ব্যক্তিত্ব

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের দেড়শ বছর

রক্তমাংসের রবীন্দ্রনাথ

রাজু আলাউদ্দিন | 7 May , 2011  

rtvo2.jpg
………
১৯০৯ সালে প্যারিসে ড্রাই পয়েন্ট এচিংয়ে বিক্তোরিয়া ওকাম্পো, শিল্পী Paul César Helleu.
………
পৃথিবীর পাঁচটি মহাদেশের বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সম্ভবত আর কোনো বাঙালি লেখক নেই যিনি এত দেশ ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু যে দেশটি প্রেমের প্রশ্নে তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে তা নিঃসন্দেহে আর্হেন্তিনা। ৬ নভেম্বর ১৯২৪ সালে তিনি বুয়েনোস আইরেসে পৌঁছান। পরের বছর অর্থাৎ ২৫ সালের ৩ জানুয়ারি বুয়েনোস আইরেস ত্যাগ করেন। প্রায় দু’মাস তিনি সেখানে কাটিয়েছেন। এত দীর্ঘ সময়, কেবল ভ্রমণে বেরিয়ে, একক কোনো শহরে, আগে বা পরে, আর কোথাও তিনি কাটাননি। এছাড়া একক কোনো ব্যক্তির আতিথ্যেও তিনি এত দীর্ঘ সময় কারোর কাছে থেকেছেন–তারও কোনো নজির আগে-পরে পাওয়া যাবে না।

ocampo-and-tagore-the-last-farewell-paris-may-1930.jpg
……….
ফ্রান্সের প্যারিসে ওকাম্পো-রবীন্দ্রনাথ শেষ বিদায়, মে ১৯৩০।
……….

আর ব্যতিক্রমেরও ব্যতিক্রম এই যে যার আতিথ্যে ছিলেন তিনি এক নারী, এক বিদুষী-নারী বিক্তোরিয়া ওকাম্পো (১৮৯০ – ১৯৭৯), যিনি রবীন্দ্রনাথের লেখার সাথে আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ ২৩ সেপ্টেম্বর রানুকে লিখেছিলেন, ‘…কোনো মেয়েই আজ পর্যন্ত সেই সত্যকার আমাকে সত্য করে চায়নি–যদি চাইত তাহলে আমি নিজে ধন্য হতুম; কেননা মেয়েদের চাওয়া পুরুষদের পক্ষে একটা শক্তি। সেই চাওয়ার বেগেই পুরুষ নিজের গূঢ় সম্পদকে আবিষ্কার করে… কতকাল থেকে উৎসুক হয়ে আমি ইচ্ছা করেছি কোনো মেয়ে আমার সম্পূর্ণ আমাকে প্রার্থনা করুক, আমার খণ্ডিত আমাকে নয়। আজো তা হলো না–সেই জন্যেই আমার সম্পূর্ণ উদ্বোধন হয় নি। কী জানি আমার উমা কোন দেশে কোথায় আছে। হয়ত আর জন্মে সেই তপস্বিনীর দেখা পাব।’’
(প্রশান্ত পাল, রবিজীবনী, ৯ম খণ্ড, ২০১০, পৃ. ১৫১)

না তাঁকে আর জন্মের জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি। কতগুলো ঘটনা পর পর লক্ষ করলেই দেখতে পাবো কেন এবং কীভাবে ওকাম্পো তাঁর উমা হয়ে উঠেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ আর্হেন্তিনা পৌঁছাবার আগে থেকেই ওকাম্পো তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং ২ নভেম্বর ১৯২৪ সালে লা নাসিয়ন পত্রিকায় লিখলেন ‘রবীন্দ্রনাথ পাঠের আনন্দ’ (La alegria de leer a Rabindranath Tagore)। তিনি জানতেন যে রবীন্দ্রনাথ লিমা যাচ্ছেন। এই উপলক্ষেই হয়তো তাঁর বহু দিনের রবীন্দ্র-পাঠকে স্মরণ করেছেন। কিন্তু তিনি কখনো কল্পনাও করেন নি রবীন্দ্রনাথকে দু’মাসের জন্য তাঁর আতিথ্যে বন্দি করে ফেলতে পারবেন। রবীন্দ্রনাথের অসুস্থতা তাঁর এই সৌভাগ্য প্রাপ্তিতে সাহায্য করেছে—তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

pketaki2_pic_rtvovillaocampo.jpg
……….
ওকাম্পো ভিলার সামনে রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পো, বুয়েনোস আইরেস, ১৯২৪-২৫।
………

রবীন্দ্রনাথকে সুস্থ্য করার জন্য হাওয়া বদল এবং হাওয়া বদলের জন্য অন্যত্র স্থানান্তর অর্থাৎ সান ইসিদ্রো, লা প্লাতা এবং চাপাদ মালালে তাঁর আবাস নিশ্চিত করার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিলেন ওকাম্পো। রবীন্দ্রনাথের অবস্থান দীর্ঘ করার বাসনায় নিজের বহুমূল্য অলংকার–হিরের টায়রাটি পর্যন্ত বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ভালোবাসার এই দানের বাইরেও আর্হেন্তিনার কাছে রবীন্দ্রনাথের আরও একটি ঋণ আছে যার কথা তিনি এক চিঠিতে স্বীকার করেছেন এইভাবে:

‘আর্জেন্টাইনের কর্তৃপক্ষ পেরুর সমস্ত ঋণ আমার তরফ থেকে শোধ করে দিতে প্রস্ত্তত আছেন। তা ছাড়া আমার দেশে ফিরে যাবার পাথেয় এখান থেকেই পাওয়া যাবে। আমি এদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি তা যে কত অকৃত্রিম ও গভীর তা অনুভর করে আমি বিস্মিত হই। আমি যাতে আরামে থাকি সুস্থ্য থাকি তার সমস্ত দায়িত্ব যেন এদের সকলেরই।’’ (প্রশান্ত পাল, রবিজীবনী, ৯ম খণ্ড, ২০১০, পৃ. ১৬৪)

তবে বস্তুগত এই ঋণের চেয়ে বেশি যে-ঋণটি রবীন্দ্রনাথের কাছে বড় হয়েছিলো তা অবশ্যই ওকাম্পোর ভালোবাসার ঋণ। পরস্পর চিঠিপত্রে এবং সাক্ষাতে সেই ভালোবাসার প্রকাশ দেখিয়েছেন নানাভাবে। বুয়েনোস আইরেসে পৌঁছানোর প্রায় ৮ দিন পরেই, ১৪ নভেম্বরে ২৪ সালে ওকাম্পোকে লেখা রবীন্দ্রনাথের এক চিঠিতেও সেই একই প্রতিধ্বনি লক্ষ করবো আমরা:

“This can be had only from a women’s love and of have been hoping for long time that I do deserve it.

I feel today that this precious gift has come to me from you…”
(Ketaki Kushari Dyson, In your blossoming Flower-Garden, 1996, Sahitya Akademi, পৃ. ৩৭৪)

পরস্পরের সম্পর্ক যে নিছক সৌজন্যস্নাত ছিলো না, বরং তারও চেয়ে বেশি কিছু, তার বাস্তব সাক্ষী লিওনার্দ এলমহার্স্টের এই ভাষ্য: “Besides having a keen intellectual understanding of his books, she was in love with him (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-লেখক)”।

(প্রশান্ত পাল, রবিজীবনী, ৯ম খণ্ড, আনন্দ পাবলিশার্স ২০১০, পৃ. ১৭৭)

এলমহার্স্ট-এর এই সাক্ষ্য পরোক্ষে আমাদের সহযোগিতা করবে ওকাম্পো-রবীন্দ্র সম্পর্কের আরেকটি মাত্রাকে বুঝতে যার উল্লেখ আমরা দেখতে পাবো ফরাসি সংস্করণে ওকাম্পোর আত্মজীবনীতে:

“মাঝে মধ্যে আমি যখন তাঁকে তাঁর রহস্যময় বাংলা লেখার খাতাটিতে ক্রমাগত লিখে যেতে দেখতাম, তখন তাঁকে কবিতার কোনো একটি অংশ অনুবাদ করার মিনতি জানাতাম। এক বিকেলে আমি তাঁর ঘরে ফুলদানিতে ফুলগুলো গোছগাছ করতে এসেছি, তিনি তখন বললেন যে তিনি অনুবাদ করছেন। টেবিলে রাখা কাগজটির উপর ঝুঁকে তাকালাম। আমার দিকে মাথা না তুলেই তাঁর হাতটি বাড়িয়ে দিলেন, যে-ভাবে কেউ গাছের ডাল থেকে ফল পাড়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়, তেমনিভাবে তিনি একটি হাত আমার স্তনের উপর রাখলেন। মনে হয় এক ধরনের প্রত্যাহারের শিহরণ অনুভূত হলো; মালিকের কাছ থেকে যখন কোনো ঘোড়া আঘাত আশা করে না তেমন মনে হলো আমার কাছে। আমার মধ্যে তৎক্ষণাত একটা পশু চিৎকার করে উঠলো, ‘‘না, এ তো চাই নি।’’ আমার মধ্যে অন্য আরেকটি সত্তা আমাকে সতর্ক করে দিয়ে বলে উঠলো: ‘‘শান্ত হও, নির্বোধ। এটা প্যাগান কোমলতার এক ইশারা।’’ ভৌত আদর বোলানোর পর হাতটি ডাল থেকে নেমে এলে আমি কবিতাটি পড়লাম। মনে হয় তিনি একই রকম। একটা মূর্তির জন্যও তাঁর স্পর্শভঙ্গি বুঝি বা এমনিই হয়ে থাকবে। তবে তিনি আর কখনোই এ কাজটি করেন নি। প্রতিদিন তিনি আমার কপালে অথবা গালে চুমু খেতেন আর আমার হাত মুঠোর মধ্যে নিয়ে বলতেন: ‘‘এতো শীতল হাত!’’
(Flower-Garden, পৃ.-২৭২)

কেতকী কুশারী ডাইসন রবীন্দ্রনাথের সাথে ওকাম্পোর এই ঘটনাকে ব্যাখ্যার সূত্রে ওকাম্পো চরিত্রের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে: “A combination of coquetry and puritanical retreat.” (Flower-Garden, পৃ.-১০৬)

কেতকীর এই কথা সত্য হলে আমাদের কাছে মনে হবে রবীন্দ্রনাথ তাহলে ভুল বুঝেছেন। তবে ওকাম্পোর বিবরণ থেকে মনে হচ্ছে, তিনি এমনটা আশা না করলেও রবীন্দ্রনাথের হস্তক্ষেপে ক্ষুব্ধও নন। এমনকি এই ঘটনার পরও তাদের মধ্যে চিঠি চালাচালি হয়েছে। এবং সে সব চিঠিতে ওকাম্পো “I Love You” বলতে কোনো দ্বিধা করেন নি।

razualauddin@gmail.com
লেখকের আর্টস প্রোফাইল: রাজু আলাউদ্দিন
———
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters


6 Responses

  1. এমন হস্তক্ষেপ! মানুষটাকে একেবারে রক্তঘামের মধ্যে ফেলে দিলেন রাজু আলাউদ্দিন! আমি ভাবছি সেই মুহূর্তের কথা, উমা জাগলো না… হাত গুটিয়ে নেবার সময় কোন মন্ত্র জপেছিলেন কবি?

  2. shamset tabrejee says:

    বেশ!

  3. pappu says:

    রবীন্দ্রনাথ আগাগোড়া একজন রক্তমাংসের মাংসের মানুষ ছিলেন। তবে সাধারণের তুলনায় উন্নত মস্তিষ্কের। তাঁকে দেবতা হিসেবে বিবেচনা করে একটা সুবিধাই পাওয়া যেতে পারে আর তা হলো তাঁর জীবনের খুব স্বাভাবিক ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা করে তাঁকে বিতর্কিত করা যেতে পারে। কেননা, রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করলে যা স্বাভাবিক মনে হয়, দেবতা হিসেবে বিবেচনা করলে সেই স্বাভাবিকতাকে অস্বীকার বা বাতিল করে তাঁকে নিচে নামিয়ে আনা সহজ হয়।

  4. মাহবুবুল হক says:

    তাইতো বলি, এক পা চিতায় দিয়েও ‘শেষের কবিতা’ মাথায় আসে কী করে বুড়োটার।
    রবীন্দ্রনাথের সাথে মৃণালিনী দেবী বা মৈত্রেয়ী দেবীর সম্পর্ক নিয়েও কানাঘুষা আছে। ওকাম্পোতে তিনি ভালোই মজেছিলেন। কিন্তু রাজু বোধ হয় আচকানের ভেতরকার রক্তমাংসের রবীন্দ্রনাথকে আক্ষরিক অর্থেই দেখতে চাইছেন। তাই ওকাম্পোর সাথে রবীন্দ্রনাথের এই বিশেষ মুহূর্তটি, যা ওকাম্পো না লিখলে পৃথিবী জানতো না, তাকে এত শিহরণ দেয়।

  5. aysa jforna says:

    ভাল লাগল লেখাট পড়ে বিশেষ করে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথকে, রক্তমাংসের রবীন্দ্রনাথকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটা। কেতকী কুশারী ডাইসনের ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্তেরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’–এ বইটি ওকাস্পোর সাথে রবীন্দ্রনাথের যে জৈবিক চাওয়া তার উপর বেজ করে রচিত। যা মূলত: শঙ্খ ঘোষের’ ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’- এর একটি কাউন্টার বই যেখানে শঙ্খ ঘোষ এ বিষয়টা বেমালুম চেপে গেছেন। তাদের ভালবাসাকে প্লেটোনিক রূপ দিতে চেয়েছিলেন।

  6. সরকার আমিন says:

    অবদমনের সুবিধা গ্রহণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। ভাগ্যিশ তার হাত নারীবক্ষে দীর্ঘস্থায়ী হয় নি এবং ঘটনা স্বাভাবিক সড়ক ধরে ‘শত’-স্ফূর্ত হয়ে এগোয় নি। এত অবদমন গাছে ধরে না, যতটা আছে রবীন্দ্রনাথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.