কবিতা

গুচ্ছ কবিতা

farhan_israk | 16 Jul , 2012  

নাভিবোতাম

দোয়াতের ছিপি খুলে কালো প্রজাপতি শিশিরজ্যোৎস্নায় শাদা পৃষ্ঠাকে বলে:
পরাগজলে পা ডুবে ছিলো, উঠে এলাম তোমার বুকে বসতে পাবো বলে।
দাগ-না-কাটা কাগজের মন অল্পতেই গ’লে গোলাপজল; বলে:নিশ্চই নিশ্চই!
পড়ার টেবিল থেকে বালকের চোখ খুলে পড়ে বালিকার স্পর্শকাতর নখে
স্বপ্নজলে কামরাঙা মাছ। পাতালের পানিতে দেখো জ্বলছে বিদ্যুৎ।

নাভিবোতামের নিচে ভোল্টার কোষ। বয়োসন্ধির মৃদুমৌমাছি একটু কামড়ালো
কল্পনার না-দেখা মাখন-স্পঞ্জের ভেতরে শিরশিরে বিষ একটু কৌতূহল।
তীব্র-চিকন আগুনগুচ্ছ চোরাগোপ্তা একজোড়া মন একজোড়া হৃৎপিণ্ডের
ভেতরে পরস্পর আসন বদলায় স্নায়ুসতর্ক নীলঘোর অন্ধকার ঘরে,
ঝড়ে কাঁপা বেসামাল রাতে।

নতুন জলে সাঁতার কাটে অনভিজ্ঞ সাপ; ডাঙার পাড়ে বিব্রত বাতিঘর
বাতির চিবুকতলে চিঠিবই এসএমএস মাল্টিমিডিয়া টেক্সট কত কী!
শৈশব হাত বাড়ায়। কৈশরের ন্যাথালিন বুক কেঁপে-ওঠা গন্ধশিহরণ
কাটা-দিয়ে-ওঠা প্রতিটি পশম রূপকথার মোহ কেটে জাগতে পারে না।

ডিপ ফ্রিজে লিবিডো আইসক্রিম; বাতাসের সামান্য ছোঁয়া পেলে সর্বনাশ
ঠোঁট যতটা পারে স্মৃতি চেটে খায় বাকিটুকু বুঝে নেবে মাছি, সাধ্যমতো
ছেঁড়া গল্পের সুতোকাটিম মেশিনে পুরে নীরবতা ছোটোখাটো দরজি-দোকান
খুলে বসে স্মৃতিবিতান মার্কেটে। ফসকানো ফ্রকের নিচে রোদ চকচকে ব্রা
না-না করে ওঠে; বলে, যাই, সময় গেলে সাধন হবে না, সাইজি!


জলটিকিট

কোথায় পোস্টিং হবে প্রশ্ন করে মেঘ-ধাক্কা লেগে পাহাড় উল্টায়
সে তো গর্ভবতী; ছায়া তার বড্ড প্রয়োজন মেঘছায়া জানে না সে
জমাট পানি চিরকাল জমাট থাকে না; তাকে ডাকে তৃণমূল বীজধান
চাষার লাঙল, ধানবৃষ্টির প্রার্থনারত সকল বিদ্যুৎ, সঙ্ঘ সমিতি সব।

উড়ে উড়ে প্রশ্নের সরু প্লেন ভেঙে চলে আলতো এলুমিনিয়াম, পেঁজাতুলো
নিম্বাস, কমুলাস, রূপ ও রূপের মোহ, আলো-চমকানো সোনারেখা, নিকেল
পোস্টিং কোথায় হবে সমুদ্র জানে; সেই তো পাঠায় নানা স্থলে, ডাঙায়, জলে
ঘানায়, গণচীনে, বুয়েন্স আয়ার্স-বরিশালে যখন যেমন খুশি, হুবহু তুমি।

মেঘ তো জানেই সে যাবে মাটির কাছে শস্যবীজে, বীজতলায়, ভ্রুণে-
বাতাস তাকে বদলি করে; বাতাসের শ্বাসঘরে আপেক্ষায় আনত মেঘ
পোস্টিং না জেনে হাওয়া-কোষ্টারে উঠে পড়লে ঝামেলা পোহাতে হয়
ভেবে, মেঘ সারাবেলা শূন্য স্টেশনে টিকিটের প্রতীক্ষা করে, জলটিকিট।

সহজ গোলক

সহজ গোলক ভেবে ছোট্ট ফুটবলে চড়াও হচ্ছে অসংখ্য পা
পাগুলো কার? আমার? না, সবগুলো আমার না, সম্ভবত

নির্বোধ খেলার চাতুরি দেখে হাসি ফেঁটে পড়ে, এ কি তাচ্ছিল্য?
ঠোটগুলো ক্রীড়ামোদী নয় বলে মাঠকোণে কোণঠাঁসা আমি
হীনম্মন্যতার হীরকররেখা কেটে ফেলে ঝিল্লি মন-বিভ্রান্তি কাটে না।

ভ্রু কেঁপে ওঠে; ভ্রান্তি দশায় পড়ে আপ্রাণ বিব্রত! ভাবি-
সংবেদনশীলতার বালাই যদি না থাকে চামড়ার
লাথি মারতে; দোষ কোথায়; তা ছাড়া খেলা তো জমবে না!

তবু সংশয় জমে রক্ত জমাট। বলের প্রবোধ মেনে নিয়তি চক্র
অন্তত প্রশ্নবোধক-প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রশ্নের প্রহারে প্রহারে
খেলনার খোল-বাতাস তেঁতে ওঠে–তীব্র দহন; আগুন, আগুন!

পেটের আগুনে পদাঘাত হলে পা পুড়ে যাবে, সব পুড়ে যাবে
স্টপ ওয়ার্ল্ড কাপ কিকিং; কিছু একটা ঘটতে পারে যখন তখন
শ্রমের চামড়া ছিঁড়ে পশম উঠে যাচ্ছে দেখে, অগত্যা বল
নিজেই ধারাভাষ্য দেবে ধীরে দর্শক সমাবেশে।

ফতোয়া

পুঁজের কলস উল্টে ফেলে দাও নারী-সোনার কলস ভরে দুধ দাও
আদৌ সঞ্চারিত হয়নি যে গর্ভ, ঐতো সেই অন্ধকারে শিশু কাঁদছে
নিজের জন্য বলছি না আমার এমনিতেই চলে যাবে।

ঝড়ের পর এ-গাছের ফুল ও-গাছে আটকে পড়ে তবু তো চিরকাল
ফুল ফোঁটে প্রাকৃতিক অধ্যাদেশে, যে গাছের যেটা সেটা তারই
এ-বাড়ির বউ ও-বাড়ি বালিশে মাথা রাখে, ঝড় এলে এমন হতে পারে।

দমকা থামলে কাপড় ঠিক করে চলে আসলে ভালো, তা না হলে
বিধান ভেঙে পড়ে, বিধানের নিচে পড়ে কার আবার হাত-পা ভাঙে!
পোশাক বদল করো; তাতে দোষ নেই, ইচ্ছেমতো প্রকৃতিকে অলঙ্কার
করো, তুমি তার অলঙ্কার হও, পুরুষের অলঙ্কার হতে কখনো যেও না।

মোহতমসা

ইন্দ্রিয়ের তোয়াজে চারুকবি রাঙা রাজকন্যাদের রস ঢালে গ্লাসে;
নির্জনতা নামে তার খ্যাতি খালি পৃষ্ঠাকে সন্দর্ভের অহঙ্কারে দেয় ভরে
মন্ত্রযোগে। ফুলে-ওঠা সেদ্ধ জামবুড়া কিশোরের পায়ে লুটায়, বল;
লাথি কষতে কষতে নগর তাপসেরা মার্চ করে, রাস্তায় টায়ার বার্স্ট
কবিত্ব শব্দ করে ফেটে পড়ে মাতাল রেস্তোরাঁয় পাগলা পার্কে-উদ্যানে।
পেচ্ছাবের ফেনাজল থেকে তোলে ছন্দফিকির; তুচ্ছতা বলে ওঠে:
আমিই মহান, এই হলো সৃষ্টিভেদ, কথাপুলকের জাদু কারিশমা।

শাশ্বত মধুপূর্ণিমার গাল টিপে ক্ষেপে গিয়ে কয়, মোহতমসার গুষ্টিচুদি
আলিঙ্গনে আবিস্কারার করে ঘাতক ব্যাধি বিকার মৃত্যু নশ্বরতা সব
গ্রাম-শহরের বিভেদক ভাঁজে শিশ্ন পুশ-ইন করে তারা ধোঁয়া তোলে:
কবিতা কী: খরপ্রলাপ বিপুল শৃঙ্গার বীর্যপাত ব্যাধিবিষন্নতা। তাদের বলি:
খাপ খুলে কলমকে ন্যাংটো করছি; চাও তো দ্বিধা ভেঙে এসে দেখো।

আরেক কবি জলডুবি শেষে তুলে আনে স্বর্ণমুদ্রা-চাঁদ; তারস্বরে বলে:
মৌনতার বেলা শেষ; লাবণ্যের ত্বক শুকিয়ে কী বিচ্ছিরি, খটখটে!
আজিজ মার্কেট থেকে ছুটে এসে একজন প্যান্টের জিপার খুলতেই
মুহূর্তে নগর নর্দমায় দেখি প্রজন্মের পোনামাছ সাঁতার খেলছে।
দেখতে দেখতে হলকুমের কাছে লটকে থাকা কবিত্বের ঢোক গিলি
পেটের ট্রাবল শেষে দেখি হাসপাতালে আমার পোড়াকলম প্রেসক্রিপশন
লিখছে; চিকিৎসার চাতুরি ভুলে ডাক্তার ছন্দ মিটার মাপতে অস্থির।

ওলটপালট

ঘুম ভাঙার পর ছক কেটেছি দফায় দফায় কী-কী ভাঙবো
সবার আগে ঘা বসাবো মনে, না হলে বদল পরাহত
চেহারা ভাঙবো না বয়স হলে তা এমনিতে ভেঙে যায়।

স্বপ্ন ভাঙার শব্দ পেয়ে মাথার নিচে বালিশ ভেঙে গেছে
মন-বদলের হাওয়া পেলে শর্তহীন বস্তু বদলায় সত্য বদলায়
ক্ষুরের টানে দাড়ির নিচে ত্বকের মসৃণতা লাবণ্য ছড়ায়।

রঙবদলের পালায় যখন ঋতুচক্রের চাকা ঘোরে আপন মনে
হাত গোটালে চলবে না তাই আকাশমূলে পরশ দিতে হবে
বস্তাপচা নীলের কারসাজি খর্ব হবে সবুজ রেখার টানে।

উলটপালট চুলের গোড়ায় হাত দেবো না সেখানে বিদ্যুৎ
চুল-দাড়ি-গোঁফ-যৌনকেশের রঙ যা আছে সেটাই নির্ভুল
ঠিক করেছি পাল্টে দেবো শিরাপথে কালসিটে ধুঁকপুকি।

সেক্সডল

বুনো ষাঁড়ের বঞ্চনা দেখে সে-বার খুব মন খারাপ করে চিরকুমার
হাত নেই, সঙ্গমকালে গাভীর স্তনমূলে শৃঙ্গার ছাড়া কী করে পোষায়!
গোয়ালার মন্থন ছাড়া গরম ভাতের থালায় ওলানদুধ কিছুতে ওঠে না।

দুর্মূল্য সেলিব্যাসি ভেস্তে যেতে চায়, চিরকুমার, গা-পোড়ানো জ্বরে!
বিজ্ঞান বিধির কল্যাণে স্পর্শকামী হাত তা বলে অভুক্ত থাকে না কখনো
কোমলতার অভাব নেই বলে নরম জিনিসে চাইলেই হাত রাখা যায়।

হায়! এঁটেল পোকার কামড় খেতে খেতে গো-জাতির গরবরে দশা
লেজ বা লেহনের কল্যাণে রক্ষে, না হলে বিফলে যেত ষণ্ডা জীবন

চিরকুমারের কষ্ট আনেক বেশি; লেজ নেই তার, জিহ্বাও জবলেস।
অবচেতনের ডাশ-মশা-মাছি সামলে চলতে কত যে গুপ্ত গ্লানি!

সেক্সডলের কথা মনে পড়তেই হা-হা করে হেসে ওঠে চিরকুমার।

free counters


18 Responses

  1. saifullah dulal says:

    প্রিয় ফারহান,
    শুভেচ্ছা নিও।
    তোমার কবিতার প্রশংসা করেছিলেন রাহমান ( শামসুর রাহমান) ভাই। আজ তোমার এই কবিতাগুলো পড়ে সেই কথা মনে পড়লো।
    দুলাল

  2. Probir Karmokar says:

    বন্ধু ফারহান ,
    অনেক দিন পর আবার তোর কবিতা পড়লাম। ভালো লাগলো । তোর কবিতা এই সাইটে নিয়মিত দেখতে চাই ।

    প্রবীর কর্মকার ।

  3. মাসুদ আহমেদ says:

    কাবিতাগুলো আমাকে আনান্দ দিয়েছে, কষ্টও দিয়েছে। ভাষা কেমন জেন!
    মাসুদ , ঢাকা

  4. Anis says:

    Ami prio Farhan ar sobgulo kabita porlam . valo laglo.

  5. খসরু আহমেদ says:

    প্রিন্ট করে আবার পড়বো।

  6. khosru ahmed says:

    kabitagulo pore onek valo legeche. Farhan Ishraq o bdnews24.com k dhonnyobad.

  7. kamrul Hasan Ripon says:

    Very nice poem. These have many messages.
    F. Ishrak is a pioneer of new type of poem.

  8. Manik Mohammad Razzak says:

    সুপ্রিয় ফারহান
    আপনার কবিতাগুলো পড়লাম, খুবই ভাল লাগল। বিশেষ করে মোহত নামা বেশি ভাল লাগল। ভাল থাকবেন।
    শুভেচ্ছাসহ
    মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

  9. hasibul hasan says:

    Farhan
    Aponar Kabita gulo pore amar onek valo legeche.
    Amar mone hoy amar moto sobaroi valo lagbe.

  10. শিমুল সালাহ্উদ্দিন says:

    ফারহান ইশরাকের কবিতাগুচ্ছ দেখে ভাল লেগেছে। পড়লাম। ভালো লাগলো। যদিও মনে মনে ঘুরে গেল অনেক কথা। কবিতা অকবিতা বিষয়ক…শুভ কামনা।

  11. Jahangir says:

    israker kobita gulo valo laglo.

  12. sayeed ahmed khan says:

    ফারহান ইশরাক (আকবর হোসেইন), তোমার কবিতা পড়লাম। তুমিতো ভালো ছড়া লিখতে। কবিতার পাশাপাশি ওটাও চালিয়ে যাও।

  13. alam says:

    valo lagar boadh acchono korlo……………

  14. raju alim says:

    good…valo kobita……

  15. MUFAJJAL SARWAR says:

    Farhan; Etodin kothay chilen?Eto din amader apnar Eto sundor kobita gulo theka bonchito kora rakhlen keno? aro besi besi lekha chai.valo thakben

  16. Taniya says:

    onek valo laglo.niyomito lekha chai

  17. মালেক মুস্তাকিম says:

    প্রিয় ফারহান
    তোমার লেখা অসম্ভব ভালো কবিতাগুলো পড়লাম।
    ভালো লাগার মত কবিতা।
    নিয়মিত লেখা চাই

    কবিবন্ধু

  18. poliar wahid says:

    মাঝে মাঝে খুব কষ্ঠ লাগে। কবি বন্ধুরা কবিতা বুঝুক আর না বুঝুক বন্ধুদের কবিতা পড়ে বলেন খুব ভালো খুব ভালো। আমি ঠিক তা পারি না। আমার মনে হয়েছ মাসুদ আহমেদ ছাড়া আর সবাই বলার জন্যে বলেছে মাত্র। কবিতাগুলোর থিম খুব ভালো ছিল কিন্তু বর্ণনায় অতিকথন যাকে মেদ বলা হয়। সেই ভারে ন‌্যূজ হয়ে গেছে। আমি কবিকে চিনি কয়েক দিন হলো। এই তার প্রথম কবিতার সাথে সাক্ষাত হলো। দেখা হলে কথা হবে। ভালো খাকবেন সবাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.