প্রবন্ধ, বইয়ের আলোচনা

অন্য এক হুমায়ূন আহমেদ

নওশাদ জামিল | 26 Sep , 2013  

হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণের পর বরেণ্য এ কথাসাহিত্যিককে নিয়ে, তাঁর সৃজনকর্ম নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে বিস্তর। কেউ লিখছেন সাহিত্যসমালোচনা, কেউ স্মৃতিচারণা। আবার কেউ হুমায়ূনের আলোকচিত্র, চিঠি, চিত্রকর্ম নিয়ে প্রদর্শনী করছেন, লেখালেখি করছেন। আবার কেউ তাঁর চলচ্চিত্র, নাটক নিয়ে লিখছেন বিশাল সব প্রবন্ধ। আয়োজন করছেন বিভিন্ন প্রদর্শনীর। ২০১৩ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলাতেই প্রায় ৫০টি বই প্রকাশিত হয়েছে হুমায়ূনকে নিয়ে। বলা যায় দিন যত গড়াবে, এ কর্মযজ্ঞ আরো বাড়বে বৈকি। এসব বই পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বইগুলোয় যতটা না হুমায়ূন রয়েছেন, তার চেয়ে বেশি রয়েছে ওই বইটির লেখকের নিজ গুণকীর্তন। ব্যাপার এমন দাঁড়ায় যে নিজের ঢাকঢোল পেটানো। কতদিন তিনি দখিন হাওয়ায় গিয়েছেন, কতদিন হুমায়ূনের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছেন, কেন হুমায়ূন আহমেদকে ভালোবাসেন ইত্যাদি। বইয়ের শিরোনামে হুমায়ূন আহমেদ থাকলেও তাঁর সম্পর্কে অধিকাংশ বইয়ে নতুন তথ্য থাকে সামান্যই। অন্যদিকে কিছু বই আছে অতিরঞ্জিত, মিথ্যা তথ্যময় কল্পকাহিনী। সেদিন দেখলাম, একটি প্রবন্ধের বই। আকার-আয়তনে বেশ ঢাউস। তাতে শিরোনামে হুমায়ূন আহমেদ থাকলেও চৌদ্দটি রচনার মধ্যে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে লেখা আছে মাত্র একটি। চারদিকে যখন এই হাল, তখন মাজহারুল ইসলামের হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে নয় রাত বইটি পড়ে বিস্মিত হতে হয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের জন্য। কারণগুলোর প্রসঙ্গে পরে আসি। এখন আপাতত বলি, মাজহারুল ইসলাম তাঁর প্রথম বইটিতেই এমন এক কারিশমা ও সংযম দেখিয়েছেন, এমন এক মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন, তাতে এ কথা বলা যায় যে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে এখন পর্যন্ত আমার পড়া সেরা বই এটি।

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন অখ্যাত ও অনামী একজন লেখকের প্রথম বইটিকেই কেন বললাম সেরা ? তাদের বিনয়ের সঙ্গে বলি, বইটি পড়ুন। তাহলেই অনুধাবন করতে পারবেন, কেন সেরা বললাম এটিকে। তার পরও আমার নিজের কিছু যুক্তি আছে, আছে পর্যালোচনাও। যৎকিঞ্চিত এ আলোচনায় সে কথাই বলব।

হুমায়ূন আহমেদের পাঠকমাত্রই জানেন, চেনেন মাজহারুল ইসলামকে। আর যারা জানেন না, তাঁদের বলি, দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। ছায়ার মতো, অবলম্বনের মতো, পরম নিশ্চয়তার মতো হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কাটিয়েছেন। যেন তাঁরা হরিহর আত্মা, নিত্যসহচর। ফলে মাজহারুল ইসলাম তাঁর বইটিতে নিজের ঢাকঢোল পিটাবেন, অনেকে এ কথাই ভাববেন জানি। কিন্তু বিনয়ের সঙ্গে নিজের কথা এড়িয়ে গেছেন তিনি। সুযোগ পেয়েও বাজাননি নিজের ঢোল, করেননি নিজের গুণকীর্তণ। ফলে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে লেখা বইটিতে প্রকৃত প্রস্তাবে হুমায়ূন আহমেদই উঠে এসেছেন অবলীলায়, প্রাঞ্জলভাবে। অন্যকথায়, বইটিতে মূর্ত হয়ে উঠেছেন অন্য এক হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে নয় রাত বইটি মূলত ভ্রমণকাহিনী। আর ওই ভ্রমণের উপলক্ষ ছিল পৃথিবীখ্যাত ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা পরিদর্শন। বইমেলা ঘুরতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে মাজহারুল ইসলাম ঘুরেছেন ইউরোপের তিনটি দেশ–জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্স। একসঙ্গে তাঁরা কাটিয়েছেন মোট ২১৬ ঘণ্টা. অর্থ্যাৎ ৯ দিন। বিদেশের মাটিতে ভিন্ন এক অবয়বে, মেজাজে উঠে এসেছেন ভিন্ন এক হুমায়ূন আহমেদ। সেখানের দিনগুলো কেমন, রাতগুলো কেমন কাটিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ ? কীসে ছিল তাঁর আগ্রহ, কীসে ভালোলাগা, মন্দলাগা ? জার্মানি গমনের ভিসা সংগ্রহ থেকে শুরু করে ঢাকায় ফেরা পর্যন্ত সব আদ্যপান্ত আছে বইটিতে।

ভ্রমণযজ্ঞের এ ঘটনাটি ছিল প্রায় একযুগ আগের। মাজহারুল ইসলাম সেসব ঘটনা, আলোকচিত্র, তথ্য-উপাত্ত, ডাটা, স্থানকালপাত্র দীর্ঘদিন কিভাবে মনে রাখলেন, কিভাবে যত্ন করে আগলে রাখলেন, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। সম্ভবত বিজ্ঞ গবেষকের মতো নোট রাখতেন তিনি। খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে তারিখ, সন, বিভিন্ন জায়গার নাম লিখে রাখতেন। বইটি পড়া শেষে এটিই মনে হয়েছে আমার। হয়তো তাঁর মনের গভীর কোনো প্রদেশে এই ভ্রমণ নিয়ে বই লেখার ইচ্ছাটি সুপ্ত ছিল অনেকদিন। পরে স্মৃতি-বিস্মৃতির ঘটনাগুলো তুলে এনে লিখেছেন মাজহারুল ইসলাম। বই পড়ে মনে হয়, একযুগ আগের স্মৃতি যেন কয়েকদিন আগের। তরতাজা, প্রাণবন্ত। মাজহারের সতেজ বর্ণনা বইটি পড়তে গিয়ে পাঠক হয়ে পড়েন আবেগে আপ্লুত, উচ্ছ্বসিত। বলার অপেক্ষা রাখে না যে হুমায়ূন আহমেদের ওই স্মৃতি বড় আনন্দের, আবার তা পরম বেদনারও।

বিদেশ-ভ্রমণ নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব মনোভাবের সঙ্গে তাঁর পাঠকেরা পরিচিত। ঘরকুনো মানুষ তিনি। কোথাও যেতে চান না, বিশেষ করে বাংলাদেশের বাইরে। যৌবনে দেশের বাইরে খুব ঘোরাঘুরি করলেও পরে তিনি যেতে চাইতেন না বিদেশে। অসংখ্যবার বলেকয়ে তাঁকে রাজি করালে তিনি যেতেন সদলবলে। বিশাল বহর নিয়ে, বন্ধু-পরিজন পরিবেষ্টিত হয়ে। এ যাত্রায়ও যাব কি যাব না এই দ্বিধা ছিল তাঁর মনে। শেষ পর্যন্ত ৯ দিনে জার্মানি, ইতালি আর ফ্রান্স সফরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু এবার তাঁর সঙ্গী হন একজনই–মাজহারুল ইসলাম। গোটা ভ্রমণে মাজহারই ছিলেন তাঁর ছায়াসঙ্গী। বইটিতে সফরটাকে মাজহার এমন জীবন্ত করে তুলে ধরেছেন যে পড়তে পড়তে মনে হয়, লেখকের সফরসঙ্গী যেন পাঠকও।
হুমায়ূন আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে কিংবা তাঁর সঙ্গী হয়ে মাজহারুল ইসলাম এ তিনটি দেশের নিসর্গ, স্থাপত্য, শিল্পসম্ভার এবং বিখ্যাত সব আর্টগ্যালারি, পর্যটন স্থান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন। সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন হুমায়ূন আহমেদকে। এ হুমায়ূন আহমেদ ছবি দেখার জন্য পাগলপারা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য ব্যাকুল। এ হুমায়ূন আহমেদ বেহিসেবি, আত্মভোলা, উদাসীন, খেয়ালি ও আবেগপ্রবণ।

হুমায়ূন আহমেদের একদিন মন বিষণ্ন, অন্যমনস্ক। মন খারাপের কারণ বিনয়ের সঙ্গে জানতে চান মাজহার। হুমায়ূন আহমেদ বললেন, “তুমি ঠিকই ধরেছ। শরীর ঠিক আছে। মন ভালো ছিল না। কারণ ১২ অক্টোবর ছিল শাওনের জন্মদিন। আমি ভুলে গিয়েছিলাম। অবশ্যই আমার একটা ফোন করা উচিত ছিল।” হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন এমনই আত্মভোলা। খেয়ালি মানুষটির নানা শখ, আবদার, পছন্দ, অপছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে পুত্রের মতো দায়িত্ব পালন করেছেন মাজহারুল ইসলাম। পরম যত্নে আগলে রেখেছেন পিতৃসম হুমায়ূন আহমেদকে।

১১২ পৃষ্ঠার এ বইটিতে অধ্যায় বা পরিচ্ছেদ আছে নয়টি। যেন ৯ দিনের বর্ণনা। আর ছবি আছে অসংখ্য। প্রতিটি স্থানের সঙ্গে, ঘটনার সঙ্গে ছবি। কোথাও অনুপম কোনো জায়গার আলোকচিত্র, কোথাও হুমায়ূন আহমেদকে ওই জায়গায় মডেল বানিয়ে আলোকচিত্র। কোথাও আবার তাঁদের দুজনের ছবি। ছবি আর মজাদার বর্ণনায়, সতেজ লেখনীভঙ্গিমায় দারুণ উপভোগ্য। প্রতিটি অধ্যায় শুরু হয়েছে ওই বিষয়টি কেন্দ্র করে বিখ্যাত কোনো লেখকের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পঙ্ক্তি দিয়ে। সেখানে জীবনানন্দ দাশ থেকে শুরু করে ইতালিও কালভিনোওসহ অনেক লেখকের রচনা থেকেই উক্তি রয়েছে। বিষয়টি ভালো লেগেছে আমার কাছে। যেমন একটি অধ্যায় শুরু হয়েছে শামসুর রাহমানের স্বাধীনতা বিষয়ক একটি কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি দিয়ে। পরে ওই অধ্যায়েই উঠে আসে প্যারিসে বসবাসকারী শিল্পী শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাৎ, পরিচয় ও অন্তরঙ্গ আলাপের বর্ণনা। পরে শিল্পী শাহাবুদ্দিনের মুখ থেকেই উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের নানা প্রসঙ্গ। উঠে আসে প্যারিসের আর্ট গ্যালারি, মিউজিয়াম পরিদর্শনের বর্ণিল অভিজ্ঞতা।

পৃথিবীর সব মহৎ ও বড় লেখকের ব্যক্তিসত্তা আর লেখকসত্তার মধ্যে থাকে একটা সুদৃঢ় সেতুবন্ধন। আলোচ্য বইটিতে হুমায়ূন আহমেদের লেখকসত্তার উপস্থিতি সামান্য হলেও উঠে এসেছে ব্যক্তিসত্তা। দুই সত্তার মধ্যে একটা সেতু নিশ্চয় আছে, সেটিও চকিতে উঁকি দেবে পাঠকের মনে। তবে বিশেষভাবে উঠে আসে হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিসত্তা। পাঠকের কাছে তা অচেনা, অজানা। মূলত পাঠকের কাছে ওই অচেনা মানুষটিকেই য্নে করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন মাজহারুল ইসলাম।

বইটির একটিই সমালোচনার দিক, সেটি মাজহারুল ইসলামের গদ্যভাষা প্রসঙ্গে। দীর্ঘদিন হুমায়ূন আহমেদের রচনা পড়তে গিয়ে, কিংবা তাঁর বই প্রকাশ করতে গিয়ে, অথবা তাঁর সঙ্গে মিশতে মিশতে ‘প্রায় অবিকলভাবে’ হুমায়ূনীয় ভাষা রপ্ত করছেন তিনি। কোথাও কোথাও ওই ভাষাটাকে মনে হয় অন্ধ অনুকরণ। অবশ্য দোষের নয় এটি। প্রথম বইটিতে এ ধরনের অনুকরণ থাকা বরং ভালো, নিরাপদ। তবে আমি নিশ্চিত যে, দ্বিতীয় বই লিখতে গিয়ে এ ঘোর এ মোহ কাটিয়ে উঠে নিজস্ব একটা সুর ও প্রকাশভঙ্গিমা তৈরি করবেন তিনি।

আরেকটি কথা না বললেই নয়। আমাদের দেশের লেখকেরা ভ্রমণকাহিনী লিখতে গিয়ে তথ্য আর উপাত্তের ভারে, ইতিহাসের ভারে জুবুথুবু করে ফেলেন তার রচনাকে। অনেকে প্রচুর ছবি দিয়ে বই লিখতে গিয়ে অ্যালবাম করে ফেলেন। ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত গাওয়ার মতো অনেকে নিজের ঢাকঢোল পিটান দেদার। ফলে ভ্রমণকাহিণীর মজাটা থাকে না আর। ভ্রমণকাহিণী হয়ে পড়ে নিরস, ক্লান্তিকর। একঘেয়ে, বিরক্তিকর। এ কাজে তাই লেখকের পরিমিতিবোধ অতীব জরুরি। আরো জরুরি তাঁর হিউমার, উইট। মাজহারুল ইসলাম প্রশংসনীয়ভাবে এ কাজটি করেছেন। ভ্রমণকাহিণী লিখতে গিয়ে ভ্রমণই লিখেছেন, ইতিহাস লিখেননি। আগাগোড়া অসংখ্য রঙিন ছবিতে সুসজ্জিত বইটি আরো মুগ্ধকর। সেখানেও আছে তাঁর পরিমিতিবোধ। নিজের ছবি দিয়েছেন হাতেগোনা কয়েকটি। অধিকাংশ ছবি হুমায়ূন আহমেদকে কেন্দ্র করে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সুখপাঠ্য, দৃষ্টিনন্দন এ বইটি পড়ে অভিভূত হয়েছি বিস্ময়ে, মুগ্ধ হয়েছি প্রাণোচ্ছ্বল আনন্দে। বইটি পড়লে যে কোনো পাঠক এমন আনন্দ পাবেন, হলফ করে এ কথা বলতে পারি।

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে নয় রাত : মাজহারুল ইসলাম। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। প্রকাশক : অন্যপ্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৩। মূল্য : ৩০০ টাকা।

Flag Counter


2 Responses

  1. Bipul Mukherjee says:

    বইটি আমি পরেছি,মাজাহার ভাই নিজেই আমাকে উপহার দিয়েছিলেন, অসাধারন হয়েছে লেখাটা, কোনো কোনো জায়গায় আমার মনে হয়েছে তাদের দুজনকে যেন আমি সামনাসামনি দেখতে পাচ্ছি, অবিকল হুমায়ুন লিখনি।

  2. Arin Amir says:

    The writer very successfully immitate Humayun’s ‘Vasha’! This is a great news.
    H.A. declared openly that he is the ‘Griho Palit…’ of Mazher’s Publication House ‘Onno Prokash! According to many H.A. was his ‘Griho Palit Shonar Dim Para Hash’.
    I will be not surprized if someone someday declared that he/she has unpublished manuscript of H.A. as someone so successful in imitating the genious H.A.!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.