গদ্য, প্রবন্ধ, ব্যক্তিত্ব, শ্রদ্ধাঞ্জলি

মুহম্মদ নূরুল হুদার সমুদ্রবন্দনা

farid_ahmed_dulal | 30 Sep , 2013  

বাংলা কবিতার প্রাগ্রসর মেধার কবিকণ্ঠ মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতায় প্রবেশ করলে দেখবো সমুদ্রের প্রতি পক্ষপাত; বিশেষ করে একজন পাঠক, যিনি তাঁর আদ্যোপান্ত খোঁজ রাখেন, দেখবেন জাতিসত্তারকবি অভিধায় খ্যাত মুহম্মদ নূরুল হুদার কাব্যবৈশিষ্ট্য কেবল নয়, তাঁর গদ্যেও সমুদ্র এসেছে বারবার। কেন তাঁর লেখায় সমুদ্রের উপস্থিতি, সে উত্তর আমরা জানি; কবি হুদা সমুদ্রনগর কক্সবাজারের ভূমিপুত্র, সমুদ্রের সাথেই তাঁর বেড়ে ওঠা, সমুদ্রের তীরে তাঁর শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি, সমুদ্রের তীর জুড়ে তাঁর পূর্বপুরুষের ঠিকানা; সমুদ্রের সাথে তাঁর নাড়ির টান। সমুদ্রের কাছে তাঁর বারবার তাই ফিরে আসা। কিন্তু এতসব সত্য জানার পরও আমরা খুঁজে দেখতে চাই দরিয়াসন্তান মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতায় দরিয়া (সমুদ্র) অন্য কোন্ ব্যঞ্জনায় আবিষ্কৃত হয়েছে। তাঁর কবিতা পড়ে আমরা সন্ধান করে নিতে চাইবো আলোকমানুষ মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতাভুবনে সমুদ্রের কতটা প্রভাব। বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতায় নিত্য ক্রিয়াশীল কবি-কাব্যকোবিদ হুদার সৃষ্টিসত্তা নানা নিরীক্ষায় উজ্জ্বল, কাব্য-প্রকরণ আর শুদ্ধতার আশ্রয়ে থেকেও তিনি নিয়ত নবায়নপ্রবণ। সুদীর্ঘ কাব্যঅভিযাত্রায় নন্দনলোকের আনন্দধারায় নিত্যস্নাত কবির স্বোপার্জিত কাব্যভাষা এবং স্বাতন্ত্র্যম-িত কাব্যমুদ্রা তাঁকে দিয়েছে সমকালীন বাংলা কবিতার অন্যতম শীর্ষ কণ্ঠস্বর হবার সম্মান; দিয়েছে বিশ্বকবিতার তাৎপর্যপূর্ণ কারুকৃতের সম্মানও।

মুহম্মদ নূরুল হুদা তাঁর জন্ম-নগরী কক্সবাজারের নতুন নামকরণ করেছেন ‘দরিয়ানগর’। ইতোমধ্যেই তাঁর এ নামকরণ কক্সবাজার-এর সচেতন মানুষ আগ্রহের সাথে গ্রহণ করেছে, অন্তত কেউ প্রকাশ্যে তাঁর বিরোধিতা করেননি; অবশ্য কেউ চাইলেই একটা জনপদের নাম সহজে বদলে দেয়া যায় না; কক্সবাজারের নামও বদলে যায়নি। একদিন হয়তো যাবে; দরিয়ানগর নামকরণে তাঁর দরিয়াপ্রীতির বিষয়টি ফুটে ওঠে।

প্রথম কাব্য শোণিতে সমুদ্রপাত (১৯৭২)-এ কবি পাঠককে নিজের জাত চিনিয়ে দিতে সমুদ্রের আশ্রয় নিয়েছিলেন। কাব্যঅভিযাত্রার সূচনায় মুহম্মদ নূরুল হুদা সমুদ্রের সাথে যে গাঁটছড়া বাঁধলেন, প্রায় অর্ধ শতাব্দী পার করে দিলেও তা থেকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাননি। তাঁর কবিতার অসংখ্য পংক্তিতে তাই দেখতে পাই সমুদ্রবন্দনা। নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিতেও তিনি লিখেন–
‘জগৎ অতিথি তুমি এসো এই ঘরে
পেতেছি বরণকুলা দরিয়ানগরে’

অথবা লিখেন–
‘যতদূর বাংলাভাষা ততদূর এই বাংলাদেশ
দরিয়ানগরে জন্ম, পৃথিবীর সর্বপ্রান্ত আমার স্বদেশ’
photo-290913-61.jpg
এভাবেই মুহম্মদ নূরুল হুদা নিজেকে দরিয়ানগরের ভূমিপুত্র–সমুদ্রের সন্তান বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁর কবিতায় সমুদ্রের প্রতি নিজের দায়কে কখনো যেমন অস্বীকার করেননি, দরিয়ানগরের সাথে সংশ্লিষ্টতাকেও এড়িয়ে যাননি। পরিণত বয়সে লেখা তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থ ঝাউদরিয়ার ডানা(২০১০) এবং নুনদরিয়ার ঘ্রাণ(২০১১), তাঁর অঙ্গীকার এবং সংশ্লিষ্টতাই ঘোষণা করে যেন। মুহম্মদ নূরুল হুদার গীতিকবিতার বই ‘সুরসমুদ্র’ হুদা-প্রতিভার অন্য এক অধ্যায়। সুরের অনুরণন যেমন বুকের গভীরে বেজে চলে অবিরাম, তেমনি গীতিকবিতাগুলি কবির বুকের সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম আড়ালগুলোকে গ্রন্থি খুলে খুলে উন্মোচন করে পাঠকের সামনে। সঠিক সুর সংযোজনের পর কবিতাগুলো যখন গান হয়ে যায়, তখন তা কেবল পাঠকের থাকে না; হয়ে যায় শ্রোতারও। গান বরং শ্রোতারই বেশি। নিবিষ্ট শ্রোতা সুরের লহড়ি আর মীড় ছুঁয়ে ছুঁয়ে পৌঁছে যান কবির হৃদয়তন্ত্রীর কাছাকাছি। কবি আর শ্রোতা তখন একাকার হয়ে যান। বাংলা সাহিত্যের প্রধান দুইপুরুষ-রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল, যাঁরা যুগ যুগ ধরে মানুষের অন্তরে সজীব অস্তিত্ব নিয়ে বিরাজমান, তাঁদের এই সজীব উপস্থিতির প্রধান অনুষঙ্গ অবশ্যই সঙ্গীত। বাঙালির লোকসঙ্গীতের ভা-ারে লালন-হাসন-জালাল-উকিলমুন্সিরা সাধারণের কণ্ঠে সুরে সুরেই বেঁচে থাকেন যুগের পর যুগ। মিডিয়ার শরণাপন্ন হতে হয় না তাঁদের; মিডিয়াই বরং নিজেদের স্বার্থে তাঁদের সুরের আশ্রয়ে যায়। সাধারণ অন্তরের আকুলতা নিয়েই গেয়ে ওঠে, ‘মিলন হবে কত দিনে/ আমার মনের মানুষেরও সনে’ অথবা ‘আগুন লাগাইয়া দিলো কনে/ হাসন রাজার মনে’ কিংবা ‘রাস্তায় পড়ে ধরবি যদি তারে চল মুর্শিদের বাজারে/ কেহই করে বেচা কেনা কেহই কান্দে’ ইত্যাদি। সে অর্থে মুহম্মদ নূরুল হুদার গীতিকবিতাগুলোর সুরারোপ হয়ে ওঠেনি; কিন্তু কবি হুদা যে সুরসমুদ্রে সমুদ্র মন্থনের প্রয়াস পেয়েছেন তার সন্ধান করাও জরুরী বিবেচনা করি। দৃশ্যকাব্য ‘নাটক’ যেমন রচনাতেই শেষ হয়ে যায় না, তার চরম উৎকর্ষের জন্য নাটক মঞ্চায়নের দাবীও পূরণ করতে হয়; গীতিকবিতার ক্ষেত্রেও তেমনি, সুরারোপ এবং বাদ্যসহযোগে পরিবেশনার পর সঙ্গীত চূড়ান্ত উৎকর্ষের সীমায় পৌঁছে। তবে মুহম্মদ নূরুল হুদা যে সুরের শক্তি অনুসন্ধান করে বাঁশীওয়ালার সাথে যোগসূত্র স্থাপনের প্রয়াস পেয়েছেন, সেইটে আশার কথা। সুরসমুদ্রে দেখি কবি নজরুলের জীবনভিত্তিক ‘অগ্নিছোঁয়ায় উঠলো জেগে’ নামের ‘গীতিনৃত্যনাট্য’টি। শিল্পের আরেক মাধ্যম ‘কাব্যগীতিনৃত্যনাট্য’ (Cantata)-র সাথেও নিজেকে যুক্ত করেছেন তাঁর এ রচনা নিয়ে। সুরসমুদ্রে সমুদ্রবন্দনার সন্ধান করতে স্মরণ করছি–
‘সঘন বর্ষণে যদি
আজ রাতে ডুবে যাই তুমি আর আমি
অগ্নিময় সেই রথে আমরাও হবো স্বর্গগামী।
তাহলে দুচোখ রাখো, জলাঙ্গিনী দুহাতে দুহাত
বাজুক যুগল বুকে মৃদঙ্গিনী জলের প্রপাত
এসেছে সৃষ্টির বৃষ্টি, সজলা সবলা এই রাত
মানুষ, তোমার সুখে মানুষীও হতে চায় খুন ॥’
(হাজার বৃষ্টির ফোঁটা ॥ সুরসমুদ্র)
সমুদ্রের সাথে নিজের সংশ্লিষ্টতা ঘোষণার গীতিকবিতাটি পড়ে নিতে পারি-
‘রোয়াং শহর শ্বশুরবাড়ি/ বদরমোকাম ঘরকাচারি/ সেন্টমার্টিনে বাগানবাড়ি/ উড়াল দিয়া যাই/ চলরে মন তাড়াতাড়ি/ সময় বেশি নাই/ নাই নাই নাই/ নাই নাই নাই ॥
টেকনাফ আর তেতুলিয়া/ বাতিঘরের কুতুবদিয়া/ জলপালংকি সোনাদিয়া/ শাম্পান বাইয়া যাই/ চলরে মন তাড়াতাড়ি/ সময় বেশি নাই/ নাই নাই নাই/ নাই নাই নাই ॥
ছেড়ে এলাম ঢাকার শহর/ পৌঁছে গেলাম দরিয়ানগর/ নাফ দরিয়ার ঢেউয়ের শহর/ সাঁতার কাইটা যাই/ চলরে মন তাড়াতাড়ি/ সময় বেশি নাই/ নাই নাই নাই/ নাই নাই নাই ॥
বনপংখি মনপংখি/ জলপিনজিরায় বাধের টংকি/ খুশির সীমা নই/ চলরে মন তাড়াতাড়ি/ উড়াল দিয়া যাই/ সময় বেশি নাই/ নাই নাই নাই/ নাই নাই নাই ॥’ (উড়াল ভ্রমণ ॥ সুরসমুদ্র)
সমুদ্রঘনিষ্ঠ ধীবর জীবন এবং সংগ্রামী মানুষের জীবনচিত্র ফুটে উঠতে দেখি তাঁর ‘দিগন্তের খোসা ভেঙে’(১৯৯৪) কাব্যে ‘নিজেকে বদল করা’, ‘দিগন্তের খোসা ভেঙে’, ‘জলমানুষ’, ‘জালো’ ইত্যাদি শিরোনামের দীর্ঘ কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে। এসব কবিতায় সমুদ্র তীরবর্তী মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার পাশাপাশি সে অঞ্চলের নিজস্ব ভাষার বেশকিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন; অবশ্য আঞ্চলিক সেসব শব্দকে সর্বজনীন করতে কোথাও পাদটিকা ব্যবহার করেননি। এটি তাঁর আঞ্চলিকতার প্রতি অহংকারী পক্ষপাত হতে পারে, সমুদ্রবন্দনার পরোক্ষ কৌশলও হতে পারে, অথবা অন্যকিছু; কিন্তু পাঠক বঞ্চিত হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। সামান্য কটি পংক্তি উদ্ধার করছি–
‘মাঝরাতে সূর্য নেই আছে নীলতারা,
দরিয়ায় ছায়া পড়ে তার,
কুপি জ্বলে, জেলের, মাঝির,
দরিয়ায় ছায়া পড়ে তার;
ওমপাতা নড়ে ওঠে ডিয়ার কিনারে,
দরিয়ায় ছায়া পড়ে তার :
মাছেরা সাঁতার কাটে সে সব ছায়ায়।’
(নিজেকে বদল করা ॥ দিগন্তের খোসা ভেঙে)
সমুদ্রের প্রতি পক্ষপাতের কারণেই সুরমা পাড়ের রাগীব আলীর প্রেমোপাখ্যান লিখতে গিয়ে টেনে আনেন পাশ্চাত্যের সমুদ্রপাড়ের ছবি, যে সমুদ্র অবলীলায় কবির নিজস্ব সমুদ্রের সাথে একাকার হয়ে যায়।
‘নন ভাগ্যবাজিকর, শোনেননি নিভৃতির বাঁশি,
সুদূর সমুদ্রশঙ্খ ডেকেছিলো লক্ষ্মীর জেল্লায়;
চারপাশে নৃত্যপর মায়াবিনী সখী সেবাদাসী
ঘাগরা দুলিয়ে হাসে ক্যাবারে, হল্লায়–
রাগীব আলীর চোখ সেই লুব্ধ জীবনের ফেনা
দেখে গেছে আড়চোখে, হয় নাই কেনা
বন্দরের চারুপণ্য; মনোলোকে বাংলার জলাঙ্গিনী
সুরমার জলে ভেসে ডেকেছিলো কোন সে ভেলায়?’
(রাগীব আলীর প্রেম ॥ পদ্মাপারের ঢেউসোয়ার)
কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার কাব্যঅভিযাত্রায় কখনো নিজের অবস্থানকে সমুদ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেননি। সোনাদিয়া, মহেশখালী, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, মৈনাক পাহাড়, আঞ্চলিক লোককহিনি-কিংবদন্তী কোনোকিছুই বাদ যায়নি তাঁর কবিতার অনুষঙ্গ থেকে। ‘পুণ্যবাংলা’ কাব্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংগ্রামের বয়ান করতে করতে নিজের অজান্তেই দরিয়ানগর জনপদের নানান লোকপুরাণে ঢুকে গেছেন। দুএকটি কবিতার কয়েকটি পংক্তি উদ্ধৃত করতে চাই;
‘আর্য আর অনার্যের ধরাস্রোতে মিলিত মানবপলি চিরবহমান
আমি এই পুণ্যবাংলার সন্তান;
প্রস্তরযুগেরও আগে এই দেহে মনে জলাঙ্গিনী নদীর সুঘ্রাণ
আমি এই পুণ্যবাংলার সন্তান।
ফুলেদের পাখিদের প্রাণে প্রাণে ছড়িয়ে দিয়েছি আমি সমুদ্রপরাগ
জীবাশ্মের বীজ থেকে টংকারে টংকারে আমি বাজিয়েছি শত রুদ্র রাগ;
বেহুলা লখীন্দর, সহউত্থানের আগে কণ্ঠে তার সতীত্বের জয়,
ষড়ঋতু পূর্ণপ্রাণে জন্মজন্মান্তর ধরে সব কৃতি সব বলিদান
আমি এই পূণ্যবাংলার সন্তান;
(পুণ্যবাংলা ॥ পূণ্যবাংলা)

এ কবিতায় কবি বিশ্ব প্রেক্ষিতকে তুলে এনেছেন পূণ্যবাংলার ইতিহাস-প্রকৃতি-কৃষ্টি ও সভ্যতাকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। হর্ষবর্ধন থেকে শুরু করে ভুসুকু, চণ্ডীদাস, রঘুপতি, কালিদাস, মোগল-পাঠান-বারো ভূঁইয়া, তিতুমীর-ঈশাখাঁ-সূর্যসেন-ক্ষুদিরাম-সালাম-জব্বারসহ অসংখ্য অনুষঙ্গ যুক্ত হয়েছে অবলীলায়; এবং এরই সাথে যুক্ত হয়েছে কবির নাম–
আমার বুকের তীর্থে শহীদী শোণিতে গড়া অবিনাশী শহীদ মিনার
সর্ববংশ সর্বগোত্র বর্ণাবর্ণ আর শোণিতস্রোতের আমি উত্তরাধিকার
আমার অনিদ্র চিত্তে শান্তিসংঘ, সুবেহসাদিকের আলোর আজান
আমি এই পুণ্যবাংলার সন্তান;
(পুণ্যবাংলা ॥ পুণ্যবাংলা)
সমুদ্রবন্দনার আরও কিছু কবিতার উল্লেখ করা যেতেই পারে, সঙ্গত কারণেই নিজেকে নিবৃত করছি এবং আলোচনার ইতি টানতে কবির ঝাউদরিয়ার ডানা(২০১০) এবং নুনদরিয়ার ঘ্রাণ(২০১১) কাব্য দুটিতে প্রবেশ করতে চাই। পরিণত বয়সে এসে কবি তাঁর দরিয়াকে দরিয়ানগরে সীমাবদ্ধ রাখেননি। কবি তাঁর নিজস্ব দরিয়াকে মিশিয়ে দিয়েছেন বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংগ্রাম-সংস্কৃতির সাথে। যে কারণে তাঁর বেহুলার ভেলা গাঙুরের জল বেয়ে সমুদ্রে মেশে, মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর সার্বভৌম তর্জনীর ইঙ্গিতে দরিয়ার জল গর্জে ওঠে লক্ষ-কোটি বাঙালির গর্জনের সাথে। বাংলার স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের স্বার্থে কবি নিজেই দরিয়াপ্রহরী হয়ে যান। বাংলাদেশকে দরিয়ানগরের সাথে একাকার করে নেন এবং স্পর্ধার সাথে উচ্চারণ করেন–
‘দরিয়ানগর জোড়া কবিচূড়া, চূড়া জোড়া টঙ
মৈনপাহাড়ের শিয়া, রাণীখং কিংবা জাফলং
কবিটঙে কবিপিতা, আদিগোত্র বঙ
বাঙালির বিশ্বমিশ্র, স্নানশুভ্র দরিয়ার ফেনা
হলুদ ফুলের দেশ পেনোয়ায় জুঁই-হাস্নাহেনা
সন্তানেরা বিশ্বজোড়া, অশ্রুময়ী জননীর চেনা
কত কুড়ি জুজুবুড়ি, কত বেলি টগর-চামেলি
দরিয়ার হাত ধরে তৌবা করে, ফেরে বেলাবেলি
সূর্যাস্ত বাসর-বধু, গায়ে তার লাজরাঙা চেলি
তরঙ্গিত শান্তিমালা পরেছেন দেবতা দরিয়া
শুভ্র হও, সুস্থ হও, স্বস্থ হও– এ মালা পরিয়া
মানুষ, হাঁটিয়া যাও শান্তিতীর্থে ঘোড়ায় চড়িয়া
এই শীতে শান্তিতীর্থে কবিপীর মাগে রাত্রিদিন
‘মানুষ সমিল হও, পঙক্তি হও’– আমিন, আমিন।
(কবিটঙে কবিপিতা ॥ নুনদরিয়ার ঘ্রাণ)
এভাবেই মুহম্মদ নূরুল হুদা তাঁর কবিতায় সমুদ্রবন্দনা করেছেন এবং নিজেকে সমুদ্রের সাথে একাকার করে দিয়েছেন। সমুদ্রের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে যেমন তিনি নিজেকে ক্ষুদ্র করে উপস্থাপন করেছেন; সমুদ্রের সাথে একাকার হয়ে একই সাথে নিজেকে সমুদ্রের সমান করে তুলেছেন। নিজের কবিতার প্রসাদগুণে সমুদ্রাসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

Flag Counter


2 Responses

  1. matin bairagi says:

    কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার ৬৫তম জন্মদিন উপলক্ষে বিশিষ্ট কবি ফরিদ আহমদ দুলাল এর প্রবন্ধটি খুবই সুন্দর এবং তাৎপর্যপূর্ণ লেখা । অন্যরকম অবলোকন আছে, আছে ভাষার চমৎকারিত্ব গদ্যের আনন্দ-পাঠ, এমনিতেই ফরিদ আহমদ দুলালের লেখার প্রতি আমার পক্ষপাতিত্ব থাকে, তারপরও বলতে চাই লেখাটি সুন্দর এবং কবির নানাদিকের আলোচনার মধ্যে নতুন আরেকটি দিকের উন্মোচন। ফরিদ ভাইকে যেমন ধন্যবাদ, তেমনি কবিকে অভিনন্দন তাঁর ৬৫তম জন্মদিন শুভ হোকৎ। স্বাগতম, অভিনন্দন হে কবি দীর্ঘজীবি হোন ।

  2. Manik Mohammad Razzak says:

    হুদা ভাই সমুদ্রের সন্তান, সঙ্গত কারণেই তাই তাঁর লেখনিতে, ভাবনায়, চেতনায় বার বার আছড়ে পড়ে সাগরের ঢেউ। দরিয়া নগরের এই কবিকে নিয়ে ফরিদ আহমেদ দুলাল সে আঙ্গিকেই মূল্যায়ন করেছেন। সব কিছু মিলিয়ে লেখাটি ভালো লেগেছে। ফরিদ আহমেদ দুলালকে ধন্যবাদ।

    মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.