গদ্য, প্রবন্ধ, ব্যক্তিত্ব, স্মৃতি

যখন তার চারদিকে আর কৃত্রিম ‘সাইকোফ্যান্ট দেয়াল’টি থাকবে না তখন আমি তার কাছে যাবো।

anwar_shahadat | 24 Jul , 2012  

শুধু বাংলায় নয় সাড়া পৃথিবীতে এই রাতে অপূর্ব জ্যোৎস্নারা নেমেছে। মাঠ-ঘাটলা-ফসলের ক্ষেত প্লাবনে ভেসে যায় চারদিক! আজ সেই চাহ্নি পসর রাত। আমাদের শহরে (নিউ ইয়র্ক) এটা সবচেয়ে বেশী।

একটা কিছু হয়তো থামে। যদি তা আমরা মেনে নেই। অন্যথায় সব কিছুই চলতে থাকে। আমরা যে ছবি দেখতে যাব বলে ঠিক করেছি তা শুর হওয়ার কথা ২:১৫ তে, সে সময় ঠিক থাকে। ছবি দেখতে যাওয়াও ঠিক থাকে। তখন কেবল অবিশ্বাস্য রকমের সত্য হয়ে থেমে থাকেন হুমায়ুন আহমেদ। আর সব কিছুই চলতে থাকে ও থাকবে এমন কী তার কফিন বহনকারী বিমানটিরও আকাশে উড়বার সময়-ক্ষণ বা কোনও যাত্রী শিশু কেঁদে সেই বিমানে বমি করলে, তার জন্য বিমান হোস্টেসের এগিয়ে দেয়া আন্তরিক ন্যাপকিনও ।
humaun-1.jpg
নিজের মৃত্যু নিয়ে খোলামেলা রোম্যান্টিক ‘কবি’ বাংলাদেশে আর কেউ ছিলেন না, কেবল তিনি। কবি? জেনে বা বুঝে লিখলাম কিনা? বা ভুল কিনা। হোক ভুল। রাইট টু বি রং অধিকারের সুযোগ নিলাম না হয়। তিনি যখন তার মৃত্যু ক্ষণের কথা বলতেন সে জায়গাটায় আমার তাকে কবিই মনে হয়। এই ধারনাটি হয় তার সম্পর্কে আমার ২০০৯-এ। ঢাকায়, তখন সাগর ভাইর সঙ্গে (ফরিদুর রেজা সাগর) দেখা করতে গেলাম, খুব স্বাভাবিকভাবেই তার সঙ্গে আমার এক পর্যায়ে ছবি নিয়ে কথা হবে। তিনি মৃত্তিকাকে বললেন তুমি ওকে আমাদের সাম্প্রতিক কিছু ছবি দিয়ে দাও তো। তার মধ্য দুটো ছবির কথা মনে আছে। একটার পরিচালক কোনও একজন নায়িকা, আর একটির পরিচালক হুমায়ুন আহমেদে। আমি প্রায় দুই দশক পৃথিবী বিখ্যাত ছবি নয় এমন ছবি দেখিনা। কিন্তু এ ছবি দেখলাম। ভাল কী মন্দ সে কথা নয়। আমার আটকালও একটি জায়গায় যেখানে তিনি মৃত্যু বিষয়ক একটি ঘটনা রাখলেন। এস আই টুটুলের একটি গান ব্যাবহার করলেন। কারণ হতে পারে ওই ছবিটি দেখবার দু’এক দিন আগে সুইডিশ পরিচালক ইংমার বার্গম্যান মৃত্যু বরন করেছেন এবং তিনি লিখিত নির্দেশনা দিয়ে গেছেন তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানটি কী ভাবে সাজানো হবে। কী ব্যান্ড, কত সদস্যের ব্যান্ড, কী সঙ্গীত, কোন পথে কফিনসহ কবরে হেটে যাবে আত্মীয়রা। কোন কোন বন্ধু বা আত্মীয়রা উপস্থিত থাকতে পারবেন, খুঁটি-নাটি ইত্যাদি। সে রকম সময় তার ওই ছবিটা আমি দেখে আমার এমনি মনে হয় যে ওটাই হয়তো তার মৃত্যুর শেষকৃত্য নির্দেশনা। তারপর থেকে মনে হয়েছে আমার কোনদিন তার সঙ্গে দেখা হলে আমি এই নিয়ে কথা বলব। দেখা হয়েছে তা এমন এক সময় যখন মৃত্যু নিয়ে কথা বলা অসৌজন্য মনে হয়, গত ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তার সঙ্গে আমার দেখা। আমার মনে হয় তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তার শেষকৃত্য হওয়া উচিৎ ওই নির্দেশনার ভিত্তিতে।

লেখক জগতের কেউ আমি না হলেও আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। প্রথমে পাঠক হিসাবে। পরে ব্যক্তিগত সম্পর্ক হলেও আমি তখন সাংবাদিক, কিন্তু সম্পর্কটায় তার কোনও অস্তিত্ব ছিল না। আর যখন ‘লেখক’ নথিতে আমি নাম লেখালাম তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে ওই অর্থে আর বলা যাবেনা কেবল এই ফেব্রুয়ারিতে। তাও আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কোনও কথা বলবো না। তার চারদিকে এক ধরনের সাইকোফ্যান্ট’রা ঘিরে থাকে তাতে সাধারণ কোন মানুষের পক্ষে পাশে ঘেঁষা সম্ভব নয়। যদিও সে সন্ধ্যা তেমন ছিল না।

৮১ হবে, আমরা যারা এক ধরনের ভাল বলে সামান্য পরিচিত কিন্তু লেখা-পড়া না করে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করতে চাই নকল করে তারা সবাই জড় হলাম বরিশাল হাতেম আলী কলেজে। অতএব আমরা সবাই এক হই মহা উল্লাসে না পড়ে পাশ করবার ব্যবস্থায়। এমন সময় একদিন রিয়াজ (বরিশাল ঢাকা সুরভী লঞ্চের মালিক) আমায় বলল তুই হুমায়ুন আহমদরে পড়েছিস কিনা। ওর সংগ্রহে যত ছিল তা আমার শেষ হয় তখন। আমার টানটা পরে তার মানবিক সূক্ষ্ম অনুভূতি নিয়ে কাজ আর তার উপহাসমূলক রসিকতায়।
humaun-ninit-tm.jpg
হতে পারে আমার সঙ্গে তার পরিচয় ৮৬’র শেষে বা ৮৭র প্রথমে। মনে পরে না আমি কোনোদিন তাকে বলেছি কিনা আমি তাকে পড়েছি। কিন্তু আমার মনে আছে তিনি অনেকদিন বলছেন বিভিন্ন সাংবাদিক ও সাহিত্যিক সম্পর্কে যে অনেকেই আসে আমার সঙ্গে কথা বলতে তার বই না পড়ে বা সামান্য পড়ে। আমার যতদূর মনে পড়ে ৯০ পর্যন্ত তার প্রকাশিত এমন কোনও বই ছিলনা যা তিনি আমাকে নিজের স্বাক্ষর না করে দিয়েছেন। বলতে পারব না কী ভাবে তার এতো স্নেহ-ধন্য হয়েছিলাম । আমি লেখক জগতের কেউ না। কোন জগতেরই কেউ না তবুও একটা ভালবাসা পেয়েছিলাম। এরপর যা হয় আমার নিয়মে নিজেকে ভির থেকে আড়াল করে নেয়া। সেই’ই আমি। তার অসুস্থতার পর দেখি একেবারে একটা শোকের মহা-উল্লাস শুরু হয়েছে, তখনই তিনি না মরলে যেনও ওদের পোষাচ্ছিল না। ওই সব রুচিহীনতা দেখে দেখে আমি বেশ দূরবর্তী শহরে বসত গড়েছি। সেই যেদিন এই ফেব্রুয়ারিতে দেখা হোল আমি কিন্তু জিজ্ঞেস করলাম না আপনি কেমন আছেন? আচ্ছা আমি তাকে কী জিজ্ঞেস করবো? আপনি কেমন আছেন? তাকে কী এই প্রশ্ন করাবার অর্থ নয় যে আচ্ছা হুমায়ুন ভাই আপনি কী তবে শিগগির মরছেন, অর্থাৎ আমরা যখন প্রেডিক্ট করেছি আপনি মরতে পারেন বলে। না কি দেরি হবে? আমরা কী শিগগিরি আপনাকে নিয়ে শোক-নামা লিখে জাতে উঠবার শেষ সুযোগটা পাবনা? না কী দেরী হবে। আমরা জাতি হিসাবে খুব তৎপর। দেরী আমাদের খুব সয়না। আপনার মৃত্যু হলে আমরা শোক সভায় খুব করে কাঁদব কিন্তু। আপনি ভাবতে পারবেন না আপনার জন্য আমার কান্না দেখে উপস্থিতরা কাঁদবে এবং তারপর তালি দেবে। আমি তালি ছাড়া কিভাবে বেঁচে থাকি।

গত দশ বছরে কতবার শহীদ ভাইর (শহীদ কাদরী) সঙ্গে দেখা হয়েছে, আড্ডা হয়েছে, ফোনে কথা হয়েছে , যদিও একেবারে বে-হিসেবী কোন সংখ্যা নয়, পরিমিত নম্বর, হিসেবি। এমন কি হাসপাতালেও বহুবার। আমার তার সঙ্গে দেখা হলে হাসি তামাশার আড্ডা হয়। কিন্তু এর মধ্যে একবারও আজ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করি নাই “শহীদ ভাই কেমন আছেন”। জানিনা তিনি তা খেয়াল করেছেন কিনা। আমি ধারনা করি করেছেন। না করলে কী করবো। আমি তো আর গিয়ে বলবো না যে শহীদ ভাই এই যে আমি জিজ্ঞেস করিনা আপনি কেমন আছেন তার একটা কারণ আছে। কারণ আপনি কেমন আছেন তা জানতে আমার আলাদা করে প্রশ্ন করতে হবে না। আমি তা এমনিতে জানতে পারি। প্রশ্ন না করেই জানতে পারি। কেনও ও কী প্রশ্ন করবো? আপনি কি শিগগিরেই মরছেন? না কী আর একটু দেরি হবে। আমরা আর কতদিন অপেক্ষা করব আপনার মৃত্যু নিয়ে উল্লসিত ক্রন্দন করবো বলে। বিভিন্ন জন এই প্রশ্নটিই করেছেন তার প্রতি সহানুভূতি দেখানোর মাধ্যমে । এই আমার মনে হওয়া। ফলে আমার সঙ্গে যেদিন হুমায়ুন আহমেদের এই ফেব্রুয়ারিতে দেখা হোল, প্রায় একঘণ্টা থাকলাম তার জ্যামাইকার বাসায়, আমি জিজ্ঞেস করলাম না কেমন আছেন? তিনি কেমন আছেন এটা জানতে তাকে আমার প্রশ্ন করতে হবে? আমার মাথায় কি গোবর? আমি কি জানিনা তিনি আমেরিকা কেন? তাকে জিজ্ঞেস করবার কী আছে?

গতকাল সন্ধ্যায় দেখি বিডি নিউজের বন্ধু’র বার্তাঃ প্রিয় আনোয়ার হুমায়ুন আহমেদ সম্পর্কে জানান। আমি গরম ঠাণ্ডা বিয়ারে চুমুক দিয়ে তাকে পাল্টা বার্তা পাঠালাম। ঘুম থেক উঠলে মেসেজ দিবেন। ফোন’এ কথা বলবো। তার মেসেজ না পেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। সকালে উঠে বার্তা পেয়েছি। ফোন করলাম। বললাম, আমি যে লিখবো আমি তো দ্বীপান্তরিত জীবন করি, কারো সঙ্গে যোগাযোগ নেই। বললাম মুক্তধারার বিশ্বজিতের স্ত্রী রুমা সাহা আমার ফেইস বুক বন্ধু, আমি ওকে মেসেজ পাঠিয়ে দেখতে পারি। আপনার কথা বলবো আর আপনিও ওকে যোগাযোগ করবেন প্লিজ। পুরবীদীর কথা বললাম। জ্যোতিদা দিদি হুমায়ুন ভাইর সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ।

অনেক দিন থেকে মনে হচ্ছিল আমার একটা লেখা লিখবার আছে হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে। সেটা এই নয় তিনি সহসা মরবেন বলে। সেটা তার অসুস্থতার অনেক আগেই মনে হয়েছে। তিনি অসুস্থ হলে তা ক্ষান্ত দেই। তার অসুস্থতা নিয়ে আমার একটা উইশ-ফুল থিঙ্কিং ছিল। মনে করেছিলাম তার অবস্থা স্টাবল হবে। রেগুলার চেকিং এর জন্য নিউ ইয়র্কেই থাকতে হবে। সাইকোফ্যান্টরা এক সময় তাদের নগদ প্রাপ্তি সুখ থেকে দূরে সরে যেতে থাকবেন। এই লোকগুলো কমে গেলে আমার তার সঙ্গে যোগাযোগ হওয়ার সম্ভাবনা হতে পারে। তখন আমি আড্ডা দেব। হিউমারের একটা দিকে তার সঙ্গে আমার মিল আছে যে! এইসব নিয়েই হিউমার করা!

রাজু আলাউদ্দিনকে জানাবার পর আমি আর আমরা স্ত্রী সিদ্ধান্ত নিলাম বাইরে সালাদ খেয়ে লাঞ্চ করবো আর এই ফাঁকে হাঁটব। আজ অনেকদিন পর গরমের পর আবহাওয়াটা হাটবার মতন। হাটতে হাঁটতে ওকে হুমায়ুন আহমেদ সম্পর্কে জানালাম; গতকাল মেহের আফরোজ শাওন, জাফর ইকবাল ও মাজহার বিবৃতিতে বলেছেন যে তিনি ভাল আছেন।

বাসায় ফিরে আমি কাউচে শুয়ে পরালাম। আমাদের শোয়া দুইটায় ছবি দেখতে যাওয়ার কথা। “বিস্টস অফ সাউদার্ন ওয়াইল্ড” সর্বাধিক আলোচিত ছবি এই বছরের। তখন পৌনে একটা, আমি আরও কিছুক্ষন অন্তত ঘুমাতে পারব বলে বেডরুমে চলে গেলাম। দেড়টায় মেয়ে ঘুম ভাঙ্গাল -বাবা মুভি দেখতে যাবে না? ওঠো। চোখ খুলে দেখি ওর হাতে একটা মাইক্রোওয়েভে বানানো পপকর্ন। বললাম বাবা, সেকি আমরা না থিয়েটারে যাব; তুমি এখন পপকর্ন খাচ্ছ কেন? আমরা থিয়েটারে খাব। মেয়ে বলল না, সে গুলোতে ফ্যাট বেশি। তখনই কুলদা রায়ের ফোন। মইন চৌধুরীর স্ট্যাটাসে দেখলাম হুমায়ুন আহমেদ মারা গেছেন, একটু খোঁজ নেন। পুরবীদি বা জ্যোতিদাকে ফোন করবার আগে ভাবলাম বদিউজ্জামান খসরু ভাইকে ফোন করি। তিনি বললেন কিছুই জানেন না। জ্যোতিদার ফোন আনসারিং মেশিন’এ গেল। মুক্তধারায় ফোন করলাম, বিশ্বজিত ধরল। বলল এটা গুজব, জাফর ভাই আর ভাবীর সঙ্গে কথা হচ্ছে। আমাকে দশ-বার জন ফোন করেছে। কুলাদাকে ফোন করলাম। বিশ্বজিতের কথা বললাম। ঢাকায় রাজু আলাউদ্দিনকে ফোন করলাম, বললাম বিশ্বজিত এ কথা বলেছে। একটু খারাপই লাগছে, বিডিনিউজ জাতি সঙ্গের স্থায়ী প্রতিনিধি আব্দুল মোমেনকে কোট করেছে। কী করে হয় তিনি অদায়িত্বপূর্ণ কাজ করবেন। এরই মধ্যে ফেসবুকে প্রথম আলোর লিঙ্ক, দেখলাম এখানে মাজহারকে কোট করা। তখন আর আমার সন্দেহ থাকল না। কুলাদা’কে আবার ফোন করলাম, খসরু ভাইকে এবং রাজু আলাউদ্দিনকে জানালাম, মাজহারকে কোট করলে বিশ্বজিত অর্থহীন হয়ে পরে। ব্যাচারা, মৃত্যুর ঘন্টাখানেক পরেও জানতে পারে নি।

৮৭ সালে হুমায়ুন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের ঘটনাটা মনে আছে। তার কারণ অন্য। তখন এরশাদবিরোধী আন্দোলন। বিচিন্তা সম্পাদক মিনার ভাই বললেন আনোয়ার আপনার সঙ্গে হুমায়ুন ভাইর সম্পর্ক আছে, যান তার সঙ্গে একটু কথা বলেন, তিনি রসায়নের শিক্ষক, যদি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হাত-বোমার একটা ফরমুলা পা্ওয়া যায় তবে আন্দোলনে বেশ কাজ দেবে। আমি তার ফজলুল হক হলের বাসায় গেলাম। তিনি শুনে বললেন, আমি যেটা জানি সেটা লিটারেল্লি তাত্ত্বিক। না জেনে তোমাদের ওভাবে কাজটা করা ঠিক হবে না। সেদিনের কথা মনে আছে তিনি আমাকে কিভাবে ড্রিঙ্ক কক্টেল বানাতে হয় সে সম্পর্কে বললেন, যা কিনা তিনি আমেরিকাতে থাকতে শিখেছেন। আমার তখন থেকে সে সবে বেশ আগ্রহ জেগে উঠছে। মনে পড়ে না তিনি কখনও আমাকে বাজিয়ে দেখেছিলেন কিনা যে আমি তার ভক্ত কিনা বা কী। আমি নিজের দিক থেকে কোনদিন তার লেখা সম্পর্কে কিছু বলিনি। সেটা বিনয় থেকে কিন্তু তিনি সেটা বুঝতেন কিনা সে প্রশ্ন নিজেকে করে দেখিনি। কিন্তু এটা জানতাম তিনি আমাকে পছন্দ করেন। সাংবাদিকরা বা তার কিছু ভক্তরা কী উদ্ভট সব আচরণের মাধ্যমে তার সঙ্গে সম্পর্ক করতে চাইত সে সব গল্প তিনি সবসময় আমার সঙ্গে শেয়ার করতেন। হতে পারে তার কারণ হয়তো আমি সাংবাদিক হলেও তার কাছে জীবনে একবার মাত্র একটা প্রশ্ন করেতে গিয়েছিলাম। আর জীবনে যতদিন আমি তার ফজলুল হকের বাসায় গিয়েছি সেটা বন্ধুর মতন। এটা অবাক হওয়ার ব্যাপার আমার কাছে অন্তত। তখনও তিনি অনেক বড় লেখক কিন্তু কীভাবে যেন তার সঙ্গে আমার অনেক ঘনিষ্ঠতা হোল। নোভা তখন হয়তো ফোর্থ গ্রেডে পড়ে, শিলা সেকেন্ড হবে, বিপাশা তখন খুবই ছোট। শিলা আমি গেলে বেশ মজা পেত। বিশেষ করে আমার বরিশালের উচ্চারণে কথা বলা। ও আমাকে ভ্যাঙ্গাত। হুমায়ুন ভাই (আমি তাকে এই বলে ডাকতাম) শীলাকে বলতেন আহ! “এটা করতে নেই!” আমি বরং ওকে আরো বেশি রসদ সরবরাহ করাতাম, আরও বেশি বরিশালের উচ্চারণে কথা বলে। হুমায়ুন ভাই যখন বুঝলেন আমি ওর ওই ভ্যাঙ্গানোয় কিছু মনে করছি না তিনি আর ওকে নিষেধ করতেন না। এগুলো সবি ৮৭ সালের ঘটনা । একদিন ফোন করে বললেন শোন গুলতেকিন তোমাকে আমাদের সঙ্গে এই শুক্রবার (কোনও এক ছুটির দিন হবে, তাই ধরে নিচ্ছি শুক্রবার হতে পারে) এসে খেতে বলেছে। তুমি মিনারকে বল, আমিও ওকে বলব। কতসব খাবার সেদিন। আমার ঢাকায় কোনও আত্মীয় নেই, বাইরে বা নিজে ডাল ও আলুভর্তা খাওয়া লোক। কারণটা জানলাম আমি কেন দাওয়াত পেয়েছিলাম তখন খেতে গিয়ে। হুমায়ুন ভাই’ই বললেন। কে না জানে তার রসিকতা; সেভাবেই বললেন, শোন গুলতেকিন দাওয়াত দেয়ার ব্যাপারে রক্ষণশীল। সহসা কেউ কোয়ালিফাই করেনা। আর তুমি বরিশালের লোক! তুমি কোয়ালিফাই করেছো মেয়েরা তোমাকে এতো পছন্দ করে বলে। সেটুকু আমার অসম্ভব সুন্দর সংরক্ষণ। ৮৮’র ফেব্রুয়ারিতে আমার স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয়। ফলে আমার সময় কমে যায়। বিচিত্রায় চাকরী, মাস্টার্স পরীক্ষা এই সব নিয়ে (এর অর্থ এই নয় আমি কোনোদিন পড়াশুনা করেছি), কিন্তু একটা সময় বরাদ্দ থাকবে বলে হয়তো আমার সঙ্গে তার যোগাযোগ কমে যায়। তাও অনেকদিন মনে পড়ে আমি আর আমার স্ত্রী রীতা অনেক দিন তাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়েছি। সব মনে নেই, দু’দিনের দু’টো কথা মনে আছে। ওকেসহ যেদিন আমি প্রথম গিয়েছি বললেন, “বাহ, তোমাদের দেখে তো বেশ ভাল লাগছে। এইভাবে তোমাদের ঘুরতে দেখে মনে হয় কিছু একটা মিস করছি”। রীতা ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী শুনে মনে হোল তার ভালই লেগেছে। আর একদিন তার বাসায় আমাদের দুজনকে পেয়ে তার সদরঘাটে রাত যাপন করা, মধ্যরাত-দর্শন অভিজ্ঞতার কথা বললেন। হতে পারে আমার সঙ্গে সদরঘাটের একটা সম্পর্ক, সে কারণে হয়তো ওই গল্পটি বললেন। সেই গল্পে যে জিনিষটির উপর জোর দিলেন তা হলো ওই মানুষগুলো খুব দুঃখ-কষ্টে রাত কাটায়। তার সেই ভাবনাটা ভুল ছিল বলে তার ধারনা হয় ওই মধ্যরাতে সদরঘাট টার্মিনাল ভ্রমণের পর।
humayun.jpg
আমার সঙ্গে যোগাযোগ আরও কমতে থাকে। এরই মধ্যে একদিন আমি ও আমার বউ (ততদিনে আমরা বিয়ে করেছি) ওর ডিপার্টমেন্টের দিকে দেখি গুলতেকিন (আমি তাকে ভাবী ডাকতাম, জানিনা সেই সম্বোধন এখন লেখা সমীচীন হবে কিনা, আমি আবার তার অফিসিয়াল নামও জানিনা)। তখন আমরা অবাক হলে তিনি আমাদের জানালেন তার ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হওয়ার কথা। বললেন “তোমরা বাসায় এসো”। এখন মনে পরছে যে আমরা দু’জন এরপরও একদিন তাদের বাসায় গিয়েছি কেননা মনে পরে হুমায়ুন ভাই আমাদেরকে রসিয়ে গল্প বলছিলেন তার ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে যাওয়া ও সেখানে কী কী হল। এরপরও আরও অন্তত আমরা দু’বার তাদের বাসায় গিয়েছি বলে মনে পরে। তিনি রীতার দু’বছর না জানি তিন বছর জুনিয়র হলেন এবং রীতা তার সব নোটগুলো গুলতেকিনকে দিল। আমরা ৯২ পর্যন্ত দেশে ছিলাম। এর মধ্যে অবশ্য আর একবার হুমায়ুন ভাইর সংগে আমার দেখা হল, ধারনা করি সেটা ৯০তে। ৮৯তে আমার উপর মৌলবাদীদের আক্রমণ ও সরকারের আমার পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া’র ফলে আমি বেকার হয়ে পরি অল্প বয়সে দ্বিতীয় বারের মতন। ফলে আমি যখন আমার কর্মসংস্থানের নামে পত্রিকাটা (আসে দিন যায়) ছাড়বার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট দপ্তরে লবিং (হয়তো তদবির শব্দটি আরও জুতসই হবে এক্ষেত্রে) করতে থাকি তখন আমাকে তিন ধরনের প্রস্তাব করা হয়েছিল সৌদি চাপে পত্রিকা ছাড়া যাবে না তথ্য জানিয়ে। এক. আমি পথকলি ট্রাস্টের মেম্বার হতে পারি বেতন ভাতাদি ও অপরাপর সুযোগ-সুবিধা সহ। দুই. নিউইয়র্কসহ ইউরোপের কোথাও প্রেস কোর’এ চাকরি নিতে পারি (এটা হয়তো আমি বিবেচনা করতাম কিন্তু আমার স্ত্রী তখন অনার্স পরীক্ষার্থী)। তিন. আমি প্রেসিডেন্টের প্রেস ডিপার্টমেন্টে যোগ দিতে পারি তোয়াব খানের অধীনে (আমি তাকে স্যার সম্বোধন করতাম, আমাকে তিনি স্নেহ করতেন)। আমি এই অপশনে একধরনের সাড়া দিতে চাইলাম। প্রথম দিনই তোয়াব খান আমাকে তার ডেপুটিদের সংগে একটা মিটিঙে যোগ দিতে বললেন যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় টিম আসবে প্রেসিডেন্টের সংগে দেখা করতে। সেই টিমে হুমায়ুন আহমেদ, তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডেকেট সদস্য। আমাকে দেখে বললেনঃ সে কী! তুমি এইখানে? ওই রকম একটি জায়গায় কথা না বলে বললাম “পরে বলব আপনাকে”। এটা যদি ৯০ সালের কথা হয় তবে তিনি তার ২২ বছর পরও কিন্তু ঠিক একই রকম করে বললেন “তুমি এইখানে”(এটা তার নিউইয়র্কের জ্যামাইকার বাসায়, এই ফেব্রুয়ারীতে)! ৯৪ সালে তিনি নিউ জার্সি বাংলাদেশ সম্মেলনে এসেছিলেন, সেবার দেখা হল, খুব সামান্য কথাবার্তা একদিন হোটেল লবিতে। নুহাস কোলে গুলতেকিনের। গত বছর পুরনো দিনের ছবি দেখতে গিয়ে দেখি আমার কাছে সেই দিনের ছবিগুলো আছে। এমনকি তার পরেরদিন একটি সাহিত্য সেমিনারে আমি হুমায়ুন ভাইর পাশে বসা একজন হিসাবে। আমার লজ্জাই লেগেছে সেই ছবি দেখে। আমি তখনো কোন একটি গল্পও লিখিনি অথচ সাহিত্য সেমিনারে গিয়ে বসেছি! তাও হুমায়ুন আহমেদের পাশে! যদিও মনে আছে তিনি বললেন তোমার বিষয়টা সুন্দর।

এরপরে আমি দূরে সরে যেতে থাকি সব কিছু থেকে হয়তো। আবার মরণ তাড়নাও হয়তো, না হলে সকল লজ্জা খুইয়ে গল্প লিখতে যাব কেন? হুমায়ুন আহমেদ হয়তো এরপর প্রতি বছরই আসতে থাকেন আমেরিকায়। কিন্তু আমার সংগে দেখা হয়না। কখনো হয়তো সংবাদগুলো জানি। ততদিনে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার পক্ষে আমার ঢাকা জীবনকালে পূর্ব-বন্ধুত্ব রয়েছে এমন কারো পাশে যাওয়া সম্ভব না। সাইকোফ্যান্টরা একটা দেয়াল গড়ে দেয়। সে দেয়াল আমি ভাঙব কেন? আমি কারো বা কোনও দেয়াল ভাঙ্গার লোক নই। কস্মিন কালেও না। ফলে তিনি তার দেয়ালে থাকেন আমি আমার মুক্ততায়। আমার কিন্তু মনে হয় হুমায়ুন ভাই যদি জানতেন তার কাছে চেনা কেউ নয় ‘আনোয়ার’ অফিসিয়ালি চলচ্চিত্র নির্মাণ শিখেছে। ক’টি গল্পও লিখছে, যা লিখে আবার খুব লজ্জিত নয়। মন্দ হতোনা এই নিয়ে আমাদের কথা হলে। মনে হয় ২০০১ এ মুক্তধারার মেলায় আমি দেখেছি তিনি স্টলে বসে আছেন, অটোগ্রাফ দিচ্ছেন। আমি তাকে দেখে আরে গেলাম না। মনে হল, ধ্যাত অত বড় দেয়াল ভেঙ্গে হ্যালো বলার কোন মানে হয় না। সুতরাং তার অসুস্থ হওয়ার খবর অন্য যে কোনও দূরবর্তী পাঠকের মতোই আমিও অনুসরণ করি। ফেইসবুকের কারণে তার লেখার লিঙ্ক পাই ও পড়ি। ওইভাবে আমি তার অন্যান্য যেকোনো ভক্তদের মতন খবর পাই।
419826_241243725968017_907110372_n.jpg
গত নভেম্বরে আমার ফিল্ম “কারিগর” (The Circumciser)-এর কাজ শেষ হলে আমার বউ বলল দিদি-দাদা (পুরবী বসু, জ্যোতি প্রকাশ দত্ত) শিগগিরই নিউ ইয়র্কে আসবে, তুমি কিন্তু তাদেরকে ছবি দেখাচ্ছ। তার এই দাবীর কারণ আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি কাউকে ছবি দেখাব না ব্যক্তিগত উদ্যোগে। আমি আরও চার বন্ধুকে বললাম। আলী আনোয়ার ভাই, নিনি ওয়াহেদ, কৌশিক আহমেদ, নসরত শাহ আযাদ। দাদা-দিদি পৌঁছাবার পর কৌশিক আহমেদের সংগে তাদের কথোপকথনে বুঝলাম তারা হুমায়ুন আহমেদের বাসা থেকে এসেছেন। ছবি দেখা শেষ হলে আমি যখন তাদের বিদায় জানাতে বাইরে নামলাম, দাদা গাড়ী পার্কিং পেয়েছেন একটু দূরে, তাদের সংগে হেটে যেতে আমি জিজ্ঞেস করলাম আপনারা হুমায়ুন ভাইর বাসা থেকে এসেছেন? আমি হুইস্কি খেইয়েছিলাম, হতে পারে ইমোশনাল ছিলাম, না হলে আমার ওভাবে জিজ্ঞেস করবার কথা নয়। দিদি বলল, হ্যাঁ। দিদি আরও জানাল ওরা থাকতে বলেছিল কিন্তু বললাম আনোয়ারের ওখানে যাচ্ছি। আমি জানি সেইটুকু খোঁজ নিয়েছিলাম আবেগ থেকে। সে রকম সময় একদিন দিদি ডেনভার থেকে ফোন করলেন “আনোয়ার, আপনারা কোথা থেকে লাইভ চিকেন কেনেন?” বলার পরে দিদি নিজেই আমাকে এই তথ্য জানালেন; ‘হুমায়ুনের সেকেন্ড (অথবা থার্ড) কেমোর পর রুচিটা ভাল নেই, আমি বলেছি লাইভ চিকেন খেতে ভাল লাগতে পারে”। আমি বললাম দিদি এমন যদি হয় এ সব ক্ষেত্রে আমি কোনও কাজে লাগি বলবেন। নভেম্বর-ডিসেম্বর’এ এক মাসের জন্য আমি আবার ঢাকা গেলাম। আমার ছবির কাজে। ফিরে আসার কিছুদিন পর পুরবী দি আবার নিউ ইয়র্ক হয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন, সেটা হবে ফেব্রুয়ারী’র প্রথম কী দ্বিতীয় সপ্তাহে, তিনি বই মেলা ধরবেন এবং অন্য কিছু প্রোগ্রামও হয়তো। তাকে বললাম দিদি আপনার এয়ারপোর্টে যাওয়ার ট্রিপটা আমি দিতে পারি। আমি জানতাম না দিদি আসলে হুমায়ুন আহমেদের বাসায় থাকেন। তিনি দুপুরে ফোন করে বললেন আপনি বিকালে আসুন আমি হুমায়ুনের বাসায় আছি। আমি বাসা খুঁজে উপরে উঠলাম, উদ্দেশ্য হুমায়ুন ভাইর সংগে দেখা করা। আমি তার বাসার অবস্থা সম্পর্কে জানি তার লেখা থেকে। দিদি হয়তো বলেন নি আমি যেতে পারি। লিভিং রুমে দেখি সবাই বসা। হুমায়ুন ভাই, তার স্ত্রী মেহের আফরোজ, হাসান ফেরদৌস, রানু ফেরদৌস, মাজহার সাহেব, দিদি। আমি লিভিং রুম অ্যাপ্রোচ করতেই হুমায়ুন ভাই বললেন “তুমি? এইখানে?” এর হয়তো কোনও উত্তর হয়না। তবুও তো একটা উত্তর থাকতে হয় যেহেতু তিনি জিজ্ঞেস করেছেন। আমি বললাম “আপনার সংগে দেখা করতে এসেছি”। দিদি বললেন “দেখেন হুমায়ুন, আনোয়ার আপনার সংগে দেখা করতে এসেছে” । জানিনা এর আগে পরে কী কথা হচ্ছিল। আমাকে দেখে হুমায়ুন ভাই’র চোখে মুখে বেশ কৌতূহল দেখলাম। মনে হল আমার চেয়ে অপ্রত্যাশিত আর কেউ হয়তো এমন তার সংগে দেখা করতে যায়নি এবং আমি তার ২৫ বছর আগের পূর্ব পরিচিত। কিন্তু যোগাযোগহীন। আবার এমনও নয় যে আমি বিখ্যাত কেউ যে আমার নাম সে হর-হামেশা বা কদাচিৎ শুনে থাকবেন যে আমার স্মৃতিটা তার মনে থাকবার কথা।

আমার ঠিকই সন্দেহ হলো তিনি আমাকে চিনতে পেরেছেন কিনা। হুমায়ুন ভাই আমাকে বসতে বললেন। সেখানে বসার যে সেটিং তাতে বসার একমাত্র শূন্য জায়গা সে সোফাটিতে তার স্ত্রী মেহের আফরোজ বসা। আমি সেখানেই বসলাম। হুমায়ুন ভাই’র চোখে মুখে আমাকে নিয়ে দেখি প্রশ্ন। আমার মনে হচ্ছে তিনি আমাকে নিয়ে স্মৃতি স্মরণ করতে পেরেছেন কিন্তু পরিষ্কার নয় ফলে তিনি সেটা কভার করতে চাচ্ছেন বলে আমার মনে হল। আমার অসম্ভব লজ্জা লাগছে। আমি কোনোদিন কোন মানুষের বিরক্তির কারণ হতে পারি এ ভাবনা আমাকে মানুষ থেকে দূরেই ঠেলে ক্রমাগত। তার এই দেয়ালে ঢুকে পরা আমার জন্য একটা যুদ্ধই। তাকে দেখতে তেমন রোগা মনে হল না। শুধু চুলগুলো পাতলা মনে হল। ছাপার একটি লুঙ্গি উঁচু কোমরে পরা ও একটি হাফ শার্ট গায়ে। তার চোখে ওই কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন “তোমার এ দেশে কতদিন হল?” এই প্রশ্নে আমি নিশ্চিত যে তিনি আমাকে নিয়ে নিজের সঙ্গে সমঝোতা করছেন। নিজেই পরীক্ষা দিচ্ছেন হয়তো নিজের কাছে যে তিনি আমাকে চিনেছেন এবং সেই চেনার ভিত্তিতে তিনি আমার সংগে কথা বলছেন। অবশ্য আমাকে তুমি সম্বোধনের মধ্যেই আমাকে চিনতে পারবার কথা ঘোষণা হয়। আমি তার প্রশ্নের উত্তরে বললাম তা প্রায় বিশ বছর। তিনি এমনভাবে এর রিপিট করলেন যেন আমি বুঝতে পারি যে তিনি আমাকে স্মরণ করাচ্ছেন যে তোমার এদেশে আসার সময় পর্যন্ত মনে আছে। তার এই আচরণ আমার জন্য স্বস্তির কারণ হ্ওয়ায় আমাকে তার কাছে পরিচিত করতে আর একটা যুদ্ধ করতে হলনা।

পুরবীদি আমার জন্য একটা বই এনেছেন ডেনভার থেকে। বইটার লেখক প্যাট বুখানন, রেকনিং আমেরিকা। সেই বইটা কোথাও রেখেছিলেন তার উপর চা বা কফি পরেছে। তিনি বইটা আনলেন এবং ওই কফি পরে বইটার যে অবস্থা হয়েছে তা নিয়ে কথা বলছিলেন। ওখানকার সকল আলোচনা ছাপিয়ে এখন সেটাই প্রধান হল। আমি বললাম “দিদি ঠিক আছে, পড়তে তো আর কোন অসুবিধা হবে না”। আমি হুমায়ুন ভাইর কথার দিকেই আগ্রহী হতে চাইলাম। প্যাট বুখানন রক্ষণশীল রাজনীতির কমেন্টেটর। আমি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকার রক্ষণশীল রাজনীতিটা অনুসরণ করছি। জানিনা দিদি সেটা মাথায় রেখেই আমার জন্য বইটা কিনেছেন কিনা। বইটা আমার ব্যাগ অথবা ওভার কোটের পকেটে রেখে দিয়ে বিষয়টাকে আড়াল করতে চাইলাম। হুমায়ুন ভাই আবারও অবাককরা প্রকাশ ভঙ্গীতে প্রশ্ন করলেন “তোমার বিশ বছর হয়ে গেল”? আমি খুব অবাক হয়েছি তা বলবো না তবে নোটিস করলাম তিনি আমার পরিবারের কোন প্রশ্ন করলেন না। আমার বউকে তিনি চিনতেন। কোন প্রশ্নই করলেন না। হুমায়ুন ভাই’র মানবিক ব্যাপারে আমার জানা আছে, সে তার বই থেকেই। তাই অবাক হলাম। আবারও প্রশ্ন এলো তিনি সত্যি আমাকে চিনেছেন কিনা। অতএব সিদ্ধান্ত আমার আগেই যে আমি নিজে কোন কথা ভলান্টিয়ার করবো না। তার লেখায় ওই যে তার চারপাশের মানুষ জন নিয়ে যে তার উপহাসমূলক রসিকতা তা আমার খুব পছন্দ নয়। সে কারণে আমার ওই অবস্থান যে আমি তার কোন রসের উপকরণ হবো না। পুরবীদি এব্যাপারে না জেনে আমাকে সাহায্যটি করলেন। বললেন, আনোয়ার আমার ফোন থেকে একটু জয়ীষা ও দীপনের টেক্সটগুলো ডিলিট করে দেন ওরা টেক্সট ছাড়া কথা বলেনা। আমি সে কাজেই লেগে গেলাম। দিদিকে বললাম আপনি রেডি কিনা। হ্যাঁ রেডি, চলেন বলেও আমরা উঠছিলাম না। আমি মহা মনযোগী দিদি’র ফোনের কাজ করতে থাকি। আমার ধারনা আমার এই নিশ্চুপ অবস্থাটা কোথাও একটু অস্বস্তিকর পরিস্থিতি হতে পারে। কেননা আমি যা হওয়ার কথা তা করছিনা। যে, হুমায়ুন ভাই, আপনে কবে নাগাদ মরবেন বলে ধারনা করেন? মরতে কিন্তু দেবো না্, আপনে কিন্তু আরও তিন’শ বছর বাঁচতে হইবে কিন্তু; ইত্যাদি জাতীয় স্টুপিড কথা আর কি। আমি কোনদিন কোনও অসুস্থ লোককে প্রশ্ন করিনা যে কেমন আছেন। সম্ভাব্য জীবনাবসান প্রসঙ্গে কথা বলে সেই নিয়ে ‘সেলিব্রেট’ করাকে আমার কাছে রুচিহীন মনে হয়। আমার ধারনা হয় হুমায়ুন ভাই আমার আউট-ফিটের দিকে দু’একবার তাকাচ্ছেন। হুমায়ুন ভাই আবার আমাকে প্রশ্ন করলেন “দেশে যাও”? আমি বললাম হ্যাঁ যাই মাঝে মধ্যে। “ফিরে যাবে”? এই প্রশ্ন ছিল তারপর পরই। কী জানি কেন তিনি আমাকে এ প্রশ্ন করলেন। আমি ঢুকে যখন তাকে সালাম দিয়েছিলাম আমার মাথার হ্যাট খুলে নিয়েছিলাম। সে হ্যাট আবার যথাস্থানে বসিয়ে দিয়েছিলাম। আমি তার সংগে আই কন্টাক্ট এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। এবার হয়তো আর একবার আমার মাথার পেঙ্গুইনের হ্যাটটায় গালের উপর দিয়ে ফ্ল্যাপ ধরে একটু চোখ-ঢাকার দিকে নামিয়ে দিলাম কেননা আমার কাছে হ্যাট এক ধরনের মুখোশ, এটা মাথায় চেপে যেমন আড়ালে থাকা যায় আবার আড়াল থেকে কথাও বলা যায়। আমি ভাঙ্গিয়ে বলতে পারতাম এই ফিরে যাওয়া নিয়ে। আমি জানতাম আমার উত্তরে তিনি অবাক হবেন কেননা আমি তাড়িত আবেগ থেকে কথা বলিনা, উত্তর দিলাম, “না”। আমি বলতে পারতাম- “না, ফিরে যাবনা”। তা করলাম না, কেননা আমি তাকে আমার একটি গল্পের মধ্য রাখতে চাইলাম কথা না ভাঙ্গিয়ে। মনে হল তিনি অবাক হলেন। তার কারণ হতে পারে তিনি আজ পর্যন্ত এমন লোক খুব একটা পান নি যারা ‘ফিরে যাবনা’ বলে না। হতে পারে তিনি হয়তো এমন সব লোকজনকে ঘৃণা না করলেও পছন্দ করেন না। আমি সেই রিস্ক নেবারই লোক। নিলামও। তিনি আমার দিকে তার গল্পের কোনও এক চরিত্রের মতন অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলেন। বললেন “যাবেনা”? আমি আবারও নিশ্চিত করলাম “মনে হয়না”। মাথা নাড়লেন কোন কথা শোনবার অর্থহীন সম্মতি-অসম্মতির মাঝামাঝি একটি জায়গা থেকে। আমি জানি তিনি অসম্ভব তীক্ষ্ণ আই কিউর লোক। তিনি আর কিছু বলবেন না। আমার কিন্তু মনে হল তিনি আমার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলেন। এর পর প্রসঙ্গ এদিক ওদিক গেল। ছেলে দুটো তার কাছে ঘুরে-ফিরে আসছিল। আমিই সম্ভবত ওদের কাছে অপরিচিত ফলে বাবার কাছে এসে আমি ওদের অস্বস্তির কারণ দেখতে পাই। বড় ছেলেটি ফ্লোরে কিছু একটা আঁকছিল। ওর ওই এ্যাকশন থেকেই হয়তো হুমায়ুন ভাইর পেইন্টিং এর প্রসঙ্গটা এলো। তার স্ত্রী এই সময় আমাদের জানালেন অনেকদিন থেকে আবার পেইন্টিং করছে না। এও বললেন, শখ করে ৩০০ (একটা তুলনামূলক বড় সংখ্যা মনে পরে বলেছিলেন) ডলার দিয়ে ব্রাশ আর পেইন্টিং এর জিনিশ পত্র কিনলাম আর এখন বসছে না। আমি বেশ মজা পেলাম। তিনি এই প্রসঙ্গে দোকানে ব্রাশ কেনার গল্প বলেনঃ সেলস পারসন বোঝাচ্ছিলেন অমুক ব্রাশটি কেন এত দাম, এটা দিয়ে কী কত নিখুঁত ভাবে ছবি আকার স্ট্রোক করা যায়। তিনি সেলস পারসন’কে কেজুয়ালি বলেন- ভাই পৃথিবীর সেরা ছবির সময় তো এই ব্রাশ আবিষ্কার হয়নি, তারা কেমন করে তবে অমন সব ছবি আঁকলেন। তিনি আরও একটি গল্প বললেন চায়নায় মেলায় গিয়ে ইচ্ছে করে এক ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ানের (সর্সারার) খপ্পরে পরলেন তাকে বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝে থেকে। আমি বললাম আপনি জেনেই করলেন? তিনি বললেন “হ্যাঁ, এর মধ্যে একটা আনন্দ আছে না?”। এক পর্যায়ে তিনি উঠে গিয়ে তার সম্প্রতি আঁকা কয়েকটি ছবি নিয়ে এলেন, আমাদের দেখালেন। বললেন শেষ করিনি। সেটা অবশ্য আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম।

আমাদের যাওয়ার সময় হয়। আমার খুব একটা অস্বস্তি থেকে যায়। হাসান ফেরদৌস, পুরবীদি, বা হুমায়ুন ভাই কেউই আমাকে তার স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন এর সংগে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। খুব সাধারণ সৌজন্যতা ছিল, হয়তো হুমায়ুন ভাইর আমার প্রতি আন্তরিক আচরণ দেখে সবাই ধরে নিয়েছিল যে আমাদের পরিচয় আছে। তাদের যখন বিয়ে হয় আমার স্ত্রী একদিন ঢাকার মেজাজের সংগে তার অস্বস্তির কথা প্রকাশ করলে আমি আমার মত প্রকাশ করলাম। আমাদের সংগে গুলতেকিন, নোভা, শিলা, বিপাশা’র সংগে পরিচয় ও অন্তরের একটি টান থাকলেও মনে করি একটি মিথ্যে বিয়ে টিকিয়ে রাখবার অসততার চাইতে বিয়েটি ভাঙ্গা অনেক সততার কাজ। এটা একটা সংস্কৃতি, ঢাকায় যে, বিয়ে টিকিয়ে রাখা। যেন প্রয়োজনে লাম্পট্য গ্রহণযোগ্য বিয়ে ভাঙ্গার চাইতে। একদিন ঢাকা হয়তো তাদের এই ভুল বুঝবে। হুমায়ুন আহমেদ নিজেও সংস্কৃতির ওই সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন নি অপরাপর বিষয়ে। এটা তার ব্যক্তিগত নয় বলে আমার ধারনা, এটা আমাদের সাংস্কৃতিক। তার কোনো লেখায় কী আছে যে মা-বাবার বিয়ে ভাঙলে সন্তানরা কোনও পক্ষ না নিয়ে দুজনের সংগেই সুসম্পর্ক রেখেছে? সুতরাং তার মেয়েরা বা ছেলে তাদের মায়ের পক্ষ নিলে তিনিও দায়ী করতে পারেন না। মার্চে আমি যখন আবারো ঢাকায় তখনই সম্ভবত তিনি তার মেয়েদের বিরুদ্ধে একটা লেখা লিখেছিলেন। আমার খুব অস্বস্তি লাগল। এক বন্ধুর সংগে দেখা হলে তিনি জানতে চাইলেন আমি ওই লেখাটা পরেছি কী না এবং আমার মত কী। আমি বললাম আপনারও মেয়ে আছে এবং বিরোধিতার কোন পর্যায়ে গেলে আপনি ওই রকম একটি লেখা লিখবেন আপনার মেয়ের বিরুদ্ধে? তিনি বললেন, কোনদিন না। তিনি যত ক্ষুব্ধই হয়ে থাকেন না কেন ব্যাপারটা সংবরণ করতে পারতেন। এরপর তার স্ত্রী থামাতে পারত। এরপর ছিল যারা লেখাটি ছেপেছে তারা তাকে স্মরণ করাতে পারতেন।

চলচ্চিত্রের কথা উঠেছিল, সম্ভবত হাসান ফেরদৌস আমাকে ওই বিষয়ে কিছু একটা বলেছিল সেখান থেকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন আমি শার্লক হোমস ছবিটা দেখেছি কি না? কেমন লেগেছে? আমি না বললাম।

আমি যখন লিভিং রুম ছেড়ে অর্ধেক পথ এসেছি বাইরে বেরুবার জন্য তিনি পেছন থেকে ডাকলেন। জানি না তিনি আমার নাম ধরে ডাকলেন কিনা। কিন্তু ডাকলেন আমি আবার পেছন ফিরে তাকালাম, বললেন “শোনো তোমার শার্লক হোমসের লুকটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে; খুব সুন্দর”। আমি তার দিকে ফিরে আর একবার আমার হ্যাট খুললাম, মাথা নুইয়ে বিনয় (বাও) প্রকাশ করলাম।

উপহাস তার প্রধান শক্তির জায়গা, মনে হয়নি তা নয় যে সেটা উপহাস কিনা আমার পোশাক ও শার্লক হোমস রেফারেন্স। মনে এ প্রশ্ন থাকলেও আমি তাকে বিশ্বাসই করে নিয়েছি। এখন দেখি তার মাথায় সব সময়ই হ্যাট থাকতো। ইস কী গরমের মধ্যে কালো উলের একটা হ্যাট পরা অসমন্বিত কন্ট্রাস্ট’-এর ছবিগুলো থাকবে। তার ওই হ্যাট পরা ছবি দেখে এখন আর মনে হয় না যে তিনি কোনও ক্রমে ওই কথা আমাকে বলেছিলেন উপহাস বা রসিকতা করে।

বলে রাখি, আমি ইচ্ছা রাখলাম আমি আরও একদিন তার কাছে গিয়ে হ্যাট খুলব ঢাকাতে। যখন তার চারদিকে আর কৃত্রিম ‘সাইকোফ্যান্ট দেয়াল’টি থাকবে না, তখন আমি তার কাছে যাবো সে কোন দেয়াল আটকায়?

free counters


10 Responses

  1. কুলদা রায় says:

    লেখাটি গুরুত্বপূর্ণ। হুমায়ুনকে ভিন্ন আলোতে দেখা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল–হুমায়ুনের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে যে বাঙ্গালীপনা জেগেছে–সেটার একটি যুতসই জবাব এখানে আছে।
    এবং যথারীতি সাইকওফ্যান্টদের বিষয়ে তীর্যক আলোকপাত। ধন্যবাদ লেখাটির জন্য।

  2. azad humayoun says:

    কৃলদা রায় প্রতিক্রিযায় লিখেছেন, দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে ” বাঙালিপনা” প্রথমত: বাঙালিপনাও দেখাবে। দ্বিতীয়ত: তিনি(হুমায়ুন আহমেদ)এত জনপ্রিয় তাঁর সৃস্টিকর্মে বাঙালিপনার জন্য। তৃতীয়ত. দ্বিতীয় বিয়ে নয়, নৈতিকতা- মেয়ের বন্ধুর সাথে বিবাহপুর্ব এবং বিবাহ উত্তর——–। আর বাঙালিপনা না দেখানোর ”আধুনিকতা”
    সে দিনটি মনে হয় শেষ হয়ে এল।

  3. aysa jhorna says:

    ভাল হয়েছে লেখাটা। ক্লোজড স্মৃতিচারণ বাট নট বায়াসড।

  4. maruf raihan says:

    Well written. Like a story.

  5. চমৎকার গদ্যশৈলীর লেখাটা ভালো লাগল।
    হুমায়ুন আহমেদের সাথে সাথে আপনার রহস্যময়তাও ফুটে উঠল।

  6. Afrina Hasan says:

    Thanks to Mr. Azad Humayoun. I agree with u

  7. Abu Taher says:

    আবার হুমায়ুন আহমেদের চতুর্দিক পরিবেষ্টিত “সাইকোফ্যান্ট” বা নির্লজ্জ চাটুকারদের কথা লিখে তিনি ক্রমাগত দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন | পুরনো পরিচয়ের সুত্র ধরে হুমায়ুন আহমেদের কাছে নিজেকে লেখক এবং চিত্রনির্মাতার নতুন পরিচয়ে পরিচিত করিয়ে দেয়ার অদম্য ইচ্ছেটা পূরণ করতে না পারায় তার দীর্ঘশ্বাসটি খুব-ই প্রকট | উনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, এ-দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ হুমায়ুন আহমেদ কবরে শুয়েও শুনতে পাবেন | হুমায়ুন আহমেদের চারপাশে সাইকোফ্যানটদের যে ঘৃণ্য দেয়ালের কথা তিনি বারবার ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে লিখেছেন, সেই বিষয়টি একজন সাইকোলজিস্টের কাছে রীতিমত গবেষনার বিষয়বস্তু হতে পারে |

    উনি নিজেকে খুব সংবেদনশীল হিসেবে তুলে ধরতে গিয়ে রুচিহীন বাঙ্গালীকে বোঝাতে চাইছেন যে, অসুস্থ মানুষকে, ‘আপনি কেমন আছেন? এ-কথা জিগ্গেস করার অর্থ হলো, ‘আপনি কবে মরবেন?’ তা ওনার এই সংবেদনশীল নতুন থিওরীটি কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই শেখা ? কে জানে ! ওদেশে মনে হয় অসুস্থ মানুষকে কেউ প্রশ্ন করে না, “How are you?” অথবা “How are you doing ?” উনি-ই ভালো বলতে পারবেন, কারণ উনি ওখানে আমেরিকার রক্ষনশীল রাজনীতিটা “অনুসরণ” করেন- প্যাট বুখানন পড়েন- শার্লক হোমস হয়ে পেঙ্গুইনের হ্যাট পরে ঘুরে বেড়ান, স্যালাড আর “গরম ঠান্ডা (???) বিয়ার” খান |

    হুমায়ুন আহমেদের নিউইয়র্কের বাসায় ওনার পূরবী’দি কে তুলতে গিয়ে লেখক আবিষ্কার করলেন,
    “সেখানে বসার যে সেটিং তাতে বসার একমাত্র শূন্য জায়গা সে সোফাটিতে তার স্ত্রী মেহের আফরোজ বসা। আমি সেখানেই বসলাম।” —তবু নিজের পরিচয়টি তিনি মেহের আফরোজ-কে দিলেন না | নিজ থেকে পরিচয় দিতে গেলে নিজের নামটা ছাড়া অন্যান্য মাহাত্ব্য প্রকাশে একটু দ্বিধা আসে বৈকি | তাই তার মনে মনে আশা ছিলো ওখানে উপস্থিত কেউ তাকে পরিচয় করিয়ে দেবেন মেহের আফরোজের সাথে; যে পরিচয়ে শুধু নাম ছাড়াও, উনি যে একজন লেখক এবং চলচিত্র নির্মাতা সেটি প্রকাশিত হতো | কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি,
    “আমাদের যাওয়ার সময় হয়। আমার খুব একটা অস্বস্তি থেকে যায়। হাসান ফেরদৌস, পুরবীদি, বা হুমায়ুন ভাই কেউই আমাকে তার স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন এর সংগে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। খুব সাধারণ সৌজন্যতা ছিল |” আহারে বেচারা !

  8. নাজমুল আশরাফ says:

    লেখাটা পড়ে আমার তিনটি বিষয় জানা হলো।
    ১। হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে বাড়তি কিছু তথ্য।
    ২। অনেক বছর আগে চেনা এক সাংবাদিকের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে।
    ৩। কিছুটা হলেও আমার এক সময়ের সহকর্মী এবং ওই সাংবাদিকের সহধর্মিণী সম্পর্কে।

    অনলাইনে এতো বড় লেখা আমি খুব কমই পড়ে থাকি। তবে এই লেখাটি একটানে পড়তে পেরেছি।

  9. কুলদা রায় says:

    আবু তাহের, সালাম জানবেন। আপনি কেমন আছেন? আজ কেমন বোধ করছেন? আপনার মন ভাল তো? আমার এই তিনটি প্রশ্ন কেমন লাগলো আপনার?
    ১. ডাকঘর নাটকের অমলকে মনে আছে আপনার? অমল মৃত্যুযাত্রী একজন রোগী। ঠাকুরদা এসেই যখন তার সঙ্গে ক্রৌঞ্চ দ্বীপের গল্প শুরু করতেন তখন অমল ভাল বোধ করত। কিন্তু আবার লোকাল কবিরাজ যখন তাকে দেখে সান্নিপাতিকের মন্ত্র আওড়াত তখন আমল তো আমল, তার কিপ্টে পিসেমশাই মাধব দত্তও হতাশ হয়ে যেতেন। এখানে কোন আচরণটা ঠিক?

    ২. হুমায়ুনের একটি নাটকে দেখেছিলাম–একজন অসুস্থ রোগীকে লোকজন দেখতে আসছে। তারা সবাই একই প্রশ্ন করছে–আপনি কেমন আছেন? আজ কি খেয়েছেন? কোন ডাক্তার দেখছেন? ইত্যাদি।
    রোগী এই একই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে বিরক্ত হয়ে গলায় কয়েকটি কার্ড ঝুলিয়ে রাখল–১. আমি ভাল আছি। ২. ভাত খেয়েছি। ৩. ডাক্তার আবু নওয়াজ ইত্যাদি।
    অর্থাৎ হুমায়ুন নিজেই পছন্দ করতেন না–অসুস্থ মানুষের সঙ্গে এইসব ভনিতা মার্কা আলাপ বিলাপ। তাহলে লেখক আনোয়ার শাহাদাত কি অন্যায়টা করেছেন –‘আপনি কেমন আছেন’ প্রশ্নটি না করে?

    ক্যান্সার একটি ভয়াবহ রোগ। এই রোগে সাধারণত বাঁচার সম্ভাবনা কম। রোগটি নিয়ে রোগী নিজেরা সবসময় এক ধরনের ডিপ্রেশনে ভোগেন। নিজেকে সুস্থ মানুষের বাইরের কাতারভুক্ত মনে করে আরও ডিপ্রেশনে নিয়ে যান। ফলে এই অবস্থায় তার কাছে এই ধরনের প্রশ্নে কি তাকে মানসিকভাবে সতেজ করা যাবে? তার চেয়ে যদি তাঁর প্রিয়ও কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ করা হয়–তখন অসুস্থ লোকটি নিজের অসুস্থতার বোধটি তাৎক্ষণিকভাবে ভুলে যেতে পারেন এবং নিজেকে সুস্থ মানুষের আওতায় ধরে নিয়ে কিছুটা সতেজ বোধ করতে পারেন। আনোয়ার শাহাদাত সেই কাজটিই করেছেন বলে আমার মনে হয়েছে। সেদিক থেকে তাকে দায়িত্বাশীল মনে করা যেতে পারে।
    ৩. অক্তাভিও পাজ ১৯৬০ সালে মৃত্যুপথযাত্রী লেখক আলফোনস রেইয়েসকে দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন–
    The last time I saw him six months ago, just before I left Mexico, he told me: “Perhaps we won’t have another conversation. There isn’t much time left to.” And with a glance he pointed toward his books. I have forgotten what I replied; no doubt it was on of those vague phrase in which, not without hypocrisy. We try to calm both the anxiety of the ill and our own secret fear of death. I remember that I felt a ridiculous sham, as if my own good health were something indiscreet and little deserved. Reys noticed my confusion, changed the topic, and happily guided me through the thickest of heretic poetry.

    কী বলেন আবু তাহের?

  10. anwar shahadat says:

    প্রিয় নাজমুল আশরাফ,
    সময় করে পড়বার জন্য অনেক ধন্যবাদ। ডিসেম্বরে এবং মার্চে আমি ঢাকায় ছিলাম। আপনাকে আমি সব সময় টিভিতে দেখলেও যোগাযোগের কোনও সুত্র খুঁজে পাইনি। আপনার পুরোনো কলিগদের মধ্যে একবার সাবির ভাইর সঙ্গে আড্ডা হয়েছে (তিনি ঢাকায় ছিলেন তখন) আর বিডি নিউজ বসের কক্ষে দার্জিলিং চা খেয়েছি। সোহেল মঞ্জুরকে মিস করেছি। আমি রীতাকে আপনার ‘দি বেস্ট’ কমেন্ট পড়িয়ে শুনিয়েছি। ও আপনাকে হ্যালো বলেছে। ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ মারুফ রায়হান, আয়েশা ঝর্ণা, কুলদা রায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.