সাহিত্য সমালোচনা ও সমালোচনা সাহিত্য

সেজান মাহমুদ | ৩০ জুন ২০১১ ১:০১ পূর্বাহ্ন


বাংলাদেশে সাহিত্য সমালোচনা বিষয়ক তর্ক-বিতর্ক বেশ তুঙ্গে। দৈনিকের সাহিত্য পাতার ফরমায়েশি লেখা, বয়োজ্যেষ্ঠ লেখকদের মননশীল ধারাভাষ্য থেকে শুরু করে প্রায়-আকাদেমীয় গবেষণাপত্রের মতো তথ্যনির্ভর পর্যালোচনা, আর আন্তর্জালে বা ইন্টারনেটে আসর গরম-করার মতো চুটকি আলোচনা সবই চলছে পুরোমাত্রায়। এই আলোচনা সমালোচনা যদি একটি যৌক্তিক ধারার দিকে যেতে বা চিন্তার মুক্তি ঘটাতে সাহায্য করে তাতে সাহিত্যের উপকার বই অপকার হবে না বলেই মনে হয়।

hahsrn.jpg……..
হাসান আজিজুল হক প্রসঙ্গে সেলিম রেজা নিউটনের পুনর্মুদ্রিত রচনা, ২০১০
…….
গত ২০০৭ সালে ২৯ জুন ও ২৩ জুলাই প্রথম আলোর সাহিত্য পাতায় কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের ‘সাহিত্য সমালোচনা কীভাবে সম্ভব” শিরোনামে দুই কিস্তির লেখা মুদ্রিত হয়েছিল।[] এর প্রেক্ষিতে সেলিম রেজা নিউটন-এর ‘চিন্তার সংকট সাহিত্যের স্বাধীনতা: মানুষের মুক্তি; প্রসঙ্গ হাসান আজিজুল হকের কার্তেসীয় পদ্ধতি এবং সাহিত্যে আত্নঘাতী বোমাবাজির প্রবণতা’ শিরোনামের এক দীর্ঘ লেখা প্রথম লিটল ম্যাগাজিন কাকতাড়ুয়ায় (২০০৮), পরে bdnews24.com-এর আর্টস বিভাগে পুনঃপ্রকাশিত হয় (২০১০)।[] দুটো লেখার ধরনের মধ্যে বিরাট ফারাক আছে; হাসান আজিজুল হক লিখেছিলেন একজন প্রাজ্ঞ সাহিত্যিকের সমালোচনা বিষয়ে ধারাভাষ্যের মতো করে, যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে দর্শনশাস্ত্রে শিক্ষকতার প্রভাব অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন কিন্তু প্রত্যক্ষ প্রভাব রেখেছে তাঁর লেখক সত্তা; অন্যদিকে নিউটন নিজেও সাংবাদিকতা এবং গণযোগাযোগের তরুণ শিক্ষক, তিনি দর্শনের পদ্ধতিগত ধারাকে ঠিক রেখে যুক্তির কাঠামো তৈরি করে যাচাই করে দেখতে চাইছেন কী আমাদের চিন্তার স্বরূপ, কী আমাদের গলতি আর তার মধ্য থেকে আমাদের নিজস্ব, স্বাধীন, চিন্তন ধারার সূচনা বা পরিস্ফূটন করা যায় কিনা (খুব সাধারণভাবে বললাম)।

srn11.jpg……..
সেলিম রেজা নিউটন
…….
প্রথমেই প্রশ্ন আসতে পারে একটি দৈনিক পত্রিকায় একজন প্রাজ্ঞ লেখকের অনেকটা ধারাভাষ্যের মতো লেখাকে পাল্টা একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণী, প্রায়-একাডেমিক লেখা দিয়ে আক্রমণ বা বিচার করা যথাযথ কি না? কেন এই প্রশ্ন? আমাদের সাহিত্য পাতায় কেউ গবেষণাপত্র লেখেন না, দর্শন বা সাহিত্য বিষয়ে তো নয়ই। এ কারণে হাসান আজিজুল হকের লেখার ধরন, যুক্তির কাঠামো অনেকটাই সাহিত্যের ক্লাসে মনোগ্রাহী বক্তৃতার মতো শোনালেও তাঁকে দোষ দেয়া যায় না। আগেই জানিয়ে রাখছি আমার এই লেখার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই এই দুই লেখকের সমালোচনা করা নয়। বরং এই সূচিত আলোচনার মধ্য থেকে কোন একটি দিকে আমার বিশ্লেষণ ধাবিত করা, যা থেকে হয়তো কিছু একটা বের হয়ে আসতে পারে—যা কারো কাছে দরকারি মনে হতে পারে, অথবা ভবিষ্যতের কোনো আলোচনার সূত্রপাত করতে পারে।

তবু খুব সংক্ষেপে দেখা যাক তিনি (হাসান আজিজুল হক) কী বলতে চেয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন সাহিত্যের সমালোচনা কি আদৌ সম্ভব? এখানে তিনি দেকার্তের পদ্ধতি অনুসরণ করে সন্দেহ, অস্বীকার করতে করতে একটি জায়গায় পৌঁছুনো যায় কিনা, যেখানে আর সন্দেহের কোন উপায় নেই—তা খতিয়ে দেখতে চেষ্টা করেছেন। হ্যাঁ, যেমন নিউটন উল্লেখ করেছেন, এই উপস্থাপনার মধ্যে সরলীকরণ আছে বৈকি। কিন্তু আমি পাঠক হিসাবে অনেক বেশি শ্রদ্ধা নিয়ে এই পদ্ধতিকে দেখবো যে এখানে হাসান আজিজুল হক যুক্তিবিদ্যার বা নিরঙ্কুশভাবে দর্শনের ইন্ডাক্টিভ বা ডাইডাক্টিভ কোন পদ্ধতির মধ্যে না গিয়েই যখন সাধারণভাবে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন, তখন তাঁর মাথায় সাহিত্য বা দর্শনের অনেক কিছু রেখেই তা করছেন। যা হোক, এভাবেই একসময় তিনি স্বীকার করে নেন যে, ‘শিল্পের গন্তব্য মানুষ… তাহলে মানুষের সাড়া পাওয়াটাই তার অস্ত্বিত্বের ভিত্তি। …সেই সাড়া প্রতিক্রিয়াকেই আলগাভাবে সমালোচনা বলা যেতে পারে।’ (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭)

নিউটন একই পদ্ধতিতে সেটার প্রতি সন্দেহ ছুঁড়ে দিতে পারেন, সন্দেহ করতে পারেন, এবং তা দিয়েছেন, করেছেন। তর্কের খাতিরে শুধু এখানে একটি কথা না বললেই নয়, তাহলে তো এই জগত-সংসার, বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড সবকিছু নিয়েই সন্দেহ করা যায়, বলা যায় এসবই ইলিউশন বা মায়া, আমাদের যে অস্তিত্ব আছে তারই তো কোনো নিশ্চয়তা নেই, তবে কীসের সাহিত্য? কিসের দর্শন? কিসের জ্ঞানকাণ্ডের আলোচনা। সকলই বৃথা। তার মানে যতই তত্ত্বজ্ঞানের দোহাই দিই বা না দিই না কেন, কোনো একটি জায়গায় আমাদের ঘুরে ফিরে আবার প্রয়োগবাদীও হতে হয় (যদিও সেখানেও তত্ত্বজ্ঞান!)।

এবার দেখা যাক সেলিম রেজা নিউটন কী বলতে চেয়েছেন? তিনি হাসান আজিজুল হকের চিন্তাপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যুক্তির অসঙ্গতি নিয়ে ইঙ্গিত করেছেন, এভাবে বাংলা সাহিত্যের অধিপতি-সাহিত্যধারার দশমহাবিদ্যার তালিকাও প্রস্তুত করেছেন। এই কাজটিকে প্রশংসার চোখে দেখতে হয়, কারণ, এখানে সাহিত্যের ‘স্ট্যাটাস ক্যু’কে প্রশ্নবিদ্ধ করা জরুরি ছিল। কিন্তু তা করতে গিয়ে নিউটন, ব্যক্তি হাসান আজিজুল হককে যেন ঠেসে ধরতে চেয়েছেন, তার পুরস্কার নেয়া না নেয়া, চশমা পরিহিত গালে হাত দেয়া ছবি বা পোজ, পাশাপাশি সমাজ-পরিবর্তন, শ্রেণিসংগ্রাম, ইত্যাদি বিষয় টেনে এনে লেখাটাকে একটি স্যুডো-একাডেমিক লেখায় পরিণত করেছেন। তাতেও এই লেখাটা থেকে নির্যাসটুকু নিতে কষ্ট হবে না। অন্তত এই আলোচনার জন্য। নিউটন যেখানে হাসান আজিজুল হকের সমালোচকদের বিরুদ্ধে বিষোদগার (…সমালোচক মিন মিন করে বা মহা আড়ম্বর করে যে রায় দিয়ে আত্মতৃপ্তি বোধ করেন, তার ভিত্তি কতটা মজবুত! তিনি শক্ত পায়ে দাঁড়াতে পারেন তো? ভাঁড়ের ভূমিকা নিতে হয় না তো তাকে?–হাসান আজিজুল হক, ২০০৭) কে ‘ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ’ মনে করছেন, সেই নিউটনই আবার সেই ছায়ার কায়াকে প্রতিপক্ষ বানালেন যখন তিনি (হাসান আজিজুল হক) জানালেন যে, ‘শিল্পের গন্তব্য মানুষ, তাহলে মানুষের সাড়া পাওয়াটাই তার অস্তিত্বের ভিত্তি’… সমালোচনা ছাড়া শিল্পই নাই, শিল্পের অস্তিত্বই নাই বলে। ঘুরে ফিরে কী দাঁড়াচ্ছে? একজন লেখকের শ্রেষ্ঠত্বের সাফাই গাইলেন? অন্যজন সমালোচকের, প্রকারান্তরে? সরলভাবে তা বললে খুব কি দোষ দেয়া যায়?

আমি বরং আরো গোড়াতে প্রশ্ন করি, কেউ কি এখানে একবারও খোলাসা করেছেন ‘সমালোচনা’ বলতে কী বুঝিয়েছেন এই দুই লেখায়? কেন এই মামুলি (?) প্রশ্নের উত্তর দেয়া জরুরি? এটা স্পষ্ট না হলে এই আলোচনা একটি শূন্য বিষয়-কেন্দ্রিক হতে বাধ্য এবং একারণেই কারো ব্যাখ্যাই কোনো স্বচ্ছতা নিয়ে হাজির হচ্ছে না। এই অস্বচ্ছতার মূল কারণ আলোচনার বা পর্যালোচনার স্তরের ভিন্নতা। এক সময় আমরা টেনে নিয়ে আসছি পৃথিবীর যাবতীয় তত্ত্বকথার উদাহরণ, আরেক সময় টেনে নিয়ে আসছি আমাদের সাহিত্যে বা বাংলা সাহিত্যে কী ঘটছে আর না ঘটছে তার বিবরণ, কোনো রকমের যুক্তির সাজুয্য না রেখেই। এতে বিষয়টা হয়ে যায় ’ঘ্যাগের ওপরে তারাবাতি’র মতো। তারাবাতিটি সুন্দর কিন্তু তা ঘ্যাগের ওপরে মানায় কিনা সেটাও তো দেখা দরকার। যেখানে সমগ্র বাংলা সাহিত্যে (বিশেষ করে বাংলাদেশের সাহিত্যে) সাহিত্য সমালোচনা বা সমালোচনা সাহিত্য কি এটাই নির্ধারিত হয় নি সেখানে পশ্চিমের তত্ত্বকথা টেনে এনেই কী আর না এনেই বা কী? এ কথা দর্শন এবং গণযোগাযোগের এই দুই শিক্ষক নিশ্চয়ই অস্বীকার করবেন না যে জ্ঞানতত্ত্বের পদ্ধতি, প্রণালীর ধারাবাহিকতা ইত্যাদি পশ্চিমারাই ধরে রেখেছে যদিও এই সূচনাটা এককভাবে তাদের হাতে ছিল না। যাক সে কথায় পরে আসছি। একটু গোড়াতে তাকালে দেখতে পাই, যেসব আলোচনা-বিশ্লেষণ ছাপা হচ্ছে তাতে একবার মনে হচ্ছে সাহিত্য সমালোচনা অর্থ হলো,

ক। পুস্তক পরিচিতি: হরহামেশা পত্রিকার পাতায় যা দেখা যায়, বইটি কে লিখলেন, গল্প বা কবিতা না উপন্যাস, কয় পৃষ্ঠার বই, প্রচ্ছদ কার আঁকা ইত্যাদির বিবরণ। বড়জোর বইয়ের মলাট থেকে কিয়দংশের উল্লেখ।

খ। বুক রিভিউ: পুস্তক পরিচিতির উপাদানের সঙ্গে সমালোচকের বিজ্ঞ মতামত, লেখকের ভাষা সবল-দুর্বল, ভোকাবুলারি কম-বেশি, আর বড়জোর নিজস্ব পারসেপশন-নির্ভর কিছু মন্তব্য।

গ। সাহিত্য সমালোচনা: পুস্তক পরিচিতি, রিভিউ এর উপাদানের সঙ্গে সমালোচক হয় চড়াও হয়ে খারিজ করে দিলেন লেখকের কর্মকে অথবা প্রশংসায় উচ্চ আসনে তুলে দিলেন, এমন কবিতা বা গল্প বা উপন্যাস লেখা হয় নি বিগত দশকে বা শতকে; এই লেখা লেখকের দ্রোহের প্রকাশ, আত্মজিজ্ঞাসার দলিল ইত্যাদি ইত্যাদি বলে।

ঘ। সমালোচনা সাহিত্যঃ সাহিত্যকে বিশ্লেষণ করে নতুন করে আবিষ্কার বা পাঠোদ্ধার করা, এক ধরনের মূল্যায়ন, কিন্তু তা সাহিত্যতত্ত্ব ও দর্শনের মধ্য দিয়ে সাহিত্য-দর্শনের পদ্ধতি, সাহিত্যের সামগ্রিক গন্তব্য বা ঠিকানার নান্দনিক রূপ বিশ্লেষণ করা।

সাহিত্য সমালোচনার একটা ইতিহাস তো আছে, ধ্রুপদী ধারা থেকে শুরু করে আজকের নতুন ধারার সমালোচনা পর্যন্ত একটা ছকে ফেলে যে কেউ সাহিত্য সমালোচনার একটা ধারাবাহিক প্রতিকৃতি তৈরি করতে পারবেন। আরিস্ততল-এর ‘পোয়েটিকস’ (খ্রীস্টপূর্ব ৪ শতাব্দী)[] বা তার সমসাময়িক ভরতমুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’[] কে যথাক্রমে কবিতার আর ভারতীয় সংস্কৃত নাটকের আদি সমালোচনা (ফরমাল) ধরে রেঁনেসা (ফ্রান্সিস বেকন এবং তৎসমুদয়), অ্যানলাইটেনমেন্ট (ডেভিড হিউম, কান্ট, মেরি উলস্টোনক্রাফট এবং তৎসমুদয়), ঊনবিংশ শতাব্দীর সমালোচনা (হেগেল, মার্ক্স, নিটশে, জন স্টুয়ার্ট মিল, তলস্তয় এবং তৎসমুদয়), নব্য সমালোচনা (ফ্রয়েড, স্যস্যুর, ইয়াকবসন, সার্ত্র, সিমন দ্য ব্যোভয়াঁ, দেরিদা, ফুকো, বার্থ, লাকাঁ, দেলুজ, বাখতিন, ফ্রেই, চমস্কি, সাইদ এবং তৎসমুদয়) থেকে এই প্রতিকৃতি বর্তমানের এক বিমূর্ত-প্রয়োগবাদী-ভাষার-আন্তর্জাতিকরণী-দর্শনাশ্রয়ী সমালোচনার পর্দায় ফেলে আলোচনা করা সম্ভব।

আবার ফিরে আসি হাসান আজিজুল হক এবং সেলিম রেজা নিউটন প্রসঙ্গে। কারণ, এই দুই প্রজন্মের দর্শন ও সাংবাদিকতার অধ্যাপকের কথাকে মন্থন করে, নতুন প্রশ্ন তুলেই আমার আলোচনার দিকধারা নির্ধারণ করে নিতে পারি। হাসান লিখেছেন, “ফুকো, দেরিদা কেউ যদি পড়তে চায়, তাকে আগে ফরাসি ভাষা শিখতে হবে–একথা বলা কি খুব অন্যায় হবে? আমি মনে করি সেটা খুব ঠিক কথা হবে। (নইলে)… শুধু অন্যের মুখে ঝাল খাওয়া হবে।” কিম্বা অন্যত্র বলেছেন, “ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত নতুন পৃথিবীর চিন্তা সংস্কৃতি দর্শন কোন কিছুরই সংস্পর্শে আমরা আসি নি।… তারপর আমাদের আধুনিক সাহিত্য শুরু হয়েছে, ভাষা ক্ষমতাশালী হয়েছে, বুদ্ধির চর্চা শুরু হয়েছে। ইহবাদী মন, মানবতাবাদী উপযোগবাদী কর্মপ্রয়াস, যুক্তিবাদী বিচার প্রবণতা, সুনির্দিষ্টভাবেই পশ্চিমনির্ভর, সন্দেহ নেই। আজ গর্ব করার মতো অনেক কিছু থাকলেও সেসব মৌলিকভাবে আমাদের নিজেদের নয়, বরং পড়ে-পাওয়া চৌদ্দ আনা পশ্চিমি বিদ্যা থেকেই আমাদের সব অর্জন।” (হাসান আজিজুল হক, ২০০৭)।

অন্যদিকে নিউটন বলেন, “লেখক-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা সার্বিকভাবে পশ্চিমা নয়া ঔপনিবেশিক সাহিত্য-থিওরির অনুরণন-সঞ্চারী। গোলামের আদিখ্যেতা-প্রসূত গোলামির জ্ঞানতন্ত্র তাঁদের জ্ঞানবিজ্ঞানের জোগানদাতা। ইঙ্গ-ইউরোপীয়-মার্কিনী-লাতিন জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন-সাহিত্য-পদ্ধতিতত্ত্বের শো-বিজের নিত্য নতুন তারকারাজি ও নক্ষত্রপুঞ্জর উত্থান-পতন তথা সুপারনোভা-ব্ল্যাকহোলে গর্ত এবং আতশবাজি তাদের চোখ ধাঁধায় আর উষ্টা খাওয়ায়। এদিকে মার্কস তো ওদিকে চিহ্ন, এদিকে ফুকো তো ওদিকে ফোকর, এদিকে লাঁকা তো ওদিকে ফাঁকা। অবস্থা সঙ্গীন। জনাব সাহিত্যিক শ্রীমান সমালোচককে উড়িয়ে দিচ্ছেন কারণ ঐ দিক থেকে আসা থিওরি-ফোয়ারা নাকি সে-রকমই বলছে। ইত্যাদি। আবার, গোলামির জ্ঞানতন্ত্র শুধু গোলামের আদিখ্যেতা-প্রসূতই নয়, কর্তার সর্বকারকতা-হেতুও বটে।” (সেলিম রেজা নিউটন, ২০০৮, ২০১০)

এই দুই মনোভঙ্গি বা প্রতিন্যাসই তো মুক্ত, স্বাধীন চিন্তার পরিপন্থী! জ্ঞান, সত্য তা পশ্চিম-পূর্ব-উত্তর-দক্ষিণ যেখান থেকেই আসুক না কেন, তাতে কিছু যায় আসে কি? নিজস্বতার সন্ধান, বা চিন্তন পদ্ধতির শেকড় খুঁজে নিজেদের অহংবোধকে উন্নত রাখা যায়, তাতে অন্যায় কিছু নেই, প্রশ্ন হলো সাহিত্যের সমালোচনা বা সমালোচনা পদ্ধতিতে সেই শেকড়ের অবস্থান, তার বিবর্তন, পরিস্ফূটন, বর্ধন-মার্জন হয়েছে কিনা তাও-ও তো খতিয়ে দেখার বিষয়। জ্ঞান বা জ্ঞানের পদ্ধতি তো স্থবির না। সাহিত্য বলি, দর্শন বলি বিজ্ঞানমনস্কতা না নিয়ে কোনোটাই আগাতে পারে নি, বা বলা যায় বিজ্ঞানের দর্শন, দর্শনেরও বিজ্ঞান জন্ম নিয়েছে। পশ্চিমের বেলায় তা আরো বেশি প্রযোজ্য। আরিস্ততল-এর ‘পোয়েটিকস’ আর ভরতমুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’ পাশাপাশি রেখে কি এক ধরনের তুল্য-বিচার করা যায়? যদিও ‘পোয়েটিকস’ সরাসরি সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত হলেও ‘নাট্যশাস্ত্র’ বরং পারফরমিং আর্টসের সঙ্গে যুক্ত, তবু এক শাখার শিল্পবিচারের সঙ্গে অন্য শাখার কোথাও কোথাও মিল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। যেমন ’নাট্যশাস্ত্রে’র অন্তর্গত সংগীত, নৃত্য আর অভিনয়কলার নন্দনতত্ত্ব বহুলাংশে কবিতার নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। অন্যদিকে এই দুই প্রাচীন সমালোচনা তত্ত্বের টেক্সট বা আদিপাঠকে নানাভাবে পাশাপাশি রেখে আলোচনা, বিশ্লেষণ করে দেখা যায়। যদিও আবির্ভাবের কালের দিক থেকে এই দুই টেক্সট সমসাময়িক, কিন্তু স্রষ্টার চরিত্রের দিক থেকে একেবারেই আলাদা। আরিস্ততল ছিলেন ঐতিহাসিক চরিত্র, দার্শনিক, লেখক যার আদিপাঠ সমৃদ্ধতর হয়েছে পাশ্চাত্যের বস্তুবিজ্ঞান, রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান, নন্দনতত্ত্ব, এবং ধর্মতত্ত্বের উৎকর্ষের আলোকে। এই দার্শনিকের লেখাকে প্রায় দুই শতকের বেশি সময় ধরে তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে ঝালাই-বাছাই করা হয়েছে। তাঁর বিশেষত্ব ছিল জ্ঞানকে বিভক্ত করে প্রতীয়মান অংশকে শনাক্তকরণ পদ্ধতি আর দুই বাক্যের মধ্য থেকে মৌল সিদ্ধান্তে উপনীত হবার পদ্ধতি আবিষ্কারে। অন্যদিকে ভরতমুনি উপকথাভিত্তিক ঐতিহাসিক চরিত্র, যিনি কে বা কারা ছিলেন তা আদৌ জানার উপায় নেই। তাছাড়া যেহেতু এটা ছিল নাট্যশাস্ত্র, শাস্ত্র অর্থই তা ছিল ঐশ্বরিক, ঈশ্বর প্রদত্ত আদিপাঠ, যা সংস্কৃত থেকে অনুবাদ করলে প্রায় তিনশ পয়তাল্লিশ পৃষ্ঠার বিস্তৃত বর্ণনা, নির্দেশনায় ঠাসা, অন্যদিকে ‘পোয়েটিকস’ ইংরেজিতে অনুবাদ করার পর মাত্র তিরিশ পৃষ্ঠার স্বল্পভাষিতার আদিপাঠ, কেউ কেউ মনে করেন যে এগুলো আদৌ আরিস্ততলের লেখা নয়, বরং তার বক্তৃতা থেকে ছাত্রদের লিখিত নোট।[] তবু এই পোয়েটিকসকে ভিত্তি করে পশ্চিমা নন্দনতত্ত্ব, সমালোচনা তত্ত্ব নানান শাখা-প্রশাখায় অনুসরণ করে আজকের উত্তরাধুনিক সাহিত্যতত্ত্বে এসে ঠেস দেয়া যায়। অন্যদিকে ‘নাট্যশাস্ত্র’ থেকে কি কোনো ধারাবাহিক পদ্ধতিগত পরিস্ফূটন ঘটেছে, শিল্প বিচারে বা সাহিত্য বিচারে? প্রত্যক্ষবাদী, অভিজ্ঞতাবাদী বা নৈরাজ্যবাদী যা-ই সমর্থন করি না কেন, এই ধারাবাহিকতার সূত্র এবং এই ধারাবাহিকতাহীনতার উপাদানগুলোর মধ্যেই নিজস্ব সাহিত্য-বিচার, সমালোচনাতত্ত্বের ভেদ-বিভেদ আবিষ্কার করা সম্ভব; এখানে পশ্চিমা জ্ঞান—দক্ষিণা জ্ঞানে ভেদ বিচার বরং মুক্তচিন্তার পরিপন্থী।

সাহিত্য কি বা কোনো কিছু আদৌ সাহিত্য হয়ে উঠলো কি না এই বিচারের পদ্ধতি, সাহিত্যের উপাদান যেমন–গঠন, শৈলী, নান্দনিকতা, বিষয়, দর্শন, ভাষা, এরকম নানা রকমের উপাদানের ভূমিকা, কখনও কখনও একটি উপাদানের ওপরে অন্যগুলোর বা অন্যটির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তো সাহিত্যতত্ত্বের নানান শাখা প্রশাখাও সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এ যুগে, অন্তত পশ্চিমা বিশ্বে সমালোচনা সাহিত্য মূলত সাহিত্যতত্ত্বের বা দর্শনের আলোচনাকেই নির্দেশ করে। এজন্য একটু পশ্চিমা ধারাগুলোকে ধারাবাহিকভাবে খতিয়ে দেখলে আমার নিজস্ব চিন্তার প্রবাহটাকে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে সুবিধা হবে।

এক সময় সাহিত্য ছিল ক্ষমতাশালী, বিত্তবানদের বিনোদন, সাহিত্য ছিল ঈশ্বরের স্তুতি বা ক্ষমতাবানের কীর্তি বিনির্মাণের কাজ। তাই সাহিত্যে এসেছে ইতিহাস, এসেছে আদর্শবাদ। এই আদর্শবাদ কিম্বা মানব চৈতন্যের হোতারা আবার ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হলেন কীভাবে মানব মন তার বাইরে বস্তুকেও জানতে পারে। এজন্য পশ্চিমা বিশ্বে কান্টের প্রভাবকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে এসেছে ফেনোমেনোলজি।[] সাহিত্যে এই ফেনোমেনোলজির পদ্ধতিতে সাহিত্য বিচারের প্রভাব দেখা যায় রুশ ফরমালিস্টদের মধ্যে। বিংশ শতাব্দীর চল্লিশ-পঞ্চাশ দশকের তথাকথিত ‘জেনেভা সমালোচনা’র ধারা এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল বলা যায়। যেমন হুসসার্ল-এর পদ্ধতি ছিল সাহিত্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, লেখক, পাঠকপ্রিয়তা ইত্যাদি টেক্সটের বাইরের সব বাদ দিয়ে শুধু মাত্র ‘টেক্সট’কে লেখকের চৈতন্য হিসেবে দেখা বা বিচার করা। অন্যদিকে একদল আমেরিকান সমালোচক এই ধারার সঙ্গে একটি শর্ত যুক্ত করে নতুন ধরনের সাহিত্যের ‘ব্যাখ্যানের বৈধতা’ বা সপ্রমাণতার দাবি জানালেন। তাদের মতে একটি সাহিত্যকর্মকে নানান ব্যাখ্যান দেয়া যায়, তবে যত ব্যাখ্যাই দেয়া হোক না কেন, তা লেখক কী বোঝাতে চেয়েছেন সেই সিস্টেমের মধ্যে পড়ার বেশি সম্ভাবনা থাকতে হবে। এটা অনেকটা বৈজ্ঞানিক এক্সপেরিমেন্ট বা গবেষণার মতো যেখানে ‘কনফিডেন্স ইন্টারভেল’ বলে একটি বিষয় আছে। যা দিয়ে বলা হয় একটি ঘটনা যদি একশ বার পরীক্ষা করে দেখা হয় তবে শতকরা ৯৫ ভাগ সময়ে তা একটি নির্দ্দিষ্ট ‘ইন্টারভেল’ এর মধ্যে পড়বে, বাকি পাঁচ বার তা কাকতালীয় ভাবে ঘটতে পারে। এই শতকরা ৯৫ ভাগ সময়ে ঘটার সম্ভাবনা থাকলেই তা শুধু বিজ্ঞান গ্রহণ করে। এই ধারার অন্যতম তাত্ত্বিক ই.ডি. হিরশ তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ভ্যালিডিটি অব ইন্টারপ্রিটেশন বইতে বিস্তর লিখেছেন এবং বলার চেষ্টা করেছেন কীভাবে এই ‘লেখক কী বলতে চেয়েছেন’-এর নানান রকমের প্রকারভেদ হতে পারে যাকে তিনি নাম দিয়েছেন টেক্সটের ‘অন্তর্নিহিত জেনরে’।[] এই ধারাটির সাম্প্রতিককালের একটি শাখাকে বলা যায় ‘রিসেপশন তত্ত্ব‘ যেখানে পাঠককে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেয়া হয়েছে যা আগের তত্ত্বগুলোতে একেবারেই স্থান পায় নি। কিন্তু এখানেও পাঠকের প্রস্তুতির কথা আছে, যেমন উলফ্যাং আইজার তাঁর দ্য এক্ট অব রিডিং[] গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে পাঠককে সাহিত্যের কলাকৌশলের সঙ্গে পরিচিত হতে হয়, রীতি-নীতি, অর্থবোধের প্রবাহের সঙ্গে আত্মীয়তা করতে হয়। এর অর্থ আবার পাঠককে উপেক্ষা করা না। পাঠকের সম্ভাবনাও অফুরন্ত, পাঠক যুগে যুগে আবিষ্কার করবেন একেক জন লেখককে, একেকভাবে। সেই অমিত সম্ভাবনার কাছে, যুগজয়িতার কাছে লেখককে আত্মসমর্পণ করতেই হবে, কিন্তু লেখক পাঠকের কাছে আত্মসমর্পণ করে লিখবেন না। আইজার-এর মতো সমালোচকদের কাছে তাই সবচেয়ে শক্তিশালী লেখা সেইটি যা পাঠককে এক নতুন সমালোচনার সজ্ঞানতার দিকে তাড়িত করে, যা পাঠকের প্রথা ও প্রত্যাশার গৃহীত নীতিমালাকে তছনছ করে দেয়। এই ধরনের সমালোচনাকে কি মুক্ত, মানবিক আদর্শবাদভিত্তিক বলা যায়? হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে বলা যায়। এই ধারার সীমাবদ্ধতা বোঝার জন্য এই একই ‘রিসেপশন তত্ত্বে’র আরেক ধারক ফরাশি দার্শনিক, সাহিত্য সমালোচক রঁলা বার্থ-এর ধারায় আসা যাক। তিনি তাঁর দ্য প্লেজার অব দা টেক্সট গ্রন্থে আইজার-এর একেবারে বিপরীত অবস্থান নিয়ে ভাষার নির্দিষ্ট অর্থকে দ্রবীভূত করে দিয়ে শব্দের মুক্ত অর্থের খেলা খেলেন, এভাবে ভাষার বিরামহীন, অধরা ব্যঞ্জনার মধ্য দিয়ে অবদমিত চিন্তাপদ্ধতিকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার প্রয়াস পেয়েছেন।[] এজন্য কেউ কেউ তাকে হিডানিস্ট বা প্রেয়োবাদীও বলে থাকেন। কিন্তু বার্থকে বুঝতে হবে, ব্যাখ্যা করতে হবে আরও গভীরভাবে, গোড়া থেকে; সে কথায় পরে আসছি।

হুসসার্লের পরাতত্ত্ব যেখানে ‘আমি’র বোধ এবং উপলব্ধির মধ্যে জ্ঞানের সম্পূর্ণতা খোঁজে (দেকার্তের উক্তির কথা মনে পড়ে কি? ‘আই থিঙ্ক, দেয়ারফোর আই অ্যাম’), সেখানে হাইডেগার কিন্তু জ্ঞানের সম্ভবপরতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য ‘চেতনা’র বদলে ‘সত্তা’কে কেন্দ্র করে নিলেন (বিইং এন্ড টাইম, ১৯২৭)।[১০] এই সত্তা কেন্দ্র হবার কারণেই আবার ভাষার গুরুত্ব অন্য রকম হয়ে যায়। সে কৃতিত্বও হাইডেগারকেই দেয়া যায়। তিনি ব্যাখ্যা করেন ভাষার স্বাধীন, স্বাবলম্ব অস্তিত্ব, মানুষের সকল চিন্তা, দর্শন, সমালোচনা, বিশ্লেষণ সবকিছু প্রকাশের কলকাঠি এই ভাষা, ভাষা এক পরিমাপহীন সম্ভাবনা-ভাষা হলো ভাষা। এই নিয়ে আরেক ফরাসি তাত্ত্বিক জাক লাকাঁ আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। নব্য সমালোচনা আধুনিক বিজ্ঞান আর শিল্পায়নের যুগে যথেষ্ট পরিশীলিত শৈলীর মাধ্যমে নিজের কর্ম সাধন করলেও এই ধারাতে এককভাবে টেক্সটের প্রতি অবসেসিভ মনোযোগ দেয়ায় সাহিত্যের বিস্তৃত, কাঠামোগত দিকটি উপেক্ষিত হয়েছে। সাহিত্য যে শুধু একটি সামাজিক অনুশীলন নয়, বরং নান্দনিক সামগ্রী তা বোঝাতে ঠিক যেন সাহিত্যের সকল শাখার সামগ্রিকীকরণ করে নরথ্রোপ ফ্রেই লিখলেন অ্যানাটমি অব ক্রিটিসিজম (১৯৫৭)।[১১] ফ্রেই আত্মনিষ্ঠ বিচার, আত্মগত পারসেপশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলেন যে সাহিত্য নিজেই ইতিহাস সৃষ্টি করে, পদ্ধতি তৈরি করে। এখানে ব্যক্তির নিজস্ব বিচার বা ভ্যালু জাজমেন্টকে সাহিত্য সমালোচনার পথ থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। সাহিত্য হলো একটি সুসংবদ্ধ, নিশ্ছিদ্র কাঠামো যার ভেতরে সাহিত্য ছাড়া আর কিছু ঢুকতেই পারবে না। এভাবে একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটবে নতুন নতুন দ্যোতনায়। অনেকটা পরিবেশবাদীদের রিসাইক্লিং-এর মতো। যদিও এই চিন্তন পদ্ধতিতে ইতিহাসের প্রতিও এক ধরনের বীতশ্রদ্ধতা আছে, তবু ফ্রেই মনে করেন, একমাত্র সাহিত্যেই আমরা থাকবো স্বাধীন আর সাহিত্য হবে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার কল্পিত বিকল্প। তাঁর এই তত্ত্বের ‘সায়ন্টিফিক ইমপালস’ নব্য সমালোচকদের চেয়ে বরং ফরমালিস্টদের কাছে বেশি পূর্ণকায়া দাবি রাখে। এ কারণেই বোধহয় দেখা যায় এর পরপরেই ষাটের দিকে ফারদিনান্দ স্যস্যুর-এর ‘কোর্স ইন জেনারেল লিংগুয়িস্টিক’ (১৯১৬)[১২]-এর ওপরে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ‘প্রাগ লিংগুয়িস্টিক সার্কেল’ (১৯২৬)[১৩] এর প্রতিষ্ঠা, আর ইয়াকবসন, জাঁ মুকারভস্কি, ফেলিক্স ভদিকা এবং অন্যান্যের হাত ধরে ফরমালিজম থেকে স্ট্রাকচারালিজম-এর উত্থান ঘটছে (১৯৬০)। স্ট্রাকচারালিজম-এ সাহিত্যের আধেয় বা উপাদানের চেয়ে আঙ্গিকের গুরুত্ব বেশি হয়ে ওঠে, এক পর্যায়ে তা সেই উপাদানকেই বর্ণনার কাঠামো বা স্ট্রাকচার হিসেবে প্রতিভাত করে। কবিতার ক্ষেত্রে তা আরও বেশি। সস্যুর যেখানে ভাষাকে ‘ব্যবধানরাশির এক সিস্টেম’ বলেন সেখানেই রুশ সেমিওটিশিয়ান ইউরি লতমান ‘দ্য স্ট্রাকচার অব দা আর্টিস্টিক টেক্সট’ (১৯৭০)[১৪] এবং ‘দ্য অ্যানালিসিস অব দা পোয়েটিক টেক্সট’(১৯৭২)[১৫]-এ তুলে ধরেন কীভাবে টেক্সটের অর্থ প্রাসঙ্গিকতার মধ্য দিয়ে বৈপরীত্য নিয়ে সমান্তরালে অবস্থান করে। যাকে স+9857৮৭স্যুরিয়ান ‘ডিফারেন্স’ অনুষঙ্গ বলা যায়। ইউরির মতে টেক্সট হলো ‘সিস্টেম অব এ সিস্টেম’। কিন্তু তিনি মনে করেন না যে কবিতা বা সাহিত্যের ভাষার অন্তর্গত গুণাবলী দিয়ে তার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা সম্ভব। কারণ, ভাষা শুধুমাত্র নিজের অন্তর্গত সাংসিদ্ধিক (ইনহিয়ারেন্ট) অর্থই বহন করে না, তা টেক্সটের ভেতরে আরো ব্যাপক সিস্টেমের অর্থকেও ধারণ করে। এভাবে তিনি পাঠককে আবার সামনে নিয়ে আসেন যে পাঠক তার গ্রহণের নীতিমালা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট টেক্সটের পটভূমিতে অন্তর্গত অর্থ উদ্ধার করে নেয়। এখানেও কিন্তু সেই পাঠকের প্রস্তুতির প্রশ্ন আসে, পাঠকের গ্রহণের নীতিমালা বা ‘রেসেপ্টিভ কোডস’ তো অনেক বিষয়ের ওপরে নির্ভরশীল। এ কারণেই বোধকরি স্ট্রাকচারালিজমে ‘আদর্শ পাঠক’ বা ‘আইডিয়াল রিডার’ আর ‘খাসা পাঠক’ বা ‘সুপার রিডার’-এর কথা বলা আছে [১৬] যা মূলত নোওম চমস্কির পাঠকের ‘ভাষাগত সামর্থ্য’ বা ‘লিঙ্গুয়িস্টিক কম্পিটেন্স’ নামক প্রতিন্যাসের ওপরে ভিত্তি করে সৃষ্ট।[১৭]

বলাই বাহুল্য, স্ট্রাকচারালিজমের সীমাবদ্ধতাই পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজমের জন্ম দিয়েছে। দেরিদা ভাষার শব্দরাশির অর্থের এই ব্যবধান বা ডিফারেন্স অনুষঙ্গ নিয়ে প্রমাণ করেন যে এই নির্দিষ্ট ব্যবধান বা বৈপরীত্য আসলে পরাতাত্ত্বিক বা মেটাফিজিক্যাল এবং তাকে ভেঙে দেয়ার খেলাই সাহিত্যের অনির্বচনীয়, সীমাহীন আনন্দ ও আবিষ্কার। দেরিদার ডিকনস্ট্রাকশন বা বিনির্মাণতত্ত্ব টেক্সটের অমিত সম্ভাবনাকে কেন্দ্রে রেখে মানব সম্ভাবনাকেও এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এ কারণে লেখক লেখার শেষে কেন্দ্র থেকে (টেক্সট?) সরে যান, সরে যায় তার বিশ্বাস, সংস্কার সবকিছু, শুধু থেকে যায় লিখিত টেক্সট বা আদিপাঠ। এই ভাষায় কেন্দ্রীভূত জীবনের সারাৎসার–তা তো আমাদের বিকশিত করে, পুনঃনির্মাণ করে, পুনরাবিষ্কৃত করে, তবু সেই ভাষার অর্থ অস্থির, অধরা, অনধিগম্য থেকে যায়। এই মানবজীবন, জাগতিক ব্যাপার স্যাপার যেমন বহুলাংশে ছায়াময়, দুর্জ্ঞেয়, লুপ্ত, তেমনি ভাষার প্রতিটি নতুন নতুন দ্যোতনা, তাৎপর্য বহুলাংশে ছায়াময়, দুর্জ্ঞেয়, লুপ্ত।[১৮],[১৯] এর অন্বেষণই কি সাহিত্য? সৃজনশীলতার মোক্ষধাম? হাসান আজিজুল হক একবার বলেছিলেন, […বাস্তবকে বিমূর্ত করা আমি বলবো না, বরং বাস্তবতাকে আরেক রকমের উপরে নিয়ে প্রচুর পরিমাণে প্রতীকী ব্যঞ্জনা, প্রতীকী ধারণা, প্রতীকী সত্য আরেকভাবে তার মধ্যে ভরে দেয়া হয়েছে। যেটা, আমার মনে হয় সৃজনের জায়গাটাও তাই। সৃজনশীলতা কিন্তু আর কিছুই না—একটা ভয়ঙ্কর, বিশাল শূন্যতা ও সম্ভাবনা। সৃজন কোন নির্দিষ্ট বিষয় নয়। যে লিখতে যায় সে জানে, যে আঁকতে যায় সে জানে; সে হাবুডুবু খায় এবং সে বোঝে যে এর কোন অন্ত নেই, মহাবিশ্বের যেমন অন্ত নেই। সৃজনের জায়গাটারও কোন অন্ত নেই, সেখান থেকে একটা জায়গাকে খুপড়ি কেটে আলাদা করে সেইখানটাকে পুরণ করতে হয়, একটু একটু করে।–হাসান আজিজুল হক, ‘অগ্নিবালক’ নিয়ে আলোচনা, ২০০৯] [২০]
এই ছায়ামায়, দুর্জ্ঞেয়, লুপ্ত মানবিক ব্যাপার-স্যাপারের অন্বেষণ শুধু সৃজনশীলতার মোক্ষধামই না; বরং এটাকেই বলা যায় এ যুগের দর্শনের সূত্র, তাকে কেউ উত্তরাধুনিকতা বলতে চাইলেও বলতে পারেন। আমি সেরকম কোন নামে বিশ্বাসী নই, আমার কাছে তা ট্রুইজম।
বার্থ যেমন শুরুর দিকে কট্টর স্ট্রাকচারালিস্ট ছিলেন যার প্রতিফলন দেখা যায় ‘মিথোলজিস’ (১৯৫৭)[২১], ‘এলিমেন্টস অব সেমিওলজি’ (১৯৬৪)[২২] এবং ‘সিস্টেম ডে লা মোড’ (১৯৬৭)[২৩] গ্রন্থে। কিন্তু বার্থেরও বিবর্তন হয়েছে, তবু তিনি ‘সাহিত্যের বিজ্ঞান’ (যাকে বার্থ মনে করতেন শুধু মাত্র আঙ্গিকের বিজ্ঞান, উপাদানের বিজ্ঞান না) এর সম্ভাবনায় বিশ্বাস করতেন, যেমন করেছেন মিখাইল বাখতিন, কিন্তু আরো বেশি বিজ্ঞানসন্মতভাবে। বার্থ-এর মতে লেখক নামের শক্তিশালী এক অবয়বের সৃষ্টি এই সমাজ ব্যবস্থা, বিশেষ করে মধ্যযুগীয় ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ, সামন্ত প্রভু অথবা পূঁজির ক্ষয়িষ্ণু রক্ষকেরা। সাধারণ সংস্কৃতিতে (যেমন, বাঙালি সংস্কৃতি) সাহিত্য বলতেই একনায়কীয় কেন্দ্রিক লেখকের কথা চলে আসে, তার ব্যক্তিত্ব, জীবন, রুচি, মোহময়তা। যেমন রবীন্দ্রনাথ, যেমন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। অথচ নতুন ধারার সাহিত্য সমালোচনায় ‘মানুষ বোদলেয়ারের’ ব্যর্থতাই বোদলেয়ার এর প্রকৃত সৃষ্টি, ভ্যান ঘগ এর পাগলামি কিম্বা চাইকোভস্কির করুণ মৃত্যু আর তাঁর সাগরেদদের মধ্যেই তাঁর অতুলনীয় সংগীতের অমরত্ব। অথচ প্রথাগত সমালোচনায় কমবেশি শোনা যায় একই ব্যক্তির একক কন্ঠস্বর–লেখক, যা আমাদেরকে আবদ্ধ করে রাখে। এই লেখক কে যখন সারিয়ে নেয়া হয় তখন লেখা আর শুধু একটি ঐতিহাসিক তথ্যাধার বা লেখকের লেখার কাজ হিসাবে থাকে না, পরিণত হয় পরিপূর্ণভাবে আধুনিক টেক্সট-এ; কিন্তু বার্থের মতে এটা শুধু টেক্সট না, লেখার সঙ্গে সঙ্গেই পরিণত হয় আধুনিক স্ক্রীপ্টরে। যখন লেখক কে সরিয়ে নেয়া হয় তখন এই টেক্সটকে ডিসাইফার করা হয়ে ওঠে আরো অর্থবহ। এভাবে লেখকের মৃত্যু ঘটে লেখার মধ্য দিয়েই, লেখার বহুমাত্রিকতাও আসে।[২৪] বার্থের এই ‘লেখকের মৃত্যু’ আর ‘পাঠকের জন্ম’ সাহিত্যের ইতিহাসে বোধকরি সবচেয়ে ‘ভুল পঠিত’ প্রতিন্যাস বা নৌশন। এমন কি পাশ্চাত্যেও এই ভুল পাঠের ফল হিসেবে সাহিত্যের আধুনিক শিল্পিত বয়ানের বিপরীতে খুব জনপ্রিয় ধাঁচের বয়ানের আন্দোলন কদাচিৎ দেখা গিয়েছিল; কারণ যুক্তি একটিই, সৃজনশীলতা তো পাঠকের হাতের শিল্প (ক্রিয়েটিভিটি ইজ নাও দ্য আর্ট অব দ্য বিহোল্ডার)। সুতরাং যেভাবে পারো পাঠক পাও। বলাই বাহুল্য এমন কি বার্থ নিজেও এই ধারণায় লজ্জায় পড়তেন। সম্প্রতি ইতালিয় দার্শনিক জর্জিও এগাম্বেন ‘দ্য অথর এজ জেসচার’ শিরোনামের প্রবন্ধে বার্থের ‘ডেথ অব দ্য অথর’ এবং মিশেল ফুকোর ‘হোয়াট ইজ এন অথর’ লেখা দুটোর নতুন পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করে দেখিয়েছেন কীভাবে এই ‘ভুল পাঠ’ সাহিত্য সমালোচনায় নেতিবাচক প্রভাব রেখেছে। মূলতঃ লেখকের মৃত্যু মানে হলো লেখকের কর্তা হিসেবে উপস্থিতি না থেকে টেক্সটের পাঠোদ্ধারে লেখকের ট্রানসেন্ডেন্টল (সীমাতিক্রম্য) উপস্থিতিকে অর্থবহ করা।[২৫]

লাকাঁর সাইকো-এনালিসিস নিয়ে বাংলায় লিখতে গিয়ে ‘মতিবিভাজনের’ যে বিভ্রাট তা নিয়ে আগেই উল্লেখ করেছিলাম যে মতির বিভাজনের চেয়ে সত্তার বিভাজন কতটা যুক্তিগ্রাহ্য (তত্ত্বজ্ঞান ও মতিবিভাজন, সলিমুল্লাহ খান, ২০০৭)।[২৬]সেখানে আরও উল্লেখ করেছিলাম লাকাঁর তাত্ত্বিক ভিত্তির একটি অনুষঙ্গে লালনের ‘আরশী নগরের পরশী’র কথা (তত্ত্বজ্ঞান ও মতিবিভাজন এর অংগ বিভাজন, সেজান মাহমুদ, ২০০৭)।[২৭ ] সত্তা এবং এই আধেয়, অধরা অনুষঙ্গ এদুটোই খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তথাকথিত উত্তরাধুনিক সাহিত্য তত্ত্বে। বলাই বাহুল্য, একারণেই লাঁকা দেকার্তের বিখ্যাত উক্তিটিকে পুনরায় লেখেন এভাবেঃ ‘আই থিঙ্ক দেয়ারফোর আই এম’ = ‘আই এম নট হোয়ার আই থিঙ্ক, এন্ড আই থিঙ্ক হোয়ার আই এম নট’। এই পর্যালোচনায় না গিয়ে শুধু এটুকু বলা যায় যে লাকাঁর পদ্ধতিতে শুধু একটি লেখার চরিত্রের সাইকো-এনালিসিস করাই সম্ভব নয়, লেখকেরও সাইকো-এনালিসিস করা সম্ভব। ফ্রয়েডের ‘আর্ট এন্ড সাইকো-এনালিসিস’ নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন ভাইগতস্কি এই বলে যে ‘ফ্রয়েড যেভাবে শিল্পের বিচার করেছেন যেখানে শিল্পের ওপরে সমাজের ভূমিকা খর্ব করা হয়েছে’ (দ্য সাইকোলজি অব আর্ট, ১৯৭১)।[২৮] ভাইগতস্কি নিজে ছিলেন একাধারে সাহিত্যের শিক্ষক, অন্যদিকে ভাষাবিদ এবং মনোবিজ্ঞানী। তার মতে শব্দ আমাদের শেখায় ‘আমরা কী না, বরং আমরা কী হতে পারি তা’। মজার ব্যাপার হলো মিশেল ফুকো বা পল ডি মান এর মতো ভাষার দার্শনিকেরা কিন্তু এখান থেকে ধার নিয়েছেন; ফুকো তাঁর ‘দা অর্ডার অব থিংস’ (১৯৭৩) গ্রন্থে লেখেনঃ

“This proper being of language is what the nineteenth century was to call the Word, as opposed to the Classical “verb”, whose function is to pin language, discreetly but continuously, to the being of representation. And the discourse that contains this being and frees it for its own sake is literature. (উনবিংশ শতকে এসে ভাষার যথার্থ অস্তিত্ব ধ্রুপদী ধারার ‘ক্রিয়াপদে’ না খুঁজে ‘শব্দে’র মাঝে খোঁজা হয়েছে, যার (শব্দের) কাজ হলো ভাষাকে রূপায়নের সত্তার সঙ্গে গ্রন্থিত করা, কৌশলী বিচক্ষণতার সঙ্গে, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে। আর যে ডিসকোর্স যা এই সত্তাকে ধারণ করে এবং নিজের জন্যই মুক্ত করে তা-ই সাহিত্য। )” [২৯]

পল ডি মানের কন্ঠেও একই কথার প্রতিধনি:
“Here…consciousness does not result from the absence of something, but consists of the presence of a nothingness. Poetic language names this void with ever-renewed understanding and…it never tries to naming it again. This persistent naming is what we call literature. (এখানে…চৈতন্য কোন কিছুর অনুপস্থিতি থেকে তৈরি হয় না, বরং এক শূন্যতার উপস্থিতির মধ্যে সৃষ্ট। কবিতার ভাষা এই শূন্যতাকে চির নতুন উপলব্ধির মধ্য দিয়ে অভিধা দেয়,…আর কখনও তা পূনঃআখ্যায়িত করে না। এই অভিধা দেয়ার নিরন্তর প্রচেষ্টার নাম-ই সাহিত্য।)” [৩০], [৩১]

আমার পূর্বে উল্লেখিত ‘অগ্নিবালক’ নিয়ে আলচনায় হাসান আজিজুল হকের মন্তব্য আর এই বক্তব্যের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি? আমরা সব সময়ই বিদেশি কুকুর ধরি দেশের ঠাকুর ফেলে দিয়ে (যদিও পূর্ব-পশ্চিম নিয়েই আমাদের এতো সংশয়!)। কথা সেটা নয়, কথা হলো এই বিদেশি তত্ত্বজ্ঞান দিয়েও আমাদের সাহিত্য সমালোচনা বা সমালোচনা সাহিত্য রচনা সম্ভব। কারণ যখন সমালোচনা সাহিত্য অর্থাৎ লেখার পাঠোদ্ধার, দর্শনের মূল্যায়ন হবে, তা হবে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, মানসজগতের মধ্য দিয়ে, এই সুসংবদ্ধ প্রকরণ-প্রণালী তাকে আরো চৌকস করবে।

বার্থ এর ব্যাপক প্রভাব সাহিত্য সমালোচনায় বা সমালোচনা সাহিত্যে আরেকটি দিকে মনোযোগী করে আমাদের, যা পরিপূর্ণভাবে খোলাসা না করলে এর বুদ্ধিবৃত্তিক চক্রে যে কেউ পড়তে পারেন; তা হলো বার্থের স্ববিরোধিতা, বা প্যারাডক্স। বার্থের ‘রাইটিং ডিগ্রি জিরো’ (১৯৫৩)[৩২] মূলত সার্ত্রের অস্তিত্ববাদের আবহাওয়ায় লিখিত, যদিও বার্থ সার্ত্রের লেখার ধরণকে বরং সমালোচনাই করেছেন। কিন্তু প্রথম প্রবন্ধেই প্রশ্ন রাখেন, লেখা কি (হোয়াট ইজ রাইটিং)? যেমন সার্ত্রের বিখ্যাত শিরোনাম, সাহিত্য কি (হোয়াট ইজ লিটারেচর)?[৩৩] কিম্বা সেই লেখকের স্বাধীনতা আর দায়িত্বের বিষয় বার বার ফিরে আসে। অনেকেই বলেন বার্থের এই ‘জিরো ডিগ্রি’ প্রতিন্যাসটি মূলত ডেনিশ ভাষা-ইতিহাসবিদ ভিগো ব্রনডাল থেকে ধার নেয়া। জিরো ডিগ্রিতে লিখতে যাওয়ার বড় যুক্তিটি ছিল সাহিত্যে আঙ্গিকের ইতিহাস, ইতিহাসমুখিনতা, এমন কি ভাষার ইতিহাসকে একটি বিষয় বা ধারণা হিসেবে নিয়ে আসা যাকে কেউ কেউ বলেন ভাষা আর ডিসকোর্সের দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্ক। কিন্তু এখানে সার্ত্রীয় মার্ক্সবাদ একেবার নির্বাসিত হয়ে নতুন ধরণের সম্পর্ককে উপস্থাপন করে। বার্থ সাহিত্যের কাজ কে অর্থনৈতিক উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত করতে নারাজ ছিলেন, বরং বার্থের মতে লেখক নিজেই উৎপাদক, ‘দ্য অথার এজ আ প্রোডিউসার’। এভাবে বার্থের মতে যে কোন সাহিত্য-আঙ্গিকে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ অনুসারে লেখক তাঁর সুর বাঁধতে পারেন যদি চান, কারণ এখানেই লেখক তাঁর দায়বদ্ধতা দেখাতে পারেন। সুতরাং সাহিত্যের ইতিহাস, এবং সাহিত্যে ইতিহাসের অবস্থান নিয়ে বার্থ এই গ্রন্থে ছিলেন স্ববিরোধী। তাঁর এই স্ববিরোধিতা দেখা যায় ভাষা নিয়ে, প্যাট্রিজিয়া লম্বারডো তো এটাকে বার্থের ‘ভাষার বিরুদ্ধে লড়াই’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন।[৩৪] বার্থ আর লাঁকায় অনেক পার্থক্য আছে ইতিহাস আর ভাষার অবস্থান নির্ণয়ে, সে আলোচনায় নাই বা গেলাম। কিন্তু বার্থ যেন স্ববিরোধিতার মধ্য দিয়েই আবার ইতিহাস কে ফিরিয়ে আনেন। তাঁর কাছে একটি স্থিরচিত্র বা ফটোগ্রাফি একটি বাস্তবতাকে তুলে ধরে, বস্তুর প্রকৃত অস্ত্বিত্ত্বের সাক্ষ্য দেয়, অন্যদিকে ইতিহাস শুধু মাত্র সেই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে শেখায়। কিন্তু একটি ছবি তা যতই একটি বস্তুর অস্ত্বিত্বের সাক্ষ্য দিক না কেন, তা তো বস্তু নয়, তাকে বস্তু হতে হলে একজনকে হ্যালোসিনেশন এর মধ্য দিয়ে ছবি আর বাস্তবতার ফারাকটাকে ঘুচাতে হবে। ভাষায় যে ছবি বা ইতিহাস প্রতিভাত হয় তার তবে কত অযুত বাস্তবতা?

বাখতিন অন্যদিকে স্ট্রাকচারালিজম কে ভেঙ্গে দিতে চান। স্যস্যুরিয়ান অবস্থানের নিরিখে বাখতিনের অবস্থান যেন ভিন্নমুখী, স্ট্রাকচারালিজম এর এন্টিথিসিস আর কী হতে পারে? স্যস্যুর ভাষাকে দেখতে চান বিমূর্ত এবং রেডি-মেড সিস্টেম হিসাবে, বাখতিন দেখতে চান শুধু মাত্র জলজ্যান্ত বাচনিক গতিময়তার মধ্যে (ডায়নেমিকস অব লিভিং স্পিচ); স্যস্যুর এর মতে ভাষা একজন বক্তার কাছে পরোক্ষভাবে তৈরি হয়, বক্তার ফাংশন বা অপেক্ষক নয়; সেকারণে এই পরোক্ষতা তাঁর কাছে এক ধরণের ছদ্মরূপ বা অনুকরণ, অন্যদিকে বাখতিনের কাছে তা সংগ্রাম এবং বৈপরীত্যের প্রক্রিয়া; আর স্যস্যুর যেখানে ব্যক্তি এবং সমাজ কে দ্বি-মুখী করে দেখেন, সেখানে বাখতিন অনুমান করেন ব্যক্তি সমাজেরই সৃষ্ট একক, একারণে চেতনা হলো সংলাপ আর সমাজের ‘অন্যান্য’দের পাশাপাশি বা সন্নিধির মধ্যকার ব্যাপার-স্যাপার। একারণেই বাখতিনের মতে পরোক্ষভাবে ভাষিক অর্থ অনুধাবনের মানে হলো আদপেই কোন অর্থ অনুধাবন না করা, এটা শুধুই অর্থের বিমূর্ত রূপ। আর এখানেই তিনি বলেন যে কোন সুনির্দিষ্ট উচ্চারণ বা উপন্যাসের বয়ান থেকে পাকাপোক্ত অর্থ উদ্ধার না করে এরূপ বিমূর্ত অর্থ তুলে আনা এক ধরণের কানাগলিতে পৌঁছানোর মতো, যেখানে ভাষিক মানদণ্ডের বিমূর্ততাকে মূর্তিমান করে তোলা হয়, বাস্তবতায় টেনে নামানো হয়, এবং এক রকমের ‘মডেল’ তৈরি করে যা দিয়ে ভাষার আর কোন আলোচনা সম্ভব হয় না-আর এখানেই, বাখতিনের মতে সামাজিক পরিবর্তন ঘটে। এখানে স্যস্যুরিয়ানদের অনেক পৈতৃকসূত্রে পাওয়া ধ্যান-ধারণা যেমন ভাষা এবং ডিসকোর্সের মধ্যে পার্থক্য (লাঙ্গু ভারসাস প্যারোল), চিহ্নের অযৌক্তিক স্বভাব, এবং সরাসরি কবিতার ভাষা আর সাধারণ ভাষার মধ্যকার পার্থক্য এগুলো পুনরার্বিভূত হতে থাকে ‘ট্রান্সফরমেশনাল গ্রামারে’, পুরনো বা নতুন লিখন শৈলী এমনি কিছু আধা-মার্ক্সিস্ট তত্ত্বের মধ্যেও। এই পুনরায় আবির্ভাব কিন্তু সরাসরি বাখতিনের বিপক্ষে চলে যায়। কারণ বাখতিনের মতে যে উচ্চারণ ঘটে–তা একটি বিচ্ছিন্ন শব্দ, এমন কি পরিপূর্ণ সাহিত্য-রচনা, তা ঘটে একটি প্রাসঙ্গিকতার মধ্য দিয়ে, যাপিত সময়কালে। এ কারণে যতোই একটি উপন্যাসের বিষয়কে উপেক্ষা করতে চাই না কেন সেই বিষয় এবং বর্ণনার সামগ্রিকতা যা লেখকের সবচেয়ে শিল্পিত কাজ–তাকে শুধু ভাষার আঙ্গিকে সংকুচিত করা যায় না, বরং তা সামগ্রিকতার অবিচ্ছিন্ন অংশ, যেমন ভাষিক উপাদানগুলো হয়ে ওঠে সামগ্রিক উচ্চারণের অবিচ্ছিন্ন অংশ।[৩৫] এখানে আবারো হাসান আজিজুল হকের একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছিঃ
“…তাহলে সাহিত্যের জন্য আলাদা একটা জায়গা নির্ধারণ করতে হয়। তখন সেটাকে বিষয় দিয়ে বিবেচনা করা যায় না। তখন জীবনঘনিষ্ঠ বলেও কোন লাভ হয় না। গ্রাম জীবন, সবার জীবন বলেও কোন লাভ হয় না। তারাশংকর গ্রাম নিয়ে লিখেছেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রাম নিয়ে লিখেছেন, বিভূতিভূষণও গ্রাম নিয়ে লিখেছেন। তো বললেই হয় এরা তিনজনই গ্রামজীবনের লেখক। ব্যাস হয়ে গেল। তাতে সাহিত্যের কোন ভোগ হয় না, আস্বাদন হয় না। …আমার কতগুলো প্রশ্ন জাগে। সেজানের বইয়ের বিষয়বস্তু কি? সেই যে বিষয়বস্তুর আমি বিরোধিতা করলাম, তা-ই আবার জানতে চাচ্ছি। বিষয়বস্তু হলো সেই জায়গাটা যেখান থেকে আমি উড়তে শুরু করি। সাহিত্যের সেই জায়গাটা যেখান থেকে আমি পাখা মেলতে শুরু করি, যেখান থেকে আমি কলম চালাই, এবং যেখান থেকে আমি কিছুতেই বাস্তবকে হাজির করতে পারি না। আমি তখন ভাষার ভিতর দিয়ে ছবি বার করি, ভাষার ভিতর দিয়ে সৌন্দর্য বার করি।” (হাসান আজিজুল হক, ‘অগ্নিবালক’ নিয়ে আলোচনা, ২০০৯)

এই যে নানাবিধ সাহিত্যতত্ত্বের আধার, তাতে যা উঠে আসে নতুন করে বা পুরনোভাবে তা হলো সমালোচক আর লেখকের কোন বিরোধ নেই। লেখক যেমন সমালোচক, সমালোচকও তেমনি লেখক। সমালোচনা সাহিত্য হবে নতুন নতুন ব্যাখ্যা, নতুন নতুন উন্মোচন। সেখানে লেখকও তো লেখা শেষে একজন পাঠক এবং সমালোচক। লেখকও উদ্ধার করতে পারেন নতুন মর্মার্থ, যা লেখার সময়ে কীভাবে লেখা হয়েছে, তা তাঁর জানা নেই, বোর্হেজ যেমন বলেন, ‘আমি জানি না আমাদের দুজনের কোন জন এই পৃষ্ঠাখানি লিখেছে।’ লেখকের যতোই মৃত্যুর কথা বলা হোক না কেন, লেখক কে যতোই আলাদা করে টেক্সট-এর পাঠোদ্ধার হোক না কেন, তাতে লেখকের মৃত্যু তো হয়ই না বরং লেখক আরো মহীরূহ হয়ে ওঠেন। একারণেই ‘লেখকের মৃত্যু’র স্রষ্টা বার্থকেই লিখতে হয় ‘রলাঁ বার্থ বাই রলাঁ বার্থ’। লেখক তো বলতেই পারেন আমি আমার অভিজ্ঞতা, আমার মতো করে দিলাম, তোমার মতামত জানতে না, শেয়ার করতে। আবার পাঠকও বলতে পারেন তোমার লেখা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য না এবং তা আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিতে পারেন। কিন্তু পাঠক তা করেন একেবারে নিজস্ব, ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে। অন্যদিকে সমালোচক যখন যা বলেন তা নির্দিষ্ট গ্রন্থকে অব্জেক্টিফাই করে বলেন, যেখানে সৃজনের দায়ভার আরো বেশি। এভাবেই একই টেক্সটের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ হবে, একজন সমালোচক সৃষ্টি করবেন মেটা-ল্যাঙ্গুয়েজ, তার ওপরে আরেক মেটা-ল্যাঙ্গুয়েজ, এক অন্তহীন সম্ভাবনা। আমি লাকাঁর ‘সিগনিফায়ার’ গুলোর তলে ’সিগনিফায়েড’ এর লুকিয়ে যাওয়াকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি ধাঁধাঁ দিয়েছিলাম,
‘হরির ওপরে হরি হরি শোভা পায়, হরি কে দেখিয়া হরি হরিতে লুকায়’ -এর মানে কি?

এখানে ‘হরি’ বিষ্ণু বা নারায়ণের এক নাম আবার ‘হরি’ দিয়ে অন্য দুই দেবতা ও বহুবিধ জিনিসকে বোঝাবার রীতি ছিল। যেমনঃ জল, পদ্মপাতা, ব্যাঙ, সাপ, কোকিল, সিংহ ইত্যাদি। তাহলে এই বাক্যের অর্থ হতে পারে,
‘জলের ওপরে পদ্মপাতায় ব্যাঙ শোভা পায়/ সাপ কে দেখে ব্যাঙ পানিতে লুকায়’।

এখানে জলের ওপরে পদ্মপাতা তার ওপরে ব্যাঙ ইত্যাদি পদার্থ আলাদা আলাদা অবস্থান করছে। লাকাঁর ধারণা মতে এবার অর্থগুলো এক করে দিলে কী হয়?
‘জলের ওপরে জল, জল শোভা পায়/জল কে দেখে জল জলেতে লুকায়’। [৩৬]

সাহিত্যেও তেমনি, একের ওপরে আরেক অর্থ যা আমাদের বস্তুজগত সম্পর্কে ইউক্লিডিয়ান ধারণাকে ভেঙ্গে সীমাহীন অর্থের ব্যঞ্জনা এনে দেবে, এই ব্যঞ্জনা কখনই কাল, ইতিহাস, সমাজ নিরপেক্ষ নয়। সেখানে কী পশ্চিম আর কী পূর্ব থেকে এলো তার তর্ক অর্থহীন, কে বড়? সমালোচক না লেখক সে তর্কও অর্থহীন।

আবার বাখতিনে ফিরে আসি; বাখতিন সেই আরিস্ততলের মতো সাহিত্যকে আত্মিক বা চৈতন্যের ‘সেফটি ভাল্ব’ হিসাবে দেখেন, যেমন আরিস্ততল দেখেছিলেন ঘন আবেগাশ্রিত শিল্প (যেমন, ট্রাজিক নাটক) কে সমাজের ‘রেচক’ বা বর্জ্যদূরীকরণের ‘সেফটি ভাল্ব’ হিসেবে। সেখানে ভাষা তাই সকল অর্গলমুক্ত। বাখতিনও স্ট্রাকচারালিজমের সকল দ্বি-মুখীনতাকে সজোরে অস্বীকার করেছেন; অস্বীকার করেছেন কার্তেসীয় বাস্তববাদিতা এবং লিবনিজ এর ‘ইউনিভার্সাল ল্যাঙ্গুয়েজ’ দিয়ে। সে আলোচনা হয়তো অন্য কোন দিন বা অন্য কোনখানে করা যাবে। কিন্তু ঠিক এইখানে এসে একটি বিপ্লবাত্মক আবিষ্কারের জানান দিয়ে আমার বক্তব্যের লক্ষ্য স্থির করে দেয়া যায়। আমি যখন এই লেখা লিখছি ঠিক তখন একজন এবং একদল বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী, নৃতাত্ত্বিক আবিষ্কার করে ফেলেছেন–কী করে পৃথিবীর সমস্ত ভাষা একটি মাত্র ভাষা থেকে এসেছে, আলাদা আলাদা ভাষা থেকে হয় নি।[৩৭] এই আবিষ্কার মানুষের বংশগতির উন্নতির সঙ্গে এক করলে যা পাওয়া যায় তা সকল নৃবিজ্ঞানী, বিবর্তনবাদীদের একটি কঠিন প্রশ্নের উত্তর পেতে সাহায্য করে; প্রশ্নটি হলো এই যে বিভিন্ন গোত্রের আদি মানুষের মধ্য থেকে কোন একটি বিশেষ গোত্র সমস্ত সংগ্রামের মধ্যে টিকে থেকেছিল তার প্রধান কারণ কি? এর উত্তর নিহিত আছে এই ভাষার গবেষণায়; এই ভাষার শক্তির জন্যেই, এই যোগাযোগের উৎকর্ষের জন্যেই সেই গোত্র পেরেছিল অস্তিত্বের লড়াইয়ে জয়ী-পুরোধা হতে। যদি বাখতিন, দেকার্ত, লিবনিজের হাতে এই গবেষণার ফলাফল থাকতো তবে চমস্কির সঙ্গে ভিন্ন এক তাত্ত্বিক মোলাকাত হতো তাঁদের। অন্যদিকে মিশেল ফুকো যেখানে বলেছিলেন আগামী শতক হবে দেলুজিয়ান, তা ঠাট্টা করেই বলুন আর সত্যি করেই বলুন না কেন, দেলুজের ওপরে লিখতে গিয়ে কাসারিনো যে ‘ফিলোপয়েসিস’[৩৮] যা আমি বাংলায় বলবো ‘দর্শনাহিত্য’ নামের ভোকাবুলারির জন্ম দিলেন, তা হতে পারে সাহিত্য ও সমালোচনা সাহিত্যের এক কাঙ্খিত গন্তব্য। দেরিদার অধিবিদ্যামূলক ডিসকোর্স (পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজম ও বিনির্মাণতত্ত্ব) দিয়ে প্রত্যক্ষবাদী বিশ্লেষণ করা হলে, বিশেষ করে ভাষার মতো অন্তহীন বায়বীয় ক্ষেত্রে, যুক্তিবিদ্যায় বা চৈতন্যের উপলব্ধিতে তা যে কতটা বৈপরীত্যের সৃষ্টি করে তা-ও আমাদের অজানা নয়। একারণেই সাহিত্যের ভ্যালু জাজমেন্ট না করে এই যে লেখকের উপলব্ধি, যার শিল্পিত প্রকাশ ঘটলো, তার পাঠোদ্ধারে, দর্শনের নতুন নতুন মাত্রা আবিষ্কারে, দর্শনের গন্তব্য ও পদ্ধতিগত মূল্যায়ন কোরে, বিশ্বজনীন ভাষায়, কোন একদিন একক সাহিত্যের ভাষায় সৃষ্টি হবে ‘সাহিত্য সমালোচনার’ অন্য নাম ‘সমালোচনা সাহিত্য’। সেই সমালোচনা সাহিত্য রাজনৈতিক মুক্তি আন্দোলন না ঘটাতে পারলেও (যেমন পারে নি ফ্রান্সে)[৩৯] আমাদের চিন্তার মুক্তি ঘটাতে জারক রসের ভূমিকা অন্তত নিতে পারে। সেই দর্শনাহিত্য আর ভাষার এই মিলন নিয়ে কথা বলবো অন্য কোন দিন, অন্য কোন ভাষায়!

তথ্যসূত্র

[]। হাসান আজিজুল হক, “সাহিত্য সমালোচনা কীভাবে সম্ভব”, প্রথম আলো, ‘সাহিত্য সাময়িকী’, ২৯শে জুন।
[]। সেলিম রেজা নিউটন, ‘চিন্তার সংকটঃ সাহিত্যের স্বাধীনতাঃ মানুষের মুক্তি; প্রসঙ্গ হাসান আজিজুল হকের কার্তেসীয় পদ্ধতি এবং সাহিত্যে আত্নঘাতী বোমাবাজির প্রবণতা’, বিডিনিউজ২৪.কম, ডিসেম্বর ২, ২০১০।
[]। Aristotle. Aristotle in 23 Volumes, Vol. 23, translated by W.H. Fyfe. Cambridge, MA, Harvard University Press; London, William Heinemann Ltd. 1932. Butcher, Samuel Henry (Trans.), Poetics of Aristotle, 1974.

[]। Kapila Vatsyayan, Bharata: The Natyasastra (1996). Sahitya Akademi, New Delhi.

[]। Richard Schechner, Rasaesthetics, The Drama Review, Vol. 45(3), Fall 2001.
[]। Edmund Husserl, The Idea of Phenomenology, The Hague, 1964
[]। E. D. Hirsch, Validity in Interpretation, New Haven, CT, 1976
[]। Wolfgang Iser, The Act of Reading, London, 1978
[]। Roland Barthes, The Pleasure of the Text, London, 1976
[১০]। Martin Heidegger, Being and Time, London, 1962
[১১]। Northrop Frye, Anatomy of Criticism, Princeton, NJ, 1957
[১২]। Ferdinand de Saussure, Course in General Linguistics, London, 1978.
[১৩]। Paul Garvin (ed.), A Prague School Reader on Esthetics, Literary Structure and Style, Washington, DC., 1964
[১৪]। Yury Lotman, The Structure of the Artistic Text, Ann Arbor, 1977.
[১৫]। Yury Lotman, Analysis of the Poetic Texts, Ann Arbor, 1976.
[১৬]। Terry Eagleton, Literary Theory, An Introduction, Blackwell Publishing, 1983.
[১৭]। Chomsky, Noam, Aspects of the Theory of Syntax. Cambridge, MA: MIT Press., ১৯৬৫
[১৮]। Jacques Derrida, Writing and Difference, London, 1978
[১৯]। Jacques Derrida, Speech and Phenomena, Evaston III, 1973
[২০]। হাসান আজিজুল হক, উপন্যাস ‘অগ্নিবালক’ নিয়ে আলোচনা, কালি ও কলম, ষষ্ঠবর্ষ, ৮ম সংখ্যা, ১৪১৬; সাইয়িদ কামরান এর প্রতিবেদন, পৃঃ১২১-১২৮।
[২১]। Roland Barthes, Mythologies, London, 1972
[২২]। Roland Barthes, Elements of Semiology, London, 1967
[২৩]। Roland Barthes, System de la Mode (Untranslatted), Paris, 1967. Theo Van Leeuwin on System de la Mode, Aus. J of Cultural Studies I, May 83, p21-35.
[২৪]। Knight, Diana. Critical Essays on Roland Barthes. New York: G.K Hall, 2000.
[২৫]। Giorgio Agamben’s Profanations, Zone Books, 2007
[২৬]। সালিমুল্লাহ খান, তত্ত্বজ্ঞান ও মতিবিভাজন, প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারি ৯, ২০০৭
২০০৭
[২৭]। সেজান মাহমুদ, তত্ত্বজ্ঞান ও মতিবিভাজন এর অঙ্গ বিভাজন, প্রথম আলো, জুন ৮, ২০০৭
[২৮]। Lev Vygotoski, The Psychology of Art ( 1917), Moscow, 1925, London 1971.
[২৯]। Michel Foucault, The Order of Things, London, 1972.
[৩০]। Paul de Man, Criticism and Crisis, Blindness and Insight: Essays in the Rhetoric of Contemporary Criticism, New York, 1971. P18.
[৩১]। Paul De Man, Allegories of Reading, New Haven, CT, 1979.
[৩২]। Roland Barthes, Writing Degree Zero, London, 1967
[৩৩]। Jean Paul Sartre, What is Literature?, London, 1978।
[৩৪]। Patrizia Lombardo, Three Paradoxes of Ronald Barthes, The University of Georgia Press, 1989.
[৩৫]। Patrizia Lombardo, Three Paradoxes of Ronald Barthes, The University of Georgia Press, 1989.
[৩৬]। Gary Morson (ed.) Bakhtin: Essays and Dialogues on His Work.
[৩৭]।Atkinson, Q. D. Phonemic diversity supports a serial founder effect model of language expansion from Africa. Science, 332: 346-9, ২০১১। ।
[৩৮]। সেজান মাহমুদ, আধুনিক ফরাসি তত্ত্বজ্ঞানঃ সাহিত্য বিশ্লেষণে লাকাঁ, দৈনিক যুগান্তর, জুলাই ৭, ২০০৭।
[৩৯]। Gilles Deleuze and Félix Guattari, What Is Philosophy? trans. Hugh Tomlinson and Graham Burchell (New York: Columbia University Press, 1994)

……………………………………………………………

আর্টস-এ লেখকের অন্য লেখা

সঞ্জীবদা, আমার সেই গান আর লেখা হলো না!সালমান রুশদির সঙ্গে একটি সন্ধ্যাআমার প্রথম বই এবং রয়্যালটি বিষয়ক কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

সঞ্জীবদা, আমার সেই গান আর লেখা হলো না!
সালমান রুশদির সঙ্গে একটি সন্ধ্যা
আমার প্রথম বই এবং রয়্যালটি বিষয়ক কিছু স্মৃতি, কিছু কথা
…………………………………………………………..

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: সেজান মাহমুদ
ইমেইল: sezanmahmud@yahoo.com

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নারায়ণ — জুলাই ৩, ২০১১ @ ৭:৫৩ অপরাহ্ন

      পড়লাম। মন্তব্য করার মত মেধা ও দুঃসাহস আমার নেই। তাই অন্য প্রসঙ্গে বলি। প্রত্যেকটি পৃষ্ঠায় দুই প্রকারের ফ্লাগ কাউন্টার লাগানোর কারণ কি? এটা কি খুব দরকার? না হলে চলে না? আমাদের মত কম স্পিডের লাইনে এই দুটো কতটা প্রয়োজনীয় গেজেট তা বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। আশা করি বিডিনিউজ২৪ কর্তৃপক্ষ এই জাতীয় (কাউন্টার জাতীয়) কোন গেজেট লাগানোর আগে আমাদের মত দুর্বল ইউজারদের কথা একটু ভেবে দেখবেন।

      ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিধান চন্দ্র — জুলাই ৬, ২০১১ @ ১১:০৩ অপরাহ্ন

      লেখাটা পড়ে খুব ভাল লাগলো যে এভাবে পশ্চিমা তত্ত্বকে আমাদের মতো করে লেখা, নানান তত্ত্ব পাশাপাশি রেখে অনেক কঠিক বিষয়কে তুলে আনা হয়েছে যা সত্যি অপূর্ব। আমাদের মতো সাধারণ পাঠকও এখন বুঝতে পারবেন কোন সমালোচক কী বলছেন, কেন বলছেন। সেই সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের একটি দুর্বল জায়গা সমালোচনা সাহিত্যে এটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি। লেখককে অনেক ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com