প্রবন্ধ, ব্যক্তিত্ব, স্মৃতি

স্মৃতিসত্তায় নন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ

ফরিদ আহমদ দুলাল | 28 Jul , 2012  

সকাল সাতটা থেকে নাট্যজন আবুল হায়াত ও ডলি জহুর-এর হুমায়ূন-তর্পণ শুনছিলাম আর হুমায়ূন আহমেদ-এর সাথে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি হাতড়াচ্ছিলাম। সকাল ন’টায় অনুষ্ঠান শেষে টেলিভিশনে বিশেষ সংবাদ হিসেবে নিচে লেখা এলো, ‘নন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ-এর মরদেহ ঢাকায় পৌঁচেছে’। সংবাদটি মনিটরে দেখে বুকের ভেতরে হাহাকার করে উঠলো। হুমায়ূন আহমেদ-এর সাথে আমার তেমন ঘনিষ্ঠতা কোনোদিনই ছিলো না, আমি তাঁর তেমন অনুরক্ত পাঠকও ছিলাম না, যারা হুমায়ূন আহমেদ-এর বই পেলেই গোগ্রাসে গেলেন; বরং বলতে পারি যখন হুমায়ূন আহমেদ খুবই স্বল্প পরিচিত লেখক সে সময় তাঁর সাথে আমার সামান্য পরিচয় ছিলো, সে পরিচয়কেও ঘনিষ্ঠতা বলা যাবে না কিছুতেই। তবু কেন বুকটা হাহাকার করে উঠলো ! কেন মনে হলো তাঁর উদ্দেশে কিছু নিবেদন করি? হুমায়ূন আহমেদ-এর সৌভাগ্য এবং আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা দেখে একজন সামান্য সাহিত্যকর্মী হিসেবে আমার বুকে কখনো ঈর্ষা উঁকি দেয়নি এমন কথা বললে মিথ্যাচার হবে; কিন্তু তাঁকে নাগাল পাওয়া যে আমার সাধ্যের অতীত তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিলো না; তবু কেন লেখার উদ্যোগ? হুমায়ূননামা লিখে নিজেকে পরিচিত করতে চাই? তা-ও বোধকরি নয়। তাহলে আগেই লিখতাম। আর যেখানে লিখছি তা আমার নিজের পাঠ সীমার বাইরে। লিখছি বুকের হাহাকারকে সান্তনা দিতে।

হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয় লেখক ছিলেন সন্দেহ নেই, তাঁর জনপ্রিয়তা শুধু সমকালেই নয় বরং বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের ইতিহাসেই উল্লেখ করার মতো ঘটনা হয়ে থাকবে। আর আজকের বিপুলমিডিয়া নিজেদের স্বার্থেই হুমায়ূন আহমেদ-এর পাশে আছে । তাঁর লেখার জাদুকরী শক্তি যেমন ছিলো, তেমনি ছিলো সম্মোহনী ক্ষমতা, যেমন ছিলো বৈচিত্র্য, তেমনি ছিলো প্রসাদগুণ। সবচেয়ে বড় কথা মানুষ হিসেবে হুমায়ূন ছিলেন আকর্ষণীয় স্বভাবের অধিকারী একজন, যেকাউকে মুহূর্তে আপন করে নেবার সামর্থ তাঁর ছিলো অপরিসীম। আজ যখন তাঁর মরদেহ ঢাকায় পৌঁছলো তখন তাঁর সাথে আমার স্বল্প পরিচয়ের স্মৃতিগুলোই যেন মহার্ঘ্য হয়ে বেজে উঠলো হৃদয়ের তন্ত্রীতে। হুমায়ূন আহমেদ-এর মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পরই আমি ঢাকায় গিয়েছিলাম। ধারণা ছিলো শনিবার সন্ধ্যায় অথবা রবিবার সকালে মরদেহ ঢাকায় পৌঁছে যাবে, আমিও সবার সাথে শহীদ মিনারে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করবো; কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাকে সাক্ষাৎ না করেই ফিরে আসতে হয়েছে।
humayun1.jpg
ছাত্রজীবনেই আমার পড়া হয়েছিলো তাঁর নন্দিত নরকে এবং শঙ্খনীল কারাগারে উপন্যাস দুটি। এরপর তাঁর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিও পড়েছিলাম একটি। ১৯৭৩-এ তিনি বাংলাদেশ কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন চাকরী করেছেন জানতাম, কিন্তু পরিচয় হয়নি। পরবর্তীতে যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তখন একবার পরীক্ষক হিসেবে আনন্দমোহন কলেজে এসেছিলেন। আমি তখন আনন্দমোহন থেকে অনার্স শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.কম ফাইনাল পরীক্ষার্থী, উঠতি লেখক এবং সাহিত্য সংগঠক। আনন্দমোহন কলেজের রসায়ন বিভাগের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাঁর সাথে কিছুক্ষণ কথা বলেছিলাম। আনন্দমোহনের লাইব্রেরিয়ান আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন; আমার সম্পর্কে কিছুটা বাড়িয়েই বলেছিলেন। যে কারণে তিনিও আমাকে কিছুটা আমল দিয়েছিলেন হয়তো-বা। তা নাহলে তো আমি তাঁর ছাত্রই ছিলাম। কিছুদিন পর, ১৯৮৪-র দিকে হবে, হুমায়ূন আহমেদ ময়মনসিংহে এসেছিলেন একটা অনুষ্ঠানে, যে অনুষ্ঠানে আমার থাকা হয়নি। অনুষ্ঠানের দিন আমি কিশোরগঞ্জে ছিলাম। পরদিন ট্রেনে ফিরেছি। স্টেশনে নেমে দেখলাম এক নম্বর ‍প্লাটফর্মে হুমায়ূন পায়চারী করছেন পেছনে হাত রেখে। ঢাকায় ফিরবেন, গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন। কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে দাঁড়ালাম। সামান্য কুশল বিনিময়ের পর তিনি কপট রাগ করে বললেন, ‘আমি ময়মনসিংহে আসছি আপনি জানতেন না!’ বললাম, ‘জানতাম’। উনি ইয়ার্কি করে বললেন, ‘তাহলে আপনাকে অনুষ্ঠানে দেখলাম না কেন- আমি আপনার চেয়ে বড় লেখক না?’ আমি বললাম,‘শুধু বড় লেখক নন, আপনি আমার বয়সেও বড়- জ্ঞানেও বড়। দুঃখিত আমি আসলে শ্বশুরালয়ে গিয়েছিলাম, ফিরতে পারিনি।’ হুমায়ূন আহমেদ আরো একটু মজা করার জন্য হয়তো বললেন, ‘শুনেন ফরিদ, নাটকেও আমি আসছি। আপনার বারোটা বাজিয়ে দেবো।’ আমিও ঠাট্টা করে বললাম, ‘নাটকে কিন্তু আমি আপনার চেয়ে অনেক আগেই এসেছি।’ তীর্যক ভঙ্গিতে বললেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই। আমি তো ভাবছি আপনার কাছে নাটকে তালিম নেবো।’ হাসতে হাসতেই বললেন কথাগুলো তিনি। আমি তাঁকে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে ফিরলাম। এর পর আরো দু’চারবার দেখা হয়েছে, কুশল বিনিময়ের বেশি কিছু হয়নি। সম্ভবত ১৯৯০ অথবা ১৯৯১-এ আমরা ময়মনসিংহে তাঁর শততম গ্রন্থ প্রকাশ উপলক্ষে মুসলিম ইনস্টিটিউট-এর পক্ষ থেকে তাঁর সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলাম। সেই অনুষ্ঠানে আমার ভূমিকা ছিলো গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকদিন পর তাঁর সাথে দেখা হলো। তিনি প্রথমে আমাকে চিনতেই পারলেন না। যখন পরিচয় দিলাম তিনি অবাক বিস্ময়ে বললেন, ‘ফরিদ, আপনার স্বাস্থ্য এতো খারাপ হলো কেন!’ আমি জানালাম আমার অসুস্থতার কথা। তিনি আরো অবাক হয়ে বললেন, ‘ বলেন কী! হ্যাপাটাইটিস-বি! এ রোগে তো মানুষ বাঁচে না!’ আমার অতটা জানা ছিলো না, বললাম, ‘তাই নাকি?’ বললেন,‘নাইনটি নাইন পয়েন্ট নাইন পার্সেন্ট!’ এবার আমি হেসে বললাম, ‘ঐ পয়েন্ট ওয়ান পার্সেন্ট-এর ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেছি।’ হুমায়ূন আহমেদ সিরিয়াস, বললেন, ‘খুব সাবধান থাকবেন, হ্যাপাটাইটিস-বি ভয়ংকর রোগ।’ আমি কিছুটা ভয় পেয়েছিলাম এবং খাদ্য গ্রহণে সাবধানীও হয়েছিলাম। উনি অবশ্য আমাকে বিলিরোবিন নর্মাল হয়েছে কি-না পরীক্ষা করাতে বলেছিলেন, আমি করাতে পারিনি। আরো পরে যখন তাঁকে দেখেছি বই মেলায় অথবা অন্য কোথাও তখন তাঁর আমার দিকে তাকাবার ফুরসতই হয়নি, তাকাতে পারলে হয়তো চিনতেন অথবা চিনতেন না। তাতে কিছু এসে যায় না।

তবে আমার এক ধরণের ভালোলাগা ছিলো এই ভেবে যে হুমায়ূন আহমেদ আমাদেরই লোক। আমাদের কোনো এক সাক্ষাতে তিনি আমায় বলেছিলেন তাঁর নাটকে তিনি ‘ফরিদ’ নামটি ব্যবহার করেছেন আমার নাম মাথায় রেখে; কথাটি অবশ্য তিনি ঠাট্টা করে বলে থাকতে পারেন; আমি কিন্তু আমার প্রথম উপন্যাস শৃঙ্খল-এ ‘গুলতেকিন’ নামটি ভাবীর নাম মাথায় রেখেই লিখেছিলাম। সেকথা আমি তাঁকে একবার জানিয়েও ছিলাম। তিনি কিছু বলেন নি, সামান্য রহস্যের হাসি হেসেছিলেন, যেমনটি তিনি হেসে থাকতেন।

আজও হুমায়ূন আহমেদ ঢাকায় এলেন না ফেরার দেশে চলে যেতে, আজও আমি তাঁর সাথে দেখা করতে পারলাম না। এখন তো হুমায়ূন কতো বড়, আকাশের ওপারে আকাশের চেয়েও অনেক বড়। আর আমি এতোটাই ছোট যে দূরে থেকে কেবল তাঁর জন্য শুভকামনা জানাতে পারি; যে শুভকামনার ধ্বনি ইথারে ঘুরবে কিন্তু কারো বিবেচনা পাবে না; কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ নিশ্চয়ই তা টের পাবেন। কেননা তিনি যে আজ অনেক বড়র চেয়েও বড়। তাঁর সম্পর্কে আমার তেমন কিছু বলার নেই, তাঁর আশপাশে যারা আছেন তাদের উদ্দেশে বলবো, হুমায়ূন আহমেদ সত্যিই অনেক বড়, তাঁর গায়ে যেন কোনো সংকীর্ণতার কালি না লাগে।

free counters


11 Responses

  1. munia mahmud says:

    হুমানয়ুন আহমেদকে নিয়ে খুব ভাল লিখেছেন আপনি। এক টানে পড়লাম। আপনাকে অনেক অনেক অভিনন্দন মনের কথা এত সুন্দর করে লেখার জন্য। ধন্যবাদ।

  2. Manik Mohammad Razzak says:

    দুলাল ভাই অপনাকে ধন্যবাদ। আপনার মত এমন অনেকেরই হয়তো হুমায়ূন আহমেদের সাথে পরিচয় ছিল, সাক্ষাৎ হয়েছিল, অনেকেরই হযতো টুকরো টুকরো অনেক স্মৃতি আছে। সে সব একত্র করলে এ মহান মানুষটির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার পরিধি হযতো আরও বিস্তৃত হবে। সকলের পক্ষে তো লিখা সম্ভব না, আপনি লিখে বেশ ভাল করেছেন। ছোট্ট হলেও লিখাটি খুব ভাল লেগেছে। আপনাকে আবারও ধন্যবাদ।

    মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক।

  3. saifullah dulal says:

    valo laglo lekhati.

  4. sumaiya barkatullah says:

    হুমায়ূন আহমেদ আমার প্রিয় লেখক। তাঁকে নিয়ে আপনার এ লেখাটি পড়লাম। আমার খুব ভালো লেগেছে। আপনি অনেক ভালো।

  5. মশিউর রহমান খান says:

    হুমায়ূন আহমেদ এক জীবনে অনেক লেখা লিখেছেন। আমার মনে হয় দুলাল ভাই যদি আত্মস্মৃতির বাইরে গিয়ে হুমায়ূনকে নিয়ে লিখতেন, তার লেখার মূল্যায়নের দিকটা আমাদের জন্য আজ বেশী জরুরী। অনেক লিখলে, বাজে লেখার পরিমানটাও বাড়ে, হুমায়ুনও নিশ্চয়ই এর বাইরে ছিলেন না। দুলাল ভাইকে অভিনন্দন। আপনার কাছ থেকে পরবর্তীতে হুমায়ূন সাহিত্য সমালোচনা প্রত্যাশা করছি।

  6. হাবীবুল্লাহ সিরাজী says:

    দুলাল।
    দাগ মোছে না। সুন্দর রচনা।
    সিরাজী।

  7. বনি আমিন says:

    আসলে আমি আরো বড় লেখা (ব্যক্তিগত পরিচয়সূত্রের) প্রত্যাশা করেছিলাম। আসলে দেশটা কয়দিন এমন হুমায়ূন হয়ে গিয়েছিল যে, অত্র পত্রিকার অত্র বিভাগে তা তুলনায় কম। আমি আসলে এমন সব বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন-যাপনকারী কৃতিদের ব্যক্তিগত জীবন খুব উপভোগ করি।

  8. Dr.Rakib says:

    আমি স্যারের সরাসরি ছাত্র ছিলাম না, তবে আমাদের অন্য গ্রুপে স্যার প্রেক্টিকেল করাতেন। সাবসিডিয়ারি রসায়ন প্রেক্টিকেল ক্লাশ হত কার্জন হলের পুকুরের উত্তর পারে প্রানী বিজ্ঞান ভবনের ৩য় তলায়। শুনেছি, এসেই তিনি প্রেক্টিকেলে করনীয় দেখিয়ে লেখার কাজে হাত দিতেন। এ সব ঘটনা ১৯৭৪ সালের।
    পরবর্তীতে স্যারকে দেখেছি ১৯৮৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে একজন নাম করা লেখক ও নাটক পরিচালক হিসেবে, বিশেষ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত প্রধান অতিথী হিসেবে। আমি তখন সবে মাত্র বিদেশ থেকে পড়াশুনা শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছি। নিজেকে ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিতে এগিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু লোকজনের ভীরে কাছে যেতে পারিনি। তবে, তার এইসব দিন রাত্রি নাটকটি দেখতে ভুল করিনি।

  9. নাসরীন says:

    লেখাটা ভাল লাগলো।

  10. মোত্তালিব দরবারী says:

    সুন্দর লেখা।

  11. Chandrima Dutta. says:

    Lekhati sundar o monograhi. dhnyobad Lekhok ke.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.