গদ্য

মিষ্টির সেকাল ও একাল

শফিক রেহমান | 31 Oct , 2011  

মিষ্টি বাঙালির অতি প্রিয় খাবার। বিভিন্ন ধর্মীয় যেমন, পূজা ও মিলাদ এবং সামাজিক যেমন, গায়েহলুদ, বিয়ে, জন্মদিন প্রভৃতি অনুষ্ঠানের অতি আবশ্যিক অংশ। কিন্তু বাংলাদেশে গত কয়েক যুগে মিষ্টির রকম ও বিক্রি ব্যবস্থাপনা বদলে গিয়েছে।


শ্বেতাঙ্গ বৃটিশরা ঝাল খেতে পারলেও বাংলাদেশি বা ইনডিয়ান মিষ্টি খেতে পারে না। একমাত্র ব্যতিক্রম পানতোয়া। বৃটেনের বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টগুলোতে পানতোয়া সার্ভ করা হয়। শ্বেতাঙ্গরা গোলাকৃতি গরম পানতোয়া পছন্দ করে। তবে সেখানে পানতোয়া পরিচিত গুলাবজামুন নামে।


অতীতে মিষ্টি বিক্রি ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের একচেটিয়া ব্যবসা। মিষ্টি বিক্রেতা ও ময়রা ছিলেন হিন্দু। তাদের মধ্যে ঘোষ উপাধিধারীরা ছিলেন কুলীন। ঘোষ মানেই মনে করা হতো মিষ্টি, দুধ ও দইয়ের ব্যবসায়ে সম্পৃক্ত।

…….
জিলাপি
……
চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে মিষ্টির দোকানে সিমেন্টে বাধানো প্রায় দুই ফিট উচু বেদির ওপর শাদা চাদর পেতে বসে থাকতেন মিষ্টি বিক্রেতা। তাদের পরনে থাকতো ধুতি, গেঞ্জি ও ফতুয়া, গলায় পৈতা, বাহুতে একাধিক মাদুলি এবং একাধিক আঙুলে বিভিন্ন পাথরের আংটি। তারা সাধারণত স্থূলকায় হতেন। রাস্তার দিকে কাসার থালায় সাজানো থাকতো বিভিন্ন রকমের মিষ্টি। রাস্তা থেকেই কাচের ওপাশে দেখা যেতো সাজানো মিষ্টির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে কিছু মাছি ও মৌমাছি। প্লেটের পাশে উকি-ঝুকি দিচ্ছে কিছু পিপড়া। এসব দোকানের হাইজিনিক স্ট্যান্ডার্ড ছিল নিচু মানের।

দোকানের মধ্যে সিলিং বা টেবিল ফ্যান ঘুরতো। কেনার আগে মিষ্টি চেখে দেখার সুযোগ দিতেন দোকানদার। অ্যালুমিনিয়ামের জগ থেকে গ্লাসে পানি দেয়া হতো। বড় অর্ডার দাতাদের চা খাওয়ানো হতো। ক্রেতার পছন্দের মিষ্টি মাটির হাড়িতে ভরে দাড়িপাল্লায় মাপা হতো। সের বা মণ দরে বিক্রি হতো। বিক্রেতার সামনে একটা কাঠের বাক্সে থাকতো ক্যাশ। ক্রেতারা লম্বা কাঠের বেঞ্চ অথবা টুলে বসতেন।

তখন মিষ্টির রকম বেশি ছিল না। জনপ্রিয় মিষ্টিগুলোই তৈরি হতো। যেমন, রসগোল্লা, পানতোয়া, কালোজাম, চমচম, ছানার জিলাপি, জিলাপি, আমৃত্তি, বালুশাই সন্দেশ, নলেন গুড়ের সন্দেশ, লাড্ডু এবং দই। এর বাইরে অন্য কোনো মিষ্টি ছিল না বললেই চলে। মিষ্টির পাশাপাশি থাকতো সিঙ্গাড়া ও নিমকি।

…….
পোড়াবাড়ি চমচম
……
সেই সময় ঢাকায় সবচেয়ে বিখ্যাত মিষ্টির দোকান দুটি ছিল প্রায় পাশাপাশি, ইসলামপুর রোডে শাখারিবাজারে ঢোকার আগে। কালাচাদ গন্ধবণিক ও সীতারাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। তাদের পরে তৃতীয় স্থানে ছিল রথখোলার মোড়ে মরণচাদ ঘোষের দোকান। তখনই মরণচাদের ব্র্যান্ড স্লোগান ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী দধি বিক্রেতা। মানুষ তখন কালাচাদ ও সীতারাম থেকে মিষ্টি কিনলেও দই এবং আমৃত্তি কিনতো মরণচাদ থেকে। চট্টগ্রামে বিখ্যাত ছিল লাভ লেইন-এর প্রান্তে বোস ব্রাদার্স।

চল্লিশের দশকে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল নবদ্বীপ হালদার-এর কণ্ঠে ‘রসগোল্লায় ইদুর’ নামে একটি কমেডি রেকর্ড। এই সময়ে কিছু আঞ্চলিক মিষ্টি দেশ জুড়ে বিখ্যাত হয়। যেমন, টাঙ্গাইলের (পোড়াবাড়ি ও চারাবাড়ি) চমচম, কুমিল্লার রসমালাই, মুক্তাগাছার মন্ডা, কুষ্টিয়ার পেড়া, বগুড়ার দই প্রভৃতি।

সত্তরের দশকে অগ্রণী আলাউদ্দিন
সত্তরের দশকে, বিশেষত বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে মিষ্টি ব্যবসার পট দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। এই পট পরিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা নেয় আলাউদ্দিন সুইটমিট লিমিটেড। গৃন রোডে তাদের ব্যবসার সূচনা হয়।

আলাউদ্দিনের দোকানে একাধিক ডিসপ্লে শেলফ স্লাইডিং কাচের পাটিশনে ঘেরা থাকতো। ফলে মাছি-মৌমাছির উৎপাত ছিল কম। এই দোকানে রেস্টুরেন্টের মতো বেশ কিছু চেয়ার-টেবিল ছিল। সেখানে কাস্টমাররা সকাল-দুপুরে মিষ্টি দিয়ে ব্রেকফাস্ট ও লাঞ্চ সারতেন। তাদের ভিড়ে দোকান সব সময় গমগম করতো।

মোটা খাকি কাগজের প্যাকেট অথবা ঠোঙার বদলে আলাউদ্দিন ঝুকে পড়ে তাদের নাম সংবলিত ডিজাইনের পিচবোর্ড বাক্সে মিষ্টি বিক্রিতে।

ইতিমধ্যে সের ও মণ যুগের শেষ হয়ে গিয়েছিল। কেজি অথবা পিস দরে মিষ্টি বিক্রি হতো। মাপা হতো আধুনিক স্কেলে। মিলাদ, কুলখানি, গায়েহলুদ ও বিয়েতে আলাউদ্দিনের গাঢ় নীল ও ম্যাজেন্টা রঙের বিভিন্ন সাইজের বাক্সে মিষ্টি দ্রুত জনপ্রিয় হয়।
শুধু প্যাকেজিং নয়, মিষ্টির বৈচিত্রও আনে আলাউদ্দিন। একটার পর একটা নতুন ধরনের মিষ্টি তারা প্রায়ই ইন্ট্রোডিউস করতে থাকে।

…….
রসগোল্লা
……
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে বাঙালিরা বিদেশে চাকরি এবং বসবাসে উৎসাহী হয়। ফলে বাঙালিদের বিদেশে যাতায়াত শুরু হয়ে যায়। বিদেশ যাত্রী বাঙালিরা যাতে বাংলাদেশের ফ্রেশ মিষ্টি নিয়ে যেতে পারে সেই লক্ষ্যে ঢাকা এয়ারপোর্টের কাছে আলাউদ্দিন একটি বড় দোকান খোলে। আলাউদ্দিনের সার্ভিস ছিল হাইজিনিক ও প্রম্পট। কোয়ালিটি ছিল ভালো। বৈচিত্র ছিল বেশি।

মিষ্টি বিক্রিতে আলাউদ্দিন হয় দেশের শীর্ষ বা মরণচাদের ভাষায় বলা যায়, অপ্রতিদ্বন্দ্বী মিষ্টি বিক্রেতা।

আশির দশকে চাহিদা বৃদ্ধি
আলাউদ্দিন দেশে ও বিদেশে কিছু ব্রাঞ্চ খোলে। তবে লন্ডনে বৃক লেইনে তাদের দোকান বড় মার্কেট পায়নি। লন্ডনে সত্তরের দশক থেকে পাকিস্তানি মালিকানাধীন আমবালা-র আধিপত্য অক্ষুণ্ন ছিল এবং এখনো আছে। বাংলাদেশ থেকে কারিগর নিয়ে গিয়েছিল আমবালা। বাংলাদেশি মিষ্টির পাশাপাশি পাকিস্তানি এবং ইনডিয়ানদের প্রিয় শুকনো মিষ্টি, যেমন বরফি ও সমুচা বা সমোশা-ও আমবালা বানায়। নিউ ইয়র্কে আলাউদ্দিন মিষ্টির বদলে খাবার-দাবারে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে।


…….
আমবালার গুলাবজামুন
…….
শ্বেতাঙ্গ বৃটিশরা ঝাল খেতে পারলেও বাংলাদেশি বা ইনডিয়ান মিষ্টি খেতে পারে না। একমাত্র ব্যতিক্রম পানতোয়া। বৃটেনের বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টগুলোতে পানতোয়া সার্ভ করা হয়। শ্বেতাঙ্গরা গোলাকৃতি গরম পানতোয়া পছন্দ করে। তবে সেখানে পানতোয়া পরিচিত গুলাবজামুন নামে।


আমবালার ওয়েব সাইটে ব্যবহৃত ছবি: দি আমবালা ডেইরি, ওল্ড ইন্ডিয়া।

আশির দশকের পর থেকে আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে মুসলিম সম্প্রদায় বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে মিষ্টির ব্যবসায়ে। এই সময়ে এগিয়ে আসে বনফুল, মুসলিম মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার প্রভৃতি। এর পাশাপাশি দেখা যায় মরণচাদের নাতিদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। মরণচাদ গ্র্যান্ড সন্স নামে ঢাকায় কিছু দোকান দেখা যায়।

ইতিমধ্যে মিষ্টি ক্রেতাদের পরিধিও বেড়ে যায়। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করা ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা যায় বেড়ে। ফলে প্রতি বছর প্রতিটি পরীক্ষায় রেজাল্ট প্রকাশিত হওয়ার দিন দেশ জুড়ে মিষ্টির দোকানে মিষ্টি যায় ফুরিয়ে। এই ঘটনা দৈনিক পত্রিকাগুলোর নিয়মিত সংবাদ হয়।

…….
নিউইয়র্কের জ্যাকসনহাইটে আলাউদ্দিনের মিষ্টির দোকান।
……

নব্বইয়ের দশকে ভ্যাটের আক্রমণ
মিষ্টির রমরমা ব্যবসা নব্বইয়ের দশকে অপ্রত্যাশিত স্থান থেকে আক্রান্ত হয়। বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান দেশে ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (সংক্ষেপে ভ্যাট বা VAT) চালু করেন যার আওতায় পড়ে মিষ্টির ব্যবসা। শোনা যায়, আলাউদ্দিনের কাছে বিশাল ভ্যাট বিল পাঠায় অর্থ মন্ত্রণালয়। এরপর থেকে আলাউদ্দিনের ব্যবসা খুব কমে যায়। ঢাকায় বর্তমানে আলাউদ্দিনের বড় দোকানটি আছে মৌচাক মোড়ের কাছে। কিন্তু আগের কোনো জেল্লাই নেই এ দোকানে।


…….
কালোজাম
…….
নব্বইয়ের দশকেই মিষ্টি ব্যবসা নতুন দিকে মোড় নেয়। এবার নেতৃত্ব দেয় গুলশান টু-তে একটি বাড়ির দোতলায় এয়ারকন্ডিশন্ড রুম থেকে প্রিমিয়াম সুইটস বাই সেন্ট্রাল। নামটা একটু কনফিউসিং। সেন্ট্রালের তৈরি প্রিমিয়াম মিষ্টি! শুধু প্রিমিয়াম মিষ্টি বললেই তো হতো।

সে যাই হোক। এই প্রিমিয়াম মিষ্টি রাজধানীর অভিজাত মহলে দ্রুত আদরনীয় হয়ে ওঠে। এর দুটো কারণ ছিল:

এক. স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সচেতন নব্য ধনী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা মেদ বৃদ্ধি ও ডায়াবেটিস পরিহারে মনোযোগী হন। গুলশান পার্ক, রমনা পার্ক, ধানমণ্ডি লেকের তীরে সকাল-বিকাল হাটাহাটি করে এবং ঘর্মাক্ত হয়েও তাদের লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছিল না। অথচ তারা মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাসও ছাড়তে পারছিলেন না। এই সময়ে তুলনামূলক ভাবে কম মিষ্টির মিষ্টি নিয়ে হাজির হয় প্রিমিয়াম।

দুই. প্রিমিয়ামের প্যাকেজিং হয় বিদেশি মানের। প্রিমিয়ামের মিষ্টির বাক্স হয় দৃষ্টিনন্দন।

মূলত এ দুটি কারণে প্রিমিয়াম দাম দিয়ে প্রিমিয়াম মিষ্টি কেনা শুরু করেন আগ্রহীরা।

প্রিমিয়ামের এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে এগিয়ে আসে রস, জয়পুর সুইটস, প্রমিনেন্ট সুইটস, সালাম ডেয়ারি প্রভৃতি। এর মধ্যে রসের ব্রাঞ্চ বেশি দেখা যায়। তবে প্রথমে যে স্টাইল ও কোয়ালিটি নিয়ে রস এগিয়ে এসেছিল তার কিছুটা হারিয়ে গিয়েছে সম্ভবত অতিরিক্ত সংখ্যক ব্রাঞ্চ ম্যানেজমেন্ট সমস্যায়। গুলশানে প্রিমিয়াম এবং বিশেষত বনানীতে প্রমিনেন্ট সুইটস নিজস্ব স্বাতন্ত্র ও কোয়ালিটি বজায় রেখেছে।

জয় হিন্দ, জয় মিঠাই
ব্যবসা ও শিল্প ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নতিতে আকৃষ্ট হয়েছেন ইনডিয়ান ব্যবসা ও শিল্পপতিরা। গার্মেন্ট শিল্পে ত্রিশ-ঊর্ধ্ব প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েছেন ইনডিয়ানরা। টেলিকমিউিনিকেশনে ইনডিয়ান এয়ারটেল নক আউট করতে চাইছে গ্রামীণফোনকে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ট্রানজিট সুবিধা আদায় করে শিল্প খাতে লোলুপ দৃষ্টি ফেলেছে ইনডিয়ানরা। সুতরাং বাংলাদেশে মিষ্টির বাজারেও যে ইনডিয়ানদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

গুলশানে ইনডিয়ান এন্টারপ্রেনিউয়ার সঞ্জীব কুমারের খাজানা রেস্টুরেন্টের পাশেই খোলা হয় খাজানা মিঠাই। এখন খাজানা মিঠাই এসেছে গুলশান টুতে প্রিমিয়াম-এর বিপরীতে। শুধু তাই নয়। বিভিন্ন সুপার মার্কেটের শেলফে হলদিরামের শনপাপরিসহ অন্যান্য প্যাকেটজাত মিষ্টি দেখা যাচ্ছে।

মিষ্টির ক্ষেত্রে ইনডিয়ান ব্যবসায়িক আগ্রাসন কতোদূর যাবে সেটা বলা মুশকিল। তবে মিষ্টি নির্ভর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ইতিমধ্যেই সফল হয়েছে। মিষ্টিকে মিষ্টি না বলে মিঠাই বলা শুরু হয়েছে। জয় হিন্দ, জয় মিঠাই!

প্রশ্ন হচ্ছে কোলকাতায় যদি প্রিমিয়াম বা প্রমিনেন্টের মিষ্টির দোকান খোলা হয় সেখানে ইনডিয়ান ক্রেতারা আসবেন কি?

কিছুই চিরস্থায়ী নয়
ব্যক্তিগতভাবে আমি পছন্দ করি ড্রাই মিষ্টি। যেমন সন্দেশ ও লাড্ডু।

১৯৫৭-তে লন্ডনে যাবার পর এই দুটি মিষ্টির অভাব বোধ করতাম। বছর তিনেক পরে ঢাকা থেকে লন্ডনে আসেন আমার প্রিয় বন্ধু এবং গিটার টিউটর ওয়ারেস আলী। হিথরো এয়ারপোর্ট থেকে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসার পরে তিনি হাসি মুখে তার সুটকেসটি আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেন, এখানে আছে তোমার গিফট।

…….
লাড্ডু
……
চাবি দিয়ে দ্রুত সুটকেস খুলে দেখলাম, তার ভেতরে একপাশে সন্দেশ এবং আরেক পাশে লাড্ডু! প্লেনে ইকনমি ক্লাসে যে বিশ কেজি ওজনের সুটকেস আনা অনুমোদিত তার পুরোটাই ভর্তি ছিল দশ কেজি সন্দেশ ও দশ কেজি লাড্ডুতে। আমি হতবাক হয়ে ওয়ারেস ভাইয়ের দিকে তাকালাম। তিনি আবার হেসে বললেন, তুমি তো এই দুই ধরনের মিষ্টিই পছন্দ করো।

আপনার কাপড়জামা? আমি জানতে চাইলাম।

আনিনি। ওসব তো লন্ডনে পাওয়া যায়। ওয়ারেসভাই বললেন।

ওয়ারেসভাই নিজে মিষ্টি খুব পছন্দ করতেন। সবরকম মিষ্টিই। দাত নষ্ট হবে অথবা ডায়াবেটিস হবে এমন সতর্কবাণী শোনালে তিনি শুধু বলতেন, কিছুই চিরস্থায়ী নয়। সুতরাং না খেয়ে মরার চাইতে খেয়ে মরাই ভালো।

ওয়ারেসভাইয়ের কথা তার জীবনে সত্যি হয়েছিল।

পেশায় তিনি ছিলেন ফ্লাইং ইন্সট্রাকটর।

ডিসেম্বর ১৯৬৪-এ এক ছাত্রকে ট্রেইনিং দিতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জের অদূরে দুর্ঘটনায় কবলিত হয়ে তার প্লেন শীতলক্ষ্যায় ডুবে যায়।

তিনি ও তার ছাত্র উভয়েই নিহত হন।

৩১ অক্টোবর ২০১১

————–

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: শফিক রেহমান

আর্টস-এ লেখকের আরো লেখা
আজীবন ছাত্র টনি বেন-এর জীবন থেকে ছাত্ররা যা শিখতে পারে


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


10 Responses

  1. Md. S I Bhuiyan says:

    অতি সুন্দের একটা লেখা। পড়ে কিচুক্ষন নস্টালজিয়াতে ভুগলাম, চলে গেলাম পন্চাশের দশকে নবাবপুরে, শাখারীবজারে। কালাচান্দরে পুত্র এখন স্বর্নের ব্যাবসা করেন।বাকিরা কেউ এদেশে নেই।

  2. সৈয়দ আলী says:

    এইই ভালো। খালেদা জিয়ার পোঁ না ধরে যদি ভুঁয়োদর্শী শফিক রেহমান বাংলা ও বাংগালীর বিচিত্র জীবন নিয়ে লেখেন তাহলে একদিকে বাংলাভাষী তরুন প্রজন্ম (পুর্ব)বাংলার ঐতিহ্য সম্পর্কে জানবে আরেকদিকে আমাদের মধুর অতীত স্মৃতি জাগরুক হবে। একই সাথে আমি চিরতরুন শফিক রেহমানকে অনুরোধ করবো তাঁর আত্মজীবনী লিখতে শুরু করতে। পঞ্চাশের দশকে পুর্ববাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কোলকাতার প্রভাবমুক্ত নতুন যে ধারা এবং শক্তিশালী জোয়ার শফিক রেহমান এবং তাঁর সহযোগীরা সৃষ্টি করেছিলেন, আজকের বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি সেই জোয়ারের দোলাতেই দুলছে। আপনাকে শ্রদ্ধা জানাই শফিক রেহমান।

  3. জ্যোতি says:

    লেখাটি স্ট্যান্ডার্ড নয়, তথ্যপূর্ণ নয়, সুখপাঠ্য নয়।

  4. লেখাটা পড়ে বেশ ভালো লাগল। আমার মত মিষ্টিপ্রিয় মানুষদের ভালো লাগার-ই কথা।

  5. Farid Miya says:

    বেশ ভালো লাগল। সাবলীল লেখা। এরকম ঐতিহ্যবাহী খাবার-দাবার ও আচার-ব্যবহার নিয়ে আরো লিখুন।

  6. Russel says:

    খুব ভালো লেগেছে। ধন্যবাদ।

  7. শাকিল হোসাইন says:

    অনেকদিন পর “যায় যায় দিন”-এর “দিনের পর দিন” কলামের স্টাইলের লেথা পেলাম শফিক রেহমানের কাছ থেকে। আরেকটা বিষয়, আমাদের প্রিয় লেখকদের কি রাজনৈতিক দলভুক্ত না হলে হয় না? পুরো দেশটা তো ২ ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে। আপনারা ভাগাভাগিতে নাই বা পড়তেন!

  8. ইমরুল হাসান says:

    শুধুমাত্র কয়েকটা ফর্ম’রে (গল্প, কবিতা, উপন্যাস) সাহিত্য ভাবার যে চিন্তাটা চালু আছে, সেইটার বিপরীতে এই ধরনের লেখারে সাহিত্য হিসাবে আইডেন্টিফাই করাটা ইর্ম্পটেন্ট মনে হয়। কারণ, সাহিত্য ত শুধুমাত্র কিছু ফর্ম-এর উৎকর্ষে র জিনিসই না, আরো অনেক কিছুই…

    শফিক রেহমান-এর গদ্য ত এমনিতেই রসালো, কিন্তু মনে হইছে যে এই লেখাটার আরো এক্সপানশন সম্ভব, তথ্যের দিক দিয়া। যেমন ধরেন, এই মুর্হূতে আরো ২টা জিনিস মনে পড়তেছে–ঢাকা শহরে যে প্রায় বারোমাস-ই রাস্তার পাশে জিলাপী বিক্রি হয় বা ঢাকার বাইরে ভাদ্রমাসের শেষদিকে ‘তালের বড়া’ মিষ্টির দোকানের আরেকটা আইটেম, সেইটার কথা।

    খাওয়া-দাওয়া জিনিসটা শিল্প-সাহিত্যে অংশ হইতে পারে ত!

  9. Dina Akhter says:

    আপনার এই লেখাটা পড়ে খুবই ভাল লাগল। আরো ভালো লাগলো এ জন্য যে এখানে পুরনো ঢাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আজকাল এদেশের লোকের কাছে তো পুরনো ঢাকার কোনো দাম নেই। এক কথায় তালিকার বাহিরে, অথচ এই পুরনো ঢাকার জন্যই আজকের এই ঢাকা শহরের আবাদ হয়েছে। তবে আপনার লেখাটা আমার কাছে বেশি পরিচিত লাগছে কারণ এই কথাগুলো আমার দাদা-দাদী, নানা-নানী আর বাবার কাছ থেকে শোনা। তবে স্যার আপনি একটা জিনিসের নাম উল্লেখ করতে ভুলে গিয়েছেন আর সেটা হলো “দওনা” মানে পাত্র, সেই পুরনো ঢাকায় যে পাত্রে মিষ্টি বিক্রয় করা হতো, অবশ্য এই পাত্রে অল্প পরিমাণের মিষ্টি ধরতো, ২৫০-১০০০ গ্রাম। এটা শুকনো কাঁঠাল পাতা দিয়ে তৈরি হতো, আর এই পাতাগুলো ছোট ছোট কাঠির টুকরা দিয়ে একটার সাথে আর একটা জোড়া দিয়ে পাত্রের আকার ধারণ করতো, যেমন-তরকারীর পেয়ালা। অবশ্য “দওনা” পুরনো ঢাকার লোকেরা বলতো। এটার বাঙলা নাম আমার জানা নেই। এই “দওনা” তে করে শুধু মিষ্টি নয় বিরানী আরো অনেক রকমের খাবার বিক্রি করা হতো। অর্থাৎ হোটেলগুলোতে তখন এই “দওনা”কে প্যাকেট হিসাবে ব্যবহার করা হতো। ধন্যবাদ।

  10. Neyamul says:

    চমৎকার!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.