গদ্য, প্রবন্ধ, ব্যক্তিত্ব, শ্রদ্ধাঞ্জলি

মুহম্মদ নূরুল হুদা বঙ্গোপসাগর ও মৈনপাহাড়ের নীল ঈগল

monir_yusuf | 30 Sep , 2013  

বাংলা সাহিত্যের ষাটের অন্যতম প্রধান কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। জন্ম দক্ষিণের দরিয়ানগরে। পাহাড়-সাগর-নদী-চারণভূমি-লবণমাঠ-বিস্তীর্ণ উপকূল-ঝাউবন-প্যারাবন-রেতবালির দ্বীপ-রাখাইন উপজাতি, জাদি-প্যাগোডা-কিয়াং-মন্দির-মসজিদ-মিঠাপানের বরজ– সবমিলে এমন এক বৈচিত্রময় ভূখণ্ডে তার বেড়ে উঠা; যা যে কোন সংবেদনশীল মানুষকে কবি হতে উদ্বেলিত করে তোলে।

জাতীয়তা ও আর্ন্তজাতিকতা যেখানে হাত ধরাধরি করে হাঁটে। হাতের কাছে নাফনদী, নাফ পেরুলেই মায়ানমার। আর একটি সংস্কৃতির হাতছানি, অবারিত নীলের বিলে মিল দিয়ে দিয়ে স্বপ্নবোনা। হাজার রকমের নৌকা জাহাজ নদী নারীর সংবেদ। হাজার তারার আকাশ, কামিনীর ঝোপঝাড়, জোনাকির রি রি জোছনা, প্রাগৈতিহাসিক যুগের মিল-অমিলের অবারিত ভূখণ্ড ; জমিজমা ও শস্যদানার ঘ্রাণ তাকে কবি করে তুলেছে। যিনি জন্মের পরই শুনেছে সাগরের গর্জন; ঝাউবন-প্যারাবনের মুরালি বাঁশি। দেখেছেন দুরন্ত কৈশোরে মাঠের আলপথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া রহস্যময়ী দ্রাবিড়াকে। জন্মগ্রামের প্রকৃতি জন্মজেলার প্রকৃতি মুহম্মদ নূরুল হুদাকে কবি হতে উসকে দিয়েছে। মাঠের বহুদূর বিস্তার, আকাশের নীল, সাগরের গর্জন, তারার চোখটিপে দেওয়া; সর্বোপরি শালিক ঝাঁকের দিগন্তের খোসা ভেঙে উড়ে যাওয়ার আবেগ ও সংবেদ তাকে স্থির হতে দেয়নি। মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে এইসব সুন্দরের লাল-নীল-দীপাবলী। তারপর শুরু হয় তার দুরন্ত শিল্পের শব্দ-শোভাযাত্রা।
যেমন:

১.
হেমন্তের বিকেলে
বাবা এসে বসতেন আঙিনায়, খড়ের গাদায়।
বাবার পরণে শাদা লুঙ্গি, শাদা পাঞ্জাবী,
মাথায় শাদা টুটি; বাবার দৃষ্টি
উত্তর আকাশের দিকে ফেরানো।

মাগরেবের নামাজের খুব বেশি দেরী নেই,
বাবা ইতিমধ্যে ওজু সেরেছেন।
প্রোঢ়ত্বের পবিত্র একাগ্রতা নিয়ে
বাবার মুখ উত্তর আকাশের দিকে ফেরানো।
বাবা প্রথম যেদিন ফসলের জমি কিনলেন
সেদিন তার মুখে সে কি হাসি।
মাকে ডেকে বললেন‘ জানো বউ,
জমিতে বালি হাঁসের পায়ের দাগ দেখলাম,
চড়–ইয়ের বাসা দেখলাম, এবার খুব ফসল ফলবে।
বাবার মুখে ‘বউ’ ডাক সেই প্রথম, সেই শেষ।

পাকা ধানের সোনালি মঞ্জরীর মতো
রশ্মি ছড়াতে ছড়াতে
সূর্য পাটে বসেছে।
একঝাঁক বালি হাঁস
মালার মতো উড়ে আসছে উত্তর আকাশ ছেয়ে
বাব মোনাজাতের ভঙিতে
হাত দু’টো প্রসারিত করলেন ‘আমিন’।
তারপর
বাবা তাঁর সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে আদরের সন্তানের মাথায়

হাত রেখে বললেন, জানিস, আমাদের ঘরে
আসার আগে তুই ওই হাঁসেদেরই একজন ছিলি;
আমাদের নিকানো উঠোন ছেড়ে আমার বাবাও আজ
ওই হাঁসেদেরই একজন হয়ে উড়ছে।
(উত্তর আকাশ/হনলুলু ও অন্যান্য কবিতা)

২.
পদব্রজে পৃথিবী ভ্রমণ– অদৃষ্টই ঠিকানার ভিনন্তর নাম
প্রতিটি মুহূর্তে আছে শৈলাবাস, দার্জিলিং নিত্য খোলা দ্বার
চড়াই উৎরাই আর পদে পদে প্রাকৃতিক ব্যরিকেড নয়
চতুর গোলত্ব তুমি, পায়ে পায়ে বাজে তবু গোপন নূপুর।
ওজনবিহীন এক বিন্দু ওড়ে, মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক সঙ্কেত
পুলিশের ভ্যান চলে, বুলেটে ও বেয়নেটে কণ্ঠহত চতুর প্রহরা
তবুও নির্বিঘ্নে হাঁটি, যতদূর হাঁটা যায়, হাঁটি ততদূর
কখনো কি প্রশ্ন করি: আমার চরণ ভারী, কতো ভার জীবনে তোমার?
(শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি– ২)

৩.
বড়ো বেশি অবিশ্বাসে ছিল এ সময়
জাল ও জলের সখ্যে, সুতোর বিন্যাসে–
অনন্তর কোন ফাঁকে করেছিল জয়,
মাছ ও শেওলার কাছে ঘুরে ফিরে আসে।

সমুদ্রের পাশে জন্ম সমুদ্র বুঝিনি
ঢেউয়ের আড়ালে যে জল, বুঝিনি যে নীল
যে আছে হাতের কাছে তাকেও খুঁজিনি
বহতা আকাশে শুধু উড়ে গেছি চিল।

মানুষেরা ভেবেছিল, আমি আর তুমি
আকাশ– সাতারু এই আমরা দুজন
আমাদের জোড়া বুক জোড়া ঝুমঝুমি
নীলিমায় নীল ঝোপে জুড়েছে কুজন।
অথচ আমরা জানি, আছে আরো আছে
তিমির তুমুল বুকে বিশালাক্ষী প্রাণ
সমুদ্রের চেয়ে বড়ো সমুদ্রের কাছে
ব্রক্ষাণ্ড তরঙ্গলীন জলের সুঘ্রাণ;
শিখরে শিখরে তার বাসি পাশাপাশি
আমি যদি জলদাস তুমি জলদাসী।

(আমি যদি জলদাস তুমি জলদাসী)

মুহম্মদ নুরুল হুদা বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ করেন শোণিতে সমুদ্র নিয়ে। রক্তের ভেতর মজ্জাগত কবিতার রক্তঢেউ; গর্জনের পর অর্জন করলো বৈচিত্র্যময় স্বাদের পঙক্তিঢেউ– যা ভিজিয়ে দিলো বাংলা কবিতার রেতবালি। বাংলাসাহিত্য নতুনের আড়মোড়া ভেঙে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়াকে স্বাগত না জানিয়ে পারলো না। মুহম্মদ নূরুল হুদা বাংলাসাহিত্য ভুবনে প্রবেশ করেই ভাসিয়ে দিলেন জলপ্লাবনে। জলের ভেতর দিয়ে ক্রমে ক্রমে গড়ে উঠলো ভূ-ভাগ এবং পৃথিবীর দীর্ঘতম কাব্যবারান্দা। যে কাব্যবারান্দায় হাঁটতে হবে বাঙালি কবিতার পাঠককে হাজার বছর। দরিয়ানগরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে অন্তর্গত সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়লো তার কবিতার ক্যানভাসে। মুহম্মদ নূরুল হুদা’র হাতে কবিতার প্রতীক অক্ষর কিংবা শব্দ হয়ে উঠলো প্রকৃতই সোনার মোহর। জাতিসত্তার শেকড় সন্ধানে যেমন তার কবিতা উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে, তেমনিভাবে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী মানুষ-প্রকৃতি ও তাদের জীবনাচারও এমন গভীরভাবে উঠে এসেছে যে, মুহম্মদ নূরুল হুদা’র জন্ম সেখানে না হলে হয়তো তা কেউ এমনভাবে উপলব্ধির সুরে পরিবেশন করতে পারত না।

যেমন:
৪.
হাইল্লার বাসা আইলর উয়র, জাইল্লার বাসা চর
আঁর সাত পুরুষের ভিডাবাড়ি সন্দ্বীপ, উড়ির চর।
ঝড়-তুয়ানত্ পানি- বানত জীবন আঁর বাজি
হেই বাজিত আঁই হারিজিতি, হেই বাজিত আঁই গাজী।
এক চর ছাড়ি আরেক চর যাই আঁই যাযাবর
দইজ্জা আঁআর পেড়ের খোরাক, দইজ্জা ভাত-কাপড়।
এই দইজ্জার আরেক নাম জানি নীল পানি
হেই পানিতে মিশে আছে আঁর চোখের পানি।
নীল পানি জীবন আঁর, নীল পানিই মরণ
এই নীল পানির কইলজাত আছে আঁর কইলজার ধন;
আছে মা বাপ আছে ভাইবোন আছে জানের জান
এই পানির নোনা বুকত বাঁদা আঁর কবর।
nurul-huda.jpg
সমুদ্র-সৌন্দর্যে গাথা তার কবিতার প্রতিটি পঙক্তি মাটি ও জলের আঘ্রাণে ভরপুর। বাংলা সাহিত্যে সমুদ্র-সাগর-পাহাড়কে এমন মুগ্ধতার জালে আর কেউ আটকাতে পেরেছে বলে মনে হয় না। জীবনের এক আশ্চর্য বর্ণিল ও শৈল্পিক জলছবি এঁকেছেন মুহম্মদ নূরুল হুদা। এমন কাব্যময়তায় সার্বভৌমশক্তি ইচ্ছে করলেও কেউ দেখাতে পারবে বলে মনে হয় না। সংবেদনশীল কবি বলেই হুদার কাছে তা সম্ভব হয়েছে। শুধু স্থুলমানুষ হলে তা কখনই সম্ভব হত না। একজন মুহম্মদ নূরুল হুদা’র ভেতর মেধা, সব গভীরতা একসাথে কাজ করেছে বলেই বাংলাসাহিত্য আজ তার হাতে এমন পরিপুষ্টি পেয়েছে। যাকে অন্য অনেকের চেয়ে নতুনভাবে ভিন্নতর দৃষ্টিকোণ দিয়ে আলাদাভাবে শনাক্ত করা যায়। তার কবিতার গূঢ়ার্থ এত অর্থবহ যে, কবিতার প্রতিটি পঙক্তি পাঠককে টেনে ধরে। বিষয়ের গভীরতায় মুহম্মদ নূরুল হুদা’র কবিতা স্বাদে এমনতরো আলাদা যে, পড়তে পড়তে আপনাতেই শরীরের শিরধ্বনি উচ্ছলিত হয়ে ওঠে। আঞ্চলিকতা থেকে আর্ন্তজাতিকতার এত বিপুল বিস্ময়, এত উজ্জ্বল উদ্ধার আর কারো কবিতায় এসেছে কিনা জানা নেই। শব্দের সাথে স্বপ্নের, অক্ষরের সাথে মেধার, প্রতিভার সাথে ভালোবাসার এমন বর্ণিল চিত্রপ্রদর্শনী আমরা খুব কম কবির কবিতাতেই দেখতে পাই।
যেমন:
৫.
মাইন্সে কইলো, ‘আইবো তুয়ান।’
বাজান চিক্কর দিলো, আইয়ক, আইয়ক।’
পেড়র ভিতর যার হামেশা তুয়ান
দইজ্জার মউজর লগে বাঁধা তার জান;
আইজ তয় হাঁচা হাঁচা আইয়ক তুয়ান।’
কলিজা বাইরে বাঁধি মাঝ-দরিয়াত
হেই রাইতেও সোনাদিয়া আছিলো বাজান,
লগে তার জ্য়োনকী, হিম্মত সাম্পান;
বাজানর সিনা’খানও গইরর নাহান।
যখন বাইড়লো পানি, বাজান কইলো,
‘দরিয়া রে তর বুক চিরি চিরি
চালিশ বছর ধরি আঁর দানাপানি,
তর খাই তর লই বাইজ্জে এই শরীল আঁর
আইজ্জা তুই হাঁচা হাঁচা ডালী লবি তার?

হাঙ্গর মাছর মতন হা গরিল দরিয়া তহন
বাজান চিক্কর দিল, দরিয়া গজ্জন।
জব্বইজ্জার বলীখেলা শুরু হইল পানির ভেতর
এক বলী বাজান আর আরেক বলী বঙ্গুয় সাইগর
(জব্বইজ্জার বলী খেলা পানির ভেতর)

মুহম্মদ নূরুল হুদা’র কবিতা যেন শব্দ ও অক্ষরের এক নান্দনিক চিত্রশালা। শিল্পের দায়বোধে নিজের যাত্রার ধ্বনি ও স্থানীয় সংস্কৃতি তার ভেতর এমনভাবে খেলা করেছে, যা থেকে তিনি উঠে আসতে পারেননি এবং উঠে আসতে না পারাটা বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধির জন্য অনেক অনেক ভালো হয়েছে। আমরা পেয়েছি একজন বিশ্বমানের কবি। যাকে নিয়ে সত্যিই যুগপৎ গর্ব ও গৌরব করা যায়।

এই বঙ্গীয় ভূখণ্ডে মা-মাটি-নুড়িবালি-আলো-বাতাস এবং তার মানবিক সৌন্দর্য ও মানবিক স্বপ্নকে চারিয়ে দিয়েছেন মুহম্মদ নূরুল হুদা। আকর্ষণ বিস্তার করে দিয়েছেন পাঠকের অতলান্ত গহীন হৃদয়ে। বাঘের সাহস নিয়ে উজ্জ্বল রঙিন চোখে হেঁটে চলেছেন টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া; বাংলাদেশসহ পৃথ্বিবিশ্বের আনাচে-কানাচে। কবিতাকে সম্বল করে হেঁটে চলেছেন অনাগত কালের হাজার বছরের পারাপার।

এই হেঁটে চলা কিন্তু এখনও মসৃণ নয়। হাজারো রক্তচক্ষু উগরে দিতে চায় বিষাক্ত নীলবিষ। বঙ্গোপাসাগর থেকে বুক ঘষে ঘষে, বুক ঘষে ঘষে পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। তারপর শিরদাঁড়া সোজা করে নিজের আত্মপরিচয়কে, নিজের অনার্য শেকড়কে তামাটে রঙের সাথে একাত্ম করে বাঙালিত্বকে শনাক্ত করতে হয়েছে। নিজস্ব কাব্যধারার ও কাব্যভাষার বোধিবৃক্ষতলে বুদ্ধের মত ধ্যানস্থ হাতের মুদ্রায় সাজাতে হয়েছে কবিতার মুদ্রা। সেই দর্শন তাকে করে তুলেছে কবিদের প্রবুদ্ধ গৌতম। মনের মুদ্রায় মুহম্মদ নূরুল হুদা সাজিয়েছেন অনিমেষ কবিতার অবারিত পৃথিবী।

যেমন:
৬.
অনার্য এই শিকড়গুলো
অনাদ্যন্ত শিকড়গুলো
বুনতে বুনতে বুনতে বুনতে
শিকড় কথা চারিয়ে দিলাম
তামাটে এক দ্রাবিড় গিয়ট
গল্পগুলো চারিয়ে দিলাম।

বৃক্ষ তুমি জমজ ভ্রাতা
পাখি তুমি বোন
মা গঙ্গা ভগীরথী
শিকড় কথা চারিয়ে দিলাম।

জন্মজমি জন্মজাতি
জলতরঙ্গ পললভূমি
স্তরে স্তরে বর্শা লাঙ্গল
শিকড় কথা চারিয়ে দিলাম
তামাটে এক দ্রাবিড় গ্রিয়ট
গল্পগুলো চারিয়ে দিলাম।

মাটি আকাশ, পাখি শিকড়
বঙ্গভূমি অনাদিকাল
উড়তে উড়তে উড়তে উড়তে
শিকড় কথা চারিয়ে দিলাম।

আমার ভূমা আমার সীমা
জাতিস্মর এই ফনলিমা
আদ্যোপান্ত আবহমান
শিকড়- কথা চারিয়ে দিলাম
তামাটে এক দ্রাবিড় গ্রিয়ট
গল্পগুলো চারিয়ে দিলাম।
(আমরা তামাটে জাতি)

আলোকিত শব্দমালার অক্ষয় অক্ষর মুহম্মদ নূরুল হুদা’র কবিতা। কবিতা কত যে বিচিত্র এবং বহুরূপময় হতে পারে হুদার কবিতা না পড়লে সেটা অনুধাবন করা যাবে না। এমন কোন বিষয় নেই, যা তার কলমের সাথে কবিতার পঙক্তি হয়ে বেরোয় নি। জীবনের মনঘাটে ভিড়িয়েছেন কবিতার নৌকা। তারপর নোঙর করেছেন জলশব্দমালায়। শব্দের নতুন সৃষ্টি এবং শব্দের নতুনযাত্রা একটা দীর্ঘতর বাঁক নিয়ে পড়েছে কবিতার বঙ্গোপসাগরে। যে সাগরের তীরে তীরে যারা বসবাস করে, সে সব নরনারীর জীবনের জলছবি আঁকা, তাদের যাপিত জীবনের আঁতুড়ঘর থেকে বার-বারান্দা হয়ে মেঠোপথ আলপথ দিয়ে পাড়ি দিয়েছেন রাজপথে। তিনি উচ্চারণ করেন, ‘আমরা তামাটে জাতি, আমরা এসেছি বলে’। সাহসের তর্জনী উঁচিয়ে ঘোষণা করেন নিজের আত্মপরিচয়। যে পরিচয় হয়ে যায় বাঙালির জাতীয় পরিচয়। হাজার বছর চেষ্টা করেও কোন রাজনীতিবিদ কিংবা কোন কবি যা পারেননি, হৃদয়ের সংবেদনে একজন কবি তা বলে দিলেন কবিতার শিল্পিত সুষমায়। তার কবিতা স্বপ্ন-সময় ও নান্দনিকতাকে এভাবে নাচিয়ে নেয় তুমুল উচ্ছ্বাসে, বৃষ্টির ফোঁটার মত মাটিকে উসকে দিয়ে – বীজ থেকে অনন্ত বীজের অঙ্কুরোদ্গমের দিকে।
যেমন:
১.
একটি গমের শীষ আমাদের সমবেত শ্রমের ফসল
একটি মেষের লোমে আমাদের সকলের সম অধিকার
আমার একার আমি এইখানে একান্ত অচল
এখানে জমির বুকে তুমি- আমি- শ্রম- পরিবার।

জমিও ফসল, পশু আমাদের, সকলের আর রাষ্ট্রের
উৎপাদন- বন্টনের যৌথনীতি, এই নীতির নেই হেরফের।

(কলখৌজ/আমরা তামাটে জাতি)

৭.
জোয়াল কাঁধে কবির গরু
হৈ হৈ হৈ রাস্তা সরু।
ডানে চলো ডানে
মাতাও পাড়া হাম্বা হাম্বা গানে।
বামে চলো বামে
বৃষ্টিবিহীন নিষ্ফলা মাঠ ভিজুক তোমার ঘামে।
(কবির গরু- জিসাস মুজিব)

৮.
বিস্তৃত ক্ষেতের বুকে ফলেছে অসংখ্য ফুটি
যেমন তোমার মুখে রাশি রাশি ঘাম
বুকের কাছে জোড়া তরমুজ দেখেই
মাঘ- নিশিতেই শুরু হলো উৎসব,
এলো নবান্নের নওশা;
অথচ রক্তের ভিতরে পুরবালারা উলুধ্বনি তুলতেই
নিভলো দীপালি, নিভলো তারার পিলসুজ;
ভয় কি ফসলিমা
এ খামার অন্যের নয়, আমার
আমিও আমার নই, তোমার
(নবান্নের নওশা/যিসাস মুজিব)

মুহম্মদ নূরুল হুদা’র কবিতার এই যাত্রানূপুর বা অতলান্ত সৌন্দর্য শতর্বষের সুন্দরতাকে প্লাবিত করেছে। কৃষ্ণচূড়ার রঙে লাল হয়েছে কবিতাবাংলা। লোকবাংলার চারণ-স্মৃতিসত্তা পায়ে পায়ে মেঠোপথে প্রজাপতি ফড়িং নলাঘাস চড়াঘাস বেলি জুঁই শিউলি বর্ষার নূপুর শীতের গা চমকানো আবিলতা হেমন্তের ধূসর মেয়ে, দরিয়াকুমারীর নাকের ঘামের বোঁটা কিংবা ধানকাউনিয়া মেয়ের গোলাঘর– এমন উজ্জ্বলভাবে শব্দের মিছিলে স্বশস্ত্র হয়ে উঠেছে যে, তার কবিতার সৌন্দর্যে দক্ষিণের বাতাস বেহুঁশ হয়ে ওঠে একটা গভীর মগ্নতা ছড়ায়। কবিতাচিত্রের সমাহার মুহম্মদ নূরুল হুদা’র কবিতা। কবি ও কবিতার স্বপ্নময় বিস্তাার হুদার কবিতায় আমরা নতুনস্বরে স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপিত হতে দেখি। তাই তো তার কবিতায় শুদ্ধতম ও শুভবাদী চেতনার বৈশ্বিক রূপ অতলান্তিক স্পর্শধর্মিতায় পরিস্ফূট হয়ে ফুটে ওঠে।

মুহম্মদ নূরুল হুদা’র প্রত্যেকটি কবিতা যেনো নতুন কিছুর প্রসবয়িতা। বাঙালির অতীত, বাঙালির বর্তমান ও বাঙালির আগামির সাথে তা এমন এক সেতুবন্ধ রচনা করে দিয়েছে, উৎসের নির্যাস নিয়ে সে সাঁকো আজ শক্তখুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। যে সেতু দিয়ে একটি জাতিসভ্যতার স্বপ্নসমুদ্র পার করে দেওয়া যায় অনায়াসে; মুহম্মদ নূরুল হুদা’র কবিতা যেনো স্বপ্ন-পারাবার বৈতরণী। নদীবৈতরণী না নদীঅমরণী পার হয়ে পৌঁছে যাবে তেপান্তরের মাঠ। বাঙালি ও বাংলাদেশ তার কবিতার জমিনে এমনভাবে চাষাবাদ হয়েছে, যাতে ফলেছে কেবলই অনন্তের অক্ষর ও শব্দের সোনাদানা। কৃষক, কামার, কুমার, জেলে, চর্যাপদের হরিণী থেকে বাঙালির অনার্য-অস্ট্রিক রক্তে বেড়ে ওঠা চির শিল্পয়িতা-প্রেয়সী দ্রাবিড়া।
যেমন:
৯.
বিচিত বসন্ত যায় তোমাকেই খুঁজি আজো হে রমণী, দ্রাবিড় রমণী
ভস্মীভূত সৌধসাধ, স্তুপাকার, আমাদের কামনা ও বাসনার মতো
হাঁটি একা- আদিগন্ত ফণা তোলে কালোসাপ, কালের তর্জনী
যেন এ বধ্যভূমি, প্রেতবাস পরিহিত রাগী মহাকাল।

হানাদার আততায়ী নিমজ্জিত জানে না যে এদেশ জলের
তাদের বিষাক্ত অস্থি জমে আছে স্তরে স্তরে পলির আড়ালে
তোমার অপাপ রক্তে তার পাপ- স্পর্শ আছে, তাই
আরোপিত দোষে- দোষী, ভ্রান্তিময়ী, আজো, পলাতকা।
(শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি ১৩)

মুহম্মদ নূরুল হুদা’র কবিতার প্রধানগুণ তার কবিতার গতি ও শক্তি। বিষয় দু’টির প্রকৃতি ও গুণাগুণ বিচার করলে বাংলাদেশের আরেক বড়শিল্পী স্বপ্নের কারকৃৎ সুলতানের কথা মনে পড়ে যায়। শিল্পী সুলতানের ছবির সাথে মুহম্মদ নূরুল হুদা’র কবিতার একটা বড় মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সুলতানের ছবিতে মানুষের বাহুমুখ হাঁটুপা যেমন পৌরাণিক মানুষের মত বড় বড় রেখায় অঙ্কিত হয়ে বেঁচে থাকার প্রবল পরাক্রান্ত তেজ নিয়ে প্রতাপী হতে শেখায়, সে ছবি যেমন বড় বেশি আশাবাদী করে তুলে যে কোন মানুষকে; তেমনিভাবে হুদার কবিতার প্রতিটি অক্ষরও যেন মানুষকে বড় আশাবাদী হতে আগ্রহী করে তুলে। সুলতান ও মুহম্মদ নূরুল হুদা বাঙালি জাতি ও তাদের শিল্পসুষমাকে এমন এক উচ্চতায় তুলে ধরেছেন, বিশ্বসাহিত্যের পাঠক ও সমঝদার চিত্রবোদ্ধাদের সামনে তা যথাযথভাবে উপস্থাপিত হলে বাঙালি-মানসকে বিশ্বমানুষ আরো নতুনতর ব্যঞ্জনায়, আরো নতুনতর মহিমায় অনায়াসে চিনতে পারে।

যেমন:
১০.
কামিনির ঝোঁপে-ঝাড়ে কখনো নামিনি
আমি বসে আছি নিজের আড়ালে;
আমি অক্ষর বৃত্তের ফাঁদে বন্দী হয়ে আছি;
আমি রচনা করেছি শুধু নিজের নরক।

গদ্যে পদ্যে বিয়ে দেওয়া হলো না এখনো
দুই শত্রু পরস্পর মিত্রও হলো না;
ধুতির বদলে আমি বারো হাত শাড়ীর নিকট
কোনদিন নতজানু হতে শিখিনি
আমি কামিনির ঝোঁপে-ঝাড়ে কখনো নামিনি।

যখনি সমস্যা দেখি, তখুনি মিলের জন্য ওঁৎ পেতে থাকি
শব্দের ভিতরে খুঁজি অতিশব্দ, পরাশব্দ, কখনো কখনো;
আমি নারীর বদলে শুধু কবিতার শ্লীল শব্দমালা,
শব্দের অধিক কিছু চাইতে শিখিনি —
আমি কামিনীর ঝোঁপে-ঝাড়ে কখনো নামিনি।

আমার ঢাকায় বুঝি বসে আছে কে এক কামিনী
শিল্পের নিদান হাতে; আমি তাকে হয়তো-বা চিনি।
২.
এ হৃদয় অন্নুত,
তার কাছে চেয়ো না কিছুই;
আদিম ঝোপে ও ঝাড়ে ঘুরছে এখন,
মাথায় সে পরে আছে আজগুবি পাখির পালক;
কপালে রক্তের চিহ্ন এঁকেছে ছুরিতে,
চুলের উপর ফুল, দুই হাতে,
কোমরে, গলায়,
ঝুলছে পাতার মালা;
পায়ে তার শিম্পাঞ্জীর থপথপে চলা,
পেশীতে উঠছে জেগে গোঁয়ার গণ্ডার
রক্তাক্ত মাংসের কণা লেগে আছে দাঁতে;

খবরদার, পড়োনা সমুখে। তাহলে সে পাতে
পুরোটাই তুলবে তোমাকে; বলি এই ফাঁকে
হাতে যে ধারালো বর্শা, সেই তো হৃদয়
হে মানবী, হে হরিণী তোমার কি নেই কোনো ভয়!
(হাতে যে ধারালো বর্ষা/ হনলুলু ও অন্যান্য কবিতা)

বাঙালির মহৎ-চেতনা ছড়িয়ে পড়বে বিশ্ব-দরবারে। একাত্তর ও বায়ান্ন’র মত শিল্পী সুলতান ও কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা’র ঋদ্ধ-চেতনা একাকার হয়ে যাবে হাজার বছরের বাঙালি জাতির শিল্প ও সংস্কৃতি চর্যার উত্তাপিত শোণিত-সমুদ্রে। সুলতানের আর্টস এবং কলা ও চারুবত্তার শিল্পসম্মান বিশ্বের চিত্রমনীষীদের মাঝে যেমন আদৃতি পেয়েছে, তেমনিভাবে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা’র শব্দবীক্ষণ ও কাব্যসুষমার কদরও যথাযথ পরিচর্চায় বেড়ে যেতে পারে বিশ্ব-কবিতাকোবিদদের পরিচর্যিত পরিম-লে। এভাবে বাঙালি আবারও বিশ্বজয় করতে পারে।

কবিতার ভুবনে মুহম্মদ নূরুল হুদা’র বিচরণ শৈল্পিক সায়রে। ঘর থেকে পা বাড়ালে নদী, নদীর দিকে চোখ রাখলেই ঘাট, ঘাটের দিকে চোখ রাখলেই নারী। নারী মানে কবিতা। সবুজ আর সবুজ, নীল আর নীল, নীল ও বিলের মিলনস্বপ্নে প্রকৃতি তাকে কবিতা লেখার জন্য তুমুল প্ররোচনা দেয়। মুহম্মদ নূরুল হুদা’র বেড়ে-ওঠা ও সুগঠিত মানসশৈশব তার কবিতায় কোন না কোনভাবে আভাসিত হয়েছে।

১১.
কাতুল্লাস ভালোবেসেছিল;
জানতো না ভালোবাসা কত বড় পাপ;
শাজাহান আর এডোয়ার্ড
মেনেছিলো
রাজ্যের চেয়েও বড় নারীর প্রতাপ;
প্রেমিক কবিও নই, নৃপতি নই
তোমার জীবনে আমি শুধু কলঙ্কই?

চাঁদের জোছনায় বাঙালির প্রাগৈতিহাসিক সংবেদ মুহম্মদ নূরুল হুদা’র মানসভূমে এঁকেছে বহুবর্ণিল কবিতা-ক্যানভাস। যে কাব্য-ক্যানভাসে তিনি চারিয়ে দিয়েছেন চিরস্বাধীনের ভিত্তিবীজ ও জাতিসত্তার শেকড়ের শোভাযাত্রা। মুহম্মদ নূরুল হুদা নিজের শিল্পসত্তাকে পতাকা করে উড়িয়েছেন কবিতার নীলিমায়, শিল্পের পলিময় ভূখণ্ডে হাজার বছর ধরে গড়ে-ওঠা এই অষ্ট্রিক দ্রাবিড় ও বাঙালি জনপদে। তাই তিনি আজ প্রতিটি বাঙালির শৈল্পিক উত্তরাধিকার, যুগপৎ কাব্যপুত্র এবং জাতিপুত্র।

Flag Counter


3 Responses

  1. matin bairagi says:

    প্রবন্ধটি পড়লাম, সত্যি ভালো লেগেছে। মনির এই লেখায় নিজকেও চমৎকার প্রকাশ করতে পারলো । আলোচ্য কবিকেও অভিনন্দন।

  2. Md A H Siddiqee says:

    I have gone through this paper of Mr Yousuf. I think that he is an outstanding critic. But he will be more useful if he writes of his own instead of writing criticism. He should not destroy his genius like Syed Abdul Mannan.
    However, Mr Huda has written so profusely that he is very difficult to grasp. Mr yousuf has tried his best to do it. Having said that Mr Huda is still far elusive from his comprehension.

    But I have liked yousuf’s style, its very new and heart touching.
    Wish Mr Huda and yousuf a very happy life.

  3. Manik Mohammad Razzak says:

    হুদা ভাইকে নিয়ে লিখিত এত লেখনির ভিড়ে তরুণ কবি মনিরের লেখাটিও অনবদ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। তারুণ্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে লিখিত তার লেখনিতে উঠে এসেছে কবিকে নিয়ে এ প্রজন্মের ভাবনার নানা দিক। হুদা ভাইকে নিয়ে মূল্যায়নমূলক এ লেখনির জন্য মনিরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

    মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.