সংস্কৃতি

বাংলাদেশের নাচ

saymon_zakaria | 14 Apr , 2011  


ভিডিও, ‘বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য’, প্রামাণ্য উপস্থাপন: সাইমন জাকারিয়া

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যধারা মূলত বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী উৎসব-অনুষ্ঠান, কৃত্যাচার বা পূজার সাথে সম্পর্কিত। এক্ষেত্রে অধিকাংশ নৃত্যধারার সঙ্গে পুরাণ কাহিনীর উপস্থাপনার যেমন যোগ থাকে তেমনি সঙ্গীতের যোগ থাকে। সেই বিচারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যধারাকে গান বা নাট্যপালা হিসেবেই পরিবেশিত হতে দেখা যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবেশনাসমূহ ‘নাচ’, ‘নাচন’, ‘নাচাড়ি’ ইত্যাদি নাম প্রয়োগ হতে দেখা গেলেও অধিকাংশ গবেষক পরিবেশনাগুলিকে নাট্যপালার পরিবেশনা বলেই শনাক্ত করেন। কারণ, নৃত্যের উপাদান পরিবেশনাতে মুখ্য হয়ে উঠলেও পরিবেশনাসমূহে যখন নাট্যের উপাদান যুক্ত থাকে তখন তাকে নাট্যপালা বলে অভিহীত করা অসমীচিন হয় না। তবে, সুর-বাণী আশ্রিত সঙ্গীত কিংবা বাচিক সংলাপ-বর্ণনা আশ্রিত নাট্য পরিবেশনা ব্যতীত শুধু তাল সহযোগে কিছু বিশুদ্ধধারার ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের প্রচলন বাংলাদেশে বর্তমান রয়েছে। এই আলোচনায় সাম্প্রতিক কালের বাংলাদেশে প্রচলিত সঙ্গীত-নাট্য আশ্রিত কিছু ঐতিহ্যবাহী নৃত্যধারার পরিচয় প্রদান করা হলো।

01.jpg
বেহুলার নাচাড়ি

ঝুমুর নাচ/পাতা নাচ
কারাম-করমা-করম পূজার অনুষ্ঠানে সাধারণত এই নৃত্য পরিবেশন করা হয়। এই নাচের বিষয় দেবতা-নির্ভর নয়, সম্পূর্ণ রূপে মানবিক। প্রেম-বিবাহ, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, জীবনযন্ত্রনা এই নাচের বিষয়বস্তু হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে শ্রীমঙ্গল চাবাগানে দেখা ঝুমুর নাচের একটি অনুষ্ঠানের কথা বলতে পারি, সে অনুষ্ঠানে গান হিসেবে গীত হয়েছিল:

চারাগাছে নতুন পাতি
সবুজ বরণ টীলা লো
মোদের নেই যে খানি শুধু চোখের পানি
নালা-খালার জল খাইয়া বদন হলো কালা গো॥

oraoder-karam-nach.jpg

এই গানের ভেতর দিয়ে চা বাগানের মানুষের জীবন-ইতিহাস করুণভাবে বর্ণিত হয়েছে। আর এধরনের গানকে উপজীব্য করেই পরস্পর পরস্পরের হাত অনেকটা লতার মতো পেচিয়ে নিয়ে এক পা সামনে এগিয়ে দুই পা পেছানোর ভঙ্গিতে ডান বা বাম পাশে বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে এই নৃত্য পরিবেশন করতে দেখা যায়। চা বাগানের শ্রমিকদের মতো সমতলের ওঁরাওদের কারামপূজাতেও প্রায় একই ধরনের ঝুমুর নাচ পরিবেশন করতে দেখা যায়।

পদ্মার নাচন
কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা, মিরপুর ও দৌলতপুর থানার বিভিন্ন গ্রামে পদ্মাপুরাণের কাহিনীকে নিয়ে ‘পদ্মার নাচন’ নামে এক ধরনের পরিবেশনারীতি প্রচলিত রয়েছে। এ রীতির পরিবেশনার সাধারণ বিশেষত্ব হচ্ছে– এটি মূলত নৃত্যপ্রধান গীতিনাট্যাভিনয়। এ ধরনের নাট্য পরিবেশনে নৃত্যের আধিক্য থাকে বলেই পরিবেশনারীতির নামের সঙ্গে নাচন শব্দটি যুক্ত হয়েছে।

এ ধরনের পরিবেশনা মূলত পাবনা অঞ্চলে প্রচলিত পদ্মাপুরাণ গান থেকে অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালে সৃষ্টি হয়েছে। কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর, ভেড়ামারা, মিরপুর থানায় প্রচলিত পদ্মার নাচনের অধিকাংশ গায়েন-শিল্পীরা জানান, এ ধরনের পরিবেশনা প্রথম প্ররর্তন করেন মিরপুর থানার কেউপুর গ্রামের রিয়াজউদ্দিন মালিথা। কথিত আছে যে, পদ্মার পার অর্থাৎ পাবনার সন্তোষ পালের নিকট থেকে পদ্মার নাচন গানকে তিনিই প্রথম মিরপুরে আনেন। পরবর্তীতে তাঁর সন্তনের মধ্যে প্রয়াত জের আলী ফেলু এবং বর্তমানে জীবিত আব্দুল কাদের মালিথা এ ধরনের পরিবেশনা উক্ত এলাকায় ছড়িয়ে দিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। বর্তমান রিয়াজউদ্দিন মালিথার বংশধরের মধ্যে তাঁর দৌহিত্র অর্থাৎ আব্দুল কাদের মালিথার ছেলে হোসেন আলী (৪০) ও নাতি চঞ্চল ফকির (২৮) নিয়মিতভাবে পদ্মার নাচনের আসর করে থাকেন।

podma-puran-ganer-nach.jpg

পদ্মার নাচন পরিবেশনার জন্য স্থায়ী কোনো মঞ্চের প্রয়োজন পড়ে না। দশ ফুট থেকে বারো ফুট আয়তনের ভূমি সমতল বর্গাকৃতি স্থান এ ধরনের নৃত্য-গীতি-নাট্য পরিবেশনার জন্য উপযোগী। এক্ষেত্রে স্থানটিকে ৪টি বাঁশের খুঁটির ওপর টিন বা শামিয়ানা দ্বারা আচ্ছাদিত করা হয়। দর্শক পরিবেশনাস্থানের চারদিকে অবস্থান করেন।

পদ্মার নাচন পরিবেশনে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে খোল, করতাল এবং পাইলদের পায়ের ঘুঙুর ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এছাড়া, দৃশ্য পরিবর্তনে কখনো কখনো একটি ঝাঁঝ ব্যবহার করতে দেখা যায়।
পদ্মার নাচন পরিবেশনায় কুশীলবগণ সাধারণত সাদা রঙের পাঞ্জাবি ও ধুতি ব্যবহার করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল গায়েনসহ অন্য কুশীলব ও গায়েন-দোহারকে দৈনন্দিন জীবনের পোশাক পরেই এ ধরনের নাট্যাভিনয় করতে দেখা যায়। এছাড়া, কিছু কিছু আসরে বাদ্যযন্ত্রী ও দোহারগণ সাদা কোড়াগেঞ্জি (হাতা বিশিষ্ট গেঞ্জি) ও ধুতি ব্যবহার করেন। এক্ষেত্রে তাদের কোমরে কোমরবন্ধনী হিসেবে লাল জড়ির ওড়না শক্ত করে বাঁধা থাকে। কখনো কখনো গামছাকেও কোমরবন্ধনী হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যায়। পদ্মার নাচন পরিবেশনে নারীর বেশে পুরুষ কুশীলব বা ছুকরিরা লাল, হলুদ, গোলাপি ইত্যাদি রঙের শাড়ি পরিধান করেন। তাদের শাড়িতে নানান রঙের কারুকাজময় নকশা যুক্ত থাকে।

পদ্মার নাচন পরিবেশনে ছুকরিগণ ব্যতীত অন্যান্য কুশীলব তেমন কোনো সাজ গ্রহণ করেন না। সাজ গ্রহণে ছুকরিগণ বিভিন্ন রঙের অক্সাইডের গুড়া, সিঁদুর, কাজল, জরি ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকেন। গ্রামের বাড়ির সাধারণ কোনো ঘর বা ঘরের বারান্দায় বসেই ছুকরিগণ সাজ গ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে আলাদাভাবে কোনো সাজঘরের প্রয়োজন পড়ে না।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, পদ্মার নাচন মূলত একটি নৃত্যপ্রধান পরিবেশনারীতি। নৃত্য ছাড়াও এ ধরনের পরিবেশনারীতিতে বর্ণনাত্মক গদ্য, বর্ণনাত্মক গীত এবং সংলাপাত্মক অভিনয় লক্ষ করা যায়। আসরের শুরুতে বাদ্যযন্ত্রী ও অন্যান্য কুশীলব খোল বাদককে কেন্দ্রে রেখে বৃত্তাকারে অবস্থান গ্রহণ করে ভূমি প্রণাম করে নেন। এরপর খোল এবং করতাল বাদনের মধ্যে সকল কুশীলব এবং ছুকরিগণ বৃত্তাকারে নৃত্যযোগে বাম দিক থেকে ডান দিকে আসর পরিক্রমণ করেন। কুশীলবদের আসর পরিক্রমণের পর এ ধরনের পরিবেশনায় একে একে রামস্তব, বন্দনা গীত এবং পালার প্রসঙ্গ অবতারণা করা হয়। প্রসঙ্গ অবতারণাকে পালা পরিবেশনের প্রস্তাবনা বলা যেতে পারে। কেননা, এ পর্বে দুই গায়েন উক্তি-প্রত্যুক্তিমূলক সংলাপের ভেতর দিয়ে পালা পরিবেশনার উদ্দেশ্য ও কারণ ব্যক্ত করে থাকেন। আর মূল আখ্যান পরিবেশনে সাধারণত বর্ণনাত্মক গদ্য, বর্ণনাত্মক গীত, গদ্য সংলাপ, গীত সংলাপ এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বর্ণনাত্মক গীত ও গীত সংলাপ মিশ্রভাবে পরিবেশিত হয়ে থাকে। এ পর্যায়ে পদ্মার নাচনের নৃত্য পরিবেশনারীতির বিবরণ উপস্থাপন করা হলো।

পদ্মার নাচনে বর্ণনাত্মক গীত পরিবেশনের সময় বাদ্যযন্ত্রীগণ, ছুকরি এবং পাইল-দোহার বেষ্টিত একটি ছোট বৃত্তের বাইরে মূল গায়েন আরেকটি বড় বৃত্ত রচনা করে বাম-ডান উভয় দিকে পরিক্রমণ করেন। তবে, ছুকরি ও দোহারগণ কেবল বামদিক দিয়ে নৃত্যযোগে ধুয়া গেয়ে পরিক্রমণ করতে থাকেন। দোহারগণ প্রতিবার ধুয়ার প্রথম মাত্রার উপরে ঘূর্ণনসহ ধুয়া গেয়ে বৃত্ত রচনা অব্যাহত রাখেন। বৃত্তে দোহারদের অবস্থান থাকে কেন্দ্রমুখী।

বর্ণনাত্মক গীতের এক পর্যায়ে গায়েন চলমান তাল থামিয়ে দ্রুত তালে পুনরায় বর্ণনাত্মক গীত (লাচাড়ি) শুরু করেন। এসময়ে ধুয়ার চরণ সংক্ষিপ্ত এবং পয়ারের দ্বি-পদী চরণ থেকে এক-পদী চরণ শেষে এই সংক্ষিপ্ত ধুয়া পরিবেশিত হয়। তাল দ্রুততর হয় এবং নৃত্যে উল্লম্ফন ও ঘূর্ণন অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। এই পরিবেশনার নৃত্যের আর একটি বৈশিষ্ট্য কোমরের ব্যবহার। এই নৃত্যে দোহার বা নৃত্যকারগণ এক নাগাড়ে দীর্ঘক্ষণ বিশেষভাবে কোমর ঘোরাতে থাকেন। এই বিশেষ প্রকারের নৃত্যকে পদ্মার নাচনের শিল্পীরা ‘ডাইল ঘোটা’ বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। শুধু তাই নয়, তারা নৃত্যে সমস্ত শরীরের ঘূর্ণনকে ‘পায়রা’ বলে থাকেন। লাচাড়ি পরিবেশনার সামগ্রিক যে রূপ পরিলক্ষিত হয় তা হলো– এসময়ে খোল বাদক দোহারদের বৃত্তের কেন্দ্রে অবস্থান করেন এবং এক পর্যায়ে তিনি তালের ছন্দের সাথে ছড়া কেটে বোল বলেন। দীর্ঘ সময় নিয়ে পরিবেশিত হতে থাকে এই নৃত্য। এ ধরনের নৃত্যাংশে মূল গায়েনও তার গীতাভিনয় বন্ধ রেখে উক্ত নৃত্যে অংশগ্রহণ করেন। অবশ্য এ সময়ে কখনো কখনো তাকে বিশ্রামে চলে যেতেও দেখা যায়। নৃত্য পরিবেশনার অংশটি পরিচালনা করেন খোল বাদক। এভাবে বেশ কিছু সময় চলার পর বাদক জোরালো তেহাই যোগে নৃত্য পরিবেশনার এক একটি অংশটি সমপন্ন করেন।

পদ্মার নাচন পরিবেশনার সঙ্গে নারী শিল্পীদেরকে কখনো অংশ নিতে দেখা যায় না। সাধারণত ছেলেরাই নারী সেজে নারী চরিত্র এবং কখনো কখনো গায়েনের চরিত্রে অভিনয় করে থাকেন। প্রায় সারা বছর কৃষ্টিয়া জেলার মুসলমান ধর্মাবলম্বী গ্রামের কৃষক, শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষ পেশাজীবীর ভিত্তিতে এ ধরনের গীতিনৃত্যমূলক নাট্য পরিবেশন করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর, ভেড়ামারা ও মিরপুর থানাতে মুসলমান গায়কদের নেতৃতে ‘পদ্মার নাচনে’র অসংখ্য দল প্রত্যক্ষ করা যায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দল হচ্ছে– ভেড়ামারা থানার পরানখালি গ্রামের হায়দার আলী, মিরপুর থানার নওদাখারারা গ্রামের আক্তার পরামানিক, কেউপুর গ্রামের হোসেন আলী, বিভাগচারমাইল গ্রামের ময়েনউদ্দীন বয়াতী এবং দৌলতপুর থানার নারায়ণপুরের নাসির উদ্দিন, সুরামপুরের জামাত, দীঘরকান্দির গনিমুল্লা, শেরপুরের শারেজ উদ্দিন, ছাতারপাড়া ইউসুফপুরের মক্কেল ও ঝাওদিয়ার পাথর হাজামের পদ্মার নাচনের দল।

বেহুলার নাচাড়ি
কুষ্টিয়া জেলার মতো টাঙ্গাইল জেলাতেও কিছু সংখ্যক নিম্নবর্গের মুসলমান পদ্মাপুরাণের আখ্যান পরিবেশন করে থাকেন। এই অঞ্চলের পরিবেশনারীতির নাম ‘বেহুলার নাচাড়ি’ এবং এ ধরনের পরিবেশনাও নৃত্যপ্রধান। সাধারণত শ্রাবণ-সংক্রান্তিতে মনসার পূজা উপলক্ষে এ ধরনের নৃত্যগীত প্রধান নাট্যরীতির অভিনয় বেশি হয়ে থাকে। এছাড়া, কাউকে সাপে দংশন করলে কিংবা কেউ কোনো ধরনের বিপদে পড়লে বেহুলার নাচাড়ির আয়োজন করেন। এক্ষেত্রে প্রায় সারা বছরই বেহুলার নাচাড়ির আসর বসে থাকে। বাড়ির বাইরের উঠানে বা উন্মুক্ত কোনো স্থানে বিশ ফুট বর্গাকার স্থান নির্দেশ করে তার চারদিকে চারটি গাছ বা বাঁশের খুঁটি পুতে উপরে শামিয়ানা টানিয়ে ভূমি সমতলে অভিনয় স্থান বা মঞ্চ তৈরি করা হয়। মঞ্চের চারদিকে দর্শকদের বসার ব্যবস্থা থাকে। এক্ষেত্রে মঞ্চের একদিকে নারী ও শিশু দর্শকদের জন্য বরাদ্দ থাকে। দর্শকগণ সাধারণ মাটির উপর খড় বিছিয়ে বসে বা দাঁড়িয়ে বেহুলার নাচাড়ি উপভোগ করে থাকেন। উল্লেখ্য, মঞ্চের একদিক ঘেষে দর্শকসারির মধ্যে একটি বা দু’টি পাটি বিছিয়ে বাদ্যকর-দোহারদের বসার ব্যবস্থা রাখা হয়। সাধারণত অভিনয় মঞ্চের নিকটবর্তী কোনো নির্জন বা নিরাপদ বাড়ির উঠানের এক পাশে পাটি বা চট বিছিয়ে বসে বেহুলার নাচাড়ির শিল্পী-কুশীলবগণ সাজ গ্রহণ করে থাকেন। সাজ গ্রহণের সময়ে তারা একটি প্লাস্টিকের বদনায় পানি এবং প্লাস্টিকের শিশি বা বোতলে কিছু নারিকেল তেল নিয়ে তা সঙ্গে রাখেন। আসলে কুশীলবগণ তাদের সঙ্গে রাখা উক্ত তেল ও পানি মুখমণ্ডল ও দেহে রঙ লেপনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে থাকেন। রঙ হিসেবে বিভিন্ন রঙের জিঙ্ক-অক্সাইড যেমন মিনা বা লাল, হলুদ, সরিষাফুল, নীল, সফেদা বা সাদা ইত্যাদি ব্যবহার করেন। উল্লেখ্য, এ ধরনের পরিবেশনার জন্যে প্রায় কুশীলবগণই তাদের চোখে কাজলের সাজ গ্রহণ করেন। আর মহাদেব চরিত্র সর্বাঙ্গে সাদা রঙের মহাদেব ফোঁটা, পেছনে ধরা নামের এক ধরনের কাপড়ের আস্তরণ, মাথায় জটা, দুই বাহুতে দু’টি এবং কোমরের সামনের দিকে আরও তিনটি কাপড়ের তৈরি সাপের ফণা, গলায় আরেকটি সাপের ফণা, পরণে বাঘের ছাল ও পায়ে ঘুঙুর পরে চরিত্রানুগ সাজ গ্রহণ করে থাকেন। নারী চরিত্রে ভূমিকা গ্রহণকারী পুরুষ কুশীলবগণ মুখমণ্ডলে রঙ লেপন করেন, চোখে কাজল দেন ও মাথায় কেশবন্ধনী করেন। উঠানে অন্যান্য কুশীলবদের সঙ্গে বসে নিয়ে ব্লাউজ, শাড়ি ও ওড়না পরার সময়ে পার্শ্ববর্তী একটি ঘরে প্রবেশ করেন তারা এবং সে ঘর থেকে পূর্ণাঙ্গরূপে নারীর সাজ গ্রহণ করে বাইরে আসেন। এক্ষেত্রে বেহুলার নাচাড়ি পরিবেশনের সাজ গ্রহণে একই সঙ্গে খোলাস্থান ও সাজঘর ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।

এ ধরনের পরিবেশনার সঙ্গে যুক্ত শিল্প-কুশীলবদের পোশাকে বেশ বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। বেহুলা চরিত্রে রূপদানকারীর পোশাক হিসেবে কোমরে আর পদ্মাদেবীর চরিত্রে রূপদানকারীর পোশাক হিসেবে একটি রঙিন জর্জেট শাড়ি কোমরে কুচি দিয়ে বেঁধে ঘাঘরার মতো ব্যবহার করেন। আর উপরের অংশে লাল রঙের ব্লাউজের উপর একটি সবুজ রঙের ওড়না ডান কাঁধের উপর থেকে বাম বাহুর নিচে আড়াআড়ি ভাবে বুকের উপর ছড়িয়ে বাঁধা রাখেন।

শিব চরিত্র খালি গায়ে পরনে হাঁটুর উপর পর্যন্ত বাঘের ছালের মতো সাদা ও খয়েরি রঙের ছাপ দেওয়া একটি বস্ত্র এবং গলায় বেঁধে শরীরের পেছন দিকে, অর্থাৎ পিঠের উপর লাল পাড়ের কুচি দিয়ে সেলাই করা কালো রঙের একটি প্রসারিত বস্ত্র ব্যবহার করেন। উল্লেখ্য, পিঠে বিছানো এই বস্ত্রটির মাঝখানে সাদা রঙের কাপড়ের একটি ‘ত্রিশূল’ এবং ‘ওঁ’ সেলাই করে শিবের প্রতীক হিসেবে সংযুক্ত থাকে।

চাঁদ সওদাগর চরিত্রে রূপদানকারী লাল রঙের হাফ হাতা জামা এবং সোনালি জরির পাড়ওয়ালা লাল রঙের ধুতি ব্যবহার করেন। লক্ষ্মীন্দর চরিত্র সাদা রঙের পাজামা-পাঞ্জাবি; পার্বতী ও সনেকা চরিত্র প্রিন্টের সুতি শাড়ি এবং লাল রঙের ব্লাউজ পরিধান করেন। এছাড়া, আখ্যান বর্ণনাকারী (দলীয় ভাবে যাকে ওস্তাদ বলা হয়) সাধারণত নিজের দৈনন্দিন জীবনের পোশাক পরেই মঞ্চে অবতীর্ণ হয়ে থাকেন। দু’একটি ক্ষেত্রে তিনি সাদা রঙের শার্ট-প্যান্ট ব্যবহার করেন।

এ ধরনের নৃত্যপ্রধান পরিবেশনারীতি বাদ্যযন্ত্র হিসেবে হারমোনিয়াম, কর্নেট, ঢোল ও করতাল ব্যবহৃত হয়। এছাড়া, প্রায় এক ফুট লম্বা এবং চার ইঞ্চি প্রসারিত কাঠের একদিকে দুই ইঞ্চি ফাঁকা দু’টি বৃত্তাকার অংশে তিন-চারটি করে টিনের ছোট পাত যুক্ত করে নির্মিত ‘খটকাতাল’ নামক এক ধরনে হাতলওয়ালা তালযন্ত্র ব্যবহার করা হয়।

টাঙ্গাইল অঞ্চলের বেহুলার নাচাড়ি মূলত নৃত্য-গীত প্রধান পরিবেশনারীতি হলেও এ ধরনের পরিবেশনাতে সংলাপাত্মক ও বর্ণনাত্মক অভিনয় প্রত্যক্ষ করা যায়। সংলাপাত্মক অভিনয়ের ক্ষেত্রে যাত্রার সংলাপ প্রক্ষেপণের কিছুটা প্রভাব থাকলেও এ ধরনের পরিবেশনাতে যাত্রার অভিনয়রীতি তেমনভাবে অনুসৃত হতে দেখা যায় না। বেহুলার নাচাড়ির অভিনেতাগণ তাদের চরিত্রাভিনয়ের অনেক সময় ভাবাক্রন্ত হয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে তারা পরস্পর পরস্পরকে আলিঙ্গনসহ মাটির উপর আছড়ে পড়েন এবং কখনোবা আবার চেতনালুপ্ত হয়ে যান। চেতনালুপ্ত অভিনেতাকে অন্যান্য কুশীলব অভিনয় স্থান থেকে কোলে তুলে সাজঘরে নিয়ে গিয়ে সুস্থ করে তোলেন। তবে, অভিনেতা চেতনা হারালেও বেহলার নাচাড়ির চলমান অভিনয়কে কখনো অভিনয় থেমে থাকতে দেখা যায় না। বর্ণনাকারী ওস্তাদ এক্ষেত্রে মঞ্চে এসে বর্ণনাত্মক অভিনয়ের আশ্রয়ে অপর কোনো একটি ঘটনা বা দৃশ্যের অভিনয়ের অবতারণা করেন।

এ ধরনের আসরে বর্ণনাকারীর ভূমিকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসলে পালার আখ্যানকে সংক্ষিপ্ত এবং বিস্তৃত করতে তিনিই প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকেন। মঞ্চে এসে তিনি গল্পকথকের ছলে বর্ণনা করেন, যে কারণে মুহূর্তের মধ্যে তিনি অনেক ঘটনার বর্ণনা মাত্র কয়েকটি কথার ভেতর দিয়ে সমাপ্ত করে আখ্যানকে বেশ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। আবার দর্শক-শ্রোতাদের উপস্থিতি ও মুগ্ধতা দৃষ্টে তিনি আখ্যান বস্তুর মধ্যে একটি ঘটনাকে অনেকখানি বিস্তৃতি দান করে থাকেন।

বেহুলার নাচাড়ির শুরুতে বাদ্যযন্ত্রীগণ বেশ কয়েকটি গানের সুরে সম্মিলিত বাদ্য বাদন করেন। এরপর ওস্তাদ এবং নারীর বেশধারী তিন-চারজন ও লক্ষ্মীন্দর চরিত্রে রূপদানী অভিনেতা সাজঘর থেকে মঞ্চ প্রণাম করে বৃত্তাকারে ঘুরে বাদ্যযন্ত্র ও বাদ্যকরদের প্রণাম করে পূর্বমুখী হয় বন্দনাগীত শুরু করেন। বন্দনাগীত পরিবেশনের সময় ওস্তাদ অনেক সময় দোহার-বাদ্যকর দলে অবস্থান নেন। আর নারীর বেশধারী অভিনেতা ও লক্ষ্মীন্দর চরিত্র মঞ্চের চার কোণে দাঁড়িয়ে বন্দনাগীত পরিবেশন করেন। বন্দনাগীতের মধ্যে যখন যেদিকের কথা আসে অভিনেতাগণ তখন সেদিকে মুখ ঘুরে নৃত্যের ছন্দে দেহ দুলিয়ে বন্দনা গেয়ে চলেন। এ ধরনের বন্দনাগীত পরিবেশন করে অভিনেতাগণ মঞ্চ থেকে প্রস্থান করতেই বর্ণনাকারী ওস্তাদ এসে আখ্যান বর্ণনা শুরু করেন। এ ধরনের আসরে সাধারণত পদ্মাদেবীর জন্মের ঘটনা দিয়ে শুরু হয়। পদ্মার জন্ম প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বর্ণনাকারী মঞ্চ থেকে চলে যেতেই মঞ্চে শিব চরিত্রের আগমন ঘটে। তার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক অন্যান্য চরিত্রেরও আগমন প্রত্যক্ষ করা যায়।

সুস্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করা যায় যে, ওস্তাদ কর্তৃক বর্ণনাত্মক অংশ কথকতার ভঙ্গিতে পরিবেশিত হয়ে থাকে। আর এই বর্ণনাত্মক অংশ মূলত পালার আখ্যানভাগকে খুব সহজে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং সংলাপাত্মক চরিত্রাভিনয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে। শুধু তাই নয়, এ ধরনের পরিবেশনারীতির আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য গীত-নৃত্য মূলত সংলাপাত্মক চরিত্রাভিনয়ের সময়েই প্রযুক্ত হতে দেখা যায়।

ধামাইল নাচ
বাংলাদেশের বিয়ের গানের সর্বাধিক জনপ্রিয় শাখা হচ্ছে ধামাইল গান। ধামাইল গান মূলত নৃত্য-সম্বলিত কাহিনীমূলক সঙ্গীত বলে এ ধরনের পরিবেশনা রীতি ‘ধামাইল নাচ’ নামেও সমধিক পরিচিত। সাধারণত বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের বিবাহ উপলক্ষে এই ধামাইল নাচ সঙ্গীত সহযোগে পরিবেশিত হয়। এই নাচের অন্যতম বিশেষত্ব হচ্ছে এই নাচ স্ত্রীসমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। দশ পনের কি বিশ-পঁচিশ জন স্ত্রীলোকে বাড়ির খোলা কোনো স্থানে চক্রাকারে দাঁড়িয়ে তালে তালে করতালি দিয়ে গীত সহযোগে এই ধামাইল নাচ পরিবেশন করে থাকেন। ধামাইল নাচ যেহেতু একটা বিশেষ সর্ম্পকের ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে পরিবেশিত হয় তাই এই নাচে শ্যালিকা, বৌদি, দাদী, নানী সর্ম্পকের মহিলারাই এই পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। যাকে উপলক্ষ করে এই ধামাইল নাচ পরিবেশিত হয় তাঁর সম্পর্কের মা-কাকী-মামী জাতীয় কেউ এই পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করতে বিধিনিষেধ রয়েছে। এসব সম্পর্কের ব্যতিরেকে অন্য সবাই নাচে অংশগ্রহণ করেন। তবে বিভিন্ন পূজা-পার্বণ-উৎসবে যেহেতু ধরা-বাঁধা কোনো নিয়ম নেই তাই এ সময় পরিবেশিত ধামাইল নাচের সময় সকল মহিলারাই সমানভাবে অংশগ্রহণ করে থাকেন। আর শিশুদের অন্নপ্রাশনের সময় শিশুর মা-মামী-কাকী-দাদী-বোন-মাসি-পিসি-পাড়া প্রতিবেশী সকলেই অংশগ্রহণ করেন এবং শিশুকে নিয়ে আনন্দ-ফূর্তিতে মেতে ওঠেন।

05.jpg

ধামাইল নাচ পরিবেশনের জন্য বিশেষ কোনো স্থান কিংবা মঞ্চের প্রয়োজন পড়ে না। বাড়ির ভেতর অথবা বাহিরের উঠানে, ঘরের মেঝেতে কিংবা সামান্য একটু খোলা জায়গায় ১০/১৫ জন মহিলা গোল হয়ে এই নাচ পরিবেশন করে থাকেন।

গ্রাম অঞ্চলে ধামাইল গান ও নৃত্যে অপরূপ এক সংহতির পরিচয় পাওয়া যায়। ছোট, বড়, ধনী, দরিদ্র নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর নারীরা মিলে সমবেতভাবে এই গান পরিবেশন করে থাকেন। শিল্পীরা সাধারণত করতালির মাধ্যমে এই গান গেয়ে চক্রাকারে নৃত্যের আঙ্গিকে ঘুরে ছন্দোময় ভাবে ধামাইল নাচ পরিবেশন করে থাকেন। এই নাচ পরিবেশনের সময় কোনো ধরনের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করার ঐতিহ্য না-থাকলেও সম্প্রতি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের ধামাইল নাচের শিল্পীগণ কিছু কিছু আসরে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ঢোল ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু, ব্যবহৃত সেই বাদ্যযন্ত্র এই নাচ পরিবেশনে তেমন কোনো ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে না। আসলে, শিল্পীদের ছন্দোময় করতালির মধ্যমে সমবেত টানা সুর, তাল এবং লয়ের সমন্বয়ে এই নাচ পরিবেশিত হয়।

ধামাইল নাচের একটি আকর্ষণীয় অংশে ভাটিয়াল এবং উল্টো ভাটিয়াল নৃত্য করা হয়। এক্ষেত্রে নাচের দলটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পরস্পর বিভক্ত দুটি দল একবার কাছে এগিয়ে পরমুহূর্তে দূরে সরে যায়, যখন কাছে এগিয়ে আসে তখন তাকে ভাটিয়াল বলে আর যখন দূরে সরে যায় তখন তাকে উল্টো ভালিয়াল বলে।

ধামাইল নাচ পরিবেশনের শুরুতেই শিল্পীরা হাত দিয়ে এক ‘থাপা’ বা একবার করতালি দিয়ে থাকেন। পরে গানের চরম বা শেষ মুহূর্তে এই করতালির পরিমান ক্রমাগত বাড়তে থাকে, অর্থাৎ দুই থাপা, তিন থাপা, চার থাপা করে করতালির পরিমাণ বেড়ে যায় এবং চরমে উঠে একটি পর্বের ধামাইল নাচ পরিবেশন সমাপ্ত হয়। একটি পর্ব শেষ হতেই উপস্থিত নারী দর্শকগণ উলুধ্বনি বা মঙ্গলধ্বনি করেন। এরপর একে একে অন্যান্য পর্বের ধামাইল নাচ পরিবেশন করা হয়। এক্ষেত্রে সিলেটে প্রচলিত ধামাইল নাচ পরিবেশনের ৮৬ পর্বের কথা জানা যায়। বৃহত্তর সিলেটের পাশ্ববর্তী নেত্রকোণা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলায় এই ধামাইল নাচের প্রচলন রয়েছে। এছাড়া ভারতের করিমগঞ্জ, আসাম ও শিলচরেও ধামাইল নাচের প্রচলন রয়েছে।

গমীরা
চৈত্র-সংক্রান্তির ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের মধ্যে থাকে পশু, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীদের প্রতিকৃতি নিয়ে শোভাযাত্রা। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার বিভিন্ন গ্রামে চৈত্র-সংক্রান্তির পাঁচ-সাতদিন আগে একদল যুবা-তরুণ বিভিন্ন পশু-পাখি ও মাছের মূর্তি তৈরি করে নৃত্য-গীত সহযোগে পাড়ায় পাড়ায় প্রদক্ষিণ করে বেড়ায়। এই দল ও তাদের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনাকে ‘গমীরা’ বলা হয়ে থাকে। সাধারণত কোনো গোপন উদ্দেশ্য সিদ্ধির কামনায় কোনো ব্যক্তি ‘গমীরা’র মানত করে থাকে। এ ধরনের পরিবেশনার সকল ব্যয় বহন করেন মানতকারী ব্যক্তি নিজে। উল্লেখ্য, গমীরাতে মাছ ছাড়া পশু-পাখির মধ্যে সাধারণত হাঁস ও ঘোড়ার মূর্তি বা প্রতিকৃতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে, আর এই সকল মূর্তি বা প্রতিকৃতি নির্মাণে খড়, বাঁশ, কাগজ, আঠা ও রঙ ব্যবহৃত হয়। গবেষকদের ধারণা, গমীরাতে পশু-পাখির মূর্তি নিয়ে যে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে তার একটি প্রাচীন ঐতিহ্য বহু আগে থেকেই বাংলাদেশে প্রচলিত ছিল। গবেষক ভাষ্যে জানা যায়, আসলে ঐন্দ্রজালিক নৃত্য হতেই এই শ্রেণীর নৃত্যের উদ্ভব হয়েছে। একদিন ঐন্দ্রজালিক উপায়ে বাঘের শক্তিকে পরাভূত করবার কল্পনা করা হতো, তখনই বাঘ-নাচের উদ্ভব হয়েছিল। একজন পুরুষ বাঘের মুখোশ পরে বাঘ সেজে বাঘের অভিনয় করে ওঝার মন্ত্রের দ্বারা নিহত হতো। পরে তা ক্রমে ক্রমে কৌতুকের বিষয় হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চড়কে মাঠে এখনও মুখোশ পরা বাঘসহ অন্যান্য কিছু প্রাণী, পৌরাণিক চরিত্র ও ভূত-প্রেতের আবির্ভাব লক্ষ করা যায়। চড়কের মাঠে সারা গায়ে কালি মেখে বিশাল আকৃতির তরবারি হাতে রাবণ চরিত্র, সারা গায়ে পাটের আঁশ বেঁধে হনুমানের মুখোশ পরে রামায়ণের চরিত্র হনুমানজি এবং রাম-লক্ষণসহ তাদের সৈন্য-সামন্তের ভূমিকায় ছোট ছোট বালকদেরকে পাটকাঠির তীর ধনুক নিয়ে সারা মাঠ জুড়ে যুদ্ধের মহড়া দিতে দেখা যায়। যা নিশ্চিতভাবেই ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের পর্যায়ে পড়ে। এই ধরনের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, শ্রীমঙ্গল, নোয়াখালী অঞ্চলে কম-বেশি প্রচলিত আছে।

কালেক্টর নাচ
চৈত্র-সংক্রান্তিতে দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ি থানার কইরাকোল, মণ্ডপখোলা (মণ্ডপী), কুমারপুর, ছোট চণ্ডীপুর, চানপাড়া; পার্বতীপুর থানার খিয়ারপাড়া, কালির হাট, চণ্ডীপুর; চিরিরবন্দর থানার আমবাড়ি, বিশ্বনাথপুর, দূর্গাডাঙ্গা, দল্লা, সুরোল গ্রামের নিম্নবর্গের হিন্দু ও আদিবাসীরা বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে বাদ্য সহযোগে এক বিশেষ প্রকারের নৃত্য পরিবেশন করে থাকেন। এই ধরনের পরিবেশনাকে স্থানীয় জনগণ ‘কালেক্টর’ বলে উল্লেখ করে থাকেন। এই কালেক্টর দলে মধ্যে যারা নৃত্যে অংশগ্রহণ করেন তাদের কেউ কেউ মুখে পাটের আঁশ বেঁধে চুন-কালি ঘষে, চোখে ভাঙা চশমা দিয়ে, ছেঁড়া জামা-প্যান্ট পরে সঙ বা জোকার সেজে থাকেন, কেউ আবার শাড়ি, ব্লাউজ, সায়া পরে মুখে পাউডার, লিপস্টিক মেখে ছুকরির রূপ গ্রহণ করে থাকেন। একটি কালেক্টর দলে এক একাধিক ছুকরি ও জোকার অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া, তাদের সঙ্গে থাকে একজন ঢোলক, একজন করতাল বাদক, একজন কাঠের তৈরি কালির মুখোশ ধারণকারী এবং একজন সংগ্রাহক থাকেন ঝোলা কাঁধে। এ ধরনের পরিবেশনারীতির নাম ‘কালেক্টর’ এই জন্য যে, গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি ঘুরে নৃত্য পরিবেশন করে নিম্নবর্গের সাধারণ মানুষ তাদের ধর্মীয় কৃত্যাচার চড়ক পূজা আয়োজনের খরচ বাবদ অর্থ এবং চাল-ডাল সংগ্রহ করেন। আসলে, যাদের পূজা আয়োজনের খরচ সংগ্রহের অন্য কোনো উপায় থাকে না তারাই শুধু ‘কালেক্টর’ সেজে গ্রামে গ্রামে নৃত্য করে ফেরেন। এ ধরনের নৃত্য পরিবেশন শুরু হয় চড়ক পূজা আয়োজনের অন্তত সাত দিন আগে থেকে। চৈত্র-সংক্রান্তি উপলক্ষে বাংলাদেশের অপরাপর এলাকার হর-গৌরীর নাচ, বাইদ্যার নাচ, গমীরা, ঢাঈ ইত্যাদির ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার সঙ্গে ‘কালেক্টর’-এর পার্থক্য হচ্ছে অন্যান্য পরিবেশনাগুলো সুনির্দিষ্ট একটি গ্রামে বা তার পার্শ্ববর্তী গ্রামে চলমান থাকে, কিন্তু ‘কালেক্টর’দের পরিবেশনা সুনির্দিষ্ট কোনো একটি গ্রাম বা তার পার্শ্ববর্তী এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কালেক্টর’রা চড়ক পূজার খরচের অর্থ এবং চাল-ডাল সংগ্রহের জন্য ছড়িয়ে পড়েন দূর দূরান্তের গ্রামে। এছাড়া, অন্যান্য পরিবেশনা থেকে অর্জিত অর্থ বা উপাদান পূজার জন্য ব্যবহৃত না-হলেও কালেক্টর’দের সংগৃহীত অর্থ ও উপাদানের সবটুকু পূজার জন্য ব্যয় করা হয়। দিনাজপুর অঞ্চলের ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনারীতি হিসেবে ‘কালেক্টর’-এর বিশেষত্ব হচ্ছে, এই পরিবেশনার সঙ্গে যুক্ত শিল্পীগণ গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাড়ির বাইরের উঠানে ঢোল ও করতাল বাদ্যের সঙ্গে নাচ শুরু করেন। আর এ ধরনের পরিবেশনার নৃত্যটি অন্যান্য পরিবেশনার মতোই বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে উপস্থাপন করা হয়। তবে, নাচের সময় কোনো গান গাওয়া হয় না। শুধু তালের উপর ভর করে এই নাচ চলতে থাকে। বাড়ির কেউ তাদেরকে অর্থ বা চাল-ডাল প্রদান করলে কালেক্টর দল তাদের নৃত্য থামিয়ে নতুন আরেকটি বাড়ির দিকে রওনা হয়। চড়কের দিন দুপুর পর্যন্ত এই নাচ চলতে থাকে।
বাংলাদেশের চৈত্র-সংক্রান্তির প্রায় সকল অনুষ্ঠানের সঙ্গে হর-গৌরী অর্থাৎ শিব-কালির বিভিন্ন ধরনের নৃত্যের যোগ আছে। এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলে রাখা ভালো যে, অনেকে মনে করেন, ভারত উপমহাদেশের নাট্যকলার উৎপত্তির সঙ্গে শিব বা মহাদেবের তাণ্ডব-নৃত্য এবং কালি বা গৌরীর লাস্য-নৃত্যের যোগ আছে। নাট্যকলা আজ স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেও নাট্যকলার উৎপত্তির মূলে যে তাণ্ডব ও লাস্য নৃত্য তার কিছু উদারহণ মহাকালের গর্ভে একেবারে বিলীন না হয়ে আজও টিকে আছে। এদেশের চৈত্র-সংক্রান্তির নৃত্যমূলক পরিবেশনাগুলো হয়তো প্রাচীনকালের ঐতিহ্যকে প্রবহমান রেখেছে।

লাঠি নাচ
বাংলাদেশের গ্রামের সাধারণ মানুষেরা তাদের নৈমিত্তিক জীবনের উৎসব–বাংলা বর্ষবরণ, বিবাহ, অন্নপ্রাশন ইত্যাদি অনুষ্ঠান উপলক্ষে লাঠি খেলা ও লাঠি নাচের আয়োজন করে থাকেন। এক্ষেত্রে সাধারণত কোনো লাঠিয়াল দলকে ভাড়া করে আনা হয়। আর লাঠিয়াল দল তাদের দৈনন্দিন জীবনের পোশাকে বায়না পাওয়া গ্রামে প্রবেশ করে বিভিন্ন ধরনের ধ্বনি করে ডাক ভাঙতে থাকেন। তাদের সে ডাক ভাঙার শব্দ শুনে গ্রামের লোকজন তো বটেই আশে-পাশের গ্রামগুলোতেও লাঠি খেলা ও লাঠি নাচের সংবাদ রাষ্ট্র হয়ে যায়।

03.jpg

গ্রামের বিভিন্ন বয়সের নারী, পুরুষ ও শিশু, কিশোর ছুটে এসে জমায়েত হতে থাকেন লাঠি খেলার জন্য নির্ধারিত স্থানে। এই অবসরে লাঠিয়ালগণ আয়োজকদের দেওয়া খানা-খাদ্য গ্রহণ করেন এবং খাদ্যগ্রহণের পর নির্ধারিত স্থানে মুখোমুখি হয়ে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে মূল লাঠি খেলা শুরুর ডাক ভাঙেন। এ সময় তারা ডাক ভাঙতে যে সব ধ্বনি ও বাক্য ব্যবহার করেন, তা হচ্ছে– “ও ও ও/তুমি যে কেমন বীর/তা জানবো আমি রে/ও ও ও।” এমন ভাষায় ডাক ভেঙে সকলে মিলে এক সঙ্গে মাটি ছুঁয়ে প্রণাম করে সাজ-পোশাক পরার জন্য একটি ঘরে ঢোকেন। এ সময় উঠানে পাটি বিছিয়ে একদল বাদ্যকার ঢোল, করতাল ও কাসার ঘড়া বা কলস বাজাতে শুরু করেন। এই সকল বাদ্য বাদনের মাঝখানে লাঠিয়ালগণ সাজ-পোশাকের মধ্যে বিভিন্ন রঙের হাতা-ওয়ালা ও স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে, সাদা রঙের ধুতি ও বর্ণিল ঘাগড়ার মতো এক ধরনের বস্ত্র পরে, পায়ে ঘুঙুর বেঁধে, খালি পায়ে বিভিন্ন রঙের লাঠি হাতে খেলার মাঠে নেমে পড়েন। খেলার মাঠে নামার সময় আবার তারা উচ্চস্বরে ডাক ভাঙেন এবং পরস্পর কিছু সংক্ষিপ্ত ও কৌতুককর সংলাপে অংশ নেন। এরপর শুরু হয় খেলার মাঠ প্রদক্ষিণ। কিছুক্ষণ মাঠ প্রদক্ষিণ শেষে সমগ্র লাঠিয়াল একে একে তাদের হাতের লাঠি খেলার মাঠের কেন্দ্রবিন্দুর মাটিতে রেখে প্রণাম করেন এবং সে লাঠিকে পরক্ষণেই হাতে তুলে নিয়ে বাদ্যযন্ত্র ও বাদ্যযন্ত্রীদের প্রণাম করেন।

শুরু হয় লাঠি খেলা ও লাঠি নাচের প্রথম পর্ব। শুরুতেই সমগ্র লাঠিয়াল দল সমান সদস্যে দুই দলে বিভক্ত হয়ে লাঠি খেলেন। এক্ষেত্রে বাদ্যের তালে তালে একদল আরেকদলকে লাঠির মাধ্যমে আক্রমণ করতে গিয়ে মুখে বলতে থাকেন– ‘খবরদার’, প্রতিপক্ষের লাঠিয়ালরা একই ভাবে সে দলকে প্রতি আক্রমণ করতে গিয়েও বলেন– ‘খবরদার’। এ ধরনের লাঠি খেলার একটি প্রধান বিশেষত্ব হচ্ছে খেলার মাঝে কোনো লাঠিয়ালের গায়ে লাঠির আঘাত লাগলে খেলা তাৎক্ষণিকভাবে থেমে যায়, থেমে যায় বাদ্য বাদন। আসলে, লাঠি খেলায় একপক্ষ তার প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে চাইবে ঠিকই কিন্তু অন্যপক্ষকে তা লাঠি দিয়েই ঠেকাতে হয়, না-ঠেকাতে পারলে সে খেলার নিয়ম অনুযায়ী আপনাতেই পরাস্ত হয়ে যায়। তাই লাঠি খেলতে খেলতে কোনো লাঠিয়ালের গায়ে লাঠির আঘাত লাগলে তা খেলা বন্ধ করে দর্শককে জানানোরও একটা রীতি এই খেলায় এভাবে বর্তমান রয়েছে।

বাদ্যের তালে তালে যখন দুই দল লাঠিয়ালের লাঠি খেলা চলতে থাকে তখন কখনো কখনো কোনো বাদ্যকার হঠাৎ বাদ্য বাদন রেখে উঠে দাঁড়িয়ে ভিন্ন প্রকারের লাঠি খেলা করার ইঙ্গিত প্রদান করেন। এক্ষেত্রে লাঠিয়ালদের একজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়া বাদ্যযন্ত্রীর কিছু সংলাপ বিনিময় হয়। মূলত সে সংলাপের ভেতর দিয়েই নতুনভাবে লাঠি খেলা শুরুর ইঙ্গিত ব্যক্ত হয়। দুই দলের বিচিত্র ভঙ্গির লাঠি খেলার মধ্যে হঠাৎ বাদ্যযন্ত্রীদের একজন উঠে বলেন– ‘ও মিয়া সাব।’ সঙ্গে লাঠিয়াল সরদার বলেন– ‘এই বেটা লাঠি খেলা চলছে…উঠলা কেন! বাজনা বাজাও।’ বাদ্যযন্ত্রী বলেন– ‘আস্তে মিয়া সাব, একটা কথা শোনেন… আমি নিজ কানে শুনছি… এই পরিবারের লোক কী বলছে শুনছেন?’ লাঠিয়াল বলেন– ‘আর কী বলছে?’ বাদ্যযন্ত্রী বলেন– ‘আর দুঃখে মরি যাই…আমরা করি বইসা বইসা আর কীয়ের খাড়িয়ে খাড়িয়ে লড়তাছে… এই নারীরা বলছে এই কথা।’ লাঠিয়াল বলেন– ‘ওহ বুঝছি, আপনি নারীদের কথা কানে তুলেছেন!’ বাদ্যযন্ত্রী বলেন– ‘আরে আপনারা কানে কম দেখেন দেখছি।’ লাঠিয়াল বলেন– ‘হ হ কানে কম শুনি। আরে জাতিই তো আমরা দুইটা, একটা মিয়ালোক আরেকটা পুরুষ।’ বাদ্যযন্ত্রী বলেন– ‘তাই তো মিয়া সাব, এখন বইসা বইসা মিয়ালোকের মতো লাঠি দিয়া বাইটা দেখাইতে হইবো।’ লাঠিয়াল বলেন– ‘যদি না পারি।’ বাদ্যযন্ত্রী বলেন– ‘এক্ষুণি গলায় হাত দিয়া বাইর করে দেবে মিয়া সাব।’ লাঠিয়াল বলেন– ‘কেডা ঘাড়ে হাত দিয়া বাইর কইরা দিবো?’ বাদ্যযন্ত্রী বলেন– ‘আমিই দেবো।’ লাঠিয়াল বলেন– ‘এতো ক্ষেমতা ক্যা! তুমার হাড়ির ভাত খাইয়া এখানে আইছি নাকি!’ বাদ্যযন্ত্রী এবার আয়োজকদের পক্ষ নিয়ে বলেন– ‘ও মিয়া সাব, এরা দুই হাজার টাকা দেছে মাঙনা না!’ লাঠিয়াল বলেন– ‘মাইনা দিয়া আনছে। খাইছি দাইছি খেলছি… এখন এমনে না ওমনে, ওমনে না এমনে। আমরা এমনেও পারবো না ওমনেও পারবো না। আমরা যেইডা পারি সেইডাই খেইলা যাবো।’ বাদ্যযন্ত্রী বলেন– ‘ও মিয়া সাব তাইলে যে ওস্তাদের ওস্তাদি থাকে না।’ লাঠিয়াল এবার মহা বিরক্ত হয়ে বলেন– ‘এই বেটা তুমি তো জবর অপমানের মানুষ। আচ্ছা, এই কথাডা ফাস্টেই কয়া দিলেই হতো যে, এখন বইসা বইসা বাইটা দেখাও। দেখাইয়া দিতাম খেলা শেষ… এখন কও ওস্তাদের ওস্তাদি থাকে না!’ বাদ্যযন্ত্রী বলেন– ‘এইবার যখন বুঝছো তখন লাঠির মাঝখানে ধইরা বইসা বইসা সবাই মেইলা সুন্দর কইরা বাইটা দিতে হইবে।’ সাথে লাঠিয়াল বাদ্যযন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে বলেন– ‘ও মিয়ারা দেখো তাইলে… এই বাজাও বাদ্য।’ শুরু হয় বসে বসে লাঠি খেলার একটি ছন্দোময় উপস্থাপনা। বেশ কিছুক্ষণ সে খেলা চলতে চলতে আবার নতুন করে দর্শক, বাদ্যযন্ত্রী কিংবা লাঠিয়ালদের একে অপরের মধ্যে কৌতুককর কিছু সংলাপ বিনিময়ের পর আবার নতুনভাবে লাঠি খেলা চলে। দলগতভাবে লাঠি খেলা প্রদর্শন ছাড়াও দুইজন লাঠিয়াল আলাদা আলাদাভাবেও লাঠি খেলা উপস্থাপন করে থাকেন। একদিনের জন্য লাঠি খেলার জন্য দশ সদস্যের একটি লাঠিয়াল দল সাধারণত দুই হাজার টাকা থেকে পাঁচশত টাকা পর্যন্ত পরিবেশনার সম্মানী গ্রহণ করেন।

লাঠি খেলা মূলত কসরৎমূলক ভ্রাম্যমাণ নাট্যমূলক শিল্প। এক সময় বাংলাদেশের সর্বত্র এই লাঠি খেলা শিল্পের প্রচলন ছিল। বর্তমানে এই তা কেবল মানিকগঞ্জ, জয়পুরহাট, নড়াইল, শ্রীমঙ্গল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ প্রভৃতি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে মানিকগঞ্জ অঞ্চলের লাঠি খেলার আসরে কখনো কখনো নৃত্যগীত পরিবেশন করা হয়। শুধু তা-ই নয়, কখনো কখনো উজ্জ্বলবর্ণের পোশাক পরে কিছু কৌতুককারী উক্ত অঞ্চলের লাঠি খেলার আসরে উপস্থিত হন এবং তারা সামাজিক রীতি-নীতির নানা রূপ বিষয় নিয়ে কৌতুক উপস্থাপন করে থাকেন। তাদের কৌতুক ও লাঠি খেলার ফাঁকে ফাঁকে লাঠিয়ালগণ বিভিন্ন ধরনের পৌরুষদীপ্ত নৃত্য পরিবেশন করেন। আসলে, লাঠি খেলার সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, লাঠি খেলায় দু’দল লাঠিয়াল পরস্পরকে কৃত্রিমভাবে আক্রমণ করে থাকেন। প্রতি আক্রমণে নতুন কৌশল প্রয়োগের আগে লাঠিয়ালগণ সুছন্দে নৃত্য প্রদর্শন করে পুনরায় খেলায় লিপ্ত হন। এ সময় লাঠিয়ালদের আক্রমণ নৃত্যের সঙ্গে নাট্যরস ঘনীভূত করতে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ঢাক-ঢোলক, মৃদঙ্গ-করতাল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এক সময় কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ অঞ্চলে কাহিনী ভিত্তিক লাঠি খেলা হতো, সেক্ষেত্রে কাহিনীর বিষয়গুলো বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিলো, যেমন, ডাকাত খেলা, যুদ্ধ খেলা ইত্যাদি। এখন কাহিনী ভিত্তিক লাঠি খেলার সে চল আর কোথাও দেখা যায় না।

লাঠি খেলা সাধারণত বাঙালি মুসলমানদের মাঝে প্রচলিত থাকলেও শ্রীমঙ্গল থানার বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিকদের মাঝে ‘কাঠি নাচ’ নামে এক বিশেষ প্রকারের লাঠি খেলার প্রচলন রয়েছে। সাধারণত ফাল্গুন মাসের চাঁদ আকাশে দেখা দেবার প্রথম রাত থেকেই শ্রীমঙ্গল অঞ্চলের চা-শ্রমিকেরা তাদের পাড়ায় পাড়ায় ঢোল বাজিয়ে গান গেয়ে গেয়ে কাঠি নাচ বা লাঠি খেলার জন্য বিভিন্ন ধরনের লাঠি বা কাঠি চুরি করে থাকেন। চুরি করা সেই লাঠিগুলো নিয়ে তারা বাদ্যের তালে তালে গান গেয়ে বিভিন্ন পাড়ায় ঘুরে নানা রকমের দৈহিক কসরৎ ও নাচ করেন। শেষ রাতে তারা সে লাঠিগুলো চা-বাগানের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত পাহাড়ি ছরা বা গাঙের ধারে রেখে আসেন। পরদিন সন্ধ্যা থেকে আবার নতুন করে লাঠি চুরি ও সে লাঠি নিয়ে আগের মতোই খেলা, নাচ, গান করে একই স্থানে লাঠিগুলো রেখে আসা হয়। এভাবে একটি স্থানে তাদের চুরি করা লাঠি জমতে জমতে এক সময় একটি মিনারের আকার ধারণ করে। উল্লেখ্য, লাঠি বা লাকড়ি চুরির সময় গায়কেরা সাধারণত এমন সব আদিরসাত্মক গান করতে থাকেন যা শুনে ঘরের মেয়েরা বাইরে বেরোতে লজ্জা পান। যেমন, লাঠি বা লাকড়ি চুরির একটি গানে আছে– ‘শমৎ বাবা শমৎ বাবা, লে লাকড়ি / চোদে কে দিহে এগো যোয়ান ছোকড়ি॥’ লাঠি চোরাদের এ রকম আদিরসাত্মক গান শুনে কোনো বাড়ির কোনো নারী যখন লজ্জায় ঘর থেকে বের হন না তখন সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে লাঠি চোরা গায়কেরা অতি সহজেই সে বাড়ি থেকে লাঠি চুরি করে থাকেন। এভাবে ফাল্গুনের চাঁদ দেখা যাবার প্রথম রাত থেকে লাঠি চুরি করে করে ছরা বা গাঙের ধারে পূর্ণিমার আগের দিন পর্যন্ত জমানো হয়। জমানো সেই লাঠিগুলোকে চা-শ্রমিকেরা ‘শমৎ বাবা’ বলে থাকেন। পূর্ণিমার দিন সকালে সবাই মিলে স্নান করে এসে ‘শমৎ বাবা’কে জ্বালানো হয়। জ্বালানো লাঠির ছাই ও কাদা দিয়ে চা-শ্রমিকেরা খেলা করেন। রাতে নাচ-গান করেন আর পরদিন সকালে রং খেলেন। আর রং খেলা শুরুর দিন থেকে প্রায় ২/৩ দিন ধরে কাঠি নাচ বা লাঠি নাচ চলে।

সাধারণত সব সম্প্রদায়ের চা-শ্রমিকেরা ফাগুয়া পর্বের এই কাচি নাচ বা লাঠি খেলার করে থাকেন। এ ধরনের লাঠি খেলাতে শুধু ছেলেরাই রাধা-কৃষ্ণ সেজে থাকেন। সম্প্রদায় ভেদে কাঠি নাচের লাঠি খেলার সঙ্গে চা-শ্রমিকেরা মাদল বা ঢোল বাজিয়ে থাকেন। ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন বাড়ি গিয়ে কাঠি নাচ বা লাঠি খেলা পরিবেশনের মাধ্যমে চা-শ্রমিকগণ সামান্য কিছু টাকা-পয়সা সংগ্রহ করেন। আগে এ ধরনের পরিবেশনার সঙ্গে সাধারণত রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক গান গাওয়া হতো। বর্তমানে এই রীতির সঙ্গে আধুনিক বাংলা কিংবা হিন্দি ছবির গান যুক্ত হতে শুরু করেছে।

মাদার পীরের বাঁশ তোলা ও মাদার বাঁশের নাচ
বাংলাদেশের মুসলমান সম্প্রদায়ের লৌকিক পীরদের প্রধান একজন হচ্ছেন মাদার। লৌকিক পীরের প্রতি ভক্তি প্রকাশের জন্য এদেশের অনেক অঞ্চলের মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যেই দুইটি সরল বা সোজা বাঁশ নিয়ে এক ধরনের নাচ করা হয়ে থাকেন, পল্লী বাংলায় তাকে মাদার বাঁশের নাচ বা মাদার বাঁশের জারি নামে খ্যাত। এ ধরনের নাচ ও জারি সম্পূর্ণরূপে ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, এ ধরনের পরিবেশনাতে ঢোল ও কাঁসি সহযোগে মুসলমান সম্প্রদায়ের কিছু গ্রামীণ লোক দুইটি সোজা বাঁশ নিয়ে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে ঘুরে নৃত্য ও গান করে বেড়ান। তবে, এই নাচের ক্ষেত্রে মাদারের বাঁশ নামে খ্যাত সোজা বাঁশকে কখনও হাতের তালুর উপর, কখনও বুকের উপর, চিবুকের উপর, নাচের উপর, কপালের উপর, কখনও কখনও এক একটি আঙুলের প্রান্ত সীমার উপর নিয়ে কখনও শুয়ে, কখনও দাঁড়িয়ে ব্যালেন্স রেখে এক একজন কুশলী মানুষ নৃত্য করেন। বাঁশ দুইটির মাঝ বরাবর কাপড় পেঁচানো থাকে এবং শেষ প্রান্তে রঙিন এক খণ্ড বস্ত্র বা লাল সালু কাপড় পতাকার মতো জড়িয়ে দেওয়া হয়। শুধু মুসলমান পল্লীতে নয়, হিন্দু পল্লীতেও এই মাদার নাচ দেখানো হয়। এ ধরনের মাদার নাচের পেছনে একটি লৌকিক আখ্যান আছে, প্রসঙ্গক্রমে তা এখানে বর্ণনা করা যেতে পারে। দুই সহোদর; দুই জন মাদার নামে খ্যাত। একজন দম মাদার ও অন্যজন পাগলা মাদার। উভয়েই আধ্যাত্মিক শক্তি-সম্পন্ন; কিন্তু সাংসারিক দৃষ্টিতে পাগলা ছাড়া কিছুই নয়। দম মাদারের বিয়ে; নির্ধারিত দিনে বর ও বরযাত্রীগণ বিয়ে উপলক্ষে যাত্রা করেছেন। বাড়িতে মা একলা আছেন। কিছু দূর যাবার পর মনে পড়ে যায় যে, মাথার পাগড়ি বাড়িতে ভুলে ফেলে আসা হয়েছে। তা নিয়ে আসার জন্য পাগলা মাদার বাড়ি ফিরে আসেন। এসে দেখে যে, মা দুই পা ছড়ায়ে দুই হাতে ভাত তুলে অতি ব্যগ্রতার সাথে আহার করছেন। মাতার এই অদ্ভূত ব্যবহারে মাদার পাগলা অবাক হয়ে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন। মা উত্তরে বলেন, ‘বাবা তোমার দাদা বিয়ে করতে যাচ্ছে, বউ এলে আর ভাত খেতে পারি কি-না ঠিক নাই, তাই আশা মিটিয়ে ভাত খেয়ে নিচ্ছি।’ এই কথায় মাদারের মনে বড় আঘাত লাগে এবং তিনি ফিরে গিয়ে দম মাদারকে সমস্ত কথা জানান। এই কথায় মাতৃভক্ত মাদার ভাতৃদ্বয় বিবাহ যাত্রা স্থগিত রাখেন এবং বিবাহ দল ত্যাগ করে পাগলের মতো নাচতে নাচতে পাশের জঙ্গলে প্রবেশ করেন এবং আশ্চর্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে যান। কিছুদিন পর সেই বনে দুটি বাঁশ গজিয়ে ওঠে। দৈর্ঘে দুইটার মধ্যে ঈষৎ পার্থক্য লক্ষ করা যায়। তখন মাদার ভ্রাতৃদ্বয়ের গুণগ্রাহীগণ সেই বাঁশ মাদার ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রতীকরূপে গ্রহণ করে উল্লিখিতভাবে নেচে বেড়ান। মাদার নাচের জন্ম ইতিহাসের পশ্চাতে লৌকিক মুসলমান সমাজে এই গল্পটি বেশ ভালোভাবেই প্রচলিত রয়েছে। এখনও এক শ্রেণীর মুসলমানদের বিশ্বাস, এক বিশেষ বাঁশে ঈষৎ ছোট-বড় আকৃতির দুইটি সোজা বাঁশ পাশাপাশি জন্মাতে দেখা যায়। সেই বাঁশ দুইটিকেই মাদার ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রতীকরূপে গ্রহণ করে নেওয়া হয়। শরিয়তপন্থি মুসলমানদের শাস্ত্রভিত্তিক আচার ব্যবহারের সাথে এটা সম্পর্কহীন। গবেষকদের ধারণা, মাদার বাঁশ সংক্রান্ত এ ধরনের লোক বিশ্বাস ও কৃত্যাচার সম্ভবত হিন্দুসমাজের কোনো লৌকিক আচারের প্রভাবে লৌকিক মুসলমান সমাজে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, বগুড়া, নাটোর, সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি গ্রামে এ ধরনের মাদার নাচের প্রচলন রয়েছে। এর মধ্যে মানিকগঞ্জ জেলার হাসুলি গ্রামে সাইদুর রহমান বয়াতির বাড়িতে মাদারের বাঁশ তোলা হয় এবং সে গ্রামে প্রতি বছর পৌষ-সংক্রান্তিতে নদীতে ডুবিয়ে রাখা মাদার বাঁশ তোলা হয়, তারপর সেই বাঁশকে মুছে এবং তেল মালিশ করে বিভিন্ন বাড়িতে ঘুরে ঘুরে মাদার বাঁশের জারি ও নাচ করা হয়। অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর থানার কুনকুনিয়া গ্রামের সাজা ফকিরের বাড়িতে মাদার বাঁশ তোলা এবং ওই গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে মাদার বাঁশের নাচ করা হয় প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম সপ্তাহে। এছাড়া, সিরাজগঞ্জ জেলার রায়েরগঞ্জে মাদারের বাঁশ তোলা উপলক্ষে তিন দিনের একটি লোকমেলা বসে জ্যৈষ্ঠ মাসের কোনো এক সময়ে। এ এলাকায় মাদার নাচে পুরুষের পাশাপাশি কখনো কখনো নারীদেরকেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে দেখা যায়।

বাইদ্যার নাচ
এই বাইদ্যার নাচে দুই বাইদ্যানী নেচে নেচে তাদের একমাত্র বাইদ্যাকে লক্ষ করে গাইতে থাকেন আর সঙ্গে সঙ্গে বাইদ্যা নেচে নেচে দূরে চলে যেতে থাকেন। ‘বাইদ্যা আমার ভালোবাসে না।/বাইদ্যা মারে আর হাসে/কিছু কই না তরাসে/আমার ভাই নাইরে দ্যাশে॥’ বাইদ্যা নিজেও বাইদ্যানীদের সঙ্গে নেচে বৃত্ত তৈরি করে ঘোরেন। নাচের মধ্যে সামান্য দৌড়ে তারা একবার বৃত্তের কেন্দ্রের দিকে ঝুঁকে পরক্ষণেই পায়ে পায়ে তাল ঠুকে বাইরের দিকে বেরিয়ে আসেন। তাদের নৃত্যে থাকে ছন্দোময় একটি কাব্যিক ভঙ্গিমা। এক্ষেত্রে সাধারণত উঠানে বসে আরো কয়েকজন শিল্পী তাদের নাচে-গানে যন্ত্রসঙ্গত করেন। তাদের কেউ হারমোনিয়াম, কেউ মন্দিরা, কেউ বা খোল বাজাতে থাকেন। আগেই বলা হয়েছে, তাদের সঙ্গে একজন গায়েনও থাকেন। তিনি-ই তো বিচিত্র সুর-ছন্দে গেয়ে চলেন ‘আমার বাইদ্যা জাতির এই তো রীতি/ঘর ছাড়িয়া বাইদ্যার নৌকায় বসতি॥’ তার সঙ্গে দোহার হয়ে বাইদ্যানীরাও গাইতে থাকেন ‘বিধি আমায় চিনো নি/হুদিনের পরে আইলাম আমি/ই তো বাইদ্যানী॥’ উঠানে উপস্থিত দর্শনার্থীদের মুগ্ধতা বুঝে এই বাইদ্যার নাচ কখনো কখনো একটু সময় নিয়েই চলে। আর নাচ শেষে নৃত্যক বাইদ্যানী ছুটে যান গৃহস্বামী বা গৃহপত্মীর দিকে। তারা বাইদ্যানীকে টাকা দান করতেই এক বাড়ির পর্ব শেষ করে বাইদ্যা নাচের শিল্পীগণ অন্য বাড়িতে ছুটে যান। যতক্ষণ সূর্যের আলো থাকে ততক্ষণ তারা গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে এই বাইদ্যার নাচ ও গান করতে থাকেন।

পরী নাচ
চৈত্র-সংক্রান্তির দিন হর-গৌরী পূজার ক্রিয়াকর্মের মধ্যে রাতের শেষভাগে গ্রামের উঠানে পরী নাচ পরিবেশিত হয়ে থাকে। এই নাচে একজন অভিনেতা স্থানীয়ভাবে তৈরি সুন্দর একটি মুখোশ পরে বর্ণিল শাড়ি পরে আগুনের থালা হাতে অংশগ্রহণ করে থাকেন। পরী নাচের জন্য একজন অভিনেতা সাজ-পোশাক ও তার অভিনয় উপকরণসহ প্রথমে অন্ধকার হতে একটি বাড়ির উঠানে ছুটে আসেন। সাথে সাথে তাকে ঘিরে শুরু হয় ঢাক বাদন। আর সেই ঢাক বাদনের শব্দের তালে পরীরূপী অভিনেতা লাফিয়ে নাচতে থাকেন। এ সময় কয়েকজন ভক্ত তাকে ঘিরে সতর্ক পাহারা দিতে থাকেন। ঢাকের বাদ্যের সঙ্গে ক্রমাগত পরী নাচের উন্মাদনা বাড়তে থাকেন। সে উন্মাদনাপূর্ণ নাচে পরীরূপী অভিনেতা এক সময় দিশা হারিয়ে ফেলেন এবং কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে লুটায়ে পড়তে যান। সহসা তাকে ঘিরে থাকা ভক্ত লোকেরা তাকে মাটিতে লুটায়ে পড়ার হাত থেকে আগলে ধরেন। এই পরীর নাচ সম্পর্কে গ্রামের লোকের বিশ্বাস হচ্ছে, পরীর নাচে এক সময় ঠিকই নাকি অভিনেতার উপর পরী এসে ভর করে। গ্রামের নারীরা জ্ঞানহারা অভিনেতা পরীকে নিয়ে তালপাখায় বাতাস করতে করতে তার মুখোশ এবং শাড়ি খুলে নেন। সাথে সাথে তিনি স্বাভাবিক হয়ে ওঠেন।

কালী কাচ
চৈত্র-সংক্রান্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্প হচ্ছে কালি কাচ। এ ধরনের পরিবেশনায় সাধারণত কোনো বাড়ির অন্ধকার থেকে কালির মুখোশ পরা দুটি জীবন্ত কালিরূপী অভিনেতার আবির্ভাব ঘটে হর-গৌরী মন্দির সংলগ্ন উঠানে। কালিরূপী অভিনেতাদ্বয়ের পরনে থাকে বর্ণিল শাড়ি। পেঁচানো। তাদের এক হাতে লোহার তরবারি অন্য হাতে মাটির বড় ঢাকনীপাত্র। তাদের একজন ঠাকুরের কাছ থেকে খুলিটাকে ছিনিয়ে নিতেই শুরু হয় দুই কালিরূপী অভিনেতার পরম যুদ্ধ। ঢাকের বাদ্যের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ চলতে থাকে। যুদ্ধের চারদিকে মশাল জ্বেলে পাহারা দেওয়া হয়। ধারালো তরবারি মশালের আলোয় ঝিলিক কাটতে থাকে। যুদ্ধে তারা সমানে সমান। যুদ্ধে তারা কেউ কাউকে পরাস্ত করতে পারেন না। এই যুদ্ধের কালীরূপী দুইজন অভিনেতাই এক সময় কাঁপতে কাঁপতে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে উপস্থিত ভক্তরা তাদের মুখ থেকে মুখোশ এবং পরনে পেচানো শাড়ি খুলে নেয়। সাধারণ ভক্তদের বিশ্বাস, মা-কালির মুখোশ পরে অভিনয় করতে করতে এক সময় অভিনেতাদের উপর স্বয়ং মা-কালি ভর করে তখন দ্রুত বেশভূষা খুলে না নিলে অভিনেতা আর কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে না। তাই অভিনয় করতে করতে অভিনেতা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে তাড়াতাড়ি করে বেশ-ভূষা খুলে ফেলার নিয়ম পালন করতে হয়। এর কিছুক্ষণ পর অভিনেতাদ্বয় স্বাভাবিক বোধ ফিরে পায়।

পাতা নাচ
চৈত্র-সংক্রান্তির আরও অন্যান্য পরিবেশনার মধ্যে হাজরা উল্লেখযোগ্য। শেষ রাতে একদল ভক্ত শ্মশানে ছুটে গিয়ে এই হাজরা করে থাকে। হাজরাতে সাধারণত চামুণ্ডার নৃত্যসহ নানা ধরনের পাতা নৃত্য (পঙ্‌ক্তি নৃত্য/পাত্র নৃত্য) পরিবেশিত হয়। যেমন, কালিকার পাতা (প্রেতের বেশে মৃতদেহ নিয়ে নৃত্য), মায়ের পাতা (প্রেতিনী বা ডাকিনীর রূপসজ্জায় নৃত্যাভিনয়), লাউসেনের পাতা (লাউ কুমড়া নিয়ে নাচ), ধূলসেনের পাতা (ধূলা উড়িয়ে নৃত্য), ব্রহ্মর পাতা (পূজায় আগুন নিয়ে নৃত্য), জলকুমরীর পাতা (খিচুড়ির ভোগ পানিতে ডুবিয়ে দেয়া) ও চামুণ্ডার পাতা (মায়ের পাতার অনুরূপ)। মায়ের পাতা নৃত্যে ভক্তরা প্রেতিনী বা ডাকিনীর রূপসজ্জা গ্রহণ করে। পরনে থাকে রঙ্গীন বস্ত্র, নানাবিধ গহনা, ফুলের মালা। চামুণ্ডার পাতা নৃত্যকারী পাত্ররা চামুণ্ডার রূপসজ্জায় অবতীর্ণ হয় তবে এদের মুখে মুখোশ থাকে। সচরাচর সন্ন্যাসী বা ভক্তগণ এই নৃত্য পরিবেশন করে। এ ধরনের পরিবেশনার অন্য নাম পাতানামা বা ভূতাবেশ, অর্থাৎ ভূতের ভয়। এই ভূতের ভয়ের অভিনয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ভক্ত বা সন্ন্যাসীগণ হাত, পা, মাথা কম্পন ও ঘুর্ণন প্রদর্শন পূর্বক বিকট স্বরে ভৌতিক চিৎকার দিয়ে থাকে। প্রধান সন্ন্যাসী যখন বুঝতে পারে যে, আসরে কালি বা চামুণ্ডার আবির্ভাব ঘটেছে তখন থেকেই এই ভ্রাম্যমাণ নৃত্যাভিনয়ের শুরু হয়। পাতানামায় অতিলৌকিক ঔষধ পাওয়া যায় বলে গ্রামীণ ভক্তগণ বিশ্বাস করে। স্ত্রীরা অবাধ্য স্বামী বশীকরণের শিকড়-বাকড়ও লাভ করে। ভূতাবেশের পর আবার যে নৃত্যের শুরু হয়, সে নৃত্য ভৌতিক এবং তা মুখোশ পরে সম্পাদিত হয়। এ ধরনের নৃত্যের সময়ে ঢাকবাদ্য চলতে থাকে। আর তা ঘটে শ্মশানে। লোক-সংস্কার অনুযায়ী সেখানে সকলে যেতে পারে না। যেতে হলে আগে থেকেই কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। এই নিয়ম শুধু হাজরা পর্বের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, পরীনাচ-কালি কাচসহ সকল প্রকার মুখোশ নাচের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এবারে পৌরাণিক চরিত্রসমূহের নৃত্যে ব্যবহৃত মুখোশ সম্পর্কে কিছু বলা যাক। চৈত্র-সংক্রান্তির নৃত্যাভিনয়কালে বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্রের মধ্যে প্রধানত কালি, চামুণ্ডা, হনুমান, প্রেত, দুর্গা প্রভৃতির মুখোশ ব্যবহৃত হয়। এই সকল মুখোশ সাধারণত শোলা, বাঁশের চটা ও কাগজের সাহায্যে তৈরি করা হয়। আর মুখোশ অলঙ্করণে রঙ, জরি, সিলভারের পাত বা রাঙতা কাগজ ব্যবহার করা হয়। এই মুখোশ ব্যবহারকারীগণকে বিভিন্ন আচার-ব্রত, যথা–প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই নিরামিষ ভোজনের নিয়ম পালন করতে হয়, এমনকি মুখোশ ব্যবহারের পরের তিন পর্যন্ত এই নিয়ম মেনে চলতে হয়।

ঘোড়া নাচ
ঘোড়ার নাচ এক প্রকার অনুকৃতিমূলক নাচ। এক সময়ে মানুষের জনপ্রিয় যাতায়াতের বাহন হিসেবে ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন ছিল। আর সেই হিসেবে ঘোড়া ছিল বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে গতি ও শক্তির প্রতীক, সেই হিসেবে বিভিন্ন ভাবে ঘোড়া যেমন লোকমানুষের কাছে পূজিত হয়েছে, তেমনি ঘোড়াকে বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত করে প্রচলিত হয়েছে ঘোড়া নাচের। এক্ষেত্রে, প্রকৃত ঘোড়াকে নাচে ব্যবহার না করে ঘোড়ার প্রতিকৃতি বা মূর্তি তৈরি করে নিয়ে সে নাচে মানুষেরাই অংশগ্রহণ করতে থাকে। আসলে ঘোড়া নাচে এক অভিনেতা কৃত্রিম একটি ঘোড়ার উপর ‘আরোহণ’ করে দর্শকের সামনে আবির্ভূত হন। কৃত্রিম ঘোড়াটি কখনও একজন ঘোড়ার মুখোশ পরা পুরুষের সহায়তায়, কিংবা কাঠের তৈরি ঘোড়ার কেবলমাত্র ঘাড় ও মুখটি দ্বারাই নির্মিত হয়। অশ্বে ‘আরূঢ়’ ব্যক্তিটি এমনভাবে তার কোমর থেকে পা পর্যন্ত আচ্ছাদিত করে রাখেন যে, সে যে আরেক পুরুষের স্কন্ধে আরোহণ করে ঘোড়ায় চড়ার অভিনয় করছেন তা দর্শকের দৃষ্টিগোচর হবে না। যদি মনুষ্যবাহক এই ক্ষেত্রে না থাকেন, তবে একটি কাঠের ঘোড়ার ঘাড় ও মুখ এমনভাবে তার কোমরে এঁটে দিয়ে তার নিম্নভাগ কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয় যে, ব্যক্তি হেঁটে গেলেও বুঝতে পারা যাবে যে, সে ঘোড়ার উপর চড়ে যাচ্ছে। সেই অবস্থায় নিজের পায়েই সে নাচতে থাকলেও মনে হবে যে ঘোড়াটি নাচছে, আর অভিনেতা ব্যক্তিটি তার পিঠে বসে রয়েছেন, ঘোড়ার নাচের তালে তালে নাচছেন। এটাই ঘোড়া নাচ। ঘোড়া নাচ বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই প্রচলিত।

হিন্দু সম্প্রদায়ের সাধারণত নিম্নবর্ণের শিল্পীরা এই নাচ বাদ্য সহকারে পরিবেশন করে থাকেন। সচরাচর ঋষি (চামড়ার কারিগর, মুচি) সম্প্রদায়ের লোকজন, অর্থাগমের নিমিত্ত এই নাচ পরিবেশন করেন। এতে বাঁশের কাঠামো দিয়ে ঘোড়ার দেহ এবং কালো দড়িতে লেজ দিয়ে কৃত্রিম দেহ কাঠামোর উপর সালু বা অন্য কোনো রঙের কাপড় মাটি পর্যন্ত ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। কাঠামোর সামনে সুদৃশ্য ঘোড়ার গলা, কান, কেশরসহ মাথা থাকে, এই মাথা মাটি অথবা কাগজের হতে পারে। নৃত্যকারী একজন ঘোড়ার মাঝখানে আরোহী সাজে। তার কাঁধে দুটি দড়ি দিয়ে এই নকল ঘোড়াটি ঝোলানো থাকে। এই ঘোড়ার পিঠের উপর থাকে দুটি খড় বা তুলা ভরা কাপড়ের ঠ্যাঙ, তা আবার রেকাবদানি রাখা। এবার ঢোল কাঁসর, ফ্লুট বা ড্রাম বাদনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় নানা ভঙ্গিতে নৃত্যের পালা।

মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে মহররমের সময় এ ধরনের ঘোড়া নাচের অনুষ্ঠান হতে দেখা যায়। বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও ঢাকার কিছু অংশে এক সময় এই ঘোড়া নাচ ব্যাপক আকারে প্রচলিত থাকলেও বর্তমানে তার চল দুর্লক্ষ। ঘোড়া নাচের স্থল দুটি। একটি শোভাযাত্রায় পথে পথে, অন্যটি উৎসব স্থলে, ভূমি সমতল বৃত্তমঞ্চে। গম্ভীরা নৃত্যে ঘোড়া নাচ একটি বিশেষ অনুষ্ঠান।

দণ্ড নাচ
02.jpgশিব ও কালির ব্রত হিসেবে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল শহর সংলগ্ন চা-বাগানের শ্রমিকেরা এই নাচ করে থাকেন। এই নাচ সাধারণত ঊড়িশ্যা থেকে আসা চা-শ্রমিকেরা করে থাকেন। আসলে, ভক্তগণ তাদের বিভিন্ন ধরনের মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য এই ব্রত পালন করেন। যারা দণ্ড নাচ করে থাকেন তারা চৈত্র মাসের প্রথম দিন থেকে এক মাসের জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। চৈত্র মাস এলেই চা-বাগানের পুরুষ শ্রমিকেরা দণ্ড নাচের বিভিন্ন দল গঠন করে শ্রীমঙ্গলের কালিঘাট, বালিশিরা, রাজঘাট, ডেঙস্ট্যান চা-বাগানে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন। তারা যে বাগানে নাচ করে সে বাগানে চাল-ডাল ভিক্ষা করেন। সারাদিন পর সন্ধ্যার দিকে ভিক্ষায় প্রাপ্ত চাল-ডাল ও শাক-সবজি এক সাথে সিদ্ধ করে নিরামিষ ভোজন করেন। এ সময় তারা জোরে বাজনা বাজাতে থাকেন, যেন বাইরের কোনো শব্দ তাদের কানে না ঢোকে। রাত ১০/১১টার দিকে দণ্ড নাচের মূল পর্ব শুরু হয়।

এই নাচের শুরুতেই শিব ও কালিকে বন্দনা করে নেওয়া হয়। তারপর সারা রাত ধরে চা-বাগানের পুরুষ শ্রমিকেরা এই নাচ করতে থাকেন এবং ভোরের আলোর আভা দেখা দিলে তারা সে রাতের মতো দণ্ড নাচের সমাপ্তি টানেন। পরের রাতে আবার নতুন আরেকটি বাড়িতে বা নতুন কোনো স্থানে দণ্ড নাচের আসর জমে ওঠে। এভাবে পুরো চৈত্র জুড়ে শ্রীমঙ্গল অঞ্চলের বিভিন্ন চা-বাগানে এই দণ্ড নাচ চলতে থাকে। জানা যায়, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে অন্যান্য চা-বাগানেও এই নাচের প্রচলন আছে। দণ্ড নাচ সাধারণত চা-শ্রমিকদের বাড়ির উঠানে পরিবেশিত হলেও, কখনো কখনো তা বাগানের নির্ধারিত কোনো নাচঘরেও পরিবেশিত হয়ে থাকে। উল্লেখ্য, এই নাচে কোনো নারী শ্রমিককে অংশ নিতে দেখা যায় না, শুধু পুরুষ শ্রমিকেরাই অংশগ্রহণ করে থাকেন।

এছাড়া, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে রয়েছে আরো বহু বিচিত্র নৃত্যধারা, যেমন ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা আলকাপ সংশ্লিষ্ট নৃত্যধারা এবং গম্ভীরা, গাজীর গান, কুশান গান, অষ্টক গান, রয়ানী গান, নামকীর্তন ও পদাবলী কীর্তন সংশ্লিষ্ট নৃত্যধারা। এতদ্ব্যতীত মনিপুরি, সাঁওতাল, ওরাওঁ, হাজং, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, রাখাইন ইত্যাদি নৃগোষ্ঠীর কৃত্যাচার ও উৎসবকেন্দ্রিক নৃত্যধারার কথাও উল্লেখ করা যায়।

saymon_zakaria@yahoo.com
আর্টস প্রোফাইল: সাইমন জাকারিয়া

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


3 Responses

  1. রিপনচন্দ্র মল্লিক says:

    সাইমন জাকারিয়া ভাই,

    আপনার লেখা পড়ে খুব ভালো লেগেছে। এটিএন নিউজে আপনার ইন্টারভিউ ও বইমেলার সময়ে কাগজে পড়ে জেনেছিলাম আপনি এই ধরনের বিষয়গুলোর উপরে বই লিখেছেন…

    আপনার লেখা বইটি পূর্ণাঙ্গভাবে পড়ার আগ্রহ রইলো….

    রিপনচন্দ্র মল্লিক
    কবি ও সাংবাদিক
    ০১৭১৩৮৬৮০৭৬

  2. mirza leo says:

    গমীরা—বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার বিভিন্ন গ্রামে চৈত্র-সংক্রান্তির পাঁচ-সাতদিন আগে একদল যুবা-তরুণ বিভিন্ন পশু-পাখি ও মাছের মূর্তি তৈরি করে নৃত্য-গীত সহযোগে পাড়ায় পাড়ায় প্রদক্ষিণ করে বেড়ায়।
    আমি পঞ্চগড় এর ছেলে কিনতু কখনও দেখা হয়নি ।
    সাইমন জাকারিয়া কে শুভেচছা ..।

  3. yeasirarafat says:

    মুগ্ধ হলাম । আগামী প্রজন্মের জন্য এমন লেখা প্রয়োজন ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.