লেখক-প্রকাশক সম্পর্ক : বাংলাদেশি চেহারা

সৈকত হাবিব | ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ৮:২০ অপরাহ্ন

শুরু করা যাক ভিক্টর উগোর সেই হ্রস্বতম চিঠিটির উদাহরণ দিয়ে। তিনি তার প্রকাশককে লিখলেন, ‘?’। মানে ‘আমার বই কেমন চলছে?’ উত্তরে রসিক প্রকাশকও দিলেন সংক্ষিপ্ততম সাড়া ‘!’। মানে ‘দারুণ বিক্রি হচ্ছে!’ এ থেকে মনে হতেই পারে লেখক-প্রকাশকের হয়তো এ রকম রসেরই সম্পর্ক।
এবার দেখা যাক বাংলাদেশের অবস্থা। লেখকের প্রশ্নবোধক চিহ্নের জবাবে প্রকাশক হয়তো ‘!’ চিহ্নটাই দেবেন। কিন্তু অর্থ হবে একেবারেই বিপরীত– ‘ভাইরে অবস্থা খুব খারাপ। আপনার বই এক্কেবারে ফ্লপ!’

কথা কটি যে এমনই হবে তা নয়। সিনিয়র লেখকদের ক্ষেত্রে হয়তো আরেকটু বিনীত বাক্য উচ্চারিত হবে, ‘আশা করেছিলাম আপনার বইটা আরও বেশি বিক্রি হবে। কিন্তু ফলাফল খুব খারাপ।’

কথাগুলো যে সবই মিথ্যা, তা নয়। এসবের মধ্যে সত্যমিথ্যা এত জড়াজড়ি করে থাকে যে, আসল যে কোনটা তা নিয়ে ধন্দ থেকেই যায়।
এবার আসি বাংলাদেশের বইবাজার প্রসঙ্গে। পাঠ্যবই-নোটগাইডকে এ লেখা থেকে আগেই নির্বাসনে দিচ্ছি। এখানে কথা হবে শুধু সৃষ্টিশীল বইপত্তর নিয়ে।
যেখানে উগোর প্রকাশক উনিশ শতকেই বই বিক্রিকে ‘দারুণ!’ বলতে পেরেছিলেন, সেখানে এই একুশ শতকেও আমাদের দেশের প্রকাশকরা, কিছু ব্যতিক্রম বাদে, ‘নিদারুণ!’ কথাটাই বেশি বলেন। কেন এই অবস্থা? যে দেশের জনগণ ষোল কোটি, সেখানে অনেক খ্যাতিমান লেখকও আছেন, যার বই এক বছরে তিনশ কপিও বিক্রি হয় না। যদি সত্যিই তা হয়, তাহলে এই অক্ষমতা কার– লেখকের না প্রকাশকের?

লেখকের কাজ লেখা। প্রকাশকের কাজ বই প্রকাশ ও বিপণন করা। অনেক সময় লেখকরাও প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করেন। নিজেরাই বিপণন করেন। বলা ভালো, বাংলাদেশের প্রকাশনার ইতিহাসে অনেক লেখকই ছিলেন সফল প্রকাশক। সেই আদি যুগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন অত্যন্ত সফল প্রকাশক। অন্যদিকে বাংলাদেশেও কবি জসীমউদ্দীন নিজেই ছিলেন প্রকাশক, যার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তার উত্তরাধিকারীরা। কিন্তু এটি এখন ব্যতিক্রমের তালিকায়ই পড়ে। কেননা, কেবল বাংলাদেশ-ভারতে নয়, এমনকি বিলেতেও বাংলা প্রকাশনা এখন একটি ব্যবসা হিসেবে নিজের জায়গা করে নিতে চাইছে। অনেক পেশাদার মানুষ যেমন এ পেশায় এসেছেন, আবার অনেকেই একে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। এ খাতের অর্থনীতিও নেহায়েত ছোট নয়। তথ্য বলছে, শুধু একুশে বইমেলাতেই ২০১২ প্রায় ২৫ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। এ ব্যবসায় কেবল প্রবীণরাই সফল নন, অনেক তরুণ-নবীন উদ্যোক্তাও বেশ সাফল্যের পরিচয় দিচ্ছেন। তবু কেন এ দুরবস্থা, একটু তলিয়ে দেখার ব্যাপার আছে।

বাংলাদেশে এমন অনেক কবি-লেখক-অনুবাদক আছেন, যার বই যথেষ্ট বিক্রি হওয়ার পরও প্রকাশক টাকা দিতে চান না, আবার অনেক লেখক আছেন যাদের বই পর্যাপ্ত বিক্রি না হলেও পয়সাকড়ি ভালোই পান। কারণটা কী? এখানে সম্ভবত নামধাম-ক্ষমতার ব্যাপারটিই মুখ্য। পাঠক না থাকলেও যদি লেখকের মিডিয়ামূল্য ও অন্যান্য ক্ষমতার ব্যাপার থাকে, তাহলে প্রকাশকের মুনাফা হয়তো বহুমাত্রিক, যা শুধু বই বিক্রির মুনাফার চেয়ে বেশি। তাই যেসব লেখক-অনুবাদক সফল ও বিক্রয়যোগ্য বই করার পরও টাকা পান না, সেই ভাগটা চলে যায় অন্যদের পকেটে। আবার এমন বহু লেখক আছেন, যারা এসব অর্থের ধার ধারেন না। পরন্তু বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য প্রচার বাবদ অনেক বেশি খরচ করেন। আর প্রতি বছর তো এমন বহু দেশি-প্রবাসী নানা ধরনের লেখকের দেখা মেলে, যারা নিজেদের অর্থ দিয়ে প্রকাশকের নামে বই প্রকাশ করেন।

তারপরও কেন প্রকাশকরা এত নাই নাই করেন? এর বড় কারণ সম্ভবত বিপণন। যে কোনো পণ্যই যত পরিমাণে বিক্রয় হবে, উৎপাদকের মুনাফা তত বাড়বে। আর বইও এক ধরনের বিশেষায়িত পণ্য। অতএব, বিক্রির সঙ্গেই এর বাণিজ্যযোগ। কিন্তু সাধারণ চোখেই দেখা যায়, বাংলাদেশে বই বিক্রির যে হার তাতে মুনাফা ব্যাপারটা খুব সহজ নয়। ব্যতিক্রম যা আছে, তা পুরো বাণিজ্যের হিসেবে নেহায়েতই কম। ধরা যাক, বর্তমানে বাংলাদেশে যে হারে বইয়ের দাম নির্ধারিত হয় (সাধারণত প্রতি ফর্মা ২৫ টাকা হারে), তাতে ৩০০ কপি বিক্রি হলেও কেবল প্রকাশনার খরচ ওঠে আসে। কিন্তু এ তো একটা বিনিয়োগ, যার নেপথ্যে মুনাফা প্রধান অনুষঙ্গ। অথচ বাস্তবতা হল, অনেক ক্ষেত্রে একজন প্রকাশকের এক বছরে অনেক বই-ই এ সংখ্যক বিক্রি হয় না।
অবস্থাটা এমন যে, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লেখক সৈয়দ শামসুল হক এক আলোচনায় জানালেন, তার নতুন বইয়ের ক্ষেত্রে অন্তত ৩০৭ জন নির্দিষ্ট পাঠক আছেন। অর্থাৎ তিনি নিশ্চিতভাবে এই পাঠকের কথা জানেন। এর বাইরে নিশ্চয়ই তার অনেক পাঠক আছেন। কিন্তু সংখ্যাটা যে ষোল কোটি মানুষের দেশে হতাশাজনক, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাহলে অন্যদের অবস্থা কী? প্রকাশকদের মতে, নিদেনপক্ষে বছরে ৫০০ কপি বই বিক্রি না হলে তাদের দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা হয় না। আর এটা অতি অল্প লেখকের ভাগ্যেই জোটে। তাই বলে কি পাঁচশ’-হাজার কপি বই বিক্রি হয় না? নিশ্চয়ই হয়। কিন্তু প্রকাশকদের মতে, বছরে তারা এক-একজন যদি ৩০-৫০টা বই প্রকাশ করেন আর তার মধ্যে যদি মাত্র ৫-১০টা উল্লিখিত পরিমাণ বিক্রি হয়, তাহলে তার চলে কী করে? কথাটার মধ্যে ন্যায্যতা আছে। কারণ দিনকে দিন যে হারে কাগজ-ছাপা-বাঁধাই ও আনুষঙ্গিক ব্যয় বাড়ছে, তাতে করে চিত্রটা সুখকর নয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যা, লেখক ও প্রকাশকের দিক থেকে চিত্রটা বেদনার।

একজন প্রকাশকের জন্য সবচেয়ে বড় পুঁজি কী? নিঃসন্দেহে লেখক। কারণ লেখক না থাকলে প্রকাশকের অস্তিত্ব থাকে না। কিন্তু সেই প্রকাশকের সঙ্গে লেখকের সম্পর্কটা বাংলাদেশে কী– অম্ল ও মধুর। তবে মধুর চেয়ে অম্লই সেখানে বেশি। মজা করে বললে, বাংলাদেশে লেখক-প্রকাশকের সম্পর্কটা অনেকটাই টম অ্যান্ড জেরির গেম। কারণ প্রকাশকের অভিযোগ লেখকের বই বিক্রি হয় না, আর লেখকের অভিযোগ প্রকাশক তার রয়্যালটি দেন না। এটা বাংলাদেশে বহু বছর ধরে প্রচলিত সবচে কমন অভিযোগ। বরং বলা ভালো, বাংলাদেশের প্রকাশনার জন্ম থেকেই এটি চলে আসছে। তবে এর বাইরে সৌভাগ্যবান লেখক কি নেই? তাদের সংখ্যা হাতে গোনা। এদের মধ্যে সৌভাগ্যের বরপুত্র হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বাংলাদেশের বই বিপণনের ক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর ইতিহাস। তার পরই তার ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল। এর বাইরেও বেশ কজন লেখক আছেন, যাদের আবার উঠতি-পড়তি আছে। এদের মধ্যে আছেন ইমদাদুল হক মিলনসহ কয়েকজন। তবে শুধু লেখাকেই পেশা হিসেবে নিয়েছেন এবং কেবল বই বিক্রির রয়্যালটি দিয়ে জীবন পার করেছেন, এ রকম লেখক কি বাংলাদেশে কেউ কখনও ছিলেন? জানা নেই। কারণ আমাদের জানা লেখকদের সবাই পাশাপাশি অন্য কোনো কাজ করেছেন– অধ্যাপনা, সাংবাদিকতা, নাটক-রচনা, ব্যবসা ইত্যাদি ইত্যাদি।

বাংলাদেশে এত পেশা আছে, অথচ ‘লেখক’ অর্থে বাস্তবেই কোনো পেশা নেই। কারণ কেবল লিখে জীবন চালানোর কোনো উপায় নেই, যদি না কোনো বিকল্প আয়ের সংস্থান থাকে। এটা কি মর্মান্তিক নয়? এর দায়টা কি কেবল লেখকের? এই যে বাংলাদেশে এত শত প্রকাশক তারা কি এত বছর বাণিজ্য করে কোনো একজনকে কেবল স্বাধীন লেখকের জীবনযাপনের সুযোগ করে দিতে পেরেছেন? দু-একজন যারা ব্যতিক্রম তারা নিজের যোগ্যতায় টিকে আছেন, এর জন্য কৃতিত্ব প্রকাশকদের দাবি না করাই ভালো। অবশ্য যারা (সামান্য ব্যতিক্রম বাদে) একজন সম্পাদকই পুষতে পারেন না, তাদের পক্ষে লেখক পোষা তো হাতি পোষারই সমান। এক্ষেত্রে তাদের সঙ্গত যুক্তিও আছে, যথেষ্ট পরিমাণ বই বিক্রি না হলে তারা তো আর ঘর থেকে এনে টাকা দিতে পারবেন না। তবে এসবের পরও বাস্তবতা হচ্ছে, বই বিক্রি করেই অনেক প্রকাশক বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছেন। তাদের তুলনায় অধিকাংশ লেখকই যে তিমিরে ছিলেন, সে তিমিরেই আছেন।

প্রকাশকরা যে বই বিক্রি হয় না বলে সব সময়ই শোরগোল তোলেন, আসলেই কি তাই? তাহলে তারা বছরে হাজার হাজার বই প্রকাশ করেন কীভাবে? আবার উল্টো করে বললে, বই বিক্রি করার জন্য তারা কী করেন? পাঠক যে কম, তা তো সত্য। কিন্তু এ কমের কম পাঠকরাও যখন বই কিনতে চান, তারা এত হতাশ হন কেন? বইয়ের মান, সম্পাদনার মান নিয়ে তারা এত ব্যথিত কেন? বা তাদের কাছে বই পৌঁছানোর মতো কার্যকর কী ধরনের উদ্যোগ আছে তাদের? অন্যদিকে প্রকাশক হয়তো একটি লেখা লিখে দিতে পারেন না, কিন্তু নির্ভুল ও মানসম্পন্ন বই প্রকাশ তো তার পেশাগত ধর্ম। এটা কজন ঠিকভাবে পালন করেন?

সন্দেহ নাই, যে দেশের মানুষ ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছেন, তাদের বাস্তবিকই নিজ ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্য প্রেম বেশ কম। নইলে গ্রাম-মহল্লায়ও এত ইংরেজিমাধ্যম স্কুলের রমরমা হতো না। এত আত্মত্যাগের পরও নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি এত অবমাননা বোধহয় কম জাতিরই আছে। আমরা ইংরেজি জানা বা শিক্ষার বিরোধিতা করছি না। কিন্তু এটা যখন নিজের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিকেই ভুলিয়ে দেয় তখন হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। আমরা চিরকালই কেরানির জাত, নিজের ঠাকুর ছেড়ে বিদেশের কুকুরকেই ভক্তি করতে অভ্যস্ত। কিন্তু এ উপনিবেশি মানসিকতা আর কত? আমাদের এত ইংরেজিপ্রীতি, অথচ খোদ ইংরেজিভাষীরাই এখন নিজেদের ভাষার পর সবচে গুরুত্ব দিয়ে চীনা ভাষা শিখছে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থে। কিন্তু বাংলা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হওয়ার পরও আমাদের নিজের দেশেই মূল্য পাচ্ছে না। এই আত্মপ্রতারণা থেকে যে কবে আমরা মুক্তি পাব তা কে জানে? এসব বলেই তো আর পার পাওয়া যাবে না। এর জন্য তো কিছু উদ্যোগও নিতে হবে। আর বাংলা ভাষা-সাহিত্য নিয়ে ব্যবসাটা যেহেতু প্রকাশকদের এ ব্যাপারে তাদেরই তো উদ্যোগী হতে হবে। দেখা যায়, তারা এক একুশে বইমেলার তৈরি বাজার পেয়েছেন, এটা নিয়েই সারাক্ষণ মেতে থাকেন। এর বাইরে মানুষকে বইমুখী ও সাহিত্যপ্রেমী করতে তেমন কোনো উদ্যোগই নেই। আবার আমাদের মিডিয়াগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। তারা বই, লেখক ও প্রকাশকদের ক্ষেত্রে বইমেলার সময়েই সবচে সরব থাকেন, আর সারা বছর বোধকরি নাকে শর্ষের তেল দিয়ে ঘুমান। যেন দেশের মানুষের বই পড়ার কোনো দরকার নেই কিংবা বছরের এক মাস তাদের বই কিনলেই চলে যায়। অথচ বইয়ের সংস্কৃতি বিস্তারে মিডিয়ার যে কী ভূমিকা সেটি ও-বাংলার আনন্দবাজার গোষ্ঠীর তৎপরতা দেখলেই টের পাওয়া যায়।

কথা হচ্ছিল লেখক-পাঠকের সম্পর্ক নিয়ে। মাঝখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই অনেক কথা এলো। আবার মূলে ফেরা যাক। লেখক তার সৃষ্টির আনন্দে লেখেন (যদিও অনেক বণিক, ঠগ, প্রতারক, প্রচারলিপ্সুরও ‘লেখক’ হবার বাসনা থাকে)। আর এজন্য কেবল লেখালেখি করতে গিয়েই প্রায় না-খেয়ে, বিনা চিকিৎসায়, হতাশায় মরে গেছেন জীবনানন্দ দাশের মতো কবি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো লেখক, শিব্রাম চক্রবর্তীর মতো সুরসিক, সুপ্রকাশ রায়ের মতো পরিশ্রমী গবেষক, শামসুদ্দিন আবুল কালাম ও কায়েস আহমেদের মতো প্রতিভা। অথচ তাদের বই আজও প্রকাশ করে চলেছেন প্রকাশকরা। দু-চার পয়সা ব্যবসা তাদেরই হচ্ছে। এখন আর তেমন রয়ালটিও দিতে হচ্ছে না। এভাবে দেশ-বিদেশের বহু লেখকের বই তারা প্রকাশ করছেন, যাদেরও আর রয়ালটি দেবার প্রয়োজন হচ্ছে না। এক্ষেত্রে ব্যবসাও ভালোই হচ্ছে। খুব ছোট্ট উদাহরণ দিয়েও যদি বলি রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, তারাশংকর, দীনবন্ধু মিত্র, মীর মশাররফ হোসেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মোতাহের হোসেন চৌধুরীর বই এখন রয়্যালটির ঊর্ধ্বে। অনেকেই প্রকাশ করছেন এবং বিনা প্রচার ও বিজ্ঞাপনেই ভালো ব্যবসা করছেন। তবু যেসব লেখক এখনও সৃষ্টির তাড়না নিয়ে লিখছেন অথচ তার প্রাপ্য রয়্যালটিটুকু পাচ্ছেন না, তাদের প্রতি কি প্রকাশকরা যথেষ্ট অবিচার করছেন না? একটু আগে উল্লিখিত লেখকদের বই তো হাজার হাজার কপি বিক্রি হলেও তাদের রয়্যালটি দিতে হচ্ছে না। বাংলাদেশে এমন অনেক প্রকাশক আছেন যারা এমনকি হাসান আজিজুল হকের মতো বরেণ্য লেখকের রয়্যালটি দূরে থাক বই প্রকাশের পর তার সঙ্গে যোগাযোগও করেন না। হতে পারে যে, হাসান আজিজুল হকের বই হাজার হাজার কপি বিক্রি হয় না। কিন্তু তাই বলে কি তিনি সামান্য রয়্যালটিও পেতে পারেন না? (তবে এমন গুটিকয় প্রকাশক আছেন যারা পাই পাই হিসাব করে রয়্যালটি লেখককে পৌঁছে দেন, এমনকি অগ্রিমও দিয়ে দেন। তবে তাদের সংখ্যা প্রকৃত অর্থেই কোটিকে গুটিক।) আবার এমন প্রকাশকও আছেন যারা রয়্যালটি দূর অস্ত, এমনকি লেখকদের ফোন ধরার মতো ভব্যতাটুকুও দেখান না। এসবের মধ্য দিয়ে তারা ইঁদুর-বেড়াল খেলা করেন, যা লেখক-প্রকাশকের মধ্যে তৈরি করে অবিশ্বাস-সন্দেহ-শ্রদ্ধাহীনতা।

তাই বলে লেখকরাও যে নির্ভেজাল ভালো মানুষ, তা নয়। এমন অনেক লেখক আছেন যারা বাস্তবতা বিবর্জিত, নিজের সম্পর্কে অতি উচ্চ ধারণায় আক্রান্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে বিরক্তিকর। তারা মনে করেন, তাদের বই প্রচুর বিক্রি হয়, আর প্রকাশক কেবলই তাদের ঠকিয়ে বেড়াচ্ছেন। বাস্তব হয়তো উল্টোটাই (কারণ লেখকের নিঃস্ব হওয়ার মতো এ দেশে অনেক সৎ প্রকাশকেরও নিঃস্ব হবার ইতিহাস আছে। তবে লেখকদের মতো এটা কখনও মহিমান্বিতভাবে প্রচার হয় না)। তবে এসবের মূলেও আছে প্রকাশকের আচরণ। প্রকাশক যদি স্বচ্ছ হন, নিয়মতান্ত্রিক হন, তাহলে দূরত্ব আসলেই কমে যায়। কিন্তু তারা অধিকাংশ সময়ই তৈরি করে রাখেন এক ধূম্রজাল, যা পরস্পরের দিকে সন্দেহের তীর ছুড়তে থাকে। আবার বাংলাদেশের প্রকাশকদের মূল প্রবণতা হল বাজারি লেখকদের পেছনে দৌড়ানো। এবং তাদেরকে অতিমাত্রায় ব্যবহার করে ছিবড়ে করে ছাড়া। তারা প্রতিদিন সোনার ডিম পাওয়ার চাইতে মুরগিকে একেবারে জবাই করে তাল তাল সোনা পেতে চান। অথচ ধীরে ধীরে লেখক তৈরি করা এবং তাকে দিয়ে উন্নত সাহিত্য রচনা করিয়ে দীর্ঘস্থায়ী মুনাফার পথ তৈরি করাও যে তাদের কাজ, এটা তারা বেমালুম ভুলে যান। এজন্যই হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর অনেকের মাথায় হাত পড়েছে। আর এ মুহূর্তে যদি মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতো লেখক লেখা বন্ধ করে দেন, তাহলে অনেকের অবস্থাও হবে তথৈবচ। কারণ এর বাইরে তারা নিজেরা চেষ্টাচরিত্র করে যেসব জনপ্রিয় লেখক প্রমোট করেছেন, তাদের অধিকাংশের লেখাই তৃতীয় শ্রেণীর। আর পাঠকরাও তাদের একঘেয়ে লেখা পড়ে পড়ে ক্লান্ত হয়ে অন্যমুখী বা পাঠবিমুখ। অথচ তারা যদি সততার সঙ্গে ভালো লেখকদের সম্মান করতেন, ভালো লেখা আদায় করে নিতে পারতেন, তাহলে লেখক-প্রকাশক উভয়ের পাশাপাশি পাঠকরাও ভালো সাহিত্যের স্বাদ পেতেন। তারা কি দেখেন না স্রেফ আনন্দ পাবলিশার্সের ব্যবসা চাঙ্গা রাখার জন্য আনন্দবাজার গোষ্ঠী কত ধরনের লেখকদের দেশ-আনন্দবাজারে মোটা বেতনের চাকরি দিয়ে পুষছে? অথচ আমাদের দেশে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও শহীদুল জহিরের মতো লেখককে খুব কম প্রকাশকই মূল্য দিতে পেরেছেন। আর আজ তারা মৃত্যুর পর যেন পাঠকের কাছে ধীরে ধীরে অতি জীবিত হয়ে উঠছেন। কারণ, পাঠক তাদের খুঁড়ে খুঁড়ে বের করছেন।

কেবল টাকার জন্যই একজন লেখক লেখেন না বা এ দেশে এখন পর্যন্ত এমন কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু তার পরিশ্রমের তো একটা মূল্য আছে। তাছাড়া রয়্যালটি বা সম্মানী একজন লেখকের প্রণোদনা হিসেবেও কাজ করে (কারণ পঙক্তিতে পঙক্তিতে সোনার মোহরের প্রতিশ্র“তির কারণেই তো লেখা হয়েছিল শাহনামার মতো অমর কাব্য)। তাছাড়া এটা একজন লেখকের পাওনাও। এক্ষেত্রে স্বচ্ছ থাকা প্রকাশকদেরই দায়।

লেখককে ঠকালে যে তারও ঠকে যান এটুকু বোঝার মতো স্বশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত কবে হবেন আমাদের প্রকাশকরা?

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (12) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dr. Binoy Barman — সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৩ @ ১১:৪২ অপরাহ্ন

      লিখনি ও প্রকাশনাশিল্প প্রসঙ্গে “দারুণ” এবং “নিদারুণ”-এর বৈপরীত্যটা করুণভাবে বোধগম্য হলো সৈকত হাবিবের আলোচনা থেকে। তিনি নিজে একজন লেখক এবং প্রকাশক। কাজেই লেখাতে তার বাস্তবজ্ঞানের প্রতিফলন ঘটেছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন muhib — সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৩ @ ১১:২৪ পূর্বাহ্ন

      ঢাকায় বই কিনতে হলে এখনও নীলখেত যেতে হয় বা ফেব্রুয়ারীর জন্য অপেক্ষা করতে হয় তা খুব দুঃখজনক ব্যাপার।
      লেখায় মুগ্ধ এবং বিষয়ে একমত।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মনজুর — সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৩ @ ১২:২৯ অপরাহ্ন

      কবি প্রকাশক জনাব সৈকত হাবিব যতটুকুন বলেছেন বাস্তবতা আসলে তাই। সেটা কবি/লেখক প্রকাশক প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই। তাই আমাকে নতুন করে কিছু না বললেও চলবে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mahbubul Alam Kabir — সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৩ @ ৪:০০ অপরাহ্ন

      কথা সত্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Zubair Chowdhury — সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৩ @ ৪:৪১ অপরাহ্ন

      অসাধারণ একটি লেখা পড়লাম। লেখার শুরুটা ছিল দারুণ। সৈকত ভাই, আপনার এরকম লেখা আরও পড়তে চাই। আপনার এ লেখায় লেখক-প্রকাশকের সম্পর্কের রসায়ন খুঁজে পেলাম। ধন্যবাদ, বিডিনিউজকে আপনার অসাধারণ এ লেখাটি প্রকাশ করবার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Manik Mohammad Razzak — সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৩ @ ১০:৩৮ পূর্বাহ্ন

      খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের উপর আলোকপাত করতে গিয়ে কবি সৈকত হাবিব একেবারে গবেষকের মতো যা উপস্থাপন করেছেন তাতে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নাই। এ নিয়ে এখন গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। ভাবতে অবাক লাগে এদেশে এখনো চার শতের উপর প্রকাশনা সংস্থা বহাল তবিয়তে টিকে আছে। কিন্তু একজন লেখনও নেই যিনি শুধু কলম পিষে জীবন নির্বাহ করছেন। এ অবস্থায় তাইরে নাইরে প্রক্রিয়ায় যে প্রকাশনা শিল্প টিকে আছে সে শিল্প যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংহত হতে না পারে তাহলে অচিরেই যে এর বিনাশ অনিবার্য তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। দেশের স্বার্থে, প্রকাশকের স্বার্থে এবং এ ক্ষেত্রটিকে বাণিজ্য সফল ক্ষেত্র হিসেবে বিকাশ লাভের প্রয়োজনে এখনই কার্যকর উপায় খুঁজে বের করা আবশ্যক বলে মনে করি। সৈকত হাবিব আপনি আরও ভাবুন, আপনার ভাবনা থেকেই হয়তো একটি যৌক্তিক পথের সন্ধান মিলতে পারে। আপনাকে অনেক অনেক অভিনন্দন।

      মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাফিরূল — সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৩ @ ৩:৪৮ অপরাহ্ন

      আমার ধারণা এই ব্যাপারে প্রথমে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে বই বাজারজাত করার জন্য। হাবিব ভাইকে অনেক ধন্যবাদ অসাধারণ একটা লেখার জন্য ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Fakrul Chowdhury — সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৩ @ ৪:০০ অপরাহ্ন

      প্রথমেই প্রাসঙ্গিক লেখাটির জন্য কবি সৈকত হাবিবকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

      দেশের ছোট-মাঝারি-বড় সব ধরনের প্রকাশনী থেকে বই বের করার সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য আমার হয়েছে। তাই প্রকাশকদের হাড়ে হাড়ে আমি চিনি। এবং হাটে হাড়ি ভাঙার মতো তথ্যও আমার কাছে রয়েছে। ভুক্তভোগী হিসেবে বলছি, দেশে ভাল ও পেশাদারী প্রকাশকের তীব্র সংকট দেখেছি।

      একটি উদাহরণ দিচ্ছি। মাঝারি এক প্রকাশনী থেকে আমার একটি বই বের হয়েছিল। ওই প্রকাশক আমাকে সম্মান দিয়েছিল, কিন্তু অর্থকড়ি দেয়নি। পরে দেশের প্রথম সারির একটি প্রকাশনী থেকে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করি। সেটা ২০১১ সালের বইমেলা। এরমধ্যে কেটে গেল বেশ সময়। কিছুদিন আগে ওই প্রকাশনীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমি তাদেরকে বইয়ের রয়াল্টি ও চুক্তি করার কথা বলি। একাধিকবার যোগাযোগ করি কিন্তু কোনো উত্তর পাইনি। অথচ ওই প্রকাশক মিডিয়ায় লেখকদের অধিকার ও প্রকাশনা সম্পর্কে চিত্তাকর্ষক বক্তব্য দিয়ে থাকেন। সরকারের ক্ষমতার কাছাকাছিও তার ঘুরাফিরা রয়েছে। অনুসন্ধান করে জানলাম, আমি কোন ছাড়, সিনিয়র লেখকদেরও উনি সম্মানী দিতে কার্পণ্য করেন। ব্যাপারটি এখন এরকম দাঁড়ালো- আগে মাঝারি প্রকাশক সম্মান দিত কিন্তু অর্থকড়ি দিত না; আর এখন বড় প্রকাশক সম্মান ও অর্থকড়ি কিছুই দিচ্ছে না।

      আমরা লেখকরা যাব কোথায়?
      আমরা কি বাতাস খেয়ে বাঁচব?

      ফকরুল চৌধুরী
      ৯/০৯/২০১৩

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হাশিম মিলন — সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৩ @ ৫:০২ অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ সৈকত হাবিব ভাই। লেখকদের মনোবেদনার পাশাপাশি প্রকাশকদের কষ্ট যেভাবে তুলে এনেছেন তাতে বিষয়টা খানিকটা হলেও উভয়পক্ষের কাছে বেশ খোলসা হলো বলেই মনে হলো। বেশ অ্যানালিটিক্যাল লেখা। ধন্যবাদ আবারো…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রানা আব্বাস — সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৩ @ ৭:২৬ অপরাহ্ন

      সৈকত হাবিবের যুক্তি অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। ভালো লিখেছেন। শিল্পমান ধরে রেখে লেখক ও প্রকাশক উভয়কেই পেশাদারিত্ব বজায় রাখা উচিত।
      রানা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন saikat habib — সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৩ @ ১:১৫ পূর্বাহ্ন

      এত সব মন্তব্য ও মূল্যায়নে আমি খুবই অভিভূত। সত্যি কথা বলতে, বহুকাল ধরে যা দেখছি ও শুনছি, তারই আলোকে এই লেখাটি লিখেছি। অনেকে ফোনেও এ ব্যাপারে কথা বলেছেন, মূল্যবান মতামত দিয়েছেন।
      আমি সবার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। আপনাদের সাড়া পেলে ভবিষ্যতেও আরো কিছু লিখব বলে আশা করি। সবার জন্য কল্যাণ প্রার্থনা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শাহ জালাল — ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৬ @ ১০:৪৫ অপরাহ্ন

      অনেক নবীন লেখক
      হতাশ হয়ে অ-কালে
      ঝরে পড়ছে

      প্রকাশকদের অবহেলার কারণে

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com