কার্লোস ফুয়েন্তেসের বিদায়

সামিন সাবাবা | ২০ মে ২০১২ ২:৪৫ অপরাহ্ন

গত ১৫ মে চলে গেলেন লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের বুম আন্দোলনের প্রধান পুরুষ কার্লোস ফুয়েন্তেস। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৮৩ বছর।

ফুয়েন্তেস ছিলেন স্প্যানিশভাষী জগতে অত্যন্ত প্রশংশিত লেখকদের একজন। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, মারিও ভার্গাস যোসা, হুলিয়ো কোর্তাসারের মত তিনিও ছিলেন একজন ক্যাটালিষ্ট। ১৯৬০ এবং ৭০- এর দশকে তারা লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন, যার নাম “এল বুম”। লিখেছেন নাটক, ছোট গল্প, রাজনৈতিক প্রবন্ধ এবং উপন্যাস যে গুলোর বেশিভাগই জটিল প্রেমের দিনপঞ্জি ।

১৯৮৫ সালে ফুয়েন্তেসের দি ওল্ড গ্রিঙ্গো উপন্যাসটি তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়, এটি মেহিকান বিপ্লবে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া মার্কিন লেখক অ্যামব্রোস বিয়ের্সকে নিয়ে লেখা এক জটিল গল্প। এই বইটি ছিল একজন মেহিকান লেখকের লেখা প্রথম বই যেটা সীমানার উত্তরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং বহুল বিক্রিত বইয়ের তালিকায় ছিল। ১৯৮৯ সালে বইটি নিয়ে একটি চলচিত্র তৈরি করা হয় সেখানে অভিনয় করেছেন গ্রেগরি পেক এবং জেন ফন্ডা।

লাতিন আমেরিকার লেখকদের রীতি অনুযায়ী ফুয়েন্তেস রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। ম্যাগাজিনে, খবরের কাগজে, মেহিকোর সরকারের সমালোচনা লিখতেন রাজনীতিতে এক দলীয় আধিপত্যের সেই লম্বা সময়টিতে যার অবসান হয় ২০০০ সালে বিরোধদলীয় প্রার্থী বিসেন্তে ফক্স কেসাদার নির্বাচন জয়ের মধ্য দিয়ে।

ফুয়েন্তেস যতটা না রাজনৈতিক তার চেয়ে বেশী ছিলেন আদর্শবাদী। তিনি আলিঙ্গন করেছিলেন ন্যায়বোধ এবং মৌলিক মানবাধিকার যা ছিল তার কাছে রাজনৈতিক পরিচয়ের উর্দ্ধে। তিনি ফিদেল কাস্ত্রোর কিউবান বিপ্লবকে সমর্থন করেছিলেন কিন্তু যখন কাস্ত্রো ক্রমশ: একচ্ছত্রবাদী হয়ে ওঠে তিনি তার বিপক্ষে চলে গিয়েছিলেন। তিনি মেহিকোর চিয়াপাসের বিপ্লবপন্থী ইন্ডিয়ানদের সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছিলেন এবং জর্জ ডব্লিউ বুশ (সিনিয়র)-এর প্রশাসনের সন্ত্রাসী মোকাবিলা এবং অভিবাসী নীতিমালাকে অতিমাত্রায় কঠোর বলে ব্যাপক সমালোচনা করেছিলেন।

বেনেসুয়েলার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট উগো চাবেসের সমালোচক ছিলেন তিনি যাকে আখ্যায়িত করেছিলেন “ট্রপিকাল অথবা উক্ত অঞ্চলের মুসোলিনি” বলে। তার নিজ দেশেরও সমালোচনা করেছেন নেশাদ্রব্যের ভয়ানক ব্যবসার সাথে জড়িয়ে থাকা আতঙ্কের মূলোৎপাটন করতে না পারার জন্য। যেদিন তিনি মারা যান সেদিন দৈনিক রিফর্মাতে ফ্রান্সে ক্ষমতার বদল নিয়ে তার একটি আশাব্যঞ্চক প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল।

ফুয়েন্তেস ১৯৭৫ সালে ফ্রান্সে নিযুক্ত মেহিকোর রাষ্ট্রদূত ছিলেন। কিন্তু তিনি দু’বছর পরই স্পেনে মেহিকোর রাষ্ট্রদূত হিসেবে গুস্তাবো দিয়াস ওর্দাসকে নিযুক্ত করার প্রতিবাদে রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৬৮ সালে যখন মেহিকান সেনারা মেহিকো সিটিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর বেপরোয়া গুলিবর্ষন করে, তখন দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন দিয়াস ওর্দাস।

কিন্তু ফুয়েন্তেস বিশ্বাস করতেন যে মূলত তার লেখার মাধ্যমেই তিনি তার কণ্ঠস্বর মানুষকে শোনতে পারবেন, এবং তিনি তা করেছেন অনন্য সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে।
fuentes-m.gif

১৯৬২ সালে প্রকাশিত দা ডেথ অব আর্তেমিয় ক্রুস-কে বলা হয় তার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। বইটির প্রধান চরিত্র যার নামে বইটির নামকরণ, সে হল খবরের কাগজের মালিক যে শয্যাশায়ী। সে ফিরে তাকায় তার অতীত দারিদ্রের দিকে যেখান থেকে সে নিজেকে টেনে তুলেছে। ফিরে দেখে মেহিকোর বিপ্লবের সময় তার দুঃসাহসী কর্মকান্ডগুলোর দিকে এবং বুঝতে পারে যে বৃহত্তর আদর্শ সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার ক্ষেত্রে তাদের বিপ্লব ব্যার্থ হয়েছে।

ফুয়েন্তেসের উপন্যাসগুলো উচ্চাভিলাষী এবং বিষয়কেন্দ্রিক। তার শেষ বই ডেসটিনি এন্ড ডিজায়ার নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ মাইকেল উড লিখেছেন “এটি ওয়ার এন্ড পিস-এর প্যারডি পুরোপুরি নয়, কিন্তু দৃষ্টিনন্দন এই বইটি, উপন্যাসের ধারনা সম্পর্কে একটি আনন্দময় পুনঃপাঠ যা ইতিহাসের সাথে পাল্লা দেয়।

তিনি আরও বলেন “এটির মধ্যে আছে প্রচুর পরিমানে হাস্যরস, ব্যাঙ্গচিন্তা, প্রতিচ্ছবি, কল্পনা এবং তীক্ষ্ম রাজনৈতিক মন্তব্য যার মাঝে অতিপরিচিতি তারকা মুখ যেমন টেলি যোগাযোগ-ব্যাবস্থার কেন্দ্রিয় চরিত্র কার্লোস স্লিমের সাংকেতিক প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। এটি স্পিনোজা এবং ম্যাকিয়াভেলীর চিন্তাধারাকেও মনে করিয়ে দেয়। এছাড়া্ও বইটির মধ্যে আছে ভূত, কবর, খুন, উড্ডয়নশীল পয়গম্বরগণ এবং এক কথক কাটা মুন্ডু।

কাটা মুন্ডুটি মেহিকোর নেশা ও অপরাধ জগতের যুদ্ধের শিকার। ফুয়েন্তেস মনে করতেন এই যুদ্ধ মেহিকোর সমাজের জন্য এক ভয়ানক হুমকি। মাথাটি কথা বলে অমাময়ী হাস্যরসের সূরে।

ফুয়েন্তেস তার জীবনের শেষ দিকে একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্সন্ন বুদ্ধিজীবী ও কূটনীতিবিদ হয়ে উঠেছিলেন। তার ৮০ তম জন্মবার্ষিকিতে শত শত মানুষ সমাবেত হয়েছিল নিউ ইয়র্ক-এর মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট-এ, তার জীবন এবং কাজ উৎযাপন করতে। নিউ ইয়র্ক-এ মেহিকোর সে সময়কার কনসাল জেনেরাল রুবেন বেলত্রান তার সম্পর্কে একটি ভূমিকা দেন। বেলত্রান বলেন কার্লোস ফুয়েন্তেসকে নিয়ে বলা মানে মেহিকোর ইতিহাস এবং সংস্কৃতিতে নিজেকে প্রাণপনে জড়িয়ে নেওয়া। আমরা মেহিকোর সাহিত্য অথবা মানবধর্মী সংস্কৃতির ওপর এমন কোনো বিতর্ক কল্পনা করতে পারি না যার মধ্যে কার্লোস ফুয়েন্তেসের নাম উচ্চারিত হবে না।
(নিউ ইর্য়ক টাইমস-এ প্রকাশিত এন্থনী ডি পালমার নিবন্ধের অংশ বিশেষের তর্জমা।)

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Taposh Gayen — মে ২১, ২০১২ @ ১০:০১ পূর্বাহ্ন

      অনুবাদটি ভালো, কিন্তু অসমাপ্ত হবার কারণে সাহিত্য-রসের ঘাটতি হয়েছে ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Choyon Khairul Habib — মে ২৭, ২০১২ @ ৮:২০ অপরাহ্ন

      ফুয়েন্তেসকে নিয়ে আপনিসহ বিভিন্নজনের লেখা পড়ে্ এক বন্ধুকে জানাচ্ছিলাম,”…একাডেমিক আনুষ্ঠানিকতার বাইরে বাস্তব অভিজ্ঞ্বতাজারিত তুলনামূলক সাহিত্যই…স্থবিরতা থেকে বেরোনোর প্রধান কল্পবন্ধন!”…সেই যাত্রাপথে আপনার আরো লেখা দেখবার প্রত্যাশায়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন arafat rayhan — নভেম্বর ২, ২০১২ @ ৩:৫৩ পূর্বাহ্ন

      want to know more about Fuentes.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com