আর্টস, গদ্য

পথে, প্রদেশে

মাসুদ খান | 31 Jan , 2012  

(২য় পর্ব)
প্রথম পর্বের লিংক http://arts.bdnews24.com/?p=1537#more-1537

মাহী-সওয়ার কলেজ। জনশ্রুতি আছে, হজরত শাহ সুলতান নামের এক দরবেশ এক বিশাল মাছের পিঠে চড়ে করতোয়া নদী দিয়ে ভেসে এসে নেমেছিলেন এইখানে, এই ঘাটে। সেই থেকে দরবেশের নাম হজরত শাহ সুলতান মাহী-সওয়ার আর তাঁর নামে নাম এই বিদ্যায়তনের।

কলেজের পাশ দিয়ে লালচে ধূলি-ওড়া পথ। সেই পথ দিয়ে তুফান-গতিতে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে চল্লিশ-পেরুনো এক লোক। চোখে স্ফূর্তি, মুখে গান- “চলো যাই ভেসে যাই প্রেমসাগরে নাও ভাসিয়ে দুজনে-এ-এ-এ-এ/ নাও ভাসিয়ে দুজনে/ রেখো মোরে তোমার নয়নে।” চেন পড়ে গেছে, সাইকেল চলছে তবু ঊর্ধ্বশ্বাসে। লুঙ্গি খুলে পড়ে যাচ্ছে চেনের সঙ্গে জড়িয়ে-মড়িয়ে, স্ফূর্তির চোটে টের পাচ্ছে না মানুষটা। ওদিকে বগলে একগাদা বই আর হাতে প্রচুর কাগজপত্র নিয়ে কী যেন ভাবতে ভাবতে ক্লাশের দিকে যাচ্ছেন এক অধ্যাপক, ভুলোমন স্বভাবের…হাতের কাগজ পড়ে যাচ্ছে, খেয়াল হচ্ছে না। পাকুড় গাছের নিচে আড্ডা জমিয়েছে কিছু হুল্লোড়বাজ ছাত্রছাত্রী। একজন দৌড়ে গিয়ে কী যেন কী একটা দেখাচ্ছে প্রফেসর সাহেবকে। ছোট্ট একটি স্ক্রু। বলছে, “স্যার, এটা বোধহয় আপনার, পড়ে গেছে।” আলাভোলা প্রফেসর পেছন ফিরে স্ক্রু-টা হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন, আর বলছেন, “না তো, আমার না তো।” হাসির হিল্লোল পাকুড় গাছের নিচে। খড়ের মালা গলায় দিয়ে একটা বেড়াল হেলেদুলে হেঁটে যাচ্ছে পাশের আলপথ ধরে। একশো একটা ইঁদুর মারার পর নিয়ত করেছে পুরাপুরি অহিংস হয়ে যাবে সে। ‘অহিংসা পরম ধর্ম্মঃ’ মন্ত্র জপতে জপতে যাত্রা করেছে বুদ্ধগয়ার দিকে। ওই বেড়ালটিও কিনা ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে এই দৃশ্য আর মুচকি মুচকি হাসছে।

পাশেই করতোয়ার খাড়া পাড়। নিচে সেই বিশ্ববিশ্রুত অথইদহ। কত জরিপ হয়েছে যুগে যুগে, কিন্তু থই পাওয়া যায়নি সেই রহস্যদহের। লোকশ্রুতি বলে, কয়েকশো বছর আগে এক তারাভরা রাতে আকাশ থেকে বিকট শব্দে বিশাল এক আলোর গোলা এসে পড়েছিল করতোয়ায়। বিশাল সেই গোলার পেছনে পেছনে ছোট-ছোট আরো অসংখ্য গোলাণু, থেমে-থেমে, থেকে-থেকে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, সেই আওয়াজে বধির হয়ে গিয়েছিল ১৩১ জন মানুষ, ২৮১টি গরুছাগল, ২২টি শিয়াল। এ বধিরতা যেমন-তেমন বধিরতা নয়। প্রজন্ম-প্রজন্ম বধিরতা। এই যে ঠসাবাড়ির গফফার ঠসা- ও নিজে ঠসা, ওর ব্যাটা ঠসা, বেটি ঠসা, বাপদাদা বারোগোষ্ঠি ঠসা। তাহলে বোঝেন! যা-হোক, সেই বিকট আওয়াজে গর্ভপাতের ঘটনা ঘটেছিল ২৯টি, আর কাঁপুনির চোটে সাঁকো ভেঙেছিল ১৫টি, টঙঘর ১২২, আর ভেঙে পড়েছিল এলাকার সবগুলি খাটা পায়খানা। সবাই ভেবেছিল কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু আলামত ছাড়াই কেয়ামত! এরকম তো হওয়ার কথা না। খরে দজ্জাল আর ইমাম মেহেদির জমানা আসার কথা, সেগুলা কই! তাহলে কি ওই শয়তান জমিদারের রূপ ধরেই দজ্জালের আবির্ভাব! এখন না-হয় বুঝলাম দজ্জালের জমানা, কিন্তু এরপর তো ইমাম মেহেদির পালা… তিনি কই, তার তো আবির্ভাব ঘটেইনি এখনো! নাকি মেহেদিপর্ব বাদ দিয়েই শর্টকাট টু কেয়ামত! এইসব নানান ভাবনা ভেবেছিল এই মহাস্থানগড়ের মানুষ, ওই প্রলয়কাণ্ডের রাতে। ভোরের দিকে নারীপুরুষশিশুরা সব ভয়ে ভয়ে জড়ো হতে থাকল করতোয়ার পাড়ে। দ্যাখে কি, আসমানি গোলার আঘাতে আউলাকান্দি মৌজার তিনগুণ-সমান বিশাল এক জায়গা একদম আউলে গিয়ে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে করতোয়ার বুকে। প্রচুর কাদামাটি ছলকে ছলকে উঠে সয়লাব করে দিয়েছে অববাহিকার জায়গাজমিন।

নতুন পলিমাটি পেয়ে বছর কয়েক ফসল ফলেছে প্রচুর। কিন্তু আনকা এক উপদ্রব। চেনা সবজি ও শস্যের ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎ অচেনা, অদ্ভুতকিম্ভুত সব সবজি ও শস্যের গাছ। এরকম কিম্ভূত-কিমাকার ফসলের গাছ দেখলেই তো ভয় লাগে! আসলো কোত্থেকে, এগুলির বীজ? এ রহস্যের কোনো কিনারা হয়নি এই সেদিন পর্যন্ত, যেদিন বিদেশী বিশেষজ্ঞরা এসে আশপাশের মাটি, কাঁকর, বীজ, শস্য, অথইদহের পানি…সবকিছু পরীক্ষানিরীক্ষা করে আবিষ্কার করল, বহু বছর আগে যে আলোর গোলাটি এসে পড়েছিল তা আসলে আর কিছু নয়, সৌরজগতের বাইরের কোনো প্রাণময় গ্রহ থেকে ছুটে আসা এক বিপুলাকার উল্কাপিণ্ড। আর ওই সজীব-সপ্রাণ উল্কার সাথেই এসেছিল ওইসব অচেনা শস্যবীজ। বিশেষজ্ঞরা আরো যা আবিষ্কার করল তা হলো, অবাক-করা কিছু কাঁকর, পাথর। রত্নপাথর। নীলা আকিক গোমেদ পোখরাজ কোনো কিছুরই মতো নয়…না সূর্যের আলো, না চাঁদের আলো কোনো কিছুতেই জ্বলে না সেই রত্ন, চুপচাপ অন্ধকার হয়ে পড়ে থাকে। কেবল বিশেষ কিছু তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে আলো ফেললে জ্বলজ্বল করে ওঠে, যেসব আলো হয়তো বিচ্ছুরিত হয় ভিন্ন কোনো নক্ষত্রলোকে।

কত খরা গেল, কত জলসেচ প্রকল্প গেল, কিন্তু কখনোই পুরাপুরি শুকাল না অথইদহের পানি। এই তো বছর কয়েক আগের কথা। নিদারুণ চৈত্রমাস। মাঠঘাট খালবিল সব চৌচির…খরার তীব্রতা ছাড়িয়ে গেছে আগের সব রেকর্ড। ডিপ টিউবওয়েলেও পানি উঠছে না। বাধ্য হয়ে কৃষকেরা বিশাল বিশাল নলকূপ নিয়ে ফিট করেছে ওই অথইদহে, শয়ে শয়ে। এরপর ঘটল সেই অস্বাভাবিক ঘটনা…হাজার হাজার কৌতূহলী মানুষের উপচানো ভিড়। দহের পানি উথালপাথাল। আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠল এক অদ্ভুত অতিকায় প্রাণীর আতঙ্কিত নড়াচড়া… প্রাণীটা খুবসম্ভব উভচর- দুই হাত, দুই পা, আর আমাদের মানিক ময়রার দোকানে বসে যে নাদুসনুদুস ছেলেটা- লুকিয়ে লুকিয়ে মিস্টি খায় খালি, সবাই ডাকে ভোটুস- তার মতো ভুঁড়িভাসানো পৃথুল দেহ। অনর্গল কথা বলছে বহির্জাগতিক অবোধ্য ভাষায়, মাঝে মাঝে স্নিগ্ধ হাসি হাসছে, দেখা যাচ্ছে ঝকঝকে দাঁত…আবার হঠাৎ হঠাৎ বিমর্ষও হয়ে পড়ছে খুব। উৎসাহী পাবলিক গুলতি, লাঠি, সড়কি, এয়ার গান, ছররা বন্দুক সব নিয়ে এসেছে…বাইনোকুলারও নিয়ে এসেছে চুয়েটে-পড়া লিটন। মনোযোগ দিয়ে পড়তে চেষ্টা করছে, প্রাণীটির সারা গায়ে কোঁকড়া-কোঁকড়া ওগুলি কি লোম নাকি আঁশ। এর মধ্যে হঠাৎ করে দু-একজন গুলিও ছুড়েছে। কোনোটা লেগেছে, কোনোটা অতদূর পর্যন্ত পৌঁছতেই পারেনি। আক্কাস মণ্ডলের মেজ যে ছেলেটি, মলনালীতে ক্যানসার ধরা পড়েছে, সেও গুলি করেছে দুই রাউন্ড। অথইদহের তলদেশে দাঁড়িয়ে টলোমলো পায়ে ভর দিয়ে অসহায় সেই প্রাণী হাত তুলে তালু খুলে দেখাচ্ছে বারবার, তালুতে গুলি লেগেছে তার, কিন্তু রক্তের রং লাল না হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে না ঠিক…

“মানুষ-প্রাণী ভাই-ভাই” নামের এক পশুপাখিপ্রেমী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অনিল বিশ্বাস এসে তার চৌকস বক্তৃতায় মুগ্ধ করে ফেলে নানা রঙের, নানা মেজাজের মানুষকে। প্রশমিত করে আনে উত্তেজিত মানুষদের জিঘাংসাভাব। এরপর শুরু হয় উদ্ধারপর্ব, শহরে খবর পাঠানো…, তারপর ক্রেন, কনটেইনার, প্রশাসন, থালাবাসন (কাদাপানি সেঁচার জন্য), ল্যাডার, ক্যাডার, জেনারেটর, ইনজিনিয়ার, দড়িদড়া, দমকল, বিশেষজ্ঞ, উকিল-মোক্তার, পশুডাক্তার…সে এক এলাহি কারবার। প্রচুর হাঁকডাক, ‘এই করো সেই করো, এই লে-আও সেই লে-আও’ এইসব আওয়াজ আর প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্য দিয়ে শুরু হলো অসহায় এলিয়েনের উদ্ধারকাজ। বেশ কয়েক ঘন্টা ধরে অকহতব্য শ্রম ও মেধা ব্যয় করে তিন-তিনটি ডালাখোলা কনটেইনার জোড়া দিয়ে বিপুলায়তন গালিভারটাকে তার ভেতর উঠিয়ে নিয়ে দুই জোড়া ক্রেন লাগিয়ে বহু কায়দা ও কসরৎ করে ওপরে তুলে আনে লিলিপুটের দল। প্রাণীটার কাছে মানুষগুলি সব হাস্যকর-রকম খর্বকায়।

বিশাল হাসি-হাসি মুখ এলিয়েনটার। সদানন্দ। কিছু মানুষ থাকে-না, যাদের চেহারাটাই এমন যে মনে হয় যেন হাসছে, সেরকম। এলিয়েনটা কথা বলছে, হাত নাড়ছে, হাসছে। পৃথিবীর চেয়ে বহুগুণ বড় দূরের প্রায়-জলমগ্ন কোনো এক গ্রহের বুদ্ধিমান অথচ নিরীহ শান্তিপ্রিয় প্রাণীপ্রজাতি। একেবারে উন্নততম নয় বটে, তবে মধ্যম স্তরের প্রজাতি। এলিয়েনদের গ্রহের স্থলদেশ, জলদেশ উভয়দেশেই রয়েছে তাদের সভ্যতা…সম্ভবত।

প্রাণীটা খুবসম্ভব উভচর, কারণ, মাঝে-মধ্যে গভীর রাতে মনে হয় উঠে আসত সে অথইদহ থেকে। ডাঙায় রেখে যেত পদচিহ্ন। ধরিত্রীর বুকে ভিনগ্রহের ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট। এলিয়েনটাকে দেখার পর স্থানীয়রা বলাবলি শুরু করে দিলো, “তাই তো কই, বছর-বছর আমাগো খ্যাতের ফসল, গাছপালা, জঙ্গলমঙ্গল সব ডামেশ কইরা ফালায় কেডা! তাই তো কই, এত্ত বড়-বড় পায়ের দাগের মতন দাগ, ওগুলা কিয়ের? ও, কালপ্রিট তাইলে এইটা?” এমনিতে পৃথিবীটা এলিয়েনের জন্য গ্রহান্তর, তার ওপর এতসব অচেনা প্রাণীর ভিড়ের ভেতর তাকে তুলে আনা হয়েছে এক ভয়ানক বৈমাত্রেয় পরিবেশে, তারপরও প্রাণীটা প্রথম প্রথম বেশ সপ্রতিভ, হাসিখুশি। কিন্তু যতই সময় যাচ্ছে, ততই মুশকিল হয়ে পড়ছে তার জৈবরাসায়নিক ভারসাম্য ঠিক রাখা। শ্বসন, প্রস্বেদন, তাপমাত্রা, চাপমাত্রা, পেশিবিক্ষেপ…সবকিছু হয়ে পড়ছে বেসামাল। শুরু হয়ে গেছে রিভার্স অসমোসিস। প্রাণীটির শরীর থেকে প্রচুর জলীয় কণা বের হয়ে আসছে বাষ্প আকারে। চৈত্রের খর্খরে আবহাওয়া। বাতাসে আপেক্ষিক আর্দ্রতা আজ ভয়াবহরকম কম, মাত্র ২০%। এরকম বিশুষ্ক আবহাওয়ার মধ্যেও সেই বাষ্পবিকিরণের কারণে প্রাণীটির চারপাশে অনেকখানি জায়গাজুড়ে কুয়াশার বাতাবরণ। চারদিকে চরাচরে প্রখর রোদ, শুধু ওই জায়গাটুকু কুয়াশায় ঘেরা। যদিও এই বাষ্পকুয়াশা কেটে যায় কয়েক ঘন্টার মধ্যেই, কিন্তু ওই আধো-অলৌকিক ঘটনাটি ঘিরে যে কুয়াশার আবরণ, তা আর সহজে কাটে না। কত হবে প্রাণীটার বয়স? গ্রহাণুর মতো বিপুলাকার উল্কাটি যখন করতোয়ায় এসে পড়ে, কয়েকশো বছর আগে, তার সাথেই কি সেও এসেছিল!? এত বয়স? তা ছাড়া, কীভাবে সম্ভব? উল্কাপিণ্ড যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভেতর সবেগে ঢুকে পড়ে তখন তো বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে আগুন ধরে যায়। তাহলে বাঁচল কেমন করে? গবেষণা বলছে, অতিকায় উল্কাটির অভ্যন্তরে ছিল একটি সাব-টেরেনিয়ান জলাশয়। মূল গ্রহ থেকে যখন বিচ্ছিন্ন হয় গ্রহাণুটা, তখন এই প্রাণীটা ছিল ওই জলাশয়ের ভেতর। জলাশয়ের ওপরকার আবরণটা ছিল খুব কঠিন এবং পুরু। ফলে সুরক্ষিত ছিল সে।

এলিয়েনটার অবস্থা ক্রমেই নাজুক হয়ে পড়ছে। প্রাণিবিশেষজ্ঞ ও ডাক্তারের দল অযথাই স্টেথোস্কোপ, বিপি-মিটার, থার্মোমিটার, ইনজেকশন সিরিঞ্জ নিয়ে প্রাণীটির চারপাশে ঘোরাঘুরি-দৌড়াদৌড়ি করছে, ওগুলো এতই ক্ষুদ্র ও অপ্রাসঙ্গিক যে, তা নিয়ে তারা নিজেরাই যারপরনাই বিব্রত। কী আর করা! ওগুলোই নিয়ে লাগাচ্ছে প্রাণীটার দেহে। মর জ্বালা! প্রাণীর গায়ে সুড়সুড়িও লাগছে না ঠিকমতো। এক পশুবিশেষজ্ঞ, এমনিতে শ্বেতীতে সারা মুখ শাদা, তার ওপর বিলাতে থাকে বহু বছর ধরে, বেড়াতে এসেছে দেশের বাড়ি। খুব দেমাগ, দেমাগের চোটে মাটিতে পা পড়তে চায় না, কথায় কথায় খালি বিলাতের গল্প, আর নিজে কী কী করেছে তার গল্প। আর সবাইকে খালি জ্ঞান দিতে থাকে। আর পয়সার গরম। কিন্তু গরিব-গুর্বারা একটু সাহায্য-টাহায্য চায়, তা দেয় না। হাটে গিয়ে বড়-বড় মাছ, মাংস, গরুর কল্লা…ভালো-ভালো যা পায় সব কিনে নিয়ে চলে আসে। দরদাম করে না, যা দাম চায় সেই দামেই কিনে ফেলে। বাজারে জিনিশপত্রের দাম সেই যে চড়িয়ে দিয়েছে লোকটা, আর নামে না। মাসখানেকের মধ্যেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে গ্রামের লোকজন। বেতমিজ পোলাপান প্রাণিবিশারদের নাম দিয়েছে ‘বিলাতি বান্দর’। তো, সেই প্রাণিবিশেষজ্ঞ এসেই শুরু করে দিলেন হুলুস্থুল লম্ফঝম্ফ। ভেরি এক্সাইটেড! নানারকম অত্যাধুনিক তত্ত্বকথা শোনালেন প্রাণিবিদ্যার, ইংরাজি-বাংলা মিশিয়ে। বললেন, “পৃথিবী নামের এই প্ল্যানেটে যত ক্রিয়েচার আছে, অল আর কার্বন-বেইজ্ড, কিন্তু এই যে ক্রিয়েচারটি দেখছেন, এইটা যে প্ল্যানেটের সেখানকার সব প্রাণীই সিলিকন-বেইজ্ড, এটাও তা-ই। ইউ নো, সিলিকন ক্যান নট হোল্ড ওয়াটার ফর লং, দ্যাখেন না, সিলিকন-ডাই-অক্সাইড, মানে বালু…বালুর মধ্যে তো পানি থাকে না বেশিক্ষণ। সো, এই প্রাণীটাও, আই মিন, এই ক্রিয়েচারটাও ইভাপরেটস ওয়াটার ভেরি কুইক্লি। দিস প্রাণী বিলংস টু দ্য স্পিসিস নেইম্ড হিপ্পোফ্যালাইটিস স্যাপোলিপিথেকাস প্রকান্ডাম।” শুনে লোকজন বলে, আরে! প্রকাণ্ড যে, তা তো দেখতেই পাইতেছি, তো এইসব অংবং প্রকান্ডাম/বোম্বাস্টিক ঘোড়াণ্ডাম…এগুলা কী কয় না কয় ক্ষ্যাটা! সেই থেকে তারা পশুবিশেষজ্ঞটির খেতাব দিয়েছে ‘অংবং প্রকান্ডাম/বোম্বাস্টিক ঘোড়াণ্ডাম’। মানুষের মধ্যে কি-জানি-কী একটা ব্যাপার ঘটে…যাকে দেখতে পারে না তো পারেই না…ভালো ভালো কথা বললেও না।

প্রাণীটাকে কীভাবে বাঁচানো যাবে সে-ব্যাপারে প্রেসক্রিপশনও দিলেন বিলাতি পশুবিশারদ। কিন্তু কাজ হলো না কোনো। সব উদ্যম, উত্তেজনা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রাণীটি অচেনা ভাষায় চিৎকার করতে করতে কয়েকঘন্টার মধ্যেই ধরিত্রীলীলা সাঙ্গ করল। প্রাণিবিশেষজ্ঞ তো কেটে পড়ল সুরসুর করে। এরপর এলো এলিয়েনের সৎকারের পালা। কী করা হবে বুঝতে পারছে না কেউ। এই প্রথমবারের মতো ডাক পড়ল সেই বিখ্যাত হকসেদের, এলিয়েনটার শেষকৃত্যের ব্যাপারে ফতোয়া দেবার জন্য। আসমান-জমিনের অনেক খবরই তো থাকে ওর কাছে। ও, ভালো কথা, এই হকসেদটা কে, সে কথা তো বলাই হয়নি। পরে বলছি। আর বলবেন না, বুড়া হয়ে গেছি, মনেও থাকে না ঠিকমতো, আগের গল্প পরে বলি, পরের গল্প আগে…। তো যাই হোক, হকসেদ বলে, “প্রাণীটা ভিনগ্রহের এক্কেবারে এক নম্বর উন্নত প্রজাতি না হইলে কী হইবো, দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের প্রাণী তো বটেই। এদেরও তো একটা রিলিজিয়ন আছে, নাকি? শোনেন নাই, মরার আগ দিয়ে প্রাণীটা বলতেছিল, কক্কারাতাফুকুনটামারিয়ামটালানটালামালাগফিরিস…মানে, সে কইতে চাইতেছিল- কক্কারাতা, মানে কক্কারাতা হইল-গিয়া তাদের ঈশ্বরের নাম, আর এই প্লানেট হইছে তাদের দশটা দোজখের একটা। দীর্ঘ নরকবাস তার শ্যাষ হইলো আইজ। এলিয়েনের আত্মারাম তো অলরেডি উইড়া গ্যাছে-গা অন্য আরেক গ্রহে যেইটা কিনা হইলো-গিয়া তাদের বেহেশত। এলিয়েনের আত্মাডা তো মনে করেন এরই মধ্যে নতুন শরীর ধারণ কইরাই ফালাইছে। আত্মা তো আর ভোগ করতে পারে না কোনো কিছু, না সুখ, না কষ্ট, ভোগ করার জন্য তো বডি লাগে একটা, তাই না? দেহধারণ করা লাগে, ঠিক কিনা? কিন্তু এলিয়েনের তো এইটা দুই নম্বর মরণ, এর আগেও তো একবার মরছিল ব্যাটা, তখন হইছিল তার আসল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। এইবার আপনারাই কন, ভদেশটার এই ভুয়া বকেয়া বডি সৎকার কইরা আর কী লাভ? দ্যাখেন, যেটা ভালো হয় করেন। তবে কই কি, এক কাম করা যায়, কাইটা দেখা যায় কী আছে এইডার মধ্যে।”

ডালাখোলা কনটেইনারের ওপরই শুরু হলো এলিয়েনের পোস্টমর্টেম। শরীরের কোন জায়গা থেকে অস্ত্রোপচার শুরু করা যায় তা দেখতে বিশাল এক লৌহশলাকা-হাতে স্থানীয় শল্য চিকিৎসক ডাঃ আরিফ প্রয়াস নিলো এলিয়েনের শরীরে আরোহণের। কিন্তু পাহাড়ের মতো শরীরের কিছুটা উঠেই পিছলে পড়ে ব্যথা পেল ডাক্তার। এল লাশকাটা ঘরের ডোমেরা। ছুরি-কাঁচির বদলে নিয়ে এসেছে গাছকাটা বিশাল করাত এক জোড়া। হাতটানা করাতের দুই প্রান্তে দুইদল ডোম বসে ঘসঘস করে কাটতে লাগল সর্বশক্তি প্রয়োগ ক’রে। করাতের দাঁতে দাঁতে প্রাণীটার চামড়ার নিচ থেকে উঠে এল প্রচুর ভেজা বালি ও কাঁকর। এলিয়েনটা হঠাৎ নড়ে উঠে আশপাশের বায়ুস্তর কাঁপিয়ে, দিলো এক অট্টহাসি- মরণোত্তর অট্টহাসি। ডোম-সম্প্রদায় ছিটকে পড়ল দূরে দূরে। এখন ডোম, ডাক্তার কেউ আর আসে না কাছে। এল পেশাদার করাতিরা। ঘচাঘচ কেটে আলাদা করে ফেলল ধড়। তরল গড়িয়ে পড়ল পীতবর্ণ, প্রচুর। পরে বোঝা গেল, আসলে এ তো প্রাণী নয়, স্বয়ংসম্পূর্ণ এক ইকো-সিস্টেম- চলিষ্ণু, জীবন্ত, জঙ্গম। বিষ্ময়কর এক ইকো-সিস্টেম। সারা শরীরে ওই যে ঘন জঙ্গল দেখছেন ওগুলি লোমও নয়, আঁশও নয়, ওগুলি আসলে এক জাতের তৃণ ও শৈবাল-জাতীয় উদ্ভিদ। আর প্রাণীটার চামড়ার নিচে রক্তমাংসচর্বির বদলে বিচিত্র খনিজ ও জৈব উপাদান মেশানো জল-কাদা-বালু-কাঁকরের এক ঘন মশলামিশ্র, যার ভেতর দিয়ে শিকড় চারিয়ে দিয়ে খাদ্যরস শুষে নেয় শরীর জুড়ে গজিয়ে ওঠা ওই তৃণ ও শৈবালের জঙ্গল। ধীরে ধীরে ফুল ফোটে তৃণে ও শৈবালে, ফল হয় চিনা-কাউন বা পোস্তদানার মতো গুড়িগুড়ি, হয়তো আকারে কিছুটা বড়-বড়। কিছু তার খুঁটে খুঁটে খেয়ে ফেলে ছোট-ছোট জলজ ও স্থলজ প্রাণী, বাকিটুকু ঝরে পড়ে ওই মরে যাওয়া তৃণ বা শৈবালের নাড়ার ভেতর। তারপর নতুন মৌসুম শুরু হলে প্রাণীটির সারা গা ভ’রে ফের গজিয়ে ওঠে নতুন তৃণ ও শৈবাল। এই শস্যচক্র চলতেই থাকে যতদিন বেঁচে থাকে এলিয়েনটা। এলিয়েনটা আসলে একটি প্রাণীই যার সারা-গা-ভর্তি ফুলফলময় উদ্ভিদ। একাধারে সে প্রাণী, উদ্ভিদ এবং এক জ্যান্ত, চলিষ্ণু ভূমিখণ্ড- স্বয়ংক্রিয়, স্বয়ংসম্পূর্ণ এক প্রতিবেশচক্র। এলিয়েনটার, মানে সিস্টেমটার অভ্যন্তরে ত্রিস্তরবিশিষ্ট বিশাল-বিশাল আধার। একটি আধার জলাশয়; আরেকটি জীবন্ত রসায়নাগার, যা অটুট রাখে ইকো-চক্রটিকে। তৃতীয়টি প্রত্ন-সংগ্রহশালা। অদ্ভুত গ্রহের অদ্ভুত সব সামগ্রী তাতে। বিচিত্র সব রত্নরাজি, আদিম ও আধুনিক কিছু হাতিয়ার, তৈজস, কৃৎকৌশলের নানান নমুনা…এইসব। আপনি যদি কখনো মহাস্থানগড় আসেন, তবে দেখবেন, ওগুলো এখনো সংরক্ষিত আছে মহাস্থানগড় বরেন্দ্র জাদুঘরে। যা হোক, শেষটায় অচেনা গ্রহের সেই একখণ্ড জিন্দা ইকোসিস্টেমকে ফালাফালা করে কেটে ছিঁড়ে ফাটিয়ে মিশিয়ে দেওয়া হলো ধরিত্রীর ধুলার সঙ্গে।

রঙ্গভরা বঙ্গদেশে কত যে রঙ্গ-রগড় হয়! এইতো সেদিন আক্কেলডাঙ্গা ইউনিয়নের ‘গমচোরা’ চেয়ারম্যান আলফাজ উদ্দিন রাগের চোটে, বিগাড়ের বশে ঘোষণা দিয়ে বসল আমরণ অনশনের। গম বরাদ্দ পেয়েছে কম। চেয়ারম্যানের এক পেয়ারা ইল্লৎ অনুচর কুবুদ্ধি দিয়েছে তাকে, “এক কাজ করেন, আমরণ অনশন শুরু কইরা দ্যান। তাইলে দেখবেন, আপনার নাম ছড়ায়া পড়বো, দুইদিন যাইতে না যাইতেই দেখবেন মন্ত্রী, এমপি, ডিসি সবাই ছুইটা আসতেছে অনশন ভাঙ্গাইবার লাগি, সবাই আপনেরে সাধাসাধি করবো, মুখে শরবত তুইলা ধরবো, টিভি-ক্যামেরা ছবি তুলবো, এক্কেরে হুড়াহুড়ি পাড়াপাড়ি লাইগা যাইবো…নামও হইবো, কামও হইবো, আর বরাদ্দ আসবো হুড়মুড়ায়া, আর দ্যাখেন-না খালি, হায়বর মণ্ডল কেমুন হায় হায় করে, জিন্দেগিতে আর সাহস করবো না ইলেকশনে খাঁড়াইতে। আপনে পাবলিকের উদ্দেশে বক্তৃতা দিবেন, “ভাইসব, এই আক্কেলডাঙ্গার জনগণের জন্যে, তাদের রাস্তাঘাট আর পাকা পায়খানার জন্যে আমার এই আমরণ অনশন।” পাবলিক সব আপনের কাছে আইসা বইসা থাকবো, আপনের সাথে একাত্মা হয়া সাহস দিতে থাকবো।”

পাবলিক অবশ্য এসেছে বটে অকুস্থলে, যেখানটায় মঞ্চস্থ হচ্ছে আলফাজের অনশন-নাট্য, ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের সামনের সেই ভেরেণ্ডাগাছের তলায়, কিন্তু সাহস দিতে নয়, এসেছে পাহারা দিতে, পালা করে, যাতে লুকিয়ে লুকিয়ে কিছু না খেতে পারে চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যানের লোকজন বড় একটা রঙচঙে ব্যানারও টাঙিয়েছে- “আলেক্কডাঙ্গার জনগণের স্বার্থে চেয়ারম্যান আফলাজ উদ্দিনের আমরণ অনশন”। ‘আক্কেলডাঙ্গা’ এর জায়গায় ভুলে ‘আলেক্কডাঙ্গা’ লিখেছে আর্টিস্ট। তাই নিয়ে চেয়ারম্যানের শুক্র এমনভাবে শিরোধার্য হয়েছে যে নিজের নামটাই যে ভুল লেখা সেটা খেয়াল করছে না।

এদিকে একদিন যায়, দুইদিন যায়, তিনদিন যায়, সাঙ্গাতরা নানান জায়গায় মোবাইলে খবর পাঠায়, কিন্তু আসে না কেউই। এক অদ্ভুত জীবনমরণ সমস্যায় পড়ে গেছে চেয়ারম্যান। এদিকে জঠরের তীব্র অ্যাসিড, তাতে আবার ধরেছে দাউদাউ আগুন। আচ্ছা এক গ্যাঁড়াকল, না পারে ভাঙতে অনশন, না পারে সইতে ক্ষুধার আগুন। পাবলিক তো মজা দ্যাখে। বলে, “বোঝ ব্যাটা, খিদার জ্বালা কেমন!” আবার, চেয়ারম্যানের দশা ‘ভিক্ষা চাই না মা কুত্তা সামলা’ নাকি ‘ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি’, কোনটা, তা নিয়েও গবেষণা করে কতিপয় দুষ্ট যুবক। নাটকের শেষ অঙ্কে এসে, পাবলিকের কাছে মাফটাফ চেয়ে আধমরা চেয়ারম্যান নিজে নিজেই ফ্রুটিকা খেয়ে অনশন ভাঙে। এভাবে আচ্ছা আক্কেল পায় আক্কেলডাঙ্গার চেয়ারম্যান।

চা-মিষ্টির এক দোকান আছে মাটিডালিতে। অভাবিতপূর্ব, অনির্বচনীয় একধরনের স্বাদ ও গন্ধ দোকানটার চা ও মিষ্টিতে। একবার খেলে স্বাদেন্দ্রিয়ে তার রেশ লেগে থাকে বহুদিন। দোকান খোলা থাকে অনেক রাত পর্যন্ত। দূরপাল্লার ড্রাইভারেরা বাস-ট্রাক থামিয়ে চা-মিষ্টি খায় এখানে। আগেই বলেছি মিষ্টি খুব পছন্দ কবিদের। কবিতা নিয়ে অবিরাম ভাবনাচিন্তা, তুমুল আড্ডা, তর্কবিতর্ক সারাদিন এইসব করতে করতে কবিদের শরীর থেকে বিকীর্ণ হয়ে বেরিয়ে যায় প্রচুর রেশমি-রেশমি চিনিবাষ্প, হাওয়াই মিঠাই আকারে। তা ছাড়া কবিরা চিনি দিয়ে মিতালি পাতায় পিঁপড়াদের সাথে। কবিদের শরীরে জাগে তীব্র মিষ্টিবাসনা। মহিমাগঞ্জ থেকে আজ বগুড়া এসেছে কবি মজনু শাহ। সারাটা দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা আড্ডা দিয়েছি আমরা কয়েকজন। রাত একটু ঘন হয়ে এলে নেউলের মতো বেরিয়ে পড়লাম আমরা তিন নিশাচর…মিষ্টির দুনির্বার আকর্ষণে। রিকশার সিটের দুই পাশে বসেছি দুজন, মজনু আর আমি, দুজনের দুই কাঁধে দিব্যি দুই পা ঝুলিয়ে স্নিগ্ধ ননীচোরার মতো নতমুখে বসে আছে কিশোর কবি অমিত রেজা চৌধুরী। ক্ষীরের সন্দেশের মতো চাঁদ উঠেছে আকাশে। চাঁদ থেকে বিচ্ছুরিত মিহি মসলিন সুতার কোটি-কোটি ঝালর উড়ছে বাতাসে। কবিদের রিকশা চলছে ওইসব সূক্ষ্ম মসৃণ এলোমেলো উড়ন্ত জ্যোৎস্নাতন্তু ঠেলে ঠেলে। তিনজনে মিলে সারা গায়ে শুষে নিচ্ছি সেইসব রেশমি বিকিরণ আর পাঁচ-পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের ওপর ঘটিয়ে তুলছি পাঁচ-পাঁচ রকমের ব্যতিক্রমী সালোকসংশ্লেষণ।

চা-মিষ্টি-সন্দেশ খেতে খেতে একই টেবিলে বসা বাসের হেলপার আর কয়েকজন যাত্রীর সাথে গুলতানি মারলাম কিছুক্ষণ। যাত্রী তিনজন কাজ করে ইটের ভাটায়, বাড়ি ভুরুঙ্গামারি, মাস-কয়েক একনাগাড়ে কাজ করে বাড়ি ফিরছে। বেশ কয়েকটি আধুনিক কবিতাও শোনালাম তাদের, বাংলা ভাষার বিখ্যাত বিখ্যাত সব কবিতা, কণ্ঠে বেশ আবেগ ও দরদ লাগিয়ে লাগিয়ে পড়লাম। কিন্তু এ কী! ও মা, এ দেখি বিরক্ত হয়, কিছুটা রাগ-রাগ ভাবও। বলে, “কী সব পড়েন-না আপনেরা! ছাগলের নাদি আর জঞ্জালের চচ্চড়ি!” বুঝলাম, আমাদের কাছে যা কবিতা, ওদের কাছে তা নির্যাতন, ওদের সৌন্দর্যবোধের ওপর নির্যাতন! অমিত বলে, “আচ্ছা, উৎপলের একটা কবিতা শোনাই?” একজন বলে ওঠে, “কার? লুৎফুলের? হ, হুনছিলাম, মধু শ্যাখের ব্যাটা পাগলা লুৎফুল নাকি কবিতা ল্যাখে। হ্যার কবিতা?” আমি তখন বলি, “তাইলে ছন্দের একটা কবিতা শোনাই?” বেয়াদব হেলপারটা বলে কী জানেন, “থোন ফালায়া আপনাগো ছন্দ। আপনাগো ছন্দ, না পাদ-মারা গন্ধ!” তো, দেখলাম আর এগিয়ে কাজ নাই।

সুবিল। করতোয়ার সরু একটা শাখা। বাড়িঘর, গাছপালার ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে হালটের মতো। ফিনিকফোটা জ্যোৎস্না। ফেরার পথে দেখলাম অদ্ভুত এক দৃশ্য- ঘোষপাড়ার নিতাই ঘোষ মালকোছা মেরে পলো খালুই নিয়ে গোয়ালঘর আর বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে দুড়দাড় করে নেমে পড়ছে সেই হালটে। আর বাঁশঝাড়ের মধ্যে একটা বাঁশ ধরে দাঁড়িয়ে আছে তার বউ। হালটে কোমর-পানি। সেই পানিতে গভীর রাতে একা-একা নিতাই খপ-খপ করে পলো ফেলে মাছ ধরছে। এত মাছ এলো কোত্থেকে! রিকশা থামিয়ে খেয়াল করে দেখি-কি, হালটের জলে ভেসে যাচ্ছে সোনালি সোনালি সব বাঁশপাতা। আর নিতাই যেই পলো ফেলছে একেকটি বাঁশপাতার ওপর, অমনি খলবল করে উঠছে পানি এক ঝলক আর ওই সোনালি বাঁশপাতা বদলে গিয়ে হয়ে যাচ্ছে রুপালি বাঁশপাতারি মাছ। নিতাই সমানে সেই মাছ ধরে ধরে রেখে দিচ্ছে কোমরে-বাঁধা খালুইয়ের ভেতর। অবিশ্বাস্য এই দৃশ্য এখনো মুদ্রিত হয়ে আছে আমার চোখের তারায়। জানি না মজনু আর অমিতের মনে আছে কিনা। কী মজনু, মনে আছে? অমিত, মনে পড়ে? কিছু বলছেন না যে আপনারা?

পরে শুনেছিলাম, নিতাইয়ের নতুন পোয়াতি বউয়ের বাঁশপাতারি মাছের চচ্চড়ি খাওয়ার খুব সাধ হয়েছিল, কয়েকদিন ধরে ঘ্যানঘ্যান করছিল নিতাইয়ের কাছে। নিতাই জোটাতে পারে না। অগত্যা গভীর রাতে হালটের পানিতে নেমেছে নিতাই, আর গর্ভিণী নারীর প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে বাঁশপাতা রূপান্তরিত হচ্ছে বাঁশপাতারি মাছে। এরকম মাঝে-মধ্যে ঘটে কিন্তু দুনিয়ায়। ঘটে না?


8 Responses

  1. মজনু শাহ says:

    আবছা হয়েছিল স্মৃতিটা। আপনি সেসব ফটোগ্রাফের মতো করে ধরেছেন। এত ডিটেইল, বিস্ময় লাগে। বর্ণনা ভঙ্গীটি চমৎকার।

  2. বনি আমিন says:

    মাসুদ খানের গদ্য ! আমার তো হুমড়ি খেয়ে পড়ার অবস্থা – চলে তাই একদিকে মৃদু বাণিজ্য আর অন্য দিকে তা পড়া। কবিতার নাম যদি পদ্য হয়, তো তাঁর পদ্যে আর গদ্যে ভেদ বোঝা দায় – অন্তত আমার তাই মনে হইছে। কেন যে তার কবি বন্ধুরা এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায় নি তা বোধগম্য নয়।নাকি তারা আমার চেয়ে বড় বাণিজ্যে তৎপর ? এখানে তো এই বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমে তো দেখি পাঠক নয়, লেখক সমাজেরই তো প্রতিক্রিয়া।
    বনি আমিন

  3. মিজান মল্লিক says:

    এমন সুস্বাদু ও রসময় সরস গদ্য…হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেছে… ভালো লাগলো… অনেক ভালো …নির্মল আনন্দে মন ভরে গেছে…পরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম…অনেক অনেক শুভ কামনা…

  4. Rowshan Ara Mukta says:

    অভিনব!!!!!!!!!!অসাধারন!!!!!!!!

  5. Subrata Augustine Gomes says:

    আমি কিছু বলতেই পারছি না, খান সাহেব, আপনার ঐ পাথরের মতো, “চুপচাপ অন্ধকার হয়ে পড়ে” আছি টাসকি খেয়ে…

  6. shakil meraj says:

    অসাধারন!!!!!

  7. গিয়াস আহমেদ says:

    এত সুস্বাদু লেখা! গোগ্রাসে গেলা নয়, পান করেছি বলা চলে তৃষ্ণার্তের মতো…। লেখার এই অপরূপ ভঙ্গিমা ভোলা অসম্ভব।
    মাসুদ খান, সেলাম নিন। আরো লিখুন ভাই, আরো…

  8. খাতুনে জান্নাত says:

    অসাধারণ চুম্বকধর্মী কাহিনীচিত্র। মাসুদ ভাই আরও লিখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.