কবিতা

যে কান্না কংক্রিট ভেদ করে যায়

tusar_gayen | 28 Apr , 2013  

সহস্র সেলাইকলে নিবিড় আঙুলগুলো অবিরাম সুতো ভরে দেয় সুঁইয়ের শূন্যতায়, ফ্যাশন-উজ্জ্বল নিশ্চেতন করা নিপুণ সেলাই নিয়ে ভাসে পোষাকপ্রবাহ মুনাফার উড্ডীন রেখায়—পাষাণপুরীর গায়ে ফাটল দেখার ভয় কাটিয়ে উঠতে চায় আগুয়ান দুপুরের ক্ষুধা, একদিন কাজের কামাই যদি তিন দিনে শোধ দিতে হয়—বুকের ভেতর ভয়, হায়াৎ মউত রয় আল্লাহর হাতে—বাকীটা মালিক আর তার পোষা কুকুরেরা জানে… ডোবার উপরে ভাসে যেই ঘর তিনতলা গাঁথুনির ’পর কী যে কুদরত দশতলা ওঠে আরো দমাদ্দম বেহেশতে যাবার মোকাম—সহস্র সেলাইকলে আঙুলের নিবিড় মগ্নতা প্রার্থনার মত একটানা শব্দ করে বয়ে যায় বড় …
হঠাৎ যে পড়ো পড়ো, শব্দ বড়, কী পড়ে মাথার ’পরে … তাড়াতাড়ি করো তাড়াতাড়ি করো… কেয়ামত কী নেমে এল ঘাড়ের উপর… আহ্‌ এত ভার সরিয়ে যে দিতে চায় কংক্রিট বীমের নিচে চাপাপড়া হাত নিঃসহায়, দুমড়ে মুচড়ে ভাঙে দণ্ডিত পিলারগুলি কৃশকায় শ্রমিকের মত যার বহনের দায় দালানের ভার আর মুনাফার ভার, দুদ্দাড়
ছাদটি পড়ছে দেখে মেয়েটি ভয়ার্ত দৌঁড়ে আসে
দু’হাতে সরাতে হবে ওকে উঁচু থেকে তা পড়ার আগে
নিমিষে জাপটে ধরে ছেলেটির তাকে সরিয়ে নেবার আগে
মৃত্যু আছড়ে পড়ে দু’জনের মাঝে চিৎকৃত চিরকাল
স্থির জমাট ভাস্কর্য আলিঙ্গনাবদ্ধ অনুপম—
সুড়কির ভারে মেয়েটির মাথা হেলে যাওয়া পিছনের দিক
আর ছেলেটির মাথা নোয়ানো যে মেয়েটির বুকে
পিঠে তার ধসে পড়া জমাট কংক্রিট …

ঐ তো একটি পা তার দ্রুত উদ্বিগ্নতা নিয়ে চাপা পড়ে আছে দেয়ালের নিচে
ঐ তো একটি পা রক্তে আলতামাখা নুপুরের সিঞ্জনী বাজায় আকাশের দিকে
ঐ তো হাতদুটো থরথর বাঁচার আকুতিঘেরা প্রার্থনায় স্থির
ঐ তো কাঁধে পৃথিবীর ভার নিয়ে ধুলায় লুটায় প্রমিথিউস

আমাকে উদ্ধার করো না হয় আমার পা কেটে
আমাকে উদ্ধার করো আমার দু’হাত ভেঙে
তিলে তিলে আয়ু এই নিঃশেষ হবার আগে বের করো
পাতালে ক্রমশঃ ডুবে যাওয়া যক্ষপুরী হতে
নন্দিনীকে বের করো রাজাকে শোনাবে যে
সেলাইকলের মূর্চ্ছনায় জেগে ওঠা গান …
আমাকে উদ্ধার করো হে দেবতা মুনাফার!

এত যে পাষাণ ভার, অতলান্ত মৃত্যুর আধারে শ্বাসরোধী যতটুকু অবকাশ আছে, জন্মেছে সেখানে বিচারের দাবী নিয়ে উত্তোলিত হাত দারুণ রোরুদ্যমান নবজাতক সুন্দর।

টরন্টো
এপ্রিল ২৭, ২০১৩

Flag Counter


4 Responses

  1. matin bairagi says:

    আমাকে উদ্ধার করো না হয় আমার পা কেটে
    আমাকে উদ্ধার করো আমার দু’হাত ভেঙে
    তিলে তিলে আয়ু এই নিঃশেষ হবার আগে বের করো
    পাতালে ক্রমশঃ ডুবে যাওয়া যক্ষপুরী হতে
    নন্দিনীকে বের করো রাজাকে শোনাবে যে
    সেলাইকলের মূর্চ্ছনায় জেগে ওঠা গান …
    আমাকে উদ্ধার করো হে দেবতা মুনাফার!
    বাস্তবতা ও আবেগের চমৎকার সমন্বয় আহত,নিহত,হারিয়ে যাওয়াদের এই এলিজি
    কার হৃদয়কে না ছূঁয়ে যায়,কবি আপনাকে শুভেচ্ছা।মতিন বৈরাগী;

  2. iqbal hasnu says:

    কবিকে ধন্যবাদ, আমাদের সময়কালের মানবসৃষ্ট ট্র্যাজেডিকে গ্রীক পুরাণের প্রমিথিউসের অনন্য মানবতার সঙ্গে সম্পর্কিত করায়।

  3. Tushar Gayen says:

    প্রিয় পাঠক, আপনারা যারা কবিতাটি পড়েছেন এবং অনেকে যারা পড়বেন— এই কবিতার ভিতর দিয়ে যদি যেই নির্মম মৃত্যুযজ্ঞের প্রতি আমাদের ক্ষ্ট, ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ভাষা কিছুটাও প্রাণ পেয়ে থাকে, তবেই যন্ত্রণার কিছুটা লাঘব বোধ হবে। আপনাদের অনেক ধন্যবাদ।

    কবি মতিন বৈরাগী ও লেখক-সম্পাদক ইকবাল হাসনু, আপনাদের আন্তরিক পাঠপ্রতিক্রিয়া, সমর্থন ও বিশ্লেষণ সৃষ্টিশীলতার উৎসাহ। অনেক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানবেন।

  4. jhoneey says:

    কবিদের প্রতি কৃতজ্ঞ এই সময়কে ধারণ করার জন্য। এই ক্ষমাহীন অপরাধে কলমের আগুন দিয়ে জাগিয়ে তুলতে হবে বাঙালির আত্মাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.