ব্যক্তিত্ব

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের দেড়শ বছর

তুলনাহীন রবীন্দ্রনাথ

kabir_chy | 7 May , 2011  

rabindranath-tagore2.jpg
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭/৫/১৮৬১ – ৭/৮/১৯৪১)

রবীন্দ্রনাথ যে কত বিষয়ের উপর লিখেছেন, এবং নীরব বৈচিত্র্যময় ভঙ্গিতে তাঁর হৃদয়ের কথা বলেছেন, তার কথা ভাবলে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। কতো রকম কবিতা লিখেছেন তিনি: উচ্ছ্বসিত আনন্দের, তেমনি গভীর বিষণ্নতার। আমাদের মনে পড়ে “নববর্ষা” কবিতার কথা, যার প্রথম চরণ হল:

“হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো নাচেরে হৃদয় নাচেরে”

এর পাশাপাশি আমাদের মনে পড়ে “দুঃসময়” কবিতার কথা, যার কয়েকটি চরণ হল:

“নাই স্নেহ মোহ বন্ধন
ওরে আশা নাই, আশা শুধু মিছে ছলনা।

ঊষা দিশাহারা নিবিড় তিমির আকাশ…”

মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, তখন নিজে লিখতে পারেন না, মুখে মুখে বলে গিয়েছেন:

“তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনা জ্বলে
হে ছলনাময়ী…”

এক সময় তো কবি প্রকৃতির মধ্যে, তাঁর সকল পরিপার্শ্বের মধ্যে, শুভ ও কল্যাণের প্রতিমূর্তি দেখেছিলেন, তাহলে কেন ছলনাময়ী? তবে ছলনাময়ী হলেই যে ছলনার জালে ধরা পড়তে হবে এমন কোনো কথা নেই। অন্তরে যদি সত্য থাকে তাহলে ছলনার জাল অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাই কবির সর্বশেষ কবিতা “তোমার সৃষ্টির পথ”-এ আমরা শুনি:

“অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে
সে পায় তোমার হাতে
শান্তির অক্ষয় অধিকার।”

‘এ জাতীয় গভীর দার্শনিক তত্ত্ব সংবলিত বহু কবিতার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ লঘু হাস্যরসাক্রান্ত বেশ কয়েকটি ছড়াও লিখেছেন। আমাদের মনে পড়ে দামোদর শেঠ, গোরা বোস্টম কাব্য এবং বীরের ছাঁদে আসা বরের কথা। শেষের কবিতাটি খুব ছোট, এবং একটি অসামান্য সৃষ্টি। পুরোটাই তুলে দিচ্ছি।

“বর এসেছে বীরের ছাঁদে বিয়ের লগ্ন আটটা
পিতল আঁটা লাঠি কাঁধে, গালেতে গালপট্টা।
শালীর সঙ্গে ক্রমে ক্রমে আলাপ যখন উঠল জমে
রায় বেশে নাচ নাচের ঝোঁকে মাথায় মারলে গাঁট্টা
শ্বশুর কাঁদে মেয়ের শোকে, বর হেসে কয় ঠাট্টা।”

রবীন্দ্রনাথ কয়েকটি অনবদ্য কাহিনী-কবিতা লিখেছেন। স্মরণ করুন: সামান্য ক্ষতি, পুরস্কার, ছুটি, ফাঁকি, সাধারণ মেয়ে, জুতা আবিষ্কার প্রভৃতি কবিতার কথা। তাঁর সৃষ্টির পরিমাণ, বৈচিত্র ও ঐশ্বর্য তুলনাহীন। কবিতা, গান, ছড়া, ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী, পত্রসাহিত্য, আত্মজীবনী প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য অবদান ছাড়াও আছে তাঁর চিত্রকর্ম ও বত্তৃতা-ভাষণ। এবং এর প্রতিটি ৰেত্রেই কতো বৈচিত্র্য, কতো গভীরতা, কতো নতুনত্ব!

রবীন্দ্রনাথের অসামান্য সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের দিকে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকার কারণে আমরা অনেক সময় তাঁর সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকার কথা বিস্মৃত হই। ওই সব ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিলো বিস্ময়কর। এ প্রসঙ্গে আমরা বিশেষ ভাবে স্মরণ করতে পারি জালিয়ানওয়ালা বাগ-এর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তাঁর নাইটহুড খেতাব বর্জন, মিথ র্যবথবোনের কাছে লেখা তাঁর খোলা চিঠি এবং তাঁর “সভ্যতার সঙ্কট” ভাষণের কথা।

রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এইভাবে তাঁর জীবন ও কর্মের অসামান্য বৈচিত্রের কথা বলতে গেলে আমি কখনোই আমার এই লেখার সমাপ্তি টানতে পারবো না। তাই এবারের মতো অন্য সব প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে তাঁর একটি অসামান্য প্রতীকী রচনা দিয়ে আমি আমার বর্তমান লেখাটি শেষ করবো। ছয়টি ছোট ছোট অনুচ্ছেদে বিভক্ত মাত্র দু’পৃষ্ঠার একটি রচনা, নাম “কর্তার ভূত” আমি এখানে শুধু প্রথম ও শেষ অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করছি।

প্রথম অনুচ্ছেদ

“বুড়ো কর্তার মরণকালে দেশশুদ্ধ সবাই বলে উঠলো, তুমি গেলে আমাদের কী দশা হবে? শুনে তারও মনে দুঃখ হলো। ভাবলো, আমি গেলে এদের ঠাণ্ডা রাখবে কে? তা বলে মরণ তো এড়াবার জো নেই। তবু দেবতা দয়া করে বললেন, ভাবনা কী? লোকটা ভূত হয়েই এদের ঘাড়ে চেপে থাক না। মানুষের মৃত্যু আছে, ভূতের তো মৃত্যু নেই।”

শেষ অনুচ্ছেদ

“মোদ্দা কথাটা হচ্ছে, বুড়ো কর্তা বেঁচেও নেই, মরেও নেই, ভূত হয়ে আছে। দেশটাকে সে নাড়েও না, অথচ ছাড়েও না।

দেশের মধ্যে দু’একটা মানুষ আছে, যারা দিনের বেলায় নায়েবের ভয়ে কথা কয় না, তারা গভীর রাত্রে হাত জোড় করে বলে, কর্তা, এখনো কি ছাড়ার সময় হয় নি?

“কর্তা বলেন, ওরে অবোধ, আমার ধরাও নেই, ছাড়াও নেই, তোরা ছাড়লেই আমার ছাড়া।

“তারা বলে, ভয় করে যে কর্তা।
“কর্তা বলেন, সেই খানেই তো ভূত।”

একটি অসামান্য ও অদ্ভুত রচনা। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই তুলনাহীন, তাঁর জুড়ি নেই।

২.৫.২০১১

free counters


3 Responses

  1. তার প্রত্যেকটি লেখা বিস্ময়-জাগানিয়া।

  2. ক্লাস নাইন-টেন এ পড়ার সময় দৈনন্দিন জীবনে আমার প্রধানতম বিনোদন ছিল “বাণী চিরন্তনী” পড়া। হাজারখানেক পৃষ্ঠার বই। হাজার হাজার টপিক, হাজার হাজার বাণী, হাজার হাজার দর্শন। সেইসময় হঠাত আমার উপলব্ধি হল, রবীন্দ্রনাথ প্রায় প্রত্যেকটি বিষয় এর উপরই অসাধারণ কথা লিখে গেছেন, হয় গানে। তা না হলে কবিতায়, উপন্যাসে। এবং তা মোটেও ইচ্ছা প্রণোদিত ছিল না।
    তার চেয়েও অবাক হওয়ার মত ব্যাপার হল, প্রায় প্রত্যেকটা বিষয় এ তার বাণীটাই সবচাইতে সুন্দর।
    রবীগুরুর তুলনা শুধু রবীই। অমানবিক রকমের অসাধারণ।

  3. Faruk Hyder Choudhury says:

    My heartfelt thanks to Kabir Choudhury for showing a glimpse of Rabi Tagore.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.