ভ্রমণ

বান্দরবনর পাআরত (কিস্তি ২)

নূরুল আনোয়ার | 10 Oct , 2011  

বান্দরবনর পাআরত ১

(গত সংখ্যার পর)

meghla (9).JPG ………
বান্দরবান শহরের অদূরে চিম্বুকের পথে পাহাড়ের ভেতর প্রবাহিত শঙ্খ নদী
…….
আমি সমস্ত কিছু নিয়তির ওপর ছেড়ে দিলাম। এ মুহূর্তে এসব নিয়ে বেশি ভাবতে গেলে আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে। গাড়ি যেখানে নষ্ট হয়েছে জায়গাটা পাহাড়ের চূড়া বলা যায়। প্রায় চার পাঁচ শ’ গজের মধ্যে তিন চারটা মোড়। পাহাড়ের রাস্তা যত ঘুরানো-প্যাঁচানো থাকে ততই সুন্দর দেখায়। এখানকার জায়গাটা তাই। একটা অল্পবয়সী বটগাছ একটা মোড়ে ডালপালা প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ে সাধারণত বটগাছ দেখা যায় না। পাহাড়িরা নিজের গরজে হয়ত এটা লাগিয়েছে। শীতকাল বলে গাছটা আমাদের কাছে বেশি দরকারি মনে হল না। কিন্তু গ্রীষ্মকালে গরম যখন ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়বে তখন এই বটগাছ পথযাত্রীদের অবলম্বন ছাড়া আর কী হতে পারে।

dulahajra (28).JPG
ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক
……..
বটগাছটা কেন এখানে লাগানো হয়েছে আমি অল্প সময়ের মধ্যে তা টের পেয়ে গেলাম। ইতোমধ্যে চার পাঁচজন পাহাড়ি তাদের ফলানো কলা, জাম্বুরা, পেঁপে, হলুদ আরও নানাজাতের সবজি পিঠে ঝুলানো থুরুমে করে এ জায়গাটাতে নিয়ে এসেছে। আমার কাছে ব্যাপারটা আকর্ষণীয় হয়ে দাঁড়াল। আমরা তাদের কিছু জিজ্ঞেস করলে তারা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা, শুদ্ধ বাংলা এবং নিজেদের ভাষা মিশিয়ে এক ধরনের জগাখিচুড়ি ভাষায় কথা বলে। কিন্তু তাদের এ ভাষাটা একটুও বেমানান ঠেকে না। আবার বুঝতেও তেমন একটা বেগ পেতে হয় না। মাঝারি সাইজের একটা পেঁপের প্রতি লোভ হল। পেঁপেটা সদ্য গাছ থেকে ছিঁড়ে এনেছে চিনে নিতে আমার একটুও কষ্ট হল না। ঢাকা শহরে এধরনের পেঁপে সচারচর চোখে পড়ে না। সেটি পেকে এক রকম হলুদ রঙ ধারণ করেছে। আমি বললাম, এ পেঁপেটার দাম কত?

পেঁপের মালিক বলল, দশ টাকা দিবা দে। (দশ টাকা দেবে।)

আমি বললাম, পাঁচ টাকা দিব দে। (পাঁচ টাকা দেব।)

সে কিছুটা খেপে গিয়ে বলল, তুমি মানু কিল্লাই আমাকে দশ টাকা ন দিবা দে? (তুমি মানুষ কী জন্য আমাকে দশ টাকা দেবে না?)

আমি বললাম, আমি পাঁচ টাকা দিলে খুশি হব। তাই পাঁচ টাকা দেব।

সে সহজ সরল ভাষায় বলল, তুমি মানু খুশি হলে পাঁচ টেয়া দেও। (তুমি মানুষ খুশি হলে পাঁচ টাকা দাও।)

আমরা পাঁচ টাকা দিয়ে পেঁপেটা কিনে নিলাম। বিক্রেতার কাছ থেকে দাখানা নিয়ে পেঁপেটা কাটলাম। ভেতরে বেশ লাল। পাহাড়ি ফলমূল সম্পর্কে আমার ধারণা আগে থেকে ফর্সা। আমি নিশ্চিত ছিলাম, এখান থেকে কিছু কিনলে ঠকার সম্ভাবনা একেবারে ক্ষীণ। আমরা মজা করে পেঁপেটা খেলাম। বেশ মিষ্টি।

একটা পাহাড়ি চাঁপা কলার ছড়ার প্রতিও আমার লোভ হয়েছিল। একটা ছড়াতে এক দেড় শ’টার বেশি কলা হবে। ছড়ার মাঝে মাঝে কলার পাক ধরেছে। কিন্তু এতগুলো কলা ঢাকায় নেব কী করে। আমার তো নিজস্ব গাড়ি নেই যে উঠিয়ে নিয়ে নিলাম। মনে মনে ধারণা করলাম ফেরার পথে যদি গাড়ি এখানে থামাতে পারি কিছু পাহাড়ি ফলমূল কিনে নিয়ে যাব।

ড্রাইভার এবং হেলপার মিলে গাড়ি ঠিকঠাক করতে লেগে গেল। মনে হল আরও কিছু সময় লাগবে। ইতোমধ্যে আমি পাহাড়ের কিছু দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করে ফেললাম। নিজেরাও কিছু ছবি ওঠালাম। আমি একজন পাহাড়ির একটা থুরুম পিঠে চাপিয়ে আলাউদ্দিন সাহবকে বললাম, আলাউদ্দিন ভাই, একটি ছবি তোলেন।

আলাউদ্দিন সাহেব তাই করলেন। গাড়িটা যখন নষ্ট হয়েছিল আমার মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এখন মনে হল সৃষ্টিকর্তা যা-ই করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। গাড়িটা যদি নষ্ট না হত এখানে যে অভিজ্ঞতা হল সেটা কোথায় পেতাম। পাহাড়ি মানুষগুলোর সহজ সরল যে ব্যবহার আমি পেয়েছি বিশাল বঙ্গভূমিতে সেটা বড়ই দুর্লভ।

আমাদের গাড়ি আবার যাত্রা আরম্ভ করল। গাড়িটা বোধকরি থানচি পর্যন্ত যাবে। প্রায় দু’ ঘণ্টা ধরে পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা চিম্বুকে গিয়ে নামলাম। চিম্বুকে যেখানে নামলাম সেখানে চমৎকৃত করার মত কিছু নেই। আমরা খানিকটা হেঁটে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গেলাম। ওখানে স্বল্প পরিসরে সেনাবাহিনীর বসতি রয়েছে। ছিমছাম একটা সুন্দর জায়গা। ওখানে রয়েছে বাংলোর মত একটা ঘর। রয়েছে সবুজ ঘাসে ঢাকা একটি আঙিনা। ওখানে দাঁড়িয়ে পুব-পশ্চিমে তাকালে দেখা যাবে সুদূরপ্রসারি পাহাড় আর পাহাড়। তারপর লোকালয়। আমরা যখন ওখানে গেলাম তখনও হালকা কুয়াশা ছিল। দূরের গাছপালাকে বেশ ঝাপসা ঝাপসা লাগছিল। কিন্তু সুন্দরের এতটুকু কমতি নেই, যেটা আমি দার্জিলিংয়ে দেখিনি। আমি প্রাণভরে প্রকৃতির সুধা পান করলাম। একজন সেনাবাহিনীর সদস্য বললেন, রাতে এখান থেকে তাকিয়ে দেখলে চট্টগ্রাম শহর এবং কক্সবাজারের বাতি দেখা যায়। বর্ষাকালে পাহাড়ের গা ঘেঁষে মেঘ যখন আনাগোনা করে তখন গোটা পাহাড়ি এলাকাকে চমৎকার দেখায়।

আমরা চিম্বুকে পৌঁছেছিলাম দুপুর বারটা নাগাদ। দুটো পর্যন্ত ওখানে ছিলাম। আমরা দোটানায় পড়ে গিয়েছিলাম। তখন ওখানে খাবারের কোনো দোকান ছিল না। সঙ্গে করে কোনো খাবার নিয়ে যাইনি আমরা। এমনকি একটা পানির বোতলও। আমরা ছিলাম ক্ষুধার্ত এবং তৃষ্ণার্ত। তখনই চলে যেতে পারলে বেঁচে যাই। কিন্তু সেটা সম্ভব ছিল না। গাড়ি আসবে দেড়টা থেকে দুটোর মধ্যে। ওইদিন বিএনপি নেতা এম কে আনোয়ার ওখানে যাবার কথা। এজন্য ওখানে একরকম সাজ সাজ রব পড়ে গিয়েছিল। বিশ পঞ্চাশজনের মোরংদের একটি বাদক দল বাঁশি বাজাতে বাজাতে সেখানে গিয়ে উপস্থিত। বাঁশের তৈরি হুকোর মত বাঁশিগুলো আমি এর আগে কোনোদিন দেখিনি। বিচিত্র বাঁশির বিচিত্র সুর। বাঁশিটা আমাকে বেশ আকৃষ্ট করল। আমি মনযোগ দিয়ে তা শুনছিলাম। এই সুরের মধ্যে কোনো ক্লান্তি নেই। বার বার কান পেতে শুনতে ইচ্ছে করে। তাদের পোশাকও দেখলাম বিচিত্র ধরনের। পোশাক বলতে একখানা নেংটি। বিশেষ জায়গা ছাড়া পুরো শরীরটা উদোম।

এই বাঁশি বাজানোটা তেমন সহজ কাজ ছিল না। আমার মনে হচ্ছিল শরীরের সমস্ত বল দিয়ে তারা বাঁশিটা বাজাচ্ছে। যখন বাঁশিতে ফু দেয় তখন দু’ গাল ফুলে ফেটে যাওয়ার মত অবস্থা হয়। এক সময় তারা ক্লান্ত হয়ে পড়লে বাঁশি বাজানো থামিয়ে দিল। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এই বাঁশিটার নাম কী?

সে জানাল, এর নাম গাদি।

আমি তার কাছে অনুমতি চাইলাম, বাঁশিটা একবার আমাকে দেয়া যায় কি না। আমি একটু বাজিয়ে দেখতে চাই।

সে জবাব দিল, তুমি মানু বাজাইত ন পারিবা। (তুমি মানুষ বাজাতে পারবে না।)

আমি বললাম, চেষ্টা করে দেখতে তো দোষ নেই।

সে বাঁশিটা আমার হাতে তুলে দিল। আমি বাঁশিটা হাতে নিয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ফু দিয়ে চেষ্টা করলাম, কিন্তু বাঁশি কোনো রকম সাড়া দিল না। এর কৌশলটা কোথায়?

তাদের কথা হল এটা একদিনের সাধনার জিনিস নয়। অনেকদিন চর্চা করে এ বাঁশি বাজানো শিখতে হয়। আমি ব্যর্থ হয়ে বাঁশিটা মালিকের হাতে তুলে দিলাম।

এম কে আনোয়ার সাহেবের গাড়ি পথে আটকে গেছে। তাঁর আসতে আরও দেরি হবে। আমাদের ততক্ষণ থাকা সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে আমাদের সেই গাড়ি এসে গেছে। আমরা তাড়াহুড়ো করে গাড়িতে উঠে পড়লাম। আমি গাড়ির চালককে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা খুবই ক্ষুধার্ত। সামনে কোথাও দোকান পাওয়া যাবে?

তিনি জানালেন, সামনে একখান চোডো বাজার আছে। এ্যাডে গাড়ি থিয়াইব। তয় বিস্কুট ছাড়া কিছু পা যাইত নয়। (সামনে একটা ছোট বাজার আছে। ওখানে গাড়ি থামবে। তবে বিস্কিট ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না।)

ঘণ্টাখানেক চলার পর সেই নির্দিষ্ট বাজারে গিয়ে গাড়ি থামল। বাজারে দু’ তিনটা দোকান। তবে দোকানে তেমন কোনো মালামাল নেই। বিস্কিট জাতীয় যা আছে খাবারের অযোগ্য। ভেবেছিলাম কলাটলা কিছু পাওয়া যাবে। শুনলাম এসবের কোনো মূল্য এখানে নেই। মানুষ ওসব খেতে চায় না। আমি একজন বাঙালি দোকানির সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেললাম। বললাম, তোঁয়ারা দুইরজা ভাত ন খও? (তোমরা দুপুরে ভাত খাও না?)

দোকানি অল্পবয়সী একটা ছেলে। সে জবাব দিল, ভাত ন খাইলে কি চলিব? (ভাত না খেলে কি চলবে?)

আমি বললাম, তুঁই ভাত খায়ও না? (তুমি ভাত খেয়েছ?)

সে জানাল, আইজও ন খাই। (এখনও খাইনি।)

আমি বললাম, ভাত রাঁইন্দ্য না? (ভাত রেঁধেছ?)

তার ফের জবাব, রাঁইন্দি। (রেঁধেছি।)

আমি বললাম, কজনর লাই রাঁইন্দ্য? (কজনের জন্য রেঁধেছ?)

সে জানাল, তিনজনের লাই। আঁর বাজি, আঁর ভাই আর আঁর লাই। (তিনজনের জন্য। আমার বাপজান, আমার ভাই আর আমার জন্য।)

আমি বললাম, তুঁই কি আঁরারে ভাত খাবাইত পারিবা না? আঁরা তোঁয়ারে টেয়া দিয়ম। (তুমি কি আমাদের ভাত খাওয়াতে পারবে? আমরা তোমাকে টাকা দেব।)

সে বলল, আঁরার ভাত তোঁয়ারা খাইতা নয়। তরকারি শুধু আলুবর্তা আর খর বাইয়ুনের হাজি। (আমাদের ভাত তোমরা খাবে না। তরকারি কেবল আলুভর্তা আর টমেটোর ঝোল।)

আমি বললাম, হনো অসুবিধা নাই। আঁইও এডিয়ার মানুষ। তিনওয়া আণ্ডা পাইলে ভাজি দেও। (কোনো অসুবিধা নেই। আমি এখানকার মানুষ। তিনটি ডিম পেলে ভেজে দাও।)

ছেলেটা আমার কথায় রাজি হয়ে গেল। তাকে খুব খুশি খুশি দেখাল। সে পাশের দোকানে গিয়ে তিনটি ডিম নিয়ে এল। তারপর বলল, তোঁয়ারা এক্কেনা বইও। ডিম ভাজি অই গেলে তোঁয়ারারে খাইতাম দিয়ম। (তোমরা একটু বসো। ডিম ভাজা হয়ে গেলে তোমাদের খেতে দেব।)

আমরা বললাম, এক্কেনা তাড়াতাড়ি গড়। গাড়ি ছাড়ি দিব। (একটু তাড়াতাড়ি কর। গাড়ি ছেড়ে দেবে।)

সে জানাল, গাড়ি ছাইড়তে আরও সম লাগিব। তোঁয়ারা চিন্তা ন গইজ্য। (গাড়ি ছাড়তে আরও সময় লাগবে। তোমরা চিন্তা কোরো না।)

দশ মিনিটের মাথায় সে ডিম ভেজে ফেলল। তারপর তিনখানা টিনের বাসনে করে আমাদের ভাত তুলে দিল। বাসনগুলো অনেকটা ভাঙা। এ নিয়ে আমাদের কোনো রকম আপত্তি থাকল না। টিনের মগে করে সে পানি এনে দিল। তারও অবস্থা প্রায়ই একই রকম। কিন্তু পানিটা বড়ই স্বচ্ছ। ভাতের পাশে আলুভর্তা এবং ডিম ভাজি। টমেটোর ঝোলটাও সঙ্গে দিয়ে দিল। আমরা খেতে লেগে গেলাম। আমরা এমনভাবে খেতে থাকলাম তিনজনে গোগ্রাসে গিলছি। অদ্ভুত একটা জিনিস লক্ষ করলাম, খাবার এত স্বাদ হয় কী করে? এ তো অসাধারণ কোনো খাবার নয়। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোঁয়ার নাম কী? (তোমার নাম কী?)

সে জবাব দিল, ফরিদ।

আমি বললাম, ফরিদ, তোঁয়ার রান্না ত খুব মজা অইয়ে। কী দিয়ে রাঁইন্দ্য? (তোমার রান্না তো ভারি মজা হয়েছে। কী দিয়ে রেঁধেছ?

ফরিদ বলল, কিছু ন দি। তয় পাআরি ছারার পানি দি রাঁধিলে যে হনো খওন ভালা লাগে। (কিছু দেইনি। তবে পাহাড়ি ছড়ার পানি দিয়ে রান্না করলে যে কোনো খাবার ভাল লাগে।)

হ্যাঁ, পাহাড়ি ছড়ার পানির মাহাত্ম্যের কথা আমি জানি। এখানকার পানি পানে আলাদা তৃপ্তি আছে, সেই সুযোগ আমার বহুবার হয়েছে। পানির গুণে হোক অথবা আমাদের খিদের কারণে হোক জীবনে আমি অনেক জায়গায় অনেক রকম দামি খাবার খেয়েছি–এত মজা করে কোথাও খাইনি। আজ প্রায় আটটি বছর কেটে গেল আমি এখনও সেই খাবারের স্বাদ অনুভব করি। বিশ্বাস করুন, আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না। খাবার শেষে ফরিদকে বললাম, ফরিদ, তোঁয়ারে ক টেঁয়া দেয়ন পরিব? (ফরিদ তোমাকে কত টাকা দিতে হবে?)

সে হেসে জবাব দিল, তোঁয়ারার ইচ্ছামত দেও। (তোমাদের ইচ্ছেমত দাও।)

আমি বললাম, ফরিদ, তোঁয়ার পোষায় মত গরি কও। (ফরিদ, তোমার যাতে পোষায় সেভাবে বল।)

ফরিদ আঙুলের গিট গুণে গুণে বলল, তেত্রিশ টেয়া দিলে অইব। (তেত্রিশ টাকা দিলে হবে।)

আমরা ফরিদকে তেত্রিশ টাকা গুণে দিয়ে আরও পাঁচ টাকা বকশিশ করলাম।

পাঁচ টাকা বেশি পেয়ে ফরিদের চোখে-মুখে আমরা আলোর ঝলকানি উপলব্ধি করলাম। মানুষ অল্পতেই কত খুশি হয় ফরিদকে দেখে আমি আঁচ করতে পেরেছিলাম।

আমরা গাড়িতে উঠে পড়লাম। গাড়ি উঁচু-নিচু পাহাড় ভেঙে ভেঙে বান্দরবানের উদ্দেশে ছুটে চলল। এক জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার চে’ চলমান গাড়িতে বসে দেখার আলাদা একটা মজা আছে আমি সেটা উপভোগ করতে থাকলাম।

সকালে যখন আমরা চিম্বুকের উদ্দেশে যাচ্ছিলাম তখন পুবদিকের গাছপালাকে ধোঁয়াচ্ছন্ন দেখাচ্ছিল এবং পশ্চিমপাশের গাছপালায় সূর্যের কোমল আলোয় ঝলমল করছিল। এখন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এবার পশ্চিমপাশের নয়, পুবপাশের গাছপালা আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে। আমরা ঘণ্টাদেড়েক পর বান্দরবান শহরের কাছাকাছি ব্রিজের পাশে এসে নামলাম। উদ্দেশ্য এখানকার ঝর্নাধারাটি কাছে থেকে দেখা।

আমাদের গ্রামের অনেক পরিবার চট্টগ্রাম শহর থেকে পুরনো সুয়েটার কিনে এনে তা খুলে তার থেকে সুতো বা’র করে বান্দরবানে এনে বেশি দামে বিক্রি করে। কিন্তু সুতোগুলো কী কাজে ব্যবহার করে আমি জানতাম না। আমি তার সদ্ব্যবহার দেখলাম। ব্রিজের পাশে কয়েকটি আদিবাসীদের বাড়ি। ও-বাড়ির নারীরা রাস্তার পাশে পা ছড়িয়ে বসে ছোট ছোট তাঁতে ওসব সুতো দিয়ে দক্ষ হাতে গায়ের চাদর এবং কম্বল তৈরি করছেন। এ ধরনের হস্তশিল্প সচারচর চোখে পড়ে না। আমি লোভ সামলাতে না পেরে আড়াই শ’ টাকায় একখানা গায়ের চাদর কিনে নিলাম। আমার দেখাদেখি অন্য বন্ধুরাও তাই করলেন।

সন্ধেবেলা জাফর আমাদের সাঙ্গু নদে নিয়ে গেল। স্থানীয় ভাষায় সাঙ্গু নদকে শঙ্খ নদী বলা হয়। বর্ষাকালে শঙ্খ নদীতে পানির ঢল নামে। তখন পাড় ভাঙার খেলা চলে। পাল তুলে চলে নৌকা। এখন পানি একেবারে নিচে নেমে গেছে। মাঝনদীতে কোমর বরাবর পানি। তারপরেও নৌকা চলছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের একটা বড় অংশ এই শঙ্খ নদীকে ঘিরে। একটা গান শেফালি ঘোষের কণ্ঠে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল–‘পালে কী রঙ লাগাইল মাঝি, সাম্পানে কী রঙ লাগাইল/শঙ্খ নদীর সাম্পানওয়ালা আঁরে পাগল বানাইল।’ আবদুল গফুর হালির গানটা যদি বলি–‘শঙ্খর খালর মাঝি আঁই ঘাডর নৌকা বাই/ এ কুলতুন ঐ কুলত মানুষ পার গরাই।’

শঙ্খ নদীর একপাশে বান্দরবান শহর, আরেকপাশে আকাশছোঁয়া পাহাড়। পাহাড় ঘেরা শঙ্খ নদী ভারি চমৎকার। নিশ্চল পানিতে নেমে আদিবাসী নারীরা স্নান করছিল। এ দৃশ্য যদি কোনো আঁকিয়ের চোখে পড়ত জীবন্ত না করে ছাড়ত না। আমি তো কোনো চিত্রশিল্পী নই। আমার দেখে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। ক্যামেরার কল্যাণে দুয়েকটা ছবি তুলে আনা ছাড়া আর কোনো স্মৃতি আমি বয়ে আনতে পারিনি।


আমি ঢাকায় চলে এলাম। তার দুই মাস পরে আমাকে বাড়ি যেতে হল। গফুর জানতে পেরে খবর পাঠাল আমি যেন বান্দরবানে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি। আমার ব্যস্ততা ছিল, কিন্তু তাকে না করতে পারলাম না। কারণ একটাই, তার সঙ্গে দেখা করাটা যতটা না মুখ্য, তার চে’ বেশি দরকারি মনে করলাম বান্দরবানটাকে আরেকবার দেখে আসা।

আমি বান্দরবানে গিয়ে গফুরের অতিথি হলাম। তার হোটেলে খাই। তার ডেরায় থাকি। তাকে অনুরোধ করে বসলাম, আঁরে পাআরত লই যা। (আমাকে পাহাড়ে নিয়ে যা।)

সে বলল, পাআরত যাইবার মত সম আঁরতে নাই। ইচ্ছা অইলে আশেপাশে পাআর আছে তুই গিয়েরে ঘুরি আয়। (পাহাড়ে যাবার সময় আমার নেই। ইচ্ছে হলে আশেপাশে পাহাড় আছে, তুই গিয়ে ঘুরে আয়।)

আমি শঙ্খ নদীর ওপারে পাহাড়ে গিয়ে ঘণ্টাখানেক বসে থেকে চলে এলাম। একা একা বসে থাকতে মন চাইল না তাই ফিরে আসতে হল। সন্ধের পর গফুর আমাকে পুরো বান্দরবান শরহটা ঘুরে ঘুরে দেখাল। পুরো শহরটা একটা গ্রাম্য বাজারের মত। রাজার বাড়ির মাঠে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে কাটালাম। অন্ধকারে অদূরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলোকে ঘন অন্ধকার দেখায়। খোলা আকাশের নিচে বসে দু’জনের অনেকদিনের জমানো কথা শেয়ার করা যায় তার চে’ বেশি কিছু নয়। শীতও বেশ অনুভূত হচ্ছিল। গফুর বলল, চল্ যাই।

আমি বললাম, হডে? (কোথায়?)

সে বলল, হোটেলত। এহন ভাত খওনের সময়। কাস্টমার বেশি অইলে ঈথারা সামলাইত পাইরত নয়। (হোটেলে। এখন ভাত খাওয়ার সময়। ক্রেতা বেশি হলে ওরা সামলাতে পারবে না।)

আমরা হোটেলের দিকে রওয়ানা দিলাম। গিয়ে দেখি হোটেলে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। লোকজন হোটেলে গিজ গিজ করছে। গফুর ক্যাশ টেবিলে গিয়ে বসল। আমাকেও একখানা চেয়ারের ব্যবস্থা করে দিল। এরই মধ্যে একজন পাহাড়িকে হোটেলের সমস্ত লোকজনের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করতে দেখা গেল। মিষ্টির সঙ্গে একটা করে বেনসন সিগারেট। লোকটা ভারি হাসিখুশি। গফুরকে জিজ্ঞেস করলাম, ঘটনা কী?

সে বলল, আজিয়া ঈতার বাপ মারা গিয়ে। ইতার লাই মিষ্টি খাবার দে। (আজ তার বাপ মারা গেছে। সেজন্য সবাইকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে।)

আমি জিজ্ঞেস করলাম, বাপ মারা যাইবার লয় মিষ্টি খাইবার সম্পর্ক কী? (বাপ মারা যাবার সঙ্গে মিষ্টি খাবার সম্পর্ক কী?)

গফুর আমাকে যা বোঝাল তা এরকম–মুরংদের মধ্যে মা-বাবা যে কেউ মারা গেলে মিষ্টি বিতরণ করে। তারা চেষ্টা করে যতটুকু সম্ভব হাসিখুশিতে থাকা যায়। তাদের ধারণা, মারা যাবার পর যতদিন হেসে খেলে লাশ সৎকার না করে রেখে দেয়া যায় ততই মঙ্গল। ব্যাপারটা হল, মৃত ব্যক্তিকে হাসিখুশিতে বিদায় করতে পারলে পরকালে সে সুখ লাভ করবে। তবে আর্থিক দৈন্যের কারণে অনেকে লাশ বেশিদিন রাখতে পারে না। লাশ বেশিদিন রাখলে খরচও হয় বেশি। সে জানাল হোটেলে কাজ শেষ হলে রাতে আমাকে লাশ দেখাতে নিয়ে যাবে। লাশ দেখার জন্য আমিও উৎসুক হয়ে উঠলাম।

মুরুংদের ধর্ম নিয়ে তার সঙ্গে আমার আরও নানা ধরনের বাতচিৎ হতে থাকল। মুরুংদের আলাদা ধর্ম রয়েছে। তাদের ধর্মের নাম ক্রামা। কিন্তু তাদের কোনো ধর্মগ্রন্থ নেই। কথিত আছে, মুরুংদের সৃষ্টিকর্তা তুরাই একখানি ধর্মগ্রন্থ এবং লাল বস্ত্রখণ্ড গরুর পিঠে করে মুরুংদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। আধা পথে এসে নির্বোধ গরু ধর্মগ্রন্থ এবং বস্ত্রখণ্ডটি খেয়ে ফেলে। ফলে তারা ধর্মগ্রন্থ থেকে বঞ্চিত হয়। তারপর থেকে তারা গরুর ওপর বিদ্বেষ পোষণ করতে থাকে। এজন্য তারা বছরে একবার গো-বধ উৎসব পালন করে। গো-বধ উৎসব পালন করার সময় তারা একটি গরুকে স্নান করিয়ে সাজিয়ে তোলে। তারপর তারা নেচে, গেয়ে, বাঁশি বাজিয়ে গরুটিকে নানা অত্যাচারের মাধ্যমে বর্শা এবং শেলে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। হত্যা করার পর তারা গরুটির মাংস খায়।

গফুরের মুখে একটা গল্প শুনলাম। একবার এক লোক মারা যায়। তখন ছিল বর্ষাকাল। প্রায় সপ্তাহকাল একনাগাড়ে বৃষ্টি। বৃষ্টি থামলে লোকজন তাকে সৎকারের জন্য নিয়ে যায়। তারা আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করে। যখনই আগুন জ্বালিয়ে তার সৎকারের ব্যবস্থা করা হয় তখনই বৃষ্টি নেমে আসে। মুরুংদের লোকজন তাদের পুজনীয় গণকের কাছে যায় এবং তাদের সমস্যার কথা খুলে বলে। তখন গণক তাদের সমস্যার সমাধান বাতলে দেন। তিনি বললেন, মৃত ব্যক্তি এমন কোনো পাপ করেছে যে কারণে তাকে আগুনে স্পর্শ করছে না। যতদিন তাকে ঘরে রেখে দেয়া হবে ততদিন বৃষ্টিও থামবে না।

লোকজন বলল, তাহলে উপায়?

গণক বললেন, উপায় একটা আছে। লাশটি কলাগাছের ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দিতে হবে। তারপর বৃষ্টি থামবে।

তারা তাই করল। তারা সকলে মিলে কলাগাছের ভেলা বানিয়ে লাশটিকে শুইয়ে দিল। তারপর ভেলাটি শঙ্খ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হল। পরের দিন আকাশের মেঘ কেটে গিয়ে বৃষ্টি থেমে গেল। মুরুংদের এ ধরনের অনেক সংস্কার আছে যেগুলো আমরা জানি না।

ওসব কথা থাক। রাতের খাবার শেষে গফুর আমাকে লাশ দেখানোর জন্য নিয়ে গেল। যে বাড়িতে লাশটি রয়েছে ওখানে যাওয়ার পর আমার কেন জানি মনে হতে থাকল আমি কি কোনো বিয়ে বাড়িতে এসেছি? পুরো বাড়িটাতে মানুষ গিজ গিজ করছে। এখানে সেখানে তাসের আড্ডা বসেছে। আমি ওসবের তোয়াক্কা না করে লাশ দেখার জন্য ঘরের ভেতরে চলে গেলাম। একটা ঘরের মাঝখানে মেঝেতে লাশটি পুব-পশ্চিম লম্বা করে শুইয়ে রেখেছে এবং তার চারপাশে গোল করে বসে অনেকে তাস খেলছে। সেই সঙ্গে চলছে বাংলা মদের আসর। সকলে নাচছে, গাইছে, খাচ্ছে। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম কারও চোখেমুখে এতটুকু শোকের ছায়া নেই। সংস্কার কী না করতে পারে! তারা যেখানে সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ভুলে গিয়ে আনন্দে ভেসে বেড়াচ্ছে সেখানে আমার মন খারাপ করার কী আছে। মনে মনে বললাম, যে যেতে চায় তাকে হাসি-খুশি মুখে বিদায় দেয়াই ভাল।


ইতোমধ্যে কারণে অকারণে আমাকে বহুবার বান্দরবানে যেতে হয়েছে। গত নভেম্বরে নতুন করে বান্দরবান ঘুরে এলাম। আমি গিয়েছিলাম কক্সবাজারে একটা গবেষণার কাজে। আমার কাজের একটা অংশ সরকারি অফিসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। আমি সরকারি অফিস থেকে কাজ উদ্ধার করতে গিয়ে কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হলাম। মায়ের পেটের ভেতর থেকে বাচ্চা বের করে আনা যত সহজ সরকারি অফিস থেকে কাজ উদ্ধার করে আনা তত সহজ ছিল না। আমার দরকার ছিল গবেষণা কাজের জন্য কিছু সেকেন্ডারি ডাটা সংগ্রহ করা। কেন বলতে পারব না, তারা আমাকে দিনের পর দিন নাকে রশি দিয়ে ঘুরানোর মত অবস্থা আরম্ভ করে দিল। কেউ কেউ আমার কাছ থেকে ঘুষ দাবি করে বসল। ঘুষ দিয়ে কাজ আদায় করায় আমি পক্ষপাতি ছিলাম না। ফলে আমার যা হবার হয়ে গেল। গোটা এক সপ্তাহ তাদের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে শুক্র-শনিবার চলে এল। এই সরকারি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কী করব আমি কোনো কিছু ভেবে উঠতে পারছিলাম না। আমার মনে ধরল আমি সাফারি পার্কে যাব এবং একটা দিন ওখানে ঘুরাফেরা করে কাটাব। অনেকে কক্সবাজার এলে সাফারি পার্কও ঘুরে যায়। আমার কোনোবার সেই সুযোগ হয়নি। আমি শুক্রবার খুব সকালে সাফারি পার্ক চলে গেলাম। কক্সবাজার থেকে এর দূরত্ব প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার। সুতরাং এক ঘণ্টার বেশি সময় আমার লাগেনি।

আমি যখন সাফারি পার্কের গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম পুরো গেটটাকে একটা খেলনা খেলনা মনে হতে থাকল। গেটের সুউচ্চ দেয়ালের ওপর নানা প্রজাতির পাখি এবং বানরের মূর্তি দেখে আমি একরকম চমৎকৃত হয়ে গেলাম। এসব মূর্তির কোনো কোনোটাকে জীবন্ত মনে হচ্ছিল। এসব দেখে আমি ভাবতে থাকলাম, না জানি ভেতরে আরও কতকিছু আছে। আমি টিকেট কেটে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। এখানেও দেখলাম ব্যতিক্রম নয়–বাঘ, সিংহ, হরিণ, জিরাফ, ডাইনোসর, ময়ূর ইত্যাদি পশুপাখির প্রতিমূর্তি রয়েছে। আমি আমার বন্ধু রাফায়েলকে বলেছিলাম সাফারি পার্কে যাবার কথা। সে বলেছিল, সাফারি পার্ক বাচ্চাদের জায়গা। তুমি ওখানে গিয়ে কী করবে?

আমি তার কথা বুঝে উঠতে পারিনি সাফারি পার্ককে কেন সে বাচ্চাদের বেড়ানোর উপযুক্ত জায়গা বলেছিল। সাফারি পার্কের ভেতরে বাইরের পশু-পাখির প্রতিমূর্তিগুলো দেখে আমি তার প্রমাণ পেয়ে গেলাম। আমি একাধারে সবগুলো প্রতিমূর্তি ক্যামেরাবন্দি করে ফেললাম। উদ্দেশ্য একটাই, ছবিগুলো বাড়িতে গিয়ে আমার পুত্র আপনকে দেখাব।

সাফারি পার্ক পুরোটাই ঝোপজঙ্গলে ভরা। মাঝে মাঝে উঁচু উঁচু গর্জনগাছ। তার ভেতর দিয়ে চিকন পিচঢালা রাস্তা। পুরো পার্কটায় একটা গাম্ভীর্য আছে। সীতাকুণ্ডের ইকো পার্কের সঙ্গে তার কিছুটা তুলনা চলে, যদিও ইকো পার্কে ঢুকলে উঁচু পাহাড় মাড়াতে হয়। সাফারি পার্কে তার বালাই নেই।

dulahajra (25).JPG…….
ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক
……..
‘বন্যরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’ এখানে যে প্রাণী রয়েছে ওগুলো বনের মধ্যে থাকলেও বেমানান। প্রাণীগুলোকে রাখা হয়েছে খাঁচাবন্দি করে। ওগুলোকে ওভাবে না রেখে একেকটা জায়গা ঘিরে ছেড়ে দিলে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারত। তখন তাদের বেশি প্রাণবন্ত মনে হত এবং দেখতেও সুন্দর লাগত। জানি না, কর্তৃপক্ষের মাথায় কী ছিল। কুমিরের থাকার জায়গাটা মানানসই। তাদের ইচ্ছেমতো বিচরণের জায়গা রয়েছে। বেশ কটা কুমিরকে দেখলাম গাছের গুড়ির মত শুয়ে আছে। বাঘ-সিংহকেও একইভাবে ছেড়ে দিলে সুন্দর দেখাত।

সাফারি পার্কের পশু-পাখি যত না আমাকে বেশি আকৃষ্ট করেছে আর চে’ বেশি আকৃষ্ট করেছে পাশে ঘন গর্জনবন। এত বড় বড় গাছের ঘন বন সচারচর চোখে পড়ে না। দুয়েকটি হরিণ দেখলাম ঝোপঝাপের আড়াল থেকে উকিঝুঁকি দিচ্ছে। এ ধরনের দৃশ্য সুন্দরবনে হঠাৎ চোখে পড়ে।

dulahajra (36).JPG ………
ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক
…….
গোটা সাফারি পার্ক ঘুরতে গিয়ে আমি ঘণ্টা দুয়েক ব্যয় করলাম। তারপর ভাবলাম এখন কী করব? নিজেকে কোথাও স্থির রাখতে পারছিলাম না। কক্সবাজার ফিরে যাব, মন থেকে সায় পেলাম না। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম বান্দরবান ঘুরে আসব। বান্দরবানের অনেক জায়গা ঘুরে এলেও নীলগিরি যাওয়া হয়নি। আমি গফুরকে ফোন করলাম। জানতে চাইলাম সে কোথায় অবস্থান করছে। সে জানাল বান্দরবানেই আছে। আমি তাকে বললাম, আঁই তোর হোটেলে এক রাইতের অতিথি অইতাম চাই। (আমি তোর হোটেলে এক রাতের অতিথি হতে চাই।)

আমার কথা শুনে সে যেন আনন্দে লাফিয়ে উঠল। আমার মনে হল আমাকে অতিথি হিসেবে বরণ করে নিতে সে অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করছে। সে জানতে চাইল, হত্তে আইবি? (কখন আসবি?)

আমি বললাম, তোর অনুমতি পাইলে ইত্তারাই গাড়িত উইঠ্যম। আঁই এখন চকরিয়ায়। (তোর অনুমতি পেলে এখনই গাড়িতে উঠব। আমি এখন চকরিয়ায় আছি।)

সে জানাল, এখনই আয় পড়। আঁই আছি। (এখনি এসে পড়। আমি আছি।)

dulahajra (32).JPG……..
ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক
……..
আমি গাড়িতে উঠে পড়লাম। প্রথমে গেলাম কেরানি হাট। তারপর ওখান থেকে আরেকটা বাস পাল্টে বান্দরবানের বাসে উঠলাম। আমার ওখানে যেতে সব মিলিয়ে দুই আড়াই ঘণ্টা লাগল। ইতোমধ্যে গফুর আমাকে দু’ তিনবার ফোন করেছে, আমি কোন সময় কোথায় আছি জানার জন্য। আমি তার দোকানে গিয়ে তাকে পেয়ে গেলাম। সে বলল, আঁর বাইরে একখান কাম আছিল। তুই আইবি এর লাই আর ন যাই। এহন ক বান্দরবন কিল্লাই আইস্যস? (আমার বাইরে একটা কাজ ছিল। তুই আসবি এজন্য আর যাইনি। এখন বল বান্দরবান কেন এসেছিস?)

আমি অনুরোধের সুরে বললাম, কালিয়া আঁরে এক্কেনা সময় দেয়ন পরিব। আঁই এক্কেনা নীলগিরি যাইতাম চাই। না গরিত পারতি নয়। (আগামীকাল আমাকে একটু সময় দিতে হবে। আমি একটু নীলগিরি যেতে চাই। না করতে পারবি না।)

গফুর জানাল, আঁই মাফ চাই। আঁরা ব্যবসায়ী মানুষ, ইচ্ছা গইরলেও হনো মিক্কা যাইত ন পারি। আঁরার ওঅর বওত মাইষের নজর থাগে। যে কোন মুত্তুত আঁরার বিপদ অইত পারে। পাআরিরা অনেকে আঁরারে পছন ন গরে। ঈয়ান বাদেও হোটেল দেহার মত মানুষ নাই। (আমি মাফ চাই। আমরা ব্যবসায়ী মানুষ, ইচ্ছে করলেও কোথাও যেতে পারি না। আমাদের ওপর অনেক মানুষের নজর থাকে। যে কোনো মুহূর্তে আমাদের বিপদ হতে পারে। পাহাড়িরা অনেকে আমাদের পছন্দ করে না। তাছাড়া হোটেল দেখার মত মানুষ নেই।)

কথাটা সত্য বটে, পাহাড়িরা তাকে ওখান থেকে উচ্ছেদের জন্য অনেকবার দাঙ্গা-হাঙ্গামা করেছে। অনেকবার জখমও হতে হয়েছে। আমি কীভাবে তাকে বাধ্য করি যে তুই আমার সঙ্গে চল। আমি বললাম, তইলে আঁর ত আর যওন নইব। তোর এই অবস্থা জাইনলে ত আঁই ন আইসতাম। (তাহলে আমার আর যাওয়া হচ্ছে না। তোর এই অবস্থা জানলে আমি আসতাম না।)

সে রেগে গিয়ে বলল, তোর লয় কি আঁর শুধু নীলগিরি যওনের সম্পর্ক? আর হনো সম্পর্ক নাই? (তোর সঙ্গে কি আমার শুধু নীলগিরি যাবার সম্পর্ক? আর কোনো সম্পর্ক কি আমাদের নেই?)

আমি বললাম, ন থাগিব কিল্লাই? আঁর হাতত বেশি সময় নাই। কালিয়া আঁই আবার কক্সবাজার ফিরি যাইয়ুম। (থাকবে না কেন? আমার হাতে বেশি সময় নেই। আগামীকাল আমি আবার কক্সবাজার ফিরে যাব।)

সে বলল, তোর চিন্তা গরিবার হনো কারণ নাই। আঁই বেয়াক ঠিক গরি দিয়ম। বেইন্না দেইবি অনেক মানুষ নীলগিরি যার। ইতারার লয় যাইত পারিবি। (তোর চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। আমি সব ঠিক করে দেব। সকালে দেখবি অনেকে নীলগিরি যাচ্ছে। ওদের সঙ্গে যেতে পারবি।)

সে পুনরায় বলল, এহন কতা অইল দে তুই কি বাসে যাবি, নাকি মাইক্রোতে গরি? (এখন কথা হচ্ছে তুই কি বাসে যাবি, নাকি মাইক্রোতে করে?)

আমি বললাম, কন্নান সুবিধা অইব, বাস না মাইক্রো? (কোনটা সুবিধা হবে, বাস না মাইক্রো?)

সে জানাল, বাসে গেলে থানচির বাসে ওডন পড়িব। পঞ্চাশ টেয়ার মত ভাড়া। আর মাইক্রোতে গেলে ছ শ’ টেয়া লইব। (বাসে গেলে থানচির বাসে উঠতে হবে। পঞ্চাশ টাকার মত ভাড়া নেবে। আর মাইক্রোতে গেলে ছয় শ’ টাকা নেবে।)

আমি বললাম, ঈয়ান লইয়েরে আঁর হনো মাথাব্যথা নাই। যাইত পাইরলে অইল। (সেটা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। যেতে পারলে হল।)

গফুর বলল, ইয়িন লইয়েরে আর চিন্তা ন গরি খাইতো বয়। চোখ মুখ দেইয়েরে মনে অর তোর ভোগ লাইগ্যে। (সেটা নিয়ে আর চিন্তা না করে খেতে বস। চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে তোর খিদে পেয়েছে।)

সত্যি তাই। সকালে যে নাস্তা করে বেরিয়েছি পেটে আর কোনো দানাপানি পড়েনি। কিছু যে খেতে হবে সেটা আমার একবারও মনে হয়নি। গফুর একজন বয়কে ডেকে বলল, হোটেলে যিয়েন আছে একখান টেবিলে সাজা? (হোটেলে যা আছে একটা টেবিলে সাজা।)

আমি হাতমুখ ধোঁয়ার জন্য বাথরুমে গেলাম। ফ্রেশ হয়ে এলে গফুর আমাকে একটা টেবিলে নিয়ে গেল। টেবিলের সাজানো খাবার দেখে আমি তাজ্জব বনে গেলাম। কী নেই টেবিলে? আলুভর্তা, ডাল, লালশাক, মুলাশাক, বিভিন্ন পদের সবজি, ডিম, গরুর মাংস, মুরগির মাংস, ইলিশমাছ, রুইমাছ; আরও কি একটা মাছের বাটি দেখলাম যেটা সহসা চিনতে পারলাম না। আমি বয়কে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, তোঁয়ার কাছে আর কিছু নাই? (তোমার কাছে আর কিছু নাই?)

বয় বলল, ইলিশ এবং রুই মাছের মাথা আছে। ক্যাডা বেশি, এতরলাই ন দি। দিয়ম না? (ইলিশ এবং রুইমাছের মাথা আছে। কাঁটা বেশি, তাই দেইনি। দেব?)

আমার সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে-বিদেশে বইয়ের সেই প্রবাসবন্ধু আবদুর রহমানের কথা মনে পড়ে গেল। মুজতবা আলী সাহেব বিভিন্ন পদের খাবারের বহর দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি মনে মনে ভাবছিলেন এত খাবারও কি মানুষে খায়? কিন্তু আবদুর রহমান সেটা বুঝতে না পেরে ভাবলেন খাবারের কমতি দেখে মুনিব মন খারাপ করেছেন। তাই তিনি বললেন, হুজুর, রান্নাঘরে আরও আছে।

আমি গল্পটা গফুরকে মনে করিয়ে দিলাম। সে হাসতে আরম্ভ করল। বলল, তোর জিয়ান মন চায় ঈয়ান খা। (তোর যেটা মন চায় সেটা খা।)

এতগুলো খাবারের মাঝখান থেকে কোনটা রেখে কোনটা খাই একরকম ভাবনায় পড়ে গেলাম। গফুর বলল, আঁরার গরুর মাংস রান্না ভাল। (আমাদের গরুর মাংস রান্না ভাল।)

গরুর মাংস আমার প্রিয় খাবার। কিন্তু স্বাস্থ্যগত কারণে এ লোভনীয় খাবারটা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। তারপরেও এক টুকরো মাংস মুখে দিলাম। গফুর কথাটা অনাবশ্যক বলেনি। কিন্তু তার কথা রাখতে পারলাম না। আমি আলুভর্তা, ডাল, লালশাক এবং ইলিশমাছ দিয়ে আমার ভোজনপর্ব শেষ করলাম।


দিনের একটা অংশ আমি গফুরের সঙ্গে ঘুরে ফিরে কাটালাম। পরের দিন খুব সকাল সকাল উঠে স্নানাদি সেরে গফুরের হোটেলে নাস্তা সেরে নিজেকে তৈরি করে নিলাম। বেরুবার সময় গফুর বলল, নীলগিরি তো যওর, ওয়ারে খওন-দওন কিছু লইওস না? (নীলগিরি তো যাচ্ছিস, সঙ্গে খাবার-দাবার কিছু নিয়েছিস?)

আমি বললাম, ব্যাগ বোঝা গরিয়েরে লাভ কী? (ব্যাগ বোঝা করে লাভ কী?)

সে বলল, নীলগিরিতে খাইবার এ্যান কিছু নাই। এ্যাডে একখান দোয়ান আছে, দাম বেশি। ভোগ লাগিলে কী খাবি? (নীলগিরিতে খাওয়ার মত এমন কিছু নেই। ওখানে একটা দোকান আছে, দাম বেশি। খিদে লাগলে কী খাবি?)

সে পুনরায় বলল, তুই এক্কেনা গরি বয়। (তুই একটু বস।)

গফুর একজন বয়কে ডেকে বলল, স্যাররে এক বোতল পানি আর পাশের দোয়ানত্তুন কউয়া কেলা ও পাউরুটি আনি দেয়। (স্যারকে এক বোতল পানি আর পাশের দোকান থেকে কটি কলা ও পাউরুটি এনে দাও।)

বয় গফুরের কথা মেনে তাই করল। আমি সব খাবার ব্যাগের ভেতর ভরে নিলাম। গফুরের খাবার দেয়ার ধরন দেখে আমার মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। আমার মা কোথাও যাবার সময় এভাবে খাবার হাতে তুলে দিতেন। আমি ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে রিকশায় করে বাস স্ট্যান্ডের দিকে ছুটলাম। আমি যেখানে নামলাম সেখানে সারি সারি মাইক্রো বাস দাঁড়িয়ে। আমার বেশ-ভূষা দেখে কজন গাড়িচালক ছুটে এল। তারা ধরে নিয়েছে এখানে নামা মানে আমার গাড়ির দরকার। একজন জিজ্ঞেস করল, স্যার, হডে যাইবেন। চিম্বুক না নীলগিরি? (স্যার, কোথায় যাবেন? চিম্বুক না নীলগিরি?)

আমি বললাম, নীলগিরি।

সে জানাল, আঁর গাড়িত আইয়ুন। (আমার গাড়িতে আসেন।)

আমি বললাম, ভাড়া কত?

সে বলল, ছ’ শ’ টেয়া। ইতারতুন কেয়াই কম যাইত নয়। (ছয় শ’ টাকা। এর চে’ কেউ কমে যাবে না।)

আমি বললাম, এত টেয়া তো আঁর নাই। আর কেয়াই গেলে ঈতারার লয় যাইত চাইলাম দে। (এত টাকা তো আমার নেই। আর কেউ গেলে তাদের সঙ্গে যেতে চেয়েছিলাম।)

এ সময় একজন আমাকে হাতের ইশারায় ডাকলেন। তিনি গাড়ির কেউ নন। কাপড়ে চোপড়ে লোকটি ভদ্রগোছের। আমি তার কাছে গেলে বললেন, অনে হডে যাইবেন দে? (আপনি কোথায় যাবেন?)

আমি বললাম, নীলগিরি।

তিনি বললেন, ইতারা পয়সা বেশি নিব। অনে রুমার বাস স্ট্যান্ডে যাইয়েরে থানচির বাসে গরি যওন গৈ। পয়সা কম লাগিব। সময়ও বেশি লাইগদ্য নয়। আইবার সময় আবার ঐ গাড়িত গরি আইত পারিবান। (এরা পয়সা বেশি নেবে। আপনি রুমার বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে থানচির বাসে করে চলে যান। পয়সা কম লাগবে। সময়ও বেশি লাগবে না। আসার সময় আবার ওই গাড়িতে করে চলে আসবেন।)

আমি ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিয়ে একখানা রিকশা নিয়ে রুমা বাস স্ট্যান্ডে চলে গেলাম। ওখান থেকে রুমার বাস স্ট্যান্ডের দূরত্ব আধা কিলোমিটারও হবে না। বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখলাম একটা মাত্র গাড়ি। লোকজন কেউ কেউ গাড়িতে উঠে বসেছে। টিকেটের ব্যবস্থা আছে। গাড়ির লোক বলল, অনে গাড়িত উডি বইয়ুন। পরে টিকেটের ব্যবস্থা অইব। (আপনি গাড়িতে উঠে বসুন। পরে টিকেটের ব্যবস্থা হবে।)

আমি তাড়াহুড়া করে উঠে সামনের দিকের বাম পাশের একটা সিটে বসে পড়লাম। প্রায় দশ মিনিটের মাথায় পুরো গাড়ি যাত্রীদের দখলে চলে গেল। অনেকে বসতে না পেরে দাঁড়িয়ে আছে। খেটে খাওয়া মানুষের পাশাপাশি প্যান্ট-শার্ট পরা ভদ্রলোকের সংখ্যাও কম নয়। আমার পাশে পাহাড়ি এক তরুণ এসে বসল। বয়স ত্রিশ-বত্রিশের কোটায়। আমি একথা সেকথা বলার পর অল্প সময়ের মধ্যে তার সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেললাম। তার নাম মং চিন। সে তঞ্চংগ্যা সম্প্রদায়ের। সরকারি চাকুরে, স্বাস্থ্য বিভাগে আছে। সে তার কর্মস্থল চিম্বুকে যাচ্ছিল। আমি তার কাছ থেকে নীলগিরির লোকেশনটা জানার চেষ্টা করলাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি থানচি যাবেন?

মং চিন বলল, না, থানচি যাব না। আমি চিম্বুক থেকে একটু সামনে গিয়ে নামব। ওখানে আমার অফিস।

আমি তাকে বললাম, আমি নীলগিরি যাব। কিন্তু আমি কোনোদিন ওখানে যাইনি। কোথায় গিয়ে নামব?

সে বলল, নীলগিরি পথেই পড়বে। আপনার চিনে নিতে কোনো কষ্ট হবে না। ওখানে বাস থেকে অনেক মানুষ নামবে।

আমি মং চিনের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতে থাকলাম যেন সে আমার অনেক দিনের চেনা। আমি তার কাছে পাহাড়ি এবং বাঙালিদের সম্পর্ক কেমন জানতে চাইলাম। সে জানাল, এক সময় বাঙালি এবং পাহাড়িদের মধ্যে রেষারেষি ভাব ছিল। এখন আর ওই রকম নেই। আমাদের ভুললে চলবে না, বাঙালিরা আছে বলেই পাহাড়িরা সচেতন হয়েছে। একটা প্রতিযোগিতার জন্ম নিয়েছে। যেই যা বলুক, এখানে বাস করতে গেলে পাহাড়ি এবং বাঙালিদের মধ্যে একটা সুসম্পর্ক অবশ্যই গড়ে তুলতে হবে। সেটা ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। আমাদের মনে রাখা দরকার আমরা সকলে বাংলাদেশের মানুষ। ইচ্ছে করলেই আর বাঙালিদের সরিয়ে দেয়া যাবে না।

মং চিন আরও নানা কথা বলে যাচ্ছিল। এই তরুণকে আমার পছন্দ হয়ে গেল। আমরা কথার পিঠে কথা বলছিলাম। তার সঙ্গে আমি আরও একটা কাজ করছিলাম। আমি তো জানালার পাশে বসেছিলাম। মং চিনের কথা শুনছিলাম বটে, কিন্তু আমার দৃষ্টি ছিল বাইরে। আমার ক্যামেরা খোলা ছিল। গাড়ি চলা অবস্থায় যেখানে মন ধরেছে সেখানে ছবি তুলে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে মং চিন আমাকে বাতলে দিতে থাকল, সামনে ভাল দৃশ্য আছে, ক্যামেরা প্রস্তুত রাখুন। মং চিনের কথা মেনে ছবি তোলায় আমি পক্ষপাতি ছিলাম না। আমি এলোপাতাড়ি ছবি তুলে যেতে থাকলাম।

আমার বান্দরবান সেই আগের মতই আছে। কোথাও সৌন্দর্যের এতটুকু হানি হয়নি। অদ্ভুত একটা জায়গা, যত দেখি তৃষ্ণা মেটার মত নয়। আমি যখন সুন্দরবন গিয়েছিলাম তার মধ্যে তেমন একটা বৈচিত্র্য খুঁজে পাইনি। কিন্তু পাহাড়ি অঞ্চল একেবারে স্বতন্ত্র। ছোট-বড় পাহাড়গুলো আপনার চোখে একেক জায়গায় একেকভাবে ধরা দিতে বাধ্য। দার্জিলিংকে আমি খাটো করে দেখি না। আমার কথা হল বান্দরবান কি তার চাইতে কোনো অংশে কম? তাহলে পয়সা খরচ করে ওসব অঞ্চলে ছুটতে হবে কেন? ঝোপঝাড়ের ভেতর দুটি বানরকে ছুটোছুটি করতে দেখলাম। মনে মনে বললাম, আমি বান্দরবানের বান্দর হব দার্জিলিং যাব না।

মং চিন বলল, আপনি যখন নীলগিরিতে নামবেন তার ঘণ্টা দুয়েক বাদে এ গাড়িটা আবার ফিরে আসবে। এই গাড়িতে করে আপনি ফেরার চেষ্টা করবেন, নইলে পরের গাড়িতে আসতে হবে। তখন আপনার অনেক দেরি হয়ে যাবে।

আমি বললাম, আমার দেরি করা যাবে না। আমাকে আবার কক্সবাজার ফিরে যেতে হবে। সুতরাং এ গাড়িটাই আমি ধরার চেষ্টা করব।

মং চিন বলল, আমিও এ গাড়িতে উঠব। আপনার সঙ্গে গাড়িতে আবার দেখা হবে। আপনি আপনার মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে দিন। সুবিধা-অসুবিধা হলে আপনাকে ফোন করব।

আমি বললাম, আপনার ফোন করতে হবে না। আমি এই গাড়িতেই ফিরব।

চিম্বুক পাহাড় পেরিয়ে প্রায় এক কিলোমিটারের মাথায় মং চিন নেমে গেল। আমার পাশে আরেকজন ছেলে বসল। তার নাম বিপ্লব মারমা। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কোথায় যাবে?

সে উল্টো আমাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কোথায় যাবেন?

আমি বললাম, নীলগিরি যাব। তুমি আমাকে একটু বলে দিয়ো আমি কোথায় নামব।

বিপ্লব বলল, আমি অতদূর যাব না। তার আগেই আমি নেমে যাব। নীলগিরি আপনাকে চিনিয়ে দিতে হবে না। আপনি নিজের থেকে চিনে যাবেন।

বিপ্লবের সঙ্গে অনেক সাঙ্গপাঙ্গ। বিপ্লব বউ নিয়ে এই প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে অনেক জিনিসপত্তর। বাঁশের বেতের তৈরি করা সাত আটটা খাঁচা। প্রতিটি খাঁচায় বড় বড় দু’টি করে মোরগ। এধরনের বড় মোরগ হঠাৎ চোখে পড়ে। একটা বড় সাইজের খাসিও গাড়ির ছাদের ওপর উঠিয়ে নিল। সেই সঙ্গে চাল তরিতরকারি তো আছেই। বিপ্লবকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি তো শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছ, এত জিনিসপত্তর কেন?

বিপ্লব বলল, প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি তো তাই নিচ্ছি। প্রথম শ্বশুরবাড়ি গেলে সঙ্গে এসব নিতে হয়। এগুলো কেটে আমাদের রান্না করে খাওয়াবে। শ্বশুরবাড়িতে প্রথম গেলে খাবার-দাবার নিয়ে যেতে হয়, নইলে উপোস থাকতে হবে।

এ নিয়মটা আমি প্রথম জানলাম। আমি বিয়ে করেছি ঢাকার মেয়ে। কিন্তু এখানকার নিয়মকানুন কিছুই জানতাম না। বিয়ের দুদিন পর যখন আমি শ্বশুর বাড়িতে গেলাম আমার বউ ফিসফিস করে বলল, তোমাকে বাজার করতে হবে। যতদিন তুমি বাজার করে না দেবে ততদিন তোমাকে পোলাও খেয়ে থাকতে হবে।

আমি বললাম, তাহলে তো ভালই। পোলাও খেয়ে খেয়ে থাকব? কিন্তু ওটা আমার মনের কথা ছিল না। পোলাও বিরানি আমি পছন্দ করি না। বউ বলল, সব কিছুতে তোমার গোয়ার্তুমি চলবে না।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কোন ধরনের নিয়ম? আমাকে বাজার করতে হবে কেন? আমি তো কোনোদিন বাজার করিনি।

সে বলল, এখন করতে হবে। কাল ভোরে সকলে ঘুম থেকে ওঠার আগে তুমি বাজারে চলে যাবে। তোমাকে আবার তোমার শালারা খুঁজতে যাবে। যদি ধরা পড়ে যাও তাহলে তোমাকে অর্থদণ্ড দিতে হবে।

আমি মহামুশকিলে পড়ে গেলাম। বললাম, আমাকে কী কী বাজার করে আনতে হবে?

সে বলল, বাজারের সবচে’ বড় রুইমাছটা তোমাকে কিনতে হবে। তারপর তরিতরকারি, মুরগি যা যা পাওয়া যায়। মিষ্টি এবং পান-সুপারির কথা ভুলো না যেন।

আমি একটা বড় পরীক্ষায় পড়ে গেলাম। বাজার যদি দুর্বল হয় জামাই বদনামের ভাগী হবে। আমি আমার এক দূরসম্পর্কের ভাইয়ের বাড়িতে চলে গেলাম। আমাকে এত সকালে দেখতে পেয়ে তারা রীতিমত অবাক। ভাইটি জিজ্ঞেস করল, আপনি এত সকালে!

আমি বললাম, শফি, আমি একটা সমস্যায় পড়ে গেছি। আমাকে নাকি বাজার করে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যেতে হবে। তুমি যদি আমাকে একটু সাহায্য না করো তো বিপদে পড়ে যাব। হাসতে হাসতে তার দম আটকে যাবার মত অবস্থা। সে বলল, আপনি তো দেখছি গ্যাড়াকলে পড়েছেন। আপনার কোনো চিন্তা করতে হবে না। এ ধরনের বাজার আমি আরও করেছি। বড় ভাইয়ের বিয়েতে তো একই সমস্যা হয়েছিল। আপনি বসে বসে টিভি দেখেন আমি বাজার করে নিয়ে আসছি। আমি শফির কথামত পাঁচ হাজার টাকা বের করে দিলাম। সে আরেকটা ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বাজারে চলে গেল।

ঘণ্টা দুয়েক পর যখন শফি বাজার নিয়ে ফিরে এলে আমার অবস্থা তো যাই যাই। বড় বড় দুই বস্তা বাজার। সঙ্গে বারটা মুরগি। দশ প্যাকেট মিষ্টি। আমি শফিকে বললাম, শফি, তুমি এ কী করেছ? আমি এসব জিনিস নেব কী করে?

সে বলল, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি আপনাকে গাড়ি ঠিক করে দেব।

আমি বললাম, বস্তার মধ্যে তুমি এত কিছু কী নিয়েছ?

শফি বলল, জানতে চান? শুনুন–আলু, মরিচ, পেঁয়াজ, লালশাক, মূলাশাক, ডাটাশাক, পুঁইশাক, করলা, চিচিঙ্গা, বরবটি, ঝিঙে, কচু, শসা, টমেটো, পেঁপে, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, ঢেঁড়শ আর কত জানতে চান?

আমি অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে বস্তা থেকে রুইমাছটা বের করল। বিশাল আকৃতির মাছ। একেবারে সাড়ে পাঁচ কেজি।

আমি বললাম, এত বড় মাছ তুমি কোথায় পেলে?

সে জানাল, আড়তে চলে গিয়েছিলাম। আড়ত ছাড়া এত বড় মাছ আর কোথায় পাওয়া যাবে?

আমি ভাবলাম মাছটা আমাকে দেখানোর জন্য সে বা’র করেছে। কিন্তু না। সে দোকান থেকে বেশ কিছু পঞ্চাশ পয়সা এবং এক টাকার কয়েন নিয়ে এসেছে। শফি কয়েনগুলো একটা কাঠি দিয়ে ঠেলে ঠেলে মাছের মুখ দিয়ে পেটে ঢোকাচ্ছে। আমি বললাম, শফি, তুমি এসব কী করছ?

সে বলল, ভাবি আপনাকে সব বলেছে, এটা বলেনি?

আমি বললাম, সে তো এসব কিছু বলেনি।

শফি বলল, আপনাকে ফাঁসাতে চেয়েছিল। যারা মাছ কাটবে তারা এ টাকা ভাগাভাগি করে নেবে। মাছের পেটে টাকা না পেলে আপনার কাছ থেকে জোর করে আদায় করবে। তখন আপনি বিপদে পড়ে যাবেন।

শফি যত বাজার করে এনেছে বর্তমানের চড়া বাজারে পনের হাজার টাকা লাগত। সে সবকিছু ঠিকঠাক করে একখানা বেবি টেক্সি ডেকে এনে সব উঠিয়ে দিল।

আমি যখন শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম আমার শালা-শালিরা ভীষণ ক্ষেপা, কেন তারা আমাকে বাজারে খুঁজে পায়নি। যাহোক, আমার কেনা তরিতরকারি দিয়ে তারা আমাকে খেতে দিয়েছিল। আজ অনেক দিন পর ব্যাপারটা আমি পাহাড়িদের মধ্যেও লক্ষ করলাম। এ নিয়ম ঢাকাইয়ারা কি পাহাড়িদের কাছ থেকে শিখল, নাকি পাহাড়িরা ঢাকাইয়াদের কাছ থেকে শিখল আমি কোনোভাবে অংক মেলাতে পারি না।


নীলগিরিতে এসে বাস থামল। বড় সাইন বোর্ড দেখে আমার চিনে নিতে একটুও কষ্ট হয়নি এটা নীলগিরি। আমার সঙ্গে বাস থেকে আরও কয়েকজন যাত্রী নামল। তারপর আমরা হেঁটে হেঁটে একটা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গেলাম। পাহাড়টা উলঙ্গ। উলঙ্গ বলছি এ কারণে, এ পাহাড়ে কোনো গাছপালা নেই। পুরো জায়গাটি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ওখানে তাদের স্থাপনা রয়েছে। খুব সম্ভব সেনা সদস্যরাই পাহাড়ের গাছপালা কেটে সাবাড় করে ফেলেছেন। আমি বলতে পারব না এ পাহাড়ের চূড়াটিকে কেন উলঙ্গ করে রাখা হয়েছে। হতে পারে হেলিকপ্টার উঠা-নামার জন্য। গ্রীষ্মকালে যদি কোনো পর্যটক ওখানে যায় তাহলে গরমে তারা টিকতে পারবে না। শীতকাল বলে আমরা অনেকটা রেহাই পেয়ে গেলাম।

নীলগিরি জায়গাটা গোটা বান্দরবানের চে’ একেবারে ভিন্ন। এটা এমন একটা জায়গা যেখানে দাঁড়িয়ে চারপাশের পাহাড়গুলো দেখতে কোনো রকম অসুবিধা হয় না। যে পাহাড়টিতে আমরা চড়লাম ওটা একেবারে খাড়া। পাহাড়ের দু’পাশ এত নিচু যে তার গভীরতা নির্ণয় করা বড়ই দুষ্কর। মাঝখানে ফাঁকা জায়গা থাকার কারণে দূরের পাহাড়গুলোর সহজে দেখা মেলে। এ জায়গাটিকে কেন নীলগিরি বলা হয়েছে আমার অনুমান করতে একটুও কষ্ট হয়নি। সাধারণত আমরা গাছপালাকে সবুজ দেখি। কিন্তু এখানকার গাছপালা সবুজ নয়, নীলাভ। জায়গাটা কেন নীলাভ বলা মুশকিল। হয়ত নীল আকাশের প্রতিচ্ছবি এখানকার পাহাড়ে প্রতিফলিত হয়েছে।

পুরো জায়গাটাকে আমার কাছে একটা বিশালাকায় থালার মত মনে হয়েছে। চারপাশে গোলাকার উঁচু পাহাড়। তার মাঝখানে আরেকটি উঁচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আমরা তা অবলোকন করছি। খোলাসা করে বলি পাহাড়টি এরকম, একটি থালার মাঝখানে উঁচু করে ভাত সাজিয়ে রাখলে ওটাকে যেভাবে দেখায়। আরও যদি বলি, আপনি সাজিয়ে রাখা সেই ভাতের ওপর দাঁড়িয়ে থালার চারপাশটা দেখছেন। ওই পাহাড়গুলো এত উঁচু যে যেন আর একটু হলে আকাশের নাগাল পাবে। আকাশের মেঘমালা পাহাড়ের গা ঘেঁষে ঘেঁষে যখন ভেসে বেড়ায় প্রকৃতি আরও অপরূপ আকার ধারণ করে। তখন মনে হতে থাকে পাহাড়গুলো আসলেই আকাশের নাগাল পেয়ে গেছে। আপনি গুণ গুণ করে গাইতে থাকবেন ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ।’

বর্ষাকালে নাকি এ দৃশ্যটা আরও অপূর্ব দেখায়। আমার আফসোস সে দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আর কখনও হবে কিনা তাও জানি না।

আমি যাবার ঘণ্টাখানেক পর সিলেট প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ঝাঁক তরুণের দেখা পেলাম। তাদের সঙ্গে ছিলেন একজন শিক্ষক এবং একজন শিক্ষিকা। শিক্ষকের নাম নজরুল ইসলাম। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ান। তাঁর সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে আমার পরিচয় হয়ে গেল। আমি কিছুটা সময় তাঁর সঙ্গে কাটালাম। ভদ্রলোক বড় অমায়িক। তাঁরা সঙ্গে করে খাবার নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাকে তাঁদের সঙ্গে খেতে আমন্ত্রণ জানালেন। আমি রাজি হতে পারিনি। কারণ তাঁদের সঙ্গে খেতে গেলে আমার সঙ্গে করে আনা খাবারের সদ্ব্যবহার করা হবে না।

আমি প্রায় দু’ ঘণ্টা নীলগিরিতে কাটিয়েছিলাম। এই সময়টুকু আমি কীভাবে খরচ করলাম একটুও টের পাইনি। প্রকৃতি মানুষকে এত আত্মভোলা করে তুলতে পারে এই প্রথম জানলাম। যদি থাকার ব্যবস্থা থাকত আমি একটা রাত ওখানে কাটিয়ে দিতাম।

হঠাৎ গাড়ির হর্ন শুনতে পেলাম। আমার বুঝতে বাকি থাকল না আমাদের সেই বাস চলে এসেছে। আমি তাড়াহুড়া করে গাড়িতে চলে এলাম। যাবার সময় গাড়ির হেলপারকে বলে রেখেছিলাম আমার সিটটা যেন খালি আসে। সে কথা দিয়েছিল, তাই হবে। আমি বিশ্বাস করিনি সে আমার কথা রাখবে। গাড়িতে উঠে দেখলাম সে আমার কথার অমর্যাদা করেনি। গাড়িতে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আমার সিটে কেউ বসেনি।

গাড়িতে বসে চোখ বুঁজে ভাবতে থাকলাম আমি কোন জায়গায় এলাম। বাংলাদেশে এমন সুন্দর জায়গা আছে আমি আগে জানলাম না কেন! নীলগিরির সৌন্দর্য আমাকে এমনভাবে বিমোহিত করল পুরো জায়গাটা মানসনেত্রে ধারণ করে নেয়ার চেষ্টা করলাম। দীর্ঘ সময় চোখ বুঁজে থাকায় কোন সময় আমার চোখে ঘুম নেমে এল আমি টেরও পেলাম না।

আমার ঘুম ভাঙার আগে বাস চিম্বুকে চলে এল। হঠাৎ কার হাতের স্পর্শ টের পেলাম। চোখ মেলে দেখি মং চিন। আমি অবাক কণ্ঠে বললাম, মং চিন আপনি! গাড়িতে কখন উঠলেন?

মং চিন বলল, দশ মিনিট হবে। আপনাকে তো বলেছিলাম আমি এই গাড়িতে ফিরব। গাড়িতে উঠে দেখি আপনি ঘুমোচ্ছেন। তাই ইচ্ছে করেও বিরক্ত করিনি। চলুন, হালকা নাস্তা করে নেই।

আমি মোটামুটি খেয়েই গাড়িতে উঠেছিলাম। তারপরেও তাকে না করতে পারলাম না। মনে মনে ধরে নিলাম তার খিদে পেয়েছে। আমরা চিম্বুক পাহাড়ে নেমে ডিম খেলাম এবং সঙ্গে কফি। কফি পান করতে করতে সে বলল, দাদা, আপনার জন্য চারটা পেঁপে কিনে এনেছি। পাহাড়ি পেঁপে খুবই মিষ্টি। খেতে ভাল লাগবে।

আমি বললাম, আপনি পেঁপে কিনতে গেলেন কেন?

সে বলল, ঢাকায় নিয়ে যাবেন।

আমি বললাম, আমাকে তো আবার কক্সবাজার যেতে হবে। ততদিনে তো পেঁপে পঁচে যাবে।

সে বলল, বেশি পাকা নয়। দু’ চারদিন থাকলেও নষ্ট হবে না।

আমি বললাম, কত দিয়ে কিনেছেন?

মং চিন বলল, মাত্র ষাট টাকায়। গাছ থেকে পেড়ে এনেছি। এধরনের তাজা পেঁপে আপনারা ঢাকায় পাবেন না।

আমি মং চিনকে বললাম, মং চিন একটা কথা বললে রাগ করবেন না তো? পেঁপের টাকাটা আপনাকে রাখতে হবে। নইলে আমি মন খারাপ করব। আপনি আমার জন্য পেঁপে সংগ্রহ করে এনেছেন তাতেই আমি খুশি।

মং চিন ভেতরে ভেতরে মনক্ষুণ্ন হল আমার বুঝতে বাকি থাকল না। সে কোনো কথাই বলল না। আমি টাকাটা তাকে দিতেই সে বলল, নাস্তার টাকাটাও কি আপনি দেবেন?

তার কথায় আমার হাসি পেয়ে গেল। আমি বললাম, না, নাস্তার পয়সা আপনি দেবেন।

গাড়িতে উঠতেই মং চিন আমাকে একটা চটের ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, আপনার পেঁপে।

আমি তো পেঁপে দেখে তাজ্জব বনে গেলাম। অনেক বড় সাইজের পেঁপে। ঢাকাতে এগুলো একেকটা আশি থেকে এক শ’ টাকা বিক্রি করবে। মং চিন আমার পাশে এসে বসল। আমি পাহাড়ের দিকে নির্বাক তাকিয়ে আছি। মং চিন বনাঞ্চলের কোন জায়গাটির নাম কী বলে যেতে থাকল। গোটা পথটায় সে আমার একজন গাইড হিসেবে কাজ করল। এক সময় আমরা বান্দরবান শহরে এসে গেলাম। গাড়ি থেকে নেমে মং চিন বলল, দাদা, আপনি এখন কোথায় যাবেন?

আমি বললাম, আমি আমার বন্ধুর কাছে যাব।

মং চিনের মুখমণ্ডলে একরকম কালো ছায়া নেমে এল। সে বলল, দাদা, সত্যি বলতে কী আপনাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।

আমি বললাম, এটা আমার ভাগ্য।

সে আমাকে বলল, আপনাকে একটা প্রস্তাব দিলে গ্রহণ করবেন?

আমি বললাম, বলুন?

সে জানাল, পাহাড়ে আমার পঁচিশ একর জায়গা আছে। আপনি যদি রাজি হন আমরা দুজনে মিলে ওই জায়গায় রাবার অথবা আমের চাষ করতে পারি। আমরা খুবই লাভবান হব। কাজটা করলে আমি সব সময় আপনাকে কাছে পাব। তাতে আমারও উপকার হবে। আমাকে যদি বিশ্বাস না হয় আপনি লিখিত একটা চুক্তি করতে পারেন।

আমি মং চিনকে বললাম, আপনি আমাকে এত অল্প সময়ের মধ্যে কাছের মানুষ হিসেবে গণ্য করে ফেললেন এজন্য ধন্যবাদ। আমাকে একটু ভাবতে দিন। আমি অবশ্যই আপনার প্রস্তাবের কথা ভাবব।

মং চিন আর কোনো কথা বলল না। আমরা দুজন দুদিকে চলে গেলাম। আমাদের দেখা হয়েছে অনেকদিন হয়ে গেল। এখনও আমাদের সম্পর্ক অটুট আছে। মং চিন প্রায়ই ফোন করে আমার খবরাখবর নেয়।

ওসব কথা থাক। মং চিন যখন চলে গেল আমার মনটা কেমন যেন ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। নিজেকে স্থির রাখার মত অবস্থা আমার ছিল না। আমার যাওয়ার কথা গফুরের হোটেলে। তারপর তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা কক্সবাজারে চলে যাওয়া। আমি কেমন জানি বান্দরবানের মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কাছে হার মেনে গেলাম। আমি একখানা অটো রিকশা নিয়ে মেঘলা পর্যটন এলাকায় চলে গেলাম। পাগল না হলে এধরনের কাজ কি কেউ করে? আমার মনে হচ্ছিল আমি তো একবার মেঘলার প্রেমে পড়েছিলাম। ওই জায়গা না দেখে আমি যাই কী করে। আমার বারবার জানতে ইচ্ছে হচ্ছিল মেঘলার কি আগের সৌন্দর্য আছে, নাকি কালের স্রোতে তার রূপ-যৌবন হারিয়ে ফেলেছে। যাবার পথে একটা সাইন বোর্ড চোখে পড়ল। পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি, মারমা, চাকমা, ম্রো, তঞ্চংগ্যা, খুমি, খেয়াং, লুসাই, পাংকুয়া, বম, ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের দম্পতির ছবিটি আমাকে বেশ আকৃষ্ট করল। আমি গাড়ি থামিয়ে সাইন বোর্ডটির একটা ছবি তুললাম। আমার ছবি তোলা দেখে ড্রাইভার হাসল। বলল, স্যার, ছবি থেকে ছবি না তুলে পাহাড়ে গিয়ে আসল মানুষের ছবি তোলেন। তাতে আপনাকে কেউ বাধা দেবে না।

meghla (8).JPG
মেঘলা

আমি মনে মনে বললাম, তা করতে পারলে ভাল হত। কিন্তু আমার হাতে সময় এবং সুযোগ কোনোটাই নেই।

meghla (1).JPG
চিম্বুকের পথে পাহাড়ের ভেতর প্রবাহিত শঙ্খ নদী

আমি টিকেট কেটে মেঘলায় ঢুকে পড়লাম। প্রথম দেখায় মনে হল মেঘলা আগের মতই আছে। তার কোথাও একটুও সৌন্দর্যহানি ঘটেনি। সরকারও বাড়তি কোনো যত্ন নেয়নি। শুধু একটা কেবল কারের ব্যবস্থা করে দিয়ে দুটি পাহাড়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। মন্দ কী, কিছু একটা তো করেছে। পাহাড়ি মেয়েরা কয়েকটি টং দোকান দিয়ে বসেছে। সেখানে কিছু পাহাড়ি ফল বিক্রি করছে তারা। ফলের মধ্যে আছে ডাব, জাম্বুরা, পেয়ারা, পেঁপে, তেতুল এবং কিছু আচার। পর্যটন এলাকার ভেতর বলে এখানে দাম একটু বেশি। তবে ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম শহরের মত নয়। আমার তৃষ্ণা পেয়েছিল। আমি বিশ টাকায় একটা ডাব কিনে খেলাম।

তারপর পুরো মেঘলা পর্যটন এলাকাটি একটা চক্কর দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এছাড়া আমার উপায় ছিল না। আমাকে আবার কক্সবাজার ছুটতে হবে।

meghla (6).JPG ………
মেঘলা
…….
গেটের বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে অটো রিকশা পেয়ে গেলাম। কোনো রকম দরদাম না করে একটাতে উঠে পড়লাম। গফুরকে ফোন করে দিলাম হোটেলে থাকিস। আমি এখুনি আসছি।

খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমি গফুরের হোটেলের সামনে গিয়ে নামলাম। আগে থেকে আমার জিনিসপত্র গুছানো ছিল। গফুর বলল, সারাদিন তো এ্যান কিছু ন খস। চারগুয়া ভাত খাই ল। (সারাদিন তো তেমন কিছু খাসনি। চারটে ভাত খেয়ে নে।)

আমি না করলাম না। পেটে একরকম খিদে অনুভব করছিলাম। বয় টেবিলে খাবার এনে দিলে তাড়াহুড়ো করে চারটে খেয়ে নিলাম। আমি যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলাম গফুরের ছোট ভাই তাহের একটা চটের ব্যাগ ধরিয়ে দিল। আমি বললাম, এত বড় ব্যাগ কেয়া? (এত বড় ব্যাগ কেন?)

সে বলল, ব্যাগের ভিতর অনর কঁইয়া আছে। আর ওগ্যা কন্নাল, এক কেজি জলপাই, আর দুই কেজি বিনি চইল। (ব্যাগের ভেতর আপনার পেঁপে আছে। আর একটা জাম্বুরা, এক কেজি জলপাই এবং দু’ কেজি বিন্নি চাল।)

meghla (5).JPG……..
মেঘলা
…….
এত বড় একটা ব্যাগ বহন করে নিয়ে যেতে হবে, আমি মন থেকে সায় পাচ্ছিলাম না। কিন্তু উপায়ও ছিল না। ভালবেসে কেউ কিছু দিলে তার তো একটা দাম আছে। সুতরাং তাকে না বলি কী করে। তাহের একটা রিকশা ডেকে ব্যাগটা উঠিয়ে দিল। ঘড়ির দিকে তাকালাম, প্রায় পাঁচটা বাজে। আর দেরি নয়। সবার কাছে বিদায় নিয়ে আমি রিকশায় চড়ে বসলাম।

পরিশিষ্ট
সম্প্রতি আমি আমার অফিসের কাজে চকরিয়া গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে ছিল তিন তরুণ–সাজ্জাদ, সুজন এবং মহিদুল। সাজ্জাদ বলল, এখানে খুব কাছে একটা ট্যুরিস্ট স্পট আছে। আমাদের কর্মস্থল থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার। বাসে যাওয়া যায়। জায়গাটার নাম মিরিঞ্জা, বান্দরবানের লামা থানায়। আপনি যদি অনুমতি দেন অবসর সময়ে আমরা জায়গাটা দেখে আসতে চাই।

আমি বললাম, ওই জায়গা সম্পর্কে কারও ধারণা আছে?

সাজ্জাদ বলল, আমার একবার যাবার সুযোগ হয়েছিল। খুব সুন্দর জায়গা।

আমি বললাম, আপনারা একা যাবেন কেন, আমাকেও নিয়ে যাবেন?

একদিন আমরা বাসে করে বিস্তীর্ণ রাবার বাগান পাড়ি দিয়ে মিরিঞ্জায় চলে গেলাম। অপূর্ব এক সুন্দর জায়গা। এ জায়গাটি মেঘলার চে’ কোনো অংশে কম নয়। যেহেতু আমি মিরিঞ্জাকে মেঘলার সঙ্গে তুলনা করলাম তার আর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন বোধ করছি না। অনেকে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে সাফারি পার্ক দেখতে যান, তাদের বলি, আপনারা একই সঙ্গে মিরিঞ্জা ঘুরে আসতে পারেন। এতে আপনার কষ্টের চে’ আনন্দের পাল্লা ভারি হবে বলে আমার বিশ্বাস।

(শেষ)


বান্দরবান ও ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ছবি
(বড় আকারে দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন।)

—–

লেখকের অন্য রচনা
ছফামৃত (ধারাবাহিক রচনা)
সেন্টমার্টিন: দইরগার চরত বেরাই টেরাই হনো মজা ন পাইবা…
কক্সবাজার: হক্কল জাগা পুরি খাইলাম ন পাইলাম চাডিয়ার নান!
সিলেটে
সুন্দরবন: এক সবুজ বস্ত্রখণ্ড!

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: নূরুল আনোয়ার
ইমেইল: nurulanwar1@gmail.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters


2 Responses

  1. মায়মুনা তাসনিম says:

    খুব খুব ভালো লেগেছে… ভীষণ গোছানো আর সাবলীল লেখা…

  2. MITU says:

    ফরিদকে আরও কিছু টাকা বেশি দিতে পারতেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.