কবিতা

গুচ্ছ কবিতা

mrinalbasu_chowdhury | 11 Jul , 2012  

একলা মানুষ

নিজের সঙ্গে একটা মানুষ
ছায়ার সঙ্গে একটা মানুষ
রোদের মধ্যে একটা মানুষ
হাঁটছে কেবল হাঁটছে কেবল হাঁটছে
ধর্ম সে তার ব্যক্তিগত
আদর্শ তার ব্যক্তিগত
চিন্তাভাবনা ব্যক্তিগত
জীবনযাপন ব্যক্তিগত
যন্ত্রণাভার ব্যক্তিগত
তবুও কেমন একলা মানুষ
রোদের মধ্যে ছায়ার মানুষ
ছায়ার মধ্যে রোদের মানুষ
সংঘবদ্ধ হবার জন্য
ভিড়ের মধ্যে একলা মানুষ
হাঁটছে কেবল হাঁটছে কেবল হাঁটছে

অঘোষিত যুদ্ধের বিষাদ

ভালোবাসা যেখানে ফুরোয়
সেখানেই জন্ম নয় ঘৃণা
শোলার মুকুট থেকে
ঝরে পড়া অহংকার
মাটি খুঁড়ে নিয়ে আসে পাপ
মুখাপেক্ষী মানুষের হাত
নষ্ট করে ইতিহাস
প্রকৃত গৌরব
মঞ্চের ওপর থেকে
মিথ্যাচারে
বেশ কিছু পায়রা উড়িয়ে
নি:শব্দ আড়ালে যারা
ঢেকে রাখে রক্তমাখা নখ
শরীরে শরীর রেখে
যারা খোঁজে বিশল্যকরণী
তারা আজ ধুলোপায়ে
ঢুকে গেছে অন্দর মহলে

অঘোষিত যুদ্ধের বিষাদ
বিভাজনে
শুধুমাত্র আগুন ছড়ায়

ধর্ম বা আইন

আমাদের মধ্যে কোন ধর্ম বা আইন নেই
নেই পরিচ্ছন্ন কোন চুক্তি
যার কাছে দায়বদ্ধ প্রেম
নেই স্বপ্নের নূপুর
নিরাপত্তাময় স্বপ্নের উঠোন
নেই কোন নিরিবিলি সাঁকো
যে কোন সময় তাই
যাই বলে চলে যেতে পারো

আমাদের মধ্যে কোন ধর্ম বা আইন নেই
আছে অস্পষ্ট আকাশ
আছে ধুলোঢাকা সবুজ ডিভান
অন্তর্লীন প্রসঙ্গ সোহাগ
আছে শীতল সন্ত্রাস
নির্ভীক শপথহীন
একান্ত স্বাধীন
মাটির ওপরে তাই
চালাঘর ভেঙে দিয়ে
এই শেষ
বলে চলে যাওয়া
হয়তো-বা আপাতনিষ্ঠুর
সামাজিক আইনবিরুদ্ধ কিছু নয়

আশ্চর্য আগুন

সারাক্ষণ মুগ্ধতা চেয়েছো
চেয়েছো মধুর ভাষালিপি
গুহাচিত্রে
মুগ্ধ পরম্পরা
চেয়েছো নিষিদ্ধ মেঘ
চিত্রময় অকালবর্ষণ
অলৌকিক সিঁড়ির দু’ধারে
স্বচ্ছতোয়া নদীর আশ্লেষে
চেয়েছো ঘনিষ্ঠ ঠোঁট
সোহাগী সিদুঁর

অনুক্রমে
স্বপ্নের বিকল্প কিছু
বোধির উত্তাপ
চেয়েছো অভিজ্ঞ ছায়া
মেধাশ্রিত প্রেম
জতুগৃহ নয়
প্রথাহীন পর্যটনে
সুখের আবর্ত ঘিরে
চেয়েছো হলুদ ছবি
বিবাগী ভ্রমর
সুখের অসুখে
চেয়েছো অক্ষরমালা
নিভু-নিভু আশ্চর্য আগুন

তোমাদের ধিক্কার সভায়

আয়ুহীন কবিতার জন্ম নিয়ে
তোমাদের ধিক্কার সভায়
নি:শব্দ নূপুর পায়ে
যে যুবতী বসেছিল একা
তার চোখ
ঠোঁট আর
হাতের আঙ্গুলে
ছিল কিছু নক্ষত্রবিষাদ
ছিল শব্দবীজ
ছিল বসন্তলালিত কিছু
উন্মাদ আগুন

শিখাহীন
যে আগুনে
পুড়ে যায় দক্ষিণ দুয়ার
ইতিহাস
সামাজিক বিধিজাল
হৃদয়বিহীন কিছু বিকল্প মিনার
শরীরী জ্যোৎস্না নিয়ে
যে যুবতী বসেছিল তোমাদের ধিক্কার সভায়
জন্মের যন্ত্রণা নিয়ে
তাকে ঘিরে
শব্দযান
রাশিরাশি
দুর্লভ কবিতা

অলস হরিণ

দ্বাদশীর চাঁদ এসে নিয়ে গেছে সমস্ত বকুল
সোনালি ভোরের রোদ
পাহাড় পেরিয়ে যায় আরেক পাহাড়ে
সন্তাপবিহীন প্রেমে
যে যুবতী চেনাপথে নিজেকে হারায়
তার জন্য অজস্র করবী নিয়ে
দাঁড়িয়েছে মায়াবী সকাল
অহঙ্কারী আগুনের পাশে
নীরব শূন্যতা নিয়ে বসে থাকা বৃষ্টিঝরা মেঘ
অসহায় ডানা মেলে উড়ে যায়
শ্মশানের দিকে

ছায়ার মানুষ জানে
জানে দ্বাদশীর চাঁদ
মায়ার জীবন নয়
জীবনের মায়া নিয়ে
গভীর অরণ্যে একা
শুয়ে আছে
অলস হরিণ

এখন সহজ

তোমার বারান্দা চিনি
চিনি বাতিঘর
ঘোরানো সিঁড়ির গল্প
দুপুরে ছায়ার নাচ
সারারাত জাগরণে
শুধুই রবীন্দ্রনাথ
ধর্মহীন নিবিড়ি উষ্ণতা
মন্দিরের চেনা সিঁড়ি
বেলগাছ
কোঁচড়ের যুঁই ফুল
সমস্তই এখন জেনেছি
জানি তুমি কোনখানে থাকো
জানি গরাদের রড
জানি কোনখানে কতখানি কুকুর পাহারা

তোমার বারান্দা চিনি
চিনি সাজঘর
কোনদিন যাইনি তবুও
চিনে যাই ঘাসের প্রকৃতি

এখন উদ্বোগ নেই
নেই অস্থিরতা
বিপরীতমুখী ওই পথের আনন্দে একা
ফিরে যাওয়া
এখন সহজ

স্বাধীন বেহালা

অস্ফুট মন্দ্রের শব্দে জেগে ওঠে স্বপ্নের শ্মাশান
বেজে ওঠে স্বাধীন বেহালা
রক্তময় আয়ুরেখা থেকে
ঝরে পড়ে প্রতারণা
অশালীন স্মৃতি
পুরনো কাঁথার ভাঁজে
শীত ঘুমে যে বীজাণু
আমায় চেয়েছে
পুনর্জন্মে সঙ্গী হবে বলে
তারাও জেগেছে আজ
অহংকারী কাঠের ওপরে
বিষন্ন হৃদয়পুরে
ভাসিয়েছে বিলাসতরণী
আসছি দাঁড়াও
এতদিন কিছুই পারিনি
অন্তত যাবার বেলা
ভোরের কুয়াশা মেখে
একবার
নিজেকে সাজাই

প্রতিটি মৃত্যুর পাশে

প্রতিটি মৃত্যুর পাশে তুমি ঠিক দাঁড়িয়ে থেকেছো
একা নয়
তবু স্থির নিঃসঙ্গ মলিন
ধূসর কপাল জুড়ে স্পষ্ট হয় অক্ষর বিষাদ
নীরব চোখের লোক
ঠোঁট বেয়ে গড়ায় শরীরে

আগামীকালের স্বপ্নে
নিরাপদ যে দূরত্ব তোমাদের
মহান করেছে
তার পাশে পড়েছিল অঙ্কের হিসেব

আমি চিরদিন
ভুল অঙ্কে শূণ্য জমিয়েছি
ভুল যন্ত্রে পুড়িয়েছি হাত

তবু
নিথর শোকার্ত তুমি শিয়রে দাঁড়াবে
এমন সুখের জন্য
মৃত্যুলোভে প্রতিদিন
ভেঙে ফেলি খেলাঘর
বিবর্ণ জীবন

এখন চোখের জলে

দক্ষিণের হাওয়া কোনো
এবার এদিকে এলে একটু দাঁড়িও
যাবো

নদীতীরে যারা বসে আছে
তারা যাবে আনন্দ উজানে

যে একা গাইছে গান
তার কাছে অপ্সরার ভিড়
হিমবাহে শ্রাবণ কুসুম

এখন সুড়ঙ্গ শেষ
এখন জ্যোৎস্না নদী
এখন বিষন্ন মোম
আলোছায়া
নিথর নীলিমা

এখন
চো খে র জ লে লাগলো জো য়া র

free counters


22 Responses

  1. hanzala says:

    ভালো লাগলো।

  2. saifullah dulal says:

    kobitagulu ektu onno rokom, vinno mejaje lekha.

  3. Rashed Rouf says:

    ভাল লাগল।

  4. চন্দন আনোয়ার says:

    কবি মৃণাল বসুচৌধুরীর ১০টি কবিতা পড়লাম। ভীষণ ভাল লাগল। ভাষা, বাচনিক ভঙ্গিমা, নির্মাণ-বৈশিষ্ট্যে ও বিষয়-গৌরবে কবিতাগুলো অনন্য। এক নিশ্বাসে পড়া যায়।

  5. FERDAUSHI QUEEN says:

    bhalo laglo

  6. মোজাফফর says:

    মৃণাল দাদার কবিতার ভক্ত পাঠক আমি। তাঁর ‘আসছি দাঁড়াও’ বইটি অনেকবার পড়েছি। শুভেচ্ছা দাদাকে।

  7. Habibullah Sirajee says:

    Excellent.

  8. Chandrima Dutta. says:

    Ei sokalbelata aanondo mukhar hoye uthlo aapnar kobita pathe. Osadharon. Aapnar kobita bohumukhi moner janala khule niye aase aaschorjyo bhromoner kothokota.

  9. quamrul arif says:

    একভাবে পড়লাম ভাল লাগলো। কবিতা বারবার না পড়লে তার প্রতি প্রেম বাড়ে না তাই কপি করে পরে ঠাণ্ডা মাথায় আবারো পড়ব।
    _কামরুল আরিফ

  10. Omar Shams says:

    vinno mejaje এক নিশ্বাসে বাচনিক ভঙ্গিমা Excellent ভক্ত aaschorjyo bhromon! বাহ! বাহ!

  11. বিশ্বজিত রায় says:

    বহুকৌণিক দিক থেকে জীবনকে অনুভব করে অমোঘ কিছু স্তোত্র রচনা করেছেন কবি মৃণাল বসুচৌধুরী । ধর্ম, ভালোবাসা, নিঃসঙ্গতা, বিরহ, বিষাদ, আকাঙ্খা, মৃত্যু-র সংগে সহবাস করা মানুষ মৃণাল, কবি মৃণাল দিয়ে এঁকে রেখেছেন জীবনের এক অনন্য ছবি। যে ছবির সামনে দাঁড়ালে কখনো কখনো আমাদের নিজের প্রতিচ্ছবিও ভেসে ওঠে। যে কবিতার কাছে আবহমান জানু পেতে বসে থাকা যায় … বিশ্বজিত রায়।

  12. Shashwati Nanda says:

    খুব ভালো লাগলো, কবির হৃদয়ছোঁওয়া এ স্বগত উচ্চারণ।

  13. কুমার দীপ says:

    sundor !

  14. মৃণাল বসুচৌধুরীর কবিতাগুলি আসলে প্রগাঢ় জীবন বোধে সম্পৃক্ত এক একটি অনিন্দ্য সুন্দর দর্শন স্তোত্র যা প্রিজমের মধ্যে প্রবাহিত রশ্মির মতো বহুমাত্রিক বর্ণচ্ছটায় বিচ্ছুরিত হয়।

  15. বনি আমিন says:

    কবিতাগুলো আমি পড়লাম। পড়লাম, উপর থেকে নিচে এবং নিচ থেকে উপরে দু‌ দুবার কিন্তু আমার কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। কেন যে মানুষ ভিড়ের মধ্যে একলা হাটে? মানুষ বোধ হয় মানুষকে ভালবাসতে জানে না। ভালবেসে ভিড়ের ভেতর হারিয়ে গেলেই তো হয়। প্রতক্রিয়াহীন হৃদয়ে এটুকু মাত্র অনুভব।

  16. monalisha chattopadhyay says:

    mrinal da . amar priyo kobi. aj ar ekbar praman holo. kobita gulo sattyi khub sundar aman nikhut chhande ke likte pare ata sundar kobita . bhab , bishoy , sobder bynjana i kobi futietulechhen nijer kotha. . khub bhalo laglo ek sange ata kobita pore. kobita guli sattyi anbodya . khub sundar kobita gulo ….monalisha chattopadhyay ………thanks………

  17. Sabina Yesmin says:

    excellent

  18. mrinal basu chaudhuri says:

    je sab pathakra protikriya janiechen, jara porechen, protikriya janiechen tader sakolke janai amar kritaggata sabai valo thakun

  19. mrinal basu chaudhuri says:

    ektu sangsosadhan….jara porechen athocho protikriya jananni ekhane,ebong jara byaktigata barta diyechen, tader sabaike dhanyabad

  20. satish biswas says:

    ১০টি কবিতায় আংশিক হলেও কবির অন্তর্মুখ প্রতিফলিত।কোন কবিতায় একলা মানুষের সংঘবদ্ধ হবার প্রয়াস-কোন কবিতায় ভালবাসার অবসানে ঘৃণা-অহংকার-পাপ।কোথাও নিরাপত্তাহীন স্বপ্ন-বোধির উত্তাপ ও মেধাশ্রিত প্রেম।আবার কোথাও বা নক্ষত্রবিষাদ।কখনো চেনা পথেই যুবতীর নিজেকে হারিয়ে ফেলা।এরই পাশাপাশি ভাল লাগে জীবনের মায়া নিয়ে কবির চেনা বারান্দায় উদ্বেগহীন ফিরে যাওয়ার অভিলাষ-নিজেকে সাজাবার ও দক্ষিণের হাওয়ার সঙ্গে পথচলার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশকে।একটু মায়াময় প্রেমের সান্নিধ্য পাবার লোভে কবি নিজের হাতে মৃত্যুকে গড়ে তুলতেও প্রস্তুত।বারবার পড়েও মৃণাল বসুচৌধুরীর কবিতা বারবার পড়তে ইচ্ছে করে।

  21. bappi says:

    মানুষ সত্য এক একমাএ ছায়া তার সংগী।

  22. Sachin Das says:

    Amar priya kabita. jatodin banchbo totodin mone rakhbo.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.