কবিতা

সহজ কল্পনা

omor_sams | 25 Apr , 2013  

এই যে দেখেছিস দাগ, দরোজার বাইরে –
দুঃখ পারবি-নে তুই ঢুকতে , বাইরে যা –
নরকে যা, পাতালে যা, নষ্ট নক্ষত্রের অন্ধ বিবরে যা!

এই দ্যাখ হাতা! আমি চালনা-বরিশাল-সন্দীপ-হাতিয়া-র তলা দিয়ে – চরের ধান, মাঝির জাল, সুন্দরী- গড়ান-হেঁতাল এড়িয়ে, সবগুলো হরিণ-বাঘ-চন্দ্রবোড়া বাঁচিয়ে – চট্টগ্রাম, পার্বত্য-চট্টগ্রামের বাইরে দিয়ে দাগ দিলাম। পারবি-নে! পারবি-নে! দুঃখ, তুই আসতে! ঝড়-সিডর, সব সমুদ্রোচ্ছ্বাস – বলে দিলাম – তোকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। যেতে হবে।
দুঃখ, তুই নিপাত যা
অমাবস্যার মুন্ডু খা! – পারবি-নে
কেননা কাঠঠোকরা-মাছরাঙা-বাজ আর চিলের শপথঃ
কোন কিশোরীর দিকে এসিড ছুঁড়ে মারলেই তা নির্মল গোলাপজল হয়ে বেরোবে।

আসবি-নে দুঃখ, আসবি-নে –
আশুলিয়ার ফ্যাক্টরিতে আর আগুন জ্বালাতে পারবি-নে, কেননা
কেরোসিন, আগুন, অক্সিজেন আর বিদ্যুতের শপথ!

গাজীপুর রোডে বিভ্রান্ত–অবিশ্রান্ত ট্রাক, পথ হারালেই
ট্রাফিক-পথিক-উল্টো বাস মুহূর্তে এড়িয়ে-বাড়িয়ে আমার অলৌকিক কম্পাসে
সোজা হয়ে যাবে।

দুঃখ, পারবি-নে,
পদ্মা–যমুনা-মেঘনা-সুরমার ঢেউয়ের শপথ,
আদিগন্ত সোনালি ধান আর হলুদ সর্ষের শপথ, – ম’রে যা!
শিমুল কি ফোটে নি? মেঘ কি বৃষ্টি নিয়ে আসে নি?
দুঃখ, তুই স’রে যা! নির্ঘাত ম’রে যা!

এই দ্যাখ শাবল, বেনাপোল–যশোর–কুষ্টিয়া-পদ্মা-তিস্তা সব বাঁচিয়ে আমি দাগ কেটে দিলাম – ব্রহ্মপুত্রর বেড়ি দিয়ে, গারো-পাহাড় থেকে সুরমার বেলেপাথরগুলোর বাইরে নকশা কেটে-এঁকে। দুঃখ , তুই পারবি-নে ! যেখানে খুশী সেখানে যা। ঐ যে, এক কবি দালানে-দরোজায়-কড়িকাঠে, চায়ের পেয়ালায় দুঃখ সাজিয়ে রাখতো – তার কাছেই যা। যেখানে খুশী সেখানে যা –
শিশিতে, বোতলে, বগিতে, বার্‌জে, ছালায়, পিপেতে
ভ’রে যা! স’রে যা! দুঃখ, তুই নিপাত যা!

Flag Counter


9 Responses

  1. matin bairagi says:

    ‘সহজ কল্পানা’ কবি ওনর শামস এর সাম্প্রাতিক কবিতা ।’আমার সন্তান যেনো থাকে দুধে ভাতে’ এই সহজ প্রত্যাশার মতো যা সহজ নয় ।তবুও সহজের প্রতি মানুষের চির কালের টান মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে জীবন সংগ্রামে। সহজ হয় না পাওয়া,তবু সহজে-রে চাওয়া । আসলে সহজই ছিল মানুষ কিন্তু সে আজ আর সহজ নয়। সমাজ, রাজনীতি জীবন আচার তাকে জটিল আবর্তে ফেলেছে। ওমর শামস তাঁর কবিতার যাত্রা শুরু করেছেন সহজ থেকে, আর্থাৎ মানুষের জাদু বিশ্বাস থেকে। ‘এই যে দেখেছিস দাগ, দরোজার বাইরে –দুঃখ পারবি-নে তুই ঢুকতে , বাইরে যা –‘ দাগ দেয়া মানে বন্ধ করা, দাগ অতিক্রম করে ভেতরে আসতে না পারার বিশ্বাস, যা আমি ছোট বেলা গ্রামের বাড়িতে দেখেছি। অসুখ বিসুখ বালা-মুসিবৎ থেকে রাক্ষা পাবার জন্য ওঝা ডেকে চার দিকে মাটির পাতিলে মন্ত্রপুঁত দ্রব্য রেখে ঢেকে তারপর দরজায় কালাম/মন্ত্র মাটির সরায় লিখে ঝুলিয়ে বাইরে এসে চার দিকে রেখা টেনে দিত। আর ভয় নেই, দাগ আতিক্রম করে ভুত,প্রেত,দানো, কিছুই আসতে পারবেনা । এই বিশ্বাস খুবই সহজ, আর এই বিশ্বাস কোনো বিজ্ঞান না হয়েও টিকে আছে বিজ্ঞান-এর যুগেও । কালে কালে নানা কিছু যুক্ত হয়েছে আরো। কবি তাঁর স্বদেশ ভূমির দুঃখ-কষ্ট-বেদনার ঊপশম লাঘবে আর কোনো সহজ উপায় আর খুঁজে পাচ্ছেন না, তাই সহজ কল্পানাই কবিতার শরীরে বুনেছেন শব্দ বীজ হিসেবে যা মন্ত্রের মতো ছড়িয়ে পড়েছে । ঊচ্চারণের ধারাটির দিকে লক্ষ্য করলে স্পষ্ট হবে ‘নরকে যা, পাতালে যা, নষ্ট নক্ষত্রের অন্ধ বিবরে যা’ ঠিক এভাবেই ওঝা বলেন দূর হ’ ধংস হ’, সোলেমান এর মাথা খা, জাহান্নামে যা । কবি ওঝার ভঙ্গিটিকে অটুট রেখে কাব্য পংতিতে হ্রস্ব এবং দীর্ঘ লয়ে যতি টেনেছেন । তাতে স্বর ক্ষেপনে অতিমাত্রা পেয়েছে । কবি সেই কতোকাল থেকে দেখে আসছেন তার মাতৃভূমি তার মানুষ নিগৃহীত হচ্ছে,দুঃখ কষ্ট সইছে, তা’ লাঘবের জন্য এই মানুষেরা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জীবন দিয়েছে। তাঁদেরকে বুঝানো হয়েছে তারা স্বাধীনতা পেয়েছে, সাম্য মৈত্রীর আস্বাস পাবার মধ্য দিয়ে এবারে মিলবে তাদের মুক্তি কিন্তু মুক্তি, স্বাধীনতা কোনটা যে তারা পেয়েছে তা’ নির্ণয়ের কোন ক্ষমতা আজ আর তাঁদের নেই। জ্বরায়,ক্ষরায়,রোগে শোকে.শেষণে, শাসনে, ঘটনার দূর্ঘটনায় তাঁরা দিক ভ্রান্ত, প্রগতির চিন্তা রুদ্ধ, লক্ষ্য কানাগলির অন্ধকারে? আজ আর তাঁকে বাঁচাবে কে? ! তাই কবি বাঁচবার একটা সহজ পথ সহজ কল্পনার মধ্যদিয়ে বাতলাতে চেয়েছেন লোকজ জাদু বিশ্বাসকে উপজীব্য করে যা সহজ নয় ।‌’দুঃখ, তুই নিপাত যা/অমাবস্যার মুন্ডু খা! – পারবি-নে/কেননা কাঠঠোকরা-মাছরাঙা-বাজ আর চিলের শপথঃ’ তিনি তার মাতৃভূমির চারিদিকে দাগ টেনে ওঝার মতোই বলেছেন দাগ দিলাম পারবিনে আসতে দুঃখ তুই আর. তুই নিপাত যা, এর দ্বারা তিনি এক সত্যের দিকে সাবাইকে নিবিষ্ট হতে বলেছেন- ত্রাণ পেতে হবে, বিশ্বাসে স্থির হতে হবে সামনে এগুতে হবে ভয় নেই চারিদকি বন্ধ ।যে রকম ওঝা তার তন্ত্র-মন্ত্র দ্বারা গেরস্তের মনে এই বিশ্বাসটুকু জাগরুক করে আর ভয় নেই বাড়ি বন্ধ, কো্ন বিপদ-আপদ নেই । কবি ঠিক তেমনি আশ্বস্ত করতে চেয়েছেন তাঁর মাতৃভূমির মানুষকে কারণ মানুষ বিশ্বাসে দৃঢ় হলে, বিশ্বাস ফিরে পেলে সামিল হবে নিজদের ভাগ্য নির্মানে আর অশুভ শক্তিগুলোর ঘঠবে পতন ।’আসবি-নে দুঃখ, আসবি-নে –
    আশুলিয়ার ফ্যাক্টরিতে আর আগুন জ্বালাতে পারবি-নে, কেননা/কেরোসিন, আগুন, অক্সিজেন আর বিদ্যুতের শপথ! এই ভাবে কাব্য ভাষায় তিনি বাস্তবতাকে জাদুর ভাষায় উপস্থাপন করে পাঠকের মনে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেন তা’ সকল মহত্বকে ছূঁয়ে দেয়। সে জন্য বলা যায় কবিতাঠি একটি মহৎ কবিতা, যারা কলাকৈবল্যবাদী তারা ভেবে দেখতে পারেন কবিতাটির মহত্ব কোথায় । কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার একটি কবিতার একটি পঙক্তি এখানে উল্লেখ করছি –‘যতোদূর বাংলা ভাষা ততোদূর এই বাংলাদেশ’ এই পঙক্তির মধ্যে দেশমাতৃকার প্রতি এক অনমনীয় মমত্ব বিস্তৃত করা হয়েছে ।জমিনে এমন কাব্যের আজ খুবই প্রয়োজন । ওমর শাসমসের কবিতাটির বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজন ছিলো এজন্য যে কবিতাটিতে কিছু নতুন বিষয় আছে, ভাবে.উদ্দেশ্যে ভাষায়,ভাষণে । কবিকে অসংখ্যবার ধন্যবাদ।

  2. omar shams says:

    sudhu porar jonno noy, vitorey dhuke bissleshon korar jonno, asshad nebar jonno, kobi Matin Bairagi-ke dhonnobad. —Omar Shams

  3. omar shams says:

    দুঃখ, আমার ওঝাগিরিতে কিচুই হল না। সাভারে ধসের, মৃতের কারণে সবার মনে কাল পতাকা। – ওমর শামস

  4. —-শব্দের ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছে । বিস্তারিত বললে বলার শেষ নেই শুধু একটুকু বলতে পারি এমন কবিতা সচারাচার চোখে পড়েনা। কবি ভালো থাকুন, আরো ভালো কবিতা উপহার দিন।

  5. Rizwan irani says:

    Waiting ! waiting ! waiting for a simple but lovely bangladesh .

  6. fariduzzaman says:

    After reading this poem it is realized that Omor Shams is a powerful poet. The presentation of this poem is like village ওঝা which is like to used in folk culture in Bangladesh and West Bengal. Omor Shams has a different language which made himself different in Bangle poetry. Thanks Omor Shams for use this type of extra ordinary use of the style of ওঝা.

    ————Fariduzzaman

  7. iqbal hasnu says:

    এ এক অবিশ্বাস্য মানবীয় প্রতিরোধ, যা কবি সহজ অথচ গভীর ইতিহাসবোধ ও দার্শনিকতার নির্যাসে অনায়াসে বুনে দিয়েছেন!

  8. omar shams says:

    Rasel, Rizwan, Fariduzzaman, Iqbal sobaikei “soho-mormitar” jonno dhonnobad. Kobi Matin Bairagi-ke to agei janiyechi. – Omar Shams

  9. Ali Habib says:

    বুকের ভেতর দুঃখ ও ক্রোধ জমা
    আর হবে না অপরাধের ক্ষমা
    সস্তা শ্রমে জীবন বিকিকিনি
    নেপথ্যে কে? আমরা তাদের চিনি।
    এই শ্রমিকের শ্রমে এবং ঘামে
    চাপা পড়া এক জীবনের দামে
    কার জীবনের মান বাড়ছে রোজ
    সবাই রাখে সেই শোষকের খোঁজ।
    শ্রমিক শোষণ করেই ধনী যারা
    আইনেরও ঊর্ধ্বে থাকেন তারা।
    তবে
    এবার সঠিক হিসাব দিতে হবে।
    আমরা এখন আর তো একা নই
    জাগছে মানুষ, আওয়াজ শোনো ঐ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.