সংস্কৃতি

বাংলার যাযাবরে নাট্য

saymon_zakaria | 14 Feb , 2008  

14.jpg
পৌর শশ্মানঘাটের চড়ক মাঠে বাঘ ও নববধূ

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিছু নাট্যমূলক পরিবেশনা বাড়ি বাড়ি ঘুরে উঠানে বা রাস্তায় এবং বাজারপ্রাঙ্গণ, নদী বা পুকুর ঘাট, এমনকি কৃষিক্ষেত্র, খেলার মাঠ ইত্যাদি বিভিন্ন স্থানে বেশ খোলামেলাভাবে পরিবেশিত হতে দেখা যায়। এ ধরনের নাট্যমূলক শিল্পকে যাযাবরে পরিবেশনা বলা যেতে পারে, ভদ্রভাষায় ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা বললেও অতিশয়োক্তি হবে না। charok_petni_2.jpg………
চড়কের মাঠে পেত্নীর আবির্ভাব, ভক্তে করে অর্থদান, ছবি: সাহাদাত পারভেজ
……….
অবশ্য বর্তমান রচনায় এ ধরনের পরিবেশনাকে আমরা ভ্রাম্যমাণ বলেই উল্লেখ করছি। এক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার চরিত্র বলতে বোঝানো হচ্ছে, যা ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন স্থানে পরিবেশন করা হয়। আর এ ধরনের নাট্যমূলক শিল্প পরিবেশনের জন্য কোনো স্থায়ী বা সুনির্দিষ্ট মঞ্চ কাঠামোর প্রয়োজন পড়ে না, শিল্পীরা তাদের প্রয়োজন মতো রাস্তা, রাস্তার ধার, গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির উঠান ইত্যাদিকে পরিবেশনাস্থান হিসেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যবহার করে থাকেন। সাধারণত bichargan_shuli_saymon3.jpg……..
গান শেষে বিচার গানের শিল্পীদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন লেখক
………
ধর্মীয় কৃত্যাচার পালনে, উৎসব উদ্যাপনে, সর্বোপরি জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনে এদেশের বহু মানুষ এখনও বহু ধরনের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার চল ধরে রেখেছেন।

বাংলাদেশে প্রচলিত বৈচিত্র্যময় ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনাকে চারটি প্রধান শ্রেণী বা প্রকরণে বিভক্ত করা যায়, যথা এক. কৃত্যমূলক পরিবেশনা; দুই. লোকনাট্য; তিন. বিভিন্ন ধরনের লোক উৎসব, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস কেন্দ্রিক পরিবেশনা; এবং চার. পেশাভিত্তিক পরিবেশনা। এই প্রকরণের প্রথমটি হচ্ছে, কৃত্যমূলক পরিবেশনা, এদেশের গ্রাম ও শহর পর্যায়ের ধর্মাচারী জনতা তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে সে সকল পৌরাণিক ও বাস্তব জীবনের ঘটনা অভিনয় আকারে উপস্থাপন করে থাকেন তা-ই হচ্ছে কৃত্যমূলক ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা।

এ প্রকরণের মধ্যে আছে জন্মাষ্টমী ও হর-গৌরী পূজা উপলক্ষে আয়োজিত বিচিত্র শোভাযাত্রা, বাইদ্যার নাচ, হর-গৌরীর নাচ, বীচট, মইন জাগানো, কালির মুখোশ পরে কালি কাচ করা, দূর্গার মুখোশ পরে পরী নাচ পরিবেশন, পুকুরে নেমে কৃষ্ণ কর্তৃক রাধার বস্ত্রহরণ ও নৌকাবিলাসের অভিনয়, মন্দির বা বাড়ির উঠানে সীতার অগ্নিপরীক্ষার অভিনয়, মন্দির বা বাড়ির উঠানে শ্মশান তৈরি করে রাজা হরিশ্চন্দ্রের শ্মশান মিলনের অভিনয়, মাছ ও পশু-পাখির মূর্তি নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ‘গমীরা’ উপস্থাপন ইত্যাদি। উল্লেখ্য, এই সকল ধর্মীয় কৃত্য কেন্দ্রিক ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনাসমূহ নাট্যমূলক, কখনোই তা নাট্য উপস্থাপনের আখ্যান বিন্যাসের মতো একটি পূর্ণাঙ্গরূপ গ্রহণ করে না, একটি ঘটনা এ ধরনের পরিবেশনাতে হঠাৎ করেই সূচনা করা হয় এবং হঠাৎ করেই তার ইতি টানা হয়।

বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার দ্বিতীয় প্রকরণের মধ্যে পড়ে লোকনাট্য, এদেশে প্রচলিত বিচিত্র ধরনের লোকনাট্যের শিল্পীরা সাধারণত বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে বায়না বা ধর্মভক্তির ভিত্তিতে কোনো ধরনের অর্থ গ্রহণ ছাড়াই লোকনাট্যের আসর করে থাকেন, যেমন, যাত্রা গান, গাজীর গান, পদ্মাপুরাণ গান, মাদার পীরের গান, মানিক পীরের গান, রামকীর্তন, রামমঙ্গল, রামলীলা, কুশান গান, পদাবলী কীর্তন, কিচ্ছা গান, মহাভারত, অষ্টক গান ইত্যাদি।

উপর্যুক্ত প্রকরণের তৃতীয় পর্যায়ে আছে বিভিন্ন ধরনের লোক উৎসব, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস কেন্দ্রিক পরিবেশনা শিল্প, এ ধরনের পরিবেশনার মধ্যে পড়ে মুসলমানদের লৌকিক পীর খোয়াজ খিজির ও মাদার পীরের স্মরণ উপলক্ষে বেড়া ভাসান ও মাদার পীরের বাঁশ তোলার অনুষ্ঠান; মুসলমানী ও বিয়ে উপলক্ষে গ্রামের পুরুষ ও নারীদের উপস্থাপনায় নাট্যমূলক বহুরূপী বা সঙের পরিবেশনা। এছাড়া, বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে নানা ধরনের শোভাযাত্রার আয়োজনে ঐতিহ্যবাহী পোশাক, বাদ্যযন্ত্র, অস্ত্র-শস্ত্রসহ বাস্তব জীবন নির্ভর কিছু নাট্যমূলক ঘটনাকে শহরের নাগরিকগণ রাস্তায় রাস্তায় অভিনয় আকারে উপস্থাপন করে থাকেন। যা নিশ্চিতভাবেই ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার পর্যায়ে পড়ে।

প্রকরণের চতুর্থ ও সর্বশেষ পর্যায়ে আছে পেশাভিত্তিক পরিবেশনা, এ ধরনের পরিবেশনা হিসেবে গ্রামের পেশাজীবী লাঠিয়ালদের লাঠি খেলা, রাস্তার ধারের বানর খেলা, সাপ খেলা, জাদু খেলা এবং সার্কাস খেলার কথা উল্লেখ করা যায়। এ প্রকরণের এ পর্যায়টি পেশাগত কারণে সম্পূর্ণরূপে অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় বহন করে। আবার একথাও ঠিক যে, অপরাপর পরিবেশনা শিল্পের চেয়ে এ প্রকরণের অন্তর্ভুক্ত শিল্পটি বিশেষভাবে ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের গুণাবলী ধারণ করে। একজন সাপুড়ে যখন সাপ খেলা আয়োজনের জন্য বীণ বা ডমরু বাজিয়ে ‘এই সাপের খেলা’ বলতে বলতে গ্রামের পথ দিয়ে হেঁটে যায় তখন তার পিছে পিছে গ্রামের শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে যুবক-বৃদ্ধেরাও কখনো কখনো ছুটতে থাকে, আর পেছনের এই লোক জমায়েত দেখেই সাপুড়ে সুবিধাজনক একটি স্থানে সাপ খেলা দেখান। এক স্থানের সাপ খেলা দেখানো শেষ হলে সাপুড়ে আবার নতুন আরেকটি পাড়া বা নতুন আরেকটি গ্রামে ঢুকে পড়ে আগের মতোই খেলা দেখিয়ে থাকেন। এমনই ভ্রাম্যমাণ প্রবণতা লাঠি খেলা ও জাদু খেলার রয়েছে, লাঠি খেলার আগে লাঠিয়ালরা গ্রামের পথ দিয়ে বিচিত্র শব্দে ডাক ভেঙে দর্শকদেরকে আকৃষ্ট করে কোনো একটি খোলা স্থানে জমায়েত করে তাদের খেলা দেখিয়ে থাকেন। এবারে বিস্তারিতভাবে বাংলাদেশের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার প্রধান কয়েকটি পরিবেশনারীতির পরিচয় উপস্থাপন করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের ইতিহাস : বাংলাদেশের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনামূলক শিল্পকলার ইতিহাস অতি প্রাচীনকালের। বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় গ্রন্থ, সাহিত্যে নিদর্শন, শিলালিপি এবং ভ্রমণকাহিনীতে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রাপ্ত সে ইঙ্গিতগুলোকে বিবেচনায় এনে শুরুতেই এদেশের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনামূলক শিল্পকলার গৌরবময় ইতিহাসের কিছু ঘটনার উল্লেখ করা হচ্ছে।

প্রথমেই উল্লেখ করা যায়, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১০০০ অব্দের মধ্যে রচিত ঋগ্বেদের কথা। এই গ্রন্থের একাধিক সূক্তে পূর্ব-ভারত তথা আমাদের এই বঙ্গভূমিতে প্রচলিত প্রাচীনতম ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনামূলক শিল্পকলার ইঙ্গিত ছড়িয়ে রয়েছে। অথর্ববেদের ব্রাত্যখণ্ডে এক দিগি¦জয়ী সম্রাটকল্প ব্রাত্যের দিগি¦জয় যাত্রার বর্ণনা আছে। সে বর্ণনায় জানা যায়, সম্রাটকল্প ব্রাত্যের দিগি¦জয় যাত্রায় তাঁর সঙ্গে বেশ কয়েকজন পার্শ্বচর থাকতেন। এই পার্শ্বচরদের মধ্যে ‘পুংশ্চলী’ ও ‘মাগধ’-এর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। কেননা, ‘পুংশ্চলী’ হচ্ছেন নারী। এই নারী ছিলেন নৃত্য-গীত পটিয়সী নটী এবং ‘মাগধ’ হচ্ছেন পুরুষ। যে পুরুষ ছিলেন বাদ্যকার, গল্পকথক নট। আর এই নট-নটীদ্বয় উভয়ে মিলে যুদ্ধের অবসরে নৃত্য-গীত ও অভিনয়ের আশ্রয়ে বিশেষ এক ধরনের পরিবেশনা দেখিয়ে সম্রাটকল্প ব্রাত্যের মনোরঞ্জন করতেন। অথর্ববেদের বর্ণনা অনুযায়ী একথা অনুমান করা চলে যে, এ ধরনের পরিবেশনা শিল্পটি ছিল নিশ্চিতভাবেই ভ্রাম্যমাণ। কেননা, তা দিগি¦জয় যাত্রায় যুদ্ধের অবসরে বিভিন্ন স্থানে পরিবেশিত হতো, তার জন্য সুনির্দিষ্ট বা স্থায়ী কোনো মঞ্চের ব্যবস্থা ছিল বলে জানা যায় না। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পরবর্তীকালের পূর্বভারতে, অর্থাৎ বঙ্গভূমির সাধারণ গ্রামীণ মানুষের মধ্যে সেই ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার নৃত্য-গীত ও অভিনয়ের অনুশীলন, প্রচার ও প্রসার ঘটে।

অথর্ববেদের ব্রাত্যখণ্ডে বর্ণিত এই সম্রাটকল্প ব্রাত্যের দিগি¦জয় যাত্রার সঙ্গে মিল পাওয়া যায় মৌর্য রাজাদের ‘বিহার যাত্রা’র। খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতকে মৌর্য রাজ-পুরুষেরা উচ্চধ্বনিতে ঢাক বাজিয়ে এক ধরনের ‘বিহার যাত্রা’ করতেন। এই ‘বিহার যাত্রা’র অন্যতম লক্ষ ছিল মৌর্য রাজ-পুরুষদের রাজ্য দর্শন। বিবরণে জানা যায়, বৎসরের নির্দিষ্ট একটি সময় মৌর্য রাজ-পুরুষেরা কেন্দ্রীয় রাজধানী থেকে বের হয়ে ‘বিহার যাত্রা’র মাধ্যমে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করতেন। এমনই ‘বিহার যাত্রা’ কালে তাদের সঙ্গে থাকতো বাহনের জন্য হাতি, রথ, রথের ঘোড়া; রন্ধনের জন্য রন্ধনকারী; মালবাহী পশু, মালবাহী পশুর জন্য চালক ও খাদ্যদানকারী; থাকতো সেবক ও মৃগয়ার সরঞ্জামাদি; এছাড়া, থাকতো মনোরঞ্জন দানকারী নৃত-গীত পটিয়সী নারী-পুরুষ, নট-নটী; গবেষকের ধারণা, ‘বিহার যাত্রা’র দল মাঝে মাঝে জনবহুল কোনো স্থানে শিবির স্থাপন করত। সন্ধ্যায় সেই শিবিরে ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা হিসেবে জনসাধারণের উপযোগী বিভিন্ন ধরনের নৃত্য-গীতের আসর বসতো। নট-নটীরা সে আসরে সাজসজ্জা করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নাটক অভিনয় করতেন। রাজপুরুষগণ নাটকগুলো রাজ্যের সাধারণ প্রজাসহ উপভোগ করতেন।

সম্রাট অশোক খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতকে উক্ত ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা ‘বিহার যাত্রা’র পরিবর্তে ‘ধর্ম যাত্রা’র প্রবর্তন করেন। কিন্তু সম্রাট অশোক প্রবর্তিত সেই ‘ধর্ম যাত্রা’র মধ্যেও ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের ঐতিহ্যবাহী ধারা বজায় থাকে। এক্ষেত্রে নৃত্য-গীতসহ বিশেষ ধরনের দৈহিক কসরত প্রদর্শিত হতো। এ প্রসঙ্গে অশোকের শিলালিপিতে উল্লেখ আছে:
‘But now (twelveth year of coronation) in consequence of the practice of Dharma on the part of the king Devanampriya Priyadarshin, the sound of drums has become the sound of Dharma, showing the people representations of aerial chariots, representations elephants, masseur of fire and other divine figures.’

এখানে উড়ন্ত রথ, হাতির মিছিল, আগুনের খেলা এবং দিব্যরূপ দেখানো হতো। এই দিব্যরূপ ছিল বিচিত্র সজ্জার ভ্রাম্যমাণ নটভঙ্গি। আসলে, বৌদ্ধদেবতাদের বিভিন্ন কার্যকলাপ এই নটভঙ্গির মধ্য দিয়ে দেখানো হতো। আর তা দেখানো হতো সাধারণ মানুষকে তাদের মানুষের বোধগম্য ভাষায়। প্রাপ্ত এ সব তথ্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার জনসাধারণের মধ্যে ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনামূলক শিল্পকলার প্রচলন ছিল।

ডক্টর সুকুমার সেন আরো দুই শতক আগে, অর্থাৎ আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকে বর্তমান পাণিনির সময়ে বাংলার সাধারণ জনতার মাঝে প্রচলিত ভ্রাম্যমাণ বিশেষ প্রকারের নাট্য পরিবেশনার কথা জানিয়েছেন। এ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন যে, পাণিনির সময়ে শুধু ‘নট’ শব্দই নয়, সেই শব্দ থেকে উৎপন্ন ‘নাট্য’ শব্দও প্রচলিত ছিল। ‘নাট্য’ শব্দটির অর্থ হয় ‘নটের কর্ম’। এই শব্দ থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, পাণিনির সময়ে ‘নটকর্ম’ জীবিকারও বিষয় ছিল। তবে, সে সময়ে রচিত “নটসূত্র” নামক প্রাচীন কোনো রচনার সন্ধান না পাওয়া গেলেও তার বেশ পরবর্তীকালে রচিত ভরতমুণির ‘নাট্যশাস্ত্র’-এর সন্ধান মিলেছে। ডক্টর সুকুমার সেন আরো উল্লেখ করেছেন, পাণিনির পরে ‘ভিক্ষু’ শব্দটি বৌদ্ধ সাধু অর্থেই ব্যবহৃত হতে থাকে। আর পাণিনির সময়ে ও তার আগে বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের সংসার-ত্যাগী সন্ন্যাসীদের মধ্যে নৃত্যগীত অভিনয় প্রচেষ্টা অজ্ঞাত ছিল না, এবং খুব সম্ভবত তারা বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে নৃত্যগীত আশ্রিত ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা করতেন। পরবর্তীকালের সাহিত্যে প্রাচীনকালের ভিক্ষুদের ভ্রাম্যমাণ নাট্যসংশ্লিষ্টতার কিছু কিছু প্রমাণ মেলে। ভাগবতে ‘ভিক্ষুচর্যা’র উল্লেখ আছে। এই শব্দটির সঙ্গে এ যাবৎ প্রাপ্ত বাংলা ভাষার প্রাচীনতম সাহিত্য-নিদর্শন ‘চর্যা’র তুলনা স্বভাবতই মনে আসে। উল্লেখ্য, চর্যার রচনাকাল আনুমানিক ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। এ কথা বিবেচনায় এনে গবেষকগণ জানিয়েছেন, চর্যা রচনাও আগে প্রাচীন বাংলায় প্রচলিত ভ্রাম্যমাণ নাট্য পরিবেশনা সম্পর্কে প্রথম সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতকে রচিত ভরতমুণির নাট্যশাস্ত্রে। এই গ্রন্থের “প্রবৃত্তি-ব্যঞ্জক” অধ্যায়ে অঞ্চলভেদে চতুর্বিধ ‘বৃত্তি-আশ্রিত’ নাট্যের কথা বলা হয়েছে। ভরতমুণি ‘প্রবৃত্তি’ শব্দের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘নানাদেশবেষভাষাচারাবার্তাঃ’, অর্থাৎ দেশ-বেশ-ভাষা ও রীতি অনুসারে চার-ধরনের প্রবৃত্তি বর্তমান রয়েছে। এগুলো হচ্ছে, আবন্তী, দাক্ষিণাত্যা, পাঞ্চালী এবং ওড্র-মাগধী। ভরতমুণির বর্ণনা মতে, সেকালে যে-সকল অঞ্চলে ওড্র-মাগধী নাট্যপ্রবৃত্তি প্রচলিত ছিল তার মধ্যে পূর্ব-ভারত তথা ‘বঙ্গ’ বা বাংলাদেশও রয়েছে। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, এই ওড্র-মাগধী নাট্যপ্রবৃত্তি হচ্ছে উত্তেজনাপূর্ণ আবেগদীপ্ত বাচিক অভিনয়। তবে, ভরত নাট্যশাস্ত্র অনুযায়ী গবেষকের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, ওড্র-মাগধী নাট্যপ্রবৃত্তি ভারতী ও কৈশিকী প্রবৃত্তির আশ্রয়ে রচিত। এর মধ্যে কৈশিকী বৃত্তি শিবের শৃঙ্গার নৃত্য থেকে উদ্ভূত। আর কৈশিকী বৃত্তির জন্য ব্রহ্মা আলাদাভাবে তেইশজন অপ্সরা তৈরি করেছিলেন। এক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে কৈশিকীর প্রয়োগ সম্ভব নয়।১০ ভরতমুণির নাট্যশাস্ত্রে এর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বসন-ভূষণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, এর পোশাক বা আহার্য হবে মনোরম এবং এই প্রবৃত্তি আত্মা হচ্ছে ‘ক্রিয়া’ ও ‘রস’। এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ভরতমুণি আরো বলেছেন, এ হচ্ছে ‘বহুনৃত্তগীতবাদ্য’ সহযোগে দলিত-অঙ্গাভিনয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রয়োগ বিচারে ভরতকৃত ‘নৃত্ত’ ও ‘নৃত্য’-এর রীতি ভিন্ন। এরমধ্যে ‘নৃত্ত’ হচ্ছে জনপ্রিয় লৌকিক নাট্যাভিনয়। যা ছন্দ-তালে সাধারণ অঙ্গভঙ্গি সহকারে প্রদর্শিত হয়ে থাকে। আর এতে নাট্যশাস্ত্র নির্দেশিত কোনো মার্গীয় মুদ্রারীতির অনুকরণ বা অনুসরণ করা হয় না। ১১ ভরতমুণির নাট্যশাস্ত্রে কৈশিকী প্রসঙ্গের বিবরণে ‘নৃত্ত’ শব্দটির ব্যবহার দেখে প্রাচীনকালের ওড্র-মাগধী নাট্যরীতির লৌকিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা করা সহজ হয়ে ওঠে। কালের দিক থেকে বিচার করে বলা যায়, ওড্র-মাগধীরীতি ভরতমুণি এবং তাঁর পূর্বকালেও প্রচলিত ছিল। এক্ষেত্রে অনুমান করা চলে, নাট্যশাস্ত্রের ‘প্রচলিত রূপটি’র নিম্নতর সীমারেখা অষ্টম শতকের শেষভাগ পর্যন্ত বর্তমান ছিল১২ এবং এ ধরনের নাট্যরীতি নিশ্চিতভাবেই ছিল ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনামূলক শিল্প। নিম্নের আলোচনায় তা উল্লেখ করা হলো।

অষ্টম শতকের দিকে প্রাচীন বাংলায় ‘বুদ্ধ নাটক’ নামে এক ধরনের বিশেষ প্রকারের ভ্রাম্যমাণ নাট্যরীতির প্রচলন ছিল। বাংলা ভাষায় প্রাপ্ত প্রথম সাহিত্যে নিদর্শন চর্যাপদে সে নাট্যপ্রসঙ্গের উল্লেখ রয়েছে। আনুমানিক খ্রিস্টীয় নবম শতকে রচিত চর্যার ১৭ সংখ্যক পদে পদকর্তা বীণাপা উল্লেখ করেছেন:
নাচন্তি বাজিল গান্তি দেবী
বুদ্ধনাটক বিসমা হোই ॥

অর্থাৎ ‘বজ্রাচার্য (পুরুষ) নাচছেন আর দেবী (নারী) গান করছেন। এর ফলে বুদ্ধ নাটক বিপরীতভাবে অনুষ্ঠিত হল।’১৩ এই পদ থেকে প্রাচীন বাংলার বিশেষ ধরনের নাট্যরীতি ‘বুদ্ধ নাটক’ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে যে, এই নাট্যরীতির অভিনয়ে স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েই অংশগ্রহণ করতেন১৪ এবং এ ধরনের নাটকে নাচ-গানের মধ্য দিয়ে বুদ্ধদেবের জীবনের কোন বিশেষ ঘটনা বা বুদ্ধদেবের সমগ্র জীবন-কাহিনীকে মঞ্চরূপ দেওয়া হতো।১৫ কিন্তু চর্যাপদ অভ্যন্তরস্থ কাহ্নু, ডোম্বীর নাটকীয় সম্পর্কের ইঙ্গিত একথাও প্রমাণ করে, শুধু বুদ্ধদেবের জীবনকাহিনীকেই নয় প্রাচীন বাংলার লোকনাট্যরীতি ‘বুদ্ধ নাটকে’ বাংলার গ্রামীণ মানুষের সাধারণ জীবন কাহিনীকেও উপস্থাপন করা হতো। আর এই নাট্যরীতি ছিল ভ্রাম্যমাণ। কেননা, চর্যা সমসাময়িককালে ডোম, কাপালিক, নট ইত্যাদি জীবিকার এবং জাতির লোকদের মধ্যে নৃত্য করা কিংবা গীত-বাদ্যের সমাদর করা খুবই প্রচলিত ছিল। সেই সময়ে বাঙালী সমাজের নিুস্তরে এমন এক শ্রেণীর লোক ছিলেন, যারা নাচ-গান করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন।১৬ এছাড়া গবেষক তো বলেছেনই, ‘১০ সংখ্যক চর্যায় নড়পেড়া শব্দের অর্থ যদি নটপেটিকা হয় তবে দেখা যায় যে, সে-কালে ছোট পেটিকা বা পেটরায় নটনটীর সকল সাজপোশাক থাকতো।’১৭ আসলে, পেটরায় সাজপোশাক রক্ষণাবেক্ষণ পেশাজীবীদের পক্ষেই সঙ্গত। উক্ত ১০ সংখ্যক চর্যায় বিভিন্ন স্থানে নৌকায় করে ডোমনীর আসা-যাওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। এ পদে ডোম্বীর রূপমুগ্ধ ও নৃত্যগুণমুগ্ধ চর্যাপদকর্তা কাহ্নুপা প্রেম নিবেদন করে প্রশ্ন বলেছেন, ‘ওগো ডোম্বী তোমাকে সৎভাবে জিজ্ঞাসা করছি, ডোম্বী কার নৌকায় তুমি আসা-যাওয়া করো।’ মূল চর্যাপদে একথাটি যেভাবে আছে, তা হচ্ছে:
আলো ডোম্বী তু পুছমি সদভাবে।
আইসসি যাসি ডোম্বী কাহেরী নাবেঁ॥

চর্যার এ পদটির পাঠ গ্রহণ করে গবেষকগণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, ‘সেকালে নিম্নবর্ণের নারী-পুরুষেরা নৃত্যগীতাভিনয় প্রদর্শনের জন্য নানা স্থানে আসা যাওয়া করত।’১৮ অতএব তাদের সে পরিবেশনা শিল্পটি ভ্রাম্যমাণভাবে প্রদর্শিত হতো।

প্রাচীনযুগের বাংলায় যে ভ্রাম্যমাণ নাট্যমূলক পরিবেশনা শিল্পের প্রচলন ছিল মধ্যযুগের বাংলায় তা থেমে যায়নি। বরং তা নতুন রূপে নতুন বিশ্বাস ও ভক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন পরিবেশনারীতির জন্ম দেয়। মধ্যযুগের বাংলায় ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্প হিসেবে ধর্মীয় কৃত্যাচার কেন্দ্রিক কিছু পরিবেশনার প্রচলন শুরু হয়। মধ্যযুগে প্রায় সকল কৃত্য পাঁচালির ধারায় ভ্রাম্যমাণ কৃত্যাভিনয় দৃষ্ট হয়। এ পর্যায়ে তার কিছু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা যেতে পারে।

মধ্যযুগের বাংলায় ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা হিসেবে কীর্তনের প্রচলন ছিল। চৈতন্যদেব নাম সঙ্কীর্তন নৃত্য এবং শোভাযাত্রা করতেন। পরিকর পরিবেষ্টিত অবস্থায় তিনি গৃহাঙ্গনে নৃত্য সহকারে নাম সঙ্কীর্তন করতেন, আবার শোভাযাত্রা সহকারেও তা সাধিত হতো।১৯

মধ্যযুগের বাংলায় ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্প হিসেবে বিভিন্ন ধরনের জলনাট্য ও নাট্যমূলক জলক্রীড়ার প্রচলন ছিল। বৃন্দাবনদাসের ‘চৈতন্যভাগবতে’ এই জলক্রীড়া ‘কয়া’ নামে উল্লেখিত হয়েছে। নীলাচলে রামকৃষ্ণের জন্ম-শোভাযাত্রায় চৈতন্যদেব ও তাঁর পরিকরগণ কয়া প্রদর্শন করেছিলেন: ‘গৌড় দেশে জলকেলি আছে কয়া নামে।/সেই জলক্রীড়া আরম্ভিলেন প্রথমে॥’ পানিতে নেমে হাততালি বা তালিবাদ্য দিয়ে এই জলক্রীড়ায় সকলে সমস্বরে ‘কয়া কয়া’ উচ্চারণ করত। শুধু হাততালি নয় সঙ্গে অন্যান্য থাকতো বাদ্যযন্ত্রও থাকতো, সে বর্ণনাও পাওয়া যাচ্ছে ‘চৈতন্যভাগবত’ থেকে, যেমন, ‘কয়া কয়া বলি করতালি দেন জলে।/জলে বাদ্য বাজায়েন বৈষ্ণব মণ্ডলে॥’ ভ্রাম্যমাণ এই কয়া-নাট্যে এক পক্ষ আরেক পক্ষের গায়ে পানি ছুঁড়ে দিতো। একে গবেষকে ভ্রাম্যমাণ ‘জলযুদ্ধ’ বলে উল্লেখ করেছেন।২০

মধ্যযুগের বাংলায় জলে পরিবেশিত আরেকটি ভ্রাম্যমাণ নাট্যমূলক পরিবেশনা শিল্প হচ্ছে ‘কালিয়দমনলীলা’। এই ভ্রাম্যমাণ লীলার বিভিন্ন নাট্যরূপ কখনো কখনো পুকুরে বা দীঘির জলাশয়ে অভিনীত হতো, এই নাট্য পরিবেশনার জন্য প্রথমে যথাযথভাবে কালিয় ফণা বা সাপের ফণা রচনা করা হতো এবং জলাশয়ের মধ্যে তা স্থাপন করে লীলা পরিবেশনার জন্য মঞ্চ নির্মাণ করা হতো। এ ধরনের লীলানাট্যের অভিনয়ে নাগবধূ সাজে কিছু অভিনেতা সে সময় জলে অবস্থান করতেন। মধ্যযুগের বাংলায় প্রচলিত এ শ্রেণীর ভ্রাম্যমাণ কালিয়দমন লীলানাট্যের সুবি¯তৃত বিবরণ আছে মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গলে’, সেখানে স্পষ্টত বলা হয়েছে যে, ‘সুর পুর কৈল হর কালিয়দমন/নাচে মালাধর নৃত্য দেখে দেবগণ।’ গবেষক জানান, উক্ত ‘কালিয়দমনলীলা’ থেকে অষ্টাদশ শতকে কালিয়দমন যাত্রার উদ্ভব হয়। এই ‘যাত্রা’ নামকরণের পেছনের মূল কারণ হলো, সে সময়ে এক স্থান থেকে অন্যত্র গমন করে অভিনয় প্রদর্শন করা হতো। এ বিবেচনায় ‘কালিয়দমনলীলা’ ও ‘কালিয়দমন যাত্রা’কে নিশ্চিতভাবেই ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্প হিসেবে উল্লেখ করা যায়। পরবর্তীতে ‘যাত্রা’ শব্দটি ঊনবিংশ শতাব্দীর কিছু আগে, বিশেষত অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে দোহার অভিনেতা ও অধ্যুষিত নাট্যের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে, যেমন, চণ্ডীযাত্রা, রামযাত্রা, কৃষ্ণযাত্রা।২১ উল্লেখ্য যে, কৃষ্ণযাত্রা হচ্ছে কৃষ্ণের জন্মযাত্রা। মধ্যযুগের বাংলায় কৃষ্ণের জন্মতিথি উপলক্ষে ভ্রাম্যমাণ শোভাযাত্রা অর্থে ‘কৃষ্ণযাত্রা’ শব্দটি ব্যবহৃত হতো। ‘চৈতন্যভাগবতে’ উল্লিখিত আছে, ‘কৃষ্ণযাত্রা অহর্নিশি সঙ্কীর্ত্তন।/ইহার উদ্দেশ্য নাহি জানে কোনজনে॥’ উদ্ধৃতাংশের প্রথম চরণের যৌক্তিক অর্থ হলো কৃষ্ণের নাম বা প্রশংসা কীর্তন। মধ্যযুগের বাংলায় ‘কৃষ্ণযাত্রা’ মূলত ভ্রাম্যমাণ শোভাযাত্রামূলক সংকীর্তন অর্থে ব্যবহৃত হতো। সাধারণত ভাদ্র মাসের কৃষ্ণাষ্টমীতে অনুষ্ঠিত উৎসবে এ ধরনের ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীতে বিভিন্ন রকমের নাট্যাভিনয় পরিবেশিত হতো। এ সকল নাট্যাভিনয়ের বি¯তৃত বিবরণ জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গলে’ আছে, “ভাদ্রে কৃষ্ণাষ্টমী জন্ম যাত্রা নীলাচলে।/কপট কৃষ্ণের জন্ম হইল বন্দিশালে॥/কাপ লৈয়া আল্য যত দেবতা গন্ধর্ব্ব।/নীলাচলে জন্মযাত্রা জগন্নাথের পর্ব্ব॥/কেহো বসুদেব কেহো দৈবকী হইলা।/কংস হয়্যা কেহো কারাগারে বন্দী কৈলা॥/ভাদ্রে কৃষ্ণাষ্টমী তিথি রোহিণী নক্ষত্রে।/মথুরাতে জন্মিলা কৃষ্ণ দুই প্রহর রাত্রে॥/বসুদেব থুইল লঞা নন্দ ঘোষ ঘরে।/যশোদার কন্যা আনি ভাণ্ডিল কংসেরে॥/বিষস্তন পানে কৃষ্ণ বধিল পুতনা।/ব্রহ্ম পদ পাইল তা মাতৃভাবনা॥” স্বয়ং চৈতন্যদেব কৃষ্ণের জন্মযাত্রার নাট্যে অভিনয় করেছিলেন।২২ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রাচীন ও মধ্যযুগে ‘যাত্রা’ শব্দটি প্রথমত বিভিন্ন ধরনের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্প, কৃত্যাচার বা লীলা-নাট্যের প্রদর্শনী অর্থে ব্যবহৃত হতো, কিন্তু এই ‘যাত্রা’ শব্দটিই পরবর্তীতে অর্থাৎ অষ্টাদশ শতকের শেষ দিক থেকে একটি বিশেষ ধরনের নাট্যাঙ্গিক হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে এবং তা আজ একটি জনপ্রিয় নাট্যাঙ্গিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

ঐতিহ্যবাহী ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের সাম্প্রতিক চালচিত্র
বাংলাদেশে অতি প্রাচীনকাল থেকে যে সকল বৈচিত্র্যময় ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার প্রচলন রয়েছে, তার সঙ্গে নিশ্চিতভাবেই যুক্ত রয়েছে এদেশের সাধারণ মানুষের উদার ও নমনীয় কিছু ঐতিহ্যবাহী ধর্মাচার, ভক্তি, বিশ্বাস, প্রেম, অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনা এবং কিছু লোকমানুষের পেশাগত পরিচয়। এ পর্যায়ে বৈচিত্র্যময় সে সকল ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার সাম্প্রতিক চালচিত্র উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রথমেই দেওয়া যাক এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শরিয়তপন্থি মুসলমান সম্প্রদায়ের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার পরিচয়।

বাংলাদেশের অনেক এলাকার শরিয়তপন্থি মুসলমান নারী-পুরুষেরাই তাঁদের কৃত্যমূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠান, যেমন, জন্ম, মুখে-ভাত, মুসলমানি ও বিবাহ উপলক্ষে নানা ধরনের ভ্রাম্যমাণ নাট্যমূলক পরিবেশনা করে থাকেন। কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ও মানিকগঞ্জ অঞ্চলে এ ধরনের পরিবেশনা ভিন্নতর রূপ ও রীতিতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। জানা যায়, ওই সকল অঞ্চলের কিছু হাজাম মুসলমানি দিতে এসে প্রথমেই ঢোল, করতাল, হারমোনিয়াম বাজিয়ে বিশেষ প্রকারের নাচ-গান করে নেন। তারপর তাঁরা তাঁদের জন্য নির্ধারিত খাৎনা দেবার কাজটি সম্পন্ন করে থাকেন।২৩ একই এলাকাগুলোতে মুসলমানি ও বিয়ের আনন্দানুষ্ঠানের অংশ হিসেবে গ্রামের পাড়া-প্রতিবেশীসহ কিছু পেশাজীবী শিল্পী রয়েছেন যারা গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির উঠানে গিয়ে ঘুরে ঘুরে নানা ধরনের নাট্যমূলক পরিবেশনা করে থাকেন।

ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া অঞ্চলের মুসলমানি ও বিয়ের সঙ : উক্ত অঞ্চলের শরিয়তপন্থি মুসলমানদের মুসলমানি (খাৎনা) ও বিয়ের অনুষ্ঠানে এক ধরনের বিশেষ প্রকারের সঙ পরিবেশনার প্রচলন রয়েছে। এ প্রকৃতির সঙ পরিবেশনায় সাধারণত গ্রামের সাধারণ গৃহিণী বা সংসারী নারীরা অংশগ্রহণ করে থাকেন। ক্ষেত্র-বিশেষে সংসারী নারীদের পাশাপাশি তাদের শিশু-কিশোর সন্তানেরাও অভিনয়ে অংশ নেয়। উল্লেখ্য, এ ধরনের সঙ পরিবেশনে বা অভিনয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বা সুগ্রথিত আখ্যান-কাহিনী থাকে না। অভিনয় আনুষঙ্গিক সংলাপ, গান এবং খণ্ড খণ্ড ঘটনার সকল কিছুই ঘটে অভিনেতা ও উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের তাৎক্ষণিক অংশগ্রহণে।

মুসলমানি ও বিয়ে বাড়িতে নিকট আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারটা গ্রাম বাংলার একটি স্বাভাবিক ও অত্যাবশ্যকীয় ঘটনামাত্র। আর অতিথি উপস্থিতির প্রধান রাতটি হচ্ছে: মুসলমানি বাড়ির ক্ষেত্রে মুসলমানি দেবার পর ষষ্ঠ রাত, এবং বিয়ে বাড়ির ক্ষেত্রে বিয়ের আগের রাত ও বিয়ের রাত। গ্রামের রসিক ও আমুদে প্রতিবেশী নারীরাই এই রাতগুলোতে সঙ সেজে এসে সারা বাড়িতে আনন্দ ছড়িয়ে দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে অভিনয়কারীগণ শুধু বিয়ে ও মুসলমানি বাড়িতেই তাদের সঙ পরিবেশনা সীমাবদ্ধ রাখেন না, বরং বিয়ে ও মুসলমানি বাড়ির আনন্দ দানের পর তারা পাড়ার অন্যান্য বাড়িতেও ছড়িয়ে পড়েন এবং একই ধরনের অভিনয় করে থাকেন।

এবারে মুসলমানি ও বিয়ে বাড়ির এই ভ্রাম্যমাণ সঙের পরিবেশনারীতি সম্পর্কে বলা যাক। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, গ্রামের পাড়া-প্রতিবেশীরাই সাধারণত মুসলমানি ও বিয়ে বাড়ির সঙ সেজে থাকেন এবং সঙের অভিনয়শিল্পী হিসেবে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক মানুষ চরিত্র নিয়ে সঙ পরিবেশন করে থাকেন। এক্ষেত্রে মুসলমানি ও বিয়ে বাড়ি থেকে পাড়ার সৌখিন সঙ শিল্পীদের অনেক সময় আগে গিয়ে মৌখিকভাবে সঙ সাজার জন্য আমন্ত্রণ বা অনুরোধ করে আসেন, আবার অনেক সময় সঙ শিল্পীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে সঙের অভিনয় করতে মুসলমানি ও বিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হয়ে থাকেন। সে যা-ই হোক, প্রায় সকল ক্ষেত্রেই প্রতিবেশী নারীরা সঙ সেজে প্রথমে আসেন মুসলমানি বা বিয়ের মূল বাড়িতে। সে বাড়িতে এসে তাঁরা উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনদের মধ্য থেকে নানা-নানি, দাদা-দাদি, চাচা-চাচি, মামা-ভাগ্নে, খালা-খালু, শ্যালিকা-সম্মন্ধী, তাওই-মাওই, বেয়াই-বেয়ান ইত্যাদি সম্পর্ক নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে একটি রসালো নাটকীয় ঘটনার অবতারণা করেন। সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতা ও সঙের অভিনয়শিল্পীদের পারস্পারিক সংলাপ শুরু হয়। এ ধরনের সঙের সংলাপগুলো হয় রসালো এবং রহস্য বা হাস্যরস বিস্তারকারী। কেননা, গ্রাম বাংলায় আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে কিছু সম্পর্ক নিয়ে কিছু রসের ঘটনার লোক-কথা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। মুসলমান ও বিয়ের অনুষ্ঠানের সঙে সেই সম্পর্কগুলো নিয়ে নতুন নতুনভাবে রসিকতা করা হয়ে থাকে। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ করা যায় তা হচ্ছে, সঙের অভিনয়শিল্পীদের সংলাপের পিঠে বাড়িতে উপস্থিত আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীদের কেউ কেউ বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাউন্টার সংলাপ উচ্চারণ করে থাকেন। সে কারণে খুব সহজেই মুসলমানী বা বিয়ে বাড়ির এই ভ্রাম্যমাণ সঙ পরিবেশনা শিল্পে এক একটি সংলাপাত্মক নাটকীয় ঘটনার সৃষ্টি হয়। কখনো কখনো এতে পূর্ণাঙ্গ একটি নাট্যাংশেরও বিস্তার ঘটে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নাট্যাংশের সংলাপাত্মক অংশের সঙ্গে সঙ শিল্পীগণ গীত সংলাপ বা ছন্দ সংলাপ প্রয়োগ করে থাকে।

মুসলমানি ও বিয়ের সঙের আরেকটি প্রধান বিশেষত্ব হচ্ছে, এই ধরনের সঙে সাধারণত সুনির্দিষ্ট এলাকায় প্রচলিত জনপ্রিয় লোকনাট্যসমূহের হাস্য ও করুণ রসাত্মক অংশের অভিনয় উপস্থাপন করা হয়। এক্ষেত্রে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ অঞ্চলে প্রচলিত মুসলমানি বা বিয়ের সঙে ওই এলাকার জনপ্রিয় লোকনাট্য ‘গাজীরগান’, ‘ভাসানযাত্রা’ ও ‘নছিমন পালা’ থেকে বিভিন্ন ধরনের হাস্য-রসাত্মক ও করুণ-রসাত্মক গীত-সংলাপের ব্যবহার সুস্পষ্টভাবেই লক্ষ করা যায়।২৪

মুসলমানি ও বিয়ে বাড়ির সঙে কস্টিউম হিসেবে লোকজ উপাদান লুঙ্গি, ছেঁড়া শার্ট, পাটের আঁশ, শাড়ি, টুপি বা মাথাল, ঘুঙুর, জরির মালা ইত্যাদি ব্যবহার করতে দেখা যায়। অন্যদিকে প্রসস্ হিসেবে এ ধরণের সঙশিল্পীরা বাঁশের লাঠি, ছেঁড়া ছাতা, বাজার করার থলে, বিভিন্ন রকম গাছের পাতা, সাদা কাগজ ইত্যাদি এবং মেকাপ হিসেবে রান্না করা হাড়ির তলার কালি, স্নো-পাউডার বা গমের আটা বা ময়দা ব্যবহার করে থাকেন।

বহুরূপী : মানিকগঞ্জ জেলার বিভিন্ন গ্রামে মুসলমানদের বিয়েতে ‘বহুরূপী’ নামে এক বিশেষরীতির অভিনয় প্রচলিত আছে। ‘বহুরূপী’ পরিবেশনায় সাধারণত সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের বিভিন্ন ঘটনা হাস্য-রসাত্মক অভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। বিয়ে বাড়ির উঠানে কিংবা বিয়ে বাড়ির পার্শ্ববর্তী অন্য কোনো বাড়ির উঠানে বহুরূপী পরিবেশিত হয়। মানিকগঞ্জ অঞ্চলে বহুরূপীর কিছু পেশাজীবী দল আছে। কমপক্ষে দশ সদস্যের একটি বহুরূপীর দল টানা একদিন (সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত) অভিনয় উপস্থাপনের জন্য আড়াই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকার বায়না নিয়ে থাকে। বহুরূপী পরিবেশনায় বিভিন্ন ধরনের মুখোশ, বিচিত্র পোশাক এবং অন্যান্য অভিনয় উপাদান হিসেবে পরিত্যাক্ত স্যালাইন, সিরিঞ্জ, পোড়া ইট, ঘড়া, দড়ি, স্যাম্পুর পরিত্যাক্ত বোতল ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বিয়ে বাড়ির আনন্দ অনুষ্ঠানের উপযোগী পরিবেশনা হিসেবে বহুরূপীর শিল্পীগণ জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রাভিনয় করে থাকেন। তবে, পরিবেশনার শুরুতেই থাকে বন্দনাগীত এবং ছুকরি নৃত্য। তারপর চলতে থাকে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী চরিত্রাভিনয়। মানিকগঞ্জ এলাকার বিয়ের বহুরূপী পরিবেশনার প্রধানতম জনপ্রিয় অভিনয় হচ্ছে ‘বুড়া-বুড়ি।’ এক্ষেত্রে, শুরুতে একজন অভিনেতা বুড়ির মুখোশ মুখে সাদা শাড়ি পরে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে অভিনয় স্থানে আসেন। তিনি এসে বাদ্যের তাল ধরে প্রথমে কিছুক্ষণ নাচেন। আর তার সেই নাচের মধ্যে বাদ্যযন্ত্রীদের দলে বসা একজন সাধারণ পোশাক পরা অভিনেতা দাঁড়িয়ে বুড়ির সঙ্গে সংলাপ বিনিময় করতে থাকেন। সে সংলাপের ভেতর দিয়ে জানা যায় বুড়ি এসেছেন তার বুড়াকে খুঁজতে। এর মধ্যে আরেকটি সুন্দর যুবতীর মুখোশ মুখে বর্ণিল শাড়ি গায়ে পেচিয়ে অন্য একজন অভিনেতা আসরে আসেন। এবার বুড়ি এবং যুবতীর চরিত্র দুই সতীনের অভিনয়ে মেতে ওঠেন। তাদের ঝাগড়া-ঝাটি, তর্কা-তর্কির বুড়ার মুখোশ পরে বিড়ি ফুকতে ফুকতে আরেক অভিনেতা এসে হাজির হন। এবার শুরু হয় এক বুড়াকে নিয়ে দুই সতীতের টানা-টানি। সে টানা-টানির মধ্যে বুড়া এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। শেষে ডাক্তার ডাকা হয়। ডাকা হয় ডাক্তারের বিদেশ ফেরত ডাক্তারনীকে। ডাক্তারদের বিচিত্র রোগ নির্ণয় প্রক্রিয়া ও চিকিৎসায় এক পর্যায়ে বুড়া সুস্থ হন। কিন্তু ডাক্তার ওদিকে বুড়ার যুবতী স্ত্রীর দিকে চোখ রাখেন এবং এক পর্যায়ে প্রেম নিবেদন করেন। বুড়া তাই ডাক্তারকে ধরে অন্য রকম চিকিৎসার কথা বলেন। এভাবে একের পর এক ঘটনার বিস্তারে বিয়ে বাড়ির বহুরূপীর অভিনয় চলতে থাকে। সন্ধ্যা হলে বহুরূপীর অভিনয়ের সমাপ্তি টানা হয়। উল্লেখ্য, কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ অঞ্চলের মুসলমান বিয়েতে যেখানে মেয়েরাই শুধু সঙ সেজে অভিনয় করে থাকে সেখানে মানিকগঞ্জের বহুরূপীর পুরো অভিনয় কিন্তু পুরুষেরাই করে থাকেন।

মুসলমানদের অপরাপর ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার মধ্যে আছে মহররমের শোভাযাত্রা ও মাতম-জারি, মাদার পীরের বাঁশ তোলা ও মাদার বাঁশের নাচ, বেড়াভাসান, ঘোড়া নাচ ইত্যাদি। এবার তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের বিবরণ উপস্থাপন করা হচ্ছে।

মাদার পীরের বাঁশ তোলা ও মাদার বাঁশের নাচ : বাংলাদেশের মুসলমান সম্প্রদায়ের লৌকিক পীরদের প্রধান একজন হচ্ছেন মাদার। লৌকিক পীরের প্রতি ভক্তি প্রকাশের জন্য এদেশের অনেক অঞ্চলের মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যেই দুইটি সরল বা সোজা বাঁশ নিয়ে এক ধরনের নাচ করা হয়ে থাকেন, পল্লী বাংলায় তাকে মাদার বাঁশের নাচ বা মাদার বাঁশের জারি নামে খ্যাত। এ ধরনে নাচ ও জারি সম্পূর্ণরূপে ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, এ ধরনের পরিবেশনাতে ঢোল ও কাঁসি সহযোগে মুসলমান সম্প্রদায়ের কিছু গ্রামীণ লোক দুইটি সোজা বাঁশ নিয়ে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে ঘুরে নৃত্য ও গান করে বেড়ান। তবে, এই নাচের ক্ষেত্রে মাদারের বাঁশ নামে খ্যাত সোজা বাঁশকে কখনও হাতের তালুর উপর, কখনও বুকের উপর, চিবুকের উপর, নাচের উপর, কপালের উপর, কখনও কখনও এক একটি আঙুলের প্রান্ত সীমার উপর নিয়ে কখনও শুয়ে, কখনও দাঁড়িয়ে ব্যালেন্স রেখে এক একজন কুশলী মানুষ নৃত্য করেন। বাঁশ দুইটির মাঝ বরাবর কাপড় পেঁচানো থাকে এবং শেষ প্রান্তে রঙিন এক খণ্ড বস্ত্র বা লাল সালু কাপড় পতাকার মতো জড়িয়ে দেওয়া হয়। শুধু মুসলমান পল্লীতে নয়, হিন্দু পল্লীতেও এই মাদার নাচ দেখানো হয়। এ ধরনের মাদার নাচের পেছনে একটি লৌকিক আখ্যান আছে, প্রসঙ্গক্রমে তা এখানে বর্ণনা করা যেতে পারে: দুই সহোদর; দুই জন মাদার নামে খ্যাত। একজন দম মাদার ও অন্যজন পাগলা মাদার। উভয়েই আধ্যাত্মিক শক্তি-সম্পন্ন; কিন্তু সাংসারিক দৃষ্টিতে পাগলা ছাড়া কিছুই নয়। দম মাদারে বিয়ে; নির্ধারিত দিনে বর ও বরযাত্রীগণ বিয়ে উপলক্ষে যাত্রা করেছেন। বাড়িতে মা একলা আছেন। কিছু দূর যাবার পর মনে পড়ে যায় যে, মাথার পাগড়ি বাড়িতে ভুলে ফেলে আসা হয়েছে। তা নিয়ে আসার জন্য পাগলা মাদার বাড়ি ফিরে আসেন। এসে দেখে যে, মা দুই পা ছড়ায়ে দুই হাতে ভাত তুলে অতি ব্যগ্রতার সাথে আহার করছেন। মাতার এই অদ্ভুত ব্যবহারে মাদার পাগলা অবাক হয়ে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন। মা উত্তরে বলেন, ‘বাবা তোমার দাদা বিয়ে করতে যাচ্ছে, বউ এলে আর ভাত খেতে পারি কি-না ঠিক নাই, তাই আশা মিটিয়ে ভাত খেয়ে নিচ্ছি।’ এই কথায় মাদারের মনে বড় আঘাত লাগে এবং তিনি ফিরে গিয়ে দম মাদারকে সমস্ত কথা জানান। এই কথায় মাতৃভক্ত মাদার ভাতৃদ্বয় বিবাহ যাত্রা স্থগিত রাখেন এবং বিবাহ দল ত্যাগ করে পাগলের মতো নাচতে নাচতে পাশের জঙ্গলে প্রবেশ করেন এবং আশ্চর্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে যান। কিছুদিন পর সেই বনে দুইটি বাঁশ গজিয়ে উঠে। দৈর্ঘে দুইটার মধ্যে ঈষৎ পার্থক্য লক্ষ করা যায়। তখন মাদার ভ্রাতৃদ্বয়ের গুণগ্রাহীগণ সেই বাঁশ মাদার ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রতীকরূপে গ্রহণ করে উল্লিখিতভাবে নেচে বেড়ান। মাদার নাচের জন্ম ইতিহাসের পশ্চাতে লৌকিক মুসলমান সমাজে এই গল্পটি বেশ ভালোভাবেই প্রচলিত রয়েছে। এখনও এক শ্রেণীর মুসলমানদের বিশ্বাস, এক বিশেষ বাঁশে ঈষৎ ছোট-বড় আকৃতির দুইটি সোজা বাঁশ পাশাপাশি জন্মাতে দেখা যায়। সেই বাঁশ দুইটিকেই মাদার ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রতীকরূপে গ্রহণ করে নেওয়া হয়। শরিয়তপন্থি মুসলমানদের শাস্ত্রভিত্তিক আচার ব্যবহারের সাথে এটা সম্পর্কহীন। গবেষকদের ধারণা, মাদার বাঁশ সংক্রান্ত এ ধরনের লোক বিশ্বাস ও কৃত্যাচার সম্ভবত হিন্দুসমাজের কোনো লৌকিক আচারের প্রভাবে লৌকিক মুসলমান সমাজে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, বগুড়া, নাটোর, সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি গ্রামে এ ধরনের মাদার নাচের প্রচলন রয়েছে। এর মধ্যে মানিকগঞ্জ জেলার হাসুলি গ্রামে সাইদুর রহমান বয়াতির বাড়িতে মাদারের বাঁশ তোলা হয় এবং সে গ্রামে প্রতি বছর পৌষ-সংক্রান্তিতে নদীতে ডুবিয়ে রাখা মাদার বাঁশ তোলা হয়, তারপর সেই বাঁশকে মুছে এবং তেল মালিশ করে বিভিন্ন বাড়িতে ঘুরে ঘুরে মাদার বাঁশের জারি ও নাচ করা হয়। অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর থানার কুনকুনিয়া গ্রামের সাজা ফকিরের বাড়িতে মাদার বাঁশ তোলা এবং ওই গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে মাদার বাঁশের নাচ করা হয় প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম সপ্তাহে। এছাড়া, সিরাজগঞ্জ জেলার রায়েরগঞ্জে মাদারের বাঁশ তোলা উপলক্ষে তিন দিনের একটি লোকমেলা বসে জ্যৈষ্ঠ মাসের কোনো এক সময়ে। এ এলাকায় মাদার নাচে পুরুষের পাশাপাশি কখনো কখনো নারীদেরকেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে দেখা যায়।

শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত বিবিধ পরিবেশনা:
বাংলাদেশে ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের প্রধান আরেকটি আয়োজন চলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠান উপলক্ষে। উক্ত অনুষ্ঠানের শোভাযাত্রাকে আশ্রয় করেই সাধারণত ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বাংলা মাসের হিসেবে শ্রাবণ বা ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে জন্মাষ্টমী পালিত হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, দ্বাপর যুগে এই তিথিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন।২৫ বাংলাদেশের সনাতন ধর্মীয় মানুষেরা এই দিনকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তিথি হিসেবে মান্য করে বিচিত্র ধরনের অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা, লীলাকীর্তন, সঙ ইত্যাদির আয়োজন করে থাকে। এইসব অনুষ্ঠানের ব্যাপ্তি গ্রাম ও শহর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে।

বাংলাদেশে গ্রাম পর্যায়ে জন্মাষ্টমীর প্রধান আকর্ষণ থাকে শোভাযাত্রার ভ্রাম্যমাণ সঙে এবং শ্রীকৃষ্ণ ও সখি রাধারাণীর লীলার বিভিন্ন পর্ব, যেমন, নৌকাবিলাস, বস্ত্রহরণ ইত্যাদি। কৃষ্ণলীলার জনপ্রিয় এইসব ঘটনাবলীকে গ্রাম পর্যায়ের কৃষ্ণভক্তগণ সাধারণত শিশু-কিশোরদেরকে সঙ সাজিয়ে অভিনয় করিয়ে থাকেন। শুধু কৃষ্ণলীলার ঘটনাবলীই গ্রামের জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠানে অভিনীত হয় না, পাশাপাশি রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী থেকেও কিছু ঘটনাংশ অভিনীত হয়ে থাকে।

টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানার নগরভাদগ্রামের আউটপাড়াতে প্রতি বছরই জন্মাষ্টমীতে এধরনের সঙ অভিনয়ের প্রচলন আছে। মাঠ-প্রতিবেদনধর্মী একটি গবেষণাগ্রন্থ২৬ থেকে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আউটপাড়ায় অনুষ্ঠিত বিচিত্র পরিবেশনা শিল্পের পরিচয় উল্লেখ করা হলো।

শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি উপলক্ষে সে গ্রামের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পীদের সাজনদার হচ্ছেন গ্রামের ঘেটুযাত্রার প্রবীণ গায়েন সোনাউল্লা। প্রতিবছর তার বাড়ির উঠানেই জন্মাষ্টমীর ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা বিচিত্র সাজ সাজন চলে। সেখানে জন্মাষ্টমীর দিন সকালে কেউ কাউকে সাজিয়ে করে তোলেন বেহুলা, কেউ কাউকে লখিন্দর, রাম, লক্ষ্মণ, সীতা, মহাদেব, হনুমান, কৃষ্ণ, রাধা ও রাধা-সখি। কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রামের এক একজন সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠেন পুরাণ কথার নানান চরিত্র। সাজ গ্রহণ সমাপ্ত হলে সে সকল চরিত্রদের নিয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষের মাঝে হুল্লোড় পড়ে যায়, বেজে ওঠে ঢোল, করতাল। এরপর সেজে ওঠা চরিত্রগুলো সোনাউল্লার বাড়ির উঠান থেকে হেঁটে গ্রামের ধূলি পথ দিয়ে দক্ষিণ দিকের মন্দির প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়। সেখানে বিভিন্ন পুরাণ চরিত্র ও তাদের চরিত্র নির্ভর বিভিন্ন ঘটনাংশের অভিনয় উপস্থাপন করা হয়। অবশ্য তার আগে মন্দিরের পেছন দিকে অবস্থিত দু’টি পুকুরে চার প্রকারের চারটি পরিবেশনা চলে। যার প্রথমে থাকে পুকুরের পানিতে পদ্মাসনে এক সাধকের ভেসে থাকা সাধনা, দ্বিতীয় পর্যায়ে থাকে রাধার বস্ত্রহরণের লীলাভিনয়। এবং পার্শ্ববর্তী অপর পুকুরে থাকে রাধা-কৃষ্ণের নৌকাবিলাস এবং বেহুলার ভাসানের পরিবেশনা। সবশেষে মন্দির প্রাঙ্গণে চলে সীতার অগ্নিপরীক্ষা এবং রাজা হরিশ্চন্দ্রের শ্মশান মিলনের অভিনয়। এ পর্যায়ে উক্ত পরিবেশনাগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা যাক।
জলাশয়ে বা নদী ও পুকুরে নেমে বিভিন্ন ধরনের কৃত্যমূলক অভিনয় উপস্থান বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনারীতি। এখনও এদেশের বহু অঞ্চলে এ ধরনের অভিনয়রীতির প্রচলন রয়েছে। তারই দিব্যরূপ হিসেবে টাঙ্গাইলের আউটপাড়ার দু’টি পুকুরে বর্তমান সময়ের একজন সাধকের সাধনার কীর্তি—পানিতে পদ্মাসনে ভেসে থাকাসহ বিভিন্ন ধরনের পৌরাণিক ঘটনা অভিনয় আকারে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে।

পুকুরে পদ্মাসন : সাধনার কীর্তিকর্মকে জনসমাজে প্রদর্শনের জন্য জন্মাষ্টমী উপলক্ষে টাঙ্গাইলের আউটপাড়া গ্রামের একটি পুকুরে একজন সাধক পদ্মাসনে ভেসে থাকার অভিনয় করে থাকেন। এ সময় গ্রামের শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সকল শ্রেণীর নারী-পুরুষ পুকুরের চার পাড়ে দাঁড়িয়ে সাধকের ভেসে থাকার অভিনয় প্রত্যক্ষ করেন। পুকুরে পদ্মাসনে ভেসে থাকার অভিনয় করার আগে প্রথমত সাধনায় সিদ্ধ সাধক খালি গায়ে এক টুকরা লালসালু কাপড়ে মালকোচা মেরে পুকুরের জলের কাছাকাছি গিয়ে জলে হাত ছুঁয়ে প্রণাম করেন এবং ডান পা আগে দিয়ে পুকুরের জলে নেমে যান। এরপর তিনি বুক পানিতে দাঁড়িয়ে একবার সূর্যের দিকে একবার পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে মন্ত্র উচ্চারণের সঙ্গে চোখ বন্ধ করে একটুখানি ধ্যান করে নেন। সেই ধ্যানের ভেতর পানির উপর দেহ ভাসিয়ে দেন এবং পা দু’টিকে পদ্মাসনের ভঙ্গিতে সংযুক্ত করে—হাত দু’টিকে বুকে উপর ন্যস্ত করেন। সেভাবে তিনি দীর্ঘক্ষণ পুকুরের জলের উপর ভাসতে থাকেন। এ সময় ভাসমান সাধককে ঘিরে পুকুরের জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকেন তাঁর চারজন ভক্ত। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে পুকুরের জলে পদ্মাসনে ভাসমান থেকে সাধক এক সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এই ব্যাপারটি তাঁর ভক্তগণ বুঝতে পেরে তাকে পানির উপর থেকে পাঁজাকোলা করে তুলে এনে মন্দিরের সম্মুখে শুয়ে দেন। ভক্তদের মন্ত্রণা ও সেবার সঙ্গে তাল পাখার বাতাসের ছোঁয়ায় কিছুক্ষণ পর তিনি বোধ ফিরে পেয়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠে বসেন। এ পর্যায়ে উপস্থিত নারী-পুরুষ ভক্তগণ তাঁর সাধনাকে ভক্তি করে তাঁকে প্রণাম করতে শুরু করেন এবং তাঁদের কেউ আবার সাধকের সামনে টাকা-পয়সা প্রদান করেন। সাধারণের ধারণা, ‘সাধক না হলে কেউ কি এভাবে পদ্মাসনে ওইভাবে জলে ভাসতে পারে!’

রাধার বস্ত্র হরণ : শ্রীকৃষ্ণের পৌরাণিক কাহিনীতে আছে একদিন যমুনায় রাধা ও তার সখিগণ স্নান করতে এলে কৃষ্ণ তাদের বস্ত্র হরণ করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে টাঙ্গাইল অঞ্চলের কিছু গ্রামীণ পুকুরে যমুনাতীরে কৃষ্ণ কর্তৃক সংঘটিত রাধা ও সখিদের বস্ত্রহরণের অভিনয় পরিবেশন করা হয়। এক্ষেত্রে আগে থেকেই পুকুরে হেলে থাকা গাছের ডালে ডালে আকাশি, নীল, কমলা আর বেগুনি রঙের চার চারটি শাড়ি ঝুলিয়ে রাখা হয়। আর অভিনয় সময়ে সেই শাড়ি ঝোলানো গাছে কৃষ্ণের সাজে সজ্জিত একটি বালককে তুলে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে বালকটি গাছে বসে প্রথমে তার হাতে ধরা বাঁশিটি নিয়ে বাজানোর ভঙ্গি করে থাকে। তার সে বাঁশি বাদন ভঙ্গির মধ্যে রাধা ও তার সখিদের বেশধারী শাড়ি, ব্লাউজ, পেটিকোট পরা কিছু শিশু কলসী কাঁখে পুকুরপাড়ে আসে। তারা কাঁখের কলসীগুলো গাছের গোড়ায় রেখে পুকুরের জলে নেমে যায়। পুকুরে নেমে প্রথমে তারা স্নান করে নেয় এবং শেষে গাছে ঝুলন্ত শাড়ির দিকে তাকায়, একে অপরের মুখে তাকায়। তারপর কোনো উপায় না দেখে গাছে বসা বালক-শ্রীকৃষ্ণের কাছে হাতের ইশারায় শাড়িগুলো ফেরত চায়। কিন্তু কৃষ্ণ হাতের ইশারাতে জানায় যে, সে তাদের শাড়ি ফেরত দেবে না। রাধা ও তার সখির ভূমিকায় অভিনয়কারী শিশুরা আরও আকুল হয়ে কৃষ্ণকে অনুরোধ করতে থাকে। বারবার অনুরোধের এক পর্যায়ে গাছে বসা কৃষ্ণ শাড়িগুলোকে একটুখানি নিচে নামিয়ে পুনরায় উঁচু করে ধরে। সে সময় রাধা ও রাধা সখিগণ লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে শাড়িগুলো হাতে ধরতে চায়। কিন্তু পারে না। এক পর্যায়ে কৃষ্ণ গাছের ডালের উপর থেকে শাড়িগুলো পুকুরের জলে ফেলে দেয়। রাধা ও রাধা সখিগণ সে শাড়ি নিয়ে দেহে পেঁচিয়ে নেয়। কৃষ্ণ গাছ থেকে নেমে আসে। আর এভাবেই শেষ হয় রাধা বস্ত্র হরণ দৃশ্যের অভিনয়।

47.jpg
জন্মাষ্টমীতে টাঙ্গাইলের নগরভাদগ্রামের পুকুরে নৌকাবিলাস

বেহুলার ভাসান ও শ্রীকৃষ্ণের নৌকাবিলাস : জন্মাষ্টমী উপলক্ষে টাঙ্গাইল জেলার আউটপাড়ার প্রায় প্রতি বছর বেহুলার ভাসান আর রাধা-কৃষ্ণের নৌকাবিলাসের অভিনয় পরিবেশিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে পুকুরটিতে আগে থেকেই একটি খেয়া নৌকা এবং কলাগাছের একটি ভেলা লাল আর সবুজ কাগজে সাজিয়ে ভাসিয়ে রাখা হয়। সে পুকুরে এবার চারজন সাদা ধুতি পরা কিছু মানুষ একটি লাশ কাঁধে এগিয়ে আসেন। তাদের মুখে থাকে ‘হরি বোল, হরি বোল’ ধ্বনি। লাশের পিছে পিছে বেহুলা সাজে ক্রন্দনরত একজন ভক্ত হেঁটে আসতে থাকেন। কাঁধে করা লাশটাকে নিয়ে পুকুরে ভাসমান কলার ভেলার কাছে আসতেই সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন ভক্ত লাশটাকে ধরে ভাসমান ভেলাতে তুলে দেন। আর অমনি নতুন শাড়ি পরে থাকা বেহুলা চরিত্রটি উঠে বসেন ভেলাতে শুয়ে ভাসমান লখিন্দরের মাথার কাছে। লখিন্দরের দেহ ঢাকা কাপড়টাকে কেউ একজন পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দিয়ে ভেলাটাকে ভাসিয়ে দেন পুকুরের মাঝ বরাবর। এরই মধ্যে একই পুকুর পাড়ে ছুটে আসেন বাঁশি আর বৈঠা হাতে বর্ণিল পোশাকে সজ্জিত শ্রীকৃষ্ণরূপী একজন অভিনেতা। তিনি এসেই পুকুরে ভাসমান খেয়া নৌকাতে উঠে বাঁশিটি কোমরে বেঁধে বৈঠা দিয়ে নৌকা বাইতে বাইতে পুকুরের মাঝ বরাবর চলে যান। এবার একজন রাধার সাজে একদল সখিসহ পুকুর পাড়ে এসে দাঁড়ান। তারা হাতের ইশারায় কৃষ্ণকে ডেকে নদী পার করে দিতে অনুরোধ করতে থাকেন। শ্রীকৃষ্ণ তাদের সে অনুরোধের ভেতর এক একবার নৌকা কূলে ভেড়ান এবং রাধার ঠিক কাছে এসে বৈঠা দিয়ে পানি ছিটিয়ে নৌকাকে দূরে সরিয়ে নেন। রাধা আর সখিরা এরমধ্যে বারবার বিনয় করে শ্রীকৃষ্ণকে কাছে ডাকেন এবং নদী পার করে দিতে অনুরোধ করেন। মাঝে মাঝে তারা পার করে দিতে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি জোড় হাতে অনুনয় করেন। কিন্তু কৃষ্ণ বারবার একই কর্ম করতে থাকেন। মজার বিষয় হচ্ছে, একই পুকুরের একদিকে যখন বেহুলা-লখিন্দরের ভাসান এবং অন্যদিকে রাধা-কৃষ্ণের নৌকাবিলাসের পরিবেশনা চলে তখন মন্দির প্রাঙ্গণের মাইকে ঘুরে ফিরে গীত হতে থাকে দুটি গান: ‘পতি কেন রে মইল’ এবং ‘পার করে দাও আমারে’। পুকুরের চার পাড়ে বিচিত্র পোশাক পরে দাঁড়িয়ে গ্রামের বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ এই ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পকে উপভোগ করে থাকেন।

সীতার অগ্নিপরীক্ষা : রামায়ণ বাংলাদেশের জাতীয় মহাকাব্য। এই কাব্যের যে সকল চরিত্র এবং চরিত্র নির্ভর ঘটনা এদেশের মানুষের কাছে অতিশয় জনপ্রিয়জ্জতার মধ্যে সীতা এবং সীতার অগ্নিপরীক্ষার ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। প্রতিনিয়তই এদেশে প্রচলিত রামায়ণ নির্ভর লোকনাট্যরীতি রামলীলা, রামকীর্তন, রামমঙ্গল ও কুশানগানের আসরে উক্ত চরিত্র এবং চরিত্র নির্ভর হৃদয়স্পর্শী ঘটনাটি মঞ্চস্থ হয়ে থাকে। কিন্তু টাঙ্গাইল অঞ্চলে জন্মাষ্টমীর কৃত্যমূলক অনুষ্ঠানে ঘটনাটি ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে রাধা-কৃষ্ণ মন্দির প্রাঙ্গণের পশ্চিমে সীতার অগ্নিপরীক্ষার দৃশ্যটি অভিনয় আকারে পরিবেশিত হয়। সেখানে এই দৃশ্যটি সংঘটনের জন্য রাম ও লক্ষ্মণ সেজে আসেন দুইজন সাধারণ গ্রামীণ অভিনেতা। তারা নির্ধারিত স্থানে এসে দাঁড়াতেই তাদের সমানে এসে দাঁড়ান সীতা চরিত্রের বেশধারী একজন অভিনেতা। তিনি অগ্নিপরীক্ষায় তাকে আগুনে নিক্ষেপ না-করার জন্য জোড় হাতে রাম-লক্ষণের দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় হনুমান বেশধারী আরেকজন অভিনেতাও সীতাকে অগ্নিপরীক্ষায় নিক্ষেপ না-করার জন্য রামকে অনুরোধ করতে থাকেন। কিন্তু রাম তার সীদ্ধান্তে অনড় থাকেন। এ রকম দৃশ্যের অভিনয় মুহূর্তে মন্দির প্রাঙ্গণের মাইক হতে রামায়ণে সংঘটিত অগ্নিপরীক্ষার কাহিনী বর্ণনা করা হয়। উল্লেখ্য, মাইকের সেই বর্ণনা-মতো উক্ত পরিবেশনায় রাম, লক্ষণ, সীতা ও হনুমান চরিত্র মূলত আঙ্গিক অভিনয় করে থাকেন। এক সময় মাইকের সেই বর্ণনা-মতোই সীতা চরিত্র তার সামনে জ্বলন্ত আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দর্শকদের অনেকে সে সময় শিহরিত হয়ে ওঠেন। কেননা, সত্যি সত্যি জ্বলন্ত আগুনের ভেতর সীতা চরিত্রে রূপদানকারী ঝাঁপিয়ে পড়েন। উপস্থিত দর্শকদের অনেকে অবাক হয়ে ঝুঁকে পড়ে অভিনয়ের শেষটা দেখতে চান। শেষ পর্যন্তজ্বলন্ত আগুন নিভে গেলে সীতা চরিত্রকে অভিনয়স্থানে অক্ষত অবস্থায় দেখা যায়।

আসলে, এ ধরনের দৃশ্য সংঘটনের আগে অগ্নিপরীক্ষার জন্যে মাটিতে একটি গর্ত খুঁড়ে তার চারদিকে সুপারির পাতা পুঁতে গর্তটাকে আড়াল করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, সুপারি পাতায় মাটির গর্তটি ঢাকা থাকে। সুপারি পাতার বাইরের দিকে খড়-বিচালি বিছিয়ে কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন জ্বেলে দেওয়া হয়। জ্বলন্ত সেই আগুনের ওপর দিয়ে সীতা চরিত্র গর্তে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং গর্তের ভেতর তিনি আত্মরক্ষা করেন। সবশেষে কিছুক্ষণের মধ্যে আগুন নিভে গেলে সীতা অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আবার সশরীরে ভূমির উপর উঠে আসেন। এ রকম অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ সীতাকে রাম এবার সাদরে গ্রহণ করে নেন।

রাজা হরিশ্চন্দ্রের শ্মশান মিলন : কৃত্তিবাসী রামায়ণের সূচনায় বর্ণিত ‘রাজা হরিশ্চন্দ্রের উপাখ্যান’ অবলম্বনে প্রচলিত ‘রাজা হরিশ্চন্দ্রের শ্মশান মিলন’ আখ্যানটি বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এর আখ্যানে সর্বস্ব-ত্যাগী এক রাজার কাহিনী আছে। তিনি হচ্ছেন রাজা হরিশ্চন্দ্রজ্জযিনি তার রাজমহিমা, রাজআসন, রাজ্য-সব ত্যাগ করে ডোমের কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। এক্ষেত্রে শ্মশানঘাটে চিতা পোড়ানোই তার মূল কাজ। এর বিনিময়ে তিনি যা কিছু পারিশ্রমিক পানজ্জতা দিয়ে জীবন চালান। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে টাঙ্গাইলের আউটপাড়া মন্দির প্রাঙ্গণের দক্ষিণ দিকে ‘রাজা হরিশ্চন্দ্রের শ্মশান মিলন’-এর অভিনয় উপস্থাপনের জন্য আগে থেকেই শ্মশান ঘাট এবং চিতার জন্য বাঁশ, পাটকাঠি, খড়, অশ্বত্থ শাখার একটি বিশেষ আসন তৈরি করা হয়ে থাকে। মন্দির প্রাঙ্গণে নির্মিত সেই শ্মশানে হরিশ্চন্দ্র অন্যান্য সকল ডোমের সঙ্গে সিদ্ধি, সুরা ইত্যাদি পান করেন এবং শ্মশানে আনা এক একটি মরদেহ চিতায় দহন করেন। এক পর্যায়ে দেখা যায়, একজন নারী একটি শিশুর মরদেহ কোলে করে আনেন। নারীটি তার শিশুপুত্রের মরদেহ আগলে কাঁদতে কাঁদতে শ্মশানের ডোমদের মরদেহটিকে চিতায় তুলে দিতে বলেন। কিন্তু নেশা-আসক্ত ডোমদের সরদার রাজা হরিশ্চন্দ্র অর্থ বা টাকা ছাড়া মরদেহ চিতায় তুলতে রাজি হন না। নারীটির সঙ্গে কোনো টাকা-পয়সা ছিল না। তাই তিনি অনেক আকুতি করে ডোমদের তার শিশুপুত্রের মরদেহকে দাহ করতে অনুরোধ করেন। ডোম সরদার হরিশ্চন্দ্রের দৃঢ়তায় ডোমরা কিছুতেই তাতে রাজি হন না। নারী তখন দ্বারে দ্বারে ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করে কেঁদে কেঁদে। অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে কখনো কখনো কাঁন্নায় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। যা দেখে মনে হয় এটা কোনো অভিনয় নয়, যেন সত্য ঘটনা ঘটছে তার জীবনে। শেষ-মেশ অর্থ সংগ্রহ শেষে নারীটি আবার শ্মশান ঘাটে আসেন। এবারে অর্থ দিয়ে যখন পুত্রের মরদেহকে চিতায় তোলার অনুরোধ জানান, তখনই রাজা হরিশ্চন্দ্রের চোখে পড়ে নারীটির মুখ। হরিশ্চন্দ্র চিনতে পারেনজ্জতার স্ত্রী শৈব্যাকে, আর যে পুত্রকে চিতায় তুলতে তিনি অর্থ দাবি করেছিলেনজ্জসে তো তারই পুত্র। হরিশ্চন্দ্র নিজের ভুল বুঝতে পেরে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়েন। যেন এও তার অভিনয় নয়। তিনিও এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। গ্রাম্য ডাক্তার বা কবিরাজ এসে তার মুখে পানির ছিটানি দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনেন। রাজা হরিশচন্দ্র সর্বস্বত্যাগী হলেও বংশপ্রদীপ পুত্রকে হারাতে চান না। তাই ডাকা হয় বিশ্বামিত্র মুনিকে। বিশ্বামিত্র মুনি এসে যজ্ঞ করে রাজা হরিশ্চন্দ্রের পুত্রের জীবন ফিরিয়ে আনেন।

এভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, রামায়ণসহ আরও কিছু পুরাণ-কথার পরিবেশ সৃষ্টি করে নানা রকমের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার প্রচলন রয়েছে। এ ধরনের পরিবেশনাতে সাধারণত তেমন কোনো সংলাপ বা বর্ণনা থাকে না ঠিকই কিন্তু ঘটনাগুলো গ্রামের সাধারণ মানুষের অভিনয়-কৌশলের গুণে এমনিতেই যেন কথা বলে ওঠেজ্জযে কথা শোনার জন্য দর্শকের কানের চেয়ে চোখই অধিক ক্রিয়াশীল থাকে। এতো গেলো জন্মাষ্টমী উপলক্ষে ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের গ্রামীণ চালচিত্র। এবার শহরকেন্দ্রিক ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের কথা যাক।

ঢাকা মহানগরের ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা : বাংলাদেশের শহরকেন্দ্রিক মানুষের চিত্তবিনোদনের একটি অন্যতম অঙ্গ হচ্ছে জন্মাষ্টমীতে আয়োজিত সঙের মিছিল। বহু আগে থেকে রাজধানী ঢাকার জন্মাষ্টমী মিছিলে ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্প হিসেবে সঙের উল্লেখ পাওয়া যায়। ঢাকার ইতিহাস রচয়িতা যতীন্দ্রমোহন রায়ের লেখা থেকে জানা যায় যে,জ্জঅনুমানিক ১০২০ বঙ্গাব্দে বা ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দের পর ঢাকার জন্মাষ্টমী মিছিলে ভ্রাম্যমাণ সঙ-এর পরিবেশনা যুক্ত হলে সমগ্র জন্মাষ্টমী মিছিলের উৎকর্ষ সাধিত হয়। তখনকার ঢাকায় ব্রজলীলার সঙ, অর্থাৎ কৃষ্ণলীলার বিভিন্ন চরিত্রের সঙ সেজে কিছু অভিনেতা জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত শোভাযাত্রার অগ্রভাগে অংশগ্রহণ করত।২৭ এখনও ঢাকার জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রায় কৃষ্ণলীলা বিষয়ক ভ্রাম্যমাণ সঙ-এর প্রচলন লক্ষ করা যায়।

সাম্প্রতিক কালে ঢাকার মহানগরের জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রাতেই সাধারণত ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্প হিসেবে কৃষ্ণলীলা বিষয়ক সঙের মধ্যে কেউ কেউ রাধা-কৃষ্ণের সাজ গ্রহণ করে থাকেন। এক্ষেত্রে রাধা-কৃষ্ণ হিসেবে অল্প বয়সী বালক-বালিকাদের এবং কংসরাজ ও অন্যান্য চরিত্রে বয়স্কদেরকে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। এ ধরনের সঙে কৃষ্ণের মাথায় একটি বর্ণিল মুকুল এবং হাতে বর্ণিল একটি বাঁশি স্থান পায়।

বহু বছর ধরে ঢাকা মহানগরের জন্মাষ্টমীর ভ্রাম্যমাণ সঙ পরিবেশনার একটি সাধারণ চিত্র এই যে,জ্জশোভাযাত্রার অগ্রভাগে ঘাতক কংসরাজ রূপী একজন অভিনেতা এবং শিশু-কৃষ্ণ সমেত নাগ ছায়া দেওয়া একটি ঝুড়ি মাথায় নিয়ে একজন শ্মশ্রুমণ্ডিত অভিনেতা হাঁটতে থাকেন। অবশ্য, কোনো কোনো বছর এই সঙের দলে রাধা-কৃষ্ণের সাজ গ্রহণ করে আরও দু’একজন শিশু-কিশোরকে শোভাযাত্রায় অংশ নিতে দেখা যায়, এমনকি হাতি, ঘোড়ার পিঠের উপর উঠে তাদের অভিযাত্রা লক্ষ করা যায়।

উনিশ শতকের মধ্যে ঢাকার জন্মাষ্টমী মিছিল ও তার শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্প হিসেবে সঙ জমকালো রূপ ধারন করে এবং সারাদেশে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় ঢাকার জন্মাষ্টমী মিছিল দেখতে দূরদূরান্ত থেকে লোক আসতে থাকে। পুরো ঢাকা তখন হয়ে উঠত উৎসবের নগরী। তখনকার দিনে ঢাকার জন্মাষ্টমী মিছিলে—তামাশায় কতকগুলো বড় চৌকি ও ছোট চৌকি এবং হাতি ঘোড়া ও পদাতিকের মিছিল বাহির হইয়া থাকে। বড় চৌকিতে পৌরাণিক ঘটনার প্রতিমূর্তি প্রদর্শিত হয়, ছোট চৌকিতে নাচ ও বিবিধ প্রকার সঙ্গ(ং) প্রভৃতি বাহির হয়। এই সমুদয় চৌকিবেহারা স্কন্ধে করিয়া মিছিলের সঙ্গেই লইয়া যায়। ছোট চৌকিতে যে সকল সঙ্গ(ং) ও কৌতুকজনক অনুকরণ বাহির হয়, তাহাতে অনেক প্রকার অশ্লীল গানাদি থাকে।’২৮ এটা হচ্ছে ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দের ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকার ভাষ্য। এই বিবরণের আরো কিছু কাল পরে আসা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্তের কৈশোর কেটেছে ঢাকায়। বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের জন্মাষ্টমীর মিছিলের বিবরণ আছে তাঁর আত্মজীবনীতে। দেখা যায়, ঢাকার জন্মাষ্টমীর দুইদিনের মিছিল দেখতে আশেপাশের গ্রাম ভেঙে লোক আসত। একদিন মিছিল বের হতো নবাবপুর থেকে আর অন্যদিন মিছিল বের হতো ইসলামপুর থেকে। এই মিছিল দুটিতে নানা রকমের সঙ থাকত, সেই সঙে বহু সমসাময়িক ঘটনা সম্বন্ধে ব্যঙ্গ এবং বিপক্ষ দলের বক্রোক্তি চলত।২৯ গবেষকগণ জানিয়েছেন, ঢাকার জন্মাষ্টমী মিছিলের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মিছিলে ভ্রাম্যমাণ সঙ বা সঙের মিছিল। সঙের মিছিলে বিভিন্ন রকম গান করা হতো। এবং সময়ের বিবর্তনে তা পরিবর্তিতও হতো।৩০

ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্প হিসেবে সঙের উপস্থিতি প্রধানত ঢাকার জন্মাষ্টমী শোভাযাত্রাতে লক্ষ করা গেলেও পরবর্তী পর্যায়ে ঢাকার সঙ শুধু জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নি, ঢাকার এই সঙ কালক্রমে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন শোভাযাত্রায় তার স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়।

অন্যান্য শহরের শোভাযাত্রা : জন্মাষ্টমী উপলক্ষে নাগরিক শোভাযাত্রার চল শুধু ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে বিচিত্র ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনাসহ জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। চট্টগ্রামের জেএম হল প্রাঙ্গণ থেকে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে, নেচে গেয়ে, কীর্তন পরিবেশন করতে করতে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে থাকে, উক্ত শোভাযাত্রার অগ্রভাগে ঘোড়া টানা রথের উপর দাঁড়িয়ে কৃষ্ণ সাজে একজন অভিনেতা একহাতে শঙ্খ মুখে ধরে বাজাতে থাকেন আর অন্যহাতে রথের রশি ধরে রাখেন। এছাড়া, বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার বুড়া কালিতলা মন্দির, মাদারীপুর বলরাম দেব মন্দির, ফরিদপুরের গোয়ালচামট শ্রীধাম, বাগেরহাট কেন্দ্রীয় হরিসভা, ময়মনসিংহ দুর্গাবাড়ি মন্দির, নারায়ণগঞ্জ লক্ষ্মীনারায়ণ আখড়া প্রাঙ্গণ, ফেনী মাস্টারপাড়া শ্রীশ্রী গুরুচক্র মন্দির এবং রাজশাহী, খুলনা, নেত্রকোণা, বরিশাল, শ্রীমঙ্গল, পঞ্চগড়, পিরোজপুর, খাগড়াছড়ি, পটুয়াখালীর বিভিন্ন মন্দির থেকে প্রতি বছর বেশ ঘটা করে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা বের হয়ে থাকে। এ সকল শোভাযাত্রাতে ঢোল-করতালের ধ্বনির সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের গান পরিবেশিত হয়ে থাকে।

চৈত্র-সংক্রান্তির ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা :
চৈত্র-সংক্রান্তি উপলক্ষে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচিত্র ধরনের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার অস্তিত্ব রয়েছে। সাধারণত ঐতিহ্য অনুসারে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া নিম্নবর্গের গ্রামীণ সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষেরাই চৈত্র-সংক্রান্তির ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও উত্তরকালে নাগরিক পরিমণ্ডলের শিক্ষিত ও শিল্পরসিক মানুষেরা ভ্রাম্যমাণ সেই পরিবেশনা শিল্পকে বাংলা বর্ষ বরণের শোভাযাত্রায় অসাম্প্রদায়িক কৃত্যাচারে রূপান্তর করেছে। এ পর্যায়ে মাঠ-প্রতিবেদনধর্মী গবেষণাগ্রন্থ৩১ থেকে চৈত্র-সংক্রান্তি উপলক্ষে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের বিবরণ উপস্থাপন করা হলো।

টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানাধীন নগরভাদগ্রাম, চরপাড়া ও শেওড়াতৈল গ্রামে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ বছর ধরে চৈত্র-সংক্রান্তি উপলক্ষে ভ্রাম্যমাণ বিভিন্ন ধরনের কৃত্যানুষ্ঠান বা পরিবেশনা শিল্পের প্রচলন রয়েছে। এই সব কৃত্যানুষ্ঠানের মধ্যে আছে শোভাযাত্রা বা মিছিল, বাইদ্যার নাচ বা বাইদ্যার নৃত্যগীত, বীচট, কালি কাচ, পরীনাচ, ডুগনী, কবিতা, কুচকি বানাম, মইন জাগানো, সঙখেলা, চড়ক ও স্বাদগ্রহণ। এবারে পর্যায়ক্রমে সেই সব ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্প বা কৃত্যানুষ্ঠানের বিবরণ তুলে ধরা হলো।

প্রতি বছর চৈত্র-সংক্রান্তির ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা হিসেবে টাঙ্গাইল জেলার নগরভাদগ্রামের প্রবেশ পথেই চোখে পড়ে পৌরাণিক চরিত্র শিব-পার্বতী, অসুর, হনুমান, কালী, রাধা-কৃষ্ণের শোভাযাত্রা, স্থানীয় ভাষায় এই শোভাযাত্রাকে ‘মিছিল’ বলা হয়ে থাকে। আর এই পৌরাণিক চরিত্রে রূপ দান করেন গ্রামের বিভিন্ন বয়সী শিশু-কিশোর ও তরুণেরা। শোভাযাত্রা বা মিছিলে অংশগ্রহণকারী চরিত্রগণ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে যেয়ে বাদ্য সহযোগে নেচে ভক্তদের প্রণাম, ভক্তি এবং কিছু সম্মানী বা টাকা-চাল-ডাল গ্রহণ করে থাকেন। বাদ্যযন্ত্র হিসেবে খোল, মন্দিরা ও হারমোনিয়াম ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ ধরনের মিছিলের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে হর-গৌরীর নাচ এবং বাইদ্যার নাচ-গান। প্রতিটি মিছিলের দল গ্রামে পথ দিয়ে হেঁটে সাধারণত বাড়ির ভিতরের উঠানে গিয়ে নাচ অথবা নাচ-গান করে থাকে। এক্ষেত্রে হর-গৌরীর নাচে বাদ্য হিসেবে খোল, করতাল, কাসার বাদন ও তাল সংযোগে গান ব্যবহৃত না-হলেও বাইদ্যার নাচে সুরযন্ত্র হিসেবে হারমোনিয়াম এবং একজন গায়কের গান ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আসলে সুর-তাল আর গানের সঙ্গেই বাইদ্যার নাচ পরিবেশিত হয়ে থাকে।

বাইদ্যার নাচ : এই বাইদ্যার নাচে দুই বাইদ্যানী নেচে নেচে তাদের একমাত্র বাইদ্যাকে লক্ষ করে গাইতে থাকেন। আর সঙ্গে সঙ্গে বাইদ্যা নেচে নেচে দূরে চলে যেতে থাকেন: ‘বাইদ্যা আমার ভালোবাসে না।/বাইদ্যা মারে আর হাসে/কিছু কই না তরাসে/আমার ভাই নাইরে দ্যাশে॥’ বাইদ্যা নিজেও বাইদ্যানীদের সঙ্গে নেচে বৃত্ত তৈরি করে ঘোরেন। নাচের মধ্যে সামান্য দৌড়ে তারা একবার বৃত্তের কেন্দ্রের দিকে ঝুঁকে পরক্ষণেই পায়ে পায়ে তাল ঠুকে বাইরের দিকে বেরিয়ে আসেন। তাদের নৃত্যে থাকে ছন্দময় একটি কাব্যিক ভঙ্গিমা। এক্ষেত্রে সাধারণত উঠানে বসে আরো কয়েকজন শিল্পী তাদের নাচে-গানে যন্ত্রসঙ্গত করেন। তাদের কেউ হারমোনিয়াম, কেউ মন্দিরা, কেউ বা খোল বাজাতে থাকেন। আগেই বলা হয়েছে, তাদের সঙ্গে একজন গায়েনও থাকেন। তিনি-ই তো বিচিত্র সুর-ছন্দে গেয়ে চলেন: ‘আমার বাইদ্যা জাতির এই তো রীতি/ঘর ছাড়িয়া বাইদ্যার নৌকায় বসতি॥’ তার সঙ্গে দোহার হয়ে বাইদ্যানীরাও গায়তে থাকেন: ‘বিধি আমায় চিনো নি/হুদিনের পরে আইলাম আমি/ই তো বাইদ্যানী॥’ উঠানে উপস্থিত দর্শনার্থীদের মুগ্ধতা বুঝে এই বাইদ্যার নাচ কখনো কখনো একটু সময় নিয়েই চলে। আর নাচ শেষে নৃত্যক বাইদ্যানী ছুটে যান গৃহস্বামী বা গৃহপত্মীর দিকে। তারা বাইদ্যানীকে টাকা দান করতেই এক বাড়ির পর্ব শেষ করে বাইদ্যা নাচের শিল্পীগণ অন্য বাড়িতে ছুটে যান। যতক্ষণ সূর্যের আলো থাকে ততক্ষণ তারা গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে এই বাইদ্যার নাচ ও গান করতে থাকেন।

কবিতা ও ডুগনি : চৈত্র-সংক্রান্তির দিন সন্ধ্যায় টাঙ্গাইলের বিভিন্ন গ্রামের হর-গৌরী পূজা মন্দিরের সামনে কবিতা শুরু হয়। এ এক অদ্ভুত কবিতা। ঢাকের চটাঙ চটাঙ শব্দের তালে একজন মুখস্থ প্রচলিতপুরাণ কথা ছন্দে ছন্দে, ধীর লয়ে গেয়ে চলেন, সাথে থাকেন কয়েকজন দোহার। তারা গায়কের ছন্দ কথার সাথে দোহারকি করতে থাকেন। এই পরিবেশনারীতিকে স্থানীয় জনসাধারণ ‘কবিতা’ বলে উল্লেখ করে থাকেন। আসলে, এই পরিবেশনারীতিকে আশ্রয় করে উপস্থিত দর্শক-ভক্তদের কানের কাছে ঢাকের চটাঙ চটাঙ শব্দের সঙ্গে রামায়ণ পাঠ করে শোনানো হয়ে থাকে। এ ধরনের ‘কবিতা’ পরিবেশনের পর শুরু হয় ‘ডুগনি’। এ পর্বের পরিবেশনাতে ঢাক বাদ্যের ভেতর পুরাণকথার ছন্দ গীতির সাথে সামান্য একটু নৃত্য যুক্ত হয়। সাধারণত পাড়ার পুরুষদের অংশগ্রহণে এ ধরনের কবিতা ও ডুগনি’র পরিবেশনার মধ্যে সন্ধ্যা অতিক্রান্ত হয়ে যায়। রাতে শুরু হয় বিভিন্ন ধরনের নৈমিত্তিক ঘটনার উপভোগ্য উপস্থাপনা: বীচট, যার সঙ্গে পূজার চেয়ে কৃষকের চাষ-বাসের সম্পর্কই বেশি।

বীচট : বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চৈত্র-সংক্রান্তির রাতে হর-গৌরীর পূজা মন্দিরের সামনেই বীচট বা বীজ বোনার একটি নাট্যমূলক পরিবেশনার প্রচলন আছে। এক্ষেত্রে প্রথমেই একজন পুরুষ ভক্ত একটি গামছা পরনে ও অন্য একটি গামছা কাঁধে ঝুলিয়ে হাইলা বা কৃষকের ভূমিকায় কাঠের পিঁড়িতে পদ্মাসনে বসেন। সাথে সাথে অন্য একজন ভক্ত তার মাথায় এক ধামা ধানবীজ চাপিয়ে দেন। হাইলার ভূমিকা গ্রহণকারী ভক্ত দুই হাতে ধানবীজের সে ধামাটি কিছুক্ষণ মাথার উপরে ধরে রাখেন। এবারে মন্দিরের পূজাকার্য রেখে গোছদার বা ‘সঞ্জিমা’ এসে হাইলার পেছনে দাঁড়ান এবং ধানবীজের ধামাটাকে কাত করে হাইলার মাথার চারদিকে ঘোরাতে থাকেন। এতে ধামার ধানগুলো হাইলার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ছোট ছোট প্রাণবন্ত শিশুরা সশব্দে যথাক্রমে লাঠি হাতে বাওই (বাবুই) তাড়াতে শুরু করে, লাঠি ফেলে ফসল কাটে, ফসল মাড়াই করে এবং সেই ফসল গুছিয়েও রাখে। হাইলা এবার গোছানো সে ফসল নিয়ে ভাগ করতে শুরু করেন। এক্ষেত্রে প্রথমেই হাইলা তার ফলানো ফসলকে দু’ভাগ করে নিয়ে একভাগ লুকিয়ে রাখেন। আর অন্যভাগ ফসলকে তিনি আবার দু’ভাগ করে বলেন: ‘এর এক ভাগ তার আর অন্য ভাগ শিবপূজার।’ তার একথার পর পূজার ফসল সাঞ্জিমা ধামায় করে মন্দিরে তুলে নেন। এভাবেই ধান তোলা পর্বের সমাপ্তি হয়। কিন্তু বীচট পর্বের তখনো অনেক বাকি। নতুন বছরের আগমনে হাইলাগণ এবার গণক ঠাকুরের শরণ নেন, ‘আরে ও গণক।’ তাদের ডাকে গণক ঠাকুর আসেন গামছা পরনে, সাদা জামা গায়ে, কুষ্টার দাড়ি মুখে, গরুর দড়ির পৈতা কাঁধে, হাতে একগাদা কাগজ নিয়ে, খালি পায়ে। গণক ঠাকুর বাড়িতে এলেই হাইলারা তার পরিচয় জানতে চান। ঠাকুর সে কথার বড় অদ্ভুত জবাব দেন। যেমন, তাকে প্রশ্ন করা হল যে, ‘আপনের পরিচয়?’ তিনি ছন্দ করে উত্তর দেন, ‘আমি আইটার গণক। কথা বড় টনক। রাম গণকের ভাই। মিথ্যা কথা ছাড়া আমার কাছে সত্য কথা নাই’ ইত্যাদি। তারপর হাইলার অনুরোধ মতো গণক ঠাকুর তার সঙ্গে আনা কাগজপত্র খুলে উঠানে বসে পড়েন। শুরু হয় তার গণনাকর্ম। গণকের গণনা শেষে হাইলার দরকার পড়ে ব্রাহ্মণ ঠাকুরের। হাইলারা এবার ব্রাহ্মণ ঠাকুরের কাছে হালের গরু চান। কেননা, বীচটের দিন তাকে চাষ দিতে হবে, ফসল বুনতে হবে। তার ডাকে ব্রাহ্মণ ঠাকুর এলে হাইলা তার কাছে জানতে চান, ‘গুরু ঠাকুর, আপনার কাছে গরু আছে না?’ ঠাকুর রেগে গিয়ে উত্তর করেন, ‘হই আমি ব্রাহ্মণ মানুষ গরুর ব্যবহার করি না।’ শেষ পর্যন্ত হাইলার টাকা নিয়ে ব্রাহ্মণ ঠাকুর গরুর প্রতীক হিসেবে গরুর ভূমিকায় অভিনয়কারী একদল শিশু-কিশোরকে হাল কাজের জন্যে দিয়ে যান। কিন্তু টাকার বিনিময়ে গরু কেনার পর হাইলা যখন হালচাষ করতে যান, তখন দেখেন গরু জোড়া হাল টানতে পারে না। বারবার শুয়ে পড়ে। দরকার হয় গো-চিকিৎসকের। সাথে সাথে দূর থেকে গো-চিকিৎসক বা ‘গোয়াল’ ডেকে ওঠেন, ‘গো’। হাইলা এবার গো-চিকিৎসককে ডাক দেন, ‘এই যে এদিক আইসো।’ গোয়াল হাইলার ডাকে এগিয়ে এলে হাইলা তাকে বলেন, ‘গরুর কী হয়চে দেখন লাগবো।’ গোয়াল গরুর গায়ে, হোলে, লেজে হাত দিয়ে গরু দেখেন। সে সময় গরুর ভূমিকায় অভিনয়কারী শিশু-কিশোররা গোয়ালকে লাথি ছুড়ে মারে। এতে করে তাদের পায়ে বাঁধা নুপুরে রুমঝুম শব্দ হয়। গোয়াল ভালো করে গরু দেখে বলেন, ‘গরুর তো ব্যাঙ্গা হইছে।’ তারপর গোয়ালের চিকিৎসায় গরু ভালো হয়। হাইলা চাষ দেওয়া ও ফসল বোনার অভিনয় করে। আর এভাবেই শেষ হয় বীচট পর্ব।

আম ভাঙা : এ পর্বের পর একটি আমের ডাল কাঁধে করে আসরে ছুটে আসেন হনুমানরূপী একজন অভিনেতা। সে এসে বলে, এতদিন আমি আমগাছের পাহারায় ব্যস্ত ছিলাম, আজ আম ভাঙানির জন্য এ আসরে হাজির হয়েছি। সহসা উপস্থিত সকলে হনুমানের কাঁধে ভর করা আমের ডালে ঝুলন্ত আমগুলো ছিঁড়ে নিতে থাকে। গ্রামের লোকেরা বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ সে রাতের পরের দিনই আম দিয়ে ডাল রান্না করে খায়। আম ভাঙা শেষ হলে হনুমানরূপী অভিনেতা হঠাৎ ছুটে আসার মতোই ছুটে চলে যায়।

মুক্তিপদ, ধার পরীক্ষা ও কুচকি বানাম : চৈত্র-সংক্রান্তির রাতে সন্ন্যাসীদের জন্য মুক্তিপদ নিয়ে আসে ‘জাইলা’ বা জেলেরূপী একজন অভিনেতা। সে এসে তার পানি ছিটানিতে সন্ন্যাসীদের মুক্তি ঘটায়। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় গান-নাচ, মানে সন্ন্যাস মুক্তির আনন্দ উৎসব। রাত যত বাড়ে মানুষের চেহারায় ক্রিয়াকর্মে ততই উন্মাদনা ভর করতে থাকে। কেউ ঠাকুর স্নানে কুমে (ছোট জলাশয়) চলে যায়। কেউবা অস্ত্রের ধার পরীক্ষায় মেতে ওঠে। এ পর্বে একটি ধারালো রামদা’কে ভূমির সমতলে উঁচু করে দুই দিক থেকে দুইজন ব্যক্তি সর্তকতার সাথে ধরে রাখে, তারপর শুরুতেই একটি কচু বা কলাগাছ কেটে তার ধার পরীক্ষা করে নেওয়া হয়। এরপর এক একজন সাহসী ও নিবিষ্ঠ ভক্ত মানুষ ধারালো সে অস্ত্রের উপর পা রেখে অস্ত্রকে ডিঙিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু কারো পা তাতে কেটে যায় না। এভাবে অস্ত্রের ধার পরীক্ষার পর শুরু হয় কুচকি বানাম। পেটের দুপাশের চামড়ার ভেতর ত্রিশূল ঢুকিয়ে ত্রিশূলের মাথায় নারিকেলের ছোবা পেঁচিয়ে আগুন ধরিয়ে ঢাকের তালে ধূপের ছিটা মেরে মেরে আগুনের ধপ্ ধপ্ শিখার সঙ্গে নাচতে থাকেন অনেকেই। এর নাম কুচকি বানাম বা পাশ বানাম বা পাশ পঞ্চম।

পরী নাচ : চৈত্র-সংক্রান্তির দিন হর-গৌরী পূজার ক্রিয়াকর্মের মধ্যে রাতের শেষভাগে গ্রামের উঠানে পরী নাচ পরিবেশিত হয়ে থাকে। এই নাচে একজন অভিনেতা স্থানীয়ভাবে তৈরি সুন্দর একটি মুখোশ পরে বর্ণিল শাড়ি পরে আগুনের থালা হাতে অংশগ্রহণ করে থাকেন। পরী নাচের জন্য একজন অভিনেতা সাজ-পোশাক ও তার অভিনয় উপকরনসহ প্রথমে অন্ধকার হতে একটি বাড়ির উঠানে ছুটে আসেন। সাথে সাথে তাকে ঘিরে শুরু হয় ঢাক বাদন। আর সেই ঢাক বাদনের শব্দের তালে পরীরূপী অভিনেতা লাফিয়ে নাচতে থাকেন। এ সময় কয়েকজন ভক্ত তাকে ঘিরে সতর্ক পাহারা দিতে থাকেন। ঢাকের বাদ্যের সঙ্গে ক্রমাগত পরী নাচের উন্মাদনা বাড়তে থাকেন। সে উন্মাদনাপূর্ণ নাচে পরীরূপী অভিনেতা এক সময় দিশা হারিয়ে ফেলেন এবং কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে লুটায়ে পড়তে যান। সহসা তাকে ঘিরে থাকা ভক্ত লোকেরা তাকে মাটিতে লুটায়ে পড়ার হাত থেকে আগলে ধরেন। এই পরীর নাচ সম্পর্কে গ্রামের লোকের বিশ্বাস হচ্ছে, পরীর নাচে এক সময় ঠিকই নাকি অভিনেতার উপর পরী এসে ভর করে। গ্রামের নারীরা জ্ঞানহারা অভিনেতা পরীকে নিয়ে তালপাখায় বাতাস করতে করতে তার মুখোশ এবং শাড়ি খুলে নেন। সাথে সাথে তিনি স্বাভাবিক হয়ে ওঠেন।

মইন জাগানো : সাধারণত কৃষিক্ষেত্রের সদ্য চাষ দেওয়া মাঠে মইন জাগানোর কৃত্যাচার পালন করা হয়। এক্ষেত্রে মাঠের কাঁচা মাটিতে মৃত মানুষের মাথায় খুলি রেখে মইন জাগানো হয়। শোনা যায়, যে খুলিটার মইন জাগানো হয় সেটা কোনো পুণ্যবান মানুষের মাথার খুলি। চৈত্র-সংক্রান্তির দিন রাতের শেষভাগে পুণ্যাত্মাকে ডেকে আনার জন্য, তার-ই খুলিতে পূজার ফুল ছিটিয়ে বা পূজা করা হয়ে থাকে। মইন জাগানের সময় অন্ধকার মাঠের মধ্যে হ্যাজাক বা মশালের আলোয় মইন জাগানোর ক্রিয়াকর্ম অদ্ভুত আদিম এক মায়া তৈরি করে। এই অনুষ্ঠানে একজন ঠাকুর দুহাতে খুলিটাকে মাটিতে আগলে ধরে থাকেন, আর একটি লোক তার মুখোমুখি গড় হয়ে বসে উন্মাদের মতো খুলিটাকে বারবার প্রণাম করতে থাকেন। অন্য একজন লোকটার প্রণামের হাত দুটির মধ্যে বারবার ফুল গুঁজে গুঁজে মন্ত্র পড়তে থাকেন। লোকটার প্রণাম-ক্রিয়াতে উন্মাদ ভাব ক্রমাগত বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে পূজারী মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সহসা কয়েকজন ভক্ত সেই পূজারীকে মৃত মানুষের মাথার খুলিসহ উচ্ছে তুলে ধরে দৌড়ে হর-গৌরী মন্দিরের সামনে নিয়ে আসেন। মন্দিরের সামনে পৌঁছলে খুলিটা তার বুক থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঠাকুরের কাছে অর্পণ করা হয়। এভাবেই শেষ হয় মইন জাগানোর কৃত্যমূলক পরিবেশনা।

কালি কাচ : চৈত্র-সংক্রান্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা হচ্ছে কালি কাচ। এ ধরনের পরিবেশনায় সাধারণত কোনো বাড়ির অন্ধকার থেকে কালির মুখোশ পরা দুটি জীবন্ত কালিরূপী অভিনেতার আবির্ভাব ঘটে হর-গৌরী মন্দির সংলগ্ন উঠানে। কালিরূপী অভিনেতাদ্বয়ের পরনে থাকে বর্ণিল শাড়ি পেঁচানো। তাদের এক হাতে লোহার তরবারি অন্য হাতে মাটির বড় ঢাকনীপাত্র। তাদের একজন ঠাকুরের কাছ থেকে খুলিটাকে ছিনিয়ে নিতেই শুরু হয় দুই কালিরূপী অভিনেতার পরম যুদ্ধ। ঢাকের বাদ্যের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ চলতে থাকে। যুদ্ধের চারদিকে মশাল জ্বেলে পাহারা দেওয়া হয়। ধারালো তরবারি মশালের আলোয় ঝিলিক কাটতে থাকে। যুদ্ধে তারা সমানে সমান। যুদ্ধে তারা কেউ কাউকে পরাস্ত করতে পারেন না। এই যুদ্ধের কালীরূপী দুইজন অভিনেতাই এক সময় কাঁপতে কাঁপতে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে উপস্থিত ভক্তরা তাদের মুখ থেকে মুখোশ এবং পরনে পেচানো শাড়ি খুলে নেয়। সাধারণ ভক্তদের বিশ্বাস, মা-কালির মুখোশ পরে অভিনয় করতে করতে এক সময় অভিনেতাদের উপর স্বয়ং মা-কালি ভর করে তখন দ্রুত বেশভূষা খুলে না নিলে অভিনেতা আর কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে না। তাই অভিনয় করতে করতে অভিনেতা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে তাড়াতাড়ি করে বেশ-ভূষা খুলে ফেলার নিয়ম পালন করতে হয়। এর কিছুক্ষণ পর অভিনেতাদ্বয় স্বাভাবিক বোধ ফিরে পায়।

পাতা নাচ : চৈত্র-সংক্রান্তির আরও অন্যান্য পরিবেশনার মধ্যে হাজরা উল্লেখযোগ্য। শেষ রাতে একদল ভক্ত শ্মশানে ছুটে গিয়ে এই হাজরা করে থাকে। হাজরাতে সাধারণত চামুণ্ডার নৃত্যসহ নানা ধরনের পাতা নৃত্য (পংক্তি নৃত্য/পাত্র নৃত্য) পরিবেশিত হয়। যেমন, কালিকার পাতা (প্রেতের বেশে মৃতদেহ নিয়ে নৃত্য), মায়ের পাতা (প্রেতনী বা ডাকিনীর রূপসজ্জায় নৃত্যাভিনয়), লাউসেনের পাতা (লাউ কুমড়া নিয়ে নাচ), ধূলসেনের পাতা (ধূলা উড়িয়ে নৃত্য), ব্রহ্মর পাতা (পূজায় আগুন নিয়ে নৃত্য), জলকুমরীর পাতা (খিচুড়ির ভোগ পানিতে ডুবিয়ে দেয়া) ও চামুণ্ডার পাতা (মায়ের পাতার অনুরূপ)। মায়ের পাতা নৃত্যে ভক্তরা প্রেতনী বা ডাকিনীর রূপসজ্জা গ্রহণ করে। পরণে থাকে রঙ্গীন বস্ত্র, নানাবিধ গহনা, ফুলের মালা। চামুণ্ডার পাতা নৃত্যকারী পাত্ররা চামুণ্ডার রূপসজ্জায় অবতীর্ণ হয় তবে এদের মুখে মুখোশ থাকে।৩২ সচরাচর সন্ন্যাসী বা ভক্তগণ এই নৃত্য পরিবেশন করে। এ ধরনের পরিবেশনার অন্যনাম পাতানামা বা ভূতাবেশ, অর্থাৎ ভূতের ভয়। এই ভূতের ভয়ের অভিনয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ভক্ত বা সন্ন্যাসীগণ হাত, পা, মাথা কম্পন ও ঘুর্ণন প্রদর্শন পূর্বক বিকট স্বরে ভৌতিক চিৎকার দিয়ে থাকে। প্রধান সন্ন্যাসী যখন বুঝতে পারে যে, আসরে কালি বা চামুণ্ডার আবির্ভাব ঘটেছে তখন থেকেই এই ভ্রাম্যমাণ নৃত্যাভিনয়ের শুরু হয়। পাতানামায় অতিলৌকিক ঔষধ পাওয়া যায় বলে গ্রামীণ ভক্তগণ বিশ্বাস করে। স্ত্রীরা অবাধ্য স্বামী বশিকরণের শিকড়-বাকড়ও লাভ করে। ভূতাবেশের পর আবার যে নৃত্যের শুরু হয়, সে নৃত্য ভৌতিক এবং তা মুখোশ পরে সম্পাদিত হয়। এ ধরনের নৃত্যের সময়ে ঢাক বাদ্য চলতে থাকে। আর তা ঘটে শ্মশানে। লোক-সংস্কার অনুযায়ী সেখানে সকলে যেতে পারে না। যেতে হলে আগে থেকেই কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। এই নিয়ম শুধু হাজরা পর্বের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, পরীনাচ-কালি কাচসহ সকল প্রকার মুখোশ নাচের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এবারে পৌরাণিক চরিত্রসমূহের নৃত্যে ব্যবহৃত মুখোশ সম্পর্কে কিছু বলা যাক। চৈত্র-সংক্রান্তির নৃত্যাভিনয়কালে বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্রের মধ্যে প্রধানত কালি, চামুণ্ডা, হনুমান, প্রেত, দুর্গা প্রভৃতির মুখোশ ব্যবহৃত হয়। এই সকল মুখোশ সাধারণত শোলা, বাঁশের চটা ও কাগজের সাহায্যে তৈরি করা হয়। আর মুখোশ অলঙ্করণে রঙ, জরি, সিলভারের পাত বা রাঙতা কাগজ ব্যবহার করা হয়। এই মুখোশ ব্যবহারকারীগণকে বিভিন্ন আচার-ব্রত, যথা, প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই নিরামিষ ভোজনের নিয়ম পালন করতে হয়, এমনকি মুখোশ ব্যবহারের পরের তিন পর্যন্ত এই নিয়ম মেনে চলতে হয়।৩৩

গমীরা ও মুখোশ-অভিনয় : মুখোশ ছাড়াও চৈত্র-সংক্রান্তির ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের মধ্যে আরো থাকে পশু, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীদের প্রতিকৃতি নিয়ে শোভাযাত্রা। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার বিভিন্ন গ্রামে চৈত্র-সংক্রান্তির পাঁচ-সাতদিন আগে একদল যুবা-তরুণ বিভিন্ন পশু-পাখি ও মাছের মূর্তি তৈরি করে নৃত্য-গীত সহযোগে পাড়ায় পাড়ায় প্রদক্ষিণ করে বেড়ায়। এই দল ও তাদের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনাকে ‘গমীরা’ বলা হয়ে থাকে। সাধারণত কোনো গোপন উদ্দেশ্য সিদ্ধির কামনায় কোনো ব্যক্তি ‘গমীরা’র মানত করে থাকে। এ ধরনের পরিবেশনার সকল ব্যয় বহন করেন মানতকারী ব্যক্তি নিজে।৩৪ উল্লেখ্য, গমীরাতে মাছ ছাড়া পশু-পাখির মধ্যে সাধারণত হাঁস ও ঘোড়ার মূর্তি বা প্রতিকৃতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে, আর এই সকল মূর্তি বা প্রতিকৃতি নির্মাণে খড়, বাঁশ, কাগজ, আঠা ও রঙ ব্যবহৃত হয়। গবেষকদের ধারণা, গমীরাতে পশু-পাখির মূর্তি নিয়ে যে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে তার একটি প্রাচীন ঐতিহ্য বহু আগে থেকেই বাংলাদেশে প্রচলিত ছিল। গবেষক ভাষ্যে জানা যায়, আসলে, ঐন্দ্রজালিক নৃত্য হতেই এই শ্রেণীর নৃত্যের উদ্ভব হয়েছে। একদিন ঐন্দ্রজালিক উপায়ে বাঘের শক্তিকে পরাভূত করবার কল্পনা করা হতো, তখনই বাঘ-নাচের উদ্ভব হয়েছিল। একজন পুরুষ বাঘের মুখোশ পরে বাঘ সেজে বাঘের অভিনয় করে ওঝার মন্ত্রের দ্বারা নিহত হতো। পরে তা ক্রমে ক্রমে কৌতুকের বিষয় হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চড়কে মাঠে এখনও মুখোশ পরা বাঘসহ অন্যান্য কিছু প্রাণী, পৌরাণিক চরিত্র ও ভূত-প্রেতের আবির্ভাব লক্ষ করা যায়। চড়কের মাঠে সারা গায়ে কালি মেখে বিশাল আকৃতির তরবারি হাতে রাবণ চরিত্র, সারা গায়ে পাটের আঁশ বেঁধে হনুমানের মুখোশ পরে রামায়ণের চরিত্র হনুমানজি এবং রাম-লক্ষণসহ তাদের সৈন্য-সামন্তের ভূমিকায় ছোট ছোট বালকদেরকে পাটকাঠির তীর ধনুক নিয়ে সারা মাঠ জুড়ে যুদ্ধের মহড়া দিতে দেখা যায়।৩৫ যা নিশ্চিতভাবেই ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের পর্যায়ে পড়ে। এই ধরনের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, শ্রীমঙ্গল, নোয়াখালী অঞ্চলে কম-বেশি প্রচলিত আছে।

ঢাঈ : চৈত্র-সংক্রান্তি উপলক্ষে নোয়াখালী অঞ্চলে যে চড়ক হয় তাতে শিব-পার্বতীর বেশধারী কয়েকজন অভিনেতা শোভাযাত্রার সামনে অবস্থান করে। পুরো গ্রামে তারা ঢাকের তালে তালে নৃত্যগীতসহকারে অভিনয় প্রদর্শনপূর্বক চড়কতলায় উপস্থিত হয়। এই বিশেষ ধরনের ভ্রাম্যমাণ নাট্যরীতি সে অঞ্চলে ‘ঢাকী’ বা ‘ঢাঈ’ নৃত্য নামে পরিচিত। (ঢাক+ঈ প্রত্যয় = ঢাকী)। এই নৃত্যে ঢাকের ব্যবহার থেকে ‘ঢাঈ’ নামের উদ্ভব। শিব-পার্বতীর চরিত্রে অভিনয়কারীদেরও ‘ঢাঈ’ নামে অভিহিত করা হয়।৩৬ চড়কের দিন দুপুরের পর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকীরা নৃত্য সহযোগে শোভাযাত্রায় যোগ দেয়। এই অনুষ্ঠানটি ভ্রাম্যমান নাট্যমূলক, কেননা এতে অংশগ্রহণকারী কালি, হনুমান, রাবন, ভূত, প্রেতনী, শিব প্রভৃতি বিচিত্র রূপসজ্জা গ্রহণ করে থাকে। সন্ধ্যার আগে হনুমান, বাঘ ইত্যাদির রূপসজ্জায় মুখোশ বা মুখা পরিধানপূর্বক বিভিন্ন অভিনয় এবং তার বিনিময়ে ভক্ত-দর্শকদের কাছ থেকে টাকা তোলা হয়ে থাকে। এ সময় অভিনয়শিল্পীর পাশে একজন সহায়তাকারী উপস্থিত থাকে।

কালেক্টর : চৈত্র-সংক্রান্তিতে দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ি থানার কইরাকোল, মণ্ডপখোলা (মণ্ডপী), কুমারপুর, ছোট চণ্ডীপুর, চানপাড়া; পার্বতীপুর থানার খিয়ারপাড়া, কালির হাট, চণ্ডীপুর; চিরিরবন্দর থানার আমবাড়ি, বিশ্বনাথপুর, দূর্গাডাঙ্গা, দল্লা, সুরোল গ্রামের নিম্নবর্গের হিন্দু ও আদিবাসীরা বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে বাদ্য সহযোগে এক বিশেষ প্রকারের নৃত্য পরিবেশন করে থাকেন। এই ধরনের পরিবেশনাকে স্থানীয় জনগণ ‘কালেক্টর’ বলে উল্লেখ করে থাকেন। এই কালেক্টর দলে মধ্যে যারা নৃত্যে অংশগ্রহণ করেনতাদের কেউ কেউ মুখে পাটের আঁশ বেঁধে চুন-কালি ঘসে, চোখে ভাঙা চশমা দিয়ে, ছেঁড়া জামা-প্যান্ট পরে সঙ বা জোকার সেজে থাকেন, কেউ আবার শাড়ি, ব্লাউজ, ছায়া পরে মুখে পাউডার, লিপিস্টিক মেখে ছুকরির রূপ গ্রহণ করে থাকেন। একটি কালেক্টর দলে এক একাধিক ছুকরি ও জোকার অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া, তাদের সঙ্গে থাকে একজন ঢোলক, একজন করতাল বাদক, একজন কাঠের তৈরি কালির মুখোশ ধারণকারী এবং একজন সংগ্রাহক থাকেন ঝোলা কাঁধে। এ ধরনের পরিবেশনারীতির নাম ‘কালেক্টর’ এই জন্য যে, গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি ঘুরে নৃত্য পরিবেশন করে নিুবর্গের সাধারণ মানুষ তাদের ধর্মীয় কৃত্যাচার চড়ক পূজা আয়োজনের খরচ বাবদ অর্থ এবং চাল-ডাল সংগ্রহ করেন। আসলে, যাদের পূজা আয়োজনের খরচ সংগ্রহের অন্য কোনো উপায় থাকে না তারাই শুধু ‘কালেক্টর’ সেজে গ্রামে গ্রামে নৃত্য করে ফেরেন। এ ধরনের নৃত্য পরিবেশন শুরু হয় চড়ক পূজা আয়োজনের অন্তত সাত দিন আগে থেকে।৩৭

চৈত্র-সংক্রান্তি উপলক্ষে বাংলাদেশের অপরাপর এলাকার হর-গৌরীর নাচ, বাইদ্যার নাচ, গমীরা, ঢাঈ ইত্যাদির ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার সঙ্গে ‘কালেক্টর’-এর পার্থক্য হচ্ছে, অন্যান্য পরিবেশনাগুলো সুনির্দিষ্ট একটি গ্রামে বা তার পার্শ্ববর্তী গ্রামে চলমান থাকে, কিন্তু ‘কালেক্টর’দের পরিবেশনা সুনির্দিষ্ট কোনো একটি গ্রাম বা তার পার্শ্ববর্তী এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কালেক্টর’রা চড়ক পূজার খরচের অর্থ এবং চাল-ডাল সংগ্রহের জন্য ছড়িয়ে পড়েন দূর দূরান্তের গ্রামে। এছাড়া, অন্যান্য পরিবেশনা থেকে অর্জিত অর্থ বা উপাদান পূজার জন্য ব্যবহৃত না-হলেও কালেক্টর’দের সংগৃহীত অর্থ ও উপাদানের সবটুকু পূজার জন্য ব্যয় করা হয়। দিনাজপুর অঞ্চলের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনারীতি হিসেবে ‘কালেক্টর’-এর বিশেষত্ব হচ্ছে, এই পরিবেশনার সঙ্গে যুক্ত শিল্পীগণ গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাড়ির বাইরের উঠানে ঢোল ও করতাল বাদ্যের সঙ্গে নাচ শুরু করেন। আর এ ধরনের পরিবেশনার নৃত্যটি অন্যান্য পরিবেশনার মতোই বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে উপস্থাপন করা হয়। তবে, নাচের সময় কোনো গান গাওয়া হয় না। শুধু তালের উপর ভর করে এই নাচ চলতে থাকে। বাড়ির কেউ তাদেরকে অর্থ বা চাল-ডাল প্রদান করলে কালেক্টর দল তাদের নৃত্য থামিয়ে নতুন আরেকটি বাড়ির দিকে রওনা হয়। চড়কের দিন দুপুর পর্যন্ত এই নাচ চলতে থাকে।

বাংলাদেশের চৈত্র-সংক্রান্তির প্রায় সকল অনুষ্ঠানের সঙ্গে হর-গৌরী অর্থাৎ শিব-কালির বিভিন্ন ধরনের নৃত্যের যোগ আছে। এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলে রাখা ভালো যে, অনেকে মনে করেন, ভারত উপমহাদেশের নাট্যকলার উৎপত্তির সঙ্গে শিব বা মহাদেবের তাণ্ডব-নৃত্য এবং কালি বা গৌরীর লাস্য-নৃত্য যোগ আছে।৩৮ নাট্যকলা আজ স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেও নাট্যকলার উৎপত্তির মূলে যে তাণ্ডব ও লাস্য নৃত্য তার কিছু উদারহণ মহাকালের গর্ভে একেবারে বিলীন না হয়ে আজও টিকে আছে। এদেশের চৈত্র-সংক্রান্তির নৃত্যমূলক পরিবেশনাগুলো হয়তো প্রাচীনকালের ঐতিহ্যকে প্রবহমান রেখেছে।

শেষ অংশ

———————–
বাংলার যাযাবরে নাট্যের ছবির গ্যালারি। দেখার জন্য ক্লিক করুন।

তথ্যনির্দেশ


১. দুলাল ভৌমিক, সংস্কৃত নাটকের ইতিহাস, (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, জুন ১৯৯৪), পৃ. ৭ ও ৯

২. শ্রীসনৎকুমার মিত্র (সম্পাদিত), বাঙলা গ্রামীণ লোকনাটক, উদ্ধৃতি : মহম্মদ আয়ুব হোসেন, “গ্রামীণ লোকনাটক : লেটো”, (কলিকাতা : পুস্তক বিপণি, ডিসেম্বর ২০০০), পৃ. ৮২

৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৩

৪. Selected Asokan Epigraphs, Sachchidananda Bhattacharyya

৫. শ্রীসনৎকুমার মিত্র, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৩

৬. সুকুমার সেন, নট নাট্য নাটক, (কলিকাতা : মিত্র এন্ড ঘোষ পাবলিশার্স, ভাদ্র ’৯১), পৃ. ৯-১০

৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ১১

৮. সেলিম আল দীন, মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য, (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, জুন ১৯৯৬), পৃ. ১

৯. সৈয়দ জামিল আহমেদ, হাজার বছর : বাংলাদেশের নাটক ও নাট্যকলা, (ঢাকা : বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, ১৯৯৫), পৃ. ২

১০. সেলিম আল দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১

১১. প্রাগুক্ত, পৃ. ১

১২. সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (সম্পাদিত) ভরত নাট্যশাস্ত্র (প্রথম খণ্ড), (কলিকাতা : ১৯৮০), পৃ. ১২

১৩. Muhammad Shahidullah, Buddhist Mystic Songs, (Dhaka : 1966), p. 53

১৪. নির্মল দাশ, চর্যাগীতি পরিক্রমা, (কলিকাতা : দে’জ পাবলিশিং, জুলাই ১৯৯৭), পৃ. ১০২

১৫. অতীন্দ্র মজুমদার, চর্যাপদ, (কলকাতা : নয়াপ্রকাশ, ১৪০০ বঙ্গাব্দ), পৃ. ৩৯

১৬. প্রাগুক্ত, ৩৮

১৭. শশিভূষণ দাশগুপ্ত, ‘বাংলা সাহিত্যের নবযুগ’, (কলিকাতা, মাঘ ১৩৮৩), পৃ. ১৬৬

১৮. সেলিম আল দীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫

১৯. সেলিম আল দীন, বাঙলা নাট্যকোষ, (ঢাকা : এপ্রিল ১৯৯৮), পৃ. ৮১

২০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৭

২১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৯-৮০

২২. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬২-৬৩

২৩. সাইমন জাকারিয়া, প্রণমহি বঙ্গমাতা (দ্বিতীয় পর্ব), (ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স, ফেব্র“য়ারি ২০০৬), পৃ. ১৪০

২৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪০-১৫২

২৫. মুনতাসীর মামুন, বাংলাদেশের উৎসব, (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ফেব্র“য়ারি ১৯৯৪), পৃ. ৬৮

২৬. সাইমন জাকারিয়া, প্রণমহি বঙ্গমাতা (তৃতীয় পর্ব), (ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স, ফেব্র“য়ারি ২০০৭), পৃ. ১৪১-৪৯

২৭. যতীন্দ্রমোহন রায়, ঢাকার ইতিহাস, (কলিকাতা : প্রকাশ ১৩১৯ বঙ্গাব্দ), পৃ. ৩৭৬-৩৭৭

২৮. মুনতাসীর মামুন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭১

২৯. প্রাগুক্ত, পৃ : ৭৪

৩০. প্রাগুক্ত, পৃ : ৭৭

৩১. সাইমন জাকারিয়া, প্রণমহি বঙ্গমাতা (দ্বিতীয় পর্ব), প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৩-১৯২

৩২. সেলিম আল দীন, বাঙলা নাট্যকোষ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৮

৩৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ২১৬

৩৪. নাজমুল হক, উত্তরবঙ্গের লোকসাহিত্যের নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক সমীক্ষা, (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ২০০৭), পৃ. ১৫২

৩৫. সাইমন জাকারিয়া, প্রণমহি বঙ্গমাতা (দ্বিতীয় পর্ব), প্রাগুক্ত

৩৬. সেলিম আল দীন, মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫

৩৭. সাইমন জাকারিয়া, উত্তরবঙ্গের চড়কের মাঠে মাঠে, সমকালের সাহিত্য সাময়িকী ‘কালের খেয়া’, ২০ জানুয়ারি ২০০৬

৩৮. শশিভূষণ দাশগুপ্ত, বাঙলা-সাহিত্যের নবযুগ, (কলিকাতা : এ. মুখার্জী অ্যান্ড কোং লিঃ, আষাঢ় ১৩৭২), পৃ. ২০৪

saymonzakaria@gmail.com

free counters


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.