ব্যক্তিত্ব

আমার শিক্ষক তারেক মাসুদ

সলিমুল্লাহ খান | 15 Aug , 2011  

`In breaking a statue one risks becoming a statue…’
Jean Cocteau, ‘Le Sang d’un Poète’

“যাঁহারা মূর্তি ভাঙ্গিবার কাজে হাত দিয়া থাকেন, তাঁহারা নিজেরাই মূর্তি হইয়া উঠিবার ঝুঁকি লয়েন॥”
জাঁ কক্‌তো, ‘জনৈক কবির খুন’


তারেক মাসুদ এন্তেকাল করিয়াছেন। একা করেন নাই, সঙ্গে করিয়াছেন আরো চারিজন। তিনজন সঙ্গী গুরুতর জখম হইয়াছেন, একজন সামান্য। ২৯ শ্রাবণ, শনিবার, বারবেলায় এই ঘটনা ঘটিয়াছে পুরানা ঢাকা জেলার ভিতরে, নতুন জেলা মানিকগঞ্জ সদরের অদূরে। যখন পহিলা খবরটি পাইলাম, তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একদল ছাত্রছাত্রীর সহিত বসিয়া আলাপ করিতেছিলাম। যখন শুনিলাম প্রথম অবিশ্বাস করিলাম, তারপর অবাক হইলাম। শেষ পর্যন্ত বুঝিলাম বিশ্বাস করিতে হইবে অবিশ্বাসকে, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ করিতেই হইবে। অবাককে কথা বলিতে হইবে।

tm.jpg

এই শেষের দিকে তারেক মাসুদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। মোবাইল ফোন কোম্পানির সংযোগ যেমন মধ্যে মধ্যে বন্ধ হইয়া থাকে তেমন অনেকখানি। কিন্তু তারেক মাসুদের কথা দিনে একবার ভাবি নাই এমন দিন আমার কমই গিয়াছে। এই অন্তরের দিনেও। তিনি আমার উত্তমর্ণ। নানা সুবাদে। একাধিক কারণে।

তারেক মাসুদ উচ্চাভিলাষী ছিলেন। তাঁহার সহিত পহিলা যেদিন দেখা হইল সেদিনই তাহা টের পাইয়াছিলাম। সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইয়াছি। ইহা ইংরেজি মতে ১৯৭৬ সালের কথা। তারেক মাসুদ ও পিয়াস করিম একযোগে দেখা দিয়াছিলেন। সে কালের শরিফ মিয়ার ক্যান্টিন নামে খ্যাত আশ্রয়কেন্দ্রের আশপাশে তাঁহারা ঘুরিতেছিলেন। তখন লেখক শিবির নামে একটি দল জীবিত ছিল। তাহার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা হইয়াছিলেন তারেক মাসুদ।

তারেক মাসুদের সাথে আমার নতুন করিয়া পরিচয় করিয়া দিয়াছিলেন মোহন রায়হান। ১৯৭৮ সালে মোহন রায়হানের পহিলা বহি ‘জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ’ প্রকাশ করিয়াছিলেন ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির’।

আমার ধারণা তাহাতে তারেক মাসুদের হাত ছিল। প্রথম দিকে তারেকের নাম সামান্য লম্বা ছিল–আবু তারেক মাসুদ। সেই নামে তিনি ছড়া লিখিতেন। সত্য বলিতে আমি তারেকের ছড়ার তুলনায় তাহার কথা বেশি শুনিতে চাহিতাম। তিনি বুদ্ধিমান ছিলেন, জোর করিয়া ছড়া শুনাইয়া তিনি কখনও আমাদিগকে লজ্জা দেন নাই। এই কাজটি আমিও কখনও কখনও করি নাই এমত নহে।

প্রথম পরিচয়েই তারেক আমাকে বলিয়াছিলেন তিনি চলচ্চিত্রকেই জীবনের ধ্রুবতারা করিয়াছেন। আমাদের বন্ধুদের বেশির ভাগই যে যাহার ধ্রুবতারা হারাইয়া ফেলিয়াছেন। তারেক হারাইতে পারেন নাই। তিনি ছিলেন সংকল্পে দৃঢ়। তিনি ইতিহাস বিভাগে পড়িতেন। এই পড়া তাহার চিন্তার পথে কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি করিতে পারে নাই। তারেক আমাকে কথাটা নিজেই বলিয়াছিলেন, ‘ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক হওয়া আমার লক্ষ্য নহে।’

১৯৭৮ সালের শেষের দিকে আমি সিদ্ধান্ত লইয়াছিলাম একটি বিশেষ চরিত্রের পত্রিকা প্রকাশ করিব। আমি লেখক শিবিরের সদস্যপদ লাভ করিবার গৌরবে তারেকের শরিক হইতে পারি নাই। কিন্তু শিবিরের মধ্যে থাকিলেও ইতিহাস বিভাগের অধিক মর্যাদা তারেক মাসুদ শিবির জিনিসটাকে দিতে পারেন নাই। শিবিরের অন্য পাঁচটি সভ্য আমাকে যতখানি অনাত্মীয় ভাবিতেন তারেক মাসুদ ততখানি ভাবেন নাই। আমি যখন “প্রাক্সিস জর্নাল” কাগজটা বাহির করি তখন তারেক আমাকে আত্মীয় ধরিয়া লইলেন। তিনি আমাদের সম্পাদনা পরিষদে নিজের নামটি যুক্ত করিতে কুণ্ঠিত হয়েন নাই।

কয়েক বছর পর আমরা একটি পুস্তিকা বাহির করি। নাম ছিল ‘সমকালীন সাহিত্যের প্রবণতা ও শ্রেণীচরিত্র প্রসঙ্গে’ বা ইহার কাছাকাছি কিছু। এই পুস্তিকা মোটের উপর আমিই লিখিয়াছিলাম। আর আমার প্রধান সহায় হইয়াছিলেন তারেক মাসুদ। তিনি আমাকে জগতের যত নতুন খবর সবই জানাইতেন। বই আনিয়া দিতেন। সেই পুস্তিকায় প্রায় তিরিশ জনের স্বাক্ষর ছিল। আমার এবং তারেক মাসুদের নাম দুটিও বর্ণানুক্রম অনুসারে ছাপানো হইয়াছিল। আহা, পুস্তিকাটি এখন হারাইয়া কোথায় গিয়াছে জানি না! একটা কথা মনে আছে কবি অসীম সাহা নাম ছাপা না হওয়ায় পরে রবার স্ট্যাম্পযোগে যুক্ত হয়।

তারেক মাসুদের সঙ্গে আমার অনেক আলাপ হইত। সত্যের খাতিরে বলিতে হইবে চলচ্চিত্র বিষয়ে আমার আগ্রহ যাঁহারা শিক্ষকের মতন যত্ন করিয়া তৈয়ারি করিয়া দিয়াছেন তারেক মাসুদ তাঁহাদের মধ্যে একেবারে সামনের কাতারে। সত্য আরো বলিতে হইবে। আমার চরিত্রের মধ্যেই নিহিত আমার নিয়তি। শিক্ষকগণের সহিত দ্বিমত করাই আমার বিধিলিপি। শেষের দিকে আমি আর তাঁহার শিক্ষা হইতে উপকার লাভ করিতে সমর্থ ছিলাম না। হয়তো তাহাতে আমারই হয়রানি হইয়াছে।


১৯৮৬ সালে আমি মার্কিন মুলুকে চলিয়া যাই। তাহার বছর কয় পরে তারেকও সেই দেশে সাময়িক হিজরত করেন। আমি তখন জীবিকা সংগ্রহের প্রয়োজনে একটি বইপত্রের দোকানে চাকরি করি। একদিন সেই দোকানে ক্যাথারিন শাপির আসিয়া হাজির। তিনি জানাইলেন তারেক তাঁহার আত্মীয়। সংবাদটা আমার জানা হইয়াছিল তাহার কিছু আগে। তারপর একদিন দেখি সত্যসত্যই তারেক মাসুদ নতুন ইয়র্ক শহরে নাতিদীর্ঘ ছায়া ফেলিতেছেন। আমরা পাঁচ হইতে সাত বছর সেই শহরে একটানা বসবাস করিয়াছি।
crew2.jpg……..
তারেক ও ক্যাথারিনের ছবি পরিচালনার মুহূর্ত
…….
শেষ পর্যন্ত তারেক মাসুদ ও ক্যাথারিন মাসুদ স্ট্যাটেন আয়ল্যান্ড নামা এক দ্বীপে বাসা লইলেন। বাসাটি ছিল কাঠের ঘর। আমরা বহুদিন সেই ঘরে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম। কারণ আমি আসিতাম অনেক দূর হইতে। অধিক রাতে ফেরা সম্ভব হইত না। তারেকও তখন আমার মতন বইপত্রের দোকানে কাজ করিতেন। তাঁহার কর্মস্থল ছিল নতুন ইয়র্ক শহরের বাঁকাপথ ওরফে ব্রডওয়ে এবং ১২ রাস্তার সংযোগবিন্দুতে। এই দোকানটি পাঁচতলা। বিজ্ঞাপন অনুসারে তাহার বইপত্রের সকল তাক একটার পর একটা সাজাইলে দৈর্ঘ্য হইবে আট মাইল। নাম স্ট্রান্ড বুকস।

আমি কাজ করিতাম ৫ অ্যাভিনিউ ও ১৪ রাস্তার সংযোগস্থলে। আমার বিদ্যালয়ের বইয়ের দোকানটার নাম ছিল ‘এয়ুনিবার্সিটি প্রেস বুকস’। অনেক মধ্যাহ্নে আমরা একত্রে এয়ুনিয়ন স্কয়ার পার্কে (ব্রডওয়ে ও ১৪ রাস্তার সংযোগস্থল) বসিয়া দুপুরের খাবার খাইয়াছি। তারেক ভালো রান্নাও করিতেন। তাঁহার ‘স্যান্ডউয়িচ’ সঙ্গে থাকিত।

কাঠমিস্ত্রী হইলেও তারেক মাসুদ মন্দ করিতেন না। এই সময় তিনি সেই কাজও মাঝে মধ্যে করিতেন। নিজের বাসার ছোটখাট মেরামতির কাজ তিনি নিজেই করিয়া সারিতেন। কখনো কখনো ভাড়াও যাইতেন। এমনই এক যাত্রায়–তিনি আমাকে বলিয়াছিলেন–তিনি আবিষ্কার করিলেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু দলিলচিত্র।

ঘটনাটা শুদ্ধ কাক আসিবার পর তাল পড়িবার বিষয় নহে। ইহার পিছনে সাধনা ছিল। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের স্মৃতি হিসাবে এই দলিল অমূল্য রতন। মার্কিন চিত্রগ্রাহক লিয়ার লেবিনের সহিত পরিচয় ও উদ্ধারপর্ব এতদিনে কিংবদন্তি হইয়াছে। নতুন ইয়র্কে থাকিতেই তারেক মাসুদ ইহার প্রদর্শনী করিয়াছিলেন সেখানে। সেখান হইতে একটি পুস্তিকাও ছাপা হইয়াছিল। সেই পুস্তিকায় আর পাঁচ জনের সহিত আমিও দুই কথা লিখিয়াছিলাম।


এই যে শেষের দিকে আমার শিক্ষক বন্ধুর সহিত আমার যোগাযোগ স্থগিত হইয়া আসিল তাহার বীজ এখন দেখিতে পাইতেছি সেই সময়েই রোপা হইয়াছিল। আগেই বলিয়াছি তারেক মাসুদ ছিলেন একাধারে উচ্চাভিলাষী এবং দৃঢ়সংকল্প। এখন বুঝিতেছি তিনি নিজের প্রাণকেও তুচ্ছ করিতে পারিতেন ভক্তির জন্য। আমাদের সহিত তাহার বিচ্ছেদ প্রাণের সহিত প্রাণের বিচ্ছেদ বৈ নহে। তিনি নেতা, আমি বিনীত অনুসারী মাত্র এই ছেদে।

তিনি তবে ‘ভক্তি’ করিয়াছিলেন কাহাকে? তাঁহার ছবি যাহারা দেখিয়াছেন সে কথা তাহারাই ভাল বলিতে পারিবেন। বাংলাদেশের হৃদয়কে তিনি ভাষা দিতে চাহিয়াছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাস তিনি পড়িয়াছেন তাঁহার নিজের মতো করিয়া। তারেক মাসুদ যে জায়গায় জন্মিয়াছিলেন সেই ফরিদপুর অঞ্চলে ছিল পরাধীন যুগে কৃষক সংগ্রামের কেন্দ্রভূমি। বাংলাদেশের মুসলমান কৃষক–মজুর ও গৃহস্থ উভয় স্তরের কৃষকই–এসলাম ধর্মের সংস্কারকে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আদর্শ আকারে গ্রহণ করে। এই আন্দোলন বাংলাদেশে ‘ফরায়েজি’ নামে জাহির আছে।

এসলামের এই ভাষ্য তারেক মাসুদ গ্রহণ করেন নাই। এসলাম এ দেশে আসিবার আগে এ দেশে যে ধর্মাচার প্রতিষ্ঠা পাইয়াছিল তাহাকে সমূলে বিনাশ করা ছিল ফরায়েজি আন্দোলনের লক্ষ্য। তারেক মাসুদ এসলামকে লোকধর্ম হিসাবে দেখিতে চাহিয়াছিলেন। তাহার ‘মাটির ময়না’ ছবিতে এই বিশ্বাস এস্তেহার আকারে হাজির আছে।

mmk2.jpg
দৃশ্য, মাটির ময়না

‘মাটির ময়না’ ছবিটি বাংলাদেশে অনেকেই পছন্দ করিয়াছেন। অনেকে ইহার মধ্যে নতুন বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের নান্দীগান শুনিতে পাইয়াছেন। আমিও এই ছবিটি দেখিয়াছিলাম। আমার মনের কথাটি একদিন দুই স্তবক আকারে লিখিয়াও ফেলি। বলা বাহুল্য তিনি তাহা পছন্দ করেন নাই।

আমি কি লিখিয়াছিলাম তাহা এখন আমার মুখে আসিতেছে না। যাহাই লিখি না কেন, আমি এখনও বলিব ছবিটিতে যে ময়না মাটির নির্মিত, তাহাতে প্রাণের সঞ্চার করা কঠিন কাজ। সেই কাজে তিনি সফল হইয়াছেন কিনা তাহা বলিতে আরো সময় লাগিবে। তবে তিনি যে হাত দিয়াছিলেন তাহা আমাকে অবাক করে নাই।

বাংলাদেশে এসলামের সূচনা যে কারণেই হৌক, এসলাম প্রচারের কারণে বর্ণাশ্রম ধর্মের অবয়বে একটা বড় আঘাত নামিয়া আসে। দুঃখের মধ্যে, খোদ এসলামও এদেশে আসিয়া বর্ণাশ্রম ধর্মের আঘাতে খানিক পঙ্গু হইয়াছে। ১৯৪৭ সালের ইতিহাস বাদ দিয়া বর্তমানে বাংলাদেশের ইতিহাস সাধনা চলিতেছে। তারেক মাসুদের সাধনা তাহাকে পুরাপুরি মানিয়া লয় নাই।

বাংলাদেশে আমরা যে সাধনায় আজও সফল হই নাই–সেই মুক্তির সাধনায় তারেক মাসুদের নাম অক্ষয় অক্ষরে লিখিত থাকিবে। যে সাধনা প্রশ্ন জাগায় না, কেবল আবেগ উস্‌কাইয়া দেয় সে সাধনা ধর্মসাধনা মাত্র। আর যে সাধনা প্রশ্ন করে, ধর্মাচারের গোড়ার কথাও প্রকাশ করে তাহাকে বলে অর্থসাধনা।

আমার ভয় হয় তারেক মাসুদ কখনো ধর্মসাধনার পথে হাঁটিয়াছেন, আবার কখনো অর্থসাধনার খবর লইয়াছেন। আমার অপূর্ণ বুদ্ধিতে যতটুকু বুঝিয়াছি আমি ততটুকুই তাঁহার ধর্মসাধনার বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছি, কখনো অর্থসাধনার বিরুদ্ধে হাত তুলি নাই।

এখন তারেক মাসুদ আর সমুখে নাই। তাই এই কথাটি বিশেষ বলিবার আবশ্যক হইয়াছে। যৌবনের প্রারম্ভে–একটা কথা ভুলিয়া গিয়াছিলাম–আমরা দুইজনেই আহমদ ছফার পদতলে বসিয়া প্রজ্ঞা ভিক্ষা করিয়াছি। কিন্তু আমাদের পথ একসময় আলাদা হইয়া যায়।

তারপরও আজ আমি বলিব ঢাকা শহরে তারেক মাসুদ নাই বলিয়া এই শহরকে বসবাসের আরো অযোগ্য মনে হইতেছে।

৩০ শ্রাবণ ১৪১৮, রবিবার

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: সলিমুল্লাহ খান
ইমেইল: salim_khan@yahoo.com



আরো লেখা

তারেক মাসুদ: বন্দি পাখিটা কি মুক্তি পেল / ফাহমিদুল হক


তাহলে কি দেশপ্রেমই দায়ী! / আলম খোরশেদ



ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters


26 Responses

  1. আহমাদ মাযহার says:

    সলিমুল্লাহ খানের লেখাটি ভালো লাগল। তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

  2. আলমগীর says:

    সলিমুল্লাহ খানের লেখাটা খুব ভাল লাগল যেমনি ভাল লাগে সবসময় । অনেক পুরনো কথার ভঙ্গিটিই ভালো লাগলো।

    ”আমার অপূর্ণ বুদ্ধিতে যতটুকু বুঝিয়াছি আমি ততটুকুই তাঁহার ধর্মসাধনার বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছি, কখনো অর্থসাধনার বিরুদ্ধে হাত তুলি নাই।” বেশ ইন্তেরেস্তিং কথা কহিলেন।

  3. Faisal Ahmed says:

    সলিমুল্লাহ খানের লেখার মধ্য দিয়ে আবারো আমরা জানলাম তারেক মাসুদ কতোটা শিকড়সন্ধানী মানুষ ছিলেন। বাঙালী মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সন্ধানে তিনি সিনেমার মাধ্যমে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। গভীর ছিলো তার সাধনার জায়গা। এমন আত্মোৎসর্গীকৃত, নিবেদিতপ্রাণ, মেধাবী ও সাধক চলচ্চিত্রকারের প্রয়াণ আমাদের মাঝে কেবলই শূন্যতার অনুভূতিই সৃষ্টি করবে–আরো বহুকাল।

  4. তানবীর says:

    অসাধারণ পর্যবেক্ষণ!
    এবং অল্পকথায় যেন পুরো তারেক মাসুদকেই তুলে ধরা হলো।

  5. Mahabubur Rahaman says:

    “তারপরও আজ আমি বলিব ঢাকা শহরে তারেক মাসুদ নাই বলিয়া এই শহরকে বসবাসের আরো অযোগ্য মনে হইতেছে…”

  6. আবদুর রব says:

    অসাধারণ! এই স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে অনেক অকথিত দিক উঠে এসেছে। দেখলাম তারেক মাসুদ নামক একটি স্বপ্নের জন্ম ও তার অপমৃত্যুর চলচ্ছবি…

  7. খুব খুবই মন খারাপ হয়েছে তারেক মাসুদের অকাল মৃত্যুতে। ক্যাথারিন আর মাসুদের যুক্তসাধনায় ছেদ পড়িল। ছেদ পড়িল আমাদের সৃজনশীল সিনেমার উত্তরোত্তর অগ্রগতিতে… তারেক মাসুদ কোনো না কোনোভাবে আমাদের ব্যক্তিগত ব্ন্ধু আত্মার আত্মীয় ছিলেন। সলিমুল্লাহ খানকে ধন্যবাদ লেখাটির জন্য। তবে আরও ডিটেইল হলে ভাল লাগত।

  8. সরব says:

    ”তারেক মাসুদ এন্তেকাল করিয়াছেন। একা করেন নাই, সঙ্গে করিয়াছেন আরো চারিজন। তিনজন সঙ্গী গুরুতর জখম হইয়াছেন, একজন সামান্য।…”

    এরকম গুণী মানুষের মৃত্যু নিয়ে লেখার ধরন কি এরকম হওয়া উচিত?! কথার ধরন আমার কাছে ব্যঙ্গাত্মক মনে হয়েছে। উনি ইন্তেকাল না বলে এন্তেকাল, ইসলাম না বলে এসলাম লিখেছেন। এটা কি উনার টাইপিং মিসটেক নাকি ইচ্ছাকৃত? আমার কাছে মনে হলো ইচ্ছাকৃত। এই যদি হয় লেখকের মানসিকতা তাহলে আর কিছু বলার নেই। কারো মতের সাথে না মিললেই তাকে আঘাত করার মত নিম্নরুচির মানুষ কখনো মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। ইসলামকে এসলাম বলে আঘাত করা নিম্নরুচির বহিঃপ্রকাশ।

  9. salim ullah says:

    সলিমুল্লাহ খানের লেখা বরাবরের মতই ভাল। তবে একথাটা বুঝিলাম না “১৯৪৭ সালের ইতিহাস বাদ দিয়া বর্তমানে বাংলাদেশের ইতিহাস সাধনা চলিতেছে”। একটু বিশদ করিলে উপকৃত হতাম।

  10. আহমেদ রাসেল says:

    সলিমুল্লাহ খানের লেখাটি ভাল লেগেছে। তিনি ভিন্নধারার মানসিকতা পোষণ করেও তারেক মাসুদকে তার যোগ্য সম্মান দেখিয়েছেন, শিল্পী হিসেবে তারেক মাসুক যে শিকড়ের সন্ধানী এ লেখায় সে শিকড়টি যে কী তা বুঝতে আমাদের সুবিধা হয়েছে।
    লেখককে অনেক ধন্যবাদ।

  11. ফাহমিদুল হক says:

    শর্ট ফিল্ম ফোরামের অন্যছবি নামক পত্রিকায় প্রকাশিত মাটির ময়না লইয়া লেখকের ছয় (পাঁচ কি সাতও হইতে পারে) লাইনের মন্তব্যকে তারেক মাসুদ ব্যক্তিপর্যায়ের আলাপে ‘ফতোয়া’ বলিয়া রায় দিয়াছিলোন। ব্যাখ্যা এই ছিল সম্ভবত যে ভালো কেন হয় নাই তাহা একটু বিস্তারে বলা উচিত ছিল। লেখক ঐ ছবিটিকে ‘ওরিয়েন্টালিস্ট’ বলিয়া ক্রিটিক করিয়াছিলেন, যতদূর মনে পড়িতেছে। ক্ষুব্ধ তারেক মাসুদ বলিয়াছিলেন উহাকে তো আমিই ঐসকল (এডওয়ার্ড সাঈদ ইত্যাদি) বইপত্র সরবরাহ করিতাম, হদিস দিতাম। এই উত্তম রচনাটি বলিতেছে, কথাটি অসত্য নয়। বন্ধুকে শিক্ষক স্বীকার করিবার উদারতাটি আমাদিগকে মুগ্ধ করিতেছে। নচেৎ উভয়ের এককালের বন্ধুত্ব এবং এইকালের বিবাদ অনুজদের অস্বস্তি উপহার দেয়। একজন বিগত হওয়ায় এইসকল তথ্য ফাঁস করিলাম, বিবাদ বাড়াইয়া তুলিবার সম্ভাবনা নাই বলিয়া।

  12. Adnan says:

    ইসলামকে এসলাম, ইন্তেকালকে এন্তেকাল, এই যুগে সাধুভাষায় লেখা–সবই হলো তার আঁতলামির প্রমাণ।

  13. roksana says:

    সলিমুল্লাহ খান,
    তারেক মাসুদ, আপনি নিজে এবং অপনার আর বন্ধুরা সবাই এক এক জন ব্যতিক্রমী বাংলাদেশের বুকে। আপনার লেখা পড়ে, যৌবনের আপনাদের কথা অনেক বেশি মনে পড়ল। আপনাদের সেই সময়ের কথাগুলো আরো জানতে চাই, বিস্তারিত লিখবেন।

  14. Arshad says:

    খুব ভাল লাগল।

  15. ড. সলিমুল্লাহ খান তারেক মাসুদকে নিয়ে লিখে মনে হল একটা বড় দায়িত্ব পালন করেছেন। লেখায় কোনো রকম রাখঢাক করেননি। একজন প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, সলিমুল্লাহ খান তারেক মাসুদকে নিয়ে বিদ্রুপ করেছেন। আমার মনে হয় তিনি ভুল বুঝেছেন। সলিমুল্লাহ খান কিছু কিছু শব্দ ব্যবহার করেন যেগুলো আমরা করি না। যেমন, ইন্তেকালকে লেখেন এন্তেকাল, ইসলামকে লেখেন এসলাম, খ্রীস্টাব্দকে লেখেন ঈসালী সন ইত্যাদি। সলিমুল্লাহ খানের আগের কোনো লেখার সঙ্গে পরিচয় না থাকলে এ ধরনের মন্তব্য অনেকের পক্ষে করা সম্ভব।

    তারেক মাসুদকে ব্যঙ্গ করার সুযোগ নেই। তিনি অনেক উঁচু মাপের মানুষ। আহমদ ছফার বাড়িতে তাঁর গতায়াত ছিল নিয়মিত। তিনি আমার খুব কাছের মানুষ ছিলাম। তিনি যখন আমাদের বাড়িতে আসতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতেন। তাঁকে বহুবার লাল চা বানিয়ে খাওয়াবার সুযোগ আমার হয়েছে। কিছুদিন আগে প্রথম আলোর ছুটির দিনে ম্যাগাজিনে এক সাক্ষাৎকারে আহমদ ছফার দয়ার কথা স্মরণ করেছিলেন। এটা খুব কম মানুষই করেন। আমি জানি না, কতদিন তাঁর জন্য কাঁদতে হবে। আমার রক্তের সম্পর্কের বাইরের কোনো মানুষ আমাকে এ পর্যন্ত কাঁদাতে পারেননি, যেটি মাসুদ পেরেছেন।

  16. Shaheen says:

    সলিমুল্লাহ খান তারেক মাসুদের বন্ধু। এ লেখার মধ্যে তার প্রতি কোনো অসম্মান জানানো হয়নি। শেষ বাক্যটি পড়লেই তা বোধগম্য হবে। তারেক মাসুদ এবং মিশুক মুনীরের আত্মার প্রতি শুভেচ্ছা। বাংলাকে ভালোবাসার জন্য।

  17. খন্দকার মো. জাকির says:

    সলিমুল্লাহ খানের লেখা খুবই ভালো লাগলো। বিশেষ করে স্মৃতিচারণ। তারেক মাসুদের কাজ নিয়ে ভিন্ন মত থাকতেই পারে। সেটি এখানেও অস্বীকার করা হয় নি।

  18. ইফতেখার ইকবাল says:

    আরো একটি দারুণ লেখা লিখলেন জনাব সলিমুল্লাহ খান। প্রয়াত তারেক মাসুদকে নিবেদিত অনেক লেখার মধ্যে এটা অন্যতম হয়ে থাকবে। তবে অবাক হয়েছি যে তিনি ইতিহাস বিভাগকে অকারণে একহাত দেখিয়েছেন: “তিনি ইতিহাস বিভাগে পড়িতেন। এই পড়া তাহার চিন্তার পথে কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি করিতে পারে নাই। তারেক আমাকে কথাটা নিজেই বলিয়াছিলেন, ‘ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক হওয়া আমার লক্ষ্য নহে।’” তাহলে গত নব্বই বছর ধরে এই বিভাগে যারা পড়েছেন এবং পড়িয়েছেন তারা সবাই গাড়ল? আমার তো মনে হয় তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রে ইতিহাস মনস্কতার যে সৃষ্টিশীল ছোঁয়া তার উৎস ইতিহাস বিভাগই। না হলে ডিপার্টমেন্ট-এ ডিপার্টমেন্ট-এ তারেক মাসুদ জন্মগ্রহণ করত!

  19. Zahirul Islam says:

    ” প্রথম পরিচয়েই তারেক আমাকে বলিয়াছিলেন তিনি চলচ্চিত্রকেই জীবনের ধ্রুবতারা করিয়াছেন। আমাদের বন্ধুদের বেশির ভাগই যে যাহার ধ্রুবতারা হারাইয়া ফেলিয়াছেন। তারেক হারাইতে পারেন নাই।”

  20. mostofa monon says:

    ভাল লাগলো লেখাটি। সাধু ভাষার ব্যবহার অতটা প্রাণবন্ত মনে হয়নি।

  21. afsanul alam says:

    “”১৯৪৭ সালের ইতিহাস বাদ দিয়া বর্তমানে বাংলাদেশের ইতিহাস সাধনা চলিতেছে।“”
    “”আমার অপূর্ণ বুদ্ধিতে যতটুকু বুঝিয়াছি আমি ততটুকুই তাঁহার ধর্মসাধনার বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছি, কখনো অর্থসাধনার বিরুদ্ধে হাত তুলি নাই।”“
    কিংবা,
    “”বাংলাদেশের মুসলমান কৃষক–মজুর ও গৃহস্থ উভয় স্তরের কৃষকই–এসলাম ধর্মের সংস্কারকে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আদর্শ আকারে গ্রহণ করে। এই আন্দোলন বাংলাদেশে ‘ফরায়েজি’ নামে জাহির আছে।”

    এরকম টুকরা বাক্যাবলীতে এমন এক সলিমুল্লাহ খানকে দেখিতে পাইতেছি যাহা অন্তত বিডিনিউজ-এর মেহেরজান নিয়া আলোচনার সলিমুল্লাহ খান নহে। বুঝা যাইতেছে একই শরীরে হইলেও উহাতে দুইটা কম্পার্টমেন্ট বা বগিতে দুই সলিমুল্লাহ খান বিরাজ করিতেছেন। স্ববিরোধ ঠোকাঠুকি এড়াইতেছেন। এক বগিতে “১৯৪৭ সালের ইতিহাস বাদ দিয়া বর্তমানে বাংলাদেশের ইতিহাস সাধনা” রত, ”আর এক বগিতে বসিয়া“”১৯৪৭ সালের ইতিহাস সাথে লইয়া বর্তমানে বাংলাদেশের ইতিহাস সাধনা” — এভাবে দুই সলিমুল্লাহ কতদিন আমাদের মাঝে রাজত্ব করিবেন তা এক দেখার বিষয় বটে।

  22. গীতা দাস says:

    লেখাটি তারেক মাসুদের প্রতি আন্তরিকতা, সহমর্মিতা, আকুলতা ও ব্যাথায় ভরপুর, যা পাঠককে সংক্রামিত করতে পেরেছে।

  23. yusuf reza says:

    বিষয় ভাল। তবে এই জাতীয় লেখা বহু আগেই বাংলা ভাষা থেকে হিযরত করিয়াছে।

  24. নিজেকে অন্যদের চে’ আলাদা ভাবা ভাল কিন্তু সে জন্যে ভাড়ামোর প্রয়োজন কতটুকু বুঝতে পারছি না।

  25. সাধু!
    সলিমুল্লাহ খান সম্পর্কে যাদের বিন্দুমাত্র ধারনা নাই; তাদের তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য না করবার অনুরোধ রইলো।
    তারেক মাসুদকে আমাদের চেয়ে উনি অনেক বেশি জানেন; বোঝেন আর ভালোবাসেন। তাই তাঁর বক্তব্যের স্টাইল নিয়ে না ভেবে তাঁর গন্তব্য দেখুন।
    বন্ধুকে শিক্ষক মানলেন; মানলেন যে, তারিক মাসুদ তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা হারাননি এবং তাঁর অবর্তমানে এই নগরীকে বসবাসের অযোগ্য মনে করছেন। এর চেয়ে উন্নত স্বীকৃতি আর কি হতে পারে?
    কাঁদলেই কান্না হয় না …

  26. anik says:

    Khub bhalo laglo. notun kora bhata sekhilo. dhannabad for honor tarek masud.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.