অনুবাদ, কবিতা, প্রবন্ধ, বিশ্বসাহিত্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘লা মারিওনেতা’ :

বিদায়ভাষ্য ছিল না আদৌ

ireen_sultana | 19 Jul , 2012  

২০১০-এ মারিও ভার্গাস য়োসার সাহিত্যে নোবেল প্রাপ্তিতে প্রতিক্রিয়া হিসেবে লাতিন আমেরিকার আরেক নোবেল জয়ী গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের টুইটার বার্তা ছিল ’এবার আমরা সমকক্ষ’ (“Cuentas iguales “, অর্থ “Now we’re even”) । গণমাধ্যমগুলোর অবশ্য এ মন্তব্যের পেছনের কারণটুকু বুঝে নিতে বেগ পেতে হয়নি একেবারেই। পত্রিকার সাহিত্য পাতায় অনেকখানি রসবোধ যুক্ত করেছিল য়োসা-মার্কেস সাহিত্যিক জুটি অথবা প্রতিদ্বন্দী!

পেরুর মারিও ভার্গাস য়োসা এবং কলম্বিয়ার গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মধ্যে একসময় যেমন তুমুল বন্ধুত্ব ছিল, তেমনি ঘটনাচক্রে তারা পরস্পর মুখদর্শন পর্যন্ত স্থগিত রাখেন। যদিও নিজমুখে এরা কেউই একে অন্যের বিরুদ্ধে সুষ্পষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত করেননি, তথাপি অনেকেই ধারণা করে থাকেন য়োসার স্ত্রী’র প্রতি নজর দেয়াই ছিল মার্কেসের চোখে কালো দাগ বসিয়ে দেয়া য়োসার সেই ঘুষির কারণ। সম্পর্কের ইতি বস্তুত সেদিন থেকেই এবং তা জারি রয়েছে আজ অব্দি। এরকম একটি মুখরোচক ঘটনার কারণেই মারিও ভার্গাস য়োসার নোবেল প্রাপ্তির পরপরই গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের নামও উঠে এসেছে গণমাধ্যমগুলোতে। সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য এটি অবশ্য বাড়তি পাওয়া। সমসাময়িক আলোচনা থেকে দু’জন নোবেলজয়ী সাহিত্যিকের কালজয়ী লেখনীর কথা তারা জানতে পারছেন।

‘শত বর্ষের নির্জনতা’ (One Hundred Years of Solitude) -র মতো একটি ধ্রুপদী উপন্যাসই হয়ত লেখক মার্কেসকে নোবেল এনে দিয়েছিল। তাঁর আরেকটি জনপ্রিয় উপন্যাস ‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরা’ (১৯৮৫ সালে প্রকাশিত)। ১৯৯৯ সালে লেখক যখন লিমফেটিক ক্যান্সারে ভুগছিলেন তখন তার শারীরিক ক্রমাবনতির গুজব বেশ জোরেসোরেই চালু ছিল। এই গুজবটিকে আরো নিশ্চয়তা দিল ২০০০ সালের ২৯ মে পেরুর দৈনিক লা রেপুবলিকা’তে প্রকাশিত একটি কবিতা। ‘লা মারিওনেতা’ (La Marioneta) শিরোনামের কবিতাটির লেখক হিসেবে মার্কেসের নাম এই অর্থ বহন করছিল যে- নিজের শোচনীয় অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কবিতাটি বন্ধুদের উদ্দেশ্যে লিখিত একটি বিদায়ী বার্তা। রাতারাতি এই কবিতাটি অন্যান্য দৈনিকগুলোতেও ছাপা হতে থাকে। এমনকি রেডিও চ্যানেলেও বহুবার এর আবৃত্তি প্রচারিত হয়। অন্তর্জালের কল্যাণে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তেও সময় লাগেনি কবিতাটির।

‘লা মারিওনেতা’ অত্যধিক কল্পনাপ্রবণ ভাবাবেগ ও ক্লিশের মিশেল ছিল যা একজন বড় মাপের লেখকের কাছ থেকে হয়ত অনেকেই স্বাভাবিক অর্থে প্রত্যাশা করেন না। ফলে অনেকেরই বদ্ধমূল ধারণা জন্মে এই কবিতা নিশ্চিতরূপেই লেখকের অন্তিম বাণী। মার্কেসের বন্ধু, ভারতীয় চিত্রনির্মাতা মৃণাল সেন হিন্দুস্থান টাইমস’কে বলেন, এই কবিতা পাঠ করে মার্কেসের সাথে বিশ বছরের বন্ধুত্বের স্মৃতি প্রবাহে ভেসে গিয়েছিলেন তিনি। যদিও এরপর অতিদ্রুতই পরিষ্কার হয় যে, মার্কেসের শারীরিক অবস্থা আদতে ততটা শোচনীয় নয়। এ পর্যায়ে যে চমকপ্রদ তথ্যটি জানা যায় তা হলো, মার্কেস আদৌ এই কবিতাটির প্রকৃত লেখক নন। কবিতাটির প্রকৃত লেখকের নাম জনি ওয়েলচ (Johnny Welch), যিনি মেক্সিকোর একজন অখ্যাত অন্তর্বচনকারী (ventriloquist; ভেন্ট্রিলকুয়িস্ট- যে ব্যক্তি দূরাগত স্বরের অনুকরণে কথা বলে। কথা দূর হতে অপরের নিকট আসছে বলে মনে হয়। পাপেট শো’তে পাপেট পরিচালনাকারী যেমন করে মুখ না নেড়ে কথা উচ্চারণ করেন)।

ওয়েলচ কবিতাটি লিখেছিলেন তার সঙ্গী পুতুল মোফলস (Mofles) -কে নিয়ে। ঘটনাচক্রে তার নামের বদলে নোবেল বিজয়ী লেখক মার্কেসের নাম ছাপা হয়। মেহিকোর ইনফোরেড রেডিও চ্যানেলের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে ওয়েলচ স্বীকার করেন তিনি যদিও কোন বড় মাপের লেখক নন, তথাপি তিনি নিরুৎসাহিতবোধ করেন যখন কেউ কিছু রচনা করে অথচ তার কৃতিত্ব লাভ করে না (“feeling the disappointment of someone who has written something and is not getting credit.”)।

কোন কোন ওয়েবসাইট বলছে, মার্কেস কখনই প্রকাশ্যে এই কবিতাটি নিয়ে কোন মন্তব্য করেননি। আবার কোথাও বলা আছে, মার্কোস যথেষ্ট কড়া প্রতিক্রিয়াই জানিয়েছিলেন এই বলে, এখন লজ্জা ছাড়া আর কী-ই বা আমাকে হত্যা করতে পারে যখন এমন একটি বস্তাপঁচা লেখাকে আমার রচিত বলে অনেকেই বিশ্বাস করছে।

বিখ্যাতদের নাম জড়িত থাকলেই যে কোন ’সাধারণ’ মানের সৃষ্টিকেও আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করি তার উদাহরণ এই ঘটনাটি অথবা বিপরীতে অখ্যাতদের নামজড়িত কোন ’অসাধারণ’ সৃষ্টি আমাদের কাছে খুব সহজে তাৎপর্য বহন করে না। একারণেই হয়ত বিভিন্ন ইংরেজি ওয়েবসাইটে কবিতাটি এখনও গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের বলেই উল্লেখিত হয়ে আসছে।

কী বক্তব্য ছিল সেই তুমুল আলোচিত কবিতাটিতে যা এতোটাই আপ্লুত করলো বিশ্ববাসীকে? পাঠকের সুবিধার্থে কবিতাটির একটি বাংলা অনুবাদ হাজির করা হলো।

নাচের পুতুল

ঈশ্বর যদি ক্ষণিকের জন্য ভুলে যেতেন আমার পুত্তলিকা পরিচয় এবং
আমাকে দিতেন এক খণ্ড জীবন,
যথাসম্ভব আমার ভাবনার সবটুকু থাকতো অব্যক্তই,
তবে যেটুকু বলতাম তার পুরোটা ভাবতাম নিশ্চয়ই।
আমি তো জৌলুসে মজে বস্তুর মূল্য ধার্য করি না
ওগুলো কতটা অর্থবহ, আমার কাছে বিবেচ্য তাই।
আমি বরং ঘুমুবো অল্পস্বল্প, স্বপ্ন দেখবো বেশী।
আমি তো জানি প্রতিবার পলক বুঁজলেই
আমরা হারিয়ে ফেলি আলোকের ষাটটি সেকেণ্ড।
যখন অন্যেরা প্রতীক্ষারত, আমি হেঁটে যাবো সেইক্ষণে;
আমি হেঁটে বেড়াবো অন্যেরা যখন অচেতন গভীর ঘুমে।
সবার কথার শ্রোতা হবো আমি,
আর কি করেই বা আমি একটি সুস্বাদু চকলেট আইসক্রিমের আস্বাদ নিতে পারি।

যদি ঈশ্বর এক টুকরো জীবন ছুঁড়ে দিতেন আমার দিকে,
নিতান্তই সাধারণ হতো আমার পরিধেয়,
নিজেকে নিক্ষেপ করতাম সূর্যতলে,
শুধু দেহই তো নয়, উন্মুক্ত করতাম আমার আত্মাকে-ও।
ওহ! আমার ঈশ্বর, যদি হৃদয়াধিকারী হতাম,
তবে লিখে রাখতাম বরফের চাঁইয়ে ঘৃণা যত,
প্রহর যেতাম গুনে কখন সূর্য হবে আবির্ভূত।
আমি ভ্যানগগের স্বপ্নকে লালন করে
তারায় তারায় এঁকে দিতাম বেনেদেত্তি’র কাব্য,
আর সেররাতের সংগীত হতো চাঁদের প্রতি আমার অর্ঘ্য।
আমার অশ্রুজলে গোলাপেরা সিক্ত হতো রোজ,
আমি অনুভব করতাম ওদের কাঁটার যন্ত্রণা,
আর তাদের পাপড়ির শরীরী চুম্বন…
ওহ! ঈশ্বর, যদি পেতাম কেবল এক মুঠো জীবন…
ভালবাসি। প্রিয়জনদের এ কথা না বলে
গত হতে দিতাম না একটিও দিন।
নারী-পুরুষ জনে জনে আমি বোঝাতামই
তারা আমার ভীষণ রকম প্রিয়,
আর আমি বাস করতাম প্রেমে, প্রেমময় সংস্বর্গে।
আমি প্রমাণ করে দিতাম মানুষের কাছে,
কত ভ্রান্তই না তারা ভাবে,
বলে পরিণত বয়সে প্রেমে মজবেনা আদৌ
-ওরা জানেই না প্রেমে না জড়ালেই তো মানুষ বয়সী হয়ে যায়।
আমি শিশুকে দিতাম ডানা, শেখাতাম কী করে উড়তে হয় নিজে নিজে।
বুড়োদের শেখাতাম জরাজীর্ণ বয়সকে সাথী করে মৃত্যু আসে না, আসে বিস্মৃতি থেকে।
মানুষ, আমি শিখেছি অনেক তোমাদের কাছ থেকে।
আমি শিখেছি সবাই যে চায় পর্বত শিখরে নিবাস,
অথচ এতটুকু উপলব্ধি জাগেনি ওদের
ঢাল বেয়ে চড়াতেই সত্যি-সুখের আবাস।
আমি শিখে গেছি, সদ্য ভুমিষ্ঠ শিশুর ছোট্ট বন্ধ মুঠো
পিতার আঙ্গুল নিয়ে যখন প্রথম মন্থনরত,
সে তাকে আটকে ফেলে চিরদিনের মতো ।
আমি শিখেছি, নিচে তাকিয়ে একজন মানুষের অন্য মানুষকে দেখার যে অধিকার
তা কেবল তখনই যখন উঠে দাঁড়াতে সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে অন্য জনার ।
আমি তো শিখেছি অনেক কিছুই তোমাদের কাছ থেকে,
যার অধিকাংশই অকেজো পরিশেষে।
কারণ যখন ওরা আমাকে স্যুটকেসবন্দি করবে,
দুর্ভাগ্যবশত আমি তখন মৃত্যুপথযাত্রী।

‘লা মারিওনেতা’ বা ‘দ্য পাপেট’ এর ইংরেজি অনুবাদ করেন ম্যাথিউ টেইলর ও রোসা এ্যারেলিস টেইলর (Matthew Taylor and Rosa Arelis Taylor)। ওপরের অনুবাদটি ইংরেজী অনুবাদের ওপর ভিত্তি করেই রচিত।

তথ্যসূত্রঃ
http://www.museumofhoaxes.com/marquez.html
http://www.bbc.co.uk/news/entertainment-arts-11493191
http://maps.thefullwiki.org/Gabriel_Garcia_Marquez

free counters


5 Responses

  1. জাহের ওয়াসিম says:

    লেখা ভালো লেগেছে। কবিতার অনুবাদ প্রাঞ্জল মনে হয়নি।

  2. Manik Mohammad Razzak says:

    আইরিন সুলতানা, আপনার শ্রম আমাদেরকে সমৃদ্ধ করেছে। আরও লিখবেন। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

    মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

  3. Saifuddin Mahmood says:

    Very nice writing by আইরিন সুলতানা
    Keep it up!

  4. নুরুন্নাহার শিরীন says:

    নোবেলজয়ী গ্যাব্রিয়েল মার্কেস-এর সদ্যমৃত্যুর খবরটি যখন কমবেশি সাহিত্যপ্রিয়দের মন ভারাক্রান্ত করেছে ঠিক সেইসময় একটি তথ্যসমৃদ্ধ লেখা মনে দাগ কাটলো মনে লেখাটি। ধন্যবাদ তোমাকে আইরীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.