নারীর ক্ষমতায়ণ: রোকেয়ার স্বপ্ন

বেবী মওদুদ | ৯ december ২০১১ ১১:১১ অপরাহ্ন

br_1234.jpg
মিসেস্‌ আর, এস্‌, হোসেন (১৮৮০-৯.১২.১৯৩০)

যুগে যুগে বাঙালির ইতিহাসে এমন সব মনীষীদের আগমন ঘটেছে যাঁরা সমাজ ও মানুষের কল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে তাদের কথা ও কাজের মধ্য দিয়ে উজ্জীবিত করেছেন। বিশেষ করে সংস্কারকের ভূমিকায় দায়িত্বশীল নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। মহিয়সী রোকেয়া এমনই ব্যক্তিত্ব যিনি তার সময়ের চেয়ে একশ অথবা দুইশ বছর এগিয়ে ছিলেন। তার ছিল আধুনিক, উদার ও বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি। আর এসব কারণে বাংলার অসহায় নারী জাগরণে মহিয়সী রোকেয়ার ক্ষুরধার লেখনীর যথেষ্ট অবদান রয়েছে বলে গবেষকরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।

একশ বছর পূর্বে তিনি তাঁর লেখায় নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা প্রসঙ্গে যেসব কথা বলেছেন তা বর্তমানে গভীরভাবে উপলব্ধি করা হচ্ছে শুধু নয়, নারী তার মেধা, দক্ষতা ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছে। আজ বিশ্বের সর্বত্র আমরা নারীর ক্ষমতায়ণের কথা শুনছি, দাবিও উঠছে।

নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার জন্য জাতিসঙ্ঘ সনদ প্রণীত হয়েছে, দেশে দেশে নারী উন্নয়নের নীতিমালা রয়েছে। এসব কথা আমরা রোকেয়ার রচনার মধ্যে খুঁজে পাই। রোকেয়া তার জীবনব্যাপী সাধনা দিয়ে নারীর অধিকারের প্রশ্নটি তুলেছেন সমাজের কাছে। আর পুরুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন তারা কীভাবে নারীকে বঞ্চিত, অবহেলিত ও শোষিত করে তাদের অধীনে বন্দি করে রেখেছে যেখানে স্বাধীনতা বলতে কিছুই ছিল না। নারীর ওপর পুরুষ যেন প্রভূত্বের স্থান দখল করে রেখেছে। নারীকে মানুষ নয়, পুরুষ তার অধীনস্থ ক্রীতদাসী হিসেবে বিবেচনা করতো। নারীর জীবন ছিল পশুরও অধম। পুরুষের মধ্যেও সেকালে তিনি এক নব জাগরণ ঘটিয়েছেন। আমাদের স্বীকার করতে হবে পুরুষ জেগেছিল বলেই তাদের কন্যারা পরবর্তীকালে শিক্ষার সুযোগ পায়–রোকেয়ার সার্থকতা এখানেই।

রোকেয়ার পূর্বে নারীর অবস্থা কেমন ছিল আমরা ইতিহাসের পাতা খুললেই তার যথেষ্ট প্রমাণ পাই। আমরা দেখতে পাই কন্যা সন্তানের জন্ম হলে কেউ সন্তুষ্ট হতো না। পুত্র সন্তানের জন্ম সৌভাগ্য মনে করা হতো। কন্যার অভিভাবক শৈশবে পিতা, তারপর বিয়ে হলে স্বামী এবং বার্ধক্যে পুত্র হয়েছে। নারী নিজে অভিভাবক ছিল না সন্তানদের। কন্যাকে শিক্ষা দেয়া হতো শুধুমাত্র ধর্ম, সেলাই, রান্না, ইত্যাদি গার্হস্থ কর্মকাণ্ড। এ শিক্ষায় যে যত পারদর্শী হতো তারই প্রশংসা হতো। নারীর জীবন ছিল স্বামীর মনোরঞ্জন, তার সেবাযত্ন, সন্তান গর্ভে ধারণ, জন্মদান ও লালন পালন। সংসারে তার কোনো মতামত ছিল না, অধিকারও ছিল না। ফলে পরিবারেও তার কোনো সম্মান ছিল না। আর সমাজে তার চলাফেরাও ছিল না তাকে অবরোধের বেড়াজালে শৃঙ্খলিত রাখা হতো। অবশ্য যাতায়ত করলে বোরখা পরিয়ে নেওয়া হতো–ফলে পৃথিবীর শব্দ-গন্ধ নেবার সুযোগ ছিল না। পুরুষ যখন বিশ্ব সভ্যতায় মেধার বিকাশ ঘটাচ্ছে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে নারী তখন রান্নাঘরে–সেলাই কর্মে ব্যস্ত। সমাজের নিম্নস্তরের নারীর অবস্থা ছিল আরও দূঃসহ মানবেতর।

নারীর অসহায়ত্ব ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পুরুষ তাকে সামগ্রী করেছে এবং পণ্য হিসাবে শরীর বিক্রির জন্য পতিতালয় গড়ে তুলেছে। দরিদ্র বিধবা ও স্বামী পরিত্যাক্তা মেয়েদের পতিতাবৃত্তিও করতে বাধ্য করেছে পুরুষই, যদিও লাভবান হয়েছে পুরুষ। আর নারী স্বাস্থ্যহীন হয়ে নিঃশেষ হয়েছে। নারীর প্রতি পুরুষ কখনও মানবিক দৃষ্টি নিয়ে তাকায়নি। নারীকে মানুষ বলে গন্যমান্য করেনি। নারীর মেধা-মনন-শ্রম শক্তিকে মূল্যায়ন করে নিজেদের সমকক্ষ ভাবতে চায়নি। নারীকে অস্বীকার করে এসেছে পারিবারিক-সামাজিক-রাজনৈতিক আচার-বিচার, ভালো-মন্দ-উন্নয়ন এবং চিন্তা ভাবনায়।

নারী তাদের কাছে শুধু মাত্র ভোগ ও সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। নারী শিক্ষার্জন করলে বিয়ে হবে না, বিয়ে হলেও সন্তান জন্ম দিতে পারবে না, আবার জন্ম দিলেও তার বুকে দুধ হবে না এ ধরনের নানা অপপ্রচার চালাত শিক্ষিত সমাজ। পত্রিকায় এসব নিয়ে তারা তীব্র আক্রমণাত্মক প্রবন্ধও লিখতো। মেয়েরা শিক্ষার্জন করে কর্মজীবী হবে এটা তারা মেনে নিতে পারে নি। তাদের ভাষায় মেয়েদের একমাত্র পেশা পতিতাবৃত্তি হিসেবে স্বীকৃত পেয়েছিল।


বেগম রোকেয়া মেমোরিয়াল সেন্টারে রোকেয়ার প্রতিকৃতি, পায়রাবন্দ, রংপুর। ছবি: উইকিপিডিয়া

আমরা দেখেছি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিম সমাজও নারী শিক্ষার ঘোর বিরোধিতাকারী ছিল। নারী ঘরের বাইরে এলে এবং পরপুরুষের দৃষ্টিতে পড়লে সমাজ উচ্ছন্নে যাবে। রাজা রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টায় ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার আইন পাশ হয় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিগত আন্দোলনে ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন প্রবর্তিত হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারীদের ভাগ্যোন্নয়নে এটা একটা মাইলফলক। নিষ্ঠুর বহুবিবাহ বন্ধ হয়। তাঁরা নারীশিক্ষার জন্য আন্দোলন করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতেই আমরা দেখতে পাই ব্রাহ্মসমাজের দ্বারা মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা হচ্ছে এবং শিক্ষাগ্রহণে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বৃটিশ শাসকরাও স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। মুসলিম ধর্মাবলম্বী মেয়েরা তখনও ঘোর অন্ধকারে।

অবরোধ প্রথা ও বোরখায় বন্দি মেয়েরা এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ভুবনের বাসিন্দা ছিল। সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েরা কখনও ঘরের বাইরে যাবার অধিকার পেত না। একমাত্র ধর্ম ও গার্হস্থ্য শিক্ষা গ্রহণে এবং সন্তান পালনে বাধ্য করা হতো। ধর্মের নামে মিথ্যা ফতোয়া, কুসংস্কার এবং নারী বিরোধী প্রচার ছাড়া পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যেন আর কিছু জানতো না। বৃটিশরা ভারত শাসন শুরু করলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শিক্ষা, চাকুরি ও ব্যবসায় দ্রুত ভাগ্যোন্নয়ন করে তোলে, কিন্তু মুসলিম সমাজের ঘুম ভাঙে অনেক দেরিতে। তারা ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণকে পাপ মনে করতো।

দুই.
উনবিংশ শতাব্দির এই অবস্থানে রোকেয়ার জন্ম হয় রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে। ধর্মান্ধ জমিদার পিতার বিলাসিতা ও অদূরদর্শিতার কারণে পারিবারিক অবস্থা শোচনীয়। বড়বোন ও বড় দু’ভাইয়ের সহেযাগীতায় রোকেয়া হৃদয়ে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বলে ওঠে। রোকেয়া শৈশব থেকেই ধর্মান্ধ পিতার কঠোর অবরোধের বেড়াজালে লালিত পালিত হলেও অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের সাধনা দ্বারা নিজেকে তিনি গড়ে তোলেন এক আধুনিক চিন্তা চেতনায়। তার মধ্যে মননের যে চর্চা ছিল, জ্ঞানের যে সীমাহীন আগ্রহ ছিল, সেটা তার সারাজীবনের কর্মকানণ্ড ও রচনাবলী পাঠ করলে উপলব্ধি করা যায়।

রোকেয়ার পারিবারিক ভাষা ছিল উর্দু। শৈশবে তোতা পাখির ধর্মশিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে বাংলা ও ইংরেজি অক্ষর শিখে তার জ্ঞানের প্রসার ঘটান। তিনি আরবী, উর্দু ও সংস্কৃতি ভাষায়ও জ্ঞান লাভ করেন। এসব ভাষার বই ও পত্র-পত্রিকাও নিয়মিত পড়তেন। তবে তার সাহিত্য চর্চা ছিল বাংলা ও ইংরেজি ভাষায়। আঠারো বছর বয়সে রোকেয়ার বিয়ে হয় বিহারের অধিবাসী চল্লিমোর্ধ বিপত্নীক ম্যাজিস্ট্রেট সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। বিয়ের পর তিনি রোকেয়ার শিক্ষা ও সাহিত্য সাধনায় সহযোগিতা করেন। রোকেয়ার লেখনীর উদ্দেশ্য ছিল সমাজ সংস্কার। বাঙালি মুসলমান সমাজের পিছিয়ে পড়ার কারণগুলি তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের এই ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের কারণে নারীর অবস্থান হয়ে উঠেছিল অসহনীয় ও মানবেতর।

রোকেয়ার ভাবশিষ্য শামসুন্নাহার মাহমুদ লিখেছেন, “রোকেয়া যেখানে গিয়াছেন সর্বত্রই তাহার চোখের সম্মুখে তীব্রভাবে জাগিয়াছে নারীর পরাধীনতার বীভৎস রূপ। অশিক্ষা ও কুশিক্ষা যেন ভীষণ ব্যাধির মত আগাগোড়া ছাইয়া ফেলিয়াছে–বড় নিষ্করুণ, বড় মমতাহীন সে কাল ব্যাধির আক্রমণ।” (রোকেয়া জীবনী, পৃ. ২৭)

রোকেয়ার নারীর অধিকার নিয়ে তীব্র আক্রমনাত্মক রচনাগুলি যখন একের পর এক পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে, তখন মুসলিম সামাজের ঘুম না ভেঙে পারেনি। তবে রোকেয়ার বিরোধীতাকারীর সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য।

বিংশ শতাব্দীর শুরুটা ছিল বিশ্ব সভ্যতার নব জাগরণ। বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার, শিক্ষা ও জ্ঞানের চর্চার শ্রেষ্ঠ সময়। বাংলার মাটিতেও সে জাগরণের ঢেউ এসে লেগেছিল। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সর্বক্ষেত্রে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং তার ক্ষতে দীর্ঘদিন ভূগতে হয়েছে আমাদের। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনও শুরু হয়েছে। মুসলিম সমাজ সে জাগরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারেনি। তাদের মধ্যেও স্বত্ত্বার বিকাশ ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম শুরু হয়। শিক্ষার্জন ও কর্মসংস্থানের জন্য তারাও এগিয়ে আসে।

১৯১০ সালে কলকাতায় সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠা করে রোকেয়া নারীশিক্ষার বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি করেন। একশ বছর পূর্বে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ণের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন আজ একশ বছর পরে এসে আমরা তার সাফল্য দেখতে পাই। পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থায় নারীর অসহায়, বেদনাদায়ক বিবর্ণ চিত্রটি রোকেয়া খুব স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তার লেখার মাধ্যমে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন। সাথে সাথে নারীকেও মেরুদণ্ড সোজা করে উঠে দাঁড়াতে আহ্বান জানিয়েছেন।

গবেষক সুফী মোতাহার হোসেন রোকেয়া বিশ্লেষণে বলেছেন, “আমাদের সমাজে ‘স্বামী’ শব্দটি প্রকৃত তাৎপর্য হারিয়ে প্রভু অর্থে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিবাহিত পুরুষের এরূপ মনোভঙ্গী যেন তার বিবাহিতা স্ত্রীর প্রভু। রমণীর ওপর পুরুষের সকল প্রকার প্রভূত্বের বিরোধী ছিলেন বেগম রোকেয়া। তাঁর মতে স্ত্রীও মানুষ, মানুষ হিসেবে তার অধিকার সমান। স্বামী স্ত্রীর প্রভু নয় কিংবা স্ত্রীও স্বামীর দাসী নয়। স্বামীর ওপর স্ত্রীর এবং স্ত্রীর ওপর স্বামীর সমান অধিকার–এটা ইসলামেরও বিধান।” (বেগম রোকেয়া জীবন ও সাহিত্য, পৃ. ৯৩)

অনেকের কাছে প্রশ্ন উঠেছিল রোকেয়া কি তবে পুরুষবিদ্বেষী ছিলেন? বিশেষ করে তার সুলতানার স্বপ্ন রচনাটি পড়লে এ বিশ্বাস জন্মে। লেখাটি প্রথমে ইংরেজি ভাষায় রচনা করে তিনি স্বামীকে পড়তে দেন। স্বামী সাখাওয়াৎ হোসেন পড়ে মুগ্ধ হয়ে বলেন, ‘এটা একটা ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ।’ তিনি তার বন্ধু-বান্ধবদের পড়তে দিলে তারাও লেখিকার কল্পনাশক্তির প্রশংসা করেন।

সুলতানার স্বপ্ন রচনাটি রোকেয়ার স্বপ্ন বা কল্পনাশক্তির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। তিনি নারীকে নানাভাবে বিচিত্ররূপে দেখতে চেয়েছেন। তার স্বপ্ন ছিল নারীর ক্ষমতায়ণ যে কথাটি আমরা এই একুশ শতকে এসে উচ্চারণ করছি। আমাদের পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে নারীর ক্ষমতায়ণ ঘটছে। বিশ্বব্যাপী সব দেশে দেশেই নারীর ক্ষমতায়ণ আজ উন্নয়ন ও প্রগতির অন্যতম ধারা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রোকেয়ার পদ্মরাগ উপন্যাস এবং অন্যান্য রচনায় আমরা এর পূর্বাভাস খুঁজে পাই।

একশ বছর পূর্বে সুলতানার স্বপ্ন লিখতে বসে রোকেয়ার সুদূরপ্রসারী চিন্তার প্রকাশ দেখতে পান তাঁর জীবনীকার শামসুন্নাহার মাহমুদ “বাস্তবিকই ‘সুলতানার স্বপ্নে’ তিনি এক অতি উচ্চ আদর্শের অবতারণা করিয়েছেন। তিনি স্বপ্নে দেখিয়াছেন এক অপূর্ব, ‘অদ্ভুত নারী রাজত্ব। পুরুষ সেখানে পর্দার আড়ালে গৃহকোণে আবদ্ধ। আর নারীরা এক অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রকৃতিকে বশীভূত করিয়া আশ্চর্য্য শৃঙ্খলার সহিত সমস্ত কাজ চালাইতেছেন। দুনিয়ার যত পাপতাপ, যুদ্ধ বিগ্রহ সবকিছুর জন্য তিনি দায়ী করিয়াছেন পুরুষকে। অবরোধরুদ্ধ, সেখানে দুঃখ কষ্ট, অশান্তির লেশমাত্র অবশিষ্ট নাই। সেখানে চারিদিকে খালি শান্তি আর শান্তি। তাঁহার এই স্বপ্ন সফল হইতে হয়ত বহুদিন লাগিবে। হয়ত বা এই স্বপ্ন স্বপ্নই থাকিয়া যাইবে। কিন্তু তাহার এই একটি মাত্র স্বপ্ন হইতেই মানুষ বহুকাল পরেও এক নিমেষেই বুঝিতে পারিবে, তাঁহার নারীত্বের আদর্শ কত উচ্চ ছিল–নারীর শক্তিতে, তাহার বিশ্বাস কত পর্বত প্রমাণ ছিল।“ (রোকেয়া জীবনী, পৃষ্ঠা. ৮০)

তিন.
রোকেয়ার রচনার কিছু কথা এখানে উল্লেখ করছি–

১. পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব। যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে আমরা লেডি কেরানী হইতে আরম্ভ করিয়া লেডী ম্যাজিস্ট্রেট, লেডী ব্যারিস্টার, লেডী জজ সবই হইব। পঞ্চাশ বৎসর পরে লেডী viceroy হইয়া এদেশের সমস্ত নারীকে রাণী করিয়া ফেলিব।

২. উপার্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত নাই, না পা নাই, না বুদ্ধি নাই? কি নাই? যে পরিশ্রম আমরা স্বামীর গৃহকার্যে ব্যয় করি সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসা করিতে পারিব না?

৩. ধর্মই আমাদের দাসত্ব বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে, ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ রমণীর উপর প্রভুত্ব করিতেছেন।

৪. যৎকালে সমগ্র জগতের নারী জাতি জাগিয়া উঠিয়াছে, তাহারা নানাবিধ সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিয়াছে–তাহারা শিক্ষামন্ত্রী হইয়াছে, তাহারা ডাক্তার, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, যুদ্ধমন্ত্রী, প্রধান সেনাধ্যক্ষা, লেখিকা, কবি ইত্যাদি হইতেছে–আমরা বঙ্গনারী গৃহকারাগারে অন্ধকার স্যাঁতসেতে মেঝেতে পড়িয়া অঘোরে ঘুমাইতেছি আর যক্ষ্মা রোগে ভুগিয়া হাজারে হাজারে মরিতেছি।

৫. ধর্মগ্রন্থগুলো পুরুষ রচিত বিধি ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নয়। নারী যদি ধর্মগ্রন্থ রচনা করতো তাহলে রূপ হয়ত ভিন্ন হতো।

৬. তুই জীবন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হ! মুষ্টিমেয় অন্নের জন্য যাহাতে তোকে কোনও দুরাচার পুরুষের গলগ্রহ না হইতে হয় আমি তোকে সেইরূপ শিক্ষা-দীক্ষা দিয়া প্রস্তুত করিব। তোকে বাল্য-বিধবা কিংবা চিরকুমারীর ন্যায় জীবনযাপন করিতে হইবে; তুই সেজন্য আপন পায়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়া!

৭. আমি সমাজকে দেখাইতে চাই, একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারীজন্মের চরম লক্ষ্য নহে; সংসারধর্মই জীবনের সারধর্ম নহে।

৮. কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিতা করিয়া কার্য ক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও–নিজের অন্নবস্ত্র উপার্জন করুক।

৯. এস যত পরিত্যক্ত কাঙালিনী অসহায়া লাঞ্ছিতা সকলে এস তারপর সমাজের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ ঘোষণা।

রোকেয়ার মনন চর্চায় নারী ছিল একমাত্র অবলম্বন। তার একমাত্র ধ্যান ছিল নারীর বিকাশ, প্রতিভার প্রকাশ, শ্রম-শক্তির অবদান তিনি দেখতে চেয়েছেন সর্বত্র। আর সেজন্য নারীকে পুরুষের সমকক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তিনি নারীকে পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে অধিষ্ঠিত হতে দেখতে চেয়েছেন। সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সর্বক্ষেত্রে নারীর পদচারণ চেয়েছেন।

রোকেয়ার স্বপ্ন ছিল নারীর ক্ষমতায়ণ এবং একমাত্র ক্ষমতায়ণ। আর এই ক্ষমতায়ণ ঘটাতে তিনি চেয়েছেন–
ক. পুরুষের সম-অধিকার,
খ. নারীর শিক্ষার্জন
গ. নারীর অর্থোপার্জন
ঘ. নারীর স্বাধীনতা

পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থায় নারীর বিরুদ্ধাচরণ, নারীর অবদমন-নির্যাতন-বঞ্চনা-বৈষম্য ও শোষণের চিত্রটি শুধু ব্যথিত করেনি, বিদ্রোহী করে তোলে। ধর্মান্ধ নারী বিদ্বেষী পুরুষের বিরুদ্ধে কলম ধরে তিনি যে বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছেন তার সাফল্য আজ একশ বছর পর সফল হয়েছে। নারী এখন আর গৃহবন্দি, নিরক্ষর, কর্মহীন নয়। নারী শুধুমাত্র গর্ভধারণ-সন্তান জন্মদান ও লালন পালনকারী নয়। নারী শুধু বিনোদন বা যৌনসঙ্গী নয়। নারী শুধুমাত্র কলুর বলদ ও গার্হস্থ্য ক্রীতদাসী নয়। নারী এখন শিক্ষার্জন করে মেধা-মননে এবং দক্ষতা ও যোগ্যতায় পুরুষকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তার সমকক্ষ হচ্ছে। নারী এখন শ্রম শক্তি দিয়ে কৃষি-কলকারখানায় কাজ করছে। নারী এখন পরিবারে-সমাজে সমাদৃত হচ্ছে, তাঁর অবদানে দেশ সমৃদ্ধ হচ্ছে। নারী এখন শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হচ্ছে, পুরুষের স্থান দখল করতে সমর্থ হচ্ছে।

আধুনিক বিশ্বের রাষ্ট্রব্যবস্থায় সমর্থ হচ্ছে। অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় জোরালো বক্তব্য রাখছে এবং প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে। নারীর সততা, আন্তরিকতা, বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শীতা কোনও কোনও ক্ষেত্রে পুরুষকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণে নারী শুধু মমত্বের স্পর্শ রাখছে না, নারী-পুরুষের সমতা গঠনে এবং বৈষম্য দূরীকরণে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। নারীর স্বার্থে আইন প্রণীত হয়েছে, নারীর ভাগ্যোন্নয়নে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে যাতে অসহায় হয়ে জীবন কাটাতে না হয়।

জাতিসঙ্ঘ নারীর প্রতি বৈষম্য অবমোচনে সনদ ঘোষণা করে সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে তা বাস্তবায়নে বাধ্য করছে। নারী উন্নয়নে নীতি প্রণীত হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলিকে প্রকল্প সাহায্য দেবার অন্যতম শর্ত হচ্ছে নারীর অংশগ্রহণ এবং উন্নয়ন থাকতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নারীর ক্ষমায়ন ঘটছে। উন্নত দেশগুলোতে নারী পুরুষের সমকক্ষ হয়ে সর্বত্র কাজের সুযোগ পাচ্ছে। নারী এখন নির্বাচনী লড়াইয়ে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রে ক্ষমতাসীন হচ্ছে। রাষ্ট্র প্রধান ও সরকার প্রধান হচ্ছে। আমরা প্রশাসনের তৃণমূল পর্যায়েও নারীর ক্ষমতায়ণ দেখছি।

রোকেয়ার নারী এখন জজ, ব্যারিস্টার, ম্যাজিস্ট্রেট, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী হচ্ছে। সারা বিশ্বে বাংলাদেশ নারী ক্ষমতায়ণের মডেল হিসেবে পরিচিত হতে সমর্থ হয়েছে। প্রতিবেশি দেশগুলিতেও আমরা এর প্রভাব দেখতে পাচ্ছি। আরব দেশগুলোতে নারী ভোটাধিকার ও নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছে। সেখানে নারীর স্বার্থে আইনের কড়াকড়ি শিথিল হচ্ছে। মেয়েরা শিক্ষার্জন করছে, কাজ করার বা ব্যবসা করার সুযোগ পাচ্ছে। আমরা একুশ শতকের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে দেখতে পাচ্ছি, নারী যেখানে অন্ধকারে শৃংখলের বেড়াজালে বন্দি জীবনযাপনে বাধ্য থাকতো, সেখান থেকে তাদের আলোক ঝর্নাধারায় নিয়ে আসার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। পিছিয়ে থাকা নারী এখন মাথা উঁচু করে মুখ তুলে সামনে এগিয়ে চলেছে।

চার.
বর্তমানে নারীশাসিত বাংলাদেশে নারীর অবস্থা কেমন? এ প্রশ্নটাও আমাদের মনে জাগে। আমাদের চারপাশে বিপুল পরিমাণ নারীকে এখন দেখতে পাই। রোকেয়ার লেখা ‘অবরোধবাসিনী’ পড়লে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে একশ বছর পর আজকের নারী অনেকখানি আত্মবিশ্বাসী, সাহসী, সম্পদের অধিকারী, শিক্ষিত, দক্ষ, অর্থোপার্জনকারী। একজন গার্মেন্টস শ্রমিক তিন হাজার টাকা বেতন পায়, একজন নির্মাণকর্মী দৈনিক একশ-দেড়শ মজুরী পায়, মাটি কাটার কাজ করে পাঁচ কেজি চাল বা গম পায়, একজন স্বামী পরিত্যক্তা বা বিধবা দুঃস্থ নারী মাসে দু’শো টাকা ভাতা পায়।

এই অসম্ভবটি সম্ভব হলো কী করে সেই গবেষণায় গিয়ে আমরা দেখেছি নারীকে ধর্মান্ধ মুসলিম সমাজ যেমন অবরোধের বেড়াজালে বন্দি করেছিল, এবং একইভাবে ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানি শাসক ও তাদের দালাল জ্ঞানপাপীরাও গৃহবন্দি করে রাখার ষড়যন্ত্র করেছিল। মেয়েদের জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ ছিল সীমিত। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু শহর ও ঢাকা কেন্দ্রিক নারী উন্নয়নের গালভরা কথা তারা উচ্চারণ করতো। একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের আমরা দেখেছি নারী কীভাবে ঘর ছেড়ে রাজপথে নেমে স্বাধীনতার শ্লোগান তুলেছে। তারপর একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেছে। যারা ধর্মের নামে ঘরে বন্দি রাখার ফতোয়া দিয়েছে সেই পাকিস্তানি শাসকরাই আবার তাদের সৈন্যদের নারী ধর্ষণ ধর্মের নামে জায়েজ করার স্পর্ধা দেখিয়েছে। এমন কি যুদ্ধাপরাধী রাজাকাররাও নারী ধর্ষণের বিরুদ্ধে কখনও কোনো কথা বলেনি। নারীকে বরং পাক সৈন্যদের হাতে তুলে দিয়েছে। ধর্মের নামে এমন ঘৃণ্য কাজে তারা স্পর্ধা দেখিয়েছে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর নারীর সামনে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার দ্বার খুলে যায়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান লিপিবদ্ধ করেছে।

১. সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। (২৭ অনুচ্ছেদ)

২. কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্ম স্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না। (২৮/১) অনুচ্ছেদ)

৩. রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন। (২৮/২) অনুচ্ছেদ)

৪. কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ নারী পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অসমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না। (২৮/৩) অনুচ্ছেদ)

৫. নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না। (২৮ (৪) অনুচ্ছেদ)

৬. প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে। (২৯/১) অনুচ্ছেদ)

নারীর জন্য জাতীয় সংসদে ৪৫টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে (৬৫/৩) অনুচ্ছেদ) এবং স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান সমূহের উন্নয়নে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। (৯ অনুচ্ছেদ) আমাদের সংবিধানে নারীর অধিকার ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত হলেও সর্বক্ষেত্রে বা সর্বস্তরের নারীর কাছে তা পৌঁছে নাই। সরকার নারীর অধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ২০১১ সালে নতুন কলেবরে ‘নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১’ ঘোষণা করেছে। এ নীতিমালার আলোকে নারীর সকল অধিকার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়ার কথাও আছে। এ ছাড়া সরকারি নানারকম অর্থ ও খাদ্য সাহায্য রয়েছে যা দুঃস্থ নারীদের বেঁচে থাকার উপায় হিসেবে আশ্বাস যুগিয়ে থাকে। এছাড়া আশ্রয়ন প্রকল্পে যে ঘর বরাদ্দ করা হয় তা নারীর নামে থাকে। বর্তমানে ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক চালু হওয়ায় মেয়েরা ঘরের কাছেই চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে। বিশেষ করে গর্ভকালীন চিকিৎসা সুবিধাজনক করা হয়েছে। নারী শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছে, বই দেয়া হচ্ছে সরকার থেকে।

রোকেয়ার মৃত্যু হয় ১৯৩২ সালে। তখন মুসলিম মেয়েরা স্কুল শিক্ষাগ্রহণে এগিয়ে এসেছে তবে সংখ্যা বড় নগণ্য। তার স্কুল সরকারি হয়েছে এবং ‘ছাত্রী সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। স্কুলে সব ধর্মের মেয়েরা ভর্তির সুযোগ পায়। মেয়েদের স্কুলের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারীরা শিক্ষকতার পেশায় যোগদান করে। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্দ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা ও ভারত ভাগের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে নানা ধরনের সমস্যার উদ্ভব হয়। কলকাতা ও ঢাকা ছাড়াও অন্যান্য শহরে শিক্ষাগ্রহণে মেয়েদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। গৃহবন্দি মেয়েরা দরজা খুলে বাইরে সূর্যের আলো দেখার সুযোগ পায়, খোলা হাওয়ার স্পর্শ পায়। কিন্তু নানা ধরনের নির্যাতনের মাত্রাও বৃদ্ধি পেতে থাকে।

তারপরও আমরা দেখতে পাই নারীর অর্জন কম নয়। ১৯২৫ সালে ভোটাধিকার ভারত ভাগের পর সংসদে মহিলা কোটায় মনোনয়ন, রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং সরকারি বেসরকারি সব ধরনের পেশায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। ১৯৬১ সালে নারী আন্দোলনের ফলে বহু বিবাহ নিষিদ্ধ এবং প্রথম স্ত্রীর বিনা অনুমতিতে দ্বিতীয় বিবাহ করলে শাস্তিযোগ্য আইন হয়। ২০০০ সালে সন্তানের অভিভাবক হিসেবে মায়ের নাম স্বীকৃতি পায়। এইসব অর্জন নারীকে সাহসী ও মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। নারী স্বাধীন মত চলাচল, জীবন যাপন, পেশাগ্রহণ, বিদেশ ভ্রমণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিবাহ করার অধিকার পেয়েছে।

রোকেয়া একশ বছর পূর্বে বাংলাদেশের সকল নারীকে রাণী করার যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তার অনেকখানি আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি সত্য। কিন্তু এখনও কূপমণ্ডুকতা, ধর্মান্ধতা, নারীবিদ্বেষ প্রবণতা আমাদের সমাজ থেকে, দেশ থেকে ধুয়ে মুছে যায়নি। বৃহত্তর নারী সমাজকে বঞ্চনা-অবহেলা-বৈষম্য-নির্যাতন-অপমান-অবমাননা সহ্য করে জীবনযাপন করতে হয়। নারীর অশ্রু ও বেদনার যন্ত্রণায় পাথর গলতে পারে, পাহাড়ে ক্ষয় ধরতে পারে কিন্তু পুরুষ হৃদয় পাষণ্ড কাঠিণ্যতায় পাশবিক, নৃশংস হয়েছে।

শহর কেন্দ্রিক সুবিধাভোগী নারী তার ভাগ্য জয় করতে সক্ষম হলেও দেশের যে বৃহত্তর নারী হত দরিদ্র-দরিদ্র-নিম্নবিত্ত পরিবারে বসবাস করে মা-কন্যা-বধু হিসেবে সেখানে রয়েছে পশ্চাৎপদতা। ধর্মীয় অপব্যাখ্যায় তাদের বাধ্য থাকতে হয়। উচ্চশিক্ষিত স্বল্পশিক্ষিত নিরক্ষর ধনী-দরিদ্র সব শ্রেণীর পুরুষের মধ্যে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রকাশ দেখা যায়। ফলে নির্যাতনের অভিশাপে আজও তারা অসহায় অবহেলিত। মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েরা উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলেও ধর্মীয় অন্ধতা, সামাজিক অপবাদ এবং পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হয়ে থাকে। পরিবারে পিতার পর ভাইরা হয়ে ওঠে অভিভাবক। শিক্ষাগ্রহণ ও সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হয়। একই ভাবে স্বামীর মৃত্যুর পর শ্বশুর বা ভাশুর ও দেবর হয়ে ওঠে অভিভাবক এবং সেখানে বঞ্চনার কোনো কমতি থাকে না। কন্যাসন্তানের শিক্ষা ও লালন-পালনে অবহেলার সীমা নেই। বাল্যবিবাহ, যৌতুক, বহু বিবাহ আজও ছোবল দিয়ে যায়। এরপর তাদের বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা ও স্বামীপরিত্যক্তা নারীর পরিচয় হয়ে ওঠে। এছাড়া অপহরণ, ধর্ষণ, পতিতাবৃত্তিতেও বাধ্যকরণ, বিদেশে পাচার করার মত ঘৃণ্যতম কর্মকাণ্ডগুলি পুরুষই করে থাকে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে নারীকে তারা অর্থ দিয়ে সহায়ক বানায়।

কন্যাকে অর্থের বিনিময়ে দরিদ্র পিতা পাচারকারীর হাতে তুলে দেয়, পতিতাবৃত্তি করার জন্য দালালের হাতে তুলে দেয়। এই নিষ্ঠুরতম বিবেকবর্জিত অমানবিক কাজগুলো কেন হবে? দারিদ্র-অসহায়ত্ব-অসচেতনার কারণে পরিবারে কন্যারা কেন লোলুপ শিকারে পরিণত হবে? নারীকে পণ্য হিসেবে কেন বিবেচনা করা হবে? তাকে শুধু যৌনতার শিকার হতে পুরুষ কেন বাধ্য করবে? তারও সেখানে ইচ্ছা-অনিচ্ছা-স্বাধীনতা থাকতে পারে। পুরুষ যদি তার দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত করে, মানবিক হতে পারে তাহলে নারী তার আপন ভাগ্য জয় করতে পারে।

রোকেয়ার স্বপ্ন ছিল নারীর ক্ষমতায়ণ। সেই ক্ষমতায়ণ নারী সম্ভব করেছে সত্য, কিন্তু সে কখনও পুরুষকে অবদমিত রাখেনি। শাসক হিসেবে দেশ পরিচালনায় নারী-পুরুষের ভেদাভেদ করেনি, বৈষম্য বঞ্চনায় শোষণ করেনি–বরং নারীকে তার যোগ্যতা ও উপযুক্ততা দিয়ে পুরুষের সমকক্ষ করে তুলতে সাহায্য করেছে। কোনোপ্রকার স্বেচ্ছাচারী মনোভাব দেখায়নি। সমাজে নারী-পুরুষ একই সঙ্গে কাজ করবে এবং দেশ ও জাতি গঠনে অবদান রাখবে সেই পদক্ষেপ নিয়েছে। রোকেয়ার স্বপ্ন ছিল এটাই। এই স্বপ্নভঙ্গ আমরা দেখতে চাই না। নারীর ক্ষমতায়ণ আরও ঘটুক, সমাজ দেশ ও মানুষের কল্যাণে স্বস্থি ও শান্তি বয়ে আনুক।

রোকেয়া যে যুগে বসে মোমবাতি জ্বালিয়ে জ্ঞানলাভ করেন এবং ক্ষুরধার লেখনীর দ্বারা নারীকে জাগরণী বাণী শুনিয়েছেন, আর পুরুষকে বেত্রাঘাতে জর্জরিত করেছেন–তারপর পদ্মায়-যমুনায়-মেঘনায় অনেক পানি গড়িয়েছে। অনেক বিদ্রোহ বিপ্লব ঘটেছে, অনেক আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে, সবশেষে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অনেক রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু নারী এসব থেকে কখনও বিচ্ছিন্ন থাকে নি। শিক্ষিত ও সচেতন নারীও অংশ নিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে নেত্রীত্ব দিয়েছে। আবার অসচেতন ও নিরক্ষর নারীকে পাশে পেয়েছে। এসবই সম্ভব হয়েছে নারীর মমত্ব, আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার কারণে। নানা ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে, বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করে, অশ্র ও বেদনাকে জয় করে বাংলাদেশের নারী আজ আপন মহিমায় উজ্জ্বল শক্তিশালী এবং আত্মমর্যাদার সাথে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে দৃঢ়। ক্ষেত-খামার, কল-খারখানা, ব্যবসা বাণিজ্য, আদালত -প্রশাসন-চিকিৎসা সেবা সর্বত্র নারীর পদধ্বনিতে সোচ্চার, কর্ম-সাধনায় নিবেদিত, সততা ও আন্তরিকতার প্রতীক। দেশপ্রেমের আলোকে উদ্ভাসিত।

রোকেয়ার মনে সবসময় কঠিন আত্মবিশ্বাস ছিল। তিনি কখনও নিরাশ বা হতাশ হবার অবকাশ পাননি। আমাদের সে কথাটি অবশ্যই মনে ধারণ করতে হবে।

মহিয়সী রোকেয়া একদিন যে স্বপ্নের প্রদীপ শিখাটি বাংলার নারীর হৃদয়ে জ্বালিয়ে দেন–সেই শিখাটি আজ তার কন্যারা অনেক বেশি উজ্জ্বল করেছে। এ প্রদীপ নিভবে না, নিভতে পারে না। অনেক রক্ত অশ্রু আত্মত্যাগের বিনিময়ে এ প্রদীপ জ্বলছে। রোকেযার এই স্বপ্নের প্রদীপ আরও শত শত বছর জ্বলবে, বাঙালির নারীকে শক্তি ও সাহস যোগাবে, আহ্বান জানাবে ‘… মাতা, ভগিনী, কন্যে! আর ঘুমাইও না–উঠ, কর্তব্য পথে অগ্রসর হও।’
৭.১২.২০১১

(মহিয়সী রোকেয়া দিবস উপলক্ষে একক বক্তব্য ৮ ডিসেম্বর ২০১১ বাংলা একাডেমী সেমিনার কক্ষে)

তথ্যসূত্র
১. রোকেয়া রচনাবলী – আবদুল কাদির সম্পাদিত
২. রোকেয়া জীবনী – মামসুন্নাহার মাহমুদ
৩. পবিত্র রোকেয়া পাঠ – গ্রন্থনা বেবী মওদুদ
৪. জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি – ২০১১
৫. বেগম রোকেয়া জীবন ও সাহিত্য – মোতাহার হোসেন সুরী
৬. নারী – হুমায়ুন আজাদ

আরো লেখা

রোকেয়ার সময় আমাদের সময়
কবীর চৌধুরীর সঙ্গে আলাপ
একুশের শহীদেরা অমর অক্ষয় চিরঞ্জীব
সন্‌ জীদা খাতুনের সঙ্গে আলাপচারিতা
পশ্চিমবঙ্গে এখন নজরুল চর্চার অবস্থা
জীবনের পাতায় পাতায় (ধারাবাহিক রচনা)
রোকেয়া: এক আদর্শবাদী মানুষের প্রতিকৃতি
ভাষা আন্দোলনের সময় নিয়ে রফিকুল ইসলামের সাক্ষাৎকার
সুফিয়া কামাল: আমাদের মননে সাহসে চেতনায়

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: বেবী মওদুদ
ইমেইল: baby.maudud@gmail.com

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com