বার্লিনের ভালুককে ঘিরে

তারেক আহমেদ | ৩ এপ্রিল ২০১৩ ৪:০২ অপরাহ্ন

ওরা বলে এই ভালুকটা নাকি শীতকালেও ঘুমায় না। বার্লিনের মানুষের প্রাণের প্রতীক বলা যায় ভালুকটিকে। বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব বা বার্লিনালেরও প্রতীক এই ভালুক।

ঢাকা থেকে জার্মানির রাজধানী বার্লিন গিয়ে যখন পৌঁছলাম – উৎসব শুরু হতে তখনও তিন সপ্তাহ বাকি। বাংলাদেশের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনে জড়িত থাকার সুবাদে জার্মন রাস্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা – ডয়্যেচে ভ্যেলের আমন্ত্রণে এই সফর। ডয়্যেচে ভ্যেলে প্রায় এক দশক যাবত পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা দেশের চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনে জড়িতদের নিয়ে বছরের এই সময় পাঁচ সপ্তাহব্যাপী এক কর্মশালার আয়োজন করে থাকে। এই আয়োজনের মূল আকর্ষণ অবশ্যি — বার্লিনালে। দর্শক সংখ্যার বিচারে যে উৎসবটি ইতোমধ্যেই শীর্ষস্থানীয় চলচ্চিত্র উৎসবের মর্যাদা লাভ করেছে। দেশে ফেরার দু’দিন আগে উৎসবের টিকিট বিক্রির পরিসংখ্যান থেকে জেনে এসেছিলাম –এবারও তিন লক্ষ দর্শক এগারো দিন ধরে চলা এই উৎসবে ছবি দেখেছেন ।

তবে, দু’দুটি বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জার্মানি তথা বার্লিনের বিভক্তি এবং আশির দশকের শেষভাগে বার্লিন প্রাচীর ধ্বংসের ’মহোৎসব’ পেরিয়ে এই চলচ্চিত্র উৎসবটি কেমন করে বার্লিনকে সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে দুনিয়াব্যাপী পরিচিত করে তুলেছে, তা এক বিষ্ময়ই বটে।

ডয়েচে ভ্যেলের কর্মশালায় আমার সঙ্গী হয়েছিলেন আরো দশটি দেশের চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজক। এশিযার প্রতিনিধি হিসেবে আমি ছাড়াও পাকিস্থান ও ভূটান থেকে ছিলেন – আলী হামিদ ও শ্রীং দর্জি। শ্রীং আবার একইসাথে একজন নাট্যকর্মী। ছোট্ট দেশ ভূটানের থিয়েটার আন্দোলনেও বেশ সক্রিয় এই তরুণ। আর কোনো আয়োজনে বাংলাদেশের সাথে পাকিস্থান থাকবে, সেখানে হবে না কোন উত্তেজনা, তা কী করে হয়? যথারীতি মুক্তিযুদ্ধ, ’৭১এর গণহত্যা – এসব প্রসঙ্গও চলে এলো। আমরা তিনজন ছাড়া সূদূর লাতিন আমেরিকার দেশ বলিভিয়া থেকে আসেন – আলেহান্দ্রো ফুয়েন্তেস, মেক্সিকোর তরুনী ক্যারোলিনা লোপেজ আর ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের ছেট্ট দ্বীপদেশ ত্রিনিদাদ -টোবগোর মেয়ে -ন্নিকা সোয়ীনি লুক। কর্মশালায় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকেও চারজন অংশগ্রহণকারী ছিলেন।

পাকিস্থান -বাংলাদেশ এই চলমান বাহাসে আরো ঘি ঢাললেন দাউদ ভাই, নির্বাসিত কবি দাউদ হায়দার। উৎসবের প্রেস কনফারেন্সের দিন প্রায় হাজার খানেক মানুষের মাঝে তিনি অনেকটা আবিস্কারই করলেন আমাকে। উষ্ণ আমন্ত্রণ। কর্মশালার সহকর্মীদের সাথে পরিচয় পর্ব সেরেই যেন পাকিস্থানের আলীকে নিয়ে পড়লেন দাউদ ভাই।

উৎসব আয়োজনের কর্মশালায় গিয়ে কেবল সিনেমা নিয়েই থাকবো, তা কী করে হয়। বোধ করি কর্মশালার আয়োজকদের উদ্দেশ্য তা ছিল না। প্রথম সপ্তাহান্তেই আমরা তাই জার্মান পার্লামেন্ট ভবন – বুন্দেষ্ট্যাগ ভ্রমনের সুযোগ পেলাম। সেদিন সকাল থেকেই প্রবল ঠান্ডা বাতাস আর তুষারপাত চলছে।তার মধ্যেই বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের গাইড ক্রিষ্টিনা নামের আরেক জার্মান তরুনী। সাথে তার ঘরের মানুষ আফ্রিকার ছোট্ট দেশ লেসেথোর তরুন এমপাকি। বছর কয়েক আগে আফ্রিকান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের এক কর্মশালায় বার্লিন এসে পাকি নিজেও যেন এখানে বাঁধা পড়ে গেছে। গেল বছর বিয়ে করবার পর এখন বার্লিনেই স্থায়ী হবার চিন্তা তার।
act-of-killing.jpg
ইউরোপের পাওয়ার হাউস জার্মানদের পার্লামেন্ট ভবনটিকে অবশ্য আমাদের জাতীয় সংসদের তুলনায় আকারে আয়তনে ছোট আর অনাড়ম্বরই মনে হলো। সন্দেহ নেই বার্লিনের অন্যতম দর্শনীয় স্থানও এই বুন্দেষ্ট্যাগ। নিরাপত্তার নানা ঘেরাটোপ পেরিয়ে মূল ভবনে প্রবেশের পর দেখলাম, আমাদের মতো বিদেশীরা তো বটেই, খোদ জার্মান দর্শনার্থীর সংখ্যাও কম নয়।

জার্মানদের ইতিহাস বড় বেদনার। আর সেই বেদনার সিংহভাগই যেন বয়ে চলেছে বার্লিনের মানুষগুলো। দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধ তো প্রায় তাদের শরীরের উপর দিয়ে চলে গেছে। বিশেষতঃ হিটলারের সৃষ্ট নাজী মতবাদ যেন পিছু ছাড়ছেই না তাদের। সাম্প্রতিক সময়ে নব্য নাজীদের উত্থানের কথাও এখন অনেকের জানা। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জার্মানি তথা বার্লিনের বিভক্তি, পরবর্তীতে কম্যুনিষ্ট-পূর্ব জার্মান প্রজাতন্ত্র সৃষ্টি এবং আশির দশকের শেষভাগে বার্লিন দেয়াল ভাঙার ’মোচ্ছবের’ মধ্য দিয়ে আপাতঃ ভাবে সেই বেদনার অবসান ঘটেছে বলে মনে হলেও তা যে আরো গভীর ক্ষত রেখে গেছে তাদের হৃদয়ে — তা আমাদের কোর্স মেন্টর ক্রিষ্টিয়ানার কথাতেই টের পাওয়া গেল। ওর ভাষায় বার্লিনের পশ্চিমাংশের মানুষেরা অনেক বেশী প্রানবন্ত পূর্বের অধিবাসীদের তুলনায়। অন্য কারো কারো কথায়ও মিললো এর প্রতিধ্বনি। জীবন যাপন, পেশা ইত্যাদি নিয়েও নাকি এক ধরনের ঠান্ডাযুদ্ধ এখনও বজায় আছে বার্লিনের দুই অংশের মানুষের মাঝে। ওদের আলাপ শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, পরশ্রীকাতরতা শব্দটি কি তবে জার্মান ভাষায়ও আছে ?

কম্যুনিষ্টদের তুলোধুনো করার বেলায় সব জার্মানই দেখলাম পারদর্শী। এক্ষেত্রে ক্রিষ্টিয়ানা তো এক কাঠি সরেস। কারন জানতে চাইলে ও জানালো, ওর ঠাকুর্মার দুই নিকটাত্মীয়া নাৎসী সন্দেহে ষ্ট্যালিন আমলে রাশিয়ায় অনেক দিন বন্দী জীবন কাটিয়েছেন। তাই ওদের গোটা পরিবারেই কম্যুনিজম বিরোধী মনোভাব তৈরির হয়েছে। ইতিহাসের ছাত্রী ক্রিষ্টিয়ানার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বয়ান শুনতে শুনতে ভাবছিলাম — দেশ ভাগ, ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ পেরিয়ে এসেও আজ আমরা যে সাম্প্রদায়িক অবস্থা আর ধর্মান্ধ রাজনীতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি – তারই ভিন্ন এক মাত্রা হয়তো আমাদের এই জার্মান বন্ধুরাও মোকাবেলা করে চলেছেন। তবে সহনীয়তার মাত্রা ওদের অনেক প্রবল বলে রাজনীতির উগ্রতা নগ্ন রুপ পায়নি।

দ্বিতীয় সপ্তাহান্তে এই ক্রিষ্টিয়ানাই আমাদের ষ্ট্যাজি প্রিজন দর্শনে নিয়ে গেল। ষ্ট্যাজি প্রিজন মূলতঃ সাবেক পূর্ব র্জামান কম্যুনিষ্ট সরকার কর্তৃক সৃষ্ট রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের কারাগার। বার্লিনের পূর্বাংশে অবস্থিত এই কারাগারের দুটি অংশ। একটি পঞ্চাশের দশকের সোভিয়েত দখলদারিত্বের সময়কালে তাদের সৃষ্ট কারাগার। দ্বিতীয়াংশে সেভিয়েতরা চলে যাবার পর ষাটের দশকের গোড়ায় পূর্ব জার্মান সরকারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে সৃষ্ট বন্দীশালা। এর গোড়াপত্তন অবশ্যি সোভিয়েতরাই করে যায়। ষ্ট্যাজি শব্দটি মূলতঃ সেই মন্ত্রকেরই সংক্ষিপ্ত নাম। সাবেক ’কম্যুনিষ্ট’ শাসনামলের এই কারাগার দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেল, আমাদের দেশেও সামরিক শাসনামলে রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে কত মানুষকে কারাগারে যেতে হয়েছে। প্রাণও দিতে হয়েছে কাউকে কাউকে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী রাজনীতিবিদ তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের জেলখানায় নির্মমভাবে নিহত হবার কথা কে না জানে। আমাদের ইতিহাসের নির্মম সেই সব ঘটনার কথা কবে আমরা তুলে ধরতে পারবো দেশ বিদেশের দর্শনার্থীদের কাছে ?

বার্লিনালে আমাদের মূল আকর্ষণ। তৃতীয় সপ্তাহে আমাদের সবারই যেন গন্তব্য হয়ে দাঁড়ালো বার্লিনালের মূল উৎসব প্রাঙ্গন – পোষ্টডামাপ্লাজ। উৎসব শুরুর অনেক আগেই, জানুয়ারির শেষ দিকে একদিন ঘুরে গিয়েছিলাম এই এলাকাটি। সেদিন সবাই মিলে যাওয়া হয়েছিল – ডয়েসে সিনেমাথেক এ। এই সিনে মিউজিয়াম না দেখে থাকলে বোঝানো যাবে না। শুনেছি প্যারিসের সিনেমাথেক নাকি আরো বৃহৎ। তবে,জার্মানরা কি করে তাদের সিনেমার ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুলেছে,তা দেখতে হলে অবশ্যি যেতে হবে বার্লিনের এই সিনেমাথেক এ। বাংলাদেশে ফিল্ম আর্কাইভ নামের একটি প্রতিষ্ঠান আছে। আমাদের সিনেমার ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারতো এই প্রতিষ্ঠানটি। পঞ্চাশ আর ষাট দশকের শত শত চলচ্চিত্রের ক্যানকে গুদামজাত করে এখন এটি ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যাক্তিরা একবার দেখেও তো শিখে আসতে পারেন – কী করে জীবন্ত করে তোলা যায় একটি দেশের জাতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে।

বার্লিনালে যে কত বড় উৎসব, তা প্রেস কনফারেন্সের দিনই টের পেয়েছিলাম। জার্মান সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রেস কনফারেন্স স্থলের বিরাটাকায় হলঘরের প্রায় পুরোটা জুড়ে হাজার খানেকেরও বেশী উৎসুক মানুষ । অধিকাংশই কোন না কোন মাধ্যমের সংবাদকর্মী। পেছনে লক্ষ্য করলাম, সার বেধে টিভি ক্যামেরাও রয়েছে প্রায় গোটা পঞ্চাশেক। সারা দুনিয়ার বিনোদন জগতের সাংবাদিকরাই তখন বার্র্লিনমুখী হতে শুরু করেছেন। উদ্দেশ্য, এই উৎসবের খবর সংগ্রহ, ছবি দেখা, কোন ছবি পুরস্কার পায়, হলিউড আর ইউরোপের কোন তারকা এবার সেরা নির্বাচিত হন — সে খবর সংগ্রহও অনেকের কাজ। দাউদ হায়দারের বদৌলতে পাশের দেশ ভারতের কলকাতা থেকে আগত সাংবাদিক নির্মল ধর আর সজল দত্তের সাথেও আলাপ হয়ে গেল উৎসব শুরুর প্রায় পরদিনই। তাদের একজনতো প্রায় দু’দশক যাবত নিয়মিত এই উৎসবে আসছেন ।

আগেই জানা ছিল, বার্লিনালের ৬৩ তম আসরে প্রধান জুরী হিসেবে থাকছেন – হংকংয়ের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা – উং কার ওয়াই। উদ্বোধনের মূল আয়োজন বার্লিনালে পালাষ্টে হলেও ফ্রিডরিখষ্টাড পালাষ্টেও ছিল সেই অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ব্যবস্থা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরুর ঘন্টা দেড়েক আগেই দল বেঁধে সেখানে উপস্থিত হয়ে যাই আমরা। এদেশে কোন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন মানেই এক সারি অতিথি। আর তাদের সার বেঁধে বক্তৃতা। ওখানে দেখলাম এর উল্টো। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে উৎসব পরিচালক ড্যিটার কস্লিক আর উৎসবের বিচারকদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো- কিন্তু সেটিও বড় অনাড়ম্বরভাবে। উদ্বোধনী আয়োজনের মূল আকর্ষণ তখন — ’গ্র্যান্ডমাষ্টার ’ ছবি। এবারের উৎসবের প্রধান জুরী উং কার ওয়াইয়ের সর্বশেষ এই ছবি দিয়েই পর্দা উঠলো ৬৩ তম বার্লিনালের।

অনেকটা পূর্ব ধারণা বশতঃ নিতান্ত কুংফু ক্যারাতের ছবি ভেবেই উৎসব শুরুর সপ্তাহখানেক আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, দেখবো না এ ছবি। কিন্তু সে সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল, তা ছবি শুরুর মিনিট কয়েকের মধ্যেই টের পেলাম। আধুনিক মার্শাল আর্টের জনক হিসেবে খ্যাত ব্রুস লির গুরু ইপম্যানের জীবনই এক অর্থে উং কার ওয়াই তুলে এনেছেন এই ছবিতে। কিন্তু মার্শাল আর্টের মোড়কে সমকালীন এশীয় সিনেমার অন্যতম প্রধান এই নির্মাতা যেন তার স্বদেশের স্বপ্ন আর বেদনার কাহিনীই বলতে চেয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে মহাচীনের একটি অঞ্চলের মানুষদের জীবন যাপন , নানা গোষ্ঠিগত দ্বন্দ্ব, তারপর জাপানিদের আগ্রাসন। স্বদেশের মানুষের সাথে কোনো কোনো ক্ষমতাধর চাইনিজের বিশ্বাসঘাতক আচরণ – সবই উং কার ওয়াই তুলে এনেছেন এই ছবিতে। পুরো ছবিটির গাঁথুনিকে টান টান ধরে রাখতে এর পরতে পরতে যেন ঠেসে দিয়েছেন মার্শাল আর্টের নানা দৃশ্য। যা কখনও কখনও হয়ে উঠেছে এক কথায় অনবদ্য। বুঝতেই পরিনি কোথা দিয়ে কেটে গেছে ২ ঘন্টারও বেশী সময়। ছবি শেষে হল থেকে বেরিয়ে ভাবছিলাম, কী অপূর্ব সব দৃশ্যই না তৈরি করেছেন উং কার উই এই ছবিতে। বার্লিনালের উদ্বোধনী ছবি হিসেবে এর চাইতে আর কোন ছবিকে ভাবা যেত কি না জানি না।

বার্লিনালে কেবল সিনেমার উৎসব নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনাই এখানে ঘটে থাকে। এর একটি- ইউরোপীয়ান ফিল্ম মার্কেট। উৎসবের দ্বিতীয় দিন সকাল বেলায় আমাদের গোটা দলটির গন্তব্য এই সিনেমার বাজার। মূল উৎসব কেন্দ্রের অদূরে মার্টিন গ্রেপিয়াস বাউ নামে পরিচিত একটি এক্সিবিশন সেন্টারে শুরু হয়েছে এই সিনেমা বাজার। ১৮৮১ সালে মূলতঃ মিউজিয়াম হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও গেল শতকের সত্তর দশকেই এই প্রাসাদোপম ভবনটি বার্লিনের অন্যতম প্রধান একটি প্রদর্শন কেন্দ্রে পরিণত হয়। বছরের এই সময়টায় বার্র্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের সময় সিনেমা জগতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয় এটি।

বিনোদন দুনিয়া, বিশেষতঃ চলচ্চিত্রের বাজার বিষয়ে সাড়ে তিন দশকেরও বেশী সময় বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করা মার্কিন নাগরিক সিডনী লিভাইনের সাথে আমাদের কর্মশালায়ই বিস্তৃত আলাপ হয়েছিল। তার উদ্যোগেই প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টাব্যাপী এই সিনে মার্কেট ঘুরে দেখবার অয়োজন। সিনেমা জগতের অন্যতম বৃহৎ এই বাণিজ্য মেলার আরেকটি অংশ ম্যারিয়ট নামের পাঁচ তারকা হেটেলেও একই সাথে চলছিল । আমাদের কোনো কোনো বন্ধু সেখানেও ঢুঁ মারেন পরবর্তীতে।

মূলতঃ ইউরোপীয় ফিল্ম মার্কেট বলা হলেও সারা দুনিয়ার চলচ্চিত্র বিষয়ক বাণিজ্যই এখানে হয়ে থাকে। তিন তলা বিশালাকায় ভবনের নানা দিকে ঘুরতে ঘুরতে লক্ষ্য করলাম অনেক দেশ তাদের নিজস্ব প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ নিয়ে তা আবার বিভিন্ন কোম্পানীর কাছে বরাদ্দ দিয়েছে। ইউরোপের নানা ছোট দেশেরও প্রতিনিধিদের দেখা গেল এই বাণিজ্য মেলায়। এশীয় দেশগুলোর মাঝে ভারত,চীন,জাপান, হংকং, কোরিয়ারও ষ্টল ছিল এখানে। তবে আফ্রিকার কোন দেশের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেল না। সিনেমার এই বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ যে অনুপস্থিত একেবারেই, তা আর নাইবা বললাম।

বাণিজ্যটি যেহেতু চলচ্চিত্রের, সুতরাং প্রত্যক্ষ দর্শনই উত্তম পন্থা। মার্টিন গ্রোপিয়াস বাউয়ের বেসমেন্টে এই মার্কেট কেন্দ্রিক ছবিরও প্রদর্শনী হয়ে থাকে। এ জাতীয় প্রদর্শনীর দর্শক মূলতঃ বিভিন্ন দেশের প্রযোজনা – পরিবেশনা সংস্থা বা সেলস কোম্পানীর প্রতিনিধিরা। মার্টিন গ্রোপিয়াস বাউ ছাড়াও আরো কয়েকটি নির্দ্দিষ্ট সিনেমা হলে বিপণনের লক্ষ্যে বাছাই করা ছবিগুলোর প্রদর্শনী হয়ে থাকে। ১১ দিন ব্যাপী উৎসব শেষ হলে জানা গেল, বাণিজ্যিক বিপণনের লক্ষ্যে আয়োজিত প্রদর্শনীতে প্রায় ৮০০ ছবি প্রদর্শিত হয়েছে। যা মূল উৎসবে প্রদর্শিত ছবির প্রায় দ্বিগুন।

মার্টিন গ্রোপিয়াস বাউয়ের ঠিক উল্টোদিকেই হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভস নামের আরেকটি প্রাসাদোপম ভবনে আয়োজন করা হয়েছে কো-প্রডাকশন মার্কেট বা যৌথ-প্রযোজনা সংক্রান্ত কারবার।এই আয়োজনটি মূলতঃ তিন দিন স্থায়ী হয়ে থাকে। যৌথ প্রযোজনা সংক্রান্ত ছবির প্রজেক্টগুলোও আলোচনার জন্য আগে থেকেই নির্ধারণ করা থাকে। উৎসব চলাকালীন সময়ে একদিন এই আয়োজন দেখতে যাওয়া হয় । বার্লিনালের যৌথ প্রযোজনা সংক্রান্ত বিভাগের প্রধান -সেনিয়া হাইনেন আমাদের গোটা দলটির কাছে এই বিশেষ আয়োজনের বিস্তৃত বিবরণ তুলে ধরলেন । সোনিয়া হাইনেন একই সাথে আবার ’ওয়ার্ল্ড সিনেমা ফান্ড ’নামে আরেকটি বিভাগেরও দায়িত্ব পালন করছেন। শিল্পসমৃদ্ধ ছবি নির্মানের জন্য যেখান থেকে পৃথিবীর নানা দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সহায়তা দেয় হয়। প্রতি বছর তিন থেকে চারটি ছবি এই প্রক্রিয়ায় সহায়তা পেয়ে থাকে। দক্ষিন এশিয়ায় কেবলমাত্র বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাই এই অনুদান প্রক্রিয়ায় প্রস্তাব প্রেরণের যোগ্য। সেনিয়া হাইনেনের সাথে আলাপকালে পরবর্তীতে জেনেছিলাম, প্রায় এক দশক আগে চালু হওয়া এই ছবির অনুদানের জন্য বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত মাত্র দুটি প্রস্তাব জমা দেয়া হয়েছিল।
childs-pose.gif
উৎসবের প্রাণের স্পন্দন টের পাওয়া গেল তৃতীয় দিনের মাথায় – যখন বার্লিন ট্যালেন্ট ক্যাম্পাস শুরু হলো। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতা তৈরির অভিনব এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয় প্রায় এই দশক আগে। এর ফলও যেন চলচ্চিত্র বিশ্ব পেতে শুরু করেছে। প্রায় দশক কাল আগে যে তরুণ আর উঠতি চলচ্চিত্র নির্মাতারা ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসে এসেছিলেন– তাদের অনেকেই পরে বার্লিনালেতে তাদের ছবি নিয়ে ফিরে এসেছেন। এবারের আয়োজনেও প্রায় ৯০টি দেশের ৩০০ জন প্রার্থী এই আয়োজনে অংশ নেন। দুঃখের বিষয় এ বছর বাংলাদেশ থেকে কোন অংশগ্রহণকারী ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসে ছিলেন না।

বার্লিনালে মূলতঃ সিনেমার উৎসব। সারা পৃথিবীতে ফি বছর নির্মিত কয়েক হাজার ছবি বাছাই করে ৪০০ ছবি উৎসবের জন্য নির্বাচন করা হয়। এই বাছাই প্রক্রিয়াটি তিন ভাবে করা হয়ে থাকে। প্রথমতঃ প্রতিটি অঞ্চলের জন্য উৎসবের একজন প্রতিনিধি আছেন। তারা নির্দিষ্ট সেই অঞ্চলের ছবি ও নির্মাতাদের সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করে থাকেন। স্থানীয়ভাবে আয়োজিত চলচ্চিত্র উৎসবসহ সিনেমা সংক্রান্ত নানা আয়োজনে অংশ নেন। এই প্রক্রিয়াতেই নিদিষ্ট সেই অঞ্চলের ছবি এই প্রতিনিধিরা বাছাই করেন।

ছবি বাছাইয়ের দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটি কেন্দ্রীয়ভাবে করা হয়। এর নেতৃত্বে আছেন উৎসব পরিচালক – ডিইটার কছলিক। তারই নেতৃত্বে উৎসবের কেন্দ্রীয় একটি দল টরন্টো, কান, ভেনিস, রটরডাম, সানড্যান্সসহ পৃথিবীর বিখ্যাত চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে সফর করেন। আর সেই উৎসবে প্রদর্শিত ছবি থেকে কিছু ছবি বাছাই করেন।

ছবি নির্বাচনের তৃতীয় ধারাটি চলে বছরব্যাপী। মূলতঃ বার্লিনালে তার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সারা দুনিয়ার সিনেমা করিয়েদের উৎসবে ছবি জমা দেয়ার আহবান জানায়। নির্দিষ্ট একটি সময় বেঁধে দিয়ে অনলাইন প্রক্রিয়ায় চলে এই রেজিষ্ট্রেশন। উল্লেখ্য এই প্রক্রিয়াতেই জমা পড়ে সর্বাধিক সংখ্যক ছবি। তবে তা থেকে সীমিত সংখ্যক ছবিই উৎসব উপলক্ষ্যে নির্বাচন করা হয়।

এত বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ছবি নির্বাচন করা হয় বলেই হয়তো বলা চলে, সেরা ছবিগুলোই বার্লিনালেতে দেখার সুযোগ হচ্ছে। এ বিষয়ে অবশ্যি বিনম্র ভিন্নমত আছে খোদ আয়োজকদের । অন্তত ফোরাম আর প্যানারোমার মতো দুটো প্রধান বিভাগের মূল নির্বাচকদের কথায় সে রকম আভাসই পাওয়া যায়। তাদের ভাষায়, হয়তো, আমাদের নির্বাচিত ছবিগুলোই শেষ কথা নয়। এর চাইতেও ভাল ছবি হয়তো বাদ পড়ে গেল। কিন্তু বার্লিনালেতে ছবি নির্বাচনের যে সব পূর্ব যোগ্যতা তারা নির্ধারণ করেছেন, সে অনুযায়ীই নির্বাচন করা হয় একটি নির্দিষ্ট ছবি।

আমার অন্য সঙ্গীরা কেউ কেউ প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকলেও সিনেমা দেখা তো বটেই, অন্য সব আয়োজনে যোগ দিতেও সমান আগ্রহী ছিলাম। তাই বাছাই করা কিছু ছবিই দেখবার সুযোগ পেয়েছি। সে সব ছবির অধিকাংশই – ফোরাম ও প্যানারোমা নামের দু’বিভাগের। বার্লিনে যাবার আগেই জানা হয়ে গিয়েছিল যে, এই দু বিভাগেই সত্যিকার অর্থে শিল্পসমৃদ্ধ ছবি মনোনীত ও প্রদর্শন করা হয়। যে ক’টি ছবি বার্লিনালেতে দেখার সুযোগ হয়, তার মাঝে অবশ্যি Act of Killing ছবিটির কথা এসে যাবে। মার্কিন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা জোশুয়া ওপেনহাইমার ২০১২ সনে নির্মান করেন ছবিটি। গত শতকের ষাট ও সত্তর দশকে ইন্দোনেশিয়ায় সুহার্তোর সামরিক শাসনামলে ’কম্যুনিষ্ট’ নিধনের নামে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয় । সে দেশের সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ায় স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলো এই গণহত্যায় অংশ নেয়। সেই বাহিনীগুলোর একটির গডফাদার – আনোয়ার কঙ্গোকে ঘিরে এই প্রামাণ্যচিত্রের ঘটনাবলী আবর্তিত হয়।

অপরিসর একটি থিয়েটার হল, যেখানে ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল আগের দিন – সেই থিয়েটার হলেই এ ছবি দেখার সুযোগ হয়। ছবি দেখতে দেখতে টের পেলাম – দু’ঘন্টার এই ছবিটি আমার মতোই প্রায় শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় যেন দেখছিলেন কয়েক’শ দর্শক। যাদের সকলেই যেন অপেক্ষা করছিলেন, কখন শেষ হয় এই ছবি। কারণ, বিরক্তি নয়। সকলেই যেন ভাবছে, আর কতক্ষণ চলবে এই বীভৎস অভিনয় দৃশ্য। অনেকেই উশখুশ করলেন – কিন্তু উঠে গেলেন না কেউ। এক পর্যায়ে মনে হতে থাকে, ছবিটির নির্মাতা জোশুয়া ওপেনহাইমার নয় ; আনোয়ার কঙ্গো নামে সন্ত্রাসীদের গডফাদার আর তার দলই তাদের প্রচারণার জন্য নির্মাণ করছে এই ছবি। এখানেই শেষ হলো না। দর্শক যে কতখানি আলোড়িত হয়েছে দু’ঘন্টার এই ছবি দেখে — তা টের পাওয়া গেল যখন ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসের এক সেশনে নির্মাতা উপস্থিত হলেন। রীতিমতো প্রশ্নবানে যেন বিদ্ধ হতে হলো তাকে। আর নানা কথার ফাঁকে তিনিও জানালেন, কি করে এই ছবির নির্মান পরিকল্পনার এক পর্যায়ে তার জীবন সংশয় দেখা দিয়েছিল। এই ছবি দেখতে গিয়ে যে কারো মনে হতেই পারে, নির্মাতা কি তবে বাস্তবের বাইরে গিয়ে কোন পরাবাস্তবতার সন্ধান করছেন। সমসাময়িক দুনিয়ার অন্যতম খ্যাতিমান দার্শনিক শ্লাভো জিজেক এই ছবি নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন — “it is in a way a documentary about the real effects of living a fiction.”

উৎসব শেষ হবার কথা ১৭ ফেব্রুয়ারী। কিন্তু খবর পেলাম, উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠান ও পুরস্কার ঘোষণা হবে ১৬ তারিখ সন্ধ্যায় বার্লিনাল পালাষ্টে। সেখানে আমাদের উৎসব করিয়ে দলটিও আমন্ত্রিত। সন্ধ্যার পর ছবি দেখবার একটা টিকিট সংগ্রহ করেছিলাম। তা ফেলে দিয়ে আমি নই কেবল, দলের অন্য বন্ধুরাও সকলে ছুটলাম সেই আয়োজন দেখতে। বলিভিয়ার আলেহান্দ্রোকে অবশ্যি খুঁজে পাওয়া গেল না। পরে জেনেছিলাম – সেল ফোন বন্ধ করে ছবি দেখায় ব্যস্ত ছিলেন তিনি। চারিদিকে স্যুটেড বুটেড সব গন্যমান্যরা। কেবল আমাদের দলটিরই যা তা অবস্থা। আনুষ্ঠানিক কোন ড্রেস কোড না থাকায় সেদিন ঝামেলায় পড়তে হয়নি।

সমাপনী আয়োজনটি জাঁক-জমকপূর্ণ। তবে বক্তৃতাবাজী এখানেও দেখলাম না। উৎসব পরিচালক ড্যিটার কছলিক মঞ্চে এলেন আমন্ত্রিত হয়ে। তারপর দেখলাম, অনেকটা চেনা কায়দায় দু’জন করে আসছেন পুরস্কারের তালিকা হাতে। পুরস্কার ঘোষণা , তারপর তা প্রদানের পর যথারীতি প্রস্থান। এশিয়ার ছবি হিসেবে সিনেমাটোগ্রাফির জন্য শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পেল কাজাকিস্থানের ছবিঃ হারমনি লেসনস। ছবিটি ওয়ার্ল্ড সিনেমা ফান্ডের সহায়তায় নির্মিত। আর শ্রেষ্ঠ ছবির জন্য এ বছর গোল্ডেন বিয়ার জুটল রোমানিয়ার ছবি – Child’s Pose এর ভাগ্যে । সমাপনী অনুষ্ঠানের পর ছবিটি দেখবার সুযোগ হলো। দর্শকরা ছবি দেখে যথেস্ট প্রশংসাও করলেন। কিন্তু নিজের মনে যেন খচমচানি থেকেই গেল।

সন্দেহ নেই এবারের উৎসবে অন্যতম সেরা ছবি ছিল এটি। সে খবর আমার আগেই পেয়ে গিয়েছিলাম। তবে, সেরা ছবির জন্য অন্য কোন ছবিকে বিবেচনা করা যেত না কি ? যেত কি না – সেই গোমড় ফাঁস করলেন, জুরীদের প্রধান, উং কার উই। জানালেন, কোন ছবির শ্রেষ্ঠত্ব তারা বিচার করতে চান নি। একটি ছবি জীবনের কথা বলছে কি না, তুলে ধরতে পারছে কি না সেটাই তারা বিচারক হিসেবে বিবেচনায় এনেছেন। অকাট্য যুক্তি বটে। সেই বিচারেই তাই শ্রেষ্ঠ ছবি – Child’s Pose ।

বার্লিনালে শেষ হলো। কিন্তু তার রেশ যেন থেকে গেল হৃদয়ে। আমাদের কোনো কোনো বন্ধুর তো মন রীতিমতো খারাপ। পোষ্টডামাপ্লাজ যেন শূন্য মনে হতে লাগলো। উৎসব শেষ হবার পর আরো কয়েকদিন আমরা এই চত্বরে ডয়্যেচে ভ্যেলের অস্থায়ী অফিসে রয়ে গেলাম। কারণ তখনও অনেক আলোচনার পর্ব বাকি। যার সমাপ্তি ঘটলো, ২০ ফেব্রুয়ারী। ততদিনে আমরাও এই উৎসবের অন্দর মহলের অনেক খবর জেনে গেছি। যা খোদ বার্র্লিনবাসী অনেকেও জানেন না।

শেষ বেলায় এসে মনে হতে লাগলো, কি করে সম্ভব হলো এটা ? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভক্ত পশ্চিম জার্মানিতে ’৫০ দশকের গোড়ায় মার্কিনীরা হিটলারের এই ফেলে যাওয়া ’নাৎসীদের’ সংস্কৃতি শিক্ষা দেয়ার চিন্তা থেকে যে চলচ্চিত্র উৎসবের সূচনা করেছিল, তা আজ গোটা বার্লিনের মানুষের হৃদয়কেই যেন ধারণ করেছে।

মনে পড়ছে, উৎসব চলাকালীন গোটা সময়টাতেই স্যুভেনির হিসেবে পাওয়া ব্যাগটি আমাদের সবার কাধে ঝুলতো। প্রায়শঃই কেউ না কেউ কাছে এসে জিজ্ঞেস করতেন, ব্যাগটি কি করে পেলেন ? নিজেকে রীতিমতো ভাগ্যবান মনে হতো তখন। মাঝে মাঝে দেখতাম, গোটা বার্লিনের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটে চলেছে বার্লিনালের লোগোযুক্ত বি.এম.ডব্লিউ. গাড়ীগুলো। দোতলা বিশাল বিশাল সব বাস পোষ্টডামাপ্লাজ চত্বরে দাড়িয়ে আছে, জেনারেশন বিভাগে যারা ছবি দেখতে যাবেন তাদের বহন করবার জন্য। এই বাসগুলো দেখলেই আমার পাকিস্তানি বন্ধু আলী হামিদের কথা মনে হোত। পাকিস্তানে শিশু চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনে জড়িত থাকায় সে জেনারেশন শাখার ছবিগুলোই কেবল দেখতে আগ্রহী ছিল। আরো কত জনকে দেখেছি, ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রায় দু কিলোমিটার দূরত্বে হেটে চলে গেছেন । এ সবই সম্ভব হয়েছিল কেবল বার্লিনালের জন্য।

ভাবছিলাম, এ কারণেই বুঝি ভালুকটা বার্লিনবাসীর এত প্রিয়। এই প্রবল শীতেও রীতিমতো প্রানের স্পন্দন তৈরি করে দিয়েছে গোটা বার্লিন শহর জুড়ে। তাই তো এত বড় বড় চিত্রশালা, অর্কেষ্ট্রা, কনফারেন্স হল বা থিয়েটারের স্থান হওয়া সত্বেও বার্র্লিনের সবচাইতে বড় পরিচয় — চলচ্চিত্র উৎসব নগরী। যা গোটা দুনিয়ার মানচিত্রে তার স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rupan — december ১০, ২০১৩ @ ১২:২৪ পূর্বাহ্ন

      দারুন ভ্রমন কাহিনী। লেখকের কাছ থেকে আরো এমন লেখা ও ছবি আশা করি।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com