কবিতা

মতিন বৈরাগীর কবিতা

matin_bairagi | 19 Sep , 2013  

মানুষের গল্প

কল্পনা করা যাক– বস্তুর বাইরে কোন কল্পনা নেই–

কল্পনা করা যাক একটি গহ্বর তার ভেতর জীবন ভর বন্দীমানুষ
তারা কোনো আলো দেখতে পায় না গর্তমুখ দিয়ে যে বাতাস ছড়িয়ে পড়ে
সেই তাদের শ্বাস-নিশ্বাস । তারা দেখে অন্ধকার–
জীবনের এক বাস্তবতা যা তারা জানে আজীবন বন্দীত্বের অভ্যেসে
তাদের হাত পা’ বাঁধা নড়ার ক্ষমতাও নেই–
ওই গুহায় সূর্য়ালোক পৌঁছায় না তারা আলোর তরঙ্গের তীব্রতা দেখে না
জানে না সূর্য প্রতিবার বিষ্ফোরণে ছড়িয়ে দেয় নতুন শক্তি বাঁচায় পৃথিবী
আর তাঁরা সব সময় যার উপমা ।
মানুষগুলো দেখে দেয়াল– পিছনের আগুন-আলোয় দেখে
অনুচ্চ পর্দার মতো প্রাচীর। আর ওই পথ দিয়ে যারা চলছে বন্দীরা দেখছে না
দেখছে প্রাচীরের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া ভোজবাজির মতো কতোগুলো ছায়া
তারা বিশ্বাস করছে মানুষগুলো শুধুই ছায়া যেমন তারা নিজেরাও ।

এরকম পৃথিবীর বিপুল মানুষ আজীবন ছায়া দেখে
প্রতিধ্বনি শোনে ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার ভঙ্গি দেখে চোখের দেয়ালে
তারা সত্যি মিথ্যের ফারাকটা জানে না।
আর কেউ মুক্ত করতে চাইলে তারা হিংস্র হয়ে তাকেই খতম করতে চায়
যেরকম সক্রেতিস অজ্ঞদের সত্য বলতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন
তারা যা জানে তা’ এক ঈশ্বর যে তাদের অন্ধকার দিয়েছে
আর এতেই তাদের কল্যাণ শুনছে প্রাচীরে হেঁটে যাওয়া মানুষের কন্ঠে

তারা তাই মেনে চলেছে
বছরের পর বছর যুগের পর যুগ– কতোকাল !

চেতনা হারানোর গল্প

তখন দিনের সূর্য যুদ্ধ-ক্লান্ত সৈনিকের মতো উঠছিলো আকাশে । উত্তর থেকে বইছিলো শীতের বাতাস। দিনের উত্তাপ হিম হয়ে ঝরছিলো। গাছগুলোর পাতাগুলোয় পথের পাশের তৃণগুলোয় কুয়াশারা শীত হয়ে ঝরছিলো। ঝাপটা হাওয়ায় জবুথবু পাখিগুলো চুপ-চাপ শাখার আড়ালে রুখছিলো শীতের চাবুক। দু’একটি কাক সকালের আকাশে উড়ছিলো, আকাশটা ছিলো ধোয়ার আকাশ..
একজন মানুষ বিরামহীন পথ হাঁটছিলো। গন্তব্য অনেক দূরের অথবা দূর রয়েছে গন্তব্যে। সারি সারি বাড়ি-ঘর পিছনে পড়ছিলো আবার সামনে থেকে সরে যাচ্ছিল পিছনে।
তখন সেই মানুষের শরীরের উত্তাপ হিম হয়ে আসছিলো । সারাদিন পথ চলে নদী-তীরে পারাপারে যখন থেমেছিলো, তখন দিনের সূর্য ছুঁইছিলো পশ্চিম আকাশ। সবুজের বুকে ঘন হয়ে বসছিলো সান্ধ্য-আঁধার। তখন জন-মানবহীন এক নদী-তীর বরফের মতো ছিলো স্থির। জলরাশির ওপারটায় জমেছিল ঘন শাদা কুয়াশা। তখন ডানে ও বামে দূর আর দূরের বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে নিশ্চল যেনো উঁচু উঁচু আঁধারের টিলা। রাত্রির কালো ঘন করে তুলছিলো, বৃক্ষগুলো দুলছিলো-
তখন সেই মানুষ ক্লান্তির কফিনে আঁটা পেরেক- নিথর শরীর অনুভবহীন খুঁজছিলো পারাপার, সে হাঁটছিলো পানির দিকে মাথা তার নড়ছিলো, সীমিত দৃষ্টিতে দেখছিলো। সামনের কাদাহীন নদীটির তীরে শিকার ধরার কৌশলে মাথা তুলে থাকা কুমির ’ভাসমান নৌকা-’ যেনো কতোকাল থেকে এই ভাবে ভেসে আছে –
নৌকা! গন্তব্যে পৌঁছানোর ইশারা! সময়ের এই প্রান্তে আনন্দ-আশা! সে ছুটলো, বসে পড়লো নৌকায়, পারাপারে ভয় আর শঙ্কায় যে ভাবে মানুষ ঘটমান ঘটনাকে ভাবে সম্ভবনা, সেই ভাবে আশা বড় হলো স্বপ্ন হলো এগুলো মাঝির দিকে। অস্পষ্ট মাঝির মুখ মাঝ-দরিয়ায় কেমন যেনো ছায়ার মতো–জলের ঢেউগুলো ফনা তুলে দোলাচ্ছে নৌকা, দুলছে মাঝির মুখ হাওয়ায় উড়ানো কাগজের মতো-
মানুষ! মানুষের মুখ এমনও কী হয় কখনো! কুয়াশায় শীতে প্রচন্ড খরায় কিংবা অকালের অঝোর বৃষ্টিতে! নিজের মুখে হাত বুলিয়ে টের পেতে চাইলো, ঠিক তখন মানুষের কন্ঠ উঠে এলো তার কানে- হাওয়ারা কেঁপে গেলো। দেখলো, দু’খানি পা’ নেকডের পা’য়ের মতো ছড়িয়ে আছে অবিকল। নেকড়ের পা’ নিশ্চিত করলো তার চোখ, সে এক নিরস হাসির শব্দ শুনলো- কেমন যেনো –ভেসে আসা দূরের শব্দের মতো নানা শব্দে জড়িয়ে,যেনো গর্গনরা হাসছে কিন্তু মুখ তার দেখতে পেলো না আর। তবু মনে হলো ছায়ার মতো এক মুখ শতমুখে হাসছে ধারালো দাঁত। উচ্চরব নেই আবার নীরবও না, তা-তেই ভাঙছে বাতাস জমে যাওয়া শরীর তাহার।

সেই এক চিৎকার মানুষের -ভয়ের, শঙ্কার, আতঙ্কের রব। ঝাঁপিয়ে পড়লো সে নদীতে– সাঁতরে উঠলো তীরে। তখনো সেই হাসিটা মেডুসার মাথা শত নাগের মতো দীর্ঘ হয়ে ছুটলো তার দিকে বাঁকা বাঁকা দাঁতগুলো উঁচিয়ে। দৌড়ের এই প্রান্তে মনে হলো গন্তব্য এখন দূর হয়ে গেছে, অনন্ত এক সময়ের দিকে।

এখন বিশ্রামের প্রয়োজন, খাদ্যের-একটু উত্তাপ শরীরে আবার । অনুভবের এই মাত্রায় মনে হলো সমুখে আলোর রেখা কুয়াশা মিশ্রিত আঁধারের শরীর চুইয়ে এলায়িত ‘ধানশীষের’ উপর মাথা তুলে ডাকছে তাকে। নুয়ে পড়া ধান-শীষ স্পষ্ট হলো তার চোখে। ধানগুচ্ছের ফাঁকে জমে আছে অন্ধকার আর তার মাঝে এক কুঁড়ে, ছড়িয়ে পড়ছে মরা আলো যা সে দেখেছিলো অসহায়ত্বের রাতে : জ্বলছে কেরোসিন বাতি বিভ্রমের মতো আঁধারের কাছাকাছি,আর ওপাশে বসে আছে একজন চাঁদরে ঢাকা তার দুই পা’ সামনে ছড়িয়ে। মুখখানি অন্ধকার। মনে হলো মানুষহীন এই প্রান্তর জেগে আছে মানুষের কাছে।

—-আমার একটু আশ্রয় চাই শুধু এই রাতটুকু — শুকনো কাপড় আর বিশ্রাম ..ভেতর থেকে ইশারা–বসলো সে পোষাকে আবৃত মানুষটির কাছে বললো: আমি খুব ভীত-ক্লান্ত-ক্ষুধার্ত এবং ঠান্ডায় জর্জরিত। ভয় আমাকে তাড়িয়ে এনেছে এতোদূর। আমি পথ হারিয়েছি–সে বলতে যাচ্ছিলো আচ্ছা মানুষের পা’ কখনো নেক-ড়ে-র- তাকালো সেই শুভ্র-পোষাকে ঢাকা মানুষটির দিকে – একজোড়া পা, অবিকল সেই পায়ের মতো লোমশ সাজানো তীক্ষ্ণ নখর…
দৌঁড়ের ভিতর সে একই রকম হাসির শব্দ শুনতে পেলো । একই ভাবে ছুটে আসছে তার দিকে তার দিকে– তার পিছু–
দিশাহীন সেই মানুষ যেনো বহুমানুষ এবং একক দৌঁড়াচ্ছে– খুঁজছে আশ্রয়–বিভ্রান্তির এই প্রান্তে সে দেখলো নিজেকে এক প্রার্থনালয়ে। ভিতরে মোমের স্নিগ্ধালোক। ভাবলো স্রষ্টার নামের এই ঘর দৈত্য-দানো ভূত-প্রেত আসবে না আর। দেখলো দেবদূতের মতো শুভ্র পোশাকে বসে আছে এক মানুষ। মানুষেরই মতো। হ্যাঁ মানুষের মতো । জ্বলছে আলোর স্নিগ্ধ শিখা, ডাকছে প্রার্থনায়-
হায়, ক্ষুধা-ক্লান্তির মানুষ আশ্রয় আর খাদ্য পাবার বাড়তি আশায় বিভোর হবার আগে দাঁড়িয়ে পড়লো প্রভূর প্রার্থনায় এবং নত হবার কালে দেখলো সেই পা’ অবিকল নেকড়ের মতো সমান ভরে রুকুতে নুয়ে গেছে আর তখন হাসিটি আবারো শুনতে পেলো সে এবং অষ্ফুট চিৎকারে চেতনা হারালো–
আর চেতনা হারানো মানে-তোÑ নতুন করে জেগে উঠবার অপেক্ষা–

Flag Counter


9 Responses

  1. আলী হাবিব says:

    কল্পনায় নয়, বাস্তবেই তো আমরা যাপন করি এক বন্দি জীবন। সূর্যের উচ্ছাস কি সত্যিকার অর্থে কোনোদিন ছুঁয়েছে আমাদের? গলে পড়া জোছনা ভিজে কতোটুকু স্পর্শ করতে পেরেছি সেই কোমল সুন্দর? তবু তো স্বপ্ন দেখি। স্বপ্নে বাঁচি। চারদেয়ালের সীমানা পেরিয়ে স্বপ্ন ছুঁয়েছে ঐ দূরের আকাশ। ঘেরাটোপে বন্দী জীবন, স্বপ্নের স্বাধীনতা তবু কাউকে দেবো না। ক্লান্তির কফিন ছুঁড়ে ফেলে নতুন করে দাঁড়াবো আবার।
    কবি মতিন বৈরাগীর কবিতায় যে বাস্তবতার কথা উঠে এসেছে, তার সঙ্গে একমত হয়েও বলি, স্বপ্ন হারাবো না।
    অভিনন্দন কবি

  2. শান্তা মারিয়া says:

    খুব ভাল লাগল। বিশেষ করে চিত্রকল্প ও দর্শন।

  3. Shakil Hussain Tutul says:

    shundor.

  4. Manik Mohammad Razzak says:

    ভালো লিখেছেন মতিন ভাই। আপনাকে অভিনন্দন। ভালো থাকবেন।

    মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

  5. zunnu rien says:

    মতিন বৈরাগী দর্শনের কাব্যময় খেলায় যে চিত্রকল্প তৈরি করেন, তা সত্যিই সুন্দর

  6. jhoneey says:

    কবিতাগুলো ভাল, আরো নুতন নুতন কবিতা আশা করি।

  7. এম. ফারুকুর রহমান says:

    কবি মতিন বৈরাগীর আশা জাগানিয়া কবিতায় গভীর আনন্দ পেলাম

  8. ‘মানুষের গল্প’ এবং ‘চেতনা হারানোর গল্প’ পড়ে ভালো লাগলো। চেতনা হারানো মানে-তো নতুন করে জেগে উঠবার অপেক্ষা — দারুণ কথা। অনেক ধন্যবাদ মতিন ভাই। দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠে আরো ভালো ভালো কবিতা লিখুন।

  9. matin bairagi says:

    আমার কবিতা পড়ে মন্তব্য দিয়ে যাঁরা আমাকে আরো লিখতে উৎসাহ দেন, দিয়েছেন তাঁদের প্রত্যেকের কাছে রইলো আমার কৃতজ্ঞতা । শুভকামনা রইলো সকলের জন্য। আশা রইলো উজ্জল আগামীর । মতিন বৈরাগী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.