কবি জয়ন্ত মহাপাত্রের ‘রূঢ় স্বপ্ন এবং ইতিহাসের ক্ষত’

তাপস গায়েন | ২১ এপ্রিল ২০১৩ ৬:০৫ অপরাহ্ন

উড়িষ্যার কবি জয়ন্ত মহাপাত্রকে (খ্রি ১৯২৮- ) নিয়ে আমি প্রথম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি তাঁর নয়টি কবিতার অনুবাদ এবং তাঁর কবিতা নিয়ে আমার এক নাতিদীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে। ‘কবি জয়ন্ত মহাপাত্র : একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক পাঠ’ লেখাটি ‘অগ্রবীজ’ সাহিত্য পত্রিকার উন্মেষ সংখ্যায় আলোর মুখ দেখেছিল, ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে। সেই আলোচনা আমি শুরু করেছিলাম কবি জয়ন্ত মহাপাত্রের কোনো একটি কবিতার একটি পঙক্তি, ‘আমের কুঁড়ির গন্ধে ভোরের বাতাস রক্তের ঐতিহ্যে অস্থির’ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে এবং কবিকে সনাক্ত করেছিলাম এইভাবে, ‘রক্তের ঐতিহ্যে যে অস্থিরতা, যে অপচয় এবং রাতভর ইঁদুরের যে দৌড়, সেই বিপন্ন চৈতন্যের রূপকার কবি জয়ন্ত মহাপাত্র।’ মহাপাত্রের কবিতায় মানুষ কোনো ক্রিয়াশীল সত্তা নয়, বরং ইতিহাসের যাঁতাকলে সে প্রতিবাদহীন, নিশ্চুপ। কারণ, এই উপমহাদেশের মানুষ আত্মবিস্মৃত এবং এই জনপদের মানুষ তার ঐতিহ্য ও ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন; এবং এই আত্মবিচ্ছেদ এবং আত্মবিস্মৃতিকেই মার্ক্স এবং রবীন্দ্রনাথ আমাদের দুর্দশার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

ফোনে এবং মেইলে জয়ন্ত মহাপাত্রের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছে মাত্র তিন-চারবার। কবি জয়ন্ত মহাপাত্রকে আমি আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ, একলব্য নিঃসীম নগরে পাঠিয়েছিলাম। সেইসূত্রে ২০১০ খ্রিস্টাব্দে কবি জয়ন্ত মহাপাত্র আমাকে একটি চিঠি লেখেন এবং ‘দি স্যুয়েনি রিভিউ’ [১] সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত (খ্রি. ২০০৯) তাঁর, ‘রূঢ় স্বপ্ন এবং ইতিহাসের ক্ষত’ কবিতা সিরিজের সাতটি কবিতা আমাকে পাঠিয়েছিলেন, পাঠ করার নিমিত্তে। সেই বছর (খ্রি. ২০০৯) এই কবিতা সিরিজের জন্য কবি জয়ন্ত মহাপাত্র পেয়েছিলেন ‘দি এলেন টেইট পোয়েট্রি প্রাইজ’। এই সিরিজের মাত্র তিনটি কবিতা (আমাকে পাঠানো চিঠিটি নয়) আমি পাঠকের কাছে তুলে ধরছি বর্তমান বাংলাদেশের ভয়ংকর অস্থির সময়কে মনে রেখে। আমরা অস্থির, কারণ আমাদের ভবিষ্যত অনির্ণীত; আমাদের চৈতন্যে দুঃস্বপ্ন এবং অস্থিরতাই একমাত্র ক্রিয়াশীল, কারণ ঈশ্বর পলাতক। দার্শনিক নিৎসের মতো আমরা ভাবি এবং কবি মহাপাত্রের অনুভবে বিদ্ধ আমরা অনেকেই অনুভবে আনি, ‘ঈশ্বর, নিতান্ত ভিনগ্রহীর মতো অন্ধকারে পলাতক’ এবং শেষাবধি কবি জয়ন্ত মহাপাত্রের বিশ্বাসে আস্থা রাখি, ‘আমরা এসেছি যেন স্বপ্ন/ যেন প্রস্তর শিল্পী/যেন মননের বার্তাবাহক।’

[১] পুরাতন জিনিস নিয়ে আবারও কথা

ক্লান্তি ছাড়িয়ে যে
ধানক্ষেত এবং গৃহস্থের বাড়ি, তার উপরে
আবার গাম্ভীর্যে নুয়ে পড়ছে
শেষ বিকালের আলো
আত্মাহূতি, অবয়বহীন এক শত্রু–
এগিয়ে চলছে, যেন রাতের চোর।
দৃষ্টিহীন শব্দ– জনসভায় অর্থহীনভাবে উচ্চারিত
আসছে, যাচ্ছে,
কখনও কখনও চেখে নিচ্ছে রক্ত–
যেন শান্ত শবদাহ।
নিঃশ্চুপ এক কুঁড়েঘরে ক্ষমাহীনতায় পরিত্যক্ত
এক বৃদ্ধ দম্পতি
সময়ের সমতলে সময়বিচ্ছিন্ন
অনেকের মতো বিস্মৃতির অতলে, যেন
মোগল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট,
অন্যথায় পরিপূর্ণ নৈরাজ্যময় ভোগান্তির
অপেক্ষায় উন্মুখ
পরিত্যক্ত দুটি স্যান্ডেল।
পায়ের কাছে শিশিরেশায়িত রংধনু,
উন্মুখ অনুগত কন্যা
ভালোবাসার জন্য পুনরায় মেলছে পাখা।
অনিঃশেষ নিঃস্তব্ধতা কেবলি দিগন্তকে করে পূর্ণ।
কোনো এক দৃষ্টিহীন মাতামহী, যিনি
সামাজিক নিষ্ঠুরতায় অন্ধ, নিজের হারিয়ে যাবার
অনুভবে খুঁজে ফিরছেন নিজের পথ;
তাঁর ক্ষীণ ধমনীতে আজ রক্ত
পথ হারিয়ে ফেলছে এবং প্রতিরোধের
ভয়ংকর ছোট্ট দেয়াল অতিক্রান্ত, এখন
অন্ধকার পরিব্যাপ্ত।
বাহিরে অপেক্ষমাণ মেঠোপথ
যা কিছুর জন্য অপেক্ষায় উন্মুখ তা আসে না ফিরে
এই পৃথিবীর বিশীর্ণ-প্রান্তরের নিঃশ্বাস
পুনরায় নিভে আসে।
গত সপ্তাহের চাল পচনের গন্ধ
ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে ব্যাপ্ত হতে থাকে।

[২] রাত

এই শান্ত নির্জন ঘরে একা আমি প্রতীক্ষায়,
বুনো বাতাসের উচ্ছ্বাসে
নিঃশ্চুপ হয়ে আসে টিয়াপাখির চিৎকার
রাতে হেলেপড়ার নিমিত্ত ছাড়িয়ে
উড়ে যাবার ইচ্ছায়
হয়তো সে নির্ভর করছে আমার সদিচ্ছায় ।
ধানক্ষেত ছাড়িয়ে
পড়ে আছে মৃত, ক্ষতবিক্ষত–
এই গাঁয়েরই এক মেয়ে
এই বিশ্বসংসারে যেন সে একা।
এবং আমি জানি না
আমি কিসের জন্য অপেক্ষা করছি।
আজ রাতে প্রতিটি কন্যাই মৃত।
অস্বচ্ছ চাঁদ ক্রোধোন্মত্ত বিষাদের এক দৃশ্যে
আমাদের সকলের ছায়াকে টানে।
আমার ঘরের অতলান্তে
টিয়াপাখির কান্না ভেসে আসে,
এবং আমি ভাবি, আমাদের মধ্যে কে যেন হারিয়ে গেছে!
ফুল্ল স্বপ্নে রাত আমার বাড়ির চতুর্দিকে
পরিভ্রমণরত এবং তার পদধ্বনি
আমার শৈশবের শূন্য আঙিনায়
ভেঙে পড়ছে
এক ভুতুড়ে দূরত্বে।

[৩] এখানে এবং অন্য কোথায়ও

ঘনঘোর এই বৃষ্টি।
এইখানে এক যুবতী মা তার একমাত্র শিশুর
শ্বাস বন্ধ করছে দীর্ঘরাতব্যাপী।
পুকুরের মাছ এখন নিথর স্তব্ধ হয়ে উঠছে।
অন্য কোনোখানে এক নারীর পেটপীড়া
কেবলি সত্যি হয়ে ওঠে, যখন সে
বাঁধাকপির ভিতরে শুঁয়াপোকা দেখে।
অন্যত্র এক বালিকা নিজেকে পোড়ায় আগুনে,
কারণ যৌতুক আসেনি তার সাথে।
ধুলিধূসরিত জনাকীর্ণ রাস্তায় হাঁটার নিমিত্তে
প্রতিরাতে প্রস্তুত হই আমি,
যখন মেঘ ভেঙে বের হয় গোলাকার চাঁদ
তার অন্তিম প্রতিরোধে।
প্রতিরাতে ব্যাঙ কোত্থেকে এসে হাজির হয়
বর্ষাসিক্ত জলাশয়ে চিৎকার আর শিৎকারের নিমিত্তে
বৃষ্টির কুয়াশা ছাড়িয়ে চলছে উত্থান শব্দের,
যার নেই কোনো অতীত কিংবা কোনো ভবিষ্যত।
আমার পিতা বলেছিলেন–
প্রাচীন গোত্রের মানুষেরা হয়তো তাদের
মেয়েদের সুকুমারী শরীর থেকে মাংস কেটে
উড়িষ্যার পাহাড়ের গভীর খাতের
জৈবভূমির উপরে টানিয়ে রাখে।
তাদের নিজস্ব যুক্তি তাদের করেছে প্রশমিত, কারণ
এসব মানুষের নির্ভরযোগ্য কোনো
অধিষ্ঠান ছিল না। মাঠের উপর দিয়ে হেঁটে গেছে
প্রেতাত্মারা–আলোর ভিতর দিয়ে আলতোভাবে।

ব্যাখ্যার নিমিত্তে আমার যে কোনো শব্দ
হয়ে ওঠে অবান্তর অর্থহীন ক্রন্দন। এইসব মৃত্যু
আমি দেখি সর্বত্র, যাকে বিক্রি হতে হবে
সর্বত্র, স্বল্প দামে এবং
নিজের মতো করে তৈরি বিশ্বাস
আমার শান্ত শোক আজ দীর্ঘ জীর্ণ রজ্জুর এক প্রান্তে বাঁধা,
এবং ঈশ্বর–যিনি পরিপুষ্ট ধানের সমূহ কারণ
নেচে যান রজ্জুর অন্য প্রান্তে ।

কবিঃ জয়ন্ত মহাপাত্র, রচনাকাল: ২০০৯

অনুবাদক: তাপস গায়েন, ভাষান্তরঃ ২০১৩

তথ্যপঞ্জীঃ

[১] Jayanta Mahapatra, “Dreams of Iron and the Hurt of History” in The Sewanne Review, vol. cxvii, 2009, Tennessee, USA.

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্বপন মাঝি — এপ্রিল ২২, ২০১৩ @ ১০:০৫ পূর্বাহ্ন

      আঃ জগতের কত কিছুই জানি না, বুঝি না। অনূদিত কবিতাগুলো পড়লাম, শুধুই পড়লাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dr. Binoy Barman — এপ্রিল ৩০, ২০১৩ @ ১১:৪৫ পূর্বাহ্ন

      অসাধারণ কবিতা, অসাধারণ অনুবাদ। মনে হয় কবি জয়ন্ত মহাপাত্র আমাদেরই কথা বলছেন। আমাদেরই কষ্ট বয়ান করছেন ছত্রে ছত্রে। আমি গত বছর উড়িষ্যা (ভুবনেশ্বর) গিয়েছিলাম এক লেখক সম্মেলনে যোগ দিতে। সেখানকার অনেক কবির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। সেখানে প্রাচীন কবি জয়দেবকে বিশেষ সম্মান করা হয়। অনেক কবি আছেন আমাদের চোখের আড়ালে। ্কবি জয়ন্ত মহাপাত্রকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য তাপসকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাবিহা সুলতানা — মে ২৯, ২০১৩ @ ১১:২৩ পূর্বাহ্ন

      শ্রদ্ধেয় কবি তাপস গায়েন, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ কবি জয়ন্ত মহাপাত্রকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য, তার কবিতার সাথে পরিচয় করানোর জন্য। আপনার অনুবাদে যেন অনন্য হয়ে উঠেছে প্রতিটি কবিতা!! আমি আপনার অনুবাদ লেখা আরো পড়তে চাই। কোথায় পাওয়া যাবে বলবেন কি?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Aminul islam — জুন ৯, ২০১৩ @ ১:১৬ অপরাহ্ন

      Beautiful poems capable of touching sensible minds & hearts. So many pains, so much sufferings in the heart of the poems! Translation is very lucid & artistic.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com