ব্যক্তিত্ব, সাক্ষাৎকার, স্মরণ, স্মৃতি

ভাটির পুরুষকথা: প্রথম করিম পরশ

shakur_majid | 12 Sep , 2013  

শাহ করিমকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র ‘ভাটির পুরুষ’ বানিয়েছিলাম ২০০৯ সালে। ২০০৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ( শাহ করিমের দাফনের দিন ) পর্যন্ত আমি এবং আমার ক্যামেরা তাঁকে অনুসরণ করে। এ সময়ের মধ্যে প্রায় দশবার তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে। প্রথম সাক্ষাতের একটা অংশ এখানে।

সুনামগঞ্জের দিরাই থানার উজান ধল গ্রামে শাহ করিমের বাড়ির সামনেই একটা নদী আছে। কালনী নদী। এটা যে নদী তা শীতকালে টের পাওয়া যায়। এখন বর্ষাকাল। এই বর্ষায় নদী আর হাওড় আলাদা থাকে না। সামনে পানি আর পানি। কতগুলো গাছ গলা পর্যন্ত ডোবা। তার ডালের কিছু অংশ ভেসে আছে পানির উপর। বিকেলের আলোয় নীল আকাশে সাদা মেঘ। বিকেলের সূর্যটা হেলে পড়েছে প্রায় পশ্চিমের দিকে। আমি ক্যামেরা রেডি করে রাখি।
প্রথমেই- অনুরোধ করি একটা গান ধরতে। করিম সাহেব গান ধরেন, সঙ্গের সঙ্গীরা বাজনা বাজায়।
আমি কূলহারা কলংকিনী
আমারে কেউ ছুঁইয়ো না গো সজনী।

প্রেম করে প্রাণ বন্ধুর সনে
যে দু:খ পেয়েছি মনে
আমার কেঁদে যায় দিন রজনী ।
আমি কূলহারা কলংকিনী

আমি জিজ্ঞেস করি এটা কারে নিয়া লেখা?
করিম বলেন এটা আমার নিজেরে নিয়েই লিখেছি। আমি নিজরেউ কইছি কুলহারা কলংকিনী। কারণ, সমাজের চোখে আমি খারাপ কাজ করি। গান গাই। মুল্লারা আমারে গ্রাম তাকি বারখরি দেয়।

করিমের ছেলে বাবুল বসেছিলেন পাশে। তিনি বললেন, বাবার যখন ৩০-৩৫ বছর বয়স, তখন একবার ঈদের দিন জামাতের পর গ্রামের মুরব্বিরা সালিশ করে তাঁকে গ্রাম থেকে বের করে দেয়। তাঁকে বলা হয়, তুমি যদি গান না ছাড়ো, তবে এই গ্রাম ছাড়তে হবে। বাবা বললেন, আমি গান বাজনা ছাড়তে পারবো না, আমি এখন শিখছি মাত্র। আরো অনেক কিছু আমার শেখার বাকি। মনে মনে চিন্তা করলেন-গ্রামের মানুষের আপত্তি থাকলে পাশের গ্রাম ‘ভাঙাডর’এ চলে যাবেন। সে গ্রামটি হিন্দু অধ্যুষিত। সেখানে কেউ বাধা দিবে না। গ্রামের কিছু লোক বাবাকে খুব পছন্দও করতো, তাদের দু’একজন তার কাছে এসে বলে, মুখে বলে ফেলো যে গান করবো না, তাহলেই আর সমস্যা থাকবে না। বাবা এতে রাজি হন না। বলেন, যে কাজ আমি পরে করবোই, এখন কেমনে বলি যে করবো না। এটা সম্ভব না। হাউ কাউ শুরু হয়ে যায়। গ্রামের এক মরুব্বি এসে চিৎকার চেঁচামেচি থামান। ঈদের নামাজ হয়ে যায়। বাবা মুরব্বিদের বললেন, আমার সিদ্ধান্ত আপনাদের জানাবো। এই বলে বাড়ি এসে তাঁর দোতারাটি কাঁধে নিয়ে তিনি চলে যান। এটা নিয়ে বাবা একটা গানও লিখেছিলেন
মনের দুঃখ কার কাছে জানাই মনে ভাবি তাই
দুঃখে আমার জীবন গড়া তবু দুঃখরে ডরাই।

নুর জালালের খুব ভালো স্মৃতি শক্তি। করিম সাহেবের সবগুলো গানই তার মুখস্ত। কতগুলো গান তিনি লিখেছেন, ঠিক বলতে পারেন না। করিম সাহেব বলেন- ৩-৪শ’তো হবেই। বেশীও হতে পারে।

করিমপুত্র পাশে থেকে বলেন, বাবার গান হাজারের উপরই হবে। তবে ৪টা বই আছে, এই বইগুলোতে যত গান আছে তার সবগুলোই তার মুখস্ত।

করিমকে প্রশ্ন করি আপনি কবে থেকে গান গাওয়া শুরু করেন?

করিম বলেন, গান তো ছোটবেলা থেকেই গাই। আমার এক দাদা ছিলেন। বাবার চাচা, নসিবউল্লাহ নাম। আমাকে খুব আদর করতেন। আমি তাঁর কোলে বসে থাকতাম। তিনি গাইতেন – ভাবিয়া দেখো মনে, মাটির সারিন্দারে বাজায় কোন জনে। আমিও তাঁর সাথে সাথে গাইতাম। পরে তিনি একবার আমাদের আরেক আল্লাহওয়ালা লোকের কাছে নিয়ে যান। উনার নাম করম উদ্দিন। আমি তাঁকে ওস্তাদ মানি। তাঁর কাছ থেকে গান শিখি। গানে আমার রাগরাগিনী ভালো ছিলো। লোকজন আমারে ডাকতো গান শোনানোর জন্য। আমি গান করতাম।
করিম বলে যান, আমাদের এলাকাটা হিন্দু মুসলমানের দেশ ছিলো। মিলেমিশে থাকতাম। হিন্দুরা আমাদের বাড়িতে আসতো, আমরা তাদের পূজায় যেতাম। তাদের বাড়িতে কীর্তন হতো, আমরা কীর্তন করতাম। রেডিও টেলিভিশন তো ছিল না। সুতরাং তবলা হারমোনিয়াম নিয়ে গান করাই ছিলো মানুষের কাছে আমোদ ফুর্তির বিষয়। এখনতো আর সেই দিন নাই। এই সব নিয়া আমি একটা গানও বানাইছিলাম।
করিম তাঁর দল নিয়ে শুরু করেন,
গ্রামের নওজোয়ান, হিন্দু মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান, ঘাটু গান গাইতাম,
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।

‘কিন্তু আপনি তো নৌকা নিয়ে অনেক গান লিখেছেন।’
‘লেখছি। অনেক গানই লেখছি। যেমন,
কোন মেস্তুরী নাও বানাইলো কেমন দেখা যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায়।।

গান শেষ হলে বলেন, এই নৌকাটাকে আমি দেহের সাথে তুলনা করেছি। চন্দ্রসূর্য দুইটা আমাদের দেহে আছে। নায়ের আগায় মানে আমার শরীরের উপরের দিকে- আমাদের এই দুইটা চোখই সেই চন্দ্র আর সূর্য। আর গানটা খেন্না দৌড় (নৌকা বাইচ) এর গান। গানের মধ্যে খেন্না দৌড়ের একটা চিত্র আছে। মদন মাঝি যেমন আমি নিজে, আর আমার নৌকাটা আমার শরীর। মদন মাঝি ভুল করলে নৌকা ডুবে যায়, আমিও ভুল পথে চললে আমার পতন ঘটাবে, এই সবই বলেছি আমার গানে।
‘আপনার গান গাড়ি চলে না…. একটা ব্যান্ডের দল গেয়েছে, শুনেছেন? দলের নাম দলছুট।’
‘আমার বাড়িত রেডিও টেলিভিশন নাই। আমার দেখার সুযোগ নাই। মাইনষে কয় অমুক তমুক আমার গান গাইছে, এইটা শুনি।’
‘টেলিভিশন দেখছইন নি?’
‘দেখছি দু’ একদিন, বাজারে ঘাটে। আপনার বাড়িত হয়তো গেলাম, ঘরে টেলিভিশন দেখলাম। এ রকম দুই চার দিন দেখেছি। আমি গরিব মানুষ। আমার রেডিও নাই, টেলিভিশন নাই।’
‘আপনি কতগুলো পুরস্কার পাইছইন ?’
‘অনেকজন অনেক জায়গা থেকে দিয়েছে, তারা আমার গান ভালা পাইছে এজন্য দিয়েছে। কয়জন যে দিয়েছে এর কোনো হিসাব কিতাব আমি রাখিনি।’
‘আপনি তো একুশে পদক পাইছইন? ইটা জানইননি?’
‘ইকটার কথা মনো আছে। ঢাকাতে গিয়েছি, আমার গান দেখে, বুঝে তারা আমাকে এই পুরস্কার দিয়েছে। বড় অনুষ্ঠান ছিলো সেটা। হাজার হাজার মানুষ। অনেক গইন্য মাইন্যরাও ছিলো। হাসিনা-খালিদাও ছিলো (আসলে পুরস্কার দিয়েছিলেন তদানিন্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, ২০০১ সালে। স্মৃতি ভ্রমের কারনে শেখ হাসিনার নামও নিয়েছেন ভুল করে) ।
‘পুরস্কারটি আপনাকে কে দিয়েছিল, জানেন?’
‘এখন আর এইটা মনে নাই।’
‘আপনার জীবনে সবচেয়ে বড় পুরস্কার কোনটি মনে করইন?’
‘মানুষের ভালোবাসা পাইছি, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওনা। টাকা পয়সাকে আমি বড় একটা কিছু মনে করি না। মানুষ যে আমাকে ভালোবাসে, এটাই বড়। আমার শিক্ষা নাই, দিক্ষা নাই, তারপরও মানুষ আমাকে ভালোবাসে। এইটাই বড় পাওনা।’
‘কিন্তু আপনার স্ত্রীর নাকি জানাজা হয়নি- কথাটা সত্য?’
নুর জালাল বলেন, ‘এইটা হাছা নায়। উল্টা পাল্টা কিছু অইছে সইত্য, পরে সমস্যা অইছে না। মাইনষে কইন ইবাড়িত নমাজ রোজা অয়না, অতা, হতা। এক সময় বাবায় কইছেন যে আমি নিজেই জনজা পড়াইলিমু। বাদে গাউর মাইনষে মিলিয়া জনজা পড়াইছইন। ঘটনা ছিলো অন্য একজন নিয়ে। বাবার এক শিষ্য ছিলো। নাম আকবর। তার বাড়ি ছিলো পাগলার ইসলামপুরে। এক সময় তার সব জমি জমা বিক্রি করে বাবার কাছে এসে পড়ে, বাবাকে গুরু মানে এবং এখানে থাকা শুরু করে। সে বাবার কাছে থাকতো। একবার অসুস্থ হয়ে মারা গেলো। তাকে জানাযা পড়ানোর জন্য মৌলানা পাওয়া গেলো না। গ্রামের লোকেরা বললো, সে করিমকে মুর্শিদ মানে, আল্লা মানে না। তার জানাযা হবে না। তারপর বাবা গেলেন মসজিদের ইমাম সাহেবের সাথে কথা বলতে। বাবা বললেন, মসজিদের খেদমতের জন্য, আপনার বেতনের জন্য বার্ষিক যে টাকা পয়সা উঠানো হয়, তার ভাগ তো আমরা দেই, আকবরও দিয়েছে। তাহলে তার জানাযা পড়াবেন না কেন? ইমাম সাহেব তাতেও রাজি হন না। কিছু লোক বাবার পক্ষও নিয়েছেন গ্রামে। এ সময় বাবা দেখলেন যে, এটা নিয়ে ফ্যাসাদ করলে গ্রামে দুইটা ভাগ হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং মওলানাকে বাদ দিয়ে বাবা নিজেই আকবরের লাশের জানাযা পড়ালেন এবং তাকে নিজেই দাফন করলেন আমাদের বাড়ির কাছের এক গোরস্থানে।’
করিম সাহেবকে নিয়ে আমার অনেক কৌতুহল। আমি জানি, প্রকৃত বাউল যারা, তারা প্রথাগত কোনো ধর্মকর্ম করেন না এবং প্রাতিষ্ঠানিক কোনো উপাসনালয়েও তারা যান না। করিম এ বিষয়ে কী ভাবেন ? আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি– ধর্ম নিয়ে চিন্তা করইন?
‘করি।’
‘আপনি কোন ধর্মে বিশ্বাস করেন?’
‘আমি সকল ধর্মে বিশ্বাস করি।’
‘মৃত্যুর পর নিয়ে আপনার বিশ্বাস কিতা?’
‘মৃত্যুর পর নিয়ে আমি চিন্তা করি না। মরি গেলে – মাটি মাটির সাথে মিশে যাইবো, বাতাস বাতাসোর লগে, পানি পানির সাথে, আগুন আগুনের সাথে, রুহ রুহের লগৈ, এই পাঁচটা জিনিস পাঁচ জায়গায় যাইবোগি।’

প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য অন্য প্রশ্ন করি। দিরাই বাজারে শুনে এসেছিলাম যে, তাঁকে গ্রামের লোকজন পীর সাহেব বলে ডাকে। এর মানে কি?
‘আপনাকে গ্রামের মানুষ কি নামে ডাকে?’
পেছন থেকে নৌকার মাঝি বলে উঠেন, ‘আমরা মিয়াসাব ডাকি।’
‘আপনাকে কেনো মিয়াসাব ডাকেন?’
‘সেটা আমি বলতে পারবো না। এটা তাদের ভাবের ব্যাপার।’
নৌকায় বসা কিশোর ফয়সালকে জিগ্যেস করি। তার উত্তরও এলোমেলো। বলে- ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি, গ্রামের বড়রাও তাকে পীর সাহেব ডাকেন, আমরাও ডাকি।
করিম সাহেবের এখন বয়স হয়েছে অনেক। প্রায় ৮৭ বছর। এখন আর স্টেজে গিয়ে গান করতে পারেন না। তার পুত্র নূর জালাল বিএ পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে, তাকেও কেনো চাকরিতে দেননি, বাবা চোখের আড়াল করতে চান না বলে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তেমন জমিজিরাতও নাই। তাহলে চলে কী করে করিমের?

করিম বলেন-ভক্ত কুলের দয়া দাক্ষিণ্যের উপর চলি। প্রতিদিনই বাড়িতে কোনো না কোন দর্শনার্থী আসেনই, কখনো ২-৪ জন, কখনো ১০-১৫ জনের দল। এরা এসে যাবার সময় দুইচাইর পাঁচশ টাকা দিয়ে যায়। মানুষজন কি কারণে আমারে অত ভালা পায় আমি জানি না। কেউ পীরছাব ডাকে, কেউ মিয়া ছাব। কেউ কেউ বিমারি লইয়াও বাড়িত আয়, কয় মিয়াছাব আপনে আতাইয়া দিলে বিমারি ভালা অইবো। এইসব আর কি!

কথা বলতে বলতে দিনের শেষ সূর্য পশ্চিমের গাছ-গাছালির পেছনে প্রায় আড়াল হয়ে যায়। আমি করিমকে বলি মুর্শিদ নিয়ে আপনার অনেক গান আছে। একটা শুনবো এখন।
কিন্তু গান শুনতে আমাদের কিঞ্চিত দেরী হয়।
নৌকা ভাসতে ভাসতে হঠাৎ একটা কংক্রিটের ছাদের কাছে এসে গেছে।
karim.gif
নূরজালাল জানান, এটা হচ্ছে হিন্দু দেবী সোমেশ্বরীর মন্দির। প্রতি বছর এই মন্দিরে পূজা হয় এবং এই পূজা উপলক্ষে একটা মেলা হয়। ধলের মেলা বলে এটাকে। এই মন্দিরটা দোতালা। বন্যার পানিতে পুরা দুই তালা ঘরটি ডুবে আছে। শুধু তার ছাদটুকু ভেসে আছে।

আমি করিম সাহেবকে তাঁর দল নিয়ে ঐ ছাদে গিয়ে বসতে বলি। ছাদটা আক্ষরিক অর্থেই একটা দ্বীপ। আমি ইঞ্জিনের ট্রলার ছেড়ে একটা ছোট ডিঙি নৌকায় ভর করি ক্যামেরা নিয়ে। মাঝিকে নির্দেশ দেয়া আছে, সে একই গতিতে নৌকা বেয়ে যাবে। এটাই আমার ট্র্যাক শট। স্থির শট যেহেতু নেয়া কঠিন, কারণ নৌকা নড়বেই, সুতরাং আমি বেশির ভাগই চলাচলের মধ্যে থাকতে চাইলাম। করিম গান ধরলেন,

মুর্শিদ ধন হে, কেমনে চিনিব তোমারে

তন্ত্রমন্ত্র করে দেখি তার ভিতরে তুমি নাই
শাস্ত্রগ্রন্থ পড়ি যত আরো দূরে সরে যাই
কোন সাগরে খেলছো গো লাই
থাকো কিসের অন্তরে
কেমনে চিনিব তোমারে
মুর্শিদ ধন হে, কেমনে চিনিব তোমারে

গানটির যে জায়গায় আছে- পাগল আবদুল করিম বলে দয়া করো আমারে, নত শিরে করজোড়ে ডাকি তোমার দরবারে এ সময় করিম মাথা নোয়ালেন। তাঁর দীর্ঘ শরীর থেকে সামনের দিকে হেলে পড়া মাথার পেছনে আকাশে কালো মেঘের উপর সূর্যের কিরণ পড়া দ্যুতিতে যে সিলুয়েট তৈরি করলো, আমার ক্যামেরা তা ধরার জন্য অস্থির হয়ে যায়।
গায়ক দলকে বলি, গানটাতো খুবই সুন্দর, আমি আরেকবার শুনবো। এটা আসলে আমার কারিগরী কৌশল। ফিক্সড শটে ভালো অডিওতে পুরো গানটা আমার নেয়া হয়ে গেছে। এবার ইনসার্ট শটের জন্য আমার দরকার আলাদা আলাদা শিল্পীর মুখ, যন্ত্রপাতি এবং তাদের চমৎকার কিছু জেশ্চারের ছবি।

করিমের এ গানটি শোনার পর আমি ধাঁধায় পড়ে যাই। করিম আল্লাহ-রসুল মানেন না বলে যারা এই কথা কয়, তাদেরকে গিয়ে এই গান শুনাতে আমার ইচ্ছা করে। কিন্তু করিমকে বুঝে ওঠার অনেক বাকি আমার।

আমি ছোট নৌকাটির গলুইয়ের উপর করিমকে বসাই। এবার আমি, করিম আর একজন ছোট মাঝি। সে আস্তে আস্তে বৈঠা ঠেলে। আমি নৌকাকে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে যেতে বলি। করিম পশ্চিমে মুখ দিয়েছেন। সূর্য ডুবে যাবার পরও যে কিঞ্চিৎ আলো পৃথিবীতে থাকে, সেই নরম আলোয় আমার ক্যামেরা বন্দি করে করিমকে।
জিজ্ঞেস করি, দিনের এই অস্তমিত সূর্যের দিকে চেয়ে আপনার কোন গানটির কথা মনে পড়ে।

করিম বলেন, দিন গত হইছে, এইভাবে একদিন মাইনষের জীবনটাও গত হবে। আমারও সময় হয়ে গেছে। পীর কও, ওলী কও, চোর কও, ডাকাইত কও, কেউইতো আর চিরদিন থাকবো না। আমার চেয়ে বয়সে ছোট যারা ছিলো তারাও গেছে, আমারও যাইতে অইবো। মানবদেহকে গাড়ির সাথে তুলনা করে আমি একটা গান লিখেছি, গাড়ি চলে না, চলে না, চলে না রে, গাড়ি চলে না। আমার ইঞ্জিনে এখন অনেক ময়লা জমে গেছে, কী করবো, আসা-যাওয়া সার হয়েছে নিয়তির বিধানে, ওরে জন্ম জরা যম যাতনা, সবই তার কারণে।

‘বন্ধুর বাড়িটা আসলে কোন বাড়ি?’
‘ভালো পথে যাইতে চাইছিলাম, এটা আর কি। কোরানের একটা আয়াত আছে – কুল্লু নাফছি জায়জাতুল মউত’ অর্থাৎ সবাইকেই মরণের স্বাদ নিতে হবে। এটা থেকে কারোই রেহাই নাই।
করিম সাহেবকে বলি, আপনার এই গানটি গেয়েছেন সঞ্জীব চৌধুরীও বাপ্পা মজুমদার বিটিভিতে ইত্যাদি অনুষ্ঠানে, আপনি কি জানেন?
‘না’
‘সঞ্জীব চৌধুরীকে চেনেন?’
‘না ’
‘সিলেট অঞ্চলের আরেক বিখ্যাত বাউল আছেন, কারী আমির উদ্দিন, উনাকে আপনার কি মনে হয়?’
‘ও এক বছর আছিল আমার ইকানো। তারপর যে গেলো, আর কুনোদিন আইলো না। এক সময় আমারে গুরু মানতো, এখন মানে কি না, জানি না। আরেকজন আছে কালা মিয়া। শুনছি আমার গান গায়, কিন্তু আমার লগে দেখা হয় না। মনোভাব নাই।’
‘আপনার প্রিয় শিষ্য কে?’
‘আছে অনেকেই। তবে রুহী, রণেশ এই দুই ভাইই বেশী।’
‘আপনার বাড়িত নয়া এক মুরিদ দেখলাম, সিরাজুন্নেছা- ’
‘আমি শুনছি আইছে। গানটান কেমন গায় জানি না। তবে আমি রাখতাম নায়।’

সূর্য ডুবেছে খানিক আগে। সূর্য ডোবার পারও বেশ কিছু আলো ছিলো। এখন তাও নাই। যে আলো আছে, তা দিয়ে কথা বলা যায়, ক্যামেরায় রেকর্ড করা যায় না। আমার ক্যামেরা যতটুকু আলো ‘গেইন’ করতে পারে তার সর্বোচ্চটুকু দিয়েও কাজ হবে না।
আমরা তাঁর বাড়িতে গিয়ে হাজির হই।

সন্ধ্যার পর ঘোর অন্ধকারে চেয়ে বসে উজানধল গ্রাম। বিদ্যুত নাই এ গ্রামে। পাশের গ্রামে আছে। দু’একটা বাতি দেখা যায়।
আমাদের ফেরার কথা দিরাই। ঘাটে আমাদের নৌকা বাধা। কিন্তু আমরা ফিরি না। দেখি করিম সাহেবের বাড়ির উঠানে পাটি বিছানো হয়েছে। দুইটা হারিকেন রাখা হয়েছে মাঝখানে। এক পাশে বসে গান করছেন রণেশ ঠাকুর।

রনেশ ঠাকুর, রুহী ঠাকুর দুই ভাই। তারা ব্রাহ্মণও। কিন্তু তাদের প্রায় পুরোটা জীবনই কাটিয়ে দিয়েছেন তাদের এই প্রতিবেশী করিমের সাথে। রুহী ঠাকুর এখন বাসা ভাড়া করে থাকেন সিলেটে। রনেশ গ্রামেই থাকেন।
রনেশ ঠাকুর বলেন, গত ২০ বছর ধরে ওস্তাদের গান গাই। আমার কাছে ওস্তাদ করিম ছাড়া আর কাউকে বাউল বলে মনে হয় না। আমার যতদিন জীবন আছে, আমি এই শিল্পীর গানই গাবো।

আমরা সিলেট ফেরার কথা ভুলে যাই। উঠানে বসে পড়ি ক্যামেরা নিয়ে। আলোর জন্য। হারিকেনই ভরসা। আমার একটা ছোট ব্যাটারি সানগান আছে ব্যাগের মধ্যে। এই ব্যাটারি সানগান দিয়ে কোনো মতে বসে পড়ি।
হঠাৎ এসে হাজির হন, সেই তরুণী। দুপুরবেলা রান্নাঘরে দেখেছিলাম। নাম বললেন, সিরাজুন্নেছা। তার চেহারাটি অতিরিক্ত ফর্সা। চোখগুলো বাদামী। বৃটিশ বৃটিশ লাগে। মহিলার সাথে যতক্ষণ কথা বলি, তাকে অপ্রকৃতস্থ মনে হলো। তাকে বলি, ‘আপনার নাম ?’
‘জ্বী হয়, আমার নাম সিরাজুন্নেছা ।’
‘ আপনি কিতা করইন ?’
‘ জ্বী হয়, আমি বাউলা গান করি।’ [তিনি কথায় কথায়, ‘জ্বী হয়’, ‘জ্বী হয়’ বলছেন]
‘ আপনি এখানে কিতা লাগি আইছইন?’
‘জ্বী হয়, আমি ওস্তাদ করিমের কাছ থেকে তালিম নিবার জন্য এসেছি।’
‘তালিম নিলে কিতা অইবো?’
‘জ্বী হয়, তালিম নিলে আমার ক্যাসেট বাহির হইবো আর আমি গান গাইতে লন্ডন যাইতে পারবো।’
‘করিম সাহেবকে কী মনে হয় ?’
‘জ্বী হয়, তিনি বড় বাউল এবং পীর সাহেব।’
‘ আপনি আমাকে একটা গান গেয়ে শোনাবেন?’
‘জ্বী হয়।’
সিরাজুন্নেছা গায়,
কেনে পিরীতি বাড়াইলেরে বন্ধু ছাইড়া যাইবায় যদি
আমি কেমনে রাখিব তোর মন আমার আপন ঘরে বাঁধিরে বন্ধু,
ছাইড়া যাইবায় যদি
……
পাগল আবদুল করিম বলে, হলো এ কী ব্যধি?
তুমি বিনে এ ভূবনে কে আছে ঔষধিরে বন্ধু
ছাইড়া যাইবায় যদি

সিরাজুন্নেছার গান শেষ হলে আমরা আসরে বসে পড়ি। একের পর এক গান গাইতে থাকেন রনেশ ঠাকুর।
আসা যাওয়া সার হয়েছে নিয়তির বিধানে:

জন্মজরা যম যাতনা সব তোমার অধীনেরে ও প্রাণ নাথ তুমি বিনে
করিম সাহেব বোধ হয় খানিকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন নৌকার মধ্যে এতো গান গেয়ে। তিনি চলে গেলেন ঘরের ভেতর।
কিন্তু প্রথম গানটি শেষ হবার আগেই দেখি এসে পড়লেন আসরে।
উঠানের উপর বড় কয়েকটা চাটাই বিছানো হয়েছে। আশপাশের বাড়ি থেকেও এসেছেন কয়েকজন। লুঙ্গি পরা, বেশির ভাগেরই খালি গা। গ্রামের লোকজন গানের তালে হাত তালি দেয়, মাথা নাড়ে। যারা এখানে এসে বসেছে তারা মাঝি, কৃষক শ্রেনীর- চেহারা এবং কাপড় চোপড়ে স্পস্ট।
এরপর শুনি
রঙের দুনিয়া তোরে চাইনা
দিবা নিশি ভাবি যাবে, তারে যদি পাইনা
প্রাণ বন্ধুর সঙ্গঁ নিলাম, ভালোবেসে মন দিলাম
পূর্বে যাহা ভেবেছিলাম এখন ভাবি তাই না
রঙের দুনিয়া তোরে চাই না
তারপর শুনি সেই বিখ্যাত গন
কোন মেস্তরি নাও বানাইছে কেমন দেখা যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূর পঙ্খী নায়

এই আসরের সবচেয়ে ছোট সঙ্গীর নাম ফয়সল। করিম সাহেবের চাচাতো নাতি। বসয় ১২-১৩। ক্লাস থ্রীতে পড়ে। গানের গলাও ভালো। বড় হয়ে সে বড় শিল্পী হতে চায়। সে বলে-আমি নানার মতো হতে চাই। আমাদের একটা গান গেয়ে শোনায়। গানের প্রথম লাইন, আমি আর কত থাকিব গো, বন্ধু হারা হইয়া।

রণেশ ঠাকুর তাকে গান শেখান। রণেশ ঠাকুরের সাথে গলা মিলিয়ে সেও গায়। রণেশ ঠাকুর বলেন, আমি করিম সাহেব ছাড়া আর কারো গান গাইনা। গানের মধ্যে যেখানে আছে, বাউল করিম বলে সেখানে তিনি গান ওস্তাদ করিম বলে। রণেশ ঠাকুর করিমের গান নিয়ে বিদেশও গিয়েছেন। লন্ডন গিয়েছেন কয়েকবার। লন্ডন ছাড়াও কার্ডিফ, বামিংহাম. ম্যানচেষ্টার, এসব শহরেও তার গানের শো হয়েছে। ভারতের শিলচরেও বেশ কয়েকবার গান গেয়েছেন। তার বাকী জীবনটাও করিম সাহেবের সান্নিধ্যেই কাটিয়ে দিতে চান।
গানের আসর চলছে। রাত সাড়ে ৮টা বাজলে আমাদের ইঞ্জিন নৌকার মাঝি এসে বলে, এর বেশি রাত হলে তার অসুবিধা আছে। রাতে প্রায়ই ডাকাতি হয় নৌকায়। অন্ধকার রাত। দিরাই পৌঁছাতে তার অনেক সময় লাগবে। সুতরাং আমাদের উঠতে হয়।
বাউল করিমের জলসা রেখেই আমরা ছুটলাম দিরাই হয়ে সিলেটের পথে।

Flag Counter


3 Responses

  1. Sanjib Kumar Chowdhury says:

    খুবই ভালো লিখছেন শাকুর মজিদ ভাই। আপনি আমাদের অনেক অজানা তথ্য জানালেন। হৃদয় ছুয়ে যাওয়া লেখার জন্য অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।
    ভবিষ্যতে আপনার কাছ থেকে আরও অনেক কিছু জানার প্রত্যাশায় রইলাম।

  2. nurunnabi shanto says:

    ফরিদারা এই লেখাটা পড়লে অনেক উপকৃত হইতেন

  3. nurunnabi shanto says:

    হানাফি, মোহাম্মদী উভয়ই মুসিলম। ব্রাহ্মন, ক্ষত্রীয় উভয়ই হিন্দু। ক্যাথলিক, প্রো্টেস্ট্যান্ট সবাই খৃষ্টান। কিন্তু লালন শাহ বাউল, করিম শাহ নন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.