অনুবাদ, বিশ্বসাহিত্য, সাক্ষাৎকার

কবি টোমাজ ট্রান্সট্রোমারের সাক্ষাৎকার

ফাতেমা সুলতানা শুভ্রা | 13 Oct , 2011  

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: তান লিন নেভিল ও লিন্ডা হোরভ্যাথ

সাক্ষাৎকারটি ১৯৯০ সালে ফিলাডেলফিয়ার পেইন্টেড ব্রিজ কোয়ার্টার্লি-এ প্রথম প্রকাশিত। সাক্ষাৎকারের শুরুতে তান লিন নেভিলের একটা ভূমিকা ছিলো। ভূমিকাটি তাঁর ভাষ্যে এখানে দেওয়া হলো। সাক্ষাৎকারটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন ফাতেমা সুলতানা শুভ্রা–বি.স.

তান লিন নেভিলের ভূমিকা:

কবি টোমাজ ট্রান্সট্রোমার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ১৯৩১ সনে স্টকহোমে তাঁর জন্ম। ১৯৮১ সনে পশ্চিম জার্মানির পেত্রার্ক পুরস্কার এবং ১৯৮৩ সনে তিনি কবিতার জন্য স্বনামধন্য বোনার অ্যাডওয়ার্ড অর্জন করেন। তাঁর নির্বাচিত কবিতা (১৯৫৪- ১৯৮৮) ১৯৮৭ সনে যুক্তরাষ্ট্রের ইকো প্রকাশনী থেকে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়। motiv1974.jpg
………
টোমাজ ট্রান্সট্রোমার
………

১৯৮৯ সনের ঠিক আগের বসন্তে কবি টোমাজ ট্রান্সট্রোমারের সাথে আমার পরিচয়। আমি তখন সবেমাত্র MFA শেষ করেছি। একদিকে স্বপ্নভঙ্গ আর অন্যদিকে সমাপ্তির আনন্দ–এই দুয়ের টানাপোড়েনের মধ্যে কবির সাথে আমার পরিচয়। কবির সাথে আমার পরিচয়, আর পরিচয়ের সূত্রে আমাদের আলাপ আমাকে কাব্যের এক বিস্তৃত, সীমাহীন নন-টেরিটরিয়্যাল শেকড়ের সাথে যুক্ত করে দেয়। কবি ট্রান্সট্রোমারের কথাগুলো আমাকে ভীষণ টানে। তাঁর বিষণ্ন নিঃসঙ্গতা, গাম্ভীর্য, আয়েসী মন সব মিলিয়ে আমাকে এক ঝলক মুক্ত বাতাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। আর সেই কবি ভালবাসেন মানুষের সঙ্গ। তাঁর কথাগুলো গভীর চিন্তা, মুক্তমনের হাত ধরে মনের গহীন থেকে উঠে আসতে দেখি। কবি ধীর লয়ে কথা বলেন। তারপরেও কথাগুলো কেমন আনন্দের, চটকের, ঠাট্টার আবার ভীষণ গুরুগম্ভীরও–যেন ঠিক বাঁধের না, এক রকম ভেবে নেয়ার না।

১৯৮৯ সনের ৭ এপ্রিল লিন্ডা হোরভ্যাথের সুউচ্চ এ্যাপার্টমেন্ট। সামনে ইন্ডিয়ানাপোলিসের দৃশ্যপট। সেই উঁচু দালানে বসে আমি আর হোরভ্যাথ কবি ট্রান্সট্রোমারের সাথে আলাপ শুরু করে দেই। সাক্ষাতকারের সময় কবি যেভাবে কথা বলছিলেন তাঁর কথার অনন্য বিশেষত্ব ধরে রাখতে যতোটুকু সম্ভব, এক্কেবারে অস্পষ্ট না হলে, এই লেখায় কবির কথায় আমার কোন হাত পড়েনি। কবির মুখের কথাগুলো আমি তার মতো করে লিখে গেছি। আমার আর হোরভ্যাথের সাথে কবির আলাপ যতো এগুচ্ছিলো ততোই আমার মনে হচ্ছিল আমি একরাশ খোলা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে বড় বড় নিঃশ্বাস টেনে নিচ্ছি। ঠিক এরকম উদ্দাম হাওয়ার কথা কবির কাব্যে বারবারই ফিরে আসে। সাক্ষাতকার নেয়ার ৬ মাস পর এই যে এখন আমি আলাপের কথাগুলো লিখছি, এক একেকটা শব্দ ধীরে ধীরে পড়ছি, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছি আর এই দেখতে গিয়ে লেখার কাজ একবারের জন্যও কঠিন মনে হচ্ছে না। বরং কবির কথা, এক একটি শব্দ ৬ মাস পর পড়তে পড়তে লিখতে গিয়ে মনে হয়েছে এই পড়াটায়, লেখাটায় আমি যেন এক আয়েশী যাত্রার আনন্দ ক্রমাগত অনুভব করে গেছি।–তান লিন নেভিল


————————–

হোরভ্যাথ: আমি আসলে আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই। আমার মনে হয় আপনি আপনার অনুবাদকদের সাথে সাহিত্যের কোন এক ঘরানার অবস্থান শেয়ার করেন। আমার মনে হয় সেই ঘরানাকে একটা নামে নির্দিষ্টও করা যায়। এমনকি আমিও আপনার কাব্যের যারা অনুবাদক ছিলেন যেমন ব্লাই, সোয়েনসন. ফুলটন আরো আরো যারা আছেন তাদের অনেকের সাথে একধরনের আত্মীয়তা বা একধরনের যোগসূত্র টের পাই।

ট্রান্সট্রোমার: হ্যাঁ, সেটা আসলে ঠিকই। আপনি কাব্যের সেই বিশাল ঘরানাকে আধুনিকতা বা আধুনিক কাব্য ভাবনা বলতে পারেন। আমার মনে হয় এর বাইরেও আরো কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয় আছে। যেমন ধরেন, আমার কবিতার প্রতি যে কবি প্রথম আগ্রহ দেখিয়েছিলেন তিনি হলেন রবার্ট ব্লাই। আমার কাব্যের প্রতি তাঁর এই আগ্রহের কারণ–আমার মনে হয়–আমরা দুজনেই একই ভাবনা বা কাব্য প্রসঙ্গে কম বেশি এক দিকেই কাজ করেছি। ব্লাই নরওয়েতে থেকেছেন, স্ক্যান্ডিনেভিয় লেখকদের লেখা পড়েছেন। তিনি আমেরিকানদের সামনে প্রকৃতি বিষয়ে একটা বিশেষ ধরনের ভাবনা তুলে ধরতে চাইছিলেন যে ভাবনা ভীষণভাবে স্ক্যান্ডিনেভিয় কাব্যের অনন্য বৈশিষ্ট্য। ব্লাইয়ের দ্য রাইটিং ইন সাইলেন্স ইন দ্য স্নোয়িং ফিল্ডস বইয়ের লেখাগুলো আমার যেমন ভীষণ চেনা মনে হয়। তাঁর বইয়ের কবিতাগুলো সম্পূর্ণভাবেই আমেরিকান; কিন্তু যখন আমি প্রথম এই কবিতাগুলো পড়ি, আমি নিজেকে সেগুলোর সাথে একাত্ম করতে পারছিলাম। তাঁর কাব্য আমার চেনা মনে হচ্ছিল। ফলে অনুবাদক যদি কোন কবির পন্থাতেই কাজ করে আর সেই অনুবাদক যদি অনুবাদ করে তবে এর চেয়ে উৎসাহব্যঞ্জক আর কিছু হতে পারে না। এরকম অভিজ্ঞতা আসলে সবার হয়ও না।

আমাকে ভাগ্যবানই বলতে পারেন। আমার কবিতাগুলো যে কবিরাই অনুবাদ করেছেন তারা কম বেশি সুইডিশ ভাষাটা জানেন। সুইডিশ ভাষা এতো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা–এটি জানা থাকা আসলে অহরহই ঘটে, তা কিন্তু নয়। বরং এমনটা হয় যে আপনার কাব্যের অনুবাদের দায়িত্ব এমন কোন ভাষা বিশেষজ্ঞের উপর বর্তায় যিনি কবিতার প্রতি বা কবিতার অনুভূতির প্রতি তেমন কোন আগ্রহ বোধ করেন না।

নেভিল: গতরাতে বলছিলেন, আপনি এতো বেশি অনূদিত হয়েছেন যে ঐ অনুবাদ আপনার সুইডিশ পাল্টে ফেলেছে। আপনার এখনকার সুইডিশ আর আগের মতো অতো সুইডিশ নেই—যখন শুরু করেছিলেন। কিংবা আপনার সুইডিশ আসলে কোনভাবেই আর সুইডিশ ছিলো না, তাই কি?

ট্রান্সট্রোমার: হুম…আসলে যে নারী আমাকে সেদিন পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি আমাকে ওভাবেই উদ্ধৃত করেন।

নেভিল: আপনি কি একমত?

ট্রান্সট্রোমার: আসলে এ নিয়ে কোন সিদ্ধান্তে আসাটা আমার পক্ষে কঠিন। কেননা সেটা আমার খুব সচেতন দশায় ঘটেনি। আমার মনে হয়, খুব নিঃসঙ্গ লেখকের মনের মধ্যেও কোন এক ধরনের দর্শক বা শ্রোতা উপস্থিতি থাকে। এক ধরনের অদৃশ্য পাঠক, লেখক হয়তো সচেতনভাবে এদের খুব টের পান না কিন্তু এই পাঠক লেখকের মনের মধ্যে কোথাও থেকে যায়। আমি প্রায়ই ভাবি এই অদৃশ্য অডিয়েন্স আসলে সেসব বন্ধুবান্ধব, কাছের মানুষ, যারা আপনাকে খুব ভালভাবে বোঝে। কিন্তু পরে অন্য সংস্কৃতির মানুষজনের সাথে মোলাকাতের চমৎকার অভিজ্ঞতা হলে, বিদেশের পাঠকেরা যখন আপনাকে পড়ে তখন তাদের প্রভাব পড়ে আপনার উপর; তার এমনভাবে আপনার অডিয়েন্সের ভিতর চলে আসে যে তারা আপনাকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। আর এই অভিজ্ঞতাটা সুন্দরও। আমাদের জন্য দুঃখজনক যে, সুইডিশ অনেক দারুণ দারুণ কবির অনুবাদ অসম্ভব হয়ে পড়ে তাদের লেখার কাঠামোর কারণে। তাদের লেখায় সুইডিশ ভাষার কাঠামো এতো কড়া যে তাদের অনুবাদ করা প্রায় অসম্ভব। অন্য কবিদের অনুবাদ বেশ সহজ। সব ভাষার ক্ষেত্রেই এই রকম আসলে।

tt-banner-6.jpg
টোমাজ ট্রান্সট্রোমার

হোরভ্যাথ: আপনি কি পূর্ব ইউরোপীয় অন্যান্য দেশগুলোর গ্লাসনোট পলিসির অবাধ তথ্য প্রসঙ্গে কিছু জানেন?

ট্রান্সট্রোমার: হ্যাঁ… অবশ্যই। আমি বলতে চাইছি, বিশ্বে রোমানিয়ার অবস্থাই বোধহয় সবচেয়ে খারাপ। রোমানিয়া অন্য দিকে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের জন্য প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের বাল্টিক অংশ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া–এসব জায়গায় দারুণ পরিবর্তন এসেছে। আমি লাটভিয়া, এস্তোনিয়ায় ছিলাম ১৯৭০ সনে। তখন এগুলি ছিলো অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং বিচ্ছিন্ন। সেসময় ঐ সব অঞ্চলে গিয়ে কখনও কখনও নিজেকে গ্রাহাম গ্রিনের প্রথম দিককার গল্পের একজন মনে হওয়াটাও অস্বাভাবিক ছিলো না।

আমার মতো অনেক সুইডিশের কাছেই এই দেশগুলোর গুরুত্ব অসীম। বাল্টিক সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবছর আমাদের এখানে অনেক নির্বাসিত ব্যক্তি আসেন, আর আমরা ওখানে কি হচ্ছে সে নিয়ে বেশ সচেতনও। গত কয়েক বছর ধরে, বিশেষভাবে গত বছরের শেষ মাসে অভূতপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।

নেভিল: আমি আসলে আবার আপনার সেই অডিয়েন্স প্রশ্নটায় কিছুক্ষণের জন্য ফিরে যেতে চাইছি। আমাদের দেশে আসলে কবিতার জন্য কি ধরনের পাঠক বা অডিয়েন্স আছে বলে আপনার মনে হয়? আমি তো এখানে দেখি পরিস্থিতি শ্বাসরুদ্ধকর, কেবল নিজের চারপাশ ঘিরে, আত্মকেন্দ্রিক। একজন কবি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অন্য কবি আর কাব্যের শিক্ষার্থীদের জন্যই কবিতা লিখে থাকেন। আমি জানতে চাইছি, সুইডেনের বেলাতেও পরিস্থিতি কি এই রকম?

ট্রান্সট্রোমার: ওয়েল…আসলে এখানে কাব্যের পাঠ অনেক বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনার সাথে জড়িত আর সুইডেনে কবিতার সাথে পাঠাগারের সম্পর্ক খুব জোরালো। সুইডেনে পাঠাগারেই কাব্য পাঠের ব্যবস্থা করা হয়। আপনি যদি ইন্ডিয়ানাপোলিসের মতো কোথাও যান তবে আপনি পড়বার জন্য পাঠাগারেই যাবেন আর সেখানে আপনি বিভিন্ন বয়স, বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের অনেক মানুষের দেখা পাবেন।

নেভিল: তারমানে সুইডেনে পাঠকরা অনেক মিশ্র কিসিমের… বড় পরিসরের?

ট্রান্সট্রোমার: হ্যা। সুইডেনে আপনি একদল তরুণ পাবেন যারা একজন আরেকজনকে সহযোগিতা করে। সবাই তারা লেখে এবং সম্ভবতঃ তারা একসাথে পড়ে বা আরো কিছু করে। কিন্তু আপসালার মতো জায়গায় বিভিন্ন জায়গার অডিয়েন্স একসাতে জড়ো হয়। হতে পারে, খুব নিঃসঙ্গ কোন মানুষ যিনি কবিতা পড়েন, সবাই সে রকম না অবশ্যই।

নেভিল: কিন্তু তারা সবাই শিক্ষক বা শিক্ষার্থী নয়?

ট্রান্সট্রোমার: সে রকম অনেকে থাকেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও পড়াশুনা হয় কিন্তু ওই ধরনের জমায়েত শিক্ষার অংশ হিসেবে গড়ে উঠে তা নয়; বরং নিজেদেরই সাহিত্য ক্লাব আছে এখানকার শিক্ষার্থীদের। আর কী পার্থক্য আছে? এটা বলা যায় যে সুইডিশ অডিয়েন্স বরং নিজেদের অনুভূতি প্রকাশে বেশ অনাগ্রহী। তারা ঐতিহ্যগতভাবে খুব শান্ত ভঙ্গিতে বসেন এবং তাঁদের মুখাবয়ব থাকে অভিব্যক্তিহীন–তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন না, হাসেন না, বা চীৎকার করেও ওঠেন না। তারা মনে করেন নিজের অনুভূতি প্রকাশ না করাটাই ভদ্রতা। সময়ে সময়ে এসব নিয়ে ভীষণ মন খারাপ হয়। মানুষজন বোর হচ্ছে নাকি আনন্দে আপ্লুত হচ্ছে–বুঝতে পারবেন না আপনি।

এখানে অডিয়েন্স তাদের অনুভূতি বেশ সরাসরি প্রকাশ করেন। কিন্তু আমেরিকাতেও অঞ্চলভেদে ভিন্নতা আছে। যেমন ধরেন, মধ্য পশ্চিম সম্ভবতঃ সবচে চাপা স্বভাবের।

হোরভ্যাথ: ২২ বছর বয়সে আপনার প্রথম বই প্রকাশিত হয়। আপনার কি মনে হয় যে সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত আপনার কাব্যচর্চা ধাপে ধাপে এগিয়েছে ক্রমশঃ?

ট্রান্সট্রোমার: আমার তাই মনে হয়…(হাসি) কিন্তু সে বিচার আমার জন্য কঠিন। আমার সমালোচকরা প্রায়ই বলে থাকেন–আমার নতুন কোন বই বের হলে—সেই একই জিনিস বা উন্নতি সামান্যই। তাঁরা আমার লেখার মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা দেখতে পান; আমার প্রথম বই পড়ে দেখতে পান—সেই একই ধরনের জিনিস আবার আসছে এখনকার লেখায়। কিন্তু আমার কাছে অনেক তফাৎ।

হোরভ্যাথ: আমি যখন আপনার নির্বাচিত কবিতা বইটি পড়ছিলাম, তখন আমার মনে হয়েছে আপনার কবিতা সময়ের সাথে জটিলতর হয়ে উঠেছে। সে কারণেই আসলে এই প্রশ্নটা করা।

ট্রান্সট্রোমার: জটিলতর হয়ে উঠার বিষয়টা সত্য হতে পারে। কিন্তু ভাষার দিক দিয়ে শুরুতে আমি আরো জটিল ছিলাম। অনুবাদের মাঝে এটা ঠিক ধরা পড়ে না। প্রথম দিককার কবিতাগুলো বেশি ঘনভাবে বিন্যস্ত, সেসময় আমি এখনকার তুলনায় কবিতার ঐতিহ্যবাহী নিক্তিগুলি বেশি ব্যবহার করতাম। আমার মনে হয় প্রথম দিককার এই কবিতাগুলো অনুবাদ করা বেশ কঠিন। ইংরেজি ভাষায় যে অনুবাদটা করা হয়েছে সেটা আসলে কবিতার একটা সিম্পল ভার্সন। কিন্তু আমার পরের দিকের কবিতাগুলো অনুবাদ করা বেশ সহজ, নিদেনপক্ষে ভাষার দিক থেকে। একটা ভিন্নতা… যদিও আমি ভাষার কাঠামো, ধরনধারন নিয়ে কথা বলতে ভীষণ অপছন্দ করি, তারপরেও আলাপ করা যাক (হাস্য সমেত)। আমার কাছে মনে হয়, আমার পরের দিকের কবিতাগুলোর বিষয় বেশি জটিল, কেননা সেগুলোতে অভিজ্ঞতার ছাপ অনেক বেশি। আমার বয়স এখন সাতান্ন। সাতান্ন বছর বয়সের একজন মানুষ আর বাইশ বছরের একজন যুবকের মধ্যে ভিন্নতা বিস্তর। শেষের দিকের কবিতাগুলোতে আমার সমস্ত জীবন, সমাজ, নানান বাস্তবতা এসে বাসা বেঁধেছে। প্রথম বই যখন বের হয় তখন বয়স কম। সেসময় শৈশব, প্রকৃতির সাথে সম্পর্কটা নিবিড় ছিল। বহির্জগতের উপস্থিতি সেখানে আসলে নেই বললেই চলে। কিন্তু এখন এই বছরগুলো ধরে বাইরের জগতের মধ্য দিয়েই আমার জীবন পার করতে হয়েছে। শৈশব আর প্রকৃতির সম্পর্কই এখন আর একমাত্র নয়।

হোরভ্যাথ: আপনার কাজের একটা দিক আমাকে ভীষণ টানে। আপনার বৈশ্বিক সচেতনতা। কিন্তু আপনার বোধের মধ্যে আমি পৃথিবী সম্পর্কে এক ধরনের যন্ত্রণা টের পাই। ‘‘অক্টোবরের স্কেচ’’-এ মাশরুম ‘আঙুলের মতো সাহায্যের চীৎকার করে করে খাড়া হচ্ছে, সেই মানুষের জন্য যে মাশরুমের নিচের গভীর অন্ধকারে বহুদিন যাবৎ ডুকরে কাঁদছে’’। আপনার এই কবিতায় মাশরুমের চিত্রকল্পে আমি কেমন আটকে গিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছির আপনি শান্তির কথা বলছেন, আপনি শান্তির প্রয়োজনের কথা বলছেন। তবু আপনার কবিতা আসলে রাজনৈতিক নয় বরং মানবিক। আপনি কি এ নিয়ে কিছু বলবেন?

ট্রান্সট্রোমার: আপনি দারুণ বলছিলেন…আমি আসলে আপনাকে বাগড়া দিতে চাচ্ছি না… (হাসি)। হ্যাঁ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমি বেড়ে উঠেছি আর আমার জন্য সে সময়টা মনে রাখবার মতোই। আমার সে সব অভিজ্ঞতা ভীষণ প্রখর থেকে গেছে। সুইডেন সেসময় নিরপেক্ষ ছিল, জার্মানরা চারপাশে–নরওয়ে, ডেনমার্ক সবই তখন অধীনস্ত। স্বাধীন থাকলেও সুইডেন ছিলো বিচ্ছিন্ন। সুইডেনের মানুষজনের মধ্যে আমি যুদ্ধ নিয়ে বিভাজন দেখতে পেয়েছি। কেউ কেই মিত্র শক্তির পক্ষে, কেউ কেউ জার্মানির। এই বিভাজনের উত্তেজনা আমি শিশু বয়সেও টের পেতাম। আমার বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়েছিলো, আর মা আমাকে নিয়ে থাকতেন। আমার আশপাশে খুব ঘনিষ্ঠ কিছু আত্মীয়স্বজন ছিলেন। তাঁরা বেশিরভাগই হিটলার বিরোধী ছিলেন আর আমি মিত্র শক্তির সবচাইতে শক্তিশালী জঙ্গি সমর্থক ছিলাম। আসলে সেই শিশু বয়সে আমি একজন ক্ষুদ্র অধ্যাপকই ছিলাম বটে, শিশুসুলভ নয় ততোটা। আমি সারাক্ষণ মানুষজনকে শেখাতাম। আমি খবরের কাগজ খুব ভালভাবে পড়তাম, যুদ্ধের খবর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানবার চেষ্টা করতাম।

আমার অভিযাত্রী হওয়ার স্বপ্ন ছিল। লিভিংস্টোন, স্টানলির মতো মানুষেরা আমার নায়ক। আমি প্রায় সবসময় আফ্রিকা সহ বিশ্বের অনেক জায়গায় কল্পনায় ঘুরে বেড়াতাম। কিন্তু বাস্তবে আমি থাকতাম স্টকহেমে আর গ্রীষ্মে আর্কিপেলাগো (Archipelago) দ্বীপে ছুটি কাটাতে যেতাম। ঐটাই ছিল আমার স্বর্গ। আমি যুদ্ধের পর বিশ্ব ঘুরে দেখতে চেয়েছিলাম। আমার মা তাঁর সারাজীবনে কখনই বিদেশে যান নাই কিন্তু আমি যেতে চাইছিলাম। ১৯৫১ সনে আমি আমার স্কুলের এক বন্ধুর সাথে প্রথম আইসল্যান্ডে বেড়াতে যাই। আমার মধ্যে সেই বেড়ানো নিয়ে খুব প্রখর অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। আমরা যখন ফিরে আসি, আমি আসলে ঠিক দরিদ্র না হয়ে গেলেও এক্কেবারে কপর্দকশূন্য হয়ে পড়ি। ১৯৫৪ সনে আমার প্রথম বই প্রকাশ পায়, আমি একটা পুরস্কার পাই। আর সে পুরস্কারের টাকায় আমি প্রাচ্য বেড়াতে যাই। মানে তুরস্ক, নিকট প্রাচ্য–ঐ সময় কিন্তু এই সব দেশ কোনভাবেই পর্যটন অঞ্চল ছিল না, বিশেষতঃ তুরস্ক। আমার কাছে মনে হচ্ছিল আমি সত্যিকারেরই অভিযানে নেমেছি। এখন যেমন মানুষজন পিঠে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে রওয়ানা হয় আমিও সেসময় আমার পেছনে ব্যাগ ঝুলিয়ে রওয়ানা হয়েছিলাম। আজকের মতো তখন এরকম করে বিদেশ যাওয়া খুব সাধারণ ছিল না।

প্রাচ্য বিশ্বের সাথে এই পরিচয় আমার মধ্যে একটা তোলপাড় তৈরি করে। আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের কিছু কবিতা তখনকার লেখা। ‘সিয়েস্তা’ (Siesta) এবং, ‘তৃতীয় প্রহরের ইজমির (Izmir at three O’clock’ তেমনই দুটো কবিতা। ১৯৫৪ সনে আমি তুর্কী আর গ্রীসে ছিলাম, ১৯৫৫-তে ইতালি আর যুগোশ্লাভিয়া, ১৯৫৬-তে মরক্কো, স্পেন আর পর্তুগাল। আর সে সময় থেকেই আমার বেড়ানোর শুরু। কিন্তু এখন আমি কোথাও দাওয়াত পেলেই কেবল যাই, যদি কিছু করবার থাকে তাহলে যাই, এমনি বেড়ানো হয় না। রাজনীতিতে আমার আগ্রহ আছে, কিন্তু সেটা যতোটা না মতাদর্শিক তার চাইতে ঢের বেশি মানবিক পন্থায়, মানবিক অনুভূতির কারণে আমি রাজনীতিতে আগ্রহী।

নেভিল: আমার কিন্তু আপনার কবিতা পড়ে কখনই মনে হয়নি আপনি ভবঘুরে। আমার বরং মনে হয় আপনার শেকড় সুইডেনে, সুইডেনের আবহাওয়ার মধ্যে আপনি প্রোথিত। আপনি কি একমত?

ট্রান্সট্রোমার: আপনি যে বললেন আবহাওয়া…আমার নিজেরও মনে হয় আমার শেকড় রয়ে গেছে সেই বিশাল দৃশ্যপটে, বড় বড় মাঠে, আমার অভিজ্ঞতায় আমার দর্শনে সুইডেনের দৃশ্যপট। সুইডেনের যে কোন মানুষ–বিশেষ করে যারা কবিতা চর্চা করেন, তাঁদের সকলের জন্য সুইডেনের আবহাওয়ার গুরুত্ব অসীম। অদ্ভুত সুন্দর আলো! আমরা নর্থ থেকে বেশ দুরে কিন্তু গালফ প্রবাহের জন্য আমাদের আবহাওয়াটা মৃদুমন্দ বলা যায়। কিন্তু সুমেরুর আলো। আর এই আলো কেবল সুইডেনেই দেখা যায়। আমাদের গ্রীষ্মের আলো এক্কেবারে ঝলমলে আবার আমাদের শীত ভীষণ অন্ধকার।

নেভিল: হ্যাঁ দীর্ঘ আর অন্ধকার। আপনার কিছু অদ্ভুত সুন্দর গ্রীষ্মের কবিতা আছে। গ্রীষ্মের স্বস্তি নিয়ে আপনার কাব্যের ভাবনাগুলো এতো প্রখর! আপনি আগে উল্লেখ করেছিলেন, কম বয়সে সুইডেনের প্রকৃতি, জল-জঙ্গলের সাথে আপনার সম্পর্ক ভীষণ শক্তিশালী ছিল। আপনার কবিতার একটা জিনিসে আমি বেশ ধাক্কা খেয়েছিলাম। কবিতাগুলো যতোই অন্তরাত্মা নিয়ে লেখা হোক, আত্মকে নিয়ে লেখা হোক, তার মধ্যে ঠিকই বাহ্যিকতার অপরূপ বর্ণণা পাওয়া যায়। কবিতা জীবনের অন্দরমহল নিয়ে লিখিত হলেও সেগুলি আসলে খুব কমই অভ্যন্তরের বর্ণনায় সাজানো থাকে। বরং আপনার কবিতায় বাইরের প্রকৃতির সবিশেষ বর্ণনা আমি দেখতে পাই। ‘‘Vermeer’’ তেমন একটি কবিতা যেখানে আপনি আসলে নিজের অন্দরমহলে, কিন্ত বাহ্যত পাই সরাইখানা এবং স্টুডিওর বিবরণ। কিন্তু আপনার এলিজির বিষয়ে ভাবি আমি, যেখানে আপনি হয়তো কোন একটা কক্ষে হাঁটছেন, আপনার দৃষ্টি হঠাৎ-ই কক্ষের বাইরে চলে যায়, জানালায় কিংবা বারান্দায়—এই ব্যাপারটা অসাধারণ! আপনি কি এই বিষয়ে কিছু বলবেন? যেটা আমার কাছে খুব চমকপ্রদ মনে হয়েছিল যে আপনার অন্দরের প্রতি আগ্রহ রয়েছে কিন্তু আপনার ভাবনার, দেখবার রাস্তাটা সব সময়ই বাইরের।

ট্রান্সট্রোমার: হুম…সম্ভবত এটাই আসলে আমার অনুপ্রেরণার জায়গা–একই সময়ে দুটো জায়গায় থাকতে পারা…কিংবা এমন একটা বোধ হতে থাকা যে আপনি যেখানে আছেন সেটা যতোই রুদ্ধ দেখাক, আসলে কিন্তু পুরোটাই খোলা। হ্যাঁ এটাকে অস্পষ্ট, দ্ব্যর্থক মনে হতেই পারে। কিন্তু এটাই আসলে আমার সমস্ত অনুপ্রেরণার জায়গা যেখান থেকে কাব্য আমার মধ্যে ধরা দেয়।

নেভিল: আমি আসলে কৌতূহলী—আপনার পেছন জীবনে এমন কী ছিলো যেই জোরে আপনি বিচ্ছিন্নতা, সলিপসিজম আর সার্বিক নির্লিপ্তির নঙর্থকতাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে থাকতে পারেন?

ট্রান্সট্রোমার: (একটা দীর্ঘ নিরবতার পর) আমার খুব ভাল একজন মা ছিলেন (হাসি)।

নেভিল: আমি আশা করছিলাম আপনি এটাই বলবেন।

ট্রান্সট্রোমার: হ্যাঁ, আমি আর মা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। আমার নানা-নানী মানুষ হিসেবে খুব চমৎকার ছিলেন–একজন নাবিক আর তাঁর স্ত্রী। এই বৃদ্ধ মানুষগুলোই আমার অতি আপন ছিলো। হ্যাঁ এটা ঠিক আশাপাশের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের কাছ থেকে এক ধরনের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছি। একই সাথে আমি ছিলাম খুব একাকী। পরিবারে আমি ছিলাম একমাত্র শিশু এবং সবাই আমাকে সব বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠতে উৎসাহিত করতেন। আমি প্রায়ই ভাবি, বিশেষ বিশেষ বিষয়ে বাচ্চাদের আগ্রহকে নিরুৎসাহিত করা হয়, কেননা বাবা-মা স্বাভাবিক বাচ্চা চান, যে বাচ্চা হবে অন্য বাচ্চাদের মতো, খেলবে ইত্যাদি। আমি নিজেকে বড়ো ভাবতাম, কিন্তু বহুক্ষেত্রে বড়োরা আমাকে আহত করতো। তারা আমাকে বাচ্চা মনে করতো। আর তাতে লাঞ্ছনার বোধ হতো আমার। কিন্তু আমার নিকট মানুষেরা, যারা সবচে গুরুত্বপূর্ণ, তারা আমার ব্যক্তিত্বের মর্যাদা দিতো সব সময়ই। স্কুলের পরিস্থিতি ছিলো অবশ্যই ভিন্ন। আমি কিছু শিক্ষককে ভালবাসতাম, কোন কোন শিক্ষককে আমি মোটেও দেখতে পারতাম না। সাধারণভাবে বলা যায়, আমার শৈশব খুব সহজ ছিল না। কিন্তু খুব খারাপ ছিল–এটাও বলা যায় না। আমার বয়স যখন ১১/১২ বছর তখন আমার পোকামাকড় সংগ্রহের একটা আজব ইচ্ছা জাগলো। জীববিজ্ঞানের প্রতি আমার আগ্রহ সব সময়ের। আমি পোকামাকড়ের মধ্যে সবচাইতে বেশি সংগ্রহ করতাম গুবরে পোকা। আমার অনেকগুলো গুবরে পোকা সংগ্রহে ছিল। আমার হাতে একটা প্রজাপতি ধরবার জাল থাকতো আর আমি সারাটা সময় কেবল পোকামাকড় ধরবার জন্য নানান জায়গায় ঘুরে বেড়াতাম।

নেভিল: আপনার কবিতায় অনেক প্রজাপতি আছে। কিন্তু আমার মনে হয় না তাতে অনেক বেশি গুবরে পোকা বা অন্য পোকামাকড়ের কথা আপনি বলেছেন।

হোরভ্যাথ:The Golden Wasp’?

ট্রান্সট্রোমার: আমার মনে হয় একটা গুবরে পোকা আছে–অবশ্যই আছে।

‘রৌদ্রে বসে আছে এক গুবরে পোকা,

বিদ্যুতের খাম্বার গায়ে।

তার ডানার উজ্জ্বল প্রচ্ছদ, আশ্চর্য দক্ষতায় গুটানো—

নিপুণ হাতে ভাজ করা প্যারাস্যুট যেন।’

–দ্য ক্লিয়ারিং

আছে তো, এখানে একটা গুবরে পোকা আছে!

হুম আসলে আপনি যদি পোকামাকড় সংগ্রহ করবার জন্য ঘুরে বেড়াতে থাকেন, দৌড়ুতে থাকেন আর প্রকৃতির সবকিছু খুব কাছ থেকে দেখতে থাকেন–সেটা আপনাকে আনন্দ দিবে। এটা সুইডিশ ঐতিহ্যও বটে। প্রকৃতি কেবল যে ভাবের জায়গা–তা নয়, প্রকৃতিতে আপনি গবেষণাও করতে পারেন। শামুকের খোল, পোকামাকড়, পাখি এসব কিছুর হাত ধরেই প্রকৃতির হাজার সৌন্দর্য শিশুবয়সে আমার সামনে উপস্থিত হয়েছে। আমি আসলে তখন সৌন্দর্য বলে উপলব্ধি করি নাই, আমার মনে হতো আমি একজন বিজ্ঞানী (হাসি)। কিন্তু যেটাই হোক সে সৌন্দর্যবোধ যে কোন ভাবেই আমার ভেতর ঢুকে গেলো।

হোরভ্যাথ: আপনার কী আর কোন বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ আছে?

ট্রান্সট্রোমার: হ্যাঁ, আমার ইতিহাসের প্রতি বিশেষ আগ্রহ আছে। আমি আগেও ইতিহাসের প্রচুর বই পড়তাম এখনও পড়ি। বয়স যখন ১৩/১৪ বছর হবে, সঙ্গীতের প্রতি ভীষণ ঝোঁক হয়েছিল আমার। আমার সঙ্গীতের প্রতি মোহান্ধতা আছে, এখনও আমি ভীষণ সঙ্গীত অনুরাগী।

নেভিল: আপনি বাজান?

ট্রান্সট্রোমার: হ্যাঁ, পিয়ানো থাকলে বাজিয়ে শোনানো যেতো আপনাদের…

হোরভ্যাথ: আমার কাছে আপনার কাব্যের ইমেজগুলোকে ভীষণ বিস্ময়কর মনে হয়। আপনার কবিতার ইমেজগুলোয় কিভাবে পৌঁছান?

ট্রান্সট্রোমার: ইমেজগুলো আপনা থেকেই আসে। কিন্তু যখন কোন কাব্যে আমি কোন কিছু বোঝাতে চাই, আমি পাঠকের জন্য সেটা পরিষ্কার করবার আপ্রাণ চেষ্টা করি। যেমন আপনি যখন স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্নের মধ্যকার জিনিস আপনার কাছে আপনার চেনা জানা পরিচিত জিনিসের মধ্যে দিয়েই চেহারা পায়।

হোরভ্যাথ: আপনার কী স্বপ্নের স্পর্শে থাকবার ইচ্ছা হয়, আপনি স্বপ্নের সাথে থাকবার চেষ্টা করেন?

ট্রান্সট্রোমার: কখনও কখনও তো অবশ্যই। আমি অনেক স্বপ্ন দেখি, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি খুব দ্রুতই স্বপ্নের কথা ভুলে যাই।

হোরভ্যাথ: তার মানে কী আপনি রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে লিখতে বসেন না?

ট্রান্সট্রোমার: না, আমার ঘুম থেকে জেগে উঠে কবিতা লিখতে বসবার অভ্যাস নেই- আমি ঘুমাতেই চাই (হাসি)। কিন্তু আমার স্বপ্নগুলো এতো প্রখর হয় যে আমি তাদের দীর্ঘায়িত করতে পারি। স্বপ্নগুলো কবিতা হয়ে যায়।

হোরভ্যাথ: মানে যখন আপনার একগুচ্ছ অনুভূতি ঘিরে কোন ইমেজ তৈরি হয়, তখন আপনাকে সেসব ইমেজ অন্যদের কাছে পরিষ্কার করতে সেগুলির প্রকাশ নিয়ে কাজ করতে হয়, ভাবতে হয়…?

ট্রান্সট্রোমার: কখনো কখনো তো অবশ্যই। কখনও আবার কোন এটা বিশেষ অনুভূতিকে ঘিরে একটা ইমেজই তৈরি হয় যেটা কিছু শব্দ দিয়ে ঠিকঠাক প্রকাশ করা যায়। কিন্তু এমন সময়ও আসে এমন কিছু ইমেজ তৈরি হয় যা আসলে শব্দহীন। তখন সে বোধটাকে, ইমেজটাকে আমার শব্দে প্রকাশের জন্য খাটাখাটুনি করতে হয়।

হোরভ্যাথ: তারমানে আপনার কাব্য রচনার বিষয়টা আসলে এমন না যে ‘‘বসছি আর কবিতা লিখছি’’। বরং সেটা অনেক বেশি আপনার নিজস্ব অবচেতনের ভেতর থেকে আসে, মনের ভেতর থেকে আসে।

ট্রান্সট্রোমার: হ্যাঁ, সবকিছুই আসলে আমার ভেতরকার, আমার অবচেতনের, আমার বোধের। আমার ভেতরের তোলপাড় আমাকে কী দেয় সেসব নিয়ে নিজেকে সামলানোর ক্ষমতা আমার আছে, কিন্তু আমার ভেতরবার গভীরতর অংশের তোলপাড় নিয়ে লেখবার জন্য নিজেকে কখনই আমি কোন হুকুম দেই নাই। আমি লিখতে চেয়েছি মাত্র। আমি যখন জেলখানায় কিশোর অপরাধীদের মনস্তত্ববিদ হিসেবে কাজ করতাম আমার ইচ্ছে হতো সেসব অভিজ্ঞতার কথা লিখি। আমি চাইতাম লিখতে। আমি খুব লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট কবিতা লিখেছিলাম কিন্তু এতে আমার কোন রকম আনন্দ লাগে নাই, লক্ষ্য স্থির করে লিখিত কবিতা আমার মনকে প্রশান্ত করতে পারে নাই। যেটা হলো আমাকে শেষ অবধি কিছু কবিতার পংক্তি মেনে নিতে হলো, জেলখানার কিশোরদের নিয়ে আমার কৃত্রিম কবিতা। এই কবিতার নাম ‘‘On The Outskirts of Work’’।

কাজের মাঝখানে

বিস্তর সবুজের বন্য বাসনা শুরু হলো আমাদের,

খোদ বন্যতার প্রতি–

কেবল যতটুকু আসতে পারে

টেলিফোন তারের ক্ষীণ সভ্যতায়।

–On The Outskirts of Work

 

জেলখানা নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী, সিরিয়াস আর দীর্ঘ একটা কবিতায় বলবার মতো এমন কয়েকটা লাইন মাত্র থাকলো। তাই আমি আসলেই কখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারি না–কী লিখবো। আমার লেখাটা আমার ভেতর থেকে আসতে হবে।

হোরভ্যাথ: আপনার কি নিজস্ব পরিবেশ, দশা বা মনের বিশেষ কোন অবস্থা যখন আপনার মাঝে কবিতা আসে?

ট্রান্সট্রোমার: আমার জন্য কাব্য কখনো খুব সহজ ছিল না। তবে তখনই কবিতা আমার ভেতর থেকে আসে যখন মনে আমোদ থাকে আবার একই সময়ে মনটা কিছুটা গম্ভীরও থাকে। মানে আপনার মনের আমোদ আর আকাঙ্ক্ষার মাঝে নির্দিষ্ট এক ধরনের ভারসাম্য বা ব্যালান্স থাকতে হবে। এই ব্যালান্সটা ঠিকঠাক পাওয়া কঠিন। আর শুধু কবিতার জন্য আলাদা করে সময় দিতে পারা খুবই কাজের। আমি সেটা কখনও দিতে পারি নাই। যেমন ধরেন এই বারের মতো কোন একটা ভ্রমণ…হ্যাঁ সে তো অবশ্যই, আমার যদি এক জায়গায় বসে কবিতা লিখবার মতো গুণ থাকতো আমি নিশ্চিন্তে হোটেল কক্ষে বসে বলতাম আমি আজ কক্ষেই থাকবো, কোথাও যাবো না। কিন্তু আমি এমন করতে পারি না। মানুষজন আমাকে ডাকে, পার্টিতে আমন্ত্রণ করে। আমি মানুষের সাথে দেখা করি। আর বিমানে চড়লে কখনো আমার ভয় লাগতে থাকে, কখনো আমি বিরক্ত হই। আমার তখন লিখবার মতো কোন মুড থাকে না। ট্রেন ভাল, দীর্ঘ ট্রেন যাত্রা…

নেভিল: আর গাড়ি ভ্রমণ। গাড়ি নিয়ে দারুণ কিছু কবিতা আছে আপনার। যেমন ‘‘Downpour in the Interior’’ এবং ‘‘Tracks’’ এই কবিতাগুলো…

ট্রান্সট্রোমার: আমার আসলে মোটর গাড়ি নিয়ে একটা দুই-টান অবস্থা আছে। এক দিকে আমি অবশ্যই মোটর গাড়ির বিরোধিতা করি, কারণ এটার কারণে নানা কিছু নষ্ট হয়েছে; আবার একই সময়ে আমাকে অবশ্যই বলতে হবে নিজের একটা মোটর গাড়ি থাকা খুব ভাল, সেটা আপনাকে প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যাবে।

নেভিল: আমি আপনাকে গদ্যরীতির পদ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে চাইছিলাম। আমার নিজের গদ্য কবিতার উপর বিশেষ আগ্রহ আছে। আমি নিজে লিখিও। কিন্তু মানুষজন মনে করে গদ্য কবিতা কেমন থলথলে, ঢিলেঢালা। আসলে আমি তাঁদের বক্তব্য তেমন কোন ধর্তব্যের মধ্যে আনিও না। আমি এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য জানতে চাইছিলাম। এই গদ্য আপনাকে ঠিক কী দেয় যেটা আপনি কবিতা লিখতে গিয়ে পান না?

ট্রান্সট্রোমার: আসলে এটা ইউরোপের বেশ পুরনো একটা ধারা। বিশেষভাবে ফরাসী ধারা বলা যেতে পারে। আমি যখন গদ্য কবিতা লিখতে শুরু করি সে সময়, ১৯৪০-এ উনবিংশ শতকের ফরাসী কবি নামে একটা সংকলিত বই বের হয়েছিল। আর সেই সংকলনের কবিতাগুলো আমার জন্য স্বাভাবিকভাবেই নতুন ছিল না। আমার এক স্কুল বন্ধু ছিলেন। তাঁর যখন বয়স তিরিশ তখন তাঁর গদ্য রীতির কবিতা নিয়ে কাব্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। আমার বন্ধুর গদ্য কবিতাগুলোর সাথে আপনি কমবেশি ম্যাক্স জ্যাকবের গদ্য কাব্যের মিল খুঁজে পাবেন। ফলে গদ্য কাব্যরীতি যখন থেকে শুরু হয়েছে আমি কম বেশি তখন থেকেই এর সাথে পরিচিত। কিন্তু আমার নিজের রচিত গদ্য কাব্যের বই আরো পরে বাজারে এসেছে। আমার মা মারা গেলেন, তখন তাঁর এ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে তাঁর বইয়ের আলমারির সামনে দাঁড়ানো—এটা নিয়ে আমি ‘‘বুককেস’’ কবিতাটি লিখি।

নেভিল: কাব্য এবং গদ্য এই দুইয়ের অনুভূতি প্রকাশের মধ্যে কী ধরনের ভিন্নতা আছে?

ট্রান্সট্রোমার: আমি প্রথম থেকেই আসলে বুঝতে পারি এটা কি গদ্য নাকি পদ্য। দুই সপ্তাহ আগে প্রকাশিত আমার শেষ বইতে ১৭ টা কবিতা আছে, এর মধ্যে ২টা গদ্য। নির্বাচিত কবিতায় একটা গদ্য কবিতা আছে। নাম ‘‘The Nightingale in Badelunda’’গতকাল আমি আরেকটি গদ্য কবিতা পাঠ করেছি ‘‘Madrigal’’। এই দুটো আকারে খুব ছোট। কিন্তু গদ্য কাব্যের মজা হলো এটা আপনাকে এক ধরনের প্রবাহের মধ্যে নিয়ে যাবে, সাবলীলতা দেয়।

আমার সাথে ব্লাইয়ের এখানে আরেকটা মিলের জায়গা আছে। আমি যেসময় গদ্য কবিতা লিখতে শুরু করি, তিনিও সে সময়েই তার গদ্য কাব্যের বই প্রকাশ করেন। আমাদের দুজনেরই Francis Ponge-কে নিয়ে আগ্রহ ছিল। তাঁর গদ্য কবিতায় একটা গভীরতা দেখা যায়, প্রকৃতি কিংবা আশপাশের বিষয়কে খুব কাছ থেকে দেখবার আকাঙ্ক্ষা আছে। Ponge-এর মতো না হলেও এই কাব্যগুলো ভীষণ অনুপ্রেরণাদায়ী। আপনি কিংবা আমি দুজনেই মনে হয় একই রকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাই–একটা মুক্তি, কোন বিষয়ের সূক্ষ্মতার মধ্যে প্রবেশ, অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের বিস্তর আলোচনা।

হোরভ্যাথ: তারমানে আপনি গদ্য কবিতা নিয়ে আর পুনর্লিখনে যান না?

ট্রান্সট্রোমার: করেছি কখনও কখনও। যেমন আমি একটা গদ্য কবিতা নিয়ে অনেক বছর কাজ করেছি। কবিতার নাম ‘‘Below Freezing’’:

 

আমাদের চায় না এমন একটা পার্টিতে আছি আমরা। অবশেষে মুখোশ খুলে ফেললো পার্টি, নিজেকে দেখালো: মালবাহী গাড়ী খালাসের একটা স্টেশন। কুয়াশার মাঝে ট্রাকে দাঁড়িয়ে আছে শীতল দৈত্য। গাড়ির দরজায় চকের এলোমেলো দাগ। মুখ ফুটে বলে না কেউ, কিন্তু অজস্র চাপা সন্ত্রাস আছে এখানে…

–Below Freezing

এই কবিতায় অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে সুইডেনের একটা নৈরাশ্যবাদী বর্ণনা রয়েছে।

নেভিল: এই কবিতার শেষটা কি এমন যে শিশুরা স্কুলবাসের অপেক্ষায় গাদাগাদি করে আছে? ঐ কবিতা আমার অনেক ভাল লাগে।

ট্রান্সট্রোমার: চাইনিজ কবি বেই ডাও (Bei Dao) এই কবিতা সবচাইতে বেশি পছন্দ করেছেন।

নেভিল: হ্যাঁ। চায়নার ল্যান্ডস্কেপ এই কবিতার সাতে বেশ যায়–মেটে রংয়ের, উপযোগবাদী এবং মিনিমালিস্ট। ‘‘Standing Up’’ এটাও আমার নিজের পছন্দের একটি কবিতা, অনেক সুখী সুখী, হালকা মেজাজের গদ্য কবিতা।

ট্রান্সট্রোমার: এই কবিতাটা বেশ আগের। আর এটা প্রামাণিক তথ্যভিত্তিক বলা যায়। আমাদের বাচ্চারা যখন ছোট ছিল আমাদের বাসায় গ্রীষ্মে মুরগী থাকতো…আমার মাঝে মধ্যে মনে হয় আমার আবার সে জীবনে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন।

নেভিল: এ রকম কি বাল্টিকে আপনার পুরনো বাড়িতেও হতো?

ট্রান্সট্রোমার: হ্যাঁ। এই শতকের প্রথম দিকে একধরনের টুপিও পাওয়া যেতো। (কবিতা আউড়ে)

 

মুরগীটা হাতে নিয়ে

আমি থমকে গেলাম।

অদ্ভুত, মনে হলো না—সে জীবিত:

ঠাণ্ডা, শুকনো,

সাদা পালকে বোনা

পুরনো একটা লেডিস হ্যাট যেনো—

চিক্কুরে বলে যাচ্ছে ১৯১২’র তাবৎ সত্য।

 

আমাদের বাড়িতে এমনই একটা টুপি সত্যিই ছিল (হাসি)।

 

নেভিল: আপনার সন্তানদেরও কি আপনার মতো ‘‘the blue house’’ নিয়ে একই রকমের অনুভূতি আছে? নাকি ভিন্ন আরেকটি প্রজন্ম হওয়ায় তাঁদের অনুভূতি ভিন্ন?

ট্রান্সট্রোমার: এটা আস্তে আস্তে একই রকম হয়ে যাবে। যতো তাঁদের বয়স বাড়বে ততো এর মূল্য তারা বুঝবে। আমার বড়ো সন্তানের বয়স ২৮, আর ছোটটার ২৪ বছর। আর তাঁদেরও সে দ্বীপ খুব পছন্দের। একারণে তারা অন্তত দ্বীপটা বিক্রি করবে না–এটা ভেবে আমার আরাম বোধ হয়।

হোরভ্যাথ: আপনার কবিতায় ধর্মের যে প্রভাব দেখা যায় সেটা নিয়ে আমাদের আলাপ হয়নি। আমি আপনার কাব্যের মাঝে এক রকমের আধ্যাত্মিকতার স্পর্শ পাই। কিন্তু তার সাথে আবার কোন বিশেষ ধর্মমতের বা ধর্মতত্ত্বের আমি যোগাযোগ খুঁজে পাই না। আমার জানতে ইচ্ছে করছে যে শৈশবে আপনি কোন বিশেষ ধর্মের দীক্ষা বা প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন কিনা?

ট্রান্সট্রোমার: আবারও আমার মায়ের কথাই বলতে হয়। তিনি খুবই… যদি আমি তাঁকে ধার্মিক বলি, তবে তাঁর সাথে অবিচার হবে আসলে। আমার মা কোনভাবেই পুরনো প্রাচীন পন্থায় বিশ্বাসী গোঁড়া ধার্মিক ছিলেন না। কিন্তু তাঁর সাথে আবার স্রষ্টার ভীষণ রকম শিশুসুলভ-সহজাত একটা সুসম্পর্ক আমি দেখতে পেতাম। তিনি আসলে খুব ইতিবাচকভাবে ধার্মিক ছিলেন। অল্প বয়সে আমি বেশ সংশয়বাদী ছিলাম। ১৯ শতকী কায়দায় আমি আসলে পুরোদস্ত্তর প্রকৃতিবিজ্ঞানে বিশ্বাসী ছিলাম, যেটি সব কিছুকেই যান্ত্রিক হিসেবে দেখে। আমি চার্চে নিবন্ধিত হলাম না, আমার সেই ১৫ বছর বয়সে। আমার প্রজন্মের প্রায় সবাই চার্চের সদস্য হয়েছিলো। কিন্তু আমি প্রত্যাখ্যান করলাম। মা আমার এই অস্বস্তি আর টানাপোড়েন গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক বছর পর আমি ধর্মের সাথে নানাভাবে জড়িয়ে যাই। চার্চে নিয়ম মাফিক নিবন্ধনের সময় আমি ছিলাম একজন অ-বিশ্বাসী। কয়েক বছর পর আমি হয়ে গেলাম বিশ্বাসী।

কিন্তু এই বিশ্বাসের বিষয়টা একেবারে আমার জীবনের মধ্যে নিজের মতো করে বিকশিত হয়েছে। আমার চার্চের সাথে তেমন কোন যোগাযোগ কিংবা লেনদেন ছিল না। আমার চার্চের দালানটাকে ভাল লাগতো। চার্চে ঢুকলে আপনারও এমন একটা ভাল লাগার অনুভূতি হতে পারে। প্রায়ই আমি চার্চে যেতাম। কিন্তু সত্য বলতে সামাজিকভাবে আমি কখনই চার্চের সদস্য ছিলাম না। যদি আমাকে কোন দলের কথা, বিশেষত ধর্মীয় কোন গোষ্ঠীর প্রতি দুর্বলতার কথা বলতে হয় তবে আমি Quaker-এর কথা বলবো। কিন্তু সুইডেনে এরা অনেক যাচাই বাছাই করে থাকে। ঐ দলভূক্ত হতে হলে আপনাকে প্রায় সাধু সন্ন্যাসী হয়ে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। ধর্ম নিয়ে আমি আমার এই দোটানা অবস্থান থেকে বের হবার চেষ্টা করে যাচ্ছি। মানে, মৃত্যুর আগে এই প্রসঙ্গে আমি একটা সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাই।

নেভিল: আপনার ‘‘The Golden Wasp’’ কবিতায় আপনি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিরুদ্ধে খুব কড়া কথা বলেছেন। আপনি তখন কি করছিলেন? নিজেই কী অনেক পড়ছিলেন? বাইবেল?

 

ট্রান্সট্রোমার: আসলে আমি একদল মানুষের সাথে কাজ করছিলাম। যারা বাইবেলের নতুন অনুবাদ করতে চাইছিলো। আমার কাজের জায়গা ছিলো শব্দ… আওয়াজ। যদি ধর্ম আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না হতো তাহলে আমি এই মৌলবাদী মানুষদের সাথে কাজে আসলে আগ্রহী হতাম না। কারণ আমার মনে হয় আমার ভালবাসার জিনিসের বিকৃতি সেটা। আমি জিম জোনস্ নিয়ে একটা টিভি সিনেমা দেখেছিলাম। আমার মাথায় ঘুরছিলো সেটা যখন আমি লিখেছিলাম—

একজন মানুষ,

সামনে স্বর্গীয় লণ্ঠন

আলো জ্বেলে ধরে–

কিন্তু পরক্ষণেই নিভে যায়।

কেন?

— The Golden Wasp”, Ironwood, Vol. 16

সান ফ্রান্সসিসকোর সেই ধর্মীয় দলটা একটা ইতিবাচক ধর্মীয় অবস্থান থেকে নিজেদের যাত্রা শুরু করেছে বলে আমার প্রথমে মনে হয়েছিল। তারপর এই দলটাই ধীরে ধীরে কিছু সময় পর নেতা সর্বস্ব একটা মৌলবাদী অবস্থানে চলে যায়। আমি ১৯৮৬ সনে আমেরিকায় যখন আসি তখন ওরাল রবার্টসের কথা শুনেছিলাম। আমাদের সুইডেনেও এখন এরকম কিছু ধর্মপ্রচারক খুঁজে পাওয়া যায়।

হোরভ্যাথ: এদের নিয়ে শংকিত হওয়ার মনে হয় কিছু আছে… এদের মানুষকে প্রভাবিত করবার ক্ষমতায়।

ট্রান্সট্রোমার: একই সাথে আমাদের ভাবতে হবে এই ধর্মীয় দলগুলোকে কেন্দ্র করে কি পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে…সেটাও চিন্তার বিষয়।

হোরভ্যাথ: আপনার জন্য কী মনোবিজ্ঞান পুরোদস্ত্তর ধর্মের প্রতিস্থাপক হয়ে উঠেছে?

ট্রান্সট্রোমার: না, আমার অবশ্য নিজের এমন মনে হয় না। এটা আসলে একটা জটিল প্রশ্ন। মনস্তত্ত্ববিদ্যা একভাবে মাঝে মধ্যে ধর্মের খুব কাছাকাছিই বসবাস করে। কিন্তু বিষয় হলো, মনোবিজ্ঞান ধর্মের কাছাকাছি আছে কি নেই সেটা নির্ভর করে মনস্তত্ববিদের উপর, যে, তিনি আসলে কীভাবে ঘটনাকে দেখতে চান। নিঃসন্দেহে বিংশ শতকের মনোবিজ্ঞানীরা ধর্মের প্রতি সন্দিহান ছিলেন এবং তারা ধর্মকে একভাবে ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কেউ কেউ, যেমন ইয়োনিয়ান (Jungian)মনোবিজ্ঞানের ধর্ম বিষয়ে অনেক বেশি খোলা।

হ্যারভাথ: আপনি কী এই ধারার অনুসারী?

ট্রান্সট্রোমার: না, আমি কোন ধারারই অনুসারী নই। আমি বরং ভীষণ উদারমতাবলম্বী, সমসাময়িক মানুষ হিসেবে থাকতে ভালবাসি। কিন্তু বিভিন্ন চিন্তাভাবনার কমবেশি প্রভাব তো আমার মাঝে থাকবেই। সে তো অবশ্যই, এখন তো মুখে মুখে ইয়োনিয়ান ধারার কথা শোনা যায়।

হোরভ্যাথ: আপনার কবিতায় ‘ইগো’ আসলে কোন জায়গায় আছে সে সম্পর্কে জানতে আগ্রহী আমি। আপনার কবিতায় ‘আমি’ পেতে আমাকে আপনার বেশ কিছু কবিতা পড়তে হয়েছে। এটা আসলে বুঝতে চাইছিলাম।

ট্রান্সট্রোমার: আসলে, এই কথাটা আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থের বেলায় খাটে। আমি কাব্যে ‘‘আমি’’ শব্দটা ব্যবহার করতে ভয় পেতাম। আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থে কিন্তু বেশ কিছু ‘‘আমি’’ এসেছে। আর এই ‘‘আমি’’র সংখ্যা আস্তে আস্তে বেড়েছে। আমার প্রথম আর শেষ দিককার লেখার অন্যতম পার্থক্য–শেষের কাব্যগুলো ‘‘আমি’’তে ভরপুর। তার মানে এটা বোঝায় না যে আমার প্রথম দিককার কবিতাগুলোর মধ্যে ‘ইগো’ কম ছিল। আমার আসলে নিজের কথা বলতে এক ধরনের লজ্জা হতো। যেমন আমি প্রায়ই ‘‘সে’’ শব্দটা ব্যবহার করতাম (হাসি)।

অভিসার সেরে রাস্তায় বেরোল সে,

দ্যাখে—

তুষারের সাথে বাতাসের খুনসুঁটি।

–সি মেজর

অবশ্যই এই ‘‘সে’’ টা আমি। কিন্তু এখন আমি কবিতায় সরাসরি ‘‘আমি’’ শব্দ ব্যবহার করতে কোন দ্বিধাবোধ করি না। প্রথম দিকে নিজেকে কাব্যে বেশি দৃশ্যমান না করাটাই আমার একটা লক্ষ্য ছিল। কিন্তু এখন আমি ভাবি কাব্যে ‘‘আমি’’ ব্যবহার করাটাই আসলে সততার পরিচয় দেয়। আপনি তো নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই কবিতা লিখছেন আর লিখছেন সেই অভিজ্ঞতা অন্যকে দেখানোর জন্য।

(আলাপের শেষ সময়ে ফ্রান কুইন–যিনি কিনা বাটলার বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রান্সট্রোমারের কাব্য সভার পরিচালনা পর্ষদের প্রধান আর ইন্ডিয়ানাপলিস লেখক সমিতির ডিরেক্টর জিম পাওয়েল আমাদের সাথে এসে যুক্ত হোন।)

কুইন: আমি আসলে এখানে আরেকটি বিষয় আলাপে আনতে চাইছি। আপনি গত রাতে আপসালায় আপনার সৃষ্টিশীল লেখার দল প্রসঙ্গে বলছিলেন। আপনি বলছিলেন যে, আপনি আসলে সৃষ্টিশীল লেখার দল শুরু করেছিলেন কিন্তু আপনি ঠিক এখন নিশ্চিত নন যে এটাই ঠিক রাস্তা কিনা। মানে আপনার মাঝে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ট্রান্সট্রোমার: আমার সৃষ্টিশীল লেখন শেখানোর বিষয় নিয়ে কিছু দ্ব্যর্থকতা আছে। আমার মনে হয় না কোন শিক্ষক আপনাকে আসলে কবিতা লেখা শিখিয়ে দিতে পারবেন। এই ভাবনার মধ্যে কোথাও একটা খটকা আছে। বড়জোড় এটা হতে পারে যে একজন শিক্ষক লিখবার পরিবেশ, ক্ষেত্র তৈরি করবার চেষ্টা করতে পারেন। বন্ধুর মতো করে, কিন্তু একই সাথে খুব ধারালো সমালোচনাও সেই আলাপে থাকতে হবে। আমি যখন লিখতে শুরু করি, আমার সাথে এই ঘটনাই ঘটেছিল। আমি যখন প্রথম লিখছি সে সময়ে আমার বেশ কিছু বন্ধুবান্ধবও লিখেন। আমার মনে হয় আমরা এক অন্যকে অনেক সাহায্য করেছিলাম। কারণ আপনি যখন প্রথম লিখছেন তখন আসলে আপনার এমন একটা পাঠক গোষ্ঠী থাকা প্রয়োজন যারা কিনা আপনার লেখাকে বন্ধুবৎসল ভাবে দেখবে, কিন্তু কেবল বন্ধু নন; বরং পাঠক হিসেবেও সেগুলো পড়বে, পড়ে মতামত দিবে। যখন একজন কবি বা লেখক প্রথম লিখে তখন তার মধ্যে এক ধরনের প্রবল উত্তেজনা কাজ করে, আর সেকারণে তাঁর পক্ষে কখনোই বোঝা সম্ভব হয় না–ঐ একই রকম তাড়না আসলে পাঠকের মধ্যে কাজ করছে কিনা। ফলে আপনার সাথে যদি সরাসরি পাঠকদের দেখা হয়, আপনি যদি লেখক হিসেবে পাঠকের প্রতিক্রিয়া দেখতে পান, তাহলে লেখকের বিকাশের পথটা প্রশস্ত হয়। লেখার জটিলতা হলো সেটা ভেতর থেকে আসে। কিন্তু আরো একটা ভাবনার বিষয় হলো আপনি যা লিখছেন সেগুলো একটা টেক্সট আকারে আসতে হয় আর পাঠক লেখকের চাইতে একেবারে ভিন্ন ধরনের অবস্থান থেকে টেক্সটটা পড়ছেন। পাঠক ঠাণ্ডা চোখে কবিতা পড়ছে, লেখকের মতো সেই টেক্সট নিয়ে তাঁর মধ্যে কিন্তু বিশেষ কোন উত্তেজনা নাই। এই বাস্তবতা সেই নবীন কবির জন্য হজম করাটা কঠিন। মোকাবেলা করাটা কঠিন যে, যারা তার কবিতা পড়ছেন তারা কবিতা নিয়ে তার মতো করে অনুপ্রাণিত বা তাড়িত নন। আর এই কারণে লেখা শুরু করবার সময়ে আপনি আসলে অমন একটা দলের সাথে থাকলে বিকশিত হতে পারেন যারা কিনা আপনার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে জড়িত এবং একই সাথে যারা কাজের বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করবে। কিন্তু এই বাস্তবতা বা বিকাশ কখনই একজন শিক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া যায় না। শিক্ষক মানেই একটা কর্তৃত্ব, আপনাকে তাঁর বাধ্য হতে হবে। আসলে আপনি একজন সঙ্গীর সাথে থাকলেই বিকাশের এই স্বাদটা পেতে পারেন। আর একজন শিক্ষক সর্বোচ্চ ঐ রকম একটা ক্ষেত্র তৈরি করবার চেষ্টা করে যেতে পারে। এটাই ছিল আমার এই সৃষ্টিশীল লেখক সার্কাসের মূল অনুপ্রেরণা (হাসি)।

কুইন: কম বয়সে আপনি আপনার যে বন্ধুদের সাথে একত্রে লেখার কাজ করতেন তাঁদের সাথে কী আপনার এখনও যোগাযোগ আছে?

ট্রান্সট্রোমার: হ্যাঁ, আছে। কিন্তু…বয়সের সাথে সাথে কিছু খারাপ ব্যাপার স্যাপারও চলে আসে। কেউ কেউ সম্পূর্ণভাবে লেখালিখি বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ কেউ লেখক হিসেবে অবহেলিত। আর আমি নাম করে ফেলেছি। ফলে এখন আর সেই সম্পর্ক তৈরি হয় না। আমরা–বন্ধুরা যখন মানুষ হিসেবে দেখা করি, কথা বলি তখন কোন সমস্যা হয় না। সমস্যাটা বাধে যখন আমরা লেখালেখি নিযে কথা বলতে শুরু করি। আসলে সেই কম বয়সে যখন আমরা সকলে একই রকম ছিলাম, একে অন্যকে সাহায্য করে গেছি, একে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলাম–সে সম্পর্কটা কোনভাবেই আর পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এই ৩৫ বছর ধরে যে ব্যবধান তৈরি হয়ে গেছে সেটা সহ কোন সম্পর্কই আর নতুন করে শুরু করা যায় না।

হোরভ্যাথ: আপনার কী এমন মনে হয় না যে, আপনি এখন হর্তাকর্তা হয়ে গেছেন আপনার সেই বন্ধুদের পক্ষে আপনার কবিতা পড়া, আপনাকে সমালোচনা করা সম্ভব হয়ে উঠে না বা তাঁদের কবিতা যখন আপনি সমলোচনা করেন সেটাও তাদের পক্ষে নেয়া সম্ভব হয় না?

tomas-monica245a.jpg ………
স্ত্রী-সন্তানের সাথে টোমাজ ট্রান্সট্রোমার
………

ট্রান্সট্রোমার: না, আসলে আমি এই পুরো বিষয়টা থেকে বাইরে থাকি। আমার স্ত্রী আমার সবচাইতে কড়া সমালোচক। তিনি আমাকে খুব ভালভাবে জানেন। কোন কিছু মিথ্যা হলেও তার কাছে ধরা খেয়ে যায়। এছাড়াও যখন কোন কবিতা অনুবাদ হয়, তখন অনুবাদের প্রক্রিয়ায় নানান নতুন বিষয় সামনে চলে আসে। সে সময় আমি যে সমস্যা বা ত্রুটিগুলি খুঁজে পাই সেগুলি শুধরানোর মতো আর সময় থাকে না প্রায়ই (হাসি)।

কুইন: আপনার প্রকাশিত কোন কবিতা কি আপনি প্রকাশের পরে বদলেছেন?

ট্রান্সট্রোমার: না। কবিতা যখন কোন সুইডিশ কাব্যগ্রন্থে ছেপে গেছে সেটার আমি আর কখনো কোন পরিবর্তন করি নাই। ধরেন ম্যাগাজিনে কিছু কবিতা আছে যেটার সাথে বইয়ে ছাপা কবিতায় মিল নাও থাকতে পারে।

কুইন: মৃত্যুশয্যায় নিজের সব লেখা আবার লিখতে থাকা ইয়েটস-এর মুখ ভাসছিলো আমার মনে।

ট্রান্সট্রোমার: না না, আমি আসলে এরকম কাজ করতেই চাই না। আমার খুবই বিরক্ত লাগে। আপনার পুরনো কবিতাগুলো আপনার ঐ সময়ের এক একটা অর্জন, এক একটা মাইলফলক। এমনকি আমি আমার অনেক আগের কবিতাগুলো জোরে জোরে পড়বার তাড়না দেখতে পাই নিজের ভেতর।

কুইন: রবার্ট ব্লাই তার নির্বাচিত কবিতা থেকে কিছু কবিতা পুনর্লিখনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমি আসলে ভাবছিলাম আপনার মাথায় এমন চিন্তা আসে কিনা।

ট্রান্সট্রোমার: হায় হায়…না! আমার কাছে এই ভাবনা ভয়ংকর মনে হয় (হাসি)।

পাওয়েল: তাহলে লেখা পুড়িয়ে ফেলা নিয়ে আপনি কি ভাবেন? বোর্হেস তো বছর ধরে ঘুরে ঘুরে তার প্রথম দিককার লেখাগুলো পুড়িয়ে দিয়েছেন।

ট্রান্সট্রোমার: লেখা পুড়িয়ে ফেলা খারাপ না (হাসি)। কিন্তু নিজের ২৫ বছর আগেকার একটা কবিতা আবার লিখতে চাওয়া বদ্ধ পাগলামী।
————–

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: ফাতেমা সুলতানা শুভ্রা
ইমেইল: fatama.suvra@gmail.com

আরো লেখা

১. নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০১১: কবি টোমাজ ট্রান্সট্রোমার / মৌসুমী জাহান
২. মস্ত হেঁয়ালি: টোমাজ ট্রান্সট্রোমারের ৫টি হাইকু / গৌতম চৌধুরী
৩. টোমাজ ট্রান্সট্রোমার-এর দশটি কবিতা / সৌম্য দাশগুপ্ত


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


5 Responses

  1. শফিক শাহীন says:

    ইন্টারভিউটা মজার। ভাল অনুবাদ।

  2. মাহবুবা জামান says:

    কবি টোমাজ ট্রান্সট্রোমার নিয়ে এরকম সাবলীল অনুবাদ সচরাচর দেখি নাই। তরতর করে পড়া হলো। তথ্যসমৃদ্ধ লেখাটার জন্য ধন্যবাদ।

  3. dupur mitra says:

    আপনার ভাষা অনেক সুন্দর। ধন্যবাদ অনুবাদ করার জন্য।

  4. তাসমিমা হোসেন says:

    লেখকের অনুবাদের ভঙ্গি এমন যে পড়তে পড়তে কখনই মনে হয় নাই বিদেশী ভাষায় আদৌ সাক্ষাতকার নেয়া হয়েছে।কিছু কিছু জায়গা এমনই গড়গড় করে পড়ে ফেলা যায় “আমার জন্য কাব্য কখনো খুব সহজ ছিল না। তবে তখনই কবিতা আমার ভেতর থেকে আসে যখন মনে আমোদ থাকে আবার একই সময়ে মনটা কিছুটা গম্ভীরও থাকে। মানে আপনার মনের আমোদ আর আকাঙ্ক্ষার মাঝে নির্দিষ্ট এক ধরনের ভারসাম্য বা ব্যালান্স থাকতে হবে। এই ব্যালান্সটা ঠিকঠাক পাওয়া কঠিন। আর শুধু কবিতার জন্য আলাদা করে সময় দিতে পারা খুবই কাজের। আমি সেটা কখনও দিতে পারি নাই। যেমন ধরেন এই বারের মতো কোন একটা ভ্রমণ…হ্যাঁ সে তো অবশ্যই, আমার যদি এক জায়গায় বসে কবিতা লিখবার মতো গুণ থাকতো আমি নিশ্চিন্তে হোটেল কক্ষে বসে বলতাম আমি আজ কক্ষেই থাকবো, কোথাও যাবো না। কিন্তু আমি এমন করতে পারি না। মানুষজন আমাকে ডাকে, পার্টিতে আমন্ত্রণ করে। আমি মানুষের সাথে দেখা করি। আর বিমানে চড়লে কখনো আমার ভয় লাগতে থাকে, কখনো আমি বিরক্ত হই। আমার তখন লিখবার মতো কোন মুড থাকে না। ট্রেন ভাল, দীর্ঘ ট্রেন যাত্রা…”কিংবা “ট্রান্সট্রোমার: না, আসলে আমি এই পুরো বিষয়টা থেকে বাইরে থাকি। আমার স্ত্রী আমার সবচাইতে কড়া সমালোচক। তিনি আমাকে খুব ভালভাবে জানেন। কোন কিছু মিথ্যা হলেও তার কাছে ধরা খেয়ে যায়। এছাড়াও যখন কোন কবিতা অনুবাদ হয়, তখন অনুবাদের প্রক্রিয়ায় নানান নতুন বিষয় সামনে চলে আসে। সে সময় আমি যে সমস্যা বা ত্রুটিগুলি খুঁজে পাই সেগুলি শুধরানোর মতো আর সময় থাকে না প্রায়ই (হাসি)।

    কুইন: আপনার প্রকাশিত কোন কবিতা কি আপনি প্রকাশের পরে বদলেছেন?

    ট্রান্সট্রোমার: না। কবিতা যখন কোন সুইডিশ কাব্যগ্রন্থে ছেপে গেছে সেটার আমি আর কখনো কোন পরিবর্তন করি নাই। ধরেন ম্যাগাজিনে কিছু কবিতা আছে যেটার সাথে বইয়ে ছাপা কবিতায় মিল নাও থাকতে পারে।

    কুইন: মৃত্যুশয্যায় নিজের সব লেখা আবার লিখতে থাকা ইয়েটস-এর মুখ ভাসছিলো আমার মনে।

    ট্রান্সট্রোমার: না না, আমি আসলে এরকম কাজ করতেই চাই না। আমার খুবই বিরক্ত লাগে। আপনার পুরনো কবিতাগুলো আপনার ঐ সময়ের এক একটা অর্জন, এক একটা মাইলফলক। এমনকি আমি আমার অনেক আগের কবিতাগুলো জোরে জোরে পড়বার তাড়না দেখতে পাই নিজের ভেতর।

    কুইন: রবার্ট ব্লাই তার নির্বাচিত কবিতা থেকে কিছু কবিতা পুনর্লিখনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমি আসলে ভাবছিলাম আপনার মাথায় এমন চিন্তা আসে কিনা।

    ট্রান্সট্রোমার: হায় হায়…না! আমার কাছে এই ভাবনা ভয়ংকর মনে হয় (হাসি)।

    পাওয়েল: তাহলে লেখা পুড়িয়ে ফেলা নিয়ে আপনি কি ভাবেন? বোর্হেস তো বছর ধরে ঘুরে ঘুরে তার প্রথম দিককার লেখাগুলো পুড়িয়ে দিয়েছেন।

    ট্রান্সট্রোমার: লেখা পুড়িয়ে ফেলা খারাপ না (হাসি)। কিন্তু নিজের ২৫ বছর আগেকার একটা কবিতা আবার লিখতে চাওয়া বদ্ধ পাগলামী।”

    এমন স্বত:স্ফূর্ত অনুবাদ পড়ে বারবার আনন্দ পেতে চাই। অনুবাদের জন্য ধন্যবাদ।

  5. SHIMANTA says:

    অভিভূত!!!!অনলাইনে কোন ওয়েব পেজে এতটা সময় ব্যয় করবো,ভাবিনি!!! ধন্যবাদ এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.