রশীদ করীম: সমকালীন ও চিরকালীন

মফিদুল হক | ১ december ২০১১ ২:৩০ অপরাহ্ন

rk118.jpg……
রশীদ করীম
…..
রশীদ করীম লিখবার ক্ষমতা হারিয়েছিলেন অনেককাল আগে। স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে তিনি হয়ে পড়েছিলেন অশক্ত, চলতে ফিরতে পারঙ্গম ছিলেন না আর। কলম বশে আনতে পারগ ছিল না হাতের আঙুল, সর্বোপরি স্মৃতি তাঁর সাথে খেলছিল নিষ্ঠুর এক খেলা, আলোছায়ার ভোজবাজির মতো স্মরণ ও বিস্মরণ খেলতে থাকে তাঁকে নিয়ে, তিনি বুঝতে পারেন সব কিন্তু কিছু করবার উপায় থাকে না। বই পড়তে পারেন না, কেননা পাঠের ধারাক্রম বজায় রাখা তাঁর আয়ত্তের বাইরে, লিখতে পারার প্রশ্নই ওঠে না, বাইরের জীবনের সঙ্গে একেবারে সংযোগবিহীন হয়ে পড়েন তিনি। আজীবন সাহিত্যচর্চায় সমর্পিত ছিলেন যে-মানুষটি তাঁর জন্য এই পরিস্থিতি ছিল গভীর বেদনাদায়ক। ১৯৯১ সালে তাঁর সর্বশেষ রচনা, স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ জীবন মরণ যখন বের হলো তখন তিনি পুরোপুরি স্মৃতিধূসর হন নি, বহু কষ্টে শেষ করেছিলেন নিজের জীবনকথা, নিজের তো নয়, তাঁর চারপাশের মানুষদের কথা এবং সেই গ্রন্থের উৎসর্গপত্রের পরে আলাদা এক পৃষ্ঠায় লিখেছিলেন, লেখেন তো নি, মুখে মুখে বলে দিয়েছিলেন কথাগুলো : “এই আমার শেষ লেখা, ইংরেজিতে যাকে বলে সোয়ান সঙ্–ময়ালসঙ্গীত।”
—————————————————————–

উত্তম পুরুষ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে, যদিও এর মুসাবিদা তিনি শুরু করেছিলেন অনেক আগে… সমকাল পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসের প্রকাশ এক পর্যায়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর, তাঁর মনে হয়েছিল সাম্প্রদায়িক ভাবনাদুষ্ট এই রচনা।

—————————————————————–
আমি যখন তাকাই রশীদ করীমের দুঃখভরা শেষ জীবনের দিকে, সেই ১৯৯২ সাল থেকে যে রোগজর্জর জীবন তিনি বহন করে চলেছিলেন, কিন্তু শত বাধা ও দুঃখময়তা সত্ত্বেও আভিজাত্যবোধ ও শরাফতিতে সামান্যতম বিঘ্ন ঘটতে দেন নি, কাউকে তাঁর জন্য বিন্দুমাত্র সহানুভূতিময় হওয়ার অবকাশ যোগান নি। বাড়িতে কেউ যখন এসেছে, কালেভদ্রে কেউ গিয়েছে, তাঁদের আপ্যায়নে সকল সদাচার বজায় রেখে আভিজাত্যবোধ রেখেছেন অক্ষুণ্ন, নিজেও এসে বসেছেন পরিচ্ছন্ন ধবধবে ফতুয়া পরে, ঘরোয়া বটে তবে রুচি ও সজ্জার যথোচিত ভাব বজায় রেখে। অথচ কষ্ট হয় তাঁর চলতে ফিরতে, কথা জড়িয়ে যায়, একটি কথা বলে বারবার পুনরুক্তি করে তা সড়গড় করে নিতে চান, কোনোভাবেই নিজের কষ্টের প্রকাশ ঘটাত দেন না। নিজের সম্পর্কে, শরীরস্বাস্থ্য বিষয়ে কোনো আলাপই করেন না। তাঁকে দেখে চাইকোভোস্কির ‘সোয়ান লেক’ ব্যালের শেষ দৃশ্যের সুরমূর্চ্ছনার কথা মনে পড়বে ময়াল যখন আলিঙ্গন করতে যাচ্ছে মৃত্যু, বলশয় থিয়েটারে মায়া প্লিসেৎস্কায়া ডায়িং সোয়ানের প্রতিরূপ ফুটিয়ে তোলেন নৃত্যে, অর্কেস্ট্রায় বাজতে থাকে অনন্য সুর, সোয়ানসঙের সেই শিল্পরূপ আচ্ছন্ন করে ফেলে সবাইকে, তেমনি মোহাবিষ্ট হয়ে দেখতে হয় রশীদ করীমকে, বেদনায় মন ভারাতুর হয়ে পড়লেও মনে হবে ব্যক্তিমানব নয়, জীবনের শিল্পরূপ যেন প্রত্যক্ষ করছি আমরা।

এমনি ছিল রশীদ করীমের শিল্পিত জীবন, যেমন তার সৃজনশীল পর্বে তেমনি তার দীর্ঘ রোগজর্জর সময়ে। সাহিত্যক্ষেত্রেও তিনি সেই একই আভিজাত্য ও উপলব্ধির প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তাঁকে আর দশজনের সঙ্গে মেলানো যাবে না, তিনি ভিড়ের মধ্যে আলাদা। লিখেছেন সর্বসাকুল্যে বারোটি উপন্যাস, সমগ্র সাহিত্যসাধনার বিচারে এই ফসল একান্ত অকিঞ্চিৎকর, হালের সাহিত্যিকরা তো এমন সংখ্যা হেলাফেলায় অতিক্রম করে যান। উত্তম পুরুষ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে, যদিও এর মুসাবিদা তিনি শুরু করেছিলেন অনেক আগে, দেশভাগের পটভূমিকায় চল্লিশের দশকের কলকাতার অভিজাত গণ্ডিতে ব্যক্তি-মানুষের প্রেম-প্রীতি-জীবনসংগ্রামের পরিসরে বৃহত্তর রাজনৈতিক-সাম্প্রদায়িক অভিঘাত যেখানে প্রতিবিম্বিত হয়েছে শিল্পের ধারায়, কোথাও কোনো আরোপিত চিন্তা বা দর্শনের অভিঘাত পড়ে নি। শিল্পের শর্ত মেনে সাহিত্যসৃষ্টির এই প্রয়াস অনেক ধরনের ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দিয়েছিল। সমকাল পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসের প্রকাশ এক পর্যায়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর, তাঁর মনে হয়েছিল সাম্প্রদায়িক ভাবনাদুষ্ট এই রচনা।

দেশভাগের পূর্ববর্তী সেই দিনগুলোয় মুসলিম লীগের রাজনৈতিক দর্শন জোরালো আবেদন সৃষ্টি করেছিল বাঙালি মুসলিম এলিট ও মধ্যবিত্তের মনে। প্রায় সর্বপ্লাবী ছিল এর বিস্তার। যেসব যুক্তি ও বোধ নিয়ে বাঙালি মুসলমান এমন মোহজালে আবদ্ধ হয়েছিল তার পেছনের কার্যকারণ বোঝা ও বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হওয়া সমাজতাত্ত্বিক ও বিশ্লেষকদের কাজ। আজকের পটভূমিকায় সেই সময় বিচারকালে অনেক ঐতিহাসিক উপলব্ধি আমরা সবাই বহন করি। ধোঁয়াশা কেটে গিয়ে সূর্য যখন মধ্যগগনে তখন অস্পষ্ট অনেক কিছুই তো পরিষ্কার হয়ে ওঠে আলোর উজ্জ্বলতায়। দেশভাগের ঘোর কাটতে বাঙালি মুসলমানের সময় বেশি লাগে নি। ভাষা আন্দোলন যার অনুপম প্রকাশ ঘটালো ষাটের সূচনায় সেই বোধ তো আরো দৃঢ় হয়েছিল। তখন শুরু হতে যাচ্ছিল আরেক লড়াই, সাহিত্য ও শিল্পবোধ নিয়ে যে-লড়াইয়ে অন্যতর মাত্রা যোগ করছিল সমকাল পত্রিকা। আর তাই পত্রিকা সম্পাদকের জন্য উত্তম পুরুষ অস্বস্তিকর বিবেচিত হয়েছিল রাজনৈতিক বিবেচনায়, শৈল্পিক বিচার নিয়েছিল গৌণ ভূমিকা। ইতিহাসের অনেকটা পথ পার হয়ে এসে, স্বাধীন বাংলাদেশের পটভূমিকায় আমরা এখন শৈল্পিক নিষ্পৃহতা নিয়ে তাকাতে পারি সেই উপন্যাসের দিকে, বুঝতে পারি রশীদ করীম লেখার মধ্য দিয়ে বিশেষ এক সময়কে ধরতে চেয়েছিলেন এবং কী অসাধারণ দক্ষতার সাথেই না সেই কাজ তিনি করেছিলেন তাঁর প্রথম উপন্যাসে। তিনি বিশ্বাস করতেন লেখকের আনুগত্য তাঁর শিল্পের প্রতি। এই শিল্প বলতে তিনি জীবনের যে গভীরতর রূপায়ন বুঝতেন তার সঙ্গে কলাকৈবল্যবাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি নিজেও একবার বলেছেন, ‘আমি কোনো বাস্তবকে আদর্শায়িত করি নি, অথবা কোনো আদর্শকে বাস্তবায়িত করি নি।’ অত্যন্ত স্মরণীয় এক-পঙ্ক্তিয় বা ওয়ান লাইনার বক্তব্য, যেমনটা বড় সাহিত্যিকেরাই করতে পারেন।

রশীদ করীম ছিলেন একান্তভাবে সাহিত্যে সমর্পিত যদিও বেশি নয় তাঁর রচনার পরিমাণ, কিন্তু যাই লিখেছেন স্মরণীয়ভাবে। সেটা তাঁর গল্প-উপন্যাস নিয়ে যেমন বলা যায় তেমনি তাঁর প্রবন্ধের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কেননা তিনি সর্বদা করেছেন বোধের চর্চা এবং সেই উপলব্ধি প্রকাশের জন্য উপযুক্ত ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি তৈরি করতে ছিলেন সর্বদা সচেষ্ট। নিভৃত সেই সাধনা রচনার গায়ে বিশেষ দাগ কাটে নি, তবে ঝকঝকে আধুনিক এক ভাষা খাপখোলা তরবারির মতো যখন ঝিলিক দিয়ে ওঠে তখন ঠিকই বোঝা যায় কতো যত্ন ও পরিচর্যায় এমন অর্জন সম্ভব।

এটা আমাদের দুর্ভাগ্য, রশীদ করীম অগ্রণী কথাসাহিত্যিক হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও তাঁর রচনার নিবিষ্ট পাঠকের সংখ্যা বেশি নয়, তার চেয়েও কম মেলে তাঁর রচনাসম্ভার নিয়ে সাহিত্যিক পর্যালোচনা। উত্তম পুরুষ, আমার যত গ্লানি, প্রেম একটি লাল গোলাপ যে-টুকু মনোযোগ আকর্ষণ করেছে তার সিকিভাগও পায় নি রশীদ করীমের ম্যাগনাম ওপাস প্রায় এপিক রচনা মায়ের কাছে যাচ্ছি। দেশভাগ থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ অবধি এই কাহিনীর বিস্তার, সমকাল ও পরিবর্তনময়কাল উভয়কে একই পরিসরে আনবার চেষ্টা করেছেন লেখক, দেখতে চেয়েছেন কালের নিরিখে অতিক্রান্ত সময়কে। উত্তম পুরুষ যদি একান্ত সীমিত থাকে বিশেষ এক কালপর্বে, এবার সেই সময় নতুনভাবে বিশ্লেষিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করলো পরবর্তী কালধারায়। ঔপন্যাসিকের সমগ্রদৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টি দুইয়ের সম্মিলনে অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে এই কাজ সম্পাদন করেছেন রশীদ করীম। মায়ের কাছে যাচ্ছি নামে যেমন আটপৌরে ভাবের সঙ্গে মিশে থাকে প্রতীকী ব্যঞ্জনা, তেমনি সহজিয়া কাহিনীধারায় ইতিহাসের বিস্তার ধারণ করবার অভিপ্রায় ছিল লেখকের। সাফল্য-অসাফল্য ছাপিয়ে যায় বিপুলকার এই প্রয়াসের দুঃসাহস। বিশাল ক্যানভাসে জীবনের যে রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক তা যদি আমাদের মনোযোগ তেমনভাবে না পায় সে-আমাদেরই দুর্ভাগ্য। কিন্তু বাংলাদেশের সাহিত্যের যথাযথ মূল্যায়নের জন্য, বাংলাদেশের সমাজ ও জাতিমানস বুঝবার জন্য রশীদ করীমের কাছে আমাদের ফিরতেই হবে, বারবার চিরকাল।

আর তাই তিনি অক্ষয় হয়ে রইবেন সাহিত্যের চিদাকাশে এবং আমাদের ফিরে ফিরে আসতে হবে তাঁর কাছে, বোধ ও প্রেরণা আহরণের জন্য।

—–

আর্টস-এ আরো লেখা


ইতিহাসের দায় ও সাহিত্যের অভিপ্রায়
সাংস্কৃতিক মানচিত্রে মিরপুর
ব্যক্ত ও অব্যক্ত মাহমুদুল হক
দেবদাস চক্রবর্তী : মূর্ত জীবনের বিমূর্ত রূপকার

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: মফিদুল হক
ইমেইল: mofidul_hoque@yahoo.com

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।