সভা, স্মৃতি

নরম্যান মেইলার, শেষবার

আনোয়ার শাহাদাত | 13 Dec , 2007  

Norman-Mailer-in-January-of-2007
নরম্যান মেইলার, জানুয়ারি ২০০৭

গত জানুয়ারি কি ফেব্রুয়ারিতে জানতে পারি গুন্টার গ্রাস ও নরম্যান মেইলারকে এক মঞ্চে বসানো হবে, একই বিষয়ে বলার জন্য। আয়োজক নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরী। অনুষ্ঠানের নাম ‘বিশ শতক বিচারের কাঠগড়ায়’ (The 20th Century on Trial)। অতএব প্রায় ছয় মাস আগে আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করি, সাহিত্যিকদের ওই ‘বিচার’ কার্য দেখবার জন্যে। আটলান্টিকের এপারের ও ওপারের দুই মহা শক্তিধর লেখক একটি শতককে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন, তাও আবার বিশ শতকের মত একটি শতক! জুনের শেষ অবধি অপেক্ষা চলতে থাকে আমার।

জুনের সামারে নিউইয়র্কের নিয়মিত বিকেলগুলি যেমন হয় সেদিনও তেমনি ছিল। সারাদিনের লম্বা গরমসহ রোদের পর স্কাই-স্ক্র্যাপারের ছায়ায় ম্যানহাটানের বিকেল। সন্ধ্যা সাতটার অনুষ্ঠান। প্রায় ছ’টায় গিয়েও লাইনের প্রথম ভাগ নিশ্চিত করা যায়নি। মধ্যভাগ নিশ্চিত হয়েছিল, আর আসন প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও তাই, হল ঘরের মাঝামাঝি। সন্দেহ থাকে না উপস্থিত দর্শকদের অধিকাংশই নিউইয়র্ক-কেন্দ্রিক লেখক ও অন্যান্য ঘরানার শিল্প-সংস্কৃতির লোকজন। সাতটার মধ্যে আসনগুলো ভরে যায়।

কয়েক মিনিট পর অনুষ্ঠান পরিচালক ঘোষণা দেন ঐতিহাসিক লেখক একত্রিকরণের। মঞ্চের মাইকে তিনি আসেন না। বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলবার মাইক থেকে অনুষ্ঠান পরিচালক ঘোষণা দেন। এর পর সেই মাইকে এসে যোগ দেন ওই দিনের অনুষ্ঠান উপস্থাপক ও সঞ্চালক স্কটিশ ঔপন্যাসিক ও লন্ডন রিভিউ পত্রিকার প্রদায়ক-সম্পাদক অ্যান্ড্রু ও’হ্যায়গান। তিনি নাতিদীর্ঘ ভূমিকা রাখলেন দূরের ওই মাইক থেকে। উপস্থাপক অ্যান্ড্রুর ভূমিকার পর মিনিটের মধ্যেই দেখা যায় গুন্টার গ্রাসকে। বয়সের ভারে খানিকটা নুয়ে পড়া, ধীরে নিজেই হেঁটে আসছেন মঞ্চের দিকে। তার সঙ্গে যোগ দেন অ্যান্ড্রু ও’হ্যায়গান ও গুন্টার গ্রাসের জন্য নিয়োজিত দোভাষি মহিলা। অ্যান্ড্রু ও দোভাষী মহিলা নিজেদের মাইক ঠিক করে নেন, এরপর গুন্টারের দোভাষী মহিলা তাকে মাইক ঠিক করতে সহযোগিতা করলেন।

গুন্টারের উপস্থিতিতে হলভর্তি মানুষের আগ্রহ প্রকাশের সীমা থাকে না। প্রায় সবার হাতের সেল-ফোন বা মিনি-ডিজিটাল ক্যামেরা ছবি তুলতে থাকে। আমার বাম পাশে এক শেতাঙ্গ মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কেন ছবি তুলছ না?’ যদি লাগে ভাল ছবি যে আমি ওয়েব থেকে নিয়ে নেবো তা ওকে জানালাম। তিনি বললেন, ‘তারপরও নিজের হাতে তোলা ছবি।’

সেটাও যে খুবই খাঁটি কথা, বলা হলো। বোঝা যায়, মঞ্চে ক’মুহূর্তের যে নিরবতা আসে যখন দর্শক হিসেবে আর কোনো কিছু করবার থাকে না তখন সেই সময়টুকু তিনি আমার সঙ্গে কথা বলে কাজে লাগাতে চান। অনেকটা গায়ে পড়েই আবারও তিনি প্রসঙ্গ বাড়ালেন, আমি ভারতীয় কিনা বা ডাক্তার কিনা। মনে হলো তিনি কী, সেটা হয়তো আমাকে বলতে চান। তাই আমিও অনিচ্ছায় প্রশ্ন করি, তিনিই ডাক্তার কিনা? এবং বলি, তোমার উচ্চারণে বৃটিশ মনে হচ্ছে। তিনি জানিয়ে দিলেন যে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার এবং নিউইয়র্কে একজন প্র্যাকটিসিং সাইকিয়াট্রিস্ট, তিনিও জি. এম. কোয়েটযির ভক্ত, ইত্যাদি।

বোঝা যাচ্ছিল দর্শকদের মধ্যে যে উৎফুল্ল ভাব ছিল তেমনটি আর থাকে না, কারণ গুন্টার গ্রাসের শীতল ব্যক্তিত্ব। অ্যান্ড্রু ও’হ্যায়গানের চেষ্টার কমতি ছিল না দর্শকের মেজাজ উপযোগী অনুষ্ঠান চালিয়ে নেওয়ার। কিন্তু গুন্টার গ্রাসের মাত্রাতিরিক্ত রসিকতা বর্জন আর শীতল নির্মোহ স্টেটমেন্ট ধরনের বিশ্লেষণ দর্শকদের কথিত বিনোদন থেকে বিরত করে। তবে তাদেরকে ইতিহাসের মুখোমুখি করে। যে ইতিহাস বর্ণিত হয় গুন্টার গ্রাসের সর্বশেষ উপন্যাস পিলিং দ্যা ওনিয়ন (পেয়াজের খোসা ছাড়াও) গ্রন্থে।
Gunter & Mailer 2007
অনুষ্ঠানের পর ছবির জন্য পোজ দিচ্ছেন গুন্টার গ্রাস ও নরমান মেইলার

অনুষ্ঠান সাজানো ছিল এরকম, সাতটা পনেরো থেকে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত দর্শকদের সামনে গুন্টার গ্রাস কথা বলবেন। সে অনুযায়ী তার পর্ব শেষ হলে সাড়ে আটটায় গুন্টার গ্রাসের বিরতির পালা শুরু হয়। পরপরই মিনিট বিরতির মধ্যে মঞ্চের দিকে খুব ধীরে এগুতে থাকেন নরম্যান মেইলার, যিনি আমেরিকান সাহিত্যে অর্ধ শতকের বেশি সময় ধরে দাপটেছেন। আমেরিকান দর্শকরা এই আমেরিকান লেখককে পেয়ে যেন খড়খড়া হয়ে ওঠে। দর্শক প্রতিক্রিয়ায় মনে হতে থাকে ‘যেমন দর্শক তেমন প্রত্যাশিত অতিথি’ মঞ্চে। যেন স্বতস্ফূর্ত ইতিহাস তৈরি হতে থাকে, দর্শকদের করতালি শেষ হতে চায় না। শেষও হয়, তা নরম্যান মেইলারের উদ্যোগেই।

আমার অবাকই লাগে করতালির মাত্রায়, মনে হতে থাকে সেলিব্রেটিদের ক্ষেত্রে আমেরিকান অডিয়েন্সে যেমন ঘটে, নরম্যান মেইলার তো লেখক, তার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটবে কেন? আসলে সে ক্ষেত্রে বোঝার ভুল সে আমারই। নরম্যান নিজেই ওই ভুল ভাঙানো শুরু করেন। তিনি দর্শকদের প্রশ্ন করেন, তাকে দেখা যাচ্ছে কিনা এবং যথার্থ শোনা যাচ্ছে কিনা।

দর্শকরা জানত তিনি রসিকতার সুরে এবং রসিকতা করে কথা বলেন। তিনি জানালেন, আজকাল চোখে কম দেখছেন এবং কানেও কম শুনছেন। দর্শকদের জিজ্ঞেস করলেন, তারাও তাকে ঠিকমত দেখতে ও শুনতে পাচ্ছে কিনা। দর্শকরা হল ফাটিয়ে আবার হাসে। কেননা এখন তারা বুঝতে পারে যে কেন নরম্যান মেইলার শুরুতেই দর্শকদের প্রশ্ন করেছেন তাকে ঠিকমত শোনা যাচ্ছে কিনা ও দেখা যাচ্ছে কিনা। দর্শকদের সেই হাসির চোখের মধ্যেই তিনি আরো কঠিন রসিকতা করেন যা কোনোক্রমেই রসের নয়। কিন্তু তিনি এমন ভাবে বলেন যেন তাতেও দর্শকরা হেসে উঠবে। অর্থৎ তার কণ্ঠের রসিকতার স্বর-মাত্রা পরিবর্তন না করেই বলেন এটাই তার শেষ পাবলিক অনুষ্ঠানে যোগদান কেননা তিনি মনে করেন তিনি বেশিদিন আর বাঁচবেন না। আর যদি বাঁচেনও তা হলেও তার কোনো পাবলিক অনুষ্ঠানে যাওয়া উচিৎ নয় বলেই তিনি মনে করেন কারণ তিনি পর্যাপ্ত পরিমাণ যেমন দেখতে পান না তেমনি পর্যাপ্ত কানেও শুনতে পান না যা নাকি কোনো পাবলিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য অপরিহার্য। সুতরাং হাসিরত দর্শকরা তার কাছ থেকেই একটি তথ্য জানলেন যে তিনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না। নরম্যান এমন ভাবে কথাগুলো বলেছিলেন যেন দর্শকরা হাসি না থামিয়ে তার একথাটিও ওই হাশির মধ্যেই গ্রহণ করেন।

দর্শকরা অবশ্য সেদিন তার ওই চালে ধরা পরেনি। তাদের হাশি তাদের প্রিয় লেখকের, প্রিয় মানুষের দেয়া মৃত্যু সংক্রান্ত তথ্যে থেমে গিয়েছিল।

ঔপন্যাসিক, লেখক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা নরম্যান মেইলার হয়তো চাননি যে তার প্রিয় দর্শকরা হাসির মুড থেকে দুঃখের মুডে চলে যান। তিনি দর্শকদের হাশি ফিরিয়ে আনতে অন্য প্রসঙ্গে গেলেন তার মৃত্যুর প্রসঙ্গ ছেড়ে। তার চোখে কম দেখতে পাওয়া ও কানে কম শুনতে পাওয়া নিয়েই বললেন এমন একটা কথা যাতে দর্শকরা আবার হাসির মানসিকতায় ফিরে গেল। তিনি সঞ্চালক অ্যান্ড্রুকে উদ্দেশ্য করে দর্শকদের জন্যে বললেন যে, যেহেতু তিনি কানে কম শোনেন ও চোখে কম দেখেন সেই সুযোগটা তিনি মনের মত কাজে লাগাবেন। দর্শক আবার উৎসুক হয়ে উঠলো, তারা দেখলো দুষ্ট বুড়ো কী অবিরাম কথা বলে যাচ্ছেন, আগাম মৃত্যুসংবাদেও স্তব্ধতা থেকে দর্শকদের ফিরিয়ে আনছেন রসিকতা ও কৌতুকের জগতে।

কানে কম শুনি ও চোখে কম দেখি এই সুযোগটা পুরোপুরি ব্যবহার করতে চাই মডারেটর অ্যান্ড্রু ও’হ্যায়গানের কোনো কথা না শুনে অর্থাৎ আমার যা বলতে ইচ্ছে করে আমি বলে যাবো। এন্ড্রু আমাকে থামাতে চাইলেও আমি ভাব করবো যে আমি শুনছি না যে তুমি আমাকে থামাতে চাচ্ছ যেহেতু আমি কানে কম শুনি সুতরাং সেটাই স্বাভাবিক আমি ওকে শুনবো না। দর্শকদের মধ্যে হাসির রোল ফিরে এলো, নরম্যান আরো হাসাতে চান, বলেন আমি তো দেখিও না, তো দেখতেও পাচ্ছি না যে অ্যান্ড্রু আমাকে থামাতে চাচ্ছে।

সেদিনের অনুষ্ঠানে নরম্যান মেইলার পরের কথাগুলো রেখেছিলেন অর্থাৎ মডারেটরের নিয়ন্ত্রণে তেমনটি থাকেননি। নিজের যা যেভাবে বলতে ইচ্ছে করেছিল সেভাবেই তিনি বলছিলেন। এমনকি ওটা যে তার শেষ জনসমক্ষে আসা সে কথাটিও রেখেছিলেন। এর পর আর কোনো পাবলিক অনুষ্ঠানে যোগ দেননি, মৃত্যু যে আসন্ন বলে আশঙ্কা করেছিলেন তাও সত্যে পরিণত হলো গত ১০ নভেম্বর। নিউইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে তার সম্পর্কে যে, এই যুদ্ধংদেহী, বহুল আলোচিত, বিতর্কিত, নির্ভিক, তার প্রজন্মের সবচেয়ে বড় মানুষটি মৃত্যুবরণ করলেন।

শুরুতেই অ্যান্ড্রু চেষ্টা করছিলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে লেখা নরম্যানের বাবার একটি চিঠি বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। সে সময়ের চলতি প্যারিস রিভিউতে একটি চিঠি ছাপা হয়েছিল তার বাবার। তিনি পত্রে শংকা প্রকাশ করেন যে তার ছেলে অসম্ভব লাজুক ধরনের ও অতিশয় স্পর্শকাতর!

অ্যান্ড্রু ও’হ্যায়গান বললেন নরম্যানকে, এই যে তোমার অসম্ভব লাজুকতা এটা কী? বিষয়টি শুনেই উপস্থিতরা হেসে ফেলেছিল। কেননা নরম্যান মেইলারের দীর্ঘ লেখক জীবনে কখনো লজ্জা ব্যাপারটা ছিল বলে তার পাঠকরা জানে না, অথচ তার বাবা অমন একটি বিষয়েই কিনা লিখেছেন! নরম্যান গলায় লম্বা করে কাশি দিয়ে বলেছিলেন, আমার চাইতে আকারে বড় মানুষ চারদিকে দেখে আমার একটা অ্যানিম্যালিস্টিক ইনস্টিঙ্কট-এর জন্ম নেয় যা কিনা ওই লাজুকতারই শামিল, আর কিছু নয়। আর আমার বেড়ে ওঠার জায়গা ব্র“কলীন, আর ব্র“কলীন ব্যাপারটাই ওই রকম (দর্শকরা আবার হাসিতে আবার ফেটে পড়ে)। তাছাড়া বাবার ওরকম পত্র লিখবার কারণ হয়তো তার নিজস্ব কমপ্লেক্স। তিনি পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা মানুষ, ব্যাংকারের সাজে চলতেন, মায়ের অর্জিত টাকাগুলো দিয়ে বিশিষ্ট জুয়ারী হয়ে উঠেছিলেন।

এর পরের প্রশ্ন ছিল বর্তমানে ইরাকে আমেরিকান উপস্থিতি প্রসঙ্গে। তিনি বললেন এর উত্তর আমি দীর্ঘ করে ঘুরিয়ে দেবো। অতএব তিনি মূল উত্তরে না গিয়ে অন্য কথাই বলতে থাকলেন, যে তিনি সাড়া জীবন আমেরিকা-বিরোধী লোক অথচ আমেরিকাকেই ভালবেসেছেন, এমনকি যেন তিনি আমেরিকার সঙ্গেই বিবাহিত। ‘যদিও আমার ছ’টি বিয়ে এবং যার একটি বিয়ে প্রকৃত অর্থেই হযবরল, ঠিক তেমনি এখন আমেরিকার অবস্থাটা অর্থাৎ এটি একটি জঘন্নতম যুদ্ধ।’

এ প্রসঙ্গে তিনি অন্য বিষয় টানলেন, বললেন আমি রাজনীতি ও শাসননীতির ক্ষেত্রে নৈরাজ্যবাদী (তিনি ব্যাঙ্গাত্মক টোনে কথাটি বলেন)। লোক বা লেখক হিসাবে আমার কাছে মনে হয় ফ্যাসিজম পদ্ধতিটি শাসনের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক, সে তুলনায় গণতন্ত্র অনেক জটিল। ফ্যাসিজম হচ্ছে আমাদের ছেলেবেলার মত, পিতা-মাতার অধীনে এটা করো, ওটা করো, ওটা করা যাবে না, এটা করা যাবে নার মত এবং সেটা তখনকার জন্য ভালই কাজ করে।

মডারেটর অ্যান্ড্রু এর পর প্রশ্ন করেছিলেন আমেরিকান সাহিত্যে বর্তমানে ভায়োলেন্সের উপস্থিতি প্রসঙ্গে। যে কেন আজকালকার লেখকরা বেশি ঝুকে পড়েছে ভায়োলেন্সের দিকে, এবং এতে তোমার অবস্থানটি কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তরেও নরম্যান মেইলার অনেক কথা বলেছেন যেসব কথাবার্তা কিনা শেষ পর্যন্ত তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে ছুরিকাঘাত করা পর্যন্ত গড়িয়েছে। তিনি বলেছেন, উনবিংশ শতাব্দিতে সেই মূল্যবোধ, সমাজনীতি জাতীয় সব বিষয় নিয়ে লেখালেখির শেষে সম্ভবত বিংশ শতাব্দির শুরু থেকেই লেখকরা যৌনতার দিকে ঝুকে পড়ে এবং এক পর্যায়ে ক্লান্তির পর তাদের সামনে হয়তো ভায়োলেন্সই থাকে।

অ্যান্ড্রু ও’হ্যায়গান প্রশ্ন করলেন, তুমি বউকে যে ছুরিকাঘাত করেছিলে তাতেই কি তুমি নোবেল থেকে বঞ্চিত হলে বলে তুমি মনে করো? তিনি হেসে দিয়ে বললেন, সুইসরা খুব বুদ্ধিমান, ওরা ভালই করেছে, এমন একটা লোককে ওরা নোবেল দিলে হয়তো ভাল হতো না যে লোকটি কিনা তার স্ত্রীকে এক সময় কুপিয়েছে।

তুমি সারাজীবনই নারীবাদীদের কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছো এ সম্পর্কে তোমার অভিমত কী? প্রশ্নের উত্তরে নরম্যান বললেন অন্য কথা, তিনি জানালেন যে তার মা সহ অন্যান্য নারীরা তাকে ভালবাসে এবং অনেক ক্ষেত্রে বরং নারীরা তাকে ভালবেসে নষ্টও করেছে – সেক্ষেত্রে তিনি তার মা, চার স্ত্রী ও এক বোনের কথা উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন, আমি নারীবাদীদের বলতাম তোমরা বিপ্লব চাচ্ছ টেক্সাসে যাও, ওখানে প্রায় সব পুরুষরাই মাচো, না তারা বরং নিউইয়র্কেই থাকলো, আমাকে তো আক্রমণ করলোই।

অ্যান্ড্রুর এর পরের প্রশ্ন ছিল, তাহলে তুমি কি প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসাবে হিলারীকেই সমর্থন করবে? তিনি হ্যাঁ সূচক মন্তব্য করলেন, বললেন ওবামা বা এডওয়ার্ডের চাইতে হিলারীই ভাল করবে। তাছাড়া লোকে ওকে যতটা ভাল মনে করে ব্যক্তিগতভাবে ও তার চাইতেও ভাল। যদিও একটা লোক সাড়াজীবন দুষ্ট রাজনীতিবিদদের সঙ্গে থেকে থেকে আর কতটা ভাল থাকতে পারে সে প্রশ্ন থাকে।

নরম্যান উনিশ’শ উনসত্তুরে নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং ব্যর্থ হয়েছিলেন। সে প্রসঙ্গে তিনি বললেন, আমি আসলে সে অর্থে তেমন ভাল রাজনীতিবিদ ছিলাম না। ভাল রাজনীতিবিদ মানে হচ্ছে মাঝারি ধরনের মেধা ও মননের লোক যার স্থায়ী স্ট্যামিনা থাকে।

তিনি জর্জ বুশকে উপহাস করে বললেন যে তার বিশেষত্ব হচ্ছে এমন কোনো কথা নেই যা তার বলতে বাধে বা তার জিহ্বায় কোনো ক্ষত তৈরি করে। ও’হ্যায়গানের এর পরের প্রশ্ন ছিল নরম্যানের কাছে যে গত শতাব্দিতে ও আজ পর্যন্ত কে সবচেয়ে খারাপ প্রেসিডেন্ট। তিনি বললেন, আমি এতদিন মনে করতাম প্রেসিডেন্ট রেগান হচ্ছে সবচেয়ে খারাপ কিন্তু বুশ আমার সে ধারণা পাল্টে দিয়েছে। যদিও রেগানের প্রধান অপরাধ হিসেবে আমি গণ্য করি তার নিজেকে যোগ্য প্রেসিডেন্ট ভাবা। রেগানের সময়ে রাশিয়া ভ্রমণ শেষে আমেরিকায় ফিরে আমেরিকার ওপর তো আমি খুবই রাগ করেছি।

তার পর্বে এর পর তিনি গুন্টার গ্রাস সম্পর্কে কথা বলেছেন, তিনি নাৎসিদের সঙ্গে গুন্টারের সম্পৃক্ততাকেও খারাপ ভাবে দেখেন না বলে জানালেন। বললেন ১৭ বছর বয়েসে ওর কোনো বিকল্প ছিল না গুন্টার যা করেছে তার চাইতে। তিনি এও বলেন যে সে সম্পর্কে গুন্টার যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে লিখেছেন সেটাও ওর বুদ্ধিদ্বীপ্ত সিদ্ধান্ত।

অনুষ্ঠানটি শেষ হয়েছিল এ কথাটি বলে যে নরম্যান শুরুতে যে বলেছে এটা তার শেষ পাবলিক অনুষ্ঠান তা যেন সত্যি না হয়। কথাটি অ্যান্ড্রু ও’হ্যায়গান বলেছিলেন। নরম্যান নিজেও বলেছিলেন। আমিও তাই আশা করেছিলাম। কিন্তু সত্যি হচ্ছে নরম্যানের ওটাই ছিল শেষ পাবলিক এপিয়ারেন্স।

————

আরো লেখা

বীচিকলায় ঢেকে যায় মুখ ও শিরোনাম

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: আনোয়ার শাহাদাত
ইমেইল: anwar.shahadat@gmail.com

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.