্তে
যা প্রার্থনায় নয় অথবা বালি কখনো শুকাতে পারে।
পবিত্র গ্রন্থে সেইভাবে বিচারের কথা লেখা নেই যেভাবে লেখা থাকলে
শহীদ হওয়া মানুষেরা স্বাধীনতার জন্য উল্লাস করতে পারতো
হেঁটে যেতে পারতো মেঘের দিকে। দিনের আলোয় রক্ত,
অন্ধকারে রক্ত। কথায় রক্ত।

তিনি বললেন : যা হারিয়ে গেছে কবিতা তাকে
আতিথ্য দিতে পারে, সুতোর মতো আলোর রেখা জ্বলজ্বল করছে
একটা গিটারের হৃৎপিণ্ডে; অথবা যিশুখ্রিস্ট
একটা গোড়ার পিঠে চড়ে রূপকালঙ্কার ভেদ করে ছুটে চলেছেন। লক্ষ্য
নন্দনতত্ত্ব কিন্তু তার উপস্থিতি বাস্তবের
আঙ্গিকে/
আকাশহীন এক পৃথিবীতে, পৃথিবী
পরিণত হয়েছে এক গোলকধাঁধায়। কবিতা
একধরনের সান্ত¦না, বাতাসের

এক ঝাপট, উত্তরের অথবা দক্ষিণের।
বিবরণ দেয়ার প্রয়োজন নেই ক্যামেরা তোমার ক্ষত
কীভাবে দেখে। এমনভাবে আর্তনাদ করো যেন তুমি নিজেই শুনছো,
আর্তনাদ করো যাতে জানতে পারো তুমি এখনও বেঁচে আছো,
এবং বেঁচে আছো, জীবন
পৃথিবীতেই সম্ভব। বলার জন্য আশাকে আবিষ্কার করো,
আবিষ্কার করো চলার নিশানা, মরীচিকাকে প্রসারিত করো অপার আশায়।
এবং গান গাও, নান্দনিকতার জন্যই আমাদের স্বাধীনতা/

আমি বললাম ; জীবনকে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় না
মৃত্যু যদি জীবন না হয়ে ওঠে।

তিনি বললেন : আমরা বাঁচব।
এসো আমরা তাহলে শব্দের উপর প্রভুত্ব করি, যে-শব্দ
তার পাঠককে মৃত্যুঞ্জয়ী করে রাখে — তোমার বন্ধু
রিতসস এরকমই বলেছিলেন।

তিনি আরো বললেন : আমি যদি তোমার আগে মরি,
আমার এই ইচ্ছা পূর্ণ হওয়া অসম্ভব।
আমি জিজ্ঞেস করলাম : অসম্ভব কী খুব দূরে সরে গেছে?
তিনি বললেন : এক প্রজন্ম দূরে।
আমি বলি : আর আমি যদি আপনার আগে মরি?
তিনি বললেন : গালিলি পাহাড়ে গিয়ে আমার শোকপ্রকাশ করে আসবো,
আর লিখে রাখবো, ‘নন্দনতত্ত্বের কাছে পৌছানোই স্থিরতা অর্জন।’ আর এখন
ভুলে যেওনা; আমি যদি আপনার আগে মরি, এ আমার এক অসম্ভব ইচ্ছে।

শেষবার আমি যখন নতুন সদোমে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি,
দু-হাজার দুই সালে, তিনি তখন ব্যাবেলের মানুষের পক্ষে যুদ্ধ করা থেকে
বিরত ছিলেন …
আর ক্যানসার। তিনি শেষ মহাকাব্যের মহানায়কের মতো
ট্রয়ের অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করে চলেছেন
অন্যদের নিজের ন্যারেটিভের ভাগ দেয়ার জন্যে।

একটি ঈগল উঁচু থেকে আরও উঁচুতে চক্রাকারে উঠে যাচ্ছে
তাঁর উচ্চতাকে জানাচ্ছে অভিবাদন,
অলিম্পাসে বসতিগড়া
কিংবা আরো উঁচুতে
সত্যিই ক্লান্তিকর।

বিদায় অভিবাদন,
বিদায় অভিবাদন, কবিতার বেদনাকে।

[মূল : মাহমুদ দারবিশ। অনুবাদ : মাসুদুজ্জামান]

‘সাংঘর্ষিক সংশ্লেষ’ শীর্ষক অনূদিত এই কবিতাটির লেখক ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশ (১৯৪১-২০০৮)। কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন ফিলিস্তিনি ভাবুক এডওয়ার্ড সাঈদের (১৯৩৫-২০০৩) মৃত্যুর পর, সাঈদের স্মৃতিকে স্মরণ করে। সাঈদ ও দারবিশ, রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত ভূখণ্ড (এখনও রাষ্ট্র হয়ে ওঠেনি) ফিলিস্তিনের দুই বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্ব। দুজনেই আজ মৃত। প্রথমজন ‘প্রাচ্যবাদ’-খ্যাত বিশশতকের প্রধান ভাবুক, অন্যজন ওই শতকেরই আরবি ভাষার বিশ্বখ্যাত কবি। সাঈদ ও দারবিশ দুজনেই নির্বাসিত জীবন বেছে নিয়েছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী ইউরো-মার্কিন-জায়নবাদী শক্তির বিরুদ্ধে তারা দুজনেই ছিলেন সোচ্চার। যাপন করে গেছেন রাষ্ট্রপরিচয়হীন, আত্মপরিচয়হীন উদ্বাস্তু জীবন। ইজরাইলি বর্বর হামলার প্রতিবাদে কবিতা লিখেছেন দারবিশ আর এই হামলার বিরুদ্ধে বিশ্বপাঠকের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক ভাষ্য লিখে গেছেন সাঈদ। কখনও গ্রন্থ রচনা করে, কখনও পত্রিকার ছোট ছোট নিবন্ধে।
দারবিশ ও সাঈদের সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে সাঈদের মৃত্যুর পর লিখে ফেলেন ‘সাংঘর্ষিক সংশ্লেষ’ নামের ওই কবিতাটি। এটি একটি আরবি শোককবিতা বা ‘মর্সিয়া’। দারবিশ ঐতিহ্যবাহী এই আরবি শোককবিতা নিয়ে চমৎকার পরীক্ষা-নীরিক্ষা করেছেন। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা আরবি শোককবিতার প্রকরণকে তো বটেই, আধুনিক কবিতার ধারাকেও ভিন্নমাত্রায় উন্নীত করেছে। বাংলা ভাষায়ও মর্সিয়া কবিতার অস্তিত্ব রয়েছে। আরবি কবিতার ধারাতেই এটি বাংলা কবিতায় স্থান করে নিয়েছিল। বাংলা ভাষায় এই মর্সিয়া কবিতা রচনার জন্য খ্যাতিমান হয়ে আছেন কাজী নজরুল ইসলাম।
edward-said.gif
কবিতাটি, লক্ষণীয়, ফিলিস্তিনির মানুষ, যারা ইসরাইলের বোমা হামলায় জীবন দিয়েছে, ঘরবাড়ি হারিয়েছে, আত্মএলিজির ভঙ্গিতে লেখা। কবিতাটি প্রকরণের দিক থেকে শোককবিতা বা এলিজি। বিস্ময়কর হল, এইভাবে আত্মমুদ্রা খচিত করে এলিজি রচনার রীতি দারবিশ সূচনা করেছেন বিশশতকের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক-ভাবুক এডওয়ার্ড সাঈদকে অবলম্বন করে। লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে সাঈদ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর এই কবিতার মধ্য দিয়েই দারবিশ তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু, বিশ্বনন্দিত বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। কবিতাটি তাই রাজনৈতিক ও শৈল্পিক উভয় দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।

কবিতাটির প্রকরণশৈলীতে একইসঙ্গে এসে মিশে গেছে প্রতিবাদী কবিতা, রাজনৈতিক ইশতেহার, প্রশ্নোত্তর পদ্ধতি, সাক্ষাৎকারের ভঙ্গি, স্মৃতি, শ্রদ্ধাবোধ, রাজনৈতিক মতাদর্শ, পরাবাস্তববাদ ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ। কবিতাটির অনন্যতা মূলত এইখানে যে দারবিশ এতে সাঈদের রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে যেমন মন্তব্য করেছেন, তেমনি এর শৈলীতে তাঁর বিশ্বখ্যাত প্রাচ্যবাদ ও সমালোচনা পদ্ধতিরও চমৎকার ব্যবহার ঘটিয়েছেন। প্রাচ্যেবাদের বৌদ্ধিক রাজনৈতিক অবস্থানকে তাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। এভাবেই কবিতাটি হয়ে উঠেছে শিল্পসম্মত প্রতিবাদী চমৎকার একটি কবিতা। টিএস এলিয়ট যেমন বলেছিলেন দারবিশও সেইভাবে ঐতিহ্যকে নবায়িত করে নিয়ে আতœবৈশিষ্ট্যে কবিতাটিকে করে তুলেছেন অনন্য। এই কবিতার মধ্য দিয়ে দারবিশ এভাবেই জন্ম দিলেন নতুন একধরনের শোককবিতার। রাজনীতি আর আত্মঅনুভূতি যেখানে পরম্পরিত হয়ে মিশে গেছে। কাব্যিক আবেগ অনুভবের সঙ্গে যেখানে এসে মিশেছে তত্ত্ব।

মূল আরবিতে লেখা ‘সাংঘর্ষিক সংশ্লেষ’ নামের কবিতাটি দারবিশ প্রথম পাঠ করেন ২০০৪ সালের জুলাই মাসে জর্ডানের ‘জেরাশ কবিতা সম্মেলনে’। পরে এটি প্রথম মুদ্রিত হয় ২০০৪ সালের ১০ আগস্ট লন্ডনভিত্তিক লেবাননি পত্রিকা আল-হায়াতে। ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এটি পুণঃমুদ্রিত হয় কায়রোর আল-আরাবি এবং অন্যান্য আরবি পত্রিকায়। ইংরেজিতে এর চমৎকার অনুবাদ করেছেন মোনা আনিস। তাঁর অনূদিত কবিতাটি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মিশরের ইংরেজি পত্রিকা আল-আহরাম সাপ্তাহিকীতে। এর পরপরই কবিতাটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পাঠকদের দৃষ্টিতে আসে। ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে এর ফরাসি অনুবাদ প্রকাশিত হয় লা মদে দিপ্লোমেতিকে পত্রিকায়। অনুবাদ করেন দারবিশের কবিতার প্রখ্যাত ফরাসি অনুবাদক ইলিয়াস স্যঁবর।

কবিতাটি এভাবে শুধু বিশ্বজনীন হয়ে ওঠেনি, এর প্রকরণরীতিটিও যে মিশ্রধাঁচের সেই বৈশিষ্ট্যের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। দারবিশ এমন একজনকে নিয়ে কবিতাটি লিখলেন যিনি নিজেও ছিলেন বিশ্বভাবুক। সাঈদ মার্কিন শিক্ষাদীক্ষায় যেমন বেড়ে উঠেছেন, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে বৌদ্ধিক আলোচনা করে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছেন। সাঈদ অসংখ্যবার উল্লেখ করেছেন, তাঁর ভাবনার প্রাথমিক উদ্বোধন ঘটেছিল পশ্চিমি সাহিত্য-সমালোচনার হাত ধরে, পরে মধ্যজীবনে ‘পুনরায় শিক্ষিত’ হয়ে ওঠেন কিছুকাল বৈরুতে থাকা কালে আরবি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনার মধ্য দিয়ে (দ্রষ্টব্য সাঈদের গ্রন্থ : শেষ আকাশের পর : ফিলিস্তিনি জীবন)। প্রায় চল্লিশ বছরের ভাবুক জীবনে সাঈদ তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ডিসকোর্সের পাশাপাশি নানা ধরনের গদ্য লেখালেখি এবং নানা প্রকরণ– যেমন স্মৃতিকথা, সাহিত্য-সমালোচনা, আলোকচিত্রের বিশ্লেষণ, সংগীত, চলচ্চিত্র, নৃত্য ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লেখালেখি করতে গিয়ে লেখালেখি সম্পর্কে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। দারবিশও সাঈদের বহুমাত্রিক জ্যঁর বা প্রকরণের ঢঙে যুক্তি-প্রত্যুক্তির বিমিশ্রণ (counterpoint) রীতিতে লিখেছেন ওই কবিতাটি — ‘সাংঘর্ষিক সংশ্লেষ’।

সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্যবাদ (১৯৯৩) গ্রন্থে সাঈদ লিখেছেন, এই সাংঘর্ষিক বিমিশ্রিত রীতির (contrapuntal method) মাধ্যমেই পাশ্চাত্যের আধিপত্যবাদী ডিসকোর্স কীভাবে প্রাচ্যের ইতিহাস নির্মাণ করে দিয়েছিল, তার স্বরূপ উন্মোচন করা যাবে। সাহিত্যের সঙ্গে সংগীতের বহুস্বরের (polyphony) তুলনা করে সাঈদ বলেছেন, কোনো ধরনের উঁচুনিচু অবস্থানে স্থাপিত না করে পশ্চিমের ধ্রুপদী সংগীত বিভিন্ন বিষয়কে (theme) পাশাপাশি স্থান দেয়। বিমিশ্রিত সাংঘর্ষিক রীতিটিও হচ্ছে ঠিক সেই ধরনের রীতি যেখানে চলে বিভিন্ন বিষয়ের সুসংগঠিত আন্তর্খেলা (organized interplay)। সংগীতের এই পদ্ধতিটি সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হলে কীভাবে কোন লেখা কেমন ‘আকার পায় এবং সম্ভবত কীভাবে উপনিবেশবাদের বিশেষ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তা গড়ে ওঠে, প্রতিরোধে এগিয়ে আসে, সর্বোপরি দেশীয় জাতীয়তাবাদের জন্মে দেয়’, সে-সবের হদিশ পাওয়া যেতে পারে। এইধরনের সাংঘর্ষিক রীতি, সাঈদ যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন, ‘জন্ম দেয় বিকল্প অথবা নতুন ন্যারেটিভের’ (সাঈদ ১৯৯৩ : ৫১)।

এই ধারণাকে (concept) আমির মুফতি উল্লেখ করেছেন ‘স্মৃতিজাগানিয়া, নিবিড় ও বিস্মৃতিপ্রবণ’ ভাবনা বলে। কিন্তু এই পদ্ধতিটি সাঈদের ক্ষেত্রে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (মুফতি ২০০৫ : ১১৪)। বারবার এর কথা নিজের লেখায় এবং নানা সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেছেন, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আলোচনা করেছেন, ব্যবহার করেছেন। সাঈদের স্মৃতিকথা স্থানচুত্যি : স্মৃতিচারণা (১৯৯৯) গ্রন্থে এর উল্লেখ যেমন আছে, তেমনি আছে তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত বিলম্বিত শৈলি প্রসঙ্গে (২০০৬) শীর্ষক সর্বশেষ বইতে। এই বইতে সাঈদ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, সংগীতের ক্ষেত্রে বিশ্বখ্যাত সংগীতজ্ঞরা (composer) কীভাবে কোন উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে সাংঘর্ষিক বিমিশ্রণ রীতি (counterpoint) ব্যবহার করেছেন। শুধু সংগীত নয়, সাঈদের মতে এই রীতিটি অন্যান্য শিল্পসমালোচনা, বিশেষ করে সাহিত্য-সমালোচনার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায়। মোৎসার্ট ও বাখের সংগীতচর্চার পটভূমিতে সাঈদ বলেছেন, ভাষা ও সমালোচনা সম্পর্কিত তর্কবিতর্ক ও তত্ত্ব-আলোচনা এবং যুক্তি প্রদানের সময় এই রীতিটি ব্যবহৃত হতে পারে। সংগীতের ক্ষেত্রে যেমন করা হয়, তেমনি একটি থিমের আবিষ্কার এবং সেই থিমটিকে এই সাংঘর্ষিক বিমিশ্রণ রীতির মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিকশিত করা যায় আর এর মাধ্যমে ওই থিমের সমস্ত সম্ভাবনাকে টেনে বের করে পাঠকের গোচরে নিয়ে আসা যায়। এর অর্থ হল, সাঈদের ভাষায় এই পদ্ধতির মাধ্যমে যে-কোনো শিল্পের সমালোচনা ভাষাগত দিক থেকে বর্ণনা করা সহজ এবং বিস্তৃত করা যেতে পারে (সাঈদ ২০০৬ : ১২৮)।

সাঈদের লেখকবন্ধু দারবিশ, একইভাবে যিনি মাতৃভূমি ছেড়ে এসেছিলেন, বেছে নিয়েছিলেন নির্বাসিত জীবন, কবিতা রচনার মাধ্যমে যুক্ত থেকেছেন রাজনৈতিক-বৌদ্ধিক সংগ্রামে। সাঈদের ওপর কবিতা লিখতে গিয়ে অবলম্বন করেছেন এই একই রীতি। তাই দেখা যাবে কথোপকথনের ভঙ্গিতে এই কবিতাটি লেখা : কবির কথা, সাঈদের কথা এবং নানা স্বর-প্রস্বর এসে এখানে মিশেছে, পাওয়া যায় নানা জনের নানা মন্তব্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারো কথাই এতে প্রধান হয়ে ওঠেনি, কোনো মন্তব্য প্রাধান্য বিস্তার করেনি। অর্থাৎ কবিতাটিতে কবিকথকের স্বর যেমন প্রধান নয়, তেমনি প্রধান নয় সাঈদের স্বরও; সেই সঙ্গে এতে নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে সন্দিহান সাধারণ ফিলিস্তিনিদের স্বরও এসে মিশেছে। কিন্তু বিস্ময়কর হচ্ছে এদের কোনো একজনের কথা বা মন্তব্য এতে প্রধান হয়ে ওঠেনি। কবিতাটি সেদিক থেকে বলতে গেলে ভাষাবয়ানের দিক থেকে আধিপত্যবিরোধী (antihegimonic) ভঙ্গিতে লেখা। ফলে কবির পর্যবেক্ষণ, নানা জনের নানা কথা ও স্বরের সহাবস্থান ও বুনটে, সাঈদ যেমন বলেছেন, বিমিশ্রিণরীতিতে ধ্রুপদী সংগীতের মতো গড়ে উঠেছে কবিতাটি।
সাঈদীয় বিমিশ্রণরীতির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল বিশ্লেষণ বা মন্তব্য করা, সাঈদ পশ্চিমের ফিলিস্তিন-নীতি বা ইসরাইলি আগ্রাসন সম্পর্কে তাঁর ভাবনা যুক্তিসহকারে আজীবন নানা লেখায় প্রকাশ করে গেছেন। নিজের এই মন্তব্য প্রকাশের রীতিকে তিনি ‘ভাবনার’ (ideas) ‘একটি সুসংগঠিত আন্তর্খেলা বলে আখ্যায়িত করেছেন (সাঈদ, ১৯৯৩ : ৫১)। এরই সঙ্গে তিনি মনে করেছেন, যে-রক্তপাত তাঁর স্বদেশকে ঘিরে ওই অঞ্চলে ঘটে চলেছে, সম্মিলিত বহুস্বর সেই বিরাজমান রাজনৈতিক উচ্চাবচ্চ অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে আর আশা জাগানিয়ার কাজ করতে পারে।

আরবি ভাষায় সাঈদীয় ঘরানার সমালোচকেরা যুক্তি-প্রত্যুক্তিময় বিমিশ্রণরীতির পারিভাষিক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেছেন ‘তিবাক’ (Tibaq) শব্দটি। দারবিশ তাঁর কবিতাটিও লিখেছেন ওই নামে ও পদ্ধতিতে। কবিতার আভ্যন্তর রচনাশৈলীর দিকে দৃষ্টি দিলেই বোঝা যাবে কী চমৎকারভাবে সাঈদের উদ্দেশ্যে রচিত কবিতাটিতে দারবিশ উক্তি-প্রত্যুক্তিধর্মী বিমিশ্রণরীতিটি ব্যবহার করেছেন। রাজনৈতিক-মতাদর্শিক বন্ধুর সমালোচনারীতির প্রতি দারবিশের শ্রদ্ধা কত গভীর ছিল, সাঈদের সমালোচনা পদ্ধতি গ্রহণ করে কবিতা লিখে তার প্রমাণ দিয়েছেন দারবিশ।

কবিতাটি দারবিশ রচনা করেছেন কথোপকথনের ভঙ্গিতে সংলাপের ওপর ভর করে। এই সংলাপ চালাচালি করেন কবিকথক দারবিশ এবং তাঁর মৃত বন্ধু সাহিত্য-সমালোচক ও প্রাচ্যবাদখ্যাত তাত্ত্বিক সাঈদ। কবিতাটির ভাষাভঙ্গি ও গঠনশৈলীতে সাঈদের উদ্ভাবিত বিমিশ্রণপদ্ধতি খুবই স্পষ্ট নানা প্রসঙ্গের উপস্থাপন এবং এসবের আন্তর্খেলা বা আন্তর্বুলির মধ্যে। মাঝে মাঝে এতে আরেক কথকের স্বর শোনা যায়, যে কবিকথক ও তাঁর বন্ধুর সমান্তরালে দাঁড়িয়ে বর্ণনা করে গেছেন নানা প্রসঙ্গ। এসবের মাধ্যমেই উন্মোচিত হয় এই কবিতার উপজীব্য রাজনীতি আর দেশহীনতার মর্মবস্তু। তবে নির্দ্বান্দ্বিকভাবে নয়, দারবিশ একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি-ইসরাইলি দ্বন্দ্ব, আশা ও নিমর্মতাকে সাংঘর্ষিক রীতিতে তুলে ধরেছেন, তাত্ত্ব্কিভাবে সাঈদেরই উদ্ভাবিত বিমিশ্রণরীতিতে লিখেছেন কবিতাটি।

সাঈদ তাঁর প্রাচ্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নানা লেখা, সমালোচনামূলক প্রবন্ধ-সাক্ষাৎকারে ‘অন্য’ (other) বা ‘অপর’-এর একটি তাত্ত্বিক রূপ উপস্থাপন করেছেন। এই কবিতাতেও দারবিশ নিজেকে এই অপরের পঙ্ক্তিভুক্ত বলে মনে করছেন : ‘আমিই আমার অন্য, এক দ্বিত্ব।’ এই পৃথিবীতে ‘যারা মানবতার মর্মোদ্ধার করে চলেছেন’ আর যারা ‘একটা জায়গাতেই যাতে সবাই বসতে পারেন সেরকম পরিসর খোঁজেন’, তাদের লক্ষ করে দারবিশ এরপর লিখেছেন : “এখান থেকেই প্রান্ত এগিয়ে চলে। অথবা বলা যায় কেন্দ্র / যায় পিছিয়ে। পুব এখানে কেবল আঁটোসাটো গণ্ডীতে বাঁধা পুব নয়, / অথবা পশ্চিম নয় সুকঠিন আঁটোসাটো পশ্চিম, / এখানে আত্মপরিচয় বহুত্বের মধ্য দিয়ে মুক্ত, প্রসারিত, / এ নয় কোনো দুর্গ অথবা পরিখা …।”

এই কবিতার যে-কথক সে সাঈদের ভাষাতেই কথা বলে, কিন্তু তা অনেক বেশি তীব্র গভীর। সাঈদের ভাবনার একটি মুলসূত্র হচ্ছে প্রাচ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে দেখানো। তাঁর লক্ষ্য ছিল বহুত্বের সমন্বয়। এখানেও আছে সেই পরম্পরা, সাঈদ ও দারবিশ দুজনেই চেয়েছেন ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের রাজনৈতিক সহাবস্থান। জাতীয়তাবাদী ও নৃকেন্দ্রিক ডিসকোর্স হিসেবে সাঈদের ভাবনাকেই দারবিশ এভাবেই তাঁর কবিতায় উপজীব্য করে তুলেছেন। আরও গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, সাঈদ ও দারবিশ দুজনেই চেয়েছেন সাংঘর্ষিক সংশ্লেষিত রাজনৈতিক সমাধান। ফিলিস্তিনিরা রাষ্ট্রপরিচয়হীনভাবে নির্বাসনে দিন কাটাবে, এই অবস্থার অবসান চেয়েছিলেন তাঁরা। মানবিক-রাজনৈতিক এই ভাবনা, বলাবাহুল্য, সাঈদেরই; দারবিশ শুধু তাকে অনুসরণ করেছেন। কবিতাটিও এভাবেই রচিত। এখানে কবি ও সমালোচক কথোপোকথনের মধ্য দিয়ে সহমত ও ভিন্নমত প্রকাশ করতে করতে এগিয়ে চলেন। সাঈদের রাজনৈতিক ভাবনার মূলকথা ছিল সমন্বয়ধর্মী বহুত্বের (harmonious plurality) মধ্য দিয়ে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের পারস্পরিক সহাবস্থান। সাঈদের এই ভাবনাকে দারবিশ কবিতায় রূপ দিলেন এভাবে, “তিনি বললেন : সেখান থেকেই আমি এসেছি, এখান থেকেও/ কিন্তু আমি সেখানকারও নই, নই এখানকারও।”

নিজের সঙ্গেই দারবিশের দ্বন্দ্ব, জাতীয়তাবাদী তিনি, কিন্তু তা নিয়েও দ্বিধান্বিত ছিলেন তিনি। আত্মপরিচয়ের সন্ধান করছেন ঠিকই, আবার সাঈদের মতো নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তা অগ্রাহ্যও করছেন এই বলে যে, “বুদ্ধিজীবীর কোনো জোলো আবেগ থাকা মানায় না।” কিন্তু এই কবিতায় গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে সংগতির ওপর। লেখক-কবি-সমালোককেরা রাজনৈতিক আন্দোলনে কীভাবে অবদান রাখতে পারেন, তারও উল্লেখ আছে। কবিতাটির প্রথমভাগ সাঈদ ও দারবিশের বৌদ্ধিক তর্ক-বিতর্কের ওপর ভিত্তি করে রচিত। এই কবিতার মাধ্যমে এক মহান কবি আরেক মহান ভাবুকের প্রতি যে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন, তার তুলনা বিশ্বকবিতার ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে সাঈদ ও দারবিশের পরস্পরের প্রতি অনুরাগ ও শ্রদ্ধাবোধের বিষয়টি একপাক্ষিক ছিল না, ছিল পারস্পরিক। ‘মাহমুদ দারবিশ সম্বন্ধে’ (১৯৯৪) শীর্ষক একটা প্রবন্ধে অকপটে দারবিশের প্রতি এই শ্রদ্ধার জানিয়ে সাঈদ লিখেছিলেন :
(দারবিশ) কখনই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তাঁর সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ, তীব্র রাজনৈতিক স্বাধীন মতাদর্শ, বিশেষ করে পরিশুদ্ধ সাংস্কৃতিক সংবেদনা ফিলিস্তিনি ও আরবীয় রাজনীতির সাংঘর্ষিক অবস্থান থেকে তাকে মুক্ত রেখেছে (সাঈদ ১৯৯৪ : ১১২)।

দুজনেই যৌথভাবে সংগ্রাম ও অবস্থান নিয়েছিলেন ফিলিস্তিনি অবদমনের বিরুদ্ধে। সাঈদ হয়ে উঠেছিলেন ওই সংগ্রামের বৌদ্ধিক কণ্ঠস্বর, দারবিশ সৃষ্টিশীল মুখপাত্র। রাজনৈতিকভাবে সাঈদ ও দারবিশের অবস্থানও ছিল সমধর্মী; ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন জানালেও একধরনের বৌদ্ধিক সমালোচনামূলক দূরত্ব বজায় রেখে ওই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁরা। ভাবুকের দিগদর্শন এভাবেই কবির শব্দবন্ধ আর বাকপ্রতিমার মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছে পরাধীনতা, নির্বাসিত জীবনের করুণ রঙিন প্রত্যয়দীপ্ত পদাবলী। কবিতাকে দারবিশ করে তুলেছিলেন দেশপরিচয়হীন মানুষের আত্মমুক্তি ও প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ লড়াইয়ের শানিত তরবারি।

প্রাচ্যবাদী রাজনৈতিক-বৌদ্ধিক ধারণা নির্মাণ করে পাশ্চাত্য কীভাবে প্রাচ্যকে শোষণ, ঘৃণা আর অবহেলা করে গেছে, কীভাবে ‘অপর’-এর [আদার] ধারণা তৈরি করে প্রাচ্যের মানুষকে অগ্রাহ্য করেছে, ‘প্রাচ্যবাদ’ [ওরিয়েন্টালিজম ১৯৭৯] গ্রন্থটিতে তার চমৎকার বিবরণ উপস্থাপন করেছিলেন সাঈদ। বৌদ্ধিকতার শ্রেষ্ঠত্ব নির্মাণ করে পাশ্চাত্য কীভাবে প্রাচ্যকে রানৈতিকভাবে শোষণ করেছে, খুলে দিয়েছিলেন সেই মুখোশ। ফলে এই বইটি প্রকাশের পর গত কয়েক দশকে বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্লেষণে প্রাচ্যবাদী ভাবনাই প্রধান হয়ে উঠেছে। নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেশে দেশে শুরু হয় রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয় অনুসন্ধান আর।সা¤্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও উত্তর-উপনিবেশবাদের স্বরূপ উন্মোচনের কাজ। বিশ্বসমালোচনার ধারাকেই ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন সাঈদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইঙ্গমার্কিন সাহিত্য সমালোচনার রীতিকে সরিয়ে দিয়ে তিনিই প্রথম প্রাচ্যবাদী ভাবনার প্রতিষ্ঠা ঘটান। তাঁর ভাবনাকে পশ্চিমের ভাবুকেরাও অগ্রাহ্য করতে পারেননি। শুধু তাই নয়, সাঈদের ভাবনার অনুসরণে বৈশ্বিক আধিপত্য, আত্মপরিচয় আর উপনিবেশবাদের বৈশিষ্ট্য উন্মোচনে বৃত হয়েছেন তাঁরা।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর ছিল সাঈদের দশম মৃত্যুবার্ষিকী। পৃথিবীর নানা দেশে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হয়েছে এই দিনটি। সেমিনার, সাহিত্যপাঠ, সংবাদপত্রের লেখালেখি, নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সাঈদের অনুরাগী পাঠক, বন্ধু, ভাবুকেরা স্মরণ করেছেন তাঁকে। এই লেখার মধ্য দিয়ে আমরাও তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। স্মরণ করছি সমকালীন এই বিশ্বশ্রেষ্ঠ ভাবুককে।

তথ্যসূত্র
Mufti, Amir R. (2005) ‘Global Comparativism’, in Homi Bhaba and W.J.T. Michell (eds.) Edward Said: Continuing the Conersation, Chicago: University of Chicago Press.
Said, Edward (1993) Culture and Imperialism, New York: Knopf.
_ (1994) Representations of the Intelectual, New York: Vintage.
_ (1994) ‘Traveling Theory Reconsidered’, Reflections of Exile and Other
Essays, Cambridge: Harvard University Press.
_ (2006) On Late Style: Music and Literature Against the Grain, New York: Pantheon.

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.