১৯৭১, গদ্য, প্রবন্ধ, বিশ্বসাহিত্য, স্মৃতি

বাংলাদেশ ও শেখ মুজিব প্রসঙ্গে আঁদ্রে মালরো

রাজু আলাউদ্দিন | 4 May , 2013  

বিচিত্র ধরণের বইপত্র পাঠের সুবিধা এই যে মাঝেমধ্যে এমন সব অভাবিত এবং অপ্রত্যাশিত জিনিস পাওয়া যায় যার জন্যে কোন মানসিক প্রস্তুতি আমাদের সব সময় থাকে না। আর এই না থাকার কারণে অভাবিত প্রাপ্তি আমাদের অনুভূতির উপর এক আনন্দময় স্পর্শ বুলিয়ে যায়। What I am Doing Here(1990) বইটি পড়ার আগেও কি জানতাম যে ব্রুস চাটউইন-এর এই বইটিতেই রয়েছে বাংলাদেশ এবং শেখ মুজিব সম্পর্কে কৌতূহলোদ্দীপক এক টুকরো মন্তব্য? না, মন্তব্যটি চাটউইনের নয়। চাটউইনের হলেও আমার কৌতুহল তাতে একটুও কম হতো না বটে। তবে যিনি মন্তব্য করেছেন তিনি অনেক আগে থেকেই আমার পরিচিত। শুধু আমারই নয়, বাংলাদেশের অনেক শিক্ষিত মানুষের কাছেই, তিনি পরিচিত ব্যক্তিত্ব। তিনি আঁদ্রে মালরো। মালরো বলেই যেন চোখ ও মনযোগ আরও টানটান হলো ঐ মন্তব্যের প্রতি কারণ তিনি ছিলেন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের এমন একজন ফরাসি সমর্থক যিনি আমেরিকা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের তোয়াক্কা না করেই বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন।

মালরোর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে যারা আগে থেকে জানতেন না তাদের কাছে এই ঘটনা অবাক করা মনে হলেও–আমি বলবো–তাঁর পক্ষে এটাই ছিলো স্বাভাবিক। তিনিই তো সেই মালরো যিনি স্পেনে ফ্যাসিষ্ট ফ্রাংকো কর্তৃক গণতন্ত্র বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় এবং সেখানকার নিরীহ নারী-পুরুষদের নির্বিচার হত্যায় আলোড়িত হয়ে হিস্পানী প্রজাতন্ত্রীদের পক্ষে যুদ্ধ করেছেন। সুতরাং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা যখন নির্বিচারে বাঙালিদের হত্যা করে যাচ্ছিলো, তখন এই সংবাদে তিনি স্থির থাকতে পারবেন না–এটাইতো স্বাভাবিক। সেই সময় তিনি আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ঘোষণাও জানিয়েছিলেন বিবৃতি দিয়ে। মালরোর বয়স তখন ৭০ এর কাছে। ৭০-এ এসে তিনি ৭১-এ আত্মহুতি দিতে চেয়েছিলেন আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে। যদিও শেষ পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রয়োজন পড়েনি আর। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে মালরো তাঁর ভূমিকা ঠিকই পালন করেছিলেন। সত্যি বলতে কি ভারত যদি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়ক ভূমিকা পালন না করতো তাহলে মালরোকে আমরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সেই সময় আমাদের পাশে পেয়ে যেতাম। এরকমই ছিলো তাঁর পরিকল্পনা যা তিনি রুস চাটউইনকে এক সাক্ষাৎকারে ঘটনার(৭১) বছর তিনেক পরে জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে চাটউইনকে যা জানিয়েছেন তা সরাসরি অনুবাদে হাজির করার আগে উৎসটি সম্পর্কে দু’একাট কথা বলা প্রয়োজন।

চাটউইনের বইটি আসলে তাঁর ভ্রমণের ফসল। চাটউইনের পাঠক মাত্রই জানেন যে তিনি মূলত ভ্রমণ-ঔপন্যাসিক। এই বইটি তাঁর In Patagonia, On the Black Hill কিংবা Songlines এর মত না হলেও এটাও এক ধরনের ভ্রমণেরই ফসল। তবে অন্য প্রকরণে। ভ্রমণজাত হলেও এটি ঐ ঘরানারই মিশ্র মাধ্যম বলা যেতে পারে। এই মিশ্র মাধ্যমের একটি হচ্ছে বইটির Encounters পর্ব । এই পর্বে তিনি বিভিন্ন সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছয় জনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের বিবরণ তুলে ধরেছেন। এঁদের মধ্যে মালরো একজন। মালরোর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিলো ৭৪ সালে অর্থাৎ বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমন্ত্রণে আমাদের স্বাধীন দেশটি ঘুরে যাওয়ার প্রায় এক বছর পর। ফলে বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর স্মৃতি ও আবেগ, তখনো সজীব। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে ব্রুস জানাচ্ছেন যে বছর দুয়েক আগে মালরোর সাথে সাক্ষাৎপ্রার্থীরা যখন ভেররিয়ের-এ আসতেন তখন তাঁকে পূর্ব বাংলার মানচিত্রের প্রতি নিবিষ্ট অবস্থায় দেখে তারা বেশ অবাক হতেন। এ প্রসঙ্গে চাটউইনের কৌতুহলের জবাবে মালরো জানানঃ

“ভারত যদি ঘটনায় প্রবেশ না করতো, আমি হয়তো গুরুতর কিছু করে ফেলতাম। প্রায় ৬শ’ অফিসার আমি বাংলায় (Bengal) নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। ফ্রান্সে যে কোন সংখ্যক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা পা্ওয়া যায়, যারা তেমন তরুণ নয়, তবে খুব বৃদ্ধও নয়। এবং তারা একেবারে একঘেঁয়ে জীবনে বিরক্ত আর বেরিয়ে পরার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার উপরে ৬শ’ কর্মকর্তা নিয়ে একটি অফিসার ট্রেনিং স্কুল করে দুই হাজার বাঙালি অফিসার তৈরি করে ফেলতে পারতাম ৬ মাসের মধ্যে। তাদের সব অফিসাররাই তো ছিলো পাকিস্তানি, সেক্ষেত্রে আমরা একটা বড় কাজ করে ফেলতে পারতাম।

মুজিবুর রহমানকে কেমন দেখলেন? ‘ইউরোপিয়রা তাঁকে নেহেরু বা গান্ধীর মত ভেবে ভুল করেন… মুজিবের মোহিত করার ক্ষমতা রয়েছে। তিনি যখন দেশে ঘুরে বেড়ান, তখন তিনি মনে করেন যে সবকিছু চমৎকার আছে কারণ সবখানেই তারা তাঁকে রাজকীয়ভাবে অভ্যর্থনা জানায়। আবেগময় পরিবেশ তিনি তৈরি করতে পারেন। বাংলাদেশ জয়ী হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তার নিশ্চয়তা অতটা নেই। সন্দেহ নেই, তিনি একজন খাঁটি মানুষ। তাঁর মধ্যে কোন দুর্নীতি নেই, তবে রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে আর তাদের সমস্যাগুলোও বেশ বড়।’’

এরপর বাংলাদেশ ও শেখ মুজিব প্রসঙ্গে আর উক্তি নেই। মনে মনে খুব আফসোস হচ্ছিলো এই ভেবে যে চাটউইন কেন আরও কিছু প্রশ্ন করলেন না এনিয়ে। কিংবা মালরো কেন আরও কিছু বললেন না।

Flag Counter


15 Responses

  1. ফারুক আহমেদ says:

    শেখ মুজিব গান্ধী বা নেহরুর মতো নেতা অবশ্যই নন। তবে তিনি হলেন এমন এক কিংবদন্তি, যিনি সৎ এবং নির্ভীক। বাংলার মানুষের মধ্যে ছিল তার অগাধ ভালবাসা। তবে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ লোকদের নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে তার বেশ কিছু সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। এবং সেটাই স্বাভাবিক ছিল।

    তবে একটি কথায় কোন সন্দেহ নেই, “শেখ মুজিব বাংলার জাতির পিতা। তিনি কিংবদন্তি।”

  2. রাজু আলাউদ্দিনের “বাংলাদেশ ও শেখ মুজিব প্রসঙ্গে আঁদ্রে মালরো” পড়ে অজানা কিন্তু দরকারী তথ্য জানা গেলো। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিদেশের বন্ধুরা কী ভেবেছেন তার এক খণ্ডচিত্র এটি। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরব এবং বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতির পিতা। What I am Doing Here-এর মতো বই আমাদের সেই গৌরব আরো বাড়িয়ে দেয় এবং জাতির পিতার প্রতি আমাদের আরো শ্রদ্ধাশীল করে তোলে। রাজুর পাঠপ্রিয় চোখে কিছু এড়ায় না। তার বহুদর্শী ও নিমগ্ন পাঠ এমন আরো জিনিস আমাদের সামনে এনে হাজির করবে সেই প্রত্যাশা।

  3. matin bairagi says:

    লেখাটির জন্য কবি রাজু আলাউদ্দিনকে ধন্যবাদ । আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রসংগে এরকম একজন খ্যতিমান মানুষ আবেগ আর অনুভুতি প্রকাশ করেছিলেন তা’ জানবার সুযোগ তৈরি করে দেয়ার জন্য । স্বাধীনতার স্থপতি প্রসংগে ও তৎসময়ের রাষ্টের অবস্থা প্রসংগে তাঁর মূল্যয়ানও আমরা জানতে পারলাম রাজুর পাঠ প্রকাশ থেকে। রাজুকে আন্তরিক ধন্যবাদ আবারও ।

  4. Taposh Gayen says:

    আমাদের কিংবদন্তীসম পুরুষদের নিয়ে ওয়েষ্টার্ন মনীষীদের মন্তব্য দেখি বরাবরই সংক্ষিপ্ত, অনেকটাই সিন্ধু সেচে মুক্তা খুঁজে বের করার মতো । কবি-প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনকে ধন্যবাদ, আমাদের দরোজায় এই প্রসাদ নিয়ে আসার জন্য ।

  5. bokul says:

    `কিন্তু তার নিশ্চয়তা অতটা নেই’–কথাটা একটু বিবেচনায় নিবেন।
    বড় মানুষরা কত সুন্দরভাবে মত প্রকাশ করেন ।

  6. M. Aziz says:

    শেখ মুজিব সম্পর্কে বিদেশিদের মূল্যায়নের চেয়ে যারা তাকে কাছে থেকে দেখেছেন তাদের মূল্যায়নই অধিক গ্রহণযোগ্য বলে আমি বিবেচনা করি। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের দুঃখজনক মৃ্ত্যুর পর খ্যাতিমান সাংবাদিক এনায়েতউল্লাহ খান লিখেছিলেন: “তিনি ছিলেন রূপকের রাজা, সত্যিকারের মুকূটের ভার তাই বহন করতে পারেননি।” মানুষকে যে দক্ষতার সাথে তিনি ক্ষেপিয়ে তুলতেন, তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন ততোটাই অদক্ষ। মালরোঁ দেখেছেন উপরিকাঠামো থেকে, ভিতরটা দেখলে তিনি এতোটা উচ্ছসিত নাও হতে পারতেন।

  7. abdus salam says:

    মুজিব ফেরেশতা বা মহাজ্ঞানী ছিলেন না এটা সবাই মানবেন, যে সরল বিশ্বাসে তিনি শিক্ষা, শিল্প, কৃষি ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগগুলো নিয়েছিলেন স্বল্প সময়ে সফলতা দেখাতে না পারলেও দিকনির্দেশনা সুস্পষ্ট ছিল। আর তাই এত বছর পরেও সেখান থেকে ধরে আবার শুরু করতে চান অনেকেই। পরিত্যাক্ত শিল্পকারখানা জাতীয়করণ না করলে সেগুলোর কি অস্তিত্ব থাকত? প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ যে কতটুকু সঠিক ছিল তা আজও আরও বেশি বেশি স্কুলকে জাতীয়করণের দাবী থেকেই প্রমাণ হয়। কৃষকদেরকে ন্যায্যমূল্য দেওয়ার জন্য আজও সরকারীভাবে ধান চাল ক্রয় চলে।

  8. mohammad shaheed says:

    It’s a masterpiece.

  9. Abul Kashem says:

    সত্য চিরকাল অম্লান ।

  10. maniryousuf says:

    আফসোস আমাদেরও।

  11. zakir hossain says:

    Dear All,

    Mujib is a great leader of the world.

    As a president he was very good to run his country but he didn’t get lot of of time to prove his capability.

    Thanks
    Zakir Hossain

  12. Manik Mohammad Razzak says:

    রাজু ভাই, চমৎকার লেখনির জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

    মানিক রাজ্জাক

  13. গিয়াস উদ্দীন শিপু says:

    বঙ্গবন্ধু একজন অসাধারণ মনের মানুষ ছিলেন।তার মধ্যে কোন দুর্নীতি ছিলনা।ক্ষমতালোভী ছিলেন না।সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি।বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা।

  14. আব্দুল আহাদ says:

    শেখ মুজিব বাংলার জাতির পিতা। তিনি কিংবদন্তি।

  15. ধন্যবাদ রাজু আলাউদ্দিন।

    ওপরে দেওয় এম. এ. আজিজের বক্তব্যের সঙ্গে একমত। এর সংগে যোগ করে আরো বলি, মালরো সংক্ষেপে উপর থেকে দেখা বিবৃতিটুকুই দিয়েছেন। খতিয়ে দেখলে তিনিও হয়তো একমত হতেন যে, শেখ মুজিবের মতো একজন উঁচু দরের দাম্ভিক, ফ্যাসিষ্ট ও বক্তৃতা সর্বস্ব রাষ্ট্র নায়ক বাংলাদেশে আর কখনো আসেননি; অদূর ভবিষ্যতে না আসাই ভালো। তাই ১৯৭১ এর রক্তস্নাত বাংলাদেশ নামক দেশটির জন্মের পর [ভক্তিজ্ঞানে অন্ধত্বটুকু বাদ দিলে] শেখ মুজিবের নায়ক থেকে খলনায়কে রূপান্তিরত হতে খুব বেশী সময় লাগেনি।

    তার সর্ম্পকে আহমদ ছফার ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ নামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ আছে। সেখানে উপসংহারে ছফা তাকে মূল্যায়ন করেন এভাবে, “খুব সম্ভবত শেখ মুজিব একজন করুণ বীর, তাঁর চরিত্র অবলম্বন করে ভবিষ্যতে সার্থক বিয়োগান্ত নাটক লেখা হবে-কিন্তু তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে বাংলার ইতিহাসের মুক্তি ঘটানো যাবে না।”…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.