গদ্য, প্রবন্ধ, ব্যক্তিত্ব, শ্রদ্ধাঞ্জলি

মুহম্মদ নূরুল হুদা: তাঁর জন্মদিনে এক চকিতদৃষ্টিতে

আহমাদ মাযহার | 30 Sep , 2013  

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদাকে চিনি গত শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে। মনে পড়ছে সেই সময়ের একদিন আবিস্কার করেছিলাম আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদতি এক দশকের কবিতা (১৯৭৬) সংকলনটিকে। ষাটের কবিদের সকবিতা চিনে নিতে আমাকে সহায়তা করেছিল এই বই। মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতাও অন্তর্ভুক্ত ছিল সেখানে। হুদাভাইয়ের কবিতা সম্পর্কে বইয়ের ভূমিকায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ লিখেছিলেন, ‘…সমকালীনতার স্ববিরোধকে পুরোপুরি কাটিয়ে গিয়ে যাঁরা চেতনা ও রূপকুশলতার সুস্থিত ও সামঞ্জস্যময় কবিতা-জগৎ রচনা করতে পেরেছেন তাঁদের মধ্যে মুহম্মদ নূরুল হুদা…র নাম সবচেয়ে আগে আসবে। হুদার সুস্মিত সংহতি…সময়ের…বিশৃঙ্খল পটভূমিতে মূল্যবান।’ আমি যখন এই রচনাটি পড়ি তখন হুদাভাই কবিতা-সংহতির নিদর্শন ‘শুক্লা-শকুন্তলা’ সিরিজের সনেট কবিতাগুলো লিখে চলেছেন। পত্রিকায় পাতায় কবিতাগুলো পড়তে পড়তেই বইমেলায় পেয়ে গেলাম আটভাগের এক ক্রাউন আকারের সংহত-আকৃতির শুক্লা-শকুন্তলা (১৯৮১) কবিতার বইটিকে।

সে ছিল চমক জাগানো কবিতার বইয়ের নামের কাল যার সূচনা তিরিশের দশকের কলকাতা-কেন্দ্রিক কবিদের হাতে ঘটেছিল। আমাদের আধুনিকেরাও সৃজনশীলতায় যেন ছাড়িয়ে যাচ্ছিলেন একে অন্যকে! শামসুর রাহমানের প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে, রৌদ্র করোটিতে, নিরালোকে দিব্যরথ, প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে, আল মাহমুদের লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালি কাবিন, আলাউদ্দিন আল আজাদের ভোরের নদীর মোহনায় জাগরণ, সূর্যজ্বালার সোপান, লেলিহান পাণ্ডুলিপি, ফজল শাহাবুদ্দীনের তৃষ্ণার অগ্নিতে একা, আততায়ী সূর্যাস্ত, অন্তরীক্ষে অরণ্য, আবু বকর সিদ্দিকের ধবল দুধের স্বরগ্রাম, বিনিদ্র কালের ভেলা, সৈয়দ শামসুল হকের বিরতিহীন উৎসব, বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা, শহীদ কদরীর তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা, কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই, আবদুল মান্নান সৈয়দের জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ, জ্যোৎস্নারৌদ্রের চিকিৎসা, ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ, আসাদ চৌধুরীর তবক দেওয়া পান, বিত্ত নাই বেসাত নাই, প্রশ্ন নেই উত্তরে পাহাড়, রফিক আজাদের অসম্ভবের পায়ে, চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া–এই নামগুলো এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায় দেখ! মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতার শুরুর দিকের কবিতার বইয়ের নামও একই ধারার! তাঁর প্রথম দিককার কবিতার বইয়ের নাম শোণিতে সমুদ্রপাত (১৯৭২), আমার সশস্ত্র শব্দবাহিনী (১৯৭৫), শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি (১৯৭৫), অগ্নিময়ী হে মৃন্ময়ী (১৯৮০) নামগুলো ততদিনে জেনে গেছি!

হুদাভাইয়ের কবিতা যে খুব আগ্রহ নিয়ে খুঁজে পড়ছিলাম তা নয়। তবে পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত উপস্থিতির কারণে চোখে পড়ছিল। বাংলা একাডেমীতে নানা কাজে যেতাম বলে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যেতো। তিনিও আমাকে তাঁর আন্তরিক সান্নিধ্যসীমায় যাবার অধিকার দিয়েছেন। অনুভব করতাম স্মিতহাস্যময় পরিহাস-রসিকতায় যেন তাঁর ব্যক্তিত্ব বর্ণিত। সাহিত্যবোধে যে তিনি তীক্ষè তা লক্ষ করতাম। ইংরেজি কাব্য আস্বাদের মধ্য দিয়ে তাঁর কাব্যরুচি গড়ে উঠলেও তাঁর মধ্যে ছুঁৎমার্গিতা দেখি নি। আমার নিজের কাব্যরুচিকে এভাবেই তিনি স্পর্শ করে যেতে লাগলেন। ফলে পত্রিকার পাতায় তাঁর কবিতা দেখলে পড়ে ফেলতাম। পড়তে পড়তেই খানিকটা ভালো লাগা জন্ম নেয় তাঁর কবিতার প্রতি। সে-সময় এর-ওর কাছে তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও শুনেছি। পরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে কর্মসূত্রে তাঁকে দেখেছি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের আহ্বানে এসকিলাসের আগামেমনন নাটক অনুবাদ করতে। তখন লক্ষ করলাম তাঁর কবিসত্তা ও ক্ল্যাসিকসংহতিপ্রবণতা গ্রিক নাট্যকারের সংলাপের মধ্যে কীভাবে জমাট বেঁধে উঠছে।

হুদাভাই বয়সে যখন পরিণত হয়ে উঠেছেন তখন লক্ষ করলাম তাঁর সম্পর্কে একটা অভিধা পড়ল যে, তিনি ‘জাতিসত্তার কবি’। নিকটজনেরা তাঁর নিজের কবিতা থেকেই অভিধাটি সংগ্রহ করে শিরোদেশে পরিয়ে দিয়ে তাঁকে চিনতে খানিকটা সাহায্য করলেন বটে, কিন্তু তাঁর কবিতার বিবর্তনকে অনুভব করা থেকে দূরেও সরিয়ে রাখলেন। কারণ আমার মনে হয়, এই ধরনের অভিধা একদিকে একজন কবিকে যেমন চটজলদি চিনতে সাহায্য করে তেমনি অন্যদিকে বিভ্রান্তও করে তাঁর সামগ্র্যকে খুঁজে পাওয়া থেকে। হুদাভাইয়ের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে বলে মনে হয় আমার। কারণ হুদাভাই কবিতা লিখেছেন অজস্র ও বিচিত্র। তাঁর কাব্যসমগ্র (২০০১) বইটি উল্টেপাল্টে দেখলে যে কেউ অনুভব করবেন যে, অন্তর্গত তাগিদ না থাকলে সম্ভব নয় এতসংখ্যক ও এত বিচিত্র ধরনের কবিতা লেখা। এমন নয় যে হুদাভাই অপরিশীলিত বাক্যরাজি লিখে কেবল বইয়ের পরে বই বের করে কবিতার সংখ্যা বাড়িয়ে গেছেন। কবিতা সৃষ্টির জন্য একজন কবিতাঅভিযাত্রীর যে-সব কারিগরি ভালোভাবে জানা থাকা দরকার হুদাভাইয়ের মধ্যে তার উপস্থিতি খুব স্পষ্ট। প্রণোদনার স্বতঃস্ফূর্ত উদ্ভাস–যা কবির এক অন্যতম অত্যাবশ্যকীয় লক্ষণ–তারও দেখা মেলে তাঁর কবিতাপ্রয়াসে। সমকালীনতার তরঙ্গভঙ্গও দেখি সেখানে। লোকজীবনের ভাষাতেও তিনি সন্ধান করেন আধুনিকতাকে।
মুহম্মদ নূরুল হুদা আধুনিকতাভিসারী, কিন্তু তিরিশি আধুনিকতা-সংস্কারে বদ্ধ নন। কবি হিশেবে তাঁর অবস্থান শীর্ষে পৌঁছেছে এমনটি হয়তো বলা যাবে না, আবার নান্দনিকতার এমন মাত্রায়ও পৌঁছোয় নি তাঁর কবিতা যে সেগুলো আমাদের মুখে মুখে ফিরবে; কিন্তু কবিতাসৃষ্টির অভিসারে এতগুলো মৌল শর্ত যাতে সুলভ তাঁকে তো অমনোযোগে পাশ কাটিয়েও যাওয়া যায় না!

এতক্ষণ বললাম তাঁর কবিতাপ্রয়াসের কথা। কিন্তু প্রবন্ধ-রচনায়, কবিতা-সমালোচনায় তাঁর পারঙ্গমতা, অন্তর্দর্শিতা ও বিচারশীলতা আমাকে আকৃষ্ট করে চলেছে সেই আশির দশক থেকে যখন আমি তাঁর প্রথম প্রবন্ধ-সংকলন শর্তহীন শর্তে (১৯৮১) পড়ি। মনে পড়ছে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত কণ্ঠস্বর পত্রিকার নবপর্যায়ের একটি সংখ্যায় এ নিয়ে সলিমুল্লাহ খানের সমালোচনায় (সলিমুল্লাহ খানের কোনো কোনো বক্তব্যের তাৎপর্য স্বীকার করেও) পীড়িত বোধ করেছিলাম। কিন্তু বইটির পাঠে আমার আনন্দ-অভিজ্ঞতা সলিমুল্লাহ খানের সমালোচনাকে পাশ কাটিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশের কবিতা-প্রসঙ্গে তাঁর প্রবন্ধটি স্বাধীনতা-উত্তর প্রবন্ধ-সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য রচনা বলে মনে হয়। কারণ বাংলাদেশের কবিতার রক্তপ্রবাহের অন্তর্গত প্রণোদনায় রাজনীতি কীভাবে ক্রিয়াশীল তার যে সংক্ষিপ্ত অথচ গাঢ় রূপরেখা তিনি টেনে দিয়েছিলেন তাকে অস্বীকার করা কঠিন। যদিও প্রশ্ন উঠতে পারে যে কবিতার শরীরে রাজনীতির থাকা-না-থাকা নানন্দনিকতার স্বার্থে আদৌ প্রাসঙ্গিক কী না! মুহম্মদ নূরুল হুদা স্পষ্ট করে বলেছেন নান্দনিক উৎকর্ষের স্বার্থে রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা কবিতার জন্য প্রাসঙ্গিক থাকুক বা না-থাকুক বাংলাদেশের কবিতা শনাক্তির জন্য তা অবশ্যম্ভাবী!

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কবিতা নিয়েও তিনি লিখেছেন তাৎপর্যপূর্ণ রচনা। বিশেষ করে নজরুলে কবিতার ব্যাখ্যায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি নিঃসন্দেহে নতুন। নজরুলের কবিতা বিশ্লেষণে তিনি রূপতাত্ত্বিকতা, সামাজিকতা, লোকায়তিকতা ও দার্শনিকতাকে একসঙ্গে ভিত্তি করেছেন।

সমকালীন সাহিত্য সম্পর্কে তিনি একেবারেই উদাসীন নন। যে সামাজিক বৃত্তে তাঁর অনুবর্তন কবিতা-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তিনি তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেও অকুণ্ঠ! প্রবন্ধ-সমালোচনায় তাঁর যে কৃতি তা সামর্থ্যকে সুবিচার করেনি। কারণ গদ্য রচনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁর অনুভবের পূর্ণসত্তার প্রকাশ হয়ে উঠতে পারে নি যথাযথ মনোযোগের অভাবে। বহু রচনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, গ্রন্থে সংহতি পায় নি পূর্বোক্ত কারণে। এখন সময় এসেছে তাঁর বিস্মৃত প্রবন্ধাবলিকে যথার্থভাবে সংকলিত করা। অলিখিত উলব্ধিসমূহকেও সমনোযেগ প্রয়াসে লেখ্যরূপ দেবেন তিনি এমনটা প্রত্যাশা আমাদের!

তিনি কবি হয়েও প্রবলভাবে সামাজিক মানুষ। কবিতা-সম্পৃক্ত নানা আনুষ্ঠানিকতায় তাঁকে দেখা যায় প্রায়শই; দেখা যায় নানা অকবিসুলভ কর্মকাণ্ডেও ব্যাপৃত থাকতে। ফলে সমাজে তাঁর ভাবমূর্তি যতটা কবির তার চেয়ে বেশি এক অস্থির কর্মীমানুষের। অনেককেই বলতে শুনি যা তিনি করবার সামর্থ রাখেন তা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় নি। তাঁর সুস্থিত কর্মপ্রয়াসে তাঁর কাছ থেকে এখনও তা পাওয়া সম্ভব বলেও মনে করেন অনেকে।

কবির জন্মদিনে আকস্মিক প্রেরণা-উদ্দীপ্ত হয়ে বর্তমান রচনায় নিয়োজিত হওয়ায় এতে তাঁর সৃষ্টিকর্মের সম্পন্ন মূল্যায়ন সম্ভব হয়নি। একটা চকিত দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকানো গেছে হয়তো! কবি বা প্রবন্ধ-সমালোচনার লেখক মুহম্মদ নূরুল হুদাকে এখানে আকস্মিক ও তাৎক্ষণিকতার মধ্যে ধারণ করার খানিকটা চেষ্টা করা হলো। জন্মদিনে এই কামনা করি যে কবিতায় তাঁর গন্তব্য কোথায় সে-খোঁজ নিতে তাঁকে নিবিড়ভাবে পাঠ করা হবে। গভীরভাবে বিচার করে দেখবার জন্য পাঠ করা হবে তাঁর প্রবন্ধাবলিকে। কামনা করি দীর্ঘ ও কর্মক্ষম জীবন লাভ করুন তিনি।

Flag Counter


3 Responses

  1. Tapan bagchi says:

    Khub i antorik rachona! kabike shuvechcha. Nibonddhoke dhannobad.

  2. মাসুদুজ্জামান says:

    লেখাটি পড়ে ভালো লাগলো। প্রিয় কবি মুহম্মদ নূরুল হুদাকে অন্যচোখে আবিষ্কার করলাম। প্রাবন্ধিককে অসংখ্য ধন্যবাদ।

  3. আহমাদ মাযহার ভাই, আপনার “মুহম্মদ নূরুল হুদা: তাঁর জন্মদিনে এক চকিতদৃষ্টিতে” লেখাটি পড়ে ভালো লাগলো। মুহম্মদ নূরুল হুদা সম্পর্কে আপনার চকিত মূল্যায়ন পাঠকের জন্য মূল্যবান। “কবি হিশেবে তাঁর অবস্থান শীর্ষে পৌঁছেছে এমনটি হয়তো বলা যাবে না, আবার নান্দনিকতার এমন মাত্রায়ও পৌঁছোয় নি তাঁর কবিতা যে সেগুলো আমাদের মুখে মুখে ফিরবে; কিন্তু কবিতাসৃষ্টির অভিসারে এতগুলো মৌল শর্ত যাতে সুলভ তাঁকে তো অমনোযোগে পাশ কাটিয়েও যাওয়া যায় না!” – আপনি যখন এমন মন্তব্য বলেন, তখন বোঝা যায় আপনি নিছক আবেগমথিত তুষ্টিকর প্রশস্তি রচনায় ব্যাপৃত হননি। আপনার উদ্দেশ্য সৎ এবং আপনি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণে প্রয়াসী। আপনাকে আন্তরিক অভিনন্দন, মাযহার ভাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.