ভ্রমণ

সুন্দরবন: এক সবুজ বস্ত্রখণ্ড! (২)

নূরুল আনোয়ার | 4 Sep , 2011  

কিস্তি ১

(গত কিস্তির পর)

DSC00953.jpgআগেই বলেছি সুন্দরবন অপূর্ব সুন্দর। কিন্তু বৃহত্তর চট্টগ্রামের মত বৈচিত্র্য নেই। নদী আর বন এ দুয়ের সমন্বয়ে সুন্দরবন। সিডরের আগে সুন্দরবন কী রকম ছিল আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। সবুজের ঘন অরণ্য দেখে আমার মনে হয়েছে সুন্দরবন কোনো কালে কোনো অশুভ শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হয়নি। নদীর দু’পাশে বেশ কিছু গাছ মরে আছে। আমি অনুমান করেছিলাম এগুলো সিডর দ্বারা আক্রান্ত। পরে শুনেছি গাছে মরক লেগেছে। কারণ হিসেবে অনেকে মন্তব্য করলেন নদীর পানিতে লবণের ভাগ বেড়ে যাওয়ায় এগুলো মরতে বসেছে।

DSC00840.jpgবাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বই-পুস্তকে আমরা এ কথাটি হামেশা পড়ে আসছি। সুন্দরবন গিয়ে আমি টের পেতে থাকলাম নদী কত প্রকার ও কী কী। আমরা খুলনা শহরের পাশের ভৈরব নদে ভেসে ভেসে রূপসা এসেছিলাম। তারপর পশুর হয়ে শ্যালা নদী। শ্যালা নদী পেছনে ফেলে গেলাম হরিণটানা। তারও পরে দুধমুখী এবং সুবতী হয়ে পৌঁছলাম কচিখালিতে। কচিখালিটি একেবারে সাগরের মোহনায়। এখানে যখন এলাম তখন সন্ধে সাতটা বাজে। বাবুল সাহেব আমাকে জানিয়েছিলেন, সন্ধের আগে পৌঁছতে পারলে আমাদের কচিখালি খালে নিয়ে যাবেন। সেখানে প্রচুর হরিণ দেখা যাবে। কিন্তু সে আশা আমাদের মাঠে মারা গেল।

আমাদের জাহাজ কচিখালির মোহনায় নোঙ্গর করা হল। সাগরের ঢেউ লেগে নৌকা দোল খেতে আরম্ভ করল। দুপুরে আমাদের সরিষা ইলিশ, মুরগি, সবজি, ঘন ডাল দিয়ে খাইয়েছিল। রাতের খাবারের তালিকায়ও একই খাবার ছিল। কেবল মাছটার পরিবর্তন ঘটেছিল। দুপুরে সরিষা ইলিশ খেয়েছিলাম, আর এখন খেলাম কোরাল মাছ। প্রতি বেলায় খাবার শেষে কোনো না কোনো রকম মিষ্টি জাতীয় খাবার থাকতই।

DSC00839-gol-pata.jpgরাতের খাবার সেরে আমি শিল্পী এবং আপনকে নিয়ে জাহাজের এক কোণায় গিয়ে বসলাম। সারাদিন মেঘের আনাগোনা ছিল। তার মানে কখনও সূর্যের মুখ দেখা যেত, কখনও থমথমে। কিন্তু রাতের আকাশে কোনো মেঘ ছিল না। সেদিন ছিল দ্বাদশী। গোলাকার চাঁদের আলোতে কচিখালির পানি চিকচিক করছিল। সাগরের পানি এবং সুন্দরবন এক অন্যরকম দৃশ্যে রূপ নিয়েছিল। জোছনা রাতের এ সৌন্দর্য আমাদের এক বাড়তি আনন্দ দিয়েছিল। ভ্রমণপিপাসুদের বলি, যারা সুন্দরবনে যাবেন তারা যেন পূর্ণিমাকে সামনে নিয়ে যান। তার সৌন্দর্য দিনের সৌন্দর্যের সঙ্গে কোনো ভাবে মেলানো যাবে না। রাতের এ দৃশ্য আমার কাছে মনে হয়েছিল কলা বেচতে এসে রথ দেখার মত। সন্ধের আগমুহূর্তেও আমি মনে করতে পারিনি ভরা যৌবন নিয়ে চাঁদ আজ আকাশে থাকবে, যার সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে উঠবে।

সত্যি বলতে কী, সারাদিন আমি জাহাজে ঘুরে বেড়িয়েছি। নদীর পর নদী দেখেছি, সুন্দরবনের সবুজের মেলা দেখে অভিভূত হয়েছি, কিন্তু ওসবের মধ্যে আমি কোনো রকম বৈচিত্র্য খুঁজে পাইনি। রাতে গোলাকার চাঁদখানা যখন ধরাপৃষ্ঠে অবারিত আলো ঢেলে দিল আমার ভ্রমণটা যেন অসম্ভব রকম মূল্যবান হয়ে উঠল। শিল্পী বলল, সারাদিন একই রকম দৃশ্য দেখে দেখে এক সময় মনে হয়েছিল ফিরে চলে যেতে পারলে বাঁচি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে জীবনে হাজার রাত আসবে যাবে, এরকম রাতের দেখা কি আর কখনও পাব?


রাতের খাবারের পর জাহাজের লোকজন বলেছিল আমরা যদি হরিণ দেখতে চাই তাহলে ভোর পাঁচটায় উঠতে হবে। খুব ভোরে হরিণের দল পানি খেতে খালে নেমে আসে। বেলা বাড়তে বাড়তে ওরা আবার গহীন অরণ্যে চলে যায়। আমরা সকাল পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠব এটা মাথায় ছিল। আমি ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম। শিল্পীকে বললাম, খুব ভোরে উঠতে হবে। আগে আগে ওঠা না গেলে বাথরুমে যাওয়া যাবে না। একবার লাইন লেগে গেলে সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে।

আমরা কেবিনে ফিরে এলাম। জাহাজে এতক্ষণ জেনারেটর চালু ছিল। বারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে তা বন্ধ করে দেয়া হল। সুতরাং জাহাজে একরকম নিস্তব্ধতা নেমে এল। আমরা শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে অল্প সময়ের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লাম।

ভোর পাঁচটায় ঘড়িতে অ্যালার্ম বেজে উঠল। আমি ধড়মড় করে উঠে পড়লাম। শিল্পীকে বললাম, আপনকে জাগিয়ে দাও।

অন্যদিন শতবার ডাকাডাকি করলেও সে ঘুম থেকে উঠতে চাইত না। আজ হরিণ দেখতে যাব এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সেও উঠে পড়ল। বাথরুমে গিয়ে দেখি বাথরুম আগে থেকে দখলে চলে গেছে। বিশেষ করে মহিলারাই আগে থেকে উঠে পড়েছে। আমি তো আর মহিলাদের সঙ্গে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে পারি না। বাথরুমের বাইরে একটি বেসিন ছিল। তার সঙ্গে একটা আয়নাও ছিল। আমি ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাড়ি কাটাটা সারলাম। ইতোমধ্যে শিল্পী নিজে ফ্রেশ হয়ে আপনকেও প্রস্তুত করে নিয়েছে। এক সময় বাথরুমে মহিলাদের আনাগোনা থেমে গেল। আমি বাথরুমে ঢোকার সুযোগ পেলাম। গোসলটা সারব ভেবেছিলাম। কিন্তু সাহস করতে পারলাম না। সকাল বেলাটায় বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছিল। শরীরের অবস্থা এমনিতে ভাল নয়। তার ওপর সকাল সকাল গোসল করে যদি ঠাণ্ডা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ি আমাকে কাঁথা-বালিশ নিয়ে শুয়ে কাটাতে হবে।

ছ’টা তখনও বাজেনি। আমাদের ডাক পড়ল ইঞ্জিন চালিত নৌকায় উঠে পড়ার জন্য। সূর্য উঠতে খানেকটা বাকি। একটু দেরি করলে আমাদের উদ্দেশ্য সাধন হবে না। আমরা যে যেই অবস্থায় ছিলাম নৌকায় উঠে পড়লাম। আমি খুলনা থেকে দেখে আসছিলাম জাহাজের পেছনে দুটো নৌকাকে টেনে নিয়ে আসা হচ্ছে। এগুলো কেন নিয়ে আসা হচ্ছিল তখনও মাথায় আসেনি। চিন্তাও করিনি এগুলো কী কাজে আসবে। এখন বুঝতে পারলাম নৌকাগুলোর গুরুত্ব কোথায়।

নৌকা দুটোয় আমরা বেশ ভালভাবে বসেছিলাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন দুই নিরাপত্তারক্ষী আবদুর রাজ্জাক এবং নূর হোসেন। একজন গাইডও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তার নামও আবদুর রাজ্জাক।

আমরা নানা জায়গা থেকে আসা মানুষ। আমাদের কারও সঙ্গে কারও পরিচয় নেই। কিন্তু আমরা জাহাজে ওঠার পর থেকে একে অপরের পরিচিত হয়ে উঠলাম। আর আমরা এমনভাবে মেলামেশা করতে থাকলাম যেন অনেকদিনের পরিচিত। আমরা যারা ছিলাম বেশিরভাগই চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী। সাত আটজন তরুণ ছিল তারা দেখলাম বেশ ভদ্র। আমরা একে অপরকে মানিয়ে নিয়ে নৌকায় করে ছুটে চললাম। উদ্দেশ্য আমরা কচিখালি খালে যাব, যেটা বেশ চিকন। সাগর থেকে দশ পনের মিনিট চলার পর আমাদের নৌকা কচিখালি খালে পৌঁছে গেল। গহীন অরণ্যের ভেতর দিয়ে তার পথচলা। খালটির এপাড়ের গাছের ডালপালা আর পাড়ের গাছকে ছুঁয়েছে। আমাদের দু’ নৌকায় দু’জন নিরাপত্তারক্ষী। গাইড আবদুর রাজ্জাক আমাদের নৌকায় ছিলেন। তিনি সতর্ক করে দিলেন কোনো রকম শব্দ করা যাবে না। মানুষের সাড়া পেলে হরিণ কাছে ঘেঁষতে চায় না। আমাদের নৌকার গতিও কমিয়ে দেয়া হল, যাতে ইঞ্জিনের শব্দটা তাদের কোনো রকম সমস্যা সৃষ্টি না করে।

আমরা যখন কচিখালি খালে ঢুকলাম আরও একটা নৌকার দেখা পেয়ে গেলাম। ও নৌকায় কয়েকজন বিদেশীও ছিলেন। নৌকাটা আগে আগে থাকায় আমাদের কিছুটা ব্যাঘাত ঘটাল। যেহেতু নৌকাটি আগে আগে, সুতরাং আমাদের হরিণের দেখা পাবার কথা নয়। তারপরেও আমরা বেশ কয়েকটি হরিণের দেখা পেয়ে গেলাম। দু’ তিনটি হরিণ দেখলাম বেশ বড়। হরিণ বেশ সুন্দর প্রাণী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার চেয়ে বড় সুন্দর হল তার চাহনি। সে যখন ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে ফিরে তাকায় তখন তাকে গ্রামের লাজুক বধূর মত দেখায়। হরিণ মানুষ দেখলে দ্রুত পায়ে পালিয়ে যায় না। খুব ধীরপায়ে সে গাছের আড়ালে চলে যায়।

আমরা হরিণ দেখলাম বটে, কিন্তু ঘন জঙ্গলের কারণে তাদের কোনো ছবি তোলা গেল না। কচিখালি খালে ঢুকে প্রথম আমি সুন্দরবনকে কাছে থেকে দেখলাম। দেখলাম ম্যানগ্রোভ বন।

সুন্দরবনের খালগুলো খুবই সুন্দর এবং নিখুঁত। আপনি যখন এসব খালে ঢুকবেন মনে হবে কেউ যেন খালগুলো সুন্দর করে কেটে রেখেছে। আগের দিন নৌপথে আসার সময়ও আমি এধরনের অসংখ্য খাল প্রত্যক্ষ করেছিলাম।

কচিখালি খালের খানিকটা বন ডিঙিয়ে গেলে শরণখোলা বন বিভাগের অফিস। শরণখোলা বাগেরহাটে পড়েছে। কচিখালি খালে নৌকা ভিড়িয়ে আমরা মিনিট দশেক বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে বন বিভাগের অফিসে গেলাম। আমাদের গাইড আবদুর রাজ্জাক কিছু ঝোপ দেখিয়ে বললেন, এগুলোর নাম কী জানেন?

আমি বললাম, জীবনে প্রথম দেখলাম।

তিনি বললেন, এর নাম টাইগার প্যান। এর মধ্যে বাঘ লুকিয়ে থাকে। আপনি যদি বাঘের কাছেও চলে যান টের পাবেন না ওখানে বাঘ আছে।

গুল্ম জাতীয় এই উদ্ভিদের পাতা অনেকটা বাঘের গায়ের ডোরার মত। এই পাতাগুলো কোনো প্রাণীর গায়ে যদি সেঁটে দেয়া হয় ওটাকে অবিকল বাঘের মত দেখাবে। প্রকৃতি বড় বিচিত্র। কোন প্রাণী কোথায় থাকবে, কোথায় তাকে মানাবে এবং কোথায় সে নিরাপদে থাকবে প্রকৃতি নিজের নিয়মে তা তৈরি করে দেয়। টাইগার প্যানের ভেতর বাঘ লুকিয়ে থাকে, তার ভেতর দিয়ে যেতে আমি একরকম ভয়ার্ত হয়ে উঠলাম। আমরা এক সঙ্গে অনেক মানুষ ছিলাম। আমার পুত্র আপন বলল, বাবা, তুমি আমাকে কোলে তুলে নাও।

আমি বললাম, কেন?

সে বলল, বাঘ এসে যদি আমার ওপর লাফ দিয়ে পড়ে?

আমি বললাম, ভয় পাবার কোনো কারণ নেই। আমরা অনেক মানুষ আছি। বাঘ সহজে আমাদের সঙ্গে পেরে উঠবে না।

আমরা হেঁটে হেঁটে বন বিভাগের অফিস পর্যন্ত গেলাম। বন বিভাগের অফিসগুলো তেমন আকর্ষণীয় নয়। তারপরেও এই ঘরগুলোকে পেছনে রেখে অনেকে ছবি তুলতে লেগে গেল। আমার কাছে অবাক ঠেকল, এ মানুষগুলোকে কোথাও কোনো প্রকৃতির ছবি তুলতে দেখিনি, অথচ এখানে এসে তারা তালগাছ জড়িয়ে ধরেও ছবি তুলছে। আসলে মানুষের মন বোঝা বড় মুশকিল। আমার কথা হল এখানে এসে এসবের ছবি তুলতে হবে কেন। গ্রামের আলপথ দিয়ে হেঁটে যেতেও তো ওগুলো চোখে পড়ে। আমি যখন এখানে এসেছি সুন্দরবনকে গুরুত্ব দেব, এমন কি নদীগুলোকেও। এ ধরনের ফালতু চিন্তা কেন মাথায় এল? মানুষের চোখের সৌন্দর্য এবং মনের রুচিবোধ এটা তো সবার সমান নয়। এখানে আসার পর আমাকে কি মানুষের মনের খুত খুঁজে বেড়ানোর নেশায় পেয়ে বসল?

আমরা অল্প সময়ের মধ্যে নৌকায় চলে এলাম। অযথা সময় ব্যয় করার ফুরসৎ আমাদের নেই। সুন্দরবনে আসার পর থেকে আমাদের প্রতিটি সময় মেপে মেপে চলতে হচ্ছে। আসলে কোথাও বেড়াতে গিয়ে সময় মেপে চলা কোনো নিয়মসিদ্ধ হতে পারে না। কিন্তু এখানে কোনো উপায় ছিল না। কারণ আমরা জাহাজ কর্তৃপক্ষের নিয়মের বেড়াজালে বন্দি ছিলাম।

আধ ঘণ্টার মাথায় আমরা জাহাজে চলে এলাম। এসে দেখলাম টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আজকের নাস্তাটা জবরদস্ত হয়েছে। ভূনা খিচুড়ি এবং পরোটা দুটোই করা হয়েছে। সঙ্গে ডিমের ওমলেট, সবজি, কলা এবং আপেল। মিষ্টিরও ব্যবস্থা ছিল। বাবুল সাহেব বললেন, আপনারা ইচ্ছেমত এবং পেট ভরে খান। আজকে আপনাদের অনেক পরিশ্রম করতে হবে। অনেকদূর হাঁটতে হবে।

বাঙালির পেটের ক্ষুধার চে’ চোখের ক্ষুধা অনেক বেশি। আমি ঢাকা শহরের একটা অভিজাত হোটেলে দাওয়াত পেয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে নিজের ইচ্ছেমত নিয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল, যাকে আমরা বুফে বলি। সেখানে অনেক ভদ্রলোককে দেখলাম প্লেটে ভাতের সঙ্গে রুটিও তুলে নিয়েছে। ভাত-রুটি ছাড়াও আরও নানা খাবারের আয়োজন সেখানে ছিল। আমি দেখলাম এসব ভদ্রলোকেরা চোখের খিদেয় প্লেটে সব রকম খাবার নিয়ে একরকম পাহাড় বানিয়ে ফেলেছেন। শেষ পর্যন্ত যেটা হল তারা খাবারের এক-তৃতীয়াংশও সদ্ব্যবহার করতে পারেননি। আমাদের এখানে অত খাবারের সমাহার ছিল না বটে, যা ছিল তাও আবার অপ্রতুল বলা যাবে না। আমি একই কাণ্ড এখানেও লক্ষ করলাম। কোনো ভদ্রলোককে যদি এ ধরনের আচরণ করতে দেখি নিজে লজ্জা পাওয়া ছাড়া উপায় কী?

সুন্দরবন হলিডেজ ট্যুরসের একটা জিনিস আমার খুব ভাল লাগল। এখানে জাহাজের ড্রাইভার এবং বাবুর্চি ছাড়া কেউ পেশাদার নন। এখানে যারা আছেন তাদের বেশিরভাগই কোনো না কোনো কলেজের অধ্যয়নরত ছাত্র। তারা এসব কাজ করে কিছু টাকা আয় করেন এবং ওই টাকা দিয়ে পড়াশুনার খরচ মেটান। ঢাকা থেকে আমাদের সঙ্গে যারা বাবুল সাহেবের অতিথি হয়ে এসেছিলেন তারাই দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের আপ্যায়ন করতেন। আর বাবুল সাহেব ঘুরে ঘুরে সমস্ত কিছু তদারকি করতেন। ভদ্রলোকের মধ্যে কোনো রকম অহংকারবোধ নেই। তিনি বেশ খাটতে পারেন। তার এই অমানুষিক পরিশ্রমের জন্য আমাদের ভ্রমণটা খুবই সুখময় হয়ে উঠেছিল।

DSC00942.jpgআমরা নাস্তা সেরে আবার ইঞ্জিন চালিত নৌকায় উঠে বসলাম। এবার আমরা যাব জামতলা সী-বীচে। ওখান থেকে চার কিলোমিটার হেঁটে যাব কটকা। হেঁটে যাওয়ার এই ব্যবস্থাটা রাখতে হয়েছিল যাতে আমরা সুন্দরবনের একটা অংশ দেখতে পাই। পনের মিনিটের মাথায় আমরা জামতলা সী-বীচে পৌঁছে গেলাম। জামতলা সী-বীচটা বেশ সুন্দর এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এই বীচে জামগাছ আর জামগাছ। শুনেছি সুন্দরবনের অন্য কোথাও জামগাছ নেই। বড় জামগাছ হাতেগোনা কয়েকটিই আছে। যা আছে তার বেশিরভাগই উপড়ে পড়ে গেছে। সমুদ্রের ঢেউ লেগে লেগে গাছের গোড়া হালকা হয়ে গেছে। অনেক গাছের শিকড় ভেসে ভেসে আছে। যে গাছগুলো উপড়ে পড়ে গেছে তা সিডরের সময়ে আক্রান্ত। এখন যে জামগাছগুলো আছে প্রায় চারার মত। কেন এখানে এত জামগাছ জন্মাল? গাইড আবদুর রাজ্জাককে জিজ্ঞেস করলাম, এই গাছগুলো কি কেউ লাগিয়েছে? তিনি জানালেন, কোনো এক সময় কেউ হয়ত জাম খেয়ে বিচি ফেলেছিল, তার থেকে জামগাছ জন্মেছিল। এখন যে জামগাছের চারাগুলো দেখা যাচ্ছে ওগুলো সব পাখির কল্যাণে।

DSC00924.jpgআমরা এক কিলোমিটারের অধিক সী-বীচে ঘুরে বেড়িয়েছিলাম। এখানে এত বেশি হরিণ বিচরণ করে পায়ের ছাপ দেখলে তা অনুমান করা যায়। বেলা বেড়ে গিয়েছিল বলে আমরা হরিণের দেখা পাইনি। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ সাগরের পানিতে স্নান করতে উৎসুক ছিল। বনরক্ষী আবদুর রাজ্জাকের কড়া নির্দেশ কেউ যেন সমুদ্রে না নামে। দুই হাজার ছয় সালে খুলনা কলেজের ১১ জন শিক্ষার্থীর সলিল সমাধি ঘটেছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ছাত্রী। তারা সমুদ্রে স্নান করতে নেমেছিলেন। অদূরে একটা চর দেখে তারা ওখানে চলে গিয়েছিলেন। তখন সাগরে জোয়ার চলছিল। হঠাৎ একটা ঢেউ এসে সবাইকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। ঢেউয়ের টান এত বেশি ছিল যে কেউ সাতরে কূলে উঠতে পারেননি। কয়েক মিনিট পর সবগুলো লাশ ঢেউয়ের তোড়ে কুলে চলে এসেছিল। তখন সকলেই মৃত। তারপর থেকে ওই জায়গায় কাউকে সমুদ্রে নামতে দেয়া হয় না। অবশ্য কদমতলী সী-বীচে কক্সবাজারের মত সুযোগ রয়েছে। ওখানে অনেকে স্নান করতে নেমেছিল। বেশ কজন বিদেশীকেও ওখানে স্নান করতে দেখা গেছে।

আমরা সকলে ওখানে এসে জড়ো হয়েছিলাম। গাইড নির্দেশ দিলেন, এবার আমরা সুন্দরবনের জঙ্গলে ঢুকব। সকলে সতর্ক থাকবেন। কেউ কথা বলবেন না।

DSC00922.jpg

গভীর জঙ্গল। তার ভেতরে ঝোপঝাড়ে আচ্ছাদিত চিকন একটি পথ। তার মানে এই পথ দিয়ে প্রায় সময় মানুষ চলাচল করে। আমরা সকলে সারিবদ্ধ ছিলাম। আগে পিছে ছিলেন দু’ নিরাপত্তা রক্ষী আবদুর রাজ্জাক এবং নূর হোসেন। দু’জনের কাঁধে দু’টি বন্দুক। নীরব নিস্তব্ধ বনাঞ্চল। একধরনের শঙ্কা ভেতরে ভেতরে কাজ করছিল, যদি আশেপাশে থেকে কোনো বাঘ এসে আমাদের ঘাড় মটকে দেয়। হঠাৎ একটা গর্জন শুনতে পেলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম সমুদ্রের গর্জন। কয়েক সেকেন্ড না যেতে আবার একটা গর্জন ভেসে এল। খুব বেশি দূরে থেকে মনে হল না। এবার নিশ্চিত হলাম বাঘের গর্জন। আমাদের ভেতর থেকে এক তরুণ চিৎকার দিয়ে উঠল, সাহস থাকলে কাছে আয়?

গাইড রাজ্জাক বললেন, কোনো রকম চিৎকার করবেন না। মানুষের শব্দ পেলে হরিণ দূরে চলে যায়।

আমরা বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমরা কদমতলী মাঠে চলে গেলাম। এই মাঠটি হরিণের বিচরণক্ষেত্র। খুব সকালবেলা এলে এখানে হরিণ আর হরিণ ছাড়া কিছুই দেখা যায় না–এমন মন্তব্য গাইড আবদুর রাজ্জাকের। আমরা কোনো হরিণের দেখা পেলাম না। এত বেলায় হরিণ থাকার কথা নয়। তবে প্রচুর হরিণের বিষ্ঠা দেখতে পেলাম। হরিণ না দেখার আরেকটা কারণ হল অনেক বাওয়ালি ওখানে ঘাস কাটছে।

বনের মাঝখানে কয়েক শ’ একরের একটা মাঠ। পুরোটাই উলুবনে ঢাকা। মাঝে মাঝে প্যান টাইগারের ঝোপ। হয়ত এখানে এসে বাঘেরা ওঁৎ পেতে থাকে। মাঠে কোনো ধরনের গাছপালা নেই। কদাচিৎ দুয়েকটা বুনো বরইগাছের দেখা মেলে। মাঠের মাঝখানে রয়েছে একটা পুকুর। বন্যপ্রাণীরা নেমে যাতে পানি খেতে পারে তার জন্য এ ব্যবস্থা। খুব সম্ভব বন বিভাগ এটি তৈরি করেছে। এই পুকুরের পাশে একটি নামফলক। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের নামে এই পুকুরের নামকরণ করা হয়েছে।
আমাদের সঙ্গে ছিলেন বেশ ক’জন মহিলা এবং কিছু শিশু। আমি আমার পুত্রকে নিয়ে বিপদে পড়ে গেলাম। সে আর হাঁটতে পারছে না। সে বারবার পা ব্যথার দোহাই দিয়ে মাটিতে বসে পড়ে। আমি কিছুদূর কোলে করে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দিয়ে বলি, এখন একটু হাঁটো।

সে কয়েক পা হেঁটে আবার গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। আমাদের সঙ্গে কয়েকজন তরুণ ছিলেন তারা আপনকে খুব ভালবাসত। লক্ষণ নামের একজন ছিলেন। তিনি প্রথম থেকে তার সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি তাকে কাঁধে তুলে নিলেন। প্রায় এক কিলোমিটার পথ তিনি তাকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে গেছেন।

আমরা খুবই তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছিলাম। ছোট একটা পানির বোতল সঙ্গে নিয়েছিলাম। সেটি অনেক আগে শেষ হয়ে গেছে।

পৃথিবীতে বিচিত্র প্রকৃতির মানুষ রয়েছে। আমরা কদমতলী মাঠ পেরিয়ে কটকাখালের পাড়ে গিয়ে থামলাম। ওখানে একটা জেটির মত পাকা ব্রিজ রয়েছে। আমাদের নৌকা দু’টি ওখানে এনে রাখা হয়েছে। একজন লোক বড় একটা কন্টেইনারে শরবত বানিয়ে পর্যটকদের মধ্যে বিলি করছেন। যেই তার কাছে যাচ্ছেন তিনি তার হাতে এক গ্লাস শরবত ধরিয়ে দিচ্ছেন। আমরা তার হাতের শরবত পান করে বড়ই তৃপ্ত হলাম। তিনিও একজন পর্যটক হয়ে থাকবেন। আমার একটা কথা মনে পড়ে গেল। ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় এক বুড়ো মানুষ প্রাইভেট গাড়ি হাঁকিয়ে এসে পার্কে ঘুরতে আসা মানুষের মধ্যে এক দেড় শ’ প্যাকেট বাদাম বিলি করে যান। এই লোকটিও ওই প্রকৃতির কি না কে জানে। আসলে কে কোন ধরনের কাজ করে আনন্দ পায় বলা মুশকিল।

আমরা কটকা খালে নেমে নৌকায় চড়ে বসলাম। খালের পানি নিশ্চল। তার দু’পাশে ঘন অরণ্য। পাড়ের সঙ্গে জন্মেছে প্রচুর গোলপাতা। পুরো খালটাকে একটা লেকের মত দেখায়। জীবন-জগত সম্পর্কে বিতৃষ্ণ কোনো মানুষ যদি এখানে আসে তার মনও আনন্দে নেচে উঠবে। আমাদের জাহাজ ছিল সাগরে, যেখানে বন বিভাগের একটা ভাঙা জেটির মত জায়গা রয়েছে। নৌকা সেদিকে ধেয়ে চলল। আমাদের জাহাজ যেখানে থামিয়েছিল তার অদূরে একটা বিরাট কেওড়া বন। ওখানে দেখা গেল দুয়েকটা হরিণ বিচরণ করছে। নৌকা জাহাজের কাছ থেকে আবার সেদিকে ছুটে গেল। হরিণগুলো দেখে মনে হল যেন পোষ মানানো। মানুষ কাছে যাবার পরও ওগুলো সরে দাঁড়ানোর প্রয়োজন বোধ করল না।

DSC00962-kotkai.jpgএই কেওড়া বনটি অদ্ভুত সুন্দর। কেওড়া গাছের পাতা মাটি পর্যন্ত ছুঁয়ে থাকে। কিন্তু এখানে ব্যতিক্রম দেখলাম। এখানকার গাছগুলোর ডালপালা একটা নির্দিষ্ট সীমার নিচে আর নামেনি। আপনি যদি এ কেওড়া বনটি দেখেন আপনার মনে হবে কোনো মালি তার দক্ষ হাতে ওগুলো ছেঁটে রেখেছে, যেভাবে ছেঁটে রাখে শহরের কোনো আলীশান বাড়ির গেটের দু’ ধারে লাগানো পাতাবাহার বা অন্য কোনো গাছের ডালপালা। আমরা প্রথমে ধরে নিয়েছিলাম সাগরে যখন জোয়ার আসে পানি তখন ওই পর্যন্ত পৌঁছায়। এজন্য কেওড়া গাছগুলোর ডালপালা আর নিচের দিকে নামেনি। এমনও মনে হয়েছিল সরকারিভাবে এগুলো লাগানো হয়েছে বলেই যত্ন করে ছেটে রেখেছে। কিন্তু আমাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হল, যখন দেখলাম একটা হরিণ মানুষের মত সোজা দু’পায়ে দাঁড়িয়ে যতদূর পর্যন্ত নাগাল পাচ্ছে সে গাছের পাতা খেয়ে চলেছে। প্রকৃতির সন্তান হরিণ কীভাবে বনটিকে সাজিয়ে রেখেছে–আমি আশ্চর্য না হয়ে পারিনি। হতে পারে তার প্রয়োজনে সে করেছে। কিন্তু সবকিছু তো প্রয়োজনেই করে। আমি এক দেড় দিনে সুন্দরবনের অনেক জায়গা দেখলাম, কিন্তু কটকার কেওড়া বনের মত পরিষ্কার এবং সুন্দর জায়গা আর কোথাও দেখিনি।

আমাদের একটি নৌকা তখনও জাহাজে এসে পৌঁছায়নি। প্রায় তিন চার কিলোমিটার হেঁটে আসার পর আমরা ভারি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমি, শিল্পী এবং আপন জাহাজের একপ্রান্তে বসে কেওড়া বনের দৃশ্য দেখছিলাম। মাঝে মাঝে দলবদ্ধ হয়ে কয়েকটি হরিণ বেরিয়ে আসত তখন আমরা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠতাম। হঠাৎ শিল্পী চিৎকার দিয়ে উঠল, বাঘ, বাঘ!

আমি বললাম, কোথায়?

সে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, দেখ, ওই দূরে দেখ। দু’টি গাছের ফাঁক দিয়ে দেখ। ভাল করে দেখ, একটি বাঘের বাচ্চা ঘুরে বেড়াচ্ছে।

হ্যাঁ সত্যি তাই। একটা বাঘ দেখার জন্য কত বন-জঙ্গল মাড়িয়ে এলাম। বাঘ তো দূরের কথা, একটা হরিণও দেখিনি। আর এখানে জাহাজে বসে বাঘ-হরিণ দুটোকে একসঙ্গে দেখলাম, তার চে’ বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে! মনে মনে বললাম, আমার সুন্দরবনে আসা সার্থক হয়েছে।

আমরা কয়েকজনকে ডেকে দৃশ্যটা দেখালাম। তারা বললেন, যেহেতু বাঘের বাচ্চা দেখা যাচ্ছে, আশেপাশে তার মা-বাবাও রয়েছে।

আমরা বাঘের মা-বাবার দেখা পেলাম না। এক সময় বাঘের বাচ্চাটাও আমাদের দৃষ্টি থেকে হারিয়ে গেল।


ঘণ্টাখানেক পর আমাদের বাকি নৌকাটিও ফিরে এল। তখন দুপুর প্রায় বারটা বাজে। জাহাজ আবার যাত্রা আরম্ভ করল। আমাদের সময় খুব কম। সূর্য ডুবার আগেই আমাদের হিরণ পয়েন্টে পৌঁছতে হবে। তারপর সন্ধ্যার পর যেতে হবে দুবলার চরে রাসমেলায়। এ রাসমেলাকে মাথায় রেখে অনেকে এ প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। বিষয়টির সঙ্গে ধর্মীয় ব্যাপার-স্যাপার জড়িত। ফলে জাহাজের কর্তৃপক্ষ এটিকে একটা স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে মাথায় রেখেছে। কর্তৃপক্ষ কিছুটা শঙ্কাগ্রস্ত ছিল। এত অল্প সময়ের মধ্যে অনেকগুলো জায়গায় আমাদের তারা নিয়ে গেছে। সাধারণত এত কম সময়ের মধ্যে এতগুলো জায়গায় যাওয়া এক রকম কঠিন তো বটেই। এগুলো যদি কাছাকাছি থাকত একটা কথা ছিল। কিন্তু একেকটা জায়গা থেকে আরেকটা জায়গায় যেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়।

সকাল থেকে আবহাওয়া ছিল চমৎকার। দুপুরে খাবারের পর এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। কিন্তু সূর্যের আলো একটুও ম্লান হয়নি। আমরা বঙ্গোপসাগর হয়ে হিরণ পয়েন্টে যাচ্ছিলাম। বৃষ্টি এবং সূর্যের আলো দুটো একসঙ্গে মিলে প্রকৃতিটা অপূর্ব লাগছিল। বঙ্গোপসাগর থেকে অনেক দূরে শ্যালার চরকে দেখলে একটা কালো মেঘ কিংবা ছায়ার মত দেখায়।

আমাকে জাহাজের এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করতে দেখলে গাইড আবদুর রাজ্জাক তার চেয়ারখানা ছেড়ে দিয়ে বলেন, স্যার বসেন, কথা বলি।

আমিও না করি না। এক সময় তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের জাহাজে যে মধু বেচে এগুলো কি খাঁটি?

তিনি জবাব দিলেন, একেবারে খাঁটি বলা যাবে না। তবে আপনাদের শহরে যে মধু পাওয়া যায় তার চেয়ে ভাল।

আমার কিছু মধু কেনার ইচ্ছে ছিল। ইচ্ছেটা ভেতর থেকে চেপে গেল। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, আপনারা তো সুন্দরবনে ঢুকতেই সাহস পান না। কিন্তু যারা মধু সংগ্রহ করতে যায় তারা কীভাবে সাহস পায়? তাদের কি বাঘে আক্রমণ করে না?

তিনি বিজ্ঞের মত জবাব দিলেন, আপনারা তো শিক্ষিত মানুষ অনেক কিছু বিশ্বাস করেন না। আপনি বাওয়ালিদের দেখেছেন?

আমি সরাসরি জবাব দিলাম, না।

তিনি বললেন, আপনি দেখবেন, বাওয়ালিদের বাহু কিংবা মাথায় একটি লাল কাপড় বাঁধা থাকে। ওটি যশোরের নোয়া পাড়ার এক পীর সাহেবের পড়িয়ে দেয়া। ওটা সঙ্গে থাকলে বাঘে আক্রমণ করে না। আজ পর্যন্ত শুনেছেন কোনো বাওয়ালি বাঘের খপ্পরে পড়েছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাই যদি হয়, আপনারা ওই লাল কাপড়খানা সংগ্রহ করেন না কেন?

তিনি বললেন, সেটা বলেন। আমরা কখনও দরকার মনে করিনি। আমরা তো সব সময় দলবদ্ধ হয়ে যাই। তাছাড়া আমাদের সঙ্গে নিরাপত্তা রক্ষী থাকে।

আমি রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে কোনো বাড়াবাড়ি করলাম না। যার বিশ্বাস তার কাছে থাকুক।

তিনি জানতে চাইলেন, হরিণের বন্ধু কে জানেন?

আমি বললাম, অবশ্যই জানি। হরিণের বন্ধু বানর।

তিনি বললেন, আরেকটা বন্ধু আছে। বনমোরগও হরিণের বন্ধু। বানর এবং বনমোরগ যখন বাঘ দেখতে পায় ডাকাডাকি আরম্ভ করে দেয়। তখন হরিণ সতর্ক হয়ে যায়। বিষয়টা আমরাও লক্ষ করেছি।

আমরা বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে হিরণ পয়েন্টে গেলাম। হিরণ পয়েন্টে যেতে একটা চিকন খাল ধরে যেতে হয়। ওখানে জাহাজ ঢুকতে পারে না। ইঞ্জিন বোটে করে আমরা ওখানে গিয়েছিলাম। সমুদ্রের মোহনা মরজাত নদীতে আমাদের জাহাজ নোঙ্গর করে রাখা হয়েছিল। আমরা যখন হিরণ পয়েন্টে পৌঁছি তখন বিকেল পাঁচটা বাজে। সূর্য তখন ডুবতে বসেছে। গোটা বনাঞ্চলে গোধূলির আলোর ঝলকানি প্রকৃতিকে অপরূপ করে তুলেছিল। মরজাত নদী থেকে দেড় দুই কিলোমিটার পথ যাওয়ার পর হিরণ পয়েন্ট নামক জায়গাটির দেখা পেলাম। জায়গাটি আমাকে নাড়া দিতে পারেনি। মরজাত নদী থেকে খালে ঢোকার পর দু’পাড়ে অসংখ্য ম্যানগ্রোভের সমাহার দেখেছিলাম। ওগুলোর মধ্যে আমি একরকম সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছিলাম।

আমাদের দু’টি নৌকাই হিরণ পয়েন্টে গিয়ে থামাল। একটা কথা বলে রাখা দরকার। গাজীপুর থেকে আসা ১১ জনের একটি দল আমাদের মধ্যে ছিল। তারা সকলে মাঝবয়সী। তারা কোনো রকম নিয়মকানুন মেনে চলায় অভ্যস্ত ছিলেন না। তাদের মনে যেটা ধরত সেটাই তারা করতেন। সবার সঙ্গে খেতে চাইতেন না। সকলে যখন খেয়ে চলে যেত তখন তারা খেতে আসতেন। যেই দু’ রাত তারা ওখানে ছিলেন বেশিরভাগ সময় জুয়া খেলে কাটিয়েছেন। আমাদের গাইড যখন বলতেন আমাদের এদিকে যেতে হবে, তারা যেতে চাইতেন অন্যদিকে। তারা ছিলেন সব সময় স্রোতের বিপরীতমুখী। এই দলটিকে নিয়ে জাহাজের কর্তৃপক্ষের দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না।

থাক ওসব কথা। আমরা তো হিরণ পয়েন্টে গেলাম। ওখানে বন বিভাগের অফিসে যাওয়ার জন্য একটা জেটির মত রয়েছে। অনেকে জেটি বেয়ে ওপরে উঠে গেলেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটালেন গাজীপুরের সেই ১১ জন। তারা ওখানে যাবেন না। তাদের বনের ভেতর নিয়ে যেতে হবে। তারা ভেতরে গিয়ে বাঘ দেখবেন, হরিণ দেখবেন। আমাদের সঙ্গে যে নিরাপত্তা রক্ষী ছিলেন তিনি বনের ভেতরে যেতে রাজি নন। তার কথা হল এ মুহূর্তে ভেতরে ঢোকাটা কিছুতেই নিরাপদ নয়। সূর্য ডুবতে বসেছে। আর একটু হলেই আঁধার নেমে আসবে। কিন্তু তারা নাছোড়বান্দা। ফলে বাধ্য হয়ে গাইড আবদুর রাজ্জাক তাদের বনের ভেতরে নিয়ে গেলেন। জায়গাটা এমন, কাদার জন্য ইচ্ছেমত হাঁটা যায় না।

তারা বনে চলে গেলেন। আমরা গেলাম বন বিভাগের অফিসের দিকে। এ অফিসটি আওয়ামী লীগ আগের বার ক্ষমতায় থাকাকালীন শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেছিলেন। ওরকম একটা নাম ফলক জেটি পার হতেই চোখে পড়ল। বন বিভাগের অফিসে তেমন কিছু নেই। প্রবেশ পথে দু’টি বাঘ এবং একটি হরিণের মূর্তি রাখা হয়েছে। বাঘ দু’টিকে দূর থেকে দেখলে জীবন্ত বলে ভ্রম হয়। আমার পুত্র আপনকে বাঘের ওপর বসিয়ে দিয়ে দু’টি ছবি ওঠালাম। বাঘের পিঠে চড়তে পেরে সে ভীষণ খুশি।

বন বিভাগে দু’ তিনটি অফিসঘর। অফিসঘর বলা ঠিক হবে না। আসলে ওখানে বনরক্ষীরা থাকেন। মিঠা পানির অভাব থাকায় অফিস সংলগ্ন একটি বিরাট পুকুর খনন করে রেখেছে। বাওয়ালিরা ওই পুকুর থেকে পানি নিয়ে গিয়ে তাদের কাজ সারেন। কাজ সারেন বন বিভাগের লোকজনও। পুকুরে রয়েছে একটি শান বাঁধানো ঘাট। ওখানে একজন বনরক্ষীর দেখা পেয়ে গেলাম। তিনি বললেন, পুকুরের ওপারে যাবেন না। গতকাল ওখানে একটি বাঘ ভীষণরকম উৎপাত করেছে। সকালেও তার দেখা মিলেছে।

কিন্তু কে শোনে কার কথা। আমাদের মধ্যে এমন কিছু মানুষ ছিলেন তাদের ভাবখানা ছিল বাঘের দেখা পেলে তারা পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করবেন। পুকুরের কোনা ধরে গ্রামের মেঠোপথের মত একটি রাস্তা বনের ভেতর চলে গেছে। একজন বনরক্ষীকে সামনে রেখে কেউ কেউ ওই পথ ধরে এগিয়ে চলল। শিল্পীর নিষেধ, ওদিকে যাবার দরকার নেই। তার কথা মাথায় রেখে ওদিকে গেলাম না বটে, কিন্তু পুকুরের অপর পাড়ে চলে গেলাম যেখানে বাঘ উৎপাত করছিল। আমার সঙ্গে আরও দুয়েকজন ছিলেন। আমরা দেখতে পেলাম একটা কর্দমাক্ত জায়গায় বাঘের পায়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে। বাঘটি যে অল্প সময় আগে হেঁটে গিয়েছে ওই ছাপগুলো থেকে অনুমান করলাম। আমি বাঘের দু’টি পায়ের ছাপ ক্যামেরাবন্দি করে বিলম্ব না করে ওখান থেকে চলে এলাম।

সূর্য প্রায় ডুবে গেছে। আমরা নৌকায় চলে এলাম। আমাদের ছেড়ে যারা বনে গিয়েছিলেন তারা দেখি আগে এসে বসে আছেন। ওখানে সদ্য বাঘের পায়ের ছাপ দেখে তারা ভয়ে চলে এসেছেন। তাদের একজন ক্যামেরাবন্দি সেই বাঘের ছাপ আমাদের দেখালেন। একজন একটি মরা হরিণের দাঁতের পাটি খুঁজে পেয়েছেন সেটাও কুড়িয়ে নিয়ে এসেছেন। বনরক্ষীদের সঙ্গে একটু মন কষাকষি হলেও সেটা পরে আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল।

আমরা আবার নৌকায় করে জাহাজে ফিরে এলাম। আমাদের জন্য হালকা নাস্তার ব্যবস্থা আগে থেকে করে রাখা হয়েছিল। নাস্তা সারতে সারতে সন্ধে পার হয়ে গেল।

আজ রাসপূর্ণিমা। আকাশের গোলাকার চাঁদ সর্বত্র আলো ঢেলে দিয়ে পুরোমাত্রায় আলোকিত করে তুলেছে। আমাদের আবার নৌকায় ফিরে যেতে হল। আমাদের যেতে হবে আলোর কোলে রাসমেলায়। আলোর কোল দুবলার চরের একটা জায়গা, যেখানে যাবার জন্য অনেকে উদ্গ্রীব ছিলেন। গাইড আবদুর রাজ্জাক জানালেন, মরজাত থেকে রাসমেলার দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার।

সমুদ্রে ভরা জোয়ার ছিল। ঢেউয়ের তোড়ে আমাদের নৌকা ডুবে যাবার উপক্রম হচ্ছিল। অনেকে ভয়ে কান্না জুড়ে দিয়েছিল। ঢেউয়ের এমন তোড়জোর দেখে অনেকে জাহাজ থেকে নামেননি। তাদের মতে মেলা তো মেলাই। এত বড় ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ওখানে যাবার কোনো অর্থ হয় না।

যারা মেলা দেখতে যাচ্ছিলেন তাদের অনেকে এটাকে সাহসী অভিযান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। গাইড রাজ্জাক বারবার বলে যেতে থাকলেন, আপনারা কেউ লাফালাফি করবেন না। যে যেখানে আছেন শক্ত করে ধরে বসুন। কিন্তু অল্প সময়ের পর আমাদের ভীতি কেটে গেল। আমরা যখন আলোর কোল খালে প্রবেশ করলাম নদীর পানিকে একেবারে নিশ্চল মনে হল। নদী এবং পুরো বনাঞ্চল পানিতে একাকার হয়ে গিয়েছিল। ফকফকে চাঁদের আলোতে কোনো কিছুই আমাদের অদেখা রইল না। মাঝে মাঝে নদীর পানি চাঁদের আলোতে ঝিলিক খেলে যাচ্ছিল। আমি অস্ফূট স্বরে গাইতে থাকলাম, ‘এই রাত কভু যদি শেষ না হত, জীবনবেলা শেষপ্রান্তে।’

DSC01016.jpgপ্রায় আধ ঘণ্টা পথ চলার পর আমরা রাসমেলায় গিয়ে পৌঁছলাম। শ’ শ’ লঞ্চ এবং ইঞ্জিন বোট পানিতে ভাসছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম, এ গহীন অরণ্যে এত জলযান এবং এত মানুষ এল কোথা থেকে! খাল থেকে ডাঙায় উঠতে আমাদের ভীষণ রকম বেগ পেতে হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছে মেলায়। আমরা প্রধান গেট দিয়ে ঢুকছিলাম তখন দেখলাম অনেকগুলো শুটকির গেট। শুটকি দিয়ে গেট তৈরি করা যায় এই প্রথম দেখলাম। এই গেটগুলো তৈরি করা হয়েছে ছোট ছোট এক ধরনের শুটকি মাছ দিয়ে, যেগুলোকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় চান্দা মাছ। লইট্টা সম্পর্কে আমরা কমবেশি পরিচিত। আরও নানাজাতের শুটকি এখানে রয়েছে। শুটকির গন্ধে নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসছিল। যারা শুটকির গন্ধে অভ্যস্ত নন তারাই বেশি এ সমস্যায় পড়েছেন।

DSC01058.jpg

রহিম আফরোজের সহায়তায় সৌর-বিদ্যুতের মাধ্যমে পুরো মেলা আলোয় আলোকিত করে ফেলেছে। শুটকির কয়েকটা গেট পার হওয়ার পর ডানপাশে চোখে পড়ল পূজামণ্ডপ। তার অপর প্রান্তে আয়োজন করেছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। আমরা যখন ওখানে পৌঁছলাম মানুষ নাচ-গান দেখায় মগ্ন। একজন কিশোরীর নাচ দর্শকদের ভীষণভাবে আপ্লুত করেছিল। ‘দুলালী নাচে কোমড় দোলাইয়া’ গানটি তখন ক্যাসেটে বাজছিল।

DSC01044.jpgদুবলার চরে কোনো জনবসতি নেই। ছয় মাসের জন্য জেলেরা মাছ ধরে শুটকি তৈরি করার জন্য আসে। মৌসুম শেষ হলে তারা আবার চলে যায়। প্রায় পাঁচ ছয় হাজার জেলে এখানে মাছ ধরে এবং শুটকি বানায়। একজন জেলে জানালেন, শুটকির পুরো ব্যবসাটা নিয়ন্ত্রণ করেন মেজর জিয়াউদ্দিন আহমেদ। জেলেরা তাকে তাদের সজ্জন হিসেবে মান্য করে। তাকে তারা যেমন ভয় করে তেমনি শ্রদ্ধাও করে।

রাসমেলাটা জেলেদের কাছে বড়ই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষ এখানে আসে নানা মানত নিয়ে। কবে থেকে এই মেলার সৃষ্টি কেউ জানে না। ব্যবসার কথা মাথায় রেখে অনেকে আসে। মেলাতে নেই এমন সবজির নাম করা যাবে না। বাংলাদেশে যত রকম সবজি আছে সবই এখানে আছে। এই মেলাটা জেলেদের একটা ভরসার জায়গাও বটে। তাদের একটা বড় সময়ের জন্য কেনাকাটা এখান থেকে করে রাখে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা এসব শাক-সবজি তেমন একটা তাজা থাকে না। তারপরেও জেলেদের কোনো উপায় না থাকায় মেলা থেকে এসব জিনিস আগ্রহ সহকারে কেনে। বেশ কিছু খেলনা এবং মনিহারির দোকানও চোখে পড়ল। তাদের বেচাবিক্রিও বেশ। এই মেলাটিরও অভিভাবক হিসেবে কাজ করেন মেজর জিয়াউদ্দিন আহমেদ।

মেলাটি আগে সী-বীচে বসত। সেখানে পূজা হত। তখন পূজাটা বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছিল। পূজার জন্য অনেকে প্রসাদ নিয়ে আসত। বিশেষ করে বাতাশাটাই বেশি আনত। ওগুলো খাওয়ার জন্য আগত মানুষের মধ্যে মারামারি লেগে যেত। সেই মারামারি থেকে বাঁচানোর জন্য জিয়া সাহেব একটি কমিটি করে দিয়ে মেলাটিকে অরণ্যের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। অবশ্য জায়গাটাকে অরণ্যের মত দেখায় না। বেশ খোলামেলা জায়গা। আমাদের গাইড আবদুর রাজ্জাক সাহেব আমাকে মেলাটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন। তিনি এক লোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি মেলা কমিটির একজন। দেব-দেবীর মূর্তি তৈরিতেও তিনি সিদ্ধহস্ত। তার নাম স্বপন ঘোষ। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কবে থেকে এই মেলা শুরু হয়েছে। তিনি জানালেন, আমার বয়স প্রায় চল্লিশ। আঠার বছর ধরে আমি এ মেলায় আসছি। তবে কবে এর উৎপত্তি লা সম্ভব নয়। একটা কিংবদন্তী আছে, শুনবেন?

আমি বললাম, বলুন?

অনেক বছর আগে এক সওদাগর বাণিজ্যে যাবার সময় এখানে তার জাহাজ ভিড়ান। গোটা রাত জাহাজের ঘুমানোর পর সকালে উঠে দেখেন রাধা এবং কৃষ্ণ দু’জনে অষ্ট সখী নিয়ে স্নান করছেন। তাদের দেখে তিনি কিছু প্রসাদ নিবেদন করেন। তখন থেকে এই মেলার আরম্ভ।

DSC01025.jpgআমি পূজা মণ্ডপে গিয়ে দেখলাম প্রায় বিশ জনের মত দেব-দেবীর মূর্তি। সবার মাঝখানে রাধা-কৃষ্ণ। তাদের দু’পাশে আট সখী। গণেশের মূর্তিও ওখানে রয়েছে। কিন্তু আমার কাছে অবাক ঠেকল, যখন দেখলাম গাজি, কালু এবং বনবিবির মূর্তি। গাজি-কালু দু’জনের পরনে লুঙ্গি এবং মুখমণ্ডলে দাড়ি। কোনো মুসলমানের মূর্তি বানিয়ে হিন্দুরা পূজা করে এই প্রথম দেখলাম। এ মূর্তিগুলো বানিয়েছেন স্বয়ং স্বপন ঘোষ। আরও একটা জিনিস লক্ষ করলাম, একজন ব্রাহ্মণ পুরোহিতের কাজ করছেন বটে, কিন্তু উচ্চবর্ণের হিন্দুরা এ মেলায় তেমন আসেনি। বলা যায় এটা নিম্নবর্ণের, বিশেষ করে জেলেরাই এ মেলায় অংশগ্রহণ করে।

স্বপন ঘোষকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি গাজি, কালু এবং বনবিবির মূর্তি বানালেন কীভাবে? তাদের ছবি কি কোথাও দেখেছেন?

তিনি বললেন, তাদের দেখব কোথা থেকে? আমি গাজি-কালুর পুঁথি পড়ে অনুমান করে বানিয়েছি। তাদের আমরা বনদেবতা হিসেবে দেখি। আপনি কি ভুলে গিয়েছেন বনবিবিকে গাজি-কালু মান্য করতেন?

আমি বললাম, গাজি-কালু সম্পর্কে ধারণা আমার কম।

দেব-দেবীর সামনে কয়েক মনের মত বাতাশা স্তূপ করে রাখা হয়েছে। ভক্তরা এসব এনেছে। তাছাড়া রয়েছে প্রচুর ফল-ফলাদি। স্বপন ঘোষ আমাকে কয়েকটা বাতাশা হাতে ধরিয়ে দিলেন।

ঘণ্টাদেড়েক সময় আমি মেলায় ছিলাম। আমার পুত্র বড় বেশি বিরক্ত করছিল। তাছাড়া আমাদের মাঝে কয়েকজন মহিলা ছিলেন। তারা চাইছেন না আর বেশিক্ষণ এখানে থাকতে। গাইড আবদুর রাজ্জাক বললেন, আপনি ঘুরে ঘুরে মেলা দেখতে থাকুন। এই ফাঁকে আমি ওদের জাহাজে রেখে আসি।

আপন নাছোড়বান্দা। সে আমাকে ছেড়ে যাবে না। মহিলারা বললেন, এখানে দেখার কী আছে, আপনাকে থাকতে হবে? এসব দেখার কি কোন মানে হয়?

আমি বললাম, কেন, আপনাদের ভাল লাগছে না?

তাদের একজন বললেন, ওই শুটকির গেট ছাড়া ভাল লাগার কী আছে? আমাদের ঢাকা শহরের ফুটপাতেও এর চাইতে অনেক সুন্দর মেলা বসে।

আমি তাদের কী করে বোঝাই, এ মেলা আর ঢাকা শহরের মেলার মধ্যে অনেক পার্থক্য। আমাদের মধ্যে অনেকে হিন্দু ছিলেন। তারা অনেকক্ষণ মেলায় ছিলেন। কেবল আমার পুত্র এবং মহিলাদের চাপে পড়ে আমাকে মেলা ত্যাগ করতে হল।

আমরা আলোর কোল খালের বুক চিরে মরজাতে অবতরণ করলাম। মরজাতের কিছুদূর আসতেই আমরা ঢেউয়ের কবলে পড়লাম। যাওয়ার সময়ও আমরা ঢেউয়ের কবলে পড়েছিলাম। কিন্তু তখন এত ভয়াবহ ছিল না। এবার সত্যি সত্যি আমি ভয় পেয়ে গেলাম। চাঁদের আলোতে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম আমাদের জাহাজখানাও ঢেউয়ের তোড়ে দুলছে। গাইড সাহেব বলে যেতে থাকলেন, শক্ত করে বসুন। বাচ্চাদের ধরে রাখবেন।

আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করে যেতে থাকলাম। এক সময় আমরা জাহাজের কিনারে চলে এলাম। নৌকায় ঢেউ লেগে লেগে জাহাজের সঙ্গে বারবার ধাক্কা খেতে থাকল। আমরা স্টাফদের সহায়তায় জাহাজে উঠে এলাম। জাহাজে উঠে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

DSC01022.jpgআমাদের রেখে নৌকা আবার রাসমেলায় গেল বাকিদের নিয়ে আসার জন্য। যারা জাহাজে ছিলেন তারা আমাদের তিরস্কার করলেন আমরা কেন এত কষ্ট করে একটা নিকৃষ্ট মেলা দেখতে গেলাম। হিন্দুদের না হয় একটা স্বার্থ আছে বলে গেছে, আমরা মুসলমান হয়ে কেন গেলাম সেটি তাদের কাছে বোধগম্য নয়। যেই যা বলুক, রাসমেলা আমার কাছে এক নতুন কিছু। এমন গহীন অরণ্যে এমন একটা মেলা জমতে পারে আমি অবাক না হয়ে পারিনি। তাছাড়া হিন্দু-মুসলমানের এমন মিলনমেলা আমি খুবই কম দেখেছি। গাজি-কালুর মূর্তি বানিয়ে পূজা করা এটা কি চাট্টিখানি কথা? সাম্প্রদায়িক চিন্তাধারায় যেখানে আমরা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছি সেখানে এ মেলাটা আমাদের নতুন করে বাঁচার কিছুই কি শেখায় না?

আমার শরীর ভাল নেই। আমি কারও সঙ্গে তর্কে জড়াতে চাইলাম না। বাকিরাও ইতোমধ্যে মেলা থেকে ফিরে এসেছেন। রাত তখন প্রায় দশটা বাজতে চলেছে। ঢেউয়ের তোড়ে জাহাজ দোল খাওয়ার কারণে হয়ত আমার মাথা চক্কর দিতে আরম্ভ করেছে। আমি কেবিনে গিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতে চেষ্টা করলাম। তখন আমার মনে হতে থাকল আমি চর্কির মত ঘুরছি। আমি বমি বমি ভাব উপলব্ধি করতে থাকলাম।

বাবুর্চি সাহেব মুরগির কাবাব তৈরি করছেন। কাবাবের গন্ধে আমার বমিভাব আরও বেড়ে যেতে থাকল। তাছাড়া গোটা জাহাজ চুলার ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে। হঠাৎ আমাদের খাবারের ডাক পড়ল। আমি না খেতে পারলে বেঁচে যেতাম। কিন্তু শিল্পীর বলাবলিতে না গিয়ে পারলাম না।

জাহাজে আজকে আমাদের শেষ রাত। সেটা মাথায় রেখে হয়ত আমাদের খাবারের আয়োজনটা বেশ ব্যাপকভাবে করেছে। ফ্রায়েড রাইস করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বানানো হয়েছে পরোটা। মুরগির কাবাব, খাসির রেজালা, সবজি ইত্যাদি ছিল। চিংড়ি ছিল কিনা মনে পড়ছে না। কোল্ড ড্রিংকসের ব্যবস্থা ছিল। খাবার শেষে ছিল মিষ্টি। কিন্তু কোনো খাবারের প্রতি আমার লোভ হল না। কাবাবের প্রতি আমার দুর্বলতা রয়েছে। একটুখানি মুখে দিতে মনে হল নাড়িভুড়ি বেরিয়ে আসতে চাইছে। ব্যাপারটি আমার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আমার সামনের চেয়ারের একটা বাচ্চাকে দেখলাম খাবার খেতে গিয়ে বমি করে ফেলেছে। আমার পুত্রেরও একই দশা হল। সেও বমি করতে আরম্ভ করেছে। জাহাজখানা যে ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে তাল রেখে নাচছে সেটা আমাদের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি এক গ্লাস সেভেন আপ খেয়ে কেবিনে চলে গেলাম।

আমার পুত্রটাও অসুস্থ। এই অল্প বয়সে তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়টা ভারি প্রবল। সে নিজে অসুস্থ হওয়ার পরও আমাকে বলল, বাবা, তুমি শুয়ে থেকো। আমি তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেই।

ছেলে বলে কী? সে নিজে অসুস্থ, অথচ সে আমার সেবা করতে চায়! পৃথিবীতে এমন কিছু ছোটখাটো ঘটনা ঘটে, হাজার কষ্টের মধ্যে বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে। তখন পৃথিবীটাকে অতি সুন্দর দেখায়। আপনের কথায় মনে হল আমি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছি।

আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। একটা জিওনিল খেয়ে আমার পুত্রকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ মনে পড়ল বাবুল সাহেব জাহাজের ছাদের ওপর ড্রিংকসের দাওয়াত দিয়েছিলেন। তাকে কথা দিয়েছিলাম, আমার অভ্যাস নেই, তারপরেও যাব। সকলের সঙ্গে আনন্দটা ভাগাভাগি করে নিতে চাই।

একবার মন চাইল তাকে গিয়ে বলে আসি আজ সম্ভব নয়। কিন্তু যাব কী, মনে হল আমি দাঁড়ালে পড়ে যাব।

রাত বারটার পর যখন জেনারেটর বন্ধ করে দিল তখন আমার চোখে ঘুম নেমে এল। সম্ভবত জিওনিল কাজ করেছে।

গভীর রাত। ক’টা বাজে আমি বলতে পারব না। হঠাৎ জাহাজে চেল্লাফেল্লা আরম্ভ করে দিল। আমার ঘুম ভেঙে গেল। কেউ যেন চিৎকার করে বলতে থাকল, নিচে নেমে এসো। নিচে নেমে এসো।

আমি মনে মনে ভাবলাম, বেটারা মদ খেয়ে মাতলামি আরম্ভ করে দিয়েছে। এসবে কান দিলে শরীরের অসুস্থতা মনের ভেতরও ক্রিয়া করবে। আমি কাৎ ফিরে শুয়ে পুনরায় ঘুমানোর চেষ্টা করলাম।

খুব ভোর। তখনও প্রকৃতির বুকে ভাল করে আলো ফোটেনি। শিল্পী কেবিনের জানালা খুলে দিয়ে বলল, তুমি এখনও ঘুমিয়ে আছো। দেখ বাইরে কী কাণ্ডই না ঘটে যাচ্ছে।

আমি ধড়মড় করে খাড়া হয়ে বসলাম। দেখলাম দলে দলে হাজার হাজার মানুষ আসছে। এসে তারা পানিতে নেমে পড়ছে। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নেই। পানিতে প্রচুর ট্রলার আর লঞ্চ ভাসছে। ট্রলার এবং লঞ্চে তারার মত আলো জ্বলছে। কী এক অদ্ভুত দৃশ্য! আমার সেই সওদাগরের কথা মনে পড়ে গেল, যিনি খুব ভোরে অষ্ট সখী নিয়ে রাধা-কৃষ্ণের স্নানদৃশ্য দেখেছিলেন। আমার মনে হল আমরা কি ওধরনের কিছু দেখছি? শিল্পীকে বললাম, এখানে এত মানুষ কেন?

শিল্পী বলল, তা তো জানি না।

হঠাৎ আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম। আমার মনেই ছিল না গতরাতে আমরা রাসমেলায় গিয়েছিলাম। তখন শুনেছিলাম আজ ভোরে পূণ্যস্নান হবে। কিন্তু স্নানটা যে এই জায়গায় হবে সেটা আমার জানা ছিল না। আমি ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গিয়ে এলোপাথাড়ি কিছু ছবি তুলে ফেললাম। ক্যামেরা স্ক্রিনে দেখলাম আলো আঁধারিতে ছবিগুলো খুব একটা খারাপ হয়নি। হঠাৎ বন বিভাগের লোকজন একটা ছোট জাহাজ নিয়ে ছুটে এলেন। তারা মাইকে ঘোষণা দিতে থাকলেন, স্নান করে তাড়াতাড়ি লোকজন সরে পড়ুন। আকাশের অবস্থা বিশেষ ভাল নেই। যে কোনো মুহূর্তে আবারও ঝড় উঠতে পারে।

আমার ভেতরে প্রশ্ন জাগল, ‘আবারও ঝড় উঠতে পারে’–এর অর্থ কী?

আমাদের জাহাজের একজন জানালেন, আপনি কিছু জানেন না?

আমি বললাম, কী জানব?

তিনি বললেন, আমাদের জাহাজ কি এই জায়গায় ছিল?

এ কথাটা আমার একবারও মাথায় আসেনি। আমি জবাব দিলাম, আমরা তো প্রায় সমুদ্রে ছিলাম। এখন তো দেখছি বিশাল চর। তাহলে কি এখন ভাটি?

তিনি বলে যেতে থাকলেন, রাতে ভীষণ ঝড় উঠেছিল। ঝড়ের তোড়ে জাহাজ এখানে চলে এসেছে। আমাদের জাহাজের ওপরে যে প্যান্ডেল ছিল সব ভেঙেচুরে গেছে। মানুষ ভয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছিল। আপনারা তো কিছুই টের পাননি। অবশ্য অনেকেই ঘুমিয়েছিলেন। লোকজন ভয় পেয়ে যেতে পারেন তাই ডাকাডাকি করেনি। ওই দেখুন, একটি জাহাজ চরের ওপর আটকে আছে। ওটাকে অনেক চেষ্টা করা হয়েছে পানিতে নামানোর জন্য। সম্ভব হয়নি।

সত্যি তাই। এম ভি শম্পা নামের একটি জাহাজ পানি থেকে এক শ’ গজ দূরে চরের ওপর আটকে আছে। নিজেকে অভাগা মনে হল। যত ভয়ানক হোক না কেন, ঝড়টা না দেখতে পেয়ে আমি মনে মনে আফসোস করতে থাকলাম। জাহাজের কর্তৃপক্ষ আমাদের না ডেকে ঠিক কাজ করেছে অন্তত আমার মন থেকে সায় মিলল না। ঝড়টা যদি আমি স্বচক্ষে দেখতে পেতাম আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আরও কিছু যোগ হত। হতভাগা আর কাকে বলে!

সবাই প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে দুবলার চরে শুটকি পল্লীতে যাবে। আমি কোনো রকম স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। একটা বড় বিপদ থেকে মুক্তি পেয়েছি সেটাকে আমি বড় করে দেখলাম না। কিন্তু আমি কেন দেখতে পাইনি সেই কষ্টটা আমার মধ্যে ভীষণ রকম ক্রিয়া করতে থাকল। আমার কোনো প্রস্তুতি নেই। তারপরেও ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মত লুঙ্গি পরা অবস্থায় অন্যদের সঙ্গে শুটকি পল্লীতে যাবার জন্য নৌকায় উঠে বসলাম। ক্যামেরাটা তখনও আমার গলায় ঝোলানো ছিল।

দুবলার চরকে দুবলার চর না বলে শুটকির চর বললে নামটা যথার্থ হত। পুরো দুবলার চরে শুটকি আর শুটকি। তিন ধরনের শুটকিই বেশি চোখে পড়ল। পুঁটি মাছের সাইজের এক ধরনের চান্দা মাছের আধিক্যই বেশি লক্ষ করলাম। তাছাড়া রয়েছে লইট্টা, ছুরি এবং ফাইস্যা মাছের শুটকি। রূপচাঁদা মাছের মত নামি দামি শুটকি তেমন একটা নেই। কেউ কেউ মাচার ওপর, কেউ কেউ চাটাই বিছিয়ে শুটকি শুকোতে দিয়েছে। রাতের বৃষ্টির কারণে অনেক শুকনো শুটকিও কাঁচা মাছের মত হয়ে গিয়েছে।
শুটকিপল্লীতে প্রায় এক শ’ দু’ শ’ গজ দূরে দূরে জেলেদের ঘর। ঘরগুলো গোলপাতা দিয়ে বানানো। জীবনে প্রথম গোলপাতার ঘর দেখলাম। ঘরগুলো এমনভাবে বানানো তার মধ্যে এক ধরনের শৈল্পিক রুচিবোধের পরিচয় দেখতে পেলাম। আমি বেশ কিছু ঘরের ছবি ক্যামেরাবন্দি করলাম। আমার ইচ্ছে ছিল কিছু রূপচাঁদা শুটকি কিনব। কোথাও তার হদিস পেলাম না। রূপচাঁদা বলে যেগুলো আমাকে চালিয়ে দিতে চেয়েছিল ওগুলো রূপচাঁদা নয়, আঁইচ চাঁদা। আমার সঙ্গে গাইড আবদুর রাজ্জাক ছিলেন। তিনি বললেন, স্যার, রূপচাঁদা শুটকি এখানে কদাচিৎ মিলে। আপনি বরং কিছু লইট্টা শুটকি নিয়ে যান। আমি আপনাকে শস্তায় কিনে দেব।

আমি তাকে বললাম, লইট্টা শুটকি আমার দরকার নেই। আমি কক্সবাজার থেকে কদিন আগে লইট্টা শুটকি নিয়ে এসেছি। ওগুলো খাওয়ারও মানুষ নেই।

তিনি বললেন, তাহলে শুটকি কেনার চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন।

রাজ্জাক সাহেবের কথায় আমি তাই করলাম। দু’ তিনদিন ধরে পানিতে ভাসছি। কিন্তু কোথাও তেমন পাখির দেখা সুন্দরবনে পাইনি। দুয়েকটি কানা বক এবং সাদা বক কদাচিৎ চোখে পড়েছে, অন্য কোনো পাখি নয়। দুবলার চরে মরজাত নদীতে দেখলাম হাজার হাজার গাঙচিল। তারা পানির কাছাকাছি এলোমেলোভাবে এলোপাথারি উড়ছে, যখন মাছের দেখা মেলে ছোঁ মেরে ধরে নিয়ে যায়। খুব কম সময়ই শিকারটা তাদের হাতছাড়া হয়। দৃশ্যটা দেখার মত।

DSC01065.jpgপূণ্যস্নান তখনও শেষ হয়ে যায়নি। প্রায় শ’খানেক মানুষকে দেখলাম মরজাত নদীকে সামনে রেখে সারিবদ্ধভাবে আসন পেতে বসে আছে, যেভাবে বসে থাকে ধ্যানে মগ্ন মুণি-ঋষিরা। তাদের মুখে কোনো রকম সাড়াশব্দ ছিল না। অনেকক্ষণ ধ্যান করার পর তারা একসঙ্গে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। যে যার মত স্নান করে চলে যাবে, তা কিন্তু নয়। তাদের মধ্যে একটা শৃঙ্খলাবোধ কাজ করে যেটা আমার চোখ এড়ায়নি।


আমরা জাহাজে ফিরে এলাম। হঠাৎ আমার মনে হল আমরা ভুল করে অন্য কোনো জাহাজে উঠে এলাম কি না। এমন ধারণা আমার কেন হল? আমি জাহাজে উঠে দেখলাম পুরো জাহাজটায় অনেক শিশু-নারী-পুরুষ গিজগিজ করছে। নিচের তলাটাতে অনেকগুলো ট্র্যাভেল ব্যাগ। পরে জানতে পেলাম এম ভি শম্পা জাহাজের সব যাত্রী আমাদের জাহাজে উঠে এসেছে। আমাদের জাহাজের সঙ্গে মোটা রশি বেঁধে ওই জাহাজটি পানিতে নামানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তাতে কোনো কাজ হয়নি। ফল হয়েছে রশিটা ছিঁড়ে দ্বি-খণ্ড হয়ে গেছে। ওই জাহাজের জন্য আরও একটা বড় দুঃসংবাদ ছিল–ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেছে।

প্রায় জাহাজে একাধিক ইঞ্জিন থাকে। একটা ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে আরেকটা ইঞ্জিন কাজ করে। যেসব জাহাজে একাধিক ইঞ্জিন থাকে ওগুলোতে বিপদে পড়ার ভয় অল্পই থাকে। এম ভি শম্পাতে ইঞ্জিন ছিল একটা এবং ওটাই বিকল হয়ে গেছে।
স্বাভাবিকভাবে আমাদের জাহাজে মানুষের চাপ বেড়ে গেল। আমাদের সঙ্গে নতুন অতিথি যোগ হয়েছে। সুন্দরবন হলিডেজ ট্যুরস কর্তৃপক্ষ যদি এদের জায়গা না দিত কী মুশকিলেই না তাদের পড়তে হত। তারা দু’ তিনদিনের মধ্যে ফিরে যেতে পারত না। বাধ্য হয়ে না হয় তারা দু’ তিনদিন থাকল, কিন্তু খাবে কোথায়? ওখানে তো আর দোকানপাট নেই। ওই জাহাজে যা খাবার ছিল তাতে হয়ত একটা দিন কোনো রকমে চলত। সুন্দরবন হলিডেজ ট্যুরস তাদের একটা বড় ধরনের উপকার করল।

লোকগুলো আমাদের জাহাজের উঠে এল বটে, কিন্তু তাদের চোখে মুখে একটা অসহায়ত্বের ছাপ আমি লক্ষ করলাম। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে সেটা বেশি করে ফুঁটে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবে এ জাহাজের লোকজন যেভাবে দাপট খাটিয়ে চলাফেরা করছে তা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের বসার এবং শোয়ার দুটো জায়গাই আছে। তাদের তো কিছুই নেই। গোটা দিনটাতে বিশ্রামের কোনো সুযোগ তাদের ছিল না। ইচ্ছে করলে তো আমরা আমাদের কেবিনগুলো ছেড়ে দিতে পারি না। আমরা তাদের প্রতি দয়া বা করুণা যেটাই করি সেটা হবে তাদের জন্য বাড়তি পাওয়া। আমরা আমাদের বসার জায়গাটি তাদের ছেড়ে দিয়েছিলাম। তাতে করে একটা বড় কাজ হয়েছে মহিলাদের বসার জায়গাটা হয়েছে।

আমি আগেই বলেছি তারা আমাদের অতিথি। কিন্তু যতই আমরা তাদের অতিথি হিসেবে গণ্য করি না কেন তারা ছিল আমাদের কাছে অবাঞ্ছিত। আমরা জাহাজে বসে রঙ-তামাশা করছি। গান করছি। তাদের কিন্তু আমরা অন্তর্ভুক্ত করছি না। আমাদের বাবুর্চি রান্না শেষ করলে তাদের বাবুর্চি রান্না করার সুযোগ পেত। আমরা খাওয়ার পর তারা খাবার টেবিলে যেত। ব্যাপারগুলো আমাকে একরকম আহত করত। কিন্তু আমাদের কিছুই করার ছিল না। আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি, কিন্তু অধিকার দেইনি, যেভাবে দেয় না কোনো দেশ শরণার্থীদের বেলায়।

সকালের নাস্তা সারার পর আমাদের জাহাজ খুলনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। আমরা মরজাত নদী থেকে পশুরে গিয়ে পড়লাম। তারপর ভৈরবে। আমরা মাইলের পর মাইল পেরিয়ে যাচ্ছি। যতই আমরা পথকে পিছনে ফেলে চলছি আমার বুকের মধ্যে একটা অজানা ব্যথা মোচড় দিয়ে দিয়ে উঠতে থাকল। জানি না, কবে আমি বাহারি সুন্দরবনকে আবার দেখতে পাব। এই ক’দিনে অনেকের সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে উঠেছে। বাকি জীবনে তাদের কারও সঙ্গে কি সাক্ষাৎ ঘটবে? হয়ত না। কিন্তু তাদের মুখগুলো আমি কোনোদিন ভুলব না, যেমনি ভুলব না আমার প্রিয় সুন্দরবনকে।

(শেষ)

লেখকের অন্য রচনা:
ছফামৃত (ধারাবাহিক রচনা)
সেন্টমার্টিন: দইরগার চরত বেরাই টেরাই হনো মজা ন পাইবা…
কক্সবাজার: হক্কল জাগা পুরি খাইলাম ন পাইলাম চাডিয়ার নান!
সিলেটে

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: নূরুল আনোয়ার
ইমেইল: nurulanwar1@gmail.com

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters


3 Responses

  1. খুব সুন্দর। লেখক নিছক ভ্রমণকাহিনী না লিখে তার ভেতরের অনেক কথাও খুব নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। এরকম একটা লেখার জন্য ধন্যবাদ :)

  2. MITU says:

    কতো দিনের ভ্রমণ জানতে পারলে ভালো হতো। ভালো লেগেছে, কিছুটা ভয়ও…।

  3. Nurul Anwar says:

    মিটুকে ধন্যবাদ। এটা কদিনের সফর বয়ানের মধ্যে এসেছে। তারপরেও বলছি, আমাদের সফরটা ছিল দু’ রাত তিনদিনের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.