কথাসাহিত্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের দেড়শ বছর

রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে এ সময়ের গল্পকাররা (কিস্তি ২)

প্রমা সঞ্চিতা অত্রি | 23 Oct , 2011  

[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর ৭০ বছর পরে তাঁর ছোটগল্প নিয়ে কী ভাবছেন এখনকার গল্পলেখকরা? এ সময়ের লেখকদের কাছে রবীন্দ্রনাথের
arts_1.jpgগল্প নিয়ে কিছু প্রশ্ন রাখা হয়। রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা গল্পে কী কী বদল ঘটেছে, রবীন্দ্রগল্পের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য কোনগুলি, রবীন্দ্রনাথের গল্প দিয়ে তিনি কতটা প্রভাবিত বা আদৌ প্রভাবিত কিনা বা তা কোন বৈশিষ্ট্যে আলাদা এবং তাদের প্রিয় রবীন্দ্র ছোটগল্প কোনগুলি–এ বিষয়ে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়। দেখা গেছে, নিজের গল্পে রবীন্দ্রপ্রভাব নিয়ে বলতে গিয়ে গল্পকাররা একেকজন একেক রকম মত প্রকাশ করেছেন। কেউ যেমন নিজের লেখাতে অনেকাংশেই রবীন্দ্রনাথের ছায়া দেখতে পান, তেমনি অনেকেই আবার তাদের লেখায় রবীন্দ্র প্রভাব একেবারে নেই বলেই মনে করেন।
বি. স]

agerkisti.jpg

——————————————————-

রাহাত খান

rahat-khan.jpgজন্ম: ১৯ ডিসেম্বর ১৯৪০

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ছোটগল্প নিয়ে বাংলাদেশে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে।গল্পের আঙ্গিক, বিষয়বস্তু, সংলাপ, চরিত্রায়ন, এই বিষয়গুলোতে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গল্পের যে ভাষা ছিল এবং ছোটগল্প সম্পর্কে তাঁর যে ধারণা ছিল সেগুলো তাঁর পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্প লেখকদের মধ্যে তেমন একটা দেখা যায় নি। তাঁর গল্পের মধ্যে যে প্রকৃতি বর্ণনা এবং বিশেষ করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনের চরিত্র-চিত্রণে তাঁর যে দক্ষতা, সেটা পরবর্তী সময়ে আসলে খুব কম লেখকের লেখাতেই পাওয়া যায়। হয়ত হাতে গোনা কয়েকজন লেখকের নাম বলা যাবে যাদের কিছু গল্প হয়ত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর মধ্যে পড়ে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মত এত এত গল্প এবং এত উচ্চমানের গল্প যে আর কেউ লিখতে পারেননি সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহই নেই।


অনেক সময় গল্পে লেখকের কোনো না কোনো অভিজ্ঞতার কথা… তাঁর গল্পে চলে আসে এবং অনেক সময় মনে করা হয় যে সাহিত্য মানেই হচ্ছে যিনি লেখক তার একটা আত্মচরিত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথ অনুপস্থিত। দুই-একটা গল্প হয়ত আলাদা যেমন, পোস্টমাস্টার, বোস্টমী, কাবুলিওয়ালা। এই কয়েকটা গল্প ছাড়া বাকি সব গল্পে রবীন্দ্রনাথ অনুপস্থিত থেকেছেন… তার ছোটগল্পে। এটা একটা বিশাল ব্যাপার। এই যে এভাবে নিজেকে… আত্মগোপন করে রাখা, এটা বলতেই হবে যে অসাধারণ একটা বিষয়।

রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের ক্ষেত্রে তিনটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি। প্রথম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গল্পের ভেতরে কখনো প্রবেশ করেননি। যাদের গল্প, তাদের গল্পই তিনি লিখেছেন। অনেক সময় গল্পে লেখকের কোনো না কোনো অভিজ্ঞতার কথা… তাঁর গল্পে চলে আসে এবং অনেক সময় মনে করা হয় যে সাহিত্য মানেই হচ্ছে যিনি লেখক তার একটা আত্মচরিত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথ অনুপস্থিত। দুই-একটা গল্প হয়ত আলাদা যেমন, পোষ্টমাস্টার, বোস্টমী, কাবুলিওয়ালা। এই কয়েকটা গল্প ছাড়া বাকি সব গল্পে রবীন্দ্রনাথ অনুপস্থিত থেকেছেন… তার ছোটগল্পে। এটা একটা বিশাল ব্যাপার। এই যে এভাবে নিজেকে… আত্মগোপন করে রাখা, এটা বলতেই হবে যে অসাধারণ একটা বিষয়। এই গেল একটা বৈশিষ্ট্য।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের কবিতার মত তাঁর ছোটগল্পেও প্রকৃতি একটা বিরাট জায়গা দখল করে আছে। গল্পে একটা ঘটনা থেকে অন্য ঘটনায় যাওয়ার যে স্পেসটা, সেটাকে আমরা বলি যতি, সেখানে প্রকৃতিই বারবার ফিরে এসেছে তাঁর গল্পে। যেমন পোস্টটমাস্টার গল্পে পোস্টমাস্টার যখন চলে যাচ্ছিলেন নৌকায় করে তখন একবার তিনি ভাবলেন যে ফিরে যাই। কিন্তু তারপর তিনি বললেন যে ততক্ষণে পালে বাতাস লেগেছে, নৌকা তীরবেগে ছুটে চলেছে ইত্যাদি। এরকম আরও বহু গল্প আছে রবীন্দ্রনাথের যেখানে তিনি প্রসঙ্গান্তরের ক্ষেত্রে প্রকৃতিকে টেনে এনেছেন। যেমন, ঘাটের কথা, রাজপথের কথা–এসব গল্পে দেখা যায় যে আসলে প্রকৃতিও উনার একটা চরিত্র। তাঁর গল্পের অন্যান্য চরিত্রের মত প্রকৃতিরও একটা বিশেষ ভূমিকা আছে তাঁর ছোটগল্পগুলোতে। রবীন্দ্রনাথ বরাবরই খুব নিস্পৃহ ছিলেন তাঁর ছোটগল্পগুলোতে। মানে কখনোই কোনো ছোটগল্পে তাঁকে উচ্ছ্বসিত হতে দেখা যায়নি, কেবলমাত্র প্রকৃতি বর্ণনা ছাড়া। কিন্তু প্রকৃতি বর্ণনার সময়ও তাঁর মধ্যে রিলেভেন্ট একটা ব্যাপার ছিল। মানে যেখানে প্রকৃতি বর্ণনা একেবারে না করলেই না, সেখানেই তিনি প্রকৃতিকে ডেকে এনেছেন।

তৃতীয় বৈশিষ্ট্য যেটা, সেটা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের ভাষা। রবীন্দ্রনাথ যখন ছোটগল্প লিখতে শুরু করেন তখন তো বাংলা সাহিত্যের গদ্যের অবস্থা ছিল হাঁটি হাঁটি পা পা। মানে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে বঙ্কিমচন্দ্র পর্যন্ত খুবই অল্পদস্তুর ক্ষমতা অর্জন করেছিল বাংলা সাহিত্য। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মধুসূদন দত্ত আর বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়–উনারা তিনজনই সংস্কৃতপ্রবণ বাংলা লিখতেন। বিশেষত বঙ্কিমচন্দ্র। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এসে যেন বাংলা সাহিত্যের, মানে বাংলা গদ্যের একেবারে দুয়ার খুলে দিলেন। যে কারণে বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক উপন্যাস বলা হয় চোখের বালিকে এবং এখনও পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের কোনো আধুনিক উপন্যাসের কথা বললে প্রথমেই চলে আসে চোখের বালি’র নাম।

আমার নিজের কথা বলতে গেলে বলা যায়, আমি হচ্ছি রবীন্দ্রনাথের একজন উত্তরসূরী। আমি তাঁর ভাষাতেই লিখছি। রবীন্দ্রনাথ যে প্রাসাদ তৈরি করে গিয়েছিলেন সেই প্রাসাদের বাসিন্দা আমি। আমিও চেষ্টা করেছি যে কত ভাবে মানুষের ভিতরে প্রবেশ করা যায় এবং সেখান থেকে তাকে তুলে আনা যায় আমার গল্পের ভেতর, উপন্যাসের ভেতর। আমি আগেও বলেছি রবীন্দ্রনাথের বাইরে বাংলা সাহিত্যে এমন দু’চার জন আছেন যারা প্রত্যেকেই দু’একটি করে চিরজয়ী গল্প লিখেছেন। আমি হয়ত সেরকম দু’একটা গল্প লিখেছি, সে রকম হতে পারে। আমরা তো রবীন্দ্রনাথেরই শিষ্য, তাঁরই উত্তরসূরী। আমাদের হাতে গল্পের যে ভাষা, আমাদের মানে রবীন্দ্র-পরবর্তী আমলের পর থেকে এখন পর্যন্ত, আমাদের হাতে ছোট গল্পের ভাষা নানাভাবে পরীক্ষিত হয়েছে, নানাভাবে নির্মিত হয়েছে, নানাভাবে বর্ণিত হয়েছে। কিছু যোগ করেছি, কিছু বা বর্জন করেছি–এই আর কি। তো আমার কাছে মনে হয় যে আমরা রবীন্দ্রযুগকে ততটা অতিক্রম করতে পারি নি। যদিও ত্রিশের পর থেকে এখন পর্যন্ত লেখা ছোট গল্পে রবীন্দ্রনাথকে ছাড়িয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় যে আমরা কেউই আসলে তাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারি নি।

রবীন্দ্রনাথের অনেক গল্পই আমার খুব প্রিয়। এর মধ্যে ঘাটের কথা গল্পটার কথা একটু বিশেষভাবে বলা যায়। এর যে কুসুম চরিত্রটা সেটা আমার খুব পছন্দের একটা চরিত্র। তারপর কাবুলিওয়ালা, পোস্টমাস্টার–এই গল্পগুলোও আমার খুব পছন্দের কিছু ছোটগল্প।

ইমদাদুল হক মিলন

imdadul-h-m.jpgজন্ম: ৪ নভেম্বর ১৯৫৫

রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর ছোটগল্প দু’টোই আন্তজার্তিকভাবে স্বীকৃত ও সমাদৃত। তিনি ছিলেন বিশ্বনন্দিত একজন ব্যক্তিত্ব এবং তিনি যে গল্পগুলো লিখেছেন তা এখনও পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের অমর ও অমূল্য এক সম্পদ। এই মানের ছোটগল্প তাঁর পরবর্তী সময়ের লেখকরা কেউ লিখতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু তারপরেও বাংলা ছোটগল্প অনেক দূর এগিয়েছে। আমি কয়েকজন লেখকের নাম বলি যাঁরা বাংলা ছোটগল্পকে খুব বড় একটা জায়গায় নিয়ে গেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রথমেই যে লেখকের নাম বলতে হবে তিনি হচ্ছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। প্রেমেন্দ্র মিত্র অসাধারণ কিছু গল্প লিখেছেন, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, তিনিও অসাধারণ কিছু গল্প লিখেছেন। মানিক, বিভুতি ও তারাশঙ্কর এই বন্দ্যোপাধায়ত্রয়ী–এই তিনজনের ছোটগল্পও অবিস্মরণীয় সব ছোটগল্প। সতীনাথ ভাদুড়ীর দুর্দান্ত সব গল্প আছে এবং তারও পরে বিমল কর, সুনীল গঙ্গোপাধায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়–এরা, তারও আগে ভূপেন্দ্রনাথ মিত্র এবং তার আরেকটু আগে সমরেশ বসু–এরা সবাই মিলে বাংলা ছোটগল্পকে একটা বড় জায়গায় নিয়ে গেছেন। আবার বাংলাদেশে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর দুর্দান্ত কিছু গল্প আছে এবং হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, এঁদের অসাধারণ সব ছোটগল্প আছে। সব কিছু মিলিয়ে রবীন্দ্র পরবর্তীকালেও বাংলা সাহিত্যে আন্তজার্তিক মানের বেশ কিছু ছোটগল্প লিখিত হয়েছে এবং একইভাবে অনেক গুণী গল্পকারেরও সমাগম ঘটেছে।


রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি আমার ছোটগল্প নিয়ে কথা বলাটা আমার কাছে রীতিমত এমব্যারাসিং একটা ব্যাপার বলে মনে হয়। এটা একেবারেই অসঙ্গত মনে হয় আমার কাছে। কারণ রবীন্দ্রনাথের সাথে তো আমাদের সময়কার বা আমাদের আগে পরের কারোরই তুলনা করা ঠিক না। আমরা যারা পরবর্তীকালে লিখতে শুরু করেছি, মানের দিক দিয়ে রবীন্দ্রনাথের কোনো ছোটগল্পের ধারে কাছে কোন গল্প কেউ লিখতে পেরেছেন বলে আমার অন্তত মনে হয় না।

রবীন্দ্রনাথের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তিনি কিন্তু ছোটগল্পের একটা সংজ্ঞা দিয়েছিলেন। ‘ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা; যারা তাঁর পাঠক তারা অধিকাংশই তাঁর এই সংজ্ঞাটির সাথে পরিচিত। সেই সংজ্ঞার ভিতরে থেকে রবীন্দ্রনাথ চরিত্রচিত্রণে, পরিবেশচিত্রণে, সংলাপের ক্ষেত্রে অসম্ভব দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ তো আসলে এক্সট্রা অর্ডিনারি প্রতিভাবান একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর ধারে কাছেও তো পরবর্তীকালে কোন বাঙালি সম্ভবত পৌঁছাতে পারেনি। শুধু তাই না, আমি বলব এই পৃথিবীতেই তাঁর মাপের মানুষ খুব কম জন্মেছেন। তাঁর ছোটগল্পগুলোকে আমার এখনও পর্যন্ত আদর্শ গল্প বলে মনে হয়। দু’তিনটি বিশেষ কারণে। প্রথমত খুব সরল আঙ্গিকে গল্পগুলো লেখা। পাঠক তাঁর গল্প পড়তে শুরু করলে খুব সহজেই এর ভেতরে ঢুকে যাবে। প্রতিটি চরিত্রকে খুব পরিচিত মনে হবে, অর্থাৎ গল্পকে চোখের সামনে ছবির মত দেখা যাবে। এটিই তাঁর সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য এবং সবকিছু মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত জীবনের খুব বড় একটা দর্শন বা খুব বড় একটা ব্যাপারকে তিনি উপস্থাপন করেন। এখানে আমি একটা ছোট্ট উদাহরণ দিব। সেটা হচ্ছে ‘ছুটি’ নামে তাঁর একটা গল্প আছে। অনেকে এটাকে কিশোর পাঠ্য গল্প মনে করেন। ক্লাস সিক্স বা সেভেনের বইতে এটা আছে। গল্পের মূল চরিত্র ছিল ফটিক নামের এক কিশোর। গল্পের কাহিনীটি ছিল এরকম যে গ্রামের একটি বাচ্চা ছেলেকে তার স্বাধীন মুক্ত জীবন থেকে শহরে ছোট্ট একটি খাঁচার মত একটা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে যেয়ে পরে ফটিক মারা গেল। এই তো হচ্ছে মূল গল্প। কিন্তু গল্পের ব্যাখ্যাটা হচ্ছে ফটিককে যখন স্টিমারে করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন পথে যেতে সে দেখেছিল স্টিমারের খালাশিরা জল মাপে- এক বাঁও মেলে না, দুই বাঁও মেলে। এটা ফটিকের মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। মৃত্যুর মুহূর্তে ফটিকের মনে এ ব্যাপারটা চলে আসে। মারা যাওয়ার সময় তার চোখে ভাসছিল ওই জল মাপার দৃশ্যটা যে ‘এক বাঁও মেলে না, দুই বাঁও মেলে’। এর অর্থটা কী? গল্পটার নাম ছুটি কেন? ফটিক আসলে জীবনের তল খুঁজছিল। মৃত্যু এমন এক জগৎ যেটার কোনো তল পাওয়া যায় না। আর এই তল খোঁজার মধ্যে দিয়ে তার ছুটিটা হয়ে যাচ্ছে। এই ছুটি মানে জীবন থেকে ছুটি। যার নাম মৃত্যু। এই তো হল রবীন্দ্রনাথ! আমার ধারণা, এ রকম একেকটি উদাহরণ থেকে তাঁর গল্পগুলোকে আমরা বিবেচনা করতে পারি।

রবীন্দ্রনাথ এমন এক ব্যক্তি যাঁর প্রভাব কোন বাঙালির জীবনে নেই–এটা হতেই পারে না। রবীন্দ্র পরবর্তীকালের প্রতিটা বাঙালির শ্বাস-প্রশ্বাসে তিনি মিশে আছেন। রবীন্দ্রনাথের গল্প, কবিতা, গান, নাটক, উপন্যাস, পত্র বা পত্রাবলী, তাঁর সমাজ সংস্কার–যে ক্ষেত্রেই তিনি কাজ করেছেন, সবকিছু মিলিয়েই তিনি আমাদের শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে জড়িয়ে আছেন। সুতরাং তাঁকে বাদ দিয়ে বা তাঁর প্রভাবমুক্ত হয়ে কোন কাজ করা বা কোনো কিছু লেখা–এটা কোনো বাঙালির পক্ষে সম্ভব না। রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি আমার ছোটগল্প নিয়ে কথা বলাটা আমার কাছে রীতিমত এমব্যারাসিং একটা ব্যাপার বলে মনে হয়। এটা একেবারেই অসঙ্গত মনে হয় আমার কাছে। কারণ রবীন্দ্রনাথের সাথে তো আমাদের সময়কার বা আমাদের আগে পরের কারোরই তুলনা করা ঠিক না। আমরা যারা পরবর্তীকালে লিখতে শুরু করেছি, মানের দিক দিয়ে রবীন্দ্রনাথের কোনো ছোটগল্পের ধারে কাছে কোন গল্প কেউ লিখতে পেরেছেন বলে আমার অন্তত মনে হয় না। আর আমার এই ধৃষ্টতা নেই যে রবীন্দ্রনাথের গল্পের পাশাপাশি নিজের গল্পের ব্যাখ্যা করব। সময়ের একটা ব্যাপার অবশ্যই আছে এটা আমি জানি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এমন এক ব্যক্তি যে তাঁকে কোনো কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। তাঁর গল্পগুলো সব সময়ই আধুনিক। এখন থেকে একশ বছর আগে যতটা আধুনিক ছিল এখনও ততটাই আধুনিক থাকবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেটা বদলেছে সেটা হল পরবর্তীকালে যারা লিখতে শুরু করেছেন তারা সময়টাকে ধরবার চেষ্টা করেছেন–দেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে ধরবার চেষ্টা করেছেন, রাজনৈতিক অবস্থাকে ধরবার চেষ্টা করেছেন। আমি শুধু আমার একটা লেখার কথা উল্লেখ করব। সেটা হল কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে আমার একটা বই বেরিয়েছিল নাম ‘দেশভাগের পর’। ঐ বইয়ে এগারোটা গল্প ছিল এবং প্রতিটা গল্পেরই বিষয় ছিল পার্টিশন। ৪৭-এর দেশভাগের উপর আমি কতগুলো গল্প লিখেছিলাম। সেই গল্পগুলোর কোনো কোনোটা আমার খুব পছন্দের। আবার মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময় নিয়েও আমি কিছু গল্প লিখেছিলাম। তার মধ্যেও অনেকগুলো গল্প আছে যেটা আমার মনে হয়েছে আমি যেমনভাবে লিখতে চেয়েছি, তার কাছাকাছি আমি পৌঁছতে পেরেছি। তো সবকিছু মিলিয়ে সময়ের একটা ব্যাপার নিশ্চয় আছে। রবীন্দ্রনাথ দেশভাগ দেখেননি। তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধও দেখেননি। কিন্তু তাঁর বহু গল্পে মানুষের জীবনের, মানুষের রাষ্ট্রের ও সমাজের এমন কিছু কথা বলা হয়েছে যেগুলো চিরকালীন। আমরা আমাদের গল্পকে অতটা চিরকালীন করতে পারিনি। এটা আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি। কিন্তু আমরা সে চেষ্টাটা করেছি। পরবর্তীকালের লেখকরাও সে চেষ্টাটা করেছেন বা করে যাচ্ছেন, কোনো কোনো লেখক এখনও।

এক কথায় রবীন্দ্রনাথের একটা বা দু’টো গল্প আমার প্রিয় এ রকম বলা যাবে না। রবীন্দ্রনাথের সব গল্পই আমার আলাদা করে প্রিয়। বিশেষভাবে বললে যেমন তাঁর ছুটি গল্পটা আমার খুব পছন্দের একটা গল্প। তারপর নষ্টনীড়, রবিবার, মুসলমানীয় গল্প, অতিথি–এরকম অনেক গল্পের কথাই বলা যায়। সুতরাং তাঁর গল্পের কথা বলে শেষ করা যাবে না। আমি যতদূর জানি, তিনি প্রায় ১১৪টি গল্প লিখেছেন যার প্রত্যেকটি গল্পই আমার কাছে আলাদা করে প্রিয়!

জিয়া হাশান

zia-hashan.jpgজন্ম: ৪ নভেম্বর ১৯৬৬

রবীন্দ্রনাথের পরে আমাদের বাংলা সাহিত্যে পরিবর্তন তো কিছু অবশ্যই হয়েছে, বিশেষত ছোটগল্পে এবং এর কাঠামো ও ভাষাভঙ্গীতে। এখন এ পরিবর্তন ভালো কি মন্দ বা টিকবে কি টিকবে না সেটা হয়ত অন্য প্রশ্ন, কিন্তু পরিবর্তনটা এসেছে। যেমন রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে কোথাও কাহিনীহীন কোন গল্প নাই। কিন্তু আমাদের এখানে ইদানিং কাহিনী ছাড়াও গল্প লেখা হচ্ছে এবং বেশ উল্লেখযোগ্য ভাবেই হচ্ছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ গল্পই এখন লিখিত হচ্ছে যেগুলোর আসলে নির্দিষ্টভাবে কোন গল্প বা কাহিনী নেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কোন ছোটগল্পেই কিন্তু কাহিনীহীন কোন গল্প নাই। আবার ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারটা এখন দেখতে পাই যে–আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের যে ভাষা বা সাধারণ মানুষের মুখের যে ভাষা সে ভাষাতেই এখন গল্প লিখছেন লেখকেরা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সময় থেকেই মূলত যে ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল–সেটা হচ্ছে, তাঁর সময় থেকেই সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা আর গল্প উপন্যাসের ভাষা পৃথক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন গল্পকারেরা আবার সেই পুরোনো পথেই ফিরে যাচ্ছেন। এখন আবার সাহিত্যের মধ্যে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাই ব্যবহৃত হচ্ছে। সাহিত্যের ভাষা বলে যে আলাদা একটা ভাষা তৈরি হয়েছিল, এখন আর গল্প উপন্যাসে সেটা চোখে পড়ে না।


এই বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রায় সবই তাঁর ছোট গল্পে পাওয়া যায়। অর্থাৎ ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য যেরকম হওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেছেন সে অনুযায়ীই তিনি কবিতাটি লিখেছেন এবং সে অনুযায়ীই তিনি তার গল্পগুলো লিখতেন অথবা তাঁর ছোটগল্পের যা যা বৈশিষ্ট্য তাই তিনি তাঁর কবিতাতে লিখেছেন।

ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য কেমন হবে তা রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর একটি কবিতায় বলে গিয়েছিলেন। কবিতার লাইনগুলো এ মুহূর্তে আমার ঠিক পুরোপুরি মনে পড়ছে না। মানে একটা গল্পের ছোট ছোট দুঃখ বেদনার কথা থাকবে এবং খুব স্বল্প পরিসরে একটা কাহিনীর বর্ণনা থাকবে। আবার ছোটগল্প হবে এমন যে ‘শেষ হইয়াও হইলো না শেষ’, অর্থাৎ রহস্যময়তা থাকবে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রায় সবই তাঁর ছোট গল্পে পাওয়া যায়। অর্থাৎ ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য যেরকম হওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেছেন সে অনুযায়ীই তিনি কবিতাটি লিখেছেন এবং সে অনুযায়ীই তিনি তার গল্পগুলো লিখতেন অথবা তাঁর ছোটগল্পের যা যা বৈশিষ্ট্য তাই তিনি তাঁর কবিতাতে লিখেছেন। তাঁর ম্যাক্সিমাম ছোটগল্পেই ওই বৈশিষ্ট্যগুলো আছে। বিশেষ করে তাঁর প্রথম দিকের গল্পগুলোতে। শেষের দিকের গল্পগুলোতে হয়ত অতটা নাই।

আমি আমার লেখালেখির প্রথম দিকে প্রতিবছর একবার করে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছটা পড়তাম। এখনো পড়ি। তাঁর লেখা পড়তে ভালো লাগে এবং তাঁর লেখা থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। কিন্তু তাঁর গল্প দ্বারা আমার গল্প প্রভাবিত হয়েছে বলে কখনো মনে হয়নি। আমার মনে হয় না, আমরা এখনও প্রভাবিত হচ্ছি বা হই তাঁর দ্বারা। সময়ের ক্ষেত্রে আমরা রবীন্দ্রনাথের দিক দিয়ে অনেক বেশি এগিয়ে গেছি। স্বাভাবিকভাবে এখন তো আর তার সময়ের প্রেক্ষাপটে লেখা হবে না। আমি শুরুতেই যেটা বলেছি যে রবীন্দ্রনাথ বা তাঁর সময়ের গল্পগুলোতে সম্পূর্ণ প্যাকড একটা কাহিনী থাকত, কিন্তু আমার বা আমাদের গল্পে এখন আর সেরকম প্যাকড কোনো কাহিনী থাকে না। যেমন, কাহিনী ছাড়াও এখন একজন মানুষের একদিনের কার্যক্রম নিয়েও একটা গল্প হতে পারে বা আর কিছুই না, স্রেফ একজন মানুষের একটা চিন্তা বা একটা ভাবনা নিয়েও একটা গল্প হতে পারে। আমাদের গল্পগুলো এখন এ রকম হয়ে গেছে। আমার গল্পে দেখা যায়, একটা কাহিনীর ভেতর হয়ত আরও পাঁচটা কাহিনী ঢুকে গেছে বা এরকম আর কি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে এরকম দেখা যায় না। তাঁর অধিকাংশ গল্পই একরৈখিক যা সরাসরি একটা কাহিনীকেই বর্ণনা করে গেছে। তো আমাদের সময়ের গল্পগুলো এখন যে রকম আমার গল্পও আমি বলব যে বর্তমান সময়ের এই পরিবর্তিত বৈশিষ্ট্যগুলোকে ধারণ করছে, এর বাইরে কিছু নয়। আর ভাষাগত একটা ব্যাপার আছে। আমরা এখন আর রবীন্দ্রনাথের ভাষা ব্যবহার করি না। আমরা আমাদের এই পূর্বাঞ্চলের ভাষা ব্যবহার করি বা আমাদের মুখের ভাষা যতটা সম্ভব ফলো করার চেষ্টা করি।

রবীন্দ্রনাথের খাতা গল্পটি আমার অন্য রকম প্রিয় একটা গল্প, মানে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণহীনভাবে প্রিয় একটা গল্প। আরেকটা গল্প আছে নাম ক্ষুধিতপাষাণ। এটাও আমার খুব প্রিয় একটা গল্প। এই গল্পে রহস্যময়তার একটা ব্যাপার আছে। যেটা আমি মনে করি, একটা গল্পের মাঝে থাকলে গল্পটা আরও স্ট্রং হয়। এছাড়া তাঁর একরাত্রি, হালদার গোষ্ঠী, হৈমন্তি–এই গল্পগুলো আমার বেশ প্রিয়। এছাড়া তাঁর কিছু গল্প আছে যেগুলো বলতে গেলে প্রায় সবারই অনেক প্রিয় এবং সেগুলোর অধিকাংশই বেশ জনপ্রিয় যেমন, পোস্টমাস্টার, কাবুলিওয়ালা ইত্যাদি। এগুলোও আমার কাছে ভালো লাগে। তবে আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প হচ্ছে তাঁর খাতা গল্পটি। এ গল্পে তিনি মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলেছেন–যে কারণে এটা আমার কাছে অন্য গল্পগুলোর চাইতে একটু বিশেষভাবে ভালো লাগে।

মানস চৌধুরী

manosh-c.jpgজন্ম: ২৪ মার্চ ১৯৬৯

ছোটগল্প তো বটেই, সময়ের সাথে সকল শাখারই পরিবর্তন হতে থাকে নিরন্তর। রবীন্দ্রপরবর্তীকালে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে আমার মনে হয় অন্তত দুটো জায়গায়: প্রথমত, টাইম-লাইন এ লিনিয়ার গল্পই কেবল আর লেখা হচ্ছে না এবং দ্বিতীয়ত, কেবল মহৎ বা ভার্চুয়াজ লোকজনই আর নায়ক-নায়িকা বা মূখ্য চরিত্র থাকছেন না একটা কাহিনীর। যে বিষয়গুলো রবীন্দ্রছোটগল্পের কেন্দ্রিয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে আমরা দেখতে পাই।

রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পে খারাপ মানুষ প্রায় পাওয়াই যায় না বা বলা যায় শিক্ষায়, আলোয় আলোকিত নন এমন চরিত্রের উপস্থিতি কম। অর্থাৎ শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কথাই তাঁর গল্পে বেশি এসেছে। তবে ছুটি, অতিথি, আপদ–এমন অনেক পাল্টা উদাহরণও আনা যাবে। কিন্তু একটা অদ্ভুত মায়াময়তার আবেশ রয়েছে তাঁর গল্পে, সেটিই সম্ভবত আরও নিবিড় পরিচয় তার কাজের; এমন কি তাঁর সময়কার কাজের যা বৈশিষ্ট্য–হিসেবে ধরতে গেলে বেশ স্বতন্ত্রই বলা যায়।


এই মুহূর্তে আমি রবীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত এটা ভাবতে আমার বিশেষ আরাম লাগবে না, কিন্তু কথনের শক্তিশালী বৈশিষ্ট্যের কারণে রবীন্দ্রনাথ উত্তরকালের হাজারে হাজারে লেখককে প্রভাবিত করেছেন; তা লেখক স্বয়ং বুঝুন বা নাই বুঝুন। আমার ধারণা আবছায়া রসবোধের বিষয়ে আমি তার দ্বারা প্রভাবিত।

সাহিত্য হচ্ছে এক বড় আজব অনুশীলন কিংবা কী জানি হয়তো যে কোন অভিব্যক্তিই, যেমন ধরা যাক সঙ্গীত। আপনি পূর্বসুরিদের দ্বারা কোন না কোনভাবে প্রভাবিত হবেনই! আর রবীন্দ্রনাথ তো একজন শক্তিশালী প্রভাবক বটেই। ফলে, যদিও এই মুহূর্তে আমি রবীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত এটা ভাবতে আমার বিশেষ আরাম লাগবে না, কিন্তু কথনের শক্তিশালী বৈশিষ্ট্যের কারণে রবীন্দ্রনাথ উত্তরকালের হাজারে হাজারে লেখককে প্রভাবিত করেছেন; তা লেখক স্বয়ং বুঝুন বা নাই বুঝুন। আমার ধারণা আবছায়া রসবোধের বিষয়ে আমি তার দ্বারা প্রভাবিত। হয়তো আরও সময় নিয়ে ভাবলে আরও পাওয়া যাবে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, এখানে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে একটা স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন করা হচ্ছে–আমি এর সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে। হয় রবীন্দ্রনাথের মত নয়তো নয় কিংবা এই দিক দিয়ে রবীন্দ্রনাথের মত আর ওই দিক দিয়ে নয়, আমি এই মতের একেবারেই বিরোধী। আমার কথা হচ্ছে আমার লেখা তো যে কারও মতই হতে পারে আবার কারো মতো নাও হতে পারে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে স্ট্যান্ডার্ড ধরেই কেন সেটাকে যাচাই করতে হবে? আমার কাছে এই ভাবনাটাকেই সমস্যাজনক বলে মনে হয়।

রবীন্দ্রনাথের কৈশোরে পড়া গল্পগুলোই আমার বেশি প্রিয়। একদম পয়লা দিকে যে গল্পগুলো পড়া তার গুরুত্ব সবসময়ই আলাদা। ছুটি, অতিথি–এই নামগুলো মনে পড়লেই একটা মায়াময়তায় আচ্ছন্ন হই এখনো। কষ্ট লাগে। ফলে, এগুলোর কথা বলা যায়। কিন্তু এগুলো যত না প্রিয়, তার থেকে অনেক বেশি স্মৃতির একটা স্মারক, একটা উপলক্ষ বা অনুভূতির লিগেসি, হয়তো বা নস্টালজিয়া।

আহমাদ মোস্তফা কামাল

ahmad-m-k-1.jpgজন্ম: ১৪ ডিসেম্বর ১৯৬৯

রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী সময়ে বাংলা ছোটগল্পের পরিবর্তন নিয়ে বলতে গেলে বলতে হবে যে বিষয়, ভাষা ও আঙ্গিকের দিক দিয়ে এর পরিবর্তন হয়েছে বিপুল পরিমাণে। আমরা যদি খেয়াল করি তাহলে দেখব গল্পের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বিষয়ের দিক দিয়ে বহুমাত্রিক পরিবর্তন এসেছে। কিছু কিছু বিষয় যেগুলো রবীন্দ্রনাথ হয়ত একেবারেই ধরেননি কিংবা তাঁর যে সময়ে তিনি লিখেছেন, সে সময়ে হয়ত বিষয়গুলো সমাজে সেভাবে বিদ্যমান ছিল না, সে বিষয়গুলো পরবর্তী সময়ে গল্পে এসে গেছে। যেমন ধরুন একেবারে গ্রামীণ অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের যে জীবন বা শহুরে শ্রমজীবী মানুষের যে জীবন সে সমস্ত বিষয় তো এসেছেই, সেই সাথে নানান রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাত, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার যে অভিঘাত—সে বিবরণগুলোও চলে এসেছে পরবর্তীকালের গল্পে। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের সময়ের যে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা সেটাই তো আসলে বদলে গেছে। তার সময়ে দেশে ব্রিটিশ রাজত্ব চলছিল। সেই ব্রিটিশ আমলের রাজনৈতিক বাস্তবতা আর এখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতা তো এক নয়। ব্রিটিশ আমলের স্বাধীনতা আন্দোলন, দেশভাগ, পরবর্তীতে পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এরকম অনেকগুলো ঘটনা একের পর এক ঘটে গেছে আমাদের জাতীয় জীবনে। তো এই অভিজ্ঞতাগুলো তো রবীন্দ্রনাথের ছিল না। সুতরাং গল্পের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো প্রভাব ফেলেছে।


আমাদের ব্যক্তিগত চিন্তার জগৎ, পারস্পরিক যোগাযোগের ধরন, আমাদের ক্লান্তি, বেদনা, সবকিছুই তো তখনকার চেয়ে আলাদা। ফলে এ বিষয়গুলো যখন গল্পে চলে আসে, তখন স্বভাবতই তা রবীন্দ্রগল্প থেকে আলাদা হয়ে যায়।

যেমন দেশভাগের কথাই ধরা যাক। দেশভাগের যে অনুভূতি বা দেশত্যাগের যে অনুভূতি সেই অনুভূতি কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ছিল না। ফলে তাঁর পক্ষে এই বিষয়টিকে তাঁর গল্পে ধারণ করাই সম্ভব না। কিন্তু এই বিষয়টা তো ইতিমধ্যে আমাদের ভারতবর্ষের মধ্যে ঘটে গেছে, আমাদের সমাজ-বাস্তবতায় ঘটে গেছে। দুই বাংলা ভাগ হয়ে গেছে, হাজার হাজার মানুষ এদেশ ছেড়ে ও দেশে পাড়ি দিয়েছে। দেশ ভাগের এই যে মর্মান্তিক বেদনা, উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া বা শেকড় ছিন্ন হয়ে যাওয়ার যে বেদনা, সে বেদনাগুলো তো আসলে তাঁর ধরবার কোন উপায় ছিল না। কারণ এ ঘটনাটা তাঁর সময়ে ঘটেনি। ফলে গল্পের বিষয়ের ক্ষেত্রে এ রকম নানা পরিবর্তন এসেছে। সেটা রাজনৈতিক কারণেই হোক, অর্থনৈতিক কারণেই হোক বা সামাজিক কারণেই হোক–এটা হয়েছে এবং তার পরবর্তীকালে লেখকরা এই পরিবর্তনগুলো, পরিবর্তিত সমাজের যে চিত্রগুলো, সেগুলো তাদের গল্পে নিয়ে এসেছেন। ফলে বিষয়ের দিক থেকে একটা পরিবর্তন আসবেই। আর বিষয়ের যখন পরিবর্তন ঘটে তখন আপনা আপনি ভাষা ও আঙ্গিকেরও পরিবর্তন ঘটে যায়। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের যে স্টাইল, তাঁর গল্পের যে রোমান্টিসিজম বা রোমান্টিক চেতনা, সেটাকে চ্যালেঞ্জ করেই পরবর্তীকালে গল্পকারেরা গল্প লিখতে শুরু করেন। সেখানে যেটা হল যে রবীন্দ্রনাথ যেসব বিষয় স্পর্শ করেন নি, পরবর্তীকালের লেখকরা তাদের লেখায় সেই বিষয়গুলো স্পর্শ করেছেন, যেমন যৌনতা। এছাড়া জীবনের যে নেতিবাচক দিকগুলো, ক্লান্তিকর ও বেদনাদায়ক যে দিকগুলো–সেগুলো নিয়ে তারা কাজ করা শুরু করলেন। ফলে, বিষয়টা যখন পাল্টে গেল তখন ভাষাটাও পাল্টে গেল। কারণ আনন্দকে ধারণ করার ভাষা আর বেদনাকে ধারণ করার ভাষা তো কখনো এক হয় না। ফলে ভাষার পরিবর্তন হল এবং অভিব্যক্তিরও পরিবর্তন হল। এভাবে বিষয় বৈচিত্র্য, স্টাইল, বর্ণনা ভঙ্গি, গল্পের যে মূল ভাবনা–এ সমস্ত কিছুই পাল্টে গেছে।

রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন আমাদের বাংলা ছোট গল্পের প্রথম সফল লেখক। তিনি গল্পটাকে গড়েছেন তাঁর নিজের মত করে। ফলে তিনি এসে প্রথমেই যেটা করেছেন, নানারকম বিষয় ভাবনা নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি প্রকৃতি নিয়ে যেমন লিখেছেন, তেমনি মানব মনের যে মনস্তাত্ত্বিক অন্তর্দ্বন্দ্ব, প্রকৃতি ও মানুষের মাঝে যে সম্পর্ক এবং সামাজিক নানা সংস্কার, এই বিষয়গুলো নিয়েও তিনি কাজ করেছেন। তিনি রোমান্টিক গল্প যেমন লিখেছেন, তেমনি কিশোরদের জন্য রহস্য গল্পও লিখেছেন। মোটকথা তিনি বিষয়বস্তু নিয়ে নানা রকম কাজ করেছেন। তিনি অনেক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়কেও তাঁর গল্পের মাঝে স্থান দিয়েছেন। এটা হল উনার একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আরেকটা যেটা সেটা হচ্ছে, তিনি অসম্ভব দক্ষভাবে প্রকৃতির বর্ণনা দিয়েছেন এবং প্রকৃতির বর্ণনা দিয়ে তিনি মানব মনের অবস্থাটাও ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ মানুষ যে প্রকৃতিরই একটা অংশ এবং প্রকৃতিও মানুষের বিশেষ বিশেষ রূপগুলো যে একাকার–এটাই উনি দেখিয়েছেন তাঁর গল্পে। আর আরেকটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে তাঁর গল্পে সেটা হল প্রকরণগত একটা বৈশিষ্ট্য। গল্প, উপন্যাস বা কবিতার যে ধারা, এগুলোকে উনি নিজের মত করে যেমন গড়েছেন তেমনি আবার ভেঙেছেনও। উনি গল্পের মধ্যে প্রবন্ধের মত করে লিখেছেন, আবার প্রবন্ধের মধ্যে এনেছেন কাব্যিকতা। উনার লেখায় তিনি সাহিত্যের যে বিভিন্ন শ্রেণী বিভাগ, তা ভেঙ্গেচুরে একাকার করে দিয়েছেন। উনি নিজের–উনার স্টাইলটাকে ভেঙে দিয়েছেন, বেরিয়ে এসেছেন এবং আবার নতুনভাবে গড়েছেন। এটা পরবর্তী লেখকদের মাঝে আর খুব বেশি দেখা যায় নি।

নিজের লেখা নিয়ে বলা আসলে খুব কঠিন একটা ব্যাপার। তবুও বলছি, রবীন্দ্রসময়ের যে বাস্তবতা আর বর্তমান যে বাস্তবতা সেটি এক নয়। আমি একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমার মধ্যে দিয়ে এসেছি। ফলে আমার চারপাশে যে বাস্তবতা, যে আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা বা যে রাজনৈতিক বাস্তবতা সেটিই আমাকে গল্প লিখতে উদ্বুদ্ধ করে। যেমন, আমি সামরিক শাসন নিয়ে একটি গল্প লিখেছি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সামরিক শাসন নিয়ে গল্প লেখেননি। কারণ, তিনি সেটা দেখেননি বা তাঁর কুফল ভোগ করেননি। কিন্তু আমি সেটা করেছি। ফলে আমাকে সামরিক শাসন নিয়ে গল্প লিখতে হয়েছে, কিন্তু তাকে হয়নি। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আমি হচ্ছি মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম বা আমি বলব যে আমি একটি মুক্তিযুদ্ধের ফসল। মুক্তিযুদ্ধ আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ফলে এ বিষয়গুলো আমার গল্পে প্রভাব ফেলে। আর তাছাড়া সময়ের সাথে সাথে মানুষে মানুষে যে সম্পর্ক, সমাজে ছেলে- মেয়ের সম্পর্ক বা মানুষের ব্যক্তিগত যে চিন্তা-ভাবনা, সব কিছুই তো বদলে গেছে। আমাদের ব্যক্তিগত চিন্তার জগৎ, পারস্পরিক যোগাযোগের ধরন, আমাদের ক্লান্তি, বেদনা, সবকিছুই তো তখনকার চেয়ে আলাদা। ফলে এ বিষয়গুলো যখন গল্পে চলে আসে, তখন স্বভাবতই তা রবীন্দ্রগল্প থেকে আলাদা হয়ে যায়। আমার গল্পও এর ব্যতিক্রম নয়।

রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পগুলোর মধ্যে অতিথি, সমাপ্তি ও পোস্টমাস্টার–এ গল্পগুলিই আমার বেশি ভাল লেগেছে।

প্রশান্ত মৃধা

prashanta-m.jpgজন্ম: ২০ নভেম্বর ১৯৭১

কোন পরিবর্তনকে কি ঠিক নির্দিষ্ট করে মেপে বলা যায়? সাহিত্যে শুধু মোটাদাগে কিছু জায়গা সনাক্ত করা যায় বড়জোর। সময়ের পরিবর্তনে গল্পের পরিবর্তন তো ঘটেছেই। পরিবর্তন তো বিভিন্ন কারণে ঘটে। সময় একটা বড় বিষয় আগেই বলা হয়েছে। তার সঙ্গে মিলেমিশে পরিবেশ প্রতিবেশ মানুষ তাদের রুচিবোধ আর ভাষা সবটাই বদলে গেছে। ফলে, এখন কেউ চাইলেই ‘রবীন্দ্রনাথের মতো’ গল্প লিখতে পারবেন না। রবীন্দ্রনাথ নিজেও পারতেন না। পূর্ব বাংলা বা বাংলাদেশের যে অঞ্চল নিয়ে রবীন্দ্রনাথের গল্পের সবচেয়ে ফলবান ভূগোল–আজ এখানে এলে তিনি নিজেই এর সামগ্রিক পরিবর্তনে যে গল্প লিখতেন, তার বিষয়, ভাষা ও মানুষ আপসেই সেদিনের চেয়ে অনেক বদলে যেত।


গল্পের চরিত্রের চোখের ভেতরে যখন আর দরদ থাকে না, কোথাও যখন আর কোমলতা থাকে না, মানুষের হৃদয়ের গহীনে–সেখানে ওই ভাষা মুহূর্তে বেশ শক্ত হয়ে ওঠে। আবার যেখানে মানুষে মানুষে সম্পর্কের সজীবতা, সেখানে খুব সহজে কোমল ঘাস গজায়। পাশাপাশি এও সত্যি যে এই বিষয়, এই ভাষা, এই বিভিন্ন মানুষজন–এই নিয়েই তাঁর গল্প। একটার সঙ্গে একটা মেলে না। মনেই হয় না, এগুলো প্রত্যেকেটি মাত্র এক মাসের ব্যবধানে লেখা।

রবীন্দ্র-পরবর্তীকাল বলতে কি বোঝানো হয়েছে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরের কাল? যদি তাই হয় সেদিক থেকে তার মৃত্যুর পরের কাল কেন, রবীন্দ্রনাথ তার নিজেই গল্প রচনায় নিজেকে বদলে নিয়েছেন। যখন তিনি ‘ল্যাবরেটরি’ লিখছেন তখন তো তাঁর পক্ষে আর লেখা সম্ভব নয় ‘সমাপ্তি’। সে কলম তিনি অনেক আগেই বদলে ফেলেছেন। একইভাবে তার জীবৎকালেই বাংলা ভাষার যে প্রধান গল্প লেখকেরা লিখতে এসেছেন তাদের হাতে তখনই গল্পে নানাপ্রকার পরিবর্তন ঘটতে দেখা গেছে। পরে ঘটেছে আরও বিস্তর। আর সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তারপর থেকে বাঙালির তো কম পরিবর্তন হয়নি। ফলে গল্প বদলে গেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। ভাষায় বা বিষয়ে ছাড়াও একই সঙ্গে সে প্রবেশ করেছে এমন সব জায়গায় যেখানে রবীন্দ্রনাথের কালে যাওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ বিষয় হিসেবে সেগুলো তখন সামনেই ছিল না। পাশাপাশি ফর্ম বা লেখন কৌশলেও পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে বিভিন্ন প্রকার। কেউ কেউ খুব সফলও হয়েছেন। সব মিলে বাংলা গল্প সময় ও সমাজের আর দশটা পরিবর্তনের মতো পরিবর্তনগুলো সঙ্গে নিয়েই চলমান।

রবীন্দ্র ছোটগল্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক–এর বিষয়, ভাষা ও চরিত্রের বহুমুখিতা। হয়তো কোথাও ভাষা বেশ কাব্যিক মনে হয়, আবার বাংলার যে ভূগোলের প্রান্তর-ডাঙা-জল ও মানুষ নিয়ে এই গল্প সেখানে এই কাব্য আর কোমলতা বেশ খাপও খেয়ে যায়। কিন্তু গল্পের চরিত্রের চোখের ভেতরে যখন আর দরদ থাকে না, কোথাও যখন আর কোমলতা থাকে না, মানুষের হৃদয়ের গহীনে–সেখানে ওই ভাষা মুহূর্তে বেশ শক্ত হয়ে ওঠে। আবার যেখানে মানুষে মানুষে সম্পর্কের সজীবতা, সেখানে খুব সহজে কোমল ঘাস গজায়। পাশাপাশি এও সত্যি যে এই বিষয়, এই ভাষা, এই বিভিন্ন মানুষজন–এই নিয়েই তাঁর গল্প। একটার সঙ্গে একটা মেলে না। মনেই হয় না, এগুলো প্রত্যেকেটি মাত্র এক মাসের ব্যবধানে লেখা। তাঁর দেখার চোখটিই তাই খুব শক্তিশালী। এতটাই যে বাংলা গল্পের এখনও শ্রেষ্ঠ কারিগর তিনি। এক হাতেই এটাকে প্রায় কুটিরশিল্পের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন।

নিজের লেখা নিয়ে আমি কোনও কথা কইতে অপারগ। রবীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত কিনা সেটা নিয়ে বলা যায়: তার গল্প বাতাসের মতো, দেখি না অথচ নিঃশ্বাস নিই, না নিলে দম বন্ধ হয়ে আসে। গল্প রচনার ক্ষেত্রে এই নিঃশ্বাস নেয়ার মতো বিষয় যদি প্রভাব হয়, তো সে প্রভাবের বাইরে যাওয়ার সাধ্যি কই!

রবীন্দ্রনাথের অনেক গল্পই ভালো লাগে। এর মাঝে হয়ত একটু বিশেষভাবে ভালো লাগে পোস্টমাস্টার, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, মেঘ ও রৌদ্র, একরাত্রি, সমাপ্তি, কাবুলিওয়ালা, জীবিত ও মৃত, শাস্তি, স্ত্রীর পত্র, মধ্যবর্তিনী ইত্যাদি।

রাশিদা সুলতানা

rashida_s.jpgজন্ম: ৩ জানুয়ারি ১৯৭৩

গল্পের আঙ্গিকে অনেক নিরীক্ষা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের পর। রবীন্দ্রনাথ নিজেও কিন্তু অনেক নিরীক্ষা করেছেন এবং পরবর্তী বহু নিরীক্ষাকেই রবি ঠাকুরেরই শুরু করা নানা পরীক্ষার সম্প্রসারণ বলে মনে করা যায়। আর রবীন্দ্রনাথের পর সময় যেহেতু পাল্টেছে, মানুষের জীবন, অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধের পরিবর্তন, পরিবর্ধন হয়েছে। দেশভাগ ও তৎপরবর্তী নানা বিপ্লব, নানা মন্বন্তর, রাজনৈতিক অস্থিরতা, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম। এসবের আছর পড়েছে ছোটগল্পে। তাছাড়া বিশ্বায়ন, জাদু বাস্তবতা, অস্তিত্ববাদ, পুঁজিবাদের বিজয়–এই সব কিছুরই প্রভাব পড়েছে রবীন্দ্র পরবর্তী কালের ছোট গল্পে। তবে রবীন্দ্র পরবর্তী কালের সফল গল্পকারেরা নিজেদের পাটাতনে শক্ত পায়ে দাঁড়িয়েই গল্প লিখেছেন। প্রমথ চৌধুরী, জগদীশ গুপ্ত, কমলকুমার মজুমদার, প্রেমেন্দ্র মিত্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সৈয়দ ওয়ালউল্লাহ, সন্দ্বীপন চট্টোপাধ্যায়, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং আরও অনেকেই ভাষা এবং প্রকরণে নানা সফল নিরীক্ষা করেছেন। পরবর্তীকালে শহীদুল জহির সোস্যাল রিয়েলিজমের গল্প বলেছেন পাঠককে, পরাবাস্তব জগতে নিয়ে গিয়ে। যে জগত মূলত বাস্তবতারই বর্ধিতাংশ। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, কাজল শাহনেওয়াজ, ব্রাত্য রাইসু সফলভাবে গল্পের ফিউশন ঘটিয়েছেন কবিতার সাথে। শামসুল কবির কচি, সেলিম মোরশেদ, শাহাদুজ্জামান এবং সুমন রহমানের কিছু গল্প এ ধারার। নতুন গল্পকার সাগুফতা শারমিন তানিয়াকে এ ধারায় সম্ভাবনাময় মনে করি। এঁদের কেউ কেউ গল্পে সোস্যাল রিয়েলিজমের পথে না হেঁটে একেবারে নতুন স্বপ্ন বা স্বপ্নকল্প নির্মাণ করেছেন।


এক্ষেত্রে আমি মনে করি যে আমি তাঁর থেকে আলাদা। আমার গল্প একজন নারী লেখকেরই গল্প।আমার স্বতঃস্ফূর্ত নারীত্ব দিয়েই আমি গল্প লিখি। কিন্তু তিনি আবার আছেনও আমার সকল কাজের মাঝে, এমনকি সচেতনভাবে তাঁর থেকে আলাদা হবার প্রবণতারও ভিতরে তিনি থেকেই যান, মানুষের ভিতরকার আত্মার মতো, আলোর মতো…

বাঙালি জীবনের প্রায় সব কিছুই পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের গল্পে। বাঙালির অভীপ্সা এবং যন্ত্রণাকে তিনি মূর্ত করেছেন সুনিপুণ দক্ষতায়। তাঁর গল্পগুচ্ছ’কে অগ্রন্থিত মহাভারতও বলা যায়। সমকালে সমাজ বাস্তবতার উপর তিনি লিখেছেন। তাঁর গল্পের বিষয়-বৈচিত্র্য মুগ্ধ করার মতো। তাঁর ভাষা কাব্যিক এবং ভীষণ মাধুর্যময়। আমার মনে হয়েছে, গল্পে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা এবং চেনাজানা গণ্ডির বাইরে খুব বেশি যাননি বলেই তাঁর গল্প পাঠককে এত গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। এমনকি যেসব অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের জীবনচিত্র তিনি এঁকেছেন তাঁর গল্পে, তার জমিদারি অভিজ্ঞতা এবং অন্তর্ভেদী পর্যবেক্ষণের কারণে সেই জীবনও তাঁর বেশ ভালোভাবেই চেনা। আর সে কারণেই তাঁর গল্পগুলো এত জীবন্ত মনে হয়।

রবীন্দ্রনাথের প্রভাব আমার লেখায় কত খানি তা যে কোনো বাঙালি লেখকের মতো আমারও পক্ষে নির্ধারণ করা শক্ত। তাঁর হাত ধরেই সাহিত্য জগতে প্রবেশ আমার। তবে আগে যেমন বলেছি, আমার বাস্তবতা রবীন্দ্রনাথের নয়, আমার যুগের মুখের ও চিন্তার ভাষা, অভিজ্ঞতার ধরন, অভিজ্ঞতাকে ধারণ করবার ধরন, সবই বদলে গেছে তাঁর থেকে, কাজেই আমার গল্প তাঁর গল্পের মতো হওয়া তো অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথের গল্প বিশুদ্ধ মানবিক এবং সহানুভূতিসূচক হওয়া সত্ত্বেও চরিত্র চিত্রণ, গল্পের আবহ, কাহিনী বর্ণন– এ সব কিছুই একজন পুরুষ লেখকের মতো করেই তিনি করেছেন। পৃথিবীর তাবৎ শক্তিমান পুরুষ লেখক এবং কোন কোন নারী লেখকও তাদের ট্রেইনিং বা পদ্ধতিগত শিক্ষার কারণে যেটা করে থাকেন অর্থাৎ পুরুষ লেখকের চোখকে ধারণ করে থাকেন। এক্ষেত্রে আমি মনে করি যে আমি তাঁর থেকে আলাদা। আমার গল্প একজন নারী লেখকেরই গল্প।আমার স্বতঃস্ফূর্ত নারীত্ব দিয়েই আমি গল্প লিখি। কিন্তু তিনি আবার আছেনও আমার সকল কাজের মাঝে, এমনকি সচেতনভাবে তাঁর থেকে আলাদা হবার প্রবণতারও ভিতরে তিনি থেকেই যান, মানুষের ভিতরকার আত্মার মতো, আলোর মতো…

রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ছোটগল্প আছে অনেক। বিশেষতঃ রবিবার, ক্ষুধিত পাষাণ, মধ্যবর্তিনী, নষ্টনীড়, হৈমন্তি, পোষ্টমাস্টার, অতিথি, কঙ্কাল, একরাত্রি, কাবুলিওয়ালা, ছুটি, জীবিত ও মৃত, দেনাপাওনা, নিশীথে, মণিহারা, মুসলমানীর গল্প, মেঘ ও রৌদ্র, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, শাস্তি, সুভা–এ মুহূর্তে এ নামগুলোই মনে পড়ছে।

ইমরুল হাসান

imrul-h.jpgজন্ম: ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫

আমার কাছে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা ছোটগল্পে ভাষার দিক দিয়ে খুব কম পরিবর্তনই হইছে। রবীন্দ্রগদ্য যেটা ছিল সেটাকে অতিক্রম করার সাহস খুব কম জনই করছেন। যেটা হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ তো ছোটগল্প শুরু করলেন, তারপর বিভিন্ন ফরমেটে অনেকেই লিখছেন। প্রত্যেকেরই একটা নিজস্ব স্টাইল তৈরি হয়েছে। কিন্তু ভাষার দিক থেকে সেটার খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে বলে আমার মনে হয় নাই। একটা ব্যাপার হতে পারে যে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুলো আমি পড়েছি বেশ আগে। কাজেই অত ভালভাবে মনে নেই। যতটুকু মনে আছে সেটার ভিত্তিতেই বলছি। আমার কাছে মনে হয়েছে রবীন্দ্রপরবর্তীকালে গল্পের দিক থেকে সে রকম বড় কোনো বাঁক বদল আসলে ঘটেনি আমাদের এখানে। ভাষার জায়গাটায় এখনো আমাদের ওই রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার নিয়েই চলতে হচ্ছে। এখানে আসলে মেজর অন্য কোনো ক্ষেত্র বা ধারা এখনো তৈরি হয় নাই। [কমলকুমার মজুমদারের মনে হয় একটা চেষ্টা ছিল।] এখানে ভাষা বলতে আমি বলতে চাচ্ছি ভাষার প্রচলিত যে ফরম্যাট সেটাকে। শব্দের যে গাঁথুনি অর্থাৎ উদ্দেশ্যের পর বিধেয় আসবে, তারপর কর্তার পর কর্ম–এভাবে ফরম্যাট সাজানো আছে ভাষার। তো এটাতে আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথ যে আকারটা দিয়ে গিয়েছিলেন ওটার ভিতরেই আমরা চলছি। তো এই পরিবর্তনটা আসলে বেশ কঠিন। একটা সময়ে যখন ভাষাটা গঠন হচ্ছে বা একটা ভাষা তৈরি হয়ে গেলে সেটাকে আলাদা করাটা বেশ কঠিন হয়ে যায়। তো ওই জায়গাটায় আমরা আসলে রবীন্দ্রনাথের ফর্মটাতেই চলছি। এইটা আলাদা করা যাচ্ছে না।


ছোটগল্প মানেই যে এক ধরনের ‘বিচ্ছিন্নতা’- ওই জিনিসটা আমি স্ট্যাবলিস করতে চাই না। ছোটগল্প হলেও আমার মনে হয় এইটা একটা প্রবহমানতার মধ্যে থাকা। এটা আমার কাছে দরকার বলে মনে হয়। আমার গল্পের ক্ষেত্রে আমি এইভাবেই চেষ্টা করি। রবীন্দ্রনাথও করতেন। কিন্তু তাঁর ছোটগল্পের ‘ভাব’-এর ভিতর ‘বিচ্ছিন্নতা’-ই মুখ্য।

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুলোর মধ্যে একটা ব্যাপার আছে সেটা হচ্ছে তার গল্পে আসলেই একটা গল্প থাকে। [এইটা ভালো।] অর্থাৎ উনি যেসব গল্প লিখতেন তার মাঝে একটা কাহিনী থাকত। উনার বর্ণনা বা গল্প বলার ঢঙের মাঝে একটা ব্যাপার আছে যেটা আমার কাছে মনে হয়েছে যে উনি হয়ত গল্পটা অর্থাৎ কাহিনীটা আগেই ফর্ম্যুলেট করে নিতেন আর কি। ফলে উনি তাঁর গল্পগুলো লেখার আগে সেটাকে কনসাইজড করে নিতেন বলে আমার কাছে মনে হয়। মানে, এইভাবে ভাবা যাইতে পারে। অর্থাৎ বাংলা গদ্যে অল্প পরিসরে কাহিনী বলার প্রবণতাটা উনি চালু করেন। অন্যভাবে দেখলে, বাংলা গদ্যে আধুনিকতা ও শহুরে একটা যে ব্যাপার আছে অর্থাৎ কাহিনীর বিস্তৃতি বাদ দিয়া ছোট বা নির্বাচিত একটা জায়গাকে যে পিক করা বা তুলে ধরা সেটা তিনি করছেন। ফলে ছোটগল্প ব্যাপারটাই এইরকম হয়া গেছে, বাংলা ভাষায়।

আর আমি তো আসলে খুব বেশি লিখি নাই। কিন্তু লেখার চেষ্টা চলছে আর কি। তো গল্প লিখতে গেলে আমার যেটা মনে হয়, কাহিনীটা যে একটা ছড়ানো বা বিস্তৃতির যে একটা ব্যাপার এবং তার মাঝখান থেকে গল্প যে একটা ‘অংশ’ বা ‘ভাগ’ ওই অবস্থাটা আমি ধরে রাখতে চেষ্টা করি। মানে ছোটগল্প মানেই যে এক ধরনের ‘বিচ্ছিন্নতা’- ওই জিনিসটা আমি স্ট্যাবলিস করতে চাই না। ছোটগল্প হলেও আমার মনে হয় এইটা একটা প্রবহমানতার মধ্যে থাকা। এটা আমার কাছে দরকার বলে মনে হয়। আমার গল্পের ক্ষেত্রে আমি এইভাবেই চেষ্টা করি। রবীন্দ্রনাথও করতেন। কিন্তু তাঁর ছোটগল্পের ‘ভাব’-এর ভিতর ‘বিচ্ছিন্নতা’-ই মুখ্য। এই ‘বিচ্ছিন্নতা’রে ‘সমগ্র’তে রূপ দেয়াই যেন বাংলা ছোটগল্পের সার্থকতা – এইরকম একটা বিভ্রান্তির কথা মনে হইতেছে এখন।

যেহেতু তাঁর গল্পগুলা অনেক আগে পড়েছি, তাই এই মুহূর্তে সব নাম ঠিকমত মনে পড়ছে না। তবে তার গল্পগুলার মাঝে বা কাহিনী বলার মাঝে তাঁর এক ধরনের যে রোমান্টিসিজম ছিল। সেইটা তার সময় হিসাবে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হইতো বইলা হয়তো আমারে বেশি আকর্ষণ করত। সে কারণে আমার অনেকবার পড়া হয়েছে তার ‘সমাপ্তি’ গল্পটা। কিন্তু আমার ধারণা, আমি এখন যদি তাঁর গল্পগুলো আবার পড়ি তাহলে অন্য কোনো গল্প হয়তো আরও বেশি ভালো লাগতে পারে।

শামীমা বিনতে রহমান

shameema_b.jpgজন্ম: ২৫ নভেম্বর ১৯৭৬

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষটিকে ছোটগল্পকার হিসেবে প্রথম পড়া শুরু করেছি বছর পনের আগে। লেইট রিডার। তার আগে অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু বা স্কুল কলেজ লেভেলে এই ভদ্রলোকটির ছোটগল্প আমাকে খুব একটা আকর্ষণ করেনি। এটা এরকম একটা ব্যাপার হতে পারে, চারপাশে সব রবীন্দ্র প্রশংসাকারীদের এতো চর্বন আর সে কারণে পড়তে বাধ্য করার পারিপার্শ্বিকতা… আমি বুকশেল্ফে গুছিয়ে রাখতেই পছন্দ করতাম। এর সঙ্গে মার্কসীয় সাহিত্য পাঠের বলয় জমিদারের পোলার সাহিত্য পাঠ করায় আমাকে উৎসাহিত করেনি। বরং আমি অনুবাদ সাহিত্য পড়তে আনন্দ পেতাম। যেমন: হ্যান্স ক্রিস্টিয়ান আ্যান্ডারসন, অস্কার ওয়াইল্ড, তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি, নিকোলাই গোগল–এসব। মোপাসাঁর ছোটগল্প পড়তে গিয়ে বড়রা বলতে থাকলেন, তুমি রবীন্দ্রনাথ পড় এবার। আমাদের রবীন্দ্রনাথকে মোপাসাঁর মতোই সেরা গল্পকার বলা হয়। এডগার এলান পো আর আন্তন শেখভ–এদের নামও পাশাপাশি উচ্চারিত হয়। এদের তখনও পড়ি নাই। নাম শুনছি আর কী। হায়! কী দশা আমার! ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হইতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শীষের ওপর একটি শিশির বিন্দু।’ বুকশেল্ফ থেকে গল্পগুচ্ছ দুই হাতের তালুতে রেখে পড়া শুরু হলো। প্রথমটা, আমার এক ব্যাপক পড়ুয়া বন্ধু (লিটারেচার) প্রথম পড়ালো রবী বাবুর ‘একরাত্রি’। আমি মুগ্ধ। ‘সুরবালা আমার কী না হইতে পারিত… কেবল আর একটা ঢেউ আসিলেই পৃথিবীর এই প্রান্তটুকু হইতে, বিচ্ছেদের এই বৃন্তটুকু হইতে, খসিয়া আমরা দুজনে এক হইয়া যাই।. . . সে ঢেউ না আসুক।’ পড়ে মুগ্ধ। আবার, আবার পড়লাম।


আমার সময়ে নিঃসঙ্গতা এমন, দেয়ালের সঙ্গে কথা বলতে হয়, সম্পর্কের ভেতরে সম্পর্কের জটিলতা কেবল ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ এর ‘ঘনকৃষ্ণ বিপুল চক্ষু-তারকায় সুগভীর আবেগ তীব্র বেদনাপূর্ণ আগ্রহ কটাক্ষপাত করা’ যৌনাকাঙ্ক্ষী নারীর মতো নয়। এসব বাহুল্যের বাইরে টাকা-তামাক-যৌনতায় অমানবিকতার ছুরিতে ফালি ফালি হয়ে মায়াময় চুমু খায় সময়ের মানুষেরা। আবার ভুলে যায়। নৃশংসভাবে ভুলে যায়।

রবীন্দ্রনাথের সবচে অসাধারণ গল্প মনে হয়েছে ল্যাবরেটরী গল্পটা। এই গল্পে সোহিনী, আমার মতে রবীন্দ্রনাথের সবচে ডাইনামিক, ম্যাচিউরড নারী চরিত্র, সোহিনী শাড়ি পরতো, আর ভেতরে ছুরি রেখে ঘুরে বেড়াতো। বিবাহিত নারী, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন ডায়নামিকস্ নিয়ে মিশছে, ইন্টারেকশনে যাচ্ছে ভিন্ন পুরুষের সঙ্গে। ডায়ালগ, ন্যারেটিভ স্টাইল, সম্পর্কের ভেতরে সম্পর্ক, নৃশংসতা এবং মনস্তাত্ত্বিক টেবিল টেনিস খেলা–অসাধারণ। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প আসলে ‘স্টার্ক রিয়েলিজম’ এবং ‘পোয়েটিক আইডিয়েলিজম’-এ ঘুরপাক খেয়েছে। তবে বাঙলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প বিশ শতকের অসাধারণ এবং এলিটিস্ট এপ্রোচের সেমি-আরবান আধুনিক গল্প।

রবীন্দ্র পরবর্তী সময়ে গদ্যের ভাষা এবং ভঙ্গি অনেক পাল্টেছে। জীবনানন্দ দাশের গদ্য প্রকাশ এবং সিনট্যাক্স কতটা পাল্টেছে, তা ‘মাল্যবান’-এ পষ্ট। রবীন্দ্রনাথের গদ্য ভাষা, ভঙ্গি, বিষয়ে সবচে বড় ঝাঁকুনি জীবনানন্দ দাশ, এটা আমি মনে করি। আর মানিক-তারাশঙ্কর থেকে সুনীল, হুমায়ুন–রবীন্দ্রনাথের স্টার্ক রিয়েলিজম এবং আর একটা শব্দ যোগ করতে চাই রবীন্দ্রনাথের গল্পের ্যা রিয়েলিজম প্যাটার্নের বিবর্তিত সংস্করণ। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আবার রবীন্দ্রজারিত নন। উৎসব, তারা বিবির মরদ পোলা, মিলির হাতে স্টেনগান, ফোঁড়া–রবীন্দ্র প্রভাব পাই না। আবার মুস্তফা আনোয়ার, রবীন্দ্রনাথ আর ইউরোপিয়ান আ্যালিয়েনেশনের ফিউশন–ক্ষুর। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, শহীদুল জহিরের গল্পে রবীন্দ্রনাথের গল্পের রোমান্টিসিজম এক ফোঁটা পাই না। আর শাহাদুজ্জামানের ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথ ঘুমন্ত শিশু। ‘একটি ক্ষুদ্র পুরাতন গল্প’র গন্ধ টের পাওয়া যায় ‘কাঁঠাল পাতা আর মাটির ঢেলা’র গল্প বয়ানে।

কমলকুমার মজুমদার তো নিজেকে রবীন্দ্রনাথ থেকে আলাদাই করে রেখেছেন বিষয়বস্তু, সিনট্যাক্স, উপস্থাপন কৌশলে। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প সেমি-আরবান, তুলনায় সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় পুরা আরবান। নারী-পুরুষ সম্পর্কের গভীর, তলহীন আবেগ, ভিন্নভিন্ন বহুমুখী জটিলতা, সেন্টিমেন্ট, প্রতিষ্ঠিত রীতির সঙ্গে দ্বন্দ্ব, রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের এসবকে ভেঙ্গে এবং সঙ্গে নিয়ে নাগরিক সঙ্কট, বেঁচে থাকার সঙ্কট, নিঃসঙ্গতা, নৃশংসতা সন্দীপনের কলমের মুন্সিয়ানা।

সাদা কথা বলি, আমার গল্পে রবীন্দ্রনাথ নাই। এর প্রধান কারণ আমি মনে করি সময়। রবীন্দ্রনাথের সময় আর আমার সময়। আমি মনে করি, রবীন্দ্রনাথ তাঁর সময়েরই ধারক। গরিব লোকের কথা তিনি যতখানি চরিত্র এবং প্লট হিসাবে লেখায় এনেছেন, বড় লোকের কথা তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি এসেছে। কারণ, তার সময়ের স্যারাউন্ডিংস্ এবং ক্লাস। তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। তার গল্প আমার ভাল্লাগছে, আমি আগেই বলেছি, কিন্তু তার প্রভাব আমার লেখায়, এমনকি অনুপ্রেরণায়ও আসে না। আমাকে বিস্মিত করে না, তবে সেই সময়কে, ছোটগল্পের মধ্য দিয়ে পড়তে… বলবো–লাভ টু রিড টেগর। আমার সময়ে নিঃসঙ্গতা এমন, দেয়ালের সঙ্গে কথা বলতে হয়, সম্পর্কের ভেতরে সম্পর্কের জটিলতা কেবল ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ এর ‘ঘনকৃষ্ণ বিপুল চক্ষু-তারকায় সুগভীর আবেগ তীব্র বেদনাপূর্ণ আগ্রহ কটাক্ষপাত করা’ যৌনাকাঙ্ক্ষী নারীর মতো নয়। এসব বাহুল্যের বাইরে টাকা-তামাক-যৌনতায় অমানবিকতার ছুরিতে ফালি ফালি হয়ে মায়াময় চুমু খায় সময়ের মানুষেরা। আবার ভুলে যায়। নৃশংসভাবে ভুলে যায়। চাকরি পেয়ে, প্রজেক্ট শেষ হয়ে বেকার হয়ে, না খেয়ে খেয়ে শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হয়, বন্ধুদের কাছে গিয়ে দাঁড়াবার ভরসা নাই। কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। মা, বাবা, প্রেমিক–কেউ না। বিশ্বাসের ভান আছে, কিন্তু বিশ্বাসের খুঁটির গোড়ায় ভরসার মাটি নাই। রাজনীতি আছে, রাজনীতি নাই। দেশ আছে, সার্বভৌমত্ব নাই; আন্দোলন আছে, পকেটে পকেটে–বেশিরভাগ এনজিওর পকেট। ছেলে-ছেলে, মেয়ে-মেয়ে প্রেম করছে, সংসার করছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প আমার গল্পে কোনভাবইে প্রভাব ফেলে না, ফেলে নাই।

রবীন্দ্রনাথের সবচে অসাধারণ গল্প হচ্ছে ল্যাবরেটরিপোস্টমাস্টারও অনেক ভালো লেগেছে। সমাপ্তি, স্ত্রীর পত্র, নষ্টনীড়, পয়লা নম্বর, একটি ক্ষুদ্র পুরাতন গল্প, ছুটি, রীতিমতো নভেল–ভাল্লাগছে অনেক।

মাহবুব মোর্শেদ

mahbub-m.jpgজন্ম: ২৯ জানুয়ারি ১৯৭৭

প্রশ্নগুলা শুইনা আমার মনে আরও কিছু প্রশ্নের ‘উদয়’ হইছে। মনে হইতেছে যথাক্রমে নতুন উদিত প্রশ্নগুলা উত্থাপন না কইরা উত্তর দিলে প্রশ্নগুলা সহসা অস্ত যাবে না। ফলে প্রথমে সেইগুলা উল্লেখ করতে চাইতেছি। প্রথম প্রশ্ন ‘রবীন্দ্রপরবর্তীকাল’, ‘বাংলা ছোটগল্প’ ও ‘পরিবর্তন’ নিয়া। এই প্রশ্নটা নিয়াই মূল প্রশ্ন। একাডেমিক আলোচনায় ‘রবীন্দ্রপরবর্তীকালে বাংলা ছোটগল্পে পরিবর্তন’ পরিচিত জিনিস। বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীরা এই নিয়া বিস্তর গবেষণা করছেন। এ ধরনের গবেষণা বই হিসাবে প্রকাশও হইছে, দেখছি। এখন এই প্রশ্নটার উত্তর সবচাইতে ভাল দিতে পারবেন একজন অধ্যাপকই। যে প্রশ্ন অধ্যাপকরে জিগানোর কথা, সেটা তারে না জিগায়া গল্পকারকে জিগাইলে একটু সমস্যা। রবীন্দ্রপরবর্তীকাল, বাংলা ছোটগল্প এবং পরিবর্তন একান্তই বাংলা সাহিত্যের একাডেমিক ইতিহাসের সমস্যা। গল্পকার হিসাবে এবং পাঠক হিসাবে আমি এই বিষয়গুলারে চর্চা করি না–মনে করি, এইগুলা দিয়া আমার কাম নাই। রবীন্দ্র পরবর্তী কালে বাংলা ছোটগল্পে পরিবর্তন ঘটছে কি ঘটে নাই, সাহিত্যিক হিসাবে এই প্রশ্নের লগে আমার বুঝাপড়ার কিছু নাই।


মানিকের গল্প মানিকের গল্পই। মানিকের গল্প যে রবীন্দ্রনাথের থিকা আলাদা হয়া গেছে সেইটা বাংলা গল্পের পরিবর্তন হইছে বইলা না। মানিক ও রবীন্দ্রনাথের দূরত্বের কারণেই আলাদা হইছে।…রবীন্দ্রনাথের গল্পের মেয়েরাও কম বয়সী। এইটা রবীন্দ্রনাথের দোষ না, তার সময়ের দোষ। ‘রবীন্দ্রপরবর্তী গল্পে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন’ বলতে গেলে এইটা বলতে হবে যে, রবীন্দ্রপরবর্তী গল্পে ধীরে ধীরে নায়িকাদের বয়স বাড়ছে।

সাহিত্যের ইতিহাসের মধ্যে বা বিশেষ কইরা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের মধ্যে বইসা তো আমি লেখি না। আমি লেখি আমার সময়ের মধ্যে বইসা, যাপন-অযাপন, অভিজ্ঞতা-অনভিজ্ঞতা, পাঠ ও অপাঠের মধ্যে বইসা। রবীন্দ্রনাথ আমি পড়ি, উনার সাহিত্যের লগে ইন্টারঅ্যাক্ট করি। শুধু উনার লিখাই না, আরও ১০০-২০০ লেখকের লেখার লগে সংঘর্ষ-সংঘাত-আপোষ কইরা আমি লেখতে বসি। ফলে লেখকের হিসাব-নিকাশ একাডেমিক সাহিত্যের ইতিহাসের পরিসরে বা পাটাতনে বইসা বুঝা একটু কঠিনই বৈকি। উদাহরণ দেই। সবাই যখন বলে তখন ‘রবীন্দ্রপরবর্তীকাল’ বইলা কিছু একটা নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু পাঠকে বা লেখকে যখন পড়ে তখন কাল বা আকাল দিয়া পড়ে না- রবীন্দ্রনাথরে রবীন্দ্রনাথ দিয়া বুঝতে চায়। পূর্ববতী ও পরবর্তী কালের সাহিত্যের অসার বা সার ঐতিহ্য দিয়া যদি রবীন্দ্রনাথ বুঝা লাগে বা রবীন্দ্রনাথরে দিয়া পরের গল্পরে যাচাই করা লাগে তাইলে তো সমস্যা। আইজকা যখন আমি গল্প লিখতে বসলাম তখন হয়তো রবীন্দ্রনাথ নন, তলস্তয়/ বোর্হেস/ ফুয়েন্তেস/ অমিয়ভূষণ আমারে পেরেশান করতেছে। কাইলকা রবীন্দ্রনাথ করতে পারে/ মানিক করতে পারে। এমনকি যে জিনিস গল্প না, সাহিত্য না, এমনকি লেখাও না–সে জিনিসও পেরেশান করতে পারে। রবীন্দ্রপরবর্তী, শিল্পবিপ্লব পরবর্তী, উপনিবেশ পরবর্তী, দেশভাগ পরবর্তী ঘটনাবলী বিচার কইরা ছোটগল্পের ইতিহাস বুঝার চেষ্টা চলতে পারে। কিন্তু একজন সাহিত্যিকের ক্লোজ এনকাউন্টার উইথ এ সিঙ্গেল লিটারারি ক্রিয়েশন ইজ আ ডিফরেন্ট থিং। ‘রবীন্দ্রপরবর্তীকাল’ ট্যাগিংটাই সে জন্য অপ্রাসঙ্গিক।

সেইভাবে ‘বাংলা ছোটগল্প’ বইলাও কিছু নাই। কারো বার্ডস আই ভিউ থাকলে তিনি হয়তো বাংলা ছোটগল্প বইলা একটা জিনিস দেখতে সক্ষম। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষায় গল্প লিখছেন; মানিক, তারাশঙ্কর, কমলকুমারসহ বহু লেখক লিখছেন। গল্পগুলা যার যার, তার তার। সব মিলায়ে বাংলা ছোটগল্প। দূর থিকা বাংলায় লেখা সব ছোটগল্প বাংলা ছোটগল্প বটে। এই জিনিসটারে একটা অনন্ত প্রবহমান জিনিশ ধইরা নিলে সমস্যা। রবীন্দ্রনাথের গল্প রবীন্দ্রনাথের গল্পই। মানিকের গল্প মানিকের গল্পই। মানিকের গল্প যে রবীন্দ্রনাথের থিকা আলাদা হয়া গেছে সেইটা বাংলা গল্পের পরিবর্তন হইছে বইলা না। মানিক ও রবীন্দ্রনাথের দূরত্বের কারণেই আলাদা হইছে। রবীন্দ্রনাথের সময়, সমাজ, ভাষা, সম্পর্ক, সংসার নিয়া বোঝাপড়া আর মানিকের বোঝাপড়ার মধ্যে পাথর্ক্য আছে বইলাই তাদের গল্প আলাদা হইছে। বাংলা ছোটগল্পের পরিবর্তন হিসাবে জিনিসটারে বুঝতে চাইলে আমরা কিছু কি বুঝতে পারবো? এমনে ভাবলে মনে হইতে পারে, বাংলা ছোটগল্প বইলা একটা আবহমান জিনিস আছে। লেখকরা আইসা সেইটার মোড় পরিবর্তন করেন, নয়তো করেন না।

পরের কথা হইলো, পরিবর্তন দিয়া আমরা কী করবো? পাঠক হিসেবে আমার পরিবর্তনের কী দরকার? আমি রবীন্দ্রনাথের গল্প পইড়া মজা নেই। আবার সৈয়দ শামসুল হকের গল্প পইড়াও মজা নেই। আমার মজা বা রসাস্বাদন যদি পরিবর্তনের উপর ডিপেন্ড করতো তাইলে তো বাংলা ছোটগল্পের তথাকথিত পরিবর্তনের পর আর রবীন্দ্রনাথ ভাল লাগতো না। আবার, পরিবর্তন শব্দটা যে বাতিল ও বহালের ধারণা তৈরি করে সেইটা সাহিত্যের জন্য জরুরি বইলাও তো মনে হয় না। সাহিত্যে ফর্ম ও কনটেন্টের পরিবর্তন ঘটে আবার অনুবর্তনও ঘটে। লেখক হিসাবে বাংলা ছোটগল্পের দিকদিশা পরিবর্তন করার দায়িত্ব নিয়া আমি গল্প লেখবো কেন? আমি গল্প লেখলে গল্পই লেখবো। লেখক হিসাবে জীবনযাপন-অযাপন, অভিজ্ঞতা-অনভিজ্ঞতা, পাঠ-অপাঠ ইত্যাদির লগে আমার যে সংঘাত বা আপোষ ঘটে সেইখান থিকা আমার গল্প তৈয়ার হয়, অন্য জায়গা থিকাও হইতে পারে। বাংলা সাহিত্য বইলা কিছু তো এই তালিকায় পাই না। মোটকথা, ‘রবীন্দ্র পরবর্তী কালে বাংলা ছোটগল্পের পরিবর্তন’ ধারণাটাতেই আমার আস্থা নাই।

দ্বিতীয় প্রশ্ন অর্থাৎ আমার চোখে রবীন্দ্রনাথের গল্পের বিশেষ বৈশিষ্ট্য কী কী তা পয়েন্ট আকারে দিতেছি:

ক. রবীন্দ্রনাথের গল্পের মধ্যে এক্সপেরিমেন্ট অর্থাৎ জোর-জবরদস্তি নাই। এইটারে বলা যায় সারল্যের শক্তি। দীন-দুনিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু পর্যবেক্ষণে ও ওরে প্রশ্ন ওনার আছিল। সেইটা প্রকাশ করার ভাষা ও গল্প বলার উপায়, বর্ণনা দিবার মতো দেখা, বিষয় ও চরিত্রের ভিতরে ঢুকার মতো অনুভব তাঁর রপ্ত আছিল। যে জিনিস তাঁর বোধ ও বুদ্ধির আওতার বাইরে, পর্যবেক্ষণ ও যাপনের বাইরে, সে জিনিস নিয়া উনি লেখেন নাই। রবীন্দ্রনাথের গ্রামের গল্পগুলা পড়লে বুঝা যায় নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়া তার সতর্কতা ভীষণ তীব্র। ফিকশন লেখক হিসাবে একটা অসীম ক্ষমতার আবহের মধ্যে আমরা থাকি। অনেক সময়ই সীমাহীন সাধ আমাদের অভিজ্ঞতা ও কল্পনার সীমাকে ছাড়ায়ে যাইতে চায়। ফলে, এইখানে একটা সমতা বা স্থিতাবস্থা দরকার। রবীন্দ্রনাথের বড় গুণ হলো দুনিয়ার আর সব বড় লেখকের মতো তিনি তার ফিকশনকে তার আওতাধীন পৃথিবীর খুব বেশি বাইরে নিয়া যান নাই।

খ. ভাষা ব্যবহারে উনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছিলেন। কখনো সাধু, কখনো চলতি ভাষা ব্যবহার করছেন। সাধু ছাইড়া চলতি গ্রহণের আলামত তাঁর গল্প পরম্পরায় দেখি না।

গ. তখনকার অধিকাংশ বাংলা গল্প-উপন্যাসের মতো রবীন্দ্রনাথের গল্পের মেয়েরাও কম বয়সী। এইটা রবীন্দ্রনাথের দোষ না, তার সময়ের দোষ। ‘রবীন্দ্রপরবর্তী গল্পে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন’ বলতে গেলে এইটা বলতে হবে যে, রবীন্দ্রপরবর্তী গল্পে ধীরে ধীরে নায়িকাদের বয়স বাড়ছে।

ঘ. স্টোরিটেলার হিসাবে রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট দক্ষ আছিলেন। বর্তমানে ভাল স্টোরিটেলিংকে অনেকে খারাপ গুণ হিসাবে দেখেন। আমার কাছে ভালো স্টোরিটেলিংকে অবশ্যই গল্পের একটা আবশ্যিক গুণ বলে মনে হয়।

রবীন্দ্রনাথ ও আমাদের সময়ের ফারাক দেড়শ বছর হইলেও এবং ইতিমধ্যে আমাদের পরস্পরের ব্যক্তিগত-সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সাহিত্যিক জীবন ও ইতিহাসের গুরুতর ভাবান্তর ঘইটা গেলেও এখনও এই ধরনের প্রশ্ন ওঠে। কারণ আমাদের সাহিত্য খুবই পশ্চাৎপদ, রক্ষণশীল ও স্থবির। রবীন্দ্রনাথের সময়কার দেশ ভাইঙ্গা ভাগ হইছে। কিন্তু সাহিত্য এখনও ভাগ হয় নাই বইলা শুনি। সাহিত্য দেখা যাইতেছে তাইলে আমাদের এখানে রাজনৈতিক সামাজিক বাস্তবতার উর্ধ্বে একটা বেহেশতি জিনিস। একে তো বেহেশতি, তদুপরি প্রতিভাহীনদেরও আখড়া। ফলে, দেড়শ বছর আগের একজন ব্যক্তির সাহিত্যকর্ম থেকে আমার সাহিত্য আলাদা কি না, সেই মাপ দিতে আমরা বাধ্য?

এই প্রশ্নের দুইটা উত্তর আছে :

ক. রবীন্দ্রনাথের বা তলস্তয়ের বা চেখভের থেকে আমাদের গল্প সব জায়গা থিকাই আলাদা। কেননা আমরা আলাদা দেশের, আলাদা ভাষার, আলাদা ইতিহাসের, আলাদা টেকনোলজির, আলাদা বাস্তবতার, আলাদা সম্পর্কের, আলাদা মূল্যবোধের মধ্যে বাস করি। সবচেয়ে বড় কথা, ভাল সাহিত্য পইড়া-শুইনা আমরা আগের মতো নয় এমন ভাল সাহিত্য রচনা করার সচেতন তাগিদ ও তৎপরতা চালাই। ফলে, এই সচেতন কর্ম তৎপরতায় এক রকম কিছু তো থাকার কথা না।

খ. আমার গল্পের সর্বাঙ্গই রবীন্দ্রনাথ বা তলস্তয় বা চেখভ প্রভাবিত। কেননা আমি আমি মনে করি এরা অনুসরণীয়। কেননা আমরা প্রত্যেকেই মানুষ ও পরিস্থিতি, সময় ও সম্পর্ক, জীবন ও যাপন নিয়ে আগ্রহী। ফলে, অনেক প্রভাব আছে। এরা প্রত্যেকেই আমার প্রশিক্ষক-প্রতিদ্বন্দ্বী ও সহযাত্রী। কিছু তো সচেতনভাবেই নিছি আবার অনেক কিছুই অবচেতনে ঢুকে গেছে।

ইচ্ছাপূরণ, একটা আষাঢ়ে গল্প, তারাপ্রসন্নের কীর্তি, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, স্ত্রীর পত্র, মুসলমানীর গল্প– আরও দু’একটা বাদে রবীন্দ্রনাথের সব গল্পই আমি লাইক করি।

বদরুন নাহার

bardun-n.jpgজন্ম: ২২ আগস্ট ১৯৭৭

সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত এবং সময় তো সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেদিক থেকেই যদি ধরি, তাহলেও এটা সত্যি, রবীন্দ্রপরবর্তী যুগে বাংলা ছোটগল্পের অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তন এসেছে। যদিও বাংলা ছোটগল্পের সার্থক সূচনা রবীন্দ্রনাথের হাত দিয়েই, কিন্তু তাঁর সময়টায় এই ভূ-খণ্ড ছিল পরাধীন। ফলে সাম্রাজ্যবাদী এবং কলোনিয়াল ভাবাশ্রিত সময়ের ছোটগল্প থেকে আজ ভাষার ব্যবহার, সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে ছোটগল্পের অঙ্গনও পরিবর্তিত। এই পরিবর্তন এক দিনে হয়নি যেমন, তেমনি তার পরিবর্তিত মাত্রাটাও অনেক দিনের। অনেক ব্যাখ্যায় তা প্রকাশ করতে হবে। যেহেতু আমি কোন সমালোচক নই, বরং লেখক-পাঠক, তাই আমি পাঠকের দৃষ্টিতেই বিষয়টাকে অল্প পরিসরে বলতে পারি। আমি কিছু উদাহরণ দিতে চাই। যেমন ধরুন, সুবোধ ঘোষ, কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ চক্রবর্তীর ছোটগল্প যেমন রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প থেকে বিষয়-প্রকরণ ও ভাষার ব্যবহারের দিক থেকে অন্য রকম, তেমনি পরবর্তীতে হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস–এমন কি শহিদুল জহিরের ছোট গল্পকেই ধরি না কেন, এরা সবাই বাংলা ছোটগল্পে পরিবর্তন এনেছেন এবং প্রতিনিয়ত এটা পরিবর্তিত হতে থাকবে। রবীন্দ্রনাথ শুরু করলেন বলেই এখনও পরিবর্তনে ছোটগল্প বৈচিত্রময় হয়ে উঠছে যেমন, তেমনি পরবর্তীতে ছোটগল্প ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে চলে আসছে বলেই আমরা বলছি–রবীন্দ্রনাথ সার্থক ভাবে শুরু করেছিলেন।


মনে রাখতে হবে যে আমরা উত্তর আধুনিকতাবাদে প্রবেশ করেছি, আর রবীন্দ্রনাথ আধুনিককালে ছোটগল্প লিখেছিলেন। আমাদের সময়ে জীবনকে দেখার প্রবণতা সাব-অলটার্ন দৃষ্টিতে আর রবীন্দ্রনাথের সময় এর বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে সাহিত্য রচিত হয়েছে।

প্রশ্নের সূত্র ধরে স্মরণ করছি রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পের চমৎকার একটা সংজ্ঞা দিয়েছিলেন। আবার এ প্রশ্নও জাগতে পারে–গল্প আগে, না তার ফর্ম বা সংজ্ঞা আগে? এ ক্ষেত্রে অবশ্যই গল্প আগে। কেননা গল্প তৈরি না হলে তার প্রাণ খুঁজতে যাওয়া যেমন বোকামী, তেমনি তার অবকাঠামো বা তার রহস্য–কিছুই চিহ্নিতকরণ সম্ভব নয়। আর সংজ্ঞা দিয়ে কিছু বেঁধে রাখাও সম্ভব নয়। সংজ্ঞা ভেঙে নতুন সংজ্ঞা আসবে। আর তা হবার আগে আসতে হবে নতুন গল্প। যে গল্প পাঠে মনে হবে, এ দেখছি একদম নতুন ধরনের বা আঙ্গিকের! এই সত্য প্রবহমানতাকে রবীন্দ্রনাথ নিজেই প্রমাণ করে গেছেন; তাঁর নিজের সংজ্ঞাকে ভেঙ্গে, গল্প থেকে গল্পকে উতরিয়ে। জমিদারি কার্য-পরিচালনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজস্ব গণ্ডির বাইরের মানুষ ও প্রকৃতির সংস্পর্শে এসে যে ছোটগল্প লেখা শুরু করেন, তা ছিল গ্রাম-বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের কথন। কিন্তু এটা ছিল শুরুর কথা, এরপর একে একে তিনি তুলে নিয়ে আসেন সামাজিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক সাতকাহন, নারী-পুরুষ সম্পর্কের জটিলতা থেকে ভৌতিক আবহে ভুতের গল্প নয়, বরং অতিপ্রাকৃত গল্প পর্যন্ত। ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথ যে বিষয়টা বিশেষ ভাবে এনেছিলেন তা হল মনস্তাত্ত্বিক ভাবধারা। বলা যায়, তাঁর গল্পে আমরা পেয়েছি সুখ-দুঃখ, বিরহ-মিলনপূর্ণ মানব সংসারের ভেতরে যাবার আকাঙ্খা, তেমনি নিরুদ্দেশ সৌন্দর্যলোকে উঠে যাবার ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। এই সবই তাঁর ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য। তিনি প্রকৃতি ও নারীকে এক কাতারে দেখাবার চেষ্টা করেছিলেন সুভা, সমাপ্তিতে; এমনকি হৈমন্তিশুভদৃষ্টি গল্পেও তা লক্ষনীয়। একরাত্রি, ল্যাবরেটরি, শেষেররাত্রি,রবিবার, মধ্যবর্তিনীসহ বেশ কিছু প্রেমের গল্প আমরা গল্পগুচ্ছে পেয়েছি। অন্যদিকে রবীন্দ্র সম-সাময়িক সামাজিক স্নেহের চিত্র আমরা তার ছোটগল্পে খুঁজে পাই। যেমন পোস্টমাস্টার, কাবুলিওয়ালা, রাশমনির ছেলে, ছুটি, ঠাকুরদা, দিদি ইত্যাদি গল্পে। তাঁর লেখায় যে সমাজ জীবনের চিত্র ফুটে ওঠে, তার সাথে পূর্ববঙ্গীয় সমাজের প্রকৃতির বর্ণনা পরিলক্ষিত হয়। রবীন্দ্রনাথ শেষ জীবনে কিছু আধুনিক জীবনের সমস্যার অবতারণা করে গল্প লিখেন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রবিবার, শেষকথা, ল্যাবরেটরি। এই গল্পগুলোতে এসে তিনি ধর্ম-দর্শনে ও জীবনবোধে নতুনত্বের প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

আমার ছোটগল্প থেকে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প অবশ্যই আলাদা। আর এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা মনে হয় সমালোচক-আলোচকদের কাজ। তবে মনে রাখতে হবে যে আমরা উত্তর আধুনিকতাবাদে প্রবেশ করেছি, আর রবীন্দ্রনাথ আধুনিককালে ছোটগল্প লিখেছিলেন। আমাদের সময়ে জীবনকে দেখার প্রবণতা সাব-অলটার্ন দৃষ্টিতে আর রবীন্দ্রনাথের সময় এর বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে সাহিত্য রচিত হয়েছে। লেখক হিসাবে আমি সে পর্যালোচনায় এখনই যেতে চাইছি না।

আমার প্রিয় রবীন্দ্র ছোটগল্পের সংখ্যা অনেক। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে রবিবার, ল্যাবরেটরি, ক্ষুধিত পাষাণ, জীবন মৃত্যু, পোষ্টমাষ্টার, সদরঅন্দর, একরাত্রি—এই নামগুলো।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়ে আর্টস-এর আরো লেখা
ব্রুকলিনে রবীন্দ্রনাথ / এস এম রেজাউল করিম
ফ্রান্সে রবীন্দ্রনাথ / এস এম রেজাউল করিম
রবীন্দ্রনাথের অমূল্য রচনা সম্বন্ধে আমাদের উপলব্ধি / খোসে পাজ্ রড্রিগেজ
আলাপচারিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | এইচ. এন. ব্রেইলসফোর্ডের সঙ্গে
/ অনুবাদ: সাহানা মৌসুমী

রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে এ সময়ের গল্পকাররা / প্রমা সঞ্চিতা অত্রি
রক্তমাংসের রবীন্দ্রনাথ / রাজু আলাউদ্দিন
তুলনাহীন রবীন্দ্রনাথ / কবীর চৌধুরী
বঙ্কিমচন্দ্র–রবীন্দ্রনাথ ধর্মতর্ক
‘পারস্যে’: মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা / অদিতি ফাল্গুনী
গণশিক্ষায় কেসস্টাডি: ‘হৈমন্তি’র অপুরুষ বনাম ‘সমাপ্তি’র পুরুষ / এস এম রেজাউল করিম
উত্তরাধুনিকের চোখে রবীন্দ্রনাথ (সেমিনার) / আজিজ হাসান
(আমার) রবিভাব… ভাব ও অভাব / মানস চৌধুরী
একজন তৃতীয় সারির কবি”: রবীন্দ্রকবিতার বোর্হেসকৃত মূল্যায়ন / রাজু আলাউদ্দিন
রবি সান্নিধ্যে / মার্গারিট উইলকিনসন (অনুবাদ: প্রিসিলা রাজ)
অশেষ রবীন্দ্র প্রীতি / সাইমন জাকারিয়া
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে ও গদ্যে মুসলমানের কথা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা / সাদ কামালী
ভাঙা গড়ার রবীন্দ্রনাথ: প্রাচ্যনাট-এর ’রাজা …এবং অন্যান্য’ / ব্রাত্য রাইসু

—–

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: প্রমা সঞ্চিতা অত্রি
ইমেইল: pshanchita@gmail.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


6 Responses

  1. শফিক শাহীন says:

    “… কিন্তু এগুলো যত না প্রিয়, তার থেকে অনেক বেশি স্মৃতির একটা স্মারক, একটা উপলক্ষ বা অনুভূতির লিগেসি, হয়তো বা নস্টালজিয়া।” – ধন্যবাদ মানস চৌধুরী। এই সময়ে এরকমই অনুভূতি হয় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়তে এখনো ভাল লাগে, কিন্তু সেটা আগের মতো নয়। সেক্ষত্রে পরিবর্তন তো কিছু এসেছেই, অস্বীকার করা যায় না। রাশিদা সুলতানার মন্তব্য এক্ষেত্রে যথার্থ বলে মনে হয়। প্রতিটা মানুষেরই চিন্তার বলয়টি নানান দিক থেকে অনন্য। চিন্তার লিগেসি তো থাকবেই। একজন গল্পকার প্রভাবিত হয়েও লিখতে পারেন। কিন্তু তিনি বা তাঁরা রবীন্দ্র বলয়ে আটকে পড়ে রইবেন বা আছেন এরকম ভাবার কারণ নেই।

  2. কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর says:

    রবীন্দ্রগল্প বিষয়ে নানান গল্পকারের নানান মত পাওয়া গেল। তবে এ কথা বলতেই হবে যে গল্পের রবীন্দ্রনাথকে হিসাবের মধ্যে না-এনে উপায় নেই।
    অন্তত দু’জন গল্পকার জানালেন যে রবীন্দ্রনাথ গল্পের একটা সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এ বিষয়টি মানা যায় না। তিনি ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায় মোটেই ছোটগল্পের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেননি। তিনি বর্ষায় তার যাপিত সময় সম্পর্কে কিছু ভাবনা জানিয়েছেন মাত্র। এতে বর্ষাযাপনের কাব্যিক আবহ ছাড়া গল্প সংক্রান্ত কিছুই বোঝা সঠিক নয়। অথচ একেই ছোটগল্পের সংজ্ঞানির্ধারণী একটা কর্ম ধরা হয়! রবীন্দ্রনাথ নিজেও গল্পের জায়গা-জমিনে ছোট প্রাণ ছোট ব্যথায় মগ্ন থাকেননি।

    আরেকটা বিষয় হচ্ছে, সতীনাথ ভাদুড়ী ও সেলিম মোরশেদ-এর নাম এখানে সঠিকভাবে লেখা হয়নি।

    [নামের বানান ঠিক করে নেওয়া হলো। ধন্যবাদ। – বি. স.]

  3. বনি আমিন says:

    প্যাচাল–এত লম্বা প্যাচাল যে বিরক্তি লাগে। উত্তর আধুনিক এ জামানায় এত প্যাচাল শোনার বা তা আবার পড়ার সময় কোথায় মানুষের? মাহবুব মোর্শেদ খুব সম্ভব লিখেছেন–এ প্রশ্নগুলো তো করার কথা সাহিত্যের অধ্যাপকদের কাছে–আমার মতো গল্পকারের নিকট কেন? এ রকম কথা হাসান আজিজুল হকও প্রকারান্তরে বলেছেন। আমাদের ব্যাচে আমরা মনে হয় দুশ জন ছিলাম–তারাও কি কেউ পড়বে? বিবি-বাচ্চার ভরণ-পোষণ চালাতেই হিমশিম সেখানে আবার বাংলা ছোটগল্প–রবীন্দ্রনাথ–পরবর্তীদের ওপর প্রভাব। এটা একটা শ্রদ্ধার্ঘ্য যেটা রবীন্দ্রনাথকে নিবেদিত। প্যাচাল হলেও আমি পড়লাম অনেক কষ্ট করে সময় বের করে। আমার কাছে ভাল লেগেছে–চঞ্চল আশরাফ, পাপড়ি রহমান, অদিতী ফাল্গুনী, মাহবুব মোর্শেদ, সুমন রহমান এঁদের কথাগুলো। মাহবুব মোর্শেদের কথায় স্ববিরোধিতা আছে। ঐ যে, তিনি রবীন্দ্রনাথের সাধু চলতির দোষ ধরেছেন তো তিনি তাঁর আলোচনায় কী ভাষা ব্যবহার করেছেন? আর সেটা যদি তাঁর স্টাইল হয় তাহলে তো এ-সব সব প্যাচাল বই তো নয়। ধন্যবাদ অনেক!

  4. গীতা দাস says:

    বনি আমিন,
    ‘প্যাচাল–এত লম্বা প্যাচাল যে বিরক্তি লাগে। উত্তর আধুনিক এ জামানায় এত প্যাচাল শোনার বা তা আবার পড়ার সময় কোথায় মানুষের?’
    সাহিত্য পড়বেন আর সময় দেবেন না তা কী করে হয়?
    আমার কিন্তু বিভিন্ন গল্পকারের মুখে রবীন্দ্র ছোটগল্প ও তাদের নিজের গল্প নিয়ে কথাবার্তা ভালই লেগেছে। তবে প্রমা সঞ্চিতা অত্রিকে ছোটগল্পকার বাছাইয়ে আরও সচেতন হওয়ার অনুরোধ করছি।

  5. শাহেদুজ্জামান লিংকন says:

    রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে বিভিন্ন দশকের গল্পকারদের বক্তব্য বেশ সুখপাঠ্য হলো। আমিও সবার সাথে একমত যে সময় যেহেতু বদলে গেছে তাই রবীন্দ্রনাথের প্রেক্ষাপট এখন আর খাপ খাবে না। তার গল্প আমাদের কাছে এখনো অবশ্য পাঠ্য তবে অনুসরণের চেষ্টা পিছিয়ে যাওয়ারই নামান্তর। একথা স্বীকার করছি যে, যে গল্পগুলো ‘কাহিনীপ্রধান’ নয় বরং ‘চিন্তাপ্রধান’ সেগুলোর আবেদন চিরকালীন। কিন্তু ভাষার দিকটা এখন পরিত্যাজ্য।

  6. দুখু সুমন says:

    ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা,
    ছোট ছোট দুঃখ কথা
    নিতান্ত সহজ সরল,
    সহস্র
    বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ
    যেতেছে ভাসি
    তারি দু-চারটি অশ্রু জল।
    নাহি বর্ণনার
    ছটা ঘটনার ঘনঘটা,
    নাহি তত্ত্ব
    নাহি উপদেশ।
    অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ
    করি মনে হবে
    শেষ হয়ে হইল না শেষ।
    জগতের শত শত অসমাপ্ত
    কথা যত,
    অকালের বিচ্ছিন্ন মুকুল,
    অকালের জীবনগুলো,
    অখ্যাত কীর্তির ধুলা,
    কত ভাব, কত ভয় ভুল-

    –রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

    গল্পকারগণ যুক্তিপূর্ণ মুক্তিমন্ত্রে রবীন্দ্রনাথ থেকে সরিয়ে নিতে চাইলেও প্রাণ যেন বাঁধা পড়ে রইলো তাঁর এই ছোট্ট কবিতায়। তবে সব’চে ভালো লেগেছে সময়ের পরিবর্তন বিষয়টাকে সবাই যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখতে চেয়েছেন। সেই সময়ের পরিবর্তনের দোহাই পেতেই বলছি, কবিতাটা নতুন সময় মাপে পাঠ করতে। বিরক্ত না হয়ে কেউ যদি সত্যি কবিতাটা নতুন করে পড়েন, তবে হয়তো স্পষ্টই সমস্ত অপরিবর্তনগুলি-ই চোখে পড়বে। হায়, ভাব-রসের সাহিত্য দুনিয়ায়- জাদুবাস্তবতা খুঁজতে মানুষ আমেরিকা যায়, একবার খুলেও দেখে না জাদুবাস্তবতার আদি উৎস আছে ঘরের “মহাভারত”টায়।
    ভালো থাকুন প্রিয় গল্পকারগণ। আপনাদের সম্মান ও সমৃদ্ধি কামনা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.