অনুবাদ কবিতা, গদ্য, প্রবন্ধ, বিশ্বসাহিত্য

এডিথ স্যোডেরগ্রান :

প্রেম, একাকিত্ব ও মৃত্যুর কবিতা

admin | 25 Jul , 2012  

ফিনল্যান্ডের প্রথম সারির কবি এডিথ স্যোডেরগ্রান-এর সাথে বাংলাভাষী পাঠকদের পরিচয় তেমন নেই বললেই চলে। বাংলাভাষী প্রবাসী দুই লেখকের আনুকূল্যে এডিথ স্যোডেরগ্রান-এর একগুচ্ছ কবিতা এই প্রথমবারের মতো প্রকাশ করা হলো বিডিনিউজটোয়ান্টিফোরডটকমের পাঠকদের জন্য। স্যোডেরগ্রান সম্পর্কে ভাষ্যটি লিখেছেন অংকুর সাহা এবং কবিতাগুলোর ভাষান্তর করেছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। বলা বাহুল্য যে কবিতাগুলো ডেভিড ম্যাকডাফ-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় তর্জমা করা হয়েছে।
sodargran-1.gif
হ্যাঁ, তাঁর কবিতার মূল থিম অবশ্যই এই তিনটি–প্রেম, একাকিত্ব ও মৃত্যু; সব কবিতারই হয়তো তাই। কিন্তু সেটাই সব নয়, তাঁর অভিজ্ঞতার ফোকাসের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধ–যেকোনো যুদ্ধ নয়, কালান্তক প্রথম মহাযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮); আর রয়েছে সশস্ত্র বিপ্লব–যেকোনো বিপ্লব নয়, অক্টোবর বলশেভিক বিপ্লব; হ্যাঁ, ২৫ অক্টোবর ১৯১৭। তিনি ছিলেন পেট্রোগ্রাড শহরে সেই বিপ্লবের কেন্দ্রে; রয়েছে দারিদ্র্য আর ক্ষুধার অভিজ্ঞতা এবং রাজরোগ যক্ষ্মা, যা তাঁকে গিলে খায় প্রথম যৌবনে।

কিন্তু এইসব বিপর্যয় সত্ত্বেও তিনি লিখেছেন কবিতা, অপার এবং অগাধ, অবারিত অথচ পরিণত, গভীর এবং তাৎপর্যময়, শুদ্ধ অথচ জটিল অনুভূতির সংশ্লেষে গাঢ়। তাঁকে বাদ দিলে অসমাপ্ত থেকে যাবে সুইডিশ ভাষার কবিতার আলোচনা। ১৯৩০-এর দশকে তরুণ অ্যাংলো মার্কিন কবি ডবলু এইচ অডেন (১৯০৭-১৯৭৩) এসেছিলেন সুইডেন ভ্রমণে। তরুণ সুইডিস কবি গুনার একেলফের (১৯০৭-১৯৬৮) সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে উঠেছিল স্যোডেরগ্রানের কথা; গুনার তাঁকে জানিয়েছিলেন : ‘‘She is a very great poet… as brave and as loving as your Emily Bronte (1818-1848). It is a pity that such a rare bird should be buried for the world in a grave over which the war has passed several times. She belongs to the world though her language might seem as old Aeolian dialect.”

স্যোডেরগ্রানের ভাষা বিষয়ে একেলফের মন্তব্যটি একটু খোলসা করা যাক। এডিথ স্যোডেরগ্রান বহুভাষায় সাবলীল, বহুজিহ্ব কবি, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘পলিগ্লট’। তাঁর বাবা-মা সুইডিশ ভাষী, সেই সূত্রে সুইডিশ তাঁর মাতৃভাষা। তিনি জন্মেছিলেন রাশিয়ার সেন্ট পিটাসবার্গ শহরে (তখন তার নাম পেট্রোগ্রাড)- শহরটি কসমোপলিটান, অভিজাত মানুষেরা রুশ ভাষার থেকে ফরাসি ভাষার চর্চা করতেন বেশী-দুটি ভাষাতেই ভালো দখল ছিল কবির। তিনি লেখাপড়ার সূত্রপাত করলেন এক শৌখিন ও সুখ্যাত জার্মান স্কুলে-সেই ভাষাটিও আয়ত্ত হল তাঁর। স্কুলে ফরাসি ও রুশ ভাষা ছাড়াও শিখলেন প্রাচীন গ্রিক। অর্থ্যাৎ বিভিন্ন ভাষাকে ভালবেসে তাঁর কবি জীবনের প্রস্ততি এবং অনেকগুলি ভাষার সাহিত্যের প্রত্যক্ষ অভিঘাত তাঁর রচনায়। চৌদ্দ বছর বয়েসে তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন, কিন্তু জার্মান ভাষায়-হাইনরিশ হাইনের (১৭৯৭-১৮৫৬) শৈলিতে ছন্দ মিলের স্তবক বিন্যাসক্রমে দুশোটি এমন কবিতা লিখে ফেলেছিলেন কয়েক মাসে। তখন ভাবাই যেত না যে তিনি হবেন সুইডিশ ভাষার প্রথম সারির কবি।

তাঁর মাতৃভাষার বিষয়টি যেমন জটিল, মাতৃভূমির বিষয়টিও তাই। সোডারগ্রান সুইডিস ভাষার কবি কিন্তু তাঁর মাতৃভূমি ফিনল্যান্ড। দ্বাদশ শতক থেকে ফিনল্যান্ড সুইডেনের সম্রাটের একটি করদরাজ্য-দেশটিকে শাসন করার জন্যে সুইডেন থেকে রাজকর্মচারীরা এসে ফিনল্যান্ডে বসবাস করতে শুরু করেন-তাঁদের হাতেই ছিল প্রধান শাসন ক্ষমতা, তাঁরা উচ্চ শ্রেণীর নাগরিক। কবির জন্মের সময় ফিনল্যান্ডের জনসংখ্যার শতকরা বারো ভাগ ছিল সুইডিস ভাষী। ফিনল্যাণ্ডের বেশির ভাগ নামকরা কবিরাই লেখেন সুইডিশ ভাষায়-ফিনিশ ভাষার কবিতা সংগ্রহ করতে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে আমাকে।

ফিনল্যান্ডের পশ্চিম সীমান্তে শক্তিশালী সুইডেন; আবার পূর্বদিকে পরাক্রমশালী রাশিয়া। রাশিয়ার সম্রাট বা জারের লোভ ছিল দেশটির ওপরে-১৮০৯ সালে তিনি দেশটি দখল করে বসলেন-ফিনল্যান্ড হয়ে দাঁড়াল রাশিয়ার একটি প্রদেশ বা গ্র্যান্ড ডাচি (Grand Duchy)। এর ফলে দেশটির সাংস্কৃতিক জীবনে সুইডিশ ভাষার প্রভাব খানিকটা কমে এবং অনগ্রসর ফিনিশ ভাষার প্রসার ও সমর্থন বাড়ে।

জারেরা বিশ্বাস করতেন যে রুশ ভাষা চাষাভুষের ভাষা-নতুন জয় করা রাজ্যে সেই ভাষা চাপিয়ে দেবার প্রশ্নই ওঠেনা। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে রুশ ভাষায় এল যুগান্তকারী সৎ সাহিত্যের জোয়ার -গোগোল, চেকভ, দস্তয়েভষ্কি, তুর্গেনেভ ও অন্যান্য; তার কেন্দ্রে সংস্কৃতিমনা সেন্ট পিটার্সবুর্গ। ফিনল্যান্ড সেখান থেকে, পাথর ছোঁড়ার দূরত্বে, সমৃদ্ধ হল তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিও।

॥২॥
১৮৯২ সালের এপ্রিল মাসে রাশিয়ার তৎকালীন রাজধানী সেন্ট পিটাসবার্গে এডিথ সোড়ারগ্রানের জন্ম। বাবা মাত্স্ এনজিনিয়ার, কর্মসূত্রে উত্তর ইয়োরোপের নানা শহর ঘুরে থিতু হয়েছিলেন সেন্ট পিটার্সবার্গে; মায়ের নাম হেলেনা হোমরুস। এডিথের বয়েস যখন কয়েক মাস, শহরে শুরু হল ভয়াবহ কলেরা মহামারী। মাত্স্ তার পরিবারকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন ষাট মাইল উত্তর পশ্চিমে ফিনল্যান্ড সীমান্ত পেরিয়ে রাইভোলা গ্রামে। নগন্য, দরিদ্র ধীবরপল্লী, কিন্তু চমৎকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য; অভিজাত রুশ মানুষেরা সেখানে খামারবাড়ি বা “দাচা” বানিয়ে গ্রীষ্মকালে ছুটি কাটাতে আসেন অরণ্য, হ্রদ, পশুপাখি ও পুষ্পের মাঝখানে। সেখানকার মানুষের ভাষা রুশ, সংস্কৃতি রুশ এবং গির্জাটিও রুশ অর্থডস্ক খ্রীষ্টধর্মের-পেঁয়াজের মতন অর্ধগোলাকৃতি গম্বুজ তার। এডিথের সংক্ষিপ্ত জীবনের একটা বড় অংশ কাটবে এই কাঠের বাড়িতে, তার বারান্দায় ব্যালকনিতে বা বড় বড় কাচের জানালার নিভৃতে বসে লেখা হবে তাঁর বিষন্ন, নিঃসঙ্গঁ কবিতাবলী-প্রিয় সঙ্গীঁ তাঁর হলুদ ও বাদামি রঙা বেড়াল “তত্তি”। কবির জীবনীকার লুপ দ্য ফানোর বর্ণনায়,” that air of neglect, that atmosphere of romantic decadence which have struck the few visitors to the place, and which were to mark the poetry of Edith Sodergran with such a strange hue.”

কবির যখন দশ বছর বয়েস, তাঁকে পাঠানো হল সেন্ট পিটার্সবার্গের নেভস্কি প্রসপেক্ট রাজপথে অবস্থিত এক অভিজাত জার্মান স্কুলে। সেখানে শিক্ষার মান যেমন উঁচু, তেমনি জোর দেওয়া হয় শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত ও নৃত্যের ওপরে। ছয় বছর এই স্কুলে পড়লেন তিনি, ছুটি কাটাতেন রাইডোনায়। স্কুলেই শুরু হল জার্মান ভাষায় নিয়মিত কবিতা রচনা। তাঁর মানসিক দৃষ্টিভঙ্গীঁ বৌদ্ধিক চিন্তাধারা এবং কাব্যভাবনা হয়ে দাঁড়ায় পুরোপুরি আন্তর্জাতিক।

১৯০৪ সালে মাত্স্ যক্ষারোগে আক্রান্ত হন, সংক্রামক অসুখের জন্যে তাঁকে বাকী জীবন কাটাতে হয় ফিনল্যান্ডের নুমেলা শহরের স্যানাটোরিয়অমে। স্কুল থেকে এডিথ তাকে দেখতে যেতেন নিয়মিত এবং পরিচর্যা করতেন তার। এডিথের কবিতায় ব্যাধি ও মৃত্যুর ছায়া নামে। গভীর যন্ত্রনায় মাত্সের মৃত্যু হয় ১৯০৭ সালে এবং দেড় বছর পরে এডিথ নিজেও আক্রন্ত হন সেই একই কালান্তক অসুখে। ওই একই স্যানাটোরিয়ামে স্থান হয় ষোড়শী এডিথের। এই সময়কার স্কুলে এবং স্যানাটোরিয়ামে রচিত কবিতাগুলি প্রকাশিত হবে তাঁর মৃত্যুর অনেক দশক পরে-শৈশবের কবিতা (১৯০৭-১৯০৯) শিরোনামে, প্রকাশ ১৯৬১।

কবির জীবনের বাকী অর্ধেক অংশ মৃত্যুর সঙ্গেঁ সংগ্রাম এবং বেঁচে থাকার জন্যে যুদ্ধ। পরবর্তী আড়াই বছরে তিনি পাঁচবার দীর্ঘ সময়ের জন্যে অন্তরীন থাকবেন নুমেলার স্যানটোরিয়ামে এবং সাময়িক ভাবে সুস্থ হলেই ফিরে আসবেন মায়ের কাছে রাইভোলায় তিনিই একমাত্র সন্তান। নুমেলার লোকজন তাঁকে জানতো কবি, পুস্তক-পাগল অথবা প্রায় উন্মাদ হিসেবে; শারীরিক যন্ত্রণার সঙ্গেঁ ছিল মানসিক অসুস্থতা। নুমেলায় একটি চমৎকার গ্রন্থাগারে ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বইপত্র-সেখানেই তিনি কাটাতেন তাঁর সুস্থতার প্রহরগুলি।

১৯১২ সালের জানুয়ারী মাসে মা, মেয়ে গেলেন সুইৎসারল্যান্ডের দাভোসে শহরে-তাঁর প্রিয় লেখক টোমাস মান (১৮৭৫-১৯৫৫) এর যাদু পাহাড় উপন্যাসটির পটভুমি। মানের স্ত্রী কাটিয়া ১৯১২ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর দাভোস শহরে স্যানাটোরিয়ামে চিকিৎসাধীন ছিলেন-তাঁর স্বামীকে লেখা দীর্ঘ চিঠিগুলিই যাদু পাহাড় উপন্যাসের রসদ। লেখক নিজে দাভোস শহরে গেছেন উপন্যাসটি লেখার অনেক দিন পরে।
sodargran-2.gif

॥৩॥
দাভোস শহরে স্বাস্থ্যের সমূহ উন্নতি হল এডিথের; সেখানকার এক বয়স্ক চিকিৎসকের প্রেমে পড়লেন তিনি; নুমেলাতেও একজন ডাক্তারকে তিনি বিবাহ প্রস্তাব দিয়েছিলেন। দাভোসের গ্রন্থাগারে তিনি পাঠ করলেন ইংরেজি সাহিত্য-ডিকেন্স ও সুইনবার্ন, হুইটম্যান আর শেকসপিঅর; ইতালিয়ান ভাষা-শিখে পড়লেন দান্তে-তাঁর ইনফার্নের সঙ্গেঁ হুবহু মিল খুঁজে পেলেন তাঁর স্যানাটোরিয়ামের। এবং সুইডিশ ভাষায় নিজের কবিতা লেখার শুরু হল। ১৯১৩ সালের বসন্তে মিলান ও ফ্লোরেন্স কিছুদিন ঘুরে দেশে ফিরলেন মে মাসে। মূলতঃ রাইভোলায় বসবাস, মাঝে মাঝে অল্প সময়ের জন্যে সেন্ট পিটার্সবার্গে। ১৯১৪ সালে বাধলো প্রথম মহাযুদ্ধ, ফিনল্যান্ড তাতে যোগ না দিলেও সেনাবাহিনীর নিয়মিত যাতায়াত রাইভোলা হয়ে রাশিয়ার পথে। ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হল প্রথম কাব্যগ্রন্থ কবিতা তাঁর সময়ের থেকে বেশ কয়েক দশক এগিয়ে থাকা কাব্যভাবনা, যাঁর অনুপ্রেরনা র‌্যাঁবো, রিলকে এবং হুইটম্যান-ফিনল্যান্ডের গন্ডগ্রামে তাঁর প্রভাব হল সাংঘাতিক। হেলসিংকি শহরে প্রতিক্রিয়া অতোটা বিরুপ নয়, তবুও খুবই আঘাত পেলেন কবি। তার অভিঘাতে লিখতে বসলেন নতুন কবিতা।

১৯১৮ সালে প্রকাশিত হল দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ শরতের বীনা। তাঁর ভূমিকাটি নর্ডিক সাহিত্যে বিখ্যাত. ”My poems are to be taken as careless sketches. As to the contents, I let my instinct build, while my intellect watches. My self confidence comes from the fact that I have discovered my dimensions. It does not behoove me to make myself smaller than I am.” সমালোচনার ঝড় বইলো-গ্রন্থের ৩১টি কবিতাকে এক সমালোচক বর্ননা করলেন “৩১টি হাসির বড়ি” বলে; কবিতার সঙ্গেঁ তিনি যে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন তাঁর কবিসত্তাকে তা নিয়েও সমালোচকদের আপত্তি। নীটশের উদ্ধৃতি দিলেন এক সমালোচক, ”লেখক তাঁর মুখ বন্ধ রাখবেন, তাঁর রচনাই কথা বলবে তাঁর হয়ে।” কেবল ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও কবিতাপ্রেমী হেগার ওলসন (১৮৯৩-১৯৭৮) “দাগেনর্স প্রেস” সংবাদপত্রে একটি প্রবন্ধ লিখলেন গ্রন্থের কবিতাগুলির গুরুত্ব ও সম্ভাবনা বিষয়ে; সেই সঙ্গেঁ তিনি তিরস্কারও করলেন কবিকে কবিতাগুলি ব্যাখ্যা করার প্রচেস্টার জন্যে। সহানুভূতিশীল প্রবন্ধটি পড়ে অভিভূত হলেন এডিথ-দুজনে বন্ধুত্ব জমে উঠলো, প্রথমে চিঠিপত্রে পরে সাক্ষাতে। হেগারের প্রনোদনায় তিনি হেলসিংকি ও সেন্ট পির্টাসবার্গে গেলে ফিনল্যান্ড ও রাশিয়ার আধুনিক কবিদের সঙ্গেঁ পরিচয় ও আলাপ আলোচনা করতে। পরিচয় হল ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি (১৮৯৩-১৯৩০) এবং ইগর সেভেরিয়ালিন (১৮৮৭-১৯৪১) এর মতন মহীরূহদের সঙ্গেঁ।

এদিকে মার্চ, ১৯১৭ শুরু হয়ে গেছে বলশেভিক বিপ্লব; ফিনল্যান্ড তখন সাময়িক ভাবে স্বাধীনতা ঘোষনা করে, কিন্তু রাশিয়ায় বেধে যায় গৃহযুদ্ধ। রাইভোলা একে রাশিয়ার সীমান্তে এবং অন্যদিকে রাশিয়ার বাল্টিক নৌবাহিনীর ঘাঁট ক্রনস্টাড শিবিরের খুব নিকটে-ফলে যুদ্ধের আগুন জ্বললো সেখানেও। গ্রামটি থাকলো বিপ্লবী লালফৌজের দখলে, কিন্তু জারের বাহিনীর চোরাপোপ্তা আক্রমণ চললো, তারা জ্বালিয়ে দিলো ক্ষেতের ফসল-সেই অঞ্চলে তখন দীর্ঘ দুর্ভিক্ষ। পরিবারটির সংসার চালানোর সমস্ত খরচ আসতো সেন্ট পিটার্সবুর্গ থেকে, বিপ্লবের ফলে তা গেল বন্ধ হয়ে। দারিদ্র ও দুর্ভিক্ষেই তাঁদের দুর্যোগের সমাপ্তি নয়, মানসিক দুশ্চিন্তার ফলে আবার ফিরে এলো পুরানো অসুখ। মেরামতের অভাবে ভেঙে পড়তে থাকে বাড়িঘর; সংসার চালাতে আর চিকিৎসায় বিক্রি হয় ঘরের আসবাবপত্র, গয়নাগাঁটি আর দামী পোষাক।

দুর্বিসহ জীবনে তাঁর সবচেয়ে বড় ভরসা বন্ধু হেগার-দুজনে হয়ে উঠলেন এক সত্তা, আত্মার আত্মীয়। ১৯১৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে আরেকটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখলেন তিনি এডিথের কবিতা বিষয়ে, তাতে কবির ওপরে নগ্ন, ঘৃন্য আক্রমনের যথোপযুক্ত সমালোচনা। দুজনে চিঠিপত্র আদান প্রদান চললো, সেই সঙ্গেঁ এডিথ পাঠালেন নতুন লেখা কবিতা। কিছুদিন পরে কবির আমন্তনে রাইভেলোর দাচায় তাঁর সঙ্গেঁ দেখা করতে এলেন হেগার এবং থাকলেন কয়েকদিন। গাড় হলেও অসম বন্ধুত্ব-একজন অসুস্থ, অসুখী, দরিদ্র, মৃত্যুর অপেক্ষায়; অন্যজন তরুনী, সম্ভাবনাময় লেখিকা, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। দুজনের চিঠিপত্রের সংকলন ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে ২০০০ সালে, গ্রন্থটির নাম-যে কবি সৃস্টি করেছেন নিজেকে-এডিথ সোভারগ্রানের নির্বাচিত চিঠিপত্র

ফুরিয়ে যাবার আগে পরপর দুটি কাব্যগ্রন্থ-গোলাপের পূজাবেদী (১৯১৯) এবং ভবিষ্যতের ছায়া (১৯২০)। সমালোচকদের আক্রমন চললো অব্যাহত। হেগারের সহানুভূতিশীল আলোচনা পড়ে কবি চিঠি দিলেন, “Could it really be that I am coming to someone? Could we take each other’s kaud?” হেগার তাঁকে হেলসিংকিতে আমন্ত্রণ জানালে তিনি উত্তর দিলেন, “ঘুম নেই, শান্তি নেই, অর্থ নেই, যক্ষার রক্তপাত আছে।” কিন্তু জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কবিতা লিখেছেন, পরনের নাইটগাউন বিক্রি করে কিনেছেন কবিতা লেখার কাগজ। মৃত্যুর পরে অগ্রন্থিত, অপ্রকাশিত কবিতাগুলি-যে ভূমি ভূমি নয় (১৯২৫)। তাঁর কবিতার ইংরেজি অনুবাদ হয়েছে বেশ কয়েকবার। ব্রিটিশ কবি ডেভিড ম্যাকডাফ (১৯৪৫-) অনুবাদ করেছেন তাঁর কবিতা সমগ্র (প্রকাশক-ব্লাডেক্স বুকস, ১৯৮৪)। মার্কিন কবি স্যামুয়েল চার্টার্স (১৯২৯-) ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রবিবাদে দেশ ছেড়ে চলে যান সুইডেনে। ১৯৭৭ সালে তিনি আমরা নারী নামে এডিথ স্যোডেরগ্রানের কবিতার অনুবাদ প্রকাশ করে ছিলেন। জন্মসূত্রে ফিনল্যান্ডের সুইডিশভাষী নাগরিক এবং গত চার দশক ক্যালিফোর্নিয়ার অধিবাসী, সাংবাদিক ও অনুবাদক স্টিনা কাচাদৌরিয়ান কবির নির্বাচিত কবিতার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেছেন প্রেম ও নিঃসঙ্গঁতা নামে ১৯৮৫ সালে। সুইডিশ কবি গৌনিল ব্রাউন (১৯২৬-) ইংরেজি অনুবাদ করেছেন এডিথের নির্বাচিত কবিতার-আইকন প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়েছে ২০০১ সালে। সুব্রত এডিথের কবিতাগুলির বঙ্গানুবাদ করেছেন ডেভিড ম্যাকড্যাফের ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে।

॥৪॥
রাইভোলার খামারবাড়িতে বাস করতেন এডিথ-কন্বমুনির আশ্রমে শকুন্তলার মতন-সেখানে প্রতিটি বস্তুর একটি নাম ছিল, সব কিছুকে ভাবা হত জীবিত এবং তুচ্ছ পদার্থটিও তাঁর কাছে চরম প্রয়োজনীয়। কোন গাছের অসুখ করলে, তিনি তার পাশে একান্তে বসে নিবিড় কথোপকথন চালিয়ে যেতেন তার সঙ্গেঁ, উষ্ণ সাবান জলে ধুয়ে দিতেন তার শরীর। শুকনো ফুলকে গাছ থেকে তুলে সাদরে শেষ শয্যায় শুইয়ে দিতেন ঘাসের উপরে-সঠিক মর্যাদার সে মৃত্যু। হেঁটে বেড়াতেন তিনি-প্রতিটি গাছ, পাথর, ধুলিকনা তাঁর পরম প্রিয়। শারীরিক শক্তি ফুরিয়ে আসার সঙ্গেঁ সঙ্গেঁই হাঁটার বৃত্তটিও ছোট হয়ে আসে। অভিজাত, প্রাচীন ফ্যাশনের দামি পোষাকের অন্তরালে ক্ষীন থেকে ক্ষীনতর হয় শরীর, তার সঙ্গেঁ থাকে দুটি দীর্ঘ আয়ত চোখ আর ওষ্ঠের মৃদু হাসি। অন্তিম সময়ের অল্প কিছুদনি আগে এক সতীর্থ কবি দেখা করতে এসেছিলেন-সারা জীবন তিনি ভুলতে পারেন নি সেই দিনটির কথা-“ডাগর দুটি ধূসর রঙের চোখ, কালো গভীর, স্থির জলে পূর্নিমার আলো পড়লে যেমন লাগে; আর সেই স্বর্গীয় হাসি।”

শেষ দিনটি ঘনিয়ে এল ২৪ জুন ১৯২৩ মধ্যগ্রীষ্মের দীর্ঘতম দিন। সূর্যদেব ডুবলেন না সেদিন-সারারাত জেগে পাহারা দিলেন এই মহান কবিকে। খুব অল্প খরচে সমাধিস্থ করা হল তাঁকে-পরে লাল গ্রানিটের ফলকে লেখা হল এপিটাফ- তাঁর অন্তিম কবিতাটির প্রথম চার লাইন-

“দ্যাখো, হেথা অনন্তের তীরে শুয়ে নারী,
ভব নদী গম্ভীর বাহিনী,
মৃত্যুর অমোঘ ক্রীড়া বৃক্ষে, গুল্মে, তৃণে
এক সুর, সরল কাহিনী।”

শরতের স্লান বিল

শরতের স্লান বিল
কী ভারী স্বপ্ন দ্যাখো তুমি বারে-বারে
বসন্ত-সাদা দ্বীপ
ডুবেছে যা পারাবারে।

শরতের স্লান বিল,
লুকায় তোমার বীচি,
তোমার আয়না ভুলে যায় যত
শুভদিন হারিয়েছি।

শরতের স্লান বিল
উচু আকাশেরে হাল্কা, নীরব বহে,
ক্ষণেকের তরে জীবন-মরণ
ঘুম-ঘুম চোখে চুম্বন করে দোঁহে।
(Pale Lake of Autumn)

হেমন্ত

তোমার বাড়ির চারিধারে ন্যাড়া গাছ
হাওয়া আর রোদ কভু বোধ করে নি তো,
বড়-বড় পায়ে ন্যাড়া গাছগুলি যায়
জলের কিনারে, জলে হ’তে বিস্বিত।
শিশুটি খেলেছে হেমন্ত-কুয়াশায়,
ফুল হাতে নিয়ে মেয়েটি চলেছে একা,
দূরে যেইখানে শেষ হ’ল নীলাকাশ
রুপালি-সফেদ পাখিরা মেলেছে পাখা।
(Autumn)

কালো বা সাদা

সেতুদের নীচে নদীগুলি ব’য়ে যায়,
পথপাশে ফুল করে সব রোশনাই,
মাঠেদের কানে, ফিসফিস করে নু’য়ে-নু’য়ে পড়ে বন।
আমার জন্য উচুনিচু কিছু নাই,
অথবা কালো বা সাদা,
সেইদিন থেকে, যখন ধবল পোশাকের এক নারী
দেখেছি আমার প্রিয়ের বাহুতে বাঁধা।
(Black or White)

তারার ঝাঁক

রাত্রি এলে
আমি দাঁড়াই সিঁড়িতে আর শুনি
অযুত তারার গুনগুনুনি আমার বাগানটিতে
এবং আমি আঁধারে দাঁড়ানো।
ঐ খশল একটা তারা ঠুং ক’রে!
খালি-পায়ে হাঁটিস না রে ঘাসে;
বাগান ভ’রে আছে ভাঙা-কাচে।
(The Stars)

বুড়ো আংলো

খুদে বুড়োটি গ’নছে ব’সে ডিম।
প্রতিবারেই একটা ডিম কম।
তাকে তোদের সোনা দেখাস নে রে,
বন্ধুরা আমার।
(The Little Old Man)

ফেনা

জীবনের শ্যাম্পেনে
বুদ্বুদ করি পান
হাল্কা ফেনার মতো
শ্যাম্পেনের পরান …

শ্যাম্পেনের নয়ান-
আকাশ ইশারা হানে
শ্যাম্পেনের চরণ-
চলো তারাদের টানে

শ্যাম্পেন-ভূত, হাতে
গেলাস বিলাসে মাতে!
(Foam)

নিটশের সমাধিতে

পাকা শিকারিটা আজ মৃত…
আমি তার গোরটিকে ঢেকে দিই ফুলের ঝালরে….
ঠাণ্ডা পাথরটাকে চুমু খেয়ে বলি:
সুখের চোখের জলে ভেজা, দ্যাখো, এ তোমার প্রথম সন্তান।
একটু ঠাট্টাভরে বসি তোমার কবরে
গালে যেন চড় এক– যেমন দেখেছে স্বপ্নে, চাবু তারও চেয়ে।
হে অদ্ভুত পিত:!
তোমার সন্তানেরা করবে না তোমার মাথা হেট।
তারা আসছে সারা পৃথিবীর থেকে, দেবতার পদাঙ্ক মাড়িয়ে,
চোখ কচলে বলছে তারা : কোথায় এলাম?
না, সত্যিই … এ-ই মোকাম আমার,
এই ভগ্নদশা গোরে আমার পিতার…
ঈশ্বর- অনন্তদৃষ্টি রেখো এই জায়গার উপর।
(At Nietzsche’s Grave)

ষাঁড়

ষাঁড় কোথায়?
আমি লাল-কাপড় এই পালায়।
দেখি না খুন-টগবগ চোখ,
শুনি না দ্রুত এবং আগুনে নিশ্বাস,
কাঁপে কি ক্রুদ্ধ খুরের তলায় রিং-এর জমি?
না।
এ-ষাঁড়ের নাই কোনো শিং; সে যে
রয়েছে দাঁড়িয়ে আস্তাবলে,
চিবিয়ে যাচ্ছে শক্ত খড়।
পৎপৎ উড়ছে হাওয়ায় অনাহত কড়া-লাল কাপড়।
(The Bull)


শিল্পীর ভেংচি

খেলাতখানি-ছাড়া আমার আর-কিছু যে নেই,
আমার এ-লাল নির্ভীকতা-ছাড়া।
আমার এ-লাল নির্ভীকতা রয় অভিযানেই
ব্যস্ত, দিবারাত্রি বল্গাহারা।

বগোল-তলায় এই দোতারা, সম্বল আমার এ যে,
আমার তুখোড় দোতারা-বাদন;
আমার তুখোড় দোতারাটা পথে-পথে বেজে
রাঙায় মানুষ আর পশুদের মন।

এই উঁচু মাথাটি নইলে, আমার সবই মিছে,
এ-উত্তুঙ্গ গর্বটুকু হায়,
এ-উত্তুঙ্গ, গর্বটুকু নেয় বগোলের নীচে
দোতারাটা– এবং চ’লে যায়।
(Grimace d’ Artiste)

কুমারীর মৃত্যু

এই শুদ্ধা কুমারীর আত্মটি বোঝে নি কোনো ভুল,
সবই জানত নিজের বিষয়ে,
তদুপরি জানত সে তো অন্যদের আর সমুদ্রের বাবদেও।
দু’চোখ পিয়াল তার, ঠোট-দু’টি গুঞ্জাফল, হাতগুলি মোমের।
হাঁটু মুড়ে ঘুরে প’ড়ে গেল সে তো মাটিতে মিশিয়ে।
সে চ’লে যাবার পর, দেহটি যে বনে প’ড়ে রয়েছে তা জানল না তো কেউ….
খুঁজেছিল তারা তাকে সমুদ্রপারের কুমারীদের ভিতরে,
শুক্তির ভিতরকার নরম ঝিনুক নিয়ে গাইত যারা গান।
অনেক খুঁজেছে তারা তাকে যত মাতালের মেলে,
মাতত যারা কাজিয়ায় জমিদার-হেঁশেলের ছুরি-চাকু নিয়ে।
দোলনচাঁপার মাঠে তাকে তারা খুঁজেছে অনেক
যেখানে আগের রাত থেকে তার একপাটি চপ্পল ছিল প’ড়ে।
(The Death of the Maiden)

জ্যোতির্বলয়েরা

আমার শক্তি আছে। আমি ডরাই না তো কিছু।
আকাশ আমার কাছে হাল্কা খড়।
দুনিয়াটা ফানা হ’লে তবু-
আমি টিকে থাকব একেশ্বর।
ধরার ঝড়েভরা রাতের ‘পরে
আমার হাল্কা দিগন্তেরা ঠায়।
ভানুমতির থেকে বেরোও, জ্যোতির্বলয়েরা!
অনড়, আমার শক্তি অপেক্ষায়।
(The Fields of Light)

আমার নকল ফুলগুলি

নকল ফুলগুলি আমারঃ
তোমার ঘরে আমি পাঠিয়ে দেব,
আমার পিতলের সিংহগুলিকে
তোমার দরজায় বসাব।
বসব আমি নিজে সিঁড়িতে-
প্রাচ্য পৃথিবীর একটা হৃত মৌক্তিক
বিশাল শহরের ঝ’ড়ো সায়রে।
(My Artificial Flowers)

সৌরজগৎ পেরোতে হয়েছে আমার

পায়দল
সৌরজগৎ পেরোতে হয়েছে আমার
পয়লা সুতাটা খুঁজে পেতে গিয়ে আমার এ-লাল জামার।
নিজেকেও আমি দেখতে পাচ্ছি অবিকল।
আমার হৃদয় ঐ তো ঝুলছে মহাকাশে কোনোখানে,
ধুকপুকে মহাশূন্য কাঁপছে, ছুটতেছে বামে-ডানেঃ
ফুলকি-উল্কা কট্টর আরও কত-না হৃদয় পানে।
(On Foot I Had to Cross the Solar System)

হিমালয়ের ধাপে-ধাপে

হিমালয়ের ধাপে-ধাপে
মহান্ বিষ্ণু ব’সে
স্বপ্ন দেখে যায়

হিমালয়কে ঘিরে-রাখা অনন্ত প্রদোষে।

শ্বেত বস্ত্রে দাঁড়িয়ে কাঁপে
তীর্থযাত্রী, ক্ষুদ্র, এমন বেগুনি আভায়।
সর্বশক্তিমান, হরণ
করো আমার প্রাণ তোমার
এক-পলকের স্বপ্ন-লাগি, স্বামিন!
বারেক জানব তোমার ইচ্ছা–তারপর নাই হয়ে যাব আমি….
(On the Steps of the Himalayas)

মন্তর

কীভাবে গভীরতম হৃদয়ের থেকে আমি বলব তোমাদের?
দেবতারা কী করে তাদের শব্দগুলিকে সাজায়, তাল্কা, আর তবু অপ্রতিহত?
কী প্রকারে বললে পরে মানবিক দুর্বলতা করবে না মাজুল শব্দদের?
এবং আমার ইচ্ছা তোমাদের পাকড়ে ধরে যেন সাঁড়াশিতে
ব্যথা, ভীতি, বা প্রেমের মতো ….
আমার ইচ্ছার কাছে তোমাদের হীনবল ক’রে ফেলতে চাই।
আমি চাই ছিঁড়ে-ছিঁড়ে ছুঁড়ে ফ্যালো তোমাদের হৃৎপিণ্ডগুলিকে,
শয়তানের অধিষ্ঠান হোক তোমাদের হাতে-পায়ে
বুনো ও অমানুষিক, আজীবন বিস্ফোরণময়।
পিশাচেরা,
কী – যে চাই তোমাদের চোখে রাখতে চোখ,
আমার চানুনিতে চাই আমার পুরেপাটা ভ’রে দিতে।
পিশাচেরা, আকাক্সিক্ষত: আমার ক্ষমতাবলে আমি বশ করব তোমাদের?
সেনালি চুলের টোপ তোমাদের সামনে ছুঁড়ে মারি দয়াহীন,
ফিনকি দিয়ে ছুটে যায় আমার রক্তের মোটা ধারা।
তোমরা কি আমার কাছে আসবে, ওগো পাতালের রক্তচোষারা?
(The Charm)

ট্যান্টালাস, ভরহ সুরাহি

এসব কবিতা নাকি? না, এরা চিরকুট শুধু, ছেঁড়া টুকরা-টাকরা,
নানা কেজো কাগজের স্লিপ।
ট্যান্টালাস, ভরহ সুরাহি।
অসম্ভব, ওগো অসম্ভব,
মরার সময় ছুঁড়ে ফেলে যাব আমার চুলের মালাখানি
তোমার অশেষ শূন্যতায়।
(Tantalus, Fill Your Beaker)

কী আমার মাতৃভূমি?

কী আমার মাতৃভূমি? সে কি বহু-দূর, তারা-খাচা
ফিনল্যান্ড? সে যা-ই হোক। চটাল তটের ‘পরে নিচু
পাথর গড়ায়। সেই ধুসর গ্র্যানিটে আমি ঠায়
এক স্থিরতায় যেন। হে স্থিরতা, গোলাপ ও লরেল
ছড়াও আমার পথে। আমি সেই গর্বিত দেবতা
তব দ্বারে। আমি সেই আশীর্ময় অতীত-বিজয়ী।
(What Is My Homeland?)

রূপান্তর

এ কী আশীর্বাদ এই প্রবল হাওয়ায়…..
শাশ্বতের অনন্ত চুম্বন…
কীভাবে রুফান্তরিত হয়েছে জীবন আর হ’য়ে গেছে স্থির,
ভ্রান্তি-জাগানিয়া-রুপে স্থির…
রূপকথার পয়মন্ত রাজকন্যা ওগো,
তোমার হৃদয়ে ঝড়ে তীব্রতর সমুদ্রের ঝড়ের চেয়েও।
এমন হৃদয় কেউ অকারণে বয় নাকি বুকে?
সময়, আমার গান শোনো!
পতিত আত্মারা গায় নরকে যখন এরকম,
কখনও স্বর্গের থেকে ফিরে আসে তার প্রতিধ্বনি।
না হৃদয়, তুমি যাচ্ছ অগ্নিবলয়ের মধ্যে দিয়ে!
আমার দৈবত রূপ–একে কি পারে না ভয় দেখাতে নিয়তি?
আমার হাতছানি পারে অবহেলা করতে খুদে ভাগ্যের ভূতেরা?
আমি যদি ডাকি তবে ভবিষ্যৎ না-এসে কি পারে?
(Metamorphosis)

হে মহান কন্দর্প

মহান কন্দর্প ওহে! তুমি শ্বাস টানো বিবাহের,
কিন্তু কী-প্রকার বিবাহের?
যবে হতে এ-পৃথিবী; কামনা বিবাহে সাধে দু’টি
শরীর; অশনিবাণ পশে নি কোনোই
মানবের ভালে।
ঐ যে ঝলক হানে বিজুলি-চাবুক,
অমিত ক্ষমতা এই অশনিবাণের,
আপন খেয়ালে হায় এ – অশনি মনুষ্যশিশুর শিরে ঝরে।
(Thou Great Eros)

বিজুলি

মেঘে-মোড়া ওগো সৌদামিনী,
যে-নীল বিজুলি দেখেই চিনি,
কবে মেঘ ফেড়ে হবে বাহির?
বাতেনি বিজুলি, হবে জাহির
শুচিকর, ভীম বজ্রসহ-
আমি স’য়ে চলি তব বিরহ।
ন্যাকড়ার মতো দেহটা শো’য়া
যেন কোনো বৈদ্যুতিক ছোঁয়ায়ঃ
চকমকি-দড় হ’য়ে সে পারে
নিজেও বিজুলি চমকাবারে।
(Lightning)

হুশিয়ারি

সকল ঐশ্বর্যের ঐশ্বর্য, আমার শরীর,
কেমন ক’রে জানো কত শক্তি তোমার তাঁবেয়?
আমার বাহু–এর দরকার আছে শতাব্দীর।
আমার বাহু– এর দরকার আছে শতাব্দীর।
আমার হাতে বিজুলি আছে, একদিন জলসাবে।
এর নীল-নীল আলোয় লোকের টাসকি লাগবে মনে।
আমি যাদের অন্যতম, তারাও প্রবল ঢের,
কিন্তু আমি সে-বর্ম যা খুঁজছে জগজ্জনে,
আমিই সে-বিচিটি, এবং সূত্র যোগাযোগের।
(Premonition)

সূর্য

আমি আনন্দময়।

ভোরের বেপরোয়া সূর্য, আমার মুখে জ্বলো, কপালে বুলিয়ে যাও ছোঁয়া।
না, তুমি এরই মধ্যে শুনেছ আমার গর্বিত হৃদয়ের উত্তর।
সূর্যের প্রতিটি আবর্তনে উদ্ধততর হৃদয় আমার।
যেন আমি সৌর পিরিচটিকে নিয়েছিলাম হাতের মুঠায়
তাকে গুঁড়িয়ে ফেলব ব’লে।
যেন পৃথিবীতে এক আকস্মিক অভ্যাগত আমি, পথচলতি ঢুকে পড়েছি চুপিসারে
এক সহসা বিদ্রুপ-বৃষ্টিতে একে জাগিয়ে তুলতে।
ওগো দুর্বিনীততম হৃদয়, বাহুগুলি মেলে ধরো সূর্যের দিকে,
হাঁটু গেড়ে বসো, আর তোমার বুকটাকে ছিঁড়ে সূর্য ঢুকে যাক– সূর্য।
(Sun)

শাহি বাগিচা

আমরা সবাই হাঘর বাউণ্ডুলে
আর আমরা ভাই-বোন।
বস্তা-পিঠে চলি আদুল-গায়ে,
কিন্তু আমাদের তুলনায় শাহ্জাদাদের কীইবা আছে ধন?
হাওয়ায় নিত্যি উড়ে আসে কতই কিমতি চিজ,
সোনার দরেও হয় না তাদের মূল্য নিরূপণ।
বয়স যত বাড়ে আমাদের
ততই পষ্টাপষ্টি বুঝি আমরা যে ভাই-বোন।
সৃষ্টিকে তো আমাদের আর কিছুই দেওয়ার নাই,
আমরা তাকে দিয়েছিলাম আত্মা-সবেধন।
আমার যদি থাকত নিজের এক শাহি বাগিচা
করতাম আমার ভাই-বোনদের সেথায় নিমন্ত্রণ।
প্রতিজনাই ফিরত একটা জবর তোফা-হাতে।
বেঘরেরা করত একটা গোত্রের পত্তন।
আমরা বেড়া তুলে দিতাম বাগানের চৌধারে
বাইরের সব ধমক যাতে ঢুকে প’ড়ে না করে গর্জন।
আমাদের ঐ নীরব বাগিচায়
পৃথিবীকে আমরা দিতাম নোতুন এক জীবন।
(The Great Garden)

বিজুলির সাধ

আমি এক বাজপাখি,
এ-ই আমি করি একরার।
কবি নয়,
কখনোই নয় কিছু-আর।
বলতেকি, ঘৃণা করি আর-সবকিছু।
বাজের ওড়ার পথে পাক খাওয়া-ছাড়া আমি কিছু বুঝি না তো।
কী ঘটনা ঘটে এই বাজের ওড়ায়?
সদা-অভিন্ন, শাশ্বত।
অধীর দোহদে এক বিজুলি আকাশ ফ্যালে চিরে
গোপন পিরিতি-ভরে, যেন জন্মাবে এক নয়া পৃথিবীরে।
(The Lightning’s Yearning)

free counters


5 Responses

  1. hasan shahriar says:

    কবির সময় থেকে কয়েক দশক এগিয়ে ছিলো তার কাব্য ভাবনা- ভাষ্যকারের এই কথাটির সাথে পুরোপুরি একমত। ধন্যবাদ অংকুর সাহা এবং অনুবাদক সুব্রতকে এমন একজন কবির সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য।

  2. Abu Sayeed Obaidullah says:

    সুন্দর আয়োজন। খুব ভালো লাগলো।

  3. Taposh Gayen says:

    অংকুরদা’র চমৎকার একটি ভূমিকার সাথে সুব্রতের অনবদ্য অনুবাদে ফিনল্যান্ডের কবিতায় বাংলার মাটি এবং জলের গন্ধ পাচ্ছি !

  4. শিমুল সালাহ্উদ্দিন says:

    দারুণ…অভিনন্দন, অনেক দিন পর আর্টস একটা কবিতাবিষয়ক ভালো কন্টেন্ট দিলো।

  5. তমসো দীপ says:

    অনুবাদগুলো এমন ক্যানো? এসব প্রাচীন শব্দ আর বাক্যসংগঠনে তো এখন আর কবিতা লেখা সম্ভব নয়! অনুবাদগুলো আরেকটু যত্ন নিয়ে করলে হতো না? তাছাড়া অকারণ আরবি-ফারসি, এমনকি হিন্দিরও প্রভাব চোখে লাগছে। “কিমতি চীজে”র মত শব্দাবলি বাঙলা যে-কোনও কাব্যলিপিতে খুবই দৃষ্টিকটু। এবং “মেঘে মোড়া ওগো সৌদামিনী” পড়ে না হেসে উপায় থাকেনি। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজকে অনুবাদগুলো নিয়ে আরেকবার কাজ করবার অনুরোধ রইলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.