গল্প

পানশালা কিংবা প্রেম থেকে পলায়ন:
যেভাবে আমি লেখক হয়ে পড়লাম

manosh | 16 Sep , 2011  

[নমস্য হে অকল্পনীয় পাত্রপাত্রী! তোমাদিগের উপস্থিতি সত্ত্বেও এই বন্তুপিণ্ডটিকে ফিকশন না বলে সোশ্যাল হিস্টরি বলে চালিয়ে দেয়া যাচ্ছে না]

ফোন বাজল ঠিক ৪টা ১৯ মিনিটে। ফোন না, সেল ফোন। আর বাজল বললাম বটে, কিন্তু বাজার কোনো সুযোগ সেটি পায় না। কণ্ঠরোধ করে রাখি আমি। ফলে পকেটের মধ্যে, কণ্ঠরোধহেতু, ভোঁৎ ভোঁৎ করে আওয়াজ করল। আমি ত্যারছা চোখে আমার সঙ্গিনীর দিকে তাকাই। এই ভোঁতভোঁতানি তাকে কিছুমাত্র আন্দোলিত করেছে বলে আমার মনে হলো না। ফলে আমি ভরসা বোধ করলাম। আবার এ কথাও মনে হলো যে সেল ফোনটা আমার শরীরে, মানে পোশাকে, সেঁটে আছে বলেই আমার কাছে এর ভোঁৎ ভোঁৎ বা ঘোঁৎ ঘোঁৎ যে তাৎপর্য বহন করে সেটা কিছুতেই তার কাছে বহনযোগ্য নয়। এসব ভাবতে ভাবতেই আমি পকেটে রাখা সেল ফোনটা বের করে সোফায় আমার পাশে রাখতে শুরু করলাম। কোনো এক কারণে এই সাধারণ স্থানান্তরের কাজটাও আমি ওভাবে ত্যারছা চোখে তাকিয়েই করতে থাকলাম। কেন যে এই ত্যারছামি আমার ভিতরে তখন জন্ম নিয়েছে তা আমি কিছুতেই এখন মনে করতে পারি না। এমনকি তখনও তা মনে পড়ছিল বলে আমার মনে হচ্ছে না। কিন্তু আমার এই ত্যারছামি সঙ্গিনী লক্ষ করলেন বলে মনে হলো। মানে তখন মনে হলো। এবং ভোঁৎ-ভোঁৎজনিত বিচলন বা বিরক্তি না হলেও ত্যারছামিতে তিনি হলেন। মানে তিনি বিরক্ত হলেন বলে তখন মনে হলো; কিংবা হয়তো এখন মনে হলো।

সেল ফোনটা কিন্তু ওভাবে বেজেই চলেছে। বা হয়তো বলা উচিৎ না-বেজে চলেছে। কখনো আমি গুণেছিলাম যে ওটা একেকবার, যদি অবশ্যই ফোনকারী নিজে থেকে কেটে না দেন, ১৪ বার বা ১৫ বার বাজে। ১৪ বার নাকি ১৫ বার? সেটা আর এখন মনে পড়ছে না। এমনকি তখনও মনে পড়ছিল না। তাছাড়া তখন আমি শুরু থেকে ভোঁৎ ভোঁৎ এর সংখ্যা গুণতেও শুরু করিনি। মাঝখান থেকে গুণে আর কী লাভ! এদিকে সোফায় রাখতে না রাখতে সেলের এই আওয়াজ অদ্ভুত বিদ্ঘুটে একটা অবস্থায় দাঁড়াল। প্ল্যাস্টিকের সংস্পর্শেই হয়তো। প্ল্যাস্টিকের সংস্পর্শে নানান বস্তুর গুণগত বদল হয়। হয়তো এজন্যেই প্ল্যাস্টিকের অনেক বিরোধী এখন। কিন্তু ওটা তো থামে না। কী ভয়ানক কথা! আচ্ছা এমন কি সম্ভব যে ফোনকারী একবারে কোন বিরতি ছাড়াই দুইবার চেষ্টা করলেন! তাহলে তো একবারে ৩০ বার কিংবা ২৮ বার ধরে বাজবে। বা না-বাজবে। কিন্তু তা কি সম্ভব! না হলে এতক্ষণ ধরে কীভাবে! আমি অনেক চিন্তাভাবনা করা সত্ত্বেও আবিষ্কার করলাম আমার ত্যারছামি থামল না। বরং সেটা এখন উল্টোপথে সেলের দিকে চলে গিয়েছে। আমার সঙ্গিনী বড়জোর ত্যারছামিতে বিরক্ত, কিংবা বিচলিত, হয়েছিলেন। এখন ত্যারছামি পথবদল করাতে তিনি কী করছেন বোঝার চেষ্টা না করেই আমি সেলের দিকে ত্যারছাই। একটা সুফল পাওয়া গেল। স্ক্রিনে নাম উঠল ফোনকারীর।

ফোনকারীর নাম না-জানা পর্যন্ত বিষয়টা নেহায়েৎ ইনসিডেন্টাল ছিল। এখন আর সেটা কিছুতেই ইনসিডেন্টাল নেই; বরং তার নাম জানা অবস্থায় ফোনটা না-ধরা আমার পক্ষে ইনটেনশনাল হতে হচ্ছে। এই ফোনকারীকে কোনো মুহূর্তেই আমি না-ধরতে চাই না। তিনি আমার আকাঙ্ক্ষিত জনের একজন, এসেক্সুয়্যাল যদিও। সম্পাদক ফোন করেই চলেছেন। কোনো এক জাদুতে তিনি বিরতিহীনভাবে আমার ফোন বাজাতে পারছেন, মানে না-বাজাতে, ভোঁৎ-ভোঁতাতে। এবং আমার অবিচল ত্যারছামি, বিহ্বলভাবে, ফোনের দিকে সোফার রেক্সিনে সেঁটে, সঙ্গিনীর একদম উল্টোপথে চলমান। এরকম অবস্থায়, যদিও বেশি কাল নয়, আমার মনে হলো অনন্ত এক কাল। সেলও ঘোঁৎঘোঁতায়, আমিও রেক্সিনমাখা সোফায় সেঁটে; এবং কিছুতেই আর সঙ্গিনীর দিকে দৃকপাতের একটা সুযোগ আর করে উঠতে পারছি না। এই যে সেলফোন খানা, কোনো এক রহস্যে, একনাগাড় বেজে চলেছে সেটা যে ওর অপরাধ, এবং আমার কিছুতেই নয়, এই আপ্তজ্ঞানও তখন আমার লুপ্ত হবার পথে।

এই মহাকাল ভেদ করে, শেষমেশ, সঙ্গিনী নিজেই উত্থিত হন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তিনি আমার দিকে চাইলেন। তিনি চাইলেন, কিন্তু তিনি চান বা না চান, আমি প্রকৃত অপরাধীর মতো মুখ করে ফেললাম। সেটি আমার ইচ্ছাকৃত ছিল না। এমনকি আমার আকাঙ্ক্ষিতও ছিল না। অপরাধীর মুখওয়ালা আমাকে তিনি অপরাধী সাব্যস্ত করে শুধালেন,

‘ফোনটা ধরছো না কেন?’

প্রশ্নটা আমি একদম শুনতে পেলাম। আমার কানে বাজছে এখনো। তখনো সেটা তীক্ষ্ণভাবেই বেজেছিল। অথচ আমি ফোনটা যেন তার দিকে এগিয়ে দিতে যাচ্ছি এই ভঙ্গিতে বাড়িয়ে ধরলাম।

আর বললাম, ‘আমি কী করব?! সম্পাদকের ফোন।’

বলার ঠিক পূর্বমূহূর্তেই আমি টের পেলাম যে সমূহ ভুল একটা উত্তর আমি করতে যাচ্ছি। কিন্তু ততক্ষণে উত্তরটা আর আটকানোর মতো অবস্থা আমার নেই। সঙ্গিনী আমার দিকে আরও সজোরে জানালেন–

‘কার ফোন তো আমি জানতে চাইনি। ফোন না-ধরার মতো কী হলো?’
‘না মানে ভাবছিলাম…’
‘অত ভাবো কেন সারাক্ষণ তুমি?’
‘ঠিক তা না। আমি ধরবই ভাবছিলাম।’

গত উত্তরের থেকে এটাকে একটুও আকর্ষণীয় মনে হলো না নিজের কাছে। সঙ্গিনী তীক্ষ্ণভাবেই সেটা স্মরণ করিয়ে দিলেন–

‘তো ধরলে না কেন তাহলে?’

এই সংলাপ চলতে থাকলে আমার কোথাওই পৌঁছানো সম্ভব হতো না। আমার ভ্যাবদামির কারণেই। কিন্তু দয়ালু সঙ্গিনী তখন এক মায়াবী জালে আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছেন। না আসলে হয়তো একটা মায়াময়, কিংবা মায়াবতী স্তরে তিনি পৌঁছে গেলেন। এবং অসম্ভাব্য সেই সংলাপে আমার ভবিষ্যৎহীন দশা তিনি কোনোভাবে ঠাহর করে থাকতে পারলেন। এবং বললেন–

‘ফোন ধরো।’

ফোন-ধরা বিষয়ক সঙ্গিনীর সবক পেয়ে ফোনটা নিয়ে হন্তদন্ত আমি কফি-পানশালার বাইরে আসি। দরজা ডিঙোনোর সঙ্গে সঙ্গেই মনে হয় এই বাইরে-আসার কিছুমাত্র জরুরিত্ব ছিল না। এমনকি বাইরে-আসাতে বিশেষ কিছু অব্যাখ্যেয় ভেজাল তৈরি হতে পারে, অনাকাঙ্ক্ষিতও বটে। দৌড়ে একইভাবে পিছন ফেরার কথা মাথায় এসেছিল বটে, কিন্তু তখন পিছন ফিরলেও আর সেই দুর্ঘটের উপশম সম্ভব হয় না। একবার মনে হলো বটে যে পিছন ফিরে দেখি সঙ্গিনী ঠিক কীরকম মায়াবতী চোখে তখন তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। কিন্তু কোনো এক কারণে ভারী একটা ভয়ার্ত মন তখন তৈরি হয়েছে। আমার আর পিছন ফেরার যথেষ্ট সাহস হলো না। অদ্ভুত এক তাড়াহুড়ার মধ্যে মন তখন নির্বিচার নিপতিত। এই তাড়াহুড়ার মধ্যেও আমার ক্ষণিক সময়ের জন্য মনে হলো যে কফি-পানশালাতে আমার তো একটু পরেও ঢুকতে হবে এবং সেটা কিছুতেই খুব আকাঙ্ক্ষিত হবে না। সেই ভাবনায় খানিকক্ষণ কাটিয়ে দিতে পারলে ভাল হতো। কিন্তু সম্পাদকের তৃতীয় কিস্তির ফোনও তখন বাজতে শুরু করেছে। মানে কিস্তিপ্রতি ১৪ কিংবা ১৫ বারের হিসেব মতো। আমি তড়িঘড়ি ফোনটা রিসিভ করতে বোতাম চাপি। এবং চাপার ঠিক আগের মুহূর্তে আমি বুঝলেও কিছুতেই কল কেটে দেয়ার বোতামটা না টিপে থাকতে পারলাম না। ফলে অগত্যা আমার যা করণীয় থাকল তা হলো আবার ঠিক ফিরতি পথেই ফোনটাকে পাঠানো। এখন আমি, একটুও চাইনি যদিও, ফিরতি-কল করবার জন্য বোতাম টেপাটিপি করছি যখন, একটু ত্যারছা চোখে কাচের ওপারে সঙ্গিনীর দিকে তাকাই। তিনি ওখান থেকেই আমাকে দেখছেন। একটুও ত্যারছা চোখে নয়। আমাকে দেখছেন। মানে আমার নতুন করে কল টেপাটিপি দেখছেন।

ফোনের রিং ওই প্রান্তে আদৌ বেজেছে কি বাজেনি, সম্পাদক ধুম করে বলে বসলেন–

‘হ্যালো। এই অবেলায় ঘুমাই পড়ছিলেন দেখি।’

আমি তারস্বরে বোঝানোর চেষ্টা করি–

‘আরে কী বলেন? এখন ঘুমানোর সময় হলো? ঘুম ছাড়া কি কিছু নেই জীবনে?’

বলেই বুঝতে পারি, এত কথা-বলার আবশ্যকতা ছিল না। এতে অতি-অর্থের আশঙ্কা প্রবল। এবং সম্পাদক সময় না নিয়েই বললেন–

‘অ তাইলে অন্যকিছু করতেছিলেন?’
‘হ্যা হ্যা। অন্যকিছু।’

আমার এতক্ষণের তাড়াহুড়া কণ্ঠস্বরে প্রবল শ্বাসধ্বনিতে রূপ নেয়। এবং ঘুম ভিন্ন অন্যকিছু করছিলাম সেটা সত্য হলেও তখন অনুচ্চারণযোগ্য ছিল। আমি বুঝতে পারি। কিন্তু বলবার ঠিক পরেই।

‘হ আমারই বোঝা উচিৎ ছিল। এতক্ষণ ফোন ধরেন না। আইচ্ছা আমি পরে ফোন দেবো নে।’

পরে ফোন দেবার আশ্বাস দেয়া সত্ত্বেও আমি সম্পাদককে তখন অব্যাহতি দেবার কারণ পাই না।

‘আরে না না। অন্যকিছু মানে অন্য কিছু না।’
‘কী কন এইগুলা? অন্যকিছু মানে অন্যকিছু না! ঘুমাইতেছিলেন তাইলে? বললে শরম কী? দুপুর বেলায় লেখকদের অনেকেই ঘুমায়। আপনার শরম পাবার কিছু নাই।’

ঘুমে শরম নাকি অন্যকিছুতে আমার মাথায় তখন আর আসছে না। নাকি ঘুম মানেই অন্যকিছু! আর অন্যকিছু মানেই শরম! আমি তখন তালগোল পাকিয়ে ফেললাম।

‘আরে ধুর শরম না। ঘুমও না। আর দুপুর পেলেন কোথায়? এ তো বিকেল।’
‘হ ওইডা আপনাদের বিলাতের হিসাব। বাংলাদেশে ৪টার সময় আবার বিকাল হিসাব করে কেডা?’
‘হা হা হা তাই তো! এটা তো আগে হিসেব করিনি।’
‘হিসাব তো করছেন ই। কইরাই তো দুপুর কইলেন। যাউক গা। দুপুর-বিকালে কিছু আসে যায় না। কথা হইতেছিল অন্যকিছু করা নিয়া। যে কোনো সময়েই করতে পারেন। অভিরুচি ও সুযোগমতো করবেন।’

সম্পাদকের দৃশ্যকল্প দেখি বেসামাল জায়গায় গিয়ে ঠেকে। কাচের মধ্যে হঠাৎ সঙ্গিনীর দিকে চোখ যায়। তাঁর চোখ পূর্ববৎ তীক্ষ্ণ এদিকেই প্রোথিত।

‘আরে ধুর এগুলা কী বলেন আপনি! আমি তো পানশালায়।’
‘আহা হা! তাই বলেন। মুখে তো সারাদিন খাই না খাই না বইলা নিজের সন্ন্যাসী ইমেজ বানাইছেন। ভিত্রে এই অবস্থা! সেডাও এই ভরদুপুরে? আপনারে দ্যাখলে তো ঋত্বিক ঘটকও লজ্জা পাইত।’

আমি বিলকুল নাবুঝ হয়ে পড়ি যে কী করব। গত কয়েক মিনিটের মধ্যে কোথা থেকে কোথায় যে সবকিছু প্যাঁচপোঁচ লেগে। আমি মরিয়া হয়ে তাঁকে থামাই–

‘আরে থামেন থামেন। এগুলা কী শুরু করলেন? আমি একটা কফি-পানশালায় বসে কফি খাই।’

সম্পাদক, হঠাৎ, বিস্ময়করভাবে, শান্ত বেড়ালের মতো হয়ে গেলেন। গলার স্বর যথাসম্ভব নামিয়ে, হয়তো এমনকি স্নেহমাখা গলায়, হতে পারে, বললেন–

‘ও। বাহ্। হ্যাঁ, কফিপানের সময় হিসেবে ঠিকই আছে বোধহয়। তো কফিপানের মতো একটা বিষয়রে আপনি এইরকম ইরোটিক বানাইলেন ক্যামনে?’

সম্পাদকের এহেন টীপ্পনিতে, কিংবা আসলে টীপ্পনিহীন সমাহিতপ্রায় বক্তব্যপ্রদানে আমার ধৈর্যশ্চ্যুতি ঘটে।

‘আরে আপনি তো আচ্ছা লোক! ইরোটিক আমি বানালাম? এতক্ষণ আমাকে জেরার মধ্যে রাখলেন। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কেমন কেমন একটা ইয়ে ব্যাপার বানালেন। একটা সাধারণ ব্যাপার নিয়ে খ্যাচর খ্যাচর করে আমাকে অতিষ্ট করে দিলেন।’

আমাকে আসলেই বিশেষ পেরেশান শোনালো। এমনকি আমার নিজের কানেই। সম্পাদক, এদফা, বেশ ভাল ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন। বা তাঁর খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাস নিয়ে সম্যক ধারণা না থাকার কারণে আমার মনে হলো। তিনি তড়িঘড়ি বললেন–

‘আরে আরে আপনি এইরকম এক্সট্রা-সেনসিটিভ হইলেন ক্যামনে? বেহুদা সেনসিটিভ হইলে আপনার সেনস্যুয়ালিটি কইমা যাইতে পারে কিন্তু।’
‘আরে আবার ঘুরে-ফিরে আবার সেই কথা।’

আমার প্রায় আর্তনাদে সম্পাদক এবারে কথা ঘোরানোর সিদ্ধান্ত নিলেন বোধহয়–

‘শোনেন কী জানি হইছে আপনার। কফিতে কিছু দিয়া দিছে নাকি খোঁজ নেন। আপনে মলম পাট্টির খপ্পরে পড়ছেন মনে হয়।’
‘কী বলেন আপনি? মলম কি কফিতে দেয় নাকি? মলম তো লাগায় চোখে।’
‘উঁহুঁ, আপনি তো আসলেও আবোল-তাবোল বকতেছেন। চোখে লাগায় গিয়ে মুশু ইয়ে মাশকারা।’
‘সে তো মলমও হাতে-পায়ে লাগায়, কফিতে তো লাগায় না। আবোল-তাবোল তো আপনিই শুরু করলেন সেই কখন থেকে।’
‘আপনে চেইতা যাইতেছেন দেখতেছি। দেখেন বস, আমার আবোল-তাবোল বকনের একটা অধিকার আছে। কিন্তু তাও আমি বকতেছি না। কিন্তু আপনার কথা ভাবেন একবার। গত দুই বছরে একটা লেখাও ডেলিভারি দিতে পারলেন না। এর মইধ্যে যদি আবোল-তাবোল বকার অভ্যাসও শুরু করেন–আমি তো আপনেরে নিয়া টেনশনে পইড়া গেলাম।… লেখা ঠিকঠাক মতো ছাপতেই আরম্ভ হয় নাই আপনার। আমি ছাড়া কেউ আপনের থিকা লেখা চায় বইলাও আমার মনে হয় না। আপনারে ভালবাইসা সাহিত্যিক ক্যাটাগরিতে রাখি আমি। এরই মইধ্যে আপনার যদি মাথাডা যায় গিয়া… মানে, আপনে সেই তখন থিকা কীসের মইধ্যে যেন আছেন। সেইজন্যই কফিতে মলম দিছে বলছি।… আপনে তাতে চেইতাই গেলেন। ক্যান কফিতে ক্রিম না কী জানি দিয়া বানায় না? তাইলে মলম দিতে পারবে না ক্যান?’

হঠাৎ আমার সাহিত্য-জীবন চলচ্চিত্রের মতো আমার চোখে ভাসতে শুরু করল। সম্পাদক নিজে খুব ভাল লেখেন আমি জানতাম। তাঁর কথন-যোগ্যতাও আমার পরিচিত। কিন্তু তাই বলে সেলফোনে চলচ্চিত্রের মতো আমার লেখক-জীবনকে দেখিয়ে দিতে পারবেন, আমার একেবারেই কখনো তা ভাবনা ছিল না। আমার মুখে বিশেষ কোনো কথাও আসছে না দেখতে পেলাম। মানে শুনতে পারলাম। মানে না-শুনে বুঝতে পারলাম। আমার প্রাণ জুড়ে এমন কান্না চেপে আসলো যে কথা বলতেও বিশেষ সাহস হলো না। আমি কিছু বলছি না বলেই বোধহয় সম্পাদক, হয়তো সেলফোনের বিলের পুরো সদ্ব্যবহারের স্বার্থে, কথা বলেই চললেন। মোটামুটি এতখানি শুনবার পর আমার মনে পড়ল আমি কফি আসলে এখনো খাই-ই নাই। সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়ল আমার সঙ্গিনী যে ভিতরে অপেক্ষমান। সেই অত্যন্ত বাস্তব বার্তাটি মনে পড়াতে কেমন একটা ভীতির অনুভূতি আমার হয়ে উঠেছে ততক্ষণে। মনে হলো সেলফোন লাইনটা ফুস করে কেটে দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ি। কিন্তু তা করতে গেলে কান থেকে যন্ত্রটিকে আমার নামাতে হয়। আর তা কিছুতেই আমি করতে পারলাম না।

প্রায় মৃত্যুঘোষণা দেয়ার মতো গলায় আমি বললাম–

‘ভাই কফি তো আমি খাই নাই। মলম দিলেও সেই কার্যকরিতা শুরু হবার সুযোগ তো পায়নি।’

সম্পাদককে ভারী অবাক শোনালো–

‘ক্যান? কফি না-খাইয়া কফিশপে বইসা কী করতেছেন?’
‘আহা! খাব না কেন? খাবার সময়েই তো…মানে অর্ডার দেবার আগেই তো আপনি ফোন দিলেন।’
‘কী বলেন? ফোনে অর্ডার আটকায়ে গেল? বস, আপনে কারো লগে নাই তো? আপনারে অপ্রকৃতস্থ মনে হইতেছে কিন্তু।’
‘লগে থাকলে কী? লগে থাকা নিষেধ নাকি?’

এবারে আমাকে বেপরোয়া শোনালো রীতিমতো।

‘আহা হা! আপনি তো দেখি… দুপুরে খাইছিলেন ঠিকঠাক?’

‘না তো।’ বেপরোয়া গলা বাদ দিয়ে আমি সম্পাদককে পরোয়া করতে শুরু করলাম।

সম্পাদক শুধালেন, ‘কিঁউ?’

তাঁর এই কিঁউ-ধ্বনিতে আমার মাথার কী যেন একটা ভেজাল হলো।

আমি উত্তরে বললাম, ‘কিঁউ কিঁউ।’

সম্পাদক বললেন, ‘বস্, আপনি তো একদমই ঠিক নাই। কী হইছে কন তো?’

আমি আবার বলি, ‘কিঁউ কিঁউ। কুঁই..কুইঁ।’

সম্পাদক বোধহয় বিচলিত হলেন। কী বলবেন সম্ভবত খানিকক্ষণ ভাবলেন।

তারপর বললেন, ‘আপনে আর বাংলা কইবেন না?’

আমি বলে চলি, ‘কুঁই…কুঁই…কুঁইইইই…কুঁইইইইইইইই….’

সম্পাদক হঠাৎ কিছু একটা খুঁজে পেলেন, ‘আরে আপনার তো দেখি মেটামরফসিস চলতাছে।’

আমি আবারও, ‘কুঁইইইইই…কুঁইইইইই…কেঁওও….কেঁওওওঔ…হ্ঔ হ্ঔ…ঘউউউউউউ…ঘউ ঘউ…………’

আমি থামলে সম্পাদক একটু বিরতি নেন। তারপর বললেন–

‘দেখেন আপনার মেটামরফসিস হইছে। সাহিত্যিকরা এইরকম মেটামরফসিস-এর জন্য আজীবন সাধ্য-সাধনা করে। আমার সম্পাদক জীবনে এই প্রথম বিশুদ্ধ মেটামরফসিস দেখতেছি। সেইটার আবার আমি সাক্ষী। আমার খুবই ভাল্লাগতেছে বস। আপনে যার লগেই থাকেন না কেন, সেইটারে আইমীন তারে এখন আপনার বদলাইতে হবে। শুককীট কিংবা মূককীট যেভাবে খোলস ছেড়ে দেয়…এইটা কিন্তু মেটামরফসিসের নিয়ম। যান শিগগির পুরা রিচ্যুয়ালটা পালন করেন গিয়া। আপনি লেখক হইয়াই ছাড়লেন। কনগ্রাচুলেশন্স।’

আমি ফোন বন্ধ করি না। তথাপি আশা করি এই সংলাপ একদা শেষ হবে। আমি সে কথাও বলি না।

‘কেঁওওওঔ…হ্ঔ হ্ঔ…ঘউউউউউউ…ঘউ ঘউ…………’
‘ওকে বস। বিশাল সৌভাগ্য আপনার। আমি রাতে আপনার ওইখানে একটা কেক কিনা নিয়া আসুম নে। আপনি দিবারাত্রি খালি লিখবেন। একটা খাতাও নিয়া আসুম নে। দুইতিন কাপ কফি খায়া সেলিব্রেট করেন। আর খোসাটা ত্যাগ করতে ভুলবেন না কিন্তু। আর আমারে আপনের বাসার ঠিকানাটা এসএমএস কইরা দিয়েন কিন্তু।’

মনে হলো সম্পাদক সত্যি সত্যি ফোন রেখে দিয়েছেন। ফোনটা কান থেকে নামিয়ে ওটার পর্দার দিকে তাকিয়েই থাকি আমি। ভিতরে যেতে হবে ভাবতেই আমার পা শুকিয়ে যায়।

মৃদু পায়ে আমি ভিতরে ঢুকি। ফোনটা পকেটে না-চালান দেয়ার কোনোই কারণ নেই। কিন্তু সেই সাধারণ কথাটাই আমার মনে থাকে না। আমি কফির ট্রের মতো করে ফোনটা বাগিয়ে একটু একটু করে টেবিলের দিকে যাই। আমার এই যাত্রাপথ পুরোটা তীক্ষ্ণ নজরে দেখতে থাকেন সঙ্গিনী। তাঁকে কী ভীষণ শান্ত দেখায়! আমি বাতের রুগির মতো করে চেয়ারে তাঁর সম্মুখে বসি। তিনি কিছু না বলে কফির খাতা উল্টাতে শুরু করলেন। তারপর, বহুকাল পর, তিনি বললেন–

‘ফোনটা রেখে আসার কী দরকার ছিল? সরাসরি চলে গেলেই পারতে।’

আমার খুব বলতে ইচ্ছা করে যে এটা সম্পাদকের ফোন ছিল। কিন্তু আমি বলি–

‘ঘউউউউউউ…ঘউ ঘউ…………’

সঙ্গিনী আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তাঁকে একটুও বিচলিত দেখাল না। যেন তিনি জানতেনই যে আমি এই ভাষায় উত্তর করব। এর মধ্যে হাতের ইশারায় তিনি কফি-ডেস্কের দিকে কী জানি বললেন। হয়তো কফি তাঁর খাওয়া হয়ে গেছে। বিল দিতে বলছেন। কিংবা হয়তো কোন কফি নেব আমরা তা ইতোমধ্যেই বলা হয়ে গেছে। আমার আর মনে পড়ল না ঠিক কত সময় আমি বাইরে ছিলাম। আমি অধোবদনে বসেই থাকি। সঙ্গিনী আরও কিছু অনন্তকাল পর বলেন–

‘এত আবাঙ কেন তুমি? কোনো কিছুতেই কি কনফিডেন্স পাও না?’
‘কুঁইইইই…।’

‘কুঁই? তুমি ভেবেছো এতেই পার পেয়ে যাবে? তুমি ভেবেছো এই ভাষা আমি বুঝি না? আমি খুবই ভালো বুঝি।’

‘কুঁইইইই…।’
‘শোনো। আমার যা বোঝার তা বোঝা হয়ে গেছে। তুমি লেখক হও আর হামানদিস্তা হও, এরকম ভ্যাবদা লোকের সঙ্গে আমার থাকা সম্ভব না। আজকেই শেষ। নো মোর কম্যুনিকেশন।’

এবারে আর কিছু না-বলে আমি বসে থাকি। অধোবদনে। মাথা যথাসম্ভব শূন্য। বসে থাকি না-খাওয়া কফির জন্য। কিংবা হয়তো বিলের জন্য।

হঠাৎ, আচমকাই, সম্পাদকের চলচ্চিত্র চোখে ভেসে উঠল। কোলের উপর মুঠি-শক্ত করে-রাখা ফোনটা আমি টেবিলের উপর তুলি। খুবই স্পষ্টভাবে সেটার দিকে তাকাই। এরপর সঙ্গিনীর দিকে তাকাই। এবারও স্পষ্ট করে। কুঁইকুঁইহীন আমার দৃষ্টিনিপাতে সঙ্গিনী একটু ভুরু কুঁচকালেন। আমি আবার ফোনের পর্দার দিকে তাকাই। তারপর–

তারপর, একটুও না-ভেবে, একটানে আমি ঠিকানা টাইপ করে সম্পাদককে পাঠিয়ে দিই। বিল কিংবা কফির জন্য সেখানে আর থাকি না। গটগট করে হেঁটে বাইরে চলে আসি। সঙ্গিনী আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কিনা সেটাও আর দেখার দরকার লাগে না তখন।

বাইরে এসে প্রথম যে চাকাওয়ালা বাহনখানা পেলাম তার তলে আমার ১১০০ টাকার মোবাইল ফোনখানি চালিয়ে দিলাম। নিখুঁতভাবে। টেম্পোর হেলপারের চোখে তখন ঝিলিক। কিন্তু সে একটুও বোঝেনি বোধহয় এটা কী। আর ঠিক তখুনি মনে পড়ল সময়টা একবার দেখে নিলে হতো।

একমাত্র সময় না-জানা ছাড়া আর কোনো সমস্যাই তখন নেই। কারণ ততক্ষণে সঙ্গিনীর সাততলার উপরে মায়াবী ফ্ল্যাটটার ঠিকানা সম্পাদক পেয়ে গেছেন।

(শুরু ১৭ই মার্চ ২০০৯॥ মোহাম্মদপুর, ঢাকা; শেষ ১২ই সেপ্টেম্বর ২০১১॥ শ্যামলীর একটা খাবার হোটেল, ঢাকা)

আর্টস-এ প্রকাশিত লেখা
প্রত্যাবর্তন: আমার ‘ফেরা’ নিয়ে যে কাহিনী না বললেও চলত (গল্প)
সায়েরার সঙ্গে ডিজিটাল মোলাকাত (সাক্ষাৎকার)
কক্ মানে মোরগ: উদ্ভ্রান্ত মোরগজাতি ও তাহাদের বিহ্বল প্রতিপালকগণ (গল্প)
বেযোগাযোগ: কী ফারাক বন্ধু কিংবা প্রতিবন্ধুতে? (জার্নাল)
(আমার) রবিভাব… ভাব ও অভাব
নীলফামারী’তে মাঠ গবেষণা
পানশালা কিংবা প্রেম থেকে পলায়ন: যেভাবে আমি লেখক হয়ে পড়লাম

—–
manosh-ch1.jpg
মানস চৌধুরী
…….

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: মানস চৌধুরী
ইমেইল: manoshchowdhury@yahoo.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters


4 Responses

  1. কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর says:

    হাহাহা, গল্পের ভিতরে এত মজা জমা আছে যে নিজের হাসির উপর আরও আরও হাসি চাইপা বসে। সেই হাস্যচাপাচাপিতে পুনঃপুনঃ হাস্যকোলাহলে মত্ত হই। তাতে আরেক ঝামেলার ভিতর গল্পটি পাঠ করতে দেরি হয়ে গেল। কারণ হাসাহাসির কারণে চোখ ভিজে যাচ্ছিল। গল্পের ভিতর আরেক গল্প মাথাচাড়া দিয়া উঠছিল। যতসব বেপোরোয়া নান্দনিক কাজ আর-কি। আমরা গল্পকাররা আর কিছু করতে না পারলেও গল্পের এলাকা থাইকা ঠাট্টাহাসিরে তাড়াইতে পারছি। মানসের গল্পে তাহা পুনরায় নাজেল হয়েছে। তাকে এই জন্য শুভেচ্ছা। তিনি বরাবরই ভাষারে নিয়া কথা চালাচালি করতে জানেন। ভাষার উপর এত বিশুদ্ধ দখল তো আমাদের গল্প-এলাকায় অত বেশি নাই। অনেকে আবার ভাষারে নিজের সম্পত্তি মনে করেন, যা ইচ্ছা তাই করেন। তিনি যা করেন তা তিনি বুইঝা-শুইনাই করেন। অল্পদিনের ভিতর আবারও তার একটা গল্প পড়তে পারলাম।
    গল্পের আরেকটা মজা হচ্ছে, গল্পটির চরিত্রত্রয়কে সনাক্ত করার একটা বাসনাও চালু ছিল। মানে গল্পটির চরিত্রই হচ্ছে, চরিত্রত্রয়কে সনাক্তকরণের একটা আবহ চালু রাখা! এজন্যও তাকে ধন্যবাদ।

  2. মানস says:

    জাহাঙ্গীর ভাই,

    অপেক্ষা করছিলাম আর কোনো মন্তব্য আসে কিনা। কপাল আমার! আর আমাদের সাহিত্য জগতের… এখানে লেখকের থেকে পাঠক সংখ্যা কম!! :( …আপনি এমন ভাবে এই লেখাকে গ্রহণ করলেন বলে আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। কৃতজ্ঞতাও।

  3. Latif Hossain says:

    এই লেখকের প্রথম কিছু পড়লাম। মজা পাইলাম – অনেক অর্থেই! নাদান পাঠক মাত্র আমি, সাহিত্য সমালোচনার কোন যোগ্যতা রাখি না। “নাদান” কারন যত পড়ার ইচ্ছা তাই হয়ে ওঠেনাই এবং এখনও হয়ে ওঠেনা রুটিরুজির পুঁজিবাদী সংবিধিবদ্ধ ধান্ধায়। আমার প্রতিক্রিয়া গল্প নিয়া না; বরং লেখকের প্রতিক্রিয়া নিয়া। তিনি একজন পাঠককে ধন্যবাদ দিলেন, আবার কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করলেন। ধন্যবাদটাও বুঝলাম সৌজন্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষিত মানুষের ঐটা অভ্যাস। কৃতজ্ঞতাটা কেন?! খারাপ না, কিন্তু প্রশ্ন আসলো – সরল স্বীকারোক্তি আমার। এই জীবনে যা কিছুই “ভালো” হইলো আমার, তার অবদান বা দায়ভার ভালো লেখক এবং তাদের লেখার উপর চাপায় দিয়ে আসছি। সত্যপোলব্ধি বা খাঁটি বিনোদন সে যাই হোক না কেন। এই লেখকের প্রতিও কৃতজ্ঞতা বোধ করছি একই কারনে। কারনগুলার ফিরিন্তি না’ই দিলাম এইখানে।

    ধন্যবাদ লেখককে। কৃতজ্ঞতাও।

    লেখকের পরিশ্রম আর তা শেয়ার করার জন্য কৃতজ্ঞতা জানানোর কথা পাঠকেরই তো? নাকি ভুল হইলো কোথাও আমার?

  4. Nur Hosain Majidi says:

    ভিন্ন ধঁাচের একটি সফল গল্প। পড়ে বেশ আনন্দ পেলাম।
    নূর হোসেন মজিদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.