বিতর্ক, ব্যক্তিত্ব

রবি ঠাকুর, রাহাজানি এবং রবীন্দ্র পূজারীবৃন্দ

admin | 8 Sep , 2011  

ফরিদ আহমেদঅভিজিৎ রায়

tagore-smiling.jpg ………
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১)
………

কোনো এক বিচিত্র কারণে আমাদের দেশে প্রায় সব খ্যাতিমানদের একটা সময় পরে মাথায় তোলা শুরু করি আমরা। মানুষ থেকে ক্রমে ক্রমে প্রথমে মহামানব, পরে দেবতা বানিয়ে ফেলি তাঁদের। হয়তো নিজেরা অক্ষম বলে, দুর্বল বলে যে হীনম্মন্যতায় আমরা ভুগি, সেই হীনম্মন্যতা লুকোনোর জন্যই দেবতার প্রয়োজন হয়ে পড়ে আমাদের। একটা সময় পর্যন্ত হয়তো কেউ এটা নিয়ে মাথা ঘামায় নি। কিন্তু আজকের এই যুগে এসে এটাকে আর মেনে নেওয়া যায় না। সময়ের প্রয়োজনেই আজকে দরকার হয়ে পড়েছে দেবোত্তর দেয়ালকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে আসল মানুষগুলোকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা। শুধু ভাল ভাল দিক নয়, তাঁদের কোনো অন্ধকার দিক থাকলেও সেটাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। এই কাজটা করা হবে কোনো প্রতিহিংসা থেকে নয়, তাঁদেরকে অবমাননা করা বা অপমান করার মানসিকতা থেকে নয়। বরং সত্যকে কঠিন এবং নির্মমভাবে তুলে ধরাটাই হবে মূল উদ্দেশ্য। রবি ঠাকুরের ভাষাতেই, সত্য যে কঠিন, সেই কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।

আবর্জনাকে রবীন্দ্রনাথ প্রশংসা করলেও আবর্জনাই থাকে।– হুমায়ুন আজাদ


বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য স্রষ্টা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর মত এরকম দুহাত উজাড় করে বাংলা সাহিত্যকে এত রত্নভাণ্ডার আর কেউ উপহার দিতে পারে নি। ঊনিশ শতকের এক দরিদ্র সাহিত্যের অধিকারী বাংলাকে তিনি প্রায় একক প্রচেষ্টাতেই জাতে তুলেছেন, সমৃদ্ধকর করে তুলেছেন। বিশ্বসভায় বাংলা সাহিত্যকে সগৌরবে উচ্চ আসনে বসিয়েছেন। নিরন্তর সৃষ্টি করেছেন তিনি। তাঁর মত এরকম ঐকান্তিক একাগ্রতায় সারা জীবনব্যাপী শুধুমাত্র সাহিত্য সৃষ্টি আর কোনো সাহিত্যিকের দ্বারা সম্ভবপর হয় নি। না এই অঞ্চলে, না সারা বিশ্বে। সচ্ছল পরিবারে জন্ম হওয়ার কারণে জীবিকা নিয়ে তাঁকে তেমন করে ভাবতে হয় নি কখনো। ফলে, আমৃত্যু তিনি সার্বক্ষণিক সাহিত্য সৃষ্টির জন্য অফুরান সময় পেয়েছেন। আর সেই সুযোগকে পূর্ণভাবে তিনি কাজে লাগিয়েছেন তাঁর অবিরাম আগ্রহ, নিরলস প্রচেষ্টা এবং ক্লান্তিহীন লেখালেখির মাধ্যমে। সেই কৈশোর বয়স থেকে যে তরী তিনি ভাসিয়েছেন সাহিত্যের স্রোতস্বিনীতে, তার সফল সমাপন ঘটেছে মরণ সাগরের তীরে এসে।
—————————————————————-
আমাকে ডেকে সস্নেহে পাশে বসালেন, কুশল প্রশ্ন করলেন। তারপর বললেন, “দেখো, বিশ্বপরিচয় লিখতে লিখতে দেখলুম এর ভাষাটা আমারই হয়ে গেছে, তাই এর মধ্যে তোমাকে কোথাও স্থান দিতে পারলুম না।” একটু থেকে বললেন, “অবশ্য তুমি শুরু না করলে আমি সমাধা করতে পারতুম না, তা ছাড়া বিজ্ঞানের অনভ্যস্ত পথে চলতে শেষপর্যন্ত এই অধ্যবসায়ীর সাহসে কুলাতো না। তুমি ক্ষুণ্ণ হয়ো না।”
—————————————————————-
দুঃখজনক হলেও এটা সত্যি যে, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এত বছর পরেও রবীন্দ্র মূল্যায়ন সঠিকভাবে হয় নি। একদল যেমন ভক্তিরসে ভরপুর হয়ে তাঁকে পুজো করে ছাড়ছে, অন্য দল তেমনি তাঁর বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষোদগার বর্ষণ করে চলেছে, মূলতঃ সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এই দুয়ের মাঝামাঝি থেকে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নির্মোহ এবং নৈর্ব্যক্তিক আলোচনা নেই বললেই চলে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এই সমস্যাটা আজকের নয়। তিনি জীবিত থাকা অবস্থা থেকেই এটা চলে আসছে। নীরদ চৌধুরী তাঁর আত্মঘাতী বাঙালী গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্ব ‘আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ’-এর ভূমিকাতে লিখেছিলেন :

তাঁহার (রবীন্দ্রনাথের) সম্বন্ধে সত্য আবিষ্কারের চেষ্টা আজ পর্যন্ত হয় নাই। যাহা হইয়াছে তাহা একপক্ষে হিন্দুর মূর্তিপূজার মত, অন্য পক্ষে মুসলমানের মূর্তি ভাঙার মত। জীবিতকালে তিনি যেন হিন্দু হইয়া মুসলমানের রাজত্ব বাস করিয়াছিলেন, অর্থাৎ প্রধানত আক্রমণেরই লক্ষ্য ছিলেন। এই অবস্থার জন্য তাঁহার ব্যক্তিত্ব, মতামত ও রচনা সম্বন্ধে যেসব কথা বলা ও লেখা হইয়াছিল তাহাকে মিথ্যা নিন্দা ভিন্ন আর কিছু বলা যাইতে পারে না। আবার এই বিদ্বেষপ্রসূত নিন্দার পরিমাণ, তীব্রতা ও ইতরতা এমনই হইয়াছিল যে উহার ভারে ও ধারে বেশীর ভাগ বাঙালির কাছেই তাঁহার আসল রূপ চাপা ও কাটা পড়িয়াছিল।

অবশ্য ইহাদের প্রতিপক্ষও যে ছিল না তাহা নয়, অর্থাৎ ভক্তও তাঁহার জুটিয়াছিল। ইহারা বিদ্বেষীদের তুলনায় সংখ্যায় অনেক কম হইলেও দলে নিতান্তই অল্পসংখ্যক ছিল না। তবে ইহাদের দ্বারাও রবীন্দ্রনাথের হিত হয় নাই। ইহারাও তাঁহার যে রূপ প্রচার করিয়াছিল তাহা অন্ধ স্তাবকের প্রশস্তি ভিন্ন কিছু নয়। এমন কি এই রবীন্দ্রভক্তি এমনই বাক্যভঙ্গি ও আচরণে প্রকাশ পাইত যে, উহাকে হাস্যাস্পদ করা নিন্দাকারীদের পক্ষে খুবই সহজ হইত। ফলে, রবীন্দ্র ভক্তেরাও রবীন্দ্র বিদ্বেষীদের মতই মিথ্যারই প্রচারক হইয়াছিল।

বর্তমানে অবশ্য অবস্থাটা উল্টা হইয়াছে, অর্থাৎ রবীন্দ্র নিন্দুকেরা লোপ না পাইলেও রবীন্দ্রভক্তেরাই প্রবল হইয়াছে। কিন্তু না ভক্তি না নিন্দা, কোনটাই উচ্চস্তরে উঠে নাই। এখনও রবীন্দ্রনাথের সত্যরূপ আত্মপ্রকাশ করিতে পারিতেছে না।

নীরদ চৌধুরী যে কথাগুলি বলে গিয়েছেন তার কী আশ্চর্য প্রতিফলন আজকের যুগে। রবীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ বাঙালিদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তাঁর অসীম মেধা, সীমাহীন সৃষ্টিশীলতা, শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনে গ্রীবা উন্নত রাজহংসের মত সাবলীল বিচরণ অন্য সব বাঙালিদের থেকে তাঁকে অনন্য করে তুলেছে। কিন্তু এই অনন্যতা তাঁকে নিশ্চয়ই দেবত্ব দেয় নি। অথচ আজকের যুগে অনেক বাঙালিই রবীন্দ্রনাথকে প্রায় দেবতার আসনে বসিয়ে ফেলেছেন। তাঁকে নিয়ে ভক্তি গদ্গদ হয়ে পুজোর আসর বসিয়েছেন তাঁরা। রবীন্দ্রনাথের সামান্যতম সমালোচনা, ক্ষীণতম ত্রুটি-বিচ্যুতির উল্লেখ তাঁদেরকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। উন্মাতালের মত ঝাপিয়ে পড়তে চান সমালোচনাকারীর উপরে। অথচ এঁরা কখনোই বিবেচনায় নেন না যে, রবীন্দ্রনাথও রক্তমাংসে গড়া একজন মানুষ ছিলেন। তাঁরও অন্য আর দশটা মানুষের মতই মানবীয় সীমাবদ্ধতা ছিল। ছিল লোভ, ছিল হিংসা, ছিল ক্ষুদ্রতা, ছিল মহত্ত্ব, ছিল ভালবাসা, ছিল প্রেম। ছিল অনেক ধরনের প্রশংসনীয় মানবীয় গুণাবলী এবং সেই সাথে সাথে নিন্দাযোগ্য অগুণাবলীও।

এই সমস্ত অন্ধ স্তাবক এবং গুণমুগ্ধ প্রেমিক পূজারীদের কারণে রবীন্দ্রনাথের সঠিক মূল্যায়ন আজকের যুগে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। রবীন্দ্রনাথের উজ্জ্বল অংশকে উদ্ভাসিত করে দিতে এঁরা যেমন তৎপর, তেমনই তাঁর অন্ধকার অংশগুলোকে অতি যত্নে আড়াল করতেও এঁদের কোনো কার্পণ্য নেই। সে কারণেই জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথের যে সমস্ত সমালোচনা হয়েছে, সেগুলোকে এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ নীরদ চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী রবীন্দ্রনাথের জীবিত থাকার সময়ে তাঁর গুণমুগ্ধ স্তাবকের তুলনায় বিরূপ সমালোচকের সংখ্যাই অনেক বেশি ছিল। প্রায় সব রবীন্দ্র গবেষকই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে রবীন্দ্রনাথের আঁধার অংশগুলোকে অপসারিত করে দিয়েছেন। ধর্ম অনুসারীরা যেরকম করে তাঁদের ধর্মীয় নেতাকে মহামানব তৈরি করে তাঁর মহৎ গুণগুলোকে শুধুমাত্র উল্লেখ করে, ঠিক সেরকম করেই রবীন্দ্র ভক্তরাও রবীন্দ্রনাথকে প্রেরিত পুরুষ বা অবতার বানানোর আয়োজন প্রায় সুসম্পন্ন করে ফেলেছে। কেউ রবীন্দ্রনাথের সামান্যতম সমালোচনা করলেই লাঠিসোঠা হাতে হা-রে-রে-রে বলে তেড়ে এসেছেন তাঁরা। আহমদ শরীফ তাঁর রবীন্দ্রোত্তর তৃতীয় প্রজন্মে রবীন্দ্র মূল্যায়ন প্রবন্ধে লিখেছেন:

তাঁর লঘু-গুরু ত্রুটি-বিচ্যুতি, মন-মননের সীমাবদ্ধতা বিমুগ্ধ-বিমূঢ় ভক্ত-অনুরক্তেরা এতো কাল চেপে রেখেছেন, অন্য কেউ উচ্চারণ করতে চাইলেও মারমুখো হয়ে উঠেছেন। প্রমাণ ষাটের দশকে বুদ্ধদেব বসুকে এবং ইদানীং সুশোভন সরকারকে ও সুভোঠাকুরকে গালমন্দ শুনতে হয়েছে। আর পঞ্চাশের দশকে কম্যুনিস্টরাও হয়েছিল নিন্দিত রবীন্দ্র বিরোধিতার জন্যে।

এই পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিরূপ আলোচনা একটু বিপদজনকই বটে। তবুও কিছুটা ভরসা আছে আমাদের এই লেখার জায়গাটা বিডিআর্টসের মত একটা প্ল্যাটফর্ম বলেই। এর অধিকাংশ পাঠকই মুক্তবুদ্ধির, মুক্তচেতনার এবং মুক্তমনের মানুষ। অন্ধ ভক্তি-শ্রদ্ধার উর্ধ্বে উঠে গুণীর কদর এঁরা যেমন করতে জানেন, ঠিক সেরকমই যে কোনো মান্যবরের মানবীয় সীমাবদ্ধতাকেও না লুকিয়ে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতেও অভ্যস্ত তাঁরা। রবীন্দ্রনাথও ইন্দ্রিয়চালিত মানুষ ছিলেন। কাজেই, নানা প্রয়োজনে তাঁরও দোষগুণ নানা প্রসঙ্গে উচ্চারণ করতে হয়, হবে। এতে বাধা দেওয়াটা কোনো কাজের কথা নয়।
—————————————————————-
তাঁর ভক্তদের মত রবীন্দ্রনাথ নিজেও নিজের বিরূপ সমালোচনা সইতে পারতেন না। সমালোচনায় উদ্বেলিত হয়ে, উৎকণ্ঠিত হয়ে তা খণ্ডনের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়তেন তিনি। তাঁর হয়ে কেউ প্রতিবাদ করুক, সেই আশায় বসে থাকতেন তিনি। সেরকম কাউকে পাওয়া না গেলে নিজেই ছদ্ম কোনো নাম নিয়ে প্রতিবাদ, প্রতিকারে নেমে পড়তেন।
—————————————————————-
রবীন্দ্রনাথ যে দোষেগুণে মিলিয়ে আমাদের মতো এক রক্তমাংসের মানুষই ছিলেন তার প্রমাণ আছে তাঁর নিজের জীবনেই। তাঁর ভক্তদের মত রবীন্দ্রনাথ নিজেও নিজের বিরূপ সমালোচনা সইতে পারতেন না। সমালোচনায় উদ্বেলিত হয়ে, উৎকণ্ঠিত হয়ে তা খণ্ডনের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়তেন তিনি। তাঁর হয়ে কেউ প্রতিবাদ করুক, সেই আশায় বসে থাকতেন তিনি। সেরকম কাউকে পাওয়া না গেলে নিজেই ছদ্ম কোনো নাম নিয়ে প্রতিবাদ, প্রতিকারে নেমে পড়তেন। এ প্রসঙ্গে আহমদ শরীফ বলেন:

রবীন্দ্রনাথ বিরূপ সমালোচনা সহ্য করতে পারতেন না, প্রতিবাদ করার লোক পাওয়া না গেলে বেনামে লিখে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করতেন। রবীন্দ্রানুরাগী ও রবীন্দ্রস্নেহভাজন অন্নদাশংকর রায় বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর ত্রুটি-নিন্দা-কলঙ্কের সাক্ষ্য প্রমাণ সতর্ক প্রয়াসে অপসারিত বা বিনষ্ট করতেন। তা সত্ত্বেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সুশোভন সরকার তাঁর প্রণাম-প্রীতিরূপ দুর্বলতার কথা বলে গেছেন। তাঁর সেজো ভাইয়ের পৌত্র সুভোঠাকুর [সুভগেন্দ্রনাথ ঠাকুর] জমিদার পরিচালনায় তাঁর স্বার্থবুদ্ধির কথা বর্ণনা করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষের কবিতার নায়ক অমিতের মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন যে, কবি মাত্রেরই পাঁচ বছরের জন্য কবিত্ব করা উচিত। তা না হলে শেষকালটায় অনুকরণের দল চারি দিকে ব্যূহ বেঁধে তাদেরকে মুখ ভ্যাংচাতে থাকে। তাদের লেখার চরিত্র বিগড়ে যায়, পূর্বের লেখা থেকে চুরি শুরু করে হয়ে পড়ে পূর্বের লেখার ‘রিসীভর্স্ অফ স্টোল্‌ন্‌ প্রপার্টি’। রবীন্দ্রনাথ নিজেও ঈর্ষণীয় রকমের দীর্ঘায়ু ছিলেন। এই দীর্ঘ জীবনে তিনি অসংখ্য সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির পরিমাণের দিক দিয়ে বাংলা সাহিত্যে তাঁর ধারে কাছেও কেউ নেই। তাঁর সমতুল্য সৃষ্টি বিশ্বের অন্য কোনো সাহিত্যে আর কেউ করেছে কি না বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এই বিপুল সৃষ্টিতে কতখানি তিনি তাঁর নিজের লেখা থেকেই নকল করে লিখেছেন, সেটা রবীন্দ্র গবেষকরাই ভাল বলতে পারবেন। তবে, যেখানে কবি সাহিত্যিকদের বেশিরভাগেরই প্রতিষ্ঠা আসে জীবনের প্রথম চল্লিশ বছরের মধ্যে, তারপর তাঁদের জীবনে মোটামুটি বন্ধ্যাত্ব নেমে আসে, সেখানে রবীন্দ্রনাথ আমৃত্যু লিখে গিয়েছেন অকাতর। শুধু লিখে গিয়েছেন বললে ভুল হবে, উৎকর্ষের দিক দিয়ে এই শেষের বছরগুলো বরং ছাড়িয়ে গিয়েছে আগের রবীন্দ্রনাথকে। এ বিষয়ে নীরদ চৌধুরী লিখেছেন:

ওয়ার্ডসওয়ার্থ, টেনিসন, ব্রাউনিং কেহই পরবর্তী জীবনে আগের রচনার তুলনায় উৎকৃষ্টতর কবিতা লেখেন নাই –ইঁহাদের কবিকীর্তি চল্লিশ বৎসরের আগে রচিত কাব্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ও হুগো শেষ জীবনে যাহা লিখিয়াছিলেন তাহা আগের জীবনে যাহা লিখিয়াছিলেন তাহার সমানতো বটেই, কোনো কোনো রচনায় উচ্চতর।

—————————————————————-
আহমদ শরীফের মতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির আগের রবীন্দ্রনাথের কাঁচা লেখা প্রাজ্ঞ হয়ে উঠেছে নোবেল প্রাপ্তির পরের সময়ে। তাঁর ভাষাতেই:… বলতে গেলে পুরস্কার পূর্বকালের রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ঊনিশ শতকী কবি আর পুরস্কার উত্তরকালের রবীন্দ্রনাথ হলেন বিশ শতকের মনীষা মানুষ।
—————————————————————-
আহমদ শরীফও একই ধরনের মতামত দিয়েছেন। তবে এই বিভাজনকে তিনি চল্লিশ বছরের আগে আর পরে করেন নি। বরং নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির সময়টাকে বিভাজন রেখা হিসাবে বিবেচনা করেছেন। আহমদ শরীফের মতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির আগের রবীন্দ্রনাথের কাঁচা লেখা প্রাজ্ঞ হয়ে উঠেছে নোবেল প্রাপ্তির পরের সময়ে। তাঁর ভাষাতেই:

নোবেল পুরস্কারের মান রক্ষার খাতিরেই রবীন্দ্রনাথকে বৈশ্বিক ও বিশ্বমানবিক চিন্তা-চেতনার অনুশীলন করতে হয়েছে। তাঁর দীর্ঘায়ু তাঁকে এ সুযোগ-সৌভাগ্য দিয়েছে। পুরস্কার প্রাপ্তির পরে তিনি সুদীর্ঘ আটাশ বছর বেঁচে ছিলেন, তার আগে বাল্য-কৈশোরের যৌবনের মধ্যবয়সের জীবনদেবতা চালিত কাঁচা-পাকা লেখায় ঊনিশ শতক ও এ শতকের এক দশক কেটেছে বটে, প্রায় সমসংখ্যক বছরব্যাপী, কিন্তু পরিচ্ছন্ন ও পরিপক্ক জ্ঞান-প্রজ্ঞা, মন-মনন এবং মনীষা ও নৈপুণ্য নিয়ে বিশ্ববোধ অন্তরে জাগ্রত রেখে লিখেছেন জীবনের স্বর্ণযুগে আটাশ বছর ধরে। বলতে গেলে পুরস্কার পূর্বকালের রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ঊনিশ শতকী কবি আর পুরস্কার উত্তরকালের রবীন্দ্রনাথ হলেন বিশ শতকের মনীষা মানুষ।

তবে এই রকম বিপুল বিক্রমে লিখে গেছেন বলে এটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না যে তিনি কাউকে অনুসরণ করেন নি, অনুকরণ করে নি, বা নকল করেন নি কখনো। কবি সাহিত্যিকরা তাঁদের জীবনের কোনো না অংশে কারো না কারো দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে থাকেন। এতে দোষের কিছু নেই। দোষ হয় তখনই, যখন কেউ অন্যের সৃষ্টিকে সচেতনভাবে নিজের নামে চালাতে চায়। রবীন্দ্রনাথের নামে এই ধরনের অভিযোগ তেমন একটা আসে নি। এর মানে অবশ্য এই না যে তিনি কুম্ভিলকতার দোষ (plagiarism) থেকে মুক্ত। আমাদের মত অর্বাচীন লেখকদের চোখে তো বটেই, বহু বিদগ্ধ গবেষকদের চোখেও সেগুলো পড়েছে। কিন্তু ধর্মপ্রচারকদের অনুসারীদের মতোই অধিকাংশই কেবল ‘ঠাকুর পুজো’ আর ‘নিভৃত প্রাণের দেবতা’র স্তব করে গেছেন অহর্নিশি, আর কঠিন, নির্জলা এবং রূঢ় সত্যগুলোকে আড়াল করে ঠেলে দিয়েছেন কৃষ্ণগহ্বরের গহীন আধাঁরে। হ্যা, স্তাবক দলের মোহনীয় পরিবেশনায় আমরা রবীন্দ্রাকাশে এতোদিন কেবল চাঁদের একটি পিঠই দেখে এসেছি। আজ আমরা মুক্তমনা লেখকেরা চাঁদের উলটো পিঠটাও দেখতে আগ্রহী। তাই, এই প্রবন্ধে আমরা রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে কুয়াশার কালো চাঁদর সরানোর সংকল্প করেছি। তবে, তার আগে এটুকু বলে নিতে চাই যে, রবীন্দ্র বিদ্বেষ থেকে এই প্রবন্ধটি লেখা হয় নি। বরং আমাদের মধ্যে অনেকের মধ্যেই অহেতুক যে পুজো করার বাতিক আছে, সেই পূজারীদের রবি ঠাকুরের মূর্তি গড়ে আড়ম্বরপূর্ণ পুজোতে বাগড়া দেওয়াটা এখানে মূল উদ্দেশ্য। রবীন্দ্রনাথকে আমরা দেখতে চাই নির্লিপ্ত এবং নির্মোহ দৃষ্টিতে, পূজারীদের প্রেমকাতরতাময় কিংবা বিদ্বেষীদের বিষ মাখানো বিষাক্ত দৃষ্টিতে নয়।
—————————————————————-
রবি ঠাকুরের মূর্তি গড়ে আড়ম্বরপূর্ণ পুজোতে বাগড়া দেওয়াটা এখানে মূল উদ্দেশ্য। রবীন্দ্রনাথকে আমরা দেখতে চাই নির্লিপ্ত এবং নির্মোহ দৃষ্টিতে, পূজারীদের প্রেমকাতরতাময় কিংবা বিদ্বেষীদের বিষ মাখানো বিষাক্ত দৃষ্টিতে নয়।
—————————————————————-

রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞানপ্রেমিক ছিলেন সে কথা কারো অজানা নয়। বাংলার সেরা বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। নীরদ চৌধুরীর আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ থেকে জানা যায় এই ঘনিষ্ঠতা এমনই পর্যায়ের ছিল যে, জগদীশ বসু প্রায়শই রবি ঠাকুরের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ ইউরোপে এসে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সাথেও সাক্ষাৎ করে গিয়েছেন। এর সবকিছুই তাঁর বিজ্ঞানের প্রতি প্রবল ভালবাসার প্রমাণ হিসাবে আমরা নিতে পারি। কিন্তু, এতেও যাঁরা সন্তুষ্ট হবেন না বলে মনে হয়, তাঁদের কারণেই হয়তো বিজ্ঞানের উপর চমৎকার এবং অত্যন্ত উন্নত মানের একটা বই লিখে গিয়েছেন তিনি জীবনের শেষপ্রান্তে এসে। ছিয়াত্তর বছর বয়সে লেখা একশ পনের পৃষ্ঠার সেই বইটির নাম ছিল বিশ্বপরিচয়। তিনি যে বিজ্ঞানপ্রেমিক ছিলেন, বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে তাঁর যে লোভের অন্ত ছিল না, সেটা আমরা এই বইয়ের উৎসর্গপত্র থেকেও জানতে পারি। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে। সেই উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছিলেন:

আমি বিজ্ঞানের সাধক নই সে কথা বলা বাহুল্য। কিন্তু বালককাল থেকে বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে আমার লোভের অন্ত ছিল না। আমার বয়স বোধ করি তখন নয়-দশ বছর; মাঝে মাঝে রবিবারে হঠাৎ আসতেন সীতানাথ দত্ত [ঘোষ] মহাশয়। আজ জানি তাঁর পুঁজি বেশি ছিল না, কিন্তু বিজ্ঞানের অতি সাধারণ দুই-একটি তত্ত্ব যখন দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিতেন আমার মন বিস্ফারিত হয়ে যেত। মনে আছে আগুনে বসালে তলার জল গরমে হালকা হয়ে উপরে ওঠে আর উপরের ঠাণ্ডা ভারী জল নীচে নামতে থাকে, জল গরম হওয়ার এই কারণটা যখন তিনি কাঠের গুঁড়োর যোগে স্পষ্ট করে দিলেন, তখন অনবচ্ছিন্ন জলে একই কালে যে উপরে নীচে নিরন্তর ভেদ ঘটতে পারে তারই বিস্ময়ের স্মৃতি আজও মনে আছে। যে ঘটনাকে স্বতই সহজ বলে বিনা চিন্তায় ধরে নিয়েছিলুম সেটা নয় এই কথাটা বোধ হয় সেই প্রথম আমার মনকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তার পরে বয়স তখন হয়তো বারো হবে (কেউ কেউ যেমন রঙ-কানা থাকে আমি তেমনি তারিখ-কানা এই কথাটি বলে রাখা ভালো) পিতৃদেবের সঙ্গে গিয়েছিলুম ড্যালহৌসি পাহাড়ে। সমস্ত দিন ঝাঁপানে করে গিয়ে সন্ধ্যাবেলায় পৌঁছতুম ডাকবাংলায়। তিনি চৌকি আনিয়ে আঙিনায় বসতেন। দেখতে দেখতে, গিরিশৃঙ্গের বেড়া-দেওয়া নিবিড় নীল আকাশের স্বচ্ছ অন্ধকারে তারাগুলি যেন কাছে নেমে আসত। তিনি আমাকে নক্ষত্র চিনিয়ে দিতেন, গ্রহ চিনিয়ে দিতেন। শুধু চিনিয়ে দেওয়া নয়, সূর্য থেকে তাদের কক্ষচক্রের দূরত্বমাত্রা, প্রদক্ষিণের সময় এবং অন্যান্য বিবরণ আমাকে শুনিয়ে যেতেন। তিনি যা বলে যেতেন তাই মনে করে তখনকার কাঁচা হাতে আমি একটা বড়ো প্রবন্ধ লিখেছি। স্বাদ পেয়েছিলুম বলেই লিখেছিলুম, জীবনে এই আমার প্রথম ধারাবাহিক রচনা, আর সেটা বৈজ্ঞানিক সংবাদ নিয়ে।

তার পরে বয়স আরো বেড়ে উঠল। ইংরেজি ভাষা অনেকখানি আন্দাজে বোঝবার মতো বুদ্ধি তখন আমার খুলেছে। সহজবোধ্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই যেখানে যত পেয়েছি পড়তে ছাড়ি নি। মাঝে মাঝে গাণিতিক দুর্গমতায় পথ বন্ধুর হয়ে উঠেছে, তার কৃচ্ছ্রতার উপর দিয়ে মনটাকে ঠেলে নিয়ে গিয়েছি। তার থেকে একটা এই শিক্ষা লাভ করেছি যে, জীবনে প্রথম অভিজ্ঞতার পথে সবই যে আমরা বুঝি তাও নয় আর সবই সুস্পষ্ট না বুঝলে আমাদের পথ এগোয় না এ কথাও বলা চলে না। জলস্থল-বিভাগের মতোই আমরা যা বুঝি তার চেয়ে না বুঝি অনেক বেশি, তবুও চলে যাচ্ছে এবং আনন্দ পাচ্ছি। কতক পরিমাণে না-বোঝাটাও আমাদের এগোবার দিকে ঠেলে দেয়। যখন ক্লাসে পড়াতুম এই কথাটা আমার মনে ছিল। আমি অনেক সময়েই বড়োবয়সের পাঠ্যসাহিত্য ছেলেবয়সের ছাত্রদের কাছে ধরেছি। কতটা বুঝেছে তার সম্পূর্ণ হিসাব নিই নি, হিসাবের বাইরেও তারা একরকম করে অনেকখানি বোঝে যা মোটে অপথ্য নয়। এই বোধটা পরীক্ষকের পেনসিলমার্কার অধিকারগম্য নয় কিন্তু এর যথেষ্ট মূল্য আছে। অন্তত আমার জীবনে এইরকম পড়ে-পাওয়া জিনিস বাদ দিলে অনেকখানিই বাদ পড়বে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের সহজ বই পড়তে লেগে গেলুম। এই বিষয়ের বই তখন কম বের হয় নি। স্যার রবর্ট বল-এর বড়ো বইটা আমাকে অত্যন্ত আনন্দ দিয়েছে। এই আনন্দের অনুসরণ করবার আকাঙ্ক্ষায় নিউকো‌ম্বস, ফ্লামরিয়ঁ প্রভৃতি অনেক লেখকের অনেক বই পড়ে গেছি – গলাধঃকরণ করেছি শাঁসসুদ্ধ বীজসুদ্ধ। তার পরে এক সময়ে সাহস করে ধরেছিলুম প্রাণতত্ত্ব সম্বন্ধে হক্সলির এক সেট প্রবন্ধমালা। জ্যোতির্বিজ্ঞান আর প্রাণবিজ্ঞান কেবলই এই দুটি বিষয় নিয়ে আমার মন নাড়াচাড়া করেছে। তাকে পাকা শিক্ষা বলে না, অর্থাৎ তাতে পাণ্ডিত্যের শক্ত গাঁথুনি নেই। কিন্তু ক্রমাগত পড়তে পড়তে মনের মধ্যে বৈজ্ঞানিক একটা মেজাজ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। অন্ধবিশ্বাসের মূঢ়তার প্রতি অশ্রদ্ধা আমাকে বুদ্ধির উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে আশা করি অনেক পরিমাণে রক্ষা করেছে। অথচ কবিত্বের এলাকায় কল্পনার মহলে বিশেষ যে লোকসান ঘটিয়েছে সে তো অনুভব করি নে।

কাজেই, রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান প্রেম নিয়ে আর কোনো সন্দেহ না থাকাটাই স্বাভাবিক। বিজ্ঞানের প্রতি প্রেমের কারণে বিশ্বপরিচয় লেখার আগে বেশ কিছু বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধও তিনি লিখেছিলেন। যদিও সেগুলোর মান ছিল শিশুতোষ পর্যায়ের। সেই প্রবন্ধগুলো আসলেই যে শিশুতোষ ছিল তার উদাহরণ হিসাবে রবীন্দ্রনাথ লিখিত একটি বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধকে এখানে তুলে দিচ্ছি।

মাকড়সা-সমাজে স্ত্রীজাতির গৌরব

পৌরুষ সম্বন্ধে স্ত্রী-মাকড়সার সহিত পুরুষ-মাকড়সার তুলনাই হয় না। প্রথমত, আয়তনে মাকড়সার অপেক্ষা মাকড়সিকা ঢের বড়ো, তার পর তাহার ক্ষমতাও ঢের বেশি। স্বামীর উপর উপদ্রবের সীমা নাই, তাহাকে মারিয়া কাটিয়া অস্থির করিয়া দেয়। এমন-কি, অনেক সময় তাহাকে মারিয়া ফেলিয়া খাইয়া ফেলে; এরূপ সম্পূর্ণ দাম্পত্য একীকরণের দৃষ্টান্ত উচ্চশ্রেণীর জীবসমাজে আছে কি না সন্দেহ।

না, এটি কোন আনাড়ি স্কুল ছাত্রের শুরু করা এবং পথিমধ্যে হাল ছেড়ে দেয়া কোন প্রবন্ধের একাংশ নয়। এটি পরিণত বয়সে লেখা তাঁর একটি পুরো প্রবন্ধই। অবাক লাগছে? বিস্ময়কর হলেও এটাই সত্যি। বিশ্বপরিচয় বাদ দিলে বিজ্ঞান বিষয়ে তিনি যে সকল প্রবন্ধ লিখেছেন সেগুলো এই মাকড়সা-সমাজে স্ত্রীজাতির গৌরব ধরণের।

তো এই রবীন্দ্রনাথের হাত দিয়েই শেষ বয়সে বেরিয়ে এসেছিল বিশ্বপরিচয়ের মত সত্যিকার অর্থে বিজ্ঞানের উন্নত একখানা বই। এতেও কোনো সমস্যা ছিল না, বরং আমাদের জন্য তা সৌভাগ্যেরই বিষয়। এর মধ্যে তিনি হয়তো বিজ্ঞানের উপরে আরো পড়াশোনা করেছেন, নিজের উৎকর্ষ বাড়িয়ে নিয়েছেন, নিজেকে সমৃদ্ধতর করেছেন। তাঁর মানের একজন ব্যক্তি তা করতেই পারেন। কিন্তু বিশ্বপরিচয়ের উৎসর্গপত্রের শেষের দিকে রবীন্দ্রনাথ কিছু কথা বলেছিলেন, যা অনেকটা ছন্দপতনের মতই ছিল। যদিও তিনি আন্তরিক অকপটতায় কথাগুলো বলার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু এর মধ্য থেকেই বেরিয়ে এসেছিল ভয়ংকর এক সত্য। সেই ভয়ংকর সত্যকে জানার আগে আসুন দেখি রবীন্দ্রনাথ কী বলেছিলেন। উৎসর্গপত্রের শেষের দিকে এসে তিনি এই গ্রন্থটি লেখার কারণটি ব্যাখ্যা করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন:

শ্রীমান প্রমথনাথ সেনগুপ্ত এম. এসসি. তোমারই ভূতপূর্ব ছাত্র। তিনি শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান-অধ্যাপক। বইখানি লেখবার ভার প্রথমে তাঁর উপরেই দিয়েছিলেম। ক্রমশ সরে সরে ভারটা অনেকটা আমার উপরেই এসে পড়ল। তিনি না শুরু করলে আমি সমাধা করতে পারতুম না, তাছাড়া অনভ্যস্ত পথে শেষ পর্যন্ত অব্যবসায়ীর সাহসে কুলোত না তাঁর কাছ থেকে ভরসাও পেয়েছি সাহায্যও পেয়েছি।

এখানেই এসেই মূলত খটকাটা শুরু হয়। যে বই লেখার ভার পড়েছিল প্রমথনাথের উপরে সেই বই লেখার ভার হঠাৎ করে রবীন্দ্রনাথের ঘাড়ে গিয়ে পড়লো কেন? তাছাড়া কথা হচ্ছে, প্রমথনাথ ঠিক কতখানি শুরু করেছিলেন? যতটুকু শুরু করেছিলেন তাতে করে সহলেখক হিসাবে তাঁর নাম আসাটা যুক্তিসঙ্গত ছিল কি না? এটি অনুসন্ধান করতে গিয়েই বেরিয়ে আসে চরম এবং ভয়ংকর সত্যটা; যে সত্যটাকে দীর্ঘকাল গোপন করে রাখা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের ইমেজকে তাঁরই পরনের সাদা আলখাল্লার মত পুতপবিত্র রাখার বাসনায়।

মূল ঘটনায় যাবার আগে বিশ্বপরিচয় গ্রন্থটি শুরুর ইতিবৃত্তটুকু একটু জেনে নেয়া যাক। রবীন্দ্রনাথের এক সময় ইচ্ছে হয়েছিলো পশ্চিমের ‘হোম ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরি’র অনুকরণে ‘লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা’ তৈরির–যেটি জনপ্রিয় ভাষায় বিজ্ঞানকে সর্বসাধারণের কাছে পোঁছিয়ে দেবে। কাজেই ভাষা হতে হবে যথাসম্ভব সহজ সরল, পাণ্ডিত্যবিবর্জিত। তিনি ভেবেছিলেন মহাবিশ্বের সাথে সাধারণ পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য একটা বই লেখা হবে, এবং বইটির ভার তিনি দেন পদার্থবিদ্যার অধ্যাপকের কাজ নিয়ে বিশ্বভারতীতে যোগ দেয়া তরুণ অধ্যাপক প্রমথনাথ সেনগুপ্তের উপর।

রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণ করে বলেছেন [প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনী ও রবীন্দ্রসাহিত্য-প্রবেশক, ৪র্থ খণ্ড, বিশ্বভারতী, ১৪০১, পৃ. ৯৬] :

‘আমাদের আলোচ্যপর্বে রবীন্দ্রনাথকে আর-একটি বিষয়ে আলোচনা করিতে দেখিতেছি, সেটি হইতেছে লোকশিক্ষার ক্ষেত্রে। পাঠকদের স্মরণে আছে বহু বৎসর পূর্বে Home University Libraryর অনুরূপ গ্রন্থমালা বাংলাভাষায় প্রকাশনের কথা কবির মনে আসিয়াছিল। এতকাল পরে বিশ্বভারতী প্রকাশন-বিভাগের অধ্যক্ষ চারুচন্দ্র ভট্টাচার্যের উদ্যোগে লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা প্রকাশের পরিকল্পনা গৃহীত হইল। কবির মতে, ‘সাধারণজ্ঞানের সহজবোধ্য ভূমিকার আরম্ভ হইবে বিজ্ঞানচর্চায়। তদুদ্দেশে কবির ইচ্ছা যে, এই লোকশিক্ষা গ্রন্থমালার প্রথম গ্রন্থ হইবে বিশ্বপরিচয়। কবি বলেন, ‘বুদ্ধিকে মোহমুক্ত ও সতর্ক করবার জন্য প্রধান প্রয়োজন বিজ্ঞানচর্চার।… জ্ঞানের এই পরিবেশনকার্যে পাণ্ডিত্য (pedantry) যথাসাধ্য বর্জনীয় মনে করি। এই প্রথম গ্রন্থখানি লিখিবার ভার অর্পণ করা হইয়াছিল প্রমথনাথ সেনগুপ্তের উপর। প্রমথনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র, সত্যেন বসুর প্রিয় শিষ্য, শিক্ষাভবনে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক।’

তরুণ শিক্ষক প্রমথনাথ শান্তিনিকেতনে চাকরী পেয়েছিলেন সত্যেন বোস এবং জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের সুপারিশে। তিনি বিজ্ঞানের ভাল ছাত্র ছিলেন। কিন্তু বাংলায় খুব বেশি দখল ছিল না, (অন্ততঃ রবীন্দ্রনাথের সমপর্যায়ের নন বলে তিনি মনে করতেন)। রবীন্দ্রনাথ প্রমথবাবুকে ব্রিটিশ পদার্থবিদ জেমস জিনসের একটা বই — ‘থ্রু স্পেস অ্যান্ড টাইম’ পড়তে দিয়েছিলেন। জেমস জিন্স খুব বড় মাপের বিজ্ঞানী ছিলেন না, কিন্তু জনপ্রিয় বিজ্ঞানগ্রন্থের প্রণেতা হিসেবে কিছু সুনাম তাঁর ছিল। ফলে, তার বই থেকে জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বই কীভাবে লিখতে হয় তার একটা রসদ পাবেন প্রমথবাবু — সেরকম একটা ধারণা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কাজেই, রবীন্দ্রনাথ যখন প্রমথবাবুকে বই লেখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন (তখন কি তিনি কস্মিনকালেও জানতেন, তার এই রসদ রবিবাবু পুরোটাই নিজের বইয়ের কাজে ব্যবহার করবেন) যারপরনাই খুশি হয়েছিলেন। কী রকম উচ্ছ্বাস তার হয়েছিল, তা প্রমথবাবুর ভাষ্য থেকেই শোনা যাক:

‘সেদিন থেকেই বিজ্ঞানের সহজ বই পড়তে লেগে গেলাম, তারপর ধীরে ধীরে শুরু হল বই লেখার কাজ। সে এক বিপর্যয় কাণ্ড। কোনদিন বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে সুসংবদ্ধ বাংলা রচনায় হাত দেইনি, দু একটা ছোটখাট রচনা যা লিখেছি তা ছিলো ইংরেজীতে। তাই এই অনভ্যস্ত পথে প্রতিপদে কেবল হোঁচট খেতে হল। এগোন আর হচ্ছিলো না। নিজের লেখা নিজেরই এত খারাপ লাগতে লাগল যে, দু এক পাতা লিখেই তা ছিঁড়ে ফেলতাম। ফলে ছিন্ন কাগজের পাতায় ঝুড়ি ভর্তি হয়ে উঠল। খাতাখানাও সম্বল হারিয়ে ক্রমশঃ শীর্ণকায় হয়ে উঠল। অবশ্য এতে একজন খুব খুশি হলেন, উনুন ধরাবার কাজে অনায়াসলব্ধ এই ছিন্নপত্রগুলো আমার স্ত্রী যথাযথ সদ্গতি করে চললেন।

এই উদ্ধৃতিটি আছে প্রমথনাথ সেনগুপ্তের আনন্দরূপম বইয়ে, যা বাসুমতি, কলকাতা থেকে একসময় প্রকাশিত হয়েছিল (এখন বইটি দুর্লভ, খুঁজলেও পাওয়া যায় না)। বইয়ের এই উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায় লেখক বাংলা নিয়ে অতটা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না, কিন্তু এটি অন্ততঃ ভেবেছিলেন বইটি তাঁরই হবে।

এ সময় পাঠভবনের অধ্যাপক তনয়বাবু (তননেন্দ্রনাথ ঘোষ, পাঠভবনের অধ্যাপক) এসে বললেন:

‘এভাবে তো হবে না, আপনি যা পারেন লিখুন। তবে তথ্যের দিক থেকে যেন হাল্কা না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন। আমাদের বিচারে যে ভাষা সাধারণতঃ ভালো বলে আখ্যা পায়, গুরুদেবের হাতে পড়লে তার খোল-নলচে বদলে গিয়ে এক নতুন ভাষা প্রকাশ পায়। কাজেই বৈজ্ঞানিক তথ্য পর পর সাজিয়ে দিন, ভাষার ভার গুরুদেব নেবেন। গুরুদেব সেই ভাষা দেখে পরবর্তী পর্যায়ে লিখতে শুরু করবেন।’

পাঠক, বুঝতেই পারছেন, কোথাকার জল কোথায় গড়িয়ে যাচ্ছে। কীভাবে রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে কেবল ভাষার মাধুর্য বাড়িয়ে প্রমথনাথের মূল তথ্যগুলো হাতিয়ে নেবার পায়তারা চলছে। কিন্তু তারপরেও বই লেখার এ পদ্ধতি ঠিক হবার পরেও হতভাগ্য প্রমথবাবু কিন্তু ভাবছেন বইটা তাঁরই হবে। তিনি বইয়ের নামও ঠিক করে রেখেছিলেন–‘বিশ্বরচনা’। তাই তিনি লিখলেন:

‘ওদের উপদেশ মেনে নিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হল। বইটার নামকরণ করলাম “বিশ্বরচনা”। ধীরে ধীরে কাজ এগুতে লাগল। ‘পরমাণুলোক’ দিয়ে শুরু হল বইয়ের প্রথম অধ্যায়, এটা শেষ করে গুরুদেবের কাছে নিয়ে যেতে হবে।’

প্রথম অধ্যায় লেখা শেষ করে প্রমথনাথ রবীন্দ্রনাথের কাছে নিয়ে গেলেন। রবীন্দ্রনাথ দেখে বললেন:

“রচনাটি আমার কাছে রেখে যাও, কাল ফেরৎ পাবে। বিজ্ঞানের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটাতে হলে ভাষাটা কীরকম হবে, তাই শুধু দেখিয়ে দেব।”

শুধু পরমাণুলোক নয়, এর পর নক্ষত্রলোক, সৌরজগৎ, ভূলোক এবং উপসংহার সব অধ্যায়ই লিখেছেন প্রমথবাবু। আর রবীন্দ্রনাথ খোল নলচে বদলে দিয়েছেন। সেই সংশোধন করা পাণ্ডুলিপিগুলো প্রমথনাথ অবশ্য আনন্দরূপম বইয়ে ছাপিয়েছিলেন কিছু কিছু । আনন্দরূপম বইয়ের পৃষ্ঠা ১৪৬-এ আমরা পাই শেষ অধ্যায় লিখে গুরুদেবের কাছে পৌঁছিয়ে দেবার কথা:

‘শেষ অধ্যায় লিখে দিয়ে এলাম গুরুদেবের হাতে। এটা সংশোধিত হয়ে ফিরে এলে তৈরি করতে হবে নতুন করে সমগ্র পাণ্ডুলিপি সুন্দর নির্ভুলভাবে লিখে, তারপর তা তুলে দিতে হবে ওঁর হাতে, আলমোড়া যাবার আগে …’

প্রমথবাবু পুরো বইটি এবং তার উপসংহার শেষ করার পরে রবীন্দ্রনাথ ঠিক করেন বইটার নাম ‘বিশ্বপরিচয়’ হবে। কিন্তু প্রমথনাথকে ঘুণাক্ষরেও তিনি জানতে দেননি একথা। বরং ভিন্ন একধরণের নাটকের অবতারণা করলেন ধীরেন্দ্রমোহন সেনকে নিয়ে এসে। নাটক বলছি কেন সেটা পাঠকেরা শুনেই বুঝতে পারবেন আশা করছি।

ড. সেন হঠাৎ ওকে (প্রমথ বাবুকে) বললেন:

‘বিশ্বপরিচয়’ নিয়ে আপনি যে পরিশ্রম করেছেন তাতে বইটার যুক্তগ্রন্থকার হওয়া উচিৎ–- রবীন্দ্রনাথ-প্রমথনাথ

‘গুরুদেব’ সাথে সাথে বললেন:

সে কীরে, বইটার বিষয়বস্তু রচনার কাজ তো প্রমথই করেছে। আমি শুধু ভাষার দিকটা দেখে দিয়েছি। গ্রন্থকার তো প্রমথেরই হওয়া উচিৎ। তবে আমার নামের সাথে যদি প্রমথ যুক্ত করতে চান, তাহলে প্রমথনাথ-রবীন্দ্রনাথ হওয়াই ঠিক হবে।

নিঃসন্দেহে এটা প্রমথবাবুর জন্য বড় রকমের ধাক্কা ছিল। তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন তার নামেই বইটা হবে। বইয়ের সব তথ্য যে তাঁরই যোগাড় করা! তারপরেও রবীন্দ্রনাথ যেহেতু ভাষার সবকিছু ঢেলে সাজিয়েছেন, সেহেতু যুক্তগ্রন্থকার হলেও খুব বেশি হারাবার নেই বলেই ভেবেছিলেন হয়তো। সেই বিহবল অবস্থা ধরা পড়ে প্রমথবাবুর লেখায়:

তারপর পাণ্ডুলিপি নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা করলেন, তারপর ওখান থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে ডক্টর সেন বললেন যে, সম্ভব হলে ঐ গ্রীষ্মের ছুটির মধ্যেই যেন ‘পৃথ্বী-পরিচয়’ বইটা আমি শেষ করি। ওর কথা বলার ধরণ দেখে মনে হচ্ছিল ‘বিশ্বপরিচয়’ বইটার লেখকের নাম নিয়ে কোথায় যেন একটা সংশয় জেগেছে, অবশ্য এ ব্যাপারে ওঁকে খোলাখুলি কিছু জিজ্ঞেস করাও সম্ভব নয়।’

এর বেশ কিছুদিন পর নাটকের আসল যবনিকাপাত। রবিঠাকুর ঠিক করলেন প্রমথবাবুকে জানাবেন ব্যাপারটা যে, নিজেই বইয়ের লেখক হতে চান, প্রমথবাবুকে বাদ দিয়ে। কীভাবে সেটা প্রমথবাবুর মুখেই শোনা যাক:

গ্রীষ্মের ছুটির পর গুরুদেব আলমোড়া থেকে ফিরে একদিন সন্ধ্যার সময় ডেকে পাঠালেন। উত্তরায়নে গিয়ে দেখি ক্ষিতিমোহনবাবু ও শাস্ত্রীমশায়ের সঙ্গে তিনি কথা বলছেন, আমাকে ডেকে সস্নেহে পাশে বসালেন, কুশল প্রশ্ন করলেন। তারপর বললেন, “দেখো, বিশ্বপরিচয় লিখতে লিখতে দেখলুম এর ভাষাটা আমারই হয়ে গেছে, তাই এর মধ্যে তোমাকে কোথাও স্থান দিতে পারলুম না।” একটু থেকে বললেন, “অবশ্য তুমি শুরু না করলে আমি সমাধা করতে পারতুম না, তা ছাড়া বিজ্ঞানের অনভ্যস্ত পথে চলতে শেষপর্যন্ত এই অধ্যবসায়ীর সাহসে কুলাতো না। তুমি ক্ষুণ্ণ হয়ো না।”

এই হচ্ছে বিশ্বপরিচয় গ্রন্থ রচনার ইতিবৃত্ত। রবীন্দ্রনাথের বিশাল পরিচিত এবং ব্যক্তিত্বের কাছে নতজানু প্রমথনাথ ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন কি না জানা নেই আমাদের। তবে, এই ঘটনা জেনে আমরা যে ভয়ঙ্কর রকমের ক্ষুব্ধ, ক্ষুণ্ন এবং ক্ষীপ্ত সে বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। রবীন্দ্রনাথের মত একজন বিশাল ব্যক্তিত্ব তাঁরই অধীনস্থ সামান্য একজন শিক্ষকের সাথে এরকম প্রতারণা করবেন, তাঁর লেখা বইকে নিজের নামে ছাপিয়ে দেবেন কোনো ধরনের চক্ষুলজ্জার ধার না ধেরে, সেটা মেনে নেওয়াটা আসলেই কষ্টকর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই ‘রাহাজানির’ (হ্যাঁ, এটি আমাদের চোখে রাহাজানিই, ছোটখাট ‘জোচ্চুরি’ নয়) ঘটনার পুরো বিবরণ আছে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত দীপঙ্কর চট্টোপাধায়ের লেখা রবীন্দ্রনাথ ও বিজ্ঞান [আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, জানুয়ারি, ২০০০] বইয়ে। দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায় পেশায় পদার্থবিদ, দাপটের সাথে এক সময় অধ্যাপনা করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯৫৮-৬১), এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। পদার্থবিজ্ঞানে সর্বোচ্চ শিক্ষা অর্জনের পরেও তিনি রবীন্দ্র বলয় থেকে বেরুতে পারেননি, বরং দেশ পত্রিকার অনুগ্রহপ্রাপ্ত প্রসিদ্ধ রবীন্দ্রস্তাবকদের একজন ছিলেন তিনি। যথারীতি আর সব সমসাময়িক রাবীন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের মতোই রবিঠাকুরকে মাথায় তুলে নেচেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ কত বড় বিজ্ঞানমনস্ক, কত পরিশীলিত ছিলো তার জ্ঞান, কত আধুনিক ছিলো তার দৃষ্টিভঙ্গি, সে সময়কার কত বড় বড় বিজ্ঞানী রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচিত হবার জন্যে পাগল হয়ে বসেছিলো–তা নিয়ে ফেনিয়ে ফেনিয়ে লিখে গেছেন পাতার পর পাতা। এমনকি আইনস্টাইন-রবীন্দ্রনাথের সংলাপের পরিপ্রেক্ষিতে আইনস্টাইনের চেয়ে রবীন্দ্রনাথই যে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ক্ষেত্রে বেশি সঠিক ছিলেন সেটাও আকারে ইঙ্গিতে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য এ ক্ষেত্রে দীপঙ্কর বাবুকে একলা দোষ দেয়া যায় না। যুগটাই রবীন্দ্রবন্দনার, রবিঠাকুরের মিছে ভাবমূর্তি গড়ে চোখ মুদে স্তব করার। মডারেট শিক্ষিত ইসলামিস্টরা যেমন কোরানের মধ্যে বিগব্যাং থেকে শুরু করে সমাজ এবং অর্থনীতির যাবতীয় সূত্র খুঁজে পান, ঠিক তেমনি মডারেট শিক্ষিত রবীন্দ্রস্তাবকেরাও সেই কাজটি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অতীব নিষ্ঠার সাথে পালন করে চলেছেন, ভারত এবং বাংলাদেশ–দু জায়গাতেই। রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন, বিজ্ঞান, মানবতাবাদ, কৃষি, সমাজতন্ত্র, কোয়ান্টাম ফিজিক্স–এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে রবীন্দ্রনাথের নিত্য নতুন অবদান আবিষ্কৃত হয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান-সমাজ-সভ্যতা ধন্য হচ্ছে না তার স্তাবককূলের হাতে পড়ে। ‘সমাজতন্ত্র কেন কাজ করেনি?’–রবীন্দ্রনাথ নাকি সেই বিশের দশকেই রাশিয়ার চিঠিতে সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্ক সংকেত উত্থাপন করে আমাদের জানিয়ে গিয়েছিলেন–একদিন সমাজতন্ত্র ভেঙে পড়বে। আইনস্টাইনের মতো জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিদের চেয়ে রবীন্দ্রনাথ নাকি ভৌত বাস্তবতার প্রকৃতি আরো ভাল বুঝতেন, আর তার ইঙ্গিত নাকি দিয়ে গেছেন শ্যামলী কাব্যগ্রন্থের ‘আমি’ কবিতায় ‘আমারি চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ’ চরণের মাধ্যমে। শুধু সমাজতন্ত্র কিংবা পদার্থবিজ্ঞান নয়, পত্রপত্রিকার রবীন্দ্রভক্ত বুদ্ধিজীবীদের কলাম থেকে আমরা আজ শুনছি–আধুনিক ক্ষুদ্র ঋণের আবিষ্কারকও নাকি রবীন্দ্রনাথ। পাশাপাশি কৃষিকর্মকাণ্ড, সমবায় প্রচেষ্টা, নারীশিক্ষা সবকিছুরই আদি অকৃত্রিম অগ্রদূত রবিঠাকুর। আজকের জামানায় রবীন্দ্রনাথ আবির্ভূত হয়েছেন যেন নতুন এক পয়গম্বর হিসেবে। কাজেই দীপঙ্কর চট্টোপাধায় নতুন কিছু করেননি, বহমান বাতাসেই নিজ নৌকার পাল তুলে দিয়েছেন, নিজেকে ভাসিয়েছেন গড্ডালিকা প্রবাহে। বিনিময়ে পেয়েছেন দেশ পত্রিকায় লেখার এবং আনন্দ পাবলিশার্স থেকে বই বের করার দারুণ সুযোগ। বাংলাদেশের নামকরা পদার্থবিজ্ঞানী শমশের আলীরা যেমন ‘কোরানিক বিজ্ঞান’ থেকে বেরুতে পারেন না, কোরানের প্রাচীন আয়াতের মধ্যে যাবতীয় আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্বেষণ করেন, ঠিক তেমনি দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের মতো রবীন্দ্র স্তাবকেরা ধর্মগুরুর মতোই রবীন্দ্রনাথকে জ্ঞান করেন, তাকে সঠিক মনে করেন, আর রবীন্দ্র রচনাবলীর মধ্যে সন্ধান করেন আধুনিক বিজ্ঞান এবং দর্শনের। তারপরেও তার গুরুজীর এভাবে রাহাজানি করে মেধাসত্ত্ব মেরে দেয়ার এই লজ্জা দীপঙ্করবাবুও লুকাতে পারেন নাই। যেমন দীপঙ্কর মশাই বলছেন:

কিন্তু একটা কথা মানতেই হবে। গোড়া থেকেই প্রমথনাথের মনে কবি একটা প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলেছিলেন। প্রথমে তো বলেছিলেন বইটা প্রমথবাবুকেই লিখতে হবে। রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন, বিশেষ করে ভাষার ব্যাপারে। এটা বলা কতদূর সঙ্গত হয়েছিল সেটাই প্রশ্ন।

তারপরেই আবার পূজারী রবীন্দ্রনাথের সাফাই গেয়েছেন এই বলে:

রবীন্দ্রনাথের একটা মজার ব্যাপার ছিল। অনেককেই তিনি গল্পের প্লট দিতেন, গল্প লিখিয়ে নিতেন। অনেক কবিযশঃপ্রার্থীর কবিতা সংশোধন করে দিতেন। এসব তিনি করেছেন খ্যাতির চূড়ায় বসেও। অত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি এসব কী করে করতেন কে জানে!

প্রিয় পাঠক, উক্তিটা শুনে সেই ব্যাঙ-এর গল্পের কথা মনে পড়ছে না? ছেলেপিলেরা পুকুর পাড়ে বসে ব্যাঙদের উপর ঢিল ছুঁড়তো। ছেলেদের জন্য নির্দোষ ঢিল ছোঁড়া–যেটা তাদের কাছে স্রেফ মজার ব্যাপার ছিলো, সেটাই কিন্তু ছিলো ব্যাঙদের জন্য মরণের কারণ। বুঝতে কী এটি খুব বেশি সমস্যা–রবীন্দ্রনাথ একে তাকে দিয়ে যেটা “মজার ব্যাপার” মনে করে লিখিয়ে নিতেন, আর তারপর নিজের নামে চালিয়ে দিতেন–সেটা প্রমথনাথের মত নবীন লেখকদের জন্য হয়েছিলো সর্বনাশের কারণ?

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে আজকের দীপঙ্ককর চট্টোপাধ্যায়–যারাই রবীন্দ্রনাথের জীবনের এই কলঙ্কিত অধ্যায়টি নিয়ে কাজ করতে গিয়েছেন, তারাই কিছুটা হলেও লজ্জিত হয়েছেন, কিন্তু তারপরেও ‘গুরুদেব’ রবীন্দ্রনাথ থেকে তাদের মোহমুক্তি ঘটেনি। ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে চেয়েছেন যে, প্রমথনাথের ভাষার চেয়ে রবীন্দনাথের ভাষা ছিলো অতুলনীয়, খোলনলচে বদলানোর পর লেখাটা এতোটাই বদলে গেছে যে সেটা প্রমথনাথের বই হবার যোগ্যই ছিলো না। তাই তাকে লেখকের পদ থেকে বাদ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ সঠিক কাজই করেছেন। যুক্তি বটে! তাদের কথা মানা যেত, যদি বইয়ের কাজটি রবীন্দ্রনাথই প্রথম থেকে শুরু করতেন, পাণ্ডুলিপিটি নিজে লিখতেন, এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের জন্য প্রমথনাথের সাথে কেবল আলোচনা করে ভুলচুক থাকলে সেটা শুধরে নিতেন, অথবা তাকে দিয়ে রিভিউ করাতেন। তা রবীন্দ্রনাথ করেনিনি। বরং পুরো বইটি লিখিয়েছেন প্রমথনাথকে দিয়েই। একটি দুইটি অধ্যায় নয়–পুরো গ্রন্থের সবগুলো অধ্যায়–পরমাণুলোক, নক্ষত্রলোক, সৌরজগৎ, ভুলোক, এমনকি উপসংহার পর্যন্ত তাকে দিয়ে লিখেছেন। কিন্তু মূল গ্রন্থাকার হিসেবে প্রমথনাথকে কৃতিত্ব দেয়া দূরের কথা–সহগ্রন্থকার হিসেবেও তাকে ঠাঁই দেননি ‘ঋষিপ্রতিম’ রবীন্দ্রনাথ, কেবল ভূমিকায় একটি বাক্যে তার নামের উল্লেখ করে দায় সেড়েছেন। একে রাহাজানি ছাড়া আর কীই বা বলা যায়?


রবীন্দ্রনাথের মত অতুলনীয় সৌভাগ্য নিয়ে পৃথিবীতে খুব কম সাহিত্যিকই জন্মেছেন। তাঁর রচনাসমূহ নিয়ে ভক্তদের মাতামাতি, উচ্চ প্রশংসা, জীবনের সর্ব আবেগের প্রকাশ রয়েছে রবীন্দ্রনাথে বা রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাঙালিত্ব অসম্পূর্ণ ইত্যাদি উচ্ছ্বাসভরা কথাবার্তা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। তবে, তাঁর গান নিয়ে যা হয় সেটাকে ঠিক মাতামাতি শব্দটা দিয়ে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। রবীন্দ্রনাথের গানকে একরকম প্রার্থনা সংগীত বানিয়ে ফেলেছেন তাঁর পূজারীর দল। যে ভাবগম্ভীর পবিত্রতা নিয়ে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করা হয় বা শোনা হয়, তা দেখলেই যে কেউই একে পূজোর আচার আচরণ ভেবে ভুল করে বসে থাকতে পারেন। ভেবে বসে থাকতে পারেন যে, একদল পূজারী গভীর ভক্তিভরে তাঁদের কোনো প্রাণপ্রিয় দেবতার উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য পরিবেশন করে চলেছেন। এর পূজারীর দল রবীন্দ্র সংগীত ছাড়া পৃথিবীতে যে অন্য কোনো সংগীত থাকতে পারে, আর সেগুলো যে এর থেকেও ভাল হতে পারে সেটা কোনোভাবে মেনে নিতে রাজি নন। অনেকেই খুব ‘গৌরবের সাথে’ এবং নির্দ্বিধায় বলে দেন যে, রবীন্দ্র সংগীত ছাড়া অন্য কোনো সংগীতই শোনেন না। বাংলা গান শোনার ক্ষেত্রে কিছু বাঙালির এই একপেশে আচরণ সম্পর্কে কবীর সুমন (সুমন চট্টোপাধ্যায়) তাঁর লিখিত বই কোন পথে গেল গান-এ বলেছেন:

বাংলা গান শোনা আমাদের সমাজে বরাবরই একপেশে। ফলে, কালক্রমে কিছু জনপ্রিয় গায়ক গায়িকা ও তাঁদের স্মৃতি ঘিরেই আমাদের গানপ্রেম আবর্তিত। সেই সঙ্গে ‘আমি বাপু রবীন্দ্র সংগীত ছাড়া কিছু শুনি না’, ‘আমি বাবা রবীন্দ্র-নজরুল-দ্বিজেন্দ্রলাল-অতুলপ্রসাদ-রজনীকান্তর বাইরে কিছু মানতে রাজি নই’,…. গোছের বেরসিক, একদেশদর্শী, সুরবধির মানসিকতার শুধু বহির্প্রকাশই নয়, সগর্ব উচ্চারণ।

ভক্তি এবং ভাবে গদগদ ভক্তদের এক্ষেত্রে অবশ্য এককভাবে দোষ দেওয়াটাও অনুচিত। রবীন্দ্রনাথই একমাত্র বিরল ব্যক্তিত্ব, যাঁর দুটো গান দুটো স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত। রবীন্দ্রনাথের নিজেরও তাঁর গান সম্পর্কে অত্যন্ত উচ্চ ধারণা ছিল। তাঁর অন্য কোনো সাহিত্যকর্ম দীর্ঘস্থায়ী না হলেও গান যে হবে সে বিষয়ে তিনি নিঃসন্দেহ ছিলেন। তাই তো তিনি বলেছিলেন, “জীবনের আশি বছর অবধি চাষ করেছি অনেক। সব ফসলই যে মরাইতে জমা হবে তা বলতে পারি না। কিছু ইঁদুরে খাবে, তবু বাকি থাকবে কিছু। জোর করে বলা যায় না, যুগ বদলায়, তার সঙ্গে তো সবকিছু বদলায়। তবে সবচেয়ে স্থায়ী আমার গান, এটা জোর করে বলতে পারি। বিশেষ করে বাঙালীরা, শোকে দুঃখে সুখে আনন্দে আমার গান না গেয়ে তাদের উপায় নেই। যুগে যুগে এ গান তাদের গাইতেই হবে।” [লেখক সমাবেশ, ৫ম বর্ষ সংখ্যা–১৩, প্রথম পক্ষ মে ১৯৮৫, পরেশ ধর – উদ্ধৃত]

রবীন্দ্রনাথের কথা আপাত সত্য। তবে, আজীবনের জন্য সত্য নয়। কোনো জিনিসই চিরস্থায়ী হয় না, তা সে সেই সময়ের জন্য যতই উৎকৃষ্ট হোক না কেন। এর জ্বলন্ত প্রমাণ মধুসূদন। এরকম একজন অসাধারণ মেধাবী কবি এখন শুধু টিকে আছেন পাঠ্য বইয়ে। কাল সবকিছুকেই গ্রাস করে নেয়। রবীন্দ্রনাথও একসময় প্রাচীন কবি হবেন, তাঁর অধিকাংশ রচনা মূল্য হারাবে–রবীন্দ্র-মহিমাও হবে ম্লান থেকে ম্লানতর। তাঁর উপন্যাস কিংবা গল্পের অনেক কিছুতেই ‘সেকেলের ছাপ’ লেগে গেছে ইতোমধ্যেই, এমনকি বহু আধুনিক মেধাবী কবিদের কবিতা কিংবা গীতিকারদের গান রবীন্দ্ররচনার সঙ্গে সমানে পাল্লা দিচ্ছে, কখনো বা উৎরে গেছে রবীন্দ্র সংগীতকে পিছনে ফেলে দিয়ে।

সমস্যা হচ্ছে যে রবিন্দ্রভক্তরা এই কথাটা মানতে রাজি নন। এই পরিস্থিতিটাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম নন। ফলে, বিভিন্ন নিষেধ জারি করে রবীন্দ্রনাথের গানকে বিশুদ্ধ রাখার, আজীবন টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাঁরা।

দেবব্রত বিশ্বাস ছিলেন কিশোরগঞ্জের মানুষ। ব্রাহ্ম পরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। সে কারণে হিন্দুরা তাঁদেরকে ম্লেচ্ছ বলে অভিহিত করতো। স্কুলে তিনি যে বেঞ্চে বসতেন সেই বেঞ্চে অন্য কোনো হিন্দু ছেলে বসতো না। গ্রামের কয়েকজন মুসলমান রাখাল ছিল তাঁর বন্ধু। অসাধারণ দরাজ গলা নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি। গানের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর ছিল না। ব্রাহ্মসমাজের মন্দিরে প্রার্থনা সংগীত গাইতে গাইতেই রবীন্দ্র সংগীত শিখেছেন তিনি। এই দেবব্রত বিশ্বাসকে রীতিমত জ্বালিয়ে মেরেছিল ‘রবীন্দ্রভারতী মিউজিক বোর্ড’। রবীন্দ্রনাথের গানের কপিরাইট তাঁদের হাতে ছিল। ফলে, রবীন্দ্র সঙ্গীতের যে কোনো রেকর্ডকেই বিশ্বভারতীর অনুমোদন নিতে হতো বাজারজাত করার আগে। রবীন্দ্রভারতী একাধিকবার দেবব্রত বিশ্বাসের গানকে অনুমোদন দেয় নি বিচ্যুতি এবং অতিরিক্ত বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের অজুহাত তুলে। এর ফলে, হতাশ হয়ে ১৯৭০ সালের পরে তিনি আর কোনো রবীন্দ্র সংগীত রেকর্ড করান নি। কেন তাঁর গাওয়া গানকে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না, এ বিষয়ে জানতে চাইলে একবার তাঁদের চিঠির সাথে রবীন্দ্র সংগীতের সাথে কী কী ধরনের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করতে হবে তার একটা তালিকা দিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা। সেই তালিকাটা এরকম।

রবীন্দ্রসংগীতের উপযোগী যন্ত্র

১। (ক) এস্রাজ, বাঁশী, সেতার, সারেঙ্গী, তানপুরা, বেহালা, দোতারা, একতারা, বাসবেহালা বা অর্গান।
(খ) পাখোয়াজ, বাঁয়াতবলা, খোল, ঢোল ও মন্দিরা।

২। প্রতি গানের মূল আবেগটির প্রতি লক্ষ্য রেখে অনুকূল আবহসংগীত যন্ত্রে রচনা করে, আরম্ভে এবং যেখানে গায়কের কণ্ঠের বিশ্রাম প্রয়োজন, সেখানে তা প্রয়োগ করতে হবে।

৩। যে কটি যন্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, গানের সঙ্গে তার সব কটিকেই বাজান যেতে পারে কিন্তু কোন যন্ত্রটি কিভাবে আবহ সংগীতে বাজবে সংগীত রচয়িতাকে তা স্থির করতে হবে গানের প্রতি ছত্রের ভাবটির প্রতি লক্ষ্য রেখে।

৪। আবহ সংগীত গায়কের গলার শব্দকে ছাড়িয়ে যাবে না কখনো। কণ্ঠের বিশ্রামের সময় বা গান আরম্ভের পূর্বে যখন যন্ত্রে আবহসংগীত বাজবে তখনও এই দিকটার প্রতি বাজিয়েরা যেন বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখেন।

৫। তালযন্ত্রের সঙ্গতের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যে, তালের ছন্দ বা বোল যেন কথার ছন্দ ও লয়ের বিপরীত না হয়। অর্থাৎ দ্রুত ছন্দের গানে যেমন দ্রুত লয়ের ঠেকার প্রয়োজন ঢিমালয়ের গানে তেমনি ঢিমালয়ের ঠেকার প্রয়োজনকে মানতেই হবে।

৬। কথার উপরে ঝোঁক দিয়ে অনেক গান গাইতে হয়। এই সব গানের সঙ্গে সঙ্গতের সময় তালবাদ্যেও কথার ছন্দের অনুকূল ঝোঁক প্রকাশ পাওয়া দরকার। তাতে গানের ভাবের সঙ্গে কথার ভাবের সঙ্গতি থাকে।

রবীন্দ্রভারতীয় মিউজিক বোর্ডের এই সব হাস্যকর নিয়মকানুনকে মানতে পারেন নি দেবব্রত বিশ্বাস। সে কারণে সিদ্ধান্ত নেন যে, রবীন্দ্রসংগীত আর রেকর্ড করবেন না। রবীন্দ্রপূজারী এবং রবীন্দ্র শুদ্ধবাদীদের এই বাদ্যযন্ত্রের নিয়মাবলী যে কতটা হাস্যকর যে বিষয়টা দেবব্রত বিশ্বাস তাঁর আত্মজীবনী ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত-এ এভাবে তুলে ধরেছেন:

রেকর্ডে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার সম্বন্ধে বাংলা ভাষায় উপর্যুক্ত নির্দেশগুলি কে বা কারা দিয়েছেন আমি জানি না। তবে বেশ সহজেই বোঝা যায় যে, যিনি বা যাঁরা ওই নির্দেশগুলি জারী করেছেন তাঁর বা তাঁদের রেকর্ডিঙের ব্যাপারে কোনো ধারণাই নেই। উপরে উল্লিখিত ৪নং নির্দেশটি পড়লে মনে হবে রেকর্ড করার সময় যাঁরা বাদ্যযন্ত্র বাজান, আবহসংগীত বাজাবার সময় বাজিয়েদের ওপরেই সমস্ত দায়িত্ব চাপানো হয়েছে। উপর্যুক্ত নিয়ামকরা জানেন না যে এই ব্যাপারে বাদ্যযন্ত্রীদের কোনো দায়িত্বই নেই। রেকর্ডিং ইঞ্জিনিয়ার তাঁর ঘরে বসে রেকর্ডিং যন্ত্রের নানা ধরনের চাবিকাঠি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কণ্ঠের এবং বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজগুলি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং প্রয়োজন হলে ইঞ্জিনিয়ার ইশারা করে অথবা নিজে এসে নির্দেশ দিয়ে যান। ৫নং নির্দেশটিতে তালযন্ত্রের ব্যবহার সম্বন্ধে যা বলা হয়েছে তা পড়ে মনে হবে সেগুলি খুব বিশেষ চিন্তাপ্রসূত নয়। তালযন্ত্র বিশেষ করে তবলা বাজাবার ব্যাপারটি অত্যন্ত জটিল এবং খুব সূক্ষ্ণ অনুভূতির ব্যাপার। তাই হিন্দুস্থান রেকর্ডিং কোম্পানী যখন এই চিঠিগুলি আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন তখন ভেবেছিলাম এই ব্যাপারে কোনো মন্তব্য বা করাই ভাল। তাছাড়া রবীন্দ্রসংগীত আর রেকর্ড করবো না বলেই স্থির করেছিলাম।

এই বিশুদ্ধবাদীরা কিছু জানুক বা না জানুক, একটা জিনিস খুব ভাল করেই তাঁরা জানে। তা হচ্ছে যে, কেমন করে তাঁদের দেবতাতুল্য মহামানবের ঐশ্বর্য এবং সম্পদকে অবিকৃত এবং অক্ষুণ্ন রাখা যায়। তাতে করে দেবব্রত বিশ্বাসের মত দুচারজন রবীন্দ্রসংগীত না গাইলেও কিছু এসে যায় না তাঁদের।

কয়েক বছর আগে ব্যান্ড সংগীত শিল্পী মাকসুদ আধুনিক বাদ্যযন্ত্র সহযোগে রবীন্দ্রনাথের একটা গান “না চাহিলে যারে পাওয়া যায়” এই গানটি নিজস্ব ঢংয়ে ফিউশন বানিয়ে গেয়েছিলেন। তখন রবীন্দ্রপূজারীরা, যারা রবীন্দ্রনাথকে নশ্বর মানব থেকে অবিনশ্বর ঈশ্বরে উপনীত করে ফেলেছেন, তাঁরা রবীন্দ্র সংগীতের জাত গেল, জাত গেল বলে শোরগোল তুলেছিলেন। কোরানের আয়াতের সামান্য বিচ্যুতি যেমন মোল্লাদের সহ্য হয় না, নারীনীতির বিরুদ্ধে হুঙ্কার পেড়ে রাস্তায় নামেন আমিনী গং, ঠিক একই রকমভাবে আমাদের দেশের রবীন্দ্রমোল্লারা রাস্তায় নেমেছিলেন ‘পবিত্র রবীন্দ্র সঙ্গীতের’ শুদ্ধতা রক্ষার জন্য। শুদ্ধবাদীদের মধ্য থেকে ওয়াহিদুল হক পত্রিকায় কলম ধরেছিলেন মাকসুদের পিণ্ডি চটকানোর জন্য। অথচ গান নিয়ে নিরন্তর গবেষণা, গানকে ভেঙেচুরে সাজানো বহমান সংস্কৃতিরই অংশ। পশ্চিমা বিশ্বে রক এণ্ড রোল, রেগে, ব্লুজ, জ্যাজ, কান্ট্রি মিউজিক নিয়ে নিরন্তর ভাঙাচোরা চলে। এলভিস প্রিসলী কিংবা চাক বেরি একসময় যে ঢংয়ে রক এন্ড রোল সংগীত পরিবেশন করতেন, আজকের শিল্পীরা সেভাবে সংগীত পরিবেশন করেন না। তারা বরং পুরোন গানগুলোকে নিজদের মতো করে ঢেলে সাজান, প্রয়োগ ঘটান নতুন নতুন বাদ্যযন্ত্রের, কখনো নতুন তাল এবং ছন্দেরও। এতে করে কারো জাত যায় না, কারো মাথায় আকাশও ভেঙে পড়ে না। কিন্তু বাংলাদেশের রবীন্দ্র-মোল্লারা রবীন্দ্রনাথকে রাখতে চান সমস্ত গবেষণা এবং কাটাছেঁড়ার উর্ধ্বে। বেদ পাঠ করার অপরাধে মহাত্মা রাম যেমন একসময় শিরোশ্ছেদ করেছিলেন নিচু জাতের শম্বুকের তার তথাকথিত ‘রাম রাজ্যে’, ঠিক তেমনি সমস্ত রবীন্দ্রপূজারীরা শিরোশ্ছেদ করার ফতোয়া দিতে চান কারো মধ্যে রবীন্দ্রসংগীতের সামান্যতম বিচ্যুতি লক্ষ্য করলে। রবীন্দ্রনাথকে যেন রাখতে হবে মাথার পরে একেবারে দেবতার আসনে বসিয়ে, দিবানিশি কেবল পায়ে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে, আর করজোড়ে স্তব করে। মাকসুদের ফিউশন করার প্রচেষ্টাটি ভাল ফলাফল বয়ে এনেছিলো নাকি খারাপ, সেটি আমাদের প্রশ্ন নয়, তাকে সমালোচিত হতে হয়েছিলো রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে কোনো রকম নাড়াচাড়া করার চেষ্টার কারণেই। মাকসুদও থেমে থাকেন নি। এর পাল্টা জবাব দিয়েছিলেন তিনিও কলাম লিখে। মাকসুদ বলেছিলেন, ‘এদেশ আগে রবীন্দ্রনাথকে বুঝুক তারপর তর্ক করবো। এদেশে এখনো রবীন্দ্র সংগীত মানেই হারমোনিয়াম ধরে প্যা প্যা…অথচ অবাক বিষয় শান্তিনিকেতনে হারমনিয়াম ঢুকতে পারে না।’ সচেতন পাঠক হয়তো খেয়াল করেছেন যে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের দেওয়া ‘রবীন্দ্রসংগীতের উপযোগী’ বাদ্যযন্ত্রের তালিকায় আসলেই হারমোনিয়াম নেই, সেক্ষেত্রে গিটার, কি-বোর্ড, স্যাক্সোফোনের অনুপ্রবেশ তো দূর অস্ত!

রবীন্দ্রনাথ বাইশ শ’-র উপরে গান লিখেছেন। বাঙালিরা গভীর ভক্তিভরে, সশ্রদ্ধ চিত্তে এগুলোকে শুনে থাকে, গেয়ে থাকে। এর ভাবসম্পদকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করে। পরম পূজনীয় ভেবে এর বিশুদ্ধতা রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু এরাই জানে না যে, রবীন্দ্রনাথের এই বাইশ শ’ গানের অনেকগুলোই বিশুদ্ধ নয়, রবীন্দ্রনাথের মৌলিক গান নয়। অন্য কোনো গানের সুর থেকে সরাসরি নকল করা বা সেগুলোকে ভেঙেচুরে রবীন্দ্রনাথ নিজের মত করে নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য গান আছে বিদেশী সুর থেকে নেয়া, অনেক গান আছে লোকসংগীত থেকে নেয়া, অনেক গান আছে বাউল সুর থেকে নেয়া। নিচে একটা বিদেশী গান দিচ্ছি। একটা খুব জনপ্রিয় রবীন্দ্র গানের সুর নেয়া হয়েছে এই গানটা থেকে। যাঁরা রবীন্দ্র সংগীত শোনেন, খুব বেশি দেরি হবে না তাঁদের সুরটাকে শনাক্ত করতে। যাঁরা পারবেন না তাঁদের জন্য রবীন্দ্রনাথের গানটাও দিয়ে দেওয়া হচ্ছে তার নিচেই।

Ye banks and braes (স্কটল্যান্ডের ফোক গানের ইস্নিপ্স লিংক)
http://www.esnips.com/doc/8c8367b3-45fd-4a70-b291-aecbbbc15101/Yea-Banks-and-Breas

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

ফুলে ফুলে ঢলে ঢলের ইস্নিপ্স লিংক

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

গান দুটোর ইউটিউব লিঙ্ক
Ye banks and braes

ফুলে ফুলে ঢলে

পৃথিবীর প্রায় সব বিখ্যাত সাহিত্যিক বা সংগীত স্রষ্টাই অন্যের সৃষ্টি দিয়ে অনুপ্রাণিত হয়। এতে দোষের কিছু নেই। রবীন্দ্রনাথও তাঁর ভক্তদের ভাষায় অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তবে, হুবহু অন্যের সৃষ্টিকে নকল করা অর্থাৎ সরাসরি কুম্ভীলকতা বা চৌর্যবৃত্তি কীভাবে ‘অনুপ্ররেণাযোগ্য’ হয় সেটা অবশ্য আমরা জানি না। রবীন্দ্রনাথের এই সমস্ত ‘অনুপ্রাণিত’ গানকে ভাঙা গান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবী রবীন্দ্রনাথের ভাঙা গানের একটা তালিকা করেছিলেন। সেখানে তিনি ২৩৪টি গানকে ভাঙা গান হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। ইন্দিরা দেবীর বক্তব্যকে যদি সত্যি বলে ধরে নেই, তাহলেও দেখা যাচ্ছে যে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট গানের এক দশমাংশেরও বেশি অন্যের সৃষ্ট সুর থেকে ‘অনুপ্রাণিত’। যে রবীন্দ্রনাথে নিজেই অন্যদের সুরকে ভেঙেচুরে বা অবিকলভাবে নকল করেছেন, সেই রবীন্দ্রনাথের অনুসারীদের তাঁর গানকে অবিকৃত রাখা বা বিধিনিষেধের বেড়াজাল দিয়ে বিশুদ্ধ রাখার প্রচেষ্টা যে অনুচিত এবং অভব্য কাজ, সেটা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না।

রবীন্দ্রনাথ এই রকম অনুপ্রাণিত হতে গিয়ে বহু দেশী-বিদেশী সুরস্রষ্টার সৃষ্ট সম্পদকে নিজে ব্যবহার করেছেন। হিন্দি ছবির কিছু নির্লজ্জ সুরকারেরা যেমন অন্যের সুর বেমালুম ‘আত্মীকরণ’ করেন (প্রীতম যেমন মেরে দিয়েছেন গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গানের সুর), ব্যাপারটা সেরকমেরই। এঁরা বিগত হয়েছিলেন বলে রবীন্দ্রনাথের অন্যায় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু একটা ক্ষেত্রে এই অনুপ্রাণিত হওয়াকে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সে বিষয়ে যাওয়ার আগে আসুন একটা গান শুনি। এই গানটির সুরকে শনাক্ত করতে, বিশেষ করে বাংলাদেশের কোনো মানুষেরই বিন্দুমাত্র সমস্যা হবার কথা নয়। কারণ, এই সুরটা আমরা অহরহ শুনি, গভীর আবেগে এই সুরের গাওয়া গানটার সাথে গলা মেলাই।

গগন হরকরার আমি কোথায় পাবো তারে গানের ইস্নিপ্স লিংক

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

এবার আসুন মূল গানটা শুনি, বহুবার শোনা এবং গীত গান এটি।

আমার সোনার বাংলা গানের ইস্নিপ্স লিংক

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

অবাক হচ্ছেন, বিস্মিত হচ্ছেন, তাই না? ভাবছেন কার এত বড় দুঃসাহস যে, এরকম করে অবিকল রবীন্দ্রনাথের গানের সুরটাকে, আমাদের জাতীয় সংগীতটাকে নকল করেছে। কিন্তু আপনাদের এই অবাক এবং বিস্ময়ের মাত্রা অনেকগুণ বেড়ে যাবে যখন জানবেন যে ‘আমি কোথায় পাবো তারে’ এই গান রচিত হয়েছিল এবং এর সুর করা হয়েছিল আমার সোনার বাংলা গানটি রচিত এবং সুর করার অনেক আগে। চাপাবাজি নয়, মিথ্যাচার নয়, সত্যের অপলাপ নয়। হ্যাঁ, এটাই সত্যি। ‘আমি কোথায় পাবো তারে’ গানটির রচয়িতা এবং সুরকার একজন হতদরিদ্র ডাক পিওন। গগন হরকরা তাঁর নাম। লালনের সমসাময়িক, কুষ্টিয়ার এক বাউল তিনি। কীভাবে গগন হরকরার সুরকে নিজের নামিয়ে রবীন্দ্রনাথ চালিয়ে দিয়েছিলেন, আসুন সে বিষয়টা দেখি আমরা।

রবীন্দ্রনাথদের পৈত্রিক জমিদারী ছিল কুষ্টিয়ার শিলাইদহে। ১৮৮৯ সাল থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত জমিদারী দেখাশোনার জন্য এখানে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। চারপুরুষ ধরে তাঁদের জমিদারীর প্রজাদের উপর পীড়ন চালিয়েছেন জোড়াসাকোর এই ঠাকুর পরিবারটি। তিনিও তাঁর ব্যতিক্রম ছিলেন না। কবি হিসাবে তিনি যত রোমান্টিকই হোন না কেন, বৈষয়িক বিষয়ে তাঁর স্বার্থবুদ্ধি ছিল একেবারে টনটনে। ১৮৯৪ সনে রবীন্দ্রনাথ চাষীদের খাজনা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, খাজনা আদায়ও করেছিলেন [শচীন্দ্র অধিকারি, শিলাইদহ ও রবীন্দ্রনাথ পৃ. ১৮, ১১৭]। নতুন জমিদারী ক্রয় করেছিলেন [মার্টিন কোম্পানী থেকে নদীয়ার ডেব্রাকোল ক্রয়]। করবৃদ্ধি ও বলপ্রয়োগে কর আদায়ের ফলে প্রজাবিদ্রোহ ঘটলে তাও তিনি সাফল্যের সঙ্গে দমন করেন। বিশশতকের বিশ দশকে প্রজাপীড়ক শোষক রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে শিলাইদহের ইসমাইল মোল্লার নেতৃত্বে দু’শঘর প্রজার বিদ্রোহ এ সূত্রে উল্লেখ। [অমিতাভ চৌধুরী, জমিদার রবীন্দ্রনাথ, দেশ শারদীয়া, ১৩৮২।]

তাঁর এই বুর্জোয়া, শোষণপ্রিয় মানসিকতার ছাপ পড়েছে তাঁর লেখালেখিতেও। রবীন্দ্রনাথের সীমাহীন রচনাতে সাধারণ মানুষ প্রায় অনুপস্থিতই বলা চলে। সামান্য যেটুকু এসেছে, সেটা নিজেকে গরীবের পক্ষের লোক হিসাবে প্রমাণের তাগিদ থেকেই এসেছে, আন্তরিকতা থেকে নয়। আজীবন শোষক হয়ে শোষিতের পক্ষে কলম ধরাটা একটু কষ্টকরই বটে। আহমদ শরীফ তাঁর ‘রবীন্দ্র সাহিত্য ও গণমানব’ প্রবন্ধে লিখেছেন:

রবীন্দ্রনাথ তাঁর অন্তরের গভীরে প্রোথিত সামন্ত-বেণে-বুর্জোয়াচেতনা ও স্বার্থবোধ শেষাবধি পরিহার করতে সমর্থ হননি। একজন কারখানা মালিক যেমন তার শ্রমিকদের দাবি আদায়ের মিছিলে সামিল হতে পারে না, সামন্ত বেণে-বুর্জোয়া-জমিদার রবীন্দ্রনাথও তেমনি পারেননি দুস্থ-দুঃখী-চাষী-মজুরের শোষণ-পীড়ণ জর্জরিত জীবনের আলেখ্য আঁকতে। এ হচ্ছে শ্রেণীক ও ব্যক্তিক স্বার্থ চেতনার বন্ধন। নইলে যে রবীন্দ্রনাথ প্রমত্তা পদ্মায় জেলে-মাঝিকে ডুবে মরতে দেখেছেন, পদ্মার যমুনার তীর ভাঙনে হাজার হাজার গরিব চাষী-মজুরকে নিঃস্ব হতে উদ্বাস্তু হতে দেখেছেন, দেখেছেন স্বচ্ছল চাষীকে সপরিবারে পথে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করতে, প্রত্যক্ষ করেছেন দুর্ভিক্ষে অনাহারে-অপুষ্টিতে-তুচ্ছ রোগে ভুগে ভুগে অকালে অপমৃত্যু কবলিত হতে হাজার হাজার নিঃস্ব-নিরন্ন-নিরক্ষর-নির্বিরোধ মানুষকে। আরো দেখেছেন তাঁরই হুকুমে বা সম্মতিতে তাঁরই গোমস্তাদের খাজনার দায়ে তাঁরই গরিব প্রজার ঘটি-বাটি ক্রোক করতে, প্রজাকে ভিটে-ছাড়া করতে, বারবার দেখেছেন ঝড়-খরা-বন্যা তাড়িতি মানুষের চরম দুঃখ-দুর্দশা ও অপমৃত্যু–সেই রবীন্দ্রনাথের বিপুল-বিচিত্র রচনায় এদের নাম-নিশানা মাত্র নেই কেন! বোঝা গেল, শোষক তিনি যত বড়ো মহাপুরুষই হোন, শোষিতের পক্ষে লড়াই দূরে থাক, তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশেও অনীহ।

শুধু সহানুভূতি প্রকাশে অনিচ্ছুকই নন, নিজেদের শোষণ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন তিনি। ফলে, জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি। জমিদারী প্রথা যে প্রজা মঙ্গলের জন্য উত্তম সেটাকেই বিশ্বাস করতেন তিনি। সেকারণেই বলেছেন, “জমিদারী উঠে গেলে গাঁয়ের লোকেরা জমি নিয়ে লাঠালাঠি কাড়াকাড়ি ও হানাহানি করে মরবে। [প্রমথ চোধুরী–রায়তের কথা]

রবীন্দ্রনাথের প্রজা পীড়নের কাহিনি কিছুটা জানা যায় আহমদ শরীফের ‘রবীন্দ্রোত্তর তৃতীয় প্রজন্মে রবীন্দ্র মূল্যায়ন’ প্রবন্ধে। রবীন্দ্রনাথের প্রজাপীড়ন সম্পর্কে জানার জন্য তিনি তাঁর ছাত্র আবুল আহসান চৌধুরীকে চিঠি লিখে তথ্য সংগ্রহ করতে বলেছিলেন। আহমদ শরীফের চিঠির উত্তরে আবুল আহসান চৌধুরী এ বিষয়ে নানা তথ্য দিয়ে একটা পত্র লেখেন। আহমদ শরীফ তাঁর প্রবন্ধের তথ্য নির্দেশ অংশে সেই চিঠিটা হুবহু প্রকাশ করেছিলেন। সেই চিঠিটা এরকম:

শ্রদ্ধাভাজনেষু

স্যার, সালাম জানবেন। অসুস্থতার জন্যে আপনার চিঠির জবাব দিতে কয়েকদিন দেরী হলো। অনুগ্রহ করে মাফ করবেন আমাকে।

ঠাকুর জমিদারদের প্রজাপীড়নের সংবাদ কাঙাল হরিনাথের ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকার কোন বর্ষ কোন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল তা আমার সঠিক জানা নেই। আমাদের কাছে গ্রামবার্তার যে ফাইল আছে, তাতে এই সংবাদ নেই। প্রজাপীড়নের এই সংবাদ-সূত্রটি পাওয়া যায় কাঙাল-শিষ্য ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র একটি প্রবন্ধে। কাঙালের মৃত্যুর পর অক্ষয় কুমারের এই প্রবন্ধটি সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধে মৈত্রেয়বাবু কাঙাল হরিনাথের সংবাদপত্র পরিচালনায় সততা ও সাহসের পরিচয় প্রসঙ্গে প্রজাপীড়নের সংবাদ ‘গ্রামবার্তায়’ প্রকাশের উল্লেখ করেন। ঠাকুর-জমিদারদের অত্যাচার সম্পর্কে হরিনাথ নিজে অক্ষয়কুমারকে যে পত্র লেখেন, তিনি এই প্রবন্ধে তা উদ্ধৃত করে দেন। এই প্রবন্ধ প্রকাশের ফলে রবীন্দ্রনাথ বিশেষ রুষ্ট ও অপ্রসন্ন হন এবং তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায়কে বলে অক্ষয়কুমারের ‘রানী ভবানী’ গ্রন্থপ্রকাশের অর্থ-সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করান। কাঙাল-পুত্র সতীশচন্দ্র মজুমদার সূত্রে জানা যায়, ঠাকুর জমিদারদের প্রজাপীড়নের সংবাদ-প্রকাশের অপরাধে (?) তাঁরা লাঠিয়াল-গুণ্ডা লাগিয়ে কাঙালকে শায়েস্তা করার ব্যবস্থা নেন। এইসব ঘটনা ঠাকুর জমিদারীর ইতিহাসের দুঃখজনক কালো অধ্যায়।

এ ছাড়া অন্যত্র যেমন মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত ‘হিতকরী’ পত্রিকায়, ঠাকুর-জমিদাররা যে প্রজাসাধারণের দুঃখ-কষ্ট মোচনে তেমন তৎপর ও মনোযোগী ছিলেন না তার ইঙ্গিত আছে। ঠাকুরবাবুরা তাঁদের জমিদারী এলাকায় গো-কোরবানী নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং এই নির্দেশ অমান্যকারীদের নানাভাবে নিগৃহীত হতে হয়। শিলাইদহ ঠাকুর-জমিদারীর এই ভূস্বামী-স্বার্থরক্ষার কৌশল-ব্যবস্থা ও প্রজাপীড়নের ঐতিহ্য চারপুরুষের, দ্বারকানাথ থেকে সুরেন্দ্রনাথ পর্যন্ত। কাঙাল হরিনাথের দিনলিপিতেও এর ইঙ্গিত মেলে।

শিলাইদহ জমিদারীতে রবীন্দ্রনাথের আমলেও কিছু অবাঞ্ছিত ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। চরের মুসলমান প্রজাদের ঢিঢ করবার জন্যে নমঃশুদ্র প্রজা এনে বসতি স্থাপনের সাম্প্রদায়িক-বুদ্ধিও রবীন্দ্রনাথের মাথা থেকেই বেরিয়েছিল। এ-ছাড়া পুত্র রথীন্দ্রনাথের নিরীক্ষামূলক শখের কৃষি-খামারের প্রয়োজনে গরীব মুসলমান চাষীর ভিটেমাটি দখল করে তার পরিবর্তে তাকে চরের জমি বরাদ্দের মহানুভবতাও রবীন্দ্রনাথ প্রদর্শন করেছিলেন। এ-সব কথা ও কাহিনী উক্ত জীবনীকারদের যত্ন ও সৌজন্যে চাপা পড়ে গেছে। সত্য ইতিহাসকে তুলে ধরতে গেলে অনেককেই হয়তো সাম্প্রদায়িক বা রবীন্দ্র-বিদ্বেষী শিরোপা, নয়তো সুভো ঠাকুরের (বিস্মৃতিচারণার প্রতিক্রিয়া দ্রষ্টব্য) মতো ধিক্কার ও তিরস্কার অর্জন করতে হবে।

ঠাকুর-জমিদারদের প্রজা-পীড়নের বিষয়ে আমি রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের জীবনের নিপুণ ভাষ্যকার শ্রীশচীন্দ্রনাথ অধিকারীকে (তিনি নিজে শিলাইদহবাসী ও ঠাকুর-এস্টেটের কর্মচারী ছিলেন এবং এই বিষয়গুলো জানতেন) চিঠিপত্রে নানা প্রশ্ন করে ছিলাম। তিনি এ-সব জিজ্ঞাসার জবাব এড়িয়ে ও অস্বীকার করে এই ধরনের কৌতূহলকে রবীন্দ্র-বিদ্বেষী বলে অভিহিত করেছিলেন।

উপরি-বর্ণিত বিষয়গুলোর কিছু কিছু তথ্য আমার সংগ্রহে আছে। আপনার প্রয়োজন হলে সেগুলো পাঠাতে পারি। আপনার নির্দেশের অপেক্ষায় রইলাম। এই বিষয়ে আপনি কোন প্রবন্ধ লিখেছেন কী না জানিয়ে বাধিত করবেন। আমার গবেষণার কাজ (‘মীর মশাররফ হোসেনের শিল্পকর্ম ও সমাজচিন্তা’) চালিয়ে যাচ্ছি। এ বছরের মধ্যে থিসিস জমা দেবো এমন আশা আছে। আমার লেখার কাজে আপনার প্রশ্রয় ও প্রেরণার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। আপনার জবার প্রত্যাশায় রইলাম। আন্তরিক শ্রদ্ধা ও সালাম জানিয়ে শেষ করি।

স্নেহসিক্ত,

আবুল আহসান চৌধুরী

এই শিলাইদহ, শাহজাদপুরে জমিদারী দেখাশোনা করতে গিয়েই বাউলদের সংস্পর্শে আসেন রবীন্দ্রনাথ। বাউলদের গান শুনে সেগুলোর ভাষার সরলতায়, ভাবের গভীরতায়, সুরের দরদে মুগ্ধ হয়ে যান তিনি। শুধু মুগ্ধই নন, জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল গানের সুর রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের গানের মধ্যে নিয়ে আসেন। তাঁর নিজের ভাষাতেই:

আমার লেখা যারা পড়েছেন তাঁরা জানেন বাউল-পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখা-সাক্ষাৎ আলাপ আলোচনা হত। আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি। এবং অনেক গানে অন্য রাগ-রাগিনীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল-সুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময় আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। (শান্তিদেব ঘোষ- রবীন্দ্রসংগীত)

এখানেই গগন হরকরার সাথে পরিচয় ঘটে রবীন্দ্রনাথের। গগন হরকরার জন্ম শিলাইদহের আড়পাড়া গ্রামে। কাজ করতেন ডাক বিভাগে ডাক হরকরা হিসাবে। তিনি একজন বিশিষ্ট বাউল গীতিকার ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ প্রায়শই গগন হরকরাকে কাছারিতে ডেকে নিয়ে আসতেন গান শোনার জন্য। গগন হরকরাও সানন্দে গান শুনিয়ে যেতেন তাঁদের জমিদারবাবুকে। গ্রামের এই সহজ সরল বাউল তখনও ভাবেন নি জমিদারবাবুর মনের মধ্যে কী রয়েছে। গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাবো তারে’ এই গানটার অনুকরণে রবীন্দ্রনাথ কবিতা লেখেন আমার সোনার বাংলা বলে। এই অবিশ্বাস্য কথাটা যাঁদের বিশ্বাস হচ্ছে না, তাঁদের জন্য গগন হরকরার আমি কোথায় পাবো তারের গীতি কবিতাটা এখানে তুলে দিচ্ছি, সেই সাথে আমার সোনার বাংলার গীতিও। আপনারা মিলিয়ে দেখতে পারেন।

আমি কোথায় পাব তারে
আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে–
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে।
লাগি সেই হৃদয়শশী সদা প্রাণ হয় উদাসী
পেলে মন হত খুশি দেখতাম নয়ন ভরে।
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে নিভাই অনল কেমন করে
মরি হায় হায় রে
ও তার বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে
ওরে দেখ না তোরা হৃদয় চিরে।
দিব তার তুলনা কি যার প্রেমে জগৎ সুখী
হেরিলে জুড়ায় আঁখি সামান্যে কি দেখিতে পারে
তারে যে দেখেছে সেই মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে।
মরি হায় হায় রে –
ও সে না জানি কি কুহক জানে
অলক্ষ্যে মন চুরি করে।
কুল মান সব গেল রে তবু না পেলাম তারে
প্রেমের লেশ নাই অন্তরে –
তাইতে মোরে দেয় না দেখা সে রে।
ও তার বসত কোথায় না জেনে তায় গগন ভেবে মরে
মরি হায় হায় রে –
ও সে মানুষের উদ্দিশ যদি জানুস কৃপা করে
আমার সুহৃদ হয়ে ব্যথায় ব্যথিত

আমার সোনার বাংলা
আমার সোনার বাংলা
আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস
আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।
ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে
ঘ্রাণে পাগল করে–
(মরি হায়, হায় রে)
ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা খেতে,
(আমি) কি দেখেছি মধুর হাসি।।
কী শোভা, কী ছায়া গো,
কী স্নেহ, কী মায়া গো–
কী আঁচল বিছায়েছ
বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।।
মা তোর মুখের বাণী
আমার কানে লাগে
সুধার মতো–
(মরি হায়, হায় রে)
মা, তোর বদনখানি মলিন হলে
আমি নয়ন জলে ভাসি।।

শুধু এই গানের কাঠামো অনুসরণে কবিতা রচনা করেই ক্ষান্ত হন নি তিনি। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় আমার সোনার বাংলাতে হুবহু গগন হরকরার সৃষ্ট সুর বসিয়ে দেন। আমাদের জানামতে গগন হরকরা সেই সময় জীবিত থাকার পরেও তাঁর কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া বা তাঁকে জানানোর প্রয়োজনটুকুও তিনি বোধ করেন নি। এ যেন তাঁর নিজের লিখিত দুই বিঘা জমির সেই জমিদারের মত। রাজা হয়েও ‘যার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি’। এত বড় একজন কবি এবং সংগীতকার হয়েও গ্রামের একজন দরিদ্র ব্যক্তির মেধাপ্রসূত সম্পদকে চুরি করতে তাঁর বিন্দুমাত্রও বাধে নি। যোগাযোগের অপ্রতুলতা এবং এখনকার মত তথ্যের অবাধ প্রবাহ সেই সময়ে না থাকার কারণে কারো পক্ষেই এত বড় একটা চুরি ধরা সম্ভবপর হয় নি। পরে যখন বিষয়টা জানা গেছে, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ পরিণত হয়ে গিয়েছেন মহাকাশস্পর্শী এক মহীরুহে। তাঁর বিশাল এক স্তাবকবাহিনী তৈরি হয়ে গিয়েছে। এই স্তাবকবাহিনী তাঁদের পূজনীয় ঠাকুরকে বাঁচানোর জন্য গালভরা এক শব্দ ‘অনুপ্রেরণা’কে বেছে নিয়েছেন, ‘ভাঙা গানে’র ভরাট ঢালের আড়ালে অত্যন্ত সুকৌশলে নিয়ে গিয়েছেন শতাব্দীর সেরা চৌর্যবৃত্তিকে।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের অনেক কিছুই মৌলিক নয়, বরং বলা যায় বিদেশী সাহিত্যের ছায়া-অবলম্বনে লেখা। যেমন, গবেষক প্রতাপনারায়ণ বিশ্বাস তার লেখা ‘রবীন্দ্রনাথের রহস্য গল্প ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ নামের একটি বইয়ে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের চারটি অতি পরিচিত গল্প–যেমন ‘মহামায়া’, ‘গুপ্তধন’, ‘নিশীথে’, এবং ‘সম্পত্তি সমর্পণ’–বিখ্যাত মার্কিন রহস্য গল্পলেখক এডগার অ্যালান পো’র সে সময়কার চারটি গল্প থেকে ‘অনুপ্রাণিত’। ফরাসি লেখক তেওফিল গতিয়ের লেখা­ Le Pied de Mome (১৮৬৬) গল্পের প্রভাব আছে তার বিখ্যাত গল্প ‘ক্ষুধিত পাষাণে’র ওপর; আর রক্তকরবীর ওপর আছে সুইডিশ নাট্যকার অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গের ‘A Dream Play’-এর ছাপ [প্রতাপনারায়ণ বিশ্বাস, ‘রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী : তত্ত্ব ও তথ্য’, অনুষ্টুপ, ১৯৮৯]। কিন্তু এগুলোর ক্ষেত্রে কেবল ‘বিদেশী গল্পের ছায়া’ থাকায় সরাসরি প্লেইজারিজমের অভিযোগ থেকে না হয় তাকে অব্যাহতি দেয়া যায়, কিন্তু হতদরিদ্র গগন হরকরার সাথে জমিদারবাবু যা করেছিলেন তার কোনো তুলনা নেই। ২০০৬ সালে বিবিসি সর্বকালের সেরা বাংলা গান কোনটি তাঁর একটি জরিপ চালিয়েছিল। সেই জরিপে বিপুল ভোট পেয়ে সেরা গান হয়েছিল ‘আমার সোনার বাংলা’। অথচ কী আশ্চর্য! সর্বকালের সেরা গানের সুরস্রষ্টা গগন হরকরাকে আমরা চিনি-ই না, চিনি একজন কুম্ভীলক রবীন্দ্রনাথকে। এর চেয়ে দুঃখজনক বিষয় আর কী হতে পারে। এই গানটা আবার আমাদের জাতীয় সংগীতও। শত শত বছর ধরে এটা গাওয়া হবে, অনাগত দিনের বাংলাদেশীরা সকৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে রবীন্দ্রনাথ নামের একজন মহান কবি এবং সংগীতকারকে, এরকম একটি অসাধারণ শ্রুতিমধুর গানকে সৃষ্টি করার জন্য। এর পিছনের বঞ্চনার ইতিহাস, চুরির ইতিহাস ঢাকা পড়ে যাবে অন্ধ পূজারীদের পরম মিথ্যায় এবং রবির কিরণের তীব্র কষাঘাতে। বেচারা গগন হরকরা। তাঁর সৃষ্ট সম্পদ অন্যে চুরি করেছে বলে যে হতাশামাখানো দীর্ঘশ্বাসটুকু ফেলবেন, তাঁর সুযোগও নেই। জানতেই পারেন নি যে, নিজের অজান্তেই সর্বকালের সেরা বাংলা গানের সুর সৃষ্টি করে ফেলেছিলেন তিনি। আর সেই অনন্য সুরটাকে নির্দ্বিধায় মেরে দিয়েছিল, তাঁর গানের কথাকে অনুকরণ করে কবিতা লিখেছিল, তাঁদেরই গানপাগলা জমিদারবাবু ঠাকুরমশাই।

রবীন্দ্রনাথ এই ধরাধাম থেকে বিদায় নিয়েছেন প্রায় সত্তর বছর আগে। তাঁকে নিয়ে যে অনন্ত আবেগ তৈরি হয়েছিল, সেই আবেগকে অতিক্রম করার জন্য যথেষ্ট সময় এটি। তারপরেও সেই আবেগ যায় নি। তবে, একেবারে না গেলে কমে আসছে ঠিকই। দ্রুতগতিতে না হলেও তাঁর ভক্ত অনুরক্তের সংখ্যা দিন দিন কমছে। এমন একদিন আসবে যখন তাঁর ভক্ত, স্তাবক বলতে কেউ-ই থাকবে না। তখন নতুন প্রজন্মের মানুষ নতুনভাবে রবীন্দ্র মূল্যায়ন করতে পারবে। সেই মূল্যায়ন হবে নিরপেক্ষ। ভাল মন্দ কোনো ধরনের তথ্যকেই চেপে রাখবে না নতুন মানুষেরা। অনাসক্ত এবং অভ্রভেদী নির্মোহ দৃষ্টিতে বিচার করবে সবকিছুকে। কোনো তথ্যকেই আবেগের রসে রসসিক্ত করে বিকৃত করার চেষ্টা করবে না তারা। সেই দিন শুধু আমাদের জন্যই নয়, রবীন্দ্রনাথের জন্যও শুভ হবে মঙ্গলময় হবে। আসল রবি ঠাকুরকে চেনা হবে তখন। সম্মানিত করা হবে প্রকৃত মানুষটিকে, তাঁর সঠিক সৃষ্টিকে।

পশ্চিমা বিশ্বে অ্যারিস্টটলেরও একসময় এরকমই অনেকটা দেবতার আসন ছিলো। তাঁর চিন্তা ভাবনা, দর্শন নীতি সব কিছুকেই মানুষ বিনা প্রতিবাদে গ্রহণ করে নিতো। সমাজে তার প্রতিপত্তি ছিলো বিশাল, অনুরাগীর সংখ্যাও ছিলো বিপুল। তার বাণী সমাজে গৃহীত হতো অনেকটা যেন ‘ঈশ্বরের বাণী’র মতোই। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে চারটি মৌলিক পদার্থ দিয়ে, মাটি, বায়ু, আগুন এবং পানি দিয়ে, অতএব সেটাই ঠিক। অ্যারিস্টটল ভেবেছিলেন, সূর্যই পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে। অতএব সেটাই হতে হবে ঠিক। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, ভারি বস্তু আর হাল্কা বস্তু উপর থেকে ছেড়ে দিলে সব সময় ভাবি বস্তুই আগে নিচে পড়বে। অতএব সেটাকেই ঠিক হতে হবে। ঠিক ঠিক ঠিক!

কিন্তু জামানা বদলায়। দেবতারও পতন হয়। বিশেষতঃ গ্যালিলিওর মতো বিজ্ঞানীদের হাত ধরে পর্যবেক্ষণমূলক পদার্থবিজ্ঞানের উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষ বুঝতে পারলো অ্যারিস্টটলের অনেক কথাই আসলে ভ্রান্ত। তার চিন্তা চেতনা পশ্চাৎগামী, তার বহু ভাবনা অবৈজ্ঞানিক শুধু নয় রীতিমত হাস্যকর। আসলে জ্ঞান বিজ্ঞান যত এগিয়েছে ততই কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বে প্লেটো এবং এরিস্টটলের ভূতকে ঘাড় থেকে নামিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন পড়েছিলো। বার্ট্রান্ড রাসেল তার হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলোসফি গ্রন্থে বলেছিলেন, ‘Almost every serious intellectual advance has had to begin with an attack on some Aristotelian doctrine; in logic, this is still true at the present day”। অর্থাৎ, সহজভাবে বললে আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাস আসলে এরিস্টটলকে হটানোরই ইতিহাস। সমালোচকেরা চাঁছাছোলা ভাবেই বলেছিলেন–‘অ্যারিস্টটল আসলে যা শিখিয়েছিলেন, তা সবই ছিলো ভুল।’ এ ধরনের তীক্ষ্ণ সমালোচনা করতেও দ্বিধান্বিত হননি পাশ্চাত্যের সমালোচকরা অ্যারিস্টটলকে নিয়ে। অ্যারিস্টটলের মতো ব্যক্তিত্বকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখতে পেরেছিলেন বলেই সভ্যতা এগুতে পেরেছে।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও এটি করা দরকার। আমাদের এগোনোর স্বার্থেই এটি দরকার।

হ্যাঁ, বল্গাহীন আবেগে আর লাগাতার রবীন্দ্র স্তবে গা ভাসিয়ে দিয়ে আত্মহারা না হয়ে বরং রবীন্দ্রনাথের পুরোটুকু জানাটাই বেশি জরুরি। তার ভুলগুলো জানা, জানানো, স্পষ্ট সমালোচনা করা তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আমাদের সময়ে। যারা মনে করেন রবীন্দ্রনাথ ছিলেন নারীস্বাধীনতার অগ্রদূত, তাদের দেখানো দরকার নারীদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন কুৎসিৎতম একটি প্রবন্ধ ‘রমা বাঈ এর বক্তৃতা উপলক্ষে’ শিরোনামে, যেখানে তিনি প্রকৃতির দোহাই পেড়ে নারীদের ঘরে অবরুদ্ধে রাখতে চেয়েছেন, আর ভদ্র ভাষায় ওয়ার্কিং ওম্যানদের গালাগালি করেছেন। যারা মনে করেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন দারুণ বিজ্ঞানমনস্ক, আইনস্টাইনের চেয়েও বিজ্ঞান ভাল বুঝতেন, তাদের দেখানো দরকার রবীন্দ্রনাথ তার জীবনে কীভাবে প্ল্যানচেটে বিশ্বাস করেছেন, কীভাবে হোমিওপ্যাথির মত অপবিজ্ঞানকে শুধু বিশ্বাসই করেননি, নিজেও হাতুড়ে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছেন। তার চেয়েও বড় কথা, নিজের বিবেক বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে প্রমথনাথ কিংবা গগন হরকরার মেধাস্বত্ব লোপাট করেছেন, অনুভব করেননি কোনো বিবেকের দংশন। এ ব্যাপারগুলো জানা দরকার। আমরা মনে করি, রবীন্দ্রনাথকে তৈরি হওয়া অর্ধসত্য এবং অতিকথন নয়, পুরো সত্যটি জানলেই ভক্তদের তৈরি কৃত্রিম প্রাসাদ ছেড়ে তিনি ফিরে আসবেন তাঁর নিজস্ব আলয়ে। সঠিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হবেন তিনি সেদিন। আহমদ শরীফকে দিয়ে শেষ করি এই প্রবন্ধ:

রবীন্দ্রনাথসম্পৃক্ত আবেগের কাল অপগত। এখনো যাঁরা আবেগে, ভক্তিতে, শ্রদ্ধায় কিংবা গৌরবে গর্বে অভিভূত, রবীন্দ্রনাথের নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে বৈষ্ণবসূলভ আবেগে-ভক্তিতে বিগলিত হন, রবীন্দ্রত্রুটি কেউ উচ্চারণ করলেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন, তাদের মন-বুদ্ধি, রুচি-চিন্তা-চেতনা-বিবেক-বিবেচনার পরিপক্কতায় আস্থা রাখা সম্ভব হয় না। আজ আত্মকল্যাণেই, আত্মবিকাশের ও প্রগতির প্রয়োজনেই ব্যক্তি নিরপেক্ষ ও অনাসক্ত মন নিয়ে যুক্তি-বুদ্ধি-চিন্তা-চেতনা প্রয়োগে সমাজ-সদস্য ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের মন-মেজাজ, সামাজিক-নৈতিক কর্ম ও আচরণ, বিশ্বাস-সংস্কার চালিত রুচি ও স্বভাব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যোগে জানতে ও বুঝতে হবে। (রবীন্দ্র সাহিত্য ও গণমানব)

২৩ আগস্ট ২০১১

লেখকদ্বয়ের আর্টস প্রোফাইল:
অভিজিৎ রায়
ইমেইল: charbak_bd@yahoo.com
ফরিদ আহমেদ
ইমেইল: farid300@gmail.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters


15 Responses

  1. ফাহিম says:

    এটি একটি চমৎকার লেখা। তথ্যপূর্ণ এবং সাবলীল। রবীন্দ্রনাথকে মাথায় করে রাখার রেওয়াজ অনেক পুরনো। যারা রবীন্দ্রনাথকে মাথায় করে রাখতে চান, তারা রবীন্দ্রনাথের বিন্দুমাত্র সমালোচনা সহ্য করেন না। প্রমথনাথ এবং গগন হরকরার ব্যাপারটা দুঃখজনক। গান হোক লেখা হোক, কৃতজ্ঞতা প্রকাশে কেউ ছোট হয় না।

    রবীন্দ্রনাথের জমিদারীর সময়ে অনেক অত্যাচারের কথা প্রকাশিত হয়েছে আহমদ শরীফের রবীন্দ্রোত্তর তৃতীয় প্রজন্মে রবীন্দ্র মূল্যায়ন প্রবন্ধে (খাজনা বাড়ানো, নতুন জমিদারী কেনা, কাঙাল হরিনাথের উপর অত্যাচার, চরের মুসলমান প্রজাদের ঢিঁঢ করার জন্য নমঃশূদ্র প্রজা এনে বসতি স্থাপন ইত্যাদি)। এ গুলো সবই নথিভুক্ত হবার পরেও সবাই চোখ বুঁজে থাকেন। এর বাইরে রবীন্দ্রনাথের ইংরেজপ্রীতিও ছিলো প্রবল। রবীন্দ্রনাথ তার ত্রিশ বছর বয়সে লিখেছিলেন মন্ত্রী অভিষেক ১৮৯০ সালে। ইংরেজদের তোষণমূলক একটি রচনা। তিনি সেখানে লিখেছিলেন ইংরেজরা ভারতীয়দের স্বার্থেই উপনিবেশ স্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, “ভরসা করিয়া বলিতে পারি এমন অবিশ্বাসী এ সভায় কেহই নাই যিনি বলিবেন ভারতের উন্নতিই ভারত শাসনের মুখ্য লক্ষ্য নহে।… নিজের স্বার্থকেই যদি ইংরাজ ভারতশাসনের প্রধান উদ্দেশ্য করিতেন তবে আমাদের এমন দুর্দশা হইত যে ক্রন্দন করিবারও অবসর থাকিত না।” অথচ তখন ভারতে সিপাহী বিদ্রোহ হয়ে গেছে। তিনি সিপাহী বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, ওহাবী বিদ্রোহ, দাক্ষিণাত্যের কৃষক বিদ্রোহ, কোল বিদ্রোহ সবই দেখেছিলেন অথচ সেই সব মহাবিদ্রোহ নিয়ে একটি লাইনও লেখন নাই। আমরা কেবল জালিয়ানাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর নাইটহুড ত্যাগ করেছিলেন সেটাই জানি, কিন্তু তার নাইটহুড ত্যাগের চিঠিটিও ইংরেজ বন্দনায় ভরা। আহমদ শরীফ তাঁর লেখায় দেখিয়েছেন ভেতরের চাপেই তাকে নাইটহুড ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। তিনি বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ড সমর্থন না করে, তখন আন্তর্জাতিকতাবাদ প্রমোট করতে উদ্যত হন, যাতে শাসকদের গদি ঠিক রাখা যায়। আহমদ শরীফ বলেছেন, “শাসক ইংরেজদের বিরুদ্ধে তার বিদ্বেষ দেখা যায় না, বরং বড়ো ইংরেজদের প্রতি ছিল তার অপ্রিমেয় অনুরাগ এবং গভীর শ্রদ্ধা।” তিনি ইংরেজ শাসনের সমর্থনে রাজকুটুম্ব, ঘুষোঘুষি, স্বদেশী ও স্বাবলম্বন, স্বদেশী সমাজ প্রভৃতি প্রবন্ধ লিখে প্রতিক্রিয়াশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

    এই চমৎকার লেখাটির জন্য লেখকদ্বয় এবং বিডিআর্টসকে ধন্যবাদ।

  2. নয়ন মজুমদার says:

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে গগন হরকারের গানের সুর চুরি করেছেন তা আপনি কোথা থেকে জানলেন?

  3. কুলদা রায় says:

    এই লেখাটা ‘মুক্ত-মনা’ নামে একটি যুক্তবাদি ব্লগে প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে লেখাটি বিতর্ক সৃষ্টি করে। বিডিনিউজ আর্টস-এ সেই লেখাটি আবার প্রকাশিত হয়েছে।

    রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে অনেকেই লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেও লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথের বউও কিছু কিছু চিঠি পত্রে লিখেছেন। তার পুত্রও লিখেছেন। মুশকিল, রবীন্দ্রনাথের বংশধর কেউ নেই। থাকলে তারাও লিখতেন। তবে এত ভাল লেখা হত কিনা সন্দেহ আছে। এই লেখার সমালোচনা সাহিত্যে নবতর সংযোজন। অভিনন্দন লেখকদ্বয়কে।

    ১.
    এই লেখার দুটি রেফারেন্স। এক. ড. আহমদ শরীফ। দুই. নীরদচন্দ্র মজুমদার। আরও কিছু রেফারেন্স হয়তো আছে।
    ড. শরীফ যখন রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে নোটে উল্লেখিত ‘রবীন্দ্রোত্তর তৃতীয় প্রজন্মে রবীন্দ্র মূল্যায়ন’ প্রবন্ধ লেখেন–বলার চেষ্টা করেন যে, রবীন্দ্রনাথ প্রজাপীড়ক জমিদার ছিলেন, তখন তিনি তা প্রমাণের জন্য তাঁর ছাত্র আবুল আহাসান চৌধুরীকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন সেটার সরেজমিন প্রমাণ সংগ্রহের জন্য। ড. শরীফ সেকালে একটা উত্তর দিয়েছিলেন। কী উত্তর দিয়েছিলেন, তাও ফরিদ সাহেব এই নোটে তুলে দিয়েছেন। লেখাটা পড়ে সেকালে অনেকেই অট্টহাস্য করেছিলেন। বলেছিলেন, আবুল আহসান চৌধুরী শিক্ষকের কথায় বড় আমতা আমতা করে সায় দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। শত হলেও শিক্ষক, পিএইচডির থিসিসের কাজও তিনি দেখাশুনা করছেন। সুতরাং শিক্ষককে চেতানো ঠিক নয়। এদেশে কে না ভাল রেজাল্টের আশায় শিক্ষকের অনুগ্রহ পেতে চায়?

    আবুল আহসান এখন নামি গবেষক এবং শিক্ষক। শাশ্বতকির মোজাফ্ফর হোসেন রবীন্দ্রনাথের প্রজানিপীড়ন বিষয়ে আবুল আহসান চৌধুরীর সাম্প্রতিককালের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। সেখানে এখন কী পাচ্ছি?
    তিনি বলছেন, রবীন্দ্রনাথ প্রজাপীড়ক ছিলেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং প্রজারা তাঁকে ভালই বাসতেন। তাহলে? তাহলে কাকে বিশ্বাস করব? সেই ড. আহমদ শরীফের জীবিতকালের অনুগত ছাত্রের চিঠিকে, না একালের পরিশ্রমী গবেষক শিক্ষক আবুল আহসান চৌধুরীর বক্তব্যকে? আশা করছি এই জবাবটি অভিজিৎ রায় এবং ফরিদ সাহেব দিয়ে আমাকেও নোবেল পাওয়ার সুযোগ করে দেবেন। হক মাওলা। আশা করছি এই উত্তরের মধ্য দিয়ে আমি আরও কিছু প্রশ্ন করার সাহস অর্জন করব। আলাপের দরোজাটা খোলা রাখুন শুধু। আমিন।

    ————————————————
    আবুল আহসান চৌধুরী কী লিখেছেন দেখুন এই ২০১১ সালে
    ————————————————
    • আবুল আহসান চৌধুরী : আমি তো আগেই বলেছি যে ঠাকুর জমিদারদের কিছুটা নিন্দে ছিল দু’পুরুষ আগে, দ্বারকানাথ ঠাকুর ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়ে। প্রজানির্যাতনের অভিযোগ ছিল এবং এসব কথা কাঙাল হরিনাথ মজুমদার তাঁর অপ্রকাশিত ডায়েরীতে যেমন লিখেছেন তেমনি তাঁর পত্রিকা ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’-তেও তিনি উল্লেখ করেছেন। সেই কারণে এই জমিদারদের বিরাগ ভাজনও তাঁকে হতে হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে জমিদাররা এই লোক লস্কর লাঠিয়াল পাঠিয়ে নানাভাবে শায়েস্তা করার চেষ্টাও করেন। সেখানেও রক্ষা কর্তা হিসেবে এসে পড়েন লালন ফকির, তখন একতারা ফেলে তাঁর শিষ্য-শাবকদের নিয়ে লাঠি হাতে কাঙাল হরিনাথকে রক্ষা করেন। তো ঠাকুর জমিদারদের এই যে ভূমিকা এই ভূমিকাকে যেহেতু শুধু ঠাকুর জমিদার না, কোন জমিদারই অত্যাচার না করে রাজস্ব আদায় আদায় করতেন না এবং নতুন নতুন কর তারা অহেতুক অযৌক্তিক ভাবেও আরোপ করতেন। লাঠিয়াল পাঠিয়ে ঘরকে ঘর জালিয়ে দেওয়া হয়েছে—নিঃস্ব মানুষগুলো একেবারে নিঃস্বতরও হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত স্পর্শকাতর, সংবেদনশীল ছিলেন এবং তাঁর ভেতরে একটা গভীর মানবতাবোধ কাজ করতো। তিনি গ্রামীণ মানুষের সুখ-দুঃখের সাথে অনেকখানি পরিচিত হতে পেরেছিলেন। সেই কারণে তিনি নানাভাবে চেষ্টা করেছিলেন যে প্রজাপীড়ন যাতে না হয়। তিনি চেষ্টা করেছিলেন যে প্রজার মঙ্গল কিসে হয়, প্রজারা সুখে থাকে কিসে। এবং সারা গ্রামগুলো, রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেছেন, যেন মরে গেছে। সেই গ্রামগুলো তিনি জাগাতে চেয়েছেন। কিভাবে জাগানো যায়–তিনি সেখানে মেলার আয়োজন করেছেন এবং সেখানে তিনি স্বদেশী যাত্রা থেকে শুরু করে গ্রামীণ মেলায় যা যা হয়ে থাকে তার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি অনেকবারই শিলাইদহে মেলার আয়োজন করেছেন। গান-বাজনা হত সেখানে, সেখানে কীর্তন হত, বাউল গান হত, কবি গান হত এইভাবে রবীন্দ্রনাথ গ্রামগুলোকে জাগাতে চেয়েছিলেন। একটা নিষ্প্রাণ, নির্জীব গ্রামের মানুষগুলোকে তিনি আনন্দ দিতে চেয়েছিলেন এবং তিনি তাদেরকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। এই যে খোকশার শিবু কীর্তনিয়া, সেই কীর্তনিয়াকে তিনি যথেষ্ট সমাদর করেছেন। তো রবীন্দ্রনাথের সময়ে এসে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে সেই পুরোনো কষ্টের যে ইতিহাস প্রজারা বংশ পরম্পরায় ভোগ করে আসছিল তা তারা ভুলতে পেরেছিল। রবীন্দ্রনাথ কেমন জমিদার ছিলেন এ সম্পর্কে একটি বিবরণ মেলে রাজশাহীর ডিস্ট্রিক গেজেটিয়ারে। সম্ভবত, এই গেজেটিয়ারের সংকলক ছিলেন ও’ ম্যালি, সেখানে জমিদার হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কৃতিত্বের কথা, তাঁর জমিদারি পরিচালনার পদ্ধতির কথা বলেছেন এবং প্রশংসা করেছেন। আর সমকালীন যে সাক্ষ্য তা থেকে তো বোঝাই যায় যে রবীন্দ্রনাথের সময়ে তিনি একটা পরিবর্তন এনেছিলেন, তা না হলে তাঁর কিসের দায় ঠেকেছে যে নোবেল পুরস্কারের সব টাকা তিনি এই গ্রামের মানুষের জন্য খরচ করবেন? তাদের জন্য ব্যাংক তৈরি করবেন? রবীন্দ্রনাথ যখন রাশিয়া থেকে ফিরে এলেন তখন রাশিয়ায় যে কৃষি বিপ্লব এবং রাশিয়ার যে কৃষিপদ্ধতি তা তাকে খুব অনুপ্রাণিত করেছিল এবং তিনি রাশিয়ার যে কমিউন প্রথা—তা মনে মনে ভেবেছিলেন যে যদি এমন আমাদের দেশে প্রবর্তন প্রচলন করা যায় তাহলে হয়ত আমাদের দেশের কৃষকেরা আরও সঠিক হতে পারবে, আরও সমৃদ্ধ হতে পারবে। কিন্তু এটি বিচ্ছিন্ন ভাবে নিরীক্ষা করার কোন বিষয় নয়। রাষ্ট্র যদি এ ব্যাপারে এগিয়ে না আসে, কেবল ছোট্ট একটি জমিদারি এলাকায় এটা করা সম্ভব না, আর সেখানে তো শুধু জমিদারের জমিতে স্বত্ব নেই কিছু ব্যক্তি স্বত্বও ছিল। তাই রবীন্দ্রনাথ পারেননি, করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু তাঁর মাথায় এ ব্যাপারগুলো এসেছিল। তিনি কৃষকদের জন্য চেষ্টা করেছেন। সেই চেষ্টার ফল যে খুব পাওয়া গেছে তা নয়, কিন্তু চেষ্টা করেছেন। যেমন, তাঁর ছেলেকে এবং জামাইকে আমেরিকায় কৃষিবিদ্যা শেখার জন্য পাঠিয়েছিলেন। রথীন্দ্রনাথ যখন ফিরে এলেন তখন শিলাইদহে তাঁর জন্য একটা কৃষি খামার করে দেওয়া হল, আলু চাষের ব্যবস্থা করলেন, এমনকি রাজশাহীর যে রেশম চাষ সেই রেশম চাষের জন্যও রবীন্দ্রনাথের একটা আগ্রহ জন্মেছিল অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়-এর সৌজন্যে। তিনি রবীন্দ্রনাথের বন্ধু ছিলেন এবং তাঁর আসল বাড়ি তো কুষ্টিয়ার কুমারখালিতে কিন্তু ওকালতি করেছেন রাজশাহীতে এবং বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার অন্যতম সহায়ক ছিলেন। তিনি কিছু গুটি পোকা নিয়ে এসে দিয়েছিলেন। লরেঞ্জ সাহেব একজন গৃহ শিক্ষক ছিলেন। তিনিও খুব মেতে ছিলেন এগুলো চাষের জন্য কিন্তু হয়নি। সেই সমযে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সাথে রবীন্দ্রনাথে খুব বন্ধুত্ব ছিল। ডি.এল. রায় কৃষি বিভাগে ছিলেন এবং তিনি নানাভাবে পরামর্শ দিয়েছেন কৃষির উন্নতির ব্যাপারে। যে চেষ্টাটা তিনি এখানে শুরু করেছিলেন তার ফল পুরোপুরি পান নি, তা তিনি শেষও করতে পারেন নি। শ্রীনিকেতনে গিয়ে সেটির প্রয়োগ করেছিলেন এবং সেখানে অনেকখানি তিনি সার্থক হতে পেরেছিলেন।

  4. কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর says:

    অতীব চমৎকার আয়োজন–এর লেখক ফরিদ আহমেদ ও অভিজিৎ রায়কে অজস্র শুভেচ্ছা। এ জন্য আর্টস বিডিনিউজের যথাজন যথাযথ শুভকামনা পাওয়ার দাবিদার।

    এ লেখাটিতে রবিঠাকুর কর্তৃক প্রজাপীড়ন, অপরের ধন নিজের নামে করার ইতিহাস, সবকিছুর উপর পয়গম্বরত্ব জারি সম্পর্কে কথাবার্তা আছে। তবে আরও কিছু বিষয়ে আরও তথ্যবহুল হওয়া দরকার ছিল। যেমন, লালন বা অন্য বাউলদের সাথে তিনি যোগাযোগই শুধু করেননি, তৎসময়ের লালনভক্তদের এমন একটা অভিযোগ ছিল যে রবিঠাকুর লালনের একটা গানের খাতা নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেননি। রবিঠাকুর বা জ্যোতিরিন্দ্রনাথরা তাদের ব্রাহ্মধমের্র স্বার্থেই বাউলসঙ্গীত সংগ্রহ করতেন। তাদের ব্রাহ্মত্বের ব্রহ্মসাধনার সাথে এসবের যোগ করতেন। কিন্তু তা তারা খুব একটা স্বীকার করতেন না।

    এমনও জানা যায় যে, রবিঠাকুর তার জমিদারির শুরুতে যে খাজনা দিতেন, সেটা তার জীবনসায়াহ্নে প্রায় দশগুণ বেড়ে যায়। মানে তিনি দুনিয়াদারিতেও ছিলেন পাকা ওস্তাদ।

    ফাহিমের প্রতিক্রিয়াটিও বেশ চিত্তাকর্ষক। তবে তাতে কিছু বিষয় যোগ করতে চাই, তিনি নাইট উপাধি পরিত্যাগ করেছিলেন ঠিকই, তবে তা করতে ১৯ দিন লেগেছিল। তার প্রতিবাদপত্রে বড়ো ইংরেজদের কাজের প্রশংসা করেছিলেন অতি কৌশলে। তিনি তার প্রতিবাদে লোকাল প্রশাসনের উপর সমস্ত দায়ভার চাপিয়েছিলেন, শাসক-ইংরেজদের প্রশংসাই করেছিলেন। রবিঠাকুর সিপাহী বিদ্রোহ নিয়ে কিছু বলেননি তা কিন্তু সঠিক নয়। গোরা নামের উপন্যাসে একে তিনি ‘মিউটিনি’ বলেছিলেন। এবং এর জাতকই গোরা, যিনি ছিলেন ইংরেজজাতক। ভারত, ব্রাহ্মধর্ম, এমনকি ভারতের মুক্তির দিশারী করেছিলেন এই গোরাকে। গোরাকে যে কুড়িয়ে পায় সে তো কোনো হিন্দু, নমঃশূদ্র বা মুসলমান নয়, সে ইউরোপিয়ান।

    যাই হোক, রবীন্দ্রবন্দনার এই যুগে এটি খুবই প্রয়োজনীয় লেখা।

  5. ভজন সরকার says:

    যে রবীন্দ্রনাথকে পড়া এক জীবনে কারো পক্ষে সম্ভব নয়, তারঁ সামগ্রিক সমালোচনা করা সে তো বিশালত্বের একবিন্দুকে ছোঁয়ার প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়| অভিজিৎ আর ফরিদ তাদের দ্বৈত প্রচেষ্টায় সেটা করতে চেয়েছেন আন্তরিকভাবেই| লেখকদ্বয়কে ধন্যবাদ সে জন্যে|

    আলোচনা শুরুর আগে এ প্রবন্ধটিতে যে দু’টো ত্রুটি আছে বলে আমি মনে করি সেগুলো আগে বলে নেই| প্রথম ত্রুটি, এই লেখার প্রায় সবগুলো উদ্ধৃতিই অন্যের কাছ থেকে ধার নেয়া; কোথাও রবীন্দ্রনাথ থেকে সরাসরি নেয়া নয়| অর্থাৎ এই প্রবন্ধটি অসংখ্য রবীন্দ্র সমালোচকের রচনার সন্নিবেশ| শুধু সমালোচনা পড়ে এ ধরনের প্রবন্ধ লেখা মহাঝুঁকিপূর্ণ| যেটা আবুল আহসান চোধুরীর বাঁকবদল থেকেই বোঝা যায়| ড. আহমদ শরীফও একদার কট্টর রবীন্দ্রসমালোচক থেকে কিছুটা হলেও পরবর্তীতে সরে এসেছিলেন–যা আমি পরে বলছি| আর নীরদচন্দ্র চৌধুরী এক রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই যে বিচিত্র ভিন্ন কথা বলেছেন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সেটা আলোচনা করলেও এক বিশাল বই লিখতে হবে| আমি তা থেকেও কিছু উদ্ধৃতি দেবো|

    আর দ্বিতীয় ত্রুটি, যেটা আমি মনে করি লেখকদ্বয় তাদের পরবর্তী প্রবন্ধে বলবেন| আর তা হলো, কারা রবীন্দ্রনাথকে “মানব থেকে প্রথমে মহামানব, পরে দেবতা বানিয়ে” ফেলেছেন তা বলা| তা না বললে এ প্রবন্ধটি লেখার সারসত্তা কোথায়? সংখ্যা বিচারে বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের মধ্যে রবীন্দ্রপূজারীদের চেয়ে রবীন্দ্রবিরোধীদের সংখ্যা কি কম? পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলন থেকে বাম-জমানার প্রায় সবখানেই তো রবীন্দ্রনাথকে বংশদণ্ড বানিয়ে পাথর মারার প্রচেষ্টা হয়েছে| পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথকে রাষ্ট্রীয়ভাবেই প্রতিপক্ষ বানানো হয়েছে অসংখ্যবার| আর বাংলাদেশের মাকসুদের মতো কোনো শিল্পীর রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মশকরা করা যে স্রেফ নিজের আত্মপ্রচার ছাড়া আর কিছু নয়, সেটা লেখকদ্বয়ও বেশ ভালোভাবেই জানেন হয়তো| তবু এ প্রবন্ধে সে প্রসঙ্গ টেনে আনায় প্রবন্ধটির মানহানি ঘটেছে বলেই আমি মনে করি|

    এ প্রবন্ধটি নানা বাহুল্য এবং বিপরীত উক্তিতে ভরা| যেমন, ”দুঃখজনক হলেও এটা সত্যি যে, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এত বছর পরেও রবীন্দ্র মূল্যায়ন সঠিকভাবে হয় নি।“ অথচ প্রবন্ধটির ভূমিকা এবং প্রথমদিককার বেশিরভাগ অংশই ড. আহমদ শরীফের ‘রবীন্দ্রোত্তর তৃতীয় প্রজন্মে রবীন্দ্র মূল্যায়ন’ প্রবন্ধ থেকে ভাব ধার করে নেয়া| তা হলে “রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এত বছর পরেও রবীন্দ্র মূল্যায়ন সঠিকভাবে হয় নি” কীভাবে? ড. আহমদ শরীফের প্রবন্ধটি পড়লে এই প্রবন্ধটি পড়ার প্রয়োজনীয়তা থাকে না| কারণ, এই প্রবন্ধে বাড়তি যে অংশটা আছে, তা নিতান্তই লেখকদ্বয়ের মনগড়া| রবীন্দ্রনাথকে দার্শনিক বা বিজ্ঞানী বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন কে, কবে? কারো উদ্ধৃতি না দিয়ে সরাসরি লেখকের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দেয়াই সমীচিন| ড. আহমদ শরীফ ‘রবীন্দ্রোত্তর তৃতীয় প্রজন্মে রবীন্দ্র মূল্যায়ন’ প্রবন্ধ শেষ করেছেন এভাবে, ”স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথকে এবং বিষয়ী ও সমাজ-সদস্য ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথকে সব সময় অভিন্ন করে দেখা অযৌক্তিক ও অসঙ্গত|” আলোচ্য প্রবন্ধে সেই অসঙ্গতিটিকেই অভিন্ন করে দেখানোর প্রচেষ্টা হয়েছে বলে আমি মনে করি| এ প্রবন্ধ থেকে বলছি, “যারা মনে করেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন দারুণ বিজ্ঞানমনস্ক, আইনস্টাইনের চেয়েও বিজ্ঞান ভাল বুঝতেন, তাদের দেখানো দরকার রবীন্দ্রনাথ তার জীবনে কীভাবে প্ল্যানচেটে বিশ্বাস করেছেন, কীভাবে হোমিওপ্যাথির মত অপবিজ্ঞানকে শুধু বিশ্বাসই করেননি, নিজেও হাতুরে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছেন।“–এটা কে বা কারা মনে করেন, প্রবন্ধে সেটা উল্লেখ আছে কি?

    নীরদচন্দ্র চৌধুরী রবীন্দ্রনাথ নিয়ে নানা সময়ে নানা রকম কথা বলেছেন, তাই এ নিয়ে আলোচনা করে সময় ক্ষেপণ না করাই ভালো| তবে রবীন্দ্রনাথের ‘একরাত্রি’ গল্পের সতীশ আর সুচরিতার মতো করেই যে তিনি জীবনাতিপাত করতে চেয়েছিলেন এবং করেছেনও সেটা তিনি শেষ জীবনে “অক্ষমের ক্ষমতা“ প্রবন্ধে বলেছেন, ”আমিও বাল্যকাল থেকেই এইরূপ মনোভাবই পোষণ করি|” এ রকম অসংখ্য উদ্ধৃতি আছে নীরদচন্দ্র চৌধুরী রচনায়|

    আর হুমায়ুন আজাদের স্ব-বিরোধীতার শুধু একটা উদাহরণ দেই| বুদ্ধদেব বসু সম্পাদনা করলেন আধুনিক বাংলা কবিতা (১৯৫৪) রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে| হুমায়ুন আজাদ তার আধুনিক বাংলা কবিতা সম্পাদনায় রবীন্দ্রনাথকে বাদ রেখে বললেন, ”রবীন্দ্রনাথ মহত কবি সন্দেহ নেই, আর এতেও সন্দেহ নেই যে তিনি আধুনিক নন, রোমান্টিক; তাই তিনি স্থান পেতে পারেন না আধুনিক বাংলা কবিতার সংগ্রহে|” হুমায়ুন আজাদ বললেন না রবীন্দ্রনাথ আধুনিক নন কেন| বললেন রোমান্টিক, তাই আধুনিক নন| অথচ অসংখ্য রোমান্টিক কবিতা এবং কবিদের স্থান দিলেন এই সংকলনে| আল মাহমুদ সহ আরো অনেককে বাদ দিলেন মৌলবাদ আর প্রতিক্রিয়াশীলদের দোসর চিহ্নিত করে, অথচ কবিতা নিলেন অনেক মৌলবাদী আর প্রতিক্রিয়াশীলদের সহযোদ্ধা ও দোসরদের |

  6. কুলদা রায় says:

    ২. ফরিদ আহমদ এবং অভিজিৎ রায় রবীন্দ্রনাথকে চোর ঠাউরেছেন দুটো অভিযোগ তুলে। এক. তিনি গগণ হরকরার গান চুরি করে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি গানটি রচনা করেছেন।
    দুই. বিশ্বপরিচয় নামে একখানি বই প্রমথনাথের রচনা–তিনি সেটি রাহাজানি করে নিজের নামের চালিয়েছেন।
    আরও কিছু অভিযোগ আছে। সেগুলো পরে সময় পেলে আলাপ তোলা যাবে।

    প্রথমে শুরু করা যাক রবীন্দ্রনাথের রাহাজানি বিষয়ে।
    ———————————————————–
    দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রনাথ ও বিজ্ঞান নামে একটি বই আছে। বইটির অষ্টম অধ্যায়ের নাম ‘বিশ্বপরিচয়’। সূচি: ৮.১. জনৈক অব্যবসায়ী ও তাঁর তরুণ সাহায্যকারী। ৮.২. বিজ্ঞানগ্রন্থ রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ। ৮.৩. ভাষা এবং রচনাশৈলী। ৮.৪. বিশ্বপরিচয় এবং বিজ্ঞানশিক্ষক রবীন্দ্রনাথ। ৮.৫ বিজ্ঞান সাহিত্য হিসাবে বিশ্বপরিচয়–এর স্থান। ৮.৬ বিশ্বপরিচয় এবং রবীন্দ্রনাথের বিশ্বদৃষ্টি। মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা–২৭৩ থেকে ৩০৬। ৩১১ এবং ৩১২ পৃষ্ঠায় এই অধ্যায়ের তথ্যসূত্র হিসাবে উল্লেখপঞ্জী। সর্বমোট ৩৯টি পৃষ্ঠায় বিশ্বপরিচয় বিষয়ে সকল প্রকার তথ্যই এখানে দেওয়া আছে। এই তথ্যগুলো থেকে বাছাই করে ফরিদ আহমেদ এবং অভিজিৎ রায় রবীন্দ্রনাথের রাহাজানির গল্পটি ফেঁদেছেন। এ বিষয়ে লেখকদ্বয় আর কোনো বই পড়েননি। যারা বইটির এই অধ্যায়টি পড়বেন–ফরিদ আহমেদ এবং অভিজিৎ রায় এখান থেকেই তথ্যসমূহ টুকে নিয়েছেন। নিজেরা কোনো গবেষণা করেননি। তাদের মন্তব্য হিসাবে যুক্ত করেছেন–শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে রাহাজানির অভিযোগ তোলা। তাদের মত করে কট্টরবাদি যুক্তিবাদের প্রয়োগ করে বলা যেতে পারে–দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের বইটির বিশ্বপরিচয় অধ্যায়টি থেকে তথ্য অভিজিৎ রায় এবং ফরিদ আহমেদ চুরি ও রাহাজানি করেছেন।

    কিন্তু দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের বইটির পড়লে বোঝা যায়–অভিজিৎ রায় এবং ফরিদ আহমেদ তথ্য চু্রি এবং রাহাজানি করেছেন বটে–কিন্তু দুধের পানিটুকু নিয়েছেন–কিন্তু সরটুকু নেননি। নির্মোহভাবে তারা যদি অধ্যায়টি পড়তেন–এবং সকল তথ্য বিশ্লেষণ করতেন, তাহলে কখনোই রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বই চুরির ও রাহাজানির অভিযোগ তোলা অসম্ভব হত।

    তাহলে বিশ্বপরিচয়ে ঢোকা যাক–
    ——————————————
    রবীন্দ্রনাথ লোকশিক্ষার জন্য বিজ্ঞানগ্রন্থমালা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ বিষয়ে শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষক জগদানন্দ রায় (১৮৬৯–১৯৩৩) রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণায় এবং রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আদর্শে সরল বাংলায় বিজ্ঞানের বই রচনা করেন। তার বইগুলোর অন্যতম–বাংলার পাখি, বাংলার পোকামাকড় ইত্যাদি। বইগুলো জনপ্রিয় হয়েছিল।
    বিশ্বভারতীর পদার্থবিদ্যার শিক্ষক প্রমথনাথ সেনগুপ্তকে রবীন্দ্রনাথ কিছু বইপত্র দেন। ‘বিশ্বপরিচয়’ নামে একটি বই লিখতে তাঁকে দায়িত্ব দেন।

    বিশ্বপরিচয় বইটি লিখতে প্রমথনাথকে রবীন্দ্রনাথ পড়তে দেন–
    ১. জিনস-এর থ্রু স্পেস এনড টাইম
    ২. এডিংটনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি বই।
    এবং লেখার শুরুতেই নক্ষত্রলোক নিয়ে একটি মনোজ্ঞ আলোচনা করেন।
    এসব আলোচনায় ক্ষিতিমোহন সেন এবং বিধুশেখর শাস্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সে সময় জর্জ গ্রের নিউ ওয়ার্ল্ড বইটির সাহায্য নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।
    লেখার উদ্দেশ্য বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রমথনাথকে বলেছেন–
    ———————————————–
    ১. বইটির রচনার ভাষাকে হতে হবে সহজ সরল।
    ২. যথাসম্ভব পরিভাষা বর্জিত।
    ৩.অথচ তার মধ্যে বিষয়বস্তুর দৈন্য থাকবে না।
    ৪. এই রচনা শিক্ষণীয় নানা বিষয়কে বাংলাদেশের সর্বসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মত হতে হবে।

    প্রমথনাথ সেনগুপ্ত তাঁর আনন্দরূপমে লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ বলেন–’গল্প এবং কবিতা বাংলাভাষাকে অবলম্বন করে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে অশিক্ষিত ও অল্পশিক্ষিত মনে মননশক্তির দুর্বলতা এবং চারিত্রিক শৈথিল্য ঘটবার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে।
    এর প্রতিকারের জন্য সর্বাঙ্গীন শিক্ষা অচিরাৎ আবশ্যক। বুদ্ধিকে মোহমুক্ত ও সতর্ক করবার জন্য প্রধান প্রয়োজন বিজ্ঞানচর্চার। লোকশিক্ষা গ্রন্থ প্রকাশে তার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে।’
    এ ভাবনা থেকেই রবীন্দ্রনাথ লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা প্রকাশের ব্যবস্থা করেন।

    রবীন্দ্রনাথ প্রমথনাথকে বলেন, সাধারণ জ্ঞানের সহজবোধ্য ভূমিকা করে দেওয়াই হবে তোমার কাজের উদ্দেশ্য। তাই, জ্ঞানের এই পরিবেশকার্যে পাণ্ডিত্য যথাসাধ্য বর্জন করতে হবে।

    রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞান বিষয়ক রচনাকে জনপ্রিয় করার জন্য ভাষাকে এবং সাহিত্যকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই বিজ্ঞান বিষয়টি কোনো বিশেষজ্ঞকে দেখানোর আগে এমন একজনকে পড়তে দিতে হবে, যিনি বিজ্ঞানের কিছুই জানেন না। তিনি এজন্য বাংলা ও সংস্কৃত ভাষার অধ্যাপক গোঁসাইজীর নাম করেন। গোঁসাইজী যদি খসড়া রচনা পড়ে বিষয়টি বুঝতে পারেন তবে–সেটা গ্রহণীয় হবে।

    প্রমথনাথকে রবীন্দ্রনাথ বইটির একটি পরিকল্পনা তৈরি করে দেন। সে ছক মোতাবেক প্রমথনাথ বইগুলো পড়ে একটি অধ্যায় লিখে রবীন্দ্রনাথকে দেখান। সেটা পড়ে পরমাণুলোক অধ্যায় কীভাবে লিখতে হবে তার ভাষার সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা রবীন্দ্রনাথ প্রমথনাথের কিছু অংশ লিখিত পাণ্ডুলিপির গায়ে লিখে দেন।

    প্রমথনাথ সেনগুপ্ত শিক্ষক হিসাবে জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু বাংলা ভাষায় রচনাকর্মে দুর্বল ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তার পাণ্ডুলিপির প্রথম পর্ব পড়ে বুঝতে পারলেন–তার পরিকল্পনা অনুসারে প্রমথনাথ বইটি লিখতে পারছেন না। সেটা এক ধরনের গুরুগম্ভীর অনুবাদ হয়ে যাচ্ছে।
    রবীন্দ্রনাথ প্রমথনাথের প্রথম পর্বটা পড়ে বুঝলেন–প্রথমনাথ লেখক হিসাবে দুর্বল। তখন তিনি কীভাবে লিখতে হবে সেটা বলে দিলেন। সেটা অনুসরণ করেও যখন লেখাটি রবীন্দ্রনাথের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী পাণ্ডুলিপি হচ্ছে না তখন তাকে রবীন্দ্রনাথ লেখা বন্ধ করে দিতে বলতে পারতেন। সেটা করেননি। তিনি তাকে লিখে যেতে বললেন। উদ্দেশ্য–তাকে লেখার তালিম দেওয়া। কী করে লেখা শেখা যায়–সে বিষয়ে তাকে হাতে কলমে শেখানো। তিনি জানেন, লেখা শিখলে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানশিক্ষার কাজে লাগবে। এভাবে তিনি অনেককেই লেখক হিসাবে তৈরি করেছেন। ধীরে ধীরে প্রমথনাথ লেখায় উন্নতি করলেও তা রবীন্দ্রনাথের নিজের ফিলসফির মত হয়ে ওঠে নি। সেজন্য রবীন্দ্রনাথই নিজের মত করে বইটি আবার লিখেছেন।

    চার বছর ধরে রবীন্দ্রনাথ তার বিশ্বপরিচয় বইটি লিখেছেন। অন্তত ছয় বছর রবীন্দ্রনাথ এই কাজে জড়িত ছিলেন। লেখাটি শেষ করেছেন আলমোড়ায়। তখন রবীন্দ্রনাথের বিশ্বপরিচয় বইটি এবং প্রমথনাথের পাণ্ডুলিপিটি পড়ে বিশেষজ্ঞগণ জানালেন–একই বিষয়ে দুটো দুরকম বই হয়েছে এই দু লেখকের। সুতরাং প্রমথনাথের বইটি পৃথ্বিপরিচয় নামে প্রমথনাথের নামে প্রকাশ করা হল। এবং রবীন্দ্রনাথের বইটি বিশ্বপরিচয় নামে রবীন্দ্রনাথের নামেই প্রকাশ হল। বিশ্বপরিচয় প্রথম প্রকাশিত হয়–১৩৪৪ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে। পঞ্চম সংস্করণ হয় পৌষ ১৩৪৬-এ। এই দুই বছর সময় ধরে তার পরিমার্জনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের স্বভাব অনুসারে ঘষে মেজে নতুন করে তুলেছেন প্রতি সংস্করণেই।

    এজন্য এ সময় আরও কয়েকটি বই রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছে––
    ১. দি ইউনিভার্সেস সার্ভেয়ড
    ২. নারায়ণস ডায়েরি–রাধারমণ ব্যানার্জি
    এই সব বই সংগ্রহ করেছেন প্রথম প্রকাশের পর। অন্যান্য সংস্করণে সেগুলো থেকে তথ্য নিয়ে রবীন্দ্রনাথ পরিমার্জন, সংযোজন করেছেন বিশ্বপরিচয়কে।

    বিশ্বপরিচয়ে ৩টি জিনিস আছে–
    ————————————–
    ১. বিজ্ঞান বিষয়ক তথ্য যা বিদেশী বই থেকে সংগৃহীত। বইগুলি রবীন্দ্রনাথ সংগ্রহ করেছেন। পড়েছেন।
    ২. জনপ্রিয় বিজ্ঞান বিষয়ক তথ্যের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নিজের ফিলসফি।
    ৩. রবীন্দ্রনাথের ভাষা।

    প্রমথনাথের বইতে আছে–
    ——————————-
    ১) বিজ্ঞান বিষয়ক তথ্য যা বিদেশী বই থেকে সংগৃহীত।
    ২) নিজের কোনো দর্শন আলোচনা তিনি করেন নাই।
    ৩) তার ভাষাটিও পোক্ত নয়।

    রবীন্দ্রনাথের বিশ্বপরিচয়ের ভূমিকা–
    —————————————-
    শ্রীযুক্ত সত্যেন্দ্রনাথ বসু
    প্রীতিভাজনেষু
    এই বইখানি তোমার নামের সঙ্গে যুক্ত করছি। বলা বাহুল্য, এর মধ্যে এমন বিজ্ঞানসম্পদ নেই যা বিনা সংকোচে তোমার হাতে দেবার যোগ্য। তা ছাড়া, অনধিকারপ্রবেশে ভুলের আশঙ্কা করে লজ্জা বোধ করছি, হয়তো তোমার সম্মান রক্ষা করাই হল না।
    কয়েকটি প্রামাণ্য গ্রন্থ সামনে রেখে সাধ্যমতো নিড়ানি চালিয়েছি। কিছু ওপড়ানো হল। যাই হোক আমার দুঃসাহসের দৃষ্টান্তে যদি কোনো মনীষী, যিনি একাধারে সাহিত্যরসিক ও বিজ্ঞানী, এই অত্যাবশ্যক কর্তব্যকর্মে নামেন তা হলে আমার এই চেষ্টা চরিতার্থ হবে।
    শিক্ষা যারা আরম্ভ করেছে, গোড়া থেকেই বিজ্ঞানের ভাণ্ডারে না হোক, বিজ্ঞানের আঙিনায় তাদের প্রবেশ করা অত্যাবশ্যক। এই জায়গায় বিজ্ঞানের সেই প্রথমপরিচয় ঘটিয়ে দেবার কাজে সাহিত্যের সহায়তা স্বীকার করলে তাতে অগৌরব নেই। সেই দায়িত্ব নিয়েই আমি এ কাজ শুরু করেছি। কিন্তু এর জবাবদিহি একা কেবল সাহিত্যের কাছেই নয়, বিজ্ঞানের কাছেও বটে। তথ্যের যাথার্থ্যে এবং সেটাকে প্রকাশ করবার যাথাযথ্যে বিজ্ঞান অল্পমাত্রও স্খলন ক্ষমা করে না। অল্প সাধ্যসত্ত্বেও যথাসম্ভব সতর্ক হয়েছি। বস্তুত আমি কর্তব্যবোধে লিখেছি কিন্তু কর্তব্য কেবল ছাত্রের প্রতি নয় আমার নিজের প্রতিও। এই লেখার ভিতর দিয়ে আমার নিজেকেও শিক্ষা দিয়ে চলতে হয়েছে। এই ছাত্রমনোভাবের সাধনা হয়তো ছাত্রদের শিক্ষাসাধনার পক্ষে উপযোগী হতেও পারে।
    আমার কৈফিয়তটা তোমার কাছে একটু বড়ো করেই বলতে হচ্ছে, তা হলেই এই লেখাটি সম্বন্ধে আমার মনস্তত্ত্ব তোমার কাছে স্পষ্ট হতে পারবে।
    বিশ্বজগৎ আপন অতিছোটোকে ঢাকা দিয়ে রাখল, অতিবড়োকে ছোটো করে দিল, কিংবা নেপথ্যে সরিয়ে ফেলল। মানুষের সহজ শক্তির কাঠামোর মধ্যে ধরতে পারে নিজের চেহারাটাকে এমনি করে সাজিয়ে আমাদের কাছে ধরল। কিন্তু মানুষ আর যাই হোক সহজ মানুষ নয়। মানুষ একমাত্র জীব যে আপনার সহজ বোধকেই সন্দেহ করেছে, প্রতিবাদ করেছে, হার মানাতে পারলেই খুশি হয়েছে। মানুষ সহজশক্তির সীমানা ছাড়াবার সাধনায় দূরকে করেছে নিকট, অদৃশ্যকে করেছে প্রত্যক্ষ দুর্বোধকে দিয়েছে ভাষা। প্রকাশলোকের অন্তরে আছে যে অপ্রকাশলোক, মানুষ সেই গহনে প্রবেশ করে বিশ্বব্যাপারের মূলরহস্য কেবলই অবারিত করছে। যে সাধনায় এটা সম্ভব হয়েছে তার সুযোগ ও শক্তি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষেরই নেই। অথচ যারা এই সাধনার শক্তি ও দান থেকে একেবারেই বঞ্চিত হল তারা আধুনিক যুগের প্রত্যন্তদেশে একঘরে হয়ে রইল।
    বড়ো অরণ্যে গাছতলায় শুকনো পাতা আপনি খসে পড়ে, তাতেই মাটিকে করে উর্বরা। বিজ্ঞানচর্চার দেশে জ্ঞানের টুকরো জিনিসগুলি কেবলই ঝরে ঝরে ছড়িয়ে পড়ছে। তাতে চিত্তভূমিতে বৈজ্ঞানিক উর্বরতার জীবধর্ম জেগে উঠতে থাকে। তারই অভাবে আমাদের মন আছে অবৈজ্ঞানিক হয়ে। এই দৈন্য কেবল বিদ্যার বিভাগে নয়, কাজের ক্ষেত্রে আমাদের অকৃতার্থ করে রাখছে।
    আমাদের মতো আনাড়ি এই অভাব অল্পমাত্র দূর করবার চেষ্টাতেও প্রবৃত্ত হলে তারাই সব চেয়ে কৌতুক বোধ করবে যারা আমারই মতো আনাড়ির দলে। কিন্তু আমার তরফে সামান্য কিছু বলবার আছে। শিশুর প্রতি মায়ের ঔৎসুক্য আছে কিন্তু ডাক্তারের মতো তার বিদ্যা নেই। বিদ্যাটি সে ধার করে নিতে পারে কিন্তু ঔৎসুক্য ধার করা চলে না। এই ঔৎসুক্য শুশ্রূষায় যে-রস জোগায় সেটা অবহেলা করবার জিনিস নয়।
    আমি বিজ্ঞানের সাধক নই সে কথা বলা বাহুল্য। কিন্তু বালককাল থেকে বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে আমার লোভের অন্ত ছিল না। আমার বয়স বোধ করি তখন নয়-দশ বছর; মাঝে মাঝে রবিবারে হঠাৎ আসতেন সীতানাথ দত্ত [ ঘোষ ] মহাশয়। আজ জানি তাঁর পুঁজি বেশি ছিল না, কিন্তু বিজ্ঞানের অতি সাধারণ দুই-একটি তত্ত্ব যখন দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিতেন আমার মন বিস্ফারিত হয়ে যেত। মনে আছে আগুনে বসালে তলার জল গরমে হালকা হয়ে উপরে ওঠে আর উপরের ঠাণ্ডা ভারী জল নীচে নামতে থাকে, জল গরম হওয়ার এই কারণটা যখন তিনি কাঠের গুঁড়োর যোগে স্পষ্ট করে দিলেন, তখন অনবচ্ছিন্ন জলে একই কালে যে উপরে নীচে নিরন্তর ভেদ ঘটতে পারে তারই বিস্ময়ের স্মৃতি আজও মনে আছে। যে ঘটনাকে স্বতই সহজ বলে বিনা চিন্তায় ধরে নিয়েছিলুম সেটা নয় এই কথাটা বোধ হয় সেই প্রথম আমার মনকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তার পরে বয়স তখন হয়তো বারো হবে (কেউ কেউ যেমন রঙ-কানা থাকে আমি তেমনি তারিখ-কানা এই কথাটি বলে রাখা ভালো) পিতৃদেবের সঙ্গে গিয়েছিলুম ড্যালহৌসি পাহাড়ে। সমস্ত দিন ঝাঁপানে করে গিয়ে সন্ধ্যাবেলায় পৌঁছতুম ডাকবাংলায়। তিনি চৌকি আনিয়ে আঙিনায় বসতেন। দেখতে দেখতে, গিরিশৃঙ্গের বেড়া-দেওয়া নিবিড় নীল আকাশের স্বচ্ছ অন্ধকারে তারাগুলি যেন কাছে নেমে আসত। তিনি আমাকে নক্ষত্র চিনিয়ে দিতেন, গ্রহ চিনিয়ে দিতেন। শুধু চিনিয়ে দেওয়া নয়, সূর্য থেকে তাদের কক্ষচক্রের দূরত্বমাত্রা, প্রদক্ষিণের সময় এবং অন্যান্য বিবরণ আমাকে শুনিয়ে যেতেন। তিনি যা বলে যেতেন তাই মনে করে তখনকার কাঁচা হাতে আমি একটা বড়ো প্রবন্ধ লিখেছি। স্বাদ পেয়েছিলুম বলেই লিখেছিলুম, জীবনে এই আমার প্রথম ধারাবাহিক রচনা, আর সেটা বৈজ্ঞানিক সংবাদ নিয়ে।
    তার পরে বয়স আরো বেড়ে উঠল। ইংরেজি ভাষা অনেকখানি আন্দাজে বোঝবার মতো বুদ্ধি তখন আমার খুলেছে। সহজবোধ্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই যেখানে যত পেয়েছি পড়তে ছাড়ি নি। মাঝে মাঝে গাণিতিক দুর্গমতায় পথ বন্ধুর হয়ে উঠেছে, তার কৃচ্ছ্রতার উপর দিয়ে মনটাকে ঠেলে নিয়ে গিয়েছি। তার থেকে একটা এই শিক্ষা লাভ করেছি যে, জীবনে প্রথম অভিজ্ঞতার পথে সবই যে আমরা বুঝি তাও নয় আর সবই সুস্পষ্ট না বুঝলে আমাদের পথ এগোয় না এ কথাও বলা চলে না। জলস্থল-বিভাগের মতোই আমরা যা বুঝি তার চেয়ে না বুঝি অনেক বেশি, তবুও চলে যাচ্ছে এবং আনন্দ পাচ্ছি। কতক পরিমাণে না-বোঝাটাও আমাদের এগোবার দিকে ঠেলে দেয়। যখন ক্লাসে পড়াতুম এই কথাটা আমার মনে ছিল। আমি অনেক সময়েই বড়োবয়সের পাঠ্যসাহিত্য ছেলেবয়সের ছাত্রদের কাছে ধরেছি। কতটা বুঝেছে তার সম্পূর্ণ হিসাব নিই নি, হিসাবের বাইরেও তারা একরকম করে অনেকখানি বোঝে যা মোটে অপথ্য নয়। এই বোধটা পরীক্ষকের পেনসিলমার্কার অধিকারগম্য নয় কিন্তু এর যথেষ্ট মূল্য আছে। অন্তত আমার জীবনে এইরকম পড়ে-পাওয়া জিনিস বাদ দিলে অনেকখানিই বাদ পড়বে।
    জ্যোতির্বিজ্ঞানের সহজ বই পড়তে লেগে গেলুম। এই বিষয়ের বই তখন কম বের হয় নি। স্যার রবর্ট বল-এর বড়ো বইটা আমাকে অত্যন্ত আনন্দ দিয়েছে। এই আনন্দের অনুসরণ করবার আকাঙ্ক্ষায় নিউকো‌ম্ব্স, ফ্লামরিয়ঁ প্রভৃতি অনেক লেখকের অনেক বই পড়ে গেছি – গলাধঃকরণ করেছি শাঁসসুদ্ধ বীজসুদ্ধ। তার পরে এক সময়ে সাহস করে ধরেছিলুম প্রাণতত্ত্ব সম্বন্ধে হক্সলির এক সেট প্রবন্ধমালা। জ্যোতির্বিজ্ঞান আর প্রাণবিজ্ঞান কেবলই এই দুটি বিষয় নিয়ে আমার মন নাড়াচাড়া করেছে। তাকে পাকা শিক্ষা বলে না, অর্থাৎ তাতে পাণ্ডিত্যের শক্ত গাঁথুনি নেই। কিন্তু ক্রমাগত পড়তে পড়তে মনের মধ্যে বৈজ্ঞানিক একটা মেজাজ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। অন্ধবিশ্বাসের মূঢ়তার প্রতি অশ্রদ্ধা আমাকে বুদ্ধির উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে আশা করি অনেক পরিমাণে রক্ষা করেছে। অথচ কবিত্বের এলাকায় কল্পনার মহলে বিশেষ যে লোকসান ঘটিয়েছে সে তো অনুভব করি নে।
    আজ বয়সের শেষপর্বে মন অভিভূত নব্যপ্রাকৃততত্ত্বে – বৈজ্ঞানিক মায়াবাদে। তখন যা পড়েছিলুম তার সব বুঝি নি। কিন্তু পড়ে চলেছিলুম। আজও যা পড়ি তার সবটা বোঝা আমার পক্ষে অসম্ভব, অনেক বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতের পক্ষেও তাই।
    বিজ্ঞান থেকে যাঁরা চিত্তের খাদ্য সংগ্রহ করতে পারেন তাঁরা তপস্বী। – মিষ্টান্নমিতরে জনাঃ, আমি রস পাই মাত্র। সেটা গর্ব করবার মতো কিছু নয়, কিন্তু মন খুশি হয়ে বলে যথালাভ। এই বইখানা সেই যথালাভের ঝুলি, মাধুকরী বৃত্তি নিয়ে পাঁচ দরজা থেকে এর সংগ্রহ।
    পাণ্ডিত্য বেশি নেই সুতরাং সেটাকে বেমালুম করে রাখতে বেশি চেষ্টা পেতে হয় নি। চেষ্টা করেছি ভাষার দিকে। বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ শিক্ষার জন্যে পারিভাষিকের প্রয়োজন আছে। কিন্তু পারিভাষিক চর্ব্যজাতের জিনিস। দাঁত-ওঠার পরে সেটা পথ্য। সেই কথা মনে করে যতদূর পারি পরিভাষা এড়িয়ে সহজ ভাষার দিকে মন দিয়েছি।
    এই বইখানিতে একটি কথা লক্ষ্য করবে – এর নৌকোটা অর্থাৎ এর ভাষাটা যাতে সহজে চলে সে চেষ্টা এতে আছে কিন্তু মাল খুব বেশি কমিয়ে দিয়ে একে হালকা করা কর্তব্য বোধ করি নি। দয়া করে বঞ্চিত করাকে দয়া বলে না। আমার মত এই যে, যাদের মন কাঁচা তারা যতটা স্বভাবত পারে নেবে, না পারে আপনি ছেড়ে দিয়ে যাবে, তাই বলে তাদের পাতটাকে প্রায় ভোজ্যশূন্য করে দেওয়া সদ্‌ব্যবহার নয়। যে-বিষয়টা শেখবার সামগ্রী, নিছক ভোগ করবার নয়, তার উপর দিয়ে অবাধে চোখ বুলিয়ে যাওয়াকে পড়া বলা যায় না। মন দেওয়া এবং চেষ্টা করে বোঝাটাও শিক্ষার অঙ্গ, সেটা আনন্দেরই সহচর। নিজের যে-শিক্ষার চেষ্টা বাল্যকালে নিজের হাতে গ্রহণ করেছিলুম তার থেকে আমার এই অভিজ্ঞতা। এক বয়সে দুধ যখন ভালোবাসতুম না, তখন গুরুজনদের ফাঁকি দেবার জন্যে দুধটাকে প্রায় আগাগোড়া ফেনিয়ে বাটি ভরতি করার চক্রান্ত করেছি। ছেলেদের পড়বার বই যাঁরা লেখেন, দেখি তাঁরা প্রচুর পরিমাণে ফেনার জোগান দিয়ে থাকেন। এইটে ভুলে যান, জ্ঞানের যেমন আনন্দ আছে তেমনি তার মূল্যও আছে, ছেলেবেলা থেকে মূল্য ফাঁকি দেওয়া অভ্যাস হতে থাকলে যথার্থ আনন্দের অধিকারকে ফাঁকি দেওয়া হয়। চিবিয়ে খাওয়াতেই একদিকে দাঁত শক্ত হয় আর-একদিকে খাওয়ার পুরো স্বাদ পাওয়া যায়, এ বই লেখবার সময়ে সে কথাটা সাধ্যমতো ভুলি নি।
    শ্রীমান প্রমথনাথ সেনগুপ্ত এম. এসসি. তোমারই ভূতপূর্ব ছাত্র। তিনি শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান-অধ্যাপক। বইখানি লেখবার ভার প্রথমে তাঁর উপরেই দিয়েছিলেম। ক্রমশ সরে সরে ভারটা অনেকটা আমার উপরেই এসে পড়ল। তিনি না শুরু করলে আমি সমাধা করতে পারতুম না, তাছাড়া অনভ্যস্ত পথে শেষ পর্যন্ত অব্যবসায়ীর সাহসে কুলোত না তাঁর কাছ থেকে ভরসাও পেয়েছি সাহায্যও পেয়েছি।
    আলমোড়ায় নিভৃতে এসে লেখাটাকে সম্পূর্ণ করতে পেরেছি। মস্ত সুযোগ হল আমার স্নেহাস্পদ বন্ধু বশী সেনকে পেয়ে। তিনি যত্ন করে এই রচনার সমস্তটা পড়েছেন। পড়ে খুশি হয়েছেন এইটেতেই আমার সব চেয়ে লাভ।
    আমার অসুখ অবস্থায় স্নেহাস্পদ শ্রীযুক্ত রাজশেখর বসু মহাশয় যত্ন করে প্রুফ সংশোধন করে দিয়ে বইখানি প্রকাশের কাজে আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন; এজন্য আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।
    শান্তিনিকেতন
    ২রা আশ্বিন ১৩৪৪

    রবীন্দ্রনাথের বিশ্বপরিচয়ের প্রথম পর্ব–পড়ে দেখুন, রচনাটা কার বুঝতে পারবেন। আর প্রমথনাথ সেনগুপ্তের বইটা দেন, এই বইটার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাবে। আমার তো ধারণা প্রমথনাথের পাণ্ডুলিপিটি বা বইটি ফরিদ আহমেদ বা অভিজিৎ কেউ-ই চোখেই দেখেননি। পরের মুখে ঝাল খাচ্ছেন।
    ———————
    পড়ুন
    বিশ্বপরিচয়ের প্রথম অধ্যায়
    পরমাণুলোক
    —————–
    আমাদের সজীব দেহ কতকগুলি বোধের শক্তি নিয়ে জন্মেছে, যেমন দেখার বোধ, শোনার বোধ, ঘ্রাণের বোধ, স্বাদের বোধ, স্পর্শের বোধ। এইগুলিকে বলি অনুভূতি। এদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের ভালোমন্দ-লাগা, আমাদের সুখদুঃখ।
    আমাদের এই-সব অনুভূতির সীমানা বেশি বড়ো নয়। আমরা কতদূরই বা দেখতে পাই, কতটুকু শব্দই বা শুনি। অন্যান্য বোধগুলিরও দৌড় বেশি নয়। তার মানে আমরা যেটুকু বোধশক্তির সম্বল নিয়ে এসেছি সে কেবল এই পৃথিবীতেই আমাদের প্রাণ বাঁচিয়ে চলার হিসাবমত। আরো কিছু বাড়তি হাতে থাকে। তাতেই আমরা পশুর কোঠা পেরিয়ে মানুষের কোঠায় পৌঁছতে পারি।
    যে নক্ষত্র থেকে এই পৃথিবীর জন্ম, যার জ্যোতি এর প্রাণকে পালন করছে সে হচ্ছে সূর্য। এই সূর্য আমাদের চার দিকে আলোর পর্দা টাঙিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীকে ছাড়িয়ে জগতে আর যে কিছু আছে তা দেখতে দিচ্ছে না। কিন্তু দিন শেষ হয়, সূর্য অস্ত যায়, আলোর ঢাকা যায় সরে; তখন অন্ধকার ছেয়ে বেরিয়ে পড়ে অসংখ্য নক্ষত্র। বুঝতে পারি জগৎটার সীমানা পৃথিবী ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে গেছে। কিন্তু কতটা যে দূরে তা কেবল অনুভূতিতে ধরতে পারি নে।
    সেই দূরত্বের সঙ্গে আমাদের একমাত্র যোগ চোখের দেখা দিয়ে। সেখান থেকে শব্দ আসে না, কেননা, শব্দের বোধ হাওয়ার থেকে। এই হাওয়া চাদরের মতোই পৃথিবীকে জড়িয়ে আছে। এই হাওয়া পৃথিবীর মধ্যেই শব্দ জাগায়, এবং শব্দের ঢেউ চালাচালি করে। পৃথিবীর বাইরে ঘ্রাণ আর স্বাদের কোনো অর্থই নেই। আমাদের স্পর্শবোধের সঙ্গে আমাদের আর-একটা বোধ আছে, ঠাণ্ডা-গরমের বোধ। পৃথিবীর বাইরের সঙ্গে আমাদের এই বোধটার অন্তত এক জায়গায় খুবই যোগ আছে। সূর্যের থেকে রোদ্দুর আসে, রোদ্দুর থেকে পাই গরম। সেই গরমে আমাদের প্রাণ। সূর্যের চেয়ে লক্ষ গুণ গরম নক্ষত্র আছে। তার তাপ আমাদের বোধে পৌঁছয় না। কিন্তু সূর্যকে তো আমাদের পর বলা যায় না। অন্য যে-সব অসংখ্য নক্ষত্র নিয়ে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, সূর্য তাদের মধ্যে সকলের চেয়ে আমাদের আত্মীয়। তবু মানতে হবে, সূর্য পৃথিবীর থেকে আছে দূরে। কম দূরে নয়, প্রায় ন’কোটি ত্রিশ লক্ষ মাইল তার দূরত্ব। শুনে চমকে উঠলে চলবে না। যে ব্রহ্মাণ্ডে আমরা আছি এখানে ঐ দূরত্বটা নক্ষত্রলোকের সকলের চেয়ে নীচের ক্লাসের। কোনো নক্ষত্রই ওর চেয়ে পৃথিবীর কাছে নেই।
    এই-সব দূরের কথা শুনে আমাদের মনে চমক লাগে তার কারণ জলে মাটিতে তৈরি এই পিণ্ডটি, এই পৃথিবী, অতি ছোটো। পৃথিবীর দীর্ঘতম লাইনটি অর্থাৎ তার বিষুবরেখার কটিবেষ্টন ঘুরে আসবার পথ প্রায় পঁচিশ হাজার মাইল মাত্র। বিশ্বের পরিচয় যতই এগোবে ততই দেখতে পাবে জগতের বৃহত্ত্ব বা দূরত্বের ফর্দে এই পঁচিশ হাজার সংখ্যাটা অত্যন্ত নগণ্য। পূর্বেই বলেছি আমাদের বোধশক্তির সীমা অতি ছোটো। সর্বদা যেটুকু দূরত্ব নিয়ে আমাদের কারবার করতে হয় তা কতটুকুই বা। ঐ সামান্য দূরত্বটুকুর মধ্যেই আমাদের দেখার আমাদের চলাফেরার বরাদ্দ নির্দিষ্ট।
    কিন্তু পর্দা যখন উঠে গেল, তখন আমাদের অনুভূতির সামান্য সীমানার মধ্যেই বৃহৎ বিশ্ব নিজেকে নিতান্ত ছোটো করে একটুখানি আভাসে জানান দিলে, তা না হলে জানা হতই না; কেননা, বড়ো দেখার চোখ আমাদের নয়। অন্য জীবজন্তুরা এইটুকু দেখাই মেনে নিলে। যতটুকু তাদের অনুভূতিতে ধরা দিল ততটুকুতেই তারা সন্তুষ্ট হল। মানুষ হল না। ইন্দ্রিয়বোধে জিনিসটার একটূ ইশারা মাত্র পাওয়া গেল। কিন্তু মানুষের বুদ্ধির দৌড় তার বোধের চেয়ে আরো অনেক বেশি, জগতের সকল দৌড়ের সঙ্গেই সে পাল্লা দেবার স্পর্ধা রাখে। সে এই প্রকাণ্ড জগতের প্রকাণ্ড মাপের খবর জানতে বেরল, অনুভূতির ছেলেভুলোনো গুজব দিলে বাতিল করে। ন’কোটি ত্রিশ লক্ষ মাইলকে আমরা কোনোমতেই অনুভব করতে পারি নে, কিন্তু বুদ্ধি হার মানলে না, হিসেব কষতে বসল।

  7. কুলদা রায় says:

    প্রমথনাথ সেনগুপ্ত ও রবীন্দ্রনাথের লেখার অংশ তুলে দেওয়া যাক। তুলনা করে দেখুন–
    ১. প্রমথনাথের লেখা পাণ্ডুলিপি থেকে–
    ———————————————-
    অনেক আশ্চর্য ও অসম্ভব কথা তোমরা পড়ে ও শুনে থাক। তোমাদের কল্পনা করার শক্তি যদি তাকে না জেনে নেয় তা হলে মনে হবে যে, এ কথা অসম্ভব, এ হতে পারে না। সকলের চিন্তা করার ক্ষমতা এক নয়, তাই তোমার আমার কাছে যা অসম্ভব ও আশ্চর্য বলে মনে হয় আর একজন হয়ত তা খুবই স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। সত্য যে কল্পনাকে কতদূর ছাড়িয়ে যায় তা আজকাল বিজ্ঞানে যুগে প্রতি পদেই আমরা (টের পাই)। Aeroplane সৃষ্টি হওয়ার আগে ‘মানুষ আকাশে উড়ে বেড়াবে;’ এর কল্পনাও ছিল আমাদের কাছে অত্যন্ত অসম্ভব। কিন্তু বৈজ্ঞানিক যখন তাঁর যন্ত্রের সব বুঝিয়ে দিয়ে আমাদের বলেন যে, এভাবে আকাশে ওড়া তো খুবই সোজা ও স্বাভাবিক, তখন আমাদের মন তাতে সাড়া দেয়–‘হ্যা সত্যিই, এতো এমন কিছু আশ্চর্য নয়, এ খুবই সোজা।’ আজ যখন বৈজ্ঞানিক পৃথিবী থেকে চন্দ্র ও মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার জন্য rocket নামে এক যন্ত্রের সৃষ্টি করতে ব্যস্ত, তখন আমরা ঘরের কোণে বসে হেসে বলছি ‘ একি কখনো সম্ভব হয়? এ শুধু পাগলামী?”
    কিন্তু যেদিন এ সম্ভব হবে, চোখের সামনে আমরা যেদিন দেখব মানুষ এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে যাতায়াত করছে, সেদিন আমরাই মাথা নেড়ে বলব, এতো এমন কিছু শক্ত কাজ নয়। সত্য বুঝতে হলে আমাদের কোনো জিনিসই অসম্ভব বলে উড়িয়ে দিলে চলবে না। স্থির হয়ে আমাদের ভাবতে হবে, বুঝতে হবে। তোমাদের কাছে আজ গ্রহ, নক্ষত্র, সূর্য, চন্দ্র, পৃথিবী, জীব, জন্তু এদের সম্বন্ধে আমার….’

    রবীন্দ্রনাথের বিশ্বপরিচয় থেকে পড়ুন
    —————————————-
    ‘সূর্য আমাদের জগতের চারিদকে একটা আলোর পর্দা খাটিয়ে দিয়েছে। পৃথিবী ছাড়িয়ে আর যে কিছু আছে মানুষকে তা দেখতে দিচ্ছে না। ভাগ্যক্রমে দিন শেষ হয়, সূর্য অস্ত যায়, আলোর আবরণ সরে যায়, তখন অন্ধকার ছেয়ে প্রকাশ পায় নক্ষত্রলোক। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কি যে চেহারা হয় তা আমাদের চোখে তখন ধরা পড়ে। এ বিশ্ব যতই প্রকাণ্ড বড় ততই অত্যন্ত ছোট হয়ে আমাদের কাছে দেখা দিয়েচে। নইলে সমস্তটার মোটামুটির পরিচয় পেতুম কী করে। হিমালয় পর্বতটা কি রকম তা জানবার জন্যে তার যে ছবি আঁকা হয়, একটা বইয়ের পাতার মধ্যেই তা ধরে। কিন্তু হিমালয়কে যদি একেবারে সামনে এনে দেখাতে চাই তাহলে সমস্ত বাংলাদেশটা চাপা পড়বে এবং হিমালয়ের সামান্য এক অংশের বেশি দেখতে পাব না।
    তেমনি বিশ্বের আয়তনকে কতই ছোটো করে প্রত্যেক রাত্রে আমাদের গোচর করা হয়েছে কিছু পরিমাণ তার আভাস পেতে হলে সূর্যের দৃষ্টান্তটা মনে আনা চাই। ভোরবেলায় সূর্য পূর্বদিকসীমানার ধারে যখন প্রকাশ পায় তখন তাকে একটি সোনার থালার মতো দেখতে হয়। তার থেকে আর কিছু না হোক বুইঝতে পারি সূর্য গোলাকার। অথচ প্রায় চোদ্দ লক্ষ পৃথিবী একত্র করলে তবে সূর্যের আয়তনের সমান হতে পারে। সমস্ত সূর্য যদি আমাদের কাছে থাকত তাহলে সমস্ত সূর্যের রূপ আমরা জানতেই পারতাম না। যা আমারদের চেয়ে অত্যন্ত বড়ো তাকে আমরা যতটুকু চিনতে পারি সে দূরের থেকে।’

    এ দুটি লেখা সম্পর্কে দিপঙ্কর চট্টোপাধ্যায় বলছেন–
    ———————————-
    যদি বলি, রবীন্দ্রনাথের লেখা এই অনুচ্ছেদটি প্রমথনাথের রচনারই ঘষামাজা চেহারা, তবে সত্যের অপলাপ হবে। বস্তুত দুটি রচনাংশের বৈদগ্ধের কোনো তুলনাই হয় না এবং তাদের বক্তব্যের মধ্যেও কোনো মিল নেই। এমনকী প্রমথনাথের ভাষা যে যথেষ্ট সহজ নয় তাও বলা যায় না। সমস্যাটা আরও অনেক বেশি গভীর। কবি রবীন্দ্রনাথ এবং পার্থবিদ্যার তরুণ অধ্যাপক প্রমথনাথ, এই দুজনের মধ্যে চিন্তার গভীরতার যতখানি তফাৎ, বিজ্ঞানকে বোঝার ব্যাপারেও তফাৎ ততখানি।

    তাহলে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে প্রমথনাথের বইটি রাহাজানি করে নিজের নামে ছাপিয়েছেন? এই রাহাজানির অভিযোগটি কি ধোপে টেকে?

  8. কুলদা রায় says:

    ৩. গগণ হরকরা এবং রবীন্দ্রনাথের গানচুরির কেস নিয়ে কিছু ফেস করা
    —————————————————————————–

    রবীন্দ্রনাথ সপরিবারে শিলাইদহে যান ১১ অগ্রহায়ণ, ১২৯৬ বঙ্গাব্দ/ ২৫ নভেম্বর ১৮৮৯ সালে। সঙ্গে ছিলেন মৃণালিনী দেবী, তাঁর একজন সহচরী, বড় মেয়ে বেলা ও পুত্র রথীন্দ্রনাথ। আরও ছিলেন বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সে সময় রবীন্দ্রনাথ জমিদারী পরিচালনা করতে ব্যস্ত থাকতেন। বলেন্দ্রনাথ সিলাইদহ/ সুনাউল্লাহর-গান শীর্ষক লেখায় লিখেছেন,
    আমরা যখন সিলাইদহে ছিলুম তখন রোজ রোজ আমাদের বোটে সেখানকার গ্রাম্য গাইয়েদের আমদানি হত। তার মধ্যে দুজন আমাদের মার্কামারা হয়ে পড়েছিল। একজন বষ্ণম–সে কাঙ্গাল ফিকির চাঁদ ফকিরের গান গাইত। …আরেকজন আসত সুনাউল্লাহ। এক-একদিনের পাল্লায় তার দুআনা পয়সা বরাদ্দ ছিল। … নিয়মিত বরাদ্দ ছাড়াও কাকীমার দানশীলতায় তাঁর একখানি সাড়ি এবং তার সহচরীর ফসফরিক সালসার একটা খালি বোতল লাভ হয়েছিল।
    বলেন্দ্রনাথ সে সময় সুনাউল্লাহর মুখ থেকে শোনা ১২টি গান খাতায় নকল করে রেখেছেন। ৪ ও ৭ সংখ্যক গানের পাশে মার্জিনে লেখা যথাক্রমে ২৩শে ও ২৫ শে অগ্রাহয়ণ ‘৯৬–অনুমান করা যায় অন্তত এই দুটি গান উক্ত তারিখগুলিতে শুনেছিলেন। এর মধ্যে ২ সংখ্যক গানের রচয়িতা গগন মণ্ডল, বলেন্দ্রনাথ তার নামের পাশে ব্রাকেটে গগন মণ্ডলের পরিচয় লিখেছিলেন–সিলাইদহের ডাক হরকরা। এই গগণহরকরা ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যেরে’ গানটি রবীন্দ্রনাথকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল, এর সুর অবলম্বনে তার বিখ্যাত স্বদেশী সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ রচিত হয়।
    ( পড়ুন–রবিজীবনী/ প্রশান্ত পাল/ তৃতীয় খণ্ড। )

    বলেন্দ্রনাথ রবিঠাকুরের স্নেহের পাত্র ছিলেন। তাকে দিয়েই শান্তিনিকতনের গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করেছিলেন খসড়টি। বলেন্দ্রনাথ অকালে মারা যান। বলেন্দ্রনাথ গগন হরকরার গানটির কথা এবং রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা রচনার ইতিহাসটি বলছেন। এখানে কোনো তথ্যই লুকানো হয়নি। রাহাজানি করলে গোপন করার বিষয় থাকে। সেটা তো করা হয়নি। রবীন্দ্রনাথ নিজেও এই গানটির সুর কোথা থেকে নিয়েছেন–তা অকুণ্ঠ চিত্তে বলেছেন। সেগুলো ঠাকুরবাড়ির লোকজনই গেয়েছেন। লালন করেছেন। মূল গান এবং তার প্রভাবে সৃষ্ট গান–সবই রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণায় গীত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ কি কখনো কোথাও বলেছেন–আমার সোনার বাংলা গানটির সুর তার নিজের সৃষ্ট? এরকম প্রমাণ কি দিতে পারবেন ফরিদ আহমেদ? যিনি তার গান রচনার বিষয়ে বলে গেছেন–তাঁকে কীভাবে রাহাজানি করেছেন অভিযোগ করা যায়?

    সঙ্গীতের বিষয়টিই সেকালে এরকম ছিল। রজনীকান্তের কোনো কোনো গান আছে–যেগুলো রবীন্দ্রনাথের গানের সুরকে হুবহু নেওয়া হয়েছে। সেগুলো তিনি রবীন্দ্রনাথকেও গেয়ে শুনিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ শুনে তারিফ করেছেন। নজরুল তার গজল গানের সুরগুলো কোথা থেকে নিয়েছেন? পারস্য গজল থেকে নিয়েছেন। সেগুলো কি রাহাজানি? শ্যামা সঙ্গীতের কথাই ভাবুন। শ্যামা সঙ্গীতের সুরের একটা ঘরানা আছে। দেখবেন, একই সুরে বহু গীতিকার সাধক তাঁদের নিজেদের কথা বসিয়েছেন। কেউ তো কখনো বলেনি–তারা চুরি বা রাহাজানি করেছেন। কীর্তনেরও বিষয়টাও তাই। রবীন্দ্রনাথ পদাবলী থেকে সুর নিয়েছেন। সেখানে কথা বসিয়েছেন। অন্য পদকর্তাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আর রবীন্দ্রনাথ দক্ষিণ ভারতীয় রাগাশ্রয়ী গানগুলোকে ব্যবহার করেছেন নিজের মত করে। তার টপ্পা গানগুলোর কথাই ভাবুন। শুনে দেখুন। তিনি কোন গান থেকে তিনি নিয়েছেন–সবই বিবৃত আছে। কিছুই লুকোনো হয়নি। জ্ঞানপ্রসাদের বাংলা রাগাশ্রয়ী গানগুলো শুনে দেখুন। আর মূল রাগগুলিও শুনে দেখুন। প্রমাণ পাবেন।

    রবীন্দ্রনাথ শুরুই তো করেছিলেন গান রচনা এভাবে। জ্যোতিদাদা পিয়ানোতে সুর তুলতেন–আর রবি সে সুরে কথা বসাতেন। রবীন্দ্রনাথের নিজের জবানীতে এই ইতিহাস আছে। এমনকি জ্যোতিদাদা নিজেও সেভাবে অনেক গান রচনা করেছেন। আর জ্য্যতিরিন্দ্রনাথতো পাশ্চাত্য সঙ্গীতে কৃতবিদ্য ছিলেন। পিয়ানোতে তিনি পাশ্চাত্যগানের সুরই বাজাতেন।

    আমার সোনার বাংলা গানটি আটজনের কণ্ঠে শুনুন– লিংক ( http://www.shapludu.com/1417/2/album.php )। শুনে দেখুন আটজনের সুরের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে।

    অমর পালের কণ্ঠে আমি কোথায় পাব তারে শুনুন–গগন হরকরার গানটিও শুনুন http://www.youtube.com/watch?v=2OJN-nDg8iw&feature=youtu.be।

    ড. স্বপন বসুর গাওয়া গগন হরকরার কোথায় পাব তারে এবং রবীন্দ্রনাথের আমার সোনার বাংলা গানের লিংক। শুনে এই গায়ক ও গবেষক কী বলেন কী গাচ্ছেন–http://www.youtube.com/watch?v=DnZvc73nQCk&feature=youtu.be

    একটু খুঁজলেই পাওয়া যাবে– গগন হরকরার একই গানের বহু ধরনি গায়কী।

    কয়েকটি গান খেয়াল করুন–
    ————————————-
    পদাবলী কীর্তনগুলো শোনাই–পর্ব ১. লিংক http://www.esnips.com/doc/61ced3dc-d1dd-4f12-b11b-562b048717da/Sri-Radhar-Manbhanjan—Part-I
    পর্ব. ২. লিংক http://www.youtube.com/watch?v=-iBHgDuKd9M&feature=related
    পদাবলী শুনুন -লিংক http://www.youtube.com/watch?v=-iBHgDuKd9M&feature=related

    কাজী নজরুলের একটি কীর্তন–লিংকhttp://www.youtube.com/watch?v=MKIVnchdrbw&playnext=1&list=PLF9162A3219E3E94B

    নাম সংকীর্তন–লিংক. http://www.youtube.com/watch?v=e0z-PVgWgkU&feature=related
    এই গানটির সঙ্গে পান্নালালের গাওয়া বলরে জবা বল কোথায় ঘন শ্যাম-গানটির সুরের কি মিল খেয়াল করুন।

    আমার সোনার বাংলা
    ————————–
    আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি গানটি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় গীত হয। প্রশান্ত পাল লিখেছেন, ইতিমধ্যে রবীন্দ্রনাথ-রচিত নূতন স্বদেশী গান ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ (দ্রষ্টব্য গীত ১।২৪৩; স্ব ৪৬) নিয়ে কলকাতা উত্তাল হয়ে পড়েছে। গানটির পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়নি। রচনার তারিখও জানা নেই। সত্যেন রায় লিখেছেন: বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ৭ আগস্ট (১৯০৫ খৃ:) কলিকাতার টাউন হলে যে সভা হয়েছিল, সেই উপলক্ষ্যে… রবীন্দ্রনাথ নূতন সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ বাউল সুরে গীত হয়েছিল। …১৯০৫ খৃ: ৭ই সেপ্টেম্বর (১৩১২ সনের ২২শে ভাদ্র) তারিখের ‘সঞ্জীবনী পত্রিকায় এই গানটি রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরে প্রথম প্রকাশিত হয়। সঞ্জীবনীর উক্ত সংখ্যাটি দেখার আমরা সুযোগ পাইনি, গানটি আশ্বিন-সংখ্যা বঙ্গদর্শন-এ (পৃষ্ঠা ২৪৭-৪৮) মুদ্রিত হয়।
    প্রশান্ত পাল জানাচ্ছেন শিলাইদহের ডাক-পিওন গগন হরকার ‘আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে’ গানটির সুরে রবীন্দ্রনাথ ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি রচনা করেন। সরলা দেবী ইতিপূর্বে শতগান (বৈশাখ ১৩০৭) এ মূল গানটির স্বরলিপি প্রকাশ করেছিলেন।

    গগন হরকরা বিষয়ে কিছু তথ্য দেওয়া যাক–
    ————————————————–
    কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শিলাইদহের নিকটে আড়পাড়া প্রামের এক কৃষিজীবী কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই রবীন্দ্র বন্ধু মহাপুরুষ গগন হরকরা। তার প্রকৃত নাম গগন চন্দ্র দাস হলেও সবাই তাকে গগন হরকরা নামেই চেনে। গগনের পিতা ও মাতা সম্পর্কে কোনো খোঁজ জানা না গেলেও কিরণ চন্দ্র নামে তার এক পুত্র ছিল বলে জানতে পারা যায়। গগন হরকরা প্রথমে পেশায় কৃষি কাজ করতেন। দুই যুগ আগেও গগনের ভিটার অস্তিত্ব ও ফলের বাগানের সাদৃশ্য ছিল। লোকমুখে জানতে পারা যায় যে, গগন হরকরা’র একটি বড় ফলের বাগান ছিল। উল্লেখ্য যে, গগনের বাস্তুভিটায় আসামদ্দি নামক একজন কৃষক বাড়ি করে থাকতেন এবং সেই বাড়িটি আজও ‘দামের ভিটা’ নামে পরিচিত (রবীন্দ্র উত্তরসূরি– পৃ. ৯৪, প্রফেসর ড. আবুল আহ্সান চৌধুরী)।

    গগন সামান্য শিক্ষা-দীক্ষায় পারদর্শী ছিলেন এবং তার ফলশ্রুতিতেই তৎকালীন শিলাইদহের ডাক ঘরের ডাক হরকরা’র চাকুরি পেয়েছিলেন। গগন সম্পর্কে পণ্ডিত ক্ষিতি মোহন সেন শাস্ত্রি অবশ্য বলেছেন: লালন-এর শীর্ষ ধারার একজন ছিলেন রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের ডাক হরকরা–যাঁর নাম গগন। রবীন্দ্রনাথ গগনকে সবার মাঝে বিভিন্ন ভাবে পরিচিত ও বিখ্যাত করে যথাসাধ্য মূল্যায়ন করেছেন।

    রবীন্দ্রনাথের আগেই সরলা দেবী (১৮৭২-১৯৪৫) ‘‘ভারতী’’ পত্রিকায় (ভাদ্র-১৩০২) গগনের কয়েকটি গান সংগ্রহ ও প্রকাশ করেছিলেন। সরলা দেবী উক্ত প্রবন্ধের শেষ অংশে আবেদন করেছিলেন যে, ‘‘প্রেমিক গগনের ভক্ত জীবনীর বিবরণ সংগ্রহ করিয়া কেহ ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশার্থে পাঠাইয়া দিলে আমাদের কাছে বিশেষ কৃতজ্ঞতা ভাজন হইবেন।” রবীন্দ্রনাথ তার বিভিন্ন বক্তৃতা-প্রবন্ধে গগনের গানের কথা ও গগনের নাম উল্লেখ করেছেন একাধিকবার। রবীন্দ্র সংগৃহীত গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’ এই গানটি দিয়েই ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ‘হারামণি’ বিভাগের (বৈশাখ- ১৩২২) সূচনা হয়েছিল। শিলাইদহে এসে রবীন্দ্রনাথ যেমন সাঁইজি লালন কর্তৃক প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং লালনের পরেই প্রভাবিত হয়েছিলেন গগন হরকরা কর্তৃক। গগনের ‘আমি কোথায় পাব তারে’ এই গানের সুরে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন ‘‘আমার সোনার বাংলা/ আমি তোমায় ভালোবাসি’’।

    গগনের সাংগীতিক প্রতিভা সম্পর্কে শিলাইদহের শচীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেছেন:
    “গগন হরকরা ছিলেন শিলাইদহ পোষ্ট অফিসের পিওন, অতি সামান্য বাংলা লেখাপড়া জানতেন, গাঁয়ে গাঁয়ে চিঠি বিলি করতেন, কিন্তু তাঁর বুকের মধ্যে পোরা ছিল রসের নির্ঝর, কণ্ঠে ছিল কোকিলের ঝংকার আর তাঁর গানে ছিল অরূপ-রতনের জন্যে চির-মধুর বিরহ-ব্যাথা। তিনি শিলাইদহে ‘সখীসংবাদের’ গানে এমন করুণ আখর লাগিয়ে গাইতেন যে, শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে সে গান শুনতেন। রবীন্দ্রনাথও তাঁর গান শুনতেন–বিরলে আদর করে কাছ বসিয়ে।”

    উল্লেখ্য যে ‘প্রবাসীর’ পরবর্তী সংখ্যায় অর্থ্যাৎ (জোষ্ঠ্য-১৩২২) ‘হারামণি’ বিভাগের পূর্ব সংখ্যায় প্রকাশিত গগনের গানটি পুনরায় পাঠ দেওয়া হয়েছিল।

    জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ লেখেন,
    ————————————–
    পিয়ানো বাজাইয়া জ্যোতিদাদা নূতন নূতন সুর তৈরি করায় মাতিয়াছিলেন। প্রত্যহই তাঁহার অঙ্গুলিনৃত্যের সঙ্গে সঙ্গে সুরবর্ষণ হইতে থাকিত। আমি এবং অক্ষয়বাবু তাঁহার সেই সদ্যোজাত সুরগুলিকে কথা দিয়া দিয়া বঁধিয়া রাখিবার চেষ্টায় নিযুক্ত ছিলাম। গান বাঁধিবার শিক্ষানবিশি এইরূপে আমার আরম্ভ হইয়াছিল।

    বাল্মিকীপ্রতিভা গীতিনাট্য রচনা বিষয়ে লেখেন, দেশী ও বিলেতি সুরের চর্চার মধ্যে বাল্মিকীপ্রতিভার জন্ম হইয়াছিল। ইহার সুরগুলি অধিকাংশই দেশি, কিন্তু গীতিনাট্যে তাহাকে তাহার বৈঠকি মর্যাদা হইতে অন্য ক্ষেত্রে বাহির করিয়া আনা হইয়াছে; উড়ায়া চলা যাহার ব্যবসায় তাহাকে মাটিতে দৌড় করাইবার কাজে লাগানো গিয়াছে।

    তিনি গান রচনার এই পদ্ধতিকে বলেছেন সঙ্গীতের বন্ধন মোচন। এই গীতিনাট্যটির অনেকগুলি গানই বৈঠকি-গান-ভাঙা, অনেকগুলি জ্যোতিদাদার রচিত গতের সুরে বসানো এবং গুটি তিনেক গান বিলাতি সুর হইতে লওয়া।

    জ্যোতিদাদার সুরে রবীন্দ্রনাথের বসানো গানের তালিকা গানের বহি ও বাল্মিকীপ্রতিভার লেখা আছে। ২৫টির সন্ধান পাওয়া যায় গীতবিতানে।
    এর মধ্যে–

    ১) অনেক দিয়েছ নাথ, ২) এত দিন পরে, সখী, ৩) এমন আর কতদিন চলে যাবে রে, ৪) ওকি সখা, মুছ আঁখি ৫) কে যেতেছিস আয় রে হেথা, ৬) খুলে দে তরণী, ৭) দাঁড়াও, মাথা খাও, ৮) দে লো সখী, দে পরাইয়ে গরে, ৯) দেশে দেশে ভ্রমি তব দুখগান গাহিয়ে, ১০) না সজনী, না, আমি জানি জানি, ১১) নিমেষের তরে শরমে বাধিল, ১২) নীরব রজনী দেখো মগ্ন জোছনায়, ১৩) প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন, ১৪) ভূল করেছিনু, ভুল ভেঙেছে, ১৫) সকলি ফুরাইল, ১৬) সখা হে, কী দিয়া আমি তুষিব তোমায়, ১৭) সখী, বল দেখি লো, ১৮) সমুখেতে বহিছে তটিনী, ১৯) সহে না যাতনা, ২০) হল না, হল না সই, ২১) হা সখি, ও আদরে, ২২) হায়রে, সেইতো বসন্ত ফিরে এল, ২৩) হাসি কেন নাই ও নয়নে, ২৪) হৃদয়ের মনি আদরিণী মোর ২৫) গেল গো–ফিরিল না, চাহিল না।

    গানের বহিতে–হিন্দিগান বিশেষের রাগ-রাগিনীর অনুসরণে রচিত হয়েছে এরূপ গানের সংখ্যা ৯০/৯২টি। আরও কিছু তালিকা করেছেন রবীন্দ্রনাথের স্নেহ ধন্য ইন্দিরা দেবী। পুরাতন গানকে ভাঙিয়াও রবীন্দ্রনাথ অসংখ্য রচনা করেছেন। তার তালিকাও পাওয়া যায়। কোনো কিছুই গোপন করা হয় নাই। কারণ এটা গান রচনারই একটি প্রচলিত পদ্ধতি।

    এবার দেখুন কালমৃগয়া ও বাল্মিকীপ্রতিভা গীতিনাট্যে কতকগুলি গানে ইংরেজি স্কচ আইরিশ সুর দেওয়া হয়েছে। তার তালিকা–

    ১) ও দেখবি রে ভাই, আয়রে ছুটে : The Victor of Bray,
    ২) তুই আয় রে কাছে আয় : The British Grenediers,
    ৩) ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে : Ye banks and braes.
    ৪) মানা না মানিলি : Go where glory wait thee,
    ৫) আহা আজি এ বসন্তে : Go where glory wait thee,
    ৬) তবে আয় সবে আয় : অজ্ঞাত
    ৭) কালি কালি বলো রে আজ : Nancy Lee
    ৮) মরি, ও কাহার বাছা : Go where glory wait thee
    ৯) ওহে দয়াময় :Go where glory wait thee
    ১০) কতবার ভেবেছিনু : Drink to me only
    ১১) পুরনো সেই দিনের কথা : Auld Lang Syne.

    কালমৃগয়া শুনতে ক্লিক করুন– লিংক http://vimeo.com/24922759

    লোকপ্রচলিত বা পুরাতন বাংলা গানের সুরে রচিত গানের তালিকা–

    ১) এবার তোর মরা গাঙ্গে : ( মন-মাঝি সামাল সামাল)
    ২) যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে : (হরিনাম দিয়ে জগৎ মাতালে)
    ৩) আমার সোনার বাংলা : (কোথায় পাব তারে/ লেখা আছে– মূল বাউল সঙ্গীতটি শিলাইদহে গগন হরকরার নিকট পাইয়াছিলেন)
    ৪) বেঁধেছ প্রেমের পাশে : (চাঁচর চিকুর আধো)
    ৫) ক্ষমা আমায়–আমায় : (জয় জয় ব্রহ্মণ ব্রহ্মণ) ।

    বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস, বঙ্কিমচন্দ্র, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার বড়াল, সুকুমার রায়, হেমলতা দেবীর ৮টি গানের সুর নিয়েও তিনি গান করেছেন। তার তালিকাও আছে
    বেদমন্ত্র ও বৌদ্ধ মন্ত্রেও তিনি সুর দিয়েছেন।

    এই তালিকা তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্য হল–রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন গানের সুর নিয়েছেন বিভিন্ন ভাণ্ডার থেকে। কোথা থেকে কোন সুরটি নিয়েছেন সব তথ্যই দেওয়া আছে। কথা কিন্তু নেননি। গানের বাণী তার নিজের।

    রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু গানের সুর হিন্দি মুভিতেও ব্যবহার করা হয়েছে। শচীনদেব বর্মন করেছেন। যেমন, অভিমান ছবিতে তেরে মেরে মিলন কি এ রয়না–লিংকhttp://www.youtube.com/watch?v=F8IVa-7-2_w&feature=youtu.be
    রবীন্দ্রনাথের মূল গানটি শুনুন–http://www.youtube.com/watch?v=zjx0l6xXEgA&feature=youtu.be
    রবীন্দ্রনাথের জীবিতকালেই রবীন্দ্রনাথের গানের পেশাজীবী বাইজী বা গায়করা গেয়েছেন তাদের ইচ্ছে মত।

    একটি গান শুনুন–
    ———————-
    গানটি গিরিজা দেবীর গাওয়া ঠুমরী মিশ্র সুর
    রচনা : সনদ পিয়া

    এই ঠুমরীর সুর অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথ করেছেন তাঁর গান–

    খেলার সাথি, বিদায়দ্বার খোলো–
    এবার বিদায় দাও।
    গেল যে খেলার বেলা।।
    ডাকিল পথিকে দিকে বিদিকে,
    ভাঙিল রে সুখমেলা।।

    গানটি শুনতে ক্লক করুন–লিংকhttp://www.youtube.com/watch?v=iyOHgjkso70
    লিংকটিতে প্রথমে গিরিজা দেবীর ঠুমরীটি পাবেন। তারপরেই নীলিমা সেনের সেনের খেলার সাথী গানটি পাবেন।

    রবীন্দ্রনাথ সনদ পিয়ার ঠুমরীটি ভেঙে যখন খেলার সাথী গানটি করলেন, তখন কিন্তু বাঙালি ঠুমরীর আস্বাদটি নিজের করে পেল। ঠুমরী তো এক সময় দরবারী সঙ্গীত ছিল। সেখানে বাঙালির পরিচয় খুব বেশি ছিল না। রবীন্দ্রনাথ যখন এই ঠুমরীর সুরে বাণী বসালেন–দেখেন কী বিষাদ আর হাহাকার আমাদের মনে পৌঁছে দিলেন। ঠুমরীর দরবার মনের প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ল।

    কিন্তু সনদ পিয়ার ঠুমরীটি কি তাদের নিজের রচনা? তার রচনা নয়। তিনিও নিয়েছেন তাঁর পূর্বসূরী দক্ষিণী সুর-রচনাকারের কাছ থেকে। নিয়ে সনদ পিয়া রচনা করছেন এই ঠুমরী। কিন্তু তা মিশ্র সুরে। তার মানে? তিনি অনেকগুলো সুর থেকে সুর মিশিয়ে করেছেন এই ঠুমরীটি। তাই একে মিশ্র সুরের বলা হয়েছে।

    এইভাবেই সুর রূপান্তরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। বহুজনের সৃষ্টিতে পরিণত হয়। এটা গান রচনার একটি পদ্ধতি। অনুসন্ধিৎসুগণ চেষ্টা করলেই এরকম বহু উদাহরণ পাবেন। তখন চোর বলা মুশকিল হয়ে পড়বে।

  9. Md. Ali Azam says:

    ‘তাহাদের’ এগোনোর স্বার্থেই রবীন্দ্রনাথকে হটানো দরকার, হ্যাঁ সত্যিই দরকার। পাশ কাটানো যে অসম্ভব। তবে কতখানি হটিয়ে কতখানি এগোবেন সেটা সময়ে দেখা যাবে। অপেক্ষায় রইলাম।

  10. আতিকুর রহমান সুমন says:

    রবীন্দ্র সমালোচনায় এই লেখাটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তার আলখেল্লাটাকে এখন মিনি স্কার্ট বলে মনে হচ্ছে।

  11. ইয়াসির says:

    রবীন্দ্র স্তাবকদের সবচাইতে বড় প্রীতি সম্ভবত তাঁর লেখা এবং সুর করা গানগুলোর প্রতি। গানের বাণী ও সুরের গভীরতা এতই অপরিসীম যে নিতান্ত সহজ প্রেমের গানগুলিকেও প্রার্থনা সঙ্গীতের মর্যাদা দিয়ে দেয়া হয়েছে। কেন জানি মনে হয়, এই মাতামাতির পেছনে আলস্যের ভূমিকাটাই বড়। বিনোদনের পাশাপাশি দুদণ্ড প্রার্থনার আমেজ পাওয়া বোধহয় আর কোনো কিছুতেই এত সহজ নয়, সুলভও নয়।

    লেখাটি পড়ে ভালোলাগার চাইতে দুঃখ পেয়েছি অনেক বেশি। রবীন্দ্র কুম্ভিলকতা যেমন-তেমন, তার চেয়ে অধিক যন্ত্রণাদায়ক জাতি হিসেবে পশ্চাদপসরণতার অপমান। হাহাকার জাগে এই ভেবে যে, আমাদের জাতীয় বিবেচনায় যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ, তিনি কেন পাশ্চাত্যের (যে মানেরই হোন না কেন) লেখকদের অনুকরণের দায়ে দুষ্ট হবেন? আমাদের সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ পুরুষটি তাঁর এতসব ত্রুটি লুকিয়ে রাখতে পেরেছেন কেবলমাত্র সাধারণ সমাজে যথেষ্ট পরিমাণ বিচারবোধ নেই বলে, যার মূল কারণ হিসেবে শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবকে দায়ী করি। শিক্ষায় বাংলাদেশ পিছিয়ে এটা সবাই জানেন, কিন্তু কেউ যদি প্রচলিত প্রথার ভুল ধরিয়ে দিতে আসেন, সবার আগে তার কপালে জোটে কটূক্তি, তার বক্তব্য বিশ্লেষিত হবার অনেক আগেই। আরো বিপদজনক, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিজয়ী হয়ে থাকে, আর প্রকৃত সত্যটি অনুদ্ঘাটিত থেকে যায়।

    এরকম একটি তথ্যবহুল লেখা উপহার দেবার জন্য লেখকদ্বয়কে ধন্যবাদ। এমন নয় যে এর পর থেকে রবীন্দ্রনাথকে ঘৃণা করতে হবে বা তার সাহিত্য/গান বর্জন করতে হবে, যে কোনো বিচারে তিনিই আমাদের সমৃদ্ধতম সাহিত্যিক। প্রয়োজন হচ্ছে যথাযথ মান বিচারের, আভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক।

  12. তুহিন তালুকদার says:

    প্রথমেই লেখকদ্বয়কে ধন্যবাদ এমন একটি তথ্যবহুল লেখার জন্য।

    রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ছোটবেলা থেকেই কিছু প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেত। তাঁর সময় দরিদ্র, নিঃস্ব কৃষক তো নিতান্ত কম ছিল না, কিন্তু তাঁর লেখায় কেন তারা আসতো না? শরৎচন্দ্র যেমন সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে অনেক উপন্যাস লিখেছিলেন, চরিত্র তৈরি করেছিলেন, রবি ঠাকুর কেন করেননি? তাঁর সৃষ্ট নায়কেরা কেন উল্লেখযোগ্যভাবে বিলেত ফেরৎ হতেন?

    কেউ কেউ বলতো, তিনি আনন্দের জন্য সাহিত্য সৃষ্টি করতেন। কিন্তু বেদনার দিকটি স্পর্শ না করলে কিভাবে চলবে?

    আশা করছি, রবীন্দ্রনাথকে মানুষ নির্মোহভাবে দেখতে শুরু করবে। তাঁর ভুল ত্রুটির আলোচনায় সাম্প্রদায়িকেরা যেন তাঁর সাহিত্যবোধকেই ছোট করে না বসে। সেই সাথে রবীন্দ্রভক্তরাও যেন রবীন্দ্র – মন্দিরের সেবাদাস না হয়ে যায়।

  13. প্রথমেই সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি যারা লেখাটি পড়েছেন এবং মন্তব্য করেছেন। আমাদের এই প্রবন্ধটিকে ঘিরে যে পক্ষে বিপক্ষে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে সেটা শুভ লক্ষণ। আমাদের সংস্কৃতিতে এ ধরণের বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা একরকম দুর্লভই বটে। একদিকে মৌলবাদী ধর্মান্ধদের সাম্প্রদায়িক দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের বিদ্বেষ যেমন আছে, তেমনি আবার রয়েছে ‘প্রগতিশীলতার’ তকমা-ধারিদের রবীন্দ্রনাথের আগা গোঁড়া সব কিছু নির্লজ্জভাবে সমর্থন করার বাতিক। রইসউদ্দিন আরিফ তার উপমহাদেশে ধর্ম, রাজনীতি সাম্প্রদায়িকতা বইয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন–রবীন্দ্রনাথের অবস্থান আমাদের সংস্কৃতির আকাশে এক কথায় অনন্য। কিন্তু তা বলে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শনের যে কোন ভুল ত্রুটি রাহাজানি সবকিছুই নির্লজ্জ ভাবে সমর্থন করতে হবে, এই ধারণাও এক ধরনের মৌলবাদ। কুলদা রায় সহ কিছু মন্তব্যকারীর মন্তব্যে সেই ধরনের মৌলবাদিতার ছাপ স্পষ্ট। যাহোক, পাঠকদের মতামতের উপর সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই আমি মন্তব্যকারীদের মন্তব্য সম্বন্ধে দু-চার কথা বলতে মনস্থ করেছি।

    ফাহিমের মন্তব্যটি তাৎপর্যপূর্ণ এবং চিন্তার উদ্রেককারী। কিন্তু একটি ছোট তথ্যগত ভ্রান্তি আছে (কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর তার মন্তব্যে এর কিছুটা সংশোধন দিয়েছেন যদিও) । ফাহিম বলেছেন যে, “তিনি সিপাহী বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, ওহাবী বিদ্রোহ, দাক্ষিণাত্যের কৃষক বিদ্রোহ, কোল বিদ্রোহ সবই দেখেছিলেন অথচ সেই সব মহাবিদ্রোহ নিয়ে একটি লাইনও লেখেন নাই।” উক্তিটির মূলভাবটি সত্য, কিন্তু এটি মনে রাখতে হবে যে, রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন সিপাহী বিদ্রোহের চার বছর পরে। সিপাহী বিদ্রোহ হয়েছিলো ১৮৫৭ সালে আর রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১ সালে। কাজেই আক্ষরিক অর্থে ধরলে রবীন্দ্রনাথ সিপাহী বিদ্রোহ দেখেননি। কিন্তু না দেখলেও তিনি সিপাহী বিদ্রোহের ঘূর্ণিঝড় বুকে ধারণ করেই বড় হয়েছেন। এটি ছিলো মূলতঃ ভারতবর্ষের জনসাধারণের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম, ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা অবশ্য এর নাম দিয়েছেন ‘সিপাহী বিদ্রোহ’। কিন্তু এ কেবল সিপাহীদের একেলার বিদ্রোহ ছিল না, বরং পলাশীর যুদ্ধের একশত বছর পরে সংগঠিত হওয়া এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলো ইংরেজদের অত্যাচারে অবিভক্ত বাংলা ও ভারতের কৃষক, শ্রমিক, জেলে, তাঁতিরাই। এমনকি সংগ্রামের নেতৃত্বে সিপাহীরাও ছিলো সেই সব গরীব খেটে খাওয়া কৃষক শ্রমিক আর তাঁতিদেরই সন্তান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও রবীন্দ্রনাথের লেখায় বিদ্রোহ নিয়ে কোনো উচ্ছ্বাস বা আগ্রহ কখনোই পরিলক্ষিত হয়নি। ১৮৫৭ সালে ঘটে যাওয়া বড় ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ কখনোই তাকে প্রভাবিত করতে পারেনি; বিশাল রবীন্দ্রসাহিত্যে এটি প্রায় অনুল্লেখ্যই থেকে গেছে। কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর তার মন্তব্যে ‘মিউটিনি’র কথাটি বলেছেন। এটি সত্য। গোরা উপন্যাসে (১৯০৯) খুব প্রচ্ছন্নভাবে একে ‘মিউটিনি’ হিসেবে উল্লেখ করলেও (ব্রিটিশ রাজ প্রবর্তিত এবং প্রচারিত এই শব্দটির ব্যবহার তার অন্য দু একটি গল্প বা প্রবন্ধেও পাওয়া যায় যেমন, ‘পয়সার লাঞ্ছনা’ কিংবা ‘আবদারের আইন’ ইত্যাদি), তা মূলতঃ নেতিবাচক ভাবে কিংবা বড়জোর নিস্পৃহভাবে ব্যবহার করেছেন। যেমন গোরা উপন্যাসে আমরা দেখি, রবীন্দ্রনাথ গোরার জন্ম পরিচয় জানানোর জন্য কৃষ্ণদয়ালের মুখ দিয়ে ‘মিউটিনি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত ভাবলেশবিহীনভাবে। কৃষ্ণদয়াল বলছে:

    ‘তখন মিউটিনি। আমরা এটোয়াতে। তোমার মা সিপাহিদের ভয়ে পালিয়ে এসে রাত্রে আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তোমার বাপ তার আগের দিনেই লড়াইয়ে মারা গিয়েছিলেন।… তিনি আইরিশম্যান ছিলেন। সেই রাত্রেই তোমার মা তোমাকে প্রসব করে মারা গেলেন। তার পর থেকেই তুমি আমাদের ঘরে মানুষ হয়েছ’।

    এ যেন অনেকটা একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কে ভুল করে কেউ কেউ ‘গণ্ডগোলের সময়’ বলে ফেলে, অনেকটা সেরকমের। ‘পয়সার লাঞ্ছনা’তে মিউটিনির ব্যবহার আরো মারাত্মক, ইচ্ছাকৃত, আরো ব্যঙ্গাত্মক:

    ‘ইচ্ছা হইল তখনই কাজ ফেলিয়া যদি চলিয়া যাই, একটা মিউটিনি করি, ইংরাজকে দেশ হইতে দূর করিয়া দিই, পার্লামেন্টে একটা দরখাস্ত করি, স্টেটস্‌ম্যান কাগজে একটা বেনামি পত্র লিখি । কিন্তু তাহার কোনোটা না করিয়া বাড়িতে চলিয়া গিয়া সেদিন আর জলখাবার খাইলাম না, খোকার সর্দি হইয়াছে বলিয়া স্ত্রীকে যৎপরোনাস্তি লাঞ্ছনা করিলাম…!’

    তার কাছে সিপাহী বিদ্রোহর মতো উন্মাতাল বিদ্রোহগুলো যেন তার কাছে কাজ ফেলে ‘মিউটিনি করা’ কিংবা ‘স্টেটস্‌ম্যান কাগজে একটা বেনামি পত্র’ লেখার সমতুল্য। এটি বলা দরকার যে, রবীন্দ্রনাথের জন্মের পর থেকে ১৯০০ সাল অবধি ভারতে ১৪টি কৃষক বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল তার মধ্যে ছয়টি ছিল বাংলা ও আসাম অঞ্চলের। নিঃসন্দেহে ভারতবর্ষের কৃষক শ্রমিকদের উপর লাগাতার ইংরেজ শোষণ আর নিপীড়ন কিছু নিজ চোখেও দেখেছিলেন, প্রান্তিক প্রজাদের উপর নিপীড়ন এবং নির্যাতনের কিছু খবর, তাদের ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদতে কাঁদতে’ নিশ্চয় জমিদারবাড়ির অচলায়তন ভেদ করে কখনো সখনো ভেদ করে তার কানেও পৌঁছাত। ১৮৬২ সাল থেকে আঠারো শতকের শেষভাগে নীলচাষীদের উপর যখন নীলকরদের অমানুষিক অত্যাচার চলছিলো ইংরেজ শাসকদের অকুণ্ঠ সমর্থনে, কিংবা আঠারো শতকের মধ্যভাগ থেকে শুরু করে ঊনবিংশ শতকের প্রথম পর্যন্ত দক্ষিণ মালাবারে তালুকের খাজনা নিয়ে মামলা, হিন্দু চাষিদের নানা দুর্ভোগের কথা–এগুলো কোনোটাই তার অবিদিত থাকার কথা নয়। না জানার কথা নয় ১৮৭৫ সালে ঘটে যাওয়া ইংরেজদের বিরুদ্ধে দাক্ষিণাত্যের বিশাল কৃষক বিদ্রোহের কথা কিংবা ১৯০০ সালের দিকে ঘটা মুণ্ডা বিদ্রোহ এবং টিকেন্দ্র সিং-এর নেতৃত্বে মণিপুর বিদ্রোহের কথা, আর সেই বিদ্রোহগুলো দমনের জন্য ইংরেজদের পাইক পেয়াদা লাগিয়ে এবং বিদ্রোহীদের ধরে ধরে প্রকাশ্যে ফাঁসি দিয়ে নির্মমভাবে বিদ্রোহ দমনের ইতিবৃত্ত। আর ঊনবিংশ শতকের শুরু থেকে আমৃত্যু বিভিন্ন ইংরেজ-বিরোধী নরম এবং চরমপন্থি সংগ্রামী ঐতিহ্যের তো ছিলেন চলমান সাক্ষী। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, রবীন্দ্র সাহিত্যে সেদিকগুলো তেমনিভাবে প্রতিফলিত হয়নি। তার পরবর্তীকালের সাহিত্যগুলোতে বিদ্রোহ এবং স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ সংগ্রামের প্রতি বিরাগ আরও স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়েছে। তার ঘরে বাইরে (১৯১৪) এবং চার অধ্যায় (১৯৩৪) তারই বলিষ্ঠ প্রমাণ। আরও একটি দৃষ্টান্ত হল ১৯৩১ সালে প্রকাশিত কলকাতার উন্নাসিক মাসিক [প্রথমে ত্রৈমাসিক] সাহিত্যপত্র পরিচয়। সেখানে সমকালীন গান্ধী-পন্থী জাতীয়তাবাদ এমনকি কৃষক আন্দোলন সম্বন্ধেও রবীন্দ্রনাথের নানা অনীহা প্রকাশিত হয়েছে। পথ ও পাথেয় আর পূর্ব পশ্চিম (১৯০৮)-এর মত প্রবন্ধগুলো তো বিপ্লবীদের প্রতি রীতিমত অবমাননাসূচক। এমনকি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে শান্তিকামী ‘আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয় তাও মুখ থুবড়ে পড়ে ১৯২৬ সালে ইতালির ফ্যাসিস্ট শাসক মুসোলিনীর সরকারী আপ্যায়নে রবিঠাকুরের ইতালি ভ্রমণ পর্যালোচনা করলে। সেখানে তিনি মুসোলিনীকে দেখে অভিভূত হয়ে তার দেহ ও আত্মা যেন ‘মাইকেল এঞ্জেলোর বাটালি দিয়ে খোদাই করা’ বলে স্তব করেছিলেন। তিনি সে সময় মুসোলিনীকে তুলনা করেছিলেন আলেকজান্ডার এবং নেপোলিয়নের মত বীরদের সাথে। মুশকিল হচ্ছে এগুলো বললেই রবীন্দ্র-বিদ্বেষী খেতাব পেতে হবে–যা কুলদা রায় ভজন সরকার প্রমুখেরা দেয়ার চেষ্টা করেছেন উপরে। হিটলার ছাড়া মুসোলিনীর তুলনীয় ফ্যাসিস্ট এবং উগ্র-জাতীয়তাবাদী নেতা কেউ ছিলো না সে সময় পৃথিবীতে, অথচ রবীন্দ্রনাথের চোখে তিনি ছিলেন উদার, বুদ্ধিদীপ্ত এবং সবার জন্য অনুসরণীয় একজন আদর্শ নেতা।

    নয়ন মজুমদারের মন্তব্যটি আরও মজার। তিনি জিগ্যেস করেছেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে গগন হরকারের গানের সুর চুরি করেছেন তা আপনি কোথা থেকে জানলেন?

    ওয়েল, ভদ্রলোকের নামটি গগন হরকার নয়, গগন হরকরা। আর প্রশ্নটি যেন ‘সাত কাণ্ড রামায়ণ পড়ে সীতা কার বাপ’-এর মতো অবস্থা। আমাদের লেখাটিতেই তো এর অসংখ্য প্রমাণ আছে। গগন হরকরার আমি কোথায় পাবো তারে গানের ইস্নিপ্স লিংক আর আমার সোনার বাংলা গানের ইস্নিপ্স লিংক পাশাপাশি দেয়া আছে। মিলিয়ে দেখলেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ঠিক যেভাবে হিন্দি ছবি মার্ডারের ‘জানা তেরে পেয়ার মেরা’ এই গানটা মাইলসের ‘নিঃস্ব করেছ আমায়’ এই গানটার নকল বলে বুঝতে কারো অসুবিধা হয় না, কিংবা প্রীতমের ‘ভিগি ভিগি’ রাতের সুর শুনলে যেভাবে বোঝা যায় সেটা গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গান ‘পৃথিবীটা যেন ছোট হতে হতে’র সুর থেকে চুরি করা, সেভাবেই গগন হরকরার ‘কোথায় পাবো তারে’ গানের সুর আর ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের সুর পাশাপাশি শুনলেই বুঝতে পারার কথা। এছাড়া মুহম্মদ মনসুর উদ্দিনের বাউল গানের সংকলন হারামণি গ্রন্থের ভূমিকাতে রবীন্দ্রনাথে ‘আমি কোথায় পাবো তারে’ এই গানটি নাম উল্লেখ না করে শিলাইদহের অঞ্চলের একজন বাউলের কণ্ঠে শুনেছিলেন বলে উল্লেখ করছেন। তাঁর ভাষাতেই:

    মুহম্মদ মন্‌সুর উদ্দিন বাউল-সংগীত সংগ্রহে প্রবৃত্ত হয়েছে। এ সম্বন্ধে পূর্বেই তাঁর সঙ্গে আমার মাঝে মাঝে আলাপ হয়েছিল, আমিও তাঁকে অন্তরের সঙ্গে উৎসাহ দিয়েছি। আমার লেখা যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন বাউল পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখাসাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হত। আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিণীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাত-সারে বাউল সুরের মিলন ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে বাউলের সুর ও বাণী কোন্‌-এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে, তখন আমার নবীন বয়স, শিলাইদহ অঞ্চলেরই এক বাউল কলকাতায় একতারা বাজিয়ে গেয়েছিল–
    কোথায় পাব তারে
    আমার মনের মানুষ যে রে!
    হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে
    দেশ-বিদেশে বেড়াই ঘুরে

    স্পষ্টতঃ এই নাম উল্লেখ না করা শিলাইদহের বাউলটিই হচ্ছেন গগন হরকরা। কিন্তু এমনভাবে বলা হচ্ছে যেন কোলকাতার রাস্তার ধারে কোনো গান গাওয়া কোনো বাউলের কণ্ঠে তিনি এটা শুনেছেন। অথচ আমরা খুব ভালো করেই জানি যে, রবীন্দ্রনাথের সাথে গগন হরকরার বেশ ভালো পরিচয় ছিলো। তিনি কোলকাতায় এসে নয়, বরং শিলাইদহের কাছারিতে এসে প্রায়শঃ তাঁর জমিদারবাবু রবীন্দ্রনাথকে গান শুনিয়ে যেতেন। অথচ জমিদারবাবুর কতো কুণ্ঠা তাঁর নাম নেওয়ার বিষয়ে।

    বলা বাহুল্য, রবীন্দ্রনাথ কখনোই তাঁর ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের মূল সুরটি যে আসলে গগন হরকরার গান থেকে নেওয়া–সে কথা কোনো লেখাতেই স্পষ্ট করে বলেননি। এ ব্যাপারটি পীড়াদায়ক। রবীন্দ্রনাথ নিজের গানের ব্যাপারে যে সাবধানতা অবলম্বন করেছেন (কীভাবে গাইতে হবে, কীভাবে সুর অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে ইত্যাদি), ঠিক ততটাই যেন নিস্পৃহ ছিলেন অন্যের গান আত্তীকরণের বেলায়। শুধু তো ‘আমি কোথায় পাব তারে’ নয়, বহু গানের সুরই এভাবে বাউল গান থেকে ধার করা। ‘গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির’ গানটি এসেছে বাউল গান ‘মন মাঝি সামাল সামাল’ গান থেকে, ‘ও আমার দেশের মাটি’ গানটি এসেছে বাউল গান ‘আমার (সোনার) গৌর ক্যানে’ গান থেকে; ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি’ গানটি এসেছে ‘যমুনে, এইকী তুমি যমুনে’ গানের সুর থেকে ইত্যাদি। বহু বিদেশী গানের সুর থেকেও যে অসংখ্য রবীন্দ্রসংগীতের সুর নেওয়া হয়েছে সেটি বোধ হয় না বলে দিলেও চলবে। আমদের লেখাতেই বলা আছে–বিখ্যাত ‘ফুলে ফুলে ঢলে’র সুর নেয়া হয়েছে স্কটল্যান্ডের ফোক গান ‘Ye banks and braes’ থেকে। ঠিক তেমনি ভাবে কেউ খোঁজ খবর করলেই জানতে পারবেন, ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ গানটির সুর নেয়া হয়েছে স্কটিশ লোকগীতি ‘Auld Lang Syne’ থেকে; ‘কতবার ভেবেছিনু’ নেওয়া হয়েছে ‘Drink to me only’ থেকে; ‘আহা আজি এ বসন্তে’ গানটি নেওয়া হয়েছে ‘Go where glory waits’ থেকে ইত্যাদি। ড. আশিস বসুমল্লিকের একটি হিসেব অনুযায়ী ২২৩২টি রবীন্দ্রসংগীতের মধ্যে ২৮০টি গান রবীন্দ্রনাথ নিয়েছিলেন অন্য সুর হতে (রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীর গণনা অনুযায়ী অবশ্য এই সংখ্যা ২৩৪), কিংবা অন্যের কথা হতে। অর্থাৎ প্রায় ১২.৫ ভাগই হচ্ছে মারা গান, থুড়ি, ‘ভাঙা গান’। সংখ্যা নেহাত কম নয়। আমরা আমাদের লেখায় ইন্দিরা দেবীর রক্ষণশীল হিসেবটিই নিয়েছি আমাদের সমালোচকদের প্রতি যথেষ্ট উদারতা দেখিয়ে।

    কুলদা রায় সহ কেউ কেউ আমাদের যুক্তিগুলো খণ্ডন না করে বাউল গানের পিছনে এখন লেগে গেছেন। তারা বলতে চাইছেন, বাউল গান নাকি আলাদা কোনো টিউন নয়। বাউল সুর বারোয়ারি, এর কোনো বাপ-মা নেই। যে কেউ ইচ্ছে করলেই নাকি এই সব গান থেকে সুর নিয়ে নিতে পারে। কাজেই রবীন্দ্রনাথ কোনো অন্যায় করেননি। এটি একটি ভুল যুক্তি, অনেকটা ডুবন্ত মানুষের খড়কুটো আঁকড়ে ধরে ভেসে থাকার অন্তিম চেষ্টা যেন। এ ব্যাপারটি মুক্তমনাতেও এটি পরিষ্কার করা হয়েছিলো। লালন শাহ, দুদ্দু শাহ, পূর্নদাস বাউল, পবন দাস বাউল, শাহ আব্দুল করিম বয়াতী সবাই বাউল, কিন্তু সবার গানের সুর এক নয়। এমনকি লালনেরও সব গানের সুর এক নয়। লালনের ‘জাত গেল জাত গেল’ আর ‘পাপ-পুণ্যের কথা আমি কারে বা শুধাই’ গানের সুর কারো কাছেই এক মনে হবে না। এমন নয় যে, ‘জাত গেল জাত গেল’ গানটি বানিয়ে তার সুরই ব্যবহার করে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানের সুর তৈরি করেছিলেন লালন। গানগুলোর সুর আলাদা আলাদা ভাবে তৈরি করেছিলেন বলেই সেগুলো শুনতে আলাদা লাগে। এর পেছনে আলাদাভাবে সৃষ্টিশীলতা এবং সৃজনশীলতা দেখাতে হয়েছে। আব্দুল করিম বয়াতীও বাউল। কিন্তু তা বলে কি তিনি লালন শাহ এর ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গান থেকে সুর নিয়ে তার ‘বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে’ কিংবা ‘একখান চাবি মাইরা’ গানের সুর কি বানিয়েছিলেন? না তা কিন্তু নয়। বাউল টিউনের উপর হলেও তাকে আলাদাভাবে সুর করতে হয়েছিলো গানে।

    পশ্চিমা বিশ্বের সংগীতের কথাই ধরা যাক। সেখানে রেগে, রক এণ্ড রোল, ব্লুজ, কান্ট্রি–এগুলো কিছু জানা টিউন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, একজন সুরকারের করা ব্লুজের একটি সুর আরেকজন হুবহু ব্যবহার করে দেবেন আরেকটা গানে আরেকজন সুরকার; কিংবা একজনের কান্ট্রি গানের সুর নিয়ে আরেকজন কাট্রিসং বানিয়ে বাজারে ছেড়ে দেবেন। ব্যাপারটার পার্থক্য বুঝতে হবে। গগন হরকরার গানটির সুর তৈরিতে গগনকে সৃজনশীলতা দেখাতে হয়েছিল, কষ্ট করতে হয়েছিল। কেবল ‘বাউল সূর সর্বজন স্বীকৃত’ বলে আরেক গানে কেউ কপি করে দিতে পারে না, ঠিক যেমনি আমি এখন রবীন্দ্রসংগীতের একটি গানের সুর আমার লেখা একটা গানে বসিয়ে বলতে পারি না যে, আমি একটা রবীন্দ্রসংগীত বানিয়েছি। এটা অন্যায় শুধু নয়, হাস্যকরও হবে । যে কুলদাবাবু এখন রজনীকান্ত-রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল-পান্নালাল এনে রবি ঠাকুরের পিঠ বাঁচাতে চেষ্টা করেছেন, তিনিই কিন্তু আমাদের বুকে ছুরি মারতেন রবিঠাকুর যে কাজটি করেছেন, সেটা আমরা শুরু করলে। রবীন্দ্রসংগীত চুরির অপবাদ আসতো সবার প্রথমে তার কাছ থেকেই। অথচ রবিঠাকুরের বেলায় এটি ‘কৃষ্ণলীলা’ হয়েই থাকবে!

    কুলদা রায় স্বর্গ-মর্ত-পাতাল ফুঁড়ে বহু তথ্য এনেছেন। সেগুলোর বেশিরভাগই এতো অপ্রাসঙ্গিক এবং বিষয়-বহির্ভূত যে সে সব দেখে কোনো সুস্থ মানুষের হাসা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। এত কষ্ট করেছেন, এতো তথ্যের পাহাড় ঢেলে দিয়েছেন, এগুলো না করে এর চেয়ে ঢের সহজ একটি ব্যাপার তিনি করতে পারতেন, তাহলেই এই অধম কৃতার্থ হতো। তিনি যদি এক লাইনে দেখাতেন–এই যে এখানে রবীন্দ্রনাথ ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি যে গগন হরকরার ‘কোথায় পাব তারে’ গানের সুর থেকে নিয়েছেন তা উল্লেখ করেছেন (রবীন্দ্র রচনাবলীর অমুক সংস্করণের অমুক পৃষ্ঠা ইত্যাদি)। ব্যাস ল্যাঠা চুকে যেত। রবীন্দ্রনাথের সম্মানও বাঁচতো, আমাদেরও এতো কষ্ট করে গলদঘর্ম হয়ে এই নিকৃষ্ট-মানের লেখা লিখতে হত না। কিন্তু কুলদা তা করতে পারেননি; সে না পারারই কথা। কারণ রবীন্দ্ররচনাবলী কিংবা রবীন্দ্র-ইতিহাসের কোথাও এর উল্লেখ নেই। রবীন্দ্রনাথ জ্ঞানতঃ গগন হরকরার সুরের স্বীকৃতি দিয়ে যাননি। এটাই বাস্তবতা। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে রবীন্দ্রনাথ কিংবা তার মা সারদা দেবী কোথায় কীভাবে তাকে পরিচিত করেছেন তা ফেনিয়ে ফেনিয়ে বলা এবং সেগুলো বসে বসে শোনা রীতিমত পীড়াদায়ক। এ অনেকটা ‘গরু মেরে জুতা দান’-এর মতো শোনায়। অবশ্য গরু মেরে জুতা দানের মতো কাজ রবীন্দ্রনাথের জীবনে অনেকই পাওয়া যাবে। এর কিছুটা ইঙ্গিত মিলে কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের মন্তব্য থেকেও। যেমন তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘লালন বা অন্য বাউলদের সাথে তিনি যোগাযোগই শুধু করেননি, তৎসময়ের লালন-ভক্তদের এমন একটা অভিযোগ ছিল যে রবিঠাকুর লালনের একটা গানের খাতা নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেননি’। এ বিষয়টার সামান্য একটু উল্লেখ আনিসুজ্জামানের লেখাতেও পাওয়া যায়:

    রবীন্দ্রনাথকে একদা আখ্যা দেওয়া হয়েছিল পায়রা কবি ও হেঁয়ালি কবি বলে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মতো বিশিষ্ট কবি ও নাট্যকার তাঁর রচনাকে বলেছিলেন অস্পষ্ট, অশ্লীল ও দূর্নীতিপরায়ণ। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় সুরেশচন্দ্র সমাজপতি লিখেছিলেন যে, বিশ্বসাহিত্যের অবস্থা এমনই শোচনীয় হয়ে গেছে, রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার না পেলে তা জানা যেতো না। একজন লিখলেন, গীতাঞ্জলি রচনার আগে রবীন্দ্রনাথ কুষ্টিয়া থেকে বাউলের গানের যে খাতা নিয়ে গিয়েছিলেন, এখন সেটা তাঁর ফেরত দেওয়া উচিত–নোবেল পুরস্কারতো পেয়েই গেছেন। (রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম ও আমরা)

    যদিও আনিসুজ্জামানের এই লেখাটি রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে অভিযোগনামা বা সমালোচনা হিসাবে লেখা হয় নি, বরং স্তব হিসাবেই লেখা হয়েছে; রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এই সকল অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি যে কত মহৎ সেটিই প্রমাণ করা উদ্দেশ্য ছিলো তাঁর। তারপরেও এ বিষয়টাকে এখানে উল্লেখ করা হলো এ কারণে যে, লালনের গানের খাতা নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে চুরি করার একটা গুরুতর অভিযোগ রবীন্দ্রনাথ জীবিত থাকা অবস্থাতেই ছিলো।

    কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরও উল্লেখ করেছেন যথার্থভাবেই–‘রবিঠাকুর বা জ্যোতিরিন্দ্রনাথরা তাদের ব্রাহ্মধর্মের স্বার্থেই বাউল-সঙ্গীত সংগ্রহ করতেন। তাদের ব্রাহ্মত্বের ব্রহ্মসাধনার সাথে এসবের যোগ করতেন। কিন্তু তা তারা খুব একটা স্বীকার করতেন না।’ অথচ এই রবীন্দ্র-বন্দনার যুগে রবীন্দ্র-স্তাবকেরা ফেনিয়ে ফেনিয়ে লিখে চলেছেন রবীন্দ্রনাথ লালন কিংবা গগন হরকরার মতো বাউলদের কতটা কদর করতেন, কতটা মাথায় করে রাখতেন, ইত্যাদি।

    প্রমথনাথ সম্বন্ধে যত কম কথা বলা যায় ততোই মনে হয় ভাল। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনী ও রবীন্দ্রসাহিত্য-প্রবেশক থেকেই পাওয়া যায় যে ‘গ্রন্থখানি লিখিবার ভার অর্পণ করা হইয়াছিল প্রমথনাথ সেনগুপ্তের উপর।’ হতভাগ্য প্রমথনাথ বইয়ের নামও ঠিক করে রেখেছিলেন–‘বিশ্বরচনা’। প্রথম অধ্যায় পরমাণুলোক থেকে শুরু কয়রে নক্ষত্রলোক, সৌরজগৎ, ভূলোক এবং উপসংহার সব অধ্যায়ই লিখেছেন প্রমথবাবু। আর রবীন্দ্রনাথ ‘খোল নলচে’ বদলে শেষ অধ্যায় লিখে গুরুদেবের কাছে পৌঁছিয়ে দেবার কথা প্রমথনাথ নিজেই বলেছেন এভাবে:

    ‘শেষ অধ্যায় লিখে দিয়ে এলাম গুরুদেবের হাতে। এটা সংশোধিত হয়ে ফিরে এলে তৈরি করতে হবে নতুন করে সমগ্র পাণ্ডুলিপি সুন্দর নির্ভুলভাবে লিখে, তারপর তা তুলে দিতে হবে ওঁর হাতে, আলমোড়া যাবার আগে …’

    রবীন্দ্রনাথ নিজেও কিন্তু প্রথমে প্রমথনাথের অবদান স্বীকার করে বলেছিলেন:

    “বইটার বিষয়বস্তু রচনার কাজ তো প্রমথই করেছে। আমি শুধু ভাষার দিকটা দেখে দিয়েছি। গ্রন্থকার তো প্রমথেরই হওয়া উচিৎ। তবে আমার নামের সাথে যদি প্রমথ যুক্ত করতে চান, তাহলে প্রমথনাথ-রবীন্দ্রনাথ হওয়াই ঠিক হবে।”

    অথচ আলমোড়া থেকে ফিরেই তিনি ভোল পালটে বললেন:

    ‘দেখো, বিশ্বপরিচয় লিখতে লিখতে দেখলুম এর ভাষাটা আমারই হয়ে গেছে, তাই এর মধ্যে তোমাকে কোথাও স্থান দিতে পারলুম না’। অন্তরালে কী হয়েছে ব্যাপারটা সুস্থ মাথার কারো পক্ষে না বোঝার কথা নয়।

    অবশ্য কুলদার মতো রবীন্দ্র-স্তাবককে এগুলো বলে লাভ নেই। উনি আমাদের এক সামান্য প্রবন্ধের ধাক্কায় চারটি মন্তব্য করে ফেলেছেন একদিনের ব্যবধানে। এখানে ওখানে গিয়ে নানা পদের জিগির করেছেন। এ থেকেই তার পেছনের জ্বালা বোঝা যায়। তার জ্বলুনি লাগাই উচিৎ। আমি একবার রবীন্দ্রনাথের প্ল্যানচেট বিষয়ে একটি লাইন লিখেছিলাম আমার ‘স্বতন্ত্র ভাবনা’ (চারদিক, ২০০৮) বইয়ের ভূমিকায় । লাইনটা এরকমের – রবীন্দ্রনাথের প্লানচেটে বিশ্বাসের ওপর প্লানচেট কিংবা আত্মার অস্তিত্ব কিংবা অনস্তিত্ব নির্ভর করে না। ‘রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসঙ্গীতের ওপর নির্ভর করে প্রমাণিত হয় না পরম ব্রহ্মের অস্তিত্ব’। ব্যাস কুলদা বাবু আরেক ব্লগে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্ল্যানচেট করাকে ডিফেণ্ড করতে শুরু করে দিলেন। বলতে থাকলেন তার ছোট ছেলে শমীর মৃত্যুতে এতোটাই ভেঙ্গে পড়েছিলেন যে তারা প্ল্যানচেট করে আত্মা ফাত্মা নামানোতে বিশ্বাস করা জায়েজ ছিল। তাকে কী করে বোঝাই যে, আমাদের অনেকরেই ছেলে মেয়ে, পিতা কিংবা নিকটাত্মীয় মারা যায়, কিন্তু কোন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ প্ল্যানচেটে বিশ্বাস করে আত্মা নামিয়ে শান্তি খোঁজে না। যদি খোঁজেন তিনি বিজ্ঞানমনস্ক নন, বরং কুসংস্কারাচ্ছন্ন। এ প্রসঙ্গে আহমদ শরীফ তার বহুল আলোচিত ‘রবীন্দ্রোত্তর তৃতীয় প্রজন্মে রবীন্দ্র মূল্যায়ন’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘ভুতে ভগবানে তাঁর (রবীন্দ্রনাথের) সমান বিশ্বাস। আমৃত্যু ভৌতিক প্ল্যানচেটে ছিল তাঁর গভীর আস্থা। আর কে না জানে, এ ধরণের আস্তিকতা মানস-মুক্তির একটি বড়ো অন্তরায়’। সহজ কথায়, ‘কাঁঠালের আমসত্ত্ব’ যেমন অবাস্তব তেমনি অবাস্তব প্ল্যানচেটে বিশ্বাসী -বিজ্ঞানমনস্ক এবং প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব। কিন্তু কুলদা রায় কাঁঠালের আমসত্ত্ব শুধু নিজে দেখছেন না, রীতিমতো অদৃশ্য আমসত্ত্বের চাটনি বানিয়ে অন্যদের পরিবেশন করার মহান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

    রবীন্দ্রনাথের কুসংস্কার সম্বন্ধে যখন বলা হচ্ছেই আরও একটি কথা এ প্রসঙ্গে না বললেই নয়। সম্প্রতি ডা. শ্যামল চক্রবর্তীর রবি ঠাকুরের ডাক্তারি (সাহিত্য সংসদ, ২০১১) নামের বইটি পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের হোমিওপ্যাথিতে বিশ্বাসের কথা জানা ছিলো কিন্তু হোমিওপ্যাথি নিয়ে এমন বাতিকগ্রস্থতার বিষয়টা এমনিভাবে জানা ছিলো না এই অধমের। লেখক দাবি করেছেন যে, রবিঠাকুরের বাতিকগ্রস্থতা (লেখকের মতে ‘চিকিৎসাবায়ুগ্রস্ততা) এমন পর্যায়ে পৌঁছিয়ে গিয়েছিলো যে তিনি মৃণালিনী দেবীর অসুস্থতার সময় কোনো এলোপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণ করতে দেননি, নিজের হোমিও-জ্ঞান প্রয়োগ করে গেছেন দিনের পর দিন তার স্ত্রীর উপর। ‘চিকিৎসক’ রবিঠাকুরের এই ভুল চিকিৎসায় মৃণালিনী দেবী জোড়াসাঁকোর একটি আলো-বাতাস-হীন ঘরে প্রথমে বাকরুদ্ধ হয়ে মারা যান। এ সময় কোনো আধুনিক চিকিৎসাই মৃণালিনীকে দেয়া হয়নি। কেবল অসুস্থ স্ত্রীকে পাখার বাতাস করে গেছেন, আর নিজের হোমিওপ্যাথির উদ্ভট ঔষধ খাইয়ে গেছেন। ডাক্তার শ্যামল চক্রবর্তীর মতে মৃণালিনী দেবীর রোগটি ছিলো গর্ভপাত-পরবর্তী জরায়ু ও সন্নিহিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সংক্রমণ যা চিকিৎসা শাস্ত্রে ‘পোস্টঅ্যাররটাল সেপসিস’ নামে চিহ্নিত। অথচ এই রোগের ভাল চিকিৎসা তখন এলোপ্যাথিতে ছিলোই। তিনি তা নেননি, বরং শ্যামল চক্রবর্তী লিখেছেন:

    ‘একদিকে স্ত্রীকে পাখার বাতাস করে ঘুম পারানোর চেষ্টা, অন্যদিকে হোমিওপ্যাথি আঁকড়ে ধরে আধুনিক চিকিৎসার কোন সুযোগ না-নেওয়া। একদিকে নার্স পর্যন্ত রাখতে না-দিয়ে শেষদিকে দিন রাত স্ত্রীর সেবা করা, অন্যদিকে কোলের সন্তানকে মায়ের কাছ থেকে সরিয়ে বোলপুরে পাঠিয়ে দেয়া… এ ঘটনাগুলো শুধু বিস্মিতই করেনা, অনিবার্য এক প্রশ্নের জন্ম দেয় মনে। …‘

    এই বইটি প্রসঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা হয়েছে (নির্মোহ, বিরল রবীন্দ্রচর্চা, বইপোকা, ৪ কার্তিক ১৪১৮ শনিবার ২২ অক্টোবর ২০১১) – “…বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য, ‘মৃণালিনীর মৃত্যু ও রবীন্দ্রনাথ’ অধ্যায়টি। সেখানে ঠিক কোন অসুখে মৃণালিনীর মৃত্যু হয়েছিল সে সম্পর্কে যুক্তিপূর্ণ অনুমান আছে, আছে এই তথ্যভিত্তিক ইঙ্গিতও যে মৃণালিনীর মৃত্যুর জন্য অনেকাংশে দায়ী রবীন্দ্রনাথই… রবীন্দ্রচর্চায় এমন নির্মোহ গবেষকের দৃষ্টি বিরল।”

    কিন্তু কুলদার কাছে এই ‘নির্মোহ দৃষ্টি’র ব্যাপারটাই অন্যায়। তার পয়গম্বরের ব্যাপারে কেউ ভিন্নধর্মী বিশ্লেষণ হাজির করলেই তাকে তিনি ছাগু, সাম্প্রদায়িক, রাজাকার, জামাতি ইত্যাদি বলে ট্যাগ করেন–ব্লগে, ফেসবুকে নানা জায়গায়। তার কাছে সবকিছুই খুব সাদা কালো, অনেকটা আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বুশের মতো–‘আইদার উইথ মি অর উইথ দেম।’ হয় রবীন্দ্রনাথের স্তব করে প্রগতিশীল বনে যেতে হবে, কিংবা আপনি হবেন পাকিস্তানপন্থী রাজাকার। এর বাইরে কিছু থাকতে পারবে না। সেটাই চান যেটা তিনি এবং তার ভক্ত-কূলেরা দিনের পর দিন করে গেছেন, করে যাচ্ছেন অহর্নিশি–রবিঠাকুরের ভাল ভাল কথামালার মালা বানিয়ে দেদারসে জাবর কাটা। জাবর কাটুন, ক্ষতি নেই, কিন্তু এতে করে কেবল ‘ষণ্ড’ খেতাবই জুটবে, সামনে এগুবার আশা করা একেবারেই বৃথা। রবীন্দ্রনাথেরই ভাষায় –

    ‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি।
    বুঝতে পারি কখন তুমি দাও-যে ফাঁকি।। …
    স্তবের বাণীর আড়াল টানি তোমায় ঢাকি।’

    ফাহিম, নয়ন মজুমদার, কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, ভজন সরকার, কুলদা রায়, Md. Ali Azam, ইয়াসির, তুহিন তালুকদার সহ যারা মন্তব্য করেছেন সবাইকে ধন্যবাদ।

    – অভিজিৎ

  14. সন্দীপ says:

    শ্রদ্ধেয় সুধীবৃন্দ,
    দয়া করিয়া যদি একটি বিতর্কমালা (একদা বিশ্বভারতী প্রকাশিত) -র সন্ধান দেন খুব ই উপকৃত হবো। রবি বাবুর সহিত প্রমথ চৌধুরী মহাশয়ের একটি বিতর্ক – জমিদারী প্রথা লইয়া। সেই পুস্তকে জমিদারী প্রথার সপক্ষে রবিবাবুর একটি অদ্ভুত যুক্তি দেখা যায় ঃ– সাহাদের হাত হইতে শেখদের বাঁচানোর জন্য জমিদারদের থাকা দরকার। সম্ভবত – অন্যথায় ছোট কৃষকদের ব্যাবসায়ী-মহাজনেরা গিলিয়া খাইবে – এই কারনে (অর্থাৎ জমিদার এইস্থানে “বাফার” এর মত ভূমিকায় অবতীর্ণ যেন…)। এই বিতর্কের প্রিন্ট ও ওয়েব প্রকাশনার খোঁজ দিয়া বাধিত করিবেন।

  15. জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাবুদের বিষয়ে এইধরণের আরো লেখা প্রকাশিত হওয়া দরকার। রবীন্দ্রনাথের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার একমাত্র পন্থা যে স্তাবকতা করা নয়, সেটা আমরা যত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবো ততই মঙ্গল! প্রজা ঠ্যাঙানোর কাজে এই পরিবারের সবিশেষ এলেম ছিলো…

    “দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যে পর্য্যন্ত মহর্ষি নাম গ্রহণ করেন নাই, সে পর্য্যন্ত প্রজাগণ তাঁহাকে দুঃখ নিবেদন করিয়া কিছু কিছু ফল পাইয়াছে, কিন্তু তিনি মহর্ষি নাম পরিগ্রহ করিলে, তাহার পর প্রজার হাহাকার তাঁহার কর্ণে প্রবেশ করিতে অবসর পায় নাই। দুরবস্থা দেখিতে নিমীলিত চক্ষু উন্মিলিত হয় নাই…দেবেন্দ্রিয় মত এই যে, ব্রহ্ম কি ধর্ম্মের সহিত জমিদারির কোন সম্বন্ধ নাই। জমিদারি ব্রহ্মধর্ম্ম অর্থাৎ ব্রহ্ম ও ধর্ম্ম ছাড়া অজগবী বা স্বয়ম্ভূ পদার্থ।সুতরাং প্রজার প্রতি যথেচ্ছা ব্যবহার করিলে তৎপ্রতি ধর্ম্মের মত কোন ক্ষমতাই নাই, সর্বত্র যাঁহার চক্ষু সেই ব্রহ্মও তাহা দেখিতে পান না। যদিও দেখেন তবে ব্রহ্ম বলিয়া ও সকল অত্যাচার তত ধর্তব্য বলিইয়া গ্রাহ্য করেন না। প্রজার অদৃষ্টে ব্রহ্মধর্ম্ম অর্থাৎ ব্রহ্ম ও তাঁহার নিয়মধর্ম্ম বিপরীত ফল বিতরণ করে, ইহা তাহাদিগের পূর্ব্বজন্মার্জ্জিত সঞ্চিত পাপের প্রায়শ্চিত্ত ভিন্ন আর কি বলা যাইতে পারে?”…কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, কাঙাল হরিনাথ মজুমদার নির্বাচিত রচনা,বাংলা একাডেমি, ঢাকা…চৈত্র ১৪০৪ বঙ্গাব্দ / মার্চ ১৯৯৮…আবুল আহসান চৌধুরী সঙ্কলিত ও সম্পাদিত…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.