পিটার্সবুর্গঃ যা আমার চোখের জলের মতো পরিচিত

ওসিপ ম্যান্ডেলস্ট্যামের কবিতা এবং তাঁর কবিতার একটি নাতিদীর্ঘ পাঠ

তাপস গায়েন | ৩০ মে ২০১২ ২:২৭ অপরাহ্ন

সমকালে উপেক্ষিত কিন্তু উত্তরকালে রুশ ভাষার প্রধান কবি হিসেবে গন্য ওসিপ ম্যান্ডেলস্ট্যাম বাংলা ভাষায় আজ্ও খুব একটা অনুদিত হননি। যদিও অনেকেই তাকে নামে চেনেন। গুরুত্বপূর্ণ এই কবির একগুচ্ছ কবিতা টীকা ও ভাষ্যসহ অনুবাদ করেছেন কবি ও অনুবাদক তাপস গায়েন

osip.jpg‘পিটার্সবুর্গে অসম্ভব কিছু একটা ঘটবে, এমন ভাবনা আমাকে সর্বক্ষণ আলোড়িত করেছে ।’ [ম্যান্ডেলস্ট্যাম, সময়ের কোলাহল (১৯২৫)]

‘এ সত্যি এক ভয়ংকর চিন্তা যে আমাদের জীবন প্লটহীন এবং নায়কবিহীন এক গল্প- যার নির্মাণ হয়েছে কাচ আর নৈরাশ্য দিয়ে ; যার উদ্ভব সার্বক্ষণিক বিচ্যুতির জরাক্রান্ত বুদ্বুদ থেকে ; যার উৎস নিহিত আছে পিটার্সবুর্গ-ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রলাপের ভিতরে ।’ [ম্যান্ডেলস্ট্যাম, দি ইজিপশিয়ান স্ট্যাম্প (১৯২৮)]

যে ঐতিহাসিক অর্থে প্যারিস বোদলেয়ারের, লন্ডন ডিকেন্‌সের, নিউইয়র্ক হুইটম্যানের, সে-একই অর্থে পিটার্সবুর্গ কবি ওসিপ ম্যান্ডেলস্ট্যামের । পিটার্সবুর্গ নগরীর সাথে নিজের সত্তাকে অচ্ছেদ্যরূপে দেখেছেন বলেই হয়ত গভীর আত্মিকতায় তিনি অনুভব করেন, ‘আমার রোগক্লিষ্ট শৈশবের বিষণ্ন নগরী– যা আমার হাতের শিরার মতো দৃশ্যমান, যা আমার চোখের জলের মতো পরিচিত ।’ নেভা নদীর তীরে এই পিটার্সবুর্গ নগরীর পত্তন এবং তার নিরন্তর নির্মিতি, আর দুই শতাব্দীর ভিতরে এই নগরীর যাত্রা এবং তার সামগ্রিক অস্তিত্বের মধ্যে যে আত্মিক শক্তি এবং সংকট, ম্যান্ডেলস্ট্যামের কবিতায় তা গভীরভাবে পরিদৃশ্যমান ; তাঁর কবিতায় ভৌগোলিক সীমারেখা শেষ হলে যা অনুধাবনযোগ্য, যা উচ্চকিত, তা হোল সময়–‘নেকড়ে তাড়িত শতাব্দী ।’ তাঁর ‘আনাড়িপনা’ যা তিনি ‘অন্তর্গত ছন্দ’ দিয়ে প্রায়শই অতিক্রম করে গেছেন, তবু সময়ের ভিতরে উৎসারিত বাস্তবতাকে তিনি দেখেছেন এইভাবে, ‘আমার জন্ম ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে, বিশ্বাসহীনতায়পূর্ণ একটি বছর এবং আরও আছে অনেক শতাব্দী যা আমাকে ঘিরে রেখেছে আগুন দিয়ে ।’ ১৭০৩ খ্রিষ্টাব্দে ‘পিটার্সবুর্গের গোড়াপত্তনের মধ্য দিয়ে রাশিয়া তার ‘একটি জানালা উন্মুক্ত করেছে ইউরোপের দিকে’ ; প্রাচ্য এবং প্রতীচ্যের মাঝে দাঁড়িয়ে পিটার্সবুর্গ স্থাপত্যের দিক থেকে হয়ে উঠতে চেয়েছে ভেনিস কিংবা আমর্স্টাডামের মতো একটি নগরী আর তার মর্ম্মমূলে ধরে রাখতে চেয়েছে গ্রেকো-রোমান সভ্যতার বিজ্ঞান, লজিক, নান্দনিক বোধ, আর সৌন্দর্য-সংবেদ ।

যে জলাভূমিতে নেভা নদী লেক লাগোডার জলরাশি উজাড় করে ফিনল্যান্ড উপসাগরে, যা অবশেষে বাহিত হয় কৃষ্ণসাগরে, সেই জলাভূমিতে এক বিশাল কর্মযজ্ঞের উদ্ভোদন, যেখানে [জার] পিটারের অনুরোধে জড়ো হয়েছে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, হল্যান্ড, এবং ইতালি থেকে শয়ে শয়ে আর্কিটেক্ট, ইঞ্জিনিয়ার, এবং তাঁর নির্দেশে রাশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসেছে হাজার হাজার শ্রমিক ; এক দশকের ভিতরে জলাভূমিতে গড়ে উঠেছে পয়ত্রিশ হাজার বিল্‌ডিং, প্রশস্ত রাজপথ, থিয়েটার, আর শপিং সেন্টার যার অভিমুখ ওয়াটার ফ্রন্টের দিকে । পিটার্সবুর্গ হয়ে উঠেছে ইউরোপের এক অনন্য নগরী ; দুই-পুরুষ-সময়ের ব্যাপ্তির মধ্যে পিটার্সবুর্গ জন্মদান করেছে বিশ্বসাহিত্যের অসামান্য সৃজনশীল সত্তা- গোগল, তলস্তয়, পুশকিন, দস্তোয়ভস্কি, মায়াকোভস্কি, আইজেনষ্টাইন, আন্দ্রে বেইলি, পাস্তারনাক, প্রমূখ- যাদের কাজ সজ্ঞায়িত করেছে আধুনিকতা এবং এই আধুনিকতার মনোগাঠনিক ভিত্তি, যা প্রকৃতার্থে নির্দেশ করে পিটার্সবুর্গের আধুনিকায়ন এবং নগরায়ণ প্রক্রিয়ারই শক্তি এবং সংকট। কারণ, এই নগরীর কংক্রিটের সাথে মিশে আছে অসংখ্য শ্রমিকদের স্বেদ আর অস্থি-মজ্জা ; এর বিশাল কর্মযজ্ঞে আত্মাহুতি দিয়েছে হাজার হাজার শ্রমিক, যা মিশরীয় পিরামিড নির্মাণে শ্রমিকদের প্রাণদানের মতোই নারকীয় এবং ভয়ংকর । আবার, এই সেই নগরী যেখানে জন্ম হয়েছে আধুনিকতার পুরাণ ও প্রতীক- দি লিটল ম্যান, দি সুপারফ্লুয়াস ম্যান, দি আন্ডারগ্রাউন্ড, দি ভ্যাংগার্ড, দি ক্রিষ্টাল প্যালেস, এবং পরিশেষে দি ওয়ারর্কাস কাউন্‌সিল কিংবা সোভিয়েত ; ইম্পিরিয়াল গেষ্ট হয়ে এই তীর্থে এসে ভীড়েছেন, আতিথ্য গ্রহণ করেছেন লিবনিজ এবং ক্রিষ্টিয়ান উল্‌ফ, ভল্‌তেয়ার এবং দিদেরা, বেন্থাম এবং হার্ডার, এবং আরও অনেকে। সুতরাং, ‘পিটার্সবুর্গে অসম্ভব কিছু একটা ঘটবে’ এই বিশ্বাসের লব্ধিবলের কবি হয়ে উঠেছেন ওসিপ ম্যান্ডেলস্ট্যাম ।
osip-1.jpg
ইহুদি মাতা-পিতার সন্তান, ওসিপ এমিলিয়েভিচ ম্যান্ডেলস্ট্যামের জন্ম ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে, ওয়ারস’তে ; শৈশব (১৮৯১-১৯০৭) কেটেছে ইম্পিরিয়াল রাশিয়ার রাজধানী সেইন্ট পিটার্সবুর্গে এবং ইহুদি হয়েও ভাগ্যবান যে তিনি পড়তে সুযোগ পেয়েছিলেন পিটার্সবুর্গের অন্যতম সেরা স্কুল তেনিশেভে, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পাশাপাশি ছিল উন্নত শিক্ষার এক উজ্জ্বল পাদপীঠ ; তাঁর শৈশবের কিছু স্মৃতি ধরা আছে ‘সময়ের কোলাহল’ গ্রন্থে, তাঁর আত্মজীবনীমূলক গদ্যাশ্রয়ী পদ্যে, যেখানে নিজের শৈশবের চেয়ে সেই সময়ের আখ্যান, সেই সময়ের কোলাহল-ই প্রধান হয়ে উঠেছে । আর যখন তিনি লিখছেন এই গ্রন্থ (১৯২৩), তখন পিটারের নগরীর নাম ‘সেইন্ট পিটার্সবুর্গ’ বদলে প্রথমে ‘পেট্রোগ্রাদ’ এবং আরও পরে ‘পেট্রোগ্রাদ’ থেকে ‘লেনিনগ্রাদে’ রূপান্তরিত হয়েছে ; এখানে আছে এক প্রাণবান সংস্কৃতির ভাষাচিত্র আর তার আলেখ্য, যা এখন বিগত, তারই কোলাহল, যা স্ববিরোধিতায় পূর্ণ, এবং যা কালের বিচারে হয়তো থেকে যাবে অমীমাংসিত । এই ভাষাচিত্রের একদিকে অক্টোবর বিপ্লবের পূর্ববর্তী মৃতপ্রায় সময়ের জ্বরা এবং ক্ষয়, ভয়ংকর প্রাদেশিকতা এবং অস্বস্তিকর আপাত অনড় সাম্যাবস্থা ; অন্যদিকে, স্ফুর্তিবান সময়ের ধারা-আলেখ্য, সার্বক্ষণিক ব্যান্ড, মিলিটারি প্যারেড, যার সাথে তাঁর মানসিকতার কোনো সাদৃশ্য নেই ; আর এইসব মিলিয়ে এক জন্ম নেয় এক বিশৃঙ্খলা, যাকে তিনি নাম দিয়েছেন, ‘জুডাইক কেয়্যজ’ এবং এই সময়কে তিনি অনুভব করেছেন তাঁর জন্মের মধ্যে নিহিত পৃথিবী-সৃষ্টির আদিকাল হিসেবে, যা থেকে তিনি কেবল পালিয়ে যেতে চেয়েছেন । আবার এই সেই জগৎ যেখানে জেগেছে গ্রীষ্মের বাগান, পুশকিন এবং দস্তয়োভস্কির সাহিত্য, স্ক্রিয়াবিন এবং চাইকোভস্কির সঙ্গীত, হফম্যান এবং কুবিলেকের কনসার্ট, উজ্জ্বল গ্রীষ্মের সমুদ্র সৈকত, ভেরা কমিসারজেভস্কায়ার থিয়েটার, আর মিউজিয়ামে মানুষের প্রতিকৃতি নিয়ে এক অপূর্ব শৈশব এবং তার শক্তি যা তাঁকে এক ভয়ংকর সময়ে এই পৃথিবীর বুকে, গুলাগ দ্বীপপুঞ্জে, ধরে রাখবে আরও কিছুকাল, যখন রাশিয়া স্তালিনের, যখন তাঁকে সাহায্য করার জন্য পাস্তারনাক এবং বুখারিনের প্রভাবও ক্ষীণ হয়ে আসবে ।

ম্যান্ডেলস্ট্যাম তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ, ‘প্রস্তর’ প্রকাশের (১৯১৩-খ্রিষ্টাব্দ) আগেই ভ্রমণ এবং শিক্ষার উদ্দেশ্যে গিয়েছেন ফ্রান্স, ইতালী, জার্মানি, এবং সুইজারল্যান্ডে ; এবং হাইডেলবার্গে পড়েছেন কান্টের দর্শন এবং প্রাচীন ফরাসী ভাষা নিয়ে ; সরবোর্নে পড়েছেন বাঁর্গসকে । রাশিয়ায় ফিরে সেইন্ট পিটার্সবুর্গ ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়ন করেছেন গ্রীক সাহিত্য পাঁচ বছর, কিন্তু অর্জন করেননি কোনো ডিগ্রি । ম্যান্ডেলস্ট্যাম যখন রাশিয়ার কাব্য-জগতে প্রবেশ করছেন তখন সিম্বলিস্টদের আয়ুস্কাল ক্ষীণ হয়ে আসছে, কিন্তু এর প্রধান পুরোহিতরা–অর্থাৎ আলেকজান্ডার ব্লক, আন্দ্রেই বেইলি, ভ্যালেরি ব্রায়ুসভ, ভিয়াচেস্‌লাভ ইভানভ, কনস্তান্তিন বালমন্ত, জিনিয়া জিপিয়াস, প্রমুখ- রাশিয়ার কাব্যজগতে রেখে যাবেন এক অতিদীর্ঘ প্রভাব । তবু একইসাথে এও সত্য যে রাশিয়ার উনবিংশ শতাব্দীর গদ্যের জগৎ অতিশীঘ্রই অতিক্রম করে যাবে তার কাব্যভূবনকে, এবং কবিতা গদ্যের অনুভবে বেড়ে উঠতে চাইবে, আর সিম্বলিস্টদের বিদায়ের সাথে আরও যে কাব্য-আন্দোলন বিদায় নিবে তা হোল ফিউচারিস্ট, যার প্রধান পুরুষ ছিলেন কবি মায়াকোভস্কি আর কবি খলেবনিকভ । জন্ম হবে ‘একমেইষ্টদের,’ কিন্তু এ-কাব্য আন্দোলনের কোনো সঠিক সংজ্ঞা দেয়া কঠিন হয়ে উঠবে এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের (নিকোলাই গুমিলেভ, আনা আখমাতোভা, এবং ওসিপ ম্যান্ডেলস্ট্যাম) পক্ষে, কারণ এই তিন জনের কবিতার মধ্যে আপাত কোনো সাদৃশ্য নেই ; তবু একথা বলা বোধকরি অসঙ্গত হবে না যে একমেইষ্টরা পছন্দ করেন নি সিম্বলিস্টদের পরাজগতকে, তাদের মরমিয়াবোধকে ; বরং নির্মাণ করতে চেয়েছেন শক্তিশালী ইমেজ, যার শক্তি এই পৃথিবী থেকেই উদ্ভুত, যা এই জগতের সবকিছুর সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে আছে । এই চিন্তার সাথে যে আত্মিক অনুভব এসে যুক্ত হয়েছে তা ম্যান্ডেলস্ট্যামের ভাষায়, ‘একমেইজম হোল বিশ্ব-সংস্কৃতির জন্য এক অতীতচারিতা,’ যা ম্যান্ডেলস্ট্যামের জন্য এশিয়া নয়, বরং তা হয়ে উঠবে ওভিদের রোম, হোমারের গ্রীস, পের্ত্রাক এবং দান্তের জগৎ । ম্যান্ডেলস্ট্যামের কবিতা প্রাতিস্বিকতা নিয়ে বলতে গিয়ে কবি আনা আখমাতোভা দাবি করছেন, ‘ম্যান্ডেলস্ট্যামের কবিতার কোনো পূর্বসূরী ছিল না–।’ সাহিত্য সমালোচকরা অবশ্য এই দাবী মেনে নিতে রাজি নন । কারণ, ভিয়াচেস্‌লাভ ইভানভ (১৮৬৬-১৯৪৯) ছিলেন ম্যান্ডেলস্ট্যামের সাহিত্য-গুরু এবং এই গুরুর সত্তার গভীরে যে দ্বিত্বতা তা দাওনিয়াসের বিশৃঙ্খল ভূবন এবং আপোলিয়নের নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খলাময় জগতের দ্বৈরথ থেকে জাত, যা এক অর্থে অন্ধকারাচ্ছন্ন জুডাইক জগৎ এবং আলোকোজ্জ্বল হেলেনিক পৃথিবীর ভিতরে যে দ্বৈরথ তারই সমান্তরাল, এবং এর সাথে এসে যুক্ত হবে বিষয়গত- এবং বিষয়ীগত-সময় নিয়ে বার্গস’র দ্বিত্বতার ভাবনা– এইসবই ম্যান্ডেলস্ট্যামের কাব্য-জগতে রেখে যাবে অনুভবযোগ্য এক বিশাল প্রভাব ; আরও উল্লেখ্য এখানে কবি ইন্নোকেন্তি এনেনিস্কি (১৮৫৬-১৯০৯), যিনি ছিলেন ক্লেদাক্ত কুসুমের কবি, যিনি রাশিয়া তথা ইউরোপিয় সংস্কৃতিকে প্রাচীন গ্রীক সভ্যতা আর সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেছেন, আর এনেনিস্কি ছিলেন ভার্লেন, ইউরিপিদিস, প্রমুখ কবিদের ভাবশিষ্য এবং তাঁদের কবিতার অনুবাদক । আরও ছিলেন ‘একমেইষ্টদের’ প্রধান পুরোহিত, নিকোলাই গুমিলেভ– যিনি পছন্দ করেননি সিম্বলিস্টদের কবিতার সুরধ্বনি, কবিতার বিষয় হিসেবে ক্ষয়িষ্ণু আত্মপ্রতিকৃতি এবং অতিপ্রাকৃতিকতাকে । যদিও ম্যান্ডেলস্ট্যাম কখনোই সম্পূর্ণভাবে সিম্বলস্টদের ছেড়ে যান নি, তবু উল্লেখিত এরা সবাই হয়ে রইবেন ম্যান্ডেলস্ট্যামের কবিতা-ভূবনের পূর্বসূরি । রাশিয়ার অস্থির সময়ে, যে রাশিয়া বেড়ে উঠবে যুদ্ধের ভিতরে, সেই যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হবেন কবি গুমিলেভ ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে, এবং নির্বাসিত হবেন ম্যান্ডেলস্ট্যামের অতিপ্রিয় কবি ভিয়াচেস্‌লাভ ইভানভ । ভাগ্যবান ম্যান্ডেলস্ট্যাম, কারণ কবি মায়াকোভস্কি, খলেবনিকভ, ব্লক, প্রমুখের মতো তাঁকে যেতে হয়নি যুদ্ধে, বরং খন্ডকালিন প্রেমের সূত্রে তিনি মেরিনা সেভেতইয়াভার সাথে ঘুরে ফিরবেন ক্রিমিয়ায়, এশিয়ার স্তেপভূমিতে, ভীত হবেন এই ভেবে যে বর্ব্বর এশিয়াটিক পৃথিবী তাকে গিলে ফেলবে, যেভাবে ভয় পেয়েছিলেন তাঁর পূর্বসূরি– কবি বারাতিনস্কি । অন্যদিকে, এ-এমনই এক সময়, যখন রাশিয়া অনিবার্যভাবে এগিয়ে চলছে ১৯১৭-খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর বিপ্লবের দিকে, যখন তিনি আগ্রহী হবেন লুনাচারিস্ক এবং বুখারিনের সাথে কাজ করতে, তবু রাশিয়ার বিপ্লবকে তিনি দেখবেন তাঁর কবিতা, ‘স্বাধীনতার গোধূলিবেলায়’ যেভাবে বিপ্লব তাঁর ভাবনায় বিধৃত হয়েছে ; বিপ্লবকে দেখবেন ‘মহাজাগতিক বিপর্যয় হিসেবে, যখন পৃথিবী তার অক্ষচ্যুত —।’ মেরিনা সেভেতইয়াভার কাছে তিনি হয়ে উঠবেন ‘তরুণ দারযাভিন’–কারণ পূর্বসূরি দারযাভিনের কবিতায় ‘পেত্রোগ্রাদ’ যেভাবে হয়ে উঠেছিল মৃতদের পুণ্যভূমি, ‘যেখানে প্রসারপিণার রাজত্ব সবার ওপর’ একইভাবে তাঁর কবিতা ‘ত্রিস্তিয়া’ সমাঙ্গ হয়ে উঠবে পিটার্সবুর্গ নগরীর আসন্ন পতনের বিষয় হিসেবে, যেভাবে পুশকিনের ‘ব্রোঞ্জ হর্সম্যান’ এবং দস্তয়োভস্কির নভেলে বিধৃত হয়েছে পিটার্সবুর্গ।

রাশিয়ার এই রাজনৈতিক অস্থির সময়ে অনেক কবির মতো ম্যান্ডেলস্ট্যামও নিভৃতি খুঁজবেন ইতালিয়ান কবিদের কবিতার অনুবাদের মধ্য দিয়ে, পরিচিত হয়ে উঠবেন কবি দান্তে এবং পের্ত্রাকের সাথে, যাঁরা তাঁর কবিতায় রেখে যাবেন বিপুল প্রভাব । মুক্ত চিন্তা, যা প্রলেতারিয়েত রাষ্ট্র-চিন্তার সমাঙ্গ নয়, তা যখন পরিতাজ্য, তখন রাশিয়ার সমাজে নিতান্তই বিজ্ঞানীরা এই ভয়ংকর অবস্থার খানিকটা বাইরে ছিলেন, সেই সুবাদে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন প্রাণিবিজ্ঞান এবং মহাকাশবিদ্যার সাথে । ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন নব্য-লামার্কবাদী বরিস কাজিনের সাথে । ম্যান্ডেলস্ট্যাম লামার্কের অভিব্যক্তিবাদের সাথে সাজুয্য খুঁজে ফিরবেন দান্তের দোজখ ধারণার সাথে এবং লিখবেন ‘লামার্ক’ এবং ‘পের্ত্রাক’ নামে সমূহ-কবিতা এবং উচ্চকিত করবেন এমন এক জগৎ, যা রাশিয়ান সাহিত্যিকদের তৎকালিন অবস্থাকেই দেখিয়ে দেয়, যা দোজখের সমান্তরাল ।

কবি ম্যান্ডেলস্ট্যামের কখনোই আনুগত্য প্রকাশ করেন নি সোভিয়েত রাশিয়ার প্রলেতারিয়েত রাষ্ট্র-ব্যবস্থার কাছে, বরং তাঁর কবিতার পংক্তি, ‘তার ক্লেদাক্ত আঙ্গুল যা কীটের মতো’ স্তালিনের গোচরে আসবে, কারণ রাশিয়ার কবিতা নিয়ে আগ্রহ ছিল স্তালিনের সারাজীবনের, কারণ তিনি নিজে জর্জিয়ার রোমান্টিক কবি ছিলেন, কিন্তু ম্যান্ডেলস্ট্যাম বেঁচে যাবেন পাস্তারনাক এবং বুখারিনের হস্তক্ষেপের কারণে, ম্যান্ডেলস্ট্যাম দ্বীপান্তরিত হবেন উরালে, ব্যর্থ হবেন আত্মহত্যার প্রচেষ্টায়, এবং তিন বছরের জন্য নির্বাসিত হবেন ভরনেজে এবং লিখবেন তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা কবিতাগুলো । রাশিয়ার গুপ্তচর-বাহিনীর চোখ থেকে এই কবিতাগুলো বালিশের ভিতরে, সসপেনে লুকিয়ে রাখবেন তাঁর জীবনসঙ্গী নাদেজদা ইয়াকোভলেভনা এবং প্রেমিকা নাতাশা শেতেম্পেল। কবি আনা আখমাতোভা এসে দাঁড়াবেন এই দুই সাহসী নারীর পাশে এবং ১৯৬১-খ্রিস্টাব্দের পরে প্রকাশিত হবে ভরনেজে উচ্চারিত এবং লিখিত অনেক কবিতা । কিন্তু এর অনেক আগেই নির্বাসনে অর্ধোভুক্ত, অর্ধোন্মাদ কবি ওসিপ এমিলিয়েভিচ ম্যান্ডেলস্ট্যাম রাশিয়ার সাইবেরিয়ায় একটি ট্রানসিট ক্যাম্পে মারা যাবেন ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের সাতাশ তারিখে ।
osip-statu.jpg
পরিশেষে এই কথা বলা বোধকরি অসঙ্গত হবে না যে কবি ম্যান্ডেলস্ট্যামের কবিতা লামার্কবাদী, ইতিহাসাশ্রয়ী, এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বিশ্বাসী হয়েও শেষাবধি হয়ে উঠেছে এক বিষাদগাথা, রাশিয়ান কবিতায় যার সর্ব্বোত্তম প্রকাশ ঘটেছে তাঁর ‘ত্রিস্তিয়া’ কবিতায় । ‘ত্রিস্তিয়া’ কবিতার ‘অভিষিক্ত পথিকের কষ্টের সাথে এক হয়ে মিশে থাকে মিউজের গান আর নারীর বিলাপ’ পংক্তির পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়ে যায় ‘নাতাশা শেতেম্পেলর প্রতি’ কবিতার লাইন, ‘কোনো কোনো নারী আছেন, যারা আর্দ্র পৃথিবীর মতো, যাদের প্রতিটি পদক্ষেপ মূর্ত করে গভীর ক্রন্দন’ কিংবা ‘একটি হাসির উদ্ভোদন’ কবিতায়, ‘নারীর কণ্ঠ হয়ে আমি আছি মহাবিশ্বের ভাবসমাধিতে, যেন নিঃশ্চুপ হয়ে আছে একটি বাঁশি ।’ আর এসবই হয়েছে পিটার্সবুর্গকে ভালোবেসে, পিটার্সবুর্গ থেকে গুলাগ দ্বীপপুঞ্জে নির্বাসিত হয়ে ; আর এই সেই পিটার্সবুর্গ যা তাঁর কবিতায় উচ্চকিত হয়ে আছে, ‘পিটার্সবুর্গ– যা আমার হাতের শিরার মতো দৃশ্যমান, যা আমার চোখের জলের মতো পরিচিত ।’

ত্রিস্তিয়া

রাতের অবিন্যস্ত ক্রন্দনের ভিতরে
আমি বিদায় সম্ভাষণ শিখেছি ।
দেখেছি, ধীরগামী শকটের মতো ক্লান্তিকর অপেক্ষায়
নগরীর ঘড়ি সময়কে ভোরের আলোর দিকে বয়ে নিয়ে যায় ।
হৃদয়ের বিভূতিতে আমি মান্য করি সেই কাক-ডাকা-ভোর,
যখন দূর যাত্রাপথে চোখের জলে
অভিষিক্ত পথিকের কষ্টের সাথে এক হয়ে মিশে থাকে
মিউজের গান আর নারীর বিলাপ ।

কে জানে ভবিষ্যত আমাদের জন্য কী বিচ্ছেদ বিন্যস্ত রেখেছে, যাকে
মানুষের এই পৃথিবীতে আমরা ‘বিদায়’ বলে জেনেছি ।
ভোরের আলো যখন নগরীর দুর্গকে প্রজ্জ্বলিত করে, তখন
মোরগের কর্কশ স্বর কি বার্তা বয়ে নিয়ে আসে ?
এবং কোনো এক নূতন যুগের প্রারম্ভে,
যখন অলস বৃষ আস্তাবলে জাবর কাটে, তখন
মোরগ, যা কিনা নূতন যুগের বার্তাবাহী,
নগর প্রাচীরে দাঁড়িয়ে কেনো ডানা ঝাপ্‌টায় ?

আমি ভালোবাসি তন্তু-বুননের-প্রক্রিয়া–
স্পিন্ডলের অস্পষ্ট গুঞ্জন আর শাটলের ক্লীক ।
আমাদের দিকে অবতরণরোহী, নগ্ন পায়ের সেই ভেড়ার পালিতা,
যার নাম ডেলিয়া, রাজহংসীর মতো কীভাবে ভেসে যায় দিগন্তে !
জীবনের মর্ম্মমূলে এ কী দারিদ্র্য,
সুখের ভাষা বেদনা-জড়িত কী করুণ !
সব কিছুই অতীতে যেন ছিল, আবার এসে আমাদের অতিক্রম করে যাবে,
আর চিনতে পারার সেই খন্ডিত-মুহূর্ত শুধু অনুভবে অবলুপ্ত হবে ।

তবে তাই হোক- যেভাবে একটি কাঠবেড়ালির ত্বক
শুষ্ক হতে থাকে, সেইভাবে একটি স্বচ্ছ দেহ
চীনামাটির পাত্রে শায়িত ;
আনত এক কিশোরীর শরীর মোমের দিকে অনিমেষ তাকিয়ে আছে ।
কেইবা গ্রীকদের নরকের দরোজা অনুভব করতে পারে ?
মোম নারীদের জন্য, আর ব্রোঞ্জ পুরুষদের ।
রণক্ষেত্রে আমাদের ভাগ্য নির্ধারিত, কিন্তু
নারীরা গণনায় তাদের মৃত্যুর দিনক্ষণ সঠিক জানে ।

[১৯১৮]

পিটার্সবুর্গ

পিটার্সবুর্গে আমরা আবার মিলিত হবো,
যেন এখানেই আমরা শায়িত রেখেছি পরিশ্রান্ত সূর্যকে
এবং প্রথমবারের মতো আমরা উচ্চারণ করব একটি শব্দকে,
যা উদ্ভাসিত, কিন্তু প্রকান্তরে অর্থহীন ।
কালো মখমলের মতো এই সোভিয়েত রাতের গভীরে,
সর্ব্বব্যাপ্ত শূন্যতার কালো আস্তরণে
মধুক্ষরা পুণ্য প্রেয়সীর চোখ আজও গান গায়
এবং সেইখানে ফোটে ফুল–অজর, অমর।

বন্য বিড়ালির মতো আগ্রাসী এই রাজধানী, আর
ব্রীজের ওপর পাহারারত একজন সশস্ত্র প্রহরী ;
আওয়াজ করে কাক্কু হর্ণবিশিষ্ট একটি গাড়ি
রাতের অন্ধকারে শুধু গাড়ির ইঞ্জিনের রাগী ঘর্ঘর শব্দ
আজকের এই রাতের জন্য আমি চাই না কোনো প্রবেশপত্র
কারণ সশস্ত্র প্রহরীকে নিয়ে আমি নই ভীত,
সোভিয়েত রাতের গভীরে, আমি একটি শব্দের জন্য প্রার্থনায় উজ্জীবিত
যে শব্দ পুণ্যতর, কিন্তু প্রকান্তরে অর্থহীন ।

থিয়েটারের অভ্যন্তরে পাতার খসখস শব্দের মতো
আমি শুনি এক কিশোরীর ক্রন্দন, যখন
আফ্রোদিতির হাত গোলাপ ফুলের স্তবকের ভারে নত,
কিন্তু যা কখনোই ভূতলে পতিত হবে না ।
বনফায়ারের উত্তাপে আমরা ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠি
এইভাবে হয়তো পেরিয়ে যাবে মহাকাল, আর পুণ্যাত্মা নারীদের
আদরণীয় হাত জড়ো করবে আমাদের ভঙ্গুর দেহের ছাই ।

কোথাও জেগেছে লাল ফুলের বিছানা,
ঐশ্বর্যময় ড্রয়ার, আর দেয়ালের গাত্রে সারবন্দি বাক্স, এবং
ঘড়ির কাঁটার মতোই সুবিন্যস্ত অফিসার যিনি
অবজ্ঞাভরে তাকিয়ে আছেন পৃথিবীর দিকে ।
দুঃশ্চিন্তা নেই, যদি আমাদের মোমবাতি নিভে যায়
অসীম গহ্বরের কালো আস্তরণে;
পুণ্যাত্মা নারীদের ঝুঁকে আসা কাধ আজও গান গায়,
কিন্তু তুমি দেখবে না সেই রাতের সূর্যকে ।

[নভেম্বর ২৫, ১৯২০]

লেনিনগ্রাদ
আবার এসেছি ফিরে লেনিনগ্রাদে, আমার রোগক্লিষ্ট শৈশবের বিষণ্ন নগরী —
যা আমার হাতের শিরার মতো দৃশ্যমান, যা আমার চোখের জলের মতো পরিচিত ।

কড-লিভারের ল্যাম্পগুলো, যা আছে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে তাদের অবারিত করো,
আর তাদেরকে বুঝে নাও নিজের অস্তিত্বে, যেহেতু আবার এসেছো ফিরে তুমি এই লেনিনগ্রাদে ।

চিনে নাও আলকাতরায়পূর্ণ বিষাক্ত ডিমের কুসুমের মতো
শীতের এই হ্রস্বতম দিনগুলোকে ।

আমার এখনও মৃত্যুর ইচ্ছা জাগেনি, পিটার্সবুর্গ–
তোমার কাছে রয়ে গেছে আমার বন্ধুদের ফোন নাম্বারগুলো ।

পিটার্সবুর্গ, আমার কাছে এখনও অনেক ঠিকানা আছে
যেখান থেকে আমি মৃতদের কণ্ঠস্বর জাগাতে পারি ।

বাড়ির পশ্চাতে আমি বাস করি, এবং বাড়ির ঘন্টা
আমার মাথায় আঘাত করে, আর চূর্ণবিচূর্ণ করে আমার এ-শরীর ।

তোমাদের সেইসব অতিথিদের জন্য সারারাত অপেক্ষায় উন্মুখ আমি —
শুনব, হাতকড়ার শব্দের মতো, অন্ধকারে দরজার কড়া-নাড়া ।

[ডিসেম্বর ১৯৩০]

যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে থাকে

যখন উত্তাপ ক্রমশ নিভে আসে, আর পৃথিবী যখন ঘুমিয়ে পড়ে,
এবং পশুদের চিত্তে নেমে আসে রাজহংসীর নিরবতা,
যখন আকাঙ্খার অস্থিরতায় এই রাত্রি আবর্তনশীল, আর
বাতাস এসে দোলায় এই বিপুল তরঙ্গকে–

তখন অনুভব করি, পুড়ে যাই, ভেঙ্গে পড়ি, আমি কাঁদি ; কিন্তু সে আমাকে শুনে না,
বরং এক অবিভাজ্য সখ্যতায় থেকে যায় পরিবর্তনহীন
সারারাত তাকে আমি দেখি, এবং পূর্বের মতোই
কোনো এক দূরবর্তী আনন্দে সে নেয় তার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ।

জলের প্রবাহ বলে কোনো এক দ্বৈরথের কথা, যদিও সে একই বসন্ত–
কঠোর এবং মধুর–
আমার প্রিয়তমা কি সেই একই দ্বিত্বতায় আচ্ছাদিত ?

একই দিনের গভীরে কতো সহস্রবার
বাস্তবতায় মরে গিয়ে আমি বিস্মিত, এবং
আবার জেগে উঠি সে একই অভাবিত বিস্ময়ে ।

[১৯৩৪]

অজ্ঞাত সেই সৈনিকের প্রতি পংক্তিমালা
(দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিহত কবি মিখাইল লারমন্তভ)

[এক]

দিগন্ত-বিস্তৃত যার হৃদয়, সেই বাতাস
হোক সাক্ষীঃ
খননে যা সর্ব্বব্যাপ্ত, ক্রিয়াশীল–
যেভাবে ব্যাপ্ত সমুদ্র-জানালাহীন, গভীর ।

এই সেই নক্ষত্র, কী শূন্যতায় ভরপুর !
সর্ব্বভূতে যার দৃষ্টি, (কিন্তু কী-ই-বা এসে যায়)
বিচারক এবং সাক্ষীকে দোষী করে
জানালাহীন এই সমুদ্রের কাছে ?

বৃষ্টির মধ্যে নিহিত সংকেত– অনাহুত কৃষক এক-
যিনি প্রস্তরখন্ডে বুনে দেন নামহীন মন্ত্রবীজ
আর ক্রুশের এই অরণ্য যা দেখিয়ে দেয়
সর্বগ্রাসী যুদ্ধ, আর অগণিত সৈন্য যারা আজ মৃত।

শীতে ক্লান্ত জরাজীর্ণ মানুষ থাকবে বেঁচে
তারা মত্ত হবে যুদ্ধে, করবে ফুর্তি, তবু তারা থেকে যাবে ক্ষুধার্ত
আর তাঁর সুবিখ্যাত স্তম্ভের নীচে মৃতশয্যায় শায়িত হবে
নাম-না-জানা কোনো এক সৈনিক ।

হে সোয়ালোস১ ক্ষুদ্র-ক্ষিপ্র পাখি, আমাকে শেখাও–
যে তুমি ভুলেছো উড্ডীন ;
হালশূন্য, পাখাহীন আমি কীভাবে
ঠিক রাখি আকাশে নিমজ্জমান এই সমাধি ।

আর কবি মিখাইল লারমন্তভের জন্য আমি
রেখে যাব এই সত্যাখ্যান–একমাত্র কবরই
এই কুব্জপৃষ্ঠকে করতে পারে লম্বমান, যখন
বাতাস-গহ্বর আমাদের লুফে নেয় ক্রমশঃ নীচে, গভীর আঁধারে ।

[মার্চ ৩, ১৯৩৭]

নাতাশা শেতেম্পেলের প্রতি

শূন্য, পরিত্যক্ত পৃথিবীতে এই পথ চলা– খঞ্জ হংসী যেন
অসম অথচ সুন্দর তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ
ক্ষিপ্রতায় তাঁর দ্রুতগামী বন্ধু এবং প্রেমিক থেকে সে সামান্যই এগিয়ে
শারীরিক অসুস্থতা– এই প্রতিবন্ধী স্বাধীনতা, যা তাকে করে দ্বিধাগ্রস্থ,
তাই তাকে করে সম্মুখবর্তী, করে অগ্রগামী ; তবু
কোনো এক চিন্তা, কোনো এক অনুভব তাকে করে ক্ষণিক স্তম্ভিত
কারণ, এখন বসন্ত, যা আমাদের সকলের প্রতি উৎসারিত–
আমাদের মৃত্যুর আদিকল্পে আদিম মাতা, এবং
আমাদের প্রতিটি মৃত্যুতে ঘটে তারই উদ্বোধন, এ যেন তারই পুনর্জন্ম ।

কোনো কোনো নারী আছেন, যারা আর্দ্র পৃথিবীর মতো,
যাদের প্রতিটি পদক্ষেপ মূর্ত করে গভীর ক্রন্দন ;
তাঁরা আছেন মানুষের শবযাত্রায়, আরও আছেন
প্রতিটি পুনর্জন্মে, জন্ম-অভিষেকে ।
তাদের কাছ থেকে চুম্বন প্রার্থনা অন্যায়, এবং তাদের
থেকে বিদায় নেয়া আরও বেশী কষ্টকর, যা আমাদের সহ্য-সীমার বাইরে
আজ যিনি দেবদূতী, আগামীকাল তিনি মাটির গভীরে কৃমি-কীট,
আর পরশু তিনি হয়ে উঠবেন কোনো এক দূরবর্তী সীমারেখা
যা ছিল একদিন পদক্ষেপ, তাই হয়ে উঠবে আমাদের আয়ত্তের বাইরে আর এক পদক্ষেপ
ফুল অবিনাশী, বেহেশত অবিভাজ্য– সম্পূর্ণ একক ।
আর যা থেকে যাবে, তা হোল শূন্য এক প্রতিশ্রুতি ।

[মে ০৪, ১৯৩৭]

পাদটীকা

ত্রিস্তিয়া

রোমান কবি ওভিদ কৃষ্ণ সাগরের তীরে কেনো এক দ্বীপে নির্বাসিত হবার আগে শেষ-রাত যাপন করেছিলেন রোমের এই নগরী– ত্রিস্তিয়ায়, যেখানে তিনি কখনো আর ফিরে আসতে পারেন নি । একইভাবে ওসিপ ম্যান্ডেলস্ট্যাম ভরনেজে স্তালিন-কর্তৃক নির্বাসিত হবার পর তাঁর অতিপ্রিয় নগরী পিটার্সবুর্গে আর কখনো ফিরে আসার সুযোগ পান নি । মোম নারীদের জন্য, আর ব্রোঞ্জ পুরুষদের– যা আনা আখমাতোভার একটি কবিতা থেকে উদ্ধৃত, কিন্তু ম্যান্ডেলস্ট্যাম-কর্তৃক অনুল্লেখিত, যা নির্দেশ করে এক ঐন্দ্রজালিকতা, যেমন জলের মধ্যে গলিত মোমের বিন্দু-বিন্দু ঝরে পড়া ।

পিটার্সবুর্গ

পিটার্সবুর্গে আমরা আবার মিলিত হবো–সম্ভবত ওলগা আরবেনিনা-কে নিয়ে লেখা । আমরা পরিশ্রান্ত সূর্যকে শায়িত রেখেছি– পুশকিনকে উৎসর্গীকৃত একটি পংক্তি ।

লেনিনগ্রাদ

আবার এসেছি ফিরে লেনিনগ্রাদে– পিটার্সবুর্গে বসবাসের নিমিত্তে এই হোল কবির শেষ প্রচেষ্টা । সেইসব অতিথিদের জন্য সারারাত অপেক্ষায় উন্মুখ আমি– ব্যাঙ্গার্থে এখানে ‘সেইসব অতিথি’ হোল ‘সোভিয়েত গুপ্তচর কিংবা সোভিয়েত পুলিশ’ ।

যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে

মীথ আছে যে গুলাগ দ্বীপপুঞ্জে নির্বাসিত হয়ে তাঁর যাত্রাপথে বনফায়ারকে প্রদক্ষিণ করে ম্যান্ডেলস্ট্যাম উদাত্ত কণ্ঠে পের্ত্রাকের কবিতা আবৃত্তি করতেন । এই কবিতায় প্রাণিবিজ্ঞানী লামার্কের অভিব্যক্তিবাদ, পের্ত্রাক এবং দান্তের জগৎ জড়াজড়ি করে আছে ।

অজ্ঞাত সেই সৈনিকের প্রতি পংক্তিমালা

রাশিয়ান কবি মিখাইল লারমন্তভ (১৮১৪-১৮৪১) যিনি প্রেমের কারণে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিহত হন । কবিতার শেষাংশে কবি ম্যান্ডেলস্ট্যাম নিজের মৃত্যুকেই ঈঙ্গিত করছেন । [মীথ আছে যে– সোয়ালোস, ক্ষুদ্র এক পাখি– যা মৃত আর জীবিত–এই দুই জগতের মধ্যে সাঁকো নির্মাণ করে চলছে ] ।

নাতাশা শেতেম্পেলের প্রতি

ভেরোনেজের নির্বাসিত জীবনে এই অল্প-বয়স্ক খঞ্জ-বান্ধবী তাঁর অনেক পান্ডুলিপি ‘সোভিয়েত পুলিশ’ এবং ‘সোভিয়েত গুপ্তচর বাহিনী’র হাত থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন ।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জীঃ
[১] দি নয়েজ অফ টাইমঃ সিলেক্টড প্রোজ, ওসিপ ম্যান্ডেলস্ট্যাম, নর্থওয়েষ্টার্ন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৩
[২] অল দ্যাট ইজ সলিড মেলট্‌স ইন্টু এয়ারঃ দি এক্সপেরিয়েঞ্চ অফ মডার্নিটি, মার্শাল বারম্যান, পেঙ্গুইন বুক্‌স, ১৯৮২
[৩] ওসিপ ম্যান্ডেলস্ট্যামঃ সিলেক্টেট পোয়েমস, জেম্‌স গ্রীন কর্তৃক নির্বাচিত এবং অনুদিত, পেঙ্গুইন বুক্‌স, ১৯৮৯
[৪] ওসিপ ম্যান্ডেলস্ট্যামঃ পঞ্চাশটি কবিতাঃ বার্নাড মিয়ারস কর্তৃক অনুদিত, পারসিয়া বুক্‌স, ১৯৭৭
[৫] দি সিলেক্টেড পোয়েমস অফ ওসিপ ম্যান্ডেলস্ট্যাম, ক্লারেন্‌স ব্রাউন এবং এস মারুইন কর্তৃক অনুদিত, নিউইয়র্ক রিভিউ বুক্‌স, ১৯৭৩
[৬] দি মস্কো এ্যান্ড ভরনেজ নোট বুক্‌সঃ ওসিপ ম্যান্ডেলস্ট্যাম পোয়েমস (১৯৩০-১৯৩৭), রিচার্ড এবং এলিজাবেথ ম্যাক্কেন কর্তৃক অনুদিত, ব্লাডেস্ক বুক্‌স, ১৯৯১

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (7) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Subrata Augustine Gomes — মে ৩১, ২০১২ @ ২:৩৩ পূর্বাহ্ন

      খুব ভালো লাগল, তাপস।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Ankur Saha — মে ৩১, ২০১২ @ ১২:০৭ অপরাহ্ন

      খুব ভালো লাগলো। চমৎকার কাজ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আলোড়ন খীসা — মে ৩১, ২০১২ @ ১:৪৬ অপরাহ্ন

      তাপস দা,
      অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। ওসিপ ম্যান্ডেলস্ট্যাম নিয়ে অনেক কিছু জানতে পারলাম আপনার লেখাটি পড়ে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন hasan shahriar — জুন ১, ২০১২ @ ৩:২৫ পূর্বাহ্ন

      চমৎকার অনুবাদ।কিন্তু একটা কথা না বলে পারছি না।যদিও আমি ঠিক নিশ্চিত নই এটা প্রাসংগিক হবে কিনা। কবি সম্পর্কে প্রাথমিক আলোচনায় বলা হয়েছে স্ট্যালিন তাকে বিতাড়িত করেছে। এতটুকু বললে মনে হবে কবি যেন এক স্বৈরশাসকের পাল্লায় পড়েছিলো যা পুরোপুরি একটা মিথ্যা ছাড়া আর কিছু নয়।শ্রমিক শ্রেনীর রাষ্ট্রব্যবস্থায় যাকেই প্রতিকূল মনে হয়েছে স্ট্যালিন তাকে শাস্তি দিয়েছেন,দিয়েছেন মৃত্যুদন্ড।এবং এটা অনিবার্য ছিলো।এক্ষেত্রে কবিকে অনেক ভাগ্যবান মনে হয়!! স্ট্যালিনের ভুল ছিলো তিনি কিছু ক্ষমাও করেছিলেন যার চরম মূল্য দিতে হয়েছে ১৯৫৩সালে তার মৃত্যু পরবর্তী রাশিয়া যখন ১৯৫৭ সালে সমাজতন্ত্রের মুখোশ পরে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদে পরিনত হয়। আশা করছি আগামী প্রজন্ম এই ভুল আর করবে না।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Taposh Gayen — জুন ২, ২০১২ @ ৭:০১ পূর্বাহ্ন

      প্রিয় হাসান শাহরিয়ার,

      ওসিপ ম্যান্ডেলস্ট্যাম পরম সৌভাগ্যবানই ছিলেন, যেহেতু স্তালিন তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেন নি, যদিও অনেক কবি, সাহিত্যিক, এবং তাত্ত্বিক ফায়ারিং স্কোয়াডে প্রাণ হারিয়েছিলেন । সেই ঐতিহাসিক তথ্যের আলোচনা আমার এই লেখার প্রধান বিষয় নয় ; আমি বরং এই লেখায় দেখাতে চেষ্টা করেছি, জৈব-সত্তার পাশাপাশি কোন্ ঐতিহাসিক অর্থে, কোন্ সামাজিক শর্তে, কোন্ জ্ঞানপ্রবাহে অবগাহনের ফলে একটি সৃষ্টিশীল সত্তার জন্ম হয় এবং তা ক্রমশঃ আভাষিত হয়ে ওঠে ।

      তবু একথা আমাদের জানা থাকা দরকার যে কবি এবং ঔপন্যাসিক বরিস পাস্তারনাক এবং বিখ্যাত মার্কসবাদী তাত্ত্বিক এবং সোভিয়েত পলিটব্যুরোর সদস্য নিকোলাই বুখারিন স্তালিনের কাছে ম্যান্ডেলস্ট্যামের প্রাণ ভিক্ষা করেছিলেন । ফলশ্রুতিতে ম্যান্ডেলস্ট্যাম নির্বাসিত হয়েছিলেন । লেনিনের মৃত্যুর পরে স্তালিনের অনেক কর্মকান্ডকে বুখারিন অনুমোদন করেন নি । এই কারণে, ‘ট্রায়াল অফ দি ট্যুয়েনটি ওয়ান (মার্চ, ১৯৩৮)’-এ বুখারিন অভিযুক্ত হন এবং আরও বিশ-জনের সাথে বুখারিনকেও নির্মূল করা হয় । প্রকৃতপক্ষে, তিন অধ্যায়ে (‘ট্রায়াল অফ দি সিক্সটিন (১৯৩৬)’; ‘ট্রায়াল অফ দি এ্যান্টি সোভিয়েত ট্রটস্কি সেন্টার (১৯৩৭)’ ; এবং ‘ট্রায়াল অফ দি ট্যুয়েনটি ওয়ান (১৯৩৮)’ অনুষ্ঠিত ‘মস্কো ট্র্যায়াল’-এ এটি ছিল তৃতীয় অধ্যায় । এ-ইতিহাস সোভিয়েত রাশিয়ার একটি কালো অধ্যায় এবং সে আলোচনা দীর্ঘ এবং জটিল । সুতরাং, এই আলোচনা এখানে সংক্ষিপ্ত হতে বাধ্য । একান্ত নিভৃতে, বন্ধুদের মধ্যে যে কবিতাটি পাঠের কারণে স্তালিন কর্তৃক ম্যান্ডেলস্ট্যাম নির্বাসিত হয়েছিলেন, তার আংশিক এখানে অনুদিত হল ।

      আমাদের পায়ের নীচে দেশমাতৃকার ভূমি অনুভব না করেই আমরা বেচেঁ আছি
      দশ ফুট দূরে তুমি শুনবে না আমাদের উচ্চারিত শব্দমালা,

      তবু থেকে যাবে অর্ধোচ্চারিত কথোপকথনের কিছু শব্দ, যা গোচরীভূত হবে
      ‘ক্রেমলিনের সেই উন্মাদ মানুষটির কাছে, যিনি কৃষকের হত্যাকারী এবং …….’

      যার হাতের প্রতিটি আঙ্গুল ক্রিমির মতো পিচ্ছিল এবং মোটা,
      এবং দশ-টনের মতো ভারী তাঁর শব্দ-সমূহকে আমাদের শুনতে হবে

      তেলা-পোকার শুড়ের মতো কম্পমান তাঁর গোফ,
      এবং উজ্জ্বল, চক্চকে তাঁর বুট কেবলি আলো ছড়ায়
      [অসম্পূর্ণ]

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Abu Sayeed Obaidullah — জুন ৩, ২০১২ @ ৯:৩০ পূর্বাহ্ন

      চমৎকার আলোচনা। অনেক অজানাকে জানলাম। শুভেচ্ছা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন hasan shahriar — জুন ৫, ২০১২ @ ১:৩৩ পূর্বাহ্ন

      আপনার কাজের জন্য অনেক ধন্যবাদ।আপনার কথাই ঠিক, যে মস্কো ট্রায়াল (৩য় অধ্যায়)কে আপনি সোভিয়েত শাসনের কালো অধ্যায় বলে উল্লেখ করেছেন,তা নিয়ে এখানে আলোচনা সংক্ষিপ্ত হওয়াই জরুরী। তবে আশা করছি কোন একদিন আমাদের দেখা হবে এবং এ নিয়ে আমরা একটা প্রাঞ্জল আলোচনা করব।হয়ত আমি আপনাকে দেখাতে সক্ষম হব স্ট্যালিনকে নিয়ে যে অপপ্রচার করে পশ্চিমা বিশ্ব স্বস্তিবোধ করে,তা কতটা মিথ্যা আর অভিসন্ধিমূলক। আবারো আপনাকে ধন্যবাদ।ভালো থাকবেন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।