অনুবাদ কবিতা

মস্ত হেঁয়ালি: টোমাজ ট্রান্সট্রোমারের ৫টি হাইকু

গৌতম চৌধুরী | 8 Oct , 2011  


ttrans3.jpg…….
নোবেল প্রাইজ পাওয়ার পর সেন্ট্রাল স্টকহোমে নিজের বাড়িতে নিউজ কনফারেন্সে টোমাজ ট্রান্সট্রোমার
…….
সাহিত্যে এবারের নোবেলজয়ীকে পাঠকেরা কতটুকু জানেন, এ নিয়ে একটা সমীক্ষা চালিয়েছিলেন Nobelprize.org। দেখা গেল, পুরস্কার সংক্রান্ত খবরের জন্য যাঁরা ওই ওয়েবসাইটটিতে ঢুকেছিলেন, সেই পাঠকদের ৮৮% টোমাজ ট্রান্সট্রোমারের কবিতা পড়েন নি। অথচ পৃথিবীর ৫০টিরও বেশি ভাষায় তাঁর কবিতা অনুবাদ হয়েছে, বাংলা সমেত!

বলা বাহুল্য, আমিও সেই সংখ্যাগুরু না-পড়ুয়ার দলে। জাল হাতড়ে হাতের কাছে পেলাম Robert Archambeau আর Lars-Håkan Svensson-এর করা কয়েকটি ইংরেজি অনুবাদ। ট্রান্সট্রোমারের হাইকু-ধর্মী কবিতাগুলির এই তর্জমা Samizdat পত্রিকার ৩ নং সংখ্যায় (গ্রীষ্ম ১৯৯৯) প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলি কবির Den stora gåtan (২০০৪) কবিতাবইয়ের অন্তর্গত। Robin Fulton এই বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন The Great Enigma (২০০৬) নামে। জানা যাচ্ছে, সুইডেন প্রবাসী কবি-সম্পাদক গজেন্দ্রকুমার ঘোষ এই বইয়ের একটি বাংলা তর্জমাও প্রকাশ করেছেন অপার রহস্য নামে।

Den stora gåtan-শব্দগুচ্ছের আর একটি ইংরেজি প্রতিরূপ পেলাম–The Big Riddle। টোমাজ ট্রান্সট্রোমারের এই কবিতা ৫টি ভাষান্তরের ভাষান্তর করার সময় তাই `মস্ত হেঁয়ালি’ নামটি ব্যবহার করলাম। বলে রাখা ভালো, হাইকুর কোনও নিয়ম কানুন মানার চেষ্টা এ-অনুবাদে নেই।
–গৌচৌ

অনুবাদ: গৌতম চৌধুরী

মস্ত হেঁয়ালি


১.
একটি গুম্ফা
সাথে ঝুলন্ত বাগান।
যুদ্ধের চিত্রমালা।

চিন্তারাশি নড়নচড়নহীন দাঁড়িয়ে
প্রাসাদ চত্বরের
মোসাইক টালিগুলির মতো।

উপরের ঢাল ধ’রে
রোদ্দুর মাথায়–ছাগলেরা
চরছিল আগুনের উপর।

অলিন্দের উপর
সূর্যকিরণের খাঁচায় দাঁড়িয়ে–
এক রংধনুকের মতো।

কুয়াসার ভিতর হুম্‌ম্‌ম্‌।
ওই যে, দূরে একটি মাছধরা নৌকা–
জলরাশির উপর স্মারকচিহ্ন।


২.
সেই একই করুণ জলাভূমির উপর
পাইনগুলোর হিম ঝাঁকড়া রুক্ষতা।
নিরন্তর আর নিরন্তর।

আঁধার বাহিত।
দেখা পেলাম বিপুল এক ছায়ার
একজোড়া চোখে।

এইসব মাইলফলক
একটি সফরে সাজানো থাকে।
শোনো ওই বন-ঘুঘুর ডাক।


৩.
বুদ্ধুদের পাঠাগারে
একটি তাকে পড়ে আছে
ধর্মোপদেশের কিতাব, অস্পৃষ্ট

আনন্দ আমার ফুলেফেঁপে উঠেছিল
আর ব্যাঙেরা গেয়ে উঠেছিল
উপকূলীয়[] দঁকে।

সে লিখছে, আর লিখছে…
খালগুলি ভরতি হয়ে উঠেছে আঠায়।
প্রেতলোকের[] নদীপারের বজরা।

বৃষ্টির মতো শান্তভাবে যাও,
দেখা করো মর্মরিত পল্লবের সাথে।
শোনো ওই ক্রেমলিনের ঘণ্টা।


৪.
ছাদের ফাটল হাঁ ক’রে রয়েছে
আর মরহুম একজন আমায় দেখছে।
এই বদন।

কিছু একটা ঘটেছে।
চাঁদ আলো ক’রে দিয়েছে ঘরটা।
ঈশ্বর ব্যাপারটা জানত।

শোনো ওই হুহু করা বৃষ্টি।
ফিসফিসিয়ে বললাম একটা গূঢ় কথা,
যাতে সোজা সেখান গিয়ে পৌঁছাই।

মঞ্চের উপর একটি দৃশ্য।
কী অদ্ভুত এক স্তব্ধতা–
অন্তঃস্বরটি।


৫.
সমুদ্র একটি দেয়াল।
কানে আসছে শঙ্খচিলদের কান্না–
তারা আমাদের ইশারা করছে।

আমার পিছনে ঈশ্বরের বাতাস।
শব্দ ছাড়াই যে-গুলিটা ছুটে আসে–
দীর্ঘতম একটা স্বপ্ন।

ছাইরঙ নীরবতা।
নীল দানবটি চলে যায়।
সাগর থেকে ঠাণ্ডা মৃদু হাওয়া।

আমি সেখানেই আছি–
আর কলিফেরানো একটা দেওয়ালের উপর
ফাইলগুলো জড়ো হচ্ছে।

পাখিমানুষেরা।
মুঞ্জরিত আপেল গাছগুলি।
মস্ত হেঁয়ালি।


—–
[] ইংরেজি অনুবাদে Pomerania শব্দটি রয়েছে, যার মূলে আছে প্রত্ন-স্লাভিক po(=কাছে) ও more (=সমুদ্র) শব্দ। ফলে, এর আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায়, সমুদ্র উপকূল। বাস্তবে এটি অবশ্য বাল্টিক সমুদ্র উপকূলের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নাম। এখন জর্মানি আর পোলান্ডের মধ্যে টুকরো হয়ে আছে। এই এলাকা বিভিন্ন সময় প্রাচীন সুইডিশ ও প্রুশিয় সাম্রাজ্যের প্রদেশ ছিল। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রথমে নাৎসিবাহিনীর কবলে, পরে লালফৌজের হাতে ‘মুক্ত’। স্বভাবতই, Pomerania-শব্দটি উচ্চারণ মাত্র ইউরোপীয় পাঠকের মনে এই স্মৃতি-বিস্মৃতির যে-অনুরণন জেগে ওঠে, মনে হয় বাঙালি পাঠকের কাছে তা দূরস্থ। তাই, আক্ষরিক অর্থটি ব্যবহার করা হ’ল।


[]ইংরেজি অনুবাদে Styx শব্দটি রয়েছে, যা গ্রীক পুরাণের প্রেতলোক বা পাতাললোক ঘিরে থাকা এক নদীর নাম। তুলনীয়, ইসলামি পুরাণের পুলসেরাত বা ভারতীয় পুরাণের বৈতরণী।

—–

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: গৌতম চৌধুরী
ইমেইল: gc16332@gmail.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters


4 Responses

  1. Novera Hossain says:

    খুব ভাল লাগল টোমাজ-এর কবিতা এবং গৌতম চৌধুরীর অনুবাদ অনবদ্য…।

  2. মোজাইক> মোসাইক এবং বৌদ্ধ> বুদ্ধু — কী ইচ্ছে করে লেখা? নাকি মূদ্রণত্রুটি?
    এক নজর পাঠে বেশ ভালো লাগলো। অনুবাদের পাশাপাশি মূল কবিতার ইংরেজীটুকু থাকলে ছন্দ-আবেশের মূর্ছনাটুকু পুরোপুরি উপভোগ করা যেতে। ধন্যবাদ গৌতম চৌধুরী। চলুক।

  3. Subrata Augustine Gomes says:

    দুর্দান্ত, গৌতম দা (চৌধুরী)।

    প্রায় মূলের স্বাদ পেলাম যেন (মূলাস্বাদনের জো তো নাই)… তবে অনুবাদে পোমেরানিয়া আর স্টিক্স্ রাখলেই ভালো হ’ত বোধ হচ্ছে, যাঁদের অজানা, তাঁরা টীকা প’ড়ে নিত না হয়… চন্দ্রদ্বীপকে ইংরেজরা চিনবে না ভেবে মুন আইল্যান্ড করা হ’লে যা হবে প্রায় তাই হ’ল না কি?

    সুব্রত।

  4. Sabidin Ibrahim says:

    translation is always a daring thing.there is always a possibility of going away from the main text.but here i get the real taste of the poet.
    good work.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.