খোন্দকার আশরাফ হোসেনঃ জীবনের সমান কবি

কামরুল হাসান | ১৮ জুন ২০১৩ ৩:২১ অপরাহ্ন

সকলকে বিমূঢ় ও শোকস্তব্ধ করে ১৬ জুন রোববার সকালে নিরালোকে চলে গেলেন কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন। প্রথমটায় মনে হল ভুল শুনেছি, বিশ্বাস হয়নি, কেননা তাঁর যাওয়ার সময় হয়নি, কত কাজ পড়ে ছিল সৃষ্টিশীল দু’হাতে, সেসব ছেড়ে কী করে চলে যান তিনি? তাঁর মৃত্যু এত অপ্রত্যাশিত যে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম, চোখ ভরে উঠছিল জলে, আর মনে পড়ছিল তাঁর সাথে কাটানো অসংখ্য স্মৃতিময় দিনের কথা। কী প্রাণবান মানুষ ছিলেন শক্তিমান এ কবি!

খোন্দকার আশরাফ হোসেনকে প্রথম দেখি বাংলা একাডেমির বইমেলায়, সেটা আশির দশকের শেষভাগ। কোকড়ানো চুলের শ্যামলা রঙের দীর্ঘদেহী মানুষটির ভিতর কি যেন আকর্ষণ ছিল, ছিল এক অনতিক্রম্য দেয়ালও, কেননা তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কবি হিসেবে প্রবল স্বীকৃত, উপরন্তু তিনি আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আজফার হোসেনের শিক্ষক। বন্ধুর শিক্ষক হিসেবে প্রথমদিকে তাকে দূর থেকে সমীহ করেছি, কাছে ভিড়বার সাহস হয়নি। তাঁর সাথে আমার সখ্য গড়ে ওঠে তাঁরই সম্পাদিত ‘একবিংশ’ পত্রিকায় লেখা মুদ্রিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। তখন তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে চিনতেন না। ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও কেবল কবিতার বিচারে লেখা মুদ্রিত হওয়ার রেওয়াজ বাংলাদেশে খুব বেশি না থাকায় তখন বিস্মিত হয়েছিলাম, সম্পাদকের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে কাছে ভিড়ে দেখলাম মানুষটি প্রাণখোলা ও আড্ডাপ্রিয়। এক অদ্ভুত সারল্য আছে তাঁর, আছে চমৎকার রসবোধ। তরুণদের লেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি, তরুণদের সাথে মিশতেন বন্ধুর মতই। আজকের স্বনামখ্যাত অনেক তরুণ কবির প্রথম লেখা তিনি তাঁর সম্পাদিত ‘একবিংশ’-এ ছেপেছেন। নিজে প্রতিভাবান ছিলেন বলেই প্রতিভা চেনার এক দুর্দ্দান্ত ক্ষমতা ছিল তাঁর। ‘একবিংশ’ হয়ে উঠেছিল তরুণ কবিদের একটি প্রিয় পত্রিকা ও সৃজনশীল আশ্রয়।

আমৃত্যু তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। আমার সৌভাগ্য হয়নি সরাসরি তাঁর ছাত্র হওয়ার, কিন্তু তাঁর ছাত্রদের মুখেই শুনেছি শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। সাহিত্যের জটিল বিষয়কে সহজ করে তুলতে পারার অসামান্য দক্ষতা ছিল, আর কবি বলেই কাব্যিক অলঙ্কারে ভরা ছিল বক্তৃতা, যে অলঙ্করণ আমরা তাঁর কবিতা বিষয়ক গদ্যে পাই। শব্দের অভাবনীয় মোচড় দেখি লেখায়; চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, প্রতীকের কুহকঘেরা জগৎ। বাংলা ও ইংরেজি–দু’ভাষাতেই সাবলীল ও শক্তিমান, এমন লেখকের সংখ্যা খুব বেশি নেই এ দেশে, এ বিচারেও তিনি ছিলেন বিরল প্রজাতির লেখক। তার অনুবাদের উচ্চমান থেকেই এটা প্রতীয়মান। এক দুর্বোধ্য কারণে, কিংবা বলা যায় বিভাগীয় শিক্ষকদের এলিট মনোভাবের শিকার হয়ে, তিনি ছিলেন কিছুটা নিঃসঙ্গ। কেননা শহুরে উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে আসা তার ‘এলিট’ সহকর্মীরা গ্রাম থেকে উঠে আসা খোন্দকার আশরাফ হোসেনকে সহজভাবে গ্রহণ করেননি। তিনি ছিলেন নিতান্তই কৃষকের সন্তান এবং পুরোপুরিই একজন স্বনির্মিত মানুষ; কেবল মেধার জোরে এসে ঠাঁই নিয়েছিলেন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে, কারো অনুকম্পায় নয়। তবে অকৃত্রিম স্নেহ পেয়েছিলেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও অন্যান্য সিনিয়র শিক্ষকদের।

বহুমাত্রিক মানুষটি কবি পরিচয়েই সবচেয়ে বেশি গর্বিত হতেন। বয়সের বিচারে তিনি ষাটের শেষভাগের কবি বলে পরিগণিত হতে পারতেন, কিন্তু কিছুটা বিলম্বে তার কাব্যজগতে প্রবেশ (প্রস্তুতিতে প্রয়োজনীয় শ্রম) এবং আবির্ভাবেই বাজিমাত। প্রথম দু’টি কাব্য তিন রমণীর ক্বাসিদা (১৯৮৪) ও পার্থ তোমার তীব্র তীর (১৯৮৬) সমালোচক ও কবিদের নজর কাড়ে এবং কবি হিসেবে তিনি দ্রুতই নিজের জায়গাটি খুঁজে পান। কবি আল মাহমুদ সেসময়ে বলেছিলেন, ‘বাংলা কবিতায় এক শক্তিমান কবির আবির্ভাব ঘটেছে।’ কবি শামসুর রাহমান তাকে সুপ্রসন্ন অভিবাদন ও স্বাগত জানিয়েছিলেন। এ দু’টি কাব্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৭ সালেই ‘আলাওল পুরস্কার’ পান। ২০০৮ সালে ‘ব্রক্ষ্মপুত্র পদক’ ছাড়াও সম্প্রতি প্রাপ্ত জীবনানন্দ পুরস্কার তাঁর কবিপ্রতিভার অমলিন স্বীকৃতি। বাংলার কৃষ্টি, ঐতিহ্য, মাটি ও মানুষের প্রতি ঘোরানো ছিল খোন্দকার আশরাফের কাব্যের মুখ। প্রথাগত ভাষায় লিখলেও তাঁর কবিতার ছন্দোমাধুর্য, ধ্রুপদী চারিত্র, ও নিটোলত্ব মুগ্ধ করেছিল পাঠকদের। তবে তিনি সময়ের সাথে দ্রুতই বদলে নিয়েছেন কবিতার বিষয় ও ভাষা। তাঁর এই অভিযোজন ক্ষমতা প্রশংসনীয়। শেষের দিকে হয়ে উঠেছিলেন উত্তরাধুনিক কবি। আধুনিকতা থেকে উত্তরাধুনিকতায় যাত্রায় তিনি বারংবার নিজেকে ভেঙেছেন, কখনো অতিক্রম করে গেছেন নিজেকেই। এসবই তার প্রতিভার নিগূঢ় স্বাক্ষর। বিষয় ও আঙ্গিক নিয়ে অনেক নিরীক্ষা করেছেন কবিতায়, কোথাও থেমে থাকেননি। ওই দুটো কাব্য ছাড়া তিনি লিখেছেন জীবনের সমান চুমুক (১৯৮৯), সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর (১৯৯২), যমুনাপর্ব (১৯৯৮), জন্মবাউল (২০০১), তোমার নামে বৃষ্টি নামে (২০০৭), আয়(না) দেখে অন্ধ মানুষ (২০১১) প্রভৃতি অসামান্য কবিতাগ্রন্থ। কুয়াশার মুশায়েরা ছিল এবছর বইমেলায় প্রকাশিত সর্বশেষ কাব্য, আর বাঙালির দ্বিধা ও রবীন্দ্রনাথ এবং বিবিধ তত্ত্বতালাশ শেষ প্রবন্ধের বই।
asraf-by-masud-anondo.jpg
খোন্দকার আশরাফ হোসেন। ছবি: মাসুদ আনন্দ।

অনুবাদে সিদ্ধহস্ত খোন্দকার আশরাফ হোসেন ১৯৮৬ সালেই তিনটি ধ্রপদী গ্রীক নাটক সফোক্লিসের রাজা ঈদিপাস এবং ইউরিপিদিসের মিডিআআলসেস্টিস সফল অনুবাদ করেন। তাঁর অনুবাদ কেবল মূলের প্রতি বিশ্বস্ত নয়, তারা সৃজনশীল। এছাড়া অনুবাদ করেছেন পাউল সেলানের কবিতা (১৯৯৭), টেরি ঈগলটনের সাহিত্যতত্ত্ব (২০০৪), ডেভিড অ্যাবারক্রম্বির সাধারণ ধ্বনিতত্ত্বের ভূমিকা (১৯৮৯)। শেষোক্ত দু’টি গ্রন্থ বাংলা ভাষায় মূল্যবান সংযোজন। এছাড়া তাঁর অনেক অনুবাদ বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কেবল কবিতা নয়, প্রবন্ধ এবং অনুবাদেও তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারের যোগ্যতা ধারণ করতেন। অথচ অমন প্রতিভাবান মানুষটিকে রিক্ত হাতে ফিরতে হলো ঈশ্বরগৃহে।

গতবছর সার্ক সাহিত্য উৎসবে লক্ষ্মৌয় কাটানো কয়েকটি দিন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে তাকে দেখার সুযোগ আমার হয়। এরও আগে কলকাতায় একটি সাহিত্যিক আমন্ত্রণে আমরা একত্রে যোগ দিয়েছিলাম। দেখেছি প্রিয় সহধর্মিণীর স্মৃতিতে কাতর মানুষটির চোখে বেদনার জল। অল্পবয়সে ভালবেসে যাকে বিয়ে করেছিলেন, যার সাথে কেটে গেছে যৌবন ও মধ্যবয়সের সকল দিনরাত্রি, তার আগেভাগে চলে যাওয়াকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। সহধর্মিণী ছাড়াও মায়ের মৃত্যু তাকে শোকাতুর রাখতো। আপাত কাঠিণ্যের আড়ালে তাঁর মনটি ছিল দয়ার্দ্র। প্রকৃত কবির মতো চেতনা জুড়ে শুধুই কবিতা বিষয়ক ভাবনা বইতো। সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন কাব্য কাঠামোর চুলচেরা বুঝতেন, কবি হিসেবে বুঝতেন তাদের মান। নিরহঙ্কারী মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত বন্ধুপ্রিয়, সরস মন্তব্যে চমক দিতেন আর মাতিয়ে রাখতেন সকলকে, নিজেকে নিয়েও মশকরা করতেন প্রচুর। প্রতিটি বইমেলায় তাঁর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়বার মতো, শেষের দিকে বাণিজ্যিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভন্ডামীকে পাশ কাটাতে নিজেই নিজের বই প্রকাশ করতেন, একাধিক বই, আর সেসব সাজিয়ে নিয়ে বসতেন লিটলম্যাগ চত্বরে। তিনি যে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সে পরিচয়কে অগ্রাহ্য করে কেবল কবি ও সম্পাদক হিসেবে বিরাজ করতেন নতুন লিখিয়েদের প্রাণবান আসরে। প্রায় প্রতিদিন বইমেলা শেষে আমরা কয়েকজন হেঁটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ক্লাবে এসে কিছুক্ষণ বসতাম। তিনি আমাদের আপ্যায়ণ করতেন এবং সরস কৌতুক ও বিদগ্ধ আলোচনায় ভরিয়ে তুলতেন প্রহরগুলো।

তিনি যে কেবল একজন শক্তিমান কবি ছিলেন তাই নয়, তার হাতে ফুটতো অসাধারণ গদ্য। যারা তার প্রবন্ধ পাঠ করেছেন তারাই মুখোমুখি হয়েছেন এক অননুকরণীয় গদ্যের, ভাষা তার কলমে সাদা পৃষ্ঠার মঞ্চে ঘুঙুর পরে নেচে ওঠা সুন্দরী হতো। পঞ্চাশ ও ষাটের প্রধান কবিদের নিয়ে লেখা তার প্রবন্ধসমূহ নতুন করে চিনিয়ে দেয় ওইসব কবিদের। বস্তুতঃ খোন্দকার আশরাফ হোসেনের মূল্যায়নের অপেক্ষা করতেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবি। কবি বলেই সেসব গদ্যের শরীরে একদিকে ছিল কবিতার অলঙ্কার ও মাধুর্য, অন্যদিকে ছিল মেধার দীপ্তি ও শাণিত বিশ্লেষণ। তাঁর অনেক লেখায় পাই মেধা, তীক্ষ্ণদৃষ্টি ও কৌতুকবোধের অসামান্য সমাহার। বিশ্বসাহিত্যে আয়াসহীন গতায়ত এবং তত্ত্বীয় কাঠামোর উপরে দখল তাঁর তুলনামূলক আলোচনাগুলোকে নিয়ে গেছে ভিন্নতর উচ্চতায়, সমৃদ্ধ করেছে পাঠকের জ্ঞানের ভান্ডার। যেখানে আবদুল মান্নান সৈয়দে এসে পাঠক জটিল গদ্যের অলাতচক্রে পড়ে যান, সেখানে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের গদ্যে পান কবিতার মোহনীয় সৌন্দর্য। বাংলাদেশের কবিতা : অন্তরঙ্গ অবলোকন তাঁর বিরল প্রতিভারই দীপ্তি ছড়ায়, যা ওইসকল প্রবন্ধকে এক মলাটের ভেতর ধারণ করে।

খোন্দকার আশরাফ হোসেন যদি একটি কবিতা বা প্রবন্ধও না লিখতেন, তবু ‘একবিংশ’ পত্রিকা সম্পাদনার জন্য তিনি আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতাভাজন হয়ে থাকতেন। ১৯৮৫ সাল থেকে শুরু করে মৃত্যুর বছরটি পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২৮ বছর সম্পূর্ণ একক উদ্যোগে তিনি কবিতা এবং কবিতা বিষয়ক গদ্যের অত্যন্ত উঁচুমানের পত্রিকাটি সম্পাদনা করে আসছিলেন। লেখা সংগ্রহ, বাছাই, প্রুফ রিডিং থেকে শুরু করে প্রকাশনার প্রতিটি খুঁটিনাটি তিনি নিজে দেখতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত গোছানো এক মানুষ, প্রকৃতিদত্ত প্রতিভার সাথে কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা মিলিত হলে যে বিস্ময় উৎপাদিত হয়, ‘একবিংশ’ ঘিরে তাঁর বিপুল কাজ সে বিস্ময়ই বহন করে। ‘একবিংশ’-এর জন্য প্রচুর প্রবন্ধ তিনি লিখেছেন, দু’হাতে অনুবাদ করেছেন বিদেশী সাহিত্য, লিখেছেন বইয়ের আলোচনা। কখনো পর্যাপ্ত গদ্য না পেলে রাশেদ মিনহাজ ছদ্মনামেও লিখেছেন। কখনো পত্রিকাটির প্রচ্ছদও এঁকেছেন, ভাবা যায়? একবিংশের সাম্প্রতিক সংখ্যাগুলো ত্রিশের পঞ্চপাণ্ডব কবিকুল ঘিরে, বাংলা ভাষার প্রণম্য কবিদের উপর অত্যন্ত নিষ্ঠা ও মেধা সহকারে প্রকাশ করছিলেন একেকটি সংখ্যা। মাঝে নিজের পিএইচডি অভিসন্দর্ভ লেখার কাজের জন্য কয়েক বছরের বিরতি ছাড়া বিরতিহীনভাবে এবং অপত্যস্নেহে কাগজটিকে লালন করেছেন, যা তরুণ কবিদের জন্য সৃষ্টিশীলতার বাতাবরণ খুলে দিয়েছিল। ‘একবিংশ’-এ লেখা ছিল প্রতিটি তরুণ কবির আরাধ্য। নতুন প্রতিভা শনাক্ত করা ও লালন করার গুরুদায়িত্বটি পালনের জন্যই তিনি আমাদের নমস্য হতেন। তরুণদের পরিচিত করিয়ে দিয়েছেন বিশ্বসাহিত্যের বিপুল ঐশ্বর্যের সাথে। তাঁর বিশ্ব কবিতার সোনালী শস্য গ্রন্থটি এরকম প্রবন্ধে ঠাঁসা (উল্লেখ্য, বইটি তিনি তুষার গায়েন, বায়েতুল্লাহ কাদেরী ও আমাকে উৎসর্গ করেছেন)। এসবই তিনি করেছেন পরম নিষ্ঠায়, নিজ ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে।

তিনি ছিলেন প্রগতিমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক চেতনার মানুষ। ছিলেন অন্যায়ের প্রতিবাদী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী। কেবল চেতনাবাহী বললে কম বলা হবে, তিনি যৌবনে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। তার সারল্য কোদালকে কোদাল বলতে শিখিয়েছে, যা তাকে কখনো কখনো কারো কারো অপছন্দের পাত্রে পরিণত করতো। তবে সেসবই সাময়িক, কেননা মানুষটির মহৎ স্বভাবের পরিচয় বিরুদ্ধবাদীরা শীঘ্রই পেতেন। অল্প সময়ের নোটিসে তাঁর মরদেহ দেখতে ও শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে আসা কবি-লেখকদের ভীড় প্রমাণ করে তিনি সকলের কতখানি প্রিয় ছিলেন। দেখেছি তাঁর ছাত্রদের প্রিয় শিক্ষককে হারানোর বেদনায় অঝোরে কাঁদতে।

দীর্ঘদিন ‘একবিংশ’-এ লেখালেখি ও আড্ডার সূত্রে আমি তার বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলাম। সে ভালবাসার প্রকাশ হিসেবেই কিনা জানিনা, একদিন বিস্মিত হয়ে দেখি ‘একবিংশ’-এর প্রিন্টার্স লাইনে সহকারী সম্পাদক হিসেবে আমার নাম মুদ্রিত। যদিও সম্পাদনার সুদূরতম কাজটিও কখনো তিনি আমাকে দেননি, তবু আমার নাম মুদ্রিত করতেন। ২০১২ সালে বইমেলায় প্রকাশিত আমার নির্বাচিত কবিতা গ্রন্থের মোড়ক তিনিই উন্মোচন করেছিলেন। এরও আগে আরও কিছু বইয়ের মোড়ক উন্মোচন তাঁর হাতেই হয়েছে। আমার মনে হতো এই নিরহঙ্কারী প্রতিভাবান মানুষটি কাছে থাকলে আর অনত্র ছোঁটার কী প্রয়োজন? আমার ঈশ্বরের নিজগ্রহ কবিতাগ্রন্থটি আমি তাকে এবং ‘নিসর্গ’ সম্পাদক সরকার আশরাফকে যৌথভাবে উৎসর্গ করি, যা ছিল তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি বিনম্র উপায়।

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা, তাঁর ভক্তরা, তাকে বলতাম, ‘স্যার, এবছর আপনি অবশ্যই পুরস্কার পাবেন।’ শুনে তিনি খুশী হতেন, চোখমুখ উদ্ভাসিত হতো আনন্দে। পুরস্কার ঘোষণার পরে আমরা অপরাধবোধে মুখ লুকাতাম আর তাঁর চোখেমুখে একটা উদাসীন বিষন্নতা ভেসে উঠতো। এটা ঘটছিল গত ৭/৮ বছর ধরেই। ঘনিষ্ঠ বলেই জানি বাংলা একাডেমি পুরস্কারের প্রতি তাঁর একটি আকাংখা জেগেছিল, যোগ্য ছিলেন বলেই এটা জেগেছিল। বছরের পর বছর তাঁর চেয়ে কম মেধাসম্পন্ন কবিদের (কখনো স্রেফ অকবিদের) পুরস্কৃত করে বাংলা একাডেমি নিদারুণ অবহেলা করছিল এই প্রতিভাবান কবির প্রতি। অন্ধ প্রতিষ্ঠানটি আয়নায় এবার নিজের মুখ দেখে নিতে পারে। হার্টের অসুখটি ধরা পড়ার পর থেকেই আমার মাঝে একটি ভয় বাসা বেঁধেছিল, পরবর্তী ফেব্রুয়ারির আগেই, ঈশ্বর না করুক, যদি তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তবে বাংলা একাডেমি লজ্জায় কোথায় মুখ লুকাবে? শেষাবধি সে বিপর্যয়ই ঘটল, সত্তরের মেধাবী কবি আবিদ আজাদের মতোই, নিদারুণ অবহেলিত হয়ে, অভিমান নিয়ে চলে গেলেন খোন্দকার আশরাফ হোসেন। তাকে পুরস্কার দিয়ে বরং বাংলা একাডেমি সম্মানিত হতে পারতো, কেননা একজন মহৎ কবির পুরস্কারে কিছু যায় আসে না, পুরস্কার তাকে ছোট বা বড় করে তুলতে পারে না। এক অর্থে এটা বরং ভালোই হল কেননা একাডেমির পুরস্কার নিয়ে বেশ কিছুকাল ধরেই যে বিতর্ক আর কানাঘুষা চলছে, সে অপবাদ তাকে নিতে হলো না।

এখন সকল পুরস্কার, তিরস্কারের ঊর্ধ্বে চলে গেছেন খোন্দকার আশরাফ হোসেন। মৃত্যু তার তীব্র তীর পার্থের বুকে বিঁধিয়েছে; কিন্তু আমরা জানি, জানে বাংলা সাহিত্যের সকল সিরিয়াস পাঠক, খোন্দকার আশরাফ হোসেনের মৃত্যু নেই, যমুনা(পর্ব) বেয়ে তার কাব্যের ভেলা চিরকাল বয়ে যাবে। জীবনের সমান চুমুক-এর কবি তো আসলে জীবনেরই সমান, কেননা তাঁর সমগ্র জীবন কবিতাকে ঘিরেই আবর্তিত, অন্য সকল ভূমিকা পোষাকী মাত্র। আজন্মবাউল মানুষটি জীবনের উঠোনে কালও প্রবলভাবে উপস্থিত ছিলেন, আজ দূরবর্তী কুয়াশায় মিশে গেলেন। কবির সাথে আমার সর্বশেষ দেখা হয় সূর্যসেন হলে, যে হলের তিনি প্রভোষ্ট ছিলেন। সেদিনই তিনি ত্রিশালের কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। আমি জানতাম না সে সুসংবাদ, কি যেন প্রাণের টানে চলে গিয়েছিলাম। তখন কি জানতাম হৃদয়ের জমিনে ঘরবাড়ি তোলা মানুষটির সাথে সেটাই আমার শেষ দেখা হবে! আজ অশ্রুসজল চোখে এই মহৎ কবির প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। বাংলার ঋতু আষাঢ় এসে গেছে, তাঁর নামে বৃষ্টি ঝরবে এই বাংলায়, বাংলার পাঠকের চোখে!

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (17) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সরকার আশরাফ — জুন ১৮, ২০১৩ @ ১১:৫৮ অপরাহ্ন

      এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো গদ্য। ভালো লাগলো। তবে খোন্দকার আশরাফ হোসেন আরো বড় মাপের কবি সম্পাদক।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ঝর্না রহমান — জুন ১৯, ২০১৩ @ ১:০৪ পূর্বাহ্ন

      অতি সম্প্রতি প্রয়াত কবি প্রাবন্ধিক অনুবাদক খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ওপর লেখা আপনার লেখাটি ভালো লাগলো। এই অসাধারণ প্রতিভাধর মানুষটি সম্পর্কে স্বল্প পরিসরে হলেও আপনার মূল্যায়ন যথাযথ। সার্ক উৎসবে লক্ষ্ণৌতে আমিও এই গুনী ব্যক্তিত্বের সাহচর্য লাভ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছিলাম। লেখাটির জন্য আপনাকে অভিনন্দন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন khalil Mazid — জুন ১৯, ২০১৩ @ ১০:৪৯ পূর্বাহ্ন

      লেখাটা পড়লাম। ধন্যবাদ কবি কামরুল হাসান। খোন্দকার আশরাফ হোসেন বিষয়ে একটি ব্যক্তিগত রচনা তথ্যে এবং বিশ্লেষণে তাঁর উপর সিরিয়াস একটি প্রবন্ধ হয়ে গেছে। দ্রুততম সময়ে খোন্দকার আশরাফ হোসেন-এর মতো একজন বহুমাত্রিক লেখককে তুলে ধরা সহজ নয়। কামরুল হাসানের লেখাটি তাঁর প্রায় সকল রচনাকে স্পর্শ করেছে। আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে। স্মৃতিচারণমূলক কথাগুলোতে আমার নিজেরও নানা স্মৃতি জেগে ওঠে। চোখ ভরে আসে জলে। জল ভরা অস্পষ্ট দৃষ্টি নিয়েই পড়তে হলো লেখাটি। হ্যাঁ, বিশ্ব কবিতার সোনালি শস্য বইটির উৎসর্গপত্রে তার স্নেহভাজন অন্যদের সাথে আমার নামটিও নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, সবসময় একসাথে থাকি, একটু লিখিত স্বাক্ষর থাকুক।
      আমি নিজে এখনো তাকে নিয়ে কিছু লিখে ওঠার মতো স্থির হতে পারিনি। ঠিকমত ঘুমাতেও পারছি না। মেনে নিতে পারছি না তাঁর অকস্মাত তিরোধান।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Aunarjo Nayeem — জুন ১৯, ২০১৩ @ ১২:০৪ অপরাহ্ন

      অসাধারন লিখেছেন আপনি।খোন্দকার আশরাফ হোসেন এর অজানা দিক গুলো জানা হলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Junan Nashit — জুন ১৯, ২০১৩ @ ১:১৪ অপরাহ্ন

      কামরুল, আপনার লেখাটি পড়ে স্মৃতিকাতরতা আরো বেড়ে গেল। এমনিতেই খারাপ লাগছিল। মাত্রা আরো বাড়লো। তার মানে লেখাটি যুৎসই ও ভালো হয়েছে। একবিংশর কয়েকটি সংখ্যায় আমিও লিখেছি। তখন নতুন লিখতে আসা। তবু আশরাফ ভাই যত্ন করে ছেপেছেন। অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম নিঃসন্দেহে। কেবল ভালোলাগা থেকে স্বপ্রণোদিত হয়ে ওনার কবিতা নিয়ে আমি কয়েকবছর আগে গদ্য লিখেছিলাম। প্রথম আলো ছেপেছে।
      উনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অবহেলিত হয়েছেন সত্য, কিন্তু আমাদের মতো অসংখ্য ভক্ত, কবিতাপ্রেমিক তাকে মনে রাখবো, তাঁর কবিতায় সিক্ত হবো অন্তত এটুকু অঙ্গীকার নিজের সঙ্গে নিজেতো করতে পারি, নাকি?
      আশরাফ ভাই যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন, এটুকু কামনা ছাড়া আর কিছু বলার নেই। উনি তাঁরই এক কবিতায় বাড়ি যেতে চেয়েছিলেন। আজ সত্যিই তিনি তাঁর আসল বাড়ি চলে গেলেন।
      আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ, লেখাটির জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন fariduzzaman — জুন ১৯, ২০১৩ @ ৩:৩৬ অপরাহ্ন

      .
      কামরুল হাসান ভাইকে ধন্যবাদ। প্রিয় কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের প্রয়াণে এমন একটি লেখা লেখার জন্য।
      এ লেখা আমাদেরকে নতুন করে ভাবাবে। যে দেশে গুণীর কদর নেই সে দেশে গুণী জন্মায় না জানি। তবু কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের মত গুণী আমাদের দেশে জন্মান। মূল্যায়িত না হয়ে ঝরে যান। আমাদের জাতীয় জীবনে এ এক ক্লেদ। তবুও আনন্দ রোশনাই ছড়ায়—

      একবিংশ

      তিন রমণীর ক্বাসিদা

      পার্থ তোমার তীব্র তীর

      জীবনের সমান চুমুক

      সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর

      যমুনাপর্ব

      জন্মবাউল

      তোমার নামে বৃষ্টি নামে

      পাউল সেলানের কবিতা

      আয়(না) দেখে অন্ধ মানুষ

      সফোক্লিসের রাজা ঈদিপাস

      ইউরিপিদিসের মিডিয়া আলসেস্টিস

      টেরি ঈগলটনের সাহিত্যতত্ত্ব

      ডেভিড অ্যাবারক্রম্বির সাধারণ ধ্বনিতত্ত্বের ভূমিকা।
      হায় যথার্থ মূল্যায়ন! কবে ফিরবে বাংলাদেশে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পাপড়ি রহমান — জুন ১৯, ২০১৩ @ ৬:০৬ অপরাহ্ন

      ‘এখন সকল পুরস্কার, তিরস্কারের ঊর্ধ্বে চলে গেছেন খোন্দকার আশরাফ হোসেন। মৃত্যু তার তীব্র তীর পার্থের বুকে বিঁধিয়েছে; কিন্তু আমরা জানি, জানে বাংলা সাহিত্যের সকল সিরিয়াস পাঠক, খোন্দকার আশরাফ হোসেনের মৃত্যু নেই, যমুনা(পর্ব) বেয়ে তার কাব্যের ভেলা চিরকাল বয়ে যাবে। জীবনের সমান চুমুক-এর কবি তো আসলে জীবনেরই সমান, কেননা তাঁর সমগ্র জীবন কবিতাকে ঘিরেই আবর্তিত, অন্য সকল ভূমিকা পোষাকী মাত্র। আজন্মবাউল মানুষটি জীবনের উঠোনে কালও প্রবলভাবে উপস্থিত ছিলেন, আজ দূরবর্তী কুয়াশায় মিশে গেলেন’

      আজ দূরবর্তী কুয়াশায় মিশে গেলেন- এটা ভাবতেই খুব খারাপ লাগছে। গত কয়দিন অনেক চেষ্টা করেও তাঁকে নিয়ে এক লাইনও লিখতে পারছি না!
      কামরুল হাসান, আপনার লেখাটি ভাল লাগলো। তবে তাঁর কাজ পরিমাপ করার মতো কোনো নিক্তি সত্যিই আমাদের কারো হাতে নেই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Zahidul Islam, London — জুন ১৯, ২০১৩ @ ৭:১২ অপরাহ্ন

      ”কেবল কবিতা নয়, প্রবন্ধ এবং অনুবাদেও তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারের যোগ্যতা ধারণ করতেন। অথচ অমন প্রতিভাবান মানুষটিকে রিক্ত হাতে ফিরতে হলো ঈশ্বরগৃহে।”– Is it that? Any big personality is assessed by his/her contribution he/she is leaving behind for others. And again, none of them are, on final analysis, really interested to prepare a balance-sheet of their ‘give and take’. He did go, probably, empty handed in terms of awards; but his heart must have been full of love of his numerous loving admirers. I am sure, this burden of love has counterbalanced his alleged heavy heart for not getting the Bangla Academy award. These Academies were more relevant when the common mass were less educated. But now, in many instances, the people outside the purview of these are better educated and enlightened. Kamrul, you have done an excellent job! Many of us, the lot who are not the poets, did know that poet Ashraf Hossain was a big personality. Having come across your excellent tribute to him, I could realize, at least partially, that what a big asset we have lost, and lost forever! Fools are the fools, because they cannot determine what are valuable and what are not. Even they understand the value of something rightly, always they do it with undue depreciation. I wonder how many commoners are like me in the long list of fools who are just unable to value such personalities. This, however, makes me feel always small. But it is a real shame that many of the assessors entrusted with the job of sorting out the real jewels like poet Ashraf Hossain from the ‘all that glitters’, are no wiser than, at best a bunch of fools. No wonder that we will continue to read such honest tributes for personalities like him by many prolific poets like Kamrul Hassan. The person, for whom it is directed, has moved far above all these to the kingdom of peace and tranquillity. But you, Kamrul, made us wiser through your contribution. As an ardent admirer of poet Ashraf Hossain this is the best you could do at the moment with your aching heart. We look forward to have an extensive discussion on Khondoker Ashraf Hossain’s literary work. That will be the best prize for him, much glorious than any other posthumous medals.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Kamrul Hassan — জুন ১৯, ২০১৩ @ ৯:০৮ অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ কবি খলিল মজিদ আপনার সুচিন্তিত মন্তব্যের জন্য। আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত বিশ্ব কবিতার সোনালী শস্য গ্রন্থটি খোন্দকার আশরাফ হোসেন যে আপনাকেও উৎসর্গ করেছিলেন, তা ভুলবশত উল্লেখ না করার জন্য। আপনি প্রয়াত কবির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন, আপনার হৃদয়ে একই রক্তপাত হচ্ছে বুঝতে পারি। খোন্দকার আশরাফ হোসেন আমাদের মাঝে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mahmud tokon — জুন ১৯, ২০১৩ @ ৯:২৬ অপরাহ্ন

      মানুষ কী নিয়ে থাকে? কী তার সঙ্গে যায়? কেমন রোদ কিংবা বিষাদ তাকে ঘিরে থাকবে? আমি এর কিছু জানি, কিছু জানি না। কিন্তু কবি দ্রষ্টা, তাকে ঘিরে থাকে সামগ্রিক বিষয়। তবে অবহেলা তাকে বিষাদগ্রস্ত করে অনেক বেশি, অভিমান তার উত্তোরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে গভীরভাবে। লেখক স্বল্প পরিসরে কিন্তু অনেক গভীর করে তা বলেছেন। আমি কী বলবো ? আমার শিক্ষক সম্পর্কে? বলি- তাকে ভালবাসা যায়, তাকে শ্রদ্ধা করা যায়, তার ওপর নির্ভর করা যায় কিন্তু তাকে কোনভাবে অবহেলা করা যায় না। উপেক্ষাতো নয়ই।

      ‘বছরের পর বছর তাঁর চেয়ে কম মেধাসম্পন্ন কবিদের (কখনো স্রেফ অকবিদের) পুরস্কৃত করে বাংলা একাডেমি নিদারুণ অবহেলা করছিল এই প্রতিভাবান কবির প্রতি। অন্ধ প্রতিষ্ঠানটি আয়নায় এবার নিজের মুখ দেখে নিতে পারে..শেষাবধি সে বিপর্যয়ই ঘটল, সত্তরের মেধাবী কবি আবিদ আজাদের মতোই, নিদারুণ অবহেলিত হয়ে, অভিমান নিয়ে চলে গেলেন খোন্দকার আশরাফ হোসেন। তাকে পুরস্কার দিয়ে বরং বাংলা একাডেমি সম্মানিত হতে পারতো, কেননা একজন মহৎ কবির পুরস্কারে কিছু যায় আসে না, পুরস্কার তাকে ছোট বা বড় করে তুলতে পারে না। এক অর্থে এটা বরং ভালোই হল কেননা একাডেমির পুরস্কার নিয়ে বেশ কিছুকাল ধরেই যে বিতর্ক আর কানাঘুষা চলছে, সে অপবাদ তাকে নিতে হলো না।’

      আমি আর কী লিখি?
      তাকে ভালবাসি, তাকে শ্রদ্ধা করি আর তার জন্য ভেতরে বাহিরে কন্দি। আমার শিক্ষককে এক নিরেট ভদ্রলোক এবং মা্ন্যবর কবি হিসেবে ভালবাসি, শ্রদ্ধা করি। লেখককে ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Kamrul Hassan — জুন ১৯, ২০১৩ @ ৯:৩৯ অপরাহ্ন

      জাহিদ, তোমাকে ধন্যবাদ সুদূর ইংল্যান্ড থেকে আমার লেখাটি ও কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কৃতির উপর একটি সুদীর্ঘ মন্তব্য পাঠানোর জন্য। তোমার যুক্তিসঙ্গত, ওই একই কথা আমাদের সকলের মনে আগুন হয়ে জ্বলছে। আমাদের দেশের সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে। এখানে ধামাধরা, ধান্ধাবাজি আর রাজনীতি ছাড়া কিছু হতে চায় না। যারা নীরবে মূল্যবান কাজ করে যান তারা কর্তাদের নজরে পড়েন না, পড়েন দলীয় চাটুকাররা। খোন্দকার আশরাফ হোসেনের মতো প্রতিভাবান কবি ও প্রাবন্ধিক আমি খুব কম খুঁজে পাই। অথচ বছরের পর বছর অপেক্ষা করে মানুষটি অবশেষে চলেই গেলেন, রাষ্ট্র কিংবা বাংলা একাডেমি তাকে যথোপযুক্ত সম্মান জানাতে পারলো না। এবড় লজ্জার, এ বড় আক্ষেপের!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dawood al-Hafiz — জুন ১৯, ২০১৩ @ ১০:৪৭ অপরাহ্ন

      বেশ তো লাগলো। জটজলদি প্রতিক্রিয়া বলে হয়তো লেখাটি না হয়েছে যথাযথ স্মৃতিকথা, না হয়েছে সিরিয়াস আলোচনা। আড্ডায় উৎসর্গিত কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন ছিলেন আরো বর্ণাঢ্য। আমার নিজের জীবনের সঙ্গে দীর্ঘ তিরিশ বছর একাকার হয়ে আছেন তিনি। তাঁর মধ্যে পড়ে আমার ছাত্রজীবন, একবিংশের প্রকাশনা ও সম্পাদনা, সর্বশেষ এবারের একুশে বইমেলায় একবিংশ প্রকাশনা থেকে আমার একমাত্র কাব্যগ্রন্থের প্রকাশ। কত আড্ডা, কত কথা, কথকতা ! কবে যে সেসব ঠিকঠাক তুলে ধরতে পারবো !

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Tushar Gayen — জুন ২০, ২০১৩ @ ১:১৪ অপরাহ্ন

      কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের অকস্মাৎ তিরোধান আমার স্বাভাবিক জীবনের ছন্দপতন ঘটিয়ে দিয়েছে। যতই চেষ্টা করছি নিজেকে শোক ও বিষাদ থেকে এক ধরণের দার্শনিকতা দিয়ে মুক্ত করে নিতে, পারছি না। যার অনেক সাধ ও স্বপ্ন, অনেক সৃষ্টিশীলতার সামর্থ্য ধমনীতে প্রবহমান ছিল, তাঁকে কেন প্রকৃতির ইশারায় অথবা চিকিৎসকদের অবহেলার শিকার হয়ে অকালে চলে যেতে হবে! কবি কামরুল হাসান তাঁর সার্বিক অর্জনের এলাকা দ্রুত রেখার টানে ভালই ফুটিয়ে তুলেছেন যা আরো বিস্তৃত পরিসরে সময় নিয়ে আলোচনার দাবী রাখে। বাংলা একাডেমীর পুরস্কার সংক্রান্ত নষ্টামিকে কামরুল হাসান দারুণ চপেটাঘাত করেছেন এবং উচিত কাজটিই করেছেন। আমি নিজেও কবি খোন্দকার আশরাফের ঘনিষ্টদের একজন হওয়ায়, ব্যক্তিগতভাবে জানি তিনি বাংলা একাডেমীর পুরস্কারের ব্যাপারে আগ্রহ রাখতেন। যদিও আমি বার বার তাঁকে বলেছি বাংলাদেশের কোনো সাহিত্য পুরস্কারের ব্যাপারে তাঁর মত একজন শক্তিমান লেখকের আকাঙ্ক্ষা থাকা অনুচিত। ধামাধরা ছাড়া কী এই দেশে কেউ সাহিত্য পুরস্কার পায়? আমি তো দেখেছি বইমেলায় টিভি ক্যামেরাগুলোর সামনে কারা নাচানাচি করে।

      যাই হোক, এইসব বলে আর কী হবে? যারা বহুদিন খোন্দকার আশরাফের সাথে ঘুরে তাঁর জীবৎকালে এক লাইন লেখারও ফুরসৎ পায় নি, তারা যদি এবার সত্যিই কিছু লেখেন, তবে তাঁর বিদেহী আত্মা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে !

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তালাশ তালুকদার — জুন ২১, ২০১৩ @ ৩:০৯ পূর্বাহ্ন

      কী বলবো; স্তব্দ, হতবাক। খুব মর্মাহত। লেখাটি এ বেদনাগুলোর মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ — জুন ২১, ২০১৩ @ ৪:৩৯ অপরাহ্ন

      ভালো লাগল কামরুল ভাই। তাঁর হঠাৎ চলে যাওয়া আমার কাছে আমার আপনজন চলে যাওয়ার মতোই। এরকম স্মৃতি বিজড়িত লেখালেখির পাশাপাশি এখন উচিৎ হবে কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কাব্যকৃতির প্রকৃত মূল্যায়ন করা, বাংলা সাহিত্যে তার অবদানের ক্ষেত্রটিকে আবিষ্কার করা। তাহলেই মনে হয় তাঁর প্রতি সুবিচার হবে। সেদিকেই চোখ দিয়ে রাখলাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অনুপম হাসান — জুন ২৩, ২০১৩ @ ১২:৫৩ পূর্বাহ্ন

      কামরুল ভাই
      প্রথমেই অসংখ্য ধন্যবাদ। কবি খোন্দকার আশরাফের মৃত্যুর পরপরই আপনার এই স্মৃতিমূলক চমৎকার গদ্যটি লেখার জন্য। বলার অপেক্ষা রাখে না, দীর্ঘদিনের সহযাত্রী কবি হিসেবে তাঁর সাথে আপনার সম্পর্ক নানা সূত্রেই আবেগের চড়ামাত্রায় গ্রথিত ছিল। ফলে সহযাত্রী কবির অকাল প্রয়াণে আপনি বেদনাতুর হবেন সেটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। আপনার স্মৃতিমূলক এ গদ্যের পরতে পরতে সেই আবেগের উদ্বেল উচ্ছ্বাস রয়েছে।
      গদ্যটিতে ব্যক্তিগত স্মৃতির পাশাপাশি মোটামুটিভাবে তাঁর সাহিত্যকর্মের যে একটা পরিচয় তুলে ধরেছেন সেটা কিন্তু যথেষ্ট দক্ষতার ব্যাপার। কেননা আপনি যখন আবেগে টলমল, তখন এমন গদ্য লিখতে গিয়ে ব্যক্তিগত বিষয়-আশয় রেখে নৈর্ব্যক্তিক হওয়ার খুব একটা সুযোগ ছিল না। তারপরও আপনি যথেষ্ট দক্ষতার সাথেই খোন্দকার আশরাফের সাহিত্য প্রতিভারও একটা মূল্যায়ন করেছেন লেখাটিতে। বিশেষত তাঁর কবি হিসেবে শক্তিমত্তা, সমালোচক হিসেবে নৈর্ব্যক্তিক দক্ষতা, সম্পাদক হিসেবে তারুণ্যের প্রতি পক্ষপাত প্রভৃতি বিষয় আপনি চমৎকার ব্যাখ্যা করেছেন।
      আপনার লেখা সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত স্মৃতির কথাটা না বলে পারছি না।
      বিদ্র.
      গত বছর ২০১২, অক্টোবর। রাজশাহীতে কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে প্রথমবারের মতো বড় আয়োজন করা হয়েছিল। দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার এক পর্বে খোন্দকার আশরাফ হোসেন ছিলেন আলোচক হিসেবে। তাঁর আসা-না-আসার ব্যাপারটি নিয়ে কাজ করতে হয়েছিল আমাকে। এদিকে কার্ড তৈরি হয়ে গেছে। সবার নাম ঠিকানায় পাঠিয়েও দেয়া হয়েছে। কিন্তু কার্ড পাওয়ার পর খোন্দকার আশরাফ হোসেন আমাকে ফোন করে বসলেন। বললেন আমি কি কবি নই; অন্যদের নামের আগে কবি-প্রাবন্ধিক-কথাসাহিত্যিক প্রভৃতি বিশেষণ আছে কিন্তু আমার বেলায় এটি বাদ গেল কিভাবে?
      আমি তাঁর কাছে বিনীত ক্ষমা প্রার্থনা করলাম। বললাম, স্যার অনেক ঝামেলার মধ্যে শেষ মুহূর্তে কার্ড ছাপতে গিয়ে কিছু ভুলত্রুটি হয়ে গেছে। এজন্য আমার লজ্জিত। কিন্তু তিনি আমাকে বেশ হতাশ করে দিয়ে জানালেন– এজন্য হয়তো তিনি নাও আসতে পারেন। আমি বিস্মিত হলাম।
      ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়ার পর উনি এভাবে বলায় ভীষণ কষ্ট পেলাম। কিন্তু দেখা গেল অনুষ্ঠানের দিন ঠিকই হাজির হয়েছেন অন্যদের সাথে। খুব সাদাসিধে মানুষ। ১ম পর্বের অনুষ্ঠানের আলোচনা চলছে। আমি আামর ঘরে বসে অতিথির মাঝে তাদের জন্য উপহার সামগ্রি বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত আছি। হঠাৎ দেখি তিনি আমার ঘরে ঢুকে পড়লেন। চেয়ারে বসে নিজের পরিচয় দিয়ে জানালেন, অনুপম ভাই দুঃখিত, সেদিন তোমাকে ওভাবে টেলিফোনে বলার জন্য। তুমি কিছু মনে করো না। আমি হাসিমুখে তাঁর সৌজন্যের জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলাম। মন থেকেও দ্রুত সেই কষ্ট চলে গেল। এরপর অনুষ্ঠান হলো। তিনি অনুষ্ঠানে ড. আকবর আলি খানের বনলতা সেন বিষয়ক উদ্ভটতত্ত্বের দাঁত ভাঙা জবাব দিয়ে যে লেখাটি লিখছিলেন, সেটি অত্যন্ত চমৎকার করে রসিয়ে রসিয়ে বক্তৃতা করলেন। তার প্রবন্ধ পাঠের প্রক্রিয়া থেকেই বোঝা গেল তাঁর ভাণ্ডে যথেষ্ট হিউমার আছে।
      এরপর গত বই মেলায় লিটল ম্যাগ চত্বরে স্যারের সাথে। দেখেই সালাম ঠুকলাম। সহাস্যে তিনি জানালেন– অনুপম তোমাদের ওখানে যে লেখাটি পড়েছিলাম সেটি বই আকারে বের হয়েছে। দেখ। আমি অবশ্য অন্য ঝামেলায় আর বইটি কেনার কথা মনে রাখতে পারি নি। কিন্তু বছর ঘুরল না, অক্টোবর এলো না– চলে গেলেনে খোন্দকার আশরাফ। হয়তো আর কোনোদিনই আমাদের সাথে তার দেখা হবে না। হয়তো রাজশাহীতে আবারও জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে অনুষ্ঠান হবে কিন্তু তিনি আসবেন না; তাঁকে আসার জন্য আমাকে দূতিয়ালী করতে হবে না।

      ধন্যবাদ আপনাকে

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Tasneem Hossain — জুন ২৩, ২০১৩ @ ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন

      I was a student of Dhaka university, English Department. Unfortunately, I didn’t have the opportunity to meet Ashraf Sir(which I regret all the time). But this truly wonderful piece of writing by Mr. Kamrul Hasan has so much depth and insight that I feel I know Ashraf Sir personally.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com