গদ্য, প্রবন্ধ, ব্যক্তিত্ব, শ্রদ্ধাঞ্জলি

কবিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা

nizamuddin_jami | 30 Sep , 2013  

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার জন্ম ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে কক্সবাজারের ঈদগাহের পোকখালী গ্রামে। তাঁর লেখাপড়া ঈদগাহ উচ্চ বিদ্যালয় (মাধ্যমিক, ১৯৬৫), ঢাকা কলেজ (উচ্চ মাধ্যমিক, ১৯৬৭) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (অনার্স-মাস্টার, ১৯৭১-৭২)। তাঁর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা প্রায় একযুগের। তবে কবি হিশেবে তাঁকে চিনি ৯০-এর দশকের গোড়াতেই। বন্ধু ফজল উশ্ শিহাব আমাকে একটি ছোট্ট বই পড়তে দিয়েছিল– আমরা তামাটে জাতি। তখন মজা পাই নি, এখন পাই। কবিকে আমি আরো ভালো করে চিনি যখন তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘পয়েট অব ইয়ার’ পুরস্কার (১৯৯৫) জিতেছিলেন। পত্রিকায় সংবাদ দেখে গর্ববোধ করেছিলাম। হ্যাঁ, ঘনিষ্ঠতার মাধ্যম ছিলেন প্রয়াত গবেষক-সাহিত্যিক মালিক সোবহান। যিনি কবি মুহম্মদ নুরুল হুদার প্রতি শেষ দিন পর্যন্ত আস্থাশীল ছিলেন। কবির সব কিছুকে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ধারণ করতে চাইতেন। যদিও নিজে কবি ছিলেন না। তাঁর মুখে হুদা সাহেবের নাম কত শতবার শুনেছি, বেশুমার! মালিক সোবহান এখন আর নেই। তিনি যাঁর সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, এখন আমি তাঁর সান্নিধ্যে আছি। তাতে আমি কতভাবে সমৃদ্ধ হয়েছি, বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার সম্পাদিত একাধিক ম্যাগাজিনে (প্রজন্ম, স্বাধীনতা) তাঁর কবিতা ছাপানোর অনুমতি পেয়ে আমি ধন্য হই।

ঈদগাহে সাহিত্য সভার ইতিহাস দুদশকের কম হবে না। বন্ধু মালিক সোবহানের জীবদ্দশায় সেখানে যাবার সময়-সুযোগ আমার খুব একটা হয় নি। অথচ এখন কবির হাত ধরে নিয়মিত মালিকের মৃত্যুবার্ষিকীতে হাজির হই। এখন নিয়মিত বার্ষিক ‘হুদা মেলা’য় যোগদান করি। শুধু আমি নই, বাংলাদেশের বরেণ্য কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী অনেকেই সেখানে আলো ছড়ান। কক্সবাজারের মানুষের জন্যে এটি একটি ভালো আয়োজন, বলা যায় শুদ্ধ মিলন মেলা। মানুষের মানবিকতা বিকাশে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। এ মেলায়ও আমরা মালিক সোবহানের শূন্যতা খুব করে টের পাই। বিগত দুবছরই আমি মেলায় যোগ দিয়েছি। প্রথম বছর আমার সহধর্মিনী অধ্যাপক সাব্বির জাহান তাহেরি আশাও গিয়েছিলেন। গত বছর ‘হুদা মেলা’র আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে (৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৩) আমার শিক্ষক ভাষাবিজ্ঞানী ড. মনিরুজ্জামান একটি মর্মান্তিক সংবাদ দিয়েছিলেন। রামুর বৌদ্ধপল্লীতে হামলা। মুহূর্তে যেন ভেঙে গেলো আমাদের হৃদয়। এ ধ্বংসযজ্ঞের সাথে জড়িতদের কেউ কি জানতো, তারা তাদের পূর্বপুরুষের গায়ে আগুন দিচ্ছে? এ মেলা থেকেই কবিবর প্রথম দাবি করলেন জড়িতদের বিচার ও শাস্তির। কবিরা দেশকাল নিরপেক্ষ হতে পারেন না। মানবতা যেখানে ভুলুণ্ঠিত হয়েছে, হুমকির মুখে পড়েছে কবিদের কলমে তখনই অগ্নিপাত হয়েছে। বাংলাদেশের লেখকদের অধিকার ও মেধাস্বত্ব আন্দোলনের পথিকৃৎ তিনি। শুধু তাই নয়, জেনেভাস্থ ইন্টারন্যাশনাল ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের (ওয়াইপো) কনসালট্যান্ট এবং বাংলাদেশ কপিরাইট বোর্ডের সদস্য হিশেবে কবি হুদা দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

মুহম্মদ নূরুল হুদা স্বপ্নচারি কবি। তিনি আপাদমস্তক একজন কবি। কবিতার রাজ্যে তিনি রাজত্ব করেন বেশ দাপটের সঙ্গে। তিনি ‘দরিয়ানগর’ নামকরণ করেছিলেন সমুদ্রনগরী কক্সবাজারের। নামটি এরই মধ্যে প্রিয় হতে শুরু করেছে। পূর্বনামে ছিল সাম্রাজ্যবাদের গন্ধ, ‘দরিয়ানগরে’ আছে এখানকার জলহাওয়ায় মিশ্রিত জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। তিনি দরিয়ানগরের স্বপ্নদ্রষ্টা-কবি। এখানে তিনি (কবিতা) বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার ঘোষণাও দিয়েছেন। এখন ভিত্তিপ্রস্তর দেয়ার পালা।

পেশাগত জীবন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে (১৯৭৩)। এরপর তিনি বাংলা একাডেমীতে যোগদান করেন। সেখানে পরিচালক পদে তিনি আসীন হন। নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন শেষে বর্তমানে তিনি একটি নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিশেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি সাংবাদিকতা করেন দেশের বহুল প্রচারিত ইংরেজি কাগজ ‘দি ডেইলি স্টার’-এ। তিনি একজন প্রথিতযশা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। তিনি ঠাট্টাচ্ছলে একদিন বলেছিলেন ‘আমার কাছে কোনো রোগী দ্বিতীয়বার আসেন না।’ কিছুটা আমতা আমতা করে কারণ জিজ্ঞেস করেছিলাম। উত্তরে বলেছিলেন ‘রোগী প্রথম ডোজেই সুস্থ হয়ে যান, তাই’। দেশবরেণ্য অনেক কবি-সাহিত্যিক তাঁর পথ্য গ্রহণ করে সুস্থ হয়েছেন বলে জানা যায়।

তিনি নিত্য গ্রামে যাওয়া-আসা করেন। সমুদ্রস্নানে যান। বালির স্পর্শ তাঁকে শক্তি দেয়, শান্তি দেয়। গ্রামের স্কুল পড়ুয়া থেকে শুরু করে সব বয়েসি মানুষের কণ্ঠে তিনি কবিতার ছন্দমাত্রাপর্ব তুলে দিতে তৎপর। তিনি রক মিউজিকের বোদ্ধা শ্রোতা কেবল নন, গ্রামবাংলার আউল-বাউল গানেও তিনি মজেন, নাচেন। তিনি ইতিহাসের সূত্রধর। তিনি কবিতায় বলেন পূর্বপুরুষের সাতকাহন। ভূগোল-ইতিহাস-নৃবিজ্ঞান তাঁর কবিতায় আসে যখন তখন। সম্পাদিত ও মূলগ্রন্থ মিলে তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা একশো দশটি।
কবির জন্মদিন হোক রঙে রঙে রঙিন। প্রতি মুহূর্ত হোক ভালোবাসাময়।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.