গদ্য, প্রবন্ধ, ব্যক্তিত্ব, স্মরণ

কীর্তিমান সাহিত্য বিশারদ আজও জীবিত

মুহাম্মদ শামসুল হক | 28 Sep , 2013  

পল্লীর মানুষ ও তার সাহিত্য-সংস্কৃতিকে অমরত্ব দান করতে হলে তাদের ভালবাসতে হয়, জানতে হয় তাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির অতীত ইতিহাস, উপলব্ধি করতে হয় তাদের চাহিদা। সর্বোপরি সব কাজেই নিজেকে পল্লীর মানুষের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হয় একজন সাধক পুরুষের।

এমনই একজন সাধক পুরুষ মুন্সি আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ। তাঁর জন্ম ১৮৭১ সালে পটিয়ার সবুজে ঘেরা সুচক্রদন্ডী গ্রামে। মুন্সি তাঁর বংশগত উপাধি এবং সাহিত্য বিশারদ হচ্ছে সুধী সমাজের পক্ষ থেকে তাঁকে দেওয়া উপাধি।

পটিয়ার বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদই ১৮৯৩ সালে প্রথম এন্ট্রাস পাস করেন। অসুস্থতার কারণে তিনি এফ.এ পরীক্ষার পাঠ শেষ করতে পারেননি।
জীবনের নানা বাঁকে সাহিত্য বিশারদ শিক্ষকতা, চট্টগ্রাম জজ আদালত ও স্কুল ইন্সপেক্টরের অফিসে কেরানি পদে চাকরি করেন। নিষ্ঠা ও কর্তব্যপরায়ণতার স্বীকৃতি হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমিক পরীক্ষাসমূহের বাংলার পরীক্ষক হিসেবেও নিয়োজিত ছিলেন তিনি। সূচক্রদণ্ডী ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন প্রায় ১০ বছর।

শিক্ষকতা করতে গিয়ে মানস-চক্ষু প্রসারিত করে তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানদের স্বকীয়তা ও স্বজাত্যবোধের অভাব উপলব্ধি করেন। এই অভাববোধই তাঁকে সাহিত্য সাধনায় উদ্বুদ্ধ করে। পূঁথি সাহিত্যকে আপন সন্তানের মতো ভালবাসতেন তিনি। চাকরি জীবনে অঢেল খাটুনির পর তিনি পূঁথি সংগ্রহ ও সাহিত্য সাধনায় জীবনের বড় অংশ কাটিয়ে দিয়েছেন।

শুধু পুঁথি সংগ্রহ করেই ক্ষান্ত ছিলেন না তিনি। অনেক পূঁথির লেখা ছিল অস্পষ্ট, অগোছালো। সেগুলোর পাঠোদ্ধার, অর্থ নির্ণয়, টীকা লিখন এবং সম্পাদনার মাধ্যমে পাঠোপযোগী করে সংগ্রহকে পূর্ণতা দেন তিনি। বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রায় আড়াই হাজার পূঁথি সংগ্রহ করেন যা আর কারো একক বা দলগত প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়নি। প্রায় দেড়শ প্রাচীন ও বিস্মৃত কবিকে তিনি সূধি সমাজে পরিচিত করার মাধ্যমে বাংলার সাহিত্যের ভান্ডারকে ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ করেন।

সাহিত্য বিশারদ খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবোধসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। এ অঞ্চলে তিনিই প্রথম দেখিয়ে দিয়েছেন যে বাংলা আমাদের দেশ, বাংলা আমাদের ভাষা এবং আমরা বাঙালি মুসলমানদের বংশধর। তাঁর ভাষায়, ‘আমার এক বিশ্বাস আছে যে, আমার দেশের মৃত্যু নাই, আমার দেশের আত্মা যে জনগণ তারও মৃত্যু নাই, তেমনই অমর আমার এই বাঙ্গালা ভাষা।’

সমসাময়িক পত্র-পত্রিকায় তাঁর প্রচুর প্রবন্ধ ছাপা হতো। মুসলমানদের বাঙালিত্ববোধ জেগে ওঠার পেছনে তাঁর রচিত ও প্রকাশিত প্রবন্ধের প্রভাব অপরিসীম। তাঁর কাজ ও গুণের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং দূরদূরান্তের সাহিত্য সভা-মজলিসে তাঁর ডাক পড়তে থাকে। নদীয়ার সাহিত্য সভায় তাঁকে ‘সাহিত্য সাগর’ এবং চট্টগ্রামের সুধীসমাজ ‘সাহিত্য বিশারদ’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

আবদুল করিম ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিদে, অমায়িক, অতিথিদের প্রতি যত্নশীল, শিশুদের প্রতি স্নেশীল। কষ্টার্জিত অর্থের একাংশ গ্রামের অসহায় দারিদ্র-পীড়িত লোকদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে এবং অসহায় রোগীদের নিজ হাতে ওষুধপত্র এনে দিয়ে তিনি আনন্দ পেতেন। চাকর-বাকরেরা চেয়ে নিত না বলে তিনি নিজে বিড়ি কিনে গোপনে তাদের পকেটে রেখে দিতেন। অকৃপণ মহৎ হৃদয়ের অধিকারী না হলে অপরের চাহিদাকে নিজের চাহিদার মতো করে দেখার এমন দরদী হওয়া নিঃসন্দেহে অসম্ভব।

শেষ জীবনে তিনি চট্টগ্রামের অলিখিত ইতিহাস লেখার কাজে হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু তা শেষ করে যেতে পারেননি তিনি। লিখতে বসেই হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে এই সাধক পুরুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। সেদিন ছিল ৩০ সেপ্টেম্বর বেলা পৌনে এগারটা, ১৯৫৩ সাল। এ লেখা শেষ করবো তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে ড. এনামূল হকের একটি বক্তব্য দিয়ে ‘সত্যই কি সব শেষ হয়ে গেল? মাস্টার আবদুল করিম মারা গেছেন, কেরানী আবদুল করিম দেহত্যাগ করেছেন, কিন্তু সাহিত্য বিশারদ মরেননি। তিনি মরতে পারেন না, কারণ……….চিত্ত, বিত্ত, জীবন এবং যৌবন এ সমস্তই চঞ্চল, কিন্তু কীর্তিমান ব্যক্তি চিরজীবি। কীর্তিমান সাহিত্য বিশারদ আজও জীবিত।’

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.