প্রবন্ধ, ব্যক্তিত্ব, সাক্ষাৎকার

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ:

‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

রাজু আলাউদ্দিন | 23 May , 2013  

মেহিকোর প্রথম সারির লেখিকা এলেনা পনিয়াতৌস্কার সাথে অক্তাবিও পাসের কথোপকথনভিত্তিক একটি বই হচ্ছে Octavio Paz : Las Palabras del arbol নামে । বইটি বেরিয়েছিলো ১৯৯৮ সালে মেহিকো থেকে। এ বইটিতে নানা প্রসঙ্গের সাথে আলোচিত হয়েছে বু্দ্ধ এবং বুদ্ধবাদ সম্পর্কেও । ভারতীয় ভাবুকতার যে অংশটি পাসকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে তা বুদ্ধবাদ। বুদ্ধ এবং বুদ্ধবাদের প্রতি তার গভীর অনুরাগ এবং শ্রদ্ধা অত্যন্ত গভীর। বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম-এর পাঠকদের জন্য এখানে প্রাসঙ্গিক অংশটুকু অনুবাদ করা হল স্প্যানিশ থেকে । অনুবাদ করেছেন রাজু আলাউদ্দিন । বি. স.

তিনি মনে করেন, “দুটো কারণে গৌতম ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি: প্রথমত তিনি হলেন সেই লোক, যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি।
তিনি বললেন: ‘আমি দেবতা নই’ আর একই সময়ে এবং একই কারণে নিজেকে মানব বলেও দাবি করলেন না। বললেন, একজন আদর্শ মানুষের উচিৎ ‘মানব’ ধারণাকে বর্জন করা।”১
সেই মৌলিক দশটি প্রশ্নের বিপক্ষে বুদ্ধের নিরবতা সম্পর্কেও পাসের ব্যাথ্যা বৌদ্ধবাদের মৌলিকতাকেই নিশ্চিত করে তোলে।

এলেনা বুদ্ধের এই নিরবতার সাথে পাস একমত কিনা জানতে চাইলে উত্তরে তিনি বলেন: “হ্যাঁ এবং না। সবই নির্ভর করে অর্থের মাধ্যমে আমরা কী বুঝলাম তার উপরে। ঐতিহ্য থেকে জানি বুদ্ধকে দশটি প্রশ্ন করা হয়েছিল: আত্মা শরীর থেকে স্বতন্ত্র্ কোনো ব্যাপার কিনা, সময় সসীম নাকি অসীম, মহাশূন্যের কোনো অন্ত আছে কিনা। এই জীবনের পরেও কোনো জীবন আছে কিনা ইত্যাদি। এগুলো মানুষের মৌলিক প্রশ্ন। দার্শনিক এবং ধার্মিকেরা সবসময় কোনো না কোনোভাবে এই প্রশ্নগুলোর প্রতি সাড়া দিয়েছেন। কিন্তু বুদ্ধ ছিলেন নিশ্চুপ।

বুদ্ধের নিরবতা বহু বিতর্ক এবং ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে। এই নিরবতার কী অর্থ থাকতে পারে? আমার ধারণা লেভি-স্ট্রাসের মতে, যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রশ্নগুলো ছিল সামঞ্জস্যহীন। অর্থহীন সব প্রশ্ন।

তবে কোনো কোনো বৌদ্ধবাদী দার্শনিক মনে করেন যে এমন কিছু বিষয় আছে, যার ব্যাপারে নীরব থাকা ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না; আর সেই কারণেই বুদ্ধ এদের কোনো জবাব দেননি। শব্দ হচ্ছে দ্বান্দ্বিক: কোনো কিছুকে ইতিবাচক করলে অন্যটি নেতিবাচক হয়ে পড়ে।

এমন এক মুহূর্ত আছে যখন একে ইতিবাচক বা নেতিবাচক, কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়। কিংবা বলা যায়, ইতিবাচক এবং নেতিবাচক, অর্থময়তা এবং অর্থহীনতা পরস্পরকে আলিঙ্গন করে বা পরস্পরের মধ্যে সমঝোতা তৈরি করে নেয়। এটাই হতে পারে বুদ্ধের নিরবতার অর্থ।”২

লাতিন আমেরিকার লেখকদের মধ্যে সম্ভবত পাস এবং বোর্হেসই গৌতম বুদ্ধকে অন্য যে কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের তুলনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছেন এবং নিজেদের ভাষায় তাকে নিয়ে লিখেছেন।

বোর্হেসের তো একটি আস্ত বই-ই রয়েছে বুদ্ধকে নিয়ে বুদ্ধবাদ কী ?(Que es el budismo ?, columbia, Buenos Aires, 1976) নামে। এছাড়া রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ। পাস তাকে নিয়ে স্বতন্ত্র কোনো কেতাব হয়তো লেখেননি কিন্তু তার বিভিন্ন প্রবন্ধে এবং সর্বশেষ এই পুস্তকদীর্ঘ সাক্ষাৎকারের বিভিন্ন জায়গায় প্রসঙ্গত উল্লেখ এবং সশ্রদ্ধ মন্তব্য আমরা দেখতে পাব। বুদ্ধকে নিয়ে পাসের চূড়ান্ত মন্তব্য : “ভালোবাসি বুদ্ধের সংস্কার, এ হচ্ছে সবচেয়ে মৌলিক।”

তথ্যসূত্র:
১. Octavio Paz : Las Palabras del arbol, Elena Poniatowska Plaza y Janes Editorial, 1998. P-100.
২. Octavio Paz : Las Palabras del arbol, Elena Poniatowska, Plaza y Janes Editorial, 1998. P 109-110.

Flag Counter


7 Responses

  1. Raoshan J. Chowdhury says:

    রাজু, আমার জানায় ভুল না থাকলে, আইনস্টাইনও মনে করতেন বুদ্ধবাদই একমাত্র ধর্ম যা আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সক্ষম।

  2. যে কোনো ধর্মপ্রচারকের সাধ হয় নিজেকে ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত করা অথবা নিজেকে দেবতা বলে জাহির করা। কিন্তু বুদ্ধ তা করেননি। একারণেই তিনি মহামানব।
    রাজুকে ধন্যবাদ পাসের বুদ্ধভাবনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য।

  3. Manik Mohammad Razzak says:

    বৌদ্ধ ধর্মের পরিধি একদিন হয়তোবা বৈশ্বিক পরিমন্ডলে বিস্তৃত হবে। ঈশ্বরহীন এ ধর্ম দর্শনের মাঝে মানুষ খুঁজবে মানবিক সমাজ। এরই একটি পূর্বাভাস হয়তোবা ল্যাটিন সমাজে পরিদৃষ্ট হয়েছে অক্তাভিও পাসের লেখনিতে। রাজু আলাউদ্দিন এ ধরনের চমকপ্রদ লেখনির সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে যথার্থ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। রাজু ভাইকে অসংখ‌্য ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা।

    মানিক মোঃ রাজ্জাক

  4. এস.বি.সৈকত বড়ুয়া says:

    গৌতম বুদ্ধ কখনোই দেবতা হিসেবে নিজেকে উপাস্হাপন করেন নাই। ভগবান তথাগত গৌতম বুদ্ধ চাইলেই অনেক অনেক বছর বাঁচতে পারতেন কিন্তু উনি তা না করে সাধারB মানুষের মত ৮০ বছর বয়সে পরির্নিবাণ লাভ করেন। এ জন্যে তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট মহামানব।

  5. onindo oli says:

    ভারতীয় গবেষক ও লেখক রাহুল সাংকৃত্যায়ন কার্ল মার্ক্স-এর মানবিক সমাজের মাঝে গৌতম বুদ্ধকে খুঁজে পে্যে ছিলেন,তাই মার্ক্সবাদি হয়েও কখনো বুদ্ধধর্মকে ত্যাগ করেন নি…।।

  6. ranjan barua says:

    বৌদ্ধ ধর্মে স্বর্গ নরকের পরেও আরেকটি স্তরের কথা বলা আছে, “নির্বাণ”। যা অন্যকোন ধর্ম দর্শনে দেখা যায় না। জাগতিক কামনা বাসনা লোভ লালসা তৃষ্ণা হেতু দুঃখ ও পাপাচারকে জয় করার মাধ্যমে “নির্বাণ-এ পৌঁছা যায় ।

  7. ranjan barua
    নতুন কিছু জানালেন। ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.