গল্প

বৃত্তের ভেতরে

nahar_monica | 24 Sep , 2011  

ঘন হয়ে আসা সন্ধ্যার দিকে শুভ্রা হারিয়ে যাবে আর তারপর তাকে খোঁজা শুরু হবে, না খুঁজে পেয়ে কেউ কেউ তাকে ঘিরে স্মৃতি আউড়ে যাবে–এটাই স্বাভাবিক। বিষয়টা নতুন তো না, যেবার এমনকি মাইকিংও করতে হয়েছিল, রিক্সা কায়ক্লেশে চলছিল আর খলিল চাচার ফ্যাশফ্যাশে ঘোষক কণ্ঠ ইকো হয়ে ছড়িয়ে ছড়িয়ে ঢুকে যাচ্ছিল খোলা বাড়িগুলোর দরজা জানলা দিয়ে, মোড়ের কাঠাল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ওপরে উঠে নেমে আসছিল চারপাশে–‘…নয় বছরের একটি মেয়ে হারিয়ে গেছে, তার পরনে ফিকে হলুদ রঙ্গের জামা…’ ইত্যাদি। দিন পার হয়ে সন্ধ্যা না হলে হয়তো হারানো বিজ্ঞপ্তি দরকার হতো না। শুভ্রা নিজেই হয়তো ফিরছিল, তখন ফিরলো ঘোষণা শুনে, মাথা নিচু, পনিটেল আলগা হয়ে যাওয়া রিবন, ফিরতে চাওয়ার অনিচ্ছা মাখা দৃষ্টি (ফিরতে তো হতোই, তার পরও ফেরা মানেই কি সত্যি সত্যি ফেরা?… ভেসে যাচ্ছিল ভেসে তো যেতোই, মনে না করিয়ে দিলে…)। খুঁজে পাওয়া গেছে, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে ভাসা ভাসা ধারণা হয়েছে যে হারানোর কেতা-কায়দা ভালোই রপ্ত করেছে সে। ফলাফল–সে সময়ে যে কয়েকবার সে হারিয়েছিল তেমন না খুঁজলেও সবাই (ওদের বাড়ির বাইরের লোকজন) তক্কে তক্কে থাকতো সে কখন ফেরে আর কোথায় তাকে খুঁজে পাওয়া গেল! হারিয়ে যাওয়াকে বিশেষ মাত্রা দেয়ার চেষ্টা ছিল ওর, সেজন্যেই হয়তো প্রতিবার নিপাত্তা হবার পর লোকজন অন্যান্য কাজের মধ্যেও ধর্মানুশাসনের মত গৎ বাঁধা নিয়মে, অন্যমনস্ক হয়ে ওকে খোঁজে। পালা করে একজন, দুজন, কোনো না কোনো ভাবে অলিখিত দায়ভারের মত দায়িত্বশীল হয়। এই অন্বেষণ ঘিরে জমে ওঠে ক্ষীরসার মত কৌতূহল, খবরের, গরম গরম গসিপের দিকে ঘন ভিড়ের আবেশে জমে যেতে চায় সবগুলো বিকেল, বিকেলের শেষ বেগুনি রস্মি। কৌতূহল বস্তুটা বলক ওঠা ডালের মত, একবার যদি ঠিক ঠাক আগুনের আঁচ পেলো, উথলালো তো উথলালোই, তারপর একসময় বেতালে শরীর ছেড়ে দিয়ে মিশে যাবে সন্নিহিত তরলে। আর চারপাশের লোকজন কি এমন মহাপুরুষ, সাধু সন্ন্যাসী যে শুভ্রার খবর জানতে আগ্রহ হবে না? তা না হলে কি ভাত হজম হয়? তাদেরকে অবশ্য দীর্ঘ সময় ধরে ভাত হজমের আনন্দবঞ্চিত হয়ে থাকতে হয় না। শুভ্রার থাকা না থাকার গল্প হ্যামস্টারের স্মৃতিশক্তির মত ঘন ঘন হারায়, তারপর ফিরে আসে ‘থেকেও নেই, না থেকেও আছি’র মত।

কথাটা শুনতে কেমন শোনালেও সেই প্রথমবার থেকে অনেকগুলো দিন প্রকৃতি থেকে খসে গেছে (তারা খসার দিনই তো তখন), এখন ‘শুভ্রা’ ভাবলে বেশ একটা সোমত্ত মেয়ের চেহারা চোখে ভাসাই স্বাভাবিক। অথচ সে থেকে থেকে হারিয়ে যায়! আসলে হয়তো হারিয়ে ঠিক যায় না, যথাযথ উপস্থিতির নিষ্ক্রিয়তা তাকে অদৃশ্য করে রাখে। শেষবার যখন তাকে দেখা যায়, তখন সে ভর যুবতী মানে একেবারে মাস্টারস পড়া। এমন মেয়ে হারিয়ে গিয়েছে শুনলে বাবলা গাছে কাঁটার মত রকম ভোতা-চোখা কাহিনী মুখ উঁচিয়ে থাকে! অথচ সবাই ততদিনে জানে যে শুভ্রা ইচ্ছে করে নিজে নিজেই নিজেকে বেপাত্তা করে ফেলে। কিন্তু কেন করে?

হারানো বিজ্ঞপ্তি ছাপানোর আগের দিনে ক্লাস ফাইভে পড়া শুভ্রাকে একা একটা রেল স্টেশনে দেখা গিয়েছিল, তারো আগের দিন এই স্টেশনে রাষ্ট্রপতির পদার্পণ ঘটেছিল, এলাকার ফুলের মত প্রাক-কিশোরী হবার সুবিধে পেয়ে সে লোকে লোকারণ্য (আশপাশের বাড়ির ছাদেও লোক, এইসব উৎসাহীদের ডাকনাম জনগণ) রেল স্টেশনে অস্থায়ী স্টেজে রাষ্ট্রপতির গলায় ফুলের মালা দিয়ে ত্রিশ সেকেন্ড তার কোলে বসে নেমে এসেছে। তার পরনে শাদা সিল্কের ফ্রক, ফ্রিলে লেস লাগানো (ঢাকায় থাকা বড় ফুপুর কলকাতা বেড়াতে গিয়ে আনা উপহার), কালো চোখা মাথা কালি ঘষা জুতো, হাঁটু অব্ধি শাদা মোজা। চুলে শাদা সিল্কের ফিতে বেঁধে ঝুটি। কে বেঁধে দেয়? মায়ের ঘ্যানঘ্যানে অসুখ, সারাদিন শুয়ে থাকে, চুল বাঁধবে কখন? চুল বেঁধে দেয় শামীম আন্টি। শামীম আন্টি পাশের বাড়ি, ইটের দেয়াল, বড় জানালায় বিষণ্ন সুন্দর মুখ, মায়াময় চোখ আর মিহিদানা কণ্ঠস্বর। মাঝে মধ্যে উঠানে মোড়ায় বই পাঠ। শামীম আন্টি ইতিহাসে অনার্স (সাবসিডিয়ারী ইংলিশ–যেটা খুব কমন না কিন্তু), শামীম আন্টি পাশের বাড়ির প্রিন্সিপাল চাচার ছোট ভাইয়ের বৌ। শামীম আন্টি ভোরবেলা মর্নিং ওয়াক। শুভ্রার দুবলা স্বাস্থ্য আর সকালগুলি খালি ঘুম ঘুম, উঠতে উঠতে সাতটা সাড়ে সাতটা, ছুটির দিনে সাড়ে আটেও ঠেকে। মা তাকে ঠেলে নিতে শামীম আন্টিকে অনুমতি দিয়েছে, মেয়ে অন্তত নিজের মত রোগের আখড়া না হোক। শামীম আন্টি অতএব অবারিত ঠেলা ধাক্কা–‘ওঠরে, মুখ ধোওরে, জামা পাল্টাওরে’ এত মিহিন ডাক যে শুভ্রার আবার ঘুম পায়। স্বামীর ক্যাডেট কলেজ, স্বামীর আর্মি ব্যাকগ্রাউন্ড হলেই কি বিস্তর রেজিমেন্টাল হতে হয়! ডিসিপ্লিনড! (শাড়ি কখনোই আলু থালু না, চুলে ক্লিপ, বই পড়ার সময় আইসক্রিমের কাঠি দিয়ে পেইজ মার্কার, পাতা ভাঁজ করবে না)। সে যখন ক্যান্টনমেন্টে বাস করেছিল, সুতরাং তখন সে এই রকম প্রেসিডেন্টদের কত বৌকে (কত প্রেসিডেন্টের এরকম বৌদেরকে) দেখেছে! তাদের ময়দা মাখা গায়ের রং, তাদের চর্চিত চুল আর তাদের মোহিত করা চাহনি, খালি সাজগোজ, খালি শরীর স্বাস্থ্যের গল্প। শামীম আন্টির নিজেরও তাই, মনে হয়েছে–এই করার জন্যই জন্ম। কিন্তু এখন তার (তিন বছর আগে ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে আসার পর) ঘোরতর অপছন্দ যে শুভ্রা এই প্রেসিডেন্টকে মালা দেয়, বলে এই প্রেসিডেন্ট আর্মি, আর আর্মি মানেই অপরচুনিস্ট। অপরচুনিস্ট মানেই কি খারাপ? না, তবে, শামীম আন্টি আর্মি’র ইংরেজী বানান থেকে এভ্রেভিয়েশন করে- A ফর এ্যাটাক, R ফর রুল, M ফর মিসেপ্রিহ্যানশন, আর লাস্ট বাট নট দ্য লিষ্ট Y এর কাঁধে চড়ে তারা ইয়েট টু ডু, ইয়েট টু সি (আয় বাবা দেখে যা, দুটো সাপ রেখে যা)’ এর লম্বা তালিকা ক্রমশ ছোট করে। কে তাদেরকে অপরচুনিস্ট বানায়? শামীম আন্টির মিন মিন করা, আত্মমগ্ন দীর্ঘ একটা বক্তব্য থাকে। শুভ্রার তখন চিল্ড্রেন কালেকশন’স ডারউইনের বই থেকে ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ এর স্টোরি পড়া হয়ে গেছে। টিভিতে ‘টারজান’ সিরিজটাও দেখে ফেলেছে। শামীম আন্টির গল্পটা এই সবের সঙ্গে মেলাতে না পেরে তার দেখা শেষ মুভি ‘বেবি’জ ডে আউট’ (শামীম আন্টির রেকমেন্ডেশন) এর সঙ্গে যোগসূত্র বের করে। ইতস্তত বাড়িঘর পার হয়ে স্কুলের মাঠের (সেখানে তারা মৃদুলয় ঘূর্ণির মত হাঁটে) দিকে যেতে যেতে তার মনে হয় শামীম আন্টির প্রতিপক্ষ সেই চোর দুটো যারা সিনেমায় শিশুটিকে কিডন্যাপ করে নিজেরাই যত্রতত্র নাজেহাল হচ্ছিল। সেনা অফিসারের সঙ্গে যার বিয়ে হয়েছিল, আর যে জানতো সব অফিসাররা নিজেদের আত্মীয়, ভাই ভাই। আর্মি শব্দের ইংরেজী বানানের এই এভ্রেভিয়েশনগুলি আগে কেন জানে নাই? এইসব মস্তিষ্ক আলোড়নকারী প্রশ্ন তার মনে আসে না। কিন্তু একজন আর্মি অফিসার প্রেসিডেন্ট হয়ে শামীম আন্টির স্বামীকে ফাঁসি দিয়ে মেরে ফেলেছে, পাবনা নাকি কুমিল্লা জেলে কেউ জানে না। শুধু এক মহা বৈশাখের বৃষ্টির মধ্যে তার লাশ এসেছে, কাঠের কফিনে। কয়েকটা লোক ভিজে ভিজে হাতুড়ি বাটাল দিয়ে কাঠের বাক্সের পেরেক ঠুকে ঠুকে খুলছিল। শামীম আন্টি তার স্বামীর লাশ দেখতে চায় নাই, তারপরও তার ক্রন্দসী দু বাহু টেনে কফিনের কাছে নিয়ে গেছে আত্মীয়স্বজনেরা। ততক্ষণে বৃষ্টি ধরে গিয়েছে। কালো মেঘ ভাগ করে একফালি নরম রোদের আলোয় কাফনের কাপড় খুলে মাথা আর মুখ উন্মুক্ত করলে প্রথমেই চোখে পড়ে বাঁ গালের ওপরে আঁচিলটা কে যেন টেনে তুলে ফেলেছে, গালের মাংশের গোলাপী রং মাঝখানে রেখে চারপাশ কালো যেমনটা রুটি, বিস্কুট ইত্যাদি পুড়ে গেলে হয়। মাথার ঘন চুল ছিঁড়ে তুলে ফেলা দেখে মনে হয় কেউ একজন ভীষণ তাড়াহুড়োয় রাতের অন্ধকারে পাকা ধানের ক্ষেতের ধান কেটে গেছে, সব নেয়ার ইচ্ছে থাকলেও উপায় হয়নি। শামীম আন্টির কি আর হুশ ছিল অত কিছু খুঁটিয়ে মিটিয়ে দেখার? তার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল গলার কাছে শাদা কাপড় টেনে সরিয়ে দেখে কত গভীর দড়ির দাগ, কত বেআক্কেলে নিষ্ঠুরতায় কেটে নিয়ে গেছে তার স্বামীর শ্বাস নেয়ার প্রাকৃতিক স্বাধীনতা!

শামীম আন্টি ইতিহাসের বইয়ের পাতার ভেতর তার স্বামীকে দেখতে পেয়েছে–পরাজিত, দুর্বল, আর সেই পলাতক অংশভাক যেখানে কোন বিজয়গাঁথা লেখা থাকে না। শুধু এই প্রেসিডেন্ট, হাজার খানেক ভ্রাতৃহন্তার (সেনারা কি ভাই ভাই?) দায় নিতে রাজী কিন্তু নিজের পথে কোনো মতদ্বৈততা দেখতে রাজী না (এ কি সম্রাট অশোক? একশত ভ্রাতাকে হত্যা করিয়া সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন!)।

“কী চেয়েছিল? একসঙ্গে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলেও…” শামীম আণ্টি রাবার ব্যান্ড দিয়ে শুভ্রার চুলের গোড়ায় শক্ত বাঁধন দিতে দিতে কঠিন কঠিন শব্দ দিয়ে সংলাপ বলে (একই রকম মিন মিন), বলে,‘স্বাধীনতা পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ’… বলে,‘ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’,… বলে, ‘কোর্ট মার্শাল’, বলে, ভুল বিচার, বিচার না আসলে খুন… এই ঠাণ্ডা মাথার খুনের বিচার কেন কেউ চায় না, কেন কেউ মিছিল করে মরে যায় না?… শামীম আন্টি দীর্ঘ নিঃশ্বাস, শামীম আন্টি সংক্ষেপে আত্মমগ্ন উপসংহার,–“আসলে পৃথিবী কিছুই বদলায় নাই, সেই প্রাচীনকালে মানুষ তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করতো, এখন বোমা মারে। মানুষের হিংসা বদলায় নাই, চক্রান্ত বদলায় নাই, লোভ বদলায় নাই… খালি ভালোবাসা বদলে গেছে।”

শামীম আন্টির ইচ্ছে করে রাষ্ট্রপতির জন্য তৈরি করা অস্থায়ী হেলি-প্যাডে লাল মরিচগুড়ো ছড়িয়ে রাখে যেন সানগ্লাসের ফোঁকর গলেও তার চোখ জ্বলে জ্বলে অন্ধ হয়ে যায়, তার গাড়ির চাকা আটকে থাকুক কাদায় যেন হাজার মানুষ ঠেলেও সরাতে না পারে। এর মানে–অভিশাপ দেওয়া, শুভ্রা জানে। কিন্তু অভিশাপ যে ফলে না সেটাও তখন তার জানা হয়ে গেছে। তাদের স’মিলের লেবারদের পোলাপানগুলি বাড়িতে ঢোকার মুখে হেগেমুতে রাখলে তার দাদী বেখেয়ালে পা দিয়ে ফেললে বিরক্ত হয়ে অভিশাপ দেয়–কুষ্ঠ হবে, নির্বংশ হবি! কই, কেউ কি হয়? হয়তো না-ই উপরন্ত ওদের বৌরা বছর বছর বাচ্চা বিয়ায়। অভিশাপ কার্যকর হবে কিনা জানতে চাইলে দাদী হাসে, “আরে আমি হইতেছি বাঁশের চেয়ে কঞ্চির জোর বেশি কিসিমের মানুষ, আউট্টা দিয়া বেকা চাপ দিলেই মট কইরা ভাইঙ্গা যাই, বুড়া মাইনষের কোন কথায়ই কোন কাজ হয় না।” তো শুভ্রার জানা হয়ে গেল অভিশাপের গাছে কোনদিন ফল ধরে না, যদি কস্মিন কালে ধরেও তা হবে কুকড়ে যাওয়া কাঠালের মত।

শামীম আন্টি অত কিছু বলে না, কিন্তু স্বামীর লাশ দেখার পর থেকে তার গলার কাছে প্রায়ই দম আটকে থাকে। শুভ্রার বাবা আর শামীম আন্টির বড় ভাই (সরকারী মহিলা কলেজের প্রিন্সিপাল) দুজনে মিলে টাউন হলে ব্রীজ খেলতে গেলে ট্রিটমেন্ট করার বিষয় নিয়ে গল্প-সল্প করে, খাই-খরচ এস্টিমেট করে, কিন্তু এই রোগ নাকি সারে না। দম আটকে শামীম আন্টি নীলবর্ণ হয়ে যায়, তাকে মৃতপ্রায় মনে করে যখন সবাই (প্রিন্সিপাল চাচার বৌ একটু কম কাঁদে, আড়ালে কপাল কুঁচকে বিরক্ত হয়, তার ননদ দেখতে ভালো বলে তার এমনিই ভালো লাগে না, তায় স্বামীখাকী, তায় রোগ!) যখন কাঁদতে বসে তখন মনে হয় আকাশের গভীর কোনো কোণ থেকে ডুব দিয়ে হঠাৎ পৃথিবীতে নেমে আসে শামীম আন্টি, বিহবল চোখে অচেনা দৃষ্টি আর সারা শরীর ঘামে জবজবে। শুভ্রার মনে হয় শামীম আন্টিকে ঘিরে তাদের দিন রাত্রি আবর্তিত হচ্ছে–যখন সে নীলবর্ণ ধারণ করে না তখন সবাই আতঙ্কে থাকে কখন জানি করবে? আর যখন তার দাঁতে খিল তখন সবাই তার ভালো হবার অপেক্ষা করে। তবে রূপকথার জীবনে ঢুকে পড়ার সুযোগ পায় শামীম আন্টি। তাকে এই দুঃসহ অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে একদম রাজপুত্র হাজির, আমেরিকায় গ্রীন কার্ড হোল্ডার। হোক না তার আগের বউ চলে গেছে, সে রকম ধরলে শামীম আন্টিও বিধবা। স্বামীর ফাঁসি হয়েছে এমন মেয়েকে, ছি! কেউ বিয়ে করতে চায়? নিদেনপক্ষে সুবিধা হলো–এই রাজপুত্র শামীম আন্টির স্বামীর স্কুলে পড়তো, ক্লাশমেট। মুক্তিযুদ্ধে এক সেক্টরে একসাথে যুদ্ধ করেছে। আর সবচেয়ে যে কারণে শামীম আন্টিও নিমরাজী (আসলে রাজী না, সকালে হাঁটতে বেরিয়ে মাঠের শিরিষ গাছের নিচে বসে শাড়ির চোরকাটা ছাড়াতে ছাড়াতে শুভ্রাকে বলেছে–‘পালিয়ে বাঁচা’)। আর শুভ্রার মনে হয়–আমেরিকায় অনেক রকম রেস্টুরেন্ট আছে, ঘোরাফেরা করা যায়, শামীম আন্টি শুভ্রাকে কাঁটা চামচ দিয়ে খেতে শিখিয়েছে। আর ওখানে নাকি সব রোগের চিকিৎসা আছে, স…অ…অ…ব রোগ, এমনকি দম আটকে গেলেও ডাক্তাররা মুখের মধ্যে মুখ নিয়ে ফু দিয়ে দম ফিরিয়ে আনতে পারে! মুখের মধ্যে মুখ নিয়ে? ওয়াক! শুভ্রার ভাবতেই বাজে লাগে। গত বছরই তো, সে খেলছিল, একা একা। বাসার সামনে ফেলে রাখা এলোমেলো এক কাঠের গুড়ির ওপর থেকে লাফ দিয়ে নিচে নেমে আবার একদমে হাইজাম্পের প্র্যাক্টিসটা থামিয়ে তাকে খলিল চাচা ডাক দিল ভেতরে তক্তাভর্তি গুমোট অফিস ঘরে। চাচা তাকে গল্প শোনালো, চকলেট দিলো, তারপর আদর করে কোলে নিয়ে গালে চুমু খেতে খেতে মুখের মধ্যে জিভ পুরে দিলো, ওয়াক! কী বিশ্রী গন্ধ! কয়লা দিয়ে দাঁত মাজে তো! শুভ্রা ঠাস ধাক্কা দিয়ে তাকে ফেলে দিয়েছে। একটু পরে বাবা ফিরলে খলিল চাচা হেসে হেসে শুভ্রার আগেই নালিশ করে দিলো! আর বাবা তার মেয়েকে বাদ দিয়ে ম্যানেজারকে বিশ্বাস করলো!–“ছি, মা বড়রা আদর করলে এমন করতে হয় না”… শুভ্রারও তখন মরিচ গুলে খলিল চাচার গায়ে ঢেলে দিতে ইচ্ছে হয় (হ্যাহ্ বলেছে এমন করতে হয় না)।

শুভ্রাদের কাঠ চেরাইয়ের কলে তখন ঝঅ শোঁ, ঝঅ শোঁ শব্দের মধ্যে বড় বড় গাছের গুড়িগুলো দুই, তিন, শতভাগ হয়ে যায়। পেছনে ওদের সাবেকি কাঠের বাড়ির বারান্দাতক কাঠের গুড়ো বিছানো পথ। মাটি না, কাঠের গুড়ো উজিয়ে মৌসুমী ফুল-পাতা লক লক করে, মনে হয় গাছেদের মাটি দরকার নাই, দরকার শুধু অ-জলজ বৃক্ষ কর্তিত বাড়তি আস্তরের, যা কখনোই মাটির সঙ্গে মিশে যাবে না। কিন্তু যায়, হলুদ বাদামি সেই কাষ্ঠচূর্ণ ম্রিয়মাণ হয়ে মাটিতে মিশে যায় বর্ষার শেষে। শীতের শুরুতে কাঠের গুড়ো সরিয়ে মৌসুমী ফুলের গাছ বুনে দিয়ে আবার গোড়া ঢেকে দেয় স’মিলের লেবাররা। বিলাসিতা ঐটুকু, যা বাইরে থেকে দেখা যায়। বাইরের রাস্তা থেকে ঢুকলে প্রথমে শামীম আন্টিদের উঠান দেখা যায়, কালো মেঘের টাল দলছুট হয়ে গেলে আকাশে যেমন এক চিলতে রোদের ফাঁক তৈয়ার হয় তেমন মাপের। তাকে বসে থাকতেও দেখা যায় ইজি চেয়ারে, যেখানে সাধারণত বুড়ো ধরনের মানুষদের বসে বসে ঝিমোনোর কথা, সেখানে ফাঁসিতে লটকে মরার বিধবার ফর্সা হাতকাটা বাহু (কোর্ট মার্শালে শাস্তি পেয়ে মরে যাওয়ার পর আর্মিরা সিভিলিয়ান হয়ে যায়?) দেখা যায় রাস্তার ওপার থেকেও। শামীম আন্টি বাইরে গেলে সিনেমার মত সানগ্লাস, হলিউড নাকি বলিউড বোঝা যায় না। চোখ ঢেকে রাখে বলে লোকজনের খুব রাগ! বলে–দেমাগ (মুখ পুরোটা ঢেকে রাখলে বোধহয় রাগ কম হতো!)।

শামীম আন্টির ভোরে ফিস ফিস ডাক শুনে শুভ্রা ওঠে। আগের দিনের পরা ফ্রকটাই ঘটঘটিয়ে গায়ে চাপায়। তারপর রেল স্টেশনে যায়। আজকে শামীম আন্টি মুখ ঢেকেছে, নেকাব, কালো পাতলা শিফনের ওপরে আরেক পাল্লা শিফন, যেন আজকে থেকে সে একটা যৌথ-চরিত্র নিজের মধ্যে ধারণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পুরো সকাল শুভ্রাকে নিয়ে ওয়েটিং রুমের কোনায় বসে থাকলো। পরনের কাপড়ে কুচকে থাকা জায়গাগুলো টেনে টেনে সমান করলো। ফেরিওলা ডেকে পুরো এক ডজন কমলা কিনে খেলো দুজনে মিলে। শুভ্রা তখন পালিয়ে থাকার মজা পেয়ে গেছে। শামীম আন্টি গুন গুনিয়ে… ‘চিত্ত আমার হারালো আজ মেঘের মাঝখানে…’ গাইতে গাইতে ট্রেন এসে গেলে সে একটা কম্পার্টমেন্টে উঠে শুভ্রাকে প্ল্যাটফর্মে দাঁড় করিয়ে রাখলো! শুভ্রা তো তখন তখনই বাড়ি ফিরতে পারতো, কিন্তু তা না করে সারাদিন কোথায় ছিল সে? সন্ধ্যাবেলার সেই ‘একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি’ শোনার আগপর্যন্ত কী করলো!

স্কুলে গেলে শুভ্রার অপার স্বাধীনতা। রোদের দিকে পেছন ফিরে সে তখন সেই ইজি চেয়ারে বসে। লম্বা কাঠের হাতলে চায়ের মগ, আর ইংরেজী বই। সাই-ফাই থ্রিলারের ভক্ত শামীম আন্টির অনুপস্থিতিতে দানছত্র ছাড়াই এই গোয়েন্দা কাহিনীর ট্রেজার তার হয়ে গেছে। ইংরেজি ঘষামাজা হচ্ছে দেখে বড়রাও তাকে কিছু বলে টলে না (ততদিনে সে বড় হয়ে গেছে, ফ্রক আর চলে না, দর্জি দোকানে সালোয়ারের মাপ দেয়া আছে)। এইসব পড়ে পড়েই ওর কোন ভিন-গ্রহে (মেঘের মাঝখানে) হারিয়ে যাওয়ার শখ তৈরি হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট কিন্তু তাকে কোলে বসিয়ে কপালে চুমু খেয়েছিল। কী সুন্দর গন্ধ প্রেসিডেন্টের গায়ে, আফটার শেইভের পুরুষ পুরুষ ঘ্রাণ। বড় হয়ে কাকে বিয়ে করবে তা বলতে লজ্জা পাবার বয়স এসে গেলেও শুভ্রার মনে হয় কেউ জানতে চাইলে সে বলবে–রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতির কোলে তার ছবি তখন লোকাল পত্রিকার পাতায়। শুভ্রার বাবা খুশীতে বাগবাগ। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে গাছ কাটার পারমিট পেতে এই ছবি কাজে লাগবে? শুভ্রা ছবিটা কেটে তার ক্লাসের বইতে রেখে দেয়, ওপরের ক্লাসে উঠলে আগের বই থেকে ছবিটা বের করে নতুন বইতে রাখে, তারপর সেটা পাঠ্য বইয়ের বাইরে অন্য বইতে চালান হয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট তার সঙ্গেই থাকে। একদিন, ইজিচেয়ারের হাতল থেকে হাতের বই কোনো কাকতালীয় ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বারান্দার রেলিং ভেদ করে পড়ে গেলে ছবিটা পাতা ভেদ করে উড়ে যায়। শুভ্রা কয়েক ধাপ বারান্দার সিঁড়ি লাফিয়ে নেমে বাড়ির পুবদিকে আসে। এদিকটায় মিস্ত্রিদের ঘর, খালি পায়ের পাতা ভিজে যায় অবেলার থেমে যাওয়া বৃষ্টির পানিতে। চেরাই কাঠ জোড়া দিয়ে বানানো খুপরি ঘরের ফাঁকা ফাঁকা বেড়া। মেঘলা বিকেলে জ্বলতে থাকা কুপির আলো ছটফটে কিশোরের মত বাইরে ছুটে বের হতে চায় আর শুভ্রার মসৃণ গালে কপালে ঝপাৎ করে পড়ে। টিপে টিপে পা ফেলার মধ্যে অন্যায় কী? বিশেষ করে নিজের বাড়ির চৌহদ্দিতে? ফোঁকর গলে অবাধ্য আলো জানান দেয় এটা তাদের স’মিলের মিস্ত্রী বোরহানের ঘর, অবাধ্য আলো বোরহানের কালো, সদ্য উপড়ানো বয়সী শেকড়ের মত পেশীময় শরীরের নিচে, বুকের নিচে চোখ বুজে থাকা নারীর শরীরটিকে দেখায়। খুব ধীরে বোরহানের ঠোঁট তার ঠোঁটে নেমে আসছে। অত ধীরে কি সত্যি আসে নাকি শুভ্রা ইংলিশ থ্রিলারের নায়ককে ঝটিতে এই খুপরির ভেতরে একটা কাউবয় হ্যাট দিয়ে মাথা ঢেকে নাভির নিচের চওড়া বেল্ট নিজের হাতে খুলে দিতে চায়। নিজেকে ফোঁকর থেকে বিচ্ছিন্ন করা সহজ হয় না তার পক্ষে, সে তখন উড গ্লু, নামকরা ব্র্যান্ডের আইকা। বোরহানের শরীরের ওঠানামা তাকে স্থাণু হবার নিশ্চয়তা দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখে। সেটাই তার প্র্যাক্টিক্যাল সেক্স এডুকেশন ক্লাশ (বেশি তাড়াতাড়ি! স্কুলে ক্লাশ টেন, ক্লাশের দু একজনের বিয়েও হয়ে গেলো!), এই ক্লাসে কেউ তাকে নিরাপত্তাহীনতার কথা, সেইফ পিরিয়ড শেখায় না। এ ক্লাশের শেষে শুভ্রার চিত্ত (প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর) মেঘের মাঝখানে। হারানোর জন্য এর চেয়ে বড় ওজর লাগে, আর সেই ওজর তার সামনে এসে দাঁড়াতে দীর্ঘ সময় নেয় না। জুটে গেল সিদ্দিক, ‘রেন্ট এ কার’-এর ব্যবসাদার, মফস্বলের কাউবয় সিনেমার রোমান্টিক নায়ক। অধরা কিছু একটা করতলগত করার পরিকল্পনা নিয়ে শুভ্রা তার সঙ্গে ঘোরে, এমন সব দিনে বেরোয় যেসব দিনকে কিশোর কুমার সোনার খাতায় লিখে রাখতে বলে। নির্জন রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে কড়কড়ে বিকেলের রোদে ডোবার পানিতে ম্লান জলজ ফুল দেখে অহেতুক কৌতূহলে ঝির ঝিরিয়ে হাসে। সে হাসি কতক্ষণ লেপ্টে থাকে শুভ্রার ঠোঁটে, তারপর জামা কাপড়ে গড়াগড়ি করে গাড়ির চাকায় আটকে যায়। ওহ! বলা হয়নি হাসলে চোরা টোলও পড়ে কিন্তু শুভ্রার গোলাপী আভা দেয়া গালের বাঁ পাশে।

সন্ধ্যাবেলা থিক থিকে হয়ে জমে ওঠার আগে আগে বাড়ি ফিরে সে তারপর ডায়েরি লিখতে বসে, বারান্দার ইজি চেয়ারটা দখল করে ফেলে শুভ্রা, তার শাদা পাতলা জামা কালো ওড়নায় ঢাকা থাকে। কেউ লুকিয়ে পড়ার চান্স নেই তবু দিনের কথা লিখে শেষ করেই তরুণীর হরিৎবর্ণ চম্পক অঙ্গুলী দিয়ে শুভ্রা তা কুটিপাটি করে ছিঁড়ে ফেলে। সিদ্দিক তাকে গাড়ির পেছনের সীটে চিৎ করে শোয়াতে চেয়েছিল। আর শুভ্রারও নিজেকে নোংরা মনে হয়নি। এসব কথা লিখে ছিঁড়ে ফেলাই সমুচিত মনে হয়েছে সে সময়ে। সময়–এই এক ব্রহ্মাস্ত্র, বাড়ির পাশের খালটার মত, স্রোতের মাথার দিকে শুরুতে টলটলে, পরিষ্কার, ইনোসেন্ট। তারপর যত লোকালয়ের কাছে আসতে থাকে ততই বিষ্ঠা, ময়লা কদর্যতা পানিতে মানানসই হয়ে ভাসতে থাকে আর পানির রঙ বদলে যায়। শুভ্রার সেই সময়ে আর এই সময়ে এমনই এক অহেতুক তুলনার তফাৎ। সে তখন ‘সাজিয়াছো যোগী বল কার লাগি?’, সে তখন ডায়েরি, মাই ডিয়ার ডায়েরিতে বাণী চিরন্তনী থেকে প্রেম-বিরহের লাইন লিখে লিখে শেষে কেউ দেখে, পাছে লোকে কিছু বলে ভেবে ছিঁড়ে ফেলে। তারপর কিছুদিন বাদে, যখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ তখন তার নাহি নাহি ভয়, দেখুক না। শুভ্রা চুরি তো করছে না। ততদিনে ইনোসেন্সে আরেক পরত রঙ চেপেছে, সে রঙয়ের নাম অল্পবিস্তর সাহস। সে সাহসে ভর করে শুভ্রা আরেকটা তেজী ঘোড়ায় চেপে বসে, যার নাম সিদ্দিকের ছো্টভাই, এয়ারফোর্সে সদ্য চান্স পাওয়া তরুণ অফিসার। সুগভীর গলায় সিদ্দিকের গাড়িতে ওর ভাইয়ের কাঁধে মাথা রেখে আবৃত্তি শোনে শুভ্রা।
বৃটিশ কাউন্সিলে শেক্সপীয়রের কিং লীয়র অভিনীত হচ্ছে। শুভ্রা কেউ না, তবু কেউ কেউদের একজন। সে ডিপার্টমেন্টের হয়ে টিকিট বিক্রি করে, অপরাজেয় বাংলার পায়ের কাছে বসে থাকে, মাথায় কিং লীয়ারের বিজ্ঞাপনের ফেট্টি বেঁধে প্রচার কাজ চালায়, আর্টস ফ্যাকাল্টির ছাত্রছাত্রীদের ডেকে শেক্সপীয়রের নাটকের মাহাত্ম্য আর সমসাময়িক উপযোগিতা বোঝায়। ওর চেষ্টাকৃত ইংরেজী উচ্চারণ আর হাস্যকর লাগে না ততদিনে, বরং আরেক পরত রঙ চাপলে একটা আভিজাত্যের আভা, যা থেকে শুভ্রা হাত উঁচিয়ে রিক্সা ডাকলে রিক্সাওয়ালা না করতে পারে না, প্যাডেল থেকে পা নামিয়ে ব্রেক চাপে আর ভাড়া নিয়ে সংশয়মুক্ত থাকে। সুতরাং বৃটিশ কাউন্সিলে পৌঁছাতে তার দেরি হয় না। সে স্টেজের পেছনে কিং লীয়রের কালো গাউন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। গুণীজনদের জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতার দিকে বেহুদা চেয়ে না থেকে সে আসলে তখন খুঁজে পায় কেভিনকে, উইংসের পাশে কালো টি-শার্ট আর জিন্স পরে নিজের লম্বা নাক স্টেজের বাইরে রাখার চেষ্টায় নিরত ভিনদেশী যুবক। নাকের ব্যাপারে শুভ্রার উন্নাসিকতা আছে, তার মনে হয় বুদ্ধিমান মানুষের প্রথম শর্ত খাড়া নাক। শুভ্রা তার টানা চোখের ওপর পাতায় ঘন কাজল টেনেছে বলে আরো পটলচেরা দেখায়, আর তার কেশবিন্যাসে বেলীফুলের ঘ্রাণ। কেভিন না পারতেই বুঝি নাকশুদ্ধ চোখ ঘোরায়, সে বৃটিশ কাউন্সিলের কম্যুনিকেশন অফিসার, তাও বেশিদিনের জন্য না, কারো রিপ্লেসমেন্টে এসে এই দেশটার আগপাশতলা জানার চেষ্টায় নিরত আছে। না, শুভ্রা প্রথম দিনই কেভিনের বাসায় যায় না। আসলে, সত্যি বলতে ওর কথাই বুঝতে পারে না অর্ধেকের বেশি। তারা আড়ং-এ কফি খায় পরের দিন। স্পোকেন ইংলিশ প্র্যাক্টিসের এই সুযোগ শুভ্রা কেমন করে ছাড়ে? খোদ শেক্সপীয়রের দেশের উচ্চারণ সহযোগে প্র্যাকটিস! কফিতে দুধ বেশি, চিনি বেশি দিয়েও তার তিতকুটে লাগে। কেভিন খায়, আর পুটুর পুটুর করে তার গ্রামের গল্প বলে, সেখানের বা-বা-ব্ল্যাক শিপ গড় গড়িয়ে আড়ং-এর কফিশপ-এর বড় কাচের জানালা দিয়ে নিচে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে নামে। সেখানে তার বাপ ঐ মফস্বল শহরের সিটি প্ল্যানিং করে তাকে ই-মেইল করে ডিজাইন পাঠায়, কেভিন তার প্রিন্ট আউট কপি শুভ্রাকে দেখায়। থোক থোক বাড়ি, বাড়ির পাশে চওড়া রাস্তা, উলটো দিকে পার্ক, পার্কে কত গাছপালা থাকলে কংক্রিটের সাথে পরিবেশের ভারসাম্য হবে, পার্কে কতজন শিশু খেলতে পারবে তার নিকেশ। শুভ্রা দুই রকমে রিয়্যাক্ট করে–এহ, ঢাকা শহরের গলি ঘুপচির মধ্যে এইসব পার্কের গল্পে রাগে তার গা জ্বলে যায় (ফর্সা ত্বক তো জ্বলে যাওয়ার জন্যই), ঢাকায় আসার পরে গা জ্বলে যাওয়া যদিও কমেছে, (কমেনি আসলে) সে গা জ্বলা ভাব লুকিয়ে ফেলতে পারছে। তবে অন দ্যা আদার হ্যান্ড এই পার্কের গল্প, নির্বিরোধী শান্ত পারিপার্শ্বিকের গল্পে সে তার ভবিষ্যৎ দেখার সুযোগ পায়। কেভিনের সঙ্গে সে তার শিশুপুত্রকে খেলতে পাঠিয়ে মনে মনে পেঁয়াজের স্যুপ বানাতে বসে যেতে পারে।

কিছুদিন যত্রতত্র দেখা গেলেও তারপর শুভ্রা ডুব দেয়। সে কেভিনকে দাবা খেলায় হারিয়ে দিলে তার স্যুপ বানানোর প্রক্রিয়া পাকাপাকি হয় নাকি সে এয়ারপোর্টের বদলে চাকরির খোঁজে দ্বিগবিদ্বিকে ছুটতে থাকে সে সম্পর্কে কেউ নিশ্চিত হয় না। একদিন ওকে দেখা যায় নামকরা সঙ্গীতশিল্পীর থার্টি-ফার্স্ট-নাইট পার্টিতে (হু লেট দ্যা ডগ আউট), ফিরোজা লং ড্রেস বাঁদিকে উরুর কাছাকাছি পর্যন্ত দু ভাগ হয়ে তারপর জোড়া লেগে গেছে। শুভ্রা মেরেকেটে পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি হলেও হতে পারে, কিন্তু আজকে আড়াই ইঞ্চি হিলে তার মধ্যে ‘বেহত্যরিন’ একটা মডেল মডেল ভাব এসেছে। এই হিন্দি (শব্দটা হিন্দি কি?) বিশেষণ ব্যবহার শুভ্রার একরকম অভ্যাসে পরিণত হয়, বলা দরকার কলেজ জীবনেই। সাইফাই থ্রিলার আর হিন্দি সিনেমা বস্ত্রালংকারের মত ঘিরে থেকেছে ওর দৈনিক রুটিন। যে তাকে আগে দেখেছে–আর এখন দেখলে–অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্রের প্রক্রিয়ায় অনায়াসে মফস্বল-ঢাকা-মুম্বাই-হলিউড এই ফর্মুলায় ফেলে দিয়ে লুকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলবে।

বেশ লম্বা এক বিরতির পর একদিন হঠাৎ পরিচিত সকলের এন্তার কৌতূহল সর্বাঙ্গে লেপ্টে শুভ্রার ছবি এক ইংরেজি দৈনিকের পাতায় দেখা গেল। উগান্ডায় তৈলসম্পদ আবিষ্কারের সংবাদের পাশে শুভ্রার ছবি! শাদা কালো, একা, একটা চেয়ারে বসে আছে। তার পরনে শাড়ি, আঁচল পিনে আটকানো। তার চোখে অস্পষ্ট হাসির ঝিলিক, ঠোঁটে বিষণ্ণতায় আঁচ করা আয়াসসাধ্য যে সে খুশী নাকি দুঃখে আছে। সে কোন পুরস্কার জিতেছে নাকি কোনো বিচিত্র কারণে গ্রেফতার হয় গেছে! তবে চেয়ারটার কৌলিন্য আর কৌণিক অবস্থান বিবেচনা করলে বোঝা যায় যে ঘরে অন্য কোনে প্রভাবশালী কেউ বড়সড় টেবিলে বসে থাকতে পারে, তার মাথার কাছে দামি তৈলচিত্র যেখানে তিনটি দুর্বোধ্য ঘোড়া ছুটে বেড়িয়ে যেতে চাইছে। আর শুভ্রার মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে শামীম আন্টির ছাপ, এত সুস্পষ্ট যে অনেকের হঠাৎ ধন্ধ হবে যে শামীম আন্টিই। ছাপার ভুল না ইচ্ছাকৃত কে জানে কিন্তু ছবিটার নিচে কোনো ক্যাপশন নাই।

—–

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: নাহার মনিকা
ইমেইল: naharmonica@gmail.com

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters


3 Responses

  1. ওয়াসিকুজ্জামান অনি says:

    পড়ে মুগ্ধ হলাম।

  2. kader says:

    অতি সন্তর্পণে একজন জনপ্রিয় সাবেক রাষ্ট্রপতির নামে কুৎসা রটানো হয়েছে লেখাটিতে। লেখকের দায়িত্ব খুবই বড়–ভুলে গেলে ভাল।

  3. afrin says:

    ভাল লেগেছে, শুরুতে শহীদুল জহির-ই গন্ধ পেলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.