জার্নাল, প্রবন্ধ, শ্রদ্ধাঞ্জলি, স্মরণ, স্মৃতি

কার্লোস ফুয়েন্তেসের মৃত্যু:

সমাহিত দর্পন?

রাজু আলাউদ্দিন | 24 May , 2012  

fuentes-2.jpg
কার্লোস ফুয়েন্তেস। (ছবি:রাজু আলাউদ্দিন)

মাকড়সা সম্পর্কে যারা খোঁজ খবর রাখেন তারা জানেন যে এক ধরনের মাকড়সা আছে যাদেরকে ইংরেজিতে বল ট্র্যাপডোর স্পাইডার, এরা খাবারের জন্য দূর-দূরান্তে ঘুরে বেড়ায় না। নিজের ঘরের কাছেই শিকারের জন্য ওৎ পেতে বসে থাকে। শিকার বা খাবারটা কাছে এলেই ওর উপর ঝাপিয়ে পরে সে। আমি অনেকটা এই ধরনের মাকড়সার মতো। ১১ বছর মেহিকোর উত্তর সীমান্ত এলাকা তিহুয়ানাতে থাকলেও সেখান থেকে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার প্লেনের দূরত্বে মেহিকো সিটিতে গিয়ে আমার প্রিয় লেখকদেরকে চাক্ষুষ করার ইচ্ছে হলেও যা্ওয়া হয়নি কখনো। বলা ভালো আলস্য আমার ইচ্ছাকে জয়ী হতে দেয়নি কখনো। অবশ্য জয়ী হলেও যে দেখার সুযোগ পেতাম তারও কোন নিশ্চয়তা ছিলো না। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার এই যে প্রকৃতির মধ্যেও বোধ হয় সবরকম বৈশিষ্ট্যের প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখার এবং পুরস্কৃত করার একটি গোপন বিধান সক্রিয় আছে। হয়তো সেই কারণেই আমি এই পুরষ্কারটি পেয়েছিলাম ২০০৮ সালের ২৪ এপ্রিলের এক বিকেলে।

সান দিয়েগোতে মেহিকো দূতাবাসের সংস্কৃতি বিভাগের সচিব পেদ্রো ওচোয়ার সাথে আমার আগেই পরিচয় ছিলো। উনি জানতেন সাহিত্য সম্পর্কে আমার প্রবল আগ্রহের কথা। আমি একটু আধটু লেখালেখি করি এটা্ও তিনি প্রসঙ্গক্রমে জেনেছিলেন। ওচোয়া আমাকে
একদিন ফোন করে জানালেন যে কার্লোস ফুয়েন্তেস আসছেন সান দিয়েগো ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ম্যানডেভিল অডিটোরিয়ামে বক্তৃতা দিতে। আমি চাইলে শ্রোতা ও দর্শক হিসেবে সেখানে যেতে পারি। ওচোয়ার এই সংবাদে আমি রীতিমত অবাক এবং বিহবল বোধ করি। ফুয়েন্তেসকে দেখতে পাবো ? রীতিমত বিষ্ময়কর ব্যাপার। আবেগ ও উত্তেজনায় আমি প্রায় তোতলামির পর্যায়ে চলে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ওচোয়াকে তা বুঝতে না দিয়ে বললাম, ”অবশ্যই যাবো। কিন্তু কবে?” বললেন, “ তোমাকে মেইল করেছি। ২৪ এপ্রিল। এপ্রিল! এলিয়ট তাহলে মিথ্যাই বলেছেন, ”এপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মান্থ…” কে বলে নিষ্ঠুরতম মাস? এতো পরম করুণার মাস।

আবেগ, উত্তেজনা আর অস্থিরতাকে ধীরে ধীরে সামলে নিয়ে আমি প্রস্তুত হতে থাকি ২৪ তারিখের জন্য। আমার স্ত্রী মারিসোলকে বললাম উত্তেজনাকর এই সন্দেশের কথা। আমার স্ত্রীর বাড়িও ফুয়েন্তেসের মতোই ভেরাক্রসে। রসিকতা করে বললাম উনি হয়তো দূর-সম্পর্কে তোমার আত্মীয়ই হবেন্ আর তোমার সূত্রে তিনি আমারও আত্মীয়। চলো দেখে আসি।

তবে তাকে দেখার অনেক আগেই আমি তার লেখার সাথে পরিচিত হয়েছিলাম দেশে থাকতেই। আটের দশকের শেষ দিকে আমি তাঁর নাম এবং লেখার সাথে প্রথম পরিচিত হই। ১৯৮৮ সালের অটাম সংখ্যার Wilson Quarterly তে Discovering Mexico শিরোনামে একটি আত্মজৈবনিক লেখা পড়ে প্র্রেমে পড়েছিলাম তার।carlos-fuentes-6.jpg
কার্লোস ফুয়েন্তেস। (ছবি:রাজু আলাউদ্দিন)

সেই থেকে খুঁজে খুঁজে তার লেখা পড়ছি। তখনও বোধ হয় এখানে তার কোন বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ এসে পৌঁছায়নি। এলে্ও আমার পক্ষে কেনার সামর্থ্য তখন ছিলো না। এইভাবে খুঁজতে খুঁজতে একদিন ইউসিস লাইব্রেরীতে হারপার ম্যাগাজিনের ১৯৮৯ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় পেলাম আরেকটি লেখা Uncle Sam, Stay home শিরোনামে। লেখাটি পড়ে ভীষণ আলোড়িত হয়েছিলাম। ঐ লেখায় তিনি আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করে বিশ্বশান্তির স্বার্থে পরামর্শ দিয়েছিলেন স্যাম চাচাকে ঘরের মধ্যেই থাকতে। তার বের হ্ওয়া মানে বিশ্বশান্তির বারোটা বাজানো। রিগান তখন স্যামের ভূমিকায়। তাঁর সাহিত্যকর্মের সাথে পরিচয় থাকলেও রাজনৈতিক লেখা সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিলো না। একজন লেখক আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে এতো গভীর পর্যবেক্ষণ, স্বচ্ছতা ও সাবলীলতা নিয়ে লিখতে পারেন তা আমার জানা ছিলো না। Discovering Mexico শিরোনামের লেখাটির এক জায়গায় ফুয়েন্তেস বলেছিলেন, ”ওক্তাবিও পাসের উদার বন্ধুত্ব লাভ করে আমি শিখেছিলাম যে সংস্কৃতি, জাতি ও রাজনীতির কোন বিশেষ কেন্দ্র নেই, যেহেতু আমাদের সময়টি হচ্ছে মারাত্মক অবক্ষয়ের সময়, সেহেতু কোন কিছুকেই সাহিত্যের বাইরে রাখা যাবে না।”

পাসের এই শিক্ষাকে তিনি আজীবন কাজে লাগিয়েছিলেন গভীর পাণ্ডিত্য, পর্যক্ষেণ ও বিশ্লেষণের অসামান্য যোগ্যতা নিয়ে। ২০০৪ সালে কন্ত্রা বুশ বা বুশের বিরুদ্ধে শিরোনামে যে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিলো সেখানেও বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার আগ্রাসী ও লোলুপ পররাষ্ট্র নীতির তীব্র সমালোচনা। এই গ্রন্থেরই একেবারে প্রথম প্রবন্ধটিতে রয়েছে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মতো রাজনৈতিক অর্থে গুরুত্বহীন দেশগুলোর উল্লেখ। তাঁর নির্ভুল পর্যবেক্ষণে বাদ যায় না বাংলাদেশের প্রতি হেলিবার্টন ইনকর্পোরেশনের আগ্রহের মূল কারণ: ”হেলিবার্টন ইনকর্পোরেশন তার লালসাকে বিস্তৃত করেছে আলজেরিয়া থেকে এ্যাঙ্গোলা, নাইজেরিয়া থেকে বেনেসুয়েলা, উত্তর সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্য এবং বার্মা থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত। প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের স্ট্যাট সেক্রেটারী জন ফস্টার ডুলস্ বলেছিলেন যে ’আমেরিকার কোন বন্ধু নেই, আছে স্বার্থ।’ অনেকটা দুঃখের সাথেই (ডিক) চেনী বললেন, ‘এটা দু:খজনক যে সদাপ্রভু তেলের খনিগুলো গণতান্ত্রিক জাতিগুলোর হাতে দেন নি।’ ”

পাবলো নেরুদা, অক্তাবিও পাস এবং মারিও বার্গাস যোসার মতো তিনিও বিশ্ব রাজনীতি ও ইতিহাসের বোঝা কাঁধে নিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়। কিন্তু মানুষের প্রতি দায়বোধ থেকে এই বোঝাকে কাঁধে নিতে গিয়ে সাহিত্যবোধকে গনরুচির কাছে বন্ধক রাখার ভুল পথে কখনো এগিয়ে যান নি তারা। অনেক পরে ’লাতিন আমেরিকা ও উপন্যাসের সার্বজনীনতা’ নামক এক প্রবন্ধে তিনি বলেছিলেন: ”এই দায়–বলা যাক ভয়–এ ভয় আমাদের লেখকদেরকে বাধ্য করেছে আইনপ্রনেতা কিংবা শ্রমিকনেতা কিংবা মূখপাত্র, কখনও সাংবাদিক কিংবা সমাজের ত্রানকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে। মূলত এর কারণ হলো চিরাচরিতভাবে আমাদের এ ভঙ্গুর সমাজে এই ভূমিকাগুলো নেবার মতো লোকের অভাব। এই প্রয়োজন বোধের চাপে পড়ে আমাদের লাতিন আমেরিকায় প্রচুর বাজে সাহিত্য লেখা হয়েছে। খনিশ্রমিক অথবা কৃষকদের রক্ষা করতে গিয়ে এমন অনেক উপন্যাস লেখা হয়েছে, যেগুলো না উদ্ধার করেছে শ্রমিকদের না উদ্ধার করেছে সাহিত্যকে। শ্রমিকরা রাজনৈতিক ক্রিয়াকান্ডের মাধ্যমে নিজেদের রক্ষা করবে। সাহিত্যের দায় একেবারে নিখাঁদ রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি না, বরং সাহিত্যের কাজ হলো কল্পনার সংযোগ ঘটিয়ে মূল্যবোধ তৈরি করা এবং ভাষার শক্তিমত্তাকে জাগিয়ে তোলা।”

সমাহিত দর্পন নামে তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৯২ সালে। এটি স্পেন এবং লাতিন আমেরিকার ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে অসামান্য এক বই। এই বইয়ের দর্পনে ফুয়েন্তেস প্রতিবিম্বিত করেছেন উভয় পক্ষের অতীত ইতিহাস ও পারস্পরিক সম্পর্ক। কিন্তু ফুয়েন্তেস কেবল স্পেন আর লাতিন আমেরিকারই দর্পন হয়ে ওঠেননি, তিনি মানব সভ্যতার নানান বিষয়ে আগ্রহ ও চর্চার মাধ্যমে হয়ে উঠেছিলেন গোটা মানবজাতির আকাঙ্খার দর্পন। আর তাই পৃথিবীর অন্যপ্রান্তের জাতি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মকান্ডকে্ও প্রতিফলিত হতে দেখি এই জীবন্ত ও যাদুকরী দর্পনে। ঠিক এই কারণে বাংলাদেশ কিংবা সত্যজিৎ রায়ের মতো ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিও দেখতে পাই তার লেখায়।

ভাবতেই অবাক লাগছিলো অসামান্য এই যাদুকরী দর্পনের মুখোমুখি হবো আমি যেখানে আমাদের এই হতভাগ্য ছোট্ট গবীর দেশটিও অনবহেলায় প্রতিবিম্বিত।

nizar-fuentes.gif
আমার ছেলে নিজার হাবিব স্বাক্ষরের জন্য ফুয়েন্তেসের দিকে বই এগিয়ে দিচ্ছে।(ছবি: মারিসোল রোহাস গনসালেস)

বন্ধু পেদ্রো ওচোয়ার পথনির্দেশিকা নিয়ে এক ঘণ্টা আগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম সান দিয়েগো ইউনিভার্সিটিতে। সঙ্গে আমার স্ত্রী মারিসোল এবং আমাদের একমাত্র ছেলে ছয় বছরের নিজার হাবিব। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পৌঁছে যাওয়ায় লাভ হয়েছিলো এই যে মঞ্চে ওঠার আগেই তাঁকে দেখতে পাওয়ার সুযোগটা পেয়েছিলাম। লালাভ ফর্সা, টিয়ার ঠোঁটের মতো বাঁকানো নাক। তিন/চার জন সঙ্গীসহ মূল অডিটোরিয়ামের পাশের রুমের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। মূল অনুষ্ঠান শুরু হতে তখনও প্রায় পনের বিশ মিনিট বাকি। প্রখরতা আর ক্ষিপ্রতার মিশেলে এক রাগী-দর্শন চেহারা দেখে মনে হবে পরিপূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়া তার মুখোমুখি হওয়াটা বিপদের সম্ভাবনাকেই কেবল বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু ভয় সত্ত্বেও স্বাক্ষর শিকারীদের কাতারে আমরা ঠিকই দাড়িয়ে গেছি ’গ্লোবালাইজেশন: এ নিউ ডিল ফর এ নিউ এজ’ শীর্ষক ঘণ্টাখানেকের বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরপরই। আমার হাতে আমার সম্পাদিত এবং ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত মেহিকান মনীষা নামের বইয়ের একটি কপি। ঐ স্বাক্ষর শিকারীদের মধ্যে আমিই ছিলাম একমাত্র লোক যে আমার স্বাক্ষরসহ তাকে একটি বাংলা বই উপহার দিয়েছিলো।

আমার পালা আসতেই সৌজন্য বিনিময় করে বইটি প্রথমে তাঁকে উপহার দিয়ে এর বিষয়বস্তুর কথা জানাই। মেহিকোর পাঁচজন লেখকের প্রবন্ধের সংকলন। বললাম, ”ঘটনাক্রমে আপনার প্রবন্ধের সংখ্যাই এতে বেশি। মোট পাঁচটি।” প্রত্যেকটির স্প্যানীশ শিরোনাম তাঁকে বললাম। তিনি কৌতুহল নিয়ে দেখছিলেন বাংলা ভাষায় প্রকাশিত তার পাঁচটি প্রবন্ধের তর্জমা। আমার প্রিয় লেখক, বিশ্বসাহিত্যের এক মহান লেখক বাংলা ভাষার মুদ্রিত রূপটি দেখছেন–ভাবতেই আমার হৃদয়ে আনন্দ ও শিহরণের এক রঙ্গীন মাহফিল বসে গেল। বললাম, ” আপনি হয়তো জানেন না বাংলাদেশে আপনার অসংখ্য পাঠক আছে। আপনি কি জানতেন বাংলা ভাষায় আপনার কিছু লেখা অনুবাদ হয়েছে?” স্মিত হেসে ফুয়েন্তেস জানালেন, “না, আমার জানা নেই। তবে তোমার মাধ্যমে জেনে খুশী হলাম যে বাংলাদেশে আমার বইয়ের পাঠক আছে।” তিনি কৌতূহল নিয়ে বইটি উল্টেপাল্টে দেখলেন। বললেন, “ইন্টারেস্টিং। জেনে ভালো লাগছে যে তোমরা আমাদের পড় এবং পছন্দ কর।” আমি তাকে জানালাম, “এই প্রবন্ধগুলো ছাড়াও আপনার কিছু গল্প এবং সাক্ষাৎকারও অনুবাদ হয়েছে বাংলা ভাষায়।” বইটি হাত থেকে না-নামিয়ে জানতে চাইলেন ”এটি কি তুমি আমাকে উপহার দিচ্ছ?” “নিশ্চয়ই, এটা আপনার জন্য। যদিও জানি, আপনি এর এক বর্ণও বুঝবেন না। তবু আপনাকে উপহার দেয়ার আনন্দটুকু পেতে চাই।” বইটি তাঁর সামনে টেবিলে রেখে আমাকে হাত বাড়িয়ে তার উষ্ণতা এবং কৃতজ্ঞতা জানালেন। আমার পেছনে তখনও অনেক স্বাক্ষরশিকারী অপেক্ষা করছেন। তাদের তুলনায় আমি একটু বেশি সময় নিচ্ছি বলে তারা নিশ্চয়ই বিরক্ত হচ্ছেন।

razu-fuentes.gif
আমার দেয়া মেহিকান মনীষা বইটি মনযোগ দিয়ে দেখছেন কার্লোস ফুয়েন্তেস। পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন পেদ্রো ওচোয়া। (ছবি: মারিসোল রোহাস গনসালেস)

এর পর আমি তার বইগুলো বাড়িয়ে দিলাম অটোগ্রাফ দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে। আমার সংগ্রহে থাকা তার ৬/৭ টা বই নিয়ে গিয়েছিলাম। তার কন্ত্রা বুশ বা বুশের বিরুদ্ধে বইটিতে যখন স্বাক্ষর করছিলেন তখন তাকে বললাম, ”বইটির প্রথম প্রবন্ধটিতে বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক অর্থে গুরুত্বহীন এবং দরিদ্র একটি দেশের প্রতি আপনার মনোযোগ দেখে অবাক হয়েছি।” তিনি মাথা তুলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাংলাদেশ তো খনিজসম্পদে সম্মৃদ্ধ একটি দেশ। তোমার দেশ দরিদ্র নয়, দরিদ্র হচ্ছে তোমাদের রাজনীতি।” আমি সত্যি বিস্মিত হয়েছিলাম তার এই পর্যবেক্ষণ এবং মন্তব্যে। এত রকম লেখার পরও আমাদের সম্পর্কে এত খোঁজ খবর নেয়ার সময় পান কখন? এবং যা বললেন তা এতটাই সঠিক যে এই সঠিক তথ্যটুকু জানার জন্য এক গাদা তথ্যের জন্জাল কি তাকে পার হতে হয়নি?

আমার পেছনে তখনও স্বাক্ষর-শিকারীদের দীর্ঘ সারি। আমার ছেলেও তার কাছ থেকে স্বাক্ষর নিতে ভোলে নি। তিনিও অবহেলা করেন নি এই ক্ষুদ্র স্বাক্ষর-শিকারীকে। আমি জানি আমার অনেক কৌতূহল ও প্রশ্নের জবাবে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলে যেতে পারবেন। কিন্তু এখানে তা সম্ভব নয়। আর তারই বা এত সময় কোথায়? তবু, গভীর আনন্দ আর তৃপ্তির কথা এই যে সেদিন তার দর্শনার্থীদের মধ্যে একমাত্র আমিই ছিলাম সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি সময় এই মহান লেখকের কাছ থেকে হরণ করার সুযোগ পেয়েছিলো।

গত ১৫ তারিখ আমার এই প্রিয় লেখককে মৃত্যু কোন রকম পূর্বঘোষণা ছাড়াই ছিনিয়ে নিয়ে গেল। তাঁর সাথে দেখা করার এবং কথা বলার বিরল অভিজ্ঞতার আনন্দের উপর এসে ছায়া ফেলেছে হারানোর গভীর বেদনা। ” অসম্ভব বেদনার সাথে মিশে রয়ে গেছে অমোঘ আমোদ/ তবু তারা করেনাকো পরস্পরের ঋণ শোধ।”

প্রিয় ফুয়েন্তেস, আপনার কালজয়ী অসামান্য রচনা প্রত্যাখ্যান করে আপনার মৃত্যুকে। আমিও প্রত্যাখ্যান করছি। আপনাকে আমাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও সম্মান।

free counters


17 Responses

  1. ফারহানা মান্নান says:

    “বাংলাদেশ তো খনিজসম্পদে সম্মৃদ্ধ একটি দেশ। তোমার দেশ দরিদ্র নয়, দরিদ্র হচ্ছে তোমাদের রাজনীতি।” অসাধারণ একটি পর্যবেক্ষণ ভীষণ সাধারণ ভাবে বলা। লেখককে ধন্যবাদ এমন একজন মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য।

  2. sajid ali says:

    লেখাটির জন্য ধন্যবাদ।

  3. মোঃ আমীর হোসেন শাহীন says:

    লেখককে ধন্যবাদ আর একটু ভালো করে তাকে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য। এ মুহুর্তে আমার আর কোনো মন্তব্য নেই। কার্লোস ফুয়েন্তেসকে তো কেবল জানলাম।

  4. Ziaul Hoque Mukta says:

    Thanks. Would like to read him.

  5. Showkat Ali Talukder says:

    ভাল লাগল লেখকের মূল্যবান ও সাহসী অনুধাবন “দরিদ্র তোমাদের রাজনীতি”। আমরা বলি নোংরা ও নেতৃত্ববিহীন রাজনীতি।

  6. sukur says:

    Our two politicians should read this article first…

  7. কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর says:

    আপনার লেখাটি দারুণভাবে আমায় ছুঁয়ে গেল। যেন একটা সময়কে স্পর্শ করতে পারছি।
    আচ্ছা, ল্যটিন আমেরিকান সেই লেখককের অনূদিত প্রবন্ধ-গ্রন্থটি কি এখন এ্যাভেয়লেবল? সংগ্রহ করতে চাই আর-কি।

  8. রাজু আলাউদ্দিনের লেখাগুলা আসলে আমাদের সামনে ওর পাঠসুত্রটা তুলে ধরে; এতে আমাদের নিজেদের পাঠ-মানচিত্রের বিস্তারের পাশাপাশি তুলনামূলক সাহিত্যের মাত্রাটাও বাড়ে! দ্বিভাষিক দারিদ্রের কারনে বাংলাদেশের সাহিত্য একটা কুপমন্ডুক একমুখিনতায় পর্যবসিত!একাডেমিক আনুষ্ঠানিকতার বাইরে বাস্তব অভিজ্ঞ্বতাজারিত তুলনামূলক সাহিত্যই এই স্থবিরতা থেকে বেরোনোর প্রধান কল্পবন্ধন!

    …নিজার হাবিব, মানে আমার ছোট তরফকে ফুয়েন্তেসের সাথে দেখে কিছুকাল আগে আফ্রিকার নোবেল বিজয়ী নাট্যকার ওলে সোয়িঙ্কার সাথে আমার দেখা হবার কথা মনে পড়লো!সোয়িঙ্কাকে বাংলাতে আমার অনূদিত ওর কাজের কথা জানাবার সময় আমার দেহছন্দ, দেহভাষাও নিশ্চিত এই অবনত নিবিষ্টতায় নিজেকেই সম্মানিত করেছিল!

    পরিতাপের বিষয় যে সোয়িঙ্কাকে যখন বাংলাতে আমার নির্দেশিত, অনুদিত ‘স্ট্রং ব্রিডের” কথা জানাচ্ছিলাম, তখন রাজুর বর্তমান নিবন্ধের একটা লাইন য্যানো লেখা হবার আগেই টেলিপ্যাথির অমোঘ দংশনে আমাকে বিড়ম্বিত করেছিল…
    ”…তোমার দেশ দরিদ্র নয়, দরিদ্র হচ্ছে তোমাদের রাজনীতি।”…বাংলাভাষার দুই বাংলার রাজনীতি এবং সাহিত্য-রাজনীতির একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রন করে শিক্ষকেরা!এরকমই একজন শিক্ষক, সুনীল গংদের ‘কৃত্তিবাস’ বিজয়ী শামীম রেজা, শিল্পতরু প্রকাশিত আমার সোয়িঙ্কা অনুবাদের কপিরাইট লংঘন করে, আমাকে না জানিয়ে আনন্দবাজারকে দিয়ে দেয়।কখনোই এই শিক্ষক আমার সাথে যোগাযোগ করে নাই!

    দুই বাংলার একাডেমিক আনুষ্ঠানিকতার চোরা-কাঠামোর সাথে যুক্ত হয়েছে কথিত প্রাগ্রসরতার অস্থি, মজ্জাহীন, পুনরাবৃতিমূলক কঙ্কালের স্তুপ। মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, রাহুল সাঙ্কৃর্তায়নের মত যারা এই চোরা কাঠামোর বাইরে থেকে কাজ করছে, তাদের অবদানেই বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে বারবার উচ্চারিত হবে। সেই উচ্চারনের জন্যই রাজু আলাউদ্দিন’দের আমাদের প্রত্যেকের ভিতরেই জরুরিভাবে দরকার! ফুয়েন্তেস’কে অন্তিম সালাম।

  9. razualauddin says:

    ভাই কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, অসংখ্য ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য। বইটি এই মুহূর্তে কোথা্ও পাবেন বলে মনে হয় না। আপনি খুব আগ্রহী হলে আমার ব্যক্তিগত কপি থেকে ফটোকপি করে নিতে পারেন।

    বইটি দ্বিতীয় সংস্করণে আরো বর্ধিত আকারে বের করার ইচ্ছা আছে যদি কোন প্রকাশক আগ্রহ দেখান।

  10. কুলদা রায় says:

    ভাই রাজু আলাউদ্দিন, দীর্ঘকাল মাকড়সা নিয়ে পাঠকর্মে রত থাকতে হয়েছিল এক সময়ে আমাকে। মাকড়সার রীতিটা হল, সে অপেক্ষা করে শিকারের জন্য। তাকে পেলে তাঁর গায়ে এক ধরনের বিষ ঢুকিয়ে দেয়। শিকারটি অচেতন হয়ে পড়ে। তাকে কিন্তু মাকড়সাটা খায় না। তার গায়ে মুখ ঢুকিয়ে তার রসটি চুষে খেয়ে নেয। মৃতদেহটি খোসার মত পড়ে থাকে।
    আপনার রচনাটির জন্য ধন্যবাদ।

  11. পার্থ says:

    রাজু সাহেবকে ধন্যবাদ। বেশ কিছুদিন আগে বিলুপ্ত ‘কাগজ’ প্রকাশনীর লাতিন আমেরিকার উপন্যাসস সংগ্রহ (মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায় অনূদিত) থেকে কার্লোস ফুয়েন্তেস এর একটা উপন্যাস পড়েছিলাম, দারুন লেগেছিল। রাজু সাহেব বোর্হেসের মত কার্লোস ফুয়েন্তেস এরও অনুবাদ সংগ্রহ অনুবাদ করবেন এই আশায় রইলাম।

  12. Taposh Gayen says:

    রাজু আলাউদ্দিনকে নিয়ে চ-খ-হাবিবের পর্যবেক্ষণটি গুরুত্বপূর্ণ, আর গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে রাজু আলাউদ্দিন আমাদেরকে বিশ্বসাহিত্যের আঙ্গিনায় নিয়ে এসে আমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ঋষিদের সাথে, আর এই কাজটি করে তিনি আমাদের একটু করে রাঙ্গিয়ে দিয়ে যান । এই সেই রাজু আলাউদ্দিন, যিনি একুশ বছর আগে আমাকে অক্তাভিও পাজ, স্টিভেন ওয়াইনবার্গ, গেয়র্ক ট্রাকল, ফার্নান্দো পেসোয়া– এইসব সৃষ্টিশীল মানুষদের সৃষ্টিকর্মের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন; এবং আজও তিনি সেই সৃষ্টিশীল কাজটি ভালোবাসা দিয়ে করে চলেছেন । তাঁর এই দান নিতে আমি কখনও কার্পণ্য করিনি, কারণ কে না চায় পৃথিবীর ঋষিপ্রবাহে (= জ্ঞানপ্রবাহে) অবগাহন করতে !

  13. Masud Khan says:

    “….খনিশ্রমিক অথবা কৃষকদের রক্ষা করতে গিয়ে এমন অনেক উপন্যাস লেখা হয়েছে, যেগুলো না উদ্ধার করেছে শ্রমিকদের না উদ্ধার করেছে সাহিত্যকে। শ্রমিকরা রাজনৈতিক ক্রিয়াকান্ডের মাধ্যমে নিজেদের রক্ষা করবে। সাহিত্যের দায় একেবারে নিখাঁদ রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি না, বরং সাহিত্যের কাজ হলো কল্পনার সংযোগ ঘটিয়ে মূল্যবোধ তৈরি করা এবং ভাষার শক্তিমত্তাকে জাগিয়ে তোলা।”
    ভালো লাগল…

    লেখাটিও ভালো লেগেছে, রাজু।ধন্যবাদ।

  14. গৌতম চৌধুরী says:

    ভালো লাগল।

  15. razualauddin says:

    প্রিয় কুলদা, প্রথমেই আপনাকে ধন্যবাদ জানাই লেখাটি পড়েছেন বলে। আজকাল নিজের গোত্রের, গোষ্ঠীর, পারস্পরিক স্বাথের ক্ষুদ্র বৃত্তের বাইরে গিয়ে কেউ কারোর লেখা পড়ে না, পড়লেও মন্তব্য করে না। আপনি সেই ট্যাবু ভেঙে মন্তব্য করেছেন দেখে আনন্দিত হয়েছি। তবে আপনার মন্তব্য পড়ে মনে হলো আপনি মাকড়সা বিষয়ে সম্ভবত দ্বিমত প্রকাশ করতে চাচ্ছেন। কিন্তু আপনার মন্তব্যে দ্বিমতটা ঠিক কোথায় তা ধরতে পারিনি। আমি বলেছিলাম: “নিজের ঘরের কাছেই শিকারের জন্য ওৎ পেতে বসে থাকে। শিকার বা খাবারটা কাছে এলেই ওর উপর ঝাপিয়ে পরে সে।”
    আর আপনি বলছেন: “মাকড়সার রীতিটা হল, সে অপেক্ষা করে শিকারের জন্য। তাকে পেলে তাঁর গায়ে এক ধরনের বিষ ঢুকিয়ে দেয়। শিকারটি অচেতন হয়ে পড়ে। তাকে কিন্তু মাকড়সাটা খায় না। তার গায়ে মুখ ঢুকিয়ে তার রসটি চুষে খেয়ে নেয়। মৃতদেহটি খোসার মত পড়ে থাকে।”
    আমি কিন্তু কোথা্ও বলিনি যে সে “তার গায়ে মুখ ঢুকিয়ে তার রসটি চুষে খেয়ে নেয়” না বা “তার রসটি চুষে” না খেয়ে আস্ত মাকড়সাটাই গিলে খেয়ে ফেলে।
    আর এই অংশটুকু, লেখার– অন্তত আমার কাছে– গৌণ অংশ। ঠিক এই জায়গাটিতেই আপনার মনোযোগ লক্ষ্য করে মুখ্য আনন্দ পেলাম। আপনাকে আমার সাধুবাদ জানাই।

  16. Urmi says:

    অসাধারন।

  17. S says:

    লেখাটার পরিধির অর্ধেকটাই মন্তব্য যা এই বিভাগের ব্যতিক্রম। লেখাটার চেয়ে আমি মনোযোগের সাথে পড়েছি মন্তব্যগুলো -কতসব জ্ঞানী-গুণি বিজ্ঞ কৃতিজন। আমার একজন প্রিয় কবিও আছেন সে সারিতে। আমি অভিভূত, আর রাজু আলাউদ্দিনকে আমি চিনি না আর কার্লোস ফুয়েন্তেস, সে তো আরো দূরের জন। সাধারণদের জন্য ফুয়েন্তেসের ঐ একটি বচনই আলোড়ন-“বাংলাদেশ তো খনিজসম্পদে সম্মৃদ্ধ একটি দেশ। তোমার দেশ দরিদ্র নয়, দরিদ্র হচ্ছে তোমাদের রাজনীতি।” – বচনটির প্রচার কামনা করি।
    — বনি আমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.