গদ্য

বঙ্গদেশে বৃটিশ-বিরোধী সংগ্রাম ও পাগলপন্থী বিদ্রোহ

farid_ahmed_dulal | 18 Sep , 2013  

১৭৫৭ খৃস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের আগেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছিলো অনেকটাই, অন্যদিকে সিরাজউদ্দৌলার পতনের অব্যবহিত পরই ভারতে বাহ্যত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়নি; বৃটিশ শাসনের তো প্রশ্নই আসে না। ভারতে বৃটিশ শাসন শুরুর আগে জনমনে বৃটিশ শাসনের অনিবার্যতা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে স্থানীয় ব্যর্থতাকে বড় করে তোলার কারণেই হয়তো কৌশল হিসেবে মীরজাফর আলী খান থেকে শুরু করে বিভিন্ন নবাবের শাসনামলের বিশৃঙ্খলা এবং অরাজক অবস্থা সৃষ্টির পাঁয়তারা হয়েছিলো; বিশ্বকে এ কথা বোঝানো প্রয়োজন ছিলো, যেন ভারতে বৃটিশ শাসনকে ভারতের জনগণ নিজেদের স্বার্থে আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছে। ইংরেজদের এই ষড়যন্ত্রের সাথে ভারতের উচ্চবর্ণের কেউ কেউ অথবা শাসন প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ সম্পৃক্ত থাকলেও ভারতের সাধারণ মানুষ যে বৃটিশ-বশ্যতাকে মেনে নেয়নি, তার প্রমাণ বিশ্ব দেখেছে বারবার।
ভারতের প্রতিটি অঞ্চলে নানানভাবে নানান সময়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে ভারতীয়রা। বৃটিশবিরোধী ভারতীয়দের প্রতিটি বিদ্রোহ ইতিহাসে সমান গুরুত্ব নিয়ে আলোচিত হয়নি অথবা ঐতিহাসিকদের সমান বিবেচনা পায়নি। বর্তমান নিবন্ধে বঙ্গদেশে বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামের সামান্য রূপরেখা উপস্থাপনের পাশাপাশি ইতিহাসে স্বল্পালোকিত ‘পাগলপন্থী বিদ্রোহ’-এর স্বাতন্ত্র্য প্রসঙ্গে কিঞ্চিত আলোকপাতের প্রয়াস থাকবে।

‘পাগল’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘উন্মাদ’, ‘উন্মত্ত’, ‘বাতুল’, ‘মত্ত’, ‘অধীর’, ‘অস্থির’, ‘অবোধ’, ‘ক্ষেপা’, ‘চপলমতি’ ইত্যাদি। আভিধানিক অর্থের বাইরে ‘পাগল’ শব্দের একাধিক ব্যবহারিক অর্থ রয়েছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, আর লোকজীবনে তো অজস্র; যেমন, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে/ পাগল আমার মন জেগে উঠে’॥ ‘পাগল যে তুই, কণ্ঠ ভরে/ জানিয়ে দে তাই সাহস করে।/ দেয় যদি তোর দুয়ার নাড়া/ থাকিস কোণে দিস নে সাড়া–/ বলুক সবাই ‘সৃষ্টিছাড়া’, বলুক সবাই ‘কী কাজ তোরে’ (রবীন্দ্রনাথ)॥ ‘চিঠিটা তার পকেটে ছিলো, ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।/ “.. ..তোমার জন্যে কথার ঝুড়ি নিয়ে/ তবেই না বাড়ি ফিরবো।/ লক্ষ্মী মা রাগ করো না,/ মাত্র তো আর কটা দিন।”/ “পাগল ছেলে”/ মা পড়ে আর হাসে, “তোর উপর রাগ করতে পারি।”(আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ)॥ ‘পাগল মন মনরে মন কেন এত কথা বলে’ (লোকসঙ্গীত)॥ ‘পাগলা রে তুই ভবের রীতি ভবের নীতি কিছুই বুঝলি না/ চান চাইয়া চান পাইলি রে তুই মন চাইয়া মন পাইলি না’ (লোকসঙ্গীত)॥ ‘আমি পাগল হবো পাগল নেবো যাবো পাগলের দেশে/ এই পাগলকে টেনে নেবো সেই পাগলের কাছে’ (লোকসঙ্গীত)॥ ইত্যাদি। পাগল শব্দটির ব্যবহার অভিধানে যাই থাকুক ব্যবহারিক জীবনে ‘পাগল’ শব্দটির সাথে আদর-স্নেহ-ভালোবাসা ইত্যাদির প্রবল যোগ রয়েছে। ইতিহাসের ‘পাগলপন্থী বিদ্রোহের’ পাগলদের সাথেও আদর-স্নেহ-ভালোবাসার যোগ রয়েছে। বর্তমান রচনায় যতবার ‘পাগল’ শব্দটি ব্যবহার হয়েছে, প্রতিটি শব্দের সাথে আছে শ্রদ্ধা-সম্মান আর প্রেম। শুধুমাত্র প্রেমের শক্তিতেই দাঁড়িয়েছে ‘বঙ্গদেশে বৃটিশ-বিরোধী সংগ্রাম ও পাগলপন্থী বিদ্রোহ’।

১৭৫৭-র যুদ্ধে ইংরেজ বাহিনী বিজয়ী হলেও ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানী প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়নি, এ কথা আগেই বলা হয়েছে; কিন্তু ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৫-তে দেওয়ানি লাভের পূর্ব পর্যন্ত ভারতে পরোক্ষে ইংরেজ শাসনই বলবৎ ছিলো। যদিও এই সময়কালের মধ্যে মীর কাশেম আলী খাঁ অথবা মহারাজা নন্দকুমারের মতো কেউ কেউ নিজেকে স্বাধীন নবাব ভাবতে গিয়ে ইংরেজদের কোপানলে পড়ে প্রাণ দিয়েছেন। মুনাফা-প্রত্যাশী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে তাদের ভূমি-বন্দোবস্ত প্রক্রিয়া, করারোপ পদ্ধতি, কর সংগ্রহ নীতিমালা এবং ভূমি রাজস্ব প্রশাসনের কাঠামো নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘ প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষাকালীন সময়ের মধ্যেই বাংলার মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে কোম্পানি-শাসন। ১৭৬৫ থেকে ১৭৭২ দ্বৈতশাসন পর্বে যে ভূমিব্যবস্থা চালু ছিলো তাকে বলা হতো আমিলদারী ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় আমিলদারদের দ্বারা রাজস্ব আদায় করা হয়েছে; এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্তদের অসাধুতা এবং ব্যক্তিগত মুনাফাচিন্তা শাসকগোষ্ঠীকে চিন্তিত করে তোলে। এ ব্যবস্থায় আমিলদারগণ সুপারভাইজার হিসেবে যাদের নিয়োগ দেন তারাও যুক্ত হয়ে যান অসাধুতার সাথে। সঙ্গত কারণেই কোম্পানিকে নতুন করে ভাবতে হয়। ১৭৭২ খৃস্টাব্দের মে মাসে কালেক্টার নিয়োগ দেয়া হয়। ওয়ারেন হেস্টিংস এ সময় পাঁচশালা বন্দোবস্তের মাধ্যমে সর্বোচ্চ করদাতাকে জমিদারী ইজারা দেয়ার নীতি গ্রহণ করেন। পরিবর্তনের উদ্দেশ্য যাই হোক সর্বোচ্চ কর আদায় প্রতিযোগে বিপন্ন হতে থাকে সাধারণ মানুষই। ১৭৭৭-এ বঙ্গদেশে বার্ষিক বন্দোবস্ত নামে নতুন এক ভূমি রাজস্বব্যবস্থা চালু হয়ে ১৭৭৯ পর্যন্ত বলবৎ ছিলো। ১৭৮৯-৯০ সালে বাংলার জমিদারদের সাথে লর্ড কর্নাওয়ালিশ ‘দশশালা’ বন্দেবস্ত করেন এবং ১৭৯৩-এর মার্চে এটিকেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে রূপান্তরিত করা হয়। এসব নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষায় একদিকে যেমন বাংলার মানুষের উপর বিভিন্ন পরিচয়ে করের বোঝা বাড়তে থাকে, অন্যদিকে কোম্পানির ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি বাংলাকে বৃটেনের কাঁচামাল উৎপাদনকারী এবং পণ্যের বাজার হিসেবে দেখার প্রবণতা বেড়ে যায়। বঙ্গভূমির সস্তা শ্রমবাজার কোম্পানি শাসনকে এতটাই প্রলুব্ধ করে তোলে যে, এদেশের মানুষকে তারা ক্রীতদাসের মতো ব্যবহারে উৎসাহী হয়ে ওঠে। ইংরেজদের এসব অনাচারে সহযোগিতা দিয়ে তাদের কৃপাদৃষ্টিলাভে তৎপর হয়ে ওঠে জমিদার, তালুকদার, জোতদার, মুৎসুদ্দিশ্রেণি; আর সকল অনাচারের উত্তাপ লাগে বাংলার সাধারণ মানুষের উপর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের মুনাফালিপ্সু চরিত্রের জন্যই বাংলার কৃষিব্যবস্থায় আনতে চায় পরিবর্তন। প্রথমদিকে বাংলার সাধারণ কৃষক তাদের দুরভিসন্ধি না বুঝে অধিক আয়ের আশায় কৃষিক্ষেত্রে পরিবর্তন আনলেও দ্রুত কেটে যায় মোহ; এবং সঙ্গত কারণেই ঘুরে দাঁড়ায় বাংলার কৃষক সমাজ। এভাবেও বিক্ষুব্ধ কৃষকের সাথে বিরোধে জড়িয়ে যায় শাসকগোষ্ঠী। একসময় পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে বঙ্গদেশে বৃটিশ বিরোধী যত বিদ্রোহ-সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছে, প্রায় প্রতিটি বিদ্রোহের সাথে জড়িয়ে গেছে বঙ্গভূমির বৃহত্তর কৃষক সমাজ। আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাথমিক সূত্র যা-ই হোক, আন্দোলনের নেতৃত্বে যারা ছিলেন তারা যেমন আন্দোলনকে বেগবান করতে বঞ্চিত-বিপন্ন কৃষকের শরণাপন্ন হয়েছেন, বাংলার কৃষকও নিজেদের হতাশা এবং বঞ্চনার প্রতিশোধ নিতে শাসকবিরোধী সংগ্রামের পতাকাতলে সমবেত হয়েছে রাতারাতি।

১৭৫৭-তে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর ইংরেজ বিরোধী বড় বিদ্রোহটি সংঘটিত হয় ১৮৫৭-তে, যেটি ইতিহাসে ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ নামে খ্যাত। সিপাহি বিদ্রোহে সরাসরি শাসন ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্টরাই বিদ্রোহ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুঃশাসনের বিরুদ্ধে; কিন্তু এর আগে বাংলায় যে কটি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে সেগুলোর সাথে সরাসরি বাংলার সাধারণ মানুষের সম্পৃক্তি ছিলো। ‘পাগলপন্থী বিদ্রোহে’র স্বাতন্ত্র্য খুঁজতে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সংঘটিত ইংরেজ বিরোধী কয়েকটি বিদ্রোহের কথা স্মরণ করতে পারি। এক অর্থে মীর কাশিম, নন্দকুমার বা বাহাদুর শাহ জাফররা যে বিদ্রোহ করেছিলেন তাকে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বলা যায় না; বরং বলা যায়, ইংরেজদের মোড়লির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ সংঘটিত হয় ফকির ও সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে। ফকির বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন ফকির মজনু শাহ, মুসা শাহ আর সন্ন্যাস বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী প্রমুখ। ‘পলাশী যুদ্ধোত্তর আযাদী সংগ্রামের পাদপীঠ’ গ্রন্থের লেখক হায়দার আলী চৌধুরী অবশ্য ফকির মজনু শাহ’র নাম নিয়ে তুমুল বিতর্কের অবতারণা করেছেন তার গবেষণা গ্রন্থে। তিনি বলতে চেয়েছেন ফকির মজনু শাহ নামে কেউ ছিলেন না। ইংরেজ প্রশাসন ও ঐতিহাসিকরাই বিদ্রোহী-দস্যু হিসেবে জন্ম দিয়েছে ফকির মজনু শাহ’র নাম। ইংরেজ বিরোধী প্রথম এই বিপ্লবীর প্রকৃত নাম ‘নবাব নূরউদ্দীন বাকের মোহাম্মদ জঙ্গ বাহাদুর’। এখানে অবশ্য সে বিতর্কে অংশ গ্রহণের সুযোগ নেই। ইংরেজরা নিজেদের কূট কৌশল হিসেবে ইতিহাসের যত বিকৃতিই ঘটাতে চাক, তাদের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ যে প্রতিবাদী হয়েছিলো সে সত্যে সামান্য ব্যত্যয় নেই। ইংরেজ পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ন্যাস ও ফকির বিদ্রোহকে বিভিন্নভাবে খাটো করার প্রয়াশ থাকলেও বাংলার ইতিহাসে সন্ন্যাসী ও ফকিররা বিপ্লবী বীর। ইংরেজ ইতিহাসবিদ ডাব্লিউ. ডাব্লিউ হান্টারের মতে, মোগল সা¤্রাজ্যে কর্মরত সেনাবাহিনির বেকার সৈন্য এবং বাংলার ভূমিহীন কৃষকরাই ছিলো সন্ন্যাস বিদ্রোহের প্রধান নিয়ামক। এ বিদ্রোহ স্থায়ী হয়েছিলো দীর্ঘ সাইত্রিশ বছর(১৭৬৩ থেকে ১৮০০ পর্যন্ত)।
১৭৬৭-১৭৬৮ খৃস্টাব্দে পূর্ববঙ্গের কুমিল্লায় (তৎকালীন ত্রিপুরা) শমশের গাজীর নেতৃত্বে সংঘটিত হয় ‘শমশের গাজীর বিদ্রোহ’। প্রথমত শমশের গাজীর বিদ্রোহ জমিদারদের বিরুদ্ধে হলেও জমিদারদের স্বার্থ রক্ষায় এগিয়ে আসা ইংরেজদের বিরুদ্ধেও চলে যায় শেষ পর্যন্ত । ১৭৬৮-তে শমশের গাজীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি ঘটে।

১৭৬৮ থেকে ১৭৬৯ বঙ্গদেশের দ্বীপাঞ্চল সন্দ্বীপে সংঘটিত হয় বিদ্রোহ। সন্দ্বীপ বিদ্রোহ প্রথমত জমিদার গোকুল ঘোষালের বিরুদ্ধে সন্দ্বীপের নির্যাতিত কৃষকদের বিদ্রোহ হলেও জমিদারী হারা কতিপয় জমিদারের সর্বাত্মক সহযোগিতা যুক্ত হয়েছিলো সন্দ্বীপ বিদ্রোহে; গোকুল ঘোষালের নিজস্ব বাহিনি এবং পুলিশ বাহিনি বিদ্রোহ দমনে ব্যর্থ হলে ১৭৬৯-এ ইংরেজ বাহিনি সন্দ্বীপ উপস্থিত হয়ে বিদ্রোহ দমন করে; পাশাপাশি ইংরেজরা একজন ব্যাতীত সবার জমিদারী ফিরিয়ে দেয়। সন্দ্বীপ বিদ্রোহে কৃষকদের আপাত বিজয় হলেও পরবর্তীতে তারা আরো নতুন নতুন নির্যাতনের মুখোমুখি হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের চাকমা কৃষকরা ১৭৭৬-এ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ইংরেজ ইজারাদারদের বিরুদ্ধে। উল্লেখ্য, ১৭৬০-এ মীর কাসিম-এর নবাবী লাভের সুবাদে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানী পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজস্ব আদায়ের সুবিধা পায়। চাকমা বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন চাকমা রাজা শেরদৌলত খাঁ এবং তার সেনাপতি রামু খাঁ। বিদ্রোহের এক পর্যায়ে ইংরেজদের সাথে চুক্তি করেন চাকমা রাজা এবং বিদ্রোহ থেমে যায়। শেরদৌলত খাঁর মৃত্যুর পর তার ছেলে জানবক্স খাঁ তার স্থলাভিসিক্ত হন। চুক্তির পরও অত্যাচার-নির্যাতন না থামায় ১৭৮৩ খৃষ্টাব্দে চাকমারা আবার বিদ্রোহ করে। ইংরেজ আক্রমনের মুখে ১৭৮৫ তে জানবক্স খাঁ গভীর জঙ্গলে পালিয়ে গেলে বিদ্রোহ থেমে যায়।

১৭৮৩’র জানুয়ারিতে কৃষকনেতা নূরুল দীনের নেতৃত্বে রংপুরে শুরু হয় স্বল্পমেয়াদী রংপুর বিদ্রোহ। রংপুর ও দিনাজপুরের ইজারাদার পাঞ্জাবী দেবীসিং-এর অত্যাচারে অতীষ্ট রংপুরের সাধারণ কৃষকরা যখন অনন্যোপায় হয়ে খাজনা দিতে অস্বীকার করে তখনই এক কৃষক সমাবেশে নূরুল দীনকে নবাব ঘোষণা করা হয়। নূরুল দীন নবাব হয়েই অত্যাচারী দেবীসিংকে খাজনা দিতে অস্বীকার করেন এবং বিদ্রোহের ব্যয়ভার বহনের জন্য প্রত্যেক কৃষককে নির্ধারিত হারে কর প্রদানের অনুরোধ জানান। কৃষকদের এই বিদ্রোহ পলকে ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত এলাকায়। বিদ্রোহীদের হাতে জমিদার, জমিদার-কর্মচারী এবং বেশ ক’জন কর সংগ্রাহক নিহত হলে দেবীসিং ইংরেজ কালেক্টর গুডল্যাডের সাহায্য প্রার্থনা করেন। দেবীসিংয়ের ঘনিষ্ঠ কালেক্টর, বন্ধুকে রক্ষার জন্য সৈন্য প্রেরণ করেন এবং উত্তাল ডিমলা, ফতেপুর, কাজীরহাট এলাকার বিদ্রোহ দমন করেন। বিদ্রোহীরাও মোগলহাটের ইংরেজ ঘাঁটি আক্রমন করে; যে যুদ্ধে রংপুর বিদ্রোহের নায়ক নূরুল দীন মারাত্মক আহত অবস্থায় বন্দী হন এবং বন্দী অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেন। রংপুর বিদ্রোহেরও সমাপ্তি ঘটে। উল্লেখ্য হায়দার আলী চৌধুরীর ‘পলাশী যুদ্ধোত্তর আযাদী সংগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থের আলোচনা অনুযায়ী নূরল দীন এবং ‘নবাব নূরউদ্দীন বাকের মোহাম্মদ জঙ্গ বাহাদুর’কে একই ব্যক্তি বলে মনে হয়।
১৭৮৪ থেকে ১৭৯৬ সময়কালে খুলনা-যশোর-এ সংঘটিত হয় প্রজা বিদ্রোহ; যে প্রজা বিদ্রোহের নায়ক ছিলেন হীরা ডাকাত এবং জমিদার কালিশংকর রায়। ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানী দেওয়ানী লাভের পর থেকে গোটা বাংলায়, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ইংরেজদের অত্যাচার-লুণ্ঠন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যাতে বাংলার কৃষক সমাজ সর্বস্বান্ত-নিঃস্ব হয়ে পড়ে। অত্যাচার থেকে বাঁচতে কৃষকদের অনেকে গৃহছাড়া হয়ে পড়ে, কেউ কেউ পালিয়ে যায় সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে। একদিকে আত্মরক্ষা অন্যদিকে প্রতিশোধ গ্রহণ, গৃহত্যাগীদের অনেকেই দস্যুবৃত্তির সাথে জড়িয়ে যায় এবং সংগঠিত হয়ে তারা জমিদার, মহাজন এবং সরকারী সম্পদ লুণ্ঠন শুরু করে। সাধারণ কৃষকদের সমর্থনও পায় তারা। হীরা ডাকাতকে গ্রেফতার করা হলে শত শত কৃষক তাকে মুক্ত করতে জেলখানায় আক্রমন চালায়। ইংরেজদের করভারে জমিদারী হারা অনেক জমিদারই ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে বঙ্গ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ইংরেজদের কাছে বিমুখ অত্যাচারী জমিদাররা নিজেদের স্বার্থে দলে টেনেছে সাধারণ কৃষকদের। তেমনি একজন বিদ্রোহী জমিদার ছিলেন নড়াইলের কালিশংকর রায়। কালিশংকর বিশাল এক কৃষক বাহিনি নিয়ে ইংরেজদের বিপক্ষে বিদ্রোহ করে। কোম্পানীর চাল বোঝাই নৌকা লুঠ করে নেবার পর ইংরেজরা তাকেও ‘কালিশংকর ডাকাত’ বলে অভিহিত করে। ইংরেজ বাহিনি কালিশংকরের বাহিনির সাথে কিছুতেই পেরে উঠতে না পেরে কৌশল হিসেবে ১৭৮৬ খৃস্টাব্দে খুলনা ও যশোরকে দুটি স্বতন্ত্র জেলায় পরিণত করে। ১৭৯৬-এ কালিশংকর বন্দী হয় ইংরেজ বাহিনির হাতে। কালিশংকরের গ্রেফতার হবার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে খুলনা ও যশোর অঞ্চলের কৃষকরা বারুদের মতো জ্বলে ওঠে। এ সময়ে কৃষক বিদ্রোহ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে ইংরেজরা কালিশংকরকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় এবং কালিশংকরের সাথে মধ্যস্ততা করে খাজনা কমিয়ে আনে। কালিশংকরের সাথে মধ্যস্ততার পর বিদ্রোহও থেমে যায়।

১৭৮৮ থেকে ১৭৯২ খৃস্টাব্দে সংঘটিত হয় বাখরগঞ্জ বিদ্রোহ। বঙ্গদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা বাখরগঞ্জও ইংরেজ নিপীড়ন থেকে রেহাই পায়নি। ইংরেজদের দুর্বৃত্তায়নের ফলে ১৭৮৭ তে বাখরগঞ্জে দেখা দেয় বয়াবহ দুর্ভিক্ষ, প্রায় ষাট হাজার মানুষ খাদ্যাভাবে মারা যায়। এমন হাহাকারেও থামেনি ইংরেজদের অত্যাচার। সর্বস্বান্ত কৃষক তখন বাধ্য হয়েই বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। খুলনা-যশোরের মতো এখানকার কৃষকও সুন্দরবনের অরণ্যে আত্মগোপন করে এবং দস্যুবৃত্তি শুরু করে। কৃষক-ডাকাতরা প্রধানত জমিদার-মহাজন এবং ইংরেজ কালেক্টরের নৌকায় লুঠ করতে থাকে। নদীপ্রধান দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান যোগাযোগ-মাধ্যম নৌপথ প্রায় চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। কৃষক-ডাকাত দলের প্রধান নেতা মহম্মদ হায়াত ১৭৯০ সালে ইংরেজদের হাতে বন্দী হন। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের সুবান্দিয়া এলাকায় কৃষকনেতা ফকির বোলাকি শাহ ইংরেজ অত্যাচারে অতীষ্ট হয়ে গড়ে তোলেন এক সংঘবদ্ধ কৃষকদল। বোলাকি তার দল নিয়ে সুবান্দিয়ায় গড়ে তোলেন এক দূর্গ। দূর্গাভ্যন্তরে গড়ে তোলেন নিজস্ব অস্ত্র তৈরি কারখানা। নিজস্ব কামারশালায় তৈরি হয় তলোয়ার, বল্লম, ট্যাটার মতো হাতিয়ার। সংগৃহীত হয় বেশ কয়েকটি কামান, বন্দুক। প্রস্তুতি শেষে বোলাকি ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ইংরেজদের খাজনা দেয়া বন্ধ করে দেন। জমিদারদের বেশ ক’জন লাঠিয়াল-বরকন্দাজ ও গোমস্তাকে আটক করে বোলাকির লোকজন। বোলাকির দূর্গ থেকে একজন গোমস্তা পালিয়ে গিয়ে বোলাকির যুদ্ধপ্রস্তুতির সকল তথ্য জানিয়ে দেয় জমিদারকে। ১৭৯২-এ শুরু হয় বোলাকি বিরোধী জমিদার-ইংরেজ অভিযান। তুমুল যুদ্ধের এক পর্যায়ে বোলাকি বাহিনি পরাস্ত হয়। ফকির বোলাকি শাহ নিজে অবশ্য পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ১৭৯২-এ সুবান্দিয়া কৃষক দূর্গ পরাস্ত হলেও বাখরগঞ্জ বিদ্রোহ স্তব্ধ হয়ে যায়নি, বেশ কিছুদিন ধরে চলতে থাকে ইংরেজ বিরোধী খণ্ড খণ্ড প্রতিরোধ।

ইংরেজ বিরোধী আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহ সংঘটিত হয় মেদিনীপুর-বাকুড়া-মানভূম অঞ্চলে ১৭৯৮-১৭৯৯ খৃস্টাব্দে। ইতিহাসে যে বিদ্রোহের নাম ‘চোয়াড় বিদ্রোহ’। ‘চোয়াড়’ অন্তজ শ্রেণীর এক সম্প্রদায়ের নাম। জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে ছিলো এদের বাস। ইংরেজরা যার নাম দিয়েছিলো ‘জঙ্গলমহল’। একই এলাকায় থাকতো ‘পাইক’ নামের আরও একটি সম্প্রদায়। যারা মোগল আমলে পুলিশের ভূমিকায় কাজ করতো। তারা অবশ্য তাদের কাজের জন্য কোনো বেতন পেতো না, তবে মোগল স¤্রাটের কাছ থেকে পেতো নিষ্কর জমির বন্দোবস্ত। ইংরেজ শাসনামলে চোয়াড় এবং পাইকদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে নতুন বসতি পত্তন দেয়া হয়। ফলে চোয়াড় এবং পাইকরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ইংরেজরা এ অঞ্চলের কয়েকজন জমিদারকে উচ্ছেদ করে তাদের জমিদারীও উচ্চমূল্যে নতুন জমিদারের কছে বিক্রি করে দেয়; ফলে সেসব জমিদারদের কেউ কেউ বিদ্রোহী চোয়াড় এবং পাইকদের সাথে মিশে গিয়ে ইংরেজ বিরোধী লড়াইয়ে শামিল হয়। বিদ্রোহীরা এতটাই মরিয়া হয়ে ওঠে যে তাদের সামাল দেয়া ইংরেজদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। বিদ্রোহীদের হত্যা-লুণ্ঠন-অগ্নিসংযোগে নতুন পত্তনি পাওয়া অধিবাসী ও জমিদারদের জীবন অতীষ্ট হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ইংরেজরা শক্তিতে না পেরে কৌশল ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে চোয়াড় ও পাইকদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে এবং বিতাড়িত জমিদারদের কারো কারো জমিদারী ফিরিয়ে দিয়ে বিদ্রোহ দমন করে।

উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সংঘটিত ‘পাগলপন্থি বিদ্রোহে’র স্বাতন্ত্র্য বুঝে নিতে এতক্ষণ ধরে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে বাংলায় ইংরেজ বিরোধী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহের সামান্য উল্লেখ করা হলো। একথা স্বীকার করতেই হবে সংক্ষিপ্ত পরিসরে যে কোনো সংগ্রাম অথবা মানব গোষ্ঠীর ইতিহাস বর্ণনা করা সম্ভব নয়। প্রতিটি ক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে সহস্র অনুষঙ্গ যেগুলো সবসময় সাধারণ দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না। বঙ্গদেশের কৃষক ইংরেজ বিরোধী হবার আরও একটি বড় কারণ দুর্ভিক্ষ। কোম্পানী শাসনের গোড়া থেকেই বাংলার কৃষক নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকে, অভাব অনটন এবং ক্ষুধা তাদের নিত্য সঙ্গী হয়ে ওঠে; কিন্তু ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বঙ্গদেশের কৃষককে দিশেহারা করে তোলে।

ভারতের শস্যভা-ার বলে খ্যাত বঙ্গদেশে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের মতো দুর্ভিক্ষ যেমন যুক্তিগ্রাহ্য নয়, একইভাবে এটি ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর সত্য এবং কোম্পানী শাসনের কলঙ্কতিলক হিসেবে চিহ্নিত অধ্যায় বলেও স্বীকৃত। ১১৭৬ বঙ্গাব্দে (১৭৭০ খৃস্টাব্দ) এ বিপর্যয় হয়েছিলো বলে এটি ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে খ্যাত। যে বাংলার খাদ্যভা-ারের উপর ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল নির্ভরশীল ছিলো, সেই বাংলায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছিলো তা উপলব্ধি করতে তিনজন দায়িত্বশীল ইংরেজের তিনটি বক্তব্য উপস্থাপন করছি; প্রথমত ইতিহাসবিদ ডব্লিউ. ডব্লিউ. হান্টার; হান্টার সাহেব তার ‘এ্যানালস্ অব রুরাল বেঙ্গল’ গ্রন্থে লিখেন, ‘চাষী তার গরু-লাঙল-জোয়াল বিক্রি করলো, বীজধান খেয়ে ফেললো, অতঃপর নিজ সন্তানদের বিক্রি করলো। সবাই বেচতে চায়, ক্রেতার সংকট দেখা দিলো। কৃষক খাদ্যাভাবে গাছের পাতা-ঘাস খেতে থাকলো-মৃত মানুষের মাংশ ছিঁড়ে খেলো। ক্ষুধার্ত মানুষ গ্রাম ছেড়ে বড় বড় শহরে ছুটলো। শুরু হলো মারামারি।.. .. পথে পথে মৃতের সারি ক্রমশ পাহাড়ে পরিণত হলো। শেয়াল-কুকুরের মেলা বসলো। যারা বেঁচে থাকলো তাদের পক্ষে বেঁচে থাকা দুঃসাধ্য হয়ে পড়লো।’ মুর্শিদাবাদের রেসিডেন্ট বেচার তার অঞ্চলের চিত্র বর্ণনা করতে লিখেছেন, ‘প্রতিদিন শহরে পাঁচশ মানুষ মরছে, গ্রামবাংলার কথা বর্ণনাতীত। কে জীবিত কে মৃত তা গণনার লোকও নেই।’ মন্বন্তরপরবর্তী ভয়াবহতার চিত্র বর্ণনা করতে বীরভূম জেলার তৎকালীন সুপারভাইজার হিগিন্স লিখেছেন, ‘দুর্ভিক্ষের ধংসযজ্ঞ এতটাই ভয়াবহ, তা বর্ণনার অতীত। শত-সহস্র গ্রাম জনশূন্য, এমনকি শহর-নগরের তিন-চতুর্থাংশ বাড়িই শূন্য পড়ে আছে। বিস্তীর্ণ-উন্মুক্ত প্রান্তর পতীত পড়ে আছে, যেগুলো ক্রমশ চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।’ বাংলার এই মন্বন্তরের প্রধান কারণ যে ইংরেজদের দুঃশাসন সে কথা বলাই বাহুল্য। মন্বন্তরের প্রত্যক্ষদর্শী ইংরেজ লেখক ইয়াং হাসব্যান্ড লিখেছেন, ‘ইংরেজ বণিকদের মুনাফা লাভের পরবর্তী ধাপ ছিলো চাল কিনে গুদামজাত করে রাখা। তারা জানতো, জীবনধারণের অপরিহার্য এ দ্রব্যটির জন্য তারা যা মূল্য চাইবে, তাই পাবে। কৃষক তার পরিশ্রমের ফসল অন্যের গুদামে সঞ্চিত হতে দেখে হতোদ্যম হয়ে পড়ে। চাষাবাদে অনাগ্রহী হয়ে পড়েÑদেখা দেয় খাদ্যাভাব। দেশের সমস্ত খাদ্য ইংরেজ বণিকদের গুদামে। খাদ্য যত কমতে থাকলো দাম তত বাড়তে থাকলো। শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর হতদরিদ্র জীবনে এটি ছিলো দীর্ঘ দুর্যোগের প্রথম আঘাত–এটি ছিলো সূচনামাত্র।’ দিশেহারা মানুষের যখন ঘুরে দাঁড়াবার কোনো পথই থাকলো না, তখনই বাংলার মানুষ বিদ্রোহী হয়ে উঠলো। একের পর এক বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত হলো বিদ্রোহ, যে বিদ্রোহে অনিবার্যভাবেই যুক্ত হলো বাংলার বিপন্ন কৃষকসমাজ, যে কথা আগেই বলা হয়েছে । ময়মনসিংহ অঞ্চলের হাতিখেদা বিদ্রোহ, গারো বিদ্রোহ থেকে শুরু করে প্রতিটি বিদ্রোহের নেপথ্যেও আছে ইংরেজ এবং তাদের স্থানীয় সাঙ্গাতদের দুঃশাসন, অত্যাচার-অনাচার ও অবিচারের ঘটনা।

পাগলপন্থী বিদ্রোহের আলোচনায় যার নাম সবার আগে উচ্চারণ করতে হয় তিনি লেটিরকান্দার ‘টিপু পাগলা’। তার নেতৃত্বেই ইংরেজ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো শেরপুর ও নেত্রকোনা অঞ্চলের কৃষক। অবশ্য ‘পাগলপন্থী’ ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন তার পিতা। টিপু পাগলার পিতা করম শাহ ফকির (চাঁদ গাজী) ছিলেন সুফীসাধক এবং টিপুর দীক্ষাগুরু। করম শাহ্র পিতা শের আলী গাজী ছিলেন গড়জরিপা ও দশকাহনিয়ার (শেরপুর) জমিদার। তাঁর নামেই শেরপুর জেলার নামকরণ হয়। শের আলী তার জনৈক কানুনগোকে হত্যা করেন এবং তার পত্নী পদ্মগন্ধাকে হরণ করে বিয়ে করেন। একই অঞ্চলের নাগ বংশীয় জমিদার উক্ত হত্যাকা- নিয়ে চক্রান্ত করেন, যার ফলশ্রুতিতে বাংলার নবাব কর্তৃক শের আলী বহিষ্কৃত হন। জমিদারী বেহাত হয়ে যায়। হিন্দু জমিদারদের সম্মিলিত চক্রান্তে শের আলীর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। করম শাহ তার মাকে নিয়ে গারো পাহাড়ের পাদদেশে শালকোনা গ্রামে বসতি স্থাপন করেন এবং ধর্মীয় ছদ্মাবরণে আধ্যাত্মিক জীবন যাপন শুরু করেন। স্থানীয় আদিবাসী-হিন্দু-মুসলমান সবার মধ্যেই সাধক হিসেবে করম শাহ্র নাম ছড়িয়ে পড়ে। করম শাহ্র অনুসারীরাই ‘পাগলপন্থী’ নামে পরিচিতি পায়। পাগলপন্থীরা গৈরিক বস্ত্র পরিধান করতেন, তারা কখনো জুতা-ছাতা-পালকি ব্যবহার করতেন না, বাসগৃহের সীমানায় তার থুতু ফেলতেন না, তারা কখনো গোঁফ-দাড়িও রাখতেন না। করম শাহ্র দুই পুত্র, প্রথম পক্ষের ছপাতি শাহ্ মিয়া এবং দ্বিতীয় পক্ষের টিপু শাহ্ মিয়া। ছপাতি শাহ্ চাইতেন পূর্ব পুরুষের জমিদারী ফিরে পেতে আর টিপু শাহ্ পিতার আদর্শে আধ্যাত্মিক জীবন বেছে নেন। ১৮১৩ খৃস্টাব্দে করম শাহ্র মৃত্যুর পর শালকোনায় টিপু শাহ্র জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। একদিকে শেরপুরের জমিদারদের অত্যচার, অন্যদিকে ছপাতি শাহ্র উচ্চাভিলাষ। এক পর্যায়ে ছপাতি শাহ্র পুত্র খাইসা মিয়া শাহ্ টিপু শাহ্কে হত্যার চেষ্ট করে। টিপু তখন তার মা, যিনি ‘মা সাহেবা’ নামে খ্যাত ছিলেন এবং অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে প্রচারিত ছিলো, তাকে নিয়ে দুর্গাপুরে কংশ নদীর দক্ষিণে লেটিরকান্দা গ্রামে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। সুসঙ্গের জমিদারও মা সাহেবা ও টিপুর ভক্ত ছিলেন। ১৮২০ খৃস্টাব্দে শেরপুরের জমিদারী ভাগ-বাটোয়ারা হয়, জমিদাররা পরস্পরের বিরুদ্ধে মামলায় জড়িয়ে পড়েন। নিয়মিত খাজনা দিতে অক্ষম প্রজাদের উপর বর্তায় মামলার খরচও। প্রজারা তখন বিদ্রোহ করে। এ সময় শেরপুর, নেত্রকোনা, ঘোষগাঁও পাহাড় ঘেঁষা পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে গারো-হাজং-কোচ-ডালু-বানাই-হদিসহ অসংখ্য হিন্দু-মুসলমান রায়ত নিজেদের পাগলপন্থী টিপু পাগলার অনুসারী বলে মনে করতো। বিপন্ন প্রজারা টিপুর শরণাপন্ন হলে তিনি তাদের বিষয়টি জমিদারদের জানাবার পরামর্শ দেন। প্রজারা জমিদারের সাথে দেখা করলে সুরাহা তো কিছু হলোই না, উল্টে তাদের বন্দী করে বেত্রাঘাতে রক্তাক্ত করা হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে পাগলভক্ত বকসু, দীপবরণ সরকার, গুমান সরকার, আহমদ ম-ল, নহর উদ্দিন সরকার প্রমুখ নেত্রীস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ‘কুটুরাকান্দা’ গ্রামে এক সভায় মিলিত হয়। ১৮২৪-এর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত সে সভায় টিপু শাহ্ সহস্রাধিক ভক্তসহ যোগ দেন। বিশাল গণজমায়েতে প্রজারা টিপুকে শেরপুরের জমিদারীর ন্যায্য উত্তরাধিকার দাবী করে এবং তাকেই নিজেদের ‘স্বাধীন সুলতান’ ঘোষণা করে। ঘটনার আকস্মিকতায় টিপু হতবিহ্বল হয়ে যান, শেষ পর্যন্ত ভক্তদের আকাক্সক্ষা, সৃষ্ট পরিস্থিতি, শেরপুরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সাধারণের বন্ধু, আধ্যাত্মিক গুরু টিপু শাহ্ অকুতভয় সমাজবিপ্লবী হয়ে ওঠেন। সরকার ও জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পাগলপন্থীরা টিপুর নেতৃত্বে শেরপুর অঞ্চল দখল করে নেয়। পাগলপন্থীরা প্রাচীন গড়জরিপা দূর্গকেন্দ্রিক এক স্বশাসন ও বিচার ব্যবস্থা চালু করে। কালীগঞ্জ থেকে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয় উঠে যায়। ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানী সরকার বারবার টিপুকে গ্রেফতার করলেও প্রমাণের অভাবে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ১৮২৭ খৃস্টাব্দে শেষবারের মতো টিপুকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিচারের পর তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। টিপু শাহ গ্রেফতার হওয়ার পরও বিদ্রোহ থেমে যায়নি, বরং তার বিধাব মাতা ‘মা সাহেবা’র নেতৃত্বে বিদ্রোহ নতুন উদ্দীপনা পায়। ১৮৫২ খৃস্টাব্দে জেলখানাতে বন্দী অবস্থাতেই পাগলপন্থী বিদ্রোহের প্রথম সেনাপতি মৃত্যুবরণ করেন।

ইংরেজরা ধারণা করেছিলো টিপু শাহ্কে বন্দী করা গেলেই বিদ্রোহ থেমে যাবে, কিন্তু বাংলার অন্যান্য কৃষক বিদ্রোহের সাথে পাগলাপন্থী বিদ্রোহের পার্থক্য এখানেই, মূল নেতাকে থামিয়ে দেয়া গেলেও বিপ্লব থামানো যায়নি। প্রথমে মা-সাহেবার নেতৃত্বে, পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নজনের নেতৃত্বে বিদ্রোহ চলতে থাকে। ১৮৩২-১৮৩৩ খৃস্টাব্দে জানকু পাথর করইবাড়ি থেকে এবং দেবরাজ পাথর নালিতাবাড়ি পাহাড় থেকে দ্বিমুখি আক্রমন চালিয়ে শেরপুর জমিদার বাড়ি দখল করে নেয় এবং লুট করে নিয়ে যায় সব, শেরপুর থানায় তারা আগুন ধরিয়ে দেয়। অবস্থা বেগতিক দেখে ইংরেজ সরকার নির্বিচারে মানুষ মারতে থাকে, বিদ্রোহীদের ধরিয়ে দেবার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। বিদ্রোহীদের অনেকেই আত্মসমর্পন করে, জানকু পাথর এবং দেবরাজ পাথর পাহাড়ে আত্মগোপন করে। পাগলপন্থী বিদ্রোহ আপত থেমে গেলেও বৃহত্তর মযমনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে নানান নামে ইংরেজ বিরোধী বিদ্রোহ চলতেই থাকে এবং ১৮৫৭ খৃস্টাব্দের সিপাহী বিদ্রোহ পর্যন্ত সে সব বিদ্রোহ অব্যাহত থাকে।

পাগলপন্থী বিদ্রোহসহ বাংলার কোনো কৃষক বিদ্রোহই চূড়ান্ত ফললাভে সক্ষম না হলেও বাংলার মানুষের চেতনায় সাধারণ মানুষ সংগ্রামের যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে তা যুগ যুগ ধরে বাঙালিকে সাহসী জাতি হিসেবে বিশ্বে পরিচিত হতে প্রেরণা দিয়েছে। সেই চেতনার আলোতেই বাঙালি নিজেদের আলোকিত করে নিয়েছে এবং বিশ্বে নিজেদের সৌর্য-বীর্যের কথা অহংকারের সাথে উচ্চারণের স্পর্ধা দেখিয়েছে। নিজেদের অহংকার ও সম্ভ্রম খোঁজার স্বার্থেই আমাদের উচিৎ বাঙালির গৌরবগাথাগুলো সবিস্তার নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা।

সহায়ক গ্রন্থ ও প্রবন্ধ
ময়মনসিংহের ইতিহাস ও বিবরণ: কেদারনাথ মজুমদার
বাংলার সশস্ত্র কৃষক সংগ্রাম: জুলফিকার হায়দার
পলাশী যুদ্ধোত্তর আযাদী সংগ্রামের পাদপীঠ: হায়দার আলী চৌধুরী
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার কৃষক: বদরুদ্দীন উমর
ময়মনসিংহের সাহিত্য ও সংস্কৃতি: সম্পাদনা- শাকির উদ্দিন
ময়মনসিংহের চরিতাভিধান: দরজি আবদুল ওয়াহাব
ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্থাপনা: দরজি আবদুল ওয়াহাব
ময়মনসিংহ: জাফর আহমেদ চৌধুরী
ময়মনসিংহের বিপ্লবী ঐতিহ্য: রুহুল আমিন খান

Flag Counter


1 Response

  1. সৈয়দ আলি says:

    অত্যন্ত সংক্ষেপে অথচ গভীরতায় গিয়ে লিখা এক বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাস তুলে আনার জন্য লেখককে কৃতজ্ঞতা জানাই।

    রচনাটির একস্থানে লেখক উল্লেখ করেছেন, “প্রথমদিকে বাংলার সাধারণ কৃষক তাদের দুরভিসন্ধি না বুঝে অধিক আয়ের আশায় কৃষিক্ষেত্রে পরিবর্তন আনলেও দ্রুত কেটে যায় মোহ….” ঠিক যেন আধুনিককালের জিএম ফুড এর পুর্বানুসৃতি বলে আমার মনে হলো।

    লেখককে আবার ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.