জীবনী

খণ্ডিত জীবন (কিস্তি ৯)

ফয়েজ আহ্‌মদ | 20 Oct , 2011  

কিস্তি ১ | কিস্তি ২ | কিস্তি ৩ | কিস্তি ৪ | কিস্তি ৫ | কিস্তি ৬ | কিস্তি ৭ | কিস্তি ৮

(কিস্তি ৮-এর পরে)

mujib-1953.jpg…….
১৯৫৩-র শেখ মুজিবুর রহমান
…….
সেদিন ভোর থেকেই জেলগেটে উত্তেজনা আমরা দেখতে পেলাম। আমরা মানে, যারা জেলের ভিতরে আছি। আমাদের থাকার জায়গা জেলের গেটের দিকে খোলা। তার ফলে মেইন গেটের প্রবেশ দ্বারটা আমরা ভিতর থেকে—কে যাচ্ছে, কে আসছে—লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই। সেদিন আমরা দেখলাম জেল গেটে ভীষণ উত্তেজনার মধ্যে অফিসাররা যাওয়া আসা করছে। সংশ্লিষ্ট জেল-রক্ষক যারা আছে, তারা যাওয়া আসা করছে। এবং সমস্ত কনস্টেবল পুলিশ—যারা জেল পুলিশ, যারা নাকি আমাদের পাহারা দেয়, আমাদের চিঠিপত্র আনা-নেওয়া, খাওয়া দাওয়া দেয়—তারা সবাই খুব তটস্থ এবং সবার মধ্যে একটা অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের আগ্রহ দেখা দিলো।

আমরা যেই সেল এলাকায় থাকতাম জেলের—দোতলা একটা পুরাতন বিল্ডিং, এটা পরে দোতলা করা হয়েছিল। সেই বিল্ডিংটার নিচতলায় সম্পূর্ণ একটা হল, উপর তলায়ও একটা হল—মাঝখানে কোন দেয়াল টেয়াল নাই। ফলে আমরা নিচের তলায় যেই হলটায় থাকতাম—সেটার নাম ছিলো, ওরা বলতো ‘খাতা’, ব্রিটিশ আমল থেকে শব্দটা। খাতা মানে ওয়ার্ড। আমাদের ওয়ার্ডের নাম ছিলো এক নম্বর খাতা। জেল গেটের পরেই। জেল গেট দিয়ে কেউ ঢুকলেই প্রথমে যে ওয়ার্ড চোখে পড়বে—সেটা হচ্ছে আমাদের ওয়ার্ড। এই এক নম্বর ওয়ার্ডে আমরা থাকতাম—সব রাজনৈতিক বন্দীরা, সিকিউরিটি প্রিজনার সবাই। আইউব খান মার্শাল ল জারি করার পরে পরেই একটা লং লিস্ট তৈরি হয়, সেই লিস্ট অনুযায়ী আমি মাস দুই পরে ধরা পড়ি। আমার বন্ধু-বান্ধব অনেকেই আমার আগে ধরা পড়েছে। অনেকে আমার পরেও ধরা পড়েছে। আমরা সবাই পালাইয়া ছিলাম—বন্ধুদের বাড়িতে, আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে—যে যেখানে পারে। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যেই প্রায় সবাই ধরা পড়ে যায়, ব্যাপক অভিযান চালায় পুলিশ।

আমার ছিলো এটা প্রথম জেল। নানান অভিজ্ঞতা। তো বড়ো একটা হল রুমে আমরা থাকি। বড়ো বড়ো জানালা, ফ্যান তো দেয় না, আলো-বাতাস চলাচলের জন্য বড়ো জানালা করা হইছে। ওই জানালা দিয়ে যারাই জেলে ঢোকে, যারাই জেল দিয়ে বের হয়—তাদের দেখা যায়। এই বিল্ডিংটা বলা হয়, শায়েস্তা খাঁর আমলের, দ্যাট ইজ, মোঘল আমলের—বিরাট বিল্ডিং। শায়েস্তা খাঁর আমলে এই বাড়িটা করা হয়েছিলো ঘোড়া রাখার জন্য, আস্তাবল হিসেবে। এইখানে ছিলাম আমরা প্রথমে। পরে আমাদের বিভিন্ন জায়গায় নেওয়া হয়, অন্যন্য জেলে। এক জেলে রাখার বিষয়ে নিয়ম আছে, বেশি দিন রাখা হয় না। এই নিয়ম এই জন্য যে, এক জায়গায় বেশি দিন থাকলে নানান রকম খারাপ বুদ্ধি করে, জেল থেকে পালানোর বুদ্ধি করতে পারে, অনেকের জেলের পাহারাদার-অফিসারদের সাথে খাতির হয়, বাইরে থেকে টাকা দিয়া তাদের কাজে লাগায়—এইসব ভয়ে নানান জেলে স্থানান্তর ঘটে।

তো আমরা সেদিন দেখলাম জেলগেটে—জেলের ইনার গেটে উত্তেজনা খুব বেশি। পাহারাদার সংখ্যায় বেশি। তখন আমরা ভাবতে শুরু করলাম—ঘটনা কী? হয় কি, জেলে তো অন্য কোন কাজ নাই—পড়াশুনা নাই, কাগজ লিমিটেড, দুই একটা আসে, তারপরে লিমিটেড লোক আছে—তার বাইরে কারো সাথে দেখাও হয় না, কারো কারো বাড়ি দূরে, দুই তিন মাসেও কেউ দেখা করতে আসতে পারে না। যারা ঢাকায় থাকে তাদেরই মেইনলি আত্মীয় স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ হয়। তাও হয়তো এক মাসে এক বার পারমিশন দেয়। ফলে যারা জেলে থাকে তারা কিছু গন্ধ পেলেই অনুসন্ধান করে, জানতে চায়। কী হইলো, কেন? আগ্রহ বাড়ে, অন্য কোন কাজ নাই! সুতরাং আমরা উৎসাহী হইয়া দাঁড়াইয়া গেলাম—ব্যাপারটা কী হচ্ছে গেটে!

094.jpg
………
ফয়েজ আহ্‌মদ
……….
কিছুক্ষণ পরে একজন জমাদার আসলো—জেলে কাজ করে, নাজির জমাদার। তার কাজেই—কারো চিঠিপত্র আছে, কারো নাই, কেউ কোন কিছু আনতে দিছে ইত্যাদি। সবচেয়ে কম লেখাপড়া জানা, সবচেয়ে ছোট যে অফিসারটি সে হলো নাজির জমাদার। ওনার কাছে আমরা জানতে চেষ্টা করলাম। বললো না কিছু। বললো, শেখ সাব কা মামলা হ্যায়, আপকা নেহি। নাজির জমাদার বিহারী ছিলো, পাকিস্তান হবার পরে পূর্ব পাকিস্তানে আইছে। আর কিছু কয় নাই, আমরাও কিছু কই নাই। কইতে বাধ্য না ও। আমরা ভাবলাম শেখ সাহেবের সাথে কিছু হইছে হয়তো কর্তৃপক্ষের। সে অন্য ওয়ার্ডে, সেল এলাকায়। ছাব্বিশ নম্বর সেল সেইটা।

তো, আমরা জানতে পারলাম না। জানলাম রাতে, ১২ টার দিকে। শেখ সাহেবের সাথে আরো সাত-আট জন পলিটিক্যাল প্রিজনার ছিলো, একই ওয়ার্ডে, সেল এলাকায়—২৬ সেল বলে ওইটাকে, ছাব্বিশটা সেল আছে ওই এলাকায়। প্রত্যেকটায় একজন করে থাকতো। আর মাঝখানে মাঠের মতোন একটা জায়গা। দিনের বেলায় এক সাথে থাকতো, সন্ধ্যার আগে যার যার রুমে ঢুকতে হইতো। তারপর রুম বন্ধ কইরা দেওয়া হয়।

আমরা পরে জানতে পারলাম কারণটা। শেখ সাহেবরে নিয়াই উত্তেজনা শুরু হইছে এবং শেখ সাব অনেকদূর পর্যন্ত অগ্রসর হইছেন ব্যাপারটা নিয়া। ওইদিন সকালবেলা ৮ টার দিকে বলা হইছিলো আপনারা সেলে যারা আছেন, সবাই বের হয়ে আসেন, কেবল শেখ সাব ছাড়া। সবার বিরুদ্ধে কেস ছিলো। এখন সবাইরে মুক্তি দিয়া দিছে, শেখ সাব ছাড়া। কারণ শেখ সাবের বিরুদ্ধে যে মামলা আছে কোর্টে, তার মধ্যে একটা বা দুইটা মামলা শেষ হয় নাই এখনো। আর অন্যদের সব মামলা একই সাথে খারিজ হইয়া গেছে। শেখ সাবের এলাকা–২৬ সেল-এর সবার রিলিজ হইয়া গেলো। আটটার পরে দেখা গেলো শেখ একলা, সব খালি হইয়া গেছে। জেলে আইন আছে–উইদাউট পার্টিকুলার রিজন একা রাখতে পারবা না। বিশেষ অর্ডার থাকতে হবে, সরকার, আইবি বা কোর্টের অর্ডার। না থাকলে একলা রাখা যাবে না বন্দীকে।

যেহেতু আইসোলেট করা যায় না, আইনে আছে, কিন্তু সে তো আইসোলেট হইয়া গেছে! তার সাথের নয় জন রিলিজ হইছে। সে তখন কইলো আমাকে সেগ্রিগেট করা হইলো। সেগ্রিগেসন হইলো–একক থাকা। সে কইলো আমাকে তোমরা একলা রাখতে পারো না, আইবি’র অর্ডার ছাড়া। সুতরাং আই ওয়ান্ট রিলিজ! এইটা নিয়াই দৌঁড়াদৌঁড়ি, উত্তেজনা। এইটাই আমরা দেখছি জেলগেটে। শেখ সাহেব সব বুঝেও দাবী করছেন যে তাকে আইসোলেট করা হয়েছে।

শেখ সাব এগারোটার দিকে একটা এপ্লিকেশন দিছে এই মর্মে যে, তাকে আইসোলেট করা হয়েছে, কেন করা হয়েছে–সে জানতে চায়। শেখ সাব দাবি করলো, এইটা আইবিতে পাঠানো হোক। এই ডিমান্ড করাতেই হইচই পড়ছে। পরে আইবির লোক জেলগেটে আসলো, এসপি, ডিএসপি–এরা। তারা আইসা বললো–আপনাকে তো আইসোলেট করা হয় নাই। শেখ সাব কইলো, আমারে যদি আইসোলেট করা নাই হয় তাইলে আমার সাথের লোক কোথায়? ছাব্বিশটা সেলের মধ্যে আমি একা! আমাকে রিলিজ দেওয়া হোক।

আইবির লোকেরা বললো আপনাকে রিলিজ দেওয়া হয় নাই, বাকি সবাইর হইয়া গেছে। তারা ঠিক করলো আর যারা আছে সিকিউরিটি প্রিজনার, তাদের পাঁচ-সাতজন আইনা ছাব্বিশ সেলে দিয়া দাও। তাইলেই আর আইসোলেট হইলো না! তখন শেখ সাহেবকে জানানো হইলো–আপনাকে লোক দেওয়া হইতেছে, সুতরাং আপনে অপেক্ষা করেন। শেখ সাব কইলো–কাকে দিবা তোমরা, আমাকে জিজ্ঞেস কইরা দিতে হবে। শেখ সাহেব স্ট্রং হইয়া গেলো একেবারে। সে জিইতা গেলো!

তখন শেখ সাহেব নাম দিলো। তারা বিভিন্ন ওয়ার্ডে আছে। তার মধ্যে আমি একজন। সন্তোষের নাম দিলো, তারপরে শফি আহমেদ বইলা নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের নেতা ছিলো–তাঁর নাম দিলো। কিন্তু শেখ সাহেবের এইটা দেওয়ার কোন বিধান নাই। সে তো প্রিজনার, তার কোন ভয়েজ নাই। কিন্তু শেখ সাহেবের কাছ থেকে নিলো। তারপর আমাদের ওয়ার্ডে, অন্যান্য ওয়ার্ডে শেখ সাবের লিস্ট ধইরা সবাইকে ২৬ সেলে নেওয়া হইলো।

[চলবে…]

পরের কিস্তি

——–

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: ফয়েজ আহমদ
ইমেইল: artsbdnews24@gmail.com

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


4 Responses

  1. Abir says:

    ধন্যবাদ কিস্তি ৯ অবশেষে পাবলিশ করার জন্য… অসাধারণ এই ইতিহাসগুলা অতি সাধারণ ভাবে উপস্থাপন করার জন্য লেখককে আবারো ধন্যবাদ। ওয়ান মোর থিং, হিজ বোল্ডনেস ইন হিজ রাইটিং ট্রুথ ইজ আন প্যারালাল।

  2. solar lights says:

    চমৎকার একজন বিচক্ষণ নেতা ছিলেন আমাদের বঙ্গবন্ধু। কোন এক ঐশী শক্তির বলে তিনি অনেক ঘটনাই আগে থেকে অনুমান করতে পারতেন। আহা আজ যদি তিনি বেঁচে থাকতেন।

    ফয়েজ আহমদকে অসংখ্য ধন্যবাদ এই চমৎকার লেখাটার জন্য।

  3. Puspita says:

    তখন জেলে বন্দি রাজনৈতিক নেতাদের সাথে কী রকম আচরণ করা হতো, আর এখন কী রকম করা হয়? এখন রাজনৈতিক নেতাদেরকে অভুক্ত রাখা, রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা, ডাণ্ডাবেড়ি পরানো সহ এমন কোনো নির্যাতন নেই করা হচ্ছে না। চিন্তা করা যায়?

  4. Altaf says:

    এখন রাজনৈতিক নেতাদের সাথে যা করা হচ্ছে তারচেয়েও বেশি নির্যাতন আগের বিএনপি জামাতের জাতিয়াতাবাদী ইসলামিক সরকারের সময় থেকে শুরু হয়েছে। আমরা দেখেছি তারা কীভাবে বিরোধী দলের কর্মীদের মিথ্যা মামলায় ফাসিয়ে ভয়াবহ নির্যাতন করেছিল। সাধারণ মানুষও বাদ ছিল না। জজ মিয়া তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.