ব্যক্তিত্ব

তারেক-মিশুক: শিল্পসহোদরের ছেঁড়া সেলুলয়েড

ইকবাল করিম হাসনু | 11 Sep , 2011  

tmmm.jpg
তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর

শনিবার, ১৩ আগস্টের সকালে কাজে যাওয়ার জন্যে তৈরি হচ্ছিলাম। টেলিফোনে দূরপাল্লার ঘণ্টাধ্বনি হতেই তুললাম–এই সাতসকালে কে আবার কিছু বিক্রি করতে উঠেপড়ে লাগল–সেটা জানার কৌতূহলে। টরন্টোতে টেলিসেলস অর্থাৎ টেলিফোনে খদ্দের ধরার ঘণ্টাধ্বনি আর দূরপাল্লার ঘণ্টাধ্বনি একইরকমের শোনায়। ভুল ভাঙল যখন ওপাশ থেকে অনুজপ্রতিম প্রদীপের (ছায়ানট-এর অন্যতম নির্বাহী) গলা ভেসে এলো─দাদা, আমি আপনাদের ওখানে অনেক গভীর রাত হয়ে গেছে ভেবে ফোন করি নি, তাই এখন করছি─একটা দুঃসংবাদ আছে। আপনার দুজন কাছের বন্ধু মারা গেছে─তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর─ মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফেরার পথে অ্যাক্সিডেন্ট-এ। মুহূর্তেই ব্যাপারটা আমার কাছে সাররিয়েল মনে হচ্ছিল। আমি প্রদীপকে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার বোধ হারিয়ে ফেলেছিলাম। ঠিক মনে পড়ছে না কী বলে যে ফোনটা রেখে দিয়ে কাজের উদ্দেশে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম। ঘটনার আকস্মিকতায় মনটা কিছুতেই বাস্তবের উপসর্গ পরা মুছে দিয়ে নির্মম সত্যকে স্বীকার করে নিতে চাইছে না যে তারেক ও মিশুক এখন স্মৃতি! প্রদীপ তৎক্ষণাৎ জানাতে পারে নি কিন্তু পরে সংবাদমাধ্যমে ওই দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে আমার অতি পরিচিত শিল্পী ঢালী আল-মামুন ও দিলারা বেগম জলির নাম দেখে আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। তাঁরাও অত্যন্ত কাছের মানুষ─সেই যে চট্টগ্রামে তাঁরা যখন চারুকলার শিক্ষার্থী ছিলেন সে-সময় থেকে। ঢালী-র সংকটাপন্ন অবস্থার কারণে মনটা এখনও অজানা আশঙ্কায় মেঘাচ্ছন্ন। স্মৃতিগুলো আছড়ে পড়ছে দুদ্দাড় করে, কিছুতইে সুস্থির হতে দিচ্ছে না। মনের এই বিক্ষিপ্ত অবস্থা সত্ত্বেও সুহৃদ ব্রাত্য রাইসু ও বন্ধু আলম খোরশেদ-এর বৈদ্যুতিন বার্তায় পাঠানো অনুরোধে চেষ্টা করছি তারেক-মিশুক নামের দুই শিল্পসহোদরের স্মৃতিগুলোকে জোড়া দিতে।

ফ্লাশব্যাক
ঠিক মনে পড়ছে না কখন তারেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। সালটা ১৯৮৩-র আগে কিছুতেই নয়, কারণ শহর চট্টগ্রামের ৮ বছরের অধিবাস ছেড়ে অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলার বাণী-র চাকরিতে যোগ দিতে ঢাকায় এসেছিলাম সেই বছরই। শিক্ষকপ্রতিম বন্ধু সলিমুল্লাহ খানের সঙ্গে দিন কয়েক আগে টেলিফোন করে স্মৃতিবিভ্রমটা কাটাতে চেষ্টা করেছি। খান ভাইয়ের অনুমানই সঠিক হবে। প্রাক্সিস অধ্যয়ন চক্রের সূত্রেই হয়তো গোড়াতে তারেকের নাম-এর সঙ্গে এবং পরে ব্যক্তিগতভাবে পরিচয়ের ঘটনা ঘটে থাকবে। পরবর্তীকালে তারেকের সঙ্গে যেটুকু যোগাযোগ আমার বেড়েছে তা প্রাক্সিস নয়, বরং চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন এবং চলচ্চিত্র দেখা ও সেই শিল্পমাধ্যম নিয়ে আড্ডা-আলোচনার সূত্র ধরে।
তারেকের সঙ্গে যোগাযোগটা চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন ও চর্চা সূত্রে হলেও ভিন্ন সাংগঠনিক সংশ্লিষ্টতার কারণে আমাদের কাজের ক্ষেত্রটা ছিল আলাদা। আমি চট্টগ্রামে থাকাকালীন চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র সংসদ এবং ঢাকায় আসার পর থেকে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ─প্রবাদপ্রতিম মুহম্মদ খসরু গোড়া থেকে যে প্রতিষ্ঠানটির হাল ধরে আছেন─এর সঙ্গে জড়িত ছিলাম। সাংগঠনিক দিক থেকে তারেকের কর্মকাণ্ড ছিল শর্টফিল্ম ফোরামকে ঘিরে। শর্টফিল্ম ফোরামের সঙ্গে থাকলেও ওই সংগঠনের অন্যতম সদস্য তানভীর মোকাম্মেল ও মানজারে হাসীন মুরাদের মতো তারেকেরও শুরুটা হয়েছিল বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ-এ। ৮০-র দশক জুড়ে মূলত ঢাকা এবং চট্টগ্রামে চলচ্চিত্র সংসদগুলোর উদ্যোগে সুস্থ চলচ্চিত্রের জন্য যে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল সেসব কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে জড়িত থাকার সুবাদে তারেকের সঙ্গে আমার যোগাযোগটা হতো। আরও একটা কারণ ছিলেন সলিমুল্লাহ খান। ঢাকায় স্থানাভাবে যখন একসময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রবাসগুলোর কোনো কোনো কক্ষে তাঁর আর আমার অস্থায়ী আবাস ছিল সেসময় তিনি আমার সঙ্গে চলচ্চিত্র দেখা এবং তা নিয়ে আলোচনায় যোগ দিতেন। খান ভাইয়ের সূত্রে তারেকের সঙ্গে পরিচয়টা আরও নিবিড় হয়েছিল।

১৯৮৫ সালের গোড়ার দিকে জার্মান কালচারাল ইনস্টিটিউটের পরিচালক পিটার জেভিৎস-এর সহায়তায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ ফেডারেশন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের এক কর্মশালার আয়োজন করে। ওই কর্মশালায় আমরা যারা যোগ দিয়েছিলাম তাদের মধ্যে শামীম আখতার, এনায়েত করিম বাবুল, তারেক মাসুদসহ অন্যান্য চলচ্চিত্র সংসদের সদস্যও ছিল। জর্মন প্রামাণ্যচিত্র পরিচালক খ্রিস্টফ হ্যুবনার আমাদের ছোটো ছোটো ক’টি দলে ভাগ করে নিজেদের পছন্দ করা যেকোনো বিষয়ে ৫ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আমাদের দলটি করেছিল রিকশার ওপর। তারেকরা ঠিক কোন বিষয়ে করেছিল এখন মনে পড়ছে না। চলচ্চিত্র সম্পর্কে তারেকের শিল্পবোধ ও গভীরতার আাঁচ পাই সে-সময়ের একটা ঘটনায়। হ্যুবনারের করা কিছু প্রামাণ্যচিত্র আমাদের দেখানো হয়েছিল। তার মধ্যে একটি ছিল জার্মানির কোনো এক প্রত্যন্ত শহরের কয়লাখনির শ্রমিকদের নিয়ে। বেশ দীর্ঘ ছিল প্রামাণ্যচিত্রটি। ছবি শেষ হয়ে এলে তারেক টিপ্পনী কেটেছিল, ”ব্যাটা একেবারে কোনো এডিটিং ছাড়াই চালিয়ে দিয়েছে।” টিপ্পনীটি আমরা যারা আশেপাশে বসে দেখছিলাম তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আমার ধারণা সে-সময় জার্মান কালচারাল ইনস্টিটিউটে রাইনার ভার্নার ফাসবিন্ডার, ভার্নার হ্যারযগ, ভিম ভেন্ডারস্ , ফয়কার শ্ল্যনডর্ফ এবং মার্গারিটা ফন ট্রটা প্রমুখ পরিচালকের করা বেশ কিছু কাহিনী, স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং প্রামাণ্যচিত্র আমাদের দেখা হয়ে গিয়েছিল এবং তারেকও সেগুলো দেখে থাকবেন যার ফলে চলচ্চিত্রের শিল্পমান ও উৎকর্ষ বিচারের─সে যে দৈর্ঘ্য কিংবা ঘরানারই হোক না কেন─একটা মানদণ্ড আমাদের মধ্যে তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

কেবল এসব জর্মন চলচ্চিত্রকারই নয়, মনে পড়ছে ওই দশকেই বৃটিশ কাউন্সিল-এর সহায়তায় জেমস্ লেহীর কর্মশালা, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের উদ্যোগে হীরালাল সেন স্মারক বক্তৃতা উপলক্ষে হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঋত্বিক চলচ্চিত্র পর্যালোচনা এবং ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্যস্বরূপ আয়োজিত ফরাসি চলচ্চিত্র পর্যালোচনা, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের উদ্যোগে আয়োজিত মৃণাল সেন চলচ্চিত্র সপ্তাহ–ইত্যাকার কর্মকাণ্ডে আমরা প্রায়শ তারেক এবং তার সঙ্গী-সাথীদের─যাদের বেশিরভাগই ছিল চারুকলার শিক্ষার্থী─দেখা পেতাম। তাছাড়া প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের হিন্দী সিনেমার নিউওয়েভ, কেরালার আদুর ঘরানা, পশ্চিমবঙ্গে রায়-ঘটক-সেন উত্তর বুদ্ধদেব-উৎপলেন্দু-গৌতম-অপর্ণার মতো নতুন একটা চলচ্চিত্রকার প্রজন্মের কর্মকাণ্ড এবং ১৯৮৫-তে নন্দন-এর মতো প্রতিষ্ঠানের অভিষেক আমাদের সুস্থ চলচ্চিত্রের আন্দোলনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। দেশের সিনেমা হলগুলোতে একদিকে নিম্নমানের নকল ও মেধা-মনন-রুচিহীন অশ্লীল ছবির (চলচ্চিত্র না বলাই ভালো) দৌরাত্ম্য, অন্যদিকে ভিডিও দোকানের বদৌলতে মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে ভিসিআর-এ নাচা-গানা আউর মউজজাতীয় স্থূলরুচির হিন্দী সিনেমা এবং ডার্টি হ্যারি মার্কা হলিউডি থ্রিলার-এর মোচ্ছব। এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেশে সুস্থ চলচ্চিত্রের একটা ধারা তৈরির প্রয়োজনীয়তা থেকে আন্দোলনটি গড়ে ওঠে। মনে পড়ছে, এসময় টিএসসি-তে আয়োজিত চলচ্চিত্র সংসদকর্মীদের সঙ্গে দেশের বেশ ক’জন বুদ্ধিজীবীদের বৈঠকে ভাষাসৈনিক গাজীউল হক বলেছিলেন সুস্থ চলচ্চিত্রের জন্য আন্দোলন কেবল মিটিং-মিছিলের মধ্যে রাখলে চলবে না, দেশের মানুষকে পাল্টা কিছু তো দিতে হবে। নিজেরা ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যে বেনোজল ঠেকাতে হবে─এ সত্য চলচ্চিত্র সংসদকর্মীদের অধিকাংশের মধ্যে তখন অনুভূত হচ্ছে। এ কারণেই শিল্পী এস,এম, সুলতানকে নিয়ে তারেক মাসুদ যে একটা প্রামাণ্যচিত্র তৈরিতে লেগে রয়েছে সে-সংবাদ তখন সংসদকর্মীদের আগ্রহের বিষয় ছিল। তেজকুনি পাড়া এবং আসাদ গেটের নিকট তারেকের আস্তানায় যতবারই গেছি হয় সলিমুল্লাহ খান নয়তো বন্ধু শিল্পী ওয়াকিলুর রহমানের-এর সঙ্গে হবে। তারেকের বন্ধুমহলের মধ্যে চারুকলা ইনস্টিউটের শিক্ষার্থীদের সংখ্যাধিক্য ছিল এবং শিল্পী সুলতানকে নিয়ে ছবি করছে বিধায় দুদিক থেকেই অর্থাৎ তারেক এবং চারুকলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে পারস্পরিক আগ্রহ থাকা ও যোগাযোগ নিবিড় হয়ে ওঠাটা ছিল স্বাভাবিক।

আমার যেটুকু চলচ্চিত্রচর্চা ঢাকায় করার সুযোগ হয়েছে তার পুরোটাই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদকে ঘিরে মুহম্মদ খসরু এবং মাহবুব আলম-এর তত্ত্বাবধানে–শামীম আখতার, মইনুদ্দীন খালেদ, ওয়াকিলুর রহমান, সৈয়দ শহীদ, জামাল চৌধুরীর মতো অন্যান্য বন্ধু ও সহকর্মীদের সাহচর্যে। এটাও মনে রাখা দরকার তখন দেশে চলছে এক অবরুদ্ধ সময়। একদিকে চলছে সামরিক শাসক এরশাদের স্বৈরাচার, পঁচাত্তর পরবর্তী বিকৃত ইতিহাস ও ধর্মাশ্রিত রাজনীতির পুনরুত্থানে মধ্যবিত্তের সেক্যুলার উদারপন্থী অংশে দিশাহীনতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব, অন্যদিকে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির ক্রমাগত বাম-বিরোধী মার্কিনী-পশ্চিমা অক্ষশক্তির ক্রোড়াগমনে দেশের অভ্যন্তরে হরেক রকম বিদেশি এনজিও-র আগমন ও সম্প্রসারণ। একদা বাম রাজনীতিতে নিবেদিত তরুণদের একটা অংশ চাকরি-বাকরি জোটানোর জন্যে এসব এনজিও-র দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে স্বাভাবিক কারণেই তরুণদের বৃহৎ অংশটা আকর্ষিত হতো গ্রুপ থিয়েটারে, ক্ষুদ্র অংশটি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে।

১৯৮৫-র শেষ দিকে আমি ও আমার সহপাঠী বন্ধু ভ্যালেরিও সাহা মিলে বিজ্ঞাপনী সংস্থা মাধ্যম শুরু করি। এর কার্যালয় ছিল ধানমণ্ডির ২ নং সড়কে জার্মান কালচারাল ইনস্টিটিউটের পাশে সদ্য গজিয়ে ওঠা চারতলা দালানের চতুর্থ তলায়। আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন শিল্পী হিসেবে ওয়াকিলুর রহমান এবং অন্যতম নির্বাহী হিসেবে শিল্প সমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ। অবৈতনিক পরামর্শদাতারূপে সবধরনের সহায়তা করে যেতেন মুহম্মদ খসরু এবং কাজ যোগাড় করে দেওয়ার ক্ষেত্রে মাহবুব আলম। মাধ্যম-এ প্রায় সন্ধ্যাতেই পদাপর্ণ ঘটতো চলচ্চিত্র সংসদকর্মী ও অন্যান্য লেখক শিল্পী বন্ধু-বান্ধবদের। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী সংক্রান্ত কয়েকটা পোস্টার ডিজাইন মাধ্যম থেকে করা হয়েছিল যার মধ্যে বৃটিশ কাউন্সিলের জন্যে করা রিচার্ড এ্যাটেনবরো পরিচালিত গান্ধী এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের জন্যে করা ফ্রেঞ্চ ফিল্ম সেশন: আ ট্রিবিউট টু ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো সুধীমহলের কিছুটা নজর কেড়েছিল। এ-সময় তারেক এসেছিলেন শিল্পী সুলতানের ওপর তাঁর নির্মাণাধীন প্রামাণ্যচিত্র রেবেল এ্যাঞ্জেল (তখনও ‘আদম সুরত’ নামকরণ করা হয় নি)-এর আকাঁড়া মুদ্রণের (রাশপ্রিন্ট) প্রদর্শনী উপলক্ষে পোস্টারের অনুরোধ নিয়ে। মাধ্যম থেকে করা পোস্টারটি সুলতানের আঁকা একটি ছবি নিয়ে হয়েছিল। জার্মান কালচারাল ইনস্টিটিউটে আয়োজিত ওই প্রদর্শনীতে স্বাগত ভাষণ ছিল আহমদ ছফার। আশফাক মুনীর মিশুকের সিনেম্যাটোগ্রাফির নান্দনিক উৎকর্ষের সঙ্গে পরিচিত হই সেই প্রথমবারের মতো। মিশুকের কাজ সম্পর্কে এর আগে ধারণা ছিল কেবল তার স্থির আলোকচিত্র নিয়ে। ঢাকাস্থ অলিয়ঁস ফ্রঁসেজ মিশুকের একক আলোকচিত্রের একটা প্রদর্শনী করেছিল। সুলতান সম্পর্কিত প্রামাণ্যচিত্রের আকাঁড়া মুদ্রণ দেখে এই আমার প্রতীতি জন্মেছিল যে ছবিটি নিয়ে সতীর্থদের কাছ থেকে সময়ক্ষেপণের যে অভিযোগ ও উপহাস মাঝেমধ্যে তারেকের কপালে জুটেছে তার একটা সাচ্চা জবাব দেওয়ার জন্যে তিনি তৈরি হচ্ছেন। কারণ, এর আগে তারেক ১৬ মি.মি সেলুলয়েডে কোনোকিছু ধারণ করেছেন বলে মনে হয় না। সমাজে নারীদের অবস্থান ও কীভাবে শোষণ করা হয় তা নিয়ে কেবল একটি ভিডিও প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছেন। তখনকার যুগের ভিডিওতে চলচ্চিত্রিক ভাষা তৈরির অবকাশ তেমন ছিল না। সুলতানের ওপর তোলা প্রামাণ্যচিত্র যেহেতু সেলুলয়েডে তাই এর দৃশ্যশ্রাব্য মান যাচাইয়ের সুযোগ ছিল। তারেক ও মিশুকের কাজ উচ্চমান অর্জনের প্রয়াস হিসেবে দর্শকদের আশান্বিত করতে পেরেছিল।

তারেকের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ ও ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর্বটা হয় কানাডার টরন্টো শহরে। ১৯৯২ সালের মে মাসে আমরা বেঙ্গল ফোরাম থেকে ইউক্লিড থিয়েটারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রথমবারের মতো কানাডায় বাংলাদেশের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করি। তারেক তখন নিউইয়র্কবাসী। জীবনসঙ্গী ক্যাথরিনকে নিয়ে মুক্তির গান সম্পাদনা নিয়ে ব্যস্ত। মাঝেমধ্যে টেলিফোনে আলাপ হয়। তারেকই ছিলেন এই প্রদর্শনীর ভরসা। তিনিই আমাকে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন প্রদর্শনীর মূল রসদ ছবি যোগাড়ের ব্যাপারে। মূলত তাঁরই তোলা ৫টি ও মোরশেদুল ইসলামের আগামী এবং জাকির হোসেন রাজুর মিছিলের মুখ নিয়ে ছিল ওই আয়োজন। আরও একটি উদ্দেশ্য ছিল এই প্রদর্শনীর। সেটা হচ্ছে মুক্তির গান (সম্ভবত নামটি তখনও নির্ধারিত হয় নি) এর সম্পাদনা শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা। প্রদর্শনীতে মুক্তির গান-এর আকাঁড়া মুদ্রণের কিছু সম্পাদিত অংশ দেখানো হয়েছিল। বলা বাহুল্য মুক্তির গান-এর অংশবিশেষ দেখে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল বাঙালি দর্শকেরা, অন্যদিকে অবাঙালি দর্শকদের আকৃষ্ট করেছিল শিল্পী সুলতানের ওপর তোলা প্রামাণ্যচিত্র আদম সুরত। সেই যাত্রায় আমাদের বাসায় তারেক যে ক’টা দিন থেকে আলাপে আড্ডায়, নিজের রান্না খাইয়ে যে সঙ্গসুখ দিয়েছিলেন তার তুলনা হয় না। বিশেষ করে অগ্রজ বন্ধু দিনু বিল্লাহসহ আমরা যখন তারেককে নিয়ে নায়াগ্রা জলপ্রপাত সন্দর্শনে যাচ্ছিলাম সে-সময় আহমদ ছফার নানা অজানা চালচিত্র তারেক রসিয়ে রসিয়ে আমাদের শুনিয়েছিলেন। ছফা ভাইয়ের বিশিষ্ট বাচনভঙ্গি অনুকরণে তারেক ছিলেন অদ্বিতীয়। দিনু বিল্লাহর জন্যে ছিল তা বাড়তি পাওনা। কেননা ছফা’র প্রাক-৭১ পর্বের অন্যতম সহচর ছিলেন দিনু। তারেকের সঙ্গে চলচ্চিত্র নিয়ে আমার একান্তে আলাপে প্রাধান্য পেয়েছিল সত্যজিৎ রায়। একমাস আগে অর্থাৎ এপ্রিলে সত্যজিতের মৃত্যু হয়। নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ইংরেজি পাক্ষিক ভয়েস অব বাংলাদেশ-এ তারেক সত্যজিতের ওপর শ্রদ্ধাঞ্জলি-জাতীয় একটা রচনা লিখেছিলেন। তারেকের সঙ্গে চলচ্চিত্র নিয়ে যতবারই আলাপ হয়েছে ঘুরেফিরে আমরা সত্যজিতে এসে থেমেছি। ওই প্রথম তারেকের কাছে কাহিনীচিত্র করার অভিলাষ সম্পর্কে জানতে পারি। চলচ্চিত্র নিয়ে যাদের কাজ-কারবার তাঁদের অনেকেই বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় আগামী ছবির কাহিনী, গল্প বা বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেন। তারেকও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। ’৯২-তে আমাকে টরন্টোর বাসায় বসে তারেক আগামী ছবির বিষয়বস্তু সম্পর্কে বলতে গিয়ে এমন একটি দৃশ্যের পরিকল্পনা শুনিয়েছিলেন যার বাস্তবায়ন পরে দেখতে পেয়েছি তাঁর প্রথম কাহিনীচিত্র মাটির ময়না-তে।

তারেক আর ক্যাথরিন নিউইয়র্ক ছেড়ে স্থায়ীভাবে থাকা ও কাজ করার জন্যে ঢাকায় ফেরত গেলে ওঁর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ালো টরন্টোবাসী বন্ধু গল্পকার, প্রাবন্ধিক সাদ কামালী। ইনি সম্পর্কে তারেকের চাচাতো ভাই এবং নিজেও চলচ্চিত্রের একনিষ্ঠ দর্শক-সমালোচক। ২০০৩ সালে কানাডার মঁগিয়েল (আমাদের চলে আসা উচ্চারণে মন্ট্রিয়ল) চলচ্চিত্রোৎসবে তারেকের মাটির ময়না এবং তানভীর মোকাম্মেল-এর লাল সালু আমন্ত্রিত হয়। তারেক খুব করে অনুরোধ করলেন টরন্টো থেকে যেন মঁগিয়েল আসি তাঁর ছবিটা দেখার জন্যে এবং সম্ভব হলে মিশুককে সঙ্গে নিয়ে। ইতোমধ্যে মিশুক পরিবার নিয়ে কানাডার অভিবাসী হিসেবে টরন্টোতে তাঁবু ফেলেছে। তখনও পর্যন্ত আমার সঙ্গে মিশুকের সাক্ষাৎ দু-একবারের বেশি নয়। তারেকের উপরোধ ছাড়াও ৬০০ কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে মঁগিয়েল এমনিতেই যেতাম কেননা প্রথম কারণ ছিল কান-এর মতো বনেদী একটা চলচ্চিত্রোৎসবে মাটির ময়না ফিপ্রেসি পুরস্কার পেয়েছে, দ্বিতীয় কারণ ছিল মঁগিয়েল চলচ্চিত্রোৎসবে টরন্টো চলচ্চিত্রোৎসবের মতো জাঁকজমক, ঢক্কানিনাদ না থাকলেও টিকেটের স্বলপমূল্য ও ছবি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে হলিউডের প্রাধান্য না থাকা। যাওয়ার মুহূর্তে মিশুকের সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়াতে মঁগিয়েল একাই গেলাম। মাটির ময়না-র প্রদর্শনী শেষে এক অনির্বচনীয় শ্লাঘায় হলের মধ্যে শিহরতি হচ্ছিলাম যখন পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহের দর্শককুল করতালি দিয়ে ছবি ও পরিচালককে অভিনন্দিত করেছিল। আবেগাপ্লুত হয়ে তারেককে আলিঙ্গন করেছিলাম প্রেক্ষাগৃহের লবিতে। প্রদর্শনীর পর তারেক ও ক্যাথরিন আমাদের সঙ্গে হলের বিপরীতে এক ক্যাফেতে এলেন আড্ডা দিতে এবং আমাদের প্রতিক্রিয়া জানতে। ওই আড্ডাতে তারেক শুনিয়েছিলেন মাটির ময়না-তে পথের পাঁচালী-র ক্রস রেফরেন্স─আনু-আসমা বনাম দুর্গা-অপুর সম্পর্ক এবং আসমা-দুর্গার ট্র্যাজিক মৃত্যু; কান-এ সাফল্য লাভের পর খসরু ভাইয়ের কাছ থেকে অভিনন্দন পাওয়া, ছবি সম্পর্কে সলিমুল্লাহ খানের মতামত এমনতরো নানা সংবাদ। আমাদের ওই আড্ডাতে তারেক অন্য যে চলচ্চিত্রকারের কাজকর্ম নিয়ে উচ্ছ্বসিত মন্তব্য করেছিলেন তিনি ইরানের আব্বাস কিয়ারোস্তামি। কিয়ারোস্তামির কাজ ও জীবনদর্শনের প্রতি তারেকের আগ্রহের প্রমাণ পাই বাংলা জর্নাল-এ প্রকাশিত তাঁর রচনা ‘Journey of art in Time/Film as a fellow traveler’-এ। মাটির ময়না একমাত্র বাংলাদেশী চলচ্চিত্র টরন্টোর সিনেমাথেক অন্টারিও-তে পরের বছর অর্থাৎ ২০০৪ সালের জুন মাসে যার একাধিক প্রদর্শনী হয়। এর আগে কেবল পশ্চিমবঙ্গের সত্যজিৎ ও ঋত্বিকের চলচ্চিত্রই এখানে দেখানো হয়েছিল। আমদের জন্যে এটা শ্লাঘার বিষয় এ-কারণে যে সিনেমাথেক-এ সাধারণত সে-সব চলচ্চিত্রকেই প্রদর্শনীর জন্যে বাছাই করা হয় যেগুলো শিল্পগুণ সমৃদ্ধ ধ্রুপদী চলচ্চিত্ররূপে সারাবিশ্বে স্বীকৃতি পেয়ে থাকে।

মাঝখানে দীর্ঘ বিরতি দিয়ে তারেকের সঙ্গে আবার দেখা ২০০৯ সালে টরন্টোতে নরসুন্দরমুক্তির কথা-র প্রদর্শনী সূত্রে। ইতোমধ্যে টরন্টোবাসী মিশুকের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ও আলাপচারিতা বেড়েছে। ওই প্রদর্শনীর আয়োজনের জন্যে মিশুক পরামর্শ চাইলে আমি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের সংগঠনকে যুক্ত করতে পারলে ভালো হবে বলে জানাই এবং প্রথাগত পোস্টার, লিফলেট মুদ্রণ ও বিলিতে অযথা ব্যয় না করে ই-মেইল ও বৈদ্যুতিন সংযোগমাধ্যমে প্রচার কার্যকরী হবে বলে অভিমত প্রকাশ করি। কথাটা মিশুকের মনে ধরেছিলো এবং বলেছিল, এজন্যেই তো তোমাকে ফোন করেছি, এসব কাজে ব্রেইনস্টর্মিং দরকার। প্রদর্শনীর সময় তারেক বলেছিলেন নরসুন্দর-এর কাহিনীর ছকটি অনেকদিন তাঁর মাথায় থাকলেও করা হচ্ছিল না কিন্তু মিশুকের উপর্যুপরি তাগিদে শেষ পর্যন্ত ছবিটা আলোর মুখ দেখলো।

প্রদর্শনীর পরদিন মিশুকের বাসায় তারেক ও ক্যাথরিনের সঙ্গে জম্পেশ আড্ডা। এসেছিলেন আফসান চৌধুরী, সেলিম সামাদ, সৈয়দ ইকবাল, আহমেদ হোসেন, শেখর গোমেজ প্রমুখ। সেদিন কে জানত আমরা যারা টরন্টোবাসী তাদের সঙ্গে তারেক-মিশুক শিল্পসহোদরের সঙ্গে এটাই হবে শেষ আড্ডা!

মিশুককে যতটুকু জানি তার কাজের মাধ্যমেই। বাংলাদেশে প্রথম তাকে আবিষ্কার করি একজন মেধাবী স্থির আলোকচিত্রীরূপে অলিয়ঁস ফ্রঁসেজ-এর পূর্বোল্লিখিত সেই প্রদর্শনী সূত্রে। পরে তার মেধা ও দক্ষতার প্রমাণ পেলাম তারেকের আদম সুরত দেখে। ক্যামেরার পেছনে থেকে শিল্পসুষমা গড়ার আকর্ষণ মিশুকের কাছে এতো তীব্র ছিল যে সাংবাদিকতার শিক্ষকতা এবং সংবাদমাধ্যমের নানা নির্বাহী দায়িত্বও তাকে আটকে রাখতে পারে নি। একুশে টেলিভিশনের অন্যতম নির্বাহী ফুয়াদ ভাই (ফুয়াদ চৌধুরী) একবার টরন্টো এলে তাঁর মুখে শুনেছিলাম ডেস্ক ছেড়ে ক্যামেরা নিয়ে ছোটার বেলায় মিশুকের অদম্য আগ্রহের কথা। ঢাকায় থাকাকালীন তারেককে যতটুকু চিনেছি বা জেনেছি ততটা চেনাজানা মিশুকের সঙ্গে আমার হয় নি। চেনাজানার সুযোগটা পাই ও সপরিবারে অভিবাসন নিয়ে কানাডায় চলে আসার পর। মিশুক ও তার জীবনসঙ্গী মঞ্জুলির সঙ্গে যোগাযোগের মাত্রাটা বেড়েছে আমার প্রিয় শিক্ষক প্রয়াত জিয়া হায়দারের টরন্টো সফরের সময়। ২০০৭ সালে স্যার অপার স্নেহ ও ভালবাসার স্পর্শ দিয়েছিলেন দুই রাত্রির জন্যে আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করে। স্যারের সম্মানার্থে এক সন্ধ্যায় কিছু ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম তাঁর কবিতা ও কথা শোনার জন্যে। সে-সময় স্যারের অনুরোধে ওই আয়োজনে মিশুক ও মঞ্জুলির উপস্থিতি আমাকে নিশ্চিত করতে হয়। মিশুক আমার স্যারের স্যার শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর সন্তান। গুরুর সন্তানের প্রতি শিষ্যের স্নেহ ও ভালোবাসা প্রকাশের ধরন কেমন তা সেদিন মিশুক ও মঞ্জুলির সঙ্গে স্যারের সাক্ষাতের ঘটনায় উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছিলাম।

কানাডার মূলধারার গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে মিশুকের যাত্রা শুরু হয় সম্ভবত সিবিসি-র (কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন) সমকালীন প্রসঙ্গ নির্ভর বিতর্কমূলক অনুষ্ঠান কাউন্টারস্পিনের ক্যামেরার কাজের মাধ্যমে। অনুষ্ঠানটি একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কিছুদিন পর মিশুকের সঙ্গে একদিন দেখা হলো সেন্টজর্জ সাবওয়ে স্টেশনে। সেদিন আমাদের দুজনের মধ্যে কানাডায় কাজে কানাডায় স্থায়ী হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ করে অভিবাসীদের জন্যে যে হতাশজনক পরিস্থিতি বিরাজমান তা নিয়ে অনেক আলাপ হয়েছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম মিশুক কী ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ৯০-এর দশকে আমারও একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল সিবিসি-তে টানা তিন বছর কাজ করার পর। করপোরেট ডাউনসাইজিং বলে কথা! বেশ কিছুদিন মিশুককে ফ্রিল্যান্স ক্যামেরার কাজ করতে হয়েছে। একসময়ে মিশুক টরন্টোর সানিব্রুক হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারেও ক্যামেরার কাজ করেছেন। ভাগ্যের এমনই পরিহাস যে মিশুক কিনা ট্রমা সেন্টারে ভর্তি হওয়া দুঘর্টনায় আহতদের জরুরি চিকিৎসার পর্ব চিত্রায়িত করার কাজ করেছিলো তারই জীবনের অবসান ঘটলো অনুরূপ পরিস্থিতির শিকার হয়ে। তো সেদিন সাবওয়ে স্টেশনের ওই সাক্ষাতে মিশুক বলেছিল পল জে (কাউন্টারস্পিনের প্রযোজক ও পরিকল্পনাকারী) এবং আরও কয়েকজন মিলে তারা নতুন একধরনের টেলিভিশন অনুষ্ঠানের চিন্তা-ভাবনা করছে যা ব্রডব্যান্ডের মাধ্যমে লাইভস্ট্রিম-এ দেখা যাবে। আমি যখন সিবিসি টেলিভিশনের সংবাদমাধ্যমে কর্মরত ছিলাম তখন কনভারজেন্স অব মিডিয়ার কথাটা বেশ চালু হয়ে গিয়েছিল। মিশুকের সঙ্গে আলাপ হলে প্রায়শ এসব প্রযুক্তির হালফিল সম্পর্কে জানতে পারতাম। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমের ক্রমবর্ধমান সমকেন্দ্রাভিমুখ বিকাশ সম্পর্কে মিশুক নিজেকে এতো বেশি হালনাগাদ রাখতো যে ওর সঙ্গে আলাপে এসব বিষয়ে নিজেকে অবগত রাখার সুযোগ মিলতো। বাংলাদেশে যাওয়ার আগে মিশুক ওর বাসায় সান্ধ্যভোজে আমাদের শুনিয়েছিল এটিএন-এ যোগ দেওয়ার কারণ এবং নাগরিক সাংবাদিকতা বা সিটিজেন জার্নালিজম নিয়ে নতুন কিছু একটা করার স্বপ্নের কথা।
পল জে এবং মিশুকদের সেই প্রস্তাবিত বিকল্প সংবাদমাধ্যম রিয়েল নিউজ টরন্টো থেকে যাত্রা শুরু করে আন্তর্জালিক সাক্ষাৎ বৈদ্যূতিন প্রবাহ (Online live streaming) মারফত। কাউন্টারস্পিন, রিয়েল নিউজ-এর বিষয়বস্তু নির্বাচন এবং দৃষ্টিকোণ প্রগতিবাদী শিবিরভুক্ত। পল জে-র সঙ্গে স্বল্পসময়ের মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠা এবং একসঙ্গে কাজ করার মধ্য দিয়ে মিশুকের রাজনৈতিক ঝোঁক সম্পর্কে সহজেই ধারণা লাভ করা যায়। নামটা মনে নেই সম্ভবত সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক রে ম্যাকগভার্ন-ই হবেন যাঁর সাক্ষাৎকার ক্যামেরায় ধারণ করার সুবাদে মিশুক বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হত্যায় পাকিস্তানের আইএসআই-কে পরামর্শ দেওয়ার ব্যাপারে সিআইএ-র সংশ্লিষ্টতা থাকার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করার পরিকল্পনা করছে বলে একদিন কথায় কথায় জানিয়েছিল। সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পেরেছি তারেক ও মিশুকের একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজের দুই গুররুত্বপূর্ণ সাক্ষী হওয়ার কথা ছিল!

একাত্তর
তারেক ও মিশুক এই হিরন্ময় ঐতিহাসিক সময়ের জাতক, শারীরিক নয় মানসিক অর্থে। যে-প্রজন্মটি তার কৈশোরের সীমারেখায় মুক্তিযুদ্ধকে অবলোকন করেছে, যুদ্ধে সরাসারি অংশ না নিলেও নিজের অমিত সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শিখেছে সে-প্রজন্ম যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে শিকার হয় বিকৃত ইতিহাসচর্চা এবং পশ্চাদ্গামী সময়ের। তারেকের স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্যচিত্রের প্রকল্পগুলিকে এই তমসাময় অপস্রোতকে রুখে দাঁড়াবার প্রয়াস হিসেবেই দেখতে হবে। মুক্তির গান যদি বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাসচর্চার ধারাকে সরিয়ে একাত্তরের জাগরুক সময়কে সঠিকপথে প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে মাইলফলক ধরা যায় তো মুক্তির কথা-কে বলতে হবে তারেকের গভীর ইতিহাসবোধ ও শ্রেণিসচেতন দৃষ্টিভঙ্গির সম্মিলনে চলচ্চিত্রিক উৎকর্ষ আয়ত্ত করার আয়োজন। তারেক নিজের শিল্পযাত্রার কাহিনী শোনাতে গিয়ে সুলতানের ওপর প্রামাণ্যচিত্র তৈরির সময় গ্রামবাংলাকে নতুনভাবে আবিষ্কারের কথা বলেছেন। যেহেতু মিশুক এই দীর্ঘ আট বছরের নির্মাণকালে ক্যামেরাকাঁধে ছিল তারেকের সহযোদ্ধা তাই অনুরূপ উপলব্ধি তারও হয়েছে বলে অনুমান করতে পারি। যাপিত জীবনের পরিসরটি তারেকের ক্ষেত্রে অনেক বিস্তৃত। শাহরিক ও নাগরিক মধ্যবিত্ত সমাজের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অনেকজনের বন্ধু, আত্মীয় ও স্বজন হওয়ার সুবাদে তারেক একদিক থেকে যেমন এই শ্রেণীর সুকৃতি ও স্বার্থসংকীর্ণতা, সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতাকে বুঝতে পেরেছিলেন তেমনি অন্যদিকে শিক্ষাজীবনের শুরুটা মাদ্রাসায় হওয়ার দরুন নিম্নবর্গের আচরিত জীবন ও লোকায়ত দর্শনের স্পন্দনকে অনুভব করার চেষ্টা করেছেন। প্রচলিত বাম রাজনীতির সঙ্গে তারেকের সংশ্লিষ্টতা হালকাভাবে হলেও ছিল এবং এই ধারার সাংস্কৃতিক তৎপরতায় শৈল্পিক ও নান্দনিক উৎকর্ষ অর্জনের ক্ষেত্রে অনাধুনিকতার যে যে জাড্য আঁকড়ে থাকে তারেক সে-সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। এ-কারণে তারেক চলচ্চিত্রের মতো একটি আধুনিক শিল্পমাধ্যমের সর্বগামিতার পরিধি যাচাই করতে নিজের ছবির প্রদর্শনীগুলোর আয়োজনে প্রচলিত ব্যবস্থার বিকল্প অনুসন্ধানে যেমন উদ্যোগী ছিলেন তেমনি দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমের পরবর্তী প্রকল্পের উপজীব্য আহরণেও ছিলেন সদাসচেষ্ট। তারেকের এই শিল্পযাত্রায় আরেক অবিভাজ্য উপাদান তাঁর জীবনসঙ্গী ক্যাথরিনের মতো সহশিল্পীর সংযোগ। বস্তুত আদম সুরত থেকে শুরু করে তারেকের পরবর্তী সকল চলচ্চিত্র প্রকল্পে চিত্রনাট্যরচনা, সম্পাদনা, সংগীতসহ পরিচালনার সার্বিক কাজে ক্যাথরিনের অংশভাগ আলাদা করে পরিমাপের সুযোগ নেই। তাঁরা কাজ করে গেছেন যৌথশিল্পীরূপে, একে অপরের সম্পূরক হিসেবে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের সার্বিক দৌর্বল্যকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক আঙিনায় সম্মান অর্জনের পথটি তারেক করেছেন তাঁর প্রথম কাহিনীচিত্র মাটির ময়না-র মাধ্যমে। যেকোনো শিল্পকর্মের ধ্রুপদী অবস্থান নির্ণীত হয়ে থাকে তার সূক্ষ্ম দ্যোতনার জোরে। মাটির ময়না-র কাহিনী তারেকের শৈশব-কৈশোরের জীবনাভিজ্ঞতার ভিত্তিতে হলেও এর বৃহৎ প্রেক্ষাপটে ধরা আছে বাঙালি মুসলমানের ঘরে প্রত্যাবতর্নের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক উন্মেষের পর্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন। আপাত দৃষ্টিতে ৯/১১ পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতির ক্রূর ক্রীড়ণকের তৈরি স্থূল বিকার মুসলিমাতঙ্কের ডামাডোলে বীতশ্রদ্ধ মুক্তমনাদের কাছে মাটির ময়না-র আকর্ষণ এই একরৈখিকতার পাল্টা প্রতিক্রিয়াসঞ্জাত মনে হলেও চলচ্চিত্রটির কাহিনীতে অন্যান্য যে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক উপাদানের দ্যোতনা বিদ্যমান তার প্রাসঙ্গিকতা দীর্ঘস্থায়ী হবে বলেই আমার ধারণা। তাছাড়া বিশ্ব চলচ্চিত্রের ধারা পর্যালোচনায় কাহিনীর গড়ন, ঘটনার সংবেদন, পরিবেশনা এবং চলচ্চিত্রিক ভাষা নির্মাণের যে ঐতিহ্য সত্যজিতের হাতে পরিণতি পেয়ে এক স্বকীয় উপমহাদেশীয় বিশিষ্টতা অর্জন করেছে মাটির ময়না তার অন্যতম প্রতিভূরূপেও গণ্য হবে বলে আমার বিশ্বাস। অন্তত টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ এশীয় সমাজ-সংস্কৃতি বিষয়ে শিক্ষকতার সুবাদে পাঠ্যক্রমে অন্যান্য চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মাটির ময়না-র অন্তর্ভূক্তি ও ব্যবহার থেকে এতোটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথাটা বলছি। তারেক এর পর করেছেন অন্তর্যাত্রা, নরসুন্দর এবং রানওয়ে। দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে আসছিলেন ‘কাগজের ফুল’ নিয়ে, যার লোকেশন বাছাই করতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় বন্ধু ও সহশিল্পী মিশুকসহ অপমৃত্যুর শিকার হলেন। ‘কাগজের ফুল’-এর কাহিনী মাটির ময়না-র পূর্বভাগ হিসেবে পরিকল্পিত যার বিষয় হিসেবে ’৪৭-এর দেশভাগ এবং তারেকের জনকের অভিজ্ঞতার অংশ থাকার কথা সংবাদমাধ্যমে জানতে পেরেছি। কাহিনীচিত্রের দিক থেকে এই প্রকল্প তারেকের কাছে মাটির ময়না-র পর সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়ে আসছিল। মাঝখানের তিনটি চলচ্চিত্রকে তিনি হাত মকশো করার কিংবা বড় ধরনের কাজে নামার অনুশীলনী মনে করেছেন। একই প্রক্রিয়ায় মিশুকও তৈরি হচ্ছিল কেননা নরসুন্দর থেকে তারেকের অত্যাবশ্যক সহশিল্পী হিসেবে ক্যামেরার কাজটি করে আসছিল সেই-ই।

এক সাক্ষাৎকারে অন্যের গল্প বা কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর চিন্তা-ভাবনা আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক না-সূচক উত্তর দিয়ে জানিয়েছিলেন নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার বাইরে তিনি ছবি করেন না। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেতিহাসে তারেক মাসুদ একদিক থেকে বলতে গেলে ওতাগ (auteur) চলচ্চিত্রকার হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছিলেন। তাঁর করা স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র ছাড়াও প্রামাণ্যচিত্রের বেলায়ও তারেক যে ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো কথিত ওতাগ (auteur) চলচ্চিত্রকারের প্রামাণ্য বৈশিষ্ট্যগুলোকে ধারণ করেছিলেন তার সবচে বড় প্রমাণ লিয়ার লেভিন চিত্রায়িত সেলুলয়েডকে মুক্তির গান-এ রূপান্তর এবং তারই সূত্র ধরে স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্য এক আখ্যানের সন্ধানে মুক্তির কথা বলা। ইতিহাসের গভীর ক্ষত দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের যে ভাষ্য ঋত্বিকের হাতে তৈরি হয়েছে পরবর্তী প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারদের পক্ষে সে ভাষ্যটা পাল্টে যাওয়া বা ভিন্ন হওয়া স্বাভাবিক সময়ের দূরত্ব এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে। এ সত্ত্বেও অনুরূপ সংবেদনশীলতায় ইতিহাসের এই ক্ষতকে আবার ফিরে দেখতে চেয়েছেন চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল তাঁর চিত্রা নদীর পারে কাহিনীচিত্রে। আমরা আবার যখন সময়ের প্রেক্ষাগৃহে দেশভাগ নিয়ে ‘কাগজের ফুল’-এ কী ভাষ্য ফুটে উঠবে তা দেখার অপেক্ষায় দিন গণনার কাজ শুরু করেছি তখনই ক্যাথরিনকে একা করে দিয়ে এই নির্মাণাধীন যৌথশিল্পের দু’জন অন্যতম কুশলীকে অপহরণ করলো অপমৃত্যুর আঘাত!

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: ইকবাল করিম হাসনু
ইমেইল: ihasnu@hotmail.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.