ভ্রমণ

গন্তব্য সিকিম

Debabrata_Das_Limon | 13 Dec , 2007  

ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশ ফোর্সের তোরণ
ইন্দো-তিব্বত বর্ডারে

প্রকৃতির সবটুকু বিশালত্ব নিয়ে পাহাড়গুলো আকাশ ছোঁয়। এত বিশালত্বের প্রাচুর্যেও তার নেই কোনো অহংকার, অস্তিত্ব জানান দেয়ার গর্জন। অসম্ভব নিরবতায় পাহাড় আমাদের শেখায় ধৈর্য্য, শান্তি আর ভালবাসার স্বপ্ন, যা আকাশ স্পর্শ করবে কিন্তু শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের অহেতুক আয়োজনে বিভোর হবে না।

সেই বিশালতার মাঝে সুন্দরের বন্দনায় এ বছর অক্টোবর মাসে আমরা ছ’জন পাল তুললাম হিমালয় পর্বতমালার কোলে ভারতের সিকিমে। হিমালয় পর্বতমালা, ভূটান, তিব্বত, চীন ও নেপাল তিন দিক থেকে ঘিরে রেখেছে সিকিমকে, আর দক্ষিণে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং। এত জাতির ও ভাষার সংমিশ্রণে সিকিমের সমাজ সংস্কৃতি অন্যরকম। ৭০০০ বর্গ কিলোমিটারের সিকিমে এখনও খুঁজে পাওয়ার মত অনেক পৃথিবী আছে।
ভোরে হোটেলের ছাদ থেকে কাঞ্চনজংঘা গ্যাংটক…….
ভোরে হোটেল থেকে কাঞ্চনজংঘা গ্যাংটক
……..
উত্তর পশ্চিম সিকিমকে তুষারাবৃত করে ভারতের সর্বোচ্চ এবং পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত কাঞ্চনজংঘা সগর্বে দাড়িয়ে আছে। হাজার রকমের অর্কিড, পাইন, রডোডেনড্রন ফুলে ভরা উত্তর-পশ্চিম। বিধাতা সিকিম জুড়ে রঙের হোলি খেলছেন।

বুড়িমারী বর্ডার পার হয়ে টাটা সুমো জিপে সরাসরি শিলিগুড়ি। সিকিমের বিবেকের সাথে বসে সাত আট দিনের একটা ট্রাভেল প্ল্যান করি। তখনই জিপে চেপে ১১০ কিলোমিটার দূরে সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকের উদ্দেশ্যে যাত্রা। গ্যাংটক নামের সাথে পরিচয় হয়েছিল সেই ছোট্ট বেলায় সত্যজিৎ রায়ের লেখায়।

রাংগপো চেকপোস্ট পার হতেই সন্ধ্যা নামল। তারপর আকাশ জুড়ে তারার মেলা। কিছুক্ষণ পর ভুল ভাঙলো। ওগুলো তারা নয়, পাহাড়ের গা জুড়ে গড়ে ওঠা ঘরে আলো জ্বলছে। যেন স্বপ্নের এক জগত। সিতান, রানিপুল পার হয়ে পৌঁছে গেলাম সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৫০০ ফুট উচ্চতায় গ্যাংটকে। বিচিত্র আবহাওয়ার সিকিমে আসার আগে উলেন সুয়েটার, কানটুপি, হ্যান্ড গ্লাভস, স্টর্ম ফিট অল ওয়েদার জ্যাকেট নিয়ে আসা ভাল। এখানে যে কোনো সময় তাপমাত্রা ১৫ থেকে ০ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা মাইনাসে নেমে আসে। প্রতিবছর গড়ে ১৫০ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে হোটেলের ছাদ থেকে অবাক হয়ে দেখি পর্বতের গায়ে গ্যাংটক শহর, অন্যপাশে বরফে ঢাকা পর্বতমালা।

এই দিন জিপ নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম ১২৬ কিমি দূরে উত্তর সিকিমের উদ্দেশে। আজ গন্তব্য লাচুং (৯৬০০ ফুট )। সিকিমের চার জেলার মধ্যে উত্তর সিকিম আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় এবং জনসংখ্যার দিক থেকে ছোট। সাধারণত ভুটিয়া, লেপ্চা, তিব্বতীদের বসবাস। হিমালয় পর্বতমালার অবর্ণনীয় ও নাটকীয় দৃশ্য দেখার জন্য উত্তর সিকিমের তুলনা হয় না। অনেক উচ্চতায়, অনেক লেক আর হাজার ঝর্নার একত্র বাস। ধন্যবাদ জানাতে হয় বিআরও মানে বর্ডার রোড অর্গানাইজেশনকে। এই বিআরও-র কল্যাণে অনেক দুর্গম এলাকায় যেতে পারছি। পর্বতের পর পর্বত, ছোট থেকে শুরু করে অনেক বড় ঝর্না পেরিয়ে আমরা চলছি। চারশ, পাঁচশ ফুট উপর থেকে খাড়া নিচের দিকে নেমে আসা ঝর্নার পানি পাথরে আছড়ে পড়ে মুহূর্তে ফেনায়িত মেঘ তৈরি করে। একটু রোদ পড়লেই দেখা যায় রংধনুর জেগে ওঠা ।

প্রায় প্রতিটি মাইলস্টোনের পাশে সুন্দর কিছু তথ্য বা নির্দেশিকা দেয়া থাকে। ‘If married divorce speed’ তার মধ্যে অন্যতম। দু একটি চেকপোস্টে পরবর্তী গন্তব্যের সে দিনের তথ্য দেয়া থাকে, রাস্তা বরফে ঢাকা কিনা বা ল্যান্ড স্লাইড হয়েছে কিনা ইত্যাদি।
সেভেন সিস্টার ফল্স, ফুদং, রঙরাঙ, মানগান পেরিয়ে আমরা তখন চারদিক থেকে উঁচু পাহাড়ে ঘেরা চুংথাং শহরে। যদিও উচ্চতা মাত্র ৬০০ ফুট। মানগান থেকে অনেক বেশি ঠাণ্ডা, অনেক বেলা পর্যন্ত এখানে খুব ঠাণ্ডা বাতাস বয়। সূর্যের আলো যখন ওপর থেকে পড়ে এই অলস থমকে থাকা ঠাণ্ডা, কুয়াশা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। উত্তর সিকিমের দুটো উপত্যকা ও দুটো নদীর সংযোগস্থলে চুংথাং। লেচাংচু নদী ও লাচেনচু নদী মিলে এর নাম হয়েছে তিস্তা। ইন্ডিয়া আর্মির বড় একটা বেস ক্যাম্পও এখানে।

আরও উত্তরে রাত ৮ টায় চীন বর্ডারের কাছে লাচুং-এ পৌঁছি। লাচুং শব্দের অর্থ ছোট পর্বত। লাচুং এক সময় তিব্বতের অংশ ছিল। ১৯৫০ সালে অধিকৃত হওয়ার আগে ছিল তিব্বত ও সিকিমের বাণিজ্য পরিচালনার কেন্দ্র। পরে বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি ভারত সরকার লাচুং টুরিস্টদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ায় এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভাল। এখানে প্রতিটি পর্বতচূড়া বরফে ঢাকা থাকে সবসময়। শীতকালে পুরো শহরটাই। ব্রিটিশ পর্যটক জোসেফ ডালটন হুকার লাচুং সম্পর্কে তার বিখ্যাত দি হিমালয়ান জার্নাল-এ লিখেছিলেন, ‘Most picturesque village of Sikkim।’ আসলেই ছবির মত। গ্যাংটক থেকে পুরো পথেই পাহাড়ি নদীকে সঙ্গী হিসেবে পাওয়া যায়। কখনো শান্ত, কখনো ভয়ঙ্কর, স্বচ্ছ-নীল পানির পাথুরে নদীটি ভুলে যাওয়া কঠিন।

সকালে এক ঘন্টারও কম সময়ে লাচুং থেকে আমরা পৌঁছি ইয়ুমথং (১২,০০০ ফুট) উপত্যকায়। গ্যাংটক থেকে প্রায় ১৫৬ কিমি দূরে। পথে বন্য ঘোড়া, ইয়ক্ (চমরিগাই)। আর পথ চলতে চলতে লক্ষ্য করি পর্বতের রঙ পাল্টে যাচ্ছে, অর্থাৎ পাইনসহ অন্যান্য গাছের ফুলের বিচিত্রতা মনে দাগ কাটে। সারিবদ্ধভাবে সাজানো হিমালয় পর্বতমালা ঘেরা ইয়ুমথং উপত্যকা। যেখানে গাছের সারি শেষ আর হিমালয়ের হাইল্যান্ড শুরু। উপত্যকা জুড়ে বন্য হলুদ এবং বেগুনী প্রিমুলাস, বিভিন্ন রডোডেনড্রন। বরফে ঢাকা পর্বতগুলো চারিদিক থেকে মনে হচ্ছে রাঙানো সু-উচ্চ উপত্যকা। তিস্তা নদীর একটা প্রবাহ এই উপত্যকা দিয়ে বয়ে চলেছে।

প্রচণ্ড তুষারপাতের কারণে ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ইয়ুমথাং টুরিস্টদের জন্য বন্ধ থাকে। উপত্যকা জুড়ে হিমালয়ের তীব্র ঠাণ্ডা বাতাসের কারণে এক পর্যায়ে জমে যাওয়ার অবস্থা। পাশে ছোট্ট একটা টং ঘরে ঢুকে তিব্বতী বন্ধুদের সাথে নেচে-গেয়ে মজা করি। আরেকবার অনুরোধ করার পর বুঝতে পারি বাংলা গান ওদের ভাল লেগেছে। ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার একটা ঘণ্টা পর পৌঁছি ইউমিসামডং (১৫,৩০০ ফুট) চীন বর্ডারে। যেখানে বিআরও-এর রাস্তা হঠাৎ থমকে গেছে। দাঁড়িয়ে থেকে অবাক হয়ে দেখতে থাকি দি গ্রেট হিমালয়ান রেঞ্জ। অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলিনি, শুধু অবাক তাকিয়ে রই। অন্তত আমার কাছে এই অনুভূতি অবর্ণনীয়।
ফেরার পথে সিকিমের সর্বোচ্চ লেক গুরুডম্বার (১৭,১০০ ফুট)। অনেকে উইশিং লেকও বলে। স্থানীয়দের বিশ্বাস এই লেকের কাচের মত স্বচ্ছ পানির ধারে দাঁড়িয়ে কেউ কিছু প্রার্থনা করলে বিধাতা তার কথা রাখেন। অন্যদের মত আমরাও কিছু সময় কাটাই এখানে। পথে অনেক মনাস্টেরি পেরিয়ে রাতে গ্যাংটক পৌঁছলাম। প্রায় সবগুলো মনাস্টেরি ১৮০০ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত এবং অনেক ইতিহাস এর পেছনে। সবাই খুব ক্লান্ত।
ইয়ুমথাং এর পথে
ইয়ুমথাং এর পথে

পরদিনের গন্তব্য পূর্ব সিকিমের চাংগু লেক, বাবা মন্দির, নাথুলা (চীন বর্ডার)। গ্যাংটক থেকে ৪০ কিমি দূরে ১২,২১০ ফুট উচ্চতার চাংগু লেক। ১ কিমি লম্বা, ওভাল শেপ-এর কাচের মত স্বচ্ছ পানির লেক, পাশেই আলপাইন জোন। ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এই লেক বরফে ঢাকা থাকে। লেকের অন্য পারে বরফাবৃত পর্বতে শিব মন্দির। অল্প দূরেই তিনটি পর্বত গুহা তার মধ্যে তিস্তেন তাসি সিকিমে আসা ৯০ ভাগ টুরিস্টের নজর কাড়ে। লোমশ ইয়ক-এর পিঠে চড়ে অনেক ট্যুরিস্ট লেকের পাড়ে ঘুরে বেড়ায়।

চাংগু
চাংগু লেকের পথে মেঘের সখ্য

আঁকাবাকা রাস্তা দিয়ে আবার চলতে শুরু করি আরও ১৬ কিমি দূরে নাথুলাপাস (১৪,৪৫০ ফুট)। ইন্দো-চীন বর্ডার হওয়ায় সপ্তাহে বুধ বৃহস্পতি এবং শনি রবিবার অনুমতি নিয়ে এখানে আসা যায়। ইন্ডিয়া আর্মি ও চীনের রেড আর্মি সামনাসামনি অবস্থানে থাকে। বছরের অনেকটা সময় বরফে ঢাকা থাকলেও আলপাইন এবং অন্যান্য গাছের দারুণ সমন্বয় সবার মন কাড়ে। হিমালয় রেঞ্জের অন্যতম সুন্দরের নাম নাথুলা।

আরও কিছুদূরে নাথুলাপাস ও জিলিপা পাসের মাঝামাঝি বাবা হরভজন সিং মেমোরিয়াল (১৩,১০০ ফুট)। ২৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বীর সৈনিক এই হরভজন সিং দেশরক্ষার জন্য বরফাবৃত পর্বতে যুদ্ধ করেন এই সীমান্তে। অনেক লোমহর্ষক ইতিহাসে সমৃদ্ধ এই বাবা মন্দির। কথিত আছে চীনের সাথে যুদ্ধ চলাকালীন একদিন স্বপ্ন দেখার পর বাবা হারিয়ে গেলেন। উনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন ওনার স্মৃতির উদ্দেশ্যে যেন একটা স্মৃতিস্তম্ভ হয়। তার সহযোদ্ধারা স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করলেন সেখানে, যেখানে হারিয়ে যাওয়ার কিছুদিন পর বরফে জমাটবাঁধা অবস্থায় বাবার মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। বাবা মন্দির এখন তীর্থযাত্রীদের গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। ফেরার পথে দুপুর আড়াইটার দিকে হঠাৎ ঘন মেঘে ঢেকে গেল চারপাশ। চারদিকে এত সাদা যে চোখ খুলে রাখাও কষ্টের। জিপের হেডলাইট জ্বেলেও পথচলা বিপদজনক হওয়ায় আমরা অপেক্ষা করতে থাকি। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বাতাস চারদিক উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

প্রায় এক ঘণ্টার পর কিছু পথ নেমে আমরা পৌঁছলাম সেরেথাং (১৩,৬০০ ফুট)। ইন্ডিয়া ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য পরিচালনার জন্য সেরেথাং-এ দু’দেশের কাস্টমস। কাস্টমসের ওপারে রিংগিংগাং চীনের সীমান্ত গ্রাম। তথ্যপ্রযুক্তির পেশাতে থাকায় এ জায়গাটি আমার জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভিস্যাট (১৩,৬০০ ফুট) এবং সাইবার ক্যাফে। সিকিম ইনফরমেশন টেকনোলোজি ডিপার্টমেন্ট এই ভিস্যাট স্থাপন করে Limca world record book 2007-এ জায়গা করে নিয়েছে। ফেব্র“য়ারি ২০০৭-এ এই সেরেথাং শহর প্রচণ্ড তুষারপাতের কারণে ১০ ফুট বরফের নিচে ছিল। আর ভি-স্যাট কার্যত অচল হয়ে পড়ে। তাই আগামী তুষারপাতের সময় ভিস্যাট সচল রাখার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত কমিউনিটি ইনফরমেশন সেন্টার।

পরদিন গ্যাংটকে আরও কিছু জায়গায় গেলাম। প্যাসেঞ্জার রোপওয়ে, গনেশটক, হনুমানটক, কবি লঙ্ঘ, ডিয়ার পার্ক, ডুল ডুল চোরটেন, হোয়াইট হল, গর্ভন্টমেন্ট ইনিস্টিটিউট অফ কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ, রিসার্চ ইনিস্টিটিউট অফ তিব্বতোলোজী, দি রয়েল চ্যাপেল, দি রিজ, তাসি ভিউ পয়েন্ট, দি ইপ্চে গার্ডেন, টি র্গাডেন এবং কিছু ঐতিহাসিক মনাস্টেরিতে গেলাম আমরা।

সিকিম থেকে পরদিন সকালে রওনা হলাম ৯৪ কিমি দূরে দার্জিলিং (৬৯৮২ ফুট)। আবারও পাহাড়ের পর পাহাড়, মেঘের পর মেঘ পেরিয়ে একসময় বিখ্যাত ট্যুরিস্ট প্লেস দার্জিলিং পৌঁছি। দাজিলিং চৌরাস্তার কাছে হোটেলে ব্যাগ রেখে হেঁটেই পৌঁছাই হিমালয়ান মাউন্টেইনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে। স্যার অ্যাডমুন্ড হিলারীর সাথে এভারেস্ট জয়ী বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি তেনজিং নোরগে এই ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছেন। পর্বত আরোহনের অনেক যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্যের এক আদর্শ স্থান এই ইনস্টিটিউট, পাশেই হিমালয়ান মাউন্টেইনিয়ারিং গার্ডেনে হিমালয়ের বন্য ইয়ক, রেড পান্ডা, স্লো-লেপার্ড, সাইবেরিয়ান বাঘ, গ্রেবার্ড ইত্যাদির দেখা মেলে। চমৎকার আবহাওয়ার কারণে অভজারভেটরি হল থেকে হিমালয়ের পুরো কাঞ্চনজংঘা রেঞ্জ দেখে আবারও অবাক হই। রাজ্যের যত অহঙ্কার নিয়ে দাঁড়িয়ে মাউন্ট কাঞ্চনজংঘা। হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যায় পৌঁছি পর্যটকদের আশ্রয়স্থল চৌরাস্তা মল রোড, যাকে ভিক্টোরিয়ান দার্জিলিং-এর হার্ট বলে। ভুটানী, নেপালী, তিব্বতি, সিকিমিজ ঐতিহাসিক হস্তশিল্প, আদিবাসী অলংকার আর পোশাকের দারুণ সম্মিলন এই মল।

ghoom……..
দার্জিলিং-এ ভারতের সর্বোচ্চ রেলস্টেশন ‘ঘুম’
……..
পরদিন ঘুরে বেড়াই রানগিট প্যাসেঞ্জার রোপওয়ে, ঘুম ঘুম্পা (যেখানে আগামী বুদ্ধদের-এর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত) তিব্বতিয়ান রিফুইজি ক্যাম্প, লইড’স বোটানিক্যাল গার্ডেন, নাইটিঙ্গেল পার্ক, বাতাসিয়া লুপ, কাসিয়ং, কালিম্পং। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের ‘ঘুম’ (৭৪০৭ ফুট) ভারতের সর্বোচ্চ রেলস্টেশন। দার্জিলিং থেকে টয় ট্রেন-এ শিলিগুরি যাওয়ার পথে পাহাড় পর্বত চাবাগানের ভিউ আছে।

সুখিয়াপোখরি, সেবক হয়ে পৌছি নেপাল পশুপতী বর্ডার-এ। পাস নিয়ে ঘন্টা দুয়েক ঘুবে বেড়াই নেপাল পশুপতী মার্কেটসহ আর কিছু দর্শনীয় স্থানে। দার্জিলিং জেলার মিরিক মূলত চা-বাগান ও কমলাবাগানের জন্য বিখ্যাত। সারি সারি ছবির মত চা বাগান এখানে।
রাত তিনটায় রওনা হই কাঞ্চনজংঘার বুকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সূর্যোদয় দেখার জন্য। টাইগার হিল (৮,৪৮২ ফুট) পৌঁছাতে বেশিক্ষণ লাগল না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দু’বার এখানে এসেছিলেন কিন্তু পর্বতের বিচিত্র আবহাওয়ার কারণে কাঞ্চনজংঘার বুকে সূর্যোদয় দেখতে পারেননি।

প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বাতাসের মধ্যেও অবাক হয়ে দেখতে থাকি পূর্ব হিমালয় পর্বতমালা। কেন জানি পিছনে ফিরলাম। আরও অবাক হয়ে দেখতে থাকি মেঘসমুদ্র, ঠিক তাই, সত্যিই মেঘের সমুদ্র। এতদিন ভারত মহাসাগর, বঙ্গোপসাগরে পানির সমুদ্র দেখেছি, আর আজ দেখেছি দি ওশান অফ ক্লাউড।
tiger hill
কাঞ্চনজংঘায় সূর্যোদয়

মেঘেরা একপাল হয়ে ঘুমোচ্ছিল, আলো ডেকে বলল, জেগে ওঠো। এ ডাকেই হয়তো ধীরে ধীরে সব মেঘ উপরের দিকে উঠতে থাকে। ভাবছি, স্বপ্ন দেখছি না তো? সূর্য উঠছে। কাঞ্চনজংঘার রঙ একটু একটু করে পাল্টাচ্ছে। পর্বতমালা বরফাবৃত হওয়ায় সূর্যের প্রথম আলোতে নিজেকে রাঙিয়ে নিচ্ছে কাঞ্চনজংঘা। আকাশ একদম পরিষ্কার। দূরে পৃথিবী বিখ্যাত মাকালু, লোৎসে, কাবরু, সিনিলচু পর্বত। অনেক দূরে স্বগর্বে মাথা উঁচু করে মাউন্ট এভারেস্ট।

নভেম্বর ২০০৭
ddas78@yahoo.com


4 Responses

  1. Rv‡q` says:

    লেখাটি পড়ে বন্ধুদের সাথে দার্জিলিং ট্যুরের সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো মনে পডে গেলো। প্রতিটি লাইন পড়ছি আর মনের গভীর স্মৃতিপটে প্রতিটি ছবি ভেসে আসছিলো। আসলেই টাইগার হিলের সেই সূর্যোদয় কিংবা টয় ট্রেনের জার্নি কখনোই ভোলার নয়। লেখকে অনেক ধন্যবাদ।

    জায়েদ

  2. আরাফ/ফয়সল says:

    অপূর্ব তথ্য আর ছবির জন্য লেখককে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

    – আরাফ/ফয়সল

  3. pintu says:

    অসাধারণ।

    – pintu

  4. মুনিরুল হাসান says:

    ভ্রমণকাহিনীটি অপূর্ব লেগেছে। আমার একটা প্রশ্ন ছিল অনুগ্রহ করে এর উত্তরটা দিলে অনেক বেশি খুশি হবো। আমার ই-মেইলে উত্তরটা পাঠালে আরো বেশি ভালো হয়। আগে ই-মেইল অ্যাড্রেসটা দিয়ে নিচ্ছি। এটা হলো munirul.hasan@yahoo.com। আমি যতটুকু শুনেছি বাংলাদেশীদের জন্য সিকিমে যাওয়া নিষিদ্ধ করে রেখেছে ভারত সরকার। তাহলে আপনি আপনার বন্ধুদের নিয়ে কীভাবে সিকিমে গেলেন? ভারতীয় নাগরিক সেজে? ট্রিক্সগুলো একটু বলে দিন। সিকিম আমাকে ভীষণ টানে। এই ভ্রমণকাহিনী পড়ে সেটা আরও বেড়ে গেলো। যাওয়ার উপায়টি বাতলে দিলে কৃতজ্ঞ থাকবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.