কুর্মিটোলা, ময়নামতি

মীর ওয়ালীউজ্জামান | ২৩ december ২০১১ ১:৩১ অপরাহ্ন

লেফটেন্যান্ট/সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট–এই দুই পদবীধারীকে ডাকাডাকি করতে লেফটেন্যান্ট অমুক বলার রীতি। লিখতে গেলে অবশ্যই সঠিক র‌্যাঙ্ক উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয়। আমরা সকলেই সরাসরি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে কমিশনপ্রাপ্ত–যেহেতু এমএ/এমএসসি/বিই ইত্যাদি ডিগ্রিধারী এবং বিশেষ বিশেষ টেকনিক্যাল কোরে নিয়োগপ্রাপ্ত। তো আমার ‘সামান’ এসে গেলে আমি সুটকেস খুলে তোয়ালে, সাবান বের করে হাতমুখ ধুয়ে এসে ইজিচেয়ারে বসেছি। চা এল একপট। কমপ্লিমেন্টারি। নতুন অফিসারের রিসেপশ্যনের অঙ্গ। সঙ্গে একটা ফলের চ্যাঙারি আর বিস্কিট। বেশ ভাল লাগল। মেস ওয়েটার বলে গেছে, চা খেয়ে মেসে গেলে অন্যান্য অফিসারদের সঙ্গে আলাপ হবে। অবশ্য, যাবার আগে ফুলহাতা শার্ট এবং টাই পরে নিলে ভাল হয়, কারণ আমাদের ইন-সার্ভিস মিলিটারি ট্রেইনিং–গ্রুমিং শুরু হয়ে গেছে।

c_wali.jpg……
সেনাশিক্ষা কোরের ক্যাপ্টেন ওয়ালী, সাল ১৯৭৫
……
পড়েছি মোগলের হাতে…। অতএব, এর শেষ দেখার সহজ সংকল্প নিয়ে ধড়াচূড়ো ধারণ করে অফিসার্স মেসে গেলাম। ভুলে গেলাম, আমি একজন কমিশন্ড আর্মি অফিসার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ, প্রাক্তন প্রভাষক, মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজ। মেসে পা দিয়ে মনে হল, আমি একজন জেন্টলম্যান ক্যাডেট মাত্র, ভরদুপুরে গলায় টাই বেঁধে ঘামছি আর সামনে কী দেখব, সে বিষয়ে পূর্বধারণা অনুযায়ী সবচেয়ে খারাপ কিছু র‌্যাগিং নমুনা মনশ্চক্ষে অবলোকনের চেষ্টা চালাচ্ছি। ঢুকেই লম্বাটে রিসেপশ্যনে হ্যাট স্ট্যান্ড, বড় বড় আয়না দেয়ালে আর একপাশে বার কাউন্টার। সব ফার্নিচার মেহগনি রং-এর। ভারি লাল ভেলভেট দিয়ে তৈরি পর্দা–কাল্‌চে লাল। কার্পেটও ম্যারুন। আমি একটু বাঁয়ে ঘুরে কাছের লম্বা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাইয়ের গেরো ঠিকঠাক করলাম। আসলে এনটিসিপেশনের এলোমেলো একটু স্ট্রিমলাইন করা আর কি। কিন্তু অনন্তকাল তো আর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা চলে না।

অতএব, যা থাকে কপালে ভাব নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলাম। মস্ত ঘর। দু’দিকের দেয়ালজোড়া সোফায় কেউ বসে, নিচুস্বরে বাক্যালাপে রত, কেউবা দাঁড়িয়ে। আস্‌সালামু আলাইকুম, স্যর। অন্ধের মতো উইশ করে এগিয়ে গিয়ে সবচেয়ে কাছের অফিসারের সঙ্গে করমর্দন করে নিজের নাম এবং র‌্যাঙ্ক উচ্চারণ করলাম, মুখে চিলতে হাসি ধরে রেখে। অফিসার মোটা গোঁফ নাচিয়ে হেসে উঠলেন, বললেন, আই থিঙ্ক উই হ্যাভ মেট বিফোর। আয়্যাম ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম, ইস্ট বেঙ্গল। সিন্স আয়্যাম দ্য সিনিয়্যরমোউস্ট অফিসার প্রেজেন্ট হিয়ার, ইটস মাই প্রিভিলিজ টু ইন্ট্রোডিউস ইউ টু দ্য রেস্ট…। পরিচয় হল। আমার ব্যাচের আরো ক’জন এসে ইতোমধ্যে জয়েন করছে। কামাল, জহির, আলী, জাকারিয়া, আলম, ভুঁইয়া, রায়হান, কায়সার আর মাহ্‌বুব। আরো কয়েকজন আসবে বিকেলের মধ্যে। আমাদের সবারই বাসস্থান এই মেসে। পরদিন সকাল থেকে প্রশিক্ষণ শুরু হবার কথা। বোঝা গেল, ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম আমাদের প্রাথমিক ব্রিফিং দেবার জন্যই মেসে উপস্থিত এবং দিনটি উনি আমাদের সঙ্গেই কাটাবেন। আমরা যে কোনো বিষয়ে তার সঙ্গে আলাপ করতে পারি দিনভর, রাতে ডিনারের পর দশটা পর্যন্ত। পরদিন সকালে উঠে সাড়ে পাঁচটায় পিটি কিটে আমাদের উনি মার্চ করিয়ে ৪ ইস্ট বেঙ্গলের মাঠে নিয়ে পরবর্তী ট্রেইনারের কাছে সোপর্দ করবেন।

কয়েকজনের চেহারা বেশ চেনা, নটরডেম কলেজে এক ইয়ারে অথবা একই ক্লাসে পড়েছি, এমন ক’জনের সঙ্গেও লাঞ্চের আগে, পরে আলাপ হয়ে গেল। জহির, আহমেদ আলীকে সেই ’৬৬ সাল থেকে চিনি। খুব একটা একা-একা আর লাগছে না তখন। সন্ধেবেলা মেসের বিলিয়ার্ড রুমে আলাপ হল সেকেন্ড বেঙ্গলের লেফটেন্যান্ট ইসমতের সঙ্গে। বিলিয়ার্ডের কিউ ধরে মাথায় চক ঘষা, কীভাবে বলের ওজন বুঝে কোথায় ঠুকে দিলে কী ঘটে ইত্যাদি শেখা হল ইসমতের সহিষ্ণু প্রশিক্ষণদানের পারদর্শিতার গুণে। বুঝে গেলাম, ক্যারমের কিছু প্রিন্সিপ্‌ল এখানে কাজে লাগানো যাবে সফলতার সঙ্গে। ডিনার খেয়ে গিয়ে বিছানায় কাত হলাম। রুমমেট, কোর্সমেইট এমদাদ ভাই ’৬৫ সালে ভূগোলে এমএসসি করে পানি উন্নয়ন বোর্ডে বেশ ভাল চাকরি করছিলেন। ওর বড়ভাই কর্নেল খুরশিদের উৎসাহে এই বয়সে মাথা মুড়িয়ে আর্মিতে কমিশন নিয়ে নতুন জীবন শুরু করছেন। এখনো বিয়ে থা’ করেননি অবশ্য। একটু ছিটেল গোছের মানুষটি ভাল।

পিটি অর্থাৎ ফিজিক্যাল ট্রেইনিং সেশনের প্রশিক্ষণদানের দায়িত্বে সুবেদার তারু মিয়া। বলতে ভুলে গেছি, ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার বা সিও মেজর আইনুদ্দিনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আমাদের দশ-বারোজন এইসি অর্থাৎ আর্মি এডুকেশন কোর, ইএমই (ইলেক্ট্রিক্যাল মেক্যানিক্যাল এঞ্জিনিয়ারিং কোর) এবং আরভিএন্ডএফসি (রিমাউন্ট্স, ভেটেরিনারি এবং ফার্ম কোর) অফিসারদের প্রশিক্ষণ শুরু হল। প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের সরাসরি বিভিন্ন ইউনিটে পোস্টিং হবে। এই শর্তেই আমাদের কমিশন দেয়া হয়েছে। আমার সাময়িক আর্মি নং হল বিইসি ১১৫। বাংলাদেশে কমিশন প্রাপ্ত সেনাশিক্ষা কোরের আমি প্রথম অফিসার। আমার পরে এমদাদ, কায়সার…। সুবেদার তারু আমাদের স্যালুট করে ফল ইন করিয়ে বললেন, স্যর, আপনারা সবাই কমিশন্ড অফিসার এবং আমি একজন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার অর্থাৎ জেসিও। কিন্তু ক্লাস চলাকালে আপনারা যথাসাধ্য আমার কমান্ড মেনে কাজ করবেন। ক্লাস শেষে আবার আপনারা সে:লে: অমুক এবং আমি সেই সুবেদার তারুমিয়া। বুঝতে পেরেছেন তো? আমরা সমস্বরে জানালাম, জি সাব। সুবেদার র‌্যাঙ্ক লেখা হত ইংরেজিতে সংক্ষেপে এসইউবি বা সাব প্রথমে, পরে নাম–এভাবে।

আমাদের সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক অথবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। তার ওপরে কারো কারো পেশাগত অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা অনেক বেশি–যেমন সফিকউল্লাহ্, যাকে আমি দাদু বলে ডাকতাম–আমাদের চেয়ে সরাসরি দশ বছরের সিনিয়র ছিল–এমদাদ ভাইও বছর পাঁচেকের জ্যেষ্ঠতা নিয়ে এসেছিল, মাহবুবও তাই। তবে অবাক কাণ্ড, ঐ ক’মাসের তীব্র রগড়ানির সময় আমরা সকলেই এক লেভেলে অর্থাৎ প্রশিক্ষণাধীন সেনা কর্মকর্তা হিসেবেই বিবেচিত হতাম, কেউ তেমন ছোটবড় বোধ করিনি। আমার অন্তত এরকমই মনে হত। আমার কেবলই মনে হত, আমরা ক’জন বুড়ো খোকা (সকলেরই প্রায় ২৩/২৪ বছর বয়স তখন) সকলেই ক্যাডেট কলেজের ক্যাডেটদের পর্যায়ে উপনীত হয়েছি–দিনরাত কেবল নানাজনের নানা কমান্ড অর্থাৎ আদেশ শোনা এবং সেই মোতাবেক কাজ করে যাওয়া–এছাড়া আমাদের আর কোনো ইষ্ট নেই।

নইলে যে আমি সুযোগ পেলেই আরাম কেদারায় শরীর এলিয়ে বসতে পেলে বর্তে যাই, সেই আমি ভোরে পিটি গ্রাউন্ডে পা দিলেই অমন চনমনে হয়ে উঠি কী ভাবে? ক্লাসের পর শরীর পাখির মতো ডানা মেলে উড়তে চাইত, তখন ফিরে এসে তৈরি হয়ে, ইউনিফর্ম চড়িয়ে, মেসে গপাগপ ব্রেকফাস্ট সেরে মার্চ করে রেজিমেন্ট সদর দপ্তরে পৌঁছতে পৌঁছতে আবার ভারভারিক্কি হয়ে পড়ত। নড়তে চড়তে ইচ্ছে করত না। একটানা ক্লাস চলত ন’টা থেকে দু’টো পর্যন্ত–মাঝে টিফিন ব্রেইক কুড়ি মিনিট। ক্লাস নিতেন ৪৬ বিগ্রেড কমান্ডার কর্নেল মঈন, মেজর হারুন, মেজর রশীদ, মেজর আইনুদ্দিন–আরো অনেকে। সবাই যার যার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রখ্যাত। মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি তখনো কারো ভাবনাতেও নেই। সদ্য স্বাধীন দেশ–অবশ্য দু’একজন মেধাবি অফিসারকে তখন বেছে বেছে বিলেতে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেবার জন্য পাঠানো হত।

দুপুরে মার্চ করে আমরা মেসে ফিরে প্রয়োজন মতো স্নানাদি সেরে লাঞ্চ খেয়ে একটু গড়িয়ে নিতাম। ঐ সময় এমদাদ ভাইকে দেখতাম গুটিগুটি আমাদের এন্টিরুমে গিয়ে খুট্খুট্ করত। একটু পরেই সে একটি সিগ্রেট ধরিয়ে এঘরে এসে আরামচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুঁজে ধূমপান করত। সাধারণত সে পরপর দু’টো সিগ্রেট টানতো। আবার তো সেই ডিনারের পর তার ধূমপান করার সময়। অবাক হতাম আমরা–যারা সুযোগ পেলেই একটি সিগ্রেট ধরিয়ে বসতাম তখন–যেখানে সেখানে। অবশ্য প্রশিক্ষণকালে আমাদের বলা হয়েছিল, কখনও খোলা আকাশের নিচে, ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে ধূমপান করা চলবে না। কারণ, ঘুটঘুটে আঁধার রাতে অনেক ওপর থেকেও জ্বলন্ত সিগ্রেটের লাল, রাগী আভা দৃশ্যমান হয় নাকি! ফৌজি লোকেরা এত কিছুও ভাবে! যা বলছিলাম, এমদাদভাই তার সিগ্রেটের প্যাকেট যাতে কোনো রকমেই ড্যাম্প না হতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে ট্রাঙ্কের ভেতর একটা কৌটোর মধ্যে বায়ুরুদ্ধ অবস্থায় রাখতো। তার দেখাদেখি আমি যেটুকু করতে শিখি, তা হল, বর্ষার দিনে প্যাকেট খুলে ওপরের রাংতার টুকরোটা ফেলতাম না, সিগ্রেট রাংতা চাপা দিয়ে রাখার অভ্যাসটুকু আমার হয়ে গিয়েছিল।

জীবনের ধন কিছুই ফেলা যায় না–কাজে লাগে। লাগানোর তাগিদটা তৈরি করে নিতে হয়। শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ আমাদের তাই তো যোগায়–আরো প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো কোথেকে, কেমন করে জানতে পারবো, তারই হদিস দেয় মাত্র। সবকিছু কি আর শেখানো বা শেখা সম্ভব? যে কোনো কোর্সে বা ক্লাসে? যা পাওয়া সম্ভব, নেয়া প্রয়োজন–সেটা হল কোনো বিষয়ে খতিয়ে জানার হদিস খুঁজে পাওয়া, লিঙ্কেজ অর্থাৎ যোগসূত্র বুঝে নেয়া। বাকিটা প্রশিক্ষণগ্রহীতার আগ্রহ, প্রবণতা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে জ্ঞান বা তথ্যভাণ্ডারের সমৃদ্ধিসাধন। ঐ ক’মাসের প্রশিক্ষণে প্রচলিত আইন ব্যবস্থা, সামরিক আইন, প্রশাসন–সিভিল ও মিলিটারি, সাধারণ যুদ্ধবিদ্যা, ব্যক্তি পর্যায়ে যেসব অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহারের উপলক্ষ্য ঘটে থাকে, সেগুলোর ব্যবহার, যুদ্ধের ইতিহাস ও ভূগোল, কলাকৌশল ও সংক্রান্ত বিজ্ঞানচর্চা, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ের পরিচিতি, উদাহরণ, ব্যাখ্যা -বিশ্লেষণে আমাদের সামান্য হলেও নবিশি করতে হয়েছিল।

লাভ হল কী? কার? কতটা? যারা ক্লাস নিতেন, তাদের মাঝে কেউ কেউ অত্যন্ত সাবলীল, সক্ষম শিক্ষক ছিলেন। মেজর আইউদ্দিনকে মনে হত সহজিয়া ঘরানার স্বভাবজ্ঞানী মানুষ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামরিক আইনশাস্ত্রের মতো আপাত নিরস বিষয়ে পড়াতেন, মাঝে মাঝে আমাদের ধূমপান করার ছুটি দিতেন, নিজে খৈনি ডলে বুড়ো আঙুল ও তর্জনি দিয়ে এক চিমটি তুলে নিয়ে নিচের ঠোঁট আর দাঁতের মাঝে গুঁজে দিয়ে চোখ বুঁজে থাকতেন আধমিনিট–তারপর আবার শুরু করতেন স্মৃতি থেকে গড়গড় করে প্রাসঙ্গিক বিষয়ে জ্ঞানদান–অবাধে, সহজ স্বভাবে আমার খুব ইচ্ছে হত, ওর মতো সহজ শিক্ষকের ভূমিকা পালন করি গিয়ে কোথাও। কিন্তু পরক্ষণেই থমকে যেতাম–কিছুই তো জানি না। কাকে কী বলব! মেজর আইনউদ্দিন বলতেন, বালক বয়সে ‘ওয়াই ক্যাডেট’ হিসেবে পাকিস্তানি আর্মিতে নাম লিখিয়ে এপর্যন্ত আসতে তো দু’আড়াই দশক তো পার করেছেনই!

মিলিটারি ড্রিল বা সামরিক কুচকাওয়াজের ক্লাস হত সকালে পিটি-র পরে। বুট আমরা ভোরেই নিয়ে যেতাম। পাকা গ্রাউন্ডে ‘লেফ্‌ট রাইট’ সেরে, হাঁটুতে মগজ নামিয়ে আনার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় ঘণ্টাভর মেদিনী কাঁপিয়ে পিটি-র ক্যানভাস জুতো হাতে ঝুলিয়ে মার্চ করে ফিরতাম মেসে। সুবেদার তারুর তাড়নায় আমার বাড়তি ওজন ঝরে গেল, পাখির মতো উড়ে উড়ে প্রায় দৌড়তে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। মনে পড়ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় প্রতিদিন বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যায়ামাগারে হাজিরা দিতে যেতাম, নইলে নাকি অনার্স পরীক্ষায় বসা হবে না। সেখানে তালপাতার সেপাই ক্ষিতিশদার সামনে পড়লেই চিত্তির–তোরা রোজ রোজ সই মাইরা পলাস, আইজকা পাইছি। এই যে এটেনড্যান্স রেজিস্টার আমার হাতে। আগে দৌড়ান, স্যরেরা, জিমের মধ্যেই পাক দ্যাও পাঁচ-সাতটা–তারপর হাজিরা। সেই বাধ্যতামূলক দৌড়োদৌড়ির জোরে তখন ব্যায়াম শুরু করি। স্বামীবাগের বাড়ির পাশবারান্দায় ইট সাজিয়ে ছোটভাই রবুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বুকডন আর বৈঠক চলত বেশুমার। নাদাপেট আমি চাবুকের মতো চর্বি কমিয়ে কোমর আটাশ ইঞ্চি আর বুকের ছাতি ছত্রিশ ছাড়িয়ে বিয়াল্লিশে গিয়ে থেমেছিলাম। অর্থাৎ, ছাত্রজীবন শেষ না হতেই প্রায় দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, যখন স্বাভাবিক জীবনযাপন আমাদের টঙে তুলে রাখতে হয়েছিল অধিকাংশ তরুণকেই। বছর দু’য়েকের বিরতির পর আবার ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে শরীরচর্চার মহড়া শুরু হল।

সকালে তারু সাব আমাদের শরীরর্চচা, দৌড় আর কুচকাওয়াজ করিয়ে কোনো কোনোদিন–বিশেষ করে, ছুটির দিনে–যেদিন রোজকার ক্লাস-লেকচার-পরীক্ষা থাকতো না–সেই কুর্মিটোলার ভেতর দিয়ে আজকের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে পর্যন্ত নিয়ে যেতেন। তখনো এয়ারপোর্ট চালু হয়নি, বিমান চলাচল তেজগাঁ হাওয়াই আড্ডাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। রানওয়েতে দৌড়নোর যে মজা, সেটা, আমি বুঝতাম, সুবেদার তারুর মতো অত্যন্ত অভিজ্ঞ শরীরচর্চাবিদের পক্ষেই আবিষ্কার করা সম্ভব ছিল। ওখানে পৌঁছে আর স্টেপ মিলিয়ে দৌড়নো নয়, দুর্নিবার, অবাধ এক দৌড় হত তখন–যে যেমন পারতাম। শেষ পর্যন্ত জাকারিয়া অর্থাৎ জ্যাক আর আমি সবাইকে ছাড়িয়ে যেতাম, শরীর মনে হত ওজনশূন্য, কেবল পায়ের ডগা শক্ত টারম্যাক ছুঁয়ে যাচ্ছে, আর শরীর যেন বাতাস কেটে সাঁত সাঁত করে ব্যুমেরাং-এর মতো ছুটে যাচ্ছে। তারুর বাঁশি বাজলে আমাদের ফিরতে হত, অনিচ্ছায়।

কোনো কোনো সন্ধ্যায় মেসে সিনিয়র অফিসার কেউ অতিথি হিসেবে আমাদের সঙ্গ দিতেন। সেগুলো ছিল ‘অতিথি সন্ধ্যা’। বিশিষ্ট সিনিয়রেরা তাঁদের অতীত জীবন, সেকালের পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি, কাকুল-এর প্রশিক্ষণ, পাকিস্তানের বিভিন্ন সেনাছাউনি, শহরের গল্প বলতেন, আমরা পানীয়ের গেলাস হাতে হাঁ করে গিলতাম আর ভাবতাম, আহারে, মিলিটারি চাকরির গ্ল্যামার তো ছিল তখনই, এখন তো আমাদের হতদশা। কারণ, আমরা ইউনিফর্মের ভাল ফ্যাব্রিক পেতাম না বাজারে, টেঁকসই, আরামদায়ক পিটি-র জুতো অমিল–এমনকি, আমার কোরের কাঁধের ব্যাজ যোগাড় করে পরতেই বেশ ক’মাস লেগে গিয়েছিল। তবুও সুখেদুখে প্রশিক্ষণ শেষ হল একদিন।

সেনা সদরে ডেকে নিয়ে মেজর নওয়াজেশ একদিন আমাদের হাতে যার-যার পোস্টিং অর্ডার ধরিয়ে দিলেন আর বললেন, মনপ্রাণ ঢেলে কাজ করবে, তোমাদের একেকজনের ওপর বাংলাদেশের মোট পাঁচটি ব্রিগেডের এক-একটির সৈনিকদের শিক্ষার দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে। এটা বড় দায়িত্ব বটে। বাংলাদেশ আর্মি এডুকেশ্যন কোরের তোমরাই সর্বপ্রথম এবং সর্বজ্যেষ্ঠ কমিশন্ড অফিসার। আশা করি, পৃথিবীর পুরনো, সভ্য দেশের সেনাশিক্ষা কোরের সুনাম তোমরা আরো নিষ্ঠার সঙ্গে আমাদের জন্য অর্জন করবে। অত সব ভারী বক্তব্য একজন পদাতিক যোদ্ধার মুখে শোনার পর আমাদের মুখাবয়ব গম্ভীর এবং বাক্রোধ হয়ে গেল প্রায়। দলের চাঁই অর্থাৎ জ্যেষ্ঠতম হওয়ার সুবাদে আমাকে কিছু বলতে হবে। দমবন্ধ করে, সোজা জানালা দিয়ে বাইরের লনের সবুজে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আমিও অতি সংক্ষেপে একটি গেরেমভারী বক্তব্য পেশ করেই খটাস্ করে হিল ক্লিক করে একটি চোস্ত স্যালুট ঠুকে, দলকে মার্চ করিয়ে বাইরের করিডোরে পৌঁছে দিলাম।

কর্মস্থলে যোগদানের জন্য প্রস্ততিমূলক কাজকর্ম ও ভ্রমণ সম্পন্ন করার জন্য সাতদিন ছুটি পাওয়া গেল। চুটিয়ে আড্ডা হল দিন কয়েক–শরীফ মিয়া, রমনা রেস্তোরাঁ, ঢাকা ক্লাব, সিরাজীর বাসা, মিটুর বাড়ি, বাংলাদেশ টেলিভিশন ইত্যাদি জায়গায়। সবাই আমাকে ডাইন আউট করবে–কিন্তু আমার অতগুলো লাঞ্চ, ডিনারে হাজিরা দেবার সময় কই? কাজেই বন্ধুবর্গ, আত্মীয় মহলকে দু’টি-তিনটি খানাপিনার আসর বসিয়ে সন্তুষ্ট করে জয়েনিং-এর ঠিক একদিন আগে তেজগাঁ এয়ারপোর্ট থেকে এফ-২৮ বিমানে উঠে কুমিল্লার পথে রওনা হলাম। ‘ধূমপান নিষেধ’-এর লালবাতি নিবতে সিগ্রেট ধরিয়েছি, বিধুমুখী হস্টেস হাতে একজোড়া চিকেন স্যানউইজ আর একমুঠো টকমিষ্টি লজেন্জ ধরিয়ে দিয়ে গেলেন। ওমা, সিগ্রেট শেষ করার আগেই আবার ‘সিটবেল্ট বাঁধো’, ‘সিগ্রেট নেবাও’–এর লালবাতি জ্বলে উঠল। এসে গেলাম নাকি? শুনেছিলাম, কুমিল্লা প্লেনে যেতে দশ-বিশ মিনিট-ই নাকি সময় লাগে। তাই বলে এত তাড়াতাড়ি?

হাতে স্যানউইজ-এর স্যাশে আর কাঁধে এয়ারব্যাগ ঝুলিয়ে কুমিল্লা এয়ারপোর্টে নেমে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালাম। একতলা বিমানবন্দরের ভবন। বাইরের কমপাউন্ডে একটি জলপাই সবুজ এম ৩৮-এ১ জিপ দাঁড়িয়ে। স্যুটকেইস নেবার জন্য কিউতে দাঁড়িয়ে সিগ্রেট টানছি, খাকি পোশাক পরিহিত মধ্যবয়সী একজন এসে দ্বিধান্বিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি লেফটেন্যান্ট ওয়ালী? ভদ্রলোক নায়েব সুবেদার খুরশিদ, কাঁধের ব্যাজে খোদাই–এইসি। জ্বি। স্যালুট মিল্‌ল। আমি সচেতনভাবে সিগ্রেট নিবিয়ে এটেনশ্যনের ভঙ্গিতে সালাম নিলাম। খুরশিদ সা’ব আমার হাত থেকে লাগেজ ট্যাগ নিয়ে বললেন, স্যর, আপনি জিপে গিয়ে বসেন, আমি মালপত্র নিয়ে আসছি। খুরশিদ সুটকেইস নিয়ে পেছনে উঠলে ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল। কথায় কথায় জানা গেল, খুরশিদ বাংলাদেশ সেনাশিক্ষা কোরের জ্যেষ্ঠতম জেসিও অর্থাৎ জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার। ৪৪ পদাতিক ব্রিগ্রেডের শিক্ষা কার্যক্রম উনিই এতকাল দেখাশোনা করে আসছেন। ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে তখন পোস্টেড ব্রিগেড কমান্ডার লে: কর্নেল নুরুল ইসলাম, ব্রিগেড মেজর আনোয়ার হোসেন, ডিকিউ মেজর ওয়ালীউল্লাহ্–ব্যস। আমি চতুর্থ অফিসার। জুনিয়রমোস্ট।

শহর ছাড়িয়ে দু’দিকে ধানক্ষেত। ডানে উঁচু গোমতী নদীর বাঁধ। খুরশিদ কথা বলে যাচ্ছিলেন। এমপি চেকপোস্টে পরিচয় দিয়ে জিপ সেনানিবাসে ঢুকল। ঐ রাস্তা সেনানিবাসের ভেতর দিয়ে সোজা ঢাকা গিয়েছে। ডানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ামুখী সড়ক চলে গেছে। জিপ বাঁয়ে ঘুরে চলল আবার। ডানে ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ। খুরশিদ জানালেন, ওটার ম্যানেজমেন্টও আমাকে দেখতে হবে। এতসব দায়দায়িত্ব পালন আমার দ্বারা হবে কি? আনমনে ভাবছিলাম, হঠাৎ জিপ ডানে মোড় নিয়ে, বাঁয়ে গোঁত্তা খেয়ে গোঁ গোঁ করে ওপরে উঠে যেতে লাগল। আমি সামনের রড ধরে টাল সামলালাম। ডানে পাক খেয়ে আবার বাঁয়ে ঘুরতেই ছোট্ট টিলার ওপরে সমতল ড্রাইভওয়েতে চাকা গড়িয়ে বাঁদিকের একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে থামা হল। খুরশিদ নেমে আমার লাগেজ নামিয়ে নিয়ে চওড়া বারান্দায় উঠলেন। খাকি শর্টস, স্যান্ডো গেঞ্জি আর ব্রাউন পিটি জুতো পায়ে পাতলা, শ্যামলবরণ একটি সৈনিক এসে এটেনশ্যনের ভঙ্গি করল। খুরশিদ বললেন, আপনার ব্যাটম্যান স্যর, লান্স নায়েক বজলু, ১৩ বেঙ্গলের ছেলে, মুক্তিযোদ্ধা। আমি এবার চলি, স্যর। কাল সকালে আপনার যদি গাড়ির প্রয়োজন হয়, বজলুকে দিয়ে খবর পাঠাবেন। গাড়ি এসে যাবে। কাল তো ছুটির দিন। গাড়ি আর কী হবে? বলে আমি বজলুর দিকে ঘুরলাম। ছুটির দিনে যদি শহরে যেতে চান, বা ময়নামতি যাদুঘর, শালবন বিহারের ওদিকে যান… ঠিক আছে, জানাব। বলে খুরশিদ সা’বকে বিদায় দিয়ে রুমে ঢুকলাম।

বজলু ততক্ষণে আমার বিছানা পেতে, স্যুটকেইস খুলে স্যান্ডেল, শর্টস, তোয়ালে, সাবান–সব জায়গা মতো সাজাতে লেগে গেছে। ভেরি গুড, বলে আমি ভেতরে গেলাম। অবিকল ঢাকার সিগন্যাল্‌স অফিসার্স মেসের ঘরই যেন কেউ এনে এই একশ’ কিমি দূরত্বে ময়নামতি রেঞ্জের এক টিলার ওপরে বসিয়ে দিয়েছে। একফালি এন্টিরুম, তারপর বাথরুম। তেমনি বিশাল বাথটাব, ঝক্‌ঝকে কমোড, বেসিন! কাপড় ছেড়ে, চপ্পল পায়ে গলিয়ে বারান্দায় গিয়ে আড়মোড়া ভাঙছি, এমনি সময় সশব্দে আর একটি এম-৩৮ জিপ উঠে এসে আমার ঘরের সামনে দিয়ে ডাইনে ঘুরে উল্টোদিকে দাঁড়াল। খাকি পরিহিত একজন তরুণ অফিসার নেমে এদিকে তাকিয়ে বেল্ট খুলতে খুলতে এগিয়ে এল। সৌজন্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে আমিও। করমর্দন করে আগন্তুক হেসে বলল, আমি লে: মিজান। এজুট্যান্ট, ১৪ বেঙ্গল। আমি লে: ওয়ালী, জিএসও-থ্রি, ৪৪ ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার্স বলতেই মিজান চিৎকার করে উঠে সোল্লাসে আমাকে বুকে টেনে নিল, বলল, এট্ লাস্ট উই’ভ গট আ জি-থ্রি হিয়ার। এবার ম্যাপরিডিং ইগ্‌জ্যাম-এ আর ফেল হবার ভয় রইল না। হাঃ হাঃ হাঃ।

দুপুরে হাতমুখ ধুয়ে, কাপড় বদলে মিজানদের সঙ্গে ময়নামতি অফিসার্স মেসে গিয়েছিলাম খেতে। ডাইনিং সদস্য আরো কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হল সেখানে। লে: রকিব, ১৩ বেঙ্গলের কোয়ার্টার মাস্টার লে: আতিক, এজুট্যান্ট, ১৩ বেঙ্গল, লে: একরাম, লে: আব্দুল্লাহ্, লে: জলিল, লে: আসাদ, ক্যাপ্টেন এজাজ এবং ১৩ বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা মেজর হায়দার–এরা সবাই ঐ মেসের সদস্য। ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের আমি একা। আরও ছিল আর্মি ডেন্টাল কোরের ক্যাপ্টেন মারজুক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ময়নামতি অফিসার্স মেস এবং সংলগ্ন ক্লাব তৈরি হয়েছিল, সিও ১৩ বেঙ্গল আমাকে শোনাচ্ছিলেন, আসলে ময়নামতি সেনানিবাস তখন নাকি আজকের তুলনায় অনেক গুণে বেশি ব্যস্ত, উৎসবমুখর এবং গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কুমিল্লা বিমানবন্দরে বেশ ক’টা রানওয়ে দেখলে না? ওটাও ওই তখনই ব্রিটিশ আর্মির ঠিকেদাররা তড়িঘড়ি তৈরি করেছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কে একটু এগোলেই মিত্র বাহিনীর মৃত সৈনিকদের ওয়ার সিমেট্রি রযেছে, সুন্দরভাবে তার রক্ষণাবেক্ষণ চলছে আজও।

বলতে ভুলে গেছি, আমাদের বিওকিউ অর্থাৎ ব্যাচিলর অফিসার্স কোয়ার্টাসের নাম ‘হানিমুন লজ।’ ব্রিটিশ এবং পাকি আমলে সদ্যবিবাহিত স্বামীস্ত্রী ওখানে উঠত। তারপর অফিসারদের পরিবারের প্রসার ঘটলে, অর্থাৎ বাচ্চাকাচ্চা হলে, তারা ওখান থেকে উঠে পুরোদস্তুর ম্যারিড একমোডেশ্যনে চলে যেত। পাঁচশ’ গজ দূরে অবস্থিত হানিমুন লজ ছিল ময়নামতি অফিসার্স মেসের এক্সটেনশ্যন অর্থাৎ বাড়তি অংশ। নববিবাহিত অফিসার্স কেউ ওখানে উঠলে মেস থেকে খাবার আনিয়ে খেতে পারত, রান্না করার ব্যবস্থা হানিমুন লজে দেখিনি। পরে অবশ্য পাকিস্তানে অন্তরীন যেসব বাঙালি অফিসার ফেরত এসেছিল, তাদের অনেককে ওখানে সপরিবারে বাস করতে দেখেছি। তখন বোধহয় রান্নার সাময়িক ব্যবস্থাও একটা হয়েছিল। সে যাক্‌গে, আমাদের সময়, অর্থাৎ স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে হানিমুন লজ কেবল আমাদের মতো বাউন্ডুলে তরুণদেরই আড্ডা বা আখড়া ছিল। আর পেছনে, টিলার ঢালে ছিল আমাদের ব্যাটম্যানদের ছোট ছোট ফলোয়ার্স কোয়ার্টার্স।

লজ থেকে নেমে ১৪ বেঙ্গলের মাঠের মধ্য দিয়ে আড়াআড়ি হেঁটে পাঁচ মিনিটে আমার দপ্তর ৪৪ পদাতিক ব্রিগেড সদর দফতরে পৌঁছে যাওয়া যেত। মাঠের পর বাঁয়ে সিগন্যাল্‌স ইউনিট, পেছনে ব্রিগেড সদরের জওয়ানদের ব্যারাক, মেস, জেসিও-দের বাড়ি, এমটি পার্ক অর্থাৎ গাড়ির আড্ডা। রাস্তা থেকে একটু ওপরে উঠে একতলা বিল্ডিং-এ আমাদের দপ্তর। গাড়িবারান্দার বিপরীতে সবুজ ঘাসে ঢাকা লনের মাঝখানে জেড ফোর্সে-র স্মারক স্তম্ভ–গায়ে জিয়া ফোর্সের অধীন যে ইউনিটগুলো ছিল, তাদের নাম খোদাই করা। তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপপ্রধান কর্নেল জিয়াউর রহমানের গড়া জেড ফোর্স মুক্তিযুদ্ধে বহু বীরত্বের কাহিনীর জন্ম দিয়েছিল।

আলাপে জানা গেল, বিএম অর্থাৎ ব্রিগেড মেজর আনোয়ার হোসেন কুষ্টিয়া কলেজের প্রাক্তন ছাত্র–আমার খালাতো ভাই নান্নুর সমসাময়িক। ডিকিউ মেজর ওয়ালীউল্লাহ্ বিপত্নীক। ডিএএএন্ডকিউএমজি অর্থাৎ ডেপুটি এসিসট্যান্ট এজুট্যান্ট এন্ড কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল। সেনাসদরে বসেন এজুট্যান্ট জেনারেল এবং কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল–দুজনেই সেনাপ্রধানের স্টাফ অফিসার–শৃঙ্খলা, প্রমোশন এবং আহার বাসস্থান ইত্যাদির সর্বোচ্চ আধিকারিক বা ব্যবস্থাপক। ব্রিগেড পর্যায়ে ডিকিউ একাই ঐ দুই দায়িত্বের সম্মিলিত বোঝা বহন করে থাকেন। স্টেশন স্টাফ অফিসার মেজর হালিম একই অফিসের প্রান্তে দু’টো ঘরে স্টেশন হেডকোয়ার্টার্সের কাজকর্ম চালাতেন। ব্রিগেড কমান্ডার লে: কর্নেল নুরুল ইসলাম থেকে শুরু করে সকল স্টাফ অফিসারই তখন প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা।

অল্প ক’দিন পরেই লে: নিরঞ্জন ভট্টাচার্য এলেন জিএসও-থ্রি (ইনটেলিজেন্স) হিসেবে পোস্টেড হয়ে। অফিসে সকাল সাড়ে সাতটা থেকে দুপুর দু’টো পর্যন্ত মোটামুটি ব্যস্ততার মাঝেই কেটে যেত। কাজের ধরন ছিল নানারকম–আমি মূলত ব্রিগেড কমান্ডারের সেনাশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা এবং একই সঙ্গে ব্রিগেডের শিক্ষা কার্যক্রমের বাস্তবায়ন তদারককারী। তার ওপর, ব্রিগেড সদর দপ্তরের যাবতীয় সাংস্কৃতিক-সামাজিক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকারীও আমি। আরো মজার ডিউটিও ছিল হরেক রকম। জিপ নিয়ে সপ্তাহান্তে কুমিল্লা শহর পেরিয়ে, বিবির বাজার বিওপি পেরিয়ে, ব্রিটিশদের তৈরি কুমিল্লা-আগরতলা সড়ক বেয়ে আগরতলা পৌঁছে যেতাম। ওখানকার নামী চলচ্চিত্র পরিবেশকদের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে, বাছাই ছবির ট্রাঙ্ক বোঝাই সম্ভার নিয়ে ফিরতাম। ময়নামতি গ্যারিসন হলে সেসব ছবির প্রদর্শনী চলত সপ্তাহব্যাপী। শিশুভাই অর্থাৎ কমান্ডার লে: কর্নেল নুরুল ইসলামের মা, আমাদের সবার ‘খালাম্মা’ ঢাকা থেকে চলে আসতেন আমাদের সঙ্গে ঐসব চিরচেনা বাঙলা ছবি–পথের পাঁচালি, তিনকন্যা, কাবুলিওয়ালা, সুর্বণরেখা–আরও কতসব বারবার দেখার জন্য। আসতেন কমান্ডারের আরও সব প্রিয় মানুষ যেমন প্রাক্তন রাস্ট্রদূত কায়সার রশীদ চৌধুরী–আরও অনেকে–যারা ক’দিন ময়নামতি ছাউনিতে থেকে, ক্লাবে, মেসে, অফিসারদের বাসায় আড্ডা জমিয়ে মাতিয়ে রাখতেন, মেতে থাকতেন।

মোটের ওপর ময়নামতি ছাউনিতে যে ক’টি বছর আমার কেটেছে, তার নানারঙের ছবি স্মৃতিতে চলচ্ছিত্রের মতোই চাবি টিপলে মূর্ত হয়ে চলাফেরা শুরু করে। দিনগুলো কেটেছে তখন টানা আনন্দে, নির্ভেজাল সখ্যে। সন্ধে হলেই আমরা ক’জন–মিজান, বজলুর রশীদ, জুলফিকার, তানিম, মোমেন, আশফাক, রিয়াজ, বজলু, জিয়াউদ্দিন–গিয়ে উঠতাম হয় ক্লাবে, নয়তো কমান্ডারের ফ্ল্যাগস্টাফ হাউজে (নিমন্ত্রণ থাকলে, নইলে নয়), নয়তো যে কোনো বিবাহিত সিনিয়রের বাসায়। মেজর তালিম, কর্নেল গিয়াস, লে: নিরঞ্জন, ক্যাপ্টেন শাহ, মেজর রশীদ–এদের যে কোনো বাড়িতে ছিল আমাদের জন্য অবারিত দ্বার। ক্লাবে গিয়ে বজা (বজলুর রশীদ) এক সন্ধ্যায় বিল দেখে হেসে খুন–আমাদের ক্লাব হাওলদার নাকি লিখেছে ‘হুমকি–৪২০ প্যাক’, পাশে দাম লেখা। বজার প্রশ্ন হল, ৪২০ প্যাকেট হুমকি কেউ দিলেই হল, ও কী দোষ করেছে, তার ওপর আবার অতগুলো টাকাও দিতে হবে নাকি! আমি বিল নিয়ে পরীক্ষা করে, হেসে বল্লাম, ওটা হুমকি নয়, হুইসকি লিখতে গিয়ে ওরকম লিখেছে। তখন সবাই মিলে গোলন্দাজ রেজিমেন্টের হাওলদারকে ‘উইস্কি’ এবং ‘পেগ’ শব্দের সঠিক বানান ও উচ্চারণ শেখাতে লেগে গেলাম। প্রায় ছেলেমানুষির পর্যায়ে এইরকম সব হুল্লোড়ে মেতে ওঠা–আমাদের প্রাত্যহিক আনন্দের খোরাক ছিল।

কোনো কোনো সন্ধ্যায় হানিমুন লজের টিলা থেকে একটু গড়িয়ে বাওয়ানি কোয়ার্টার্সে গিয়ে উঠতাম। প্রথমেই ছিল মেজর ওয়ালিউল্লাহর বাড়ি। পরেরটি মেজর তালিম ও ভাবির আস্তানা। তারপর ক্যাপ্টেন শাহের ডেরা। শাহ তখন অবিবাহিত যদিও, ব্রিগেড কমান্ডার ‘শিশুভাই’ ওকেও বাওয়ানি কোয়ার্টার্সের একটি ডুপ্লেক্স বরাদ্দ করেছিলেন। উদ্দেশ্য দ্বিবিধ–বাড়ি খালি পড়ে থাকার চেয়ে কাউকে বরাদ্দ করলে সেটির দেখাশোনা, পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে ভাবনা থাকে না। আবার যৎকিঞ্চিৎ রাজস্ব আয় থেকেও সরকার বঞ্চিত হয় না। শাহের বাড়ির দরজা আমাদের হানিমুন লজার্সদের জন্য চব্বিশ ঘণ্টাই অবারিত। মালিক উপস্থিত না থাকলেও ঢালাও হুকুম ছিল–আমাদের কেউ গিয়ে উঠলে তাকে বাড়ির আতিথেয়তার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করতে সাদর আহবান জানাতে হবে। বাকি অতিথির মর্জি। এর অন্যথা ঘটার জো ছিল না। শাহ যথার্থই সিংহহৃদয় মানুষ ছিল সেই সত্তর দশকের শুরুতে–আমরা স্নেহের কাঙাল জুনিয়ররা অন্তত তাকে ওরকমটাই দেখেছি।

শাহ, তালিম ভাই অথবা বি এম–যার বাড়িতেই সান্ধ্য বিনোদনের খোঁজে যাওয়া হত–ক্রিয়াকর্ম মোটামুটি একই প্রথায় সংঘটিত হত। প্রথমেই ফাঁকা ঘরে অর্থাৎ যেঘরে আসবাবপত্র তুলনামূলকভাবে কম দেখতাম, সেটাকে আমরা বাড়ির কারো সম্মতির তোয়াক্কা না করে ডান্স হলে রূপান্তরিত করে নিতাম। এর জন্য দরকার হত ট্যাল্ক বা বরিক পাউডার বেশ কিছুটা–সারা ঘরের মেঝেতে, যা কিনা এমনিতেই ফার্স্ট রেইট মোজেইক অর্থাৎ অতি মসৃণ–সেখানে উদার হাতে ছিটিয়ে সমান সোলের স্নিকার্স পিছ্লে প্রায় জেলপিচ্ছিল করে ফেলা হত। এককোণে ছোট্ট টেবিলে মেইকশিফট্ বার সাজানো হত তারপর। অতঃপর মিউজিক সিস্টেম ফিট করে, গরমাগরম তেলেভাজা কিছু এনে ফেলতে পারলেই পার্টি আ-গৌ-গৌ–আমাদের জলতরঙ্গ কে রোধে! ওসব পার্টিতে যে কেবল মোদো-মাতাল দেবদাসদেরই ভিড় হত তা কিন্তু মোটেই সত্যি না! পানদোষে আসক্ত-অনাসক্ত সব অফিসার এবং তাদের পরিবার-পরিজন আবাহন বিনাই সেসব আনন্দ সন্ধ্যায় সম্মিলিত হতেন।

কোনো কিছুরই কমতি হতো না কখনো–সে খাদ্য, পানীয় যাই হোক, আর নাচগান আর আমোদের তো দুর্বার, অশেষ সম্ভার! কারো বাড়িতে সিভিলিয়ান অতিথি থাকলে তারাও এসে জুটত সেখানে আর ফিরে যেত তাদের অনেকেই দীর্ঘদিনের লালিত ধারণা ভুল ছিল–এসব ভাবতে ভাবতে। কমান্ডার শিশুভাই এসে যেতেন খোঁজ পেলেই–তার সঙ্গী ঢাকা বা চিটাগাং বা সুদূর কোনো বৈদেশাগত সায়েব-মেম-দিশিমেম-ট্যাঁশ-ভদ্রজন অতিথি। তুমুল আড্ডা-গল্প চল্‌ত, সঙ্গে পান ও টুক্‌টাক খাওয়া চলছে, নীল ডায়মন্ডের সুইট ক্যারোলাইন বাজছে, এরিমধ্যে কেউ কেউ জোড়ায় বা একা নেচে চলছে বাজনা যেমন তার তালে তালে। কমান্ডারের গায়ে স্কিনটাইট সাইকেডেলিক রং-এর ভেল্কি লাগানো চৈনিক রেশমী জামা, কোমরের ওপরে সব বোতাম খোলা, বুকে একটা লকেট দুলছে। শিশুভাই স্বর্গীয় আনন্দসুধায় বুঁদ। হঠাৎ চোখ একটি খুলে অপাঙ্গে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, ‘আই অলওয়েজ ফগগেট টু আস্ক ইউ–আ’ ইউ রিলেইটেড্ টু আর ডালাই লামা, ইন এনি কেইস?’ আমি হাসি আর নেচে নেচে দূরে সরে যাই।

মজার ব্যাপার হল, সামরিক প্রশিক্ষণ নেবার পর আমার বাড়তি মেদ-টেদ ঝরে শরীর বেশ ঝরঝরে অর্থাৎ স্লিম হয়ে গিয়েছিল। চট্টগ্রামের যে কোনো বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে তখন গেরুয়া বসন ধারণ করে ধ্যানে বসে গেলে আমার কঠিন চীবর প্রাপ্তি কেউ ঠেকাতে পারত না–বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলত। ওদিকে চট্টগ্রামের সন্তান বীর যোদ্ধা লে: কর্নেল জিয়াউদ্দিন, যিনি স্বাধীনতার পর ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন, যিনি পদত্যাগ করে খোলা চিঠি সাপ্তাহিক হলিডে কাগজে ছাপাতে দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন, তার চেহারার সঙ্গে শুকিয়ে যাওয়া লে: ওয়ালীর চেহারার অদ্ভুত সাদৃশ্য পরিচিত জনেরা আবিষ্কার করে যুগপৎ মজা এবং রোমাঞ্চ লাভ করত। শিশুভাই হালকা মেজাজে থাকলে তিনিও একই মজা করতেন। আমরা বাচ্চা অফিসাররা কর্নেল জিয়াউদ্দিনকে ‘দালাই লামা’ বলে জানতাম। এই রগড়ের পেছনে অবশ্য অনেকেই ‘দালাই লামা’-কে গভীর শ্রদ্ধা করত, ভালবাসত, আনুগত্য প্রদানে প্রস্তুত ছিল জানতাম। তাই, চেহারার মিলের দরুন ঠাট্টা-তামাশার ফোকাস্ হওয়া সত্ত্বেও আমার ও বিষয়ে কিঞ্চিৎ শ্লাঘাবোধও হত বৈকি। কক্সবাজার মহাসড়কে হারবাং থেকে বেঁকে গাঁয়ে ঢুকলে জিয়াউদ্দিনের ভিটে। গল্প শুনেছি, তার মা ছেলের জন্য দিনরাত চায়ের কেতলি আর বিস্কিট নিয়ে বসে থাকতেন, যদি ছেলে এসে উপস্থিত হয়, যদি ভাত খাবার তার সময় না থাকে, তাহলে অন্ততঃ চা-বিস্কিট তো সে খাবে।

কুমিল্লা শহরে আমাদের ঘন ঘন যাতায়াত ছিল। ক্যাণ্টূনমেন্টের বাজারে সামান্য দু’চারটে মনিহারি দোকান আর সামোসা-চা-কফির ‘কাকলি’ রেস্তোরাঁ ছিল। আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে হলে মোটরবাইক চেপে কান্দিরপারে স্টেডিয়ামের কাছেই যে দোকানগুলো, তার একটা থেকে জনপ্রতি এক লিটারের কার্টন কিনে নিয়ে স্টেডিয়ামের ভেতরে বসে তারিয়ে তারিয়ে চাখতাম। কখনো বা স্টেশন রোডে কাবারের দোকানে বসে কাবাব-পরোটা সাঁটিয়ে মেসে ফিরতাম। পরে ক্রমশঃ শহরে পরিচিতি বাড়ে। ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের প্রাক্তন ছাত্রী রাখী ভদ্র তখন ওখানে অশোক দাশগুপ্তের স্ত্রী। অশোকদার সঙ্গে আলাপ ঘটে যাবার পর ওদের বাড়ি যাওয়া হত প্রায়ই। আড্ডা, রাখীর গান আর ভোজন–সবই হত। একবার ওদের সঙ্গে লে: মুনিব আর আমি ‘জোড়কাননে’ চড়ুইভাতি করতে গিয়েছিলাম। লে: আতিকের অনেক স্থানীয় বন্ধু ছিল। ওরা আমাদেরও প্রিয়জন হয়ে গিয়েছিল।

তখন আর্মি অফিসারদের অত্যন্ত সাধারণ মানের পোশাকাদি পরতে দেখেছি। মহার্ঘ কাপড়চোপড় দেশে তেমন মিলতোও না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। টিসিবি অর্থাৎ ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ কিছু কিছু অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানি করে থানা পর্যায় পর্যন্ত বাজারজাতকরণের চেষ্টা করত। একবার আতিক খবর দিল, ওর সিও লে: কর্নেল গিয়াসউদ্দিনের বাড়ি বরুড়া থানা সদরে নাকি টিসিবি’র শার্টিং এবং প্যান্ট পিস এসেছে। আমরা ছুটির দিনে ১৩ বেঙ্গলের জীপ চেপে কয়েকজনে কুমিল্লা শহর ছাড়িয়ে, লাকসামের পথে ডানে লালমাই পাহাড়চূড়োয় জোড়ামন্দিরের নিচ দিয়ে ডানে ঘুরে বরুড়া পৌঁছলাম। কাপড় কেনা হল সস্তায়, ফেরার পথে কুমিল্লায় দরজির দোকানে মাপ দিয়ে মুক্তহস্ত হয়ে ভরদুপুরে আইসক্রিম খেয়ে ফিরলাম।

শুরু হল ‘অপারেশন সিলভার লাইনিং’। উদ্দেশ্য, বেআইনি অস্ত্র উদ্ধার। মুক্তিযুদ্ধের পর অনেকেই অস্ত্র জমা করেনি। অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল, দেশজুড়ে ঐসব অস্ত্রের অপব্যবহার শুরু হয়েছে। ডাকাতি, খুন, ছিনতাই–সবেতেই অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছিল। গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে খোলা জলাশয়ে মাছ মারা চলছিল। অতএব রাষ্ট্রপ্রধানের হুকুম হল, আর্মি, নেভি, এয়ারফোর্স, রক্ষীবাহিনী–সকলে মিলে দেশব্যাপী বেআইনি অস্ত্র উদ্ধারে নামতে হবে। আর্মির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ঐ অভিযান চালানো হয়েছিল। বহু ধরপাকড় হয়েছিল। অস্ত্র উদ্ধারও হয়েছিল বেশ। আরেকবার ডাক ও তার কর্মচারিরা দেশব্যাপী ধর্মঘট ডাকে। তখনও আমাদের ডাক পড়েছিল। আমি স্পেশ্যাল কোনো ডিউটিতে চিটাগাং জিপিও-তে গিয়ে দেখি, সিনিয়র পোস্টমাস্টারের চেয়ারে নটরডেম কলেজের সেই বুলুভাই–সৈয়দ ফরহাদ রেজা বসে আছেন। আট ন’ বছর পরে দেখা, হৈচৈ করে উঠলেন বুলু ভাই। ‘এসে গেছে এবার আমার ছোটভাই,’ বলে চেয়ার ছেড়ে দিলেন, ‘বোস, হাল ধর, তোমরাই চালাও ক’দিন। দেখিয়ে দাও আমাদের কর্মীদের যে, ওরা কাজ না করলেও ডাক ও তার বিভাগ তার জনসেবা ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে।’

হ্যাঁ। সেটা আমাদের আর্মি সিগন্যাল্‌স-এর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিকরা ভালই দেখাল। অত্যন্ত সুচারুভাবে চিটাগাং জিপিও আমি এবং আমার সহকর্মীরা পরিচালনা করলাম দিন দশেক। ধর্মঘটী কর্মীরা কাজে যোগ দিলে আমরা ফিরে এলাম কুমিল্লায়। আমার লাভ, বুলুভাইয়ের সঙ্গে আবার যোগাযোগ হল। কুমিল্লা থেকে চিটাগাং বেড়াতে যাবার উপলক্ষ্যের অভাব হবে না আর। এদিকে বেআইনি অস্ত্র উদ্ধার পর্ব শেষ না হতেই আমি জুড়ে গেলাম বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির পত্তনে নিযুক্ত টিমের সঙ্গে। পাকিস্তান প্রত্যাগত মেজর হান্নান শাহর নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন শাহ এবং আমি একটি র‌্যামশ্যাক্‌ল রাশিয়ান গজ জিপে চড়ে ময়নামতি ছাউনি চষে ফেলতে লাগলাম উপযুক্ত জায়গার খোঁজে। টিলাময় উপত্যকাসমৃদ্ধ সেনানিবাসের অধিকাংশ জায়গা, এমনকি বহু ব্যারাক ও বাংলো পর্যন্ত তখন অব্যবহৃত পড়েছিল। আমরা একটানা কিছু ছোট ছোট টিলা এবং মধ্যবর্তী সমতল এলাকাশুদ্ধ একটা মস্ত এলাকা চিহ্নিত করে ফেললাম। জানতে পারলাম, মেজর হান্নান শাহ সম্ভবতঃ চিফ ইন্সট্রাক্টর এবং শাহ পেট্‌সো অর্থাৎ ফিজিক্যাল এডুকেইশ্যন এন্ড ট্রেইনিং স্টাফ অফিসার নিযুক্ত হবেন যখন বিএমএ কার্যক্রম চালু হবে। ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল নাজমুল হুদা ওরফে গুড্ডু ভাই ঠাট্টা করে বলতেন, ‘আর ওয়ালী হবে অনারারি এন্ড আনপেইড ইংলিশ ল্যাঙ্গুইজ ইন্সট্রাক্টর।’ ‘ক্লাস সি অবশ্যই’, আমি হেসে যোগ করতাম।

হানিমুন লজ ছেড়ে আমরা ততদিনে হাইওয়ের ওধারে স্টেশন আফিসার্স মেসে উঠেছি। পাকিস্তান প্রত্যাগত সিনিয়র অফিসাররা তাঁদের পরিবার নিয়ে লজে উঠেছেন। মাঝে ক’দিন অবশ্য ময়নামতি ক্লাব সংলগ্ন বিওকিউতে থাকতে হয়েছে। পাকিস্তান থেকে ফেরা লে: জুলফিকার চৌধুরী, জাহাঙ্গির, ওয়াদুদ–ওদের সঙ্গে আলাপ হল সেখানে। জানলাম, জুলফিকার প্রখ্যাত চিত্রকর রশীদ চৌধুরীর ছোটভাই। ওদের ভাই নীলু চৌধুরী আমার ভগ্নিপতি হবার সুবাদে জুলি অর্থাৎ জুলফিকার হচ্ছে বেয়াই। জুলি চমৎকার রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়। ঘরের কোনে ময়নামতি ক্লাবের সান্ধ্য আসর আমরা দুই বেয়াই দ্বৈতসঙ্গীত পরিবেশনে তাতিয়ে তুলতে ব্যস্ত হলাম। মু‘নিব এল ওসি এমপি হিসেবে পোস্টিং নিয়ে। আমরা তিনজনে একঘরে হলাম। মুনিবের বাড়ি থেকে আনা সেকেলে রেকর্ড প্লেয়ারে বাজত টম জোনসের ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক উম্যন’, এঙ্গেলবার্টের ভরাট গলায় গাওয়া ‘রেইনড্রপস্ কিপ ফলিং… ’ ইত্যাদি নষ্টালজিক গান। মোটের ওপর, জমজমাট দিন ও রাত।

এক সপ্তাহান্তে মিটু আর ব্যাংকার রাহাত ফিফটি সিসি হন্ডায় ডুগ্‌ডুগ্ করতে করতে এসে উঠল। মেসের গেস্ট উইংয়ে ওদের থাকার ব্যবস্থা হল। সন্ধ্যায় ক্লাবে ওদের নেমন্তন্ন। গমগমে আড্ডা, সঙ্গীত, নৃত্য, ডিনার শেষে শয্যাগ্রহণ। ছুটির দিনে সকালে উঠে চিঠি পেলাম, ছোটভাই বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ান জিমন্যাস্ট রবু ওর মহিলা কাউন্টারপার্ট অর্থাৎ মহিলা গ্রুপে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন খুশিকে বিয়ে করার অনুমতি চেয়েছে। চিঠি পড়ে মিটুরা সবাই হৈচৈ করে উঠল, ‘দে লাগিয়ে বিয়ে, ডোন্ট ওয়রি। লেট পিপ্‌ল বি হ্যাপি।’ তাই জানিয়ে দেয়া হল। মিটু, রাহাত উইকএন্ড কাটিয়ে ঢাকা ফিরে গেল। মিটুর ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ মোড় সামনে, মতামত চেয়েছিল, আমরা ফৌজি বন্ধুরা সবাই একচেটে মত দিলাম, ওসব ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো অর্থাৎ ব্যবসার ফিকিরফন্দি তো হল অনেকই, এবার সয়েল সায়েন্সে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমার পরীক্ষা হয়ে যাক্–অর্থাৎ ডানকান ব্রাদার্সের চা বাগানে যে এসিসট্যান্ট ম্যানেজারের পদে চাকরির সুযোগ মিলেছে, ওখানেই যোগদান করা হোক। হয়তো কাজে যোগ দিতে না দিতেই দেখবে, ময়নামতির খাকি হনুমানগুলো তোমার লালচান টি এস্টেটে আতিথ্য নিতে হাজির!

কথা ঠিক। বেআইনি অস্ত্র উদ্ধার কাজের তদারকিতে আমি ব্রিগেড সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে যখন-তখনই গিয়ে পড়ছিলাম সিলেটের তামাবিল, জকিগঞ্জ, ছাতক থেকে নিয়ে দক্ষিণের ফেনী সার্কিট হাউসে, মেহমানদারি চাখতে। দেখতে দেখতে বিএমএ-র প্রশিক্ষণ টিম এসে গেল, মেজর আমজাদ, মেজর মান্নাফ, মেজর শাহেদ, মেজর আনোয়ার (৪৪ ব্রিগেডের প্রাক্তন বিএম) এবং আরো অনেকে এলেন, বাসায় উঠে গুছিয়ে নিচ্ছেন সব–এরি মধ্যে প্রথম ব্যাচ জেন্টলম্যান ক্যাডেটরা (জিসি) এসে গেল। শুরু হল বিএমএ-র শুভযাত্রা কুমিল্লার ঐ ক’টি ব্রিটিশ আমলের ব্যারাকে। শাহ মেজর পদে প্রমোশন পেয়ে শরীরচর্চা প্রশিক্ষক নিযুক্ত হয়েছেন। মেজর মুজিব সেনাশিক্ষা কোরের সবার সিনিয়র অফিসার–উনি এলেন ডিরেক্টর অব স্টাডিজ পদে যোগ দিতে। ময়নামতির ক্লাব নাইটে আর মস্তির শেষ নেই–জায়গাও অকুলান। বাইরের লনে প্রায়ই ম্যারাপ বেঁধে হল্লার আয়োজন হতে লাগল।

মোটের ওপর, সৈনিকের জীবন যতখানি ব্যাপ্ত-ব্যস্তভাবে যাপন করা সম্ভব, তার প্রাণপণ চেষ্টা আমাদের তরুণ অফিসারদের তখন ছিল বেশ ভাল মাত্রায়। সিভিল-মিলিটারি সম্পর্ক ছিল অতি হার্দ্য ও সহযোগিতাভিত্তিক। ভোরে উঠে হয়তো কমান্ডারের সঙ্গে ফেনী রওনা হয়েছি জরুরি পরিদর্শনে। ওখানে গিয়ে পৌঁছতে না পৌঁছতেই সরকার প্রধানের চপার এসে নামল সার্কিট হাউজের হেলিপ্যাডে। শেখ মুজিব পাইপ হাতে নেমে কর্নেল হুদার সঙ্গে কোলাকুলি করলেন, পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘ভালই তো গুড্ডু অস্ত্র উদ্ধার করতে ছিলে, আবার এই দুর্ঘটনাটা কেন ঘটাইলে?’ হয়েছিল কী, ফেনীতে অস্ত্র উদ্ধার করতে গিয়ে যৌথ বাহিনী ক্ষমতাসীন দলের এক প্রভাবশালী স্থানীয় নেতার সন্তানকে বেআইনি অস্ত্র রাখার অপরাধে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের পর্যায়ে বেসামাল হয়ে পড়ে দুর্ঘটনাটি ঘটিয়ে ফেলেছিল। শীর্ষ নেতার আগমনে ব্যাপারটা মিটে গেল। ওখান থেকে ফিরে লাঞ্চ খেয়েই আবার বসলাম মেজর আমজাদ (বর্তমানে প্রাণ গ্রুপের চেয়ারম্যান) এবং মেজর শাহেদের সঙ্গে ইংরেজি ফোনেটিক্স অর্থাৎ ধ্বনিতত্ত্বের আলোচনায়। কমান্ডার তো সঙ্গে আছেনই। ইন ফ্যাক্ট, কর্নেল হুদা আমার কাছ থেকে ড্যানিয়েল জোন্সের ডিক্‌শনারি-কাম-তত্ত্বালোচনা বিষয়ক বই নিয়ে আগেই ইংরেজির প্রমিত উচ্চারণ বিষয়ে ইতোমধ্যে মোটামুটি সড়গড় হয়ে উঠেছেন।

বিকেলে খেলাধূলোর পর গা ধুয়ে সন্ধের ঝোঁকে বড় বড় ফ্ল্যাশলাইট আর এয়ারগান ও এয়ার পিস্তল নিয়ে শচীন কর্মকার, মুনিব, আতিক আর আমি বেরোলাম খরগোশ শিকারে। ময়নামতি এবং লালমাই পাহাড়ে তখন প্রচুর ঝোপঝাড়, জঙ্গুলে পরিবেশ বর্তমান। বিভিন্ন ছোট জাতের বন্যপ্রাণীর মাঝে আমাদের লক্ষ্য ছিল তুলতুলে খরগোশ নিধন। আঁধারে অথবা পাতলা দুধে প্রচুর পানি মেশালে যেমন হয়–তেমনি ধোঁয়াশায় জিপের হেডলাইট নিবিয়ে, খরচোখে ঝোপঝাড়ে তাকাতাম, খরগোশের মোতির মত কুতকুতে পাটকিলের মাঝে কালো অক্ষিগোলকে সামান্য আলো প্রতিফলিত হতে দেখলেই চার ব্যাটারির দাউদাউ আলো ওর চোখে বিঁধে ওকে নিশ্চল করে দিত। ফটাস্ করে কারো এয়ারগান থেকে ছোট্ট হন্তারক ছুটে গিয়ে শিকারকে অনায়াসে গেঁথে কাত করে দিত। ছুটে গিয়ে ওকে পিলোপ্যাকে ভরে থলের মুখের দড়ি টেনে দিলেই খেল্ খতম। থলে ভরে শিকার নিয়ে ফিরে ওটাকে মেস হাওলাদারের হাওয়ালা করে দিয়ে আমরা পোশাক বদলে ক্লাবে হাজির হতাম।

হাউজি শেষ হতেই ক্লাবের আড্ডা পাতলা হতে শুরু করত। মেজর শাহ হয়ত তখন আমাদের ক’জনকে ডেকে বললেন, ‘লেট্স গৌ এন্ড সি হাউ দ্য বয়েজ আর ডুয়িং ওভার দেয়ার।’ আমরা সোল্লাসে রাজি। বিএমএ পেট্‌সো-র এম৩৮-এ১ জিপ ফট্ররর শব্দে ছুটে চলল আরেক প্রজাতির শিকার অভিযানে। তখন লাইট্‌স অফ হয়ে জিসি-রা কেবল হয়তো ঘুমের প্রথম স্তরে বিচরণ করছে। একযোগে মেইন অফ্ করে দিয়ে রেজিমেন্টাল পুলিশদের নজর রাখতে বলে আঁধারে ঝাঁপিয়ে পড়া হল ঘরে ঘরে। ‘কাম অন, বয়েজ, গেট আপ এন্ড নিল ডাউন, স্টার্ট ক্রলিং, ক্লাইম্ব আপ দ্য বিএমএ পিক’… আমার খুব ভাল লাগত না ব্যাপারটা। সারাদিন অবিশ্রাম শরীরচর্চ্চা, পড়াশুনো, খেলা, আবার পড়া–সেরে ছেলেগুলো ঘুমোতে না ঘুমোতেই উঠিয়ে আবার এই তথাকথিত ‘ট্র্যাডিশনাল র‌্যাগিং’-এর অবসান হওয়া প্রয়োজন। আমার ক্ষেত্রে অবশ্য ওই ভাবনা পর্যন্তই। আর্মিতে সিনিয়রের কথার বিপরীত কর্ম করা তো দূরস্থান, কনসিভ করাও নিষিদ্ধ!

রাত একটায় ফিরে শুয়ে পড়ব, এমন সময় ব্যাটম্যান খতিব বলল, ‘স্যর নতুন কমান্ডার সাব ভোরবেলা পাখি মারতে যাইবেন। আপনারে রেডি থাকতে খবর পাঠাইছেন।’ হয়ে গেল ঘুমের দফারফা। বাকি রাত হয়তো পড়ে অথবা আড্ডা মেরে অথবা কারণবারি সেবায় কাটিয়ে দিলাম। পাঁচটা নাগাদ আবার পিটি কিটে তৈরি থাকতে হবে না ? সারারাত জেগে কাটাতে আমি কখনো ক্লান্তিবোধ করিনা–আজও–এই ষাটোর্ধ বয়সেও। তবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করেছি আগাগোড়াই–ভোরবেলা আজানের শব্দ কানে এলেই আমার মন প্রশান্তিতে স্নাত হত, চোখ বুঁজলেই তখন কাঁড়ি কাঁড়ি ঘুম কোত্থেকে যেন এসে আমার অস্তিত্বকে ডুবিয়ে দিতে চাইত নিশ্ছিদ্র আরামে। কাজেই সকালে এপয়েন্টমেন্ট থাকলে ঐ পরম স্বস্তির নিদ্রাগমনে ব্যাঘাত ঘটত। যথাসময়ে ত্রিকোণ পতাকা উড়িয়ে কমান্ডারের জিপ গোঁ গোঁ গর্জনে লজের টিলার চড়াই পেরিয়ে আমার রুমের সামনে ঘ্যাঁচ করে ব্রেইক কষে দাঁড়াল। আমি ক্রিকেটার্স ক্যাপ মাথায় দিয়ে ফ্লাইপ্রুফ দরজার পাল্লা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এটেনশ্যনের ভঙ্গি করে কমান্ডারকে সুপ্রভাত জানালাম। উনি নড করে বললেন, ‘হপ ইন, জিথ্রি! হোয়াট আর উই ওয়েটিং ফ’?’

আমি পেছনে উঠতে যাব, কমান্ডার বলে উঠলেন, ‘আহ্যাভ সিন ইউ ড্রাইভিং মিলিটারি ভিইকল্‌স ফ্রিলি। উড ইউ লাইক টু ট্রাই দিস নিউ টয়োটা হার্ডটপ?’ হৃৎপিণ্ড স্পন্দন মিস্ করল নাকি? উনি এলেনই তো সেদিন। আমাকে ফৌজি গাড়ি চালাতে দেখলেন কবে আবার? নাকি বিদায়ি কমান্ডার গুড্ডু ভাই ব্রিফ করেছেন, তার স্নেহভাজন জিথ্রি ড্রাইভিং পছন্দ করে বেশুমার! কোনো কথা না বলে আমি ঘুরে ওধারে চলে গেলাম। ড্রাইভার নেমে গিয়ে পেছনে বসেছে ততক্ষণে। উঠে অল স্টিল ভারি দরজা টেনে বন্ধ করলাম। চমৎকার ভরাট শব্দটা কানে বাজল। গিয়ার শ্যাফ্‌ট নিউট্রালে যথারীতি, হ্যান্ডব্রেইক ওপরে তোলা। থ্যাঙ্ক ইউ ফর ট্রাস্টিং মি, স্যর।’ বাঁয়ে মাথা ঘুরিয়ে নড করে গাড়ির চাকা গড়িয়ে দিলাম। অত্যন্ত স্মুথ যান্ত্রিক শব্দ। এসব গাড়ির স্টিয়ারিং-এ বসলেই চালকের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় লাফিয়ে লাফিয়ে। গরমাগরম, ভারি ভারি স্যালুট নিতে নিতে আমরা ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া সড়কে পড়লাম। ক্রুজিং স্পিড ৪০-৪৫ কিমি।

কমান্ডার ইতিউতি চাইছেন। ভোরের আলো ফুটিফুটি করছে, তখনো নীলচে কুয়াশা বাতাসে, মাথার ভেতরটা দপ্‌দপ্ করছিল। ধীরে ধীরে স্নিগ্ধ হাওয়ায় ঝিমুনির ভাব এসে গেল। প্রায় মুখস্থ এ রাস্তা, এর বাঁক, খানাখন্দ, বেইলি ব্রিজ, সব ল্যান্ডমার্ক। ডানে রানির কুঠি, বাঁয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের কবরস্থান পেরিয়ে ফাঁকা বিল জায়গায় গাছের ছায়ায় দাঁড়ালাম আমরা। ‘শ্যাল উই গেট ডাউন হিয়ার ? হোপ টু ফাইন্ড সাম গুড টার্গেট্‌স?’ কমান্ডারের শিশুসুলভ প্রশ্নে স্মিতমুখে মাথা নাড়িয়ে আমি দরজা খুলে নেমে সিগ্রেট ধরানোর অনুমতি চাইলাম। ‘ক্যান আই বরো আ ফ্যাগ, প্লিজ?’ আরে বলে কী? উনিও আবার স্মোকার নাকি? আমি বিস্মিতমুখে ‘শ্যূওর, স্যর’ বলে প্যাকেট খুলে সামনে ধরলাম। উনি স্টেইট এক্সপ্রেসের প্যাকেট দেখে বললেন, ‘নৌ, আইল স্মোক আ ডানহিল। গেট মি আ প্যাক, উইল য়্যূ?’ মুসকিলে পড়া গেল।

এদিকে তো এসব সিগ্রেট কেউ খোঁজে না, কাজেই পাবার সম্ভাবনা কম। সেটা জানালাম। বললাম, ‘আইল ট্রাই টু গেট য়্যু ডানহিলস হোয়েন উই গেট টু ব্রামানবারিয়া।’ ‘অল রাইট। ডান’। বলে কমান্ডার শুকনো বিলের কোলে ঢালুতে নেমে গাছের ডালপালা পত্রালীর খাঁজভাঁজ নিরীক্ষণ করতে করতে এয়ার রাইফেল চালিয়ে দিলেন। ডানা ঝট্পটিয়ে গোটা দুই পাখি যেন জড়ামড়ি করে কাদা, শুকনো কচুরিপানার জঙ্গলে পড়ে হারিয়ে গেল। ‘রান, রান,’ বলে উনি বডিগার্ড ও ড্রাইভারকে তাড়া করলেন প্রায়। মজাই লাগছিল। ওরা বুটে, ট্রাউজার্সে কাদা লাগিয়ে দু’টো ঘুঘু তুলে নিয়ে এল। আমি ডান হাতের পিঠ আলতো ঠেকিয়ে অনুভব করতে চাইলাম, উষ্ণ রক্তাক্ত পালকের নিচে ধুক্‌পুকে প্রাণপাখি তখনো ছট্‌ফট্ করছে কিনা। যান্ত্রিকভাবে দেঁতো হাসি হেসে উচ্চারণ করলাম, ‘এমেইজিং শট্, স্যর!’ উনি বিগলিত হাস্য করলেন।

ঘণ্টাদুয়েকের মৃগয়া শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে পৌঁছে স্টেশনের ওদিকে ডানহিলের খোঁজে যাওয়া হল। পাওয়াও গেল। একটি প্যাকেট নিয়ে এসে কমান্ডারের হাতে তুলে দিলাম। কর্নেল গম্ভীরভাবে উপহার গ্রহণ করলেন এবং বললেন, ‘অফিসে গিয়ে আমার পিএ-র কাছ থেকে টাকা নিয়ে নেবে, কেমন? এন্ড লেট্স নাউ স্যাম্পল সাম কান্ট্রিসাইড ব্রেইকফাস্ট। ওউন্ট দ্যাট বি সামথিং টু টেল দ্য বয়েজ হোয়েন উই মিট ফর দ্য কফি ব্রেইক টুডেই? আর কফি ব্রেইক। পকেটে হাত দিয়ে বুঝতে চাইলাম, যথেষ্ট টাকাকড়ি আছে তো? মুখে বললাম, ‘জাস্ট দ্য থিং স্যর! সাচ আ ওয়ান্ডারফুলি রিফ্রেশিং ড্রাইভ উই জাস্ট হ্যাড, স্যর! অফ কোর্স, উই হ্যাভ আর্নড আ হৌলসাম কান্ট্রি ব্রেইকফাস্ট।’ ‘উইল হ্যাভ ইট হিয়ার, ওকে? টেল দেম টু সার্ভ দ্য ফুড রাইট হিয়ার!’ কমান্ডার উৎসাহে টগবগ করছেন যেন। চেনা দোকানের মালিককে অবস্থা বুঝিয়ে বললাম। সেনকাকু অভয় দিলেন, ‘চিন্তা নেই স্যর, আপনারা যে মাঝরাতে আসেন মাঝে-মাঝে। এ তো আর সেরকম নয়। কমান্ডার বলে কথা। আপনি গাড়িতে গিয়ে বসুন। আমি ট্রে সাজিয়ে পাঠাচ্ছি।’

ব্রেইকফাস্টের ট্রে দেখে কমান্ডার যারপর নাই খুশি। সাদা ন্যাপকিন কোলের ওপর পেতে ঝক্‌ঝকে ট্রে স্নাগলি বসিয়ে দিয়ে গেলেন সেনকাকু স্বয়ং। আমিও শঙ্কামুক্ত এবং মন বেশ হালকা লাগছে, পুরনো খদ্দেরের মানরক্ষা করেছেন ভদ্রলোক। সখ করে ব্যবসা চালাচ্ছেন। ওর দোকান বাকি খাবারের স্টলগুলো থেকে একেবারেই ভিন্নমানের। মুচমুচে লালচে ভাজা পরোটা, মেথি ফোঁড়ন দেয়া পাঁচমিশেলি তরকারি, চমৎকার ওমলেট, সুপুষ্ট মর্তমান কলা আর শেষপাতে খিরসাপাতি–কমান্ডার নিবিষ্টমনে খেয়ে চলেছেন। আমিই টুকটাক কথা বলছি, সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কের উন্নয়নে এ ধরনের এসকেপেড যে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়ে সবিনয়ে কিন্তু দৃঢ়তার সাথে আমার যুক্তি পেশ করে চলেছি। উনি হুঁ-হাঁ করছেন। খাওয়া শেষ। খানিকটা বেখাপ্পা রকমের একটি উদ্‌গার তুলে বসলেন, ‘নাউ আই’ল ইনজয় মাই ডানহিল।’ আমি নেমে গিয়ে সেনকাকুর পাওনা মিটিয়ে এলাম। ড্রাইভার, বডিগার্ডকেও দোকানে বসিয়ে যত্ন করে খাওয়ানো হয়েছে।

ফেরত আসব। কমান্ডার একটু ইতস্ততঃ করে বললেন, ‘ইয়ে… জিথ্রি। তোমার ভাবীর জন্য ক’টা ওই খিরসাপাতি না কি, ওই সুইট্‌স নেবে নাকি? দ্যাট উইল বি আ সুইট সারপ্রাইজ, মাই ডিয়ার। হোয়াট ডু ইউ সে? আবার সেইয়িং কী রে! আমি গাড়ির চাবি নিয়ে আবার সেনকাকু সমীপে এবং সুইটার আশ্চজ্জির মেটে হাঁড়ি (তখনকার দিনে এত বাসকো, কৌটো ছেল না) হাতে ঝুলিয়ে ওয়াপস্। সর্বাঙ্গসুন্দর যাত্রা যাকে বলে! ফেরবার সময় কেবল ওয়র সিমেট্রির সামনে একটু দাঁড়িয়েছিলাম। ব্রাউন ব্রেইক অর্থাৎ পাঁচ মিনিটের ধূমপান বিরতি যাকে বলে। হেলড্রাইভিং করে সওয়া ঘণ্টায় ফিরেছিলাম। ফ্ল্যাগস্টাফ হাউসের উঁচু টিলায় ওঠার সময় কেবল কর্নেল বললেন, ‘ড্রোউভ ঠু ফাস্ট, ইয়ং ম্যান। বাট্ কমেন্ডেবল কনট্রৌল ইউ ডিমনস্ট্রেইটিড ঠু!’ আমি কিছু না বলে গাড়ি বারান্দায় গিয়ে স্মুথলি ল্যান্ড করলাম।

ময়নামতির দিনকাল ওইরকম ভোঁচক্কর মাথাঘোরানো ব্যস্ততার মাঝেই কাটত। ব্রিগেড স্টাফ অফিসারদের কাজকর্ম আমার ভালই লাগত দেখতে, সেরকম কঠোর ধরনের সামরিক কায়দাকানুনের বাড়াবাড়ি হতে দেখিনি তেমন। যখন যেটা দরকার, করা হত। লাল ফিতের চর্চা আমরা করিনি, পরবর্তী জীবনে যেটা বেশ কাজে লেগেছে, যখন এনজিও-তে কাজকর্ম নিয়ে মেতে থেকেছি রাতদিন, কোনো স্ট্রেস বা চাপ অনুভব করিনি তেমন।

মেজর মাহবুব বিএমএ-র চীফ ইন্সট্রাক্টর হয়ে এলেন। বেশ জমলো আরেক আড্ডা। ও ১৭৫ সিসি-র এক জাপানি হন্ডা মোবাইক কিনে নিয়ে এল চিটাগাং থেকে। মুশকিল হল, বাইকের ওজন এত বেশি যে, হালকা-পাতলা মাহবুব সেটা সামলাতে হিমশিম্ খেত। তবুও সাহস করে একবার ওদের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালি যাওয়া হল। দু’জনে পালা করে ড্রাইভ করেছিলাম। ফেরত ট্রিপে দুর্ঘটনা ঘটল। মাহবুব ফুটহোল্ড লুজ করে গরম সাইলেন্সারের ছ্যাঁকা খেল গোড়ালির ওপরে কাফ মাস্‌ল-এ। টেরিকটের প্যান্ট পুড়ে, চামড়া ঝলসে, ভেতরের মাংসপেশিতে ইনজুরি হল। কুমিল্লা ফিরে সিএমএইচে ক’দিন শুয়ে থাকতে হয়েছিল ওকে।

ওসি এমপি মুনিব আর আমি এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে চট্টলা সফরে গেলাম। ৮ বেঙ্গল মেসে উঠেছিলাম সেবার। স্যান্ডহার্স্ট থেকে লে: শফি কেবল ফিরেছে গ্র্যাজুয়েশন করে–রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি বলে কথা! এদিকে কুমিল্লায় শফির ব্যাচমেইটরা ১ম বিএমএ শর্ট কোর্সের আওতায় প্রশিক্ষণ নিচ্ছে তখন। বিলেত ফেরত শফি বেশ আগেভাগেই ফৌজি ট্রেইনিং নিয়ে ৮ বেঙ্গলে পোস্টিং নিয়ে বন্দরনগরীর উত্তরপাড়ায় হাজির। বেশ ভালই ছেলেটি। শ্যামল, চোখমুখে বুদ্ধির দীপ্তি, পড়াশোনা-রসবোধ যথোচিত, চমৎকার সঙ্গী। মুনিবকে মনে মনে ধন্যবাদ জানালাম, চট্টগ্রাম সফরে আমাকে ডেকে এনেছে বলে। লে: মাহবুব এবং জালালাবাদীর (জেবি) সঙ্গে সখ্য জমে গেল। শহর থেকে এল ম্যানোলার মালিক জিয়াদ খান আর তরুণ ব্যবসায়ী বন্ধু আসগর কাদরী। আসগরের মস্ত সাদা মার্সেইডিজ আর শফির বিলেত থেকে আনা অস্টিন চেপে খুব বেড়াতে লাগলাম–ফয়েজ লেইক, পতেঙ্গা সৈকত, সীতাকুণ্ড পাহাড়, কাপ্তাই টাউনশিপ, রাঙ্গামাটি পাহাড়–রীতিমত ব্লিৎসক্রিগ গতিতে ছুটে বেড়ানো।

দু’একটি ছোটখাট মিসএডভেঞ্চারও হল বৈকি! বন্দরে মাঝিরঘাট এলাকায় এক প্রমোদমেলায় বন্ধুরা ঢুকেছে। আমি অধিকাংশ ব্যাপারে যেমন, তেমনি কুঞ্জের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে আমাদের দু’টো গাড়ির ওপর নজর রাখছি আর সিগ্রেট ধরিয়েছি কেবল। এমনি সময় মিলিটারি পুলিশের জিপ এসে ঘ্যাঁচ শব্দে ব্রেইক চেপে দাঁড়াল। খাকি ইউনিফর্মের শার্টের বাহুতে এমপি-র সাদা ফেট্টির ওপর লাল দগদগে অক্ষরে ‘মিলিটারি পুলিশ’ দাগানো–এরকম পোশাকে একজন সুবেদার নেমে দাঁড়ালেন। আমাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করলেন, চুলের ছাঁট লক্ষ্য করলেন, মন্দ্রস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গাড়ি আপনাদের?’ ‘ইয়েস, এনি প্রবলেম?’ বলে গম্ভীরভাবে সিগ্রেট জুতোর নিচে পিষে আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘চিটাগাং গ্যারিসনের ওসি এমপি কে এখন, সা’ব?’ সুবেদারের সঙ্গী এমপি সৈনিকেরা ততক্ষণে ভেতরে হুল্লোড় ফেলে দিয়েছে। কয়েকজন কদমছাঁটকে ধরে এনে জিপে তুলল দু’জন এমপি। সুবেদার ততক্ষণে খানিকটা স্বস্থিত হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শুধোলেন, ‘আপনার পরিচয়?’ পরিচয় দিলাম এবং বল্লাম, ‘ভেতরে চারজন আর্মি অফিসার এবং আমার দু’জন সিভিলিয়ান বন্ধু আছেন। আপনার লোকদের গিয়ে বলুন।’ অমুক সাব খটাস্ করে স্যালুট ঠুকে নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকে গেলেন এবং মিনিট দুই পরে বেরিয়ে এসে দুঃখিত মুখে বল্লেন, ‘সব ঠিক আছে , স্যর। কিন্তু জায়গাটা তো বন্দর জোন। জাহাজি, বিদেশি লস্করদের ভিড়ভাট্টা লেগেই থাকে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এরিয়া ক্লিয়ার করে চলে যান। আমি বড় রাস্তার মোড়ে ওয়েট করব। ঝামেলা হলে বলবেন।’

আমি আস্তে বললাম, ‘থ্যাঙ্ক ইউ। অসুবিধা হলে আপনি ফাঁকা ফায়ারিং-এর আওয়াজ পাবেন।’ অমুক সাব আমার পকেটে ঢোকানো ডান হাতের নড়াচড়া থেকে যা বোঝার বুঝে নিয়ে খানিকটা চিন্তান্বিত মুখে স্যালুট করে গাড়িতে উঠলেন। ভিড় জমে গিয়েছিল। চাটগাঁ বন্দরের মানুষ কমবেশি সকলেই সেয়ানা কিসিমের। চাপাস্বরে ভিড়ের উদ্দেশ্যে বললাম, ‘যাও সব, নিজের কাজে যাও।’ অমনি ভোজবাজির মত জায়গা ফাঁকা হয়ে গেল। বন্ধুরা বেরিয়ে এল, গাড়িতে উঠল। আমরা ক্লাবের দিকে চললাম। সবে যে কলির সন্ধে!

কুমিল্লায় ফেরত এসে কাজকর্ম করছি। কমান্ডার এক দুপুরে ডেকে পাঠালেন। ঢুকে দেখি, মুনিব এবং তার কমান্ডিং অফিসারও হাজির। বুঝে গেলাম। দু’জনকে যুগপৎ রেপ্রিমান্ড করা হবে। কমান্ডার কেবল বললেন, ‘নিজের ফর্মেশন আর নিজের স্টেশন হল তোমাদের হোম। বাইরে গেলে ইউ মাস্ট ওয়চ ইওর স্টেপ্‌স। আপনপর বুঝে চলবে। ডোউন্ট টেইক এভরি ইনভায়রনমেন্ট ফর গ্র্যানটিড। ওকে? নাউ, ফাক অফ্!’ ‘রাইট স্যর। ওউন্ট ফাগ্‌গেট ইট এভার।’ দ্বৈতকণ্ঠে উচ্চারণ করে আমরা এবাউট টার্ন করে পিঠটান দিলাম। বিএম-এর ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছি, কানে এল, ডিকিউ মেজর ওয়ালী বিএম-কে বলছেন, ‘হোয়াট’স দ্য প্রবলেম ইন সেন্ডিং ওয়ালি আউট টু সিলহেট্?’ ঘরে ঢুকে বসতে না বসতেই ফোন বাজল, তুলে শুনলাম, বি এম বলছেন, ‘তোমাকে একটু সিলেট যেতে হবে। তুমি আর ওসি এফআইইউ যাবে। আই’ল ব্রিফ ইউ বোথ আফটার হাফ এন আর।’ যথাসময়ে বিএম ব্রিফ করলেন দু’জনকে। কনফিডেনশিয়াল ইনভেস্টিগেশ্যন ইনটু এন ইনসিডেন্ট ইনভলভিং স্টেইট সিকিউরিটি এন্ড পার্সোনাল ইন্টেগ্রিটি অব মেন ইন ইউনিফর্ম।

অত্যন্ত স্পর্শকাতর মিশন। লাঞ্চ খেয়ে একটু গড়িয়ে নিয়ে উঠে ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। আতিক এসে গেল তার সবুজ টয়োটা জিপ নিয়ে। ফোর্সেস ইনটেলিজেন্স ইউনিটের ওসি লে: আতিক। হার্দ্য, হাসিখুশি, কেয়ারফ্রি। ভাল বন্ধু। এই যাত্রায় সহকর্মীও বটে। বিজনেস টু বি কশাসলি মিক্সড উইথ প্লেজার দিস টাইম, গাড়িতে উঠে আতিকের সঙ্গে কাজের পরিকল্পনা ছকে নিলাম। আতিক গাড়ি চালাতে ভালবাসে–তবে উদগ্র, দুর্দম রকমে, গাড়ি হলেই হল–তার মালিক কে, গাড়িটা চালু কেমন, কোনো বিষয়ে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে কিনা–ওসবে তার আগ্রহ নেই। কেবল বেদম বেগে ছুটলেই সে খুশি। যাই হোক, রাতে পথে থাকব, রাস্তাও খুব প্রশস্ত কিংবা মসৃণ নয়, কাজেই আমাকে কড়া নজর রাখতে হবে ওর ওপর, বিএম বলে দিয়েছেন।

মোটামুটি নির্বিঘ্নে একরকম একটানাই চালিয়ে রাত দু’টো নাগাদ সিলেট মডেল স্কুলে আর্মি ক্যাম্পে পৌঁছে গেলাম। অফিসার্স মেসে প্রায় সবাই শুয়ে পড়েছে। কেবল মেস সেক্রেটারি লে: মিজান জেগে বসে হিসেবপত্র দেখছিল। ও মেসবয়কে তুলল। আধঘণ্টার মধ্যে ডাইনিং রুমে ডাক পড়ল। মিজান ইতিমধ্যে আমাদের দু’পাত্তর করে ব্র্যান্ডি উইথ হট ওয়াটার দিয়েছিল। বেশ রিল্যাক্সড হয়ে এক-এক মিনিটে শাওয়ার নিয়ে মাথা-টাথা ভাল করে না মুছেই টেবিলে পৌঁছে গেলাম। ‘তোমরা তো এসেই শোবার জায়গা খুঁজছিলে। কোথায় গেল সেই ফ্যাটিগ?’ মিজানের সহাস্য প্রশ্নের উত্তরে আতিক প্লেটে ভাত, চিকেন তুলে নিয়ে স্পুন-ফর্ক চালাতে চালাতে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যর। আই ইক্সপেক্টেড আ ওয়ম ওয়েলকাম লাইক দিস। আস্ক ওয়ালী।’ ‘আফটার অল–নো, নো, বিসাইড্‌স এভরি কান সিডারেইশন–দিস ইজ দ্য ফর্টিন বেঙ্গল অফিসার্স মেস! লং লিভ রোরিং ফর্ন্টিনজ।’ আমার এপ্রিসিয়েইশ্যন শুনে মিজান শুধু উচ্চারণ করল, ‘খেয়ে শুয়ে পড় তোমরা অওর আগে আগে দেখো কেয়া হোতা হ্যয়। ইউ এইন্ট সিন নাথিন্ ইয়েট’ আর মুচকি হেসে উঠে গেল নিজের ঘরে।

মিজান, ১৪ ই বেঙ্গলের এজুট্যান্ট তার ইশারার মর্যাদা রেখেছিল পুরোপুরি। পরের দিন কয়েক আমাদের নিরলস আমোদ, কর্ম, অবসর-বিনোদন, আবার কাজ, সামারি অব এভিডেন্স, ইন্টারোগেইশ্যন ইত্যাদিতে কাটল। প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় দল বেঁধে আমরা তিনজন আতিকের সিভিল জিপ নিয়ে বের হতাম। তেলের জন্য শহরের নির্দিষ্ট পাম্পে গিয়ে দাঁড়ালেই মিজান স্লিপ সই করে দিলেই ট্যাঙ্ক টপ-আপ করে দিত। তারপর আর কী। চালাও পানসি বেলঘরিয়া অর্থাৎ জিপ ছুটত তামাবিল-জাফলং-শ্রীপুর টি এস্টেট–খাইস্যা বস্তি। একেকদিনের মৃগয়া একেকজনের নেমন্তন্ন ভেনিউতে সম্পন্ন হত। সীমান্ত পেরিয়ে আসা রসদাদির সদ্ব্যবহার করে, চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় একাধারে এস্তেমাল করে যখন ফেরা হত, তখন প্রায়ই স্টিয়ারিং ধরত মিজান, আমাদের সবচাইতে নির্ভরযোগ্য চালক–যে কোনো অবস্থায়। ও প্রায় উড়িয়ে এনে ফেলত আমাদের শালুটিকর বিমানবন্দর সংলগ্ন আস্তানায়, সুকোমল বিছানায়। একরাতে ফিরছি সকলে ঝিমুতে ঝিমুতে। সে রাতে লে: আব্দুল্লাহ্, ১৪ বেঙ্গলের কিউ এম অর্থাৎ কোয়ার্টার মাস্টারও ছিল। হঠাৎ ঝিমুনি কাটিয়ে সে চিৎকার করে উঠল, ‘কালো পিচের রাস্তায় তো আমরা নেই, মিজান। কোথায় যাচ্ছি, এই সাদা মেটে রাস্তায়?’ বলতে না বলতেই জিপ আবার কালো ফিতে রাজপথে। ‘শাট আপ, ইউ এবডালা। গোউ টু স্লিপ। আই’ল গেট ইউ হোউম অরাইট,’ বলে মিজান স্মিতমুখে একবার বাঁয়ে ঘুরে আমার দিকে তাকাল। আমি বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে উৎসাহ দিলাম, ‘কিপ ইট আপ, স্যর। ওই সাদা রাস্তাটা ছিল এই রাস্তায় শুকোতে দেয়া তেজপাতা, অতএব চিয়ারিও এবডালা।’

আরেক সন্ধেয় রসদ খুঁজতে বেরিয়ে প্ল্যান্টার্স ক্লাবে কিছু না পেয়ে গুলশান হোটেলে পেলাম মার্টিনি গোটা দুই। এতে কী হবে? যা হয় হবে। নিয়ে নাও। একজন বলে উঠল। কিন্তু দাম শুনে কান গরম আমাদের। হাল ধরতে হল আমাকে। কুড়িয়ে বাড়িয়ে যে তহবিল দাঁড়াল, তার কিছু রেখে, বাকিটা নিয়ে আমি নেমে গিয়ে আমার একাত্তরে গুলশান বাসের কথা প্রোপ্রাইটারকে মনে করিয়ে দিয়ে তারই দেয়া সিগ্রেট ধরিয়ে, টাকাটা জোর করে তার হাতের মুঠিতে গুঁজে দিয়ে হৃষ্টচিত্তে এসে গাড়িতে উঠে বললাম, ‘লেট’স গৌ।’ সুগন্ধি স্বাদু মার্টিনির ছিপি খুলে ঢুকু ঢুকু চালাতে চালাতে একটু বাদেই রসদ শেষ। মেজাজ ফুরফুরে। মেসে ফিরে ওরা বসল আড্ডায়। আতিককে বললাম, ‘চাবিটা দাও গাড়ির। আমি জকিগঞ্জ যাচ্ছি। ওখানকার কাজ সেরে আসব।’ ‘ওকে। আমি তাহলে কাল সকালে ছাতক যাই। দেখিগে, রশীদ সত্যি সত্যি চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে খাট বিছানা তুলে এনেছে কি না রেস্ট হাউসে। ঠিক আছে?’ আতিক ভালই প্রস্তাব দিয়েছে, ভাবলাম, দু’জনে দু’জায়গায় একই সঙ্গে কাজ করে এসে কুমিল্লা ফিরব।

জকিগঞ্জের রাস্তাটা সিলেটের পর থেকে চুরখাই পর্যন্ত একটানা সোজা, চওড়া। যেন প্লেন নামতে পারবে, মনে হল। কিন্তু চুরখাইয়ের পর থেকে বাঁয়ে ঘুরে যেই বোলডার বিছানো রাস্তায় পড়লাম, ওই রাতের বেলা, সেটা আর কহতব্য নয়। মনে পড়ে গেল, সেই একাত্তরের সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের ৪২ মাইল ৬ ঘণ্টায় পেরনোর কথা। হেডলাইটের আলোতে পথ দেখে ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে চলে রাত এগারোটায় জকিগঞ্জ ডাকবাঙলায় পৌঁছলাম। কম্পাউন্ডে লে: সাইদের এম-৩৮ এ-ওয়ান জিপ দাঁড়িয়ে। আশাতীত অভ্যর্থনা জুটল। সাইদ রীতিমত উচ্ছ্বসিত। সোৎসাহে ও নানা স্থানীয় আকর্ষণের বর্ণিল ছবি এঁকে চলল আর আমি খিদে মিটিয়ে বরাক নদীর পাবদার ঝাল, ঘিয়ের সম্ভার দেয়া মুগডাল, ছোট চিংড়ি আর কচুর লতির প্রায় মুচমুচে বাদামি চচ্চড়ি আর স্যালাড সাবড়ে গেলাম।

খাওয়া শেষ করে দুইবন্ধু পাশাপাশি দুই খাটে চিত হলাম। বড় বাতি নিবিয়ে ডিম আলো জ্বেলে দিয়ে গেল ওর ব্যাটম্যান। বেড টি দেবে কখন জেনে গেল। আরামে চোখ বুঁজে আসছে। এমন সময গান ভেসে এল কানে.. গানে মোর, কোন্ ইন্দ্রধনু..। আমি মাথা তুলে সাইদের দিকে ঘোরাতে জবাব এল, ওপারে ভারতীয় শহরের সিনেমা হলের গান এরকম মাঝরাতে নদী পাড়ি দিয়ে আসে বৈকি। ওই ছবি আমরা দেখতে পাব না? ছেলেমানুষের মতো প্রশ্ন করি। জানি, সামরিক অফিসার আমরা, জরুরি কাজে এই সীমান্ত শহরে থানা গেঁড়েছি, আবার আরেক দেশে গিয়ে মুভি দেখার বাসনা? অবাক হই সাইদের কথা শুনে। ‘ও আর এমন কী ব্যাপার। দাঁড়াও, ব্যবস্থা করছি। কবে যাবে, কাল না পরশু?’ তাহলে সত্যিই যাওয়া হতে পারে–ভাবতেই দুনিয়ার ক্লান্তি আর নিশ্চিন্তি। দু’চোখের পাতা বুঁজিয়ে ঘুম এসে গেল।

পরদিন সকালে নায়েব সুবেদার আলিমের মধ্যস্থতায় সাব্যস্ত হল, বিএসএফ-এর ক্যাপ্টেন তরুণ ব্যানার্জি আমাদের ওপারে রিসিভ করবেন বিকেলে আড়াইটায়। যথাবিধি কুশিয়ারা পেরিয়ে করিমগঞ্জে পৌঁছলাম। পরনে সিভিল পোশাক, হাতে ঝোলানো মস্ত রুই আর ছানা এক হাঁড়ি। ব্যানার্জির বাড়িতে চা খেয়েই বাড়ির লাগোয়া ছবিঘরে ‘অমানুষ’ দেখতে গেলাম। উত্তম-শর্মিলার পরিণত বয়সের অভিনয় অনবদ্য, সঙ্গীতও চমৎকার। হল থেকে বেরিয়ে কিছু শপিং করা গেল। তেমন কিছু নয়–ক’টা সূতি টিশার্ট, মোজা এইসব। রাতে ব্যানার্জির বাড়িতে ডিনার খেয়ে ওকে ফেরত ভোজের নেমন্তন্ন করে ফিরলাম ন’টা নাগাদ। মনটা ফুরফুরে। সাইদের ক্যাম্প অফিসে ওর হেডক্লার্কের সঙ্গে বসে কিছু দাপ্তরিক কাজকর্ম সারা হল। ক্লান্ত হয়ে ঘুমোলাম কাদার তালের মতো।

পরদিন সকালে বিদায় নিয়ে সিলেট পৌঁছলাম এগারোটায়। লাঞ্চ খেয়ে আতিক আর আমি সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কুমিল্লার পথে যাত্রা করলাম বেলা দু’টোয়। আতিক ওর নিজস্ব ভঙ্গিতে–অত্যন্ত শিথিলভাবে বাঁ হাত স্টিয়ারিং হুইলের কোলের ভেতর গুঁজে ঝুলিয়ে দিয়ে–ডান হাতে গাড়ি স্টিয়ার করছিল। আমি এরিনমোর আর বড় তামাকের বিড়ি তৈরি করে ধরাচ্ছিলাম মাঝে মাঝে। দুজনেই ধূমপান করছি, গাড়ির চাকা অনায়াসে গড়াচ্ছে। সামনে চুনারুঘাটের বাঁক। খেয়াল করিনি। একেবারে নব্বুই ডিগ্রি মোড়। আতিকের বাঁ হাত বের করা হল না। ঘাবড়ে গিয়ে ডান হাতে স্টিয়ারিং দ্রুত বাঁয়ে অতখানি ঘোরাতে না পারলেও বাঁ হাত মট্ করে ভেঙে পেঁচিয়ে গেল হুইলে, গাড়ি রাস্তা থেকে কালভার্টে না উঠে কেৎরে বাঁয়ের ডোবায় গড়াল।

স্থিতাবস্থা প্রাপ্ত হলে উপলব্ধি করলাম, চিৎ হয়ে পড়ে আছি জিপের ছাদে পিঠ বিছিয়ে। অর্থাৎ, গাড়িটা গোটা দুইবার কাত হয়ে গড়ান খেয়ে পা ওলটানো গুবরে পোকার মত অবস্থায় রয়েছে। আতিক যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে মা, মা বলে। আমার চেয়ে বয়সে ছোট ছেলেটির অসহায়ত্ব আমাকে কষ্ট দিচ্ছিল। ওর জন্যই হ্যাঁচড়-প্যাচঁড় করে পাছা ঘষটে জিপের খোলা পেছন দিয়ে বেরিয়ে ওঠার চেষ্টা করতেই দু’জন দু’দিক থেকে দু’হাত ধরে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল। টের পেলাম, সর্বাঙ্গে বেদনা। ভালই ঝাঁকুনি লেগেছে শরীরে। লোক জুটেছে মেলাই। এর নাম বাংলাদেশ! রাস্তায় চলতে চলতে দুষ্টুমি করে হঠাৎ থেমে, দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে ভূতলে দৃষ্টি নিবন্ধ করে, ‘আর্শ্চয, আর্শ্চয’ বার কয়েক উচ্চারণ করে দেখুন, আপনাকে গিরে আপামর জনতা উঁকিঝুকি মেরে আপ্রাণ দেখতে বুঝতে চাইছে, আপনাকে কে বা কী বস্তু অমন আশ্চর্যান্বিত করল! সে যাকগে।

জনতা এরিমধ্যে আমার নীরব অঙ্গুলি নির্দেশে জিপের ভেতরে দুড়দাড় ঢুকে পড়ে আতিককে বের করে এনে ওপরে রাস্তার পাশে ঘাসজমিতে শুইয়ে দিয়েছে। অদূরবর্তী কুঁড়ে থেকে এক দয়ার্দ্র শিশু একটি তেলচিটে বালিশ এনে আহতের মাথার নিচে গুঁজে দিল। আমি তো টাচ্‌ড। তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে হাতপা ঝাড়া দিয়ে সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করলাম। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে একটি ছোটখাটো উদ্দীপক বক্তৃতাও দিয়ে ফেললাম। সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। দূরে একটি মোটরগাড়ির শোভাযাত্রা। সামনে পুলিশের গাড়ি। পরেরটা পতাকাশোভিত। কাফেলা থেমেছে ভিড় দেখেই বোধহয়। পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত তাহেরউদ্দিন ঠাকুর নেমে এলেন। পূর্ব পরিচিত অমাত্য মহাশয়কে আমি সালাম জানালাম। উনি আতিকের কপালে হাত ঠেকিয়ে আমার দিকে তাকালেন। আমি অতি সংক্ষেপে আমাদের দেশোদ্ধারের মহান মিশন শেষে প্রত্যাবর্তনের পথে এই আকস্মিক দুর্ঘটনা পর্যন্ত বিবৃত করলাম। মন্ত্রীর গাড়িতে আতিককে আধশোয়া করে বসিয়ে আমি ধরে রইলাম। আমাদের ব্যাগ দু’টো পেছনে তোলা হল। মন্ত্রী স্বয়ং ড্রাইভারের পাশে বসলেন। ‘চলো,’ মন্ত্রীর নির্দেশে গাড়ি ছুটল।

আমার ক্ষীণ আপত্তি ধোপে টেঁকেনি, বলাই বাহুল্য। ওর বাড়িতে পৌঁছনোর পর আমার দুশ্চিন্তা কেটে গেল। ওর কথামতো আমি গরমজলে স্নান সেরে, পরিষ্কার পাজামা গেঞ্জি গায়ে ও-দ্য-কলন সুরভিত হয়ে বেরিয়ে দেখি, আতিকের নোংরা কাপড় বদলে গেছে। দু’তিনজন চিকিৎসক ওর বাঁ হাতে প্ল্যাস্টার অব প্যারিসের (পপ) কাস্ট পরাতে ব্যস্ত। ঠাকুর দাদা বসে মন দিয়ে দেখছেন। আমাকে বললেন, ‘তোমাদের গাড়ি তুলে টোউ করে তোমার অফিসে নিয়ে যাচ্ছে। ফোনে সিইও-কে সব জানিয়েছি। কারার সবাইকে বলে দেবে, তোমরা কাল সকালে ধীরেসুস্থে যাবে। খুশি?’ ‘যারপর নাই,’ আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম, ‘ভাগ্যিস আপনি আসছিলেন ওই পথে ওই গোধূলি লগনে মেঘে..’ বাক্য শেষ না করেই আমি উদাত্ত কণ্ঠে জর্জদার ভঙ্গিতে রবীন্দ্রনাথের সেই অমোঘ গোধূলি গীতি গাইতে শুরু করলাম। ‘গেয়ে যাও, তোমাদের ওষুধ আসছে, ওর পপটা হয়ে যাক,’ মন্ত্রী আমাকে উৎসাহ দিলেন।

মন্ত্রী যথারীতি তাঁর সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে মহকুমা প্রশাসকের দপ্তরে গেলেন জরুরি মিটিং সারতে। আমরা তাঁর অবারিত আতিথ্য উপভোগ শেষে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে উঠে জানলাম, রাতেই মন্ত্রী রাজধানীতে ফিরে গেছেন। আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যে যাতে সামান্য খুঁতও না থাকে, সেটা নিশ্চিত করে বিশদ নির্দেশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দিতে ভোলেননি। আতিকের মানসিক আঘাতেরও অনেক উপশম হয়েছে। এসডিও-র ট্রান্সপোর্ট পুল থেকে একটি ভাল জিপ এসেছে। আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্টেশন রোড থেকে বয়ে আনা স্বাদু প্রাতঃরাশ ও মিষ্টির সদ্ব্যবহার করে কুমিল্লার পথে রওনা হলাম। ড্রাইভারকে বল্লাম, ‘তুমি স্যরের ওপাশে বসে ভাঙা হাতে যাতে চোট না লাগে, সেজন্য সাপোর্ট দেবে। আমি গাড়ি চালিয়ে যাব, যেন মিনিমাম ঝাঁকুনি লাগে।’

আসলে, দুর্ঘটনা তখন আমাদের পায়ে পায়ে ঘুরছে। কোম্পানিগঞ্জ পেরিয়ে গেছি, ঢিমে তেতালা ভঙ্গিতে একজন আড়াআড়ি রাস্তা পেরোচ্ছে, হর্ন বাজালাম এবং আশা করলাম, ও একটু দ্রুততর গতিতে পার হবে, তাহলে আমাকে ঝুঁকি নিয়ে ঘ্যাঁচ করে গাড়ি থামিয়ে বা গতি কমিয়ে ওকে পাশ কাটাতে হবে না। হা হতোস্মি! লোকটা কালা নাকি? আতিক ওর প্ল্যাস্টার করা হাত নিয়ে টেনশনে সোজা হয়েছে, আমি ব্রেইক কষা এড়িয়ে, বাঁয়ে অনেকখানি কেৎরে লোকটাকে পার হতে পারলাম। কিন্তু গাড়িকে রাস্তায় রাখতে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছেঁচড়ে ডানে কাটতে হল এবং তাতে গাড়ির ডান দিকের কোণে সামান্য গুঁতো খেয়ে লোকটা পিচঢালা পথে মুখ থুবড়ে পড়লই। নিরুপায় ক্ষোভে ঠোঁট কামড়ালাম।

কুমিল্লা পৌঁছে পরের দু’দিন চুপিচুপি ‘দৈনিক গোমতী’র পাতা স্ক্রিন করে কিছুটা নিশ্চিন্তিলাভের চেষ্টা করেছি। ভেবেছি, পোয়েটিক জাস্টিস বলে একটা কথা তো প্রচলিত রয়েছেই। সে যাক্‌গে। বুলু ভাইয়ের ফোন এল, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনবাদাড়ে ঘুরতে যাবার বাসনা হয়েছে, আমি কি সামিল হব? সে আর বলতে হয়। সিলেট থেকে ফেরার পথে যে কাণ্ড হল, সেটা কাটাবার প্রয়াসে এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে দক্ষিণমুখো হলাম। বিপনি বিতান সংলগ্ন জিপিও’র দোতলায় উঠে বেল বাজালাম। দরোজা খুললেন ফোটন মামা। ‘আরে ফৌজি, এস, এস। মন্টু আসছে না এযাত্রা। তবে দিন তিনেক পরে এসে জুটতেও পারে। ও জিএম হয়ে ফাঁকি দিতে পারছে না বিশেষ আগের মতো, বুঝলে?’ বুঝলাম। ভেতরে ঢুকে দেখলাম, মেজর মান্নান আর ক্যাপ্টেন খালেদ বসে বুলু ভাইয়ের সঙ্গে ঢুকুঢুকু চালাচ্ছে, গল্পও হচ্ছে টুকটাক চিপস চানাচুরের মুখরোচক সঙ্গতে।

বুলু ভাই কেজো মানুষ। একটা বড়োসড়ো পানীয় তৈরি করে আমার দিকে সৌখিন ফরাসি মগে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মেরে দাও। তারপর চল, বাজার করে আসি। দেরি করে লাভ নেই। কালই বেরিয়ে পড়া যাক, কী বল?’ কোথায়, কী রকম এসব প্রশ্ন করা বৃথাই বাগাড়ম্বর হবে জেনে মাথা ওপর-নিচ করে জানান দিলাম, তথাস্তু এবং মগ টপ্আপ করতে ব্যস্ত হলাম। মিনিট দশেকের মধ্যে দু’ভাই আর ফোটন মামা হাজির হলাম বিপনি বিতানে। বিস্তর কেক-বিস্কুট, পনির, চানাচুর, সিগ্রেট, চা-কফি কেনা হল। ফোটন মামা হিসেব করছেন, দু’তিনদিনের জন্য জঙ্গলে আর কী কী লাগতে পারে। সেগুলো আমরা ঝপাঝপ কিনে ঝোলায় ভরছি। ‘খালেদ তো ওর কাজে ওখানেই ঘুরছে, বুঝলে?’ কাজের ফাঁকে ফাঁকে বুলু ভাই আমাকে ব্রিফ করে চললেন, ‘একটা নতুন জিপ এসেছে। প্রথম হাজার মাইল তো একটু হিসেব করে চালাতে হবে, বুজলে না? তো এই জঙ্গল সাফারিতেই সেটার প্রথম ভাগ সারা হবে। ঠিক আছে না?’ ‘অবশ্যই, বিজনেস কে বিজনেস, আবার ঘোরাও হবে বেশ,’ আমি সোৎসাহে বলি।

‘দু’টো বন্দুক যাবে–আমারটা আর তোমার দোনলা উইনচেস্টার,’ রাতে খাবার টেবিলে বুলু অসমাপ্ত জ্ঞানদান রিজিউম করলেন। ‘ওহ্ হোয়াট আ থ্রিল! মানে, শিকারও হবে?’ ‘না হলে খাবেটা কী ওখানে শিকার না করলে?’ বুলুর সরল জিজ্ঞাসা। ‘আমাকে কিন্তু বন্দুক ধরতে বলবে না,’ মান্নানভাই জানালেন, ‘ওপাট একাত্তরেই শেষ আমার।’ ‘ডোউন্ট ওয়ারি, আমি আর ওয়ালী যথেষ্ট। তুমি মাঝে মাঝে লো গিয়ারে গাড়িটা ঠেলবে, ব্যস,’ বুলু তার পিএমএ-র বন্ধু মেজর মান্নানকে নিশ্চিন্ত করেন। ঠিক হল, ফোটন মামা বাসায় থাকবেন এবং ঢাকা থেকে ব্যাঙ্কার মন্টুদা এসে পৌঁছলে তাঁকে ট্রিট করবেন আর কক্সবাজার ট্রিপের প্রস্তুতি দু’জনে ধীরেসুস্থে সেরে রাখবেন। মামা দু’হাত ওপরে তুলে একপাক নেচে নিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ‘আর আমার ওলেনা যে ঢাকা থেকে রোজ ফোনে জানাচ্ছে, আমার দু’টো গাড়িই নাকি বসে যাওয়ার পথে, ড্রাইভাররা হিসেবমতো টাকা পয়সা জমা করছে না, তার কী হবে?’ এবারে মেজর মান্নান ও আমি উঠে দ্বৈত পার্ফরমেন্সে ‘দারাপুত্র পরিবার, তুমি কার, কে তোমার’ ইত্যাদি সুর করে ভুলভাল গেয়ে দিলাম একদফা।

সকাল সকাল রওনা হয়ে পাহাড়মুখো সরু কালো ফিতের মতো পিচঢালা রাস্তায় আমরা ‘গ্রামছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ..’ গাইতে গাইতে চলেছি। চন্দ্রঘোনা কাগজকলের ঘাটে দড়িটানা ফেরিতে জিপ পার করে ওপারে মেটে রাস্তায় উঠলাম। মেজর মান্নান এবারে স্টিযারিং ধরেছেন। আর্মি এঞ্জিনিয়ার্স জঙ্গল কেটে রাস্তা তৈরি করছে। প্রচুর ধূলোওড়া পথে চড়াই-উৎরাই ডিঙোতে ডিঙোতে পথ চলেছি। সঙ্গে আনা পাঁউরুটি, সেদ্ধডিম আর কলা খেয়ে শেষ করে মেজর মান্নান বাঙালিহালিয়া-তে গাড়ি থামালেন পাহাড়িদের এক বস্তির সামনে। চায়ের দোকানে ঢুকে খাদ্যাখাদ্য পরিদর্শনের পর বুলু আর আমি বাঁশের বেঞ্চিতে বসে ধূমপানে মনোযোগ দিলাম। কমান্ডো আমাদের পানে একবার তাকিয়ে নির্লিপ্তভাবে দোকানিকে মাছি ভন্‌ভনে, আধপোড়া, কোন্ সকালে সেঁকা মোটা লাল আটার রুটি আর আটা-গুড়ের হালুয়ার রোল করে দিতে বললেন। অকুতোভয়ে সেই রোল উনি তিন-চারটে খেয়ে ফেলার পর চা দিতে বললেন। অলস পাহাড়ি যারা দোকানে গুলতানি মারছিল, তারাও বিস্ফারিত চোখে দেখছিল। বুলু ঢোঁক গিললেন বন্ধুর কাণ্ড দেখে আর আমাকে কানে কানে শুধোলেন, “যথেষ্ট পরিমাণে পেটে অসুখের বড়ি-টড়ি এনেছ তো?” আমি নিশ্চিন্ত করলাম।

আরো ঘণ্টাখানেক ড্রাইভ করে একটা বাঁক ঘুরে সামনে দেখি, ক্যাপ্টেন খালেদ একজন পাহাড়ির সাথে গল্পগুজব করতে করতে সামনে এগোচ্ছেন। ওকে তুলে নেয়া হল, পাহাড়ি গাইডসুদ্ধ। খালেদ নানা রোমহর্ষক কাহিনী বলে যাচ্ছে–দালাই লামা সত্যিই ওদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন নাকি, কোন ক্যাম্প রেইড করতে গিয়ে দেখা গেল, চুলোয় ভাত ফুটছে, মানুষজন নিমিষে হাওয়া–এইসব। শুনে বুলু ইতিউতি দু’পাশের ঘন জঙ্গলে বাইনো ফোকাস করে ওদের উপস্থিতি আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে আবার খালেদের গল্পে মন দিলেন। বেলা আড়াইটে নাগাদ পাহাড়চূড়োয় বনরাজি শোভিত রাজস্থলী ক্যাম্পে পৌঁছলাম। প্রকৌশলী ব্যাটালিয়নের হেডকোয়াটার্স। এজুট্যান্ট লে. হায়দার আমার বন্ধু, বুলুর ভায়রা ভাই। অতএব, সম্বর্ধনা মন্দ জুটল না। তাৎক্ষণিক যে লাঞ্চের ব্যবস্থা হল, সেও রাজকীয়প্রায়। আমরা নিচের ছড়া অর্থাৎ পাহাড়ি ঝোরায় নেমে স্বচ্ছশীতল জলে পথের ক্লান্তি আর রাঙামাটি পাহাড়ের রাঙা ধুলো ধুয়েমুছে পরিষ্কার হলাম।

হায়দার গাছতলায় ত্রিপল খাটিয়ে বসার জায়গা, খাওয়ার টেবিল পেতেছে। পেঁয়াজ-মরিচ লাল করে সর্ষে তেলে মোটা লাল চালের ভাতভাজা, দু’রকম কালো-কালো শুকনো দেখতে মাংসের প্রিপারেশান, ঝোরা থেকে গেঁথে তোলা স্থানীয় মাছের স্মোকড ডিশ, পাহাড়ি কালো ডালের স্যূপ আর সবুজ স্যালাড। মান্নান ভাই কথা না বলে প্লেইট টেনে নিয়ে পেটপুজো শুরু করলেন। আমরা দু’ভাই একটু কিন্তু কিন্তু করলেও শেষে ‘খাবার যদি শেষ হয়ে যায়’ আশঙ্কায় হাত লাগালাম। একটু অন্যরকম এবং ততোটা নরম না হওয়া সত্বেও মাংসের দুটো ডিশ বেশ খাওয়া হয়ে গেল তো! বুলুর শিশুসুলভ ঔৎসুক্য মেটাতে ওর ভায়রা হায়দার জানাল, ওগুলো শিকারের মাংস–হরিণ ও বনমোরগের। শুনে রোমাঞ্চ হচ্ছিল। ‘আমরা দু’চারটে কিল্ পাবো না, হায়দার?’ আমার হুড়মুড়ে প্রশ্নের উত্তরে হাট্টাকাট্টা উর্দিপরিহিত এজুট্যান্ট গম্ভীরভাবে নিবেদন করল, ‘আই’ল ডু মাই বেস্ট টু ফ্যাসিলিটেইট ইয়োর টার্গেট প্র্যাকটিস, স্যর।’ ভরপেট খেয়ে তুষ্ট আমরা একসঙ্গে হেসে উঠলাম। কাছেই এক নিচু ডালে বসা দু’টো পাখি উড়ে গেল।

খাওয়ার পর মেজর মান্নান এবং নিজের কম্প্যানির সহায়তায় হায়দার আমাদের জন্য তিনটে তাঁবু খাটিয়ে ফেললেন। পেছনে টয়লেট টেন্টসুদ্ধ। তারপর আড্ডা আর চায়ের পালা চলল, মাঝে-মাঝে এজুট্যান্ট তার রানারের হাতে মেসেজ পাঠাচ্ছেন, রিসিভ করছেন। একটু দুরেই কমুনিকেশ্যন তাঁবু। বেতারযন্ত্র কাজ করছে অহর্নিশি। যার-যার বন্দুক লোড করে দশটা নাগাদ শুয়ে পড়া গেল। শিকারের প্রত্যাশায় আমাদের শিরদাঁড়া টান্‌টান্। ঘুম কি আর হয়? চোখ বুঁজে শরীরকে আরাম দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। একটু তন্দ্রামতো এসেছে। কেন জানি না, কিলিম্যাঞ্জারোর পাদদেশে শায়িত আহত হোমিংওয়ের কথা মনে পড়ছিল। মনশ্চক্ষে দেখছিলাম। তাঁবুর প্রবেশ পথের ফ্ল্যাপ বাতাসে দুলছে। ফাঁকে-ফাঁকে ফিনকি দেয়া জোছনা নজরে আসছে। পরমুহূর্তে তাঁবুর ভেতরে হারিকেনের কমানো আলোয় ক্যাম্পকটের পাশে দাঁড় করানো বন্দুকের নলের ম্লান কিন্তু অমোঘ ইশারা দেখতে পাচ্ছি।

‘স্যর, উঠে পড়েন। শিকার ডাকছে। আপনাদের ভাগ্য দুরন্ত।’ হায়দারের ডাকে ধড়মড়িয়ে উঠে বসেছি। সাড়ে চারটে। এহ, ঘুমিয়েই দেখছি রাত কাবার করেছি সবাই। মনে-মনে নিজের ওপরই বিরক্ত হতে চাইলাম। পারলাম না। বিশ্রামের দরকার ছিল। শরীর সেটা আদায় করে নিয়েছে। বুলুভাই ঘুমোচ্ছেন। হায়দার এবং আমি বেরোলাম ম্লান জোছনায় আলো-আঁধারি পরিবেশে। মান্নান ভাই চললেন আমাদের সঙ্গে স্বেচ্ছাপ্রণোদনায়, মধুসূদনের ভুমিকায়। তরুণ আমরা মনে মনে চটলেও মুখে কিছু বল্লাম না। আফটার অল, আ সিনিয়র ইজ অলওয়েজ টু বি ওবেইড! জংলা শুঁড়িপথে আগে আগে হোস্ট হায়দার, মাঝে আমি, মেজর রিয়ারগার্ড। পা টিপে টিপে, যথাসম্ভব নিঃশব্দে নিচের উপত্যকায় পৌঁছলাম। ‘ডাকটা এদিক থেকেই শুনেছি,’ হায়দারের চোখ জ্বলছিল, ‘এখন বাকিটা কপাল আপনাদের।’

ঝোপের আড়ালে আমাদের তিনজোড়া পা আট্‌কে গেল যেন। ঠাহর করে নজর চালালাম। ভ্যালির বাম প্রান্ত ঘেঁষে ক্লিয়ারিং-এ তিনটে বারাশিঙা চরছে। মুগ্ধ হয়ে বারাশিঙার শৃঙ্গশোভা দেখছি তো দেখছিই। হায়দার জুতোর গুঁতো দিল জুতোয়। তটস্থ হয়ে ফিসফিস করলাম, ‘আমি বাঁয়ে, আপনি ডান থেকে।’ হামাগুঁড়ি দিয়ে ঝোপঝাড়ের আড়ালে এগোলাম সুন্দরকে হত্যার তীব্র বাসনায়। হায়দার কয়েক হাত পেছনে। মেজর আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে চারদিকে নজরদারি বজায় রেখেছেন। মোক্ষম রেঞ্জে আসতেই হাত তুলে সিগন্যাল করলাম। হায়দার কি নড করল? প্রায়ান্ধকারে প্রায় কিছুই দেখছিলাম না। নিঃশ্বাস বন্ধ রেখে বন্দুক তাক করলাম। একই সঙ্গে তিনটে গুলি ছুটল। জঙ্গল, নির্জনতা, ঘাই হরিণীর পরিত্রাহি আর্তনাদ, পাখিদের ঘুমচটা কাকলি আর মেজরের তীরের মতো ছুটে যাওয়া–সবই যেন যুগপৎ ঘটল। আমি ঘামতে ঘামতে উঠে দাঁড়ালাম। লম্বা শ্বাস টানলাম। কতকাল যেন ফুসফুসে বাতাসের গতায়াত ছিল না!

হায়দারের ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার্স কম্প্যানির জোয়ানেরা তাগড়া বারাশিঙা দু’টোকে পাকা বাঁশে ঝুলিয়ে, দোলাতে দোলাতে নিয়ে এল। হরিণ-হরিণী পলকহীন, বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে। মুখ ফিরিয়ে নিলাম। আলো ফুটছে। ‘বসে থাকলে তো চলবে না, স্যরেরা। এবার কেবল ছররার খেলা দেখবেন, চলেন।’ হায়দারের কথায় ওর দিকে ফিরতে দেখলাম, ও নিজের বন্দুকে কাট্র্রিজ লোড করে বুলুর বন্দুকে গুলি ভরছে। ‘বুঝেছি, হায়দার ব্রাদার আজ ক্ষ্যামা দেবে না। বুলুভাই কই?’ বলতে বলতে বুলুর তাঁবুতে ঢুকে দেখি, ওর নাক ডাকছে মৃদু। মেজর মান্নান বললেন, ‘এবার আমিও শোব। তোমাদের এবার রিয়ারগর্ড দরকার নেই, বুঝেছি।’ বলে নিজের তাঁবুতে ঢুকে গেলেন। অতএব, আমরা দুই বেয়াই এগোলাম বন্দুক কাঁধে। যে পথে জীপ চালিয়ে গতকাল এখানে উঠে এসেছি, সে পথেই ধুলোর মধ্যে জুতো ডুবিয়ে নিঃশব্দে উষাকালের নিসর্গ প্রত্যক্ষ করতে করতে ঢালু বেয়ে নামতে লাগলাম। চারিদিক শুন্‌শান এখনো। পাখিদের ঘুম ভাঙছে, ভাঙাচ্ছে।

একটু চওড়া বাঁকে ঘুরতেই হায়দার আমরা কাঁধ আল্‌তো স্পর্শ করল। সামনে আলো আঁধারে চোখ চালিয়ে হৃদয়ঙ্গম করলাম, একঝাঁক মোরগ-মুরগি সদ্য ক্যাটারপিলার চালানো রাস্তায় নেমে ফৌজি র‌্যাশন টানা লরি থেকে স্পিল করা চাল, গম ঘুঁটে খাচ্ছে। পিছু হটে দুজন রাস্তার দু’পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসে তৈরি হলাম। আমার দোনলার কভারেজ অনুমান করে ডানপ্রান্ত থেকে বাঁয়ে দ্রুত গুণে দেখলাম, বেশ ডজন খানেক হবে। হায়দার বাঁ প্রান্ত থেকে ডানে। হাতের ইশারায় মাহেন্দ্রক্ষণ সাব্যস্ত হলে একসঙ্গে ঘোড়া টেপা হল। আমি গুড়ুম, গুড়ুম এবং হায়দার দড়াম শব্দে বন্দুকজোড়া কাঁপালাম। পেছনে থাকা ফলোয়াররা দৌড়ল শিকার কুড়োতে। আমরা ফিরলাম চড়াইপথে, ধীরে ধীরে। এখন গিয়ে এককাপ জম্পেশ চা খেয়ে তবে অন্য কথা।

পনেরোটি ওয়াইল্ড ফাউল কুড়িয়ে এনেছে ওরা চারজন। গুলির শব্দে বড়ভাইয়েরা গাত্রোত্থান করেছেন। ক্যাম্প টেবিল ঘিরে সবাই বসেছি। সামনে ধূমায়িত সোনালি চা। আহ্, চায়ে চুমুক দিয়ে হায়দার আরামে চোখ বুঁজল। মান্নান ভাই প্রস্তাব করলেন, ‘হায়দার, কংগ্র্যাচুলেশনজ। ওয়ালীকেও অভিনন্দন। আজ তুমি কম্প্যানিকে বড়াখানা দাও।’ ‘হ্যাঁ, এজুট্যান্টস গ্র্যান্ড লাঞ্চ,’ আমি সেকেন্ড করলাম হাত তুলে। হায়দারের চোখ খুশিতে হাসিতে কুঁচকে ছোট হয়ে গেল। ‘সো ইউ আন্ট ক্যারিং ইওর গ্র্যান্ড ট্রফিজ ব্যাক টু টাউন, আফটার অল!’ ‘পাগল নাকি’, বুলুভাই তার ভুবনভোলানো হাসিটি হেসে, আমার বিড়ি তৈরির এরিনমোর তামাকের কৌটোটা টেনে নিয়ে, পাইপ ঠাসতে লাগলেন।

হায়দারের মেহমানদারি অত্যন্ত খানদানি, মৌলিক ধরনের। ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মাথায় নাশ্‌তা টেবিলে এসে গেল। লাল আটার ফুল্কা, কাঁটা বিঁধলে হু-উ-শ করে গরম বাষ্প বেরিয়ে যায়। বনমোরগের ভুনা গোশ্‌ত। ঘন দুধের পায়সান্ন। সব চেটেপুটে খেলাম। অতঃপর চা খেয়ে অনতিদূরের ঝরনায় ঘটি ডুবিয়ে স্নান সেরে এসে তাঁবু অন্ধকার করে নিদ্রা যাওয়া হল। দুপুরে উঠে সৈনিকদের দাগানো কোর্টে ভলিবল খেলা হল। বুলুভাই এলেন না। দুই গাছের মাঝে ফিট করা এজুট্যান্টস হ্যামকে শুয়ে দুলতে লাগলেন। তিন অফিসারের সঙ্গে সৈনিকরা কয়েকজন জুটে টিম তৈরি হল। বল সার্ভ করার ফাঁকে ফাঁকে চারদিকে তাকিয়ে বুঝলাম, হেডকোয়ার্টার্স কম্প্যানিতে একটা সর্বজনীন পরবের আমেজ লেগেছে। লঙ্গরে পলান্ন, রোস্ট হরিণ, বনমোরগের চাট, ছোলার ডাল রান্না হচ্ছে। বেশ করে লাফালাফি হল, ঘাম ঝরল। অতএব, আরেকবার স্নান এবং তারপর অবধারিত প্রীতিভোজ। হায়দার প্রাক-ভোজ বক্তৃতা করার পর অতিথিদের প্রতিনিধি হিসেবে আমি দু’কথা বললাম। ভূরিভোজ শেষে মেজর মান্নান উঠে দাঁড়িয়ে ৬ষ্ঠ এঞ্জিনিয়ার্স ব্যাটালিয়নের সকলকে ধন্যবাদ জানালেন।

পরদিন ব্রেকফাস্ট শেষে সঙ্গে যথেষ্ট রসদপত্র নিয়ে আমরা চিটাগাংমুখো হলাম। ও, বলতে ভুলে গেছি, ক্যাপ্টেন খালেদ আগের দিন বিকেলে তার স্থানীয় গাইডের সঙ্গে যেন জঙ্গলে মিলিয়ে গিয়েছিলেন। শ্যামলা, অত্যন্ত মিষ্টি চেহারার যুবকটিকে ভোলা কঠিন। সে যাকগে। নদী পার হবার সময় মান্নান ভাই বলে উঠলেন, ‘তোমাদের কি আজ খিদে-টিদে সব হারিয়ে গেল? হায়দার এত খাবার প্যাক করে দিল। সব তো নষ্টই হল বোধহয় এতক্ষণে। দূর। এরচেয়ে ঐ পাহাড়িদের দোকানে হালুয়া রুটি খেলেও হত!’ বুলুভাই হেসে ফেলেন। অতঃপর আমাদের খাবার পরিবেশন করেন। নিজেও নিলেন। ফেরিমাস্টারকেও ভাগ দেয়া হল। ধূলিস্নাত হয়ে জিপিও-র দোতলায় পৌঁছে স্নান সারলাম। তারপর সবার সাজেশ্যনমাফিক সাপ্লিমেন্টারি দরকারের লিস্টি হাতে বিপনী বিতান থেকে কক্সবাজার ট্রিপের জন্য বাজার করে ফিরলাম। বুলুভাই জানালেন, আইকিউবাল অর্থাৎ ইকবাল একেএ ইকু আসছে ওর সার্সন রোডের আস্তানা থেকে। ওর টয়োটা কার আর বুলুর নতুন জীপ যাবে। ফোটন মামা আমাদের সবাইকে হুইস্কিমুখ করিয়েছেন ইতোমধ্যে। মন্টুদাকে দেখলাম। লম্বা চওড়া এক বিশাল পুরুষ। জনতা ব্যাঙ্কের জেনারেল ম্যানেজার। ঢাকা থেকেই যথেষ্ট পানীয় এবং চাট্ সঙ্গে এনেছেন। তাই বলে এত? একটু বিস্মিত হলেও পরে বুঝেছি, মন্টুদার একার খোরাকই স্তম্ভিত হওয়ার মতো!

সাতটায় বেরিয়ে পড়েছি আমরা। বুলুভাই, মন্টুদা আর ফোটন মামা জিপে চলেছেন। এবারে ডাক বিভাগের চালক স্টিয়ারিং-এ। কারণ বুলুভাই কক্সবাজার সার্কল পরিদর্শনেও যাচ্ছেন কিনা! আমি আর ইকবাল গাড়িতে। আমাকে স্টিয়ারিং ছেড়ে দিয়ে আইকিউ একনাগাড়ে বক্‌বক্ করে চলেছে। আমি আগে চলেছি যদিও, রিয়ারভিউ আয়নায় পেছনের গাড়ির সঙ্গে তাল মিলিয়ে একসিলারেটর থেকে পা তুলে আনছি প্রায়ই। কী যে আরাম পাচ্ছি ইকবালের নতুন গাড়ি চালিয়ে! প্রায় চোখ বুঁজেই চালানো যায় এগাড়ি, অনায়াসে। চিরিঙ্গা বাজারের আগে সামনে থেকে থাকা নানা যানবাহনের লম্বা সারির পেছনে থামলাম। পেছনে বুলুরাও। নেমে জানলাম, রাতে পাহাড়ে জোর বৃষ্টি হয়েছে। সেই পাগলা ঝোরা সকালে মহাসড়ক ভাসিয়ে পশ্চিমে নেমে যাচ্ছে। আরও কিছুক্ষণ পরে হয়তো এই আধ কিলোমিটার জলে ভাসা সড়ক পাড়ি দেয়া যাবে, অন্য চালকদের অনুমান। সন্টুটা ছুটি পেল না, আমি আফসোসের গলায় বললাম। নতুন চাকরি তো, বুলুভাই জানালেন, ‘ভাইদের ফার্ম, বোঝ তো, দায়বদ্ধতা একটু বেশি। এক্সপোর্টের কাজগুলো সন্টুই দেখছে।’ ‘ভালই তো, ওর একটা জটিল ব্যবসায়িক কাজ শেখা হচ্ছে ভালভাবে,’ আমি বলি, ‘পরে নিজে ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারবে ইচ্ছে হলে।’ ‘অবশ্য শীগগিরই তোমাকে আবার এই পথে যেতে হতে পারে,’ বুলু পাইপ ধরিয়ে বলে যায়, ‘সন্টু কোলকাতা থেকে সুন্দরী ইম্পোর্ট করে ওর বাউণ্ডুলেপনার ইতি টানছে অতি শীঘ্র এবং তখন তোমাকে সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে যাবে ওরা জোড়ে, কাল রাতে ফোনে জানাল।’ ‘ওরা যাবে মধুচন্দ্রিমা যাপনে, আবার আমাকে টানা কেন,’ আমি আপত্তি করি। কাবাব মে হাড্ডি হব শেষে?

সামনের গাড়িগুলো নড়েচড়ে উঠেছে। দীর্ঘদেহী কেন্নোর মতো দেখাচ্ছে। ইঞ্চি ছয়েক জল, তবে বেশ অনেকটা জুড়ে। সেকেন্ড গিয়ারে চালিয়ে পেরিয়ে গিয়ে আমরা রাস্তার ধারে দেখেশুনে কড়াইতে দুধ জ্বাল হচ্ছে এমন একটি দোকানের সামনে বেঞ্চিতে বসে কাচের গেলাসে চা পান করলাম। এবার ফোটন মামা আমাদের গাড়ির পেছনে উঠলেন। একটু বাদেই নাক ডাকতে শোনা গেল। এক চমৎকার, নিশ্চিন্ত, আড্ডাপ্রিয় মানুষ এই ফোটন মামা। আমাদের সঙ্গে কী সহজে তাল মিলিয়ে চলেন। আমরা মাঝে মাঝে ভুলে যাই ওর ব্যবহারে যে, উনি বুলুর আপন ছোট মামা–মায়ের প্রিয় ভাইটি। ইকবাল হিন্দি গান বাজাচ্ছে ওর পোর্টেবল ক্যাসেট প্লেয়ারে। আমি পকেট থেকে দেবব্রত বিশ্বাসের ক্যাসেট বের করে দিলাম। কোথায় পেলে? এ তো দেখছি এইচএমভি-র? ইকবাল প্রশ্ন ছুঁড়ে ক্যাসেট পালটাল। আমি মাঝে মাঝে আগরতলা যাই তো–ফিল্ম এনে গ্যারিসন হলে আমাদের দোস্ত তৌহিদকে দিই, ও শো করে আমাদের জন্য। বলতে বলতে আমি মোলায়েম ভাবে রাস্তার ধারে গাড়ি পার্ক করি। জলবিয়োগ করব। আইকিউ ফলো করে।

বেলা দু’টোর দিকে কক্সবাজারে পৌঁছে গেলাম। দুপুরের ফাঁকা হাই রোড। দোকানপাটের ঝাঁপ ফেলা। বর্মীদের দোকানগুলো বিকেলে খুলবে। সোজা নিরিবিলি রেস্তোরাঁর সামনে গিয়ে থামি। নেমে সাবান কিনে আনলাম। সবাই ভালভাবে হাতমুখ ধুয়ে একটা বড় টেবিল ঘিরে ফাঁকা-ফাঁকা হয়ে বসলাম। দু’জন বেয়ারা এসে গড়গড় করে স্থানীয় উপভাষায় প্রায় ৩০/৪০ পদের ভর্তা ভাজিভুনাঝোল ব্যঞ্জনের নাম বলে গেল। ওরি মাঝে বোধগম্য দু’চারপদের নাম আমরা উচ্চারণ করলাম রিজয়েন্ডার হিসেবে, এপ্রিশিয়েইশ্যন হিসেবে। টেবিল ভরে গেল পাঁচ মিনিটে। লেবু নুনে প্লেট মেজে ফুটনো জল ঢেলে থালা ধুয়ে নিলাম। তরিবত করেই লাঞ্চ সারা হল। আইকিউ এবারে অনেকদিন বাদে লিবিয়া থেকে ফিরেছে। ওখানে ওদের ফার্ম জিওকন কীসব ম্যামথ নির্মাণে মত্ত নাকি! ও খুব উপভোগ করছে নিরিবিলি-র এক্কেবারে দিশি আতিথেয়তা, বুঝতে পারছিলাম। খাওয়া শেষে মৌরি মিছরি চিবিয়ে চুষে, বিল মিটিয়ে, আমরা পোস্ট অফিসের বিশ্রামাগারে ঠাঁই নিলাম। ওপরে নিচে চারটে বড় ঘর, মাঝে লাউঞ্জ, ডাইনিং-এর ব্যবস্থা। রান্নাবাড়ি নিচে। আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে জায়গা করে নিলাম।

আইকিউ আর আমি পোশাক বদলে গাড়ি চালিয়ে ডানে পর্যটনের নতুন স্থাপনা সুইমিং পুল, সাগরিকা তিনতারা মোটেল, সাগরিকা বার-কাম-রেস্তোরাঁ, বাঁয়ে মোটেল উপল, তারপর ডানে ঘুরতে মোটেল প্রবাল পেরিয়ে ইট বাঁধানো পথ ধরে একেবারে অর্ধচন্দ্রাকার মোটেল লাবণী-র সামনে গাড়ি পার্ক করলাম। নেমে গেলাম জলে। গা ভিজিয়ে উঠে এসে রোদে আধশোয়া হয়ে মন্টুদার চৈনিক বিয়রের সবুজ কাচের আধারে চুমুক দিলাম। খানিকক্ষণ ঝাঁপাঝাঁপি হল। শরীর হাল্কা করে ওপরে এসে সৈকতে গড়াগড়ি করে শর্টস শুকিয়ে নিলাম। সোনাঝরা বিকেলে আমাদের পোস্টাপিসের হেইভন-এ ফিরে এলাম। পথে নেমে আইকিউ হাকশোবাজারের বিখ্যাত ঢাউস আকারের গরুর ভুঁড়ির পুর দেয়া সামোসা আর তেঁতুলের চাট্‌নি নিয়ে নিল।

নিচে বাবুর্চিকে শুধিয়ে জানা গেল, সাহেবরা ঘুমোচ্ছেন। আমি চা করলাম, কাপে কাপে ঢেলে ট্রে সাজালাম। সামোসা আর চাটনিসহ চায়ের ট্রে আইকিউ ব্যালান্সের খেল দেখাতে দেখাতে ওপরে নিয়ে চলল। আমি আর বাবুর্চি পানির জগ আর গেলাস নিয়ে অনুসরণ করলাম। ‘স্যরেরা গা তুলুন প্লিজ। চা জলখাবার জুড়িয়ে যায় যে!’ আমি ডেকে তুললাম মন্টু, বুলু আর মামাকে। টেবিলে এসে সবাই খুশি। কিং সাইজের সামোসা ভেঙে ঐ অপূর্ব চাটগেঁয়ে গরুর অন্ত্রভাজার পুর জিভে ছুঁইয়ে বুলুর তো চোখ বুঁজে গেল সোয়াদের ঘনত্বে। ‘বাহ্, কোথায় পেলে এ জিনিস, ক্যাপ্টেন?’ ‘আরে ক্যাপ্টেনের নজর কি রাস্তার ধারে পৌঁছয়? আনাচে-কানাচে? এটা এই আইকিউর ফাইন্ড!’ ইকবাল টিশার্টের কলার উচিয়ে জানিয়ে দিল।

চা-টা খেয়ে পঞ্চপাণ্ডব বেরিয়ে পড়লাম সান্ধ্যভ্রমণে। ওহ্, সে এক ভ্রমণ বটে! মনে হচ্ছিল, কুমড়ো গড়ান গড়াচ্ছি ক’জনা। উপায় কী? ফোটন মামা, মন্টুদা, বুলুভাই তিনজনেই নাদুস ভুঁড়িয়াল। আমি আর আইকিউ দ্বিতীয় সারিতে হাঁটি, দাঁড়াই, আবার ওদের ধরে ফেলি–এই করে সৈকতে পৌঁছলাম। তখন বিচে একালের মতো সম্বৎসর মেলার ভিড় লেগে থাকত না। ঝাউয়ের সারির সামনে বালুতে জেবড়ে বসে পড়লাম সবাই। মন্টুদা বাদামওলাকে ডেকে ওর সব বাদাম কিনে নিয়ে টাকা দিয়ে বললেন, তুমি বাড়ি যাবার আগে তোমার কাঠা নিয়ে যেও, কেমন? ছেলেটি খুশি হয়ে লাফাতে লাফাতে ওর বন্ধুদের সঙ্গে গল্পগাছা করতে চলে গেল।

‘এত বাদাম কে খাবে, মন্টুদা?’ বুলুভাই নিরাসক্ত গলায় প্রশ্ন করলেন। ‘আমি, দেখব’খন, ফেরত গিয়ে যখন ঢুকুঢুকুর সঙ্গে আমি এই টাটকা বাদামবাজা লবণ, লেবুর রস আর কাচালঙ্কা দিয়ে চাখবো, তখন তুমি কী কর।’ মন্টুদা এই কথা বলে বাদাম ভেঙে ভেঙে ছেলেটির কাঠার ভেতরে রাখা কাগজের ঠোঙায় গুছিয়ে রাখতে লাগলেন। আমরা সবাই এন্টারপ্রাইজিং বনে গিয়ে বাদাম ভাঙা, ঠোঙায় পোরার কাজে ব্রতী হলাম আর পশ্চিমে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম, কখন টুপ্ করে সূয্যিমামা অস্তে গেলেন। আমরাও ডাক বিভাগের বিশ্রামাগারে রুখসত করলাম।

সেবারে কুমিল্লা ফিরে ঢাকা যাবার বরাত পেলাম। ম্যালেরিয়া দূরীকরণ কর্মসূচির একটি সিভিল জিপ, ড্রাইভার এবং নগদ টাকা নিয়ে স্টেশন পাঠাগারের জন্য নতুন বই কিনতে ঢাকা যাওয়া ঘটল। সকাল বিকেল নিউমার্কেটের দোকানে দোকানে ঘুরে, দেখেশুনে বই কেনা আর ফাঁকে ফাঁকে শরীফ মিয়া, মোনিকো আর রমনা রেস্তোরাঁয় আড্ডা জমানো। মিটু তখন ঢাকায় নেই, ডানকানের লালচান চা বাগানে ম্যানেজারি করছে। আর বাকিরা মোটামুটি রমনার আড্ডায় নিয়মিত আসছে। সিরাজি, শাজাহান ভাই, শফিক ভাই–সবাই দিনের কাজ শেষে সন্ধের আড্ডায় মিলিত হয়। ফার্মগেটে নতুন সিনেমা হল ‘আনন্দ’ চালু হয়েছে। অনেকদিন সিনেমা দেখার সুযোগ হয় না। শাজাহান কবীর আর আমি একদিন ম্যাটিনে শোয়ে ওখানে ঢুকে পড়লাম বহুপঠিত মাসুদ রানা থ্রিলারের মুভিফর্ম প্রত্যক্ষ করতে। আজমের খালাত ভাই সোহেল রানা নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

দিনসাতেক পর জিপের পেছনে কেনা বইয়ের কার্টন তোলার পর খালি জায়গা যেটুকু ছিল, সেটা ভরাট করার ইরাদা নিয়ে এশিয়া ফাউন্ডেশ্যনের লাইব্রেরিতে গিয়ে উঠলাম। শাজাহান ভাই উদারভাবে প্রকাণ্ড বইঘরের ক’টি শেল্‌ফ দেখিয়ে দিয়ে বললেন, যে টাইটেল পছন্দ হবে, তার দু’টি করে নিতে পারবে। এক কপি কুমিল্লা স্টেশন পাঠাগারের জন্য, অন্যটি তোমার নিজের সংগ্রহে রাখবে। নর্টনের অ্যান্থলজি অব ওয়র্ল্ড লিটারেটার টাইপের মূল্যবান সব সংগ্রহ আর অ্যামেরিকান সাহিত্যের প্রতিভূ যারা– হোমিংওয়ে, ফকনার, মেলভিল, স্টাইনবেক ইত্যাদি গদ্যকার ও কবিদের রচনা সংগ্রহে সাধ মিটিয়ে গাড়ির ফাঁকা জায়গা ভরাট করা হল। শাজাহান ভাইকে জিপে তুলে নিয়ে মিং হাউসে বসে পেটভরে চৈনিক খাদ্য সেবা করে ঢাকা থেকে বিদায় নিলাম।

ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের এমটি পার্কে অর্থাৎ মেক্যানিক্যাল ট্র্যান্সপোর্ট রাখবার আঙিনায় ‘৭১ পূর্ববর্তীকালের একটি সুবারু ৬০০ সিসি মিনিভ্যান ‘পরিত্যক্ত’ অবস্থায় ছিল। এমটি সুবেদারের সহায়তায় ওটির প্রয়োজনীয় সারাই করিয়ে চলার উপযোগী করা হল। তারপর একদিন ওটাকে নিয়ে সিলেট সড়কে টেস্ট ড্রাইভে বেরিয়ে লে. রিয়াজ আর আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসার সময় ব্রেক বিপর্যয় ঘটায় এক উঁচু ট্রাকের নিচে ঢুকে গেলাম। সামনের কাচ ভেঙে আমাদের হাতটাত কাটল। ট্রাক থামার পর আমরা বেরিয়ে এসে ট্রাকারের ক্যাবিনে উঠে আমাদের কুমিল্লা সেনানিবাসে পৌঁছে দিতে বল্লাম। সুবারু মিনিভ্যান আবার অফিসের এমটি পার্কের ‘অ্যাবানড্যন্ড ভিইক্যাল’ কর্নারে ঠাঁই পেল।

এসে গেল আমার চিটাগাংয়ে বদলির আদেশ এবং বিএমএ ১ম কোর্সের পাসিং আউট উৎসব। আজকের বঙ্গোপসাগর তীরে বিএমএ ও নিয়মিত কোর্সের সমাপনী উৎসব যে ধরাবাঁধা জৌলুস আর কেতায় পালিত হয়, তা দেখে কেউ ধারণা করতে পারবেন না, এই অ্যাকাডেমির হাঁটি হাঁটি পা পা অবস্থায় কুমিল্লা সেনানিবাসের স্বল্প পরিসরে আমরা ৩৬ বছর আগে প্রথম পাসিং আউট প্যারেডটি কত ধরনের সীমাবদ্ধতার মাঝে সংগঠিত করতে পেরেছিলাম। প্রথম ব্যাচের জেন্টলম্যান ক্যাডেটদের সৌভাগ্য বলতে হবে, তাদের আবাসিক ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার যেটুকু খামতি ছিল বলে মনে করা যায়, তার অনেকখানি পূরণ করে দিয়েছিলেন তখনকার ডিএস অর্থাৎ ডিরেকটিং স্টাফ ও প্রশিক্ষকবৃন্দ তাঁদের সম্মিলিত প্রয়াস, যত্ন, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রতিজ্ঞা আর নিষ্ঠার সঙ্গে কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়ে। আজকের মিনাবাজারসহ বহু প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার কর্নেল শাহেদ, প্রাণ গ্রুপের প্রাণসঞ্চালক জেনারেল আমজাদ, প্রয়াত জেনারেল মান্নাফ, কর্নেল মুজিব, কর্নেল সফিউল্লাহ, জেনারেল আনোয়ার, কর্নেল মাহবুব, জেনারেল ইমাম, কর্নেল এমদাদ, ব্রিগেডিয়ার কায়সার–সর্বোপরি তৎকালীন ফর্মেশন কমান্ডার প্রয়াত ব্রিগেডিয়ার মশহুরুল হক–আরো অনেকের কথাই আজ মনে পড়ে।

বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও কর্ণধার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বিএমএ-র প্রথম ব্যাচের পাসিং আউট প্যারেডে সালাম গ্রহণ করেন। সে রাতে ময়নামতি অফিসার্স ক্লাব ও ১৩ বেঙ্গল মেসে গালা ডিনারে অতিথি বেশুমার। ফর্মেশন কমান্ডার আনুষ্ঠানিক পোশাক পরে অর্ধেক শরীর ঝুঁকিয়ে প্রপার বাউ করে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানালেন। মিলিটারি ব্যান্ড এসেছে ঢাকা থেকে। সে এক এলাহি কাণ্ড। অফিসারবৃন্দ সবাই হাসিমুখ, আনন্দে উচ্ছল। তাদের পরিবার ও অভ্যগতজন নির্বিশেষে আনন্দে মেতেছেন। অতবড় পার্টি ময়নামতি ক্লাব আগে কখনো বোধহয় দেখেনি। ওয়েটাররা অতিথিদের হুকুম সার্ভ করতে হিমশিম্ খাচ্ছে। বার মেম্বার ক্যাপ্টেন সাইদ চরকি নাচন নাচছে। ভোররাতে আমরা ক’জন ক্লান্তপদে টাইয়ের নট ঢিলে করে ‘আমার সোনার বাংলা’ গাইতে গাইতে চিটাগাং রোডের স্টেশন অফিসার্স মেসে ঘুমোতে গিয়েছিলাম। পরদিন বিশেষ ছুটি। বঙ্গবন্ধুর উপহার।

তিন বছরে কুমিল্লায় কত ঘাটে যে নৌকো বেঁধে ঘুরেছি, সেকথা মনে করে ঘাটে ঘাটে ঘুরে বিদায় নিচ্ছিলাম। মন খারাপ। বন্ধুদেরও। শচীন, সাইদ, জুলফিকার–ওদের সঙ্গে এক বিকেলে শালবন বিহারে যাওয়া হল। চাঁদের আলোয় শালবনে চড়ুইভাতি। হাওয়া বন্দুক নিয়ে আমি আর শচীন জীপ চালিয়ে বিডিআর ক্যাম্প পেরিয়ে লালমাই পাহাড়ের ওপরে চলে গেলাম। ভাগ্য জবরদস্ত। ছ’টি খরগোশ হাতে ঝুলিয়ে ফিরতে সবাই হুররে ধ্বনি দিয়ে আমাদের হাতে হাতে কারণ বারির পাত্র ধরিয়ে দিল। চাঁদ উঠেছে, ফুল ফুটেছে। শাল্মলী তরুতটে আমরা ক’জনা দামাল ঘরছাড়া হুল্লোড়ে মত্ত। চাঁদ হেলে পড়লে যার যার ডেরায় ফিরেছিলাম।

শহরে পাখীদের বাড়ি, জনাদা-রাখি বউদির আড্ডা আর খালাম্মা-বেটসিদের ওখানে এক এক বিকেলে বিদায় নিতে গেলাম। এরোমাদের বাড়িতে মাসিমার হাতের শুক্তো, সর্ষে ইলিশ আর চিতলের মুঠিয়া কোপ্তার কারি সহযোগে একরাতে গ্র্যান্ড বাঙাল ডিনার হল। পরদিন দুপুরের ট্রেইনে চট্টগ্রাম যাত্রা।

আর্টস-এ প্রকাশিত লেখা

গর্কি: ১২ নভেম্বর ১৯৭০
রৌরববাস, ২৫ মার্চ ১৯৭১
উলানিয়া উপাখ্যান: ডিসেম্বর ১৯৭০
শিমূলের বিজয়োৎসব
পদ্মাপারের কড়চা
পুজোয় শিলং: অক্টোবর ২০০৪
পুরনো সেই ঢাকার কথা
বকুলের নাইওর
বর্ষায়, বাদাবনে
দুলছে লণ্ঠন
বার্বিকিউ, কুয়াকাটা সৈকতে
খাগড়াছড়ির ‘সিস্টেম হোটেল’
পদ্মার চরে, ঘুড়ি উৎসবে
সন্টু-কাবেরির মধুচন্দ্রিমা ও বাঘের দুধ
গুলশানের কচুর শাক
ফেরা হয় না
এল ডোর‌্যাডো সেরাফিনো!


লেখকের আর্টস প্রোফাইল: মীর ওয়ালীউজ্জামান
ইমেইল: m.waliuzzaman@gmail.com

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters

প্রতিক্রিয়া (1) »

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।